২য়-খণ্ড

০১. পেঁজা তুলোর মতন পাতলা তুষার

পূর্ব-পশ্চিম – উপন্যাস –দ্বিতীয় খণ্ড
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ভোরবেলা থেকে পেঁজা তুলোর মতন পাতলা তুষার দুলতে দুলতে নামছে। বৃষ্টির শব্দ থাকে, কিন্তু তুষারপাত একেবারে নিঃশব্দ। আস্তে আস্তে সাদা হয়ে আসছে গাছগুলোর মাথা। এদিকটায় নদীর ধারে সারি সারি উইলো গাছ, ঝুঁকে আছে জলের দিকে। এই গাছগুলির নাম উইপিং উইলো, দেখলেই কেমন যেন করুণ আর বিষণ্ণ মনে হয়। আরও অনেক গাছ এখানে, তার মধ্যে পপলার ও মেপল চেনা যায়।

হাডসন নদীর ধার দিয়ে সুদৃশ্য পথ, রিভার সাইড ড্রাইভ। গাড়ি চলার রাস্তা ছাড়াও রয়েছে। আলাদা পায়ে চলা রাস্তা, তার পাশে পাশে, গাছ তলায় অনেক বসবার জায়গা, সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো তাশ খেলা কিংবা দাবা খেলার টেবিল। এখন অবশ্য সেখানে কেউ বসে নেই।

এ দেশের গাড়ি হর্ন বাজায় না, মসৃণ রাস্তায় গাড়ির কোনো ঝাঁকুনি নেই, তবু চলন্ত গাড়ির সঙ্গে বাতাসের ঘর্ষণের একটা অদ্ভুত শব্দ আছে। সেটাই শহরের শব্দ। হু স স। হু স্ স্। এখানকার হাওয়া এক মুহূর্তও অক্ষত থাকে না।

ওভারকোটের পকেটে দু’হাত ভরে আস্তে আস্তে হেঁটে আসছে অতীন। গ্লাভস পরে আছে যদিও, কিন্তু দুটোতেই কয়েকটা ফুটো, হাত বাইরে রাখলেই কঙ্কন করছে আঙুলের ডগা। অতীনের গালে শৌখিনভাবে ছাঁটা দাড়ি, বেশ পুরুষ্ট একটা গোঁফ, চোখে সান গ্লাস, মাথায়। টুপী। সে মাথা নীচু করে হাঁটছে, একবার সে ডান দিকে তাকিয়ে রাস্তার অন্য পারের একটি ব্যাঙ্কের ঘড়ি দেখলো। এই ঘড়িতে একবার সময়, আর একবার তাপমাত্রা দেখায়। এখন সকাল আটটা সতেরো, তাপমাত্রা বিয়োগ চার।

মার্চ মাসের মাঝামাঝি ঠাণ্ডা বেশ কমে গিয়েছিল, গলতে শুরু করেছিল বরফ, মনে হয়েছিল এবার বুঝি বসন্ত আসবে। আশার ছলনা! এ দেশে এত তাড়াতাড়ি বসন্ত আসে না। দু’দিন ধরে রোদ মুছে গেছে একেবারে, আকাশ গম্ভীর, আবার শুরু হয়েছে তুষারপাত।

অতীনের খুব সিগারেট টানতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু গ্লাভস পরা হাতে সিগারেট জ্বালা যায় না। গ্লাভস খোলার তো প্রশ্নই ওঠে না, সিদ্ধার্থ তাকে ফ্রস্ট বাইটের ভয় দেখিয়ে রেখেছে। ফ্রস্ট বাইট হলে নাকি আঙুলের ডগাগুলো চিরকালের মতন অসাড় হয়ে যায়।

হাতে সময় আছে বলেই অতীন ইচ্ছে করে হাঁটছে। বাড়ি থেকে সে বেরিয়ে পড়েছে অনেক আগে। একটা গরম গেঞ্জি, তার ওপর টেরিউলের শার্ট, তার ওপর জ্যাকেট, তার ওপরে ওভার কোট, ঠাণ্ডা লাগার কোনো সম্ভাবনাই নেই। যথেষ্ট গরম পোষাক থাকলে বরফের মধ্যেও হাঁটতে ভালো লাগে, শরীরটা খুব তাজা লাগে। নিঃশ্বাসে একেবারে টাটকা বাতাস।

আরও কিছু কিছু নারী-পুরুষ হেঁটে যাচ্ছে এই পথে। রিভার সাইড ড্রাইভে অনেকে শখ করে বেড়াতে আসে। আজ ছুটির দিন নয়, তবু এতবড় শহরে নিষ্কম কিছু লোক থাকেই। তা ছাড়া আছে টুরিস্ট, সারা বছর ধরেই তাদের আসার বিরাম নেই।

দু’জন যুবককে দেখে অতীনের মনে হলো তারা ভারতীয় তো বটেই, বাঙালীও হতে পারে। ঠিক অতীনের মুখোমুখি আসছে। পথ ছেড়ে চট করে অতীন একটা পপলার গাছের আড়ালে

চলে গেল। যদি ওরা তাকে দেখে কথা বলতে চায়? অতীন অচেনা বাঙালীদের সঙ্গে আলাপ করতে একেবারেই আগ্রহী নয়। আড়ালে গেল বটে, তবু অতীন কান খাড়া করে রইলো। হ্যাঁ, তার অনুমান ঠিক, লোক দুটি বাংলাতেই কথা বলতে বলতে যাচ্ছে, কথার টান শুনে মনে হয় পূর্ব পাকিস্তানী।

ঠিক ন’টা বাজতে পাঁচ মিনিটে অতীন সেন্ট্রাল পার্কের একটা গেটের সামনে এসে। দাঁড়ালো। উল্টো দিকে প্লাজা হোটেল। অতীনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক ন’টায়। তুষারপাত থেমে গিয়ে খুচ করে একটু রোদ উঠে গেছে। এ দেশের আবহাওয়া বোঝা সত্যি দুষ্কর।

এখন একটা সিগারেট না খেলে আর চলে না। এরপর অনেকক্ষণ সিগারেট টানা যাবে না। বুকের মধ্যে একটা ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেছে, এক একবার মনে হচ্ছে ফিরে গেলে কেমন হয়?

অতীন একটা লাকি স্ট্রাইক ধরিয়ে পার্কের ভেতর দিকে তাকালো। বরফের ওপরে ছুটোছুটি করছে কয়েকটি বাচ্চা, উজ্জ্বল লাল-নীল পোষাক পরা, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। একজন বৃদ্ধ একটু দূর থেকে এমন লোভীর মতন দেখছে সেই বাচ্চাদের খেলা, যেন তাঁর কোনোদিন কোনো সন্তান হয়নি, অথবা তার সন্তানরা তাকে ত্যাগ করেছে।

সিগারেটটা শেষ করলো না অতীন, কয়েকটা ঘন ঘন টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে এলো। হোটেলটির দরজার রং সোনালি। অতীন আগে থেকেই শুনে এসেছে প্রাজা হোটেলটি বেশ অভিজাত, বড় বড় কম্পানির প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্টরা এখানে ওঠে, কিংবা ফিল্ম স্টারেরা, সাধারণ টুরিস্টদের পক্ষে এই হোটেল ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এ দেশের এই একটা সুবিধে, যে-কোনো বড় দোকান বা হোটেলেই ঢুকে পড়া যায়, কেউ বাধা দেয় না। কিছু না কিনেও কোনো দোকান বা হোটেলের আরকেডে ঘোরা যায়, হয়তো অনধিকারীদের ওপর এরা আড়াল থেকে নজর রাখে। কালো লোকেরা এই সব হোটেলে বোধ হয় ঢুকতে সাহসই পায় না। অতীন সোজা দৃষ্টি ফেলে, কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে, ঘোরানো কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে চলে এলো।

ডান পাশে কাউন্টার, তার ওপাশে সিঁড়ি, তারপর লিফটের দরজা, সামনে প্রশস্ত লবি। সিঁড়ির রেইলিং, লিফটের দরজা, লবির চেয়ারগুলি সবই যেন সোনা দিয়ে তৈরি। একেই বোধ হয় সোনার জলে গিল্টি করা বলে।

অতীন কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালো। এখন তার বুকটা থরথর করে কাঁপছে বলে সে নিজের ওপরেই বিরক্ত হচ্ছে। এরকম তো কথা ছিল না। নাভাস হবার কী আছে, যা হবার তা হবে, কিছুতেই কিছু আসে যায় না!

রিসেপশান কাউন্টারে পাঁচজন তরুণ-তরুণী, তাদের মধ্যে সবচেয়ে যার ভালো মানুষের মতন মুখ, তাকে বেছে নিল অতীন। টাইয়ের গিটটায় একবার অনাবশ্যকভাবে হাত দিয়ে, গলা পরিষ্কার করে সে বললো, আমি শ্রীযুক্ত স্যামুয়েল হুইলারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

যুবকটির মাথায় সোনালি চুল, নীল চক্ষু। সে এমনই রূপবান যে সে ফিলমের নায়ক না। হয়ে হোটেলের সামান্য কর্মচারি হয়েছে কেন, এই প্রশ্ন তাকে দেখলে মনে জাগবেই। সে সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করলো, আপনার কি সাক্ষাৎকার নির্দিষ্ট আছে?

ভারতীয়রা অনেক সময় শুধু মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানায়, এ দেশে সেটা সৌজন্য সম্মত নয়। তাই অতীন মাথা ঝোঁকালো বটে, মুখেও বললো, হ্যাঁ, আমার সঙ্গে শ্রীযুক্ত হুইলারের সাক্ষাৎকার নির্দিষ্ট আছে।

যুবকটি বললো, এক মুহূর্ত অপেক্ষা করুন, দয়া করে।

এই সব হোটেলে বাইরের আগন্তুকদের কাছে অতিথিদের ঘরের নম্বর বলে দেওয়ার নিয়ম নেই। যাকে-তাকে ওপরে পাঠিয়ে দেবার তো প্রশ্নই ওঠে না।

যুবকটি প্রথমে একটি তালিকা দেখলো, তারপর কানে টেলিফোন যন্ত্র লাগিয়ে কিছুক্ষণ শুনলো, তারপর অত্যন্ত বিনীতভাবে বললো, আমি ভীত হচ্ছি, মহাশয়, ঘরে কেউ নেই।

অতীনের মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ঘরে কেউ নেই মানে? সামুয়েল হুইলারের সঙ্গে সে গতকালই নিজে টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে। তিনি তাঁকে ন’টার সময় সময় দিয়েছেন। তবে কি অন্য কোনো তারিখে। না, তিনি স্পষ্ট বলেছেন, শুক্রবার সকাল ন’টায়। তবু লোকটা নেই? সাহেব জাতি এরকম কথা দিয়ে কথা রাখে না?

তারপরই অতীন ভাবলো, সকাল ন’টার সময় সাক্ষাৎকারের সময় দিয়ে লোকটা ঘরে বসে থাকবে কেন? নীচে নেমে আসবে কিংবা ব্রেকফাস্ট খাবার জন্য গিয়ে বসবে।

সে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি খাবারের ঘরগুলো একটু খুঁজে দেখতে পারি?

যুবকটি অতীনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বললো না। হোটেলে কাজ করার জন্য এরা একরকম নিখুঁত ভদ্রতা দেখানোর শিক্ষা পায়, তার মধ্যে মানবিক উত্তাপ একটুও থাকে না। অতীন যে অনেক দূর থেকে এসেছে, একটা সমস্যায় পড়েছে, তা কি এই লোকটা বুঝতে পারছে না? বুঝতে সে চায়ও না, সেটা তার চাকরির অন্তর্গত নয়।

অতীন লবিতে বা ডাইনিং হলগুলিতে খুঁজতে গেলে কেউ বোধ হয় আপত্তি করবে না, কিন্তু ঐ কথাটা সে উজবুগের মতন বলেছে। সে তো স্যামুয়েল হুইলারকে চেনেই না, এমনকি তার ছবিও দেখেনি! সে কি জনে জনে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে, আপনিই মিস্টার হুইলার?

যুবকটি অন্যদের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো, অতীন গরু-চোরের মতন মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার বুকের মধ্যে এখন আর কোনো শব্দ নেই, বুকটা একেবারে খালি, সে কি এতদূর এসে ফিরে যাবে। এ প্রস্তুতি, অপরের কাছ থেকে সুট ধার করে আনা, সব ব্যর্থ?

কাউন্টারের যুবকটি একটু পরে, অন্য একজনের সঙ্গে কথা শেষ করে, অতীনকে তখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, যান্ত্রিক দায়িত্ব বশত চাবির খোপ দেখলো। আপন মনে বললো, উনি চাবি দিয়ে যাননি। তারপরই স্বর্ণখনি আবিষ্কারের ভঙ্গিতে সেই খোপ থেকে এক টুকরো কাগজ বার করে এনে, একটা শিস দিয়ে বললো, আমি দুঃখিত, মহাশয়, এই যে একটা নির্দেশ রয়েছে। আপনার নামটি অনুগ্রহ করে জানাবেন কী?

অতীন পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে দিল। সেটি দেখে, হাতের কাগজটির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে সে বললো, হ্যাঁ, এই তো, শ্রীযুক্ত স্যামুয়েল হুইলার আপনার জন্য সাঁতার-পুকুরে অপেক্ষা করছেন!

এবারে অতীনের চক্ষু ছানাবড়া হবার জোগাড়। এই শীতের মধ্যে সুইমিং পুলে? সেখানে লোকটি দেখা করবে অতীনের সঙ্গে? পাগলের কাণ্ড নাকি?

–সাঁতার-পুকুরটি কোন দিকে?

যুবকটির বিনয়ের মুখোসপরা মুখেও একটা অধৈর্যের ছাপ ফুটে উঠেছে। নিতান্ত গাঁইয়া। ছাড়া এরকম প্রশ্ন যেন কেউ জিজ্ঞেস করে না। একজন উটকো লোকের জন্য সে অনেকখানি। সময় খরচ করে ফেলেছে। এ চাকরিতে তার প্রতি ছমিনিটের দাম এক ডলার।

সে একদিকের দেয়ালে অঙ্গুলি নির্দেশ করে অতীনের দিকে পিঠ ফেরালো।

দেয়ালের গায়ে স্বর্ণাক্ষরে সুইমিং পুল, সান বাথ, কনফারেন্স রুম ও বিভিন্ন রকম খাবারের কক্ষের নামের নীচে নীচে তীর চিহু আঁকা। কিন্তু এই সব কথা যে দেয়ালের গায়ে লেখা থাকে, সেটাই বা একজন নতন লোক জানবে কী করে?

একটি তীর চিহু ধরে অতীন এগোলো। গোলকধাঁধার মতন পথ। এ দেশে প্রায় বছর খানেকের বেশী কেটে গেলেও অতীন এখানে অনেক কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এখন তার মনে পড়লো, এখানে অনেক ঢাকা সুইমিং পুলে শীতকালের উপযোগী ঈষদুষ্ণ জল থাকে। যাদের স্বাস্থ্য বাতিক, তারা সাঁতার কাটে সারা বছর।

সুইমিং পুলে যদি অনেক লোক থাকে এখন, তা হলে স্যামুয়েল হুইলারকে অতীন কী করে খুঁজে পাবে? একমাত্র ভরসা তিনি অতীনকে চিনে নেবেন। এ পর্যন্ত আর কোনো ভারতীয় তো দূরের কথা, একজনও অশ্বেতকায় মানুষ দেখা যায়নি।

সুইমিং পুলে ঢোকার মুখে একটি লোক বসে আছে, সে অতীনের দিকে নিঃশব্দে হাত বাড়ালো, এখানে পোষাক খুলে রাখতে হয়। অতীনের উচিত ছিল ঢোকার মুখেই ক্লোক রুমে ওভার কোটটা জমা করে আসা। ভেতরে গরমের জন্য সে ওভার কোটটি খুলে হাতে নিয়েছে। সে লোকটিকে বললো, আমি সাঁতার কাটতে যাচ্ছি না, একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।

এ কথা সে বললো বটে, তবু বোকার মতন সে লোকটির হাতে তুলে দিল তার ওভার। কোট। এ দেশে পদে পদে, যে-কোনো লোককে দিয়ে যে-কোনো কাজ করাতে গেলেই পয়সা লাগে। শুধু একটা কোট হাতে ধরার জন্যই ফেরার সময় এই লোকটিকে কত বকশিশ দিতে হবে কে জানে! কম বকশিশ দিলে এরা বড় অবজ্ঞার চোখে তাকায়। অতীন এ দেশে ট্যাক্সি চাপে না, প্রথম দিকে দু’একবার চাপতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে। প্রথমবার সে ট্যাক্সির মিটার দিয়ে আর অতিরিক্ত কত দেবে ভেবে হাতের পয়সা গুণছিল, পটুরিকান ড্রাইভারটিই তার তালু। থেকে একটি ডলারের আধুলি ও দুটি সিকি তুলে নিল। তারপর থেকে অতীন জেনে গেছে যে ট্যাক্সি ভাড়ার ওপরে আরও পনেরো শতাংশ গুণাগার না দিলে এখানে চলে না।

সুইমিং পুলে গোটা পাঁচ-ছয় বাচ্চা, তিন-চারটি তরুণী ও একজন মাত্র পুরুষ। মাথা খারাপ করে দেবার মতন স্বাস্থ্যবতী একটি তরুণী একটি টাইয়ের মাপের জাঙ্গিয়া পরে জল ছেড়ে ঘাটলার ওপরে বসে আছে। বাকল ছাড়ানো কলাগাছের মতন মসৃণ তার উরু, তার বুকে কোনো বন্ধন নেই, সদ্য সমুদ্র থেকে তোলা শঙ্খের মতন তার দুই স্তন। অতীন শুনেছে, ষাটের দশকের গোড়া থেকে এ দেশের রমণীরা প্রকাশ্যে বুক উন্মুক্ত রাখতে শুরু করেছে, এমন পোষাক তারা পরে, যার নাম টপ লেস। নারী মুক্তিতে যারা বিশ্বাসী, সেই সব মেয়েদের বক্ষ বন্ধনীর ওপর খুব রাগ।

স্বভাবতই এই অপরূপা, নির্লজ্জা অপ্সরার দিকে অতীনের চোখ আটকে যাবেই। কিন্তু প্রয়োজন বড় দায়। সে জোর করে চোখ সরিয়ে পুরুষটিকে দেখলো। রীতিমতন বলিষ্ঠ, হৃষ্টপুষ্ট, মাঝারি উচ্চতার, মাঝবয়েসী এই লোকটির বুক ভর্তি পাকা চুল, অথচ মাথার চুল কালো, মুখখানা চৌকো ধরনের, চোখ দুটি কুকুতে, সে অতীনের দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতে সে অতীনকে হাতছানি দিল। অতীন এগোতেই সে চৌকো পুকুরটার মাঝখান থেকে সাঁতরে চলে এলো রস্তোরু অঙ্গরাটির কাছাকাছি তীরে।

অতীন ভেবেছিল, ন’টার সময় যখন সাক্ষাৎকার, তখন নিশ্চয়ই স্যামুয়েল সাহেব তাকে প্রাতরাশের টেবিলে বসিয়ে আলোচনা করবে। অতীন এই জন্য কিছু খেয়ে আসেনি। এই লোকটা তাকে ডেকেছে সুইমিং পুলে? এর মধ্যে একটা হেলা-তুচ্ছ করার ভাব আছে না? অপমান-বোধে অতীনের কান ও নাকের ডগা গরম হয়ে গেল।

অতীন লোকটির কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে বললো, আপনি কি শ্রীযুক্ত স্যামুয়েল হুইলার? আমার নাম…

লোকটি বললো, হাই…

তারপর এক নজর সেই আগুনের ঢেলার মতন তরুণীটির দিকে তাকিয়ে নিয়ে সে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো, ইউ প্যাকিং’ অর অ্যান ইনজান?

অতীন টানা ছ’মাস টেলিভিশনের সামনে প্রতিদিন তিন চার ঘণ্টা ধৈর্য ধরে বসে আমেরিকান ইংরিজি উচ্চারণ অভ্যেস করেছে। তবু লোকটির কথা শুনে সে হকচকিয়ে গেল। বিড় বিড় করে কী বলছে লোকটা?

তারপরই তার চকিতে মনে পড়লো, এই দেশে, ছোটদের কমিকসে আর টি ভি-র ফিমে, এখানকার যারা প্রকৃত আদিবাসী, বাংলা ভূগোলের বইতে যাদের বলে রেড-ইন্ডিয়ান, সেই তাদের এরা বলে ইনজান। আর প্যাকি মানে পাকিস্তানী। অর্থাৎ লোকটা তার সঙ্গে প্রথম থেকেই রসিকতা করতে শুরু করেছে। যখন তখন রসিকতা করাটা আমেরিকানদের একটা মুদ্রাদোষ!

অতীন বিনীতভাবে বললো, স্যার, আমি একজন ভারতবর্ষের ভারতীয়!

স্যামুয়েল বললো, উত্তম, উত্তম! আমি ভারতীয়দের পছন্দ করি। আমি একবার ভারতে গিয়েছিলাম, সেই উনিশ শো চুয়াল্লিশে, তখন আমি সেনাবাহিনীতে ছিলাম, বমবেই, ক্যাজুরায়ো, আজান্টা…আমার দিব্য মনে আছে! শোনো যুবক, তোমাকে এখানে ডেকেছি, আশা করি তুমি কিছু মনে করছে না, আমি পৃথিবীর যেখানেই থাকি, সকালবেলা খানিকক্ষণ সাঁতার না কাটলে আমার মর্জি ঠিক থাকে না-এবারে কাজের কথা হোক, তুমি ভারতের কোন্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ডিগ্রি নিয়েছো?

এই কি চাকরির ইন্টারভিউ? অতীন ক্ষোভের সঙ্গে ভাবলো, এই স্যামুয়েল নামের লোকটা একটি বড় মাল্টি ন্যাশনাল কম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান। লোকটির চেহারা যদিও গেরিলার মতন, তবু যোগ্যতা আছে নিশ্চয়ই। প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় জলে শরীর ডুবিয়ে সে অতীনকে প্রশ্ন করছে। অতীন যদি ভারতীয় না হয়ে একজন শ্বেতাঙ্গ এম এস-সি পাশ যুবক হতো, তবে তার সঙ্গে এরকম বেয়াদপি করার সাহস পেত কি স্যামুয়েল?

অতীনের একবার ইচ্ছে হলো উঠে চলে যাওয়ার। কিন্তু কয়েকদিন আগে একটা ঘটনা ঘটেছে। নিউ জার্সিতে একজন বাঙালী ইঞ্জিনিয়ার ছেলে হঠাৎ খুন হয়েছে অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে। পুলিস এখনও হত্যাকারীকে ধরতে পারেনি। স্থানীয় অনেক বাঙালীর ধারণা, ঐ ইঞ্জিনিয়ারটিকে খুন করেছে তারই জনৈক বন্ধু। ঐ ইঞ্জিনিয়ার ছেলেটি প্রাক্তন নকশাল, দেশে। থাকতে সে কারুকে খুন করে এসেছিল কি না তা অবশ্য কেউ জানে না, নিশ্চয়ই সেরকম কিছু ব্যাপার আছে, তারই প্রতিশোধ নিয়েছে অন্য কোনো বাঙালী। পশ্চিম বাংলায় যারা মরেছে, তাদের ভাই-টাই বা দলের ছেলেরাও তো এ দেশে চাকরি করতে বা পড়তে আসে।

এই ঘটনার পর সিদ্ধার্থ অতীনকে বলেছে, তুই নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যা, যদি প্রাণে বাঁচতে চাস। গোটা নিউইয়র্ক স্টেটে অনেক বাঙালী স্থায়ী বাসিন্দা। তা ছাড়া অনেক বাঙালী আসছে-যাচ্ছে। জলপাইগুড়ি–শিলিগুড়ির কেউ অতীনকে হঠাৎ চিনতে পারলে বদলা নেবার চেষ্টা করতে পারে। অতীনের পক্ষে মিড-ওয়েস্ট কিংবা অ্যারিজোনা–নিউ মেক্সিকোর দিকে চলে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে, ঐ সব দিকে বাঙালীর সংখ্যা কম, টুরিস্টও বেশী যায় না।

সিদ্ধার্থর কথায় যুক্তি আছে। লন্ডনে থাকার সময়ই অতীন এই ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গে বছর দুই-আড়াই নকশাল ছেলেরা দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখাবার পর এখন তারা পিছু হটছে। ইন্দিরা গান্ধী আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় লেলিয়ে দিয়েছে পুলিস-মিলিটারি। যেখানে সেখানে নকশাল বিপ্লবীদের কিংবা নকশাল সন্দেহে অন্য ছেলেদের পিটিয়ে মারা হচ্ছে। সরোজ দত্তের মতন বুদ্ধিজীবীকে ভোরবেলা কলকাতায় পুলিস ময়দানে পাগলা কুকুরের মতন গুলি করে মেরেছে। এর প্রতিফলন পড়েছে বিদেশেও। লন্ডনে একটা জায়গায় তর্ক করতে করতে অতীন উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, তখন একটি নিতান্ত ছাপোষা,উন্নতিকামী, এলেবেলে বঙ্গসন্তান হঠাৎ বলে উঠেছিল, আপনি মশাই অতীন মজুমদার, আপনার বাড়ি কি কালীঘাটে ছিল? কালীঘাটের সাবজজ প্রতাপ মজুমদারের ছেলে তো একটা খুনী, বেইল জাম্প করে বিদেশে পালিয়ে এসেছে! এবার দেশে গিয়ে, শুনলুম…

সিদ্ধার্থর পরামর্শ হয়তো সঠিক, কিন্তু মিড ওয়েস্ট বা অ্যারিজোনার দিকে চাকরি পাওয়া কি সোজা কথা? এখানকার বন্ধুরাই বলে যে আগের দশকে আমেরিকায় চাকরি ছিল অফুরন্ত। যে যখন খুশী ইচ্ছে মতন পেশা বদলাতে পারতো। সিটিজেনশীপ বা গ্রীন কার্ড পাওয়াও ছিল অনেক সহজ। কিন্তু বছর দুয়েক আগে থেকেই অবস্থা অনেক বদলে গেছে, আরব দেশের তেল এখন আমেরিকার প্রধান শিরঃপীড়া, সেখানকার হঠাৎ পাওয়া গলিত স্বর্ণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে আমেরিকা হঠাৎ উপলব্ধি করেছে যে শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ানের দিকে একচক্ষু হরিণের মতন তাকিয়ে থাকাটা তাদের ভুল হয়েছে।

বিজ্ঞাপন দেখে দেখে আরিজোনার একটি ওষুধের কম্পানিতে একটা দরখাস্ত করেছিল। অতীন, তারপর সিদ্ধার্থর জামাইবাবুর সূত্র ধরে এই কম্পানিতে খানিকটা চেনা-শুনোও বেরিয়েছে, সেই জন্যই অতীন এখানে একটা ইন্টারভিউয়ের সুযোগ পেয়েছে। অতীনও আর নিউইয়র্কের মতন বড় শহরে থাকতে চায় না। কোনো লোক তার পূর্ব পরিচয়ের প্রসঙ্গ তুললেই অসম্ভব মাথা গরম হয়ে যার তার, রাত্রে ঘুম আসে না কিছুতেই। এমনকি কোনো লোক তার সঙ্গে ঠাট্টার সুরে কথা বললেই সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, দু’একবার সে এরকম লোকদের গলা টিপে ধরতে গিয়েছিল। সে, অতীন মজুমদার তো খুনী নয়! আত্মরক্ষা করবার জন্য…

নিজেকে দমন করে অতীন স্যামুয়েলের প্রশ্নের জবাব দিয়ে যেতে লাগলো। বেশীরভাগই এলেবেলে কথা, যার সঙ্গে চাকরির কোনে সম্পর্কই নেই। অতীনের বেশী খারাপ লাগছে এই জন্য যে খুব কাছেই বসা, প্রায় নির্বসনা সুন্দরীটি সব কথা শুনতে পাচ্ছে। যদি চাকরির ব্যাপার না হতো, তা হলে হোঁকা স্যামুয়েলের চেয়ে অতীনের নিশ্চিত বেশী সুযোগ ছিল মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করবার। এ দেশের মেয়েরা চেহারার কদর দেয় বটে। তার চেয়েও বেশি দেয়। টাকা ও ক্ষমতার। মেয়েটি নিশ্চিত বুঝতে পারছে যে স্যামুয়েল একজন কেউকেটা ব্যক্তি, আর অতীন সামান্য একজন দয়াপ্রার্থী।

হোটেলের পরিচারক এসে মেয়েটিকে দিয়ে গেছে এক কৌটো হাইনিকেন বীয়ার। মেয়েটি বীয়ারে চুমুক দিতে দিতে তাকিয়ে আছে এদিকেই। বীয়ার খেলে মেদ জমে, এই তরুণীটি বীয়ারও পান করে, আবার সাঁতার কেটে মেদ ঝরিয়ে নেয়।

স্যামুয়েল মেয়েটির নগ্ন স্তনের দিকে বার বার চোরা-দৃষ্টি হানছে। হাসি ছুঁড়ে দিচ্ছে, আর অতীন সোজা তাকিয়ে আছে স্যামুয়েলের মুখের দিকে। স্যামুয়েল অর্থাৎ আংকল স্যাম যা খুশী করতে পারে, কিন্তু অতীন, সে এক অকিঞ্চিত্বর ভারতীয়, দয়াপ্রার্থী, চাকরির ইন্টারভিউতে একবার অন্যমনস্ক হলে তার আর কোনোরূপ আশা নেই। এ কি অসম প্রতিযোগিতা!

সুইমিং পুলের জল ঠিক সমুদ্রের মতন গাঢ় নীল। কয়েকটা বাচ্চা সেখানে দাপাদাপি করছে। আর অবাক হয়ে দেখছে অতীনকে। অতীন এখানে পুরো পোষাক পরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। বলেই সে দ্রষ্টব্য, না কালো মানুষ বলে? অন্য যে দু’তিনটি তরুণী সাঁতার কাটছে, তাদের পুরো দস্তুর সঁাতারের পোষাক। শুধু এই একটি মেয়েই পাড়ে উঠে বসে জেদীর মতন তার শরীর দেখাতে চায়। নীচু ছাদ থেকে কৃত্রিম আলো পড়েছে তার ওপরে, ঠিক রোদ্দুরের মতন।

অন্যান্য কথার মাঝখানে স্যামুয়েল হুইলার হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, তুমি স্প্যানীশ জানো? চাকরির মৌখিক পরীক্ষার সব কিছুতেই যা বলতে হয়, কিন্তু অতীনের এক বর্ণও স্প্যানীশ। ভাষা-জ্ঞান নেই। সে একটু ইতস্তত করে বললো, না স্যার!

–তোমাকে কাজের জন্য মাঝে মাঝে মেক্সিকোতে যেতে হবে, স্প্যানীশ ভাষা জানা অতি আবশ্যিক!

–আমি খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারবো, স্যার। অন্তত তিন মাসের মধ্যেই–

–বাঃ! তোমাকে দাড়িটা কামিয়ে ফেলতে হবে। গুটি রাখতে পারো, তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু দাড়ি চলবে না। আমাদের চেয়ারম্যান যে-কোনো দাড়িওয়ালা ছোকরাকেই বীটনিক মনে করে। ওর ছেলে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল, সেখানে গিয়ে বাউন্ডুলে হয়ে যায়।

অতীন হাসি হাসি মুখে চুপ করে রইলো। মনে হচ্ছে চাকরিটা হয়ে যাবে। লোকটাকে যত খারাপ মনে হয়েছিল, ততটা কঠোর নয়। সিদ্ধার্থ অবশ্য বলে দিয়েছে, এ দেশে বড়লোকদের। ব্যবহারেও একটা নকল আন্তরিকতা থাকে। ভারতে যারা চাকরির ইন্টারভিউ নেয়, সেই সব বড় অফিসাররা সবাই গোমড়ামুখো হয়, এ দেশে এরা হেসে কথা বলে।

কিন্তু এই লোকটা ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে আনছে। স্প্যানীশ ভাষা শিখতে বলছে, দাড়ি কামাতে বলছে, এতটা যখন এগিয়েছে…না হয় অতীন দাড়িটা কামিয়েই ফেলবে! যে-কোনো উপায়ে সে নিউইয়র্ক ছেড়ে যেতে চায়। নিউ জার্সির বাঙালীদের মধ্যে অন্তত দু’জন তাকে ঘোরতর অপছন্দ করে, অতীন তার কারণ বুঝতে পারে না। অ্যারিজোনায় অপরিচিতদের মধ্যে গিয়ে সে শুরু করবে নতুন জীবন।

স্যামুয়েল আবার বললো, আর একটি কথা। তোমার নামটিও বদলানো দরকার। অন্তত নামের প্রথম অংশটি। আমাদের কম্পানিতে সবাই সবাইকে প্রথম নাম ধরে ডাকি। তোমার ঐ ভারতীয় নামটি কেউ উচ্চারণ করতে পারবে না, আমি তো পারিনি। একটা বেশ সহজ, মিষ্টি নাম:টম নামটা কি তোমার পছন্দ?

অতীনের মুখখানা পাট-পচা জলের মতন বিবর্ণ হয়ে গেল। চাকরির জন্য বাপ-মায়ের দেওয়া নামও বদলে ফেলতে হবে? কয়েকদিন আগেই সিদ্ধার্থর বন্ধু ধ্রুব বলেছিল, ওদের দেশের বাড়িতে সব চাকরেরই নাম বদলে দেওয়া হয়। যে চাকরই আসুক, তার নাম রাম। একজন রাম চাকরি ছেড়ে চলে গেল, তারপর যাকে রাখা হলো, তার আসল নাম হয়তো দুর্যোধন, কিন্তু ঐ খটমটে নাম কে মনে রাখবে? দুর্যোধনের নাম পাল্টে রাখা হলো রাম। দুর্যোধনেরা তাতে আপত্তি করে না। এ দেশেও আমরা সবাই ঐ রাম।

বীয়ার পান শেষ করে, ক্যানটি পাশে নামিয়ে রেখে মুক্তবসনা তরুণীটি এবার জিজ্ঞেস করলো, স্যামি, তোমার কি আরও দেরি আছে? আমি এবার ঘরে ফিরবো!

স্যামুয়েল বললো, না ডারলিং, আমার শেষ হয়ে গেছে। তোমার কেমন লাগলো এই ছেলেটির কথা শুনে?

অতীনের দিকে না তাকিয়ে, মেয়েটি তার পায়ের নখ পরিষ্কার করতে করতে বললো, ও কে!

অতীনের আবার স্তম্ভিত হবার পালা। এই মেয়েটি স্যামুয়েলের চেনা, ওর বউ নাকি? এই প্রৌঢ়ের এতটা তরুণী বউ? কিংবা হোটেলে এসে সংগ্রহ করা সাময়িক বান্ধবী! সে যাই হোক, অতীনের চাকরির ব্যাপারে এরও মতামতের মূল্য আছে? এই যুবতী স্যামুয়েল হুইলারের সহকর্মিণী নয় তো? বউকে ফাঁকি দিয়ে বড় কারা প্রাইভেট সেক্রেটারিকে নিয়ে দূরের কোনো শহরে ফুর্তি করতে যায়, এরকম গল্প প্রায়ই দেখা যায় খবরের কাগজে।

স্যামুয়েল জল থেকেই তার ভিজে হাতটা অতীনের দিকে বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য। তারপর বললো, ঠিক আছে, বাকিটা তোমাকে চিঠি লিখে জানানো হবে!

‘ধন্যবাদ’ বলে অতীন উঠে দাঁড়ালো, তারপর পেছন ফিরে হাঁটতে লাগলো যন্ত্রের মতন। ওভার কোটটা ফেরত নেবার সময় বকশিশ দেবার কথা তার মনে পড়লো না। কেউ যেন ঠাস ঠাস করে তার দুই গালে থাপ্পড় কষিয়েছে। তার চোখ দিয়ে এক্ষুনি জলের ফোঁটা নামবে। সে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল হোটেল থেকে।

বাইরে রোদ নিভে গিয়ে আবার তুষারপাত শুরু হয়েছে–অতীন গ্লাভস পরলো না, ওভার কোটটাও গায়ে চাপাতে ভুলে গেল। র গরম লাগছে। সিগারেট ধরাতে গিয়ে তার হাত কাঁপতে লাগলো একটু একটু।

মালখানগরের প্রতাপ মজুমদারের ছেলে সে, অতীন মজুমদার, তাকে এতটা নীচে নামতে হবে? তার বাবা কোনোদিন কারুর কাছে মাথা নীচু করেননি, শুধু একবারই তাঁকে লোকের কাছে দয়া চাইতে হয়েছে, তাও তাঁর ছেলের জন্য।

একটা জলে গা-ডোবানো গেরিলা আর একটা আধ-ন্যাংটো মেয়ে নেবে তার চাকরির ইন্টারভিউ? অ্যামেরিকানরা ইনফরমাল হয়, তা বলে এতটা ইনফরমাল নাকি একটা কালো ভারতীয় ছেলের জন্য অন্য সময়ে সময় নষ্ট করা যায় না? চাকরির জন্য তাকে দাড়ি কামাতে হবে, নাম বদলাতে হবে। এরপর যদি বলে তুমি বাপের নাম বদলাও, মায়ের নাম বদলাও, সারা গায়ে খড়ি মেখে ফর্সা হও…এরকম চাকরির মুখে লাথি! চিঠি এলে সে ছিঁড়ে ফেলে দেবে!

ঘোরের মাথায় খানিকটা হেঁটে এসে এক জায়গায় থমকে দাঁড়ালো অতীন। সকালটা কত একটা সুন্দর সম্ভাবনা দিয়ে শুরু হয়েছিল, এখন সব কিছু বিস্বাদ হয়ে গেছে। সামনে লম্বা, টানা ফিফথ অ্যাভিনিউ। একটা পৃথিবী-বিখ্যাত পথ, এখানে সে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেললেও কেউ তার দিকে ফিরে তাকাবে না।

দাঁতে দাঁত চেপে অতীন বেশ জোরে বললো, শুয়ারের বাচ্চা!

০২. সিদ্ধার্থ এসে অতীনকে

সিদ্ধার্থ এসে অতীনকে ঘুম থেকে টেনে তুললো। এখন সন্ধে সাতটা, এখন মোটেই ঘুমোবার সময় নয়। টি ভি চলছে, জানলার পর্দা টানা, বেড সাইড টেবিলে গোটা ছয়েক বীয়ার ক্যান, অতীন শুয়ে আছে খাটের একেবারে ধার ঘেঁষে, তার একটা হাত পাশে ঝুলছে। সিদ্ধার্থ সেই হাতটা ধরে টান মেরে বললো, এই বাবলু, ওঠ!

জড়ানো গলায় অতীন বললো, আঃ বিরক্ত করিস না। আমি এখন ঘুমোবো। আজ আমি রান্না-ফান্না করতে পারবো না!

টি ভি বন্ধ করে, জানলার পর্দা সরিয়ে কাচের ওপাশের আলোকোজ্জ্বল নগরীর দিকে তাকিয়ে সিদ্ধার্থ বললো, তোর একটা চিঠি এসেছে!

সঙ্গে সঙ্গে তড়াক করে উঠে বসলো অতীন। খানিকটা অবিশ্বাসের সঙ্গে বললো, যাঃ, বাজে কথা!

কোটের পকেট থেকে বার করে একটা এয়ার মেল খাম দেখিয়ে আবার সেটা পকেটে ভরে ফেললো সিদ্ধার্থ। তারপর বললো, দেবদাস, অ্যাঁ? দিনের বেলা একাকী মদ্যপান, বিরহ, বেকারত্বের দুঃখ! আজ কাজে যাসনি।

–দে চিঠিটা দে! কার চিঠি!

–আগে উঠে মুখ চোখ ধুয়ে আয়। ঐ জঘন্য নোংরা গেঞ্জিটা না খুললে তোর এই চিঠি পড়ার কোনো রাইট নেই। ঘরটাকে এত গরম করে রেখেছিস কেন? এত গরম খুব আনহাইজিনিক।

অতীন দু হাতে মাথা চেপে ধরলো। দিনের বেলা বীয়ার খেয়ে ঘুমালেই তার মাথা ধরে। আবার একলা একলা বীয়ার খেলে ঘুম পাবেই। উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে সে জিজ্ঞেস করলো, তোর কাছে টাইলেনল আছে?

–কড়া করে কফি খা, মাথা ছেড়ে যাবে। যখন-তখন ওষুধ খাওয়া ভালো নয়। সিদ্ধার্থ ওভারকোট খুলে ওয়ার্ডরোবে ঝোলালো। টাই খুললো, চেয়ারে বসে জুতো-মোজা। খুললো, সব গুছিয়ে রাখলো ঠিক জায়গায়। সে পরিপাটি ধরনের ছেলে। এদিক-ওদিকে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রাখা সে একেবারে পছন্দ করে না। ঘরের চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখলো

অতীন কী কী অগোছালো করে রেখেছে। বাইরে শূন্যের নিচে তাপমাত্রা হলেও ঘরের মধ্যে ঘাম হচ্ছে, সিদ্ধার্থ দেয়ালের রেগুলেটার ঘুরিয়ে গরম কমালো, বীয়ারের খালি টিনগুলো ফেলে দিল ট্রাস ক্যানে, দু তিনটে সিগারেটের টুকরো কুড়োললা মেঝে থেকে। তারপর সে পাশের রান্নাঘরে এসে গ্যাস জ্বেলে কেটলিতে জল চড়ালো।

অতীন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলো টেবিলের ওপর এনভেলাপটি রাখা। ঠিকানার হাতের লেখা দেখেই সে চিনেছে। সাহেবরা হাতের লেখা পড়তে পারবে না এই ভয়ে মা পুরো ঠিকানাটাই ক্যাপিটাল অক্ষরে লেখে।

মায়ের চিঠির সঙ্গে মুন্নিরও একটা আলাদা চিঠি আছে। বাবা চিঠি লেখেন না। অতীনও তো মাকে লেখা চিঠির শেষে এক লাইন জুড়ে দেয়, বাবা ভালো আছে নিশ্চয়ই, বাবাকে প্রণাম জানিও। বাবাকে চিঠি লেখে না অতীন, কিন্তু এখানে সে প্রায়ই বাবার সঙ্গে মনে মনে কথা বলে, তর্ক-বিতর্ক করে।

প্রথমে সে দুটো চিঠিতেই দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল, কোনো বড় রকমের খবর আছে কি না জানার জন্য। পরে ভালো করে পড়বে। একবার নয়, তিন চারবার। মা কিংবা মুন্নি কোনো চিঠিতেই কারুর অসুখের কথা লেখে না।

সিদ্ধার্থ দু’ কাপ কফি নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, বাড়ির চিঠি?

অতীন চিঠি থেকে চোখ না তুলে মাথা নাড়লো। সিদ্ধার্থ হেসে বললো, ড্রয়ারে এরোগ্রাম আছে, এবার উত্তর লিখতে বসে যা! যত পারিস গুল-গাপ্পা ঝাড়। লেখ যে, এই উইক এন্ডে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গেলুম। জানো তো, মা, একটা লাল রঙের গাড়ি কিনেছি, আমার বাড়ির বাগানে কী সুন্দর গোলাপ ফুটেছে, অফিসে একজন সাহেবকে ডিঙিয়ে আমার প্রমোশন হয়েছে, অফিসের বস কাল ব্রডওয়ে-তে থিয়েটার দেখালো, তারপর ডিনার খাওয়ালো–আরও কী কী যেন তুই বানাস?

অতীন চিঠি দুটো খামে ভরে কফিতে চুমুক দিল।

সিদ্ধার্থ আবার বললো, কলকাতায় বাবা মা ভাবছে, ছেলে আমাদের কী না সুখে আছে! লন্ডন ছেড়ে চলে এসেছে সোনার দেশ আমেরিকায়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহর নিউ ইয়র্কে তার বাড়ি, নিজের গাড়ি চেপে অফিস যাচ্ছে, পকেটে সব সময় ঝমঝম করছে ডলার।

অতীন প্যান্টের পকেট থেকে একটা দশ ডলারের নোট বার করে এগিয়ে দিল সিদ্ধার্থর দিকে।

–ড্রয়ারে রাখ। আজ কাজ পেয়েছিলি তা হলে?

কাছেই একটা সুপার মার্কেটে অতীন দিন-মজুরির ভিত্তিতে কুলির কাজ করে। তাও প্রত্যেকদিন নয়, মাঝে মাঝে কাজ পায়। ট্রাক থেকে আপেল ভর্তি বড় বড় কাঠের ক্রেট নামিয়ে দোকানের মধ্যে এক জায়গায় জড়ো করা। সবচেয়ে নিম্নতম কাজ। সেজন্য তাকে একটা নীল ওভারঅল জড়াতে হয় গায়ে, মাথায় পড়তে হয় কাপড়ের টুপি। কারুর সঙ্গে কোনো কথাবার্তা নেই, ট্রাকে ওঠো ক্রেট নামাও। দু হাতে বয়ে নিয়ে যাও! ভারি ভারি ক্রেটগুলো বইতে গিয়ে সে কুঁজো হয়ে যায়, হাতের জোড়ে টন টন করে, তবু কোনো কথা বলতে হয় না বলেই সে সন্তুষ্ট। কথা বলতে গেলেই তার মুখ দিয়ে খারাপ ভাষা বেরিয়ে আসে, এ জন্য দু জায়গায় সে কাজ হারিয়েছে। ঘণ্টায় দু’ ডলার। কত আপেল, শুধু একটা সুপার মার্কেটেই এত আপেল, এরা রাক্ষসের মতন আপেল খায়।

সিদ্ধার্থ বললো, আজ দশ পেয়েছিস? ডলারের রেট কত করে যাচ্ছে যেন, পাঁচ আশি, ছ’ টাকাই ধর। দেশের লোক ভাবছে ষাট টাকা, অনেক টাকা! তুই শিলিগুড়ি কলেজে ক’ পয়সা মাইনে পেতিস রে?

অতীন এবারও কোনো উত্তর দিল না। কফিটা শেষ করে সে একটা সিগারেট ধরালো। বাইরে ঝিরঝির করে তুষারপাত হচ্ছে, জানলার কাচের ভেতর দিকে জমে যাচ্ছে বাষ্প। একটা আঙুল দিয়ে সেই বাষ্পে সে আঁকিবুকি কাটতে লাগলো।

–খিদে-টিদে পায়নি, বাবলু! রান্না করতে হবে না।

–ও বেলার খিচুড়ি করা আছে। দু’ একটা সসেজ আর ডিম ভেজে নিলেই হবে। আমার ইচ্ছে করছে না। তুই ভেজে নে।

–বাড়ির চিঠি পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেছে? কিছু টাকা পাঠাতে চাস তো বল, ম্যানেজ হয়ে যাবে। ব্রুকলিনের হাসপাতালে একটা কেমিস্টের কাজ খালি আছে, কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলুম, মাইনে খুব খারাপ না। চেষ্টা করবি?

–না!

–তা হলে তুই শুধু এই সব অড জব করে যাবি? গ্যাস স্টেশানের কাজটা তো এই কুলিগিরির চেয়ে অনেক ভালো ছিল, টাকা বেশি দিত।

–ওখানে একটা লোক যখন-তখন ব্যাস্টার্ড বলতো!

–ওটা এদের কথার কথা! অনেক সময় আদর করে বলে। পুরো দেশটাই তো ব্যাস্টার্ডদের দেশ। দেখা যাচ্ছে, মিক্সড ব্লাড়ের মানুষ বেশি হার্ড ওয়ার্কিং হয়। তোর এদেশে কি হবে না বাবলু! তুই এখানে ভ্যাতভেতে বাঙালী রয়ে গেলি! এখানে ছোটখাটো অপমান গায়ে মাখলে চলে না। আমাদের মতন ইমিগ্রান্টদের একমাত্র মটো কী? টাকা রোজগার করো, টাকা রোজগার করো! যত পারো শালা টাকা জমাও! আমি তো ঠিক করেছি এক লাখ ডলার জমালেই দেশে কেটে পড়বো। মধ্যমগ্রামে বিরাট বাড়ি হাঁকাবো আর ফুলের চাষ করবো!

অতীন সিগারেটের টুকরোটা জঞ্জালের বালতির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলতেই সিদ্ধার্থ তাকে এক ধমক দিয়ে বলল, তুই আবার না নিবিয়ে ও রকম ভাবে সিগারেট ফেলছিস? আগুন লেগে গেলে কী হবে জানিস? এ দেশে সব সময় আগুনের ভয়। বাড়িগুলো তো এক একটা। জতুগৃহ!

অতীন ঝুঁকবার আগেই সিদ্ধার্থ নিজে নিবিয়ে দিল সেটা। তারপর বললো, এক কাজ কর, জামা-জুতো পরে নে। আজ বাইরে খাবো!

–না, আমার বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। খিচুড়ি তো রয়েছেই।

–ধ্যাৎ, রোজ রোজ ঐ একঘেয়ে খিচুড়ি খেতে ভালো লাগে কারুর? অনেকদিন স্টেক খাইনি। ভিলেজে একটা ভালো দোকান দেখে রেখেছি, চ, চ, ওঠ, ওঠ!

–এই ঠাণ্ডার মধ্যে বাইরে যাবো?

–ঠাণ্ডা তো কী হয়েছে, তুই কি ন্যাংটো হয়ে যাচ্ছিস নাকি? ইংল্যাণ্ডে থাকার সময় রাত্তিরে বেরুতি না কক্ষনো? ইংল্যাণ্ডে কি এর চেয়ে কম ঠাণ্ডা? দিন দিন কুঁড়ের যম হচ্ছিস। তুই আমার ব্লু পার্কাটা চাপিয়ে নে, তোকে ওটা ভালো মানায়।

অতীন বললো, তুই যে এক লাখ ডলার জমাবার কথা বললি, স্টেক খেতে তো অনেক পয়সা বেরিয়ে যাবে!

–তা বলে কি না খেয়ে টাকা জমাবো নাকি? বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়, অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময়, লভিব মুক্তির স্বাদ…তার পর কী যেন! তোর মনে আছে?

অতীন কাঁধ ঝাঁকালো। সে কবিতা-টবিতা বিশেষ পড়েনি। সিদ্ধার্থ মোজা পরতে পরতে বললো, দেশ থেকে দুটো বই এনেছিলুম সঙ্গে, সঞ্চয়িতা আর আবোল তাবোল। প্রথম প্রথম মন খারাপ হলেই পড়তুম। কোন শালা যেন সঞ্চয়িতাখানা মেরে দিয়েছে।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো দু’জনে। ম্যানহাটনের এক প্রান্তে লোয়ার ইস্ট সাইডের তিন। নম্বর রাস্তার একটা ছ’তলা বাড়ির ছাদের ঘরটা সিদ্ধার্থর অ্যাপার্টমেন্ট, এদেশের ভাষায়। অ্যাটিক। লিফট নেই। ক্ষয়ে যাওয়া সিঁড়ি, নড়বড়ে রেলিং, দেয়ালে নানা রকম অসভ্য কথা লেখা। বাড়ির অধিকাংশ বাসিন্দাই পোটুরিকান আর গরিব ইহুদী, তিন চারটে কালো পরিবার আছে। সিঁড়িতে প্রায়ই আলো থাকে না। সব মিলিয়ে এমন একটা নোংরা নোংরা ভাব যে এটাকে একটা কংক্রিটের ঊর্ধ্বমুখী বস্তি বলা যায়। নিউ ইয়র্কের নগর কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই বাড়ি ভাঙার নির্দেশ জারি করেছে, দু’ এক মাসের মধ্যেই সিদ্ধার্থকে এই অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়তে হবে।

বেশ খানিকটা হেঁটে এসে ওরা ঢুকে পড়লো ওয়াশিংটন স্কোয়ারে। এত ঠাণ্ডার মধ্যেও টুরিস্টদের ভিড় যথেষ্ট। এক সময় গ্রীনিচ ভিলেজ ছিল শিল্পী কবি-সাহিত্যিকদের পাড়া, এখন সেখানে নকল কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকে ভরে গেছে, উদ্ভট পোশাক ও বিরাট দাড়িওয়ালা মুখ নিয়ে তারা টুরিস্টদের তৃপ্তি দেয়। কাফে-রেস্তোরাঁয় এক সময় এক দশক আগেও নামকরা প্রতিবাদী কবিরা চিৎকার করে কবিতা পড়তেন, এখন অনেক কাফে-রেস্তোরাঁতেই কবি সেজে আসা অভিনেতারা অশ্লীল ছড়া শোনায়, বহু লোক টিকিট কেটে তা শুনতে আসে। এখানকার অনেক রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট খোলা থাকে সারা রাত। ঠাণ্ডা আটকাবার জন্য সব রেস্তোরাঁতেই দু পাল্লা কাচের দরজা, কখনো দুটো দরজাই এক সঙ্গে খুলে গেলে ছিটকে বেরিয়ে আসে বাজনার শব্দ।

অতীন বললো, আমি রাত্তিরের দিকে এদিকটায় আসিনি আগে। একটা পাড়াতেই এত হোটেল-রেস্টুরেন্ট? গোটা কলকাতাতেও বোধ হয় এত নেই!

সিদ্ধার্থ বললো, আমেরিকাতে দুটো কী কী জিনিসের সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় বল্ ত? আলো আর কাগজ। এত আলো তুই পৃথিবীর আর কোনো শহরে দেখতে পাবি না। দ্যাখ, যে-সব দোকানগুলো বন্ধ, সেগুলোরও ভেতরে সব আলো জ্বলছে। সব বিজ্ঞাপনের আলোগুলো সারা রাত জ্বলে। কেউ কি সারা রাত ধরে দেখে? লিংকন টানেলের মধ্যে গিয়ে দ্যাখ, অত আলো, চব্বিশ ঘণ্টা জ্বলছে। আর দেখবি কাগজ। যেখানে সেখানে কাগজের ছড়াছড়ি। পেপার ন্যাপকিন তুই একটা চাইলে পাঁচখানা দেবে। খবরের কাগজগুলো তাগড়া তাগড়া। নিউ ইয়র্ক টাইমস একশো কুড়ি পাতা, লোকে পাঁচ-দশ মিনিট পড়ে, তারপর পুরো কাগজটাই ফেলে দেয়। পুরানো খবরের কাগজ বিক্রি করা যায় না বলে প্রথম প্রথম আমার গা কচকচ করতো।

–আমাদের দেশে কাগজের কত অভাব।

–আমাদের দেশের কথা বাদ দে। তুই নতুন এসেছিস তো, এখন তোর আমাদের দেশের সঙ্গে তুলনাটা প্রায়ই মনে আসবে। কিন্তু তুলনা করতে গেলে খেই পাবি না। এটা পৃথিবীর উল্টো দিক। এখানে সব কিছুই উল্টো। আমাদের দেশের লোক খেতে পায় না, এখানে জাহাজ ভর্তি গম সমুদ্রে ফেলে দিয়ে আসে।

–এ দেশে এত কাগজ নষ্ট হয়, তবু বইয়ের কিন্তু বেশ দাম।

–এরা সস্তায় বিশ্বাস করে না। এদের ব্যবসা মানেই হচ্ছে, তোর পকেট থেকে কী করে বেশি টাকা খরচ করাবে। খুব সাধারণ একটা জিনিস ধর না, টয়লেট পেপার। প্রত্যেকেরই লাগবে। আগে ছিল সাদা, এখন পিংক বেরিয়েছে, ব্লু বেরিয়েছে। ইয়ে পোঁছার কাগজ সাদা হলো না গোলাপী, নীল হলো তাতে কী আসে যায়? এরা বিজ্ঞাপন দিয়ে বোঝালো যে রঙীন কাগজ টয়লেট রুমে মানায় ভালো। ব্যস, দশ পনেরো সেন্ট দাম বেড়ে গেল, লোকে সাদার। বদলে রঙীন টয়লেট পেপার কিনছে পাগলের মতন। তোর পকেট থেকে যত পয়সা বেরিয়ে যাবে, তত তুই বেশি রোজগারের জন্য ব্যস্ত হবি। আর যত তুই বেশি রোজগার করবি, তত তোর খরচ বাড়বে। এই হচ্ছে কনজিউমার সোসাইটির গোলকধাঁধা।

কোনাকুনি পার্কটা পার হয়ে সামনের বড় রাস্তা পেরিয়ে সিদ্ধার্থ একটা ছোট রাস্তার মধ্যে ঢুকলো। সে একটা বিশেষ রেস্তোরাঁয় যাবে। এ শহরের সমস্ত রাস্তাই সোজা-টানা, ঘোরানো-প্যাঁচানো গলি একটাও নেই। একটা আলো ঝলমল রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে যেতে যেতে সিদ্ধার্থ বললো, তুই ডিলান টমাসের নাম শুনেছিস! খুব বড় একজন ব্রিটিশ কবি, মাতালের হদ্দ ছিল, এই দোকানটায় শেষ দিনে নাকি এক ঘণ্টায় আঠারো পেগ মদ খেয়ে মারা যায়। ভেতরে গিয়ে একদিন দেখিস, সেই কথাটাই এরা গর্ব করে লিখে রেখেছে।

আর একটা রাস্তার মোড়ে এসে সিদ্ধার্থ বললো, এবার তোক এই সোসাইটির একটা ভালো জিনিস দেখাই। তোর একটা টেবল ল্যাম্প লাগবে বলছিলি না? দ্যাখ এটা চলবে?

একটা পার্কিং মিটারের পাশে রাখা রয়েছে কয়েকটা কাগজের বক্স, কিছু সাময়িক পত্রিকা, কিছু কাপ-প্লেট, একটা প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা বাতিদান, ওপরে চমৎকার শেড, কিছু গ্রামোফোন। রেকর্ড ইত্যাদি।

সিদ্ধার্থ বললো, এরা বাড়ি বদলাবার সময় অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নেয় না। আমাদের দেশে দেখেছি লোকে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে মর্চে ধরা বালতি, পাইখানার মগ, ছেঁড়া মাদুর, ভাঙা টব কিছুই বাদ দেয় না। এরা বাড়তি জিনিস রাস্তার মোড়ে রেখে যায়, অন্য যার কাজে লাগবে, সে নিয়ে যেতে পারবে। এ সব জিনিসের রি-সেল ভ্যালু খুব কম, এরা দু চারটে টাকার পরোয়া করে না, বরং অন্য যে বিনা পয়সায় পাবে, সে খুশী হবে।

বাতিদানটি সুন্দর পালিশ করা কাঠের, বালব পর্যন্ত লাগানো আছে, প্লাগটিও অক্ষত। সেটার গায়ে হাত বুলিয়ে অতীন বললো, এটা তো একটুও ভাঙেনি, নষ্ট হয়নি, তবু ফেলে গেল কেন?

–এত বড় স্ট্যান্ড ল্যাম্প কেউ আর এখন ঘরে রাখে না। ফ্যাসানেবল নয়। এটাও মনে সোসাইটির ইউটিলিটিটাই বড় কথা নয়। যাদের বেসিক নীডগুলো মিটে। গেছে, তারা নানা রকম শৌখিনতা নিয়ে মাথা ঘামাবেই।

–এখানেও আমি কয়েকজনকে ভিক্ষে করতে দেখেছি।

–এ পাড়াতেই বেশি দেখতে পাবি। সেগুলো মাতাল, গেঁজেল কিংবা শখের ভিখিরি। সে আর কটা! তুই এ জিনিসটা নিবি তো তুলে নে। লজ্জার কিছু নেই। আমার ঘরের অনেক কিছুই এরকম রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া।

নিচু হয়ে ঝুঁকে সিদ্ধার্থ রেকর্ডগুলো দেখতে লাগলো। তার পছন্দ হলো না। সে বললো, সব কটাই প্যাট বুন, শুনলেই আমার গা জ্বলে যায়। টেপ রেকডারের যুগ এসে গেছে, এখন আর কেউ এ সব ভারি ভারি রেকর্ড জমিয়ে রাখতে চায় না। একদিন আমি এরকম জায়গা থেকে পল রবসন পেয়েছিলাম, জানিস!

–এত বড় একটা বাতিদান ঘাড়ে করে আমরা দোকানে খেতে যাবো?

–তাতে কী হয়েছে? এ দেশে সব কিছু চলে। আমার বাবার কাছে গল্প শুনেছি, ওঁদের আমলে টাই না পরে, জ্যাকেট গায়ে না দিয়ে এ দেশের কোনো ভদ্র রেস্তোরাঁয় ঢোকা যেত না। এখন দ্যাখ না, যেই সামার শুরু হবে, আমেরিকান ছেলেরাই চটি পরে, গেঞ্জি গায়ে যেখানে সেখানে ঢুকে যাবে। হিপিরা এ দেশে পোশাকের ব্যাপারে ন্যাকামির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।

সিদ্ধার্থ নিজেই তুলে নিল অত বড় বাতিদানটা। তারপর খানিকটা গিয়ে একটা রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়ালো। এ দোকানে গানবাজনা নেই, একটু ভেতরের দিকে বলে নিরিবিলি।

ঢোকার মুখে একটি দীর্ঘকায়া যুবতীর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সিদ্ধার্থ বললো, হাই! যুবতীটিও ফিক করে হেসে বললো, হাই!

টেবিল পেয়ে বসবার পর অতীন জিজ্ঞেস করলো, মেয়েটা তোর চেনা?

–কেন, চেনা না হলে বুঝি হাই বলা যায় না?

জিন্স-এর প্যান্ট ও উজ্জ্বল হলুদ রঙের পুলওভার পরা মেয়েটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাকে যেন খুঁজছে, তার ঠোঁটে একটা লম্বা হোল্ডারে বসানো সিগারেট। বেশ চোখে পড়ার মতন রূপসী সে।

সিদ্ধার্থ বললো, মেয়েটা বোধ হয় খালি আছে, ডাকবো আমাদের টেবিলে? ওকে আমি একটু একটু চিনি, আমাদের অফিসের হ্যারি একদিন আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। ও মেয়েটা এত লম্বা তো, তাই কোনো ছেলে ওর সঙ্গে ডেট করতে চায় না। তার সঙ্গে মানাবে, তুই ডেট করতে চাস তো ব

অতীন কোনো কথা না বলে সিদ্ধার্থর মুখের দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে রইলো।

–এমন কিছু খারাপ কথা বলিনি যে আমার দিকে অমন কট কট করে তাকাতে হবে। ঠিক আছে, কী খাবি বল, তোর স্টেক ভালো লাগে? অন্য কিছুও খেতে পারিস।

–তোর যেটা ইচ্ছে বল না।

–কেন, তোর নিজের কিছু ইচ্ছে অনিচ্ছে নেই? লবস্টার খাবি? দামের জন্য তোকে চিন্তা করতে হবে না।

–না, না, আমি অত দামী কিছু খাবো না!

টেবিলের ওপর থেকে এক গোছা ন্যাপকিন তুলে অতীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, তোর ঐ বিপ্লবী-বিপ্লবী অভিমানী অভিমানী মুখখানা মুছে ফ্যাল তো! এদেশে যখন এসেই পড়েছিস, এখানেই যখন থাকতে হবে, তখন সব সময় মুখ গোমড়া করে রেখে লাভটা কী? হাসতে শেখ। এদেশে হাসতে না শিখলে বাঁচা যায় না!

অতীন তবু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

সিদ্ধার্থ ধমক দিয়ে বললো, মুখখানা মুছে নে, তেলতেলে হয়ে গেছে। শোন, অত চিন্তা করিস না। এপ্রিল থেকে ইউনিভার্সিটিগুলোতে নতুন সেমেস্টার শুরু হচ্ছে, পাঁচখানা অ্যাপ্লিকেশন পাঠানো হয়েছে, তুই একটা না একটাতে ঠিক চান্স পেয়ে যাবি। তোর রেজাল্ট তো ভালো! কিছুদিন ধৈর্য ধরে থাকতে হয়। লেক্সিংটনে ইন্ডিয়ান ছাত্রদের একটা মেস বাড়ি আছে, সেখানে গিয়ে দ্যাখ, ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে এসেও কেউ কেউ এক বছর দু’ বছর অড় জব করছে। প্রথম দিকে আমাকে কি কম কষ্ট করতে হয়েছিল? বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বিক্রি করতুম।

যে হোটেল কর্মীটি ওদের অডার নিতে এসেছিল, সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, স্যার, আপনারা বাঙালী!

দু জনে মুখ তুলে দেখলো, ওদেরই বয়েসী একজন যুবক, ঠোঁটে সামান্য হাসি ফোঁটালেও মুখে একটা উদ্বিগ্ন ভাব রয়েছে। নিউ ইয়র্কের হোটেল রেস্তোরাঁয় ভারতীয় বা পাকিস্তানী পরিচারক দেখতে পাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। বাংলা কথা শুনলে বাঙালীরা খুশী হয়।

সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথাকার?

লোকটি বললো, আমার বাড়ি চিটাগাং, দুই বৎসর এদেশে আসছি! ঢাকার নতুন খবর কিছু জানেন?

–নতুন খবর তো কিছু জানি না। সপ্তা দু’য়েক আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটা ছোট খবর দেখেছিলাম।

–সেটা আমিও দেখছি। তারপর মিটমাট কিছু হইলো কি না—

একটু পরে যুবকটি অর্ডার নিয়ে চলে যাবার পর অতীন জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে। ঢাকায়?

সিদ্ধার্থ বললো, ইস্ট পাকিস্তানে বিরাট গোলমাল চলছে। ইয়াহিয়া খান ইলেকশন কল করেছিল, তুই সে খবর জানিস?

অতীন ঘাড় নাড়লো। তাদের দু’জনের সংসারে খবরের কাগজ কেনা হয় না, টি ভি-তে যেটুকু খবর দেখে। এদেশের টি ভি-তে ভারত-পাকিস্তানের প্রায় কোনো উল্লেখই থাকে না। সিদ্ধার্থ অফিসের লাইব্রেরিতে কাগজ পড়ে আসে।

সিদ্ধার্থ বললো, ইলেকশন ডেকে ইয়াহিয়া প্যাঁচে পড়ে গেছে। ইস্ট পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সিক্স পয়েন্ট ফর্মুলার ভিত্তিতে ভোটে নেমে দারুণ ভাবে জিতেছে। ইস্ট পাকিস্তানে তো সুইপ করে বেরিয়ে গেছে বটেই, গোটা পাকিস্তানেই ওদের মেজরিটি, এখন মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী না করে উপায় নেই। কিন্তু ভুট্টো তা মানবে কেন? সে নানান রকম বায়নাক্কা তুলেছে। এই নিয়ে খুব হাঙ্গামা ওখানে। আজ কত তারিখ? পঁচিশে মার্চ তো, আজও ওদের ওখানে…

অতীন শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল। পাকিস্তানের ঘটনা সম্পর্কে তার আগ্রহ নেই, তার মনে পড়ে গেল মানিকদা, কৌশিকদের কথা। কৌশিক আর পমপম দু’ জনেই ধরা পড়ে জেলে আছে, মানিকদার কোনো হদিস নেই। সে আপন মনে বললো, কতদিন দেশের বন্ধুবান্ধবদের খবর পাইনি।

সিদ্ধার্থ বললো, ওয়েস্ট বেঙ্গলের অবস্থাও খুব খারাপ। ইণ্ডিয়া অ্যাব্রড’ বলে একটা ট্যাবলয়েড কাগজ বেরোয়, তাতে একটা নিউজ দেখলুম, সিদ্ধার্থ রায়ের গবর্ণমেন্ট নতুন ট্যাকটিকস্ নিয়েছে, নকশাল ছেলেগুলোকে কোর্টে পাঠাচ্ছে না। পুলিশের গাড়িতে চাপিয়ে ময়দানে এনে ছেড়ে দিয়ে বলছে, যা বাড়ি যা, পালা! ছেলেগুলো দৌড়তে শুরু করলেই পেছন থেকে গুলি করে শেষ করে দিচ্ছে, এর নাম এনকাউন্টার! ফিমস্টার উত্তমকুমার ময়দানে মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে নাকি এ রকম একটা দৃশ্য দেখে ফেলেছে। তুই ভাগ্যিস দেশ থেকে ঠিক টাইমলি পালাতে পেরেছিলি, এখন জেলে থাকলে তুই খতম হয়ে যেতিস!

অতীন টেবিল ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, তার চোখ দুটি রক্তিম। সে কর্কশ গলায় বললো, আমি খাবো না। বাড়ি যাচ্ছি।

সিদ্ধার্থ তার হাত চেপে ধরে বললো, আরে পাগল, বোস, বোস! অতীত নিয়ে মানুষ বাঁচে না। যা হবার তা তো হয়েই গেছে।

–দ্যাখ সিদ্ধার্থ, আমাকে অপমান করার কোনো রাইট নেই তোর।

–ইয়ার্কি-ঠাট্টাও বুঝিস না? সব সময় মাথা গরম! চট্টগ্রামের ছেলেটি ওদের জন্য দু প্লেট স্টেক নিয়ে এলো। সঙ্গে একটি রেড ওয়াইনের বোতল। সিদ্ধার্থ ওয়াইনের অর্ডার দেয়নি, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে যেতেই ছেলেটি বললো, ওটা আমার কমপ্লিমেন্ট। আপনাদের বাড়ি কি ঢাকা?

না, আমরা কলকাতার লোক।

–স্যার, গত সপ্তায় দ্যাশ থিকা একজন আসছে, সে কইলো, ঢাকায় স্টুডেন্টরা স্বাধীন বাংলা ডিক্লেয়ার করে দিয়েছে, মিলিটারি গুলি চালিয়ে অনেককে মেরেছে।

–সেটা তো দু’ সপ্তাহ আগের খবর। আজ পচিশে মার্চ, আজ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হচ্ছে, আজ শেখ মুজিবরের হাতে ক্ষমতা দিতেই হবে। কালকের কাগজে কিছু খবর থাকবে নিশ্চয়ই। আপনিও বসুন না আমাদের সঙ্গে?

–না স্যার, অন ডিউটি, আপনাদের ঠিকানা দ্যান, একদিন গল্প করতে যাবো।

ছেলেটি চলে যাবার পর অতীন অবজ্ঞার সঙ্গে বললো, স্বাধীন বাংলা না কচু হবে! আর্মি রেজিমে কখনো সিসেশান হতে পারে? ওদের দেশে রেভোলিউশান হবার স্কোপ ছিল, তার বদলে আবার ভোটের দিকে গেল!

সিদ্ধার্থ বললো, ইস্ট পাকিস্তানে কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, যেটা ওয়ার্ল্ডে আর কোথাও বোধ হয় হয়নি। নেতাগুলো তো অনেকেই জেলে ছিল কিংবা চুপ মেরে গিয়েছিল। কিন্তু সিক্সটি নাইন থেকে ছাত্ররা এমন বিরাট আন্দোলন শুরু করলো যে তাতেই সরকার টলে যাচ্ছে। ছাত্রদের দাবিতেই এখন নেতারা গলা মেলাচ্ছে। ছাত্রদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ওখানে কোনো নেতার নেই। স্টুডেন্ট পাওয়ার একটা দেশের পলিটিক্যাল চেইঞ্জ নিয়ে আসছে…আর তোরা ওয়েস্ট বেঙ্গল কী করলি? নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি…

–আমেরিকায় বসে দেশের সমালোচনা করতে খুব মজা লাগে, তাই না?

–চল উঠে পড়ি, টি ভি-তে রাত সাড়ে এগারোটায় একটা ভূতের ছবি দেখাবে।

ফেরার পথে সিদ্ধার্থ বললো, এবার বিনা পয়সায় কফি খেতে হবে। জায়গাটা চিনে রাখ।

সত্যিই একটি রাস্তার ওপরের দোকানের কাউন্টারে দুটি মেয়ে কাগজের গেলাসে কফি বিলি। করছে। সিদ্ধার্থ দু’ গেলাস নিয়ে এলো। চুমুক দিয়ে বললো, ভালো কফি! এদেশের ছেলে মেয়েদের গাঁজা খাওয়ার অভ্যেস ছাড়ানোর জন্য স্যালভেশন আর্মি থেকে এই বিনা পয়সার কফি খাওয়াচ্ছে। আজ ইফ কফি খেলে কেউ আর গাঁজা খেতে চাইবে না। কী বুদ্ধি এদের!

এতক্ষণ পরে অতীন খুক খুক করে একটু হাসলো।

বাড়ি ফিরে সিদ্ধার্থ খাটে শুয়ে টিভি দেখতে লাগলো, অতীন চিঠি লেখার জন্য বসলো টেবিলে। চিঠি পেতে একটু দেরি হলেই মা উতলা হয়ে পড়ে। সিদ্ধার্থ নিশ্চয়ই একদিন তার চিঠি পড়ে ফেলেছিল। মাকে চিঠি লেখার সময় অনেক গল্প বানাতেই হয়। ছেলে কুলিগিরি করছে শুনলে মা অজ্ঞান হয়ে যাবে!

একটু পরে অতীন খানিকটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলো, সিদ্ধার্থ, একটা ফোন করবো বোস্টনে?

সিদ্ধার্থ ঘড়ি দেখে বললো, আর দশ মিনিট পরে করিস। বারোটার পর চার্জ অনেক কম লাগবে।

–আমি পয়সাটা দিয়ে দেবো তোকে।

–হ্যাঁ, হ্যাঁ, দিবি দিবি! তুই হার্ভার্ডে না হোক, বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে একটা চান্স পেয়ে গেলে খুব ভালো হয়। তখন আর তোকে ঘন ঘন লং ডিসটেন্স কল করতে হবে না।

একটু থেমে সিদ্ধার্থ আবার বললো, দ্যাখ অতীন, তোকে একটা কথা বলি। শর্মিলার মতন এরকম সত্যিকারের একটা ভালো মেয়ে খুব কম দেখেছি। তোর মতন একটা অপদার্থ, গোঁয়ারকে যে ওর কী করে পছন্দ হলো সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার। তুই যদি মেয়েটাকে কষ্ট দিস, সেটা হবে বিরাট ক্রাইম, তাহলে তার সঙ্গে আর জীবনে কথা বলবো না। তুই শর্মিলাকে ডিচ করিস না!

০৩. সাদা পাজামা আর তাঁতের পাঞ্জাবি পরা

সাদা পাজামা আর তাঁতের পাঞ্জাবি পরা, তার ওপর একটা গরম হাফ-কোট, আর মুখে পাইপ নিয়ে শেখ মুজিব বসে আছেন তাঁর বত্রিশ নম্বর ধানমণ্ডির বাড়িতে, বসবার ঘরে। সারাদিন ধরে মানুষজন আসার বিরাম নেই, আসছে অজস্র মিছিল, পাটিকর্মী ও শুভার্থীরা ঘিরে বসে আছে তাঁকে। কথা বলতে বলতে শেখ সাহেবের মুখে ফেনা উঠে আসছে। তাঁর পাশেই সাদা পাজামা ও পাঞ্জাবির ওপর একটা শাল জড়িয়ে বসে আছেন তাজুদ্দীন, তাঁর মুখে অজস্র চিন্তার রেখা, থুতনিতে একটা আঙুল। এক এক সময় ক্লান্ত হয়ে গিয়ে শেখ মুজিব অত্যুৎসাহীদের বলছেন, তোমরা তাজুদ্দীন সাহেবের সাথে কথা কও, আমারে একটু চিন্তা করতে দাও।

দুদিন আগেই “স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” এবং “স্বাধীন বাংলা শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ” প্রতিরোধ দিবস পালন করেছে। দেশের জনসাধারণ এখন উত্তাল। শেখ মুজিবের ঐ দোতলা বাড়ির ছাদে শস্যশ্যামলা বাংলার প্রতীক সবুজের পটভূমিতে, শহীদের রক্তে রাঙা সূর্যের প্রতীক লাল বৃত্তের মধ্যে, সোনালি রঙে পূর্ববাংলার মানচিত্র আঁকা এক নতুন পতাকা। শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান ঐ একই রকম আর একটি পতাকা তুলে দিয়েছে বাড়ির সামনে। এই বাড়ি এখন ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীদের এক বৃহৎ অংশের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র।

শেখ মুজিবের মুখে, চোখে, ভুরুতে নিদারুণ অস্বস্তি। স্বাধীন বাংলা! পাকিস্তান কি ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে? পাকিস্তান ভাঙা কি এতই সহজ? তা ছাড়া, কেনই বা তিনি। পাকিস্তান ভাঙতে চাইবেন এখন! ছয় দফা দাবীর জয় হয়েছে, এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার পর বাঙালী মুসলমানের হাতে শাসন ক্ষমতা না দিয়ে ইয়াহিয়া খান যাবে কোথায়? শেখ মুজিব গোটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব পেলে তিনি পাকিস্তান ভাঙতে যাবেন কেন?

ছাত্ররা ছয় দফার থেকেও বাড়িয়ে এগারো দফা দাবী তুলেছে। স্বাধীন বাংলা, স্বাধীন বাংলা রব উঠেছে চতুর্দিকে। সামরিক শাসকদের হাত থেকে দেশের অর্ধেক অংশ ছিনিয়ে নেওয়া কি মুখের কথা? তিনি প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু বাংলার মাটির দুর্গ পশ্চিম পাকিস্তানীদের কামানের মুখে কতক্ষণ টিকবে? শুধু মনের জোর দিয়ে কি রাইফেল-বোমার বিরুদ্ধে লড়া যায়? তিনি পূর্ব পাকিস্তানে শতকরা আটানব্বই ভাগ ভোট পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু যদি সত্যি লড়াই লাগে তাহলে কি এ দেশের সব মানুষ তাঁর পিছনে। এসে দাঁড়াবে? যদি লড়াই লাগে…সে লড়াই কতদিন ধরে চলবে ঠিক নেই, কত লক্ষ লক্ষ প্রাণ বিনষ্ট হবে, সে দায়িত্ব তিনি একা নেবেন?

পার্টির উগ্রপন্থী সদস্যরা তাঁকে বারবার বলছে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্রের সঙ্গে আলোচনায় আর যোগ না দিতে। অযথা কথা বাড়িয়ে, দেরি করিয়ে দেবার কৌশলে ওরা পশ্চিম পাকিস্তান। থেকে আরও সেনা আনাচ্ছে। কিন্তু শেখ মুজিব এখনও চূড়ান্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাঁর এখনও ধারণা, ইয়াহিয়া খান লোকটা আইয়ুবের মতন কুটকৌশলী নয়, এর চক্ষুলজ্জা আছে, নির্বাচনের ফলাফলকে এই সেনাপতি মর্যাদা দেবে। আলাপ, আলোচনা এখনো একেবারে অন্ধ গলিতে পৌঁছোয়নি, আজ রাত্রেই একটা কিছু হেস্তনেস্ত হয়ে যেতে পারে।

মাঝখানে বেশ গরম পড়ে গিয়েছিল, আজ আবার একটু শীত শীত ভাব। থমথম করছে। বাতাস। প্রত্যেকটি মানুষের মুখে কী হয় কী হয় ভাব। আজ সারাদিন ধরেই একটা গুজব চতুর্দিকে ঘুরছে যে যে-কোনো মুহূর্তেই মিলিটারি এসে আওয়ামী লীগের সব নেতা এবং ছাত্র নেতাদের বন্দী করবে!

সকাল থেকে পঞ্চান্নটি মিছিল এসেছে শেখ সাহেবের কাছে, তার মধ্যে শুধু মহিলাদেরই মিছিল ছিল ছটা। সকলেরই এক কথা, এবারে কিছুতেই সামরিক শাসকগোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করা হবে না। শেখ মুজিব অভিভূত হয়ে পড়ছেন। দৃঢ় ভাষায় তাদের ভরসা দিতে গিয়েও তাঁর কণ্ঠস্বর কেঁপে যাচ্ছে। যদি সত্যিই রাষ্ট্রবিপ্লব বেঁধে যায়, কোন কোন দেশ সাহায্য করবে, কারা অস্ত্র দেবে? যদি কেউ না দেয়? যদি ইণ্ডিয়াও দোনামনা করে? তা হলে কামানের মুখে ছাতু হয়ে যাবে এই সব সরল, তেজী, আদর্শবাদী ছেলে-মেয়েগুলো! না, শেখ মুজিব এখনও আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান সূত্র খুঁজতে চান। খানিকবাদেই ইয়াহিয়ার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকারের সময় নির্দিষ্ট আছে।

হুড়মুড় করে একদল ছাত্রলীগ জঙ্গী বাহিনীর ছেলে ঢুকে পড়লো ঘরের মধ্যে। তাদের মুখপাত্র হয়ে কামরুল আলম খসরু বললো, মুজিবভাই, আপনি আন্ডার গ্রাউন্ডে চলুন। আপনার এখন বাড়িতে থাকা ঠিক হবে না।

মুখ থেকে পাইপটা নামিয়ে শেখ মুজিব প্রবল ভাবে মাথা নাড়লেন।

তারপর বললেন, তোরা তৈরি হ-গে যা! আমার জন্য ভাবিস না। আমার আর কী করবে, বড় জোর ধরে নিয়ে যাবে। তা বলে আমি চোরের মতন পালিয়ে যেতে পারি না। তা ছাড়া আমি পালিয়ে গেলে আমার খোঁজে ওরা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালাবে, বাড়ি ঘর পুড়ায়ে দেবে। আমার লোকদের আমি বিপদের মুখে ফেলে রেখে পালিয়ে যেতে পারি না।

কিছুক্ষণ তর্কাতর্কি হলো, কিন্তু শেখ মুজিব অনড়। তিনি আলোচনার শেষ দেখতে চান!

ছাত্রদলের সঙ্গে সিরাজুলও বেরিয়ে এলো বাইরে। একজন কেউ বললেন, আচ্ছা শেখ সাহেব তো গোঁয়ারের মতন বসে থাকবেনই ঠিক করেছেন, কিন্তু ভাবী আর ছেলেমেয়েদের এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত না? সংগ্রাম শুরু হলে এই বাড়িই তো ফাস্ট টার্গেট হবে।

সিরাজুল আবার ভেতরে খবর নিতে গেল। ফিরে এসে জানালো যে ভাবী আর পরিবারের অন্য সবাই শামিবাগে এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেছেন।

এবার ওরা চললো জহুরুল হক হলের দিকে। তার আগে, মধুর ক্যান্টিনে ছাত্র লীগের মিটিং আছে রাত এগারোটায়।

পাকিস্তানের ভাবমূর্তির স্রষ্টা কবি ইকবালের নামে ছিল ছাত্রদের একটি হস্টেল, ইকবাল হল। ছাত্ররা সেই নাম বদলে দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর সাজানো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের মতনই আর একজন আসামী ছিলেন সার্জেন্ট জহুরুল হক। বিচার শেষ হবার আগেই কারাগারের মধ্যে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় এই সৎ মানুষটিকে। ছাত্ররা তাই তাঁকে স্মরণীয় করেছে ইকবালের নাম মুছে দিয়ে।

জিন্নার নামে যে রাস্তা, সে রাস্তার নামও পাল্টে সূর্য সেনের নামে রাখার দাবী তুলেছে। ছাত্ররা।

–মধুদা, পাঁচ কাপ চা!

অন্যরা এখনো আসেনি। সাজাহান, সিরাজ ও নজরুল ইসলাম না এলে মিটিং শুরু করা যাবে না। চা খেতে খেতে কাদের জিজ্ঞেস করলো, এই সিরাজুল, তুই যার বাসায় থাকোস, সেই বাবুল মিঞা এক আর্মির মেজরের কোয়ার্টারে যাতায়াত করে ক্যান রে?

সিরাজুল কিছু উত্তর দেবার আগেই অন্য একজন বললো, মদ-মুদ গেলতে যায় বোধ হয়! আমাগো প্রফেসরদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে ফিফথ কলামনিস্ট!

কাদের বললো, কিন্তু বাবুল চৌধুরীরে ভালো মানুষ বইলাই জানতাম। মদ তো খাইতো না আগে, সিগারেট টানতে দেখি নাই। হ্যাঁর পোশাক-পরিচ্ছদের মতন মানুষটাও ক্লিন আছিল।

–আলতাফের ছোট ভাই তো! ঐ আলতাফের পত্রিকা এই ইলেকশানের সময় আওয়ামী লীগকে সাপোর্ট করে নাই। হেই কাগজের মালিক ঐ হোটেলওয়ালা হোসেন মিএ আওয়ামী লীগের ক্যান্ডিডেটের এগেইনস্টে কনটেস্ট করছিল। ওরা সব কয়টাই দুই নম্বরী!

–আমি বাবুল চৌধুরীর কাছে পড়ছি। এমনিতে তো মার্কসিস্ট, অথচ আর্মির সাপোটার, কিছুদিন আগেই চীনা ঘুইরা আসলো।

–ঐসব ফরেন ট্রিপের লোভেই তো আমাগো তথাকথিত ইনটেলেকচুয়ালরা আর্মির ধামা ধরে। এইসব কয়টা হারামখোররে একদিন খতম করতে হবে!

–কী রে, সিরাজুল, চুপ কইরা আছেস ক্যান? বাবুল চৌধুরীর নুন খাইছোস, তাই কিছু বলবি না।

সিরাজুল মাথা নীচু করে রইলো। বাবুল চৌধুরীকে এক সময় সে পীরপয়গম্বর মতন ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। এই মানুষটির জন্য সে মনিরাকে নিয়ে গ্রাম থেকে চলে আসতে পেরেছে। ঢাকা শহরে আশ্রয় পেয়েছে। বিদ্বান ও নিখুঁত ভদ্রতার প্রতিমূর্তি বাবুল চৌধুরী ছিল তার আদর্শ সেই বাবুল চৌধুরী তার শ্রদ্ধার আসন থেকে কত নীচে নেমে এসেছেন!

সারাদেশ যখন শেখ মুজিবের নামে রোমাঞ্চিত হচ্ছে, তখনও বাবুল চৌধুরী উঠতে বসতে শেখ সাহেবের নামে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে। জামাতে ইসলামীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সে বলে যে। ছয় দফা হলো পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগ ভারতের টাকা খায়, ইন্দিরা গান্ধীর অঙ্গুলি হেলনে এই পার্টি পাকিস্তানের সর্বনাশ করছে। আর্মি যে ইস্ট পাকিস্তানের ওপর অনবরত দুরমুশ চালাচ্ছে, এই মার্চ মাসেই কত ছাত্রকে গুলি করে মেরে ফেললো, সে সম্পর্কে বাবুল চৌধুরীর কোনো প্রতিবাদ নেই। এখনও নির্লজ্জের মতন তার বন্ধু এক ওয়েস্ট পাকিস্তানী মেজরের বাড়িতে খানাপিনা করতে যায় নিয়মিত। কেউ কেউ বলে, সেই মেজরের। স্ত্রীর সাথে নাকি বাবুল চৌধুরীর গোপন আশনাই আছে।

মঞ্জু ভাবীর মতন অমন চমৎকার এক মহিলা, তাকেও খুব কষ্ট দিচ্ছে বাবুল চৌধুরী। প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি; মঞ্জু ভাবী রাগ করে চলে যায় বাপের বাড়ি। আর ঐ আলতাফ, সেটা তো একটা শয়তান। সে মনিরার ওপর কুদৃষ্টি দিয়েছে।

সিরাজুল বললো, না, আমি বাবুল চৌধুরীর নুন খাই নাই। উনি বাসায় থাকতে দিয়েছেন ফ্রিতে, সেটা ঠিক, কিন্তু কোনোদিন আমি তার কাছ থেকে এক আধলাও সাহায্য নিই নাই। এবার ও বাসা ছেড়ে দেবো!

হঠাৎ দূরে পর পর কয়েকটা বিকট শব্দ হতেই ওরা কথা থামিয়ে উকর্ণ হলো। মেশিন গানের আওয়াজ! এখন গুলি চলছে কোথায়? এখন তো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে শেখ সাহেব ও ভুট্টোর মিটিং চলার কথা।

কাদের উঠে গিয়ে বাইরে উঁকি মেরে দেখলো, রাস্তায় লোকজন ছুটোছুটি করছে। আরও কয়েকবার গুলির আওয়াজ শোনা গেল। মন্টু নামে একটা ছেলে দৌড়াতে দৌড়োতে এসে বললো, আইস্যা পড়ছে। আইস্যা পড়ছে! আমি, আর্মি!

এবার শোনা গেল মেঘ গর্জনের মতন গুরু গুরু ধ্বনি! ট্যাঙ্ক বেরিয়েছে মনে হচ্ছে। লোকজন দুপদাপিয়ে পালাচ্ছে। আর এখানে থাকার কোনো মানে হয় না। চায়ের দাম টেবিলের ওপর রেখে সিরাজুল বললো, মধুদা, তুমিও দোকান বন্ধ করে দাও। জগন্নাথ হলে চলে যাও।

জহুরুল হলে দোতলার একটি ঘরে কিছু বোমা ও কয়েকটি থ্রি ও থ্রি রাইফেল জড়ো করে। রাখা আছে। পুলিশই হোক আর আমিই হোক, তাদের কিছুতেই হলের মধ্যে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সিরাজুলরা এসে দেখলো কিছু ছেলে হল ছেড়ে পালাচ্ছে। কাদের তাদের ধমক দিতে লাগলো। হলে একসঙ্গে এত ছেলে থাকতে ভয়ের কী আছে? কয়েকজন তবু পালিয়ে গেল, কয়েকজন ফিরলো।

সিরাজুলরা পজিশন নিল দোতলার ঘরটায়। এখনও তারা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। এত তাড়াতাড়ি কি আলোচনা ভেঙে গেল? শেখ সাহেব বলছিলেন, কাল থেকেই মাশাল ল তুলে নেবার খুবই সম্ভাবনা। তা হলে আজ রাত্তিরে রাস্তায় আর্মি বেরুবে কেন?

প্রচণ্ড শব্দে একটা শেল এসে পড়লো খুব কাছাকাছি। তারপর আর একটা। কামান থেকে গোলা দাগছে? জানলা দিয়ে আর্মির গাড়ি বা কিছুই দেখা গেল না। কাদের একটা খারাপ গালাগাল দিয়ে ছুঁড়ে মারলো পর পর দুটো বোমা। তারপরই শুরু হলো বৃষ্টির মতন গুলিবর্ষণ।

বিপদের গুরুত্বটা এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ রাত্তিরবেলা ছাত্রদের মারতে আসবে কেন আর্মি? আজ তো ছাত্ররা কোনো বিক্ষোভ দেখায় নি। কেউ কোনো ভুল অর্ডার দিয়েছে? বাইরে গুলি-গোলার আওয়াজ, হলের মধ্যে চিৎকার করছে ছেলেরা। ঝনঝন শব্দে ভাঙছে জানলার কাঁচ। ট্যাঙ্ক থেকে গোলা ছুঁড়ছে, পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে শব্দ, একদিকের। দেয়াল ভেঙে পড়লো হুড়মুড় করে। সিরাজুল লাফিয়ে সরে এলো সেদিক থেকে।

প্রথমে লুটিয়ে পড়লো কাদের, তারপর মন্টু। কাদের যে মরে যেতে পারে তা বিশ্বাসই করতে পারছে না সিরাজুল। এক মিনিট আগে ও লাফিয়ে লাফিয়ে চিৎকার করে যে খানসেনাদের চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করছিল, একটা গুলিতেই সে শেষ হয়ে গেল? কাঁদেরের নিস্পন্দ শরীরটা ধরে পাগলের মতুন ঝাঁকাতে লাগলো সিরাজুল।

কে যেন তাকে জোর করে টেনে নিয়ে গেল সে ঘর থেকে। হলের মধ্যে ছাত্রদের গুলি করে মারবে। যে-কোনো ছাত্রকে!

এখন আর বাইরে বেরুবার উপায় নেই, হুড়োহুড়ি করে ছেলেরা চলে যাচ্ছে ছাদে। ছাদে এসে গোলা পড়লে তারা আবার নেমে আসছে নিচে, কে যে কোথায় যাবে তা ঠিক করতে পারছে না, যেন খাঁচার মধ্যে রর দৌড়। আতঙ্কের চিৎকার আর বারুদের ধোঁয়ায় পুরো জায়গাটা যেন নরক।

সিরাজুলের হাতে তখনও রাইফেল, সেটা কেড়ে নিয়ে ফেলে দিল হায়দার। পেছন দিকের একটা ঘরের জানলা ভেঙে বাইরে এসে ওরা দু’জন অন্ধকারের মধ্যে একটু দৌড়ে গিয়ে দেখতে পেল গ্যারেজ, আর কিছু চিন্তা না করে দু’জনে উঠে পড়লো সেই গ্যারেজের চালের ওপর। সেখানে আরও দু’তিনজন ছাদে গা মিশিয়ে শুয়ে আছে, তারা বললো, চুপ চুপ!

আর্মি একটু পরেই ঢুকে পড়লো হলের মধ্যে, প্রত্যেক ঘরে ঘরে গিয়ে গুলি করে মারছে ছেলেদের। শুধু ছাত্র হওয়াই অপরাধ। যারা জীবনে কখনো রাজনীতি করেনি তারা হাউ হাত করে কাঁদছে, কেউ কেউ ভাঙা ভাঙা উর্দুতে দয়া ভিক্ষে করছে, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো কথা নেই, শুধু গুলি, শুধু গুলি!

গ্যারেজের ছাদে পাঁচটা প্রাণী একেবারে কাঠ হয়ে আছে। সিরাজুল অনবরত ভাবছে, মরে যাবো, মরে যাবো! কাদের মরে গেছে, আমিও মরে যাবো। কাদের, কাদের, একটু আগে বেচে ছিল কাদের, সে আর নেই! কাদের বোমা ছুঁড়ে ভুল করেছিল, কিন্তু বোমা না ছুঁড়লেও ওরা গুলি চালাতোই, ছাত্র আন্দোলন একেবারে শেষ করে দেবার জন্য ওরা সব ছাত্রদেরই মেরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। এরকম নির্লজ্জভাবে আর্মি এসে সিভিলিয়ানদের মারবে, এ রকম কি কেউ ভাবতে পেরেছিল?

মনিরার কী হবে? সিরাজুল যতক্ষণ না বাড়ি ফেরে, ততক্ষণ মনিরা জেগে থাকে। আজ কথা ছিল, শেখ সাহেবের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের মিটিং-এর ফলাফল কী হলো তা না জেনে বাড়ি ফেরা হবে না। সারারাত ও কোনো হলে কাটিয়ে দিতে পারে। আজকের রাতটা কী আর কাটবে? যদি গ্যারেজের ছাদের ওপর টর্চের আলো ফেলে বাঁচার আশা নেই…শুধু মৃত্যু আর্তনাদ আর গুলির শব্দ…কেউ বাঁচবে না। পূর্ব বাংলার যুবশক্তিকে আজ এরা ধ্বংস করে। দেবে…

জহুরুল হলের সঙ্গে সঙ্গে আরও সাঁজোয়া গাড়ি গিয়ে আক্রমণ করলো জগন্নাথ হল, সলিমুল্লা হল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাসগুলি। নির্বিচারে হত্যা। কামান ও মর্টারের গোলায় লাল হয়ে উঠছে আকাশ।

জগন্নাথ হলের ছেলেরা ভেবেছিল, তারা মাইনরিটি কমিউনিটি, তাদের গায়ে হাত পড়বে না। হলে সরস্বতীর মূর্তি রয়েছে, সেই প্রতিমা নিশ্চয়ই খান সেনারা ছোঁবে না। বেশীর ভাগ ছাত্র গোলাগুলির আওয়াজ শুনে সেই সরস্বতী প্রতিমার পেছনে গিয়ে জড়াজড়ি করে বসেছিল।

কিন্তু আর্মির চোখে পূর্ব পাকিস্তানের সবাই হিন্দু অথবা হিন্দুর দালাল। বাঙালী মুসলমান খাঁটি মুসলমান নয়। তাদের আরও বোঝানো হয়েছে যে প্রচুর ভারতীয় হিন্দু অনুপ্রবেশকারী ঢাকায় আত্মগোপন করে ছাত্রদের খ্যাপাচ্ছে।

মিলিটারি জগন্নাথ হলে ঢুকে লাথি মেরে ভেঙে ফেললো সরস্বতী প্রতিমা। একদল ছাত্রকে দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি চালাবার পর আর একদল ছাত্রদের বাধ্য করা হলো লাশগুলো বাইরে বয়ে নিয়ে যেতে। তারপর তারা মরলো, সেই লাশ বয়ে নিয়ে গেল আর একদল ছাত্র।

জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট, ইংরিজির অধ্যাপক জ্যোর্তিময় গুহ ঠাকুরতা বাধা দিতে এসে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। দর্শনের প্রবীণ অধ্যাপক গোবিন্দ দেব নিজের কোয়াটার থেকে ছুটে এলেন, তিনি হাত তুলে বললেন, আমার ছেলেদের মেরো না। তোমাদের অফিসার কে আছে, তাঁর সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দাও!

মালাউন কি বাচ্চা বলেই একজন এক ঝাঁক গুলি চালিয়ে দিল তাঁর দেহে। ঘরের মধ্যে ছিল তাঁর পালিত কন্যা রোকেয়া সুলতানা, কোলে তাঁর বাচ্চা, পাশে তাঁর স্বামী। রোকেয়ার স্বামী বাধা দিতে এসে গুলিতে প্রাণ হারালো, রোকেয়া আর্তনাদ করে আল্লাহ বলে। হিন্দুর ঘরে আল্লার নাম শুনে সৈন্যরা একটু থমকে দাঁড়ালো, তারপর ফিরে গেল।

পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যক্ষ মুনিরুজ্জামান সাহেব যেমন পণ্ডিত তেমনই ধার্মিক। জল্লাদেরা গভীর রাতে তার কোয়ার্টারে যখন ঢোকে, তখন তিনি জায়নামাজে বসে কোরআন তলাওয়াত করছিলেন। সেই অবস্থায় তিনি নিহত হলেন, সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ দিল তাঁর ভাই, ছেলে।

কামান দাগা হলো ইত্তেফাক অফিসে, পুড়িয়ে দেওয়া হলে ‘পিপল’ পত্রিকার কার্যালয়, গোলা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হলো ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনারের চূড়া। মিলিটারি চলাচলে বাধা দেবার জন্য কয়েকটি রাস্তায় লোকেরা ব্যারিকেড করেছিল, ট্যাঙ্ক এসে সেই ব্যারিকেড উড়িয়ে দিল, আগুন লাগিয়ে দিল কাছাকাছি সব কটি বাড়িতে। যারা মরছে তারা মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও বুঝতে পারছে না, তাদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানীদের এত রাগ কেন। শুধু বাঙালী হওয়াই অপরাধ?

সিরাজুলরা গ্যারেজের ছাদ থেকে নামলো পরদিন বিকেলবেলা।

দিনের আলো ফোঁটার পর শুরু হয়েছিল কবর খোঁড়ার পালা। ছাত্রাবাসগুলির সামনের জমিতেই সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এক হাত দু’হাত মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে ফেলা দেওয়া হচ্ছে। লাশ। দু’একটা হাত-পা বেরিয়ে থাকছে, তাতে কিছু আসে যায় না।

সামরিক গাড়ি ও বুটের আওয়াজ যখন আর শোনা গেল না তখনই ভরসা করে নেমে পড়লো সিরাজুলরা। হায়দার সারারাত মুখে হাত চাপা দিয়ে বমি করেছে। সেই বমি সিরাজুলের গায়েও লেগেছে, দু’জনের জামাতেই দুর্গন্ধ। হায়দারের চোখ দুটিও ঘোলাটে হয়ে গেছে। দারুণ সাহসী হায়দারই কাল সিরাজুলকে বাঁচিয়েছে, কিন্তু এখন আর সে মানসিক চাপ সহ্য করতে পারছে না।

অনেক মৃতদেহ এখনও কবর দেওয়া হয়নি। ছড়িয়ে আছে রাস্তায়। কয়েকটা আধ পোড়া বাড়ি থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, কোথাও কোনো শব্দ নেই। যেন সত্যিকারের একটা যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ঢাকা নগর।

একটা গলির মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এলেন জিন্নাত আলী, ইনি জহুরুল হলের সহ-সভাপতি। মুখখানা একেবারে বরফের মতন সাদা, ওদের দেখেও কোনো কথা বললেন না।

রাস্তার গা ঘেঁষে ঘেঁষে এক পা এক পা করে এগোচ্ছে ওরা। মৃতদেহগুলিকে দেখে ওরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে নিজেরা কী করে বেঁচে আছে। ওদের বাড়িতে কি কেউ বেঁচে আছে?

খানিকটা এগোতেই একজন মিলিটারি চেঁচিয়ে উঠলো, কৌন হ্যায়?

আশ্চর্য ব্যাপার, সৈনিকটি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ঠিক মাঝখানে। হাতে সাব-মেশিনগান তবু। তাকে ওরা দেখতে পায়নি কেউ। ওরা দেখছিল শায়িত মৃতদেহগুলির মুখ, কোনো কোনো লাশ একেবারে ছিন্নভিন্ন, তবু এদের মধ্যে চেনা কেউ আছে কিনা, সেটা জানার ব্যাকুলতা।

মিলিটারিটি একেবারে ওদের সামনে, পালাবার কোনো উপায় নেই। প্রায় প্রৌঢ় চেহারার এক পাঠান, চোখ দুটো লালচে, চৌকো চোয়াল। সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। একটু নড়াচড়া করলেই পর পর গুলিতে ফুড়ে দেবে সবাইকে।

আর বাঁচার কোনো আশা নেই। সামান্য একটু অসাবধানতার মূল্য দিতে হবে প্রাণ দিয়ে। সিরাজুল একবার ভাবলো, কোনোক্রমে লাফিয়ে পড়বে লোকটার ওপরে; তার নিজের প্রাণ গেলেও অন্যরা সেই সুযোগে ছুটে পালাতে পারে। কিন্তু প্রাণ দেওয়া এত সহজ নয়। লোকটা অস্ত্র তুলে আছে, সিরাজুল ওর কাছে পৌঁছোতেই পারবে না!

সিরাজুল তাকালো জিন্নাত আলীর দিকে। তিনি যদি কোনো বুদ্ধি বার করতে পারেন। সিরাজুল দেখতে পাচ্ছে মনিরার মুখ। মনিরা যেন ভালো থাকে!

সৈন্যটি হাতের অস্ত্র নেড়ে ইঙ্গিত করলো কাছে আসার। রবার দিয়ে তৈরী তিনটি পুতুলের মতন ওরা এগিয়ে গেল।

আশ্চর্য ব্যাপার, সৈনিকটির মুখের ভঙ্গি বেশ নরম। সে একবার চট করে পেছন দিক দেখে নিয়ে বললো, ইধার কেয়া কর রহা হ্যায়?

জিন্নাত আলী বললেন, স্যার, হামলোগ ইদারহি রহেতা হ্যায়।

সৈনিকটি জিজ্ঞেস করলো, মুসলমান হ্যায় ইয়া হিন্দু হ্যায়?

হায়দার বললো, মুসলমান হ্যায় সাব, মুসলমান, হামলেগকো সবহি ক খৎনা হ্যায়।

সৈনিকটি ইঙ্গিত করলো পাজামা খুলে ফেলতে। কেউ বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলো না। সৈনিকটি ভালো করে তাকিয়ে দেখলোও না, মুখ ফিরিয়ে নিল। অস্ত্রটা নিচু করে সে বললো, যাও, জলদি জলদি ভাগ চলো, আভি আভি কাপটেন সাব চলা আয়গা। তব তত তুমলোগকো ভি নেহি ছোড়ে গা!

তারপর সে দুঃখিত ভাবে মুখ কুঁচকে বললো, কেয়া হো রহা হ্যায় ই দেশ মে!

পাজামার দড়ি না বেঁধেই দৌড়োলা ওরা তিনজন।

০৪. কৃষ্ণনগরে বিমানবিহারীদের বাড়ি

কৃষ্ণনগরে বিমানবিহারীদের বাড়ির একটি অংশে হঠাৎ আগুন লেগে গেল এক রাত্রে। বিমানবিহারী দু’দিন আগেই সপরিবারে দেশের বাড়িতে এসেছেন। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা চলেছিল, তিনি এলেই প্রতিবেশীরা অনেকেই দেখা করতে আসে, খাওয়া-দাওয়া হয়। রাত দশটার সময় খানিকটা ঝড় উঠে এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল। আগুন লাগার স্বাভাবিক কোনো কারণই নেই, কেউ লাগিয়েছে। গোয়াল ঘর আর হাঁসঘর থেকে রান্নাঘর অনেকটা দূর, কিন্তু তিন জায়গাতেই আগুন ধরেছে একসঙ্গে। সেই আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিল বসতবাড়ির পেছন দিকে দোতলা পর্যন্ত।

শেষ রাত্রে হৈ চৈ, হুড়োহুড়ি, হাঁকাহাঁকি, পটোপাড়া থেকে অনেকে ছুটে এসেছিল সাহায্য করতে, পাছ-পুকুর থেকে ঘড়া ঘড়া জল এনে আগুন নেবাবার চেষ্টা চলতে লাগলো। এ সময় মনে হয়েছিল গোটা বাড়িটাই বুঝি ভস্ম হয়ে যাবে।

শেষ পর্যন্ত বসতবাড়ির খুব বেশী ক্ষতি হয়নি, হাঁসগুলো সব মরে গেছে, একটা গরু দারুণ ভাবে ঝলসে গেছে। তার আর্ত চিৎকারে কান পাতা দায়। গরুটাকে বাঁচানো যাবে না, আবার মুমূর্ষ গরুটাকে মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার কথাও কেউ চিন্তা করছে না। একজন ভেটেরিনারি ডাক্তারকে ডাকতে লোক গেছে, সে কখন আসবে তার ঠিক নেই।

বিমানবিহারীর এক জ্ঞাতি দাদা রাজচন্দ্র চুরুট টানতে টানতে বিজ্ঞভাবে বললেন, এ নির্ঘাৎ নকশালদের কাজ। তোমাদের আমি আগেই সাবধান করে দিয়েছিলাম, বিমান!

সদ্য ভোর হয়েছে, গোয়ালঘর রান্নাঘরের খড়ের চালে প্রচুর জল ঢালা হলেও এখনও সেখান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে উঠছে ধোঁয়া। বিমানবিহারীর কাকার ছেলেরা প্রচুর খাটাখাটনি করে চলেছে, অলি আর বুলিও হাত লাগিয়েছে।

সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিমানবিহারী চশমার কাচ মুছলেন।

রাজচন্দ্র কবে তাঁকে নকশালদের সম্পর্কে সাবধান করেছিলেন, তাঁর মনেই পড়লো না। এক ধরনের মানুষ থাকে যে কোনো ঘটনা ঘটলেই বলে, আমি তো আগেই বলেছিলাম; রাজচন্দ্র সেই দলে।

বিমানবিহারী ভাবলেন, নকশাল ছেলেদের তাঁদের বাড়ির ওপর রাগ থাকবে কেন? তাঁরা। তো জমিদার বা জোতদার নন। তাঁদের পরিবারের কুড়ি বাইশ বিঘে জমি আছে মাত্র। বিমানবিহারী কলকাতায় বইয়ের ব্যবসা করেন। কৃষ্ণনগরের বাড়িটি বিক্রি না করে রেখে দিয়েছেন, এই তাঁর দোষ?

রাজচন্দ্রদাদা নিজে পুরনো কংগ্রেসী এবং তার দুই ছেলেও কংগ্রেসের পাণ্ডা। বিমানবিহারীর কাকার ছেলেরা সি পি এম পার্টির সদস্য। এ শহরের ইস্কুল কলেজের ছাত্ররা নাকি দলে দলে নকশালপন্থী হয়ে গেছে। এখন কংগ্রেস-সি. পি. এম ও নকশাল ছেলেদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই চলছে নানান জেলায়। প্রতিদিনই কাগজে কয়েকটি তরুণপ্রাণ বিনষ্ট হবার সংবাদ থাকে।

বিমানবিহারীর পুত্র সন্তান নেই, দুটি মেয়ে পড়াশুনো নিয়েই ব্যস্ত, কলেজ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়নি। তাঁদের পরিবারটি রাজনৈতিক পরিবার নয়। তবে তাঁরা কাদের আক্রমণের লক্ষ্য?

বছরখানেক আগে বিমানবিহারী কঙ্কালের ছবি আঁকা একটি লাল কালিতে লেখা চিঠি। পেয়েছিলেন। সেই চিঠিতে তাঁর কোনো অপরাধ নির্দেশ করা হয়নি। তাঁকে কোনো ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়াও হয়নি, তাঁকে যে খতমের তালিকায় রাখা হয়েছে, সেই কথাটিই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

চিঠিখানা দেখে বিমানবিহারী যে খুব ভয় পেয়েছিলেন তা নয়, বিভ্রান্তিবোধ করেছিলেন। তিনি আইন ও বিজ্ঞানের গ্রন্থ প্রকাশ করেন, মাঝারি ধরনের ব্যবসা, এতে কৃষক আর শ্রমিক নিপীড়নের কোনো ব্যাপার নেই, তবু তাঁকে হত্যা করা হবে কেন?

চিঠিখানা তিনি পুলিশ কমিশনারকে দেখিয়েছিলেন।

পুলিশ কমিশনার তো হেসেই উঠলেন সে চিঠি দেখে। প্রথমে একটি লাল কলম নিয়ে, পরে সেটি বদলে একটি সবুজকালির কলম নিয়ে তিনি চার জায়গায় দাগ দিয়ে বললেন, এই দ্যাখো, বিমান, তিনটে বানান ভুল। এক জায়গায় কনস্ট্রাকশান ভুল। নকশালরা এ চিঠি লিখতে পারে না। আফটার অল, ভালো ভালো ছাত্রেরা ঐ দলে ভিড়েছে, প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্ররা আছে, যতই মাথা বিগডোক, তারা লেখাপড়া জানে। তারা এরকম বাজে চিঠি লিখবে না। কতকগুলো লুমপেন এখন নকশালদের নাম করে যা তা করে বেড়াচ্ছে। তুমি এ চিঠিটা ফেলে দিতে পারো; আর তুমি যদি চাও, পুলিশ প্রোটেকশানের ব্যবস্থা করে দিতে পারি তোমার জন্য।

সঙ্গে সঙ্গে সব সময় একজন সেপাই ঘুরবে, এ ব্যাপারে বিমানবিহারীর একেবারে মনঃপূত হয়নি।

কমিশনার আরও বললেন, দেখো, এরপর বোধ হয় তোমার কাছে দু’পাঁচ হাজার টাকা চাঁদার জুলুম করতে আসবে। আমাদের কাছে খবর আছে, এরকম এক্সটরশান চলছে। অনেকে ভয় পেয়ে দিয়ে দেয়। সেরকম কোনো ইন্ডিকেশন পেলেই তুমি টুক করে আমাদের খবর দিয়ে দেবে। এই মুভমেন্টের আয়ু আর বেশি দিন নেই, চায়না ব্যাক আউট করেছে।

বিমানবিহারী জিজ্ঞেস করেছিলেন, আচ্ছা রুনু, ছেলেগুলো তো একটা বড় আদর্শ নিয়েই এসেছিল, হয়তো তারা মিস-গাইডেড, কিন্তু ভালো ভালো ছেলে, কিন্তু তাদের যে ধরে ধরে মেরে ফেলা হচ্ছে, এটা কি ঠিক? এটা তোমরা আটকাতে পারো না?

খুন করলে যে শাস্তি পেতে হয়, তা তো একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। এরা যে রাস্তায় ঘাটে যাকে-তাকে খুন করছে, চায়না রাশিয়াতেও তো এরকম ইনডিসক্রিমিনেট কিলিং দিয়ে। রেভোলুশন শুরু হয়নি। আমরাও তো কিছু পড়াশুনো করেছি, নাকি?

ঘরে অন্য লোক ঢুকে পড়তে আর বেশী কথা হয়নি। বিমানবিহারী উঠে পড়েছিলেন। কমিশনার তাকে আশ্বস্ত করার জন্য আবার বলেছিলেন, তুমি চিন্তা করো না। এইসব আজে বাজে চিঠি পেয়ে কয়েকজনের হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে শুনেছি, ইচ্ছে করলে কিছুদিন অন্য জায়গায় বেড়িয়ে এসো.-এদের ব্যাপারটা শিগগিরই শেষ হয়ে যাচ্ছে তোমার সেই বন্ধুর ছেলে ভালো আছে তো?

এর দু’তিন দিন বাদেই কুমোরটুলীতে একজন হাইকোর্টের বিচারক খুন হলেন দিনের বেলায়, প্রকাশ্য রাস্তায়!

তখন বিমানবিহারী ভাবলেন, তিনি যে আইনের বই ছাপেন, সেটাই কি তবে দোষের? এদেশে এখনও ব্রিটিশ রচিত আইনই মোটামুটি চলে, তার ওপর ঐ বিপ্লবী ছেলেদের রাগ আছে?

পুলিশ খুনের পর, বিচারক, অধ্যাপক, ভাইস চ্যান্সেলর খুন শুরু হয়ে গেল। কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় গিয়ে বিমানবিহারী শুনলেন যে টালায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতেও নাকি। পুলিশ পাহারা বসেছে, তারাশঙ্করের নামেও ঐ রকম লাল কালিতে লেখা জঘন্য ভাষায় চিঠি এসেছে।

বিমানবিহারী কল্যাণীর কাছে ঐ লাল চিঠির কথা গোপন রাখতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পুলিশ কমিশনারের স্ত্রীই তাকে একদিন ফোন করে কথায় কথায় জানিয়ে দেন। কল্যাণী দারুণ ভয় পেয়ে গেলেন, বিমানবিহারী তাঁকে কিছুতেই শান্ত করতে পারলেন না, সপরিবারে তাঁকে চলে যেতে হলো বেনারস।

কুমোরটুলীর ঐ বিচারক খুন হবার পর বিমানবিহারী তাঁর বন্ধু প্রতাপ সম্পর্কেও চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। প্রতাপ জেদী মানুষ, কারুর সঙ্গে নরম সরমভাবে কথা বলা তাঁর ধাতে নেই। এখন যা দিনকাল, কালীপুজোর চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেও পেটে ছুরি বসিয়ে দেয়।

বেনারসে বেশ বড় একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। বিমানবিহারী প্রতাপকেও তাঁর স্ত্রী কন্যাদের নিয়ে বেনারস যাবার জন্য অনেক অনুরোধ করেছিলেন, প্রতাপ রাজি হননি। বিমানবিহারী মমতাকেও গিয়ে ধরেছিলেন, মমতা ম্লান হেসে বলেছিলেন, আপনার বন্ধু একবার না বললে কি তাকে দিয়ে হ্যাঁ করানো যায়, আপনি জানেন না?

বিমানবিহারী সূক্ষ্ম অনুভূতির মানুষ। প্রতাপের অসম্মতির কারণটা তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। দুই পরিবারের আর্থিক অবস্থার অনেক তফাত! বেনারসে এক সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে গেলে বিমানবিহারীই বেশীরভাগ খরচপত্র চালাবেন, সেটাই মেনে নিতে পারবেন না প্রতাপ! তাঁর মালখানগরের বংশগৌরব তাতে নষ্ট হবে! বিপদের সময় মানুষ কি বন্ধুর কাছে আশ্রয় নেয় না? তা হলে আর বন্ধুত্ব কী? প্রতাপের সব কিছুই আলাদা। বিমানবিহারী কিছু টাকা প্রতাপকে ধার হিসাবে দিতে চেয়েছিলেন, প্রতাপ বলেছিলেন, তোমার কাছে আমার ঋণের পাহাড় জমে গেছে, আর বাড়াতে চাই না!

বেনারসে দু’মাস নিরুপদ্রবেই কেটেছিল। কল্যাণী কিছুদিন হাঁপানীতে ভুগছিলেন, তাঁর বেশ স্বাস্থ্যের উন্নতি হলো। স্থানীয় বাঙালী ক্লাবের দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে গান গেয়ে বেশ নাম হলো। তাঁদের ছোট মেয়ে বুলির। অলি গান শেখা ছেড়ে দিলেও বুলির খুব গানের দিকে আগ্রহ, সে এর মধ্যেই রেডিওর অডিশনে পাশ করেছে।

আগ্রায় বেড়াতে গিয়ে দেখা হলো জাস্টিস স্বরূপ মিত্রের সঙ্গে। তিনিও তিন মাস ধরে আগ্রায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছেন। এ যেন সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার অবস্থা, বাধ্য হয়ে কলকাতা ছেড়ে বাইরে থাকা! এরকম কতজন যে ঐ রকম লালকালির চিঠি পেয়েছে কে জানে!

স্বরূপ মিত্রের ছেলে প্রবীর থাকে পশ্চিম জার্মানিতে, সে দেখা করতে এসেছে বাবা-মার সঙ্গে। সে তাদের পশ্চিম জার্মানিতে নিয়ে যেতে চায়। প্রবীর খুব চমৎকার ছেলে। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমনি মিষ্টি ব্যবহার। প্রবীর এখনো বিয়ে করেনি শুনেই কল্যাণী দারুণ উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। এই প্রবীরের সঙ্গে অলির সম্বন্ধ করা গেলে একেবারে রাজযোটক হতো!

জ্যোৎস্নারাতে সবাই মিলে তাজমহল বেড়াতে যাওয়া হলো, প্রবীরের সঙ্গে অনেক গল্প করলো অলি, কিন্তু তারপর আর কিছুই না। বিয়ের প্রস্তাবে সে কান দিতেই চায় না একেবারে। এখনকার তরুণ-তরুণীরা বেশ সাবলীল ভাবে মেলামেশা করে, চায়ের দোকানে গল্প করে, এক সঙ্গে বেড়াতে যায়, তবু যে তাদের কথায় কথায় প্রেম হয় না, এটাই বুঝতে পারে না কল্যাণী। তাঁদের কালে বয়ঃসন্ধির পর থেকেই মেয়েদের বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হতো। প্রায় প্রতিদিনই এই প্রসঙ্গে শুনতে হতো মাসি-পিসি-আত্মীয়স্বজনদের কথা, বিয়েটাই যেন ছিল মেয়েদের জীবনের প্রধান ঘটনা। আর এখন মেয়েরা বিয়ের খুব ভালো সম্বন্ধও উড়িয়ে দেয় এক কথায়।

বিমানবিহারী অলির বিয়ের ব্যাপারে কোনো উৎসাহ দেখান না। মেয়ে যদি বিয়ে একেবারেই না করে, তাতেও তাঁর আপত্তি নেই, মেয়ে তাঁর ব্যবসা দেখবে। অলি এর মধ্যেই তাঁর প্রকাশনার অনেকটা ভার নিয়েছে।

কলকাতায় ফিরে আসার পর বিমানবিহারী খবর পেলেন যে প্রতাপের ওপর একবার আক্রমণ হয়ে গেছে এর মধ্যে। তাঁরা বেনারস যাবার এক সপ্তাহের মধ্যেই। প্রতাপ চিঠিতে কিছুই জানাননি।

শিয়ালদার কাছেই, প্রতাপ আদালত থেকে বেরুবার পর গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, সরকার থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে, তিনজন হাকিম এক গাড়িতে যাতায়াত করেন, আর দু’জন। ছিলেন প্রতাপের খানিকটা পেছনে। একটি ছেলে হঠাৎ যেন তাঁর সামনে মাটি খুঁড়ে উঠে একটা ছুরি তুললো। এক সময় ফুটবল খেলতেন প্রতাপ, এখনও তাঁর স্নায়ু শিথিল হয়নি, তিনি হাতের গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগটি সঙ্গে সঙ্গেই তুলে ধরলেন বুকের কাছে, ফলে ছুরিটা তাঁর ডান বাহুতে খানিকটা ঘেঁষে গেল। পরের মুহূর্তেই প্রতাপ সেই ব্যাগটি দিয়ে ছেলেটির মুখে একটা আঘাত করলেন। তারপরই হৈ চৈ উঠে গেল, ছেলেটির আরও দু’জন সঙ্গী ছিল, তারা একটা বোমা ফাটালো, সেটা অবশ্য পালাবার পথ পরিষ্কার করবার জন্য।

ছেলে তিনটিকে ধরা গেল না। কেউ অবশ্য তাদের ধরার জন্য পিছু ধাওয়াও করেনি।

প্রতাপের জামা রক্তে ভিজে গেলেও প্রতাপের আঘাত তেমন গুরুতর না। অন্য হাকিমদের অনুরোধেও তিনি হাসপাতালে যেতে রাজি হননি, সোজা বাড়ি চলে এসেছিলেন, নিজের রুমাল দিয়ে বেঁধে নিয়েছিলেন ব্যাণ্ডেজ।

বিমানবিহারীর সঙ্গে দেখা হবার পর প্রতাপ বলেছিলেন, আরে না না, ওরা আমাকে মারতে আসেনি। আমাকে নিশ্চয়ই অন্য কারুর বদলে ভুল করে…। আমাকেই টারগেট করলে কি ওরা এত সহজে ছেড়ে দিত? ওরা তিনজন ছিল, সঙ্গে বোমা ছিল…। আমাকে ওরা মারবে কেন বলো! আমি তো ক্রিমিন্যাল কেস বা পলিটিক্যাল কেস করি না। কোনো নকশাল ছেলেকে শাস্তিও দিইনি…

কী জন্য যে কে কাকে মারছে সেটাই তো বোঝার উপায় নেই, যাদবপুরের ভাইস চ্যান্সেলর যেদিন রিটায়ার করলেন, সেদিনই বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে খুন করার কী যুক্তি থাকতে পারে? সব খুনই কি নকশাল ছেলেরা করছে? এখন তো খুনের কারবারে নেমে পড়েছে অনেকেই। এমনকি কারুর ওপর ব্যক্তিগত রাগ থাকলেও তাকে খুন করে সেটা রাজনৈতিক হত্যা নামে চালিয়ে দেওয়া যায়। এই সব খুন নিয়ে পুলিশও মাথা ঘামায় না, তারা নকশালদের মারতে ব্যস্ত।

বাবলুর বাবা হিসেবে অন্য পার্টির ছেলেদেরও রাগ থাকতে পারে প্রপের ওপর, তারই হয়তো প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে কথা বিমানবিহারী বললেন না। ছেলের ব্যাপারে প্রতাপ খুবই স্পর্শকাতর। প্রতাপের এখনও দৃঢ় ধারণা শিলিগুড়িতে বাবলু নিজের হাতে কারুকে খুন করেনি, তার কোনো বন্ধু-টন্ধুর দায়িত্ব সে ইচ্ছে করে নিজের কাঁধে নিয়েছে।

প্রতাপকে সাবধানে চলাফেরা করার জন্য উপদেশ দেওয়ার কোনো মানে হয় না। বিমানবিহারী নিজেই বা কী করে সাবধান হবেন?

চোর-ডাকাতদের সম্পর্কে সাবধান হওয়া যায়, যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হলে মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরা খুনী হয়ে উঠলে তাদের সম্পর্কে আর কী করে সতর্ক হওয়া যাবে? এরা তো প্রায় নিজেদের বাড়ির ছেলেরই মতন। নানান কাজে, এই বয়েসী ছেলেরা বাড়িতে বা অফিসে অনবরত আসে, তাদের যে-কেউ হঠাৎ একটা ছুরি বা রিভলভার বার করতে পারে। রাস্তাঘাটে যে-কেউ একটা কথা বলার ছুতো করে হঠাৎ মেরে দেয়। এই রকমই তো ঘটছে। সন্ধের পর কোনো কোনো রাস্তায় যাওয়াই নাকি অপরাধ! কাগজে এরকম খবর বেরোয় যে মফস্বলের কোনো ছেলে হয়তো কলকাতায় এসে কোনো আত্মীয়ের বাড়ির ঠিকানা খুঁজছে, তাকে স্পাই সন্দেহ করে খতম করে দেওয়া হলো! পুলিশ থেকে তো ম্যাপ এঁকে ঘোষণা করে দেওয়া হয়নি যে সন্ধের পর কলকাতার কোন্ কোন্ রাস্তায় ঢাকা নিষিদ্ধ!

বিমানবিহারী গাড়িতে চলাফেরা করেন, তাঁর তবু খানিকটা নিরাপত্তা আছে। বাড়ির দরজায় একজন দারোয়ান বসিয়েছেন। কিন্তু প্রতাপ যেন বেপরোয়া। আদালতে যাওয়া-আসার সময়টুকু শুধু তিনি গাড়ি পান, কিন্তু অন্য সময় বাড়িতে বসে থাকার মানুষ তিনি নন। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে বাজারে যান। ছুটিছাটার দিনে বাসে-ট্রামে ঘোরেন। একবার যার ওপর আক্রমণ করে বিফল হয়েছে, পরের বার তাকে পুরোপুরি শেষ করে দেবার জন্য যে আততায়ীরা সুযোগ খুঁজবে, সে সম্পর্কে প্রতাপের কোনো ভূক্ষেপ নেই। যা হয় হোক, এই রকমই যেন তাঁর মনোভাব।

এবারেও কৃষ্ণনগরে আসার আগে,বিমানবিহারী প্রতাপকে সঙ্গে আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মমতার সামান্য শরীর খারাপ, এই অজুহাতে প্রতাপ এড়িয়ে গেছেন। মমতা আলসারে কষ্ট পান, কৃষ্ণনগরের জল ভালো, এখানে কয়েকদিন থাকলে মমতার উপকারই হতো।

কলকাতার রাস্তায় এখন সব সময় ভয়ে ভয়ে চলতে হয়। সারা ভারতেই এখন কলকাতা সম্পর্কে বিষম বদনাম। অফিসের কাজে বা ব্যবসার কাজেও বম্বে ও দিল্লি থেকে কেউ এখন কলকাতায় আসতে চায় না। বিদেশী টুরিস্টরা তো কলকাতার নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে। কৃষ্ণনগরে এসে বিমানবিহারী অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করেছিলেন। এটা তাঁর জন্মস্থান, নিজের জায়গা, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল থেকে তাঁদের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস আছে এই শহরে। তাঁদের এক পূর্ব পুরুষের সঙ্গে কবি রামপ্রসাদের পরিচয় ছিল। রামপ্রসাদের নিজের হাতে লেখা দু’খানি গানের পাণ্ডুলিপি তাঁদের পারিবারিক সম্পদ।

বিমানবিহারী এই শহরের অনেক মানুষকে চেনেন, বছরে তিন চারবার এখানে নিয়মিত আসেন, তাঁর মায়ের নামে এখানে একটি স্থানীয় স্কুলের একাংশে পাকা বাড়ি তুলে দিয়েছেন। জ্ঞাতিদের সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই, তাঁর কাকাদের সঙ্গে সম্পত্তি আপোসে ভাগ করা হয়ে গেছে। কাকা এখন জীবিত নেই কিন্তু তাঁর ছেলেরা তাঁকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। এখানে কারা এসে তাঁর বাড়িতে আগুন লাগালো? আগুনে যত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার জন্য নয়, তাঁর জন্মস্থানে কেউ তাঁকে অবাঞ্ছিত মনে করে, এই ধাক্কাটাই বেশী করে বিমানবিহারীর মনে লেগেছে!

গো-বদ্যি আসবার আগেই থেমে গেল আহত গরুটার আর্তনাদ। যারা আগুন লাগিয়েছে। তারা গোয়ালঘর আর হাঁসঘরের দরজা খুলে দিতে পারতো না? তাহলে অবোলা প্রাণীগুলোকে মরতে হতো না এমন ভাবে। মানুষের ওপরেই তো মানুষের রাগ থাকে। ওদের ওপরে তো নয়?

একটা জিনিসও খোয়া যায়নি, শুধু তিনটে গরু চুরি করে নিলেও অনেক টাকা পেত। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, চোর-ডাকাতদের কাজ নয়, যারা আগুন লাগিয়েছে তাদের উদ্দেশ্য শুধু ধ্বংস করা!

অলি দুকাপ চা নিয়ে এসে বললো, বাবা তোমরা ভেতরে যাও, এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে?

রাজচন্দ্র বললেন, ইস অলি-মা, তোমার মুখখানা যে কালি বন্ন হয়ে গেছে। তুমি আর আঁচের কাছে যেও না!

অলি আঁচল দিয়ে মুখ মুছে দুঃখী গলায় বললো, বাবা, তিনটে হাঁস মরে গেছে, আর দুটোও বেশীক্ষণ বাঁচবে না। ওগুলো কী হবে?

বিমানবিহারীর বদলে রাজচন্দ্রই বললেন, ফেলে দিতে হবে। মরা হাঁস খেতে নেই। কিংবা দ্যাখো যদি ঐ যারা বাইরে থেকে এসেছে তারা কেউ নেয়!

অলি বললো, আমি খাবার কথা বলিনি। যে-দুটো এখনো বেঁচে আছে, ওদের গায়ে কী বার্নল লাগানো যায়?

বিমানবিহারী কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি বাড়ির বার মহলের দিকে চলে গেলেন। রাজচন্দ্রের সঙ্গেও তাঁর এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু রাজচন্দ্র কিছুতে তাঁর সঙ্গ ছাড়বেন না। কথা বলা তাঁর নেশা, শেষ রাত্রে তিনি ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন, এখন বিমানবিহারীর ওপর প্রচুর উপদেশ বর্ষণ করে তার ক্ষতিপূরণ করবেন।

বিমানবিহারীর সঙ্গে যেতে যেতে রাজচন্দ্ৰ নিচুগলায় বললেন, তোমার ঐ খুড়তুতো ভাইগুলো-মুখে খুব মিষ্টি ভাব থাকে, ওদের বিশ্বাস করো না, এই আমি বলে দিলাম, কখন যে কুলোপানা চক্কোর তুলবে তার ঠিক নেই!

বিমানবিহারী বললেন, রাজুদা, ছোটকাকার ছেলেদের সঙ্গে আমার তো আর কোনো স্বার্থের সম্পর্ক নেই। তবু দেখুন ওরা নিজেরাই গায়ে পড়ে আমার উপকার করতে এসেছে।

–ওসব লোক-দেখানো ব্যাপার, বুঝলে? ওরাই যে আগুন লাগায়নি, তার কোনো গ্যারান্টি আছে? এটাই ওদের কায়দা বুঝলে, বাঁ হাত বাড়িয়ে তোমাকে সাহায্য করবে, আর ডান হাতে তোমাকে ছুরি মারবে!

রাজচন্দ্র একটু আগেই নকশালদের দায়ী করেছিলেন, এখন আবার বিমানবিহারীর খুড়তুতো ভাইদের নামে দোষ চাপাচ্ছেন। বয়েস হয়েছে, কখন কী বলেন মনে রাখতে পারেন না।

এটাও বিমানবিহারী জানেন যে, কিছু কিছু লোকের ব্যাধি থাকে সব সময় অপরের নামে নিন্দে করা। এই যে রাজচন্দ্র তাঁর খুড়তুতো ভাইদের নামে তাঁকে বিষিয়ে দিতে চাইছেন, এতে ওর নিজের কোনো লাভ নেই। শুধু শুধু ঝগড়া বাঁধিয়েই আনন্দ।

বিমানবিহারী রাজচন্দ্রের কোনো কথায় গুরুত্ব দেন না, কিন্তু বয়েসে বড় বলে ওঁর মুখের ওপর কোনোও কড়া কথা বলতে পারেন না।

রাজচন্দ্রের বয়েস সত্তরের ওপর, শরীরে এখনও বেশ সামর্থ্য আছে। সারা জীবন জীবিকা অর্জনের জন্য কোনো কাজ করেননি, পারিবারিক সম্পত্তিতেই চলে গেছে। কলকাতা থেকে তিনি দামী চুরুট আনান, আরও তাঁর কিছু কিছু শখের জিনিস কলকাতা থেকে আসে। কিন্তু তিনি নিজে কলকাতায় যেতে চান না। কলকাতার জল-হাওয়া তাঁর সহ্য হয় না।

–অলি-মা’র বিয়ে দাও এবার! দুটো পাস তো দিয়েছে। এরপর মেয়ে অরক্ষণীয়া হয়ে যাবে। আমাদের এখানে একটি সুপাত্র আছে, সম্বন্ধ করবো নাকি? ছেলেটি ম্যাজিস্ট্রেট, ভালো বংশ।

–রাজুদা, অলির বিয়ের ব্যাপারটা আপনি অলিকেই জিজ্ঞেস করবেন। তার অমতে তো কিছু হবে না।

বিমানবিহারীর কণ্ঠস্বরে ঈষৎ বিরক্তি ফুটে উঠেছিল, তাই রাজচন্দ্র চুপ করে গেলেন। বাড়িতে আগুন লেগেছে, সেই চিন্তায় বিমানবিহারী নিমগ্ন, এখন কি মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করার সময়?

একটু পরে রাজচন্দ্র আবার সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন, বিমান, তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি নাকি একটা খুনে নকশাল ছেলেকে বিলেতে পাঠিয়ে দিয়েছো?

এবার বিমানবিহারী দারুণ চমকে উঠলেন। যে ব্যাপারটি অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল, তা কৃষ্ণনগরেও পৌঁছে গেল কী করে? বাতাসে কী খবর ছড়ায়? মাত্র তিন-চার জন ছাড়া বাবলুর ঘটনা আর কারুরই জানবার কথা নয়। অথচ যে রাজচন্দ্র কখনো কলকাতায় যান না, তাঁর কানেও এ খবর এতদিন পরে পৌঁছে গেছে! রাজচন্দ্র আবার বললেন, কে যে কার ওপর এখন বদলা নিচ্ছে তার ঠিক নেই, বুঝলে? নকশালদের মধ্যেও দল ভাগ হয়ে যাচ্ছে শুনছি। তুমি ঐ যে একজনকে দেশের বাইরে পাঠিয়েছো, সেজন্য তোমার ওপর অনেকে রেগে আছে। সাবধান, বিমান, সাবধানে থেকো!

০৫. কৃষ্ণনগর থেকে বহরমপুর

কৃষ্ণনগর থেকে বহরমপুর কতখানিই বা দূর! ছেলেবেলায় অলিরা অনেকবার বহরমপুর হয়ে মুর্শিদাবাদ, খোসবাগ দেখতে গেছে, একবার সেই মেম কাকিমার সঙ্গে হাজারদুয়ারী দেখতে গিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল, ফ্ৰকপরা অলির সেই ছবি এখনো আছে অ্যালবামে। তখন অবশ্য অভিভাবক শ্রেণীর কেউ না কেউ সঙ্গে থাকতেন, এখন অলি অনায়াসেই একলা যেতে পারে, লালগোলা প্যাসেঞ্জারে চাপলে দু’ আড়াই ঘণ্টার পথ।

কিন্তু বাড়িতে আগুন লাগার পর বিমানবিহারী মেয়েদের বাইরে বেরুতে বারণ করে দিয়েছেন। তাঁর মন ভেঙে গেছে। তিনি তক্ষুনি কলকাতায় ফিরতে পারলে খুশী হতেন, কিন্তু বসতবাড়ির পেছন দিকের পোড়া অংশগুলো কিছু মেরামত না করলে একেবারে ভেঙে পড়বে। তিনি মিস্ত্রি খাটাচ্ছেন।

প্রত্যেকবার অলিবুলি ঘূর্ণীতে নানারকম মাটির পুতুল কিনতে যায়, পুতুলের শখ বুলিরই বেশী, বাড়ি থেকে একটা রিকশা নিয়ে যাওয়া আর সেই রিকশাতেই ফিরে আসা, কিন্তু। বিমানবিহারী বললেন এবারে পুতুল কিনতে যেতে হবে না। একই রকম তো পুতুল, পরে অনেক পাওয়া যাবে।

ঘূর্ণীতেই যাওয়া হচ্ছে না, তা হলে বহরমপুর যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। অলি একবার সে প্রসঙ্গ তুলতেই বিমানবিহারী উড়িয়ে দিলেন।

অথচ বহরমপুরে শুক্রবার বিকেলবেলা অলিকে একবার যেতেই হবে।

বাবা কোনো কাজেই প্রায় বাধা দেন না, সুতরাং বাবা কোনো ব্যাপারে একবার না বললে আর তর্ক করা যায় না। কৃষ্ণনগর থেকে পাঁচ মাইল দূরে একটা ইস্কুল বাড়িতে বোমা মারামারি হয়েছে বুধবার দুপুরে, সেই খবর পাবার পর বাবা-মা আরও সন্ত্রস্ত হয়ে আছেন। কিন্তু এই সব বোমা, খুন, আগুন লাগানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের গা-সহা হয়ে গেছে। জীবনযাত্রা তো। থেমে নেই। ট্রেনে বাসে একই রকম ভিড়। যে রাস্তায় বোমাবাজি হয়, সেখানে দোকান পাটগুলো দ্রুত ঝাঁপ ফেলে দেয়। ঘণ্টা দু’ এক বাদেই আবার খুলে যায় সবকিছু। যে-পাড়ায় খুন হয়, পরের দিন সে পাড়ার মানুষজনকে দেখলে বোঝাই যায় না যে সেখানে কিছু ঘটনা ঘটেছে।

বহরমপুরে কল্যাণীর ছোট ভাই থাকেন, তিনি ডাক্তার, সদ্য একটি নার্সিং হোম খুলেছেন বাস স্ট্যান্ডের কাছেই। অলিবুলিদের সেই শান্তিমামা ও রীতা মামীমা গাড়ি নিয়ে এলেন কৃষ্ণনগরে, এখানকার রোমান ক্যাথলিক চার্চের ফাদার শান্তিমামার পেসেন্ট, সেই ফাদার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেই আসতে হয়েছে শান্তিমামাকে, সেই সঙ্গে তিনি দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গেও দেখা করে যাবেন।

বৃহস্পতিবার দিন এই শান্তিমামা ও রীতা মামীমা যেন দৈব প্রেরিত। অলি সাধারণত কারুর কাছে কিছু চায় না, অনুরোধ করে না, তা মামীমার কাছে সে বাচ্চা মেয়ের মতন আবদার ধরলো, আমাকে তোমাদের সঙ্গে বহরমপুরে নিয়ে চলো, বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলো।

গাড়িতেই যাওয়া, তবু বিমানবিহারী খুব পছন্দ করলেন না। অলি ফিরবে কার সঙ্গে? শান্তিমামা বললেন, বহরমপুর থেকে তাঁর চেনা কতলোক প্রত্যেকদিন কলকাতায় যায়, একজন কারুর সঙ্গে অলিকে ট্রেনে তুলে দেবেন সকালবেলা, কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে রিকশা ধরে অলি বাড়ি চলে আসবে। দিনেরবেলা ভয়ের কী আছে? ছেলে-ছোকরারা মারামারি খুনোখুনি করছে বটে, কিন্তু মেয়েদের গায়ে কোথাও হাত দিয়েছে, এমন তো শোনা যায়নি।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হতেই বিমানবিহারী তাঁর শ্যালককে তাড়া দিলেন, এবার তোমরা বেরিয়ে পড়ো, গাড়িতে কম সময় তো লাগবে না! সন্ধে হয়ে গেলে রাস্তায় যদি কোথাও গাড়ি খারাপ হয়ে যায়?

বিমানবিহারী আগে এরকম ভীতু ছিলেন না। বাড়িতে আগুন লাগার ঘটনার পরেই খুব দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

গাড়িতে বেশ গল্প করতে করতে আসা হচ্ছিল। পলাশীর কাছে উঠলো কালবৈশাখীর ঝড়। ফাঁকা রাস্তার দু’ পাশে মাঠ, বিকেলবেলাতেই এমন মিশমিশে কালো আকাশ অলি কখনো দেখেনি। সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছে ঠিক যেন সমুদ্রে জাহাজ যাওয়ার মতন। হাওয়ার দাপটে মনে হচ্ছে যেন গাড়িটা দুলে দুলে উঠছে, যে-কোনো সময়ে উল্টে যাবে। সমস্ত কাচ তুলে গাড়িটা এক জায়গায় থামিয়ে রাখা হলো। বড় গাছপালা থেকে অনেক দূরে। একটু আগেই ওরা রাস্তার ওপর একটা শিরীষ গাছের ডাল ভেঙে পড়তে দেখেছে।

শান্তিমামা বেশ মজার মানুষ। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যাবার বদলে তিনি। স্টিয়ারিং হুইল চাপড়ে চাপড়ে গান ধরলেন, ঝড় নেমে আয়, ওরে আয় রে আমার শুকনো পাতার ডালে ডালে…

রীতা মামীমা চোখ গোল গোল করে বললেন, এখন কী হবে? এই ঝড় যদি সহজে না থামে?

শান্তিমামা বললেন, তাতেই বা কী এমন হবে? আমরা সারা রাত এখানে থেকে যাবো!

রীতা মামীমা বললেন, যদি গাড়িটা শুদু উড়িয়ে নিয়ে যায়?

শান্তিমামা হেসে উঠে বললেন, সেটা হবে একটা ওয়ার্ড রেকর্ড! আকাশ পথে অ্যাম্বাসেডর গাড়ি! বিড়লার অপূর্ব কৃতিত্ব! একই সঙ্গে গাড়ি ও এরোপ্লেন! তোমার মাথাও খেলে বটে, ঝড়ে কোনদিন গাড়ি উড়ে গেছে এমন শুনেছো?

ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন পড়ছে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। গাড়ির ছাদে যেন অনেকগুলো কাক একসঙ্গে দৌড়চ্ছো। রাস্তায় আর একটাও গাড়ি নেই।

আরও একটা গান গাইতে গাইতে হঠাৎ মাঝপথে থেমে গিয়ে শান্তিমামা বললেন, অলি, তোদের বাড়িতে আগুনটা কে লাগালো বল তো? আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা পলিটিক্যাল নয়। কৃষ্ণনগরে কোনো ছেলের সঙ্গে তোর প্রেম-ট্রেমের ব্যাপারে কোনো ঝগড়া হয়নি তো?

অলির বদলে রীতা মামীমাই বললেন, যাঃ, কৃষ্ণনগরে আবার কার সঙ্গে ওর প্রেম হতে যাবে?

শান্তিমামা ভুরু কুঁচকে বললেন, আবার মানে? অলির কী একটা প্রেম অল রেডি হয়ে গেছে নাকি?

–জামাইবাবুর এক বন্ধু, সাব জজ, তাঁর ছেলে অতীনের সঙ্গে অলি তোর ভাব ছিল না? সেই ছেলেটি এখন কোথায় রে, অলি?

–অলি এবার মৃদু গলায় বললো, সে এখন অ্যামেরিকাতে!

–কী করতে গেছে রে? চাকরি করছে, না পড়াশুনো?

–কেমিস্ট্রিতে পি-এইচ ডি করছে।

শান্তিমামা বললেন, কেমিস্ট্রিতে পি-এইচ ডি করার জন্য আমেরিকায় যাবার দরকারটা কী ছিল? সে যাকগে, অলির আর একটা বন্ধু থাকলেও কৃষ্ণনগরের কোনো ছেলে ওর প্রেমে পড়তে পারে না? একবার আমার নার্সিং হোমে একটা কেস এসেছিল, বুঝলি অলি, বহরমপুরের একটা ছেলে এক উকিলের মেয়েকে ভালোবাসতো, ছেলেটা একটু মাস্তান টাইপের, উকিলবাবু তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে তো রাজিই নয়, মেয়েকে মিশতেও বারণ করে দিলেন, তারপর সেই ছেলেটা একদিন উকিলবাবুকে মিস করে তার প্রেমিকার মামার মুখে অ্যাসিড বা ছুঁড়ে মারলো! সেই মামা ভদ্রলোকের একটা চোখ তো বাঁচানোই গেল না। বুঝে দ্যাখ ব্যাপারটা অলি, তোর প্রেমে কেউ ব্যর্থ হয়ে আমার পেটে বসিয়ে দিল ছুরি! দিনকাল হয়েছে এই রকম।

নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলো শান্তিডাক্তার।

তারপর বললো, ঝড় অনেকটা কমেছে, নাও লেস স্টার্ট এগেইন!

খুব তোড়ে বৃষ্টি পড়ছে বলে রাস্তার সামনের দিকটা প্রায় কিছুই দেখা যায় না। গাড়ি চলছে খুব আস্তে। পেছনের সীটে বসেছে অলি আর রীতা মামীমা। গাড়ির মালিক নিজে গাড়ি চালালে বাড়ির কোনো লোককে সামনের সীটে বসতে হয়, এটাই নিয়ম, কিন্তু সামনের সীটে রাখা আছে একগাদা পেঁয়াজ কলি আর গোটা তিনেক লাউ, গাড়ির পেছনেও ভরে দেওয়া হয়েছে অনেকগুলো ঝুনো নারকোল। এসব অলিদের কৃষ্ণনগরের বাড়ির বাগানের ফসল।

রীতা মামীমার ছেলেমেয়ে কিছু হয়নি, তাঁর চেহারা অল্পবয়েসী তন্বীর মতন। শান্তিমামা মোটাসোটা ভারিক্কী ধরনের মানুষ, যদিও স্বভাবটা অনেকটা ছেলেমানুষ ধরনের। অলি তাকে কক্ষনো গম্ভীর সুরে কথা বলতে শোনেনি।

রীতা মামীমা এক সময় বললেন, অলি, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো। তুমি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছো, খুব ভালো লাগছে, কিন্তু তুমি হঠাৎ বহরমপুরে আসার জন্য জেদ ধরলে কেন? এখানে কি তোমার বিশেষ কোনো কাজ আছে? কারুর সঙ্গে দেখা করতে হবে?

শান্তিমামা বললেন, এই রে, তুমি ওকে একটা পার্সোনাল ব্যাপার জিজ্ঞেস করে ফেললে? মেয়েটাকে তো আমি বাচ্চা বয়েস থেকে দেখছি, মিথ্যে কথা বলতে গেলেই ওর চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। তোতলাতে শুরু করে। খুব প্রাইভেট কিছু হলে তোকে বলতে হবে না রে, অলি!

অলি বললো, ছোটমামা, তোমাকে আর মামীমাকে আমি বলবো ঠিকই করেছিলুম। কিন্তু তোমরা প্লীজ বাবাকে কিছু জানিও না। বহরমপুর জেলে একজনের সঙ্গে আমাকে একটু দেখা করতে হবে!

–বহরমপুরের জেলে…তার মানে পলিটিক্যাল প্রিজনার কে?

–আমাদের একজন বন্ধু।

–আমাদের বন্ধু মানে? আমরা কি তাকে চিনি?

–না, তোমরা ঠিক চেনো না।

রীতা মামীমা বললেন, সেই অতীনের কোনো বন্ধু। তার মানে নকশাল। অতীন তো কী একটা বড় রকম চার্জে পড়েই আমেরিকায় পালিয়ে গেছে না?

অলি চমকে রীতা মামীমার দিকে তাকালো। আজকাল আর কারুকে কিছু বলার দরকার হয়। সবাই সব কিছু জেনে যায়। শান্তিমামা রীতা মামীমারা মাঝে মাঝে কলকাতায় আসেন, হয়তো বাবলুদাকে দু একবার দেখেছেন তাদের বাড়িতে, যদিও বাবলুদার বিষয়ে ওদের সঙ্গে

অলির কোনোদিন কোনো কথাই হয়নি!

শান্তিমামা বললেন, নকশাল প্রিজনারের সঙ্গে দেখা করবি, সে তো আগে থেকে পারমিশান। করাতে হয়। এমনি এমনি তো দেখা করতে দেবে না!

অলি বললো, আমার পারমিশানের চিঠি আছে। শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটে…তোমরা যদি হঠাৎ চলে না আসতে কৃষ্ণনগরে, তা হলে বাবাকে না বলে আমাকে একাই আসতে হতো।

–অলি, তুই বুঝি পাটি করিস? তোর মতন এরকম নরম-সরম মেয়েও যে ভেতরে

–না। আমি পার্টি করি না। বিশ্বাস করো। একজন আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। গাড়ির ড্যাস বোর্ড থেকে একটা রামের পাঁইট বার করে গলায় ঢালবার আগে শান্তিমামা বললেন, আমি একটু খাচ্ছি, অলি, তুই কিছু মনে করবি না তো?

রীতা মামীমা তাড়না দিয়ে বললেন, এই, তুমি ড্রিংক করছো যে এক্ষুনি? নার্সিং হোমে যেতে হবে না?

–আজ পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত নটা বেজে যাবে। আজ আর নার্সিং হোমে যাওয়া যাবে। শুভংকরের ডিউটি আছে, ও ম্যানেজ করবে।

গলায় খানিকটা রাম ঢেলে শান্তিমামা বললেন, তোকে একটা ঘটনা বলি, অলি! রীতা, সেই যে, সেই ডিসেম্বরের শনিবার রাত্তিরের ব্যাপারটা!

রীতা মামীমা বললেন, ওঃ, ভাবলেও এখনও আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়!

–ওরা কিন্তু ব্যবহার খারাপ করেনি, যাই বলো! শোন, অলি, সেটা এই তো মাস তিনেক আগের ঘটনা। ডিসেম্বরের শেষ শনিবার। ডি এম-এর বাংলোয় আমি তাশ খেলতে গেসলুম। বেশ শীত পড়েছিল সে রাতে। তাশ খেলা ভাঙলো যখন, তখন রাত পৌনে বারোটা। রীতাকে বলা ছিল, ফিরতে দেরি হবে। তাশ-টাশ খেলে আমি গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছি, তারপর পাঁচ মিনিটও হয়নি, হঠাৎ আমার কাঁধে ঠেকলো একটা পাইপগানের নল। ওরা দু’জন গাড়ির পেছনের সীটের তলায় শুয়ে ছিল। ভাব তুই ওদের সাহস, ডি এমের বাংলোর সামনে গাড়ি পার্ক করা, সেখানে সেন্ট্রি-ফেন্ট্রি থাকে, তারই মধ্যে ওরা কী করে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে শুয়ে ছিল। কতক্ষণ ধরে শুয়ে ছিল তাই বা কে জানে! ওদের ঐ সাহসের জন্যই আমি মনে মনে বললুম, জিতা রহো বেটা!

রীতা মামীমা বললেন, বাজে কথা বলো না! তোমার নিশ্চয়ই তখন ভয়ে প্রাণ উড়ে গিয়েছিল!

শান্তিডাক্তার বললেন, হ্যাঁ, ভয় পেয়েছিলুম ঠিকই। একবার ভাবলুম, এবারে রীতা বিধবা হলো। অপারেশন টেবলে আমার হাতে কত লোক খতম হয়েছে, এবারে আমিও খতম। কিন্তু মনে মনে ছেলেগুলোর সাহসেরও তারিফ করেছিলুম। এটাও ঠিক! ওদের মধ্যে একজন বেশ ভদ্রভাবেই বললো, ডাক্তারবাবু, আমাদের একজন পেশেন্টকে দেখতে যেতে হবে। কিছু মনে করবেন না, আপনার চোখটা আমরা বাঁধবো, আপনি সরে বসুন! আমরা গাড়ি চালাবো।

রীতা বললেন, না, তুমি ভুল বলছো! ওরা তোমার চোখ বাঁধলো গঙ্গার ধারে নিয়ে গিয়ে।

–ও হ্যাঁ। প্রথমে ওদের একজন আমার গাড়িটা চালাবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই সময় আমার গাড়িটার যখন তখন স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। গাড়িও তো অনেকটা ঘোড়ার মতন, ঠিক চেনা হাতের ছোঁয়া ছাড়া চলতে চায় না। গঙ্গার ধার পর্যন্ত আমিই চালিয়ে নিয়ে গেলুম। তারপর গাড়ি থেকে নামিয়ে আমার চোখ বাঁধলো একটা কালো কাপড়ে। সেখান থেকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল প্রায় পনেরো মিনিট। অত রাতে, শীতের মধ্যে ওদিকে আর লোক নেই তো। একটাও। আমি তখন কী ভাবছি বল তো? এরা সাধারণত একেবারে শেষ সময়ে ডাক্তার ডাকে। অনেক সময়ই সে রুগীর আর আশা থাকে না। ডাক্তারের হাতে রুগী মারা গেলে ডাক্তারের দোষ হয়। ওদের হাতে বন্দুক পিস্তল আছে, রাগে ঝড়াস করে গুলি চালিয়ে দেবে আমার পেটে। আজ রীতার বিধবা হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। আমি তখন মনে মনে আমার টাকা পয়সা উইল করে যাচ্ছি, আর মনে মনে বলছি, রীতা, তুমি আবার বিয়ে করো। তোমার চেহারা এখনও সুন্দর আছে।

–অ্যাই বাজে কথা বলো না! এই সবগুলো তুমি বানাচ্ছো!

–সত্যিই এই সবই ভাবছিলুম। চোখ বন্ধ থাকলে তো কিছু দেখার উপায় নেই, শুধু ভেবে যেতে হয়! একটা পড়ো বাড়িতে ঢুকিয়ে তো আমার চোখ খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কে যেন একজন বললো, এত দেরি করে ফেললি, সব শেষ! রীতার কপালে দ্বিতীয় বিয়ে নেই। আমি তার কী করবো? আমি পৌঁছোবার আগেই ওদের পেশেন্ট মারা গেছে। তখন আর আমাকে দোষ দেয় কী করে? আমাকে বললো, ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিতে। লিখলুম। যে মারা গেছে, তার নাম মানিক ভটচাজ। সে ওদের একজন বড়–গোছের লীডার!

অলি ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলো, কী নাম বললেন? চেহারাটা মনে আছে আপনার?

–আমি শুধু হাতটা তুলে ছুঁয়ে দেখেছি। মুখ দেখার দরকার হয়নি। ওরা সবাই মানিকদা, মানিকদা বলে খুব কান্নাকাটি করছিল। অবশ্য একজন আমাকে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল। ওফ, সেই একখানা রাত্তির গেছে বটে! আগে অতটা ভয় পাইনি বোধ হয়, কিন্তু ওরা যখন গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল, বুঝলুম যে আমি এ যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেছি, আর কোনো ভয় নেই, তখনই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সে এক পিকিউলিয়ার ফিলিং। গাড়ি আর স্টার্ট দিতেই পারি না।

গাড়ির মধ্যে অন্ধকার। তাতে অলির চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। তার কান্নায় কোনো শব্দ নেই। অলি স্টাডি সার্কেলে বেশীদিন যায়নি, ওদের দলের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখেনি, কিন্তু মানিকদাকে সে সত্যিই শ্রদ্ধা করতো। শুধু শ্রদ্ধাই নয়, মানিকদাকে দেখলেই কেমন যেন মায়া লাগতো। মানিকদা নেই? অত নরম মনের একজন মানুষ, অতীন-কৌশিকরা প্রায়ই বলতো, মানিকদা যেন ওদের মায়ের মতন!

সারা পথ অলি আর কোনো কথা বলতে পারলো না।

পরদিন যথা সময়ে সে গেল কৌশিকের সঙ্গে দেখা করতে।

একটা ছোট ঘরের মাঝখানটায় আগে ছিল শুধু লোহার গরাদ, এখন জাল দিয়েও ঘিরে দেওয়া হয়েছে। কোনো জিনিস দেবার বা নেবার উপায় নেই। জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অলি যে চিঠি পেয়েছিল, তাতেও লেখা ছিল যে প্রিজনারের জন্য কোনো উপহার আনা চলবে না।

সেই ঘরের দরজার কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে, সে কথাবার্তা শুনবে।

এক মুখ দাড়ি হয়েছে কৌশিকের, মাথায় এত বড় বড় চুল যে নিশ্চয়ই উকুন আছে। চোখ দুটো ও টিকোলো নাক দেখে চেনা যায় কৌশিককে। কপালের রংটাও যেন কালো হয়ে গেছে।

ঘরে ঢুকে কৌশিককে দেখা মাত্রই অলির চোখ ঝাঁপসা হয়ে এলো। কিন্তু তাকে হাসি মুখে কথা বলতে হবে।

অলির খুব অভিমান হলো বাবলুদার ওপর। বাবলুদা যেন স্বার্থপরের মতন একা পালিয়ে গেছে। যে দেশটাকে সে সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করতো, সেই দেশে সে এখন টাকা রোজগার করছে, লাল রঙের গাড়ি কিনেছে, উইকএন্ডে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে যায়। আর তার প্রাণের বন্ধু কৌশিক এই বহরমপুরের জেলে

কৌশিকই প্রথমে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছো অলি?

অলি কিছু না বলে মাথাটা হেলালো শুধু।

কৌশিক আবার জিজ্ঞেস করলো, বুলুদির কাছ থেকে চিঠিপত্র পাও? বুলুদির ছেলে খুব অসুস্থ শুনেছিলুম।

বুলুদি নামে কেউ নেই। অলিকে সব আন্দাজে বুঝে নিতে হবে। হয়তো বুলুদি মানে বাবলুদা!

–হ্যাঁ, চিঠি পেয়েছি। এখন ভালো!

–তোমাদের বাগানে লাল গোলাপ ফুল ফুটেছে এবার? ইস, কতদিন যে লাল গোলাপ দেখিনি। একটা আনতে পারলে না?

লালগোলাপ মানে লালবাজার। পমপমকে লালবাজারে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন জেরা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে শারীরিক অত্যাচার। মাঝখানে রটে গিয়েছিল যে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পমপম পাগল হয়ে গেছে। সেই খবরটা দিতেই অলির এখানে আসা। পমপমের অসম্ভব মনের জোর। পমপম ফিটের রুগী হবার ভান করে হাসপাতালে গিয়েছিল। পি জি হাসপাতালে পমপমের সঙ্গে অলি দেখা করেছিল একদিন। পমপম ভালো আছে। পমপমই অলিকে অনুরোধ করেছিল যে-কোনো ভাবে হোক একবার কৌশিকের সঙ্গে দেখা করতে।

সে বললো, না, এবার সব লালগোলাপ ফুরিয়ে গেছে। সাদা ফুটেছে কয়েকটা।

গেটের সামনে দাঁড়ানো লোকটির ঠোঁটে মৃদু হাসি। সে জানে যে এসব অর্থহীন কথার অন্তরালে অন্য কোনো অর্থ আছে। হয়তো মনে মনে টুকে নিচ্ছে কথাগুলো। পরে ডি-কোড করবার চেষ্টা করবে!

দু একটা সাধারণ কথা বলার জন্যই অলি জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে এরা কী খেতে-টেতে দেয়? পেট ভরে?

কৌশিক বললো, আমরা তো এখানে রান্না করে খাই, জানো না?

–তোমাদের কি শিগগিরই কোর্টে প্রোডিউস করবে?

–সেরকম কিছু শোনা যাচ্ছে না।

অলি আর একটা কথা চিন্তা করলো। ছোটমামা বলেছিলেন, জেলের ডাক্তারের সঙ্গে তাঁর চেনা আছে। তিনি তাঁকে বলে কৌশিককে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিতে পারেন। তা হলে ও স্পেশাল ডায়েট পাবে। কিছুটা আরামে থাকবে। কিন্তু অলির ধারণা, সেরকম চেষ্টা করা হলেও কৌশিক একা নিজের জন্য আলাদা কোনো সুযোগ নেবে না।

তবু সে জিজ্ঞেস করলো, তোমার যে পেটে ব্যথা হতো খুব? আলসার কিনা দেখিয়েছো?

কৌশিক সেটা উড়িয়ে দিয়ে বললো, এখন ভালো আছি। ব্যথা-ট্যাথা কিছু নেই। ওসব সেরে গেছে।

তারপর অলির চোখের দিকে চোখ রেখে কৌশিক জিজ্ঞেস করলো, আমার মা কেমন আছে? মায়ের সঙ্গে তুমি কি দেখা করে এসেছো?

কৌশিকদের বাড়িতে অলি যায় নি বটে, কিন্তু তার মা সম্পর্কে বিশেষ খারাপ কোনো খবর শোনে নি। এখনকার দিনে কোনো ছেলে যদি নকশাল হিসেবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তাহলে তার মা নিশ্চয়ই রাত্তিরে ঘুমোতে পারেন না। সুতরাং কৌশিকের মা নিশ্চয়ই ভালো নেই, তবে বেঁচে আছেন।

অলি বললো, তোমার মায়ের শরীর সুস্থ আছে।

কৌশিক আবার জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে? তিনি কিছু বলেছেন?

অলি এবার বুঝতে পারলো, কৌশিক নিজের মায়ের কথা জানতে চাইছে না। বাবুলদা-কৌশিকরা যাঁর সম্পর্কে বলতো আমাদের মায়ের মতন,সেই মানিকদার কথা ও জানতে চাইছে। কিন্তু সেই নামটা উচ্চারণ করা যাবে না।

এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবে অলি? সে কি মিথ্যে কথা বলবে? তার চোখে আবার জল আসছে। কিন্তু কৌশিকের সামনে কিছুতেই দুর্বলতা দেখালে চলবে না।

এমনও তো হতে পারে, অলি প্রশ্নটা বুঝতে পারলো না। মা মানে পার্টির হেড মনে করাও সম্ভব। চারু মজুমদার এখনও ধরা পড়েননি।

অলি জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, ভালো আছেন। তোমার মা ভালো আছেন!

০৬. অতীনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও

অতীনের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও সিদ্ধার্থ তাকে প্রায় জোর করেই নিয়ে গেল শান্তাবৌদির বাড়িতে।

শান্তাবৌদি ইলিশ মাছ খাওয়াবার নেমন্তন্ন করেছেন, ইলিশ মাছের নাম শুনেও যেতে রাজি হয় না, অতীন কি এমনই পাষন্ড? বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে থাকা অতীনের গায়ে একটা জামা ছুঁড়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বললো, আর কিছুদিন থাক তারপর বুঝবি। এদেশে আমাদের বাঙালীত্ব বলতে টিকে থাকে শুধু ইলিশ মাছ, দুর্গা পুজো আর রবীন্দ্রনাথ। এই নিউ ইয়র্কে একমাত্র শান্তাবৌদির বাড়িতেই ঐ তিনটে জিনিস পাবি!

বাঙাল পরিবারের ছেলে হলেও অতীনের ইলিশ মাছের প্রতি লোভ নেই। সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোনোরকম মাছ না খেলেও তার কিছু আসে যায় না, ভাতের বদলে স্যাণ্ডুইচ বা হ্যামবার্গার খেয়ে সে দিব্যি চালিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া নতুন কারুর সঙ্গে আলাপ করতে সে একেবারেই আগ্রহ বোধ করে না। শান্তাবৌদি নামে এক অচেনা মহিলার বাড়িতে সে কেন। যাবে?

সিদ্ধার্থ এসব ওজর আপত্তিতে কানই দিল না। শান্তাবৌদিকে সে জানিয়ে দিয়েছে যে তার সঙ্গে একজন বন্ধু থাকে, শান্তাবৌদি বিশেষ করে বলে দিয়েছেন সেই বন্ধুটিকে নিয়ে আসতে।

গজগজ করতে করতে উঠে বসে অতীন বললো, শনিবার দিনটা শুধু শুয়ে শুয়ে কাটাবো তারও উপায় নেই? গাদা গুচ্ছের প্যান্ট-শার্ট-কোট–জুতো-মোজা পরে বেরুতে কারুর ভালো। লাগে?

সিদ্ধার্থ হাসতে হাসতে বললো, তুই গ্যেটের ‘পোয়েট্রি অ্যান্ড লাইফ পড়েছিস?

–না, আমি কবিতা-টবিতা কিছু পড়িনি ভাই!

–এটা কবিতা নয়, প্রবন্ধ। তাতে গ্যেটে এক জায়গায় বোরডমের একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, একজন ইংরেজ একদিন ঝোঁকের মাথায় আত্মহত্যা করে ফেললো, তার কারণ প্রত্যেকদিন নিয়মমাফিক জামা কাপড় পরা আর খোলা তার সহ্য হচ্ছিল না। সভ্যতার এই তো এক জ্বালা ভাই? তাও তো আমরা ইংরেজদের মতন নেমন্তন্ন বাড়ি যেতে হলে ফর্মাল ইভনিং ড্রেস পরি না, গলায় কালো বো বাঁধি না। তুই ইচ্ছে করলে তোর পাজামা পাঞ্জাবির।

ওপর ওভারকোটটা চাপিয়ে নিতে পারিস!

সিদ্ধার্থ অবশ্য একটু বেশী সাজ পোশাকই করলো। একটা সিল্কের সার্টে লাগালো ঝুটো মুক্তোর কাফ লিংক। টাইয়ের বদলে গলায় কায়দা করে জড়িয়ে নিল একটা বাটিকের কাজ করা স্কার্ফ।

রাস্তায় বেরিয়ে সিদ্ধার্থ অতীনকে দশটা ডলার দিয়ে বললো, কারুর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গেলে সঙ্গে কিছু নিয়ে যাওয়া উচিত। তুই লিকার স্টোর থেকে এক বোতল ওয়াইন কিনে নিয়ে আয়, আমি সামনের দোকান থেকে কিছু ফুল কিনে নিচ্ছি।

অতীন পেছন ফিরে পা বাড়াতেই সিদ্ধার্থ ডেকে বলল, এই, কী ওয়াইন আনবি বল তো? অতীন নির্বিকার মুখে জিজ্ঞেস করলো, কী ওয়াইন? দশ-ডলারের মধ্যে যা পাওয়া যায়।

সিদ্ধার্থ হেসে বললো, বাঙাল আর কাকে বলে! এতদিন ইংলন্ডে কাটিয়ে এলি, ওখানে ওরা তোকে কিছু শেখায়নি? একটা যে-কোনো ওয়াইন নিলেই হলো? ইলিশ মাছের নেমন্তন্ন না? সাদা আমিষের জন্য সাদা মদ। এক বোতল বোদো হোয়াইট ওয়াইন নিয়ে আয়।

সিদ্ধার্থ কিনলো এক গুচ্ছ লালগোলাপ। ওয়াইনের বোতলের চেয়েও তার দাম বেশী। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালো এইটথ স্ট্রিটের মোড়ে। সিদ্ধার্থের এক বন্ধু সমীর তাদের এখান থেকে তুলে নেবে।

অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোর ঐ শান্তাবৌদির স্বামী কী করেন? সিদ্ধার্থ বললো, শান্তাবৌদির হাজব্যান্ড হলেন পাঁচুদা। একেবারে নিপাট ভালোমানুষ। পাঁচুদা আমাদের শিবপুর থেকে পাস করা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু আমি প্রায়ই ভাবি, ঐ গোবেচারা মানুষটি শিবপুরের হোস্টেলে পাঁচটি বছর কাটালেন কী করে! পাঁচুদা এক ঘণ্টায় একটার বেশী কথা বলেন না। ওদের বাড়িটাকে কেউ পাঁচুদার বাড়ি বলে না, সবাই বলে শান্তাবৌদির বাড়ি। শান্তাবৌদি গান গাইতে পারেন। এখানে বাঙালীদের থিয়েটার হলে শান্তাবৌদি বাঁধা হিরোইন। আবার লোককে ডেকে ডেকে খাওয়াতেও ভালোবাসেন! ওঁদের বাড়ি তো কুইন-এ, শান্তাবৌদিও এখনকার বাঙালীদের কুইন, মক্ষিরানীও বলতে পারিস।

–আমি ওখানে গিয়ে কী করবো বল ত, সিদ্ধার্থ? নিশ্চয়ই আরও অনেক লোক থাকবে, কারুকে চিনি না…

–এইভাবেই তো চোনাশুনো হয়।

–আমার শরীরটা সত্যি ভালো লাগছে না রে! আমি বাড়ি ফিরে যাই। আমার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।

–একটা থাপ্পড় খাবি, অতীন। বলছি না, শান্তাবৌদির ওখানে গেলেই তোর জড়তা কেটে যাবে।

অতীন সিদ্ধার্থর চোখের দিকে চোখ রেখে অদ্ভুতভাবে হাসলো। কলকাতার কফি হাউসে তার বন্ধুদের মধ্যে সে ছিল স্বাভাবিক নেতা গোছের, তার মেজাজের জন্য সবাই তাকে ভয় পেত, এই সিদ্ধার্থ কোনোদিন তার মুখের ওপর একটাও কথা বলেনি।

সিদ্ধার্থ অতীনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো, চিয়ার আপ মাই বয়!

সমীর এসে পৌঁছলো কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটায়। দরজা খুলে দিয়ে বললো, চটপট উঠে পড়ো, এক্ষুনি টিকিট দিয়ে দেবে!

নো পার্কিং এলাকায় গাড়ি কয়েক মুহূর্ত থামানোই দারুণ অপরাধ, সিদ্ধার্থ দৌড়ে উঠে পড়লো সামনের সীটে, অতীন পেছনে।

আরও খানিকটা দূরে এসে সমীর একটা ড্রাগ স্টোরের সামনে থেকে তুললো তার স্ত্রী বাসবীকে। অতীনের সঙ্গে বাসবীর দেখা হয়নি আগে। সিদ্ধার্থ পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, আমার বন্ধু অতীন, ব্রিলিয়ান্ট স্টুডন্ট, কয়েক মাস আগে এসেছে…

অতীন শুধু একটা শুকনো নমস্কার করলো, সারা রাস্তা একটাও কথা বললো না অন্যদের সঙ্গে।

শান্তাবৌদিদের বাড়িটা একটা সুন্দর নির্জন রাস্তায়, সামনে এক টুকরো বাগান। গাড়ি থেকে নেমে অতীন প্রথমেই লক্ষ করলো, সেই বাগানে অনেকগুলো বেশ বড় বড় গোলাপ ফুটে আছে। সিদ্ধার্থও গোলাপ ফুলই এনেছে।

বেল বাজাবার পর দরজা খুললেন শান্তাবৌদি নিজে। বেশ লম্বা ও বড় চেহারার মহিলা, মাথায় অনেক চুল, দেবী প্রতিমার মতন মুখের গড়ন। প্রথমেই তিনি বকুনির সুরে বললেন, তোমরা এত দেরি করলে, সমীর নিশ্চয়ই লেট করেছে? এই বাসবী, তোমায় বলেছিলুম না। আগে এসে আমায় একটু হেল্প করবে!

বাসবী বললো, আমার যে আটটায় ছুটি, তবু আমি পনেরো মিনিট আগে অফ নিয়েছি!

অতীনের দিকে চেয়ে শান্তাবৌদি বললেন, আপনিই বুঝি সিদ্ধার্থর বন্ধু? এ কী, আপনি ওয়াইন এনেছেন কেন? প্রথম দিন আমার বাড়িতে-না না এটা খুব অন্যায় হয়েছে, এত ওয়াইন জমে গেছে আমাদের…

সিদ্ধার্থর হাত থেকে গোলাপের গুচ্ছ নিয়ে তিনি বললেন, আঃ কী সুন্দর! ঠিক এই পারল কালারটা আমার বাগানে কিছুতেই ফোঁটাতে পারি না!

শান্তাবৌদিকে দেখেই অতীনের মনে হলো, এই মুখখানা যেন তার পরিচিত। কোথায় দেখেছে আগে? ।

ড্রয়িংরুমে ছ’সাতজন নারী পুরুষ আগে থেকেই উপস্থিত। পুরুষরা বাসবীর জন্য উঠে দাঁড়ালো, শান্তাবৌদি বললেন, তোমরা নিজেরা পরিচয় করে নাও, আমি চট করে একবার কিচেন থেকে ঘুরে আসছি! বাসবী, একটু এসো না আমার সঙ্গে!

এ বাড়িতে ফায়ার প্লেস আছে, তারমধ্যে কাঠের আগুনের বদলে জ্বলছে একটা ইলেকট্রিক হীটার। তার এক পাশে সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামা পরে বসে আছেন এই পরিবারের কর্তা পাঁচুদা, মুখে পাইপ। সিদ্ধার্থ বসলো একটি কিশোরী মেয়ের পাশে। একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক অতীনকে ডেকে বসালেন নিজের কাছে। হাত তুলে নমস্কার করে তিনি বললেন, আমার নাম অমিয় মিত্র। আপনি দেশ থেকে নতুন এসেছেন বুঝি? দেশের খবর কী বলুন?

উল্টোদিক থেকে সিদ্ধার্থ বললো, অমিয়দা, ও হচ্ছে আমার কলেজের বন্ধু অতীন, এখানে। আসবার আগে বছর খানেক ইংল্যান্ডে কাটিয়ে এসেছে।

অমিয় মিত্র বললেন আঁ, ইংল্যান্ড! আমিও সেখানে ছিলাম, সেভেন ইয়ার্স, ওখানকার ওয়েদার আমার সুট করলো না, রোদ্দুর এত কম দেখা যায়, এত ঠান্ডা বরফ তো এখানেও পড়ে, কিন্তু ইংল্যান্ডে একেবারে ওয়েট কোল্ড…তা ছাড়া ব্রিটিশ জাতটা এখনো এত কনসিটেড, ওদের সঙ্গে মানিয়ে চলা…

সিদ্ধার্থ বললো, আসল কথাটা বলছেন না কেন অমিয়দা? ইংল্যান্ডের চেয়ে এখানে টাকা রোজগারের স্কোপ বেশী। অনেকেই এখন চান্স পেলে আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছে!

অমিয় মিত্র বললেন, যব স্যাটিসফ্যাকশান এখানে অনেক বেশী। ইফ ইউ ক্যান পুভ ইয়োর মেরিট অ্যান্ড এফিসিয়েন্সি, এখানে তুমি কাজ করার অনেক সুযোগ পাবে। রিসার্চের কাজ করতে গেলেও এখানে এতরকম সুবিধে আছে…

সিদ্ধার্থ আবার বললো, জব স্যাটিসফ্যাকশনের চেয়েও বড় কথা হচ্ছে টাকা! আমি অন্তত তাই বুঝি! পাউন্ডের থেকে ডলার অনেক স্ট্রং টনিক!

সমীর এসেই বার টেন্ডারের দায়িত্ব নিয়েছে। কার কী লাগবে, কার গেলাস খালি, এই সব দেখতে দেখতে সে অতীনের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে কী দেবো? স্কচ না বার্বন?

অতীন বললো, কিছু না!

কিশোরী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে বলতে চমকে মুখ তুলে সিদ্ধার্থ তাকালো তার বন্ধুর দিকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অতীন খুব বেশী মদ্যপান করছে, বাড়িতে একা একা বসে বোতল শেষ করে, তার হঠাৎ মদ্যপানে অরুচি! পাঁচুদার বাড়িতে সিভাস রিগ্যাল থাকে, ঐ বোতল কেনার সাধ্য তার বা অতীনের নেই। পাঁচুদার বাড়িতে যত ইচ্ছে খাওয়া যায়।

সিদ্ধার্থ বললো, অতীন তুই বীয়ার নিবি? ভালো ডাচ বীয়ার আছে।

অতীন আবার দুদিকে মাথা নাড়লো। এমনকি কোকাকোলা নিতেও সে রাজি হলো না। তার ইচ্ছে করছে না। এই সব পার্টিতে মদই হোক বা ঠান্ডা নরম পানীয়ই হোক, হাতে একটা গেলাস ধরে থাকাই রীতি, অতীন শুধু সিগারেট টানতে লাগলো। কারুর সঙ্গে আলাপ করার বদলে সে টেবিল থেকে তুলে নিল নিউজউইক।

সব পার্টিতেই একজন কেউ প্রধান বক্তা থাকে। এখানে সেই ভূমিকা নিয়েছেন অমিয় মিত্র। ইনি অন্যদের কথা বলার বিশেষ সুযোগই দেন না। এর কায়দাটি বিচিত্র। ইনি অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কিছু প্রশ্ন করেন, তারপর উত্তরটি শোনার আগেই সে বিষয়ে নিজে বলতে শুরু করে দেন।

এখন তিনি বলতে শুরু করেছেন প্রবাসীদের একটি অতি প্রিয় বিষয় নিয়ে। দেশের নিন্দে! অমিয় মিত্র দু’বছর আগে মাত্র তিন সপ্তাহের জন্য দেশে ঘুরে এসে এমনই শিহরিত হয়েছেন যে সেই সম্পর্কেই বলে যাচ্ছেন অনবরত। কলকাতায় গেলে ইংরিজি উচ্চারণ পর্যন্ত ভুলে যেতে হয়। ওখানকার ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ফ্যার হয় না, ফাস্ট হয়! অমিয় মিত্রর এক খুড়তুতে ভাই হিস্ট্রি অনার্স পড়ে, তার যা ইংরিজি উচ্চারণের বহর! কলকাতার রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, শিক্ষারও সেই একই রকম দুরবস্থা! নকশাল ছেলেরা স্কুল-কলেজ পোড়াচ্ছে, মাস্টারদের মারছে। লেখাপড়ার আর দরকার নেই।…কলকাতার বাতাসে নিশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হয়…

সিদ্ধার্থ দু’একবার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে তারপর কিশোরী মেয়েটির প্রতি বেশী মনোযোগ দিল। অন্য মহিলারা এক পাশে উঠে গিয়ে সুপার মার্কেটে কী কী জিনিসের সেল দিচ্ছে সেই বিষয়ে আলোচনা করছেন। পাঁচুদা পাইপ টানতে টানতে হাসছেন মুচকি মুচকি।

অতীন কোনো কথাই শুনছে না। সে যেন পৃথিবীর লাজুকতম ব্যক্তি।

শান্তাবৌদি আবার এ ঘরে এসে ঢুকতেই অতীনের মনে পড়লো, এই মুখখানা সে দেখেছিল অনেকদিন আগে, দেওঘরে। তখন অতীন খুব ছোট, একটা বেশ বড় বাড়িতে থাকতেন। বুলামাসি, শান্তাবৌদির মুখখানা অবিকল সেই বুলামাসির মতন। কিন্তু সেই বুলামাসিই এই শান্তাবৌদি হতে পারেন না, এতদিনে বুলামাসির অনেক বয়েস হয়ে যাবার কথা–একবার ত্রিকূট পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে দেখা হয়েছিল বুলামাসিদের সঙ্গে। অতীনের মনে পড়ে যাচ্ছে, দাদা খুব মুগ্ধভাবে তাকিয়ে থাকতে বুলামাসির মুখের দিকে, তখন বুঝতে পারেনি, অতীন এখন বুঝতে পারছে, দাদা বুলামাসির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, দাদার কবিতার খাতায় দেওঘরের পটভূমিকায় দুটো কবিতা বোধ হয় বুলামাসিকে নিয়েই। কোথায় গেল সেই কবিতার খাতা?

অতীন কি সেটা শিলিগুড়ি নিয়ে গিয়েছিল? নাকি ফুলদির কাছেই রয়ে গেছে? ঠিক মনে পড়ছে না। শিলিগুড়িতে নিয়ে গেলে, সেটা আর কোনোদিনই পাওয়া যাবে না। ফুলদির। কাছেই রাখা উচিত ছিল।

শান্তাবৌদি বললেন, খাবার কিন্তু রেডি। তোমরা গরম গরম খেয়ে নাও, ঠান্ডা হলে একেবারে ভালো লাগবে না।

অমিয় মিত্র তখন একটা লম্বা গল্পের মাঝখানে, তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হলো প্রায় জোর করে। ডাইনিং রুমে চলে এলো সবাই। টেবিলে এক সঙ্গে এতজন বসতে পারবে না, প্লেটে তুলে নিতে হবে। ধপধপে সাদা গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ইলিশ মাছ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি পদ টেবিলে সাজানো।

এদেশে এই ইলিশের নাম শ্যাড মাছ। সাহেবদের দেশে সব কিছুই বড় বড়, পদ্মা-গঙ্গার ইলিশের চেয়ে এই শ্যাডও আকারে বড় হয়, তিন কেজি সাড়ে তিন কেজি ওজনেরও পাওয়া যায়। শান্তাবৌদি জানালেন যে একটি ইটালিয়ান মাছওয়ালা তার দোকানে এই শ্যাড় মাছ এলেই শান্তাবৌদিকে ফোন করেন। এই মাছ যে বাঙালীদের অতি প্রিয় তা ইটালিয়ানরাও জেনে গেছে।

ভাতের সঙ্গে খানিকটা ডাল নেওয়ার পর হঠাৎ অতীন ঠিক করে ফেললো, সে ঐ মাছ খাবে না!

শান্তাবৌদি একটু পরেই অতীনের প্লেটের দিকে নজর দিয়ে বললেন, এ কী, আপনি মাছ নিলেন না? দাঁড়ান আপনাকে আমি পেটির মাছ তুলে দিচ্ছি।

অতীন প্লেটটা সরিয়ে নিয়ে বললো, আমি ইলিশ মাছ খাই না। আমার গন্ধ লাগে।

শান্তাবৌদির মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তাঁর নিজের হাতে রান্না করা মাছকে প্রত্যাখ্যান। করা যেন তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত অপমান।

তিনি সিদ্ধার্থর দিকে তাকিয়ে বললেন, এ কী, সিদ্ধার্থ, তুমি একথা আমাকে আগে বলোনি? আমি ইচ্ছে করে আজ মাংস করিনি, উনি কী দিয়ে খাবেন? ফ্রিজে স্যামন মাছ আছে, একটু দাঁড়ান, কয়েকখানা ভেজে দিচ্ছি!

সিদ্ধার্থও অবাক হয়ে গেছে। কলকাতায় অতীনদের বাড়িতে সে তিন-চারদিন ভাত খেয়েছে, অতীনকে সে ইলিশ মাছ খেতে দেখেছে। তবু অতীনের হঠাৎ মত পরিবর্তনে সে কোনো জোর করলো না। সে বললো, শান্তাবৌদি, আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম। অতীন। নিরামিষ খাওয়া প্র্যাকটিস করছে। ঐ তো ফুলকপির তরকারি, বেগুন ভাজা, পটল ভাজা রয়েছে, এতেই ওর হয়ে যাবে। আপনি পটল কোথা থেকে জোগাড় করলেন?

অন্যদের চেয়ে আগে খাওয়া শেষ করে প্লেট নামিয়ে রেখে অতীন চলে এলো লিভিংরুমে। তাড়াতাড়ি সে একটা সিগারেট ধরালো, সে বুঝতে পারছে, কারুর সঙ্গে আলাপ না করা, কথা না বলা, খাওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প-হাসি-ঠাট্টায় যোগ না দেওয়া, শান্তাবৌদির রান্নার প্রশংসা না করে চলে আসা, এসবই অস্বভাবিক ও অভদ্রতা। তবু কিছুতেই সে মন খুলতে পারছে না।

খাওয়ার ঘরে হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে। বোধ হয় সিদ্ধার্থ ফিসফিস করে অতীন সম্পর্কেই ওঁদের বলছে অনেক কিছু। যা খুশী বলুক।

… বাবা একদিন অনেক রাত্তিরে একজোড়া ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে। তা নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল মায়ের সঙ্গে। অতীনের তখন পরীক্ষা চলছে, না, পরীক্ষা আরম্ভ হয়নি বোধ হয়, দু’একদিন বাকি ছিল, কিন্তু অত রাতে ইলিশ-টিলিশ খেতে একদম ইচ্ছে করেনি তার, সে রাগারাগি করেছিল বাড়িতে ফ্রিজ নেই, সেই মাছ রেখে দেবার উপায় ছিল না, বাবা সব ফেলে দিয়েছিলেন–বাবা মনে দুঃখ পেয়েছিলেন…এখনও তো বাড়িতে ফ্রিজ নেই, বাবা অনেক টাকা ধার করেছেন তারজন্য–তিন-চার শো ডলার পাঠাতে পারলে একটা ফ্রিজ কেনা যায়-যতদিন না কলকাতার বাড়িতে একটা ফ্রিজ কিনে দেবার ক্ষমতা তার হবে, ততদিন সে ইলিশ মাছ কেন, আর কোনো মাছই খাবে না!

হাত থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা পড়ে গেল নরম পুরু কার্পেটে। তক্ষুনি নিচু হয়ে সিগারেটটা তুলে নেওয়া উচিত, কিন্তু সে তুলছে না, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। কার্পেটে আগুন ধরে যেতে দেরি হলো না, ধোঁয়া উঠছে, এক্ষুনি যে-কেউ এঘরে এসে পড়তে পারে, ধোঁয়া দেখে আঁতকে উঠবে, এদেশে সাংঘাতিক আগুন-ভীতি। শান্তাবৌদিকে খারাপ লাগেনি অতীনের, পাঁচুদার মুখেও একটা স্নিগ্ধ ভাব আছে, তবু কেন সে এদের বাড়ির দামি কার্পেট পোড়াচ্ছে?

পাশের ঘরে হঠাৎ সবাই একসঙ্গে হেসে উঠতেই অতীন চমকে উঠলো। এবারে সে তাড়াতাড়ি সিগারেটটা তুলে পা দিয়ে নেবাতে লাগলো আগুন। অনেকটা পুড়েছে, একটা আধুলির সাইজের কালো গোল গর্ত হয়ে গেছে। চোখে পড়বেই। অতীন তার সোফাটা টেনে এনে পোড়া জায়গাটা চাপা দিল। তারপর নিজে গিয়ে বসলো উল্টো দিকে।

সবচেয়ে আগে এ ঘরে এলেন পাঁচুদা। একেবারে অতীনের কাছে এসে নরম গলায় বললেন, এখনও হোম সিকনেস কাটেনি? আমারও মাঝে মাঝে…

অতি সাধারণ একটা কথা। তবু অতীনের মাথায় দপ করে জ্বলে উঠলো রাগ। বাড়ির কথা মনে পড়া, নিজের দেশের কথা মনে পড়া একটা অসুখ? সিকনেস?

কিছু উত্তর দিতে গেলেই অতীনের মুখ দিয়ে কঠিন কথা বেরিয়ে আসবে, তাই সে চুপ করে চেয়ে রইলো। পাঁচুদাও যেন উত্তর চাননি, চলে গেলেন নিজের আসনে।

অন্যরা এসে বেশ কিছুক্ষণ ধরে প্রশংসা করতে লাগলো মাছ রান্নার ও স্বাদের। শান্তাবৌদি ছাড়া আর কেউ অতীনের সঙ্গে যেচে কথা বললো না। অন্য মাছ বা মাংস রান্না করেনি বলে শান্তাবৌদির আফসোসের শেষ নেই, তরকারিও সেরকম কিছু ছিল না। অতীন যদি নিরামিষ পছন্দ করে তাহলে তিনি আর একদিন অতীনকে শুধু নিরামিষই রান্না করে খাওয়াবেন। অতীনকে আবার আসতেই হবে।

এরপর শান্তাবৌদি পর পর তিনখানা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন সকলের অনুরোধে।

অতীন খুব একটা গানের সমঝদার নয়, তবু সে বুঝতে পারলো, মহিলা ভালই গান জানেন। অনেকটা রাজেশ্বরী দত্তের মতন গলা। গান শুনতে শুনতে হঠাৎ অতীনের একটা কথা মনে পড়ে গেল। খাবার শেষ করার পর সে তার প্লেটটা টেবিলের নিচে রেখে দিয়েছিল। সেটা একটা অপরাধ হয়েছে। এ দেশে খাওয়ার পর নিজের বাসনটা মেজে দেওয়াই নিয়ম। ঝি-চাকর তো নেই, কে অন্যের এঁটো বাসন মাজবে?

তার প্লেটটা কি এখনো টেবিলের নীচে রয়ে গেছে? তাহলে এই বেলা মেজে দেওয়া উচিত। গানের মাঝখানে অতীন উঠে গেল ডাইনিং রুমে, না টেবিলের নিচে তার প্লেটটা নেই, এমনকি সিংকেও নেই। কে ধুয়েছে, শান্তাবোদি না সিদ্ধার্থ?

ডাইনিং রুমটা বেশ গরম। পাশের ঘরে গিয়ে গান শোনার বদলে এই ঘরে থাকাটাই তার কাছে আরামপ্রদ মনে হলো। এ বাড়িতে বসবার ঘরের বাইরে জুতো খুলতে হয়। সেই সময় অতীন মোজাও খুলে ফেলেছে বলে তার পায়ে শীত লাগছে।

খানিকবাদে বাসবী এসে দেখলো, সেই ঘরের ঠিক মাঝখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে অতীন। সোজা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে।

বাসবী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এখানে কী করছেন?

অতীন কড়াগলায় বললো, দেখতেই তো পারছেন, এমনিই দাঁড়িয়ে আছি।

বাসবীর ভুরু কুঁচকে গেল। এরকম উত্তর পেতে সে অভ্যস্ত নয়। সে বললো, আমরা এখন বাড়ি যাবো, আপনি যদি আমাদের সঙ্গে যেতে চান–

শুধু মাত্র যদি কথাটার জন্যই অতীন বললো, না, আমি আপনাদের সঙ্গে যাবো না। পরক্ষণেই সিদ্ধার্থ দরজার কাছ থেকে মুখ বাড়িয়ে বললো, এই অতীন, চল!

সিদ্ধার্থর কাছে অবশ্য জেদাজেদি করতে পারলো না অতীন, তাকে সমীরের গাড়িতেই উঠতে হলো। এবার সে বসলো সামনের সীটে। কিশোরীর মতন চেহারার মেয়েটি ঠিক কিশোরী নয়, তার নাম নীতা, সে পি-এইচ ডি’র ছাত্রী। তাকেও পথে নামিয়ে দিতে হবে, সিদ্ধার্থ বাসবী আর নীতার সঙ্গে পেছনে বসেছে, সিভাস রিগ্যাল অনেকটা পান করে বেশ ফুরফুরে নেশা হয়েছে তার। সে নীতার কাঁধে মৃদু চাপড় দিতে দিতে গান গাইছে, দেয়ার ইজ আ গোল্ড মাইন ইন দা স্কাই ফার অ্যাওয়ে, উই উইল ফাঁইন্ড ইট…

অন্যসময় সিদ্ধার্থ নানারকম বাংলা গান গায় কিন্তু বিলিতি মদের নেশা হলেই তার গলা দিয়ে ইংরিজি গান ছাড়া অন্য কিছু বেরোয় না।

নীতার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবার দরকার হলো না, সে নিজে থেকেই অতীনকে বললো, আপনি খুব অহংকারী, তাই নয়? কারুর সঙ্গে কথা বলছিলেন না!

সিদ্ধার্থ নীতার কাঁধে চাপ দিয়ে ইঙ্গিত করলো চুপ করতে। নীতা তবু বললো, আপনি সবার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন, আপনার চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই বোকা, আপনিই একমাত্র বুদ্ধিমান!

সিদ্ধার্থ বললো, আরে, তুমি জোর করে আমার বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া বাধাচ্ছো কেন? লিভ হিম আলোন!

নীতা ফস করে ঝেঝে উঠে বললো, হি হ্যাঁজ নো রাইট টু ইনসাল্ট শান্তাবৌদি? সাচ আ নাইস লেডি, এত যত্ন করে খাওয়ান…আপনার বন্ধুটি খাবার নামে একটা ফার্স করলেন, তারপর শান্তাবৌদির গানের মাঝখানে ঐ ভাবে উঠে যাওয়া কেউ কখনো যায়? শান্তাবৌদি দুঃখ পেলেও মুখে কিছু বললেন না!

বাসবী বললো, উনি গানের মাঝখানে ডাইনিং রুমে উঠে চলে গেলেন, আমি ভাবলুম, বুঝি আবার খিদে পেয়ে গেছে! যদি ওকে কিছু হেল্প করতে পারি, সেইজন্যে গিয়ে দেখি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কেন দাঁড়িয়ে আছেন, জিজ্ঞেস করতেই এমন ধমকে দিলেন আমাকে!

সিদ্ধার্থ বলল, হ্যাঁরে অতীন, তুই অতক্ষণ ডাইনিংরুমে কী করছিলি? সত্যি খিদে পেয়েছিল নাকি?

সমীর জিজ্ঞেস করলো, তুমি আমাদের সঙ্গে এসেছো, ফেরার সময় আমার গাড়িতে যাবে না। বলছিলে কেন?

অতীনের মনে হলো, এই গাড়ির অন্য চারজন এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে, তাকে উত্তর দিতেই হবে? ডাইনিং রুমে সে কেন গিয়েছিল তার মনে পড়ছে না এখন। কোনো ঘরের মাঝখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকাটা কি অপরাধ? সে উত্তর না দিলে এরা তাকে ছাড়বে না। সারা রাস্তা প্রশ্নবাণ দিয়ে তাকে খোঁচাবে। সত্যি সত্যি যেন ঐ চারজনের হাতে ধারালো অস্ত্র, তারা অতীনকে খোঁচাচ্ছে, অতীনের হাত-পা বাঁধা

সিদ্ধার্থ, বাসবী, সমীর, নীতা চার রকম গলায় বলতে লাগলো, কেন? কেন? কেন? কেন? অতীন, তুমি কেন ওটা করো নি? তুমি কেন ওটা করেছো?

অতীন ছটফট করতে লাগলো, দু’ হাতে কান চাপা দেবার চেষ্টা করলো। কোনো উত্তর দিতে পারছে না সে, প্রশ্নও সহ্য করতে পারছে না!

ঝট করে অতীন খুলে ফেললো সীটবেল্ট, তারপর গাড়ির দরজাটাও খুলে এক লাফ দিল রাস্তায়।

মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠলো!

সিদ্ধার্থ পাংশু মুখে, ফ্যাসফেসে গলায় বললো, মিরাকল! মিরাকল!

অতীন গাড়ির দরজার হ্যাঁন্ডেল খোলার চেষ্টা করতেই সমীরের পা যান্ত্রিকভাবেই চলে গিয়েছিল ব্রেকে। দরজাটা খুলে যেতেই সে পুরো ব্রেকে চাপ দেয়।

এরপর অনেকগুলি দৈবাৎ যোগাযোগে তারা বড় রকম দুর্ঘটনা থেকে বেঁচেছে। এরকম হঠাৎ ব্রেক কষায় গাড়ি উল্টে যেতে পারতো, তা না করে খানিকটা এদিক ওদিক বেঁকেছে। মাত্র। সমীরের গাড়ির ঠিক পেছনেই কোনো গাড়ি ছিল না, থাকলে সেই গাড়ি নির্ঘাৎ এসে ধাক্কা মারলে তাকে।

অতীন গড়িয়ে গেছে পাশের লেনে। সেখানে পর পর তিনটি গাড়ি, চাপা পড়ে ছাতু হয়ে যাবার কথা ছিল তার। কিন্তু প্রথম গাড়িটি শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষেছে, দ্বিতীয় গাড়িটা কিছুটা। দূরত্বে ছিল। সে ব্রেক কষলেও সামান্য ধাক্কা মেরেছে এসে প্রথম গাড়িতে, তৃতীয় গাড়ি মেরেছে তাকে।

সিদ্ধার্থ আর সমীর দু’জনেই দৌড়ে গেল অতীনের কাছে। একটা ক্যাডিলাক গাড়ির সামনের চাকা থেকে মাত্র দু’হাত দূরে পড়ে আছে অতীন। তার কোনো অঙ্গেরই কিছুমাত্র ক্ষতি হয়নি। সমীর ঠিক সময় ব্রেকে পা দিয়ে গতি কমিয়ে দিয়েছিল, নইলে ষাট-সত্তর মাইল গতিতে চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ার আঘাতেই সে মরে যেতে পারতো।

সিদ্ধার্থ তার বন্ধুকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করালো, কপালের একটা পাশ সামান্য ছড়ে যাওয়া। ছাড়া আর কিছুই হয়নি অতীনের।

ক্যাডিলাক গাড়ির ড্রাইভার নেমে এসে গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞেস করলো, কী হলো ব্যাপারটা? আমি প্রথমে ভাবলাম, তোমরা বুঝি একটা ডেডবডি ডিসপোজ অফ করছো!

সমীর তাকে প্রচুর ধন্যবাদ জানিয়ে বললো, আমাদের গাড়ির সামনের দরজাটা হঠাৎ খুলে গিয়েছিল, সেইজন্যই এই দুর্ঘটনা।

ক্যাডিলাক গাড়ির প্রৌঢ় ড্রাইভার এপাশে এসে সমীরের সেকেন্ড হ্যাঁন্ড ফোর্ড গাড়িটা দেখলো। সামনের দরজার লকটা পরীক্ষা করলো তিন চারবার। পুরোনো গাড়িতে একটু লড়ঝরে ভাব থাকেই। সে অতীনের দিকে তাকিয়ে বললো, ঈশ্বর আজ আমাকে খুনী হওয়ার দায় থেকে বাঁচালেন। তোমাকে মারলে আমার কোনো শাস্তি হতো না, কিন্তু মনে একটা দাগ তো থেকে যেত!

রাত পৌনে বারোটা হলেও রাস্তায় পর পর জমে যেতে লাগলো গাড়ি। পুলিশের গাড়িও এসে গেল অবিলম্বে। কোনো রকম চ্যাঁচামেচি, রাগারাগি, অন্যকে দোষারোপের ব্যাপার নেই, সবাই চুপচাপ। সমীরের গাড়ির ইনসিওরেন্স কম্পানির নাম ও নম্বর টুকে নিল পুলিশ। সমীর মাত্র দু পেগ হুইস্কি খেয়েছে, তাকে ড্রাংক ড্রাইভারও বলা যাবে না, অতীনের মুখেও মদের গন্ধ নেই। অতীনের বয়েসী একটি যুবক ইচ্ছে করে চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে লাফ মারবে, এটা ওদের কাছে অকল্পনীয়। একটুবাদেই পুলিশ ওদের ছেড়ে দিল।

মেয়ে দুটি আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। গাড়ি ছাড়ার পরও কেউ কোনো কথা বললো না।

একটু বাদে সিদ্ধার্থ বললো, তুই কী করে বেঁচে গেলি, অতীন, সেটাই মহা আশ্চর্য ব্যাপার। মিরাকুলাস এসকেপ ছাড়া আর কী বলা যায়? নেক্সট টাইম তোর যখন এরকম নাটক করার ইচ্ছে হবে, তুই ওয়াশিংটন ব্রীজ থেকে ঝাঁপ দিস, আমাদের এরকম বিপদে ফেলিস না।

সমীর বললো, এখন এসব কথা থাক, প্লীজ।

সিদ্ধার্থ তবু বললো, আমার মাথা গরম হয়ে গেছে! পুলিশ দেখলেই আমার…অতীন, তোকে আর একটা কথা বলে দিচ্ছি, এই সবার সামনে। আমি তোকে সাত দিনের নোটিস দিলাম, তুই আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে অন্য জায়গা খুঁজে নিবি। অনেক ঝাট সহ্য করেছি ভাই, আর না। তোকে আর আমি জায়গা দিতে পারবো না।

অতীন মুখ ঘুরিয়ে সিদ্ধার্থের দিকে চেয়ে হাসলো।

০৭. দরজা খোলার জন্য

দরজা খোলার জন্য ওভারকোটের বিভিন্ন পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে চাবি খুঁজতে লাগলো সিদ্ধার্থ। অতীনের কাছেও চাবি থাকে, কিন্তু সে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল ঘেঁষে। যেন ধরা-পড়া চোরের মতন মুখচোখ, তার দাড়িতে লেগে আছে রাস্তার ধুলো।

প্যান্ট-সার্ট-জ্যাকেট ও ওভারকোট মিলিয়ে দশ বারোটা পকেট, সব কটা পকেট খুঁজে চাবিটা পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত। ভেতরে এসে, আলো জ্বেলে রাগে গরগর করতে করতে সিদ্ধার্থ বললো, এমন দামি নেশা, শালা চৌপাট হয়ে গেল একেবারে। ভেবেছিলুম রাত্তিরটা থানায় কাটাতে হবে!

ওভারকোটটা খুলে সে ছুঁড়ে ফেললো বিছানার ওপর। তারপর উগ্রমূর্তিতে অতীনের দিকে ফিরে বললো, এবার বল, কেন ঐ কাণ্ডটা করতে গেলি? গাড়িতে দুটো মেয়ে ছিল, নইলে তোকে তখনই এমন পেটাতে ইচ্ছে করছিল আমার!

অতীন যেন সঙ্কোচ-গ্লানিতে সরু হয়ে গেছে। সে ওভারকোট খুললো না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকেই নীচু গলায় বললো, আমি এখনই চলে যাবো! জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে মিনিট দশেক লাগবে, সেইটুকু যদি সময় দিস

সিদ্ধার্থ বললো, চলে যাবি মানে? এত রাত্তিরে কোথায় যাবি?

অতীন বললো, সে আমার কোনো অসুবিধে হবে না। সাবওয়েতে রাত্তিরে শুয়ে থাকা যায়।

সিদ্ধার্থ তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল মাটিতে। জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বললো, ব্লাডি ইডিয়েট, আমার সঙ্গে মাজাকি হচ্ছে? এক্সপ্লেইন ইয়োর বিহেভিয়ার ফাস্ট। কেউ কি তোর সঙ্গে একবারও খারাপ ব্যবহার করেছে? তবু তুই সবাইকে অপমান করবি কেন?

–সিদ্ধার্থ, আমি এখন একটু ব্র্যান্ডি খেতে পারি?

–ব্র্যান্ডি? তোকে আর কিছু দেবো না। আমার কাবার্ড গুলো চাবি দিয়ে রাখবো। সব কিছুরই একটা লিমিট আছে। ছি ছি ছি ছি, আজ তুই যা করলি!

–সিদ্ধার্থ, আমার মাথাটা দুর্বল লাগছে। ঘুম পাচ্ছে। যদি কাল সকালে

–মারতে মারতে তোর আমি ঘুম ঘুচিয়ে দেবো আজ। তুই আজ যা সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলি আমাদের…

অতীন চেয়ারে বসে পড়ে ফ্যাকাসে গলায় বললো, কেন তুই আমাকে ঐ পার্টিতে নিয়ে গেলি। আমি যেতে চাইনি, তুই জোর করে…

সিদ্ধার্থ এগিয়ে এসে অতীনের চুল খামচে ধরে বললো, তোকে আমি শান্তাবৌদির বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অন্যায় করেছি। তোকে ইংল্যান্ড থেকে এখানে ডেকে আনাটাও আমার অন্যায় হয়েছে? আমার অ্যাপার্টমেন্টে কে থাকতে দিয়েছি, সেটাও আমার অন্যায়? তুই যদি মরতেই চাস, দেশে থেকেই মরতে পারতি না? এখানে একা একা যেখানে খুশী গিয়ে মর না! মরার জায়গার অভাব আছে? আমাদের জড়াতে চেয়েছিলি কেন?

অতীন বললো, আমি চেষ্টা করলেও মরতে পারি না।

অতীনের চুল ধরে টানতে টানতে জানলার কাছে নিয়ে এসে, জানলাটা খুলে দিয়ে, সিদ্ধার্থ বললো, লাফা, এখন থেকে নীচে লাফিয়ে পড়। দেখি শালা, তুই মরিস কি না।

সিদ্ধার্থর হাতটা ধরে অতীন বললো, ছাড়, আমার লাগছে! সত্যি, তোদের ওরকম বিপদে ফেলা আমার অন্যায় হয়েছে। গাড়ির মধ্যে হঠাৎ যেন আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, সবাই আমাকে অপমান করছে, আমার বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না।

–কেউ তোকে অপমান করেনি। শান্তাবৌদি কত ভালো ব্যবহার করছিলেন, তুই-ই তাদের অপমান করেছিস।

–হয়তো আমারই ভুল। শান্তাবৌদির কাছে এখন টেলিফোন করে মাপ চাইবো? অতীনের চুল ছেড়ে দিয়ে সিদ্ধার্থ বললো, এত রাত্তিরে আর ন্যাকামি করতে হবে না! দ্যাখ অতীন, মানুষের ধৈর্যের একটা সীমা আছে। আমি আর তোকে ট্যাকল করতে পারছি না। আমি কি সব সময় তোকে পাহারা দিয়ে থাকবো? তুই এখানে আছিস বলে আমার কোনো বান্ধবীকে এই অ্যাপার্টমেন্টে ডাকি না, উইক এন্ডে ডেট করি না, আর কত স্যাক্রিফাইস করবো তোর জন্য?

অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে স্নান গলায় বললো, তুই আমাকে সাতদিনের নোটিস দিয়েছিস, তার আগেই আমি তোর অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যাবো।

–আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে রেল স্টেশানে গিয়ে শুবি? হারামজাদা ছেলে, গাড়ির দরজা। খুলে, যখন ঝাঁপ দিলি, তখন তোর মা বাবার কথা একবারও মনে পড়লো না? আচ্ছা, মা বাবার কথাও না হয় বাদ দিলুম, ঐ শর্মিলা বলে মেয়েটির কথাও একবারও ভাবলি না!

–আমি এমন একটা ক্রাইসিসের মধ্যে পড়েছি, তাতে মা-বাবা, বন্ধু বান্ধব কেউ আমাকে কোনো হেল্প করতে পারবে না। আমি এমন একটা বিরাট অন্যায় করে ফেলেছি, যার থেকে মুক্তি পাবার কোনো উপায়ই নেই। সেইজন্যই ভাবি যে আমার এখন মরে যাওয়াই ভালো।

–অন্যায় আর অন্যায়! তোর এই একটা অবসেশান তুই মুছে ফেলতে পারছিস না? যুদ্ধ করতে গেলে মানুষ মারতে হয়। যুদ্ধ ব্যাপারটাই একটা অন্যায় হতে পারে, কিন্তু অ্যাকচুয়াল যুদ্ধে নেমে পড়লে মানুষ মারা অন্যায় নয়। নইলে নিজেকে মরতে হবে। তুইও একটা আদর্শের জন্য যুদ্ধে নেমেছিলি।

অতীনের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে উঠলো, শক্ত হয়ে গেল চিবুক, সে ঘাড় সোজা করে বললো, না, না, না, না, নর্থবেঙ্গলে আমি যে একজনকে মেরেছি, সেটা আমি মোটেই অন্যায় করিনি। বেশ করেছি মেরেছি! সেটা ছিল একটা সমাজবিরোধী, জোতদারের দালাল, ভাড়াটে গুণ্ডা, আমাদের দিকে আগে বোমা ছুঁড়েছিল, মানিকদা ইনজিওরড হয়েছিলেন, তারপরেও লোহার রড নিয়ে তেড়ে এসেছিল আমাদের দিকে। আমি তাকে গুলি না করলে সে-ই আমার মাথা ছাতু করে দিত। নট ওনলি ফর সেলফ-ডিফেন্স, তাকে শাস্তি দেবার মরাল রাইট ছিল আমার হান্ড্রেড পারসেন্ট! বেশ করেছি তাকে মেরেছি! ওরা আমার নামে মিথ্যে কেস সাজিয়েছিল, কিন্তু আমি জানি, আমি কোনো অন্যায় করিনি।

সিদ্ধার্থ বললো, তুই যদি নিজেকে এত স্টাউটলি ডিফেন্ড করতে পারিস, তা হলে আর লজ্জা পাবার কী আছে? চোর-চোর ভাব করে থাকিস কেন? লোকজনের সঙ্গে মিশতে পারিস না। দিনদিন তুই মরবিড় হয়ে যাচ্ছিস। কাল তুই ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলি!

অতীনের শরীরটা আবার শ্লথ হয়ে গেল, নুয়ে গেল মুখ। মেঝের দিকে তাকিয়ে সে বললো, পালিয়ে থাকার সময় আমি এমন একটা কাজ করে ফেলেছি… প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে… মাথার ঠিক ছিল না… তারপর থেকে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না! অন্য কারুকে সে কথা বলতেও পারি না, কী যে করবো এখন তা বুঝতেও পারি না।

–ইডিয়েট, তুই সে কথা আমাকেও বলতে পারিস না? আমি তোর বন্ধু নই? একা একা ব্রুড করে তুই দিন দিন যে একটা ওয়ার্থলেস হয়ে যাচ্ছিস, তাতে কোনো লাভ আছে?

–কোনো বন্ধুই আমাকে সাহায্য করতে পারবে না।

–আমি আজই সব শুনতে চাই। ইটস হাই টাইম…

সেই এক ঘোর বৃষ্টিময় বিকেলে অতীন একটা লোককে গুলি করার পর দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটেছিল। কোথায় যাবে সে? মানিকদার আস্তানায় যাওয়া যাবে না, ওরা মানিকদাকে চিনে ফেলেছে। কলকাতার বাড়িতেও ফেরা যায় না এখন, পুলিশ নির্ঘাৎ খোঁজ পেয়ে যাবে সে বাড়ির। কয়েক মিনিট আগেও অতীন জানতো না যে সে একটা লোককে খুন করবে। কিন্তু ওরাই আগে আক্রমণ করেছে, প্রায় বিনা কারণে, বিনা প্ররোচনায় পুলিশ ওদেরই তাঁবেদার পুলিশের হাতে ধরা পড়লে অত্যাচার করবে, বালির বস্তা দিয়ে পেটাবে, কানু সান্যাল–খোকন। মজুমদারের সন্ধান জানবার জন্য জেরা করবে… তারপর কি ওরা অতীনকে ফাঁসি দেবে? কিছুতেই ধরা দেবে না অতীন, বিপ্লবীরা কখনো ধরা দেয় না, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়!

প্রথম রাতটা অতীন কাটালো মাদারিহাটের কাছে একটা জঙ্গলে। সারা রাত তার চোখে একফোঁটা ঘুম আসেনি। মাত্র দু’এক মিনিটের একটা ঘটনায় তার জীবনটা বদলে গেছে। সে এখন অন্য মানুষ। সে আর মমতা-প্রতাপ মজুমদারের ছেলে নয়, তাঁদের কাছে অতীন কী করে। আর মুখ দেখাবে? অলির সঙ্গেও আর সম্পর্ক থাকবে না কিছু।-অলির বাবার চোখে সে এখন অস্পৃশ্য, একটা ক্রিমিন্যাল।

সেই রাতেই অতীন বুঝেছিল যে জঙ্গলে একা একা লুকিয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মানিকদা একবার বলেছিলেন বডার ক্রস করে নেপালে চলে যাবার কথা। কিন্তু নেপালে গিয়ে সে কোথায় থাকবে? তার কাছে টাকাকড়ি নেই, নেপালে কোনো কনট্যাক্ট নেই। যদি সঙ্গে আর একজন কেউ থাকতো, তাহলে দু’জনে মিলে বুদ্ধি করে একটা কিছু করা যেত। তপনটা কোথায় গেল? কাপুরুষের মতন পালিয়েছে আগেই…।

পরদিন সন্ধের অন্ধকারে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে অতীন মাদারিহাটে এসে রঞ্জিতকে খুঁজল। এই রঞ্জিত এখানে একটা ইস্কুলে পড়ায়, কয়েকবার এসেছে শিলিগুড়িতে মানিকদার বাড়িতে। সে তাদের মতবাদে, বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী।

রঞ্জিতরা খুবই গরিব, দু’খানা মাত্র টিনের ঘরে মা বাবা-ভাই-বোন মিলিয়ে সাতজন থাকে। সেখানে অতীনকে আশ্রয় দেবে কী করে? তা ছাড়া মাদারিহাটের মতন একটা ছোট জায়গায় একজন নতুন লোক দেখলেই জানাজানি হয়ে যাবে। ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকবেই বা ক’দিন। রঞ্জিতদের বাড়ির গা ঘেঁষাঘেষি অনেকগুলো বাড়ি, সবই প্রাক্তন রিফিউজিদের, এক বাড়ি লোক অন্য বাড়িতে যখন তখন আসে।

খুনের কথা এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। রঞ্জিতের কাছ থেকেই অতীন খবর পেল যে মানিকদা ধরা পড়েননি। যে-ছেলেটি মারা গেছে, ফরোয়ার্ড ব্লকে তার নাম লেখানো থাকলেও সে ছেলেটি আসলে একটি গুণ্ডা। এর আগে সে বেশ কয়েকটা খুন করেছে। কিন্তু এখানে রটেছে যে সি পি এম-এর উগ্রপন্থীদের হাতে খুন হয়েছে ফরায়ার্ড ব্লকের একজন কর্মী। তাই নিয়ে একটা মিছিল বেরিয়ে গেছে কুচবিহারে।

রঞ্জিত পরামর্শ দিল অতীনকে বিহারে চলে যেতে, ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশের আওতার বাইরে। খুনের আসামী হিসেবে অতীনের নাম এখনো জানাজানি হয়নি, সে কয়েকমাস বিহারে কাটিয়ে আসতে পারলে ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। কাটিহারে রঞ্জিতের এক মামাতো ভাই থাকে, সে যথাসাধ্য সাহায্য করবে অতীনকে।

রঞ্জিতের অত টানাটানির সংসার, তবু সে পঞ্চাশটা টাকা জোগাড় করে দিল অতীনকে। নিজের একটা জামা দিল এবং তার মামাতো ভাইয়ের নামে একটা চিঠি।

কিষানগঞ্জ দিয়ে অতীন ঢুকে পড়লো বিহারে। তারপর বাস ধরে পূর্ণিয়া, সেখান থেকে কাটিহার। বিহারে এসেই অতীন অনেকটা স্বাভাবিক বোধ করলো, যেন তার বিপদ কেটে গেছে, এখানে কেউ তাকে চেনে না।

এর মধ্যে কলকাতায় ফেরার কথা ছিল অতীনের। মাকে সে চিঠিটা যে কেন লিখতে গেল। ঠিক দিনে অতীন না পৌঁছেলে মা উতলা হয়ে উঠবেন। সোমবার দিন নিশ্চয়ই তার জন্য রান্না করে রেখেছিলেন মা। এখন অতীনের কাছ থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেলে মা বাবা কী করবেন? প্রথমে একটা টেলিগ্রাম পাঠাবেন শিলিগুড়িতে। কোনো উত্তর পাবেন না। তারপর? মা বাবাকে জোর করে পাঠাবেন শিলিগুড়িতে? কিংবা কৌশিকও আসতে পারে। কৌশিক পমপমেরা কি সব জেনে ফেলেছে? মানিকদা কোথায় গেলেন?

দার্জিলিং থেকে ফেরার পথে অলিরা নিশ্চিত খোঁজ করবে অতীনের। আর কিছুদিন যাক, অলিকে সব কথা বুঝিয়ে একটা চিঠি লিখতে হবে।

কাটিহারে রঞ্জিতের মামাতো ভাইয়ের নাম পরাণ, একটা ছোট মনিহারি দোকান আছে তার। এরাও রিফিউজি কিন্তু ক্যাম্পে না থেকে কোনোক্রমে জীবনযাপনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। শুকনো, চিড়ে-চ্যাপ্টা গোছের চেহারা এই পরাণের, বছর তিরিশেক বয়েস, সে রাজনীতির ধার ধারে না। কিন্তু রঞ্জিতের চিঠি পেয়ে সে কোনো প্রশ্ন করলো না, অতীনকে তার। দোকানের কাজে লাগিয়ে দিল।

দাড়ি কামানো বন্ধ করে দিয়েছিল অতীন, এবারে কে আরও কিছু ছদ্মবেশ নিতে হলো। প্যান্টের বললে ময়লা ধুতি ও খালি গায়ে সে দোকানে বসে, স্নান করে না, চুল আঁচড়ায় না। তার চেহারা থেকে শহুরে পালিশটা একেবারে মুছে ফেলা দরকার। পারতপক্ষে খদ্দেরদের সঙ্গে কথাও বলে না অতীন। পরাণ দরদাম করে, অতীন জিনিসপত্র বেঁধে দেয়। স্টেশানের কাছে, রেলেরই জমি জবরদখল করে, টিনের ছাউনির দোকান, রাত্তিরে অতীন সেই দোকানেই শোয়। রাণদের বাড়িতেই দু’বেলা খাওয়া, শুধু ডাল-ভাত আর একটা তরকারি, অধিকাংশ দিনই ঝিঙে বা ঢ্যাঁড়শের।

কাটিহারে পৌঁছোবার কয়েকদিন পরেই অতীন স্টেশানের খবরের কাগজে দেখলো যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার পতনের খবর। উত্তরবঙ্গে নকশালবাড়িকে কেন্দ্র করে ভূমি দখলের আন্দোলন একেবারে থিতিয়ে গেছে, কিন্তু কলকাতায় ছাত্রসমাজ সশস্ত্র কৃষক-বিপ্লবের সমর্থনে মিছিল বার করছে প্রায়ই।

টানা সাড়ে তিনমাস অতীন কাটিহারে রয়ে গেল সেই মনিহারি দোকানের বোকাসোকা কর্মচারীর ছদ্মবেশে। বাড়িতে সে চিঠি লেখেনি, অলিকেও সে চিঠি লেখেনি। এই অজ্ঞাতবাস তার বেশ পছন্দই হয়ে গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়ে যাবার ফলে পুলিশ। এখন লাগামছাড়া। প্রতিদিন ডজন ডজন গ্রেফতারের খবর।

রঞ্জিত এর মধ্যে চিঠি লিখে জানিয়েছিল যে অতীন যেন অন্য কোথাও চলে না যায়। মানিকদার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে, মানিকদা অতীনকে আপাতত কাটিহারে থাকতেই নির্দেশ দিয়েছেন।

পুরো শীতকালটা তার কাটলো বিহারের ঐ ক্ষুদ্র শহরে।

তারপর চৈত্রমাসে এক ঝড় বৃষ্টির সন্ধ্যায় অতীন আর পরাণ যখন দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করতে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ উপস্থিত হলো এক আগন্তুক। গায়ে বষতি, মাথায় টুপী, মুখে চাপ দাড়ি, সে প্রায় ঝাঁপটা তুলে জোর করে দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়তেই অতীন একটা আড়াইসেরী বাটখারা তুলে নিয়েছিল হাতে। না লড়াই করে সে ধরা দেবে না।

ঐ বিচিত্র পোশাকের জন্য কৌশিককে চিনতে পারেনি অতীন। হঠাৎ এতদিন বাদে কৌশিককে দেখে তার কান্না পেয়ে গিয়েছিল। কৌশিক যেন তার সত্তার অপর একটি অংশ, কৌশিকের চেয়ে প্রিয় তার কেউ নেই।

পরাণকে প্রচুর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেই রাতেই ওরা দু’জন রওনা হলো রাজমহলের দিকে। তারপর সেখান থেকে ধানবাদ, রাঁচী ঘুরে জামসেদপুর।

কৌশিকের কাছ থেকেই অতীন জানলো চারু মজুমদারের আদর্শে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি মোটেই থেমে যায়নি, বরং সংগঠন গোপনে গোপনে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কানু সান্যাল–মানিকদারা আশা করেছিলেন যে সি পি এম পার্টি ক্যাডারদের মধ্যে একটা বিরাট ভাঙন ধরবে, তারা অবলম্বন করবে চারুবাবুর প্রদর্শিত পথ। তা হয়নি অবশ্য। সি পি এম দল। থেকে প্রায় হাজারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তারপর তাদের পার্টির মধ্যে আর কোনো প্রকাশ্য মতবিরোধ নেই। কিন্তু ছাত্রসমাজ থেকে প্রচুর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, এই আদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের নানা প্রান্তে, তৈরি হয়েছে একটা অল ইন্ডিয়া কো-অর্ডিনেশন কমিটি। একদিকে অন্ধ্র প্রদেশ অন্যদিকে পঞ্জাব, এর মধ্যে শুরু হয়েছে মাওপন্থীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়, খুব শিগগিরই একটা আলাদা পাটি ফর্ম করা হবে। এখন অনেক কাজ!

কিন্তু অতীন এই সব কাজে এখন কোনো অংশ নিতে পারবে না। তপন ধরা পড়েছে, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পুলিশের কাছে সে অতীন ও মানিকদার নাম জানিয়ে দিয়েছে। ওয়ারেন্ট আছে এই দু’জনের নামে। এখন অন্তত এক বছর পশ্চিমবাংলায় অতীনের ঢোকা চলবে না। তারপর দিকে দিকে বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠলে পুলিশের ঐসব হুলিয়া-টুলিয়া তুচ্ছ হয়ে যাবে।

কৌশিক খানিকটা ভর্ৎসনার সুরে অতীনকে বলেছিল, এই সময়টায় আমাদের গোপনে গোপনে সংগঠন জোরদার করার কথা, এর মধ্যে তারা এমন একটা বেমক্কা কাজ করে ফেললি! এখন খুন জখমের মধ্যে যাবার কী দরকার ছিল?

অতীন উত্তর দিয়েছিল, আমরা কি প্ল্যান করে কিছু করেছি নাকি? হঠাৎ হয়ে গেল! মানিকদা চারুবাবুর কাছ থেকে একটা গোপন মেসেজ নিয়ে যাচ্ছিলেন খোকন মজুমদারের কাছে, মাঠের মধ্যে ওরা হঠাৎ আমাদের অ্যাটাক করলো…।

–মানিকদা বলেছেন, তুই মাথা গরম করে হঠাৎ গুলি চালিয়ে দিলি! ওকে একেবারে প্রাণে মেরে না ফেললে চলতো না?

–মানিকদা বলেছেন এই কথা? আমি না মারলে ওরা নির্ঘাৎ আমাদের মেরে ফেলতো। ওরা মারতেই এসেছিল। মানিকদার গায়ে বোমা ছুঁড়েছিল, তারপর লোহার রড নিয়ে তেড়ে এসেছিল! তুই জানতি, কৌশিক, মানিকদার সঙ্গে রিভলভার থাকে?

–সেই রিভলভারটা নিয়ে তুই কি ওদের ভয় দেখাতে পারতি না?

–ওরা কি ভয় পাবার মতন মানুষ? মানিকদার হাতে রিভলভার দেখেও ওরা বোমা ছুঁড়েছিল। খুন করতে ওদের হাত কাঁপে না। জানিস কৌশিক, দু’এক মুহূর্তের এদিক ওদিক, আমার গুলি যদি লোকটার গায়ে না লাগতো, ও আর একটা বোমা ছুঁড়লেই আমরা শেষ হয়ে যেতাম। হ্যাঁরে, তপন ধরা পড়ে সব বলে দিল? হারামজাদা বাঙালটা এত ভীতু?

–জেলের মধ্যে আমাদের অন্য ছেলেও আছে। তাকে দিয়ে তপনের ওপর ওয়াচ রেখেছি। তবে আমার মনে হয় ও রাজসাক্ষী হবে না। অনেকে সহ্য করতে পারে না, বুঝলি, প্রথমটায় ভেঙে পড়ে, তারপর আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে ওঠে। মানিকদা এখনও তপনকে অবিশ্বাস করেন না।

–মানিকদা কোথায়?

–সেকথা তোকে বলা যাবে না। বাই চান্স তুই যদি ধরা পড়িস, তাতে টচারের মধ্যে তুই যাতে বলে না ফেলিস, সেই জন্য এই প্রিকশান। তুই না জানলে আর বলবি কি করে? আরে, না না, তোকে অবিশ্বাস করছি না। তুই তপনের মতন উইক সেকথাও বলছি না, তবে এই রকমই একটা সিস্টেম করা হয়েছে। আর মানিকদার সেফটির ওপর আমরা ম্যাক্সিমাম জোর দিয়েছি। মানিকদার শরীর খারাপ।

–আমার বাড়ির কোনো খবর জানিস?

–হ্যাঁ, সবাই ভালো আছেন। আমি মেসোমশাইয়ের সঙ্গে কোর্টে দেখা করে বলেছি, আপনারা চিন্তা করবেন না। বাবলু ভালো আছে। তুই কোথায় আছিস সে কথা জানাইনি অবশ্য।

–বাবা কী বললেন তোকে?

–অত্যন্ত স্ট্রেঞ্জ ব্যবহার করলেন। আমার কথাগুলো সব শুনলেন মন দিয়ে, কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না, একটা কথাও বললেন না আমাকে। সব শোনার পর চুপ করে রইলেন, সিগারেট টানতে লাগলেন। এবার তার হাতের লেখা দু’ লাইন চিঠি নিয়ে গিয়ে তোর মাকে দেখাবো।

–আর অলি? তোর সঙ্গে অলির দেখা হয়েছিল এর মধ্যে?

–না, অলির সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে খবর পেয়েছে নিশ্চয়ই। তুই কিন্তু পোস্টে কোনো চিঠি পাঠাসনি বাবলু! স্ট্রিকটলি নিষেধ!

জামসেদপুরে সতীশ মিশ্র নামে একজন ইঞ্জিনিয়ারের বাড়িতে তোলা হলো অতীনকে। ভদ্রলোক কিছুদিন আগে বিপত্নীক হয়েছেন, দুটি অল্পবয়েসী ছেলেমেয়ে আছে। অতীন তাদের গৃহশিক্ষক। সতীশ মিশ্র মুঙ্গেরের লোক হলেও যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনো করেছেন, মোটামুটি বাংলা জানেন। ভদ্রলোক কথা বলেন কম, কিন্তু বেশ সাহসী মানুষ। অতীনের পটভূমিকা তিনি জানেন, তিনি অতীনকে বলে দিয়েছেন, দিনের বেলা বিশেষ বেরুবেন না, তাহলে আর ভয়ের কিছু নেই।

জামসেদপুরে অতীনকে ঠিকঠাক ভাবে স্থিতি করিয়ে দিয়ে কৌশিক ফিরে গেল।

এই সতীশ মিশ্রের বাড়ির পাশেই থাকে একটি বাঙালী পরিবার। সেই পরিবারে দুটি মেয়ে এ বাড়ির মাতৃহীন ছেলেমেয়েদুটির জন্য মাঝে মাঝেই নানারকম খাবার ও খেলনা নিয়ে আসে। অতীনের মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ থাকলেও বড় মেয়েটি তাকে দেখেই চিনতে পারলো। এই মেয়েটির নাম শর্মিলা, জলপাইগুড়ির এক চা বাগানে এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অতীন আর কৌশিকদের। শর্মিলার সব মনে আছে।

জামসেদপুরে ঐ বাড়িতে অতীনের কাটতে লাগলো মাসের পর মাস। এখানে অতীন। নিয়মিত ইংরিজি খবরের কাগজ পায়। সে জানতে পারলো, কানু সান্যাল ধরা পড়ে গেছেন। মানিকদার কোনো খবর নেই। রাষ্ট্রপতির শাসন তুলে দেবার দাবিতে জোরদার আন্দোলন। চলছে কলকাতায়। বামপন্থীরা অন্তর্বর্তী নির্বাচন চাইছে।

কৌশিক সেই যে গেল আর তার আসার নাম নেই। তবে তার কাছ থেকে খবর নিয়ে এর মধ্যে আরও দু’জন এসেছিল, তারা কেউই অতীনের চেনা নয়। তাদের একজনের হাতে অতীন। পেয়েছিল তার মায়ের চিঠি। অতীনও তাদের হাত দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল দুখানা।

জামসেদপুরে বাঙালীর সংখ্যা অনেক, দুর্গাপুজো হয় বেশ কয়েকটা। সাকচিতেই প্রায় পাশাপাশি দুটো প্যান্ডেল। এই সময় সবকিছুই ঢিলেঢালা। তাই অতীন ঘোরাঘুরি করতে শুরু করলো দিনের বেলায়। পুজো প্যান্ডেলে যাওয়ার যে খুব আগ্রহ আছে তার তা নয়, কিন্তু সে স্বাধীনতা ভোগ করতে চাইছিল।

নবমী পুজোর দিন ভোরবেলা এক গাড়ি পুলিশ এসে বাড়ি ঘিরে ধরলো এবং অতীন গ্রেফতার হলো প্রায় ঘুমন্ত অবস্থায়। পাঁচদিন পর তাকে নিয়ে আসা হলো আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।

পরে অবশ্য অতীন জেনেছিল যে তাকে ধরিয়ে দিয়েছেন অলির বাবা বিমানবিহারী।

এত গোপনীয়তার মধ্যেও কী করে যেন জানাজানি হয়ে গিয়েছিল অতীনের অজ্ঞাতবাসের ঠিকানা। প্রতাপ-মমতা জেনেছিলেন, অলি জেনেছিল। অলি কৌশিককে ধরে ছিল, সে একবার অতীনের সঙ্গে দেখা করতে জামসেদপুরে যাবে। সে উদ্যোগ নেবার আগেই বিমানবিহারী প্রতাপের কাছ থেকে জানতে পেরে গেলেন জামসেদপুরের কথা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়ে সব ঘটনা জানিয়ে এলেন।

বিমানবিহারী আসলে একটা সূক্ষ্ম বুদ্ধির চাল চেলেছিলেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বামপন্থীদের নির্বাচনী শ্লোগানের মধ্যে আছে যে, ক্ষমতায় এলে তারা সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেবেন। বিমানবিহারী হাওয়া দেখে বুঝেছিলেন যে বামপন্থীদের যুক্তফ্রন্টের আবার জয়ী হয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনাই খুব বেশী। অতীন আত্মগোপন করে থাকলে তার নামে ওয়ারেন্ট রদ করা সহজ হবে না। বরং কিছুদিন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে জেল খাটলেই নির্বাচনের পর তার মুক্তি পাওয়ার সুযোগ খুব উজ্জ্বল।

বিমানবিহারীর অনুমান প্রায় নির্ভুল। মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয় হলো, জ্যোতি বসু হলেন হোম মিনিস্টার এবং পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতন রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিলেন, তাঁদের ঘোষিত শত্ৰু কানু সান্যালরাও ছাড়া পেয়ে গেলেন। কিন্তু অতীনের কেসটা আটকে গেল। নথীপত্রে দেখা গেল অতীন রাজনৈতিক বন্দী নয়, তার নামে ক্রিমিন্যাল কেস, সে সাধারণ একটা খুনের আসামী।

এদিকে অতীনকে বিদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা সব পাকা হয়ে গিয়েছিল। প্রতাপ ত্রিদিবকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন ইংল্যান্ডে অতীনকে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিতে। ত্রিদিব রাজি হয়েছিলেন সাগ্রহে। উঁচু মহলের বিভিন্ন ব্যক্তিকে ধরে অতীনের পাশপোর্ট এবং টিকিটেরও বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল, শেষ মুহূর্তে সব আটকে যাবার উপক্রম হলো।

কানু সান্যাল সমেত পরিচিত অন্যান্যরা সবাই ছাড়া পেয়ে গেলেও অতীন যখন মুক্তি পেল না, তখন সে খুবই ভেঙে পড়েছিল। বিমানবিহারী কিন্তু হাল ছাড়েননি। একটা প্রবল ঝুঁকি নিয়ে তিনি অতীনকে পাঁচ হাজার টাকার জামিনে খালাস করে আনলেন। তারপর জামিন ভঙ্গ করে তিনি অতীনকে তুলে দিলেন বিদেশের জাহাজে।

অতীন বিদেশে যেতে একেবারেই রাজি ছিল না। বাবা এবং বিমানকাকাকে সে অনেকবার বলেছে যে মুক্তি পেলেও সে লন্ডনে যাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক বন্দীর মর্যাদা সে যখন পেল না, সাধারণ ক্রিমিন্যাল হিসেবে কয়েকদিনের জন্য মাত্র জামিনে ছাড়া পেয়ে তার দিশেহারা। অবস্থা। আবার তাকে জেলে যেতে হবে। বিচারে তার ফাঁসি না হলেও চোদ্দ বছর অন্তত জেল খাটতে হবে, কৌশিকই তখন বলেছিল, অলির বাবা ঠিক পথই বাতলেছেন। কিছুদিনের জন্য অন্তত বিলেতে থেকে আয়, এর মধ্যে তোর কেসটাকে পলিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল দিতে হবে। বিমানবিহারী জ্যোতিবাবুকে বোঝাবেন, স্নেহাংশু আচার্যের সঙ্গে তাঁর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা আছে

কলকাতার ময়দানে মে দিবসে কানু সান্যাল প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন নতুন এক রাজনৈতিক দলের জন্মের। দলটার নাম সি পি আই (এম এল) এবং এই দল পরিচালিত হবে। মাও সে তুং-এর চিন্তাধারায়। মাও সে-তুং-এর একটি রেড বুক আন্দোলিত করে তিনি বললেন, এই দলই ভারতে প্রথম সঠিক বিপ্লবী দল।

ঐ দিনই ময়দানের অন্য প্রান্তে আর এক বিশাল সভায় জ্যোতি বসু বললেন, তাঁর সরকার একদিনে নকশালদের দমন করতে পারে কিন্তু তিনি জনসাধারণের হাতেই সে ভার ছেড়ে দিতে চান। নকশালদের রাজনৈতিক বক্তব্য মোকাবিলা করা হবে রাজনৈতিক ভাবে, কিন্তু তাদের খুন-জখমের ক্রিয়াকর্মগুলো সাধারণ অপরাধীদের মতন বিচার করা হবে আইনের চোখে।

তার পরদিনই অতীন জাহাজে ভেসে পড়লো।…

সিদ্ধার্থ বললো, তোর বিলেতে থাকার অভিজ্ঞতাগুলো আমি শুনেছি। কিন্তু জামসেদপুরে কী হয়েছিল? এখন বোস্টনে যে শর্মিলা থাকে, তার সঙ্গে তোর আলাপ জামসেদপুরে? সেখানেই প্রেম হয়েছিল?

অতীন চুপ করে রইলো। সিগারেট ধরাতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে। সে আর কথা বলতে পারছে না। শর্মিলার সঙ্গে কি তার প্রেম হয়েছিল? না বন্ধুত্ব? মাসের পর মাস সেই অজ্ঞাতবাসে শর্মিলাই ছিল তার কথা বলার একমাত্র সঙ্গী। সঙ্গিনী নয়, সঙ্গীই। অতীন প্রথম বেশ কিছুদিন শর্মিলাকে মেয়ে হিসাবে গ্রহণ করেনি, সহজ বন্ধুর মতন ছিল। অলি ছাড়া আর কোনো মেয়েকে ভালোবাসার কথা সে চিন্তাই করেনি।

কিন্তু পরপর কতকগুলো নির্জন দুপুর, অতীনের তখন প্রায়ই জ্বর হতো, শর্মিলা এসে সেবা করতো তাকে, এমন চমৎকার মেয়ে শর্মিলা, সরল, ভুলোমনা, পবিত্র। তার হাতের ছোঁয়ায় জাদু ছিল, প্রবল জ্বরের ঘোরে অতীনের একদিন মনে হলো শর্মিলাই অলি, সে তাকে জড়িয়ে ধরলো, বুকের কাছে টানলো, শর্মিলা জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল নিজেকে।

একজন বিপ্লবীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ায় রোমাঞ্চিত বোধ করতো শর্মিলা। অসুস্থ, অসহায় এই মানুষটিকে সেবা করে অদ্ভুত তৃপ্তি পেত, কিন্তু তার কোনো প্রেমের বোধ ছিল না। অতীন তো তাকে কোনোদিন ভালোবাসার কথা বলে নি। বিপ্লবীদের নিয়ম অনুযায়ী অতীন শর্মিলাকে তার পূর্ব পরিচয় কিছুই জানায় নি, অলির কথা, তার বাবা-মায়ের কথা, মানিকদার কথা একবারও উচ্চারণ করে নি সে।

কিন্তু মাসের পর মাস অনিশ্চিত অবস্থা, তার ওপর অসুখে ভুগে ভুগে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। অতীন, তার মধ্যেই জেগে উঠেছিল এক প্রবল শারীরিক টান, এক এক সময় জ্বরের ঘোরে সে শর্মিলাকেই অলি মনে করে আদর করতে চাইতো। অলিকে সে ভালোবাসে, কিন্তু এখন অলি কেন তার কাছে নেই? এক অদ্ভুত, অযৌক্তিক অভিমান হচ্ছিল অলির ওপর। নারী-শরীরের স্পর্শের জন্য সে ছটফট করতো।

শর্মিলা কিন্তু অতীনকে কখনো প্রশ্রয় দেয় নি, প্রলুব্ধ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। তখনও যেন শর্মিলার যৌন চেতনা জাগে নি। অসুস্থ একজন মানুষকে সে ধমক দিতে পারে না, কিন্তু অতীন বাড়াবাড়ি করতে গেলেই সে দূরে সরে যায়।

তিনদিন পর অতীন শর্মিলার জানু ধরে বললো, আমি তোমাকেই চাই!

শর্মিলাকে রাজি করাতে আরও সাতদিন লেগেছিল অতীনের। সেদিন একশো চার জ্বর, সে কিছুতেই ডাক্তার ডাকবে না, সে শুধু শর্মিলাকে চায়। শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়লো শর্মিলার। সে অতীনের বুকে এলো। তারপর একটা প্রবল জোয়ার উঠলো, সে জোয়ারে ছেঁড়া চিঠির টুকরোর মতন অতীন ভাসিয়ে দিল অলিকে।

০৮. আরিচা ঘাটে বিশাল যমুনা নদীর দিকে

আরিচা ঘাটে বিশাল যমুনা নদীর দিকে তাকিয়ে মামুন ভাবলেন, নিয়তি এবার কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে? সামনে কী আছে?

অন্ধকার হয়ে এসেছে। আজ আর নদী পার হবার কোনো উপায় নেই। অন্য সময় আরিচার এই ফেরীঘাটে কত ব্যস্ততা থাকে, আজ একেবারে শুনশান, একটাও লঞ্চ নেই, সৈন্যরা যাতে ব্যবহার করতে না পারে সেইজন্য সব কটা ফেরী লঞ্চ ওপারে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ঢাকা থেকে অনেকগুলো পরিবার এই ফেরীঘাটে এসে দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ভাবে। কেউ কোনো কথা বলছে না, এমনকি শিশুরা পর্যন্ত ভয়ে চুপ করে আছে।

একটু পরে কয়েকটি ছেলে এসে বললো, আপনারা ইস্কুল বাড়িতে যান, ওখানে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। তাছাড়া আর কী করবেন!

সেই ছেলেরাই সাহায্য করলো মালপত্র বয়ে নিয়ে যেতে। স্কুলের দোতলার একখানা ঘরে আরও দুটি পরিবারের সঙ্গে জায়গা পেলেন মামুনরা। হেনা আর মঞ্জু শুয়ে পড়লো দেয়াল ঘেঁষে, মঞ্জুর ছেলে সুখুকে নিয়ে মামুন আবার বেরুলেন কিছু খাবার কিনে আনার জন্য। পুঁটুলিতে করে বেশ খানিকটা চিড়ে-গুড় নিয়ে এসেছেন মামুন, তা থাক ভবিষ্যতের জন্য, এখানে দুএকটা খাবারের দোকান খোলা রয়েছে।

সুখুর হাত শক্ত করে ধরে আছেন মামুন। ট্রাকে করে আরো লোক আসছে, ফেরী বন্ধ দেখে উদভ্রান্তভাবে ছোটাছুটি করছে অনেকে, এরপর আর ইস্কুল বাড়িতেও জায়গা হবে না। এত লোক রাত্তিরে থাকবে কোথায়? দোকানগুলো থেকেও খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত, মামুন ছ’খানা রুটি আর কিছু শুকনো কাবাব জোগাড় করতে পারলেন অতি কষ্টে।

খাবারের দোকানে স্থানীয় একজন স্কুল মাস্টার বিবর্ণমুখে মামুনকে জিজ্ঞেস করলেন, ঢাকায় ঠিক কী হয়েছে বলেন তো! নানাজনের কাছে নানান কথা শুনতেছি। আমার ফেমিলি আছে ঢাকায়, তাগো কোনো খবর পাই নাই।

মামুন শুধু বললেন, ঢাকার খবর ভালো নয়!

তা ছাড়া আর কী বলবেন মামুন। এখনো সব কিছুই যেন এক অবিশ্বাস্য, চরম দুঃস্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। এ কী সত্যি হতে পারে যে নিজের দেশের সরকার রাস্তায় মিলিটারি নামিয়ে সাধারণ নিরীহ লোকদের পর্যন্ত গুলি করে মারছে? কোনো যুক্তিতেই এটা বিশ্বাস করা যায় না, তবু এটাই ঘটছে। ঢাকার পথে পথে পড়ে আছে নিদোষ মানুষের লাশ।

পচিশে মার্চ রাতে এই ভয়াবহ কাণ্ড শুরু হবার পর মামুন কোনোক্রমে বাড়ি ফিরে তারপর আর তিন চারদিন তিনি পথে বার হননি। তবু তিনি একসময় বুঝতে পারলেন যে ঢাকায় থাকা তাঁর পক্ষে কোনোক্রমেই নিরাপদ নয়। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজে আওয়ামী লীগের সদস্যদের খুন করছে, সেই সঙ্গে মারছে সাংবাদিক, অধ্যাপক ও ছাত্রদের। কোনো দেশের আর্মি কামান দেগে প্রেস ক্লাব উড়িয়ে দেয়, এরকম কেউ শুনেছে? বাঙালী পুলিশদের মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সৈন্যদের নিরস্ত্র করে খতম করে দেবারও চেষ্টা করেছে। ইয়াহিয়া খান কি উন্মাদ হয়ে গেল, সমগ্র বাঙালী জাতিকে ধ্বংস করে দিয়ে সে পাকিস্তান শাসন করবে?

শেখ মুজিবের কোনো সন্ধান নেই। তিনি নিজেই আত্মগোপন করেছেন, না সৈন্যরা তাঁকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে গেছে, তা কেউ জানে না। কিন্তু জানতে পারা গেছে যে বাঙালীরা শুধু পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে না, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। চট্টগ্রামে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস তুমুল লড়াই করছে পশ্চিম পাকিস্তানী আর্মির সঙ্গে। চট্টগ্রাম শহর থেকে কিছুটা দূরে কালুরঘাটে রেডিও ট্রান্সমিটিং সেন্টারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র, সেখান থেকে জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে জিয়াউর রহমান নামে একজন মেজর স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে।

গতকাল মামুন দেখলেন তাঁর বন্ধু কবি ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদকে। আর্মি এসে যখন প্রেস ক্লাবের লাল রঙের বিল্ডিংটাতে কামান দাগতে শুরু করে, তখন ফয়েজ ছিলেন ঐ প্রেস ক্লাবের দোতলায়। সাংঘাতিক ভাবে আহত হলেও তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন একটা মসজিদে। তিনদিন তিনরাত একটা বাথরুমে লুকিয়ে থেকে কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন সেই ফয়েজ আহমদ মামুনকে বললেন, পালাও, ঢাকা থেকে পালাও, কোনো গ্রামে চলে যাও, ওরা আমাদের শেষ করে দেবে, ‘ইত্তেফাক’-এ যারা এক লাইনও লিখেছে, তাদের কারুকে ওরা ছাড়বে না। মামুন, তুমি আজই সরে যাও ঢাকা থেকে।

ফিরোজা বেগম কয়েকদিন আগে ছোট মেয়েকে নিয়ে টাঙ্গাইলে বাপের বাড়িতে গেছেন, তাঁকে খবর দেবার উপায় নেই। মামুনের পক্ষে টাঙ্গাইলে যাওয়াও নিরাপদ নয়, সেখানেও নিশ্চয়ই তাঁর খোঁজ পড়বে বড় মেয়ে হেনাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ার উদ্যোগ করতেই মঞ্জু এসে বললো, সেও তার ছেলেকে নিয়ে মামুনের সঙ্গে যাবে। বাবুল এখন ঢাকা ছেড়ে যেতে রাজি নয়, তবে মামুনের সঙ্গে তার স্ত্রী ও সন্তানকে পাঠাতে তার আপত্তি নেই।

বাবুলের ব্যবহারটা বেশ বিচিত্র। পচিশে মার্চ রাত্তিরে শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের চূড়ান্ত মিটিং হবার কথা, কিন্তু তার আগেই প্রেসিডেন্ট সাহেব সন্ধ্যেবেলা চুপিচুপি বিশেষ বিমানে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলেন করাচীর দিকে। সৈন্যবাহিনীকে হুকুম দিয়ে গেলেন, নিরস্ত্র বাঙালীদের হত্যা করতে। এই দারুণ বিশ্বাসঘাতকতাতেও বাবুল বিচলিত নয়। তার ধারণা, সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই সব শান্ত হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে সামরিক শাসন পাকিস্তানের পক্ষে অনেক ভালো।

চতুর্দিকে খুন ও অত্যাচারের কাহিনী শুনে মজু ভয় পেয়ে আগেই ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে চাইছিল, কিন্তু বাবুল তাতে কর্ণপাত করে নি। সে বলেছে, এত ভয় কিসের? ঐ তো দ্যাখো না, জাহানারা ইমামরা কি পালিয়েছেন? কামাল কিংবা পল্টনরা তো ইন্ডিয়ায় যাচ্ছে না। আমাদের বাসায় কোনো অ্যাটাক হবে না।

কিন্তু মামুনের সঙ্গে মঞ্জু গ্রামের দিকে যেতে চায় শুনেই বাবুল হঠাৎ মত বদলে ফেললো। বেশ আগ্রহের সঙ্গেই বললো, তুমি তোমার মামুনমামার সঙ্গে যেতে চাও? তা হলে যাও।

মঞ্জু তার স্বামীকেও সঙ্গে আনবার জন্য খুব সাধাসাধি করেছিল, তবু বাবুলকে টলানো গেল না। শেষ মুহূর্তে মঞ্জু তার হাত ধরে কাতর ভাবে বলেছিল, তুমি সাবধানে থাকবে কথা দাও!

বাবুল হেসে বলেছিল, তোমরা ভালো থেকো!

একখানা গাড়ি জোগাড় করা হয়েছিল এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে। বিকেল চারটে থেকে কারফিউ, সকালে হঠাৎ গুজব শোনা গেল যে মীরপুরের কাছে ব্রীজটা উড়ে গেছে, ওদিক দিয়ে। যাওয়া যাবে না। কিন্তু রেডিওতে ঘোষণা করা হচ্ছে যে মীরপুরের ব্রীজ ঠিক আছে, যানবাহন সব চলছে স্বাভাবিক ভাবে। ঝুঁকি নিয়ে মামুন বেরিয়ে পড়লেন। মীরপুরের কাছে এসে দেখলেন, ব্রীজের পাশে আর্মি ঘোরাঘুরি করছে, ব্রীজটার ক্ষতি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এরমধ্যেই মেরামত করা হয়েছে অনেকটা।

মীরপুর ছাড়িয়ে আমিনবাজারের কাছে আসতেই চোখে পড়লো আর্মি কনভয়। মেশিনগানের লম্বা নলগুলো দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে। মামুন মাথা নীচু করে রইলেন, যেন তাঁর মুখ কেউ দেখতে না পায়। তাঁর অতি প্রিয় ঢাকা শহর ছেড়ে তিনি পালাচ্ছেন চোরের মতন। নয়ারহাটে পৌঁছোতেই শুনতে পেলেন পেছনে গোলাগুলির শব্দ। সেনাবাহিনী আবার কোথাও শুরু করেছে ধ্বংসযজ্ঞ।

কোথায় যে যাবেন মামুন তা এখনও ঠিক করতে পারেননি। একবার ভাবলেন, মানিকগঞ্জে তাঁর এক ছেলেবেলার বন্ধু থাকে, তার বাড়িতে উঠবেন। তারপর আবার ঠিক করলেন, ঢাকা থেকে আরও অনেক দূরে সরে যাওয়াই ভালো, পাবনা কিংবা বগুড়ার দিকে।

আরিচা ঘাটে এসে যে ফেরীর অভাবে এভাবে আটকা পড়তে হবে তা আগে কল্পনা করতে পারেননি। যদি কালকেও ফেরী না চলে? এই বিশাল নদী নৌকোতে পার হওয়া যায় বটে কিন্তু এত মানুষ এসে জমা হয়েছে, নৌকোও পাওয়া যাবে কী? হেনা, মঞ্জু আর সুখুকে সঙ্গে এনে তিনি আরও মুশকিলে পড়েছেন, একলা হলে তাঁর দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। যে-সব মানুষ উদ্যোগী হয়ে যে-কোনো পরিস্থিতিতে ঝটপট একটা কিছু ব্যবস্থা করে ফেলতে পারে, মামুন যে সেই দলে পড়েন না। তিনি ভালো করে মিশতেই পারেন না অচেনা লোকের সঙ্গে।

খাবার নিয়ে ফিরে এসে ইস্কুল বাড়ির দোতলায় উঠতে উঠতে একজন লোককে দেখে মামুনের চেনা চেনা মনে হলো। বেশ হৃষ্টপুষ্ট কালো চেহারা, মোটা গোঁফ, মাথায় অনেক চুল, মামুনকে দেখে সেই মানুষটিও থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, মামুনভাই?

মামুনের তখনই মনে পড়ে গেল, এই মানুষটিকে তিনি ইত্তেফাক অফিসে দেখেছেন একসময়, সম্ভবত রিপোর্টারের কাজ করতো, খুব রসিক লোক, নিজে প্রাণ খুলে হাসতে এবং অন্যদের হাসাতে জানে। এর নাম এম আর আখতার। সবাই ডাকতো মুকুল বলে। মাঝখানে অনেকদিন এর সঙ্গে দেখা হয়নি।

এখন হাস্য-পরিহাসের সময় নয়, প্রত্যেকের ভুরুতেই উদ্বেগ মাখানো, কথাও সব এক। চেনাশুনো কে কে মারা গেছে আর কার কার সন্ধান নেই। দু’চারটি কথার পর মামুন। আখতারকে অনুরোধ করলেন, কাল নৌকোর ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদেরও সঙ্গে নেবেন।

আখতার বললেন, অবশ্যই, অবশ্যই! মাঝ রাত্তিরে সবাই যখন শুয়ে পড়েছে, নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে বাতি, কে ঘুমিয়েছে, কে যে জেগে আছে তা বোঝার উপায় নেই, তখন মামুন শুনতে পেলেন একটি নারীকণ্ঠের কান্না। কোনো ভাষা নেই, শুধু একটা টানা শব্দ, সে শব্দ যেন উঠে আসছে হৃদয়ের অতল গভীর থেকে, এমনই একটা তীব্র শোক আছে সেই কান্নার সুরে যা শুনলেই বুকটা মুচড়ে ওঠে।

একটু পরেই মঞ্জু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, মামুনমামা, কে কান্দে?

পাশ থেকে হেনা বললো, এই ঘরে কেউ না।

মামুন বুঝলেন, হেনা আর মঞ্জু জেগেই আছে, আজ রাতে বোধহয় কারুরই ঘুম হবে না। কান্নার শব্দটা এ ঘরের নয় ঠিকই। মামুন উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। সব কটা ঘরেই মানুষজন ভরা, কোনো ঘরেরই দরজা বন্ধ নয়, মামুন একটার পর একটা ঘরে গিয়ে উঁকি মারলেন, কোনো ঘরেই সেই ক্রন্দনরতা নারীকে দেখতে পেলেন না। আরও অনেকে সেই কান্নার শব্দ শুনে উঠে বসেছে।

হঠাৎ মামুনের শরীরটা ঝিমঝিম করে উঠলো। এই কান্না কি অশরীরী? কিংবা সারা দেশ জুড়ে স্বামীহারা, সন্তানহারা, ভাইহারা নারীরা যে কান্নার রোল তুলেছে, এই কান্না তারই প্রতীক। দেশ-জননীই এমন আকুল হয়ে কাঁদছে।

পরদিন ভোরে উঠে ফেরীঘাটে এসে পাওয়া গেল একটা নৌকো। বিকেলের দিকে নৌকো পৌঁছোলো নগরবাড়ি। সেখানে এসে মামুন শুনলেন যে পাবনায় গণ্ডগোল চলছে খুব, সেই তুলনায় বগুড়ার খবর আশাপ্রদ। বগুড়ায় ছাত্ররা মুক্তিবাহিনী গঠন করে বেশ কিছু পাকিস্তানী সৈন্যকে হত্যা করেছে, বাকি সৈন্যরা পালিয়ে গেছে। বগুড়ায় আপাতত কোনো শত্রুর চিহ্ন নেই। সুতরাং মামুন ঠিক করলেন, পাবনার বদলে তিনি বগুড়ার দিকেই যাবেন।

কিন্তু যাওয়া যাবে কী করে? নগরবাড়িতেই শোনা গেল যে পেট্রল-ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও, বাস চলাচল বন্ধ হয়ে আসছে প্রায়। তা ছাড়া, নানান জায়গায় গ্রামের লোকেরা রাস্তা কেটে রেখেছে, যাতে আর্মির ট্রাক যেতে না পারে। বহুলোক এখন শহর ছেড়ে পায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে গ্রামের দিকে।

বগুড়ার দিকের একটা বাস পাওয়া গেল ভাগ্যক্রমে। তাতেও অবশ্য যাওয়া গেল না শেষ পর্যন্ত, বাঘাবাড়ির কাছাকাছি এসে দেখা গেল রাস্তা বন্ধ, রাস্তার মধ্যে গাছ কেটে ফেলা রয়েছে, কিছুটা রাস্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এবার হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। মামন সঙ্গে মালপত্র বিশেষ কিছু আনেননি, শুধু কয়েকটা কাঁধ ব্যাগ। সুখু বেশ হাঁটতে পারে, তাকে কোলে নিতে গেলেই বরং সে আপত্তি করে। হেনা আর মঞ্জু শহুরে মেয়ে, তাদের হাঁটার অভ্যেস নেই, চৈত্রমাসের গনগনে রোদে তাদের মুখ লাল হয়ে ওঠে।

বাঘাবাড়ির ঘাট পেরুবার পর পাওয়া গেল আর একটি অতি লজঝরে চেহারার বাস। একটি ছোকরা কন্ডাকটর সেই বাসের গা চাপড়ে চাপড়ে বলছে, আসেন, আসেন, পংখীরাজ, পংখীরাজ! লাস্ট ট্রিপ, আর চান্স পাইবেন না!

প্রতি মুহূর্তে থেমে যাবে থেমে যাবে ভাব করেও সেই বাসটা চলতে লাগলো বেশ। এক সময় তাকে বাধ্য হয়ে থামতে হলে অবশ্য, সেটা তার নিজের দোষে নয়। উল্লাপাড়া লেভেল ক্রসিং-এ রাস্তা বন্ধ, একটা মালগাড়ি দিয়ে সেই ক্রসিংটা আটকে দেওয়া হয়েছে। বাস রেল লাইনের ওপারে যেতে পারবে না। বাস থেকে নেমে আবার পদযাত্রা।

আখতার সাহেব করিৎকর্মা মানুষ, তিনি উল্লাপাড়া ডাক বাংলোতে রাত্তিরটা থাকার ব্যবস্থা করে ফেললেন। মামুনরা এই পরিবারটির সঙ্গ নিয়ে কিছুটা সুবিধে ভোগ করছেন। আখতার সাহেবের চেয়ে মামুন বয়সে প্রবীণ, তাছাড়া একটা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং জেল খেটেছেন বলে লেখক-সাংবাদিকদের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র, কিন্তু আখতারের মতন একজন চেনা লোক না পেলে কেউ এই ডামাডোলের মধ্যে তাঁকে পাত্তাই দিত না।

ডাকবাংলোর বেয়ারা-চৌকিদার সব উধাও। খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। হোটেলও নেই এখানে। শোনা গেল যে বাজারের কাছে একটা লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে, সেখানেই একমাত্র খাবার পাওয়া যেতে পারে। অগত্যা যেতে হলো সেখানেই। লঙ্গরখানায় অনেকেই পাত পেড়ে বসে গেছে, দেওয়া হচ্ছে শুধু গরম ভাত আর ডাল। আর কিছু না। আখতার সাহেবের ছেলে মেয়েরা আর সুখু মিয়া সেই ভাত ডাল নিয়ে বসে রইলো, তাদের ধারণা, এরপর কোনো তরকারি বা ভাজাটাজা আসবে। শুধু ডাল আর ভাত যে খাওয়া যায়, তা তারা জানেই না। মামুন দেখলেন, মঞ্জুর চোখ ছলছল করছে। তিনি ফ্যাকাসে ভাবে বললেন, এরপর যে ভাগ্যে আরও কী আছে তা কে জানে!

সেই রাত্রে মামুনের হু হু করে জ্বর এসে গেল। মামুন নিজের ওপর মহা বিরক্ত হয়ে উঠলেন। এই কি জ্বরের সময়? যেতে হবে আরও অনেকটা পথ। তার জ্বরের কথা টের পেয়ে গেলে অন্যরা বিব্রত হবে। কিছুতেই কারুকে জানানো চলবে না। সুখু তাঁর বুক ঘেঁষে শুয়েছে। বাচ্চা ছেলে হলেও সে জ্বরতপ্ত শরীর ছুঁয়ে বুঝতে পারবে ঠিকই, মামুন তাই খানিকটা সরে গেলেন।

বগুড়ায় মহিলা কলেজের সামনে ছাত্রদের সঙ্গে পাকিস্তানী আর্মির জোর লড়াই হয়েছে, শেষ পর্যন্ত খান সেনারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। আঁড়িয়াবাজারের মিলিটারি ক্যাম্পেরও পতন হয়েছে, জয়জয়কার পড়ে গেছে মুক্তিবাহিনীর। উল্লাপাড়াতেই শোনা গেল এই সব কাহিনী। বগুড়া শহরে জলেশ্বরীতলায় মামুনের এক শ্যালকের একটা ওষুধের দোকান আছে, সে যদি শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে না থাকে, তাহলে বগুড়ায় আশ্রয় পাবার কোনো অসুবিধে হবে না।

সারা রাত মামুন জ্বরের ঘোরে ছটফট করলেন, পরদিন সকালেও জ্বর ছাড়লো না। কিন্তু কারোকে জানতে দেওয়া হবে না। তিনি সকলের সংস্পর্শ বাঁচিয়ে রইলেন।

আর বাস পাবার কোনো আশা নেই, তবে সাইকেল রিক্সা আছে। কিছু দূর অন্তর অন্তর রিক্সা বদল করে যাওয়া যেতে পারে। সুযোগ বুঝে রিক্সাওয়ালারা যাচ্ছেতাই ভাড়া হাঁকছে। না দিয়েই বা উপায় কী!

এই রিক্সা-যাত্রাতেও স্বস্তি নেই। এক মাইল দু মাইল অন্তর অন্তরই রাস্তা কাটা। রিক্সাচালকরা আগেই চুক্তি করে নিয়েছিল যে রাস্তা কাটা থাকলে সওয়ারিদেরই রিক্সা ঘাড়ে করে অন্য ধারে নিয়ে যেতে হবে। মামুনের প্রায় একশো পাঁচ জ্বর, চোখ জ্বালা করছে, ঝাঁ ঝাঁ করছে কান, সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা, তবু তিনি টু শব্দটি করছেন না, যথাসময়ে রিক্সা বইবার জন্য কাঁধ দিচ্ছেন।

চান্দাইকোনা পৌঁছোবার আগে ঠিক ন’বার রিক্সা থেকে নেমে, রিক্সাটাকেই কাঁধে করে পার হতে হলো গর্ত।

চান্দাইকোনায় এসে এই তিনজন রিক্সাচালক আর যেতে রাজি হলো না। এবারে অন্য রিক্সা ধরতে হবে। এখানে একজন লোক হঠাৎ মামুনের সামনে এসে বললো, চেনা চেনা লাগে, আপনে ‘দিন কাল পত্রিকার সম্পাদক সাহেব না?

মামুন মৃদু হেসে বললেন, ছিলাম একসময়ে, এখন যে মালিক, সে-ই সম্পাদক। আমি বেশ কিছুদিন আগেই বিতাড়িত!

লোকটি বললো, আপনিই তো কাগজটা স্টার্ট করেছিলেন। সার, আপনার আটিকেলগুলো আমি সব পড়তাম, বড় ভালো লাগতো। আমার নাম এজাজ আহমদ, বগুড়ায় আমার বুক স্টল ছিল, ঢাকায় গিয়া আপনারে তিন চাইরবার দেখছি।

অতি ভক্তিতে লোকটি নীচু হয়ে মামুনকে কদমবুসি করতে যেতেই মামুন তার হাত ধরে বাধা দিলেন। এজাজ আহমদ চমকে উঠে বললো, এ কী, সার, আপনার হাত এত গরম…

চান্দাইকোনায় এম. আর. আখতার মুকুলের পরিবারের সঙ্গে মামুনদের বিচ্ছেদ হলো। এজাজ আহমদ এরকম অসুস্থ অবস্থায় কিছুতেই মামুনকে যেতে দিল না বগুড়ায়। এক দৈনিক পত্রিকার খ্যাতিমান সম্পাদক এতখানি জ্বর নিয়ে আবার ঘাড়ে করে সাইকেল রিক্সা বইবেন, এই চিন্তাও যেন তার কাছে অসহ্য। চান্দাইকোনায় তার বাড়িতে কয়েকদিন বিশ্রাম নেবার পর সে নিজে মামুনদের বগুড়ায় পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতি দিল।

আখতার সাহেবের স্ত্রী মাহমুদা খানম রেবার সঙ্গে হেনা আর মঞ্জুর খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল এর মধ্যে, এখন ছাড়াছাড়ি হতে সজল হয়ে এলো ওদের চোখ। যেন আর কখনো দেখা হবে না।

এজাজ আহমদের বাড়িটি বেশ সুস্নিগ্ধ শকড় একটা উঠোনকে ঘিরে অনেকগুলি মাটির ঘর, চারপাশে প্রচুর গাছপালা, দু’দিকে দুটি পুকুর। মনোরম কোনো গ্রামের বাড়ি বলতে যে ছবিটি ফুটে ওঠে, ঠিক সেই রকমই বাড়ি। রয়েছে ধানের গোলা ও গোয়াল ঘর। উঠোনে একটা তুলসীমঞ্চ দেখে বোঝা যায় এককালে এটা হিন্দুর বাড়ি ছিল। এজাজ আহমেদের আদি বাড়ি ছিল বালুরঘাট, তার মরহুম পিতা একজন হিন্দুর সঙ্গে বাড়ি এক্সচেঞ্জ করে এদিকে চলে এসেছিলেন পার্টিশানের দু’বছর পরেই।

জ্বরের ঘোরে মামুন অজ্ঞান হয়ে রইলেন প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা। একজন বৃদ্ধ এল এম এফ পাশ ডাক্তারকে পাওয়া গেল, তিনি শুধু নাড়ি টিপেই বললেন এ নিঘাৎ টাইফয়েড। বগুড়ায় জলেশ্বরীতলায় লোক পাঠিয়েও মামুনের শ্যালকের কোনো খবর পাওয়া গেল না, ওষুধের দোকান বন্ধ করে তার মালিক কোথায় পালিয়েছে কেউ জানে না। চতুর্দিকে লুঠপাট চলছে, ভয়ে এখন কেউই দোকান খোলে না। এমনকি নুন পর্যন্ত সাংঘাতিক দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

প্রায় বিনা ওষুধে ও চিকিৎসায়, শুধু বেঁচে থাকার এক প্রবল তাগিদেই যেন মামুন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেন সাতদিনের পর। শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকা নয়, মামুনের আর দীর্ঘজীবনের সাধ নেই, কিন্তু এই অচেনা জায়গায়, এমন দুঃসময়ে তিনি হঠাৎ মারা গেলে হেনা মঞ্জুদের কী হবে? জ্বরের ঘোরেও মামুন সেই চিন্তাই করতেন। হেনা আর মঞ্জু দু’জনেরই মুখ। শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে, চোখের নীচে কালি। জ্বরের ঘোর কাটবার পর হেনা আর মঞ্জুকে দেখে মামুনের মনে হলো, চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়লে মানুষ ও পশুর চোখের দৃষ্টির কোনো তফাত থাকে না।

সম্পূর্ণ অনাত্মীয় ও অচেনা হয়েও এজাজ আহমদের পুরো পরিবার মামুনদের যে সেবা যত্ন করলো তার তুলনা নেই। মানুষের স্নেহ ভালোবাসা যে কোথায় কার জন্য জমা থাকে তার ঠিক নেই। চান্দাইকোনার মতন এক অখ্যাত জায়গায় যেন মামুনের অন্নঋণ ছিল।

জ্বর ছেড়ে যাবার পর মামুন সব খবরাখবর নিলেন। এই ক’দিনেই অবস্থা অনেক বদলে গেছে। পঁচিশে মার্চের প্রথম আক্রমণের ঝোঁকে বাঙালীরা প্রচণ্ড মার খেয়েছিল। কতজন যে প্রাণ হারিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। তারপর ই পি আর এবং ছাত্র-যুব মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে বেশ কয়েকটা জায়গায় পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা মার খেয়েছে, ক্রোধ-উন্মত্ত জনতা তাদের ধরে ধরে ছিন্নভিন্ন করেছে। এখন আবার পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী নতুন শক্তিতে সঙঘবদ্ধ হয়ে পুনর্দখল করে নিচ্ছে একটার পর একটা জায়গা। চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বোমা মেরে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সেখানকার ই পি আর পশ্চাৎ অপসরণ করেছে। ভারত সীমান্তের দিকে। যে-সব জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিল, আমি এসে ফ্লেম থ্রোয়ার দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে সেইসব গ্রাম। যে-কোনো বাঙালী যুবককে দেখা মাত্র গুলি চালাচ্ছে, বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে যুবতী মেয়েদের। সেনাবাহিনীকে ঢালাও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। লুণ্ঠন ও ধর্ষণের। বাবা-মায়ের সামনে মেয়েকে, স্বামীকে দাঁড় করিয়ে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করার ঘটনা শোনা যাচ্ছে প্রত্যেক দিন। শিশুদের শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে গুলি করছে চার পাঁচজন মিলে, যেন টারগেট প্র্যাকটিস।

এদিকে শুরু হয়েছে এক উৎপাত। গ্রামে গ্রামে লেগে গেছে বাঙালী-অবাঙালী দাঙ্গা। দেশ বিভাগের সময় বিহার থেকে যে-সব মুসলমান এইসব অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল, এই চব্বিশ বছরেও তারা বাঙালীদের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেনি, তারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সমর্থক। আর্মি তাদের লেলিয়ে দিয়েছে বাঙালীদের বিরুদ্ধে।

মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের অস্ত্র গোলা বারুদ ফুরিয়ে এসেছে এর মধ্যেই, অসীম সাহসে তারা সেনাবাহিনীকে মাঝে মাঝে অ্যামবুশ করতে গিয়ে নিজেরাই মরছে দলে দলে।

এজাজ আহমদ সর্বশেষ খবর নিয়ে এলো, রংপুর, পার্বতীপুর পুনর্দখল করে পাকিস্তানী আর্মি এগিয়ে আসছে হিলির দিকে। হিলির বর্ডার দিয়ে মুক্তি বাহিনীর ছেলেরা সীমান্তের ওপারে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বলে আর্মি হিলিতে এসে ঐ বডার বন্ধ করে দিতে চায়। তারপর তারা নওগা, বগুড়া ও আশেপাশে চিরুনি অপারেশন শুরু করবে।

এজাজ আহমদ ইতস্তত করে বললো, মামুন ভাই, এই অবস্থায় আপনাদের আর এখানে ধরে রাখতে চাই না। বডার খোলা থাকতে থাকতে আপনে ইন্ডিয়া চলে যান। আপনার সঙ্গে মেয়েরা রয়েছে, ওদের এখানে রাখা একেবারেই নিরাপদ নয়। পশুরা যে কী বীভৎস কাণ্ড করতেছে আপনি কল্পনাই করতে পারবেন না মামুনভাই।

মঞ্জু পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল, সে বললো, মামুনমামা, আমরা ঢাকা ফিরে যেতে পারি না?

এজাজ আহমদ বললো, ঢাকায় ফেরার সব পথ বন্ধ। ঢাকায় গোলমাল আরও বেশী!

মামুন বললেন, ইন্ডিয়ায় যাবো কোন্ ভরসায়? তারা আমাদের আশ্রয় দেবে? আমাদের পাসপোর্ট-ভিসা কিছু নাই।

এজাজ বললো, অনেকেই যাচ্ছে। মামুনভাই, সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। এরপর বড়ার সীল করে দিলে আর কোনো উপায় থাকবে না।

মামুন চেষ্টা করলেন বগুড়ায় এম আর আখতার মুকুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কিন্তু তাঁর সন্ধান পেলেন না। সেইদিনই জয়পুরহাটে এক বিরাট দাঙ্গার খবর পাওয়া গেল। চতুর্দিকে রব, আর্মি আসছে, আর্মি আসছে।

এজাজ আহমদ একটা জিপ জোগাড় করে দিল, অনেকটা দিশাহারার মতনই মামুন রওনা দিলেন হিলি সীমান্তের দিকে। মঞ্জু আর হেনাকে দেশের মধ্যে রাখা নিরাপদ নয়, তাদের জন্য আশ্রয় নিতে হবে অন্যদেশে! নাৎসী বাহিনী আক্রমণ করেছিল পোলাণ্ড, সেখানকার লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ-শিশু প্রাণ দিয়েছে, আর এখানে নিজের দেশেরই সেনাবাহিনী, একই ধর্ম…

ক্ষেতপাল এসে নদী পার হতে হবে, একটা কাঠের ব্রীজ রয়েছে এখানে, তার মাঝখানের অংশটা খোলা। গ্রামবাসীরাই সেটা খুলে রেখেছে। এখানে আবার দেখা পাওয়া গেল এম আর আখতার মুকুলের। মুকুল গ্রামবাসীদের বেঝাচ্ছেন যে তাঁদের সীমান্তে পৌঁছোনো বিশেষ প্রয়োজন, প্রবাসী সরকার গঠন করতে না পারলে এই লড়াই বেশীদিন চালানো যাবে না।

এই পথ দিয়ে সশস্ত্র অবাঙালীরা ঢাকার দিকে যাচ্ছে বলে গ্রামবাসীরা ব্রীজটা খুলে রেখেছিল। মুকুলের বাকপটুতায় মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা ভাঙা অংশটা আনতে গেল।

মুকুল মামুনকে বললেন, মামুনভাই, দোয়া করেন, যাতে আর্মি এসে পড়ার আগেই আমরা বডারে পৌঁছাতে পারি!

তারপর নদী পেরিয়ে, পাঁচবিবি হয়ে একসময় দুটি জিপ এসে থামলো জয়পুরহাট সুগার মিলের সামনে। মুকুল সাহেব আগে থেকে ব্যবস্থা রেখেছিলেন, সেখানেই গেস্ট হাউসে কাটানো হলো রাতটা।

পরদিনই পার্বতীপুর থেকে রেল লাইন ধরে কামান দাগতে দাগতে এগিয়ে এলো পাকিস্তানী বাহিনী। তাদের আগে হিলি পৌঁছোতেই হবে, নইলে আর কোনো উপায় নেই। এদিকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ছোট বাহিনী প্রতিরোধের জন্য তৈরি হয়ে আছে।

রাত্রির অন্ধকারে বাতি না জ্বেলে যাত্রা করলো দুটো জিপ। মেয়েরা অবিরাম সুরা পাঠ করছে। মামুন স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন, ভয় কিংবা উত্তেজনার চেয়েও দারুণ এক বিমর্ষতায় তিনি আক্রান্ত। চল্লিশের দশকে তাঁর মতন যারা পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য প্রাণপণ করেছিলেন আজ তাঁদেরই এরকম অসহায় অবস্থায় পালিয়ে যেতে হচ্ছে পাকিস্তান ছেড়ে! সে সময় কোথায় ছিল ইয়াহিয়া খান, কোথায় ছিল ভুট্টো সাহেব? আজ তারাই পাকিস্তানের রক্ষক ও ভক্ষক?

হিলি রেল স্টেশানে জিপ দুটো পৌঁছোলো রাত বারোটার পর। রেল লাইনের ওপারেই ভারত। যৌবনে মামুন অন্তত দু’বার এ পথে যাতায়াত করেছেন, কিন্তু তখন ওপারটা বিদেশ ছিল না।

মুকুলের সঙ্গে সিরাজগঞ্জের এস ডি ও শামসুদ্দীন সাহেব এসেছেন, তিনি আগেই জানিয়েছিলেন যে ভারতীয় সীমান্ত প্রক্ষীদের সঙ্গে কথা হয়ে আছে, তারা কারুকে ওপারে যেতে বাধা দিচ্ছে না। রেল লাইনের মাঝখানে এসে শামসুদ্দীন সাহেব থেমে গিয়ে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, আমি এবার যাই!

মুকুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, আপনি আমাদের সঙ্গে ওপারে আসবেন না?

শামসুদ্দীন সাহেব হেসে বললেন, বাঘাবাড়ির চরে আমি পজিশন নিয়ে আমার জোয়ানদের রেখে এসেছি। তারা আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। আমি কি এখন যেতে পারি? তাছাড়া আপনারা যাতে শিগগিরই সসম্মানে স্বাধীন বাংলায় ফিরে আসতে পারেন, তার ব্যবস্থা। করে রাখতে হবে তো!

হঠাৎ মঞ্জু হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠতেই মামুন তাঁর মাথায় হাত রাখলেন। বলার কিছু নেই। বছরের পর বছর ভারত সম্পর্কে এমন প্রচার করা হয়েছে যে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ধারণা হয়ে গেছে যে ভারত হলো হিন্দু দুশমনদের দেশ। তারা এখন কী ভাবে আশ্রয় দেবে? যদি অপমান করে, লাথি-ঝাঁটা মারে? কতদিন থাকতে হবে সে দেশে, খরচ চলবে কী ভাবে? মামুনের কাছে মাত্র দু’ হাজার পাকিস্তানী টাকা।

শেষবার মাতৃভূমির দিকে তাকিয়ে সবাই পার হয়ে এলো রেললাইন। একজন ভারতীয় সরকারি কর্মচারী অপেক্ষা করছিলেন এদিকে, তিনি বেশ ভদ্রভাবেই বললেন, আসুন, বেশী চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে! নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত আপনারা, ডাক বাংলোতে শোবার ব্যবস্থা আছে, তার আগে থানায় শুধু নাম-ধাম লিখিয়ে নিতে হবে। আসুন।

রাত একটা। থানা মানে পুলিশ চেক পোস্ট, ছোট্ট একটা ঘর, সেখানে ইলেকট্রিসিটি নেই। একজন জমাদার লম্বা একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ জ্বেলে ধরেছে, আর বিরাট এক খাতা খুলে বসে আছে গেঞ্জি গায়ে এক রোগা সিঁড়িঙ্গে থানাদার। এই দলটিকে দেখে তিনি বললেন, লাইনে দাঁড়ান, এক এক করে বলুন নাম, বাপের নাম, সাকিন, পেশা।

লিখতে লিখতে মাঝপথে কলম থামিয়ে সেই রোগা পুলিশটি মুখ তুলে বললেন, ভাইগ্যাই যদি পড়বেন, তা হইলে এই গণ্ডগোলটা বাজাইলেন ক্যান, অ্যাঁ?

এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। সবাই নীরব।

লোকটি আবার বললেন, এলায় আপনারা যে ভাগতেছেন, আপনাগো মনের অবস্থাটা কী? মানে কিনা, আপনাগো মনটা কেমন হাউ হাউ করতাছে?

লোকটির কর্কশ কণ্ঠের সঙ্গে খানিকটা বিদ্রূপ মেশানো। সদ্য ওপার থেকে এসে মাথাভর্তি বিরাট একটা প্রকাণ্ড অনিশ্চয়তার বোঝা নিয়ে যারা দাঁড়িয়েছে, তারা এই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উত্তরে কী আর বলতে পারে!

পুলিশটি আবার বললো, বুঝছেন, আমাগো বাড়িও বড়ারের হেই মুড়া, মানে বরিশাল। পঞ্চাশ সনের রায়টে বউ-পোলাপান লইয়া ভাগছি। এলায় বুঝছেন, আপনারা যখন আমাগো খেদাইছিলেন, তখন আমাগো মনড়া এইরকমই করছিল! হে ভগবান, কত কিছু দেখাইলা। এবার তো দেখতাছি, হিন্দু-মুসলমান হগলই ভাগতাছে!

মামুন তাকালেন মুকুলের দিকে। তাঁর মুখখানা যেন পাথরের মতন।

সরকারি গাইড ভদ্রলোকটি এবার বললেন, ওসব কথা ছাড়ুন। একটু তাড়াতাড়ি করুন, রাত অনেক হয়েছে, এদের সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চা রয়েছে

দু’দিন পর হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন মামুন। স্টেশানের বাইরে এসে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ওপারের কলকাতায় সবে মাত্র ভোর হচ্ছে। সেই কলকাতা, তাঁর ছাত্রজীবন ও যৌবনের কলকাতা! গত চব্বিশ বছরে এই শহর কতখানি বদলেছে কে জানে! মামুন মঞ্জুকে বললেন, এক সময় তুই কলকাতায় আসার জন্য কী কান্নাকাটি করেছিলি, তোর মনে আছে মঞ্জু? দ্যাখ, শেষ পর্যন্ত তার সেই কলকাতাতে আসা হলো!

০৯. উত্তর ও মধ্য কলকাতার রাস্তাঘাট

এক সময় উত্তর ও মধ্য কলকাতার রাস্তাঘাট খুব ভালোই চিনতেন মামুন, চব্বিশ বছরের ব্যবধানে সব কিছুই যেন ঝাঁপসা হয়ে গেছে। এখন কলকাতা একটা বিদেশী শহর, এতগুলি বছরে কত পরিবর্তন হয়েছে কে জানে, এই শহর কি তাঁদের সহৃদয়ভাবে গ্রহণ করবে? কোথায় থাকবেন কোনো ঠিক নেই। বালুরঘাট থেকে মালদা হয়ে কলকাতায় চলে এসেছেন শুধু এই ভরসায় যে, এর মধ্যেই আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপক কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। কিন্তু এত বড় শহরে কোথায় সন্ধান পাবেন তাঁদের?

আগে একটা মাথা গোঁজার জায়গা ঠিক করা দরকার। হোটেল ছাড়া গতি নেই। কলকাতার হোটেলে মুসলমানদের থাকতে দেয় তো? ছেচল্লিশের দাঙ্গার স্মৃতি অবধারিতভাবে মনে পড়ে, এবং গা ছমছম করে ওঠে। মামুনদের ছাত্র বয়েসে চৌরঙ্গি, পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলকে বলা হত সাহেব পাড়া, আর পার্ক সার্কাস, বেকবাগান, কলুটোলা, মীজাপুর, কলাবাগান, রাজাবাজার ইত্যাদি অঞ্চলগুলো ছিল প্রধানত মুসলমান পাড়া। সেই সব অঞ্চলে অনেক মুসলমানদের হোটেল ছিল। কিন্তু এখনও কি সেই সব হোটেল আছে? অধিকাংশ হোটেলই তো ছিল অবাঙালী মুসলমানদের।

বাস বা ট্রামে উঠলে ঠিক দিশা পাবেন না, এই জন্য মামুন বাধ্য হয়ে একটা ট্যাক্সি নিলেন। দাড়িওয়ালা, বলিষ্ঠকায় একজন পাঞ্জাবী সদারজী সেই ট্যাক্সির চালক, তার কোমরে কৃপাণ। লাহোর করাচী থেকে বিতাড়িত শিখদের নিশ্চয়ই জাতক্রোধ আছে পাকিস্তানীদের সম্পর্কে, এই লোকটাও সেই রকম কেউ নাকি? মামুন যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বললেন, চলিয়ে বেকবাগান।

হেনা আর মঞ্জুর মুখে উৎকণ্ঠার কালো ছায়া। তারা বারবার মামুনকে দেখছে চকিত দৃষ্টিতে। এই এক অচেনা বৃহৎ শহরে তাদের সামনে পড়ে আছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। মঞ্জু ভেতরে ভেতরে দারুণ অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছে, এখন মনে হচ্ছে, ঢাকা ছেড়ে চলে আসা তার উচিত হয়নি। আর কি কোনোদিন সে তার স্বামীকে ফিরে পাবে? বাবুল যেন ইচ্ছে করেই তাকে দূরে সরিয়ে দিল। ঢাকায় যদি এত বিপদ, তা হলে বাবুল কেন থেকে গেল সেখানে? মামুনমামাকে সে একটুও পছন্দ করে না, তবু মামুনমামার সঙ্গেই তাকে পাঠিয়ে দেবার এত আগ্রহ কেন তার?

মামুন কৃত্রিম উৎসাহ দেখিয়ে বললো, এই যে হাওড়া ব্রীজ দেখছিস তোরা, দ্যাখ মাঝখানে কোনো সাপোর্ট নাই, এত বড় ঝুলন্ত সেতু এশিয়ায় আর নাই। ঐ দ্যাখ কত লোক এই সাত সকালেই গঙ্গার পানিতে ডুব দিতে এসেছে, হিন্দুরা মনে করে গঙ্গায় তিনবার ডুব দিলেই সব পাপ দূর হয়ে যায়! ঐ পাড়টা হলো বড়বাজার, মাউড়া ব্যবসায়ীদের বড় বড় দোকান।

মঞ্জু জিজ্ঞেস করলো, মামুনমামা, বেকবাগানে তোমার চেনা কেউ আছে?

মামুন উত্তর দিতে ইতস্তত করলেন। কলেজ জীবনে তাঁর অনেক হিন্দু বন্ধু ছিল। ভারত সীমান্তে পা দেবার পর থেকেই তাঁর মনে পড়ছে তাঁর এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রতাপ মজুমদারের কথা। কিন্তু দীর্ঘকাল কেউ কারুর খোঁজ রাখেননি।

মামুন বললেন, চেনা তো অনেকেই আছে, আস্তে আস্তে খুঁজে বার করতে হবে।

তারপর তিনি সুখুর কাঁধ চাপড়ে বললেন, এই দ্যাখ ট্রাম। আগে তো কখনো ট্রাম দেখিস নাই। কেমন, সুন্দর না?

সুখু বিজ্ঞের মতন বললো, ট্রাম তো ইস্টিমারের মতন। মাটির উপরে চলে!

মামুন বললেন, ঠিক বলেছিস! আর ঐ দ্যাখ, দুতলা বাস!

হেনা বললো, বাবা, কইলকাতায় এত মানুষ?

এখন মাত্র সকাল সওয়া ছ’টা, তবু পথে মানুষের স্রোত শুরু হয়ে গেছে। ব্রীজ শেষ হবার পর হ্যারিসন রোডের মুখটায় রিকশা, ঠ্যালাগাড়ি ও ঝাঁকা মুটেদের জটলা পাকানো। এইটুকু এসেই মামুন উপলব্ধি করেছেন যে তাঁর যৌবনের সেই সুন্দর, ঝকঝকে, প্রাণবন্ত শহরের সঙ্গে এখনকার কলকাতার বিশেষ মিল নেই। বাড়িগুলির চেহারা মলিন, রাস্তাগুলো হাড় বার করা, আর যেদিকেই চোখ যায়, শুধু মানুষ, অসংখ্য মানুষ।

বেকবাগান ও পার্ক সার্কাস অঞ্চল ঘুরে শেষ পর্যন্ত একটা ছোটখাটো হোটেল পাওয়া গেল। নাম ‘হোটেল মদিনা’। কাছেই একটি মসজিদ, সেই মসজিদ থেকে তখন মাইক্রোফোনে আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

হোটেলের মালিকের মুখে উর্দ শুনে মামুন হতচকিত হয়ে গেলেন। তাঁর ধারণা ছিল, পার্টিশানের পর অবাঙালী মুসলমানরা সবাই কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে। তা তো সত্যি নয়। দেখা যাচ্ছে। এখানে এখনো এরা ব্যবসা চালায়? আশেপাশের বস্তিও মুসলমানদের।

তিনখানা বেড়ওয়ালা একটা বড় রুম পাওয়া গেল, ভাড়া দৈনিক পঞ্চান্ন টাকা। খাওয়ার। খরচ আলাদা। মামুনের কাছে যা রেস্ত আছে, তাতে দশ বারোদিনের বেশি চলবে না। মঞ্জুর হাতে দুটো সোনার বালা আর হেনার কানে দুটো মুক্তোর দুল, এইগুলো বিক্রি করলে কিছু পাওয়া যাবে, কিন্তু তারপর?

একটি অল্প বয়েসী ছোকরা তাদের নিয়ে এলো দোতলার ঘরে। দেওয়ালের রং ফাটা ফাটা, অন্ধকার-অন্ধকার ভাব, ঘরের মধ্যে আরশোলার ডিমের গন্ধ। মঞ্জু আর হেনার ঘর পছন্দ হয়নি, তবু মামুন তাদের বোঝালেন যে আপাতত এখানেই কয়েকদিন থাকতে হবে। দু’একদিন বিশ্রাম নেওয়া যাক, তারপর খোঁজখবর নিয়ে দেখতে হবে অন্য কোথায় যাওয়া যায়।

ছোকরাটিকে একটা টাকা বকশিশ দিয়ে তিনি বললেন, একটু জল খাওয়া তো বাবা, বড় তেষ্টা পেয়েছে। কী গরম এখানে!

ছোকরাটি টেবিলের ওপর রাখা একটি টিনের জগে টোকা মেরে বললো, সাব, এতে পানি ভরা আছে। চা-নাস্তা খেতে হলে আপনাদের নিচে যেতে হবে। এই হোটেলে রুম সার্ভিস পাবেন না।

মামুন হাসলেন। বডার পার হবার আগে, দারুণ সঙ্কট আর উত্তেজনার মধ্যেও এস ডি ও শামসুদ্দীন সাহেব শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ইন্ডিয়ায় গিয়ে আর পানি বলবেন না, জল বলবেন। ওরা পানি শুনলে ভুরু কুঁচকায়। সেই থেকে মামুন হিলির ডাক বাংলোয়, বালুরঘাটে, মালদায়, ট্রেনে সব সময় সচেতনভাবে পানির বদলে জল বলে এসেছেন। অথচ, কলকাতার হোটেলের এক বেয়ারা তাঁর মুখের ওপর পানি বলে গেল!

মামুনদের ছাত্র বয়েসে জলপানি বলে একটা কথা প্রচলিত ছিল। স্কলারশিপের বাংলা। হয়তো হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের ছাত্রদের কথা ভেবেই শব্দটা তৈরি করা হয়েছিল। অনেকদিন মামুন জলপানি শব্দটা শোনেননি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর হিন্দু আর মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মিলনের যে-কোনো প্রস্তাবই অপরাধ বলে গণ্য করা হত। পশ্চিম পাকিস্তানীদের চোখে হিন্দু মাত্রই কাফের এবং পাপের সঙ্গী। বাঙালী মুসলমানদের তারা আধা হিন্দু মনে করেই তো ঘৃণা করেছে! ভারত অর্থাৎ ইন্ডিয়াতেও নিশ্চয়ই তার বিপরীত ধারণাই গড়ে উঠেছে।

হেনা একটা বন্ধ জানলা ঠেলে ঠেলে খুলে দিয়ে বললো, বাবা, কইলকাতা শহরে, কী রকম যেন একটা গন্ধ।

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, কী রকম গন্ধ রে? দুবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে, ভুরুতে ঢেউ খেলিয়ে বললো, কী জ

যায় না, তবে অন্য রকম, ঢাকার মতন না।

মঞ্জু জিজ্ঞেস করলো, মামুনমামা, আমরা কতদিন থাকবো এখানে?

এ প্রশ্নের উত্তর মামুনের জানা নেই। তিনি সুখুর মাথায় হাত বুলোত বুলোত বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখবি, সব ঠিক হয়ে যাবে।

ঘরের সংলগ্ন বাথরুম নেই, যেতে হবে বারান্দার এককোণে। সেখান থেকে ঘুরে এসে হেনা বললো, কী নোংরা! কাপড় ছাড়ার জায়গা নাই।

কলকাতা শহরে পঞ্চান্ন টাকা ভাড়ার হোটেল আর কত ভালো হবে। নিরাপত্তা আছে কিনা। সেটাই বড় কথা। সেদিক থেকে মনে হয় ভয়ের কিছু নেই।

মামুন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তোরা কাপড় টাপড় ছেড়ে নে, আমি একটা ঘুল্লা দিয়ে আসি।

একতলায় এসে দেখলেন, একজন লোক ইংরিজি কাগজ পড়ছে। মামুন পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দিলেন। প্রথম পৃষ্ঠায় ছ’ কলমের হেড লাইনে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের সংবাদ। যশোরে একটা সাইকেল রিকশার ওপর তিনটি লাশের ছবি। বিদেশী সাংবাদিকদের বিবরণ।

পশ্চিম বাংলাতেও খুনোখুনির সংবাদ রয়েছে প্রথম পৃষ্ঠাতেই। নকশালপন্থী, পুলিশ, সি পি এম আর কংগ্রেসীদের লড়াই। শামসুদ্দীন সাহেব সাবধান করে দিয়েছিলেন, কলকাতার কোনো কোনো অঞ্চলে নকশালপন্থীরা নাকি অচেনা মানুষ দেখলেই খুন করে।

একটা বাংলা কাগজ কেনার জন্য মামুন রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। এপ্রিল মাসের রোদ শরীরে আলপিন বিধিয়ে দেয়। এর মধ্যেই ট্রামগুলো টই-টুম্বুর ভর্তি, বাইরেও লোক ঝুলছে। মামুন হাঁটতে লাগলেন, কোন রাস্তা কোন দিকে গেছে তা তাঁর মনে পড়লো না। তবে পাড়াটা চেনা চেনা লাগছে। আগের তুলনায় অনেক ঘিঞ্জি হয়েছে, ফাঁকা জায়গা এক ইঞ্চিও পড়ে নেই কোথাও।

খানিক বাদে তিনি এসে পৌঁছোলেন চৌরাস্তার মোড়ে। এই জায়গাটা তাঁর স্পষ্ট মনে পড়লো। বাঁ দিকে পার্ক স্ট্রিটের পুরনো কবরস্থান। সামনে আরও এগিয়ে গেলে নতুন খ্রীষ্টানী কবরখানা, সেখানে শুয়ে আছেন মাইকেল মধুসূদন। ডান দিকে কিছু দূরে পার্ক সার্কাস ময়দান। রিপন স্ট্রিটের একটা মেসে মামুন কিছুদিন ছিলেন, সে জায়গাটা এখান থেকে বেশি দূর হবে না।

একখানা আনন্দবাজার কিনে মামুন চা খেতে ঢুকলেন এক দোকানে। দোকানটিতে নাস্তা খাওয়ার জন্য লোকেদের বেশ ভিড়। অধিকাংশ খদ্দের এবং লুঙ্গিপরা বেয়ারারা কথা বলছে। উর্দুতে। দু’একটি টেবিলে উর্দু সংবাদপত্র। মামুনের হাতে বাংলা কাগজ দেখে অন্যরা কি তাঁকে হিন্দু ভাবছে? প্রথম দিন এসেই কলকাতা শহরের এই চিত্রটি দেখবেন, মামুন একেবারেই তা আশা করেননি।

আনন্দবাজার পত্রিকাটা মামুন দেখলেন অনেকদিন পর। যখন তিনি মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন, তখন এই পত্রিকার নীতির সঙ্গে তাঁর খুবই মতবিরোধ ছিল। মনে আছে, একবার তাঁরা রাস্তায় এই কাগজ পুড়িয়েছিলেন।

এই পত্রিকায় এখন চলিত ভাষায় খবর লেখা হয়। মামুন বরাবর সাধু বাংলাতেই লিখে এসেছেন। যশোর-খুলনা-চট্টগ্রামের অত্যাচার ও সঙ্ঘর্ষের খবরই বেশি। ঢাকায় গুলি চালনা বিষয়ে রয়টারের খবরের একটি ছোট বক্স আইটেম। চতুর্থ পৃষ্ঠায় আবদুল আজাদ নামে একজনের লেখা ঢাকায় পঁচিশে মার্চ রাত্রির নারকীয় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। মামুন মন দিয়ে লেখাটি পড়লেন, সত্যি কথাই লিখেছে, পড়লে মনে হয় লেখকটি ঢাকার একজন সাংবাদিক। কিন্তু আবদুল আজাদ কে? ঢাকার সাংবাদিক লেখকদের প্রায় প্রত্যেককেই মামুন চেনেন, হয়তো এই লোকটি ছদ্মনামে লিখেছে।

পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার রিফিউজি আসছে ভারতে, সে খবরও রয়েছে প্রথম পৃষ্ঠায়, সঙ্গে ছবি। মামুন ভাবলেন, তিনিও তো রিফিউজি।

পাশের টেবিলে কয়েকটি ছোকরা বোম্বাইয়ের একটি সিনেমা বিষয়ে আলোচনা করছে। দিলীপকুমার নামে একজন নায়ক নাকি আসলে মুসলমান, সে রাজকাপুর নামে আর একজন নায়কের চেয়ে যে অনেক বড় অভিনেতা, সেটাই ওদের বক্তব্য। নার্গিস ও সায়রা বানুর মতন দুই সুন্দরী অভিনেত্রীর সঙ্গে বোম্বাইয়ের আর কোনো মেয়ের তুলনাই চলে না। মহম্মদ রফি হেমন্তকুমারের চেয়ে অনেক বড় গায়ক।

কলকাতার কোনো চায়ের দোকানে যে এ ধরনের কথাবার্তা শুনবেন, মামুন কল্পনাই করতে পারেননি। এ যেন মীরপুরের কোনো দোকান। কোনো অলৌকিক উপায়ে কলকাতার এই রেস্তোরাঁটি কি চব্বিশ বছর আগের জগতেই রয়ে গেছে? কোনো হিন্দু কি এ দোকানে আসে na? দোকানের দরজার ওপর ‘নো বীফ’ লেখা একটা ছোট্ট বোর্ড ঝুলছে।

কলকাতা থেকে মাত্র শ’খানেক মাইল দূরেই মুসলমান এখন মুসলমানকে মারছে, খুন হচ্ছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ, মুসলমানের ঘরের মেয়েদের ধর্ষণ করছে মুসলমান সৈন্য, গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে আগুনে, সে সম্পর্কে এখানে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই? এরা কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না? ওদের সামনে টেবিলে যে উর্দু কাগজ পড়ে আছে, তাতে কী লিখেছে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা সম্পর্কে? মামুন উর্দু শুনে বুঝতে পারলেও পড়তে পারেন না। ঐ লোকগুলির সঙ্গে কথা বলতেও মামুনের ভয় করলো। নিদারুণ একাকীত্ব বোধের অবসাদে ছেয়ে গেল তাঁর বুক।

হোটেলে ফিরে এসে মামুন লম্বা এক ঘুম দিলেন। বিকেলে একবার ঘুম থেকে উঠে বেরুবার কথা চিন্তা করেও বেরুলেন না শেষ পর্যন্ত। কোথায় যাবেন? একটা কোনো চেনা মানুষের ঠিকানা তাঁর সঙ্গে নেই। এম আর আখতার মুকুলরা সদলবলে এসে কোথায় উঠবেন, সেটাও যদি জেনে রাখতেন! সহায়সম্বলহীন অবস্থায় কতদিন থাকতে পারবেন এই কলকাতা শহরে। এত বড় শহর, এর প্রকাণ্ড উদর, এখানে যে আসে সে-ই ঠাঁই পেয়ে যায়, তারপর কে মরলো, কে বাঁচলো, তা কেউ খেয়ালও করে না।

সন্ধে হতে না হতেই আবার ঘুমিয়ে পড়লেন মামুন। তাঁর শরীর পুরোপুরি সুস্থ নয়, টাইফয়েডের পরে, এখনও গায়ে জোর পাননি।

হোটেলের আব্বাস নামে একটি বাচ্চা বেয়ারাকে এর মধ্যেই হাত করে নিয়েছে মঞ্জু, সে নিচের তলা থেকে চা-খাবার এনে দেয়। মঞ্জু আর হেনা দু’জনে মিলে ঠেলাঠেলি করেও মামুনকে কিছু খাওয়াতে পারলো না।

পরদিন মামুন জোর করে ঝেড়ে ফেললেন অবসাদ। একটা কিছু করতেই হবে। তিনি ঠিক করলেন, তিনি কোনো খবরের কাগজের অফিসে যাবেন। সাংবাদিকরাই বলতে পারবে, পূর্ব বাংলার নেতাদের মধ্যে কে কোথায় উঠেছেন, মুক্তি আন্দোলন চালাবার জন্য কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি নিজেও সহজভাবে কথা বলতে পারবেন সাংবাদিকদের সঙ্গে।

আনন্দবাজার অফিসটা বর্মণ স্ট্রিটে না? একবার যেন গিয়েছিলেন কার সঙ্গে। কিন্তু কাগজটা নিয়ে দেখলেন অন্য ঠিকানা। এই জায়গাটা কোথায়? পোস্টাল জোন যখন কলিকাতা-১, তখন জি পি ওর কাছাকাছি হবে।

মামুন বেরুবার উদ্যোগ করতেই হেনা জিজ্ঞেস করলো, বাবা, আমরা কইলকাতা শহর দেখবো না?

মামুন বললেন, দেখবি, দেখবি, আমি তোদের নিয়ে যাবো সব জায়গায়, দু’একটা দিন সবুর কর।

মঞ্জু খাটের ওপর পা মেলে বসে আছে, শাড়িটা এলোমেলো, চুল বাঁধেনি, চোখ দুটো ফুলো ফুলো, সে যে গোপনে কান্নাকাটি করছে, তা দেখলেই বোঝা যায়।

মামুন বললেন, তোরা ঘর থেকে এক পাও বাইরাস না। সুখুকে দেখবি, যেন হুট করে রাস্তায় না যায়। আমি ঘুরে আসতেছি।

কলকাতা শহরে মামুন অন্তত দশ বারো বছর কাটিয়েছেন, এখন এই শহরে রাস্তা হারিয়ে ফেললে খুব লজ্জার বিষয় হবে। মোড়ের মাথায় এসে তিনি এসপ্লানেড লেখা একটা ট্রামে চড়ে বসলেন।

বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তিনি পেয়ে গেলেন আনন্দবাজার অফিস। মস্ত বড় লোহার গেট, অনেকগুলি দারোয়ান, এই পত্রিকার আগেকার অফিসের সঙ্গে কোনো মিলই নেই। একজন দারোয়ান ভেতরে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিল।

কাচের দরজার ওপাশে একটা কাউন্টার। তার এক পাশ দিয়ে লোকজন যাতায়াত করছে। মামুন সেখান দিয়ে ঢুকতে যেতেই একজন বেশ মোটা গোঁফওয়ালা বলিষ্ঠ ব্যক্তি প্রায় হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো, এই যে, কোথায় যাচ্ছেন?

মামুন বিনীতভাবে বললেন, সম্পাদক মশাইয়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।

গোঁফওয়ালা লোকটি মুখে হাসি ছড়িয়ে বিদ্রূপের সুরে বললো, এডিটরের সঙ্গে দেখা করতে। চান? চাইলেই কি দেখা করা যায় নাকি? আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?

মামুন বললেন, জী না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নাই।

–তবে দেখা হবে না। তিনি এমনি এমনি কারুর সঙ্গে দেখা করেন না।

–নিউজ এডিটরের সাথে দেখা হতে পারে কী?

–তিনি খুব ব্যস্ত। যার-তার সঙ্গে দেখা করেন না।

–হলে অন্য কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে যদি দেখা করা যায়।

–আপনার কী দরকার, কোথা থেকে এসেছেন, সেটা বলুন।

–দেখুন, আমি নিজেও একজন সাংবাদিক, ঢাকা থেকে এসেছি, যদি এখানে কারুর সাথে একটু আলাপ করা যায়।

গোঁফওয়ালা লোকটি লাফিয়ে উঠে বললো, ঢাকা থেকে? জয় বাংলা? হ্যাঁ, হ্যাঁ আসুন। আসুন। এই যে স্লিপে নাম লিখুন।

লোকটির ব্যবহার সম্পূর্ণ বদলে গেল, খাতির করে নিজে এসে মামুনকে লিফটে তুলে নিয়ে গেলেন ওপরে, একটা টেবিলের সামনে গিয়ে বললেন, অমিতবাবু, ইনি ঢাকা থেকে এসেছেন, রিপোর্টার।

অমিতবাবুও হাসি মুখে বললেন, আরে মশাই, বসেন, বসেন! বাড়ি কোন জেলায়? সিলেট নাকি?

সেই টেবিলের উল্টোদিকে একজন লম্বা মতন লোক নিউজ প্রিন্টের প্যাডে খসখস করে দ্রুত কী যেন লিখে চলেছে, মামুন তার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, গাফফার না?

লোকটি মুখ ফিরিয়ে কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলকভাবে চেয়ে রইলো, তারপর বললো, মামুন ভাই? আমি শুনেছিলাম আপনাকে ধরে নিয়ে গেছে? ছাড়া পেলেন কী করে?

মামুন বললেন, না আমাকে ধরতে পারে নাই। হিলি বর্ডার দিয়ে পালিয়ে এসেছি।

আবদুল গাফফার চৌধুরীকে পেয়ে মামুন যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তাঁকে নিজের মুখে পরিচয় দিতে হলো না এখানে। গাফফার কয়েকদিন আগেই এখানে এসেছেন, অনেকের সঙ্গে চেনা হয়ে গেছে।

অমিতাভ চৌধুরীর সঙ্গে খানিকক্ষণ আলাপ করার পর গাফফার বললেন, চলেন, আপনারে সন্তোষদার কাছে নিয়ে যাই। তিনিই এই কাগজের সর্বেসর্বা।

কিন্তু সন্তোষকুমার ঘোষের ঘরে তখন খুব ভিড়, ভেতরে ঢোকা গেল না। গাফফার তাঁকে। নিয়ে ঘুরে ঘুরে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবার পর এলেন দেশ পত্রিকার ঘরে। সম্পাদকের সামনে গিয়ে বললেন, সাগরদা, ইনি সৈয়দ মোজাম্মেল হক, আমাদের ঢাকার খুব শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক, একটা ডেইলি পত্রিকার এডিটর ছিলেন। জঙ্গীবাহিনী একে ধরতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে কোতল করে দিত। বহু কষ্ট করে পালিয়ে এসেছেন।

দেশ পত্রিকার সম্পাদক মধ্যমাকৃতি, হৃষ্টপুষ্ট চেহারা, দেখলে খুব গম্ভীর মনে হয়। গাফফারের কথা শুনে তিনি শুধু হাত তুলে নমস্কার করলেন, মুখ দিয়ে কিছু উচ্চারণ করলেন না।

মামুন বললেন, আমি এক সময় দেশ পত্রিকা নিয়মিত পড়েছি। সিক্সটি ফাঁইভের পর তো। আমাদের ওখানে এদিককার কোনো পত্র-পত্রিকাই পাওয়া যেত না। অনেকদিন টাচ নাই। আজ আপনার সাথে আলাপ করে খুব খুশী হলাম।

সম্পাদক মশাই এবারেও একটিও কথা বললেন না।

গাফফার বললেন, জানেন সাগরদা, দুটি মেয়ে আর একটি বাচ্চাকে নিয়ে মামুন-ভাই যেভাবে প্রায় দেড় শশা মাইল রাস্তা পার হয়ে বড়ার ক্রশ করে এসেছেন, সে এক রোমহর্ষক ব্যাপার।

সম্পাদক মশাই হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পেছন ফিরলেন। এবার বোঝা গেল তাঁর নীরবতার রহস্য। জানলার কাছে গিয়ে পানের পিক ফেলে এসে তিনি মুখে সহৃদয় হাসি ফুটিয়ে। বললেন, আপনার অভিজ্ঞতার কথা লিখে দিন না আমাদের কাগজের জন্য। পূর্ব বাংলায় সত্যি সত্যি কী ঘটছে সব পাঠকরা জানতে চায়। দেরি করবেন না, কালই লিখে আনুন।

মামুন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আপনি যে বললেন, এতেই আমি ধন্য হয়ে গেলাম। লেখার চেষ্টা করবো অবশ্যই, যদি আপনার পছন্দ হয়…।

খানিক বাদে গাফফার মামুনকে নিয়ে ঢুকলেন সন্তোষকুমার ঘোষের ঘরে। ছোটখাটো চেহারার মানুষটি, গায়ে একটা সিল্কের পাঞ্জাবি, তার এক জায়গায় মাংসের ঝোলের দাগ। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। স্বভাবটি যে অত্যন্ত ছটফটে তা অল্পক্ষণ দেখলেই বোঝা যায়। বাঁ হাতে একটা কাগজ তুলছেন, ডান হাতে একটা কাগজ ছুঁড়ে ফেলছেন, লম্বা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে জল খেলেন এক চুমুক, আবার ধরিয়ে ফেললেন একটা সিগারেট। অন্য একজনের সঙ্গে কী নিয়ে যেন বকাবকি করছিলেন, সেই ব্যক্তিটি চলে যাবার পর গাফফার সামনে এসে মামুনের পরিচয় দিলেন।

সন্তোষকুমার কপালের কাছে হাত তুলে বললেন, আস্সালাম আলাইকুম। বসুন! কী নাম। বললেন? সৈয়দ মোজাম্মেল হক? নামটা চেনা চেনা।

ভুরু কুঁচকে একটু চিন্তা করতে করতে ফস্ করে পকেট থেকে একটা ক্যাটকেটে সবুজ রঙের চিরুনি বার করে চুল আঁচড়ে নিলেন অকারণে। তারপর বললেন, সৈয়দ মোজাম্মেল হক? আপনি এক সময় সওগাতে কবিতা লিখতেন না? ‘আশমানের প্রজাপতি’ নামে আপনার কবিতার বই আছে, আমি পড়েছি। কিছুদিন ‘দিন কাল’ নামে একটি ডেইলি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ‘অনুসন্ধিৎসু’ ছদ্মনাম দিয়ে আপনিই তো একটা কলাম লিখতেন, তাই না?

মামুন স্তম্ভিতভাবে তাকিয়ে রইলেন মানুষটির দিকে।

গাফফার বললেন, মামুন ভাই, এই হচ্ছেন সন্তোষদা। ফ্যানটাসটিক মেমারি। বাংলা ভাষায় বোধ হয় একটাও ছাপার অক্ষর নাই, যা উনি পড়েন নাই। আমার নাম শোনামাত্রই উনি। বলেছিলেন, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটা আপনার লেখা না?

সন্তোষকুমার গাফফারকে এক ধমক দিয়ে বললেন, চুপ করো! আমি যখন কথা বলবো, তখন অন্য কেউ কথা বলবে না। আপনি পচিশে মার্চ রাত্তিরে ঢাকায় ছিলেন? মিলিটারি অ্যাকশান কিছু দেখেছেন নিজের চোখে?

মামুন বললেন, অনেক কিছুই দেখেছি।

সন্তোষকুমার বললেন, কালই সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখে আনুন। পার্সোনাল টাচ দিয়ে লিখবেন, প্রবন্ধ-ট্রবন্ধ নয়, ঠিক যা-যা দেখেছেন।

মামুন বললেন, দেশ পত্রিকার সাগরময় ঘোষবাবুও আমাকে ঐ বিষয়ে লিখতে বললেন।

সন্তোষকুমার চোখ রাঙিয়ে বললেন, ঐ সব দেশ পত্রিকা-টত্রিকা ছাড়ুন। আমি বলছি, এখানে লিখতে হবে। দেশে লিখে ক’ পয়সা পাবেন? এখানে রিফিউজি হয়ে এসেছেন, টাকার দরকার নেই? উঠেছেন কোথায়?

–একটা হোটেলে।

–ব্যাঙ্ক লুট করা টাকা এনেছেন নাকি?

মামুন এবারে হাসলেন। এই মানুষটির কথাবার্তায় একটা কঠিন ব্যক্তিত্ব আরোপের চেষ্টার মধ্যেও যে একটা সরল ছেলেমানুষী আছে, তা বুঝতে দেরি লাগে না।

সন্তোষকুমার আবার বললেন, গাফফার এখানে লিখছে। সৈয়দ সাহেব, আপনি ইচ্ছে করলে। এই কাগজে একটা রেগুলার ফিচার লিখতে পারেন। তাতে আপনার এখানকার খরচ চলে। যাবে।

মামুন বললেন, আমাকে সৈয়দ সাহেব বলবেন না। বড় গালভারি শোনায়। অনেকেই আমাকে মামুন বলে ডাকে। আপনি আর আমি বোধ হয় এক বয়েসীই হবো।

সন্তোষকুমার আবার একটু ট্যারা হয়ে কিছু চিন্তা করে বললেন, আপনি যখন সওগাতে কবিতা লিখতেন, তখন আমি চাকরি করতুম মোহাম্মদী কাগজে, তা জানেন? আমার বাড়ি ছিল ফরিদপুর। আপনার বাড়ি.দাঁড়ান, দাঁড়ান, বলবেন না, উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে, কুমিল্লা। তাই না?

আধঘণ্টা পরেই মামুনের মনে হলো, এই মানুষটির সঙ্গে তার অনেক দিনের চেনা। তিনি একবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তো অনেককিছু জানেন, কলকাতায় আমার এক পুরনো। বন্ধুকে খুঁজে বার করতে চাই, প্রতাপ মজুমদার, তার কোনো সন্ধান দিতে পারেন?

–প্রতাপ মজুমদার? তিনি কী লেখেন? না, ঐ নামে কোনো লেখক নেই। কী করেন। তিনি?

–মুন্সেফ ছিলেন, এখন বোধ হয় সাবজজ বা ডিস্ট্রিক্ট জজ হয়েছেন। কলকাতায় থাকেন। কিনা তাও অবশ্য জানি না।

–সেভাবে তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক যদি বাড়িতে টেলিফোন থাকে, গাইডে ঠিকানা। পাওয়া যাবে।

মামুন চমৎকৃত হয়ে ভাবলেন, তাই তো, টেলিফোন গাইড দেখার কথা তো তার আগে মনে। আসেনি?।

সন্তোষকুমার আবার চ্যাঁচামেচি করে উঠলেন, গাইডটা কোথায় গেল? আঃ, কাজের সময় ঠিক জিনিসটা পাওয়া যায় না, গুনধর, গুধির! স্টুপিড, কে এখান থেকে গাইডটা নিয়ে গেছে? যাও, তোমার আর চাকরি নেই!

টেলিফোনের ওপর সামনেই মোটা গাইডটা রাখা। গুণধর নামে বেয়ারাটি সেটি নিঃশব্দে এগিয়ে দিল। সন্তোষকুমার পাঁচ টাকার একটা নোট বকশিশ হিসেবে তাকে ছুঁড়ে দিয়ে ফরফর করে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। তারপর বললেন, না, ও নামে কেউ নেই। আর কেউ চেনা নেই?

মামুন বললেন, আর একজন ছিল বিমানবিহারী, তার পদবী মনে নাই।

–ওভাবে কলকাতায় মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছুদিন থাকুন, আস্তে আস্তে খোঁজ পাবেন। লেখাটা কিন্তু কালকেই চাই। আপনার কিছু টাকা অ্যাডভান্স লাগবে?

খানিকটা পরে গাফফারের সঙ্গে আনন্দবাজারের গেট দিয়ে বাইরে এসে মামুন বললেন, বুকখানা এখন হালকা লাগছে। এদেশে আমাদের শুভার্থী আছে সেটা ঠিক আগে বুঝি নাই। আচ্ছা গাফফার, আনন্দবাজার অফিসে ঢোকার এত কড়াকড়ি কেন? গেটে পাহারাদার, খবরের কাগজের অফিস, অথচ কেমন যেন দুর্গ দুর্গ ভাব!

গাফফার বললেন, নকশালদের ভয়ে এই ব্যবস্থা। নকশালরা যদি বোমা মেরে প্রেস উড়িয়ে দেয়! বামপন্থীদের এই কাগজের উপর খুব রাগ। এরা তো বলে জাতীয়তাবাদী দৈনিক, ইন্ডিয়াতে জাতীয়তাবাদ মোটেই ফ্যাসানেল নয়। কলকাতার অনেক দেয়ালে দেখবেন চীনের চেয়ারম্যানের নামে প্রশস্তি।

মামুন বললেন, আনন্দবাজার বরাবরই অ্যান্টি পাকিস্তানী কাগজ। ঢাকায় বসে আমরা কেউ আনন্দবাজারের নামও উচ্চারণ করতাম না। এখন এই কাগজই আমাদের বড় সাপোর্টার। তুমি আর আমি এই কাগজের লেখক হতে চলেছি। একেই বলে নিয়তি।

১০. পিজি হাসপাতালের গেটের সামনে

পিজি হাসপাতালের গেটের সামনে পরিচিতদের ভিড় দেখেই প্রতাপ থমকে গেলেন। সবাই নীরব। এরপর আর কোনো প্রশ্ন করার দরকার হয় না। প্রতাপ ভেতরে ঢুকলেন না, রেলিং-এর এক পাশে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। কাছেই দু’ গাড়ি ভর্তি পুলিশ। এখন হাসপাতালের গেটেও পুলিশ পাহারা রাখতে হয়।

হাইকোর্টের বিচারপতি কিরণলাল রায়কে কুমোরটুলিতে তাঁর বাড়ির সামনেই গাড়ির মধ্যে গুলি করা হয়েছিল গতকাল। হাসপাতালে এনেও তাঁকে বাঁচানো গেল না। বিদ্বান ও সজ্জন। ছিলেন তিনি, তবু কয়েকটি অল্পবয়সী ছেলে নিছক একটি খুন করার জন্যই তাঁকে পৃথিবী থেকে অসময়ে সরিয়ে দিয়ে গেল। সরকারি কর্মচারি, পুলিশ, শিক্ষক, বিচারপতি এইরকম সমাজের নানা স্তরের মানুষদের এলোমেলো ভাবে খুন করে এরা সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে চায়। একমাত্র ব্যবসায়ীদের গায়েই এরা হাত ছোঁয়াচ্ছে না।

একটু পরে বিমানবিহারী বেরিয়ে এলেন হাসপাতালের চত্বর থেকে। ভুরু দুটো কুঁচকে আছে, শোকের বদলে তাঁর মুখে অসম্ভব একটা বিরক্তির ছাপ। প্রতাপকে দেখতে পেয়ে তিনি কাছে এসে বললেন, বডি বার করতে দেরি আছে, তুমি কি এখনো থাকবে?

প্রতাপ নিঃশব্দে দু’দিকে ঘাড় নাড়লেন।

বিমানবিহারী বললো, চলো, তাহলে আমার সঙ্গে চলো। পরে খবর নিয়ে না হয় শ্মশানে যাওয়া যাবে।

গাড়ির দরজা খুলে তিনি প্রতাপকে ভেতরে বসালেন। তারপর নিজে ঢুকেই প্রচণ্ড ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, এসব কী হচ্ছে বলো তো! কিরণ আমার ছেলেবেলার বন্ধু, গত সপ্তাহেও দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে… এমনি ভাবে হঠাৎ তাকে চলে যেতে হলো। কয়েকটা বকাটে গুণ্ডা ছেলের জন্য! কোনো প্রোটেকশান নেই, এর কোনো বিহিত নেই!

প্রতাপ কোনো উত্তর না দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন।

বিমানবিহারী বললেন, আমি এখনও ভাবতে পারছি না, কিরণ আর নেই! এমন অকারণে একজন মানুষের জীবন যাবে! জানো প্রতাপ, আজ পর পর দুটো খারাপ খবর পেলুম। আজ কাগজে সন্তোষ ভট্টাচার্যের কথা পড়েছো?

প্রতাপ বললেন, না, খেয়াল করতে পারছি না তো! সন্তোষ ভট্টাচার্য কে?

–বহরমপুরের সৈদাবাদে খুন হয়েছেন সন্তোষ ভট্টাচার্য! আমার বিশেষ পরিচিত। আমাদের পাবলিকেশনের বই নিতে এসেছেন কতবার। শিক্ষক আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা এই সন্তোষবাবু, এবার পালামেন্টারি ইলেকশনে দাঁড়াবার কথা ছিল…সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরছিলেন ভদ্দরলোক, কটা ছেলে এসে তাকে ছুরি মেরে গেল। আচ্ছা বলো তো, অরাজকতা আর কাকে বলে! এইরকমভাবে আর কিছুদিন চললে সমাজ, সভ্যতা সব গোল্লায় যাবে। এ ওকে মারবে, সে তাকে মারবে! বুড়ো অজয় মুখার্জি দ্বিতীয়বার চীফ মিনিস্টার হয়ে এলো, একটা জোড়াতালি দেওয়া গভর্নমেন্ট, এরা ওয়েস্ট বেঙ্গলের সর্বনাশ করে দেবে না?

প্রতাপ ধীর স্বরে বললেন, যতবার এই রকম খুনের খবর কাগজে পড়ি কিংবা লোকের মুখে শুনি, আমার ভেতরটা পুড়তে থাকে। একটা প্রচণ্ড অপরাধবোধ,…এর জন্য আমিও তো কিছুটা দায়ী। আচ্ছা বলো তো বিমান, কী প্রায়শ্চিত্ত করা সম্ভব আমার পক্ষে?

।এক মুহূর্তে বিমানবিহারীর সমস্ত উত্তেজনা মিলিয়ে গেল, তিনি বিবর্ণ মুখে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বন্ধুর হাত চেপে ধরে তিনি বললেন, না, না, প্রতাপ, আমি তোমাকে আঘাত দেবার জন্য কিছু বলিনি, বিশ্বাস করো, একই দিনে দু’জন চেনা মানুষের এরকম ঘটনা শুনে আমার এমন লেগেছে…না, না, তুমি এজন্য দায়ী হতে যাবে কেন?

–আমার দায়িত্ব নেই? আমার নিজের ছেলেই তো এইসব শুরু করেছে!

–ননসেন্স! তুমি এখনো ঐ ভুল ধারণাটা আঁকড়ে বসে আছো? তোমাকে তো কতবার বলেছি যে বাবলুর অ্যাকশানটা ছিল পিওরলি সেলফ ডিফেন্সে। রণজিৎ গুপ্ত নিজে আমাকে বলেছে। যে-ছেলেটা খুন হয়েছিল, সে ছিল একজন কনফার্মড ক্রিমিন্যাল, ওরা কয়েকজন বোমাড় নিয়ে বাবলুদের অ্যাটাক করেছিল। মনে করো, রাস্তায় একটা গুণ্ডা হঠাৎ তোমাকে মারতে এলো, তুমি উল্টে রেজিস্ট করবে না? সেই ছেলেটার সঙ্গে যে আর দু’জন ছিল, তাদের স্টেটমেন্ট আর বাবলুর বন্ধু তপনের স্টেটমেন্ট মিলে গেছে!

–বাবলুর কাছে রিভলভার কী করে এলো? রিভলভার ছোঁড়া শিখলই বা কবে? অথচ সে নিজের হাতে ফায়ার করেছে, তাতেও তো কোনো সন্দেহ নেই!

–রিভলভার ছোঁড়া শিখতে দোষ নেই। শিখে ভালোই করেছিল। নইলে সে নিজেই মরতো। তোমার দুটি ছেলের একটিও আর থাকতো না। তাছাড়া, বাবলুদের ঘটনাটা ঘটেছিল এখনকার এইসব পলিটিক্যাল খুনোখুনি শুরু হবার অনেক আগে,একটা স্ট্রে ইনসিডেন্ট, এসবের সঙ্গে কোনো যোগই নেই! প্রতাপ, তুমি ঐ এক ব্যাপার নিয়ে অবসেল্ড হয়ে থেকো না। ওসব তো চুকেবুকে গেছে!

–সত্যিই কি চুকে গেছে? বাবলু আর কোনোদিন দেশে ফিরতে পারবে?

–কেন পারবে না? ধরে নিতে পারো, প্র্যাকটিক্যালি বাবলুর নামে কেস ড্রপড হয়ে গেছে। বাবলুর যে অ্যাকমপ্লিস ছিল, যে বাবলুকে রিভলভারটা সাপ্লাই করেছে, সেই মানিক ভট্টাচার্যও মারা গেছে শুনেছো তো? কাগজেও বেরিয়েছিল খবরটা। রণজিৎ আমাকে বলেছে যে কোটে নাকি ঐ কেসের কাগজপত্রই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং ও নিয়ে আর কেউ কোনোদিন মাথা ঘামাবে না। এখন চতুর্দিকে এত সব কাণ্ড হচ্ছে, দু’আড়াই বছর। আগেকার ঐ সামান্য একটা ঘটনা কে মনে রাখবে?

প্রতাপ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন।

বিমানবিহারী প্রতাপের কাঁধ ছুঁয়ে বললেন, এবার যখন বাবলুকে চিঠি লিখবে, ওকে লিখে দিও ও এখন ইচ্ছে করলেই দেশে ফিরতে পারে। কোনো ভয় নেই। অবশ্য ও যদি আরও দু’এক বছর থেকে কিছু টাকা জমিয়ে আনতে চায়, সেটাও মন্দ না। মমতার নিশ্চয়ই ছেলেকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে!

গাড়িটা বিমানবিহারীর বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে, হঠাৎ দেখা গেল গলির মুখে একটা হুড়োহুড়ি, লোকজন এদিকে সেদিকে ছুটছে। কিসের যেন একটা চিৎকার! ওখানে একটা কিছু সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটেছে। বিমানবিহারী ড্রাইভারের কাছে ঝুঁকে এসে আতঙ্কে চেঁচিয়ে বললেন, গাড়ি ঘোরাও, গজু, শিগগির গাড়ি ঘোরাও!

কয়েকটি রিকশা ও সাইকেল এলোমেলো ভাবে পালাচ্ছে, তারই মধ্য দিয়ে ড্রাইভার একটা ইউ টার্ন নিয়ে ঘুরিয়ে নিল গাড়ি। এলগিন রোডের কাছাকাছি এসে গাড়িটা থামলো। এখানে রাজপথের চিত্র একেবারে স্বাভাবিক। ট্রামবাস চলছে, লোকজন ঠিকঠাক হেঁটে যাচ্ছে, কোমারে চেন দিয়ে বাঁধা রিভলভার সমেত একজন ট্রাফিক পুলিশ হাত দেখাচ্ছে, তাকে পাহারা দিচ্ছে আর একজন পুলিশ!

বিমানবিহারী সাঙ্ঘাতিক মর্মবেদনার সঙ্গে বললেন, দিনে-দুপুরে নিজের বাড়িতেও ফিরতে পারব না? এই বর্বর দেশে আমরা বাস করছি! প্রতাপ, ওরা আমার বাড়ি অ্যাটাক করেনি তো? আমরা ভয়ে পালিয়ে এলাম!

প্রতাপ বললেন, না, না, তোমার বাড়ি অ্যাটাক করবে কেন?।

–কেন অ্যাটাক করবে, তার কি কোনো যুক্তি খোঁজার দরকার আছে? আমাদের কৃষ্ণনগরের বাড়িতে কারা আগুন লাগালো, কেন আগুন লাগালো, তা তো আজও জানা গেল না!

–তা হলে চলো আমরা ফিরে যাই। আমরা গাড়ির মধ্যে আছি, চাচামেচি দেখেই তক্ষুনি ফিরে না আসাই উচিত ছিল। একটু দেখে নিলে হতে।

–গাড়িতে থাকলেই বা কী সুবিধে? জাস্টিস কিবলাল রায় তো নিজের বাড়ির সামনে গাড়িতেই বসে ছিলেন! তিনি বাঁচতে পারলেন? এখন কী হবে, বাড়িতে মেয়েরা রয়েছে, একবার লালবাজারে যাবো?

–আমার মনে হয়, বিমান, একবার কাছাকাছি ফিরে গিয়ে দেখে নেওয়া যাক। আগে থেকেই বেশী প্যানিক করা ঠিক হবে না।

–আমাদের দেখতে পেলেই যদি… তোমার ওপরেও রাগ থাকতে পারে, একবার তোমার ওপর অ্যাটেমট নিয়েছিল, না, না, রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না, লালবাজারে গিয়ে ইনফর্ম করাই ভালো।

–আমার মনে হয়, আগে একবার তোমার বাড়িতে গিয়ে দেখে নেওয়াই উচিত। বাড়িতে মেয়েরা রয়েছে, যদি সত্যিই কিছু হয়ে থাকে…এখন তো দেখছো, পুলিশও প্রটেকশান দিতে পারছে না। গাড়িতে আমরা দু’জনে রয়েছি, ড্রাইভার আছে, এত ভয় কিসের?

ড্রাইভারও বললো, একবার বাড়িতে গিয়েই দেখুন না স্যার! আমার মনে হচ্ছে সীরিয়াস কিছু নয়, উটকো ঝামেলা।

গাড়ি আবার ফিরে এলো ভবানীপুরে। এখন তেমন উত্তেজনা নেই, গলির মুখটায় কিছু লোক জমে আছে শুধু, গলির মধ্যে বিমানের বাড়ির সামনে কেউ নেই। আজকাল ভিড় দেখলেই বরং অভয় পাওয়া যায়।

গাড়িটা গলির মধ্যে ঢুকতেই বিমানবিহারী জানলা দিয়ে মুখ বার করে জিজ্ঞেস করলেন, এই, কী হয়েছিল গো এখানে একটু আগে?

একটি ফার্মতন যুবক এগিয়ে এসে বললো, বিমানকাকা, ডেঞ্জারাস ব্যাপার হয়ে গেল। ঐ যে ইলেকট্রিকের দোকানটা দেখছেন, ওর ভেতরে একটা ছেলে বসে ছিল, মালিকের ভাইপো, সিউড়িতে থাকে, কালই এসেছে সিউড়ি থেকে। হঠাৎ একটা ট্যাক্সি এসে এখানটায় থামলো, ঐ যে ঠিক ঐ ল্যাম্পপোস্টের গা ঘেষে, তার থেকে তিনটে ছোকরা বেরিয়ে এসে, দোকানে ঢুকে সেই সিউড়ির ছেলেটাকে জাপটে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল!

–কোথায় নিয়ে গেল?

–সেই ট্যাক্সিতে। ট্যাক্সিটায় স্টার্ট দেওয়াই ছিল।

–তোমরা সব দেখলে?

নিজের চোখে দেখলুম, এই তো, এই পানের দোকানের সামনেটায় আমি দাঁড়িয়ে ছিলুম। ওদের হাতে পাইপ গান, আর এই অ্যাত বড় ড্যাগার, কে আটকাতে যাবে বলুন! ওদের চ্যালেঞ্জ করতে গেলেই জানে মেরে দিত!

–ছেলেটাকে ধরে নিয়ে গেল কেন?

–দোকানের মালিক তো সে কথা কিছুই বুঝতে পারছে না। সে বলছে যে তার ভাইপো বি এ-তে ফার্স্ট ক্লাস অনার্স পাওয়া ভালো ছেলে, পাটি ফার্টি করতো না। অবিশ্যি সিক্রেটলি কিছু করত কিনা…।

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থেকে নামবার পর বিমানবিহারী বললেন, নাঃ, বাবলুকে এখন আসতে বারণ করে দাও! কোনো দরকার নেই এর মধ্যে ফিরে আসার। এই রকম হঠাৎ যদি তাকে তিনটে ছেলে এসে ধরে নিয়ে যায়! তুমি-আমি কিছুই করতে পারবো না তখন। আজ যে ছেলেটাকে ধরে নিয়ে গেল, নির্ঘাৎ কালকে তার ডেড বডি পাওয়া যাবে কোনো রেললাইনের ধারে।

দ্রুত দোতলায় উঠে এসে বিমানবিহারী বললেন, তুমি একটু অফিস ঘরটায় বসো। তোমাকে একটা জিনিস দেখাচ্ছি!

বিমানবিহারী চলে গেলেন তিনতলায়। প্রতাপ অফিসঘরে এসে বসবার আগে এক কোণায় কুঁজো থেকে নিজেই গড়িয়ে নিয়ে পর পর দু’ গেলাস জল খেলেন। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল তাঁর। যদি এসে দেখতেন, এ বাড়ির মধ্যে দুতিনটে ছেলে ঢুকে পড়ে বোমা মেরে সব কাগজপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছে, তাতেও কিছুই আশ্চর্যের ছিল না। এখন সব কিছুই সম্ভব।

টেবিলের ওপর থেকে খবরের কাগজটা তুলে নিলেন তিনি। যদিও পড়া কাগজ, তবু তিনি সন্তোষ ভট্টাচার্যের খবরটা খুঁজলেন। কয়েকদিন আগেও, প্রায় প্রত্যেকদিনই প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় করে এইসব খুনের খবর ছাপা হতো। এখনও খুন-জখম একই রকম ভাবে চলছে যদিও, কিন্তু সেই সব খবরের আর গুরুত্ব নেই। ভেতরের পৃষ্ঠায় ছোট করে দেওয়া থাকে পাঁচটি খুন, সাতটি খুন!

এখন খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে প্রায় সবটাই পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদ। রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া এইসব নামগুলো কতবছর পরে আবার ফিরে এসেছে। কলকাতার খবরের কাগজের পাতায়। পূর্ব পাকিস্তানকে এখানকার কাগজগুলো বাংলাদেশ। বলে লিখতে শুরু করেছে, বিশেষত বাংলা পত্রিকাগুলো। কী করে বাংলাদেশ হলো। পাকিস্তানী সরকার কি ছেড়ে দিয়েছে? কাদের নিয়ে বাংলাদেশ? শেখ মুজিব কোথায়, তিনি মৃত না জীবিত, তা কেউ জানে না। আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাই বা কোথায়?

একটু বাদেই বিমানবিহারী দারুণ উৎকণ্ঠা নিয়ে ফিরে এসে বললেন, দেখেছো কাণ্ড? অলি এখনও বাড়ি ফেরেনি। সে নাকি প্রেসে গেছে। মেয়েটাকে এত করে বারণ করেছি আমহাস্ট স্ট্রিট কলেজ স্ট্রিটের দিকে যেতে, তবু কিছুতেই শুনবে না। এখন কী করা যায় বলো তো? প্রেসের টেলিফোন খারাপ, খবর নেবারও কোনো উপায় নেই।

প্রতাপ বললেন, এক কাজ করো, ড্রাইভারকে গাড়ি নিয়ে প্রেসে পাঠিয়ে দাও, অলিকে নিয়ে আসুক প্রেস থেকে।

বিমানবিহারী একটু চিন্তা করে বললেন, হ্যাঁ, ঠিক বলেছো, ড্রাইভারকেই পাঠিয়ে দেওয়া। যাক।

প্রতাপ আবার খবরের কাগজে মন দিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের সুশিক্ষিত, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামে সুসজ্জিত নিষ্ঠুর সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাঙালী মুক্তিবাহিনী প্রায় খালি হাতে লড়ে যাচ্ছে, এই যুদ্ধের খবর বারবার পড়তেও তাঁর ভালো লাগে। কলকাতার খবরের কাগজগুলো অত্যুৎসাহে হয়তো কিছুটা বাড়িয়ে লিখছে। যশোরে সত্যিই কি একটা স্যাবার জেট ফেলে দিয়েছে মুক্তিবাহিনী? চট্টগ্রামের বিমানবন্দর দখল করে নিয়েছে? ময়মনসিংহ থেকে সব পাকিস্তানী বাহিনী পালিয়ে গেছে?

কিছুটা অতিরঞ্জিত হলেও ঘোরতর লড়াই যে চলছে সেখানে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রতাপ নিজে বি বি সি’র খবর শুনেছেন, ব্রিটিশ কাগজের সংবাদদাতারাও যুদ্ধের খবর দিচ্ছে। তারা প্রশংসা করছে মুক্তিবাহিনীর। পচিশে মার্চের পর দু’তিন দিন সাংঘাতিক অত্যাচার চলার পর পূর্ব বাংলার বাঙালীরা আর শুধু পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে না। সেখানকার তরুণরা রুখে দাঁড়িয়েছে, দেশের সর্বত্র তারা ছড়িয়ে দিয়েছে প্রতিরোধ।

সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে সাধারণ নাগরিকেরা, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কিছু প্রাক্তন পুলিশ আর সীমান্ত রক্ষী আর মাত্র কয়েকজন বাঙালী মেজর আর কর্নেল। বাঙালীরা সত্যি সত্যি যুদ্ধ করছে? এর আগে বাঙালীরা যুদ্ধ করেছিল সেই কবে, বার ভূঁইঞাদের আমলে! বাঙালী ছেলেদের বীরত্বের কাহিনী পড়লে প্রতাপের গর্বে বুক ভরে যায়।

মুক্তিবাহিনী যে কোনো কোনো জায়গায় সত্যি বীরত্বের পরিচয় দিচ্ছে, তার কংক্রিট প্রমাণও আছে। কিছু কিছু পাকিস্তানী খানসেনা এর মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে এসে ধরা দিচ্ছে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে। তাদের বিশাল বিশাল চেহারা ক্ষত বিক্ষত, মুখ ভয়ে পাণ্ডুর। খবরের কাগজে এরকম ধরা-দেওয়া পাকিস্তানী সেনাদের ছবি বেরিয়েছে। তারা নাকি বলছে, মুক্তি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে ভারতীয় সেনাদের হাতে ধরা দেওয়া তাদের কাছে অনেক বেশী কাম্য। রোগা রোগা বাঙালী ছেলেদের তারা এত ভয় পায়?

ওপারের তরুণরা জাতীয় সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য এরকম জীবনপণ লড়ছে, আর কী করছে এপারের তরুণরা? এখানে চলেছে শুধু ভ্রাতৃবিরোধ! এপারের যুবকদের সামনে আর কোনো শত্রু নেই, শুধু নিজের ভাই, বন্ধু কিংবা সমবয়েসী অন্য ছেলেরা অন্য পার্টির কর্মী হলেই তাকে খুন করতে হবে! খুনের বদলা খুন! চীনের মাও সেতুঙ মার্কসবাদের নতুন এক ব্যাখ্যা দিলেন, আর তাই নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করে চলেছে পশ্চিম বাংলার ছেলেরা। এরপর কোনোদিন যদি মাও সে-তুঙ বলেন, যে, না, না, আমার ঐ ব্যাখ্যায় একটু ভুল হয়েছিল, ওটা অন্যরকম হবে, কখনো কখনো অন্য পক্ষের লোকের সঙ্গে হাত মেলানো যায়, তখন কি এইসব বিনষ্ট প্রাণ আর ফিরে আসবে? কত হীরের টুকরো ছেলে, পড়াশুনোয় ব্রিলিয়ান্ট, সৎ, আদর্শবাদী, অথচ কোন্ অন্ধ আবেগের তাড়নায় তারা হাতে ছুরি আর রিভলভার তুলে নিয়েছে। শুধু কিছু নিজেরই বয়েসী ছেলেদের অথবা কিছু নিরীহ মাস্টার, কেরানি, জজদের খুন করার জন্য। এর কাপুরুষতার দিকটাও তাদের চোখে পড়ছে না? ওপারের ছেলেরা প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় লড়ছে অটোমেটিক রাইফেল আর লাইট মেশিনগানধারী সৈন্যদের বিরুদ্ধে। আর এ পারের ছেলেরা এক অসহায় শিক্ষককে বাড়ি ফেরার পথে পেটে ছুরি মারছে।

প্রতাপ আবার কুমিল্লা রণাঙ্গনের বিবরণ পড়ায় মন দিলেন। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে এগিয়ে আসছিল খান সেনা, মুক্তিবাহিনী তাদের আটকে দিয়েছে, সাতজন পাঠানকে নদীতে চুবিয়ে মেরেছে বাঙালী ছেলেরা। কুমিল্লা শহরটা প্রতাপের চোখে চলচ্চিত্রের মতন ভেসে উঠলো। মনে পড়লো তাঁর ছাত্র বয়েসের বন্ধু মামুনের কথা। কোথায় আছে সে? কিছু বিপদ হয়নি তো মামুনের? বুলাদের বাড়ি সেই বাড়িতে কি এখন আর কেউ থাকে? সেই এক ঝড় বৃষ্টির রাতে মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে মামুনদের বাড়ি যাওয়া, তারপর বুলাদের বাড়িতে

–প্রতাপকাকা, আপনি কখন এসেছেন?

চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রতাপ দেখলেন অলিকে। একটা লাল শাড়ী পরে আছে অলি, এই গরমে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, তবু যেন ঝলমল করছে তার মুখোনি। কী সতেজ, সুন্দর হয়েছে অলি, ঠিক যেন শরৎকালের একটা স্থলপদ্ম গাছের মতন।

প্রতাপ বললেন, তুমি কোথায় ছিলে এতক্ষণ? সবাই চিন্তা করছে, তোমার জন্য গাড়ি পাঠানো হলো একটু আগে! এ পাড়ায় কী কাণ্ড হয়েছে জানো তো?

কাছে এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে অলি বললো, জানি। বাস থেকে নেমেই শুনলুম। মোড়ের দোকানটা থেকে একজনকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে কয়েকটা ছেলে। নিশ্চয়ই ঐ ছেলেটা সিউড়িতে কোনো অ্যাকশান করে এসেছে।

প্ৰতাপ বললেন, অ্যাকশান! এই কথাটা এখন খুব চালু। আগে আমরা একশ্যান শব্দটার অন্য মানে জানতুম। প্রতিটি ক্রিয়ারই ঠিক ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে, এটা একটা বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত। তা কি এরা জানে না?

সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে অলি বললো, প্রতাপকাকা, আজ কলেজ স্ট্রিটে বাবলুদার এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো, সে আমার কাছে বাবলুদার খবর জানতে চাইলো। তা আমি তো লেটেস্ট খবর কিছুই জানি না।

প্রতাপ অলির মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলেন। আজকাল বাবলুর চিঠি নিয়মিতই আসে তার মায়ের কাছে। সেই চিঠি পড়ে মনে হয়, বাবলু লন্ডন থেকে আমেরিকায় যাবার পর বেশ ভালোই আছে, ফুর্তিতে আছে। সে কি অলিকে চিঠি লেখে না?

তিনি বললেন, বাবলু তো একটা নতুন চাকরি পেয়েছে, শিগগিরই বোধহয় নিউ ইয়র্ক থেকে ওয়েস্টে চলে যাবে। এর মধ্যে ওর ড্রাইভিং লাইসেন্স হয়ে গেছে। তুমি বাবলুর চিঠি পাও না!

খুব স্বাভাবিক ভাবে হেসে অলি বললো, নাঃ, বাবলুদা আর আমাদের চিঠি-টিঠি লেখে না। আমাদের ভুলেই গেছে বোধ হয়।

–ওর চিঠি লেখার অভ্যেসটাই কম। আমাকেও লেখে না, শুধু নিজের মাকে লেখে, তাও কাটা কাটা কথা। আট-দশ লাইনের বেশী না। নতুন কী কী কোর্স নিয়েছে, সেই নিয়ে ব্যস্তও নাকি খুব।

–প্রতাপকাকা, আমি একবার আমেরিকায় যাবো ভাবছি।

–বাঃ খুব ভালো কথা। ঘুরে এসো। তোমার বাবাকে বললে এক কথায় রাজি হয়ে। যাবেন।

–আমি ওখানকার সাতটা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাই করেছিলুম, তার মধ্যে তিন জায়গা থেকে ভর্তির কল পেয়েছি, ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায়। শুধু একটা ব্যাপারই চিন্তা করছি, আমি চলে গেলে বাবার এই পাবলিশিং ব্যবসা কে দেখবে? বাবা একলা একলা আজকাল আর সব দিক সামলে উঠতে পারেন না।

–তা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমরা তো আছি! পাবলিশিং-এ এখন এমনিই মন্দা চলছে, তুমি ব্যবস্থা করো, চলে যাও।

প্রতাপ বেশ উদ্দীপিত হয়ে উঠলেন। অলি আমেরিকায় গেলে সবচেয়ে খুশী হবেন মমতা। বাবলু সম্পর্কে মমতার এখনও দুশ্চিন্তা যায়নি। আমেরিকা সম্পর্কে বাবলুর মনে একটা ঘোর বিতৃষ্ণা ছিল, সেখানে সে কিছুতেই যেতে চায়নি, বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে, এখন মোটামুটি ভালোই আছে মনে হয়, তবু যা মাথা গরম স্বভাব ওর! যদি হঠাৎ কোনোদিন কারুর সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে বসে! অলি গেলে বাবলুকে সামলে রাখতে পারবে, অলির কাছ থেকে খবরাখবরও পাওয়া যাবে সব রকম। হয়তো অলিকে নিয়ে বাবলু একদিন সংসারী হবে। তিনি বললেন, তুমি কোন ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশান নিতে চাও, ঠিক করে ফেলল। আমি বাবলুকে টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেবো।

অলি বললো, তার দরকার নেই কিছু। আমি যদি যাই, ওখানে পৌঁছে বাবলুদাকে টেলিফোন করে চমকে দেবো!

একটু পরে অলি চলে গেল ওপরে! তার পরেই বিমানবিহারী নেমে এলেন। হাতে একটা পুরোনো আমলের কারুকার্য করা আখরোট কাঠের বাক্স। তিনি বললেন, চাবিটা খুঁজে পাচ্ছিলুম না। সেইজন্য আসতে দেরি হলো। দেখলে তো, তোমার কথা শুনে গাড়িটা পাঠালুম, তারপরেই অলি ফিরে এলো। গাড়িটা শুধু শুধু তেল পুড়িয়ে অতটা যাবে।

সারাদিনের নানা রকম ঘটনায় প্রতাপের মনের মধ্যে যে অপ্রীতিকর বাষ্প জমে উঠেছিল, তা যেন হঠাৎ মুক্ত হয়ে গেছে অলিকে দেখে ও তার কথা শুনে। তিনি বললেন, তা একটু তেল পুড়বে পুড়ুক। ওহে বিমান, অলির তো এখন আবার বিদেশে গিয়ে পড়াশুনো করার ইচ্ছে হয়েছে। এতদিন যেতে চায় নি, এখন নিজে থেকেই অনেকগুলো জায়গায় অ্যাডমিশান চেয়ে চিঠি লিখেছে শুনলুম, চান্সও পেয়েছে!

বিমানবিহারী একটা পেতলের চাবি দিয়ে আখরোট কাঠের বাক্সটা খোলার চেষ্টা করতে করতে বললেন, তা যেতে পারে, যদি ইচ্ছে করে!

বিমানবিহারীর কণ্ঠস্বরে উষ্ণতার অভাব লক্ষ করে প্রতাপ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, তোমার খুব একটা ইচ্ছে নেই নাকি? আগে তো তুমি নিজেই ওকে কতবার যেতে বলেছো।

বিমানবিহারী মুখ না তুলে বললেন, আমার ইচ্ছে থাকবে না কেন! ঐ মেয়ে কী ধাতুতে গড়া তা তো জানো না। ঐরকম নরম সরম চেহারা। কিন্তু কী সাংঘাতিক জেদী! আমি বেশী ইচ্ছে প্রকাশ করলে অমনি বেঁকে বসবে। ভাববে, আমি ওকে জোর করে পাঠাচ্ছি। যা। দিনকাল পড়েছে, ইয়াং ছেলেমেয়েরা যত কলকাতা থেকে দূরে চলে যায়, ততই তো মঙ্গল! কিন্তু এতদিন আমি বুঝিয়েছি, ওর মা বুঝিয়েছে, তবু যেতে চায়নি।

-এবার কিন্তু ইচ্ছে হয়েছে, নিজে থেকেই যখন অ্যাপ্লিকেশান পাঠিয়েছে, ওর রেজাল্ট ভালো, স্কলারশীপও পেয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

–টাকা পয়সার অসুবিধে হবে না। ওর রেজাল্ট অনুযায়ী ফুল ব্রাইট থেকেও প্যাসেজ মানি পেতে পারে। যদি নাও পায় সে টাকা আমি দেবো, সে সাধ্য আমার আছে। এখন তুমি ধীরে সুস্থে ওকে বোঝাও। বেশী চাপাচাপি করো না।

–আমি কালই ওর জন্য পাসপোর্ট ফর্ম আনাবো।

বাক্সের ডালাটা খুলে ফেলে বিমানবিহারী বললেন, এই দ্যাখো, বিউটি, বিউটি, একেবারে নতুনের মতন রয়েছে এখনও।

প্রতাপ মহা অবাক হয়ে দেখলেন, সেই বাক্সের মধ্যে গাঢ় নীল ভেলভেটের ওপর রাখা এক জোড়া রিভলভার!

সে-দুটির গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বিমানবিহারী বললেন, মাউজার গান! আমার ঠাকুর্দা রড়া কম্পানি থেকে কিনেছিলেন। দারুণ জিনিস!

প্রতাপ অস্ফুট স্বরে বললেন, রড়া কম্পানি-মাউজার পিস্তল…মলঙ্গা লেনের হাবু

–তার মানে?

–কোথায় যেন পড়েছিলাম, পরাধীন আমলে, কয়েকজন টেররিস্ট ঠেলাওয়ালা আর ঝাঁকা মুটের ছদ্মবেশ ধরে মলঙ্গা লেনের কাছে রড়া কম্পানির পঞ্চাশটা মাউজার পিস্তল চুরি করেছিল। তারপর সেই পিস্তলগুলো দিয়েই শুরু হয়েছিল সারা ভারতে সাহেব খুন করার অভিযান!

–এগুলো সেই চুরি করা পিস্তল নয়। আমার ঠাকুর্দা কিনেছিলেন। এ দুটো আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি।

–বুঝলাম, কিন্তু তুমি হঠাৎ এ-দুটো বার করলে কেন? তোমার কাছে এই অস্ত্র আছে তা জানাজানি হলেই বিপদ আছে!

–বিপদ আবার কী! এর একটা আমি সবসময় সঙ্গে রাখবো। আর একটা তোমার কাছে রাখতে পারো ইচ্ছে করলে। আমি তোমার নামে লাইসেন্স বার করে দেবো, তাতে কোনো অসুবিধে হবে না। এবার আমি ঠিক করেছি। বিপ্লবের নাম করে ঐ গুণ্ডাগুলো হামলা করতে এলেই আমি ওদের কুকুরের মতন গুলি করে মারবো।

–খবর্দার। বিমান, ওরকম চিন্তাও মাথায় স্থান দিও না। গুলি করতে তুমি পারবে না, তোমার হাত উঠবে না। বরং উল্টো ফল হবে। ওরা এখন অস্ত্র কাড়ার একটা অভিযান। চালাচ্ছে, তোমার কাছে এই জিনিস আছে, ঘুণাক্ষরেও তার সন্ধান পেলে ওরা এই অস্ত্র কাড়তেই আসবে, তোমাকেও মেরে রেখে যাবে!

–মেরে রেখে যাবে, অত সোজা? কেড়ে নেবে, অত সোজা! দু’একটাকে না মেরে আমি মরবো না! কিরণলালকে গাড়ির মধ্যে অসহায় অবস্থায় গুলি করে মারলো, তার পর থেকেই আমার মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে! এমনি এমনি আমার জীবনটা কেড়ে নেবে? নাঃ, বাধা। দিতেই হবে, সোজা গুলি চালাবো! তোমাকে যদি মারতে আসে, তুমি আত্মরক্ষা করবে না?

ওদের সঙ্গে অস্ত্র থাকে, আমরাও অস্ত্র রাখবো!

প্রতাপ দুদিকে মাথা নাড়লেন।

তিনি মুখে আর কিছু উচ্চারণ করলেন না, কিন্তু মনে মনে বললেন, না, আমি ওদের মারতে পারবো না। এইসব ছেলেরা, এরা তো তাঁর বাবলুরই মতন। ভুল করুক, দোষ করুক, তবু এরা সন্তানতুল্য। এরা যদি পিতৃহত্যা করে বিপ্লব আনতে চায়, তাহলে এদের বাধা দিয়েও কোনো লাভ হবে না। বরং তারপর যদি ওদের অনুতাপ হয়, ওরা ভুল বুঝতে পারে, তবে সেটুকই যথেষ্ট। ভবিষ্যতের পৃথিবীটা তো ওদেরই জন্য। প্রতাপ একটা পিস্তল হাতে তুলে নিলেন। জিনিসটা এমনই মসৃণ, সুদৃশ্য ও ওজনদার যে হাতে নিলেই মনে হয় বেশ দামী ধরনের অস্ত্র। সেই ঠাণ্ডা ইম্পাত প্রতাপ গালে ছোঁয়ালেন। তিনি ভাবলেন, এইরকম একটা অস্ত্র নিয়ে যদি সীমান্তের ওপারে অত্যাচারী বর্বর সৈন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে একজন নিপীড়িত বাঙালীকেও সাহায্য করা যেত, তাহলে জীবনটা ধন্য হতো।

১১. হেনা দু’বার ডাকতেই মামুন

হেনা দু’বার ডাকতেই মামুন ধড়ফড় করে উঠে বসে ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী? কী হইছে? কয়টা বাজে? দেরি হইয়া গেল, অ্যাঁ?

হেনা বললো, সাড়ে চারটা! আপনে বলেছিলেন ঠিক সাড়ে চারটায় ডেকে দিতে। মামুন কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে ঘড়ি দেখলেন। জানলার বাইরে মিসমিস করছে অন্ধকার। ঘরে জ্বলছে টিউব লাইট। হেনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মঞ্জু, তার হাতে চায়ের কাপ। মামুন একটু লজ্জা পেলেন, মেয়ে দুটো এত আগেই উঠে পড়েছে, অথচ তাঁর ঘুম ভাঙেনি। কী যেন একটা লম্বা স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি, এখন আর মনে পড়ছে না।

বাসি মুখেই চা খাওয়া তাঁর অভ্যেস, মঞ্জুর হাত থেকে কাপটা নিয়ে জোরে জোরে চুমুক দিতে লাগলেন। মঞ্জু জিজ্ঞেস করলো, আরও চা আছে, দেবো?

মামুন বললেন, দে, দে, জলদি দে। কলে পানি এসেছে কিনা দ্যাখ তো।

হেনা বললো, আমি রাত্তিরেই বালতিতে পানি ভরে রেখেছি।

দ্রুত চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে মামুন চলে গেলেন গোসল করতে।

হোটেল ছেড়ে মাত্র তিন দিন আগে বেকবাগানে এই বাড়িতে চলে এসেছেন মামুন। একটা বড় সড় ঘরের ভাড়া দুশো পঁচিশ টাকা। তবু হোটেলের চেয়ে অনেক ভালো, সঙ্গে রান্না ঘর আছে, ইচ্ছে মতন বেঁধে খাওয়া যায়। কলকাতায় পৌঁছে মামুন প্রথম দিন টাকা ভাঙিয়ে একশো টাকায় অষ্টাশী ভারতীয় টাকা পেয়েছিলেন, গতকাল পেয়েছেন এক শো টাকায় পঁচাত্তর টাকা, হু হু করে পাকিস্তানী টাকার দাম কমে যাচ্ছে। আর দু’ চারদিন বাদে কেউ পাকিস্তানী টাকা ছোঁবেই না বোধহয় এই বাংলায়। মামুন সব টাকা ভাঙিয়ে নিয়েছেন, তবে তা নিঃশেষ হতে বেশীদিন লাগবে না। এর পর গয়না বিক্রি করতে হবে। মামুন খোঁজ নিয়েছেন, ইণ্ডিয়ায় এখন সোনার ভরি একশো ঊননব্বই টাকা। সামান্য যা গয়না আছে, তাও ফুরিয়ে যাবার পর কী হবে? কতদিন এরকম উদ্বাস্তু হয়ে থাকতে হবে তার কোনো ঠিক নেই। একমাত্র ভরসা, এখানকার খবরের কাগজে তাঁর প্রথম রচনাটি ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাতে হাতে দেড় শো টাকা পেয়েছেন। মাসে অন্তত চার পাঁচটি লেখা প্রকাশিত হলে কোনো ক্রমে চলে যাবে।

বাথরুম থেকে বেরিয়েই মামুন দেখলেন, হেনা ততক্ষণে তাঁর জন্য টোস্ট আর ওমলেট বানিয়ে ফেলেছে। মামুন বললেন,আরে, এসব আবার করেছিস কেন? এত সকালে কি আমি কিছু খেতে পারি?

মঞ্জু বললো, তা বলে খালি পেটে যাবে নাকি? না, খেয়ে নাও। কতক্ষণ লাগবে আর একটু চা করে দেবো।

হঠাৎ মামুন ফজরের নামাজে বসে গেলেন। নিয়মিত নামাজ আদায় করার অভ্যেস তাঁর নেই। মনের মধ্যে তেমন কোনো ধর্মীয় টান তিনি অনুভব করেন না এই বয়েসেও। তবু আজ একটি বিশেষ দিন। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ ধ্যানে মনের জোর বাড়ে। তাঁকে নামাজ পড়তে দেখলে মঞ্জু আর হেনাও কিছুটা ভরসা পাবে।

কিন্তু ফল হলো বিপরীত। মঞ্জু আর হেনার মুখে আরও ঘনিয়ে এলো শঙ্কা। এতদিন পর মামুনকে নামাজ পড়তে দেখে আজকের ঘটনার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেল তাদের কাছে। মামুন শেষ করতেই মঞ্জু উদ্বিগ্ন গলায় বললো, মামুন মামা, তোমার না গেলে হয় না?

হেনা তাঁর হাত চেপে ধরে বললো, বাবা, তুমি যেও না। আমরা একলা থাকতে পারবো না।

মামুন হেসে বললেন, আরে, এত ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি কি একলা যাচ্ছি নাকি, আরও অনেকে যাচ্ছে, চিন্তা করিস না, আমি সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবো।

মঞ্জু আর হেনা দু’ দিক থেকে তাঁকে চেপে ধরে বলতে লাগলো, না, যেতে হবে না। আজ থাক না, পরে একদিন যেও।

মামুন অনেক কষ্টে তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে কুত-পাজামা পরে নিলেন। মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা ধক ধক করছে। যেতে তাঁকে হবেই। একটা ঐতিহাসিক ঘটনার তিনি সাক্ষী থাকতে চান।

পাশের ঘরে ঘুমিয়ে আছে সুখু, মামুন তার ললাট চুম্বন করলেন। মঞ্জু আর হেনার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, খুব সাবধানে থাকবি, ঘর থিকা এক পা বাইড়াবি না। কারুরে দরোজা খুলবি না। আমি আসি।

মঞ্জু মামুনের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতে গিয়ে কেঁদেই ফেললো। মামুন তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে আঙুল দিয়ে চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, কী পাগল। দ্যাখ তো হেনা শক্ত আছে। আমি ফিরে আসি, কাল তোদর মেট্রোতে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবো। তোরা দোয়া কর, সারাদিন বাংলাদেশের নামে দোয়া কর।

রাস্তায় বেরিয়ে মামুন দেখলেন অন্ধকার সামান্য ফিকে হয়ে এসেছে। এর মধ্যেই কিছু কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়েছে পথে। চলতে শুরু করেছে ট্রাম। মামুনের মনে পড়লো, ছাত্র বয়েসে কলকাতায় থাকার সময় তিনি দেখতেন, অনেক হিন্দু ভদ্রলোক ভোরবেলার প্রথম ট্রামে চেপে গঙ্গা স্নান করতে যেতেন। এখনো কি লোকেরা সেই রকম গঙ্গা স্নান করতে যায়? এত ভোরেও ট্রামে যাত্রীর সংখ্যা কম নয়। দু তিনটে ট্যাক্সিও দাঁড়িয়ে আছে বেকবাগানের মোড়ে। ঢাকার তুলনায় কলকাতা অনেক বড় মেট্রোপলিস, এখানে ভালো করে আলো ফোঁটার আগেই যানবাহন পাওয়া যায়। ট্যাক্সিগুলো বোধহয় সারা রাতই চলে।

মামুন ট্যাক্সি নেবার বদলে ট্রামে চেপে বসলেন। হাতে এখনও কিছুটা সময় আছে, বেশি পয়সা খরচ করার তো দরকার নেই। ভোরের ট্রাম অনবরত ঠং ঠং শব্দ করে চলে। সেই শব্দে মনে পড়ে যায় ছাত্র বয়েসের স্মৃতি।

ধর্মতলার মোড়ে ট্রাম থেকে নেমে মামুন ঘড়ি দেখলেন। পৌনে ছ’টা। এর মধ্যেই খবরের কাগজের হকারদের দৌড়োদৗড়ি শুরু হয়ে গেছে। ছড়ি হাতে বয়স্ক লোকেরা বেরিয়েছে। প্রাতঃভ্রমণে। এককালে কার্জন পার্কটা কত সুন্দর ছিল, কত ফুল ফুটতো এখানে, এখন চেনাই যায় না। মনুমেন্টটাকে আগে আরও উঁচু মনে হতো না? ছোট হয়ে গেল নাকি?

কলকাতার ময়দানের মতন এতবড় ময়দান ঢাকাতে নেই। কেউ কেউ বলে বিলেতের হাইড পার্কও নাকি এত বড় নয়। রেড রোডের ধারে সার সার কৃষ্ণচূড়া ফুল ফুটেছে। রেড রোড নামটা সার্থক। এই রাস্তাটা আগের মতনই আছে। মামুনের মনে পড়লো, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই রাস্তায় মিত্র বাহিনীর প্লেন নামতো।

কয়েকজন স্বাস্থ্য উদ্ধারকারীকে জিজ্ঞেস করে করে মামুনকে প্রেস ক্লাব খুঁজে বার করতে হলো। ঢাকার তুলনায় কলকাতার প্রেস ক্লাব যে এত ছোট হবে তা মামুনের ধারণা ছিল না। ঢাকার প্রেস ক্লাবের দোতলা বাড়ি, আর এখানে সামান্য একটা তাঁবু। ময়দানে খেলার ক্লাবগুলির অনেক তাঁবু আছে, তারই মধ্যে একটা এই প্রেস ক্লাব। কলকাতায় এত বড় বড় খবরের কাগজ আছে, কত বিদেশী সাংবাদিক আসে এখানে, অথচ এখানকার প্রেস ক্লাবের এই দশা।

দশ বারোখানা গাড়ি জমা হয়ে গেছে প্রেস ক্লাবের সামনে। অন্তত জনা তিরিশেক দেশী-বিদেশী সাংবাদিক দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়, কিন্তু সবাই নিঃশব্দ। এখনো কেউ জানে না কোথায় যেতে হবে।

মামুন ইউসুফ আলীকে খুঁজে বার করলেন। গত পরশুদিন দৈবাৎ এই ইউসুফের সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল বলেই মামুন আজকের ঘটনাটা জানতে পেরেছেন। এক সময় ইউসুফের সঙ্গে একই ঘরে প্রায় দেড় বছর কাটিয়েছিলেন মামুন, সেই বন্ধুত্বের সুবাদে মামুনের অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেননি ইউসুফ, মামুনকে সঙ্গে নিতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু এমনই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছে যে ইউসুফ মামুনকে পর্যন্ত বলেননি আজকের গন্তব্যস্থল। কোথায়।

একটা অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে মামুনকে বসিয়ে দিলেন ইউসুফ আলী। তারপর নিজে একটা জিপে উঠে সকলকে বললেন সেই জিপটাকে অনুসরণ করতে। চাপা উত্তেজনায় তাঁর গলাটা ভাঙা ভাঙা শোনালো।

একটা গাড়ির কনভয় চিত্তরঞ্জন এভিনিউ দিয়ে এগিয়ে, শ্যামবাজার পাঁচ মাথা পার হয়ে যশোর রোডে পড়লো। পার্টিশান হয়ে গেছে চব্বিশ বছর আগে, তবু এই রাস্তার নাম এখনও যশোর রোড। এখানে পথের ধারে বাজার বসে গেছে, লোকজন থলি হাতে বাজার করতে এসেছে, মুটেরা সবজির ঝাঁকা মাথায় নিয়ে ছুটছে, একটা মস্ত বড় ষাঁড়ের পাশে দাঁড়িয়ে খবরের। কাগজ মেলে একসঙ্গে পড়ছে তিনজন লোক, মামুন একজনের মন্তব্যও শুনতে পেলেন, ওরে, ওয়েস্ট ইন্ডিজে গাভাসকর থার্ড সেঞ্চুরি করেছে…। এখানে অন্য যে-কোনো দিনের মতনই একটা দিন, সাধারণ, নিরুপদ্রব জীবন। অথচ এই রাস্তা ধরে সত্তর-আশী মাইল সোজা গেলেই যশোর, সেখানে চলছে নারকীয় তাণ্ডব, মিলিটারির সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলছে অসম লড়াই, গ্রামের পর গ্রাম পুড়ছে…।

সেই যশোরেই যাওয়া হবে নাকি?

গাড়িতে অন্য সবাই অপরিচিত, কেউ কোনো কথা বলছে না, নিজে থেকে কারুর সঙ্গে আলাপ জমাবার ইচ্ছেও মামুনের নেই। তিনি জানলা দিয়ে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলেন বাইরে। দমদম, মধ্যমগ্রাম, বারাসত, এই সব নামগুলিই মামুনের চেনা, বারাসতে তাঁর এক মামার বাড়ি ছিল, সেখানে একবার এসেছিলেন, থার্টি এইটে, তখন এদিকে এত বাড়ি ঘর ছিল না, শুধু ঝোঁপ জঙ্গল আর চাষের জমি।

গাড়ির কনভয় প্রথম থামলো কৃষ্ণনগরে। এখানে চা খাওয়া হবে। আসল উদ্দেশ্য অবশ্য তা নয়। একটি গাড়ি এগিয়ে গেছে খবর নিতে, সীমান্তের কোন অংশটা নিশ্চিত নিরাপদ। রাস্তার ধারের একটা ছোট দোকান থেকে মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছে সাংবাদিকরা, কারুর মুখে কোনো প্রশ্ন নেই। সদা-কৌতূহলী সাংবাদিকরাও বাধ্য হয়ে চুপ করে আছে, কারণ আগেই তাদের বলে দেওয়া হয়েছে যে যাত্রা পথে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না।

পিচের রাস্তা ছেড়ে গাড়িগুলো একসময় চলতে লাগলো কাঁচা রাস্তা দিয়ে। হঠাৎ মামুনের সঙ্গে একটা শিহরন হলো। তবে কি পশ্চিম বাংলার সীমান্ত পার হয়ে ঢুকে পড়া গেছে পূর্ব পাকিস্তানে? না, না, পূর্ব পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ, এখনো ঠিক মনে থাকে না। দৃশ্যগত কোনো পরিবর্তন নেই, দু পাশে একই রকম গাছপালা, মাটির বাড়ি, একই চেহারার মানুষ। তবে কয়েকটি বাড়ি ভেঙে পড়েছে, কোনো বাড়ির দেয়ালে আগুন লাগার দাগ। এই বাংলাদেশ। মামুন আবার ফিরে এসেছেন তাঁর স্বদেশভূমিতে। তাঁর বুক কাঁপছে।

গাড়িগুলো শেষ পর্যন্ত এসে থামলো একটি বিশাল আমবাগানের মধ্যে। এই গ্রামটির নাম বৈদ্যনাথতলা, জেলা কুষ্টিয়া, মহকুমা মেহেরপুর। কিছু লোক সেখানে দৌড়াদৌড়ি করে চেয়ার সাজাচ্ছে, অধিকাংশই হাতল ভাঙা চেয়ার, কাছাকাছি গ্রামের বাড়িগুলো থেকে জোগাড় করে আনা। জায়গাটিকে ঘিরে রাইফেল আর এল এম জি হাতে পজিশান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পঁচিশ-তিরিশ জন সৈন্য, তাদের ঠিক মুক্তি বাহিনীর ছেলে বলে মনে হয় না, খুব সম্ভবত প্রাক্তন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একটি বিদ্রোহী বাহিনী।

মামুন গাড়ি থেকে নেমে এক পাশে দাঁড়াতেই কলকাতার একটি বাংলা কাগজের একজন সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে যেচে আলাপ করে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, এই কুষ্টিয়া আগে নদীয়া জেলার মধ্যে ছিল না?

মামুন মাথা নেড়ে বললেন, জী, হ্যাঁ।

সাংবাদিকটি বললো, আমরা ঐ যে কৃষ্ণনগরের পাশ দিয়ে এলাম, তার কাছেই পলাশী। ঐ পলাশীর আমবাগানে একদিন বাংলার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা। আর আজ সেই জেলারই আর এক আমবাগানে জন্ম নিচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র। তাই না? ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট।

মামুন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

–আপনি কোন কাগজ থেকে কভার করতে এসেছেন?

–আমি রিপোটিং করতে আসিনি। আমি এই বাংলারই মানুষ।

–আপনি আওয়ামী লীগের নেতা? আচ্ছা, কোন তাজুদ্দীন একটু চিনিয়ে দিন তো। তাজুদ্দীনের সঙ্গে একটা এক্সকুসিভ ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?

মামুন হেসে বললেন, না, আমি নেতা নই। আমিও আপনারই মতন সাংবাদিক ছিলাম এক সময়। তাজউদ্দিন সাহেব এখনও আসেন নাই। আসলে তাঁকে আর চিনায়ে দিতে হবে না, তিনিই তো ভাষণ দেবেন।

–আচ্ছা মৌলানা ভাসানী কি আসবেন? তিনি কি মুক্তিযুদ্ধ সাপোর্ট করছেন?

–মৌলানা ভাসানী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে এসেছেন শুনেছি। এদিকে যখন এসেছেন, তখন পাকিস্তানকে নিশ্চয়ই আর সাপোর্ট করছেন না। স্বাধীন বাংলার দাবি তিনি আগেই তুলেছেন। তবে তিনি আজ এখানে আসবেন কিনা তা আমি জানি না।

–একটা জিনিস দেখুন, সৈয়দ সাহেব, যতই সিক্রেট রাখা হোক, এই আমবাগানেই যে মুজিব নগর স্থাপিত হবে, সেটা কিন্তু জানাজানি হয়ে গেছে। কত লোক এসেছে দেখুন।

কথাটা মিথ্যে নয়। আশপাশের গ্রাম থেকে ধেয়ে এসেছে বিপুল জনতা। অস্ত্রধারী সেনাদের বৃত্ত ভেদ করে তারা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়তে পারছে না বলে অনেকেই আমগাছগুলোতে চড়তে শুরু করেছে। একটা অশুভ আশঙ্কায় মামুনের বুক কেঁপে উঠলো। এরা সবাই কি পাকিস্তান উৎখাত করে স্বাধীন বাংলাদেশ চায়? মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামের কর্মীরা মোটেই চায় না, তা মামুন ভালোভাবেই জানেন। এই জনতার মধ্যে পাকিস্তানের স্পাই থাকতে পারে না? পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে খবর পৌঁছে গেলে যদি তারা হঠাৎ এসে আক্রমণ করে? যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিমানে উড়ে আসতে কতক্ষণ লাগবে? আওয়ামী লীগের সব ক’জন বড় বড় নেতাকে যদি মেরে ফেলতে পারে কিংবা বন্দী করে নিয়ে যায়, তা হলে স্বাধীনতার সংগ্রাম কি আর এগুতে পারবে? ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী বড়ার পেরিয়ে এদিকে ঢুকবে না, তা নাকি আগেই বলে দিয়েছে। ই পি আর এর এই সামান্য ক’জন সৈন্য পাক বাহিনীর আক্রমণের মুখে কতক্ষণ টিকবে?

অনুষ্ঠানটা কেন তাড়াতাড়ি শেষ করা হচ্ছে না, এই জন্য মামুন অধীর বোধ করতে লাগলেন।

হঠাৎ একটা শব্দে সবাই সচকিত হয়ে উঠলো। এসে গেল নাকি পাকিস্তানী সৈন্যরা? না, সে রকম কিছু নয়, অনেকগুলো লোকের ভার বইতে না পেরে ভেঙে পড়েছে একটা আমগাছের ডাল।

অনুষ্ঠান শুরু হলো এগারোটার পর। তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সবাই এসে গেছেন। তবে, যাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশী প্রয়োজনীয় ছিল, তিনি নেই, তিনি আসবেন না। শেখ মুজিব যে কোথায় আছেন তা এখনো জানা যায়নি।

তবু অনুপস্থিত শেখ মুজিবর রহমানের নামই ঘোষণা করা হলো রাষ্ট্রপতি হিসেবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ। মন্ত্রীসভার অন্য তিনজন সদস্য হলেন খোন্দকার মোশতাক আহমদ, এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এম মনসুর আলী। বাংলাদেশ সৈন্যবাহিনীর কমাণ্ডার ইন চীফ নিযুক্ত হলেন রিটায়ার্ড কর্নেল এম ওসমানী।

এর সাতদিন আগেই কলকাতার থিয়েটার রোডের অস্থায়ী মুজিব নগর থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সনদ ঘোষণা করা হয়েছিল। আজ, ১৭ই এপ্রিল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার, ঐতিহাসিক দলিলটি পাঠ করলেন চীফ হুইপ ইউসুফ আলী। ই পি আর-এর প্লাটুন গার্ড অফ অনার দিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে।

তারপর সাংবাদিকরা ঘিরে ধরলো তাজউদ্দিনকে। ধীর স্থিরভাবে উত্তর দিয়ে যেতে লাগলেন এক সদ্য প্রসূত রাষ্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। একজন বিদেশী সাংবাদিক প্রশ্ন করলো, আপনারা যে বাংলাদেশ সরকার গড়লেন, বাংলাদেশের কতটুকু এ পর্যন্ত আপনারা মুক্ত করতে পেরেছেন?

মাথা ঘুরিয়ে চতুর্দিক একবার দেখে নিলেন তাজউদ্দিন। তারপর প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, গোটা বাংলাদেশটাই তো মুক্ত। শুধু সামরিক ঘাঁটিগুলো ছাড়া। বাংলার মাটিতে পাক বাহিনী এখন বিদেশী সৈন্য বাহিনী। আমরা তাদের তাড়াবোই।

বাংলা কাগজের যে সাংবাদিকটি মামুনের সঙ্গে যেচে আলাপ করেছিল, তার নাম অরুণ সেনগুপ্ত। বেশ সুশ্রী চেহারা, মাথার চুল ঢেউ খেলানো, কথা বলার সময় চোখ দুটো কুঁচকে আসে। কিন্তু ঠোঁটে হাসি মাখানো। তাঁর হাওয়াই শার্টে চার পাঁচটা পকেট। ফেরার সময় মামুন তাঁর সঙ্গে এক গাড়িতেই উঠলেন। আসার সময় সকলেরই মুখ ছিল থমথমে, এখন সবাই উৎফুল্ল। বিপদের আশঙ্কা, হঠাৎ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা সকলের মনেই ছিল, কিন্তু কোনোই গণ্ডগোল হয়নি। সব কিছু সুষ্ঠুভাবে চুকে গেছে! কালকের খবরের কাগজ দেখে পাকিস্তানী শাসকদের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে।

কোথা থেকে মিষ্টি জোগাড় হলো কে জানে, অরুণ সেনগুপ্ত গাড়ির সবাইকে জোর করে মিষ্টি খাওয়াতে লাগলেন। তারপর একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করে বললেন, নিন, নিন। এখনও যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। এত বড় একটা ঐতিহাসিক ঘটনা সত্যি ঘটে গেল? পাকিস্তান ভেঙে জন্ম হলো বাংলাদেশের? আমরা তার সাক্ষী?

একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক বললেন, এখন পৃথিবীর কোন্ কোন্ দেশ এই বাংলাদেশ সরকারকে রিকগনাইজ করবে। সেটাই হলো প্রশ্ন।

অরুণ সেনগুপ্ত জোর দিয়ে বললেন, আমার ধারণা, ইণ্ডিয়া আজ রাত্তিরেই রেকগনিশান দেবে। তা হলে ইণ্ডিয়ার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও দেবে সঙ্গে সঙ্গে…

ব্রিটিশ সাংবাদিকটি বাঁকা সুরে বললেন, ইণ্ডিয়ার বন্ধু রাষ্ট্র-সে রকম কেউ আছে নাকি?

কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ করে গেল। তবু দমে না গিয়ে অরুণ সেনগুপ্ত বললেন, সোভিয়েট ইউনিয়ন আছে। নেপাল, ভুটান, সিকিম।

অন্য একটি বাঙালী সাংবাদিক সুর করে বলে উঠলো, হায় চীন, সোনালি ডানার চীন…! দশ বছর আগেও চীনের সঙ্গে আমাদের কত বন্ধুত্ব ছিল, আমরা হিন্দী চীনী ভাই ভাই করেছি। সেই চীন এখন পাকিস্তানের সব বর্বরতা সাপোর্ট করছে।

ব্রিটিশ সাংবাদিকটি বললো, এখনো তো কলকাতার দেয়ালে লেখা দেখছি, চীনের চেয়ারম্যান আপনাদেরই চেয়ারম্যান।

মামুন একটাও কথা বলছেন না। তাঁর বুকটা এখনো থরথর করে কেঁপেই চলেছে। আজকের ঘটনায় তাঁর মনে যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা এরা কেউ বুঝবে না। শুধু আনন্দ নয়, অনেকখানি দুঃখও মিশে আছে অনুভূতিতে। আশা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল পাকিস্তান, তা রক্ষা করা গেল না শেষ পর্যন্ত। শুধু আজকের ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, আরও একটা বিরাট ঐতিহাসিক ভুলেরও তো তিনি অংশীদার। সে জন্য কিছুটা আত্মগ্লানি তিনি এড়াবেন কী করে?

ভাত খাওয়ার জন্য আবার নামা হলো কৃষ্ণনগরে। বেলা প্রায় তিনটে বাজে। ডাল, ভাত আর ডিমের ঝোল ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না হোটেলে। অরুণ সেনগুপ্ত মামুনের সঙ্গে বসলেন এক টেবিলে। হেসে বললেন, মাছ ছাড়া খেতে আপনাদের কষ্ট হয়, তাই না? বলুন, আজ রাত্তিরে আপনি আমার বাড়িতে খেয়ে যাবেন।

মামুন বললেন, না, না, ডিমের কারি আমার ভালোই লাগে।

–অনেক সময় এই সব হোটেলে খুব ভালো পাকিস্তানী মাছ আসে। সরি, পাকিস্তানী না, বাংলাদেশী মাছ! বডার পেরিয়ে স্মাগলড হয়ে আসে, আমি অনেকবার খেয়েছি। এখন যুদ্ধ টুদ্ধ হচ্ছে বলে বোধহয় আর আসছে না।

–পশ্চিম বাংলার মানুষ মাছ খেতে পায় না। বাজারে গিয়ে দেখেছি, মাছের একেবারে আগুন দাম।

–পপুলেশনের কী চাপ দেখছেন না? এখন তো পাঞ্জাব রাজস্থান থেকেও কলকাতার বাজারে মাছ আসে। সে যাই-ই আসুক, পদ্মার ইলিশ আর সিরাজগঞ্জের রুইয়ের সঙ্গে কি সেসব মাছের তুলনা চলে?

হঠাৎ মুখটা ঝুঁকিয়ে গোপন কথার মতন ফিসফিসিয়ে অরুণ সেনগুপ্ত বললেন, আচ্ছা, সৈয়দ সাহেব, একটা কথা বলুন তো! এই যে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ক্যাবিনেট তৈরি হলো, এতে সবাই আওয়ামী লীগের, এটা কি ঠিক হলো?

মামুন অবাক হয়ে বললেন, কেন? ঠিক হবে না কেন? লাস্ট ইলেকশানে আওয়ামী লীগ ওভারহোয়েলমিং মেজরিটি পেয়েছে। তাদেরই সরকার গড়ার কথা ছিল। ইয়াহিয়া খান আর ভুট্টো জোর করে হতে দেয়নি। এখন বাংলাদেশ সরকার গড়তে গেলে

–সে ইলেকশান তো ছিল পাকিস্তানের ইলেকশান। এখানে তৈরি হলো বাংলাদেশ সরকার। এ দুটো আলাদা ব্যাপার নয়? বাংলাদেশে যতদিন না ভোট হচ্ছে, ততদিন সব পার্টির নেতাদের নিয়ে একটা ন্যাশনাল ক্যাবিনেট গড়া উচিত ছিল না? মুক্তিযুদ্ধ কি শুধু আওয়ামী লীগ চালাবে?

–না, মুক্তিযুদ্ধে সারা বাংলাদেশের মানুষ অংশ নেবে।

–নেতৃত্ব দেবে শুধু আওয়ামী লীগ? আপনাদের দেশে বামপন্থীরা আছে, উগ্রপন্থী আছে, ধর্মীয় দলগুলি আছে, তারা যদি এই নেতৃত্ব মেনে নিতে না চায়? এরকম একটা বিরাট ক্রাইসিসের সময় পাটি পলিটিকসের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে এক প্লাটফর্মে দাঁড় করাবার চেষ্টা করাটাই বেশী কার্যকর হতো না কি?

একটু ইতস্তত করে মামুন বললেন, তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। তবে আজ তো ছোট একটা ক্যাবিনেটের কথা ঘোষণা করা হলো, পরে যখন বাড়ানো হবে, তখন অন্য দলের। নেতাদেরও নেওয়া হবে আশা করি।

অরুণ সেনগুপ্ত পকেট থেকে ছোট্ট একটা নোট বই বার করতেই মামুন তাঁর হাত চেপে ধরে বললেন, না, না, আমায় কোট করবেন না, প্লীজ। আমি পলিটিকসের কেউ না, আমি সামান্য একজন রিফিউজি। বাংলাদেশ সরকারের মতামত দেবার কোনো অধিকার আমার নাই। আমিও তো এক সময় আপনার মতন সাংবাদিক ছিলাম। কাকে যেমন কাকের মাংস খায় না, সেই রকম কোনো সাংবাদিক ও সাংবাদিকের মাংস…

অরুণ সেনগুপ্ত হো হো করে হেসে উঠে বললেন, আসুন, তা হলে ডিমের ঝোল খাওয়া যাক।

কলকাতায় পৌঁছে, অরুণ সেনগুপ্তর বাড়িতে অন্য একদিন নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মামুন বাড়ি ফিরে এলেন। রাস্তা থেকেই দেখতে পেলেন, মঞ্জু আর হেনা অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে জানলার গরাদ ধরে। তাঁর দিকে চোখ পড়া মাত্র মেয়ে দুটির মুখে যে হাসি ফুটে উঠলো, মামুনের মনে হলো, একেই বোধহয় স্বর্গীয় হাসি বলে। হাত তুলে ওদের। আশ্বস্ত করে মামুন মোড়ের দোকানে কিছু মিষ্টি কিনতে গেলেন। অনেকদিন পর তিনি গুন গুন করে ধরলেন একটা গান, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

মিষ্টির দোকানের সামনে চার-পাঁচটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। মামুন তাদের কথাবার্তা শোনবার চেষ্টা করলেন। এরা আলোচনা করছে ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে আজ যে কী বিরাট ব্যাপার ঘটে গেল সে সম্পর্কে ওদের কোনো সই নেই? নাকি ওরা কেউ এখনও জানে না। অল ইণ্ডিয়া রেডিও থেকে কিছু বলেনি? দোকানের মালিক একটা ময়লা নোট নিয়ে কথা কাটকাটি করছে একজন খদ্দেরের সঙ্গে। আজ কি এমন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করার দিন?

দশ টাকার মিষ্টি কিনে মামুন উঠে এলেন দোতলায়। দরজা খুলেই তিনি মঞ্জুর ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে প্রায় নাচতে নাচতে বলতে লাগলেন, ওরে সুখু মিঞা, আজ থিকা আমরা। কেউ আর পাকিস্তানী না। আমরা বাংগালী, বাংগালী। তুই নিজেকে কী বলবি বল তো? বাংগালী। তোর দেশ বাংলাদেশ।

উদ্ভাসিত মুখে মঞ্জু বললো, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে?

মামুন বললেন, না, যুদ্ধ এখনো শেষ হয় নাই, তবে হবে, হবে। কতদিন আর ওরা পারবে? পশু-শক্তি কি মানুষের সাথে পারে?

হেনা বললো, বাবা, তুমি সত্যি বাংলাদেশের মইধ্যে গেছিলা!

মামুন মেয়ের মাথার চুল ধরে নেড়ে দিয়ে বললেন, হ রে ছেমড়ি, হ। একেবারে কুষ্টিয়ার মইধ্যে, মেহেরপুরে। সেখানে আমাগো আর্মি ছিল, পাকিস্তানীরা ভয়ে ধারে কাছে আসে নাই।

হেনা আবার জিঞ্জেস করলো, বাবা, সেখান থিকা মা’র কোনো খবর পাও নাই? কুষ্টিয়া থিকা মাদারিপুর কতদূর?

মামুন নাচ থামিয়ে সুখু মিঞাকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন। মঞ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, তার মুখেও অনেকগুলি প্রশ্নের রেখা। ফিরোজা বেগম, বাবুল চৌধুরীর কোনো খবর এতদিনে জানা যায়নি, জানার কোনো উপায় নেই। তারাও মামুনদের কোনো খবর জানে না।

বাধ্য হয়ে মিথ্যে কথা বলার জন্য মামুন জোর করে মুখের হাসি বজায় রেখে বললেন, চিন্তার কিছু নাই, কুষ্টিয়ায় শুনে আসলাম, ঢাকা, ফরিদপুর, চিটাগাঙ এখন শান্ত। খান সেনারা

ভয় পেয়ে গেছে, মুক্তিবাহিনীর ভয়ে তারা ক্যান্টনমেন্টে ঢুকে বসে থাকে, সিভিলিয়ানদের আর একদম ঘাঁটায় না। আমি শিগগিরই মুক্তি বাহিনীর ছেলেদের হাত দিয়া ওদের কাছে চিঠি পাঠাবো। এখন খা, সন্দেশ খা। আইজ কত বড় একটা আনন্দের দিন। মঞ্জু, গান ধর তো, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

ঘরের দরজা বন্ধ। খানিকটা দ্বিধার পর মঞ্জু গান শুরু করে দিল, হেনা আর সুখুও যোগ দিল তার সঙ্গে। মামুন যেন মোশান মাস্টার, তিনি দু হাত দুলিয়ে দুলিয়ে বলতে লাগলেন, আবার আবার।

সেই পঁচিশে মার্চের পর এই ভয়ার্ত, শঙ্কাতুর, দুঃখী পরিবারটিতে দেখা গেল এই প্রথম কিছুটা আনন্দের হিল্লোল।

এরপর মঞ্জু আর হেনা রান্না ঘরে চলে গেলে মামুন একটা রেডিও খুলে বসলেন। এই শস্তার ট্রানজিস্টারটা তিনি দু’ দিন আগে কিনেছেন। ঢাকা ধরা যায়, ঢাকার খবরে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা থাকে, তবু শুনতে ইচ্ছে করে। যদি ঐসব মিথ্যের ফাঁকে দু’ একটা সত্য হঠাৎ ঝিলিক দেয়। ঢাকার সংবাদে মুক্তি বাহিনীর কোনো উল্লেখই থাকে না, ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদগারই প্রায় সবটুকু। ভারতীয় সেনাবাহিনী নাকি ছদ্মবেশে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।

আজ মামুন অল ইণ্ডিয়া রেডিও’র খবরই শুনতে চান। ভারত সরকার কখন স্বাধীন। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে? কলকাতার পাকিস্তানী ডেপুটি হাইকমিশন কি যোগ দেবে বাংলাদেশের পক্ষে? ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলীকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তিনি বাঙালী মুসলমান হয়েও এ পর্যন্ত রাজি হননি। এখনো পাকিস্তানের প্রতি এই আনুগত্য কি শুধু চাকরির মায়ায়?

দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের খবরে কোনো উল্লেখ নেই, দিল্লি থেকে প্রচারিত ইংরিজি সংবাদেও ভারত সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা গেল না। মুজিব নগরের বাংলাদেশ। সরকারকে ইন্দিরা গান্ধী যদি শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি না দেন!

সারা দিন অনেক ধকল গেছে, রেডিও শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন মামুন। খাবার জন্য মঞ্জু আর হেনা তাঁকে ডেকে তোলার চেষ্টা করেও পারলো না।

পরের দুটি দিন গেল উদ্বেগ আর নিরানন্দে। ভারত সরকার স্বীকৃতি দেননি, স্বাধীন। বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধী একেবারে চুপ। অনেকে বলছে, উদ্বাস্তুদের তিনি। আশ্রয় দিলেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাবেন না। ভারত এখন যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চায় না।

হঠাৎ একটি সুসংবাদ এলো অন্য দিক থেকে। ইয়াহিয়া সরকারের একটা ভুল চালে সুবিধে হয়ে গেল বাঙালী বিদ্রোহীদের। কলকাতার পাকিস্তানী ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলীকে রাওয়ালপিণ্ডিতে বদলির অর্ডার এলো। হোসেন আলীর স্ত্রী ও আত্মীয় পরিজনেরা বেঁকে বসলেন, এই অবস্থার মধ্যে তাঁরা কিছুতেই হোসেন আলীকে রাওয়ালপিণ্ডি যেতে দিতে চান না, যদি সেখানে নিয়ে গিয়ে তাঁকে অ্যারেস্ট করা হয়? পাকিস্তান সরকারের কোনো উঁচু পদেই আর বাঙালী রাখা হবে না, এ তো সবাই জেনে গেছে।

হোসেন আলী এবার তাজউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন নিজেই। একাত্তর জন বাঙালী কর্মচারী নিয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখাতে চান। ডেপুটি হাই কমিশনের বাড়িটিও থাকবে তাঁদেরই দখলে।

সারা কলকাতায় সারা পড়ে গেল। পাকিস্তান যে সত্যি ভাঙছে, এটা তার একটা সত্যিকারের বাস্তব প্রমাণ। দূতাবাসের আনুগত্য বদল তত সহজ কথা নয়। এই ঘোষণার পরদিন সকালেই পার্ক সাকাসে সেই দূতাবাসের সামনে ছুটে এলো হাজার হাজার মানুষ। ভূতপূর্ব পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশন অফিসের নাম হয়ে গেল বাংলাদেশ মিশন, সেখানে শুরু হলো এক স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব। শুধু সাংবাদিকরাই নয়, তাতে যোগ দিলেন কবি-সাহিত্যিক, সঙ্গীত শিল্পীরা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে-সব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী এবং বুদ্ধিজীবীরা এদিকে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বাধ্য হয়ে, তাঁদের সকলের চোখ মুখে উল্লাস। এতদিন পর কলকাতায় তাঁদের মিলনের একটা নিজস্ব জায়গা হলো। এখানে উড়ছে বাংলাদেশের সবুজ-সোনালি পতাকা।

একটার পর একটা গান গেয়ে চলেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মন দিয়ে সেই গান শুনতে শুনতে হঠাৎ ডায়াসের কাছাকাছি একজন মানুষকে দেখে চমকে উঠলেন মামুন। আর কোনো কিছু চিন্তা না করে তিনি এগোতে লাগলেন ভিড় ঠেলে। অরুণ সেনগুপ্ত তাকে দেখতে পেয়ে হাত ধরে বলতে গেলেন কিছু, মামুন তাঁর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে গেলেন সামনে। উদ্দিষ্ট লোকটির পাশে গিয়ে তার পিঠে হাত রেখে আবেগ কম্পিত গলায় বললেন, প্রতাপ, প্রতাপ।

লোকটি মুখ ফিরিয়ে বিস্মিতভাবে চেয়ে রইলেন মামুনের দিকে।

মামুন বললেন, প্রতাপ, আমায় চিনতে পারলি না? আমি মামুন, তোর কলেজের বন্ধু।

লোকটি বিনীতভাবে বললেন, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি, আপনার বোধহয় ভুল। হয়েছে, আমার নাম প্রতাপ নয়।

১২. সরকারি মতে বসন্ত এসে গেছে

সরকারি মতে বসন্ত এসে গেছে। টাইমস পত্রিকায় ছাপা হয়েছে রাস্তার ধারের ঘাষফুলের ছবি। কে প্রথম রবিন পাখির ডাক শুনেছে তাও জানিয়েছে খবরের কাগজে চিঠি লিখে। তবু আজ দুপুর থেকে হঠাৎ বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেল! এদেশের আবহাওয়ার মতি গতি বোঝা ভার। এক একদিন সকাল থেকে রাত্তিরের মধ্যেই যেন তিন চারটে ঋতু খেলা করে যায়। আজ সকালে ছিল ঝকঝকে রোদ, দুপুরে বইতে লাগলো হিমেল হাওয়া।

ওভারকোটটা তুলে রেখেছিল তুতুল, আবার বার করতে হলো। জানলার বাইরে লাগানো ছোট্ট থার্মোমিটারে দেখলো তাপমাত্রা নেমে গেছে দশের নিচে। শুধু রেইন কোট দিয়ে কাজ চালানো যাবে না। এখন পৌনে তিনটে বাজে, তুতুলকে এয়ারপোর্টে যেতে হবে পাঁচটার সময়। আকাশের রং স্লেটের মতন, আজ আর রোদ্দুর ওঠার আশা নেই।

তুতুলকে এয়ারপোর্টে যেতে হবে একা। সপ্তাহের মাঝখানে কারুর তো ছুটি নেবার উপায় নেই। পরপর কয়েকটি নাম মনে পড়লো তুতুলের, তাদের কারুকে ফোন করলে হয়তো অফিস। থেকে ঘণ্টাখানেক আগে বেরিয়ে আসতেও পারে, কিন্তু এরকম ভাবে কারুর কাছে সাহায্য চাইতে তুতুলের সঙ্কোচ হয়। সে মুখ ফুটে একজনকেও বলতে পারবে না, তুমি তোমার কাজ নষ্ট করে আমার সঙ্গে চলো। শুধু গতকাল সন্ধেবেলা সে শিরিনকে একবার অনুরোধ করেছিল। শিরিন উপস্থিত কোনো চাকরি করছে না, সে যেতে পারতো। কিন্তু শিরিন একটা অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে তুতুলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এয়ারপোর্টে গেলেই তার নাকি দারুণ মন খারাপ হয়ে যায়। তাই সে এয়ারপোর্টে যেতে চায় না।

চারটের সময় সাজগোজ করে সঙ্গে একটা অতিরিক্ত ওভারকোট নিয়ে তুতুল নিচে নামলো। গাড়িটা বার করলো গ্যারাজ থেকে। পেট্রল বেশ কম আছে, ভরে নিতে হবে রাস্তা থেকে। পার্সটা খুলে একবার দেখে নিয়ে তুতল গাড়িতে স্টার্ট দিল। সাধারণত সে গাড়ি না নিয়ে টিউব ট্রেনেই যাতায়াত করে। রাস্তা চিনতে এখনও তার গণ্ডগোল হয় তবে হিথরো ডিরেকশানে যেতে অসুবিধে নেই। কয়েকদিনের উষ্ণতার পর হঠাৎ আবার ঠাণ্ডা পড়েছে বলে বেশী ঠাণ্ডা লাগছে, তুতুল গরম হাওয়া চালিয়ে দিল গাড়ির মধ্যে।

রাস্তার দু’ধারে চেস্টনাট গাছগুলোতে নতুন পাতা এসেছে, ফুল এখনো চোখে পড়ে না। কেউ কেউ বলে, এগুলো নাকি হর্স চেস্টনাট। তুতুল তফাৎ বোঝে না। তার মনে পড়ে একটা কবিতার লাইন, “ঘোড়া নিমে কোরালির ডাক…”। পিকলুদা এই লাইনটা প্রায়ই বলতো, তুতুলের মনে গেঁথে আছে। নিমগাছ দু’রকম হয়। নিম আর ঘোড়া নিম। সেইরকম চেস্টনাটেরও ঘোড়া চেস্টনাট আছে? আশ্চর্য! আগে তুতুল গাছ বা ফুল বিশেষ চিনতো না। কিন্তু লণ্ডনে বাগান নিয়ে কথা বলা একটা ফ্যাসান। যার বাড়ির সামনে এক চিলতে বাগান। আছে, সে সেই বাগানের প্রসঙ্গ তুলবেই, এবং তাতে অন্যদেরও যোগ দিতে হয়। প্রায় সব বাগানেই গোলাপ ও চন্দ্রমল্লিকা ফোটে। লন্ডনে আসবার আগে এরকম গোলাপ তুতুল দেখেইনি। আস্তে আস্তে লন্ডন শহরটা ভালো লাগতে শুরু করেছে তুতুলের, এত ফুলের জন্যই বেশী ভালো লাগে। এই ঘিঞ্জি শহরেও তো প্রায় সব বাড়ির সঙ্গেই একটু না একটু বাগান থাকেই। তুতুল এখন টিউলিপ থেকে ম্যাগনোলিয়া গ্ল্যান্ডিফ্লোরা পর্যন্ত অনেক ফুলই চিনে গেছে।

বসন্তকাল এসেছে তাই ফুলের কথা মনে পড়ছে। আজ কি এয়ারপোর্টে এক গুচ্ছ গোলাপ নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল? তুতুল আপন মনে হাসলো, সেটা বোধ হয় আদিখ্যেতা বলে মনে হতো।

একটা হলুদ রঙের গাড়ি তুতুলের গাড়িটাকে ওভারটেক করতে করতে সেই গাড়ির চালক তুতুলের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে দিল। লন্ডন শহরে ফুলের শোভার এই এক বিপরীত দিক। একা কোনো নারীকে দেখলে এখানকার পুরুষরা অনেকেই কোনো না কোনো যৌন কৌতুকের চেষ্টা করে। সত্তর মাইল স্পীডে গাড়ি চলছে, তার মধ্যেও এই কৌতুক! এতে ওরা কী আনন্দ পায়? প্রথম প্রথম তুতুলের বিষম রাগ হতো, এখন গা-সহা হয়ে গেছে। সে একটা সান গ্লাস পরে নিল। এতে আর চোখচোখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তুতুল আজকাল সাহেবদের মধ্যেও তফাত বুঝতে পারে, ঐ গাড়ির চালকটি ইংরেজ নয়, খুব সম্ভবত ইলিয়ান কিংবা গ্রীক!

হিথরো এয়ারপোর্টের পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি রেখে তুতুল এসে দাঁড়ালো কাস্টমস্ এরিয়ার বাইরে নির্ধারিত জায়গাটিতে। ভারতীয়-পাকিস্তানী চেহারায় বেশ কয়েকজন নারী পুরুষ উপস্থিত সেখানে। তুতুল চোখ বুলিয়ে দেখলো তার চেনা নয় একজনও। কিন্তু একজন শালোয়ার কামিজ পরা মহিলা তার চোখে চোখ ফেলে তাকিয়ে রইলো বেশ কয়েক পলক। মহিলাটি যদি অল্পস্বল্প চেনাও হন। তবু তিনি নিজে থেকে এসে কথা না বললে তুতুল আলাপ করতে পারবে না। এই তার দোষ।

প্রথম দিন বিলেতের মাটিতে পা দেবার পর তুতুল আলমকে দেখেছিল এখানে। আজ সে আলমকে নিতে এসেছে। কিন্তু তুতুলের সেই প্রথম আগমনের তুলনায় আজকের দিনটির গুরুত্ব অনেক বেশী। তুতুল তার আবেগ, উত্তেজনা সব চাপা দিয়ে রেখেছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে তার মুখোনি শান্ত। তুতুল একা একা সবই সহ্য করতে পারে, তবু তার বারবার মনে হচ্ছে, আজকে সঙ্গে আর একজন কেউ থাকলে ভালো হতো!

পি আই এর প্লেন ল্যান্ড করার খবর জানা গেছে, ঠিক সময়েই ফ্লাইট পৌঁছেছে। যাত্রীরা বেরিয়ে আসছে একে একে, প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রচুর মালপত্র। আলমকে দেখা যাচ্ছে না এখনও। আজ আলম আসতেও পারে, নাও আসতে পারে। টেলিফোনে একটি অচেনা কণ্ঠস্বর তুতুলকে জানিয়েছিল, আজ আলমের ফেরার সম্ভাবনা আছে। লোকটি নিজের নামও বলেনি, তুতুল আরও দু’একটা কথা জানতে চেষ্টা করায় সে লাইন কেটে দিয়েছিল।

পঁচিশে মার্চের পর আলম আটকা পড়ে গিয়েছিল লাহোরে। তার পাসপোর্ট, ট্রাভেলার্স চেক সব চুরি গেছে। লন্ডনে আলমের বন্ধুরা বলেছিল, আলম এখন নন এনটিটি, সে আর পাকিস্তান। থেকে বেরুতে পারবে না। গোটা মার্চ মাস জুড়েই ঢাকায় সাংঘাতিক কাণ্ড চলছিল, তারমধ্যেই জোর করে দেশে চলে গেল আলম। কিন্তু ঢাকা থেকে হঠাৎ লাহোরে কেন গিয়েছিল আলম, তা বোঝা গেল না।

পাকিস্তানে ঠিক যে কী ঘটছে, তা বোঝা যাচ্ছে না স্পষ্ট। ব্রিটিশ প্রেস পঁচিশে মার্চের ক্র্যাক ডাউনের খবর ছেপেছিল, তারপর মাঝে মাঝে দু’একটা গণ্ডগোলের ঘটনা। এখন একেবারে চুপ করে গেছে। কিন্তু ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে গিয়ে কলকাতার কাগজগুলো পড়লে মনে হয়, গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পাকিস্তানে। সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের লড়াইতে নেমে গেছে গোটা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। আলমের বন্ধুরা অবশ্য এইসব কাগজের রিপোর্ট বিশ্বাস করে না। তাদের মতে, ভারতীয় কাগজগুলো একশো গুণ বাড়িয়ে লিখছে। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের আলোচনা ব্যর্থ হয়ে গেছে বটে, কয়েকটি জায়গায় কিছু সংঘর্ষও হয়েছে, তা বলে একটা দেশের আর্মি শুধু শুধু সিভিলিয়ানদের গুলি করে মারবে, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে তা কখনো হতে পারে? চীন, সোভিয়েত, আমেরিকা চুপ করে আছে, শুধু একা একা চাচাচ্ছে পাকিস্তানের জন্মশত্রু ভারত!

তুতুল কলকাতা থেকে মায়ের চিঠি পেয়েছে গত সপ্তাহে, সে চিঠিতে যুদ্ধ বিগ্রহের কোনো উল্লেখ নেই। অবশ্য মা তো কোনো চিঠিতেই দেশের অবস্থা বা রাজনীতির কথা কিছু লেখেন না। ঢাকা থেকে একখানাও চিঠি বা একজনও চেনা মানুষ লন্ডনে আসেনি গত এক মাসের মধ্যে। আলমও কেন কোনো খবর পাঠাতে পারছে না?

টেলিফোনে কে খবরটা দিল তুতুলকে? সে কি শুধু শুধু তুতুলকে এয়ারপোর্টে পাঠাবার জন্য প্র্যাকটিক্যাল জোক করেছে? এরকম একটা খবর পেলে তুতুলের না এসেও উপায় নেই।

প্রায় সব যাত্রীই তো বেরিয়ে এলো, আর বোধ হয় সম্ভাবনা নেই আলমের আসার। তবু তুতুলকে শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। তার চোখ জ্বালা করছে।

কিছুদিন ধরেই শরীরটা খারাপ যাচ্ছে তুতুলের। মাথার মধ্যে চিড়িক চিড়িক করে একটা ব্যথা হয়। একদিন সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তার কাছে এরকম কোনো পেশেন্ট এলে অবিলম্বে তাকে ই ই জি করাতে বলতো তুতুল। কিন্তু নিজের বেলায় সে ভাবছে, আরও কয়েকটা দিন দেখা যাক না, হয়তো দুশ্চিন্তা থেকেই হচ্ছে এরকম। তিন মাস আগে তার এফ আর সি এস হয়ে গেছে। কিন্তু সে এক বিচিত্র ডাক্তার, চিকিৎসা শাস্ত্রে এতখানি জ্ঞান অর্জন করেও সে নিজে বিশ্বাস করে না ওষুধ খাওয়ায়।

দরজা দিয়ে হঠাৎ আলমকে বেরিয়ে আসতে দেখে তুতুলের শুধু বুক কেঁপে উঠলো না, মাথার মধ্যে ঝনঝন করতে লাগলো। সে চোখ বুজে মনের জোর আনবার চেষ্টা করলো, এসময় তার অজ্ঞান হয়ে গেলে কিছুতেই চলবে না।

এই এক মাসের মধ্যেই অনেক রোগা হয়ে গেছে আলম, তার সুটটা ঢলঢলে মনে হচ্ছে। এমনিতেই সে লম্বা, এখন আরও যেন ঢ্যাঙা দেখাচ্ছে তাকে। একজন অত্যন্ত সুপুরুষ ও সুসজ্জিত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগোচ্ছে আলম। তাকে কেউ নিতে এসেছে কি না, তা সে তাকিয়েও দেখছে না।

তুতুল ভিড় ছেড়ে বাইরে চলে এলো। আলমের অতি নাটক করার অভ্যেস আছে। হয়তে হঠাৎ সে তুতুলের কোমর দুহাতে ধরে শূন্যে তুলে ফেলবে। লোকজনের সামনে তুতুলের লজ্জা করে।

তুতুলকে দেখে আলম এমনই অবাক হয়ে গেল যে কোনো রকম নাটক করার বদলে সে বেশ কয়েক মুহূর্ত ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর আস্তে আস্তে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, কী রে, তুলতুলি, তুই বুঝি ভেবেছিলি, আমি মরে গেছি?

ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তুতুল চুপ করে রইলো।

এগিয়ে এসে আলম তুতুলের থুতনিটা আলতো করে ছুঁয়ে বললো, এই দ্যাখ, আমি কোয়াইট অ্যালাইভ অ্যান্ড কিকিং। তবে আর একটু হইলেই দিত সাবাড় করে। তুই কী করে জানলি যে আমি আজ ফিরবো? কে তোকে খবর দিল?

তুতুল এখনও কোনো কথা বলতে পারছে না। তার মাথার মধ্যে ঝনঝনানি থামে নি। আলমের সঙ্গী ভদ্ররলোকটি বললেন, আমি তাহলে যাই। আচ্ছা, গুড বাই! আলম বললো, না, না, দাঁড়ান, আপনাকে ড্রপ করে দেবো। এই তুতুল তুই গাড়ি এনেছিস তো? আলাপ করায়ে দিই, আমার বান্ধবী তুতুল, এর একটা গালভরা ভালো নামও আছে ডক্তর বহ্নিশিখা সরকার, এফ আর সি এস! আর ইনি শাজাহান চৌধুরী, ইন্ডিয়ান সিটিজেন, অ্যাকচুয়ালি কলকাতার মানুষ, লন্ডনে সেটল করেছেন, ব্যবসার সূত্রে ওয়েস্ট পাকিস্তান। গিয়েছিলেন, প্লেনে আলাপ হলো।

শাজাহান চৌধুরী সালাম জানাবার বদলে হাত জোড় করে নমস্কার করলেন তুতুলকে। তারপর বললেন, কেন শুধু শুধু বদার করবেন, আমি টিউব নিয়ে চলে যাবো, মালপত্র বেশি।

আলম বললো, না, না, আপনার বাসা আমাদের পথেই পড়বে।

গাড়ি স্টার্ট দেবার পর তুতুল প্রথম কথা বললো। সে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলো, কী। হয়েছিল লাহোরে?

আলম একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, শস্তা থ্রিলারের মতন ব্যাপার স্যাপার বুঝলি! যা ঘটেছে তা যদি আমি বলি, শুনলে মনে হবে গাঁজাখুরি গল্প। কিন্তু আমাকে পাঁচে ফেলার একটা প্ল্যান যে করা হয়েছিল তাও ঠিক!

আলম বসেছে সামনের সীটে, তুতুলের পাশে। পিছনে শাজাহান। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এই গোলমালের মধ্যে ঢাকা থেকে লাহোরে চলে এলেন কেন?

আলম হেসে বললো, সেইটাই মিষ্টি নাম্বার ওয়ান। ঢাকায় এত উত্তেজনা, ছাত্রদের পাল্লায় পড়ে শেখ সাহেব এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এই ঘোষণা করে দিয়েছেন। সেরকম সময় আমার ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমি লাহোরে যেতে যাবো কোন দুঃখে। কিন্তু ঠিক চব্বিশ তারিখ আমার নামে একটা টেলিগ্রাম এলো, আমার জাফরমামা খুব অসুস্থ, আমাকে একবার দেখতে চান। এই জাফরমামা প্রায় আমার বাবার মতন। ছোটবেলায় আমি মামার বাড়িতেই মানুষ হয়েছি। বিজনেসের জন্য জাফরমামাকে মাঝে মাঝে করাচী-লাহোরে গিয়ে থাকতে হয়। এরকম একটা টেলিগ্রাম পেলে আমি না গিয়ে পারি কী করে? মামার অসুখ, খবর পেয়েও আমি যদি না যাই, আমি আবার বিলেতি ডিগ্রিওয়ালা ডাক্তার, তা হলে আমি নিমকহারাম হয়ে যাবো না? সত্যি কথা বলতে কী, আমার যেতে ইচ্ছা করছিল না। পঁচিশ মার্চের মধ্যেই একটা কিছু হেস্তনেস্ত হয়ে যাবার কথা? তবু সেইদিন সকালের ফ্লাইটেই আমাকে লাহোরে যেতে হলো।

শাজাহান বললেন, পঁচিশে মার্চ রাত্তিরেই ঢাকা শহরে অন্তত হাজার খানেক মানুষ মারা গেছে।

আলম বললো, তার বেশী ছাড়া কম না। আমার এক বন্ধু, ইত্তেফাকের সাংবাদিক ছিল, সেও মারা গেছে শুনেছি।

তুতুল জিজ্ঞেস করলো, তোমার পাসপোর্ট কোথায় হারালে?

আলম বললো, লাহোর এয়ারপোর্টে নেমে দেখি একজন লোক আমার নাম লেখা একটা বোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটারে আমি চিনি না। আমি যে সেই ফ্লাইটেই আসবো তা জানাইনি, আন্দাজে ধরে নিয়েছে। লোকটা পাঞ্জাবী, ভাঙাভাঙা বাংলা জানে, সে বললো, মামুর কম্পানিতে চাকরি করে। কিন্তু সে কোনো গাড়ি আনেনি, ভাড়া করে রেখেছে একটা ট্যাক্সি। তাইতেই আমার সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমি শুধু ভাবছিলাম, মামুর সাথে আমার শেষ দেখা হবে কি না। মামুকে একটু ভালো দেখলেই ঢাকায় ফিরে যাবো। ট্যাক্সিটা যখন জুবিলি পার্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ একটা পিকিউলিয়ার ব্যাপার হলো। একটা পুলিশের গাড়ি স্টেশানারি ছিল, হঠাৎ সেটা চলতে শুরু করলো, তারপরই আমাদের ট্যাক্সির সাথে হেড অন কলিশন। আমি ডেফিনিট যে অ্যাকসিডেন্টটা কনককটেড! পুলিশের গাড়িটা ইচ্ছে করে ধাক্কা মেরেছে।

অ্যাকসিডেন্টের কথা শুনেই তুতুল চকিতে আলমের দিকে তাকালো।

আলম সঙ্গে সঙ্গে বললো, না, আমার লাগেনি। সেরকম কিছুই হয়নি। আমি শুধু একটা গুতা খেয়েছিলাম।

তুতুল তবু বুঝতে পারলো, আলমের কণ্ঠস্বর একটু দুর্বল হয়ে গেছে। মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও সে যে সম্পূর্ণ অভাবিত কোনো দারুণ সংকটের মধ্যে পড়েছিল, তা লুকোতে পারছে না।

আলম বললো, তারপরই পুলিশগুলো এসে ট্যাক্সি থেকে ড্রাইভারকে টেনে নামালো। কিন্তু ঐ ড্রাইভারের খুব একটা দোষ ছিল না, কিন্তু আমি তর্ক করতে চাইনি, আমি শুধু বলেছিলাম, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। আর একটা ট্যাক্সি ধরার জন্য আমি নেমে দাঁড়ালাম। বুঝলে, লাহোরে তো সহজে ট্যাক্সি পাওয়াও যায় না…এর মধ্যে সেখানে ভিড় জমে গেছে, একজন। পুলিশ অফিসার আমাকে বললো, ঐ ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে আমাকেও থানায় যেতে হবে। বোঝো ঠ্যালা! আমি কেন থানায় যাবো? এইসব গণ্ডগোলের মধ্যে দেখি যে আমার হ্যাঁন্ডব্যাগটা নেই। তার মধ্যে আমার পাসপোর্ট, ট্রাভলার্স চেক, রিটার্ন টিকিট সব কিছু।

শাজাহান জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাগটা আপনার হাতে ছিল?

–না, ট্যাক্সিতে রাখা ছিল। তখন আমাকে যেতেই হলো থানায়, ডাইরি করতে তো হবেই। এর মধ্যে সেই যে লোকটা আমায় এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে গিয়েছিল, সে সরে পড়েছে। দেন ওনলি আই স্মেট র‍্যাট! পুরো ব্যাপারটাই একটা ট্র্যাপ। ক্যান ইউ বিলিভ ইট, থানায় নিয়ে যাবার পর আমাকে ডায়েরি করতে দিল না, আমাকে গারদে ভরে দিল! কোনোরকম কারণ দেখালো না, কিছু না। আমি একটা টেলিফোন করতে চাইলাম, তাও দেবে না।

–আপনার মামার অসুখের কথাটা মিথ্যে?

–সেটা অনেক পরে জানতে পেরেছি। অসুখ বিসুখ কিচ্ছ না। জাফরমামা ঐ টেলিগ্রাম পাঠান নাই, তিনি কিছু জানেনও না। পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্সের কারবার। তারা ঠিক খবর নিয়েছিল যে ঐ জাফরমামার গুরুতর অসুখের কথা জেনেই আমি ঢাকা থেকে ছুটে আসবো। ইন ফ্যাকট ওরা আমার সম্পর্কে অনেককিছুই জেনেছিল আগে থেকে। সন্ধেবেলা একজন ইন্টারোগেট করতে এলো আমাকে, এসেই বললো, আপনি ডাক্তারি করেন না পলিটিকস করেন? লন্ডনে আপনি একটা বাংলা আর একটা ইংরেজি কাগজের সাথে কানেকটেড, আপনাদের কাগজে ইস্ট পাকিস্তানের অটোনমি দাবি করা হয়েছে।

তুতুল জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে মেরেছে?

–না, মানে, ফিজিক্যাল টরচার বিশেষ করে নাই।

–বিশেষ করেনি মানে, কিছু করেছে? কোথায় মেরেছে?

–সে এমন কিছু না। পরে বলবো। শোনো, তার চেয়েও ডেঞ্জারাস ব্যাপার হলো, থানা থেকে পরদিন আমাকে আর একটা বাড়িতে নিয়া গেল, সে জায়গাটা যে কী কিছু বুঝলাম না, একটা ব্যারাক বাড়ির মতন, চারদিকে কাঁটাতার দিয়া ঘেরা, চব্বিশ ঘণ্টা আর্মড গার্ড। সেখানে দুইদিন থাকার পরই আমার মনে হলো, এরা আমাকে মেরে ফেলবে। কেউ কিছু জানবে না, গুলি করে গোর দিয়ে দেবে। আমার পাসপোর্ট নাই, কোনো আইডেনটিটি নাই, কেউ আমার খোঁজও করবে না লাহোরে। ওরা যতবার আমাকে ইন্টারোগেট করতে আসে, আমি আমার ব্যাগটার কথা তুললেই ওরা হেসে উড়িয়ে দেয়। একজন তো বলেই ফেললো, আপনার আর পাসপোর্ট দরকার হবে না! তখন সত্যি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আর বাঁচার কোনো উপায় নাই!

তুতুলের পিঠে হাত রেখে আলম আবেগ চাপবার চেষ্টা করে বললো, সত্যি ভেবেছিলাম, তোমার সাথে আর দেখা হবে না।

তুতুল জিজ্ঞেস করলো, একজন যে আমাকে টেলিফোনে খবর দিল, তোমার পাসপোর্ট টাকা পয়সা হারিয়ে গেছে, সে কে! সেই লোকটি জানলোই বা কী করে? সে বলেছিল, আমি আলমের বন্ধু, লাহোর থেকে এসেছি!

–শোনো না ব্যাপারটা। সেইই লোকের জন্যই তো বেঁচে গেলাম। যে ব্যারাক বাড়িটাতে আমারে আটকে রেখেছিল, সেখানে দু’বেলা শুধু চাপাটি আর সবজি খেতে দিত, চা-টা কিছু না। যে-লোকটা রোজ খাবার দিয়ে যেত, তার বদলে একদিন অন্য একজন লোক এলো। তাকে দেখেই আমার সন্দেহ হলো বাঙালী বলে। সে লোকটাকে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, সার, চিটাগাঙে কী হইতাছে, হুনছেন? তার কাছেই আমি জানতে পারলাম পঁচিশে মার্চের রাত্তিরের ঘটনা। দু’জন বাঙালী আর্মি অফিসারদের কোয়াটারেও সে খাবার দেয়। সেখান থেকে শুনেছে। বাঙালী আর্মি অফিসাররাও পালাবার মতলোব করছে নাকি! সেই কুকটি প্রথমে আমাকে কোনো সাহায্য করতে রাজি হয়নি, সে ভয় পাচ্ছিল, তার ওপরেও নজর রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটা উপায় আমার মাথায় এলো। যে লোকগুলো আমায় ইন্টারোগেট করছিল, তাদের কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলাম, ওরা আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানলেও একটা খবর জানে না। আমি যে বছর খানেক আগেই ব্রিটিশ সিটিজেনশীপ পেয়ে গেছি, সেটা তারা উল্লেখ করে না। আমি পাকিস্তানী পাসপোর্টও ক্যানসেলড করাই নাই। ব্রিটিশ পাসপোর্ট খানা ঢাকায় রয়ে গেছে, ট্রাভেলার্স চেক ভাঙাবার সুবিধার জন্যই পাকিস্তানী পাসপোর্টখানা লাহোরে যাবার সময় সাথে নিয়েছিলাম।

শাজাহান বললেন, আপনি ব্রিটিশ সিটিজেন হলে তো আপনাকে আটকে রাখার অধিকার ওদের নেই। সে কথা ওদের জানিয়ে দিলেন না কেন?

আলম বললো, সে কথা জানালে, ওরা তখুনি আমাকে মার্ডার করতো। আই ওয়াজ ডেফিনিট অ্যাবাউট দ্যাট। আমাকে ওরা বাঁচিয়ে রেখেছিল শুধু আমার পেট থেকে কথা আদায় করার জন্য। লন্ডন থেকে কোন কোন বাঙালী মুসলমান আওয়ামী লীগকে সাহায্য করে, টাকা। পয়সা তুলে দেয়, সেটাই ওরা জানতে চেয়েছিল। আমার দু’একজন বন্ধুর নাম করে জিজ্ঞেস করেছিল, এরা তো চায়নাপন্থী লেফটিস্ট, এরাও কি শেখ মুজিবকে সাপোর্ট করে? বুঝুন তা। হলে, কতটা ওরা জানে!

তুতুল জিজ্ঞেস করলো, তুমি কী করলে তারপর?

আলম বললো, হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনে আমার একজন বাঙালী বন্ধু পি আর ও’র কাজ করে। তার নাম মেহেদী আলী ইমাম মিন্টু। সেই মিন্টু আমার পোলাপান বয়েসের বন্ধু। আমাকে একমাত্র সেই বাঁচাতে পারে। কোনো রকমে যদি তারে খবর দেওয়া যায়। ব্যারাকের সেই বাঙালী কুককে কাকুতি-মিনতি করলাম, কোনো রকমে আমার একখানা চিঠি মিন্টুর নামে পোস্ট করে দিতে হবে। আমার মামুরে জানায়ে কোনো লাভ নাই, তিনি কিছু করতে পারবেন না, মিন্টুই ভরসা! এরপর যা একখান কাকতালীয় ব্যাপার হলো, প্রায় অবিশ্বাস্য বলা যায়। আল্লার বোধ হয় হঠাৎ নেক নজর হয়েছিল আমার উপর। আমার চিঠিখানা মিন্টু যখন হাতে পেল, তার ঠিক দু’ঘণ্টা পরেই তার লন্ডনে আসার কথা। তাতে খুব সুবিধা হয়ে গেল। মিন্টু লন্ডনে পৌঁছেই ফরেন অফিসকে সব জানালো। পাকিস্তান হাই কমিশনে গিয়েও হুমকি দিল যে কোনো ব্রিটিশ সিটিজেনকে যদি এরকম ভাবে ডিটেইন করা হয়, তা হলে সে খবরের কাগজে সব ফাঁস করে দেবে! ঐ মিন্টুই তোমাকে ফোন করেছিল তুতুল! যদি আর দুই তিন দিন দেরি হতো, তা হলে বোধ হয় আমারে আর দেখতে পেতে না। সেই বাঙালী কুকটি অ্যারেস্টেড হয়ে যায় পরের দিনই।

শাজাহান বললেন, থ্যাংক ইয়োর স্টারস্। সত্যিই আপনি খুব জোর বেঁচে গেছেন। আমি তো আর্মির সঙ্গে সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করি, আর্মির অফিসারদের পার্টি দিতে হয় মাঝে মাঝে। তাদের কাছ থেকে কিছু কিছু যা কথা শুনেছি, হরিবল, আনথিংকেবল! বাঙালীদের ওপর তাদের অসম্ভব রাগ। তারা গর্ব করেই বলেছে যে এবার ইস্ট পাকিস্তান থেকে ওয়ান ফোর্থ পপুলেশন কমিয়ে দেবে! যত পারে মারবে। বাকিদের তাড়িয়ে দেবে ইন্ডিয়ায়। হিন্দুদের সরাতে পারলেই তো কমে যাবে অনেক। আওয়ামী লীগের সাপোর্টারদের খুঁজে খুঁজে বার করে কুকুরের মতন গুলি করবে! এ তো জেনোসাইড!

আলম জিজ্ঞেস করলো, ওখানে মুক্তিযোদ্ধারা নাকি খুব জোর ফাঁইট দিচ্ছে। সে সম্পর্কে শুনেছেন কিছু?

শাজাহান বললেন, আর্মির লোকরা হাসি ঠাট্টা করে তাদের নিয়ে। চট্টগ্রামের বাঙালী

রেজিসটেন্স নাকি তারা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এর মধ্যেই। ঢাকায় এক হাজার কলেজের ছাত্রকে মেরেছে। ওদের মতে, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা সবাই ইন্ডিয়ার এজেন্ট। তাদের মরাই উচিত। শুনুন আলম সাহেব, আপনাদের পূর্ব পাকিস্তান যদি আর একটা ভিয়েৎনাম হয়ে ওঠে, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

আলম বিবর্ণ মুখে বললো, এক হাজার ছাত্রকে মেরেছে? গর্ব করে বললো এই কথা? নিজের দেশের ছেলেদের–আপনাকেই বা বললো কেন এই কথা?

শাজাহান বিচিত্রভাবে হেসে বললেন, আমি বিলেতে থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা করি, নামে মুসলমান, সুতরাং ইন্ডিয়ান সিটিজেন হলেও ধরেই ওরা নিয়েছে আমি অ্যান্টি ইন্ডিয়ান, অ্যান্টি হিন্দু হবোই! অনেকেই তো তাই মনে করে।

শাজাহান সাহেবের বাড়ি সাউথ হ্যাঁরোতে, তাঁর নামার সময় এসে গেল। সুটকেস নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে তিনি পকেট থেকে নিজের একটা কার্ড বার করলেন। সেটা আলমের হাতে দেবার আগে তিনি তুতুলের মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বললেন, অনেকক্ষণ থেকে মনে করার চেষ্টা করছি তোমাকে আগে কোথায় দেখেছি! প্রতাপ মজুমদার তোমার কে হন?

তুতুল বিস্মিত ভাবে বললো, উনি আমার মামা!

শাজাহান বললেন, তোমাকে অনেক ছোট বয়েসে দেখেছি। আমি ত্রিদিবের বন্ধু ছিলাম। তুমি প্রতাপবাবুর ছেলে পিকলুর সঙ্গে ত্রিদিব-সুলেখাদের বাড়িতে আসতে মাঝে মাঝে। পৃথিবীটা আসলে খুব ছোট, তাই না?

তুতুল বিস্ফারিত চোখে আলমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ও হাঁ, তাঁ, ত্রিদিব মামাও তো এদেশেই আছেন। আপনার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে?

সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শাজাহান আলমকে বললেন, এই কার্ডে আমার ফোন নাম্বার আছে, আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে খুশী।

তারপর তিনি আর দাঁড়ালেন না।

আলম শরীর এলিয়ে দিয়ে বললো, এখন দুইদিন আমি টানা ঘুমাবো। কোথায় যাবো রে। তুলতুলি, গোল্ডার্স গ্রীনে তোর অ্যাপার্টমেন্টে আমারে থাকতে দিবি?

তুতুল বললো, যেতে পারো। তোমার অ্যাপার্টমেন্টটাও আমি ঠিকঠাক করে রেখেছি। যা ময়লা জমেছিল, এই রবিবার ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালিয়েছি সারা দিন!

আলম হাই তুলে বললো, অর্থাৎ, তোর বাসায় আমাকে নিতে চাস না। একা একা আমার বাসায় নির্বাসন দিতে চাস, তাইই তো? কী মাইয়ার পাল্লাতেই পড়েছি, সিংহের থাবা থেকে কোনোক্রমে বেঁচে ফিরে আসলাম, তাও একটা মিষ্টি কথা বলে না, একটু আদর করে না।

–কে বলেছিল এই মাইয়ার পাল্লায় পড়তে? আরও কত সুন্দরী মেয়ে তোমার জন্য পাগল ছিল, শিরিন বেচারি কত দুঃখ পেয়েছে।

–ইচ্ছে করে কি আর পড়েছি! গ্রহের ফের, একেই বলে গ্রহের ফের!

–এখনো সময় আছে গ্রহের ফের কাটাবার! বলল, নাসিম-রেবেকাদের অ্যাপার্টমেন্টে নামিয়ে দেবো? ওরা কত খুশী হবে তোমায় পেলে!

হঠাৎ তুতুলের পিঠে একটা কিল মেরে আলম বললো, তুমি আমাকে কাটিয়ে দিতে পারলেই খুশী হও, তাই না?

তুতুল আলমের দিকে মুখ ফিরিয়ে পাতলা করে হেসে বললো, হ্যাঁ খুশী হইই-তো! তুমি জানো না?

আলম এবার তুতুলের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে গাঢ় স্বরে বললো, তুতুল, তুমি কি স্বাধীনতার থেকেও বেশী দূরে?

তুতুল রক্তিম মুখে বললো, এই প্লীজ, ওঠো, আমি ক্লাচ দিতে পারছি না। লোকে দেখছে, লোকে দেখছে!

আলম বললো, লন্ডন শহরে লোকে দেখলেও কিছু আসে যায় না। আর কতদিন আমাকে দূরে দূরে রাখবে? প্রথমে বললে, মায়ের ভীষণ আপত্তি, কিছুদিন অপেক্ষা করা যাক। তারপর বললে, আগে এফ আর সি এস হয়ে যাক। তারপর বললে, এক সাথে দেশে ফিরে…। তুতুল, লাহোরে আটক থাকার সময় সর্বক্ষণ কী ভেবেছি জানো? একেবারে খাঁটি সত্যি কথা বলছি। এতদিন আমি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য অনেক কাজ করেছি, খেটেছি, এ কাজের জন্য যে হঠাৎ প্রাণটা চলে যেতে পারে তা কি আমি জানতাম না? সে জন্য তো তৈরিই ছিলাম। কিন্তু লাহোরের ঐ কয়েদখানায় বসে মনে হতো, স্বাধীনতা আমি দেখে যাবো কি না জানি না। কিন্তু তুতুলের সঙ্গে আর দেখা হবে না? অন্তত আর একবার…। সেইজন্যই বাঁচার চেষ্টাটা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। তুমি বলবে, মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে শুধু নিজের জন্য। না, সব সময় তা হয় না, আমি এবারে সেটা অনুভব করেছি। যাক, ছাড়া তো পেয়ে গেলাম। শুনছি, স্বাধীনতার যুদ্ধও পুরোপুরি শুরু হয়ে গেছে। একদিন না একদিন স্বাধীনতা আসবেই। কিন্তু তুমি কি কোনোদিন আমার হবে না? এরকম দূরে দূরেই থাকবে?

–আমি বুঝি দূরে দূরে আছি? তুমি কিছু বোঝে না!

–তুমি কেন সম্পূর্ণ আমার হবে না? শোনো, আমি বড় ক্লান্ত, ভিতরটা একেবারে ফাঁকা হয়ে আছে। তোমার কাছে আমাকে কয়েকটা দিন থাকতে দাও। বিশ্বাস করো, আমি আর কিছু চাই না, শুধু তোমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকবো, অনেক কথা আছে। প্লিজ, গাড়িটা ঘোরাও।

–উঠে বসো, লক্ষ্মীটি। তোমাকে ওরা মেরেছে কিনা সত্যি করে বলো। কোথায় মেরেছে?

–গাড়ি না ঘুরিয়ে কথা ঘোরাচ্ছো? তোমার বাসার এক কোণায় আমাকে একটু আশ্রয় দিতে পারবে না? বুঝেছি! থাক, আর বলবো না!

–কী বুঝেছো?

–ঐ শাজাহান সাহেব তোমায় পিকলুদার কথা বললেন, তাই শুনেই তোমার মন খারাপ হয়ে গেল। তোমার মুখ দেখেই টের পাওয়া যাচ্ছে। পিকলুদাকে তুমি কিছুতেই ভুলতে পারো না! তোমার পিকলুদা খুব চমৎকার মানুষ ছিল জানি, তোমায় খুব ভালোবাসতো, বাট হি ইজ ডেড লং টাইম এগো! আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা একজন মৃত মানুষের সঙ্গে। দিস ইজ আনফেয়ার! একজন মৃত মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ কি জিততে পারে!

তুতুল আলমের চুলে একটা হাত রেখে বললো, তুমি কিছু জানো না, কিচ্ছু বোঝো না! পিলুদার কথা মনে পড়লে আমার এখন আর কষ্ট হয় না, মনটা ভালো লাগায় ভরে যায়। পিলুদা আমার সেই বয়েসেই থেমে আছে, আমার এখনকার সঙ্গী সে নয়। পিকলুদার সঙ্গে তোমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে না! গাড়ির মধ্যে শুয়ে থাকলে কি রাস্তা দেখা যায়? গাড়িটা কোন দিকে যাচ্ছে তাও তোমার খেয়াল নেই। ওঠো, আমরা প্রায় এসে গেছি!

১৩. অতীন প্যান্টে বেল্ট বেঁধে

অতীন প্যান্টে বেল্ট বেঁধে বেরুবার জন্য তৈরি হচ্ছে, এমন সময় ঝনঝন করে বেজে উঠলো। টেলিফোন। অতীন মুখ ফিরিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। টেলিফোনটা সে ধরবে, কি ধরবে না? আর আধ মিনিট বাদে, দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেলে সে ঐ টেলিফোনের আওয়াজ শুনতেই পেত না। আধ মিনিটে কী আসে যায়! এই ভর সন্ধেবেলা কেউ জরুরি টেলিফোন করে না!

কয়েকবার বেজে থেমে গেল ঝনঝনানি। অতীন নিশ্চিন্ত হয়ে জ্যাকেটটা গায়ে গলিয়ে টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে নিতে যাবে, আবার টেলিফোন বাজলো। দু’বার ডাকের মধ্যে একটা ব্যাকুলতা থাকে। এবারে ধরতেই হয়।

প্রথমে একজন অপারেটরের কৃত্রিম কণ্ঠস্বর। কালেক্ট কল, শ্যান্টা রেচাড্রি কথা বলতে চাইছে, অতীন কি নেবে?

অতীন বললো, ইয়াপ!

–হ্যালো সিদ্ধার্থ? আমি শান্তা বৌদি বলছি, একটা মুশকিলে পড়েছি ভাই।

–সিদ্ধার্থ এখনো বাড়ি ফেরেনি, আপনি যদি কোনো মেসেজ দিতে চান–

–আপনি কে? অতীনবাবু? সিদ্ধার্থ কখন ফিরবে?

–এই সময়েই ফেরার কথা! পাঁচ দশ মিনিটের মধ্যেই এসে পড়েবে বোধ হয়।

–আপনি কি বাড়িতে আছেন? আমি একটু আসতে পারি? আমার বিশেষ দরকার আছে, আমি কাছাকাছি এক জায়গা থেকেই বলছি।

ভদ্রমহিলা এখানে আসতে চাইছেন, অতীন না বলতে পারে না। কিন্তু অতীনের হাত কামড়াতে ইচ্ছে হলো। কেন সে ফোনটা ধরতে গেল? অতীন তত বেরিয়েই যাচ্ছিল, তা হলে উনি কোনো সাড়া পেতেন না।

শান্তা বৌদির বাড়িতে গিয়ে অতীন অভদ্র ব্যবহার করেছিল, তারপর একদিন সে টেলিফোনে ক্ষমা চেয়েছে বটে কিন্তু ওঁর বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ এড়িয়ে গেছে। এখন সেই শান্তা বৌদির মুখোমুখি পড়ে যেতে হবে? সর্বনাশের ব্যাপার!

ভদ্রমহিলা কালেক্ট কল করলেন কেন, তাও কাছাকাছি থেকে? সিদ্ধার্থর সঙ্গে ওঁর দরকার, অতীন বসে থেকে কী করবে? ভদ্রমহিলা নিজে থেকেই আসবেন বললেন, অতীন কী করে দরজা বন্ধ করে চলে যাবে! অতীনের কোনো কাজ নেই অবশ্য, সারাদিন বাড়িতে বসে ছিল বলেই সে একবার ঘুরে আসতে চাইছিল রাস্তা থেকে।

সিদ্ধার্থ এসে পড়লে সে কেটে পড়তে পারে। অফিস থেকে সাধারণত এই সময়েই ফেরে সিদ্ধার্থ, কিন্তু আজ যদি কোনো কারণে আটকে যায়? ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরতেই হবে, সেরকম তো কোনো মাথাব্যথা নেই।

সিগারেট ধরিয়ে সে বিরক্তমুখে অ্যাপার্টমেন্টে পায়চারি করতে লাগলো। অকারণে ফ্রিজটা খুলে দেখলো একবার। জানলার পর্দা সরিয়ে উঁকি মারলো রাস্তায়। অনেক নীচের রাস্তাটা যেন তাকে টানছে। বাইরের টাটকা বাতাস, রেস্তোরাঁর গান-বাজনা…

দশ মিনিটের মধ্যে এসে পড়লেন শান্তা বৌদি। অতীন দরজা খোলা মাত্র তিনি এক গাল হেসে বললেন, যা একখানা বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়েছে আজ! এমন বিপদে পড়ে গেছি! আমার হ্যাঁন্ডব্যাগটা চুরি হয়ে গেল!

ভেতরে এসে বললেন, কী কাণ্ড বলুন তো! আমার আগে কক্ষনো এরকম হয়নি। ব্যাগের মধ্যে আমার চেক বই, টাকাপয়সা, ড্রাইভিং লাইসেন্স সব কিছু। কী ভাগ্যিস গাড়ির চাবিটা অন্যমনস্কভাবে হাতের মুঠোয় রেখেছিলুম, ব্যাগে ঢোকাইনি!

অতীন আড়ষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করলো, ব্যাগটা কী করে চুরি গেল? শান্তা বৌদি বললেন, কী জানি, বুঝতেই পারলুম না। একটা গ্রসারি স্টোরের কাউন্টারের ওপর ব্যাগটা রেখে দু’একটা জিনিস দেখছিলুম, বোধ হয় এক মিনিটও হয়নি, তার মধ্যেই ব্যাগটা হাওয়া! কত খোঁজাখুঁজি হলো, দশ বারোজন মাত্র লোক ছিল দোকানে, তাদেরই কেউ নিয়েছে, না বাইরে থেকে কেউ এসে… আপনাদের এই পাড়াটায় বড় চোরের উপদ্রব!

অতীন বললো, আপনি কুইনসে থাকেন, অত দূর থেকে এ পাড়ায় গ্রসারি স্টোরে বাজার করতে এসেছিলেন কেন?

শান্তা বৌদি চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, আমাকে একটা কাজে ম্যানহাটনে আসতেই হয়েছিল, তারপর অফ ব্রডওয়ে থিয়েটারের টিকিট কাটলুম দুটো, সেই টিকিটও গেল, ঐ ব্যাগের মধ্যে ছিল! এদিকে এলে আমি বাজার করে নিয়ে যাই, এ পাড়ায় একটা দোকানে খুব ফ্রেস ক্যাবেজ পাওয়া যায়। এমনিতে তো এদেশের বাঁধাকপিতে কোনো স্বাদই নেই। ফিফথ স্ট্রিটের ঐ সারি স্টোরটা দেখেছেন? ওরা পৃথিবীর সব দেশের ভেজিটেবল রাখে, আমি একদিন চেঁকির শাক পর্যন্ত পেয়েছি, লাউ পেয়েছি…। আপনাদের ঘরটা বড় গরম হয়ে আছে, বাইরে কিন্তু আজ বেশ ঠাণ্ডা!

অতীন একটা জানলা খুলে দিল।

শান্তা বৌদি বললেন, ব্যাগটা চুরি যাওয়ায় একেবারে বোকা বনে গেছি! সঙ্গে তো আর একটাও পয়সা নেই, বাড়ি ফিরবো কী করে? আমার কতা অফিসের কাজে শিকাগো গেছেন, বাড়িতে ফোন করে কোনো লাভ নেই। গাড়িটা রেখেছি একটা পার্কিং লটে, সেখানে দু’তিন ডলার দিতে হবে, গাড়িটা ওখানে রেখে দিয়ে ট্রেনে যে ফিরবো, সে টিকিট কাটারও উপায় নেই, তাই ভাবলুম, কাছেই সিদ্ধার্থর অ্যাপার্টমেন্ট, যদি তার সাহায্য পাওয়া যায়।

অতীন টেবিলের প্রথম ড্রয়ারটা খুললো। এখানে সিদ্ধার্থ আর সে খুচরো পয়সাগুলো রাখে। এদেশে অনেক খুচরো জমে যায়। অতীন দেখলো, কোয়াটার আর ডাইম মিলিয়ে সাত-আট ডলার হয়ে যাবে। সে বললো, পার্কিং লট থেকে আপনার গাড়িটা ছাড়াবার ব্যবস্থা। হয়ে যেতে পারে!

শান্তা বৌদি বললেন, আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সটাও যে ব্যাগের মধ্যে ছিল! পার্কিং লটে গিয়ে যদি বলতুম আমার ব্যাগ চুরি গেছে, তা হলে ওরা এমনিই ছেড়ে দিত নিশ্চয়ই, পরে ওদের পাওনাটা চেকে পাঠিয়ে দিতুম, কিন্তু লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাবো কী করে? ধরলে জেলে দিয়ে দেবে!

এ দেশে সবাই গাড়ির ওপর নির্ভরশীল, আবার গাড়ি একটা ভয়েরও বস্তু বটে। শহরে এসে গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজে পাওয়াই বিরাট ঝামেলা, যেখানে সেখানে রাখলে পুলিশ টিকিট দিয়ে দেবে কিংবা গাড়ি টো করে নিয়ে যাবে। পার্কিং লটে রাখতে গেলে অনেক পয়সা দিতে হয়। গাড়ি খুব জোরে চালালে পুলিশ ধরে, আস্তে চালালেও ধরে, ড্রাইভিং লাইসেন্স সঙ্গে রাখতে হবে সব সময়। তা বলে, একদিন কি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যাওয়া যায় না?

শান্তা বৌদি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে? তা হলে আপনি আমায় পৌঁছে দিয়ে আসতে পারেন, গাড়িতে অনেক জিনিসপত্রও আছে।

–আমি গাড়ি চালাতে জানি না!

–তা হলে তো সিদ্ধার্থর জন্য অপেক্ষা করতেই হয়। একটু চা খাওয়াতে পারবেন? আমিই তৈরি করে নিতে পারি।

–না, না, আমি করে দিচ্ছি। টি ব্যাগ আছে, অসুবিধে কিছু নেই।

–আপনি কি বেরুচ্ছিলেন? কোথাও যাবার তাড়া আছে?

–হ্যাঁ, একটু আছে। আপনাকে চা-টা করে দিই, আশা করি সিদ্ধার্থ একটু বাদেই এসে পড়বে!

কেটলিতে জল ভরে স্টোভে চাপিয়ে দিল অতীন। এখনও তার অস্বস্তি যাচ্ছে না। সিদ্ধার্থটা আসছে না কেন? আজই সে সেই বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে কোথাও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে কি না কে জানে!

অতীন শান্তা বৌদির দিকে পেছন ফিরে আছে। ভদ্রমহিলা দেখতে বেশ সুন্দর, কিন্তু রূপের জন্য অহঙ্কারের ভাবটা নেই, ব্যবহার চমৎকার। এই যে ব্যাগ হারিয়ে বিপদে পড়েছেন, সেটা নিয়েও হেসে হেসে কথা বলছেন। এই রকম একজন মহিলার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে তো। যে-কোনো মানুষেরই ভাল লাগার কথা। অতীন নিজেই বুঝতে পারছে না, সে কেন এই মহিলার উপস্থিতি পছন্দ করতে পারছে না। ওঁর সঙ্গে আলাপের প্রথম দিনেই গণ্ডগোল করে ফেলার জন্য। উনি তো একবারও কোনো ভাব দেখান নি যে উনি তার সেদিনের ব্যবহারে আহত হয়েছেন!

শান্তা বৌদি কাছে এসে বললেন, বাচেলরদের ঘরে ভীষণ পুরুষ পুরুষ গন্ধ থাকে। জানেন, আমার পরিষ্কার বাতিক আছে। এই রকম কোনো ঘরে এলেই আমার হাত দুটো নিশপিশ করে, ইচ্ছে করে সব কিছু গুছিয়ে ঠিকঠাক করে দিই। রান্নাঘরের ওয়ালপেপারেও ঝোলের দাগ লাগিয়েছেন?

অতীন শুকনো ভাবে জিজ্ঞেস করলো, আপনার ক’ চামচ চিনি?

–এক চামচ। কিন্তু দুটো টি ব্যাগ দেবেন।

–দুধ মেশাবো, না লেবু?

–লেবুও আছে নাকি?

আসল লেবু নয়, একটা প্লাস্টিকের তৈরি অবিকল হলদে রঙের লেবু, তার মধ্যে এক আউন্স। রস, টিপলে ফোঁটা ফোঁটা পড়ে। সেটা হাতে নিয়ে শান্তা বৌদি বললেন, এই জিনিসটা আমি কখনো ব্যবহার করিনি। আমি ফ্রেস লেবুই পছন্দ করি।

চায়ের কাপটা শান্তা বৌদির হাতে তুলে দিয়ে অতীন একটু দূরে সরে গেল। ভদ্রমহিলা একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্য কোনো মতলব আছে না কি? দরজা বন্ধ, ঘরের মধ্যে দু’ জন নারী আর পুরুষ, এত কাছে এসে কথা বলার দরকার কী?

অতীন মনে মনে ঠিক করলো, এই মহিলা যদি তার সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করেন, তা হলে সে এমন শিক্ষা দেবে, যা উনি জীবনে ভুলবেন না! এদেশে এসে মেমসাহেব হয়েছেন, যার তার সঙ্গে ব্যাভিচার করে বেড়ান মনে হচ্ছে। সিদ্ধার্থ ফেরার সঙ্গে সঙ্গে সে বলবে, তুই যে শান্তা বৌদির এত প্রশংসা করছিলি, ইনি যে আমার সঙ্গে শুতে চাইছিলেন রে! এই সব। মেয়েছেলেদের আমার ছুঁতেও ঘেন্না করে।

অতীন আড় চোখে শান্তা বৌদির দিকে তাকালো। বারোয়ারি বৌদি, থিয়েটার করেন, সবাইকে ডেকে ডেকে খাওয়ান, আর একলা ছেলেদের অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসেন যখন তখন!

শান্তা বৌদি চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, বাঃ! থ্যাঙ্ক ইউ! আপনার সম্পর্কে বি জানি না। আপনি কি চাকরি করেন, না এখনো পড়ছেন?

–আমি কুলিগিরি করি!

শান্তা বৌদি মধুরভাবে হাসলেন।

অতীন আবার জোর দিয়ে বললো, আমি কাছেই একটা সুপার মার্কেটে লরি থেকে মালপত্তর নামাই। সপ্তাহে তিন দিন।

–প্রথম প্রথম এসে অনেককেই এরকম অড জব করতে হয়। কত ছাত্র-ছাত্রী হোহাটেল-রেস্তোরাঁয় বাসন মাজার কাজ করে। এদেশে ডিগনিটি অফ লেবার আছে।

–ডিগনিটি অফ লেবার আবার কী! এদেশে টাকা ছাড়া একদিনও বেঁচে থাকা যায় না। বলেই লোকে বাধ্য হয়ে যে-কোনো কাজ করে। লেখাপড়া শিখে কুলিগিরি কিংবা ঝি-চাকরগিরি করার মধ্যে কোনো ডিগনিটি অফ লেবার নেই!

–আমার এক দেওর অনেকদিন গ্যাস স্টেশনে অ্যাটেনডেন্ট-এর কাজ করেছে। এখন সে হোয়াইট কলার জব পেয়েছে। প্রথম কিছুদিন কষ্ট করতে হয়।

–এখানে লাথি ঝাঁটা খেয়েও দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকতে হয়, যদি একদিন বড়লোক হওয়া যায় এই আশায়!

শান্তা বৌদি এবার এত জোর হেসে উঠলেন যে তাঁর হাতের চায়ের কাপ চলকে গেল, খানিকটা চা পড়লো শাড়িতে। তাড়াতাড়ি কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, পেপার ন্যাপকিন আছে?

অতীন দু’তিনখানা কাগজ এনে দিল। শান্তা বৌদি শাড়ি মুছতে মুছতেও হাসতে লাগলেন। অতীনের গা জ্বলতে লাগল। এরকম অকারণ হাসি মেয়েরাই শুধু হাসতে পারে।

অতীন এবার আর সরে গেল না। শান্তা বৌদি হাসি থামিয়ে একদৃষ্টিতে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। অতীন ভেতরে ভেতরে অপেক্ষা করছে, সে মহিলাকে সিডাকশান শুরু করার সুযোগ দিচ্ছে।

–আপনি নাকি সেদিন আমার বাড়ি থেকে ফেরার সময় চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিলেন?

–এ কথা কে বলেছে আপনাকে?

–যে-ই বলুক, ঘটনাটা কি সত্যি?

–হ্যাঁ।

–কেন, ঐ রকম করেছিলেন কেন?

–আমার ইচ্ছে হয়েছিল।

–প্রথমে শুনে ভেবেছিলুম, আমি কিংবা আমার বাড়ির কেউ সেদিন আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। আমার এত লজ্জা হয়েছিল।

শান্তা বৌদি একটা হাত তুললেন। অতীন ভাবলো, এইবার উনি তাকে ছোঁবেন, সান্ত্বনা দেবার ছলে সিডাকশনের প্রথম স্তর। ওর বুকের আঁচলটা খসে গেছে অর্ধেকটা, ইচ্ছে করেই করেছেন নিশ্চয়ই।

শান্তা বৌদি তাঁর ফস, নরম বাঁ হাতের তালুটা অতীনের মুখের কাছে এনে বললেন, এই দেখছেন, কত বড় একটা কাটা দাগ, একবার একজন আমাকে ছুরি মারতে এসেছিল, আর একটা দাগ আছে ঘাড়ে, সেটা চুলের তলায় ঢাকা পড়ে যায়।

হাতটা নামিয়ে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

কেন যে তিনি হঠাৎ এই কথাটা বললেন তা বোঝা গেল না। পরক্ষণেই তিনি বললেন, আপনি আমাকে দু ডলার ধার দিন। সিদ্ধার্থের আসতে দেরি হবে মনে হচ্ছে, আমি ট্রেনে। করেই বাড়ি চলে যাই।

একটু অবাক হলেও অতীন ড্রয়ার থেকে বেশ কিছু খুচরো তুলে নিল। শান্তা বৌদি হাত পেতে সেগুলো নিলেন, তারপর বললেন, আপনি চা খাওয়ালেন, পয়সা দিলেন সেজন্য অনেক ধন্যবাদ। সিদ্ধার্থ ফিরলে বলবেন একটা ফোন করতে। গাড়িটা থাক আজকে।

অতীন বললো, আপনি ইচ্ছে করলে আর একটু অপেক্ষা করতে পারেন। সিদ্ধার্থ জেনারেলি এই সময়েই ফেরে।

–নাঃ, আপনার নিশ্চয়ই অন্য কাজ আছে, আপনার সময় নষ্ট করবো না।

–আমি যদি আপনাকে আর কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি, মানে, আপনার একা ট্রেনে। যাওয়ার অভ্যেস আছে তো?

শান্তা বৌদি আবার হেসে বললেন, হ্যাঁ, অভ্যেস আছে। একসময় তো আমি চাকরিও। করেছি।

দরজার কাছে গিয়ে আবার পেছন ফিরে তিনি বললেন, জীবনের যেমন অনেক খারাপ দিক আছে, তেমন ভালো দিকও আছে, তাই না? সব সময় খারাপ দিকগুলিই দেখা ঠিক না। কত সময় মানুষ কত সামান্য জিনিস পেলেই দারুণ খুশী হয়ে যায়!

–হঠাৎ আমাকে এই কথাটা বলছেন কেন?

–এমনিই মনে এলো। আমি মাঝে মাঝে এরকম উল্টোপাল্টা কথা বলি। এখানকার সবাই জানে, কেউ কিছু মনে করে না।

–এর আগে আপনি ছুরি মারার কথা বললেন। আপনি কি কোনো কারণে আমাকে ভয় পেয়েছিলেন?

–না, না, আপনাকে ভয় পাবো কেন? আপনাকে প্রথম দিন দেখেই আমার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়েছিল। তারও ঠিক আপনার মতনই রাগী রাগী স্বভাব আর বয়েসের তুলনায় ছেলেমানুষ। সে আবার কট্টর কমিউনিস্ট। এই দেশটাকে দু চক্ষে দেখতে পারে না। আমি এদেশে থাকি বলে আমাকেও সে অ্যামেরিকান মনে করে। তা হলে আজ চলি!

দরজায় চাবি ঘোরাবার শব্দ হলো, শান্তা বৌদিকে প্রায় ঠেলে ভেতরে ঢুকলো সিদ্ধার্থ। তারপরই সে চেঁচিয়ে উঠলো, কী ব্যাপার, শান্তা বৌদি, আবার নেমন্তন্ন নাকি? কবে, কবে?

শান্তা বৌদি বললেন, হ্যাঁ, এই শনিবার। এবারে তাড়াতাড়ি আসতে হবে কিন্তু, সেই যে তোমরা রাত দুপুর করে আসো, সেদিন গান বাজনা হবে, সামনের রবীন্দ্রজয়ন্তীর প্রোগ্রাম ঠিক হবে।

–টেলিফোনে না বলে আপনি নিজে এত দূর চলে এসেছেন?

–এ পাড়ায় এসেছিলুম, ভাবলুম নিজের মুখে বলেই যাই। তোমার বন্ধুর সঙ্গে গল্প করাও হলো।

–আপনি অতীনের সঙ্গে গল্প করলেন? ও গল্প করতে জানে? ও তো একটা টিপিক্যাল হুঁকোমুখো হ্যাংলা, বাড়ি তার বাংলা, মুখে তার হাসি নাই দেখেছো? ও আপনার সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি বা রাগারাগি করেনি তো?

–না, না, আমার সঙ্গে রাগারাগি করবেন কেন? উনি তো নিজের ওপরেই খুব রেগে আছেন মনে হলো! যাই হোক, আমাকে চা-টা খাইয়েছেন। সিদ্ধার্থ, আমি আজ চলি, শনিবার ঠিক এসো, তোমার বন্ধুর যদি খুব আপত্তি না থাকে তা হলে সঙ্গে নিয়ে এসো!

অতীন এবারে প্রকৃতই অবাক হয়ে গেছে। এই ভদ্রমহিলার চরিত্রটা সে কিছুই বুঝতে পারছে না। ব্যাগ হারানোর কাহিনীটা তা হলে কি রসিকতা, সেই জন্যই হাসতে হাসতে বলছিলেন? কিন্তু ঐ ছুতোয় এসেও তিনি অন্য কিছু তো করলেন না!

সে বললো, আপনার তা হলে হ্যাঁন্ডব্যাগ হারায় নি?

সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলো, হ্যাঁন্ডব্যাগ হারিয়েছে? কবে?

শান্তা বৌদি অতীনকে চোখ দিয়ে ধমকে বললেন, আপনি আমার কথা শুনে বুঝতে পারলেন।

যে ও কথাটা ওকে এখন বলতে চাইনি! বেচারি অফিস থেকে খেটেখুটে এসেছে, এখন আমি ওকে কোনো ট্রাবল দিতে চাই না। গাড়িটা কাল নিয়ে গেলেই হবে। যা যাবার তা তো গেছেই!

সিদ্ধার্থ বললো, হ্যাঁন্ডব্যাগ? গাড়ি? কী হয়েছে বলুন তো! বসুন, শান্তা বৌদি, এত হুড়োহুড়ি করছেন কেন?

সিদ্ধার্থ সব শুনে একগাল হেসে বললো, আপনি যে একদিন বলেছিলেন আপনার কিছু হারায় না! ইউ ক্যান অলওয়েজ টেক কেয়ার অফ ইয়োরসেলফ? এবার ঠ্যালা বুঝলেন তো? গ্রীনিচ ভিলেজে কবি, টুরিস্ট আর চোর সব সময় গিসগিস করছে। একদিন কী হয়েছে জানেন, একটা টুরিস্ট ফ্যামিলি, বাবা-মা-ছেলে-মেয়ে সব মিলিয়ে চারজন, এখানকার রাস্তা দিয়ে ঘুরছে আর খচাখচ ছবি তুলছে। কিন্তু সবার ছবি তো একসঙ্গে উঠছে না, যে তুলছে, তারটা বাদ যাচ্ছে, সেইজন্য রাস্তার একজন লোককে ডেকে, ক্যামেরাটা তার হাতে দিয়ে বললো, ভাই, তুমি আমাদের একটা ছবি তুলে দেবে? সেই লোকটা ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে একটু পোজ মারলো, তারপর হঠাৎ এক দৌড়ে পালিয়ে গেল। আর ধরাই গেল না তাকে। নেশাখোর, বুঝলেন না? ক্যামেরাটা নিয়ে গিয়ে পন্ শপে বিক্রি করে গাঁজা কিনবে!

শান্তা বৌদি বললেন, বাবাঃ, আমি আর তোমাদের পাড়ায় কক্ষনো বাজার করতে আসছি। দরকার নেই আমার ফ্রেস ভেজিটেবলে!

সিদ্ধার্থ বললো, শান্ত হয়ে বসুন! নো প্রবলেম। এ পাড়ার পার্কিং লট দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে, আমি গাড়ি বার করে দেবো, কোনো চিন্তা নেই, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো। অতীন ব্যাটা নিশ্চয়ই কিছু রান্না করে রাখেনি আমার জন্য, আপনার বাড়িতে গেলে ডাল-ভাত খাওয়াবেন নিশ্চয়ই। দেয়ার ইজ অ্যানাদার গ্রেট নিউজ টু ডে! সেলিব্রেট করতে হবে!

শান্তা বৌদি বললেন, তুমি গাড়ি কিনছো, তাই তো? আজই কিনে এনেছো নাকি? সিদ্ধার্থ হাসতে হাসতে বললো, গাড়ি কেনা তো সামান্য ব্যাপার। এদেশে গাড়ি কেনা আবার কোনো নিউজ নাকি? বেকাররাও গাড়ি কেনে! এই অতীন হারামজাদা, ফ্রিজে কয়েকটা বীয়ারের ক্যান ছিল না? বার কর, বার কর, সব শেষ করে দিসনি তো? আমাকে দে, শান্তা বৌদিকে দে।

শান্তা বৌদি বললেন, আমি এখন বীয়ার খেতে পারবো না! আমি বীয়ার ভালোও বাসি না, তুমি জানো।

সিদ্ধার্থ বললো, ভালো না বাসলেও আজ একটু খেতে হবে আমাদের সঙ্গে। আপনার ব্যাগ হারিয়েছে বটে, কিন্তু আপনি দারুন গুড লাক নিয়ে এসেছেন আজ এই অ্যাপার্টমেন্টে! আপনি এত ছটফট করছেন কেন, পাঁচুদা তো নেই শহরে। বাড়িতে কে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে?

সোফায় বসে পড়ে সিদ্ধার্থ সামনের লো টেবিলে পা তুলে দিল। তারপর গলার টাইয়ের গিট আলগা করতে করতে বললো, শান্তা বৌদি, আপনি কতক্ষণ আগে এসেছেন?

শান্তা বৌদি বললেন, তা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তোমার বন্ধু এর মধ্যে আমাকে চা করে খাইয়েছেন।

সিদ্ধার্থ বললো, এতক্ষণের মধ্যে ও আপনাকে একাধিকবার শোনায় নি যে ও কুলিগিরি করে? আই বেট! এই কথাটা ও সবাইকে গর্ব করে জানাতে ভালবাসে!

শান্তা বৌদি সারা মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, ইউ লুজ, সিদ্ধার্থ! না, উনি এ কথা আমাকে একবারের বেশী বলেন নি তো!

ফ্রিজ খুলে বীয়ার ক্যান বার করতে গিয়ে অতীন ওদের দু’জনের দিকে বক্র দৃষ্টিতে তাকালো। ওরা কৌতুক করছে তাকে নিয়ে। সে যেন একটা বোকাসোকা ভ্যাবা গঙ্গারাম। অথচ সে কোনো উপযুক্ত উত্তরও দিতে পারছে না।

সিদ্ধার্থ আবার মুরুব্বি চালে জিজ্ঞেস করলো, এই অতীন! লেজি বোন্স! তুই আজ সারাদিনে ঘর থেকে বার হসনি, তাই না?

অতীন সঙ্গে সঙ্গে বললো, হ্যাঁ, একবার বেরিয়েছিলুম।

সিদ্ধার্থ শান্তা বৌদির দিকে তাকিয়ে বললো, সেলফ পিটি মানুষের কতখানি ক্ষতি করে দেখলেন তো? এ ছেলেটা আগে ভাল ছিল, এখন অনবরত ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতে ভুগতে মিথ্যে কথা বলতে শিখেছে।

তারপর মুখ ফিরিয়ে বললো, শালা, তুই নীচে গেলে একবার লেটার বক্সও দেখতি না? আমাকে ভোগা দিচ্ছিস?

পকেট থেকে সে দুটি চিঠি বার করলো। একটি লম্বা, সাদা লেফাফা, অন্যটি ভারতীয় খাম। সেই দুখানা চিঠি সে বাঁ হাতে তুলে ধরে নাটকীয় ভাবে বললো, র‍্যাগ টু রিচেস! র‍্যাগ টু রিচেস! দা গ্রেট আমেরিকান মিথ! যে অতীন মজুমদার গতকাল পর্যন্ত ছিল সুপার মার্কেটের কুলি, আজ থেকে সে রেসপেকটেবল স্কলার! অ্যাই অতীন, এই দুটো চিঠিই তোর। তার মধ্যে এই একটা আমি খুলে ফেলেছি, কিউরিয়সিটি দমন করতে পারিনি ভাই! তুই বস্টন ইউনিভার্সিটির কাজটা পেয়ে গেছিস! পোস্ট ডক্টরেট করবি, প্লাস অ্যাসিস্টান্টশীপ, মাসে সাড়ে ছ’শো ডলার করে পাবি!

অতীনের দু’ হাতে বীয়ারের টিন, সে মর্মরমূর্তির মতন স্থির হয়ে গেল। সে জানে, সিদ্ধার্থ এরকম একটা গুরুতর ব্যাপার নিয়ে ইয়ার্কি করবে না। তবু, এ কী সত্যি হতে পারে? সেমেস্টারের শুরুতে সে চিঠি পায়নি, অথচ এখন, ও, এবার তো সামার কোর্স শুরু হবে!

সিদ্ধার্থ বললো, আমার কাছে তোর তিন শো নব্বই ডলার ধার, সব কিন্তু কড়ায় গণ্ডায় শোধ করে দিতে হবে ভাই! তোর ঋণ জীবনে শোধ করতে পারবো না, এই ধরনের ফালতু কথাবার্তা আমি শুনতে চাই না। মানি ইজ মানি!

অতীনের ইচ্ছে করলো, দৌড়ে গিয়ে সিদ্ধার্থকে জড়িয়ে ধরতে। তিন শো নব্বই ডলার তো অতি সামান্য, তার চেয়ে অনেক বেশী টাকা সিদ্ধার্থ খরচ করেছে তার জন্য। সিদ্ধার্থর এইটাই। একটা বড় গুণ, সে সব কথাই হাল্কা সুরে বলে। সিদ্ধার্থর সঙ্গে এতদিন থেকেও অতীন তা শিখতে পারলো না।

অতীন মনে মনে ছুটে যাবার কথা ভাবলেও সে দাঁড়িয়ে রইলো একই জায়গায়। তার পা দুটো যেন পেরেক পুঁতে আটকে দিয়েছে। সে এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যি সে বস্টনে যাবার সুযোগ পেয়েছে? সাড়ে ছ’শো ডলার দেবে? অনেক টাকা! এই শান্তা বৌদি

আজ সৌভাগ্য নিয়ে এসেছেন।

সিদ্ধার্থ শান্তা বৌদিকে বললো, কীরকম লাকি ডগ জানেন? রোজ রাত্তিরে বস্টনে শর্মিলা বলে একটা মেয়েকে ফোন করে অতীন। লং ডিসটেন্স কল করতে করতে আমাকে ফতুর করে দিল, বুঝলেন, শান্তা বৌদি! পুরোনো বন্ধু, মুখে কিছু বলতেও পারি না। তা ছাড়া প্রেমের ব্যাপার। এখন দেখুন, কাজ পেল সেই বস্টনেই। আর টেলিফোন খরচ করার ঝামেলা রইলো না। প্রেমিকার সঙ্গে দু বেলাই দেখা হবে!

শান্তা বৌদি বললেন, বাঃ, খুব ভালো কথা তো। এবার আশা করি ওর রাগ কমে যাবে। শর্মিলা, মানে কোন শর্মিলা? যে খুব ভালো গান করে?

সিদ্ধার্থ হাতটা লম্বা করে বললো, এই নে চিঠি দুটো। সেকেন্ডটা আমি খুলিনি, আমি কক্ষনো পার্সোনাল চিঠি পড়ি না।

অতীন হাত বাড়িয়ে চিঠি দুটো নিল। তবে, যে-চাকরির ওপর তার ভবিষ্যৎ জীবন, নিরাপত্তা, তার আত্মীয়বন্ধুদের খুশী হবার ব্যাপার আছে, সেই দরকারি চিঠিটা দেখবার আগে সে দেশের চিঠিটা উল্টেপাল্টে দেখলো। দেশ থেকে খুব কমই চিঠি আসে। তবু এক একখানা এলেই অতীন ব্যাকুল হয়ে ওঠে, চিঠিখানা ছুঁয়েই সে যেন দেশের মাটির স্পর্শ পায়।

দ্বিতীয় চিঠিখানা খুলতেও হলো না। ঠিকানার হাতের লেখা দেখেই অতীন বুঝতে পারলো, সেটা অলির চিঠি! অতীনের সবঙ্গের রোম সতর্ক হয়ে উঠলো। অনেকদিন অলির সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ নেই। কিন্তু প্রতিদিনই সে অলির সঙ্গে কথা বলেছে মনে মনে। অতীনের। চিঠি না পেয়ে অলিও বোধ হয় অভিমান করে চিঠি দেয়নি। আজই অলির চিঠি এলো!

১৪. দরজায় বেল শুনে

দরজায় বেল শুনে দৌড়ে এসে খুলে দিল টুনটুনি, আগন্তুককে দেখেই সে কাঠ হয়ে গেল। বাড়িওয়ালার ছেলে পরেশ। সাদা প্যান্টের ওপর ভোয়ালের মতন কাপড়ের টি শার্ট পরা, ঘাড়ে পাউডার, চোখে হাল্কা নীল রঙের রোদ চশমা। টুনটুনির দিকে কয়েক পলক স্থিরভাবে তাকিয়ে থেকে সে চশমাটা খুললো, তার একটা চোখ টকটকে লাল, থুতনিতে স্টিকিং প্লাস্টার। সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের মতন বললো, আমি প্রতাপবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

টুনটুনি কিছু বলার আগেই সে ভেতরে ঢুকে এসে একটা বেতের চেয়ারে বসলো এবং সিগারেট ধরালো। টুনটুনির বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে, সে দাঁড়িয়েই রইলো দরজার কাছে।

পরেশ হুকুমের সুরে বললো, প্রতাপবাবুকে খবর দাও, আমার তাড়া আছে!

মামাকে ডাকবার আগে টুনটুনি চলে এলো মুন্নির কাছে। খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে একরাশ বই ছড়িয়ে পড়াশুনো করা স্বভাব মুন্নির বাবলুর ঘরটা এখন মুন্নির দখলে। তার পিঠে লাল রঙের ব্লাউজের ওপর খোলা চুল ছড়ানো। টুনটুনি খাটের পাশে বসে পড়ে ফিসফিস করে বললো, এই মুন্নি, এই মুন্নি, সে এসেছে!

সপ্তম শতাব্দীর ইতিহাস থেকে মন ফিরিয়ে এনে মুন্নি তাকালো টুনটুনির দিকে। টুনটুনির মুখখানা ভয়ে সরু হয়ে গেছে, চোখদুটিতে রাজ্যের উৎকণ্ঠা।

মুন্নি বললো, এসেছে তো কী হয়েছে, তাকে কী বললো?

–আমাকে কিছু বলেনি। মামার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

–বাবাকে ডেকে দে!

–এই মুন্নি, ও যদি মামাকে সব কথা বলে দেয়!

মুন্নির চোখে এখনও সপ্তম শতাব্দীর ঘোর। হঠাৎ তার বাবাকে মনে হলো কোনো রাজ্যহীন প্রৌঢ় রাজার মতন। কপাট বক্ষে চামড়ার বর্ম, কোমরে তলোয়ার, ক্রোধদীপ্ত চক্ষু, বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি দেবার জন্য তাঁর ওষ্ঠে শপথের কঠোর ভঙ্গি। সে হেসে বললো, বলুক না বাবাকে, বলুক, তারপর ও ঠ্যালা বুঝবে। বসবার ঘরের দেয়ালে একটা চাবুক ঝুলছে দেখিসনি!

–মুন্নি, তুই একটু গিয়ে মামাকে বল!

–আমি এখন উঠতে পারবো না। যাঃ, অত ভয়ের কী আছে? বাবা তোকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সব সত্যি কথা বলবি! তবে দ্যাখ, ও বোধহয় তাকে বিয়ে করতে চায়!

প্রতাপ যখন বসবার ঘরে ঢুকলেন তখনও পরেশের সিগারেট শেষ হয়নি, কিন্তু আর টান না। দিয়ে সেটা সে অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিল। টুনটুনির সামনে প্রতাপবাবু বললেও এখন সে অস্পষ্টভাবে বললো, কাকাবাবু, আপনার কাছে একটা বিশেষ দরকারে এসেছি।

প্রতাপ বললেন, হুঁ, বসো। তোমার বাবা কেমন আছেন? মাথা নীচু করে অ্যাশট্রেটা ঘোরাতে ঘোরাতে পরেশ বললো, এখন ভালো আছেন। কাকাবাবু, শুনেছেন বোধহয়, আমার দিদির বিয়ের চেষ্টা চলছিল অনেকদিন ধরে, এবারে ঠিক হয়েছে। এই সামনের মাসেই

প্রতাপ স্পষ্টত খুশী হয়ে বললেন, তাই নাকি, বাঃ, শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে তাহলে? কোথায় ঠিক হলো? পাত্র কী করে?

–সায়েন্স কলেজের রীডার। দিদির সঙ্গে একসঙ্গেই… মানে, কাকাবাবু, বলছিলুম কী।

–তোমার বাবাকে বলল, খুব খুশী হয়েছি। হ্যাঁ যাবো, নিশ্চয়ই যাবো, কত তারিখ পড়েছে?

–তারিখ এখনো ঠিক হয়নি, মানে, আমি আজ…

এ বাড়ির মালিক জ্ঞানাঞ্জন গুহনিয়োগীর সঙ্গে প্রতাপের পরিচয় বহুদিনের। ক্রিমিন্যাল কেসের উকিল হিসেবে একসময় বেশ নাম করেছিলেন এবং প্রচুর টাকা। কলকাতা শহরে তাঁর তিনখানা বাড়ি। দৃষ্টিশক্তি খুবই ক্ষীণ হয়ে যাওয়ায় তিনি ওকালতি বন্ধ করে দিয়েছেন অনেক আগেই। তাঁর ছেলেরা কেউ বাবার পেশা নেয়নি, তারা লেখাপড়ায় সুবিধে করতে পারেনি, বরং তাঁর মেজোমেয়ে সুমিতা ন্যাশনাল স্কলার হয়েছিল। এখন সে অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিকসে পি এইচ ডি করে সায়েন্স কলেজে পড়াচ্ছে। সুমিতাকে দেখতেও বেশ সুশ্রী, কিন্তু সে জেদ ধরেছিল কিছুতেই বিয়ে করবে না। এই নিয়ে জ্ঞানাঞ্জনবাবু অনেকবার আক্ষেপ করেছেন প্রতাপের কাছে। যে পিতার আর্থিক সঙ্গতি আছে, তিনি মেয়ের বিয়ে দিতে না পারলে যেন সমাজে অপদস্থ হয়ে যান। ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দেওয়া গেল না, তাহলে আর এত টাকা রোজগার করে লাভ কী হলো!

কিন্তু পরেশ তার দিদির বিয়ের নেমন্তন্ন করতে আসেনি। এ বাড়িতে সে সিগারেট ধরিয়ে ঢোকেনি আগে কখনো, আজ তার চালচলন অন্যরকম। প্রতাপের সামনে প্রাথমিক জড়ত। কাটিয়ে উঠে সে এবার বললো, কাকাবাবু, আমি অন্য একটা কথা বলতে এসেছিলুম।

–বলো!

–দিদির বিয়ে ঠিক হয়েছে… আমাদের এখন খুব জায়গার টানাটানি, তাই এই বাড়িটা আমাদের লাগবে। সেইজন্যই বলছিলাম, আপনারা যদি একটা অন্য বাড়ি খুঁজে নেন।

সামান্য একটা ছোট একতলা বাড়ি, জ্ঞানাঞ্জন গুহ নিয়োগীর অন্য সম্পত্তির তুলনায় অতি নগণ্য। বউবাজারে তাঁর অন্য একটি বাড়িতে তিরিশ ঘর ভাড়াটে। সম্প্রতি নিউ আলিপুরে আর একটি জমি কিনেছেন। প্রতাপ অবিশ্বাসের হাসি নিয়ে বললেন, তোমার দিদির বিয়ের জন্য এই বাড়ি লাগবে কেন, পাত্রটি কি ঘরজামাই হতে চায় নাকি?

পরেশ নিরস স্বরে বললো, এ বাড়িতে আমাদের কিছু আত্মীয়স্বজন এসে থাকবে বিয়ের সময়, তার আগে বাড়িটা মেরামত করতে হবে!

প্রতাপ বললেন, বাড়িটা বিক্রি করতে চাও নাকি? জমির দাম যেরকম হু হু করে বাড়ছে, এই বাড়িটাই ভেঙে যদি এখানে একটা তিন চারতলা তুলতে পারো, লাভ হবে অনেক বেশী! তাই করতে বলো না বাবাকে। আমাদের একটা ফ্ল্যাট দিও।

–কাকাবাবু, সেরকম কোনো প্ল্যান আমাদের নেই এখন। নিজেদের লোকজনদের জন্যই লাগবে।

–আমাদের তুলে দিতে চাইছো? বেশ তো, যাবো।

–আপনারা যদি এ মাসের মধ্যেই—

–এ মাসের মধ্যেই কোথায় যাবো? অন্য একটা বাড়ি খুঁজে পেতে হবে তো!

–দিদির বিয়ে সামনের মাসের দশ বারো তারিখের মধ্যেই পড়বে, তার আগে এ বাড়িটা সরিয়ে না নিলে, …আমি বাইরে থেকে দেখছিলুম, বিচ্ছিরি চেহারা হয়েছে! সব ভাড়াটেরাই বাড়ির এত অযত্ন করে!

প্রতাপ ভুরু কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন পরেশের দিকে। তার মধ্যেই তাঁর একটা কথা মনে পড়ে গেল। বছর তিনকে আগে এই পরেশের ঠিক ওপরের ভাই ধীরেশ এইরকমভাবে প্রতাপের কাছে এসে বাড়ি ছেড়ে দেবার খুব বায়নাক্কা ধরেছিল। প্রতাপ তখন জ্ঞানাঞ্জনবাবুর সঙ্গে দেখা করতেই তিনি সব শুনে অবাক হয়েছিলেন এবং ধমক দিয়েছিলেন নিজের ছেলেকে। যে-ভাড়াটে নিয়মিতভাবে ভাড়া দিয়ে যায়, তাকে যে হুট করে তুলে দেওয়া যায় না, তা তিনি নিজে ঝানু উকিল হয়ে ভালোই জানেন।

প্ৰতাপ বললেন, তোমার বাবার সঙ্গে এক জজের শ্রাদ্ধবাড়িতে দেখা হলো গত সপ্তাহে, কই তিনি তো কিছু বললেন না। অনেকক্ষণ গল্প করলেন আমার সঙ্গে!

পরেশ বললো, বাবা আর এখন এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। প্রপার্টির ব্যাপারগুলো আমিই দেখাশুনো করছি! আপনাকে কাকাবাবু এমাসের মধ্যেই বাড়ি ছাড়তে হবে। আমি ঠিক করেছি…

–তুমি কী ঠিক করেছে, তা আমার শোনার আগ্রহ নেই পরেশ। বাপের সম্পত্তি দেখাশোনা করছে, বেশ ভালো কথা, তার আগে সব নিয়মকানুন শিখে নাও! আধখানা মাসের মধ্যে কোনো ভাড়াটেকে তুলে দেবার নোটিশ দেওয়া যায়?

-–ঠিক আছে, আজ তো মাসের ছ’ তারিখ। আপনাকে আগামী মাসের ছ’ তারিখ পর্যন্ত টাইম দিচ্ছি!

–তুমি বোধহয় জানো না, তোমার বাবা আমাকে নিজে ডেকে এনে এই বাড়ি ভাড়া দিয়েছিলেন। এখনও ভাড়ার রশিদে তাঁর সই থাকে। তোমার কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। তোমার বাবার কাছ থেকে চিঠি নিয়ে এসো, কিংবা, তোমার কাছে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি আছে? কই দেখি?

–কাকাবাবু, এসব কথা তুললে শুধু ঝামেলা বাড়বে। এ বাড়ি আপনাদের এবার ছেড়ে দিতে হবেই। এত কম ভাড়ায় ভাড়াটে রাখলে আমাদের হেভি লস্।

এই পরেশকে অনেক ছোট বয়েস থেকে দেখছেন প্রতাপ। একবার ওকে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে পালিয়ে আসে। আর একবার তাকে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল বেহালার একটি কারখানায় অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে। জ্ঞানাঞ্জনবাবু চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলেরা খেটে খেতে শিখুক, কিন্তু কিছুতেই তা হবার নয়, ওরা অল্প বয়েস থেকেই বাবার টাকার স্বাদ পেয়ে গেছে।

প্রতাপ বললেন, ঝামেলা বাড়বে মানে? একবার তোমার দাদা এই নিয়ে বাঁদরামি করতে এসেছিল, তোমার বাবা তাকে শুধু মারতে বাকি রেখেছিলেন। সে এখন গেল কোথায়? তুমিও কি তার পথ ধরেছে নাকি? অন্য বাড়ি পছন্দ হলে এ বাড়ি ছেড়ে দেবো, এক মাস দু’মাসের মধ্যে ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।

–এখানে এত কম ভাড়ায় আছেন, এরপর আর কোনো বাড়িই আপনাদের পছন্দ হবে না। সব ভাড়াটেই এই কথা বলে, আমি জানি, এই বলে টাইম পাস করে।

–তুমি বেশি পাকা পাকা কথা বলছে, পরেশ! তোমার বাবার সই করা নোটিস দাও আগে, তারপর দেখবো কবে উঠে যাওয়া যায়।

–তাহলে আর বাবার চিঠি নয়, আপনাকে উকিলের চিঠিই পাঠাবো! মানে পাঠাতে বাধ্য হবো! উইথ ওয়ান মানথস নোটিস!

দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো প্রতাপের মাথায়। প্রায় থাপ্পড় মারার জন্য হাত উঠিয়েছিলেন তিনি, অতি কষ্টে সামলে বললেন, কী, তুমি আমাকে উকিলের চিঠির ভয় দেখাচ্ছো? বেয়াদপি করতে এসেছো এখানে? জ্ঞানাঞ্জনবাবু একজন সজ্জন, ভদ্রলোক, তার যত কুলাঙ্গার সন্তান! বেরোও, বেরোও এখান থেকে!

পরেশও উঠে দাঁড়িয়ে বললো, দেখুন, চোখ রাঙাবেন না! ওসব ঢের দেখা আছে। আপনার সঙ্গে এতক্ষণ সম্মান করে কথা বলেছি… আপনি বেরুতে বলছেন কাকে? এটা আমার নিজের বাড়ি!

প্রতাপ বললেন, বাড়ি একবার ভাড়া দিলে সে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে বিনা অনুমতিতে বাড়িওয়ালার ঢোকার অধিকার থাকে না। তুমি খবর্দার আর এ বাড়িতে ঢুকবে না! যাও, আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও…

চ্যাঁচামেচি শুনে ছুটে এলেন মমতা। স্বামীকে আড়াল করে বললেন, আঃ, কী শুধু শুধু মাথা গরম করছো! চুপ করো তো। কী হয়েছে পরেশ? বসো, বসো, একটু চা খাবে তুমি?

পরেশ ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো, চ্যা? এখন আমাকে চা খেতে বলছেন! আপনারা যতদিন থাকবেন, ততদিন এ বাড়িতে আমি পেচ্ছাপও করতে আসবো না। আর এ কথাও বলে দিচ্ছি, এই মাসের মধ্যে বাড়ি না ছেড়ে দিলে আপনাদের আমি রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ছাড়বো! যদি না পারি, তাহলে আমার নাম পরেশ গুহ নিয়োগী নয়! সব জিনিসপত্র ছুঁড়ে ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেবো। যদি হিম্মৎ থাকে, আমায় রুখবেন!

অতি নাটকীয় ভঙ্গিতে সে দড়াম করে দরজা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল!

প্রতাপ বললেন, আমাকে থ্রেট করে গেল? এক্ষুনি থানায় ডায়েরি করবো, ওর নামে ক্রিমিন্যাল কেস আনবো! একটা হতচ্ছাড়া বাঁদর।

মমতা বললেন, কী হচ্ছে কী? প্লিজ চুপ করবে একটু! তোমার হাই প্রেসার, এরকম বাড়াবাড়ি করলে… তুমি ছেলেটাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বললে কেন? এটা তোমার অন্যায়

মমতাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে প্রতাপ তখনই বাইরে যেতে উদ্যত হয়েছিলেন, হঠাৎ তাঁর মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো। তিনি বসে পড়লেন চেয়ারে।

টুনটুনি আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল, সে এবার মুন্নির কাছে এসে কেঁদে ফেললো। তার মনে ক্ষীণ আশা জেগে ছিল, হয়তো পরেশ তাকে বিয়ে করার প্রস্তাবই দেবে!

মুন্নি আবার ফিরে গেছে সুদূর অতীতে, বাইরের ঘরের গোলমাল তার কানে আসেনি। সে টুনটুনিকে দেখে বললো, কী হলো রে, সব ঠিক হয়ে গেল?

টুনটুনি বললো, ঐ লোকটা মামাকে অপমান করলো, খারাপ খারাপ কথা বললো। এই মুন্নি, মামা অজ্ঞান হয়ে গেছে!

রাজ্যহীন, অভিমানী প্রৌঢ় রাজার মুখখানা আবার ভেসে উঠলো মুন্নির চোখে। এইসব রাজারা বারবার লাঞ্ছিত, অপমানিত হন বটে, কিন্তু শেষপর্যন্ত ঠিকই জিতে যান!

টুনটুনির সঙ্গে মুন্নিও চলে এলো বাবাকে দেখতে। প্রতাপ অজ্ঞান হয়ে যাননি বটে, কিন্তু চোখ বুজে মাথা এলিয়ে বসে আছেন পরেশেরই পরিত্যক্ত চেয়ারে। পাখাটা ফুল স্পীডে চালিয়ে দিয়ে মমতা হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তাঁর কপালে। প্রতাপের ঠোঁটের দু’পাশ কেঁপে কেঁপে উঠছে।

মুন্নি তাকালো টুনটুনির দিকে, এবারে আসল ঘটনাটা আর গোপন রাখা যায় না।

একটু বাদে প্রতাপ অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠে স্নান করতে গেলে মুন্নি মমতাকে ডেকে বললো, মা শোনো, একটা কথা আছে!

ঘটনাটা ঘটেছে মাত্র দু’ দিন আগে।

কলেজে ভর্তি হয়েও টুনটুনির পড়াশুনায় মন যায়নি। সে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তাকে সামলানোর দায়িত্ব মুন্নির, যদিও সে টুনটুনির চেয়ে বয়েসে ছোট। টুনটুনিকে বিয়ে দেবার চেষ্টা হচ্ছে, কিন্তু এখনো ঠিক হয়নি কিছু।

দু’দিন আগে সন্ধেবেলা টিউশানি সেরে ফেরার পথে মুন্নি হঠাৎ দেখতে পেয়েছিল টুনটুনি পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে এই পরেশের সঙ্গে, হাজরা পার্কের পাশে। মুন্নি শুধু অবাক হয়নি, রেগেও গিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। এই পরেশের দাদা ধীরেশের সঙ্গে বাবলুর একবার হাতাহাতি হয়েছিল, কারণ সে একটা খারাপ কথা বলেছিল ফুলদির নামে। পরেশটাও বদ ছেলে, মুন্নি জানে, সে মেয়েদের দিকে বিশ্রীভাবে তাকায়। এই পরেশের সঙ্গে কোথায় যাচ্ছে টুনটুনি!

সন্ধেবেলা রাস্তায় অনেক মানুষজন, তাই মুন্নি ভয় পায়নি, সে সোজা ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এই টুনটুনি, বাড়ি চল!

পরেশ বলেছিল, না, ও এখন বাড়ি যাবে না। ওর জন্য আমি থিয়েটারের টিকিট কিনেছি, ও আমার সঙ্গে থিয়েটারে যাবে!

মুন্নি টুনটুনির চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, টুনটুনি, তুই থিয়েটারে যাবি, বাড়িতে বলে এসেছিস?

টুনটুনি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলেছিল, না, আমি থিয়েটারে যাবো না!

ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াতো না। এরকম ছোটখাটো নাটক তো রাস্তাঘাটে প্রায়ই হয়, কেউ বিশেষ মাথা ঘামায় না। কিন্তু জগুবাবুর বাজারের দোতলার মদের দোকানে পরেশ সারা। দুপুর-বিকেল মদ্যপান করেছিল বলেই সে কাণ্ডজ্ঞানটুকু হারিয়েছিল। কলকাতার রাস্তায় চলাফেরার কয়েকটি অঘোষিত নিয়ম রীতি আছে। তার মধ্যে একটা হলো এই যে প্রতিটি মোড়ের মাথায় গুচ্ছ গুচ্ছ নিষ্কম যুবকেরা যদি পথ-চলতি যুবতীদের দিকে নানা রকম রসালো মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়, তা কেউ গায়ে মাখে না। আরও কিছু কিছু অসভ্যতাও সহ্য করা হয়। কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো মেয়ের গায়ে হাত দেওয়া অমার্জনীয় অপরাধ! তখনই জেগে ওঠে নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালিদের নীতিবোধ ও বীরত্ব।

মুন্নির সঙ্গে কথা কাটাকাটি করতে করতে পরেশ এক সময় টুনটুনির হাত চেপে ধরে জড়িত গলায় বলেছিল, আলবাৎ ও যাবে আমার সঙ্গে! তুই যা না, পুঁচকে মেয়ে বাড়িতে গিয়ে মায়ের আঁচল ধরে দুধ খেগে যা! এ আমার গার্ল ফ্রেন্ড, একে আমি যেখানে খুশী নিয়ে যাবো!

টুনটুনি হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে বলে উঠেছিল, না, না, আমি যাবো না! আমি বাড়ি যাবো!

তক্ষুণি কোথা থেকে চার পাঁচটি ছেলে হৈ হৈ করে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পরেশের ওপর! মেয়েছেলের ইজ্জৎ নিয়ে টানাটানি! বাড়িতে মা-বোন নেই!

তারা কিল-ঘুঁষি-লাথি মারতে লাগলো পরেশকে। মুন্নিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। পরেশ তাদের বাড়িওয়ালার ছেলে, তাকে ওরা এতটা শাস্তি দিতে চায় নি। কিন্তু তখন আর ওদের বাধা দেবারও ক্ষমতা নেই। একজন প্রৌঢ় ওদের বললেন, মা, তোমরা বাড়ি চলে যাও। এই নোংরা ব্যাপারের মধ্যে আর থেকো না!

ফেরার পথে মুন্নির জেরার উত্তরে টুনটুনি বলেছিল, তার কোনো দোষ নেই, পরেশ প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা করে বলে, আমি তোমায় ভালোবাসি! আমি তোমায় ভালোবাসি! আইসক্রিম খাওয়াতে চায়, বালিগঞ্জ লেকে নিয়ে যেতে চায়। টুনটুনি যত বলে যে মামা জানতে পারলে রাগ করবেন…

সরল মেয়েরাও খুব মিথ্যেবাদী হতে পারে। মুন্নির কাছে নিখুঁত নিরপরাধের ভাব করে থাকলেও টুনটুনি এর আগে তিনবার পরেশের সঙ্গে জোড়া গীজার পাশে পাঞ্জাবী হোটলের পর্দা ঢাকা কেবিনে বসে চপ কাটলেট খেয়েছে ও চুমু পর্যন্ত সম্মতি দিয়েছে। তার মুখ দেখে এসব কিছুই বোঝার উপায় নেই, সব দোষ সে দিয়ে দিল পরেশের ঘাড়ে।

এ কাহিনী শুনে মমতা দারুণ আতঙ্কিত হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললেন, এ বাড়িতে আর কিছুতেই থাকা চলবে না। পরেশ প্রতিশোধ নিতে এসেছে, সে ছাড়বে না। সহজে। জ্ঞানাঞ্জনবাবু বুড়ো হয়েছেন, চোখে দেখতে পান না, তিনি কী করে সামলাবেন এই অসভ্য ছেলেদের। প্রতাপ বুঝবেন না, শুধু আইন কানুন দিয়ে দেশটা চলে না, মামলা করে ওরা ভাড়াটে ওঠাতে না পারলেও এমন অত্যাচার শুরু করবে যে টেকা যাবে না। আগেরবার তবু বাবলু ছিল বাড়িতে, বাবলুর বন্ধুবান্ধবের দল ছিল, তাদের ভয় পেতে ধীরেশ-পরেশরা। এখন প্রতাপ আদালতে চলে গেলে বাড়িতে শুধু চারটি নারী, ওরা কখন কী উৎপাত করবে, তার কিছু ঠিক নেই। এই সময় নকশালদের নাম করে বাড়িতে যখন তখন ছেলেরা ঢুকে পড়তে পারে।

মমতার প্রস্তাব শুনে প্রতাপ যথারীতি গর্জন করে বলে উঠলেন, এ বাড়ি ছাড়বো? কক্ষনো! যদি ভালো করে, ভদ্রভাবে বলতো, অন্য বাড়ি দেখেশুনে নিশ্চয়ই ছেড়ে দিতাম। কিন্তু আমাকে ভয় দেখাবে? মুখের ওপর শাসিয়ে যাবে? করুক ওরা মামলা, অন্তত তিন চার বছর চলুক।

সুপ্রীতি সকালবেলা জপে বসেছিলেন, তাই পরেশের চোটপাট তখন শোনেননি। তিনি মৃদু গলায় বললেন, এত শস্তার ভাড়া, এখন ছাড়তে গেলে নতুন বাড়িতে অনেক বেশী ভাড়া দিতে হবে না? তবে দিনকাল খারাপ, ওরা যদি মারতে-টারতে আসে।

প্রতাপ বললেন, বিমান আমাকে একটা রিভালভার দিতে চেয়েছিল, সেটা এবার এনে। বাড়িতে রাখবো। এইসব ত্যাঁদোড় ছেলেদের কী করে শায়েস্তা করতে হয় আমি জানি।

মমতা চোয়াল শক্ত করে স্বামীর দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন। তিনি জানেন, প্রতাপের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, একবার গোঁ ধরলে প্রতাপ যুক্তির ধার ধারেন না। টুনটুনির সঙ্গে পরেশের ঘটনাটাও জানানো যাবে না প্রতাপকে, তা হলে তিনি হয়তো টুনটুনিকে তুলে আছাড় মেরেই বসবেন।

প্রতাপের গোঁ-এর একমাত্র উত্তর মমতার জেদ। ওদের দু’জনের কথার মাঝখানে তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন, আমি এ বাড়িতে আর কিছুতেই থাকবো না!

প্রতাপ বললেন, তুমি বলছো কি মমো! একটা চ্যাংড়া ছেলে এসে ভয় দেখালেই আমাদের উঠে যেতে হবে?

মমতা বললেন, পরের বাড়িতে জোর করে থাকতে আমার ঘেন্না করে! আমি থাকবো না বলেছি, কিছুতে থাকবো না, এটা অপয়া বাড়ি। দরকার হয় টালিগঞ্জ, যাদবপুরে উঠে যাবো। কিংবা আরও দূরে।

বিকেলবেলা আদালত থেকে ফিরেও প্রতাপ মমতার জেদ টলাতে পারলেন না একটুও। মমতার মুখ থমথমে হয়ে আছে। মুন্নি আর টুনটুনি একবারও বেরুলো না ঘর থেকে। প্রতাপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, আবার বাড়ি খুঁজতে হবে!

এককালে কলকাতার অনেক বাড়িতে টু-লেট লেখা বোর্ড ঝুলতো, সেই সব বোর্ড কবেই অদৃশ্য হয়ে গেছে! এখন লোকে বাড়ি ভাড়ার সন্ধান পায় কী করে? খবরের কাগজে যেসব ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন থাকে, সেগুলোর ভাড়া আড়াই হাজার তিন হাজার টাকা! অত টাকা বাড়ি ভাড়া দেবার মত লোকও আছে এ শহরে! ডাকাতি না করে কেউ এতটাকা রোজগার করতে পারে?

আদালত থেকে ফেরার সময় আজকাল প্রতাপের নিজস্ব আদালি রজ্জব শেখ ফাঁইলপত্র নিয়ে বাড়ি পর্যন্ত আসে। এক হিসেবে সে এখন প্রতাপের বডি গার্ডও বটে। তার কাছ থেকে প্রতাপ বাড়ি খোঁজার ব্যাপারে পরামর্শ নিলেন। রজ্জব শেখ বললো যে অনেক পানের দোকানে বাড়ি ভাড়ার সন্ধান পাওয়া যায়। পানওয়ালারা খবর রাখে পাড়ার কোন বাড়ি খালি হলো কিংবা ভাড়াটে এলো। পানের দোকানের সামনে বাড়ির দালালরাও দাঁড়িয়ে থাকে। রজ্জব শেখের বাড়ি বেহালায়, দরকার হলে সে সেদিকে সাহেবের জন্য বাড়ি খুঁজে দিতে পারে।

মমতা এ বাড়ি তো ছাড়বেনই, কালীঘাট পাড়াতেই আর থাকবেন না বলেছেন। প্রতাপ দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ের পানের দোকানের সামনে একজন দালালের সন্ধান পেলেন। তার হাতে পাঁচখানা বাড়ি আছে। প্রতিটি বাড়ি দেখানোর জন্য তাকে দিতে হবে দশটাকা, আর কোনো বাড়ি পছন্দ হলে তাকে দিতে হবে একমাসের ভাড়া। অগত্যা সেই দালালের সঙ্গেই এক সন্ধেবেলা মমতাকে নিয়ে বেরুলেন প্রতাপ। পর পর চারটি ফ্ল্যাট দেখলেন, প্রত্যেকটিই অখাদ্য, মমতা নাক সিটকে রইলেন। পঞ্চম ফ্ল্যাটটি কিন্তু চমৎকার, বেশ পছন্দসই। যতীন দাস রোডে একটি ছোট দোতলা বাড়ির পুরো দোতলাটা ভাড়া দেওয়া হবে, বেশ ঝকঝকে পরিষ্কার আলো-হাওয়া যুক্ত, তিনখানা শোওয়ার ঘর, আর একটি ছোট ঘর ও টানা বারান্দা। ভাড়া তিন শো পঁচিশ টাকা, প্রতাপের সাধ্যের অতিরিক্ত নয়। বাড়িওয়ালাটি ফুটফুটে ফস ছোট্টখাট্টো মানুষ, বেশ নম্র ও ভদ্র, তিনি থাকেন একতলায়, তাঁর স্ত্রীর বাতের অসুখ, সিঁড়ি ভাঙতে পারেন না বলে দোতলাটা ভাড়া দিচ্ছেন।

মমতার মুখে হাসি ফুটেছে। প্রতাপও অনেকটা হালকা বোধ করছেন। এত সহজে যে এমন সুন্দর একটা বাড়ি পাওয়া যাবে তিনি আশাই করেননি। বস্তুত, কালীঘাটের বাড়ির তুলনায় এ বাড়ি অনেক বেশী মনোমত, পাড়াটাও ভালো। বাড়িওয়ালা চা আনিয়েছেন, সেই চায়ে চুমুক দিতে দিতে প্রতাপ বললেন, তাহলে আজই ফাইনাল করে নিতে চাই। অ্যাডভান্সের টাকাটা…

বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকটি দালালটির দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, অ্যাই বেচু, তুই এনাদের সব কন্ডিশন বলে এনেছিস তো?

দালালটি বললো, না বলিনি, তবে তাতে কোনো অসুবিধে হবে না। ইনি হলেন হাইকোর্টের জাজ…

প্রতাপ বাধা দিয়ে বললেন, না, হাইকোর্টের নয়…

দালালটি বললো, ঐ হলো গিয়ে, আপনি স্যার জাজ তো! স্যার, এ বাড়ির দুটি কন্ডিশন আছে। একগাদা বাচ্চাকাচ্চা থাকলে চলবে না। আর স্যার সেলামি দিতে হবে দশ হাজার টাকা!

প্রতাপ প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, সেলামি? দশ হাজার টাকা?

সেলামি কথাটা যে প্রতাপ আগে শোনেননি তা নয়। বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে এই জিনিসটা যে চলছে সে কথা খবরের কাগজেও বেরোয়। কিন্তু অন্যের মুখে শোনা আর খবরের কাগজে পড়ার তুলনায় নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানার তীব্রতা অনেকখানি। কথাটা শুনেই প্রতাপের মনে হলো, এই ছোট্টখাট্টো ফর্সা মানুষটিকে যেন তিনি সত্যিই সেলাম করতে বাধ্য হবেন এবং এর পায়ের কাছে বসে বাণ্ডিল বাণ্ডিল একশো টাকার নোট উৎসর্গ করবেন। এই লোকটি বাড়িওয়ালা, শুধু সেই যোগ্যতাতেই তার সেলাম ও নৈবেদ্য প্রাপ্য।

প্রতাপ আবার বললেন, দশ হাজার টাকা!

বাড়িওয়ালাটি মিষ্টি করে বললেন, তার থেকে তো কম করা যাবে না। এই ফ্ল্যাটের ভাড়া এমনিতে কত হয় জানেন? অন্তত সাড়ে পাঁচশো। ভাড়া কমিয়ে রেখেছি।

প্রতাপ কাঁচুমাচুভাবে বললেন, তিনখানা ঘর তিনশো টাকা কম তো নয়। তারপরেও পঁচিশ টাকা।

–বাজার ঘুরে দেখুন, তাহলে রেট বুঝতে পারবেন। একজন মাড়োয়ারী তো এ বাড়ি নেবার জন্য ঝুলোঝুলি করছে, নেহাৎ কোনো বাঙালিকে দেবো বলেই…। বেশী ভাড়া নিয়ে লাভ নেই, বুঝলেন, কপোরেশন ট্যাক্স কাটবে, তারপর ইনকাম ট্যাক্স, প্রায় সবই কেটে নেবে। সব টাকাটা হোয়াইটে নিলে লাভের ধন পিঁপড়েয় খেয়ে যায়।

প্রতাপ মাথা নীচু করে বসে রইলেন। কত কারণে মানুষের কাছে ছোট হয়ে যেতে হয়। এই লোকটা তাকে অসহায় করে দিয়েছে, সেটা উপভোগ করে মিটিমিটি হাসছে। এই লোকটা জানে না, এই বাড়ির অন্তত কুড়ি গুণ দামের সম্পত্তি তাদের ছিল এক সময়। কিন্তু সে কথা এখানে উচ্চারণ করাও যাবে না!

দশ হাজার টাকা এখন প্রতাপের কাছে স্বপ্নেও স্পর্শযোগ্য নয়। বাবলুকে বিদেশে পাঠাবার সময় মমতার গয়নাগুলো সব গেছে। লাইফ ইনসিওরেন্স থেকে ধার করতে হয়েছে, এছাড়াও ধার আছে বিমানবিহারীর কাছে। বাড়ি ভাড়া সওয়া তিনশো টাকা দিতে হলেই সংসারের কিছু কিছু খরচ কাটছাঁট করতে হবে!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রতাপ বললেন, দশ হাজার টাকা ব্ল্যাক মানি ক’জন বাঙালি দিতে পারবে?

বাড়িওয়ালাটি শব্দ করে হাসতে লাগলেন। সেই হাসির মধ্যে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তাঁর মনের কথাটি অর্থাৎ, দশ হাজার টাকার কথা শুনলেই যাদের মুখ শুকিয়ে যায়, তাদের আবার এই রকম বাড়ি দেখতে আসার শখ কেন?

লোকটি আবার বললো, আপনি জজ, আপনাদের তো নানা রকম রোজগার। আপনারা ইচ্ছে করলে…

লোকটি বাঁ হাত বাড়িয়ে একটা বিশ্রী ধরনের ইঙ্গিত করতে যাচ্ছিল। মমতা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে তাকে আড়াল করলেন। স্বামীর মেজাজ যে ক্রমশ চড়ছে, তা তিনি বুঝে গেছেন।

লোকটির ব্যবহার এতক্ষণ বেশ ভদ্র ছিল, কিন্তু হাসির শব্দটি যেন খুবই অশ্লীল। প্রতাপের ইচ্ছে হলো, পা থেকে চটি খুলে লোকটার দু গালে ঠাস ঠাস করে পেটাতে। আর কোনো কথা। না বলে মমতাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন বাড়ির বাইরে।

দালালটি বিদায় নিল একটি দশ টাকা নিয়ে। আজ শুধু শুধু প্রায় পঞ্চাশ টাকা গচ্চা গেল।

একটুখানি এগিয়ে এসে মমতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বললেন, ইস, বাড়িটা বড় পছন্দ হয়েছিল। গো। কী সুন্দর শান্ত পাড়া।

বাড়িওয়ালার ওপর যতটা রাগ জমেছিল সবটা মমতার মুখের ওপর ফাটিয়ে দিয়ে প্রতাপ বললেন, তোমরা কি আমাকে চুরি-ডাকাতি করতে বলো? অত টাকা পাবো কোথায় আমি?

অবুঝ রমণী তবু হেসে বললেন, আহা, কলকাতায় যারা বাড়ি ভাড়া নেয়, তারা সবাই বুঝি চুরি-ডাকাতি করে?

সেদিন রাত্রে পর পর দুটো বোমা পড়লো কালীঘাটের বাড়ির সদর দরজায়। রাত তখন পৌনে একটা, ঘুমিয়ে পড়েছিল সবাই, বোমা ফাটার বিকট শব্দে জেগে উঠে মমতা ভাবলেন, পরেশ বুঝি দলবল নিয়ে এখুনি বাড়ির মধ্যে ঢুকে আসবে। অন্য অস্ত্রের অভাবে প্রতাপ ছুটে গিয়ে চাবুকটা হাতে নিলেন। কিন্তু আর কিছুই ঘটলো না। এ শুধু পরেশের ক্রোধের দুটি স্ফুলিঙ্গ। সে জানিয়ে দিচ্ছে, ক্রমশই এরকম ঘটতে থাকবে।

সদর দরজার একটা পাল্লা কাত হয়ে পড়েছে। বোমার শব্দে প্রতিবেশীদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। নকশালদের দৌরাত্ম্যে দুটি মাত্র বোমা পড়া অতি সামান্য ঘটনা। থানায় খবর দিলেও পাত্তা দেবে না। কেউ খুন-জখম হয়নি, এটা আবার কোনো কেস নাকি?

পরদিন প্রতাপ টেলিফোনে জ্ঞানাঞ্জনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে জানলেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছেন। মমতা, মুন্নি আর টুনটুনির বাড়ি থেকে বেরুনো বন্ধ করে দিলেন একেবারে। প্রতাপকে তিনি বললেন, যেমন করে হোক, এ মাসের মধ্যে উঠে যেতেই হবে!

এখন প্রতাপ ঢাকুরিয়া, টালিগঞ্জের দিকে বাড়ি দেখতে শুরু করেছেন। রজ্জব শেখ খিদিরপুরে একটা সস্তার বাড়ির সন্ধান এনেছে, সেখানেও দু’ মাসের ভাড়া অগ্রিম দিতে হবে। এজলাশে বসে শুনানি শুনতে শুনতে প্রতাপ অন্যমনস্ক হয়ে যান। যাকে বলে হাঘরে, তাঁর এখন সেই অবস্থা। একবার যে বাস্তৃভূমি থেকে দ্রুত হয়, সে বোধহয় আর কোনোদিনই স্থির বাসস্থান। পায় না। প্রতাপের কথাবার্তায় বোধহয় বোঝা যায় যে তাঁর টাকার জোর নেই, নইলে সব বাড়িওয়ালাই তাঁর সঙ্গে অবজ্ঞার সুরে কথা বলে কেন?

মাস শেষ হতে আর মাত্র ছ’দিন বাকি। এর মধ্যে প্রতাপ জ্ঞানাঞ্জনবাবুর প্যাডে লেখা ফর্মাল নোটিস পেয়ে গেছেন। পরেশকে দেখেছেন দু’একবার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। প্রতাপ যে ভয় পেয়ে বাড়ি খুঁজছেন, তা ওরা নিশ্চয়ই জেনে গেছে। প্রতাপের মুখের ওপরে পড়েছে একটা কালো ছাপ। এ সময় নিজের ছেলেটা যদি অন্তত পাশে থাকতো। না, ছেলে বিপ্লব ও দেশোদ্ধারের ছুতোয় এই সংসারটাকে সর্বস্বান্ত করে এখন বিদেশে বসে আছে, সেখানে সে মজায় আছে, নিজস্ব গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়ায়…

আদালত থেকে বেরুবার মুখে একজন সুদর্শন যুবক প্রতাপের সামনে এসে নমস্কার জানিয়ে বললো, স্যার, আমি খবরের কাগজের রিপোটার, একজন বাংলাদেশী ভদ্রলোক আপনার নামে একজনকে খুঁজছেন! আপনিই তো প্রতাপ মজুমদার?

একটু দূরে দাঁড়ানো একজন দাড়িওয়ালা মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিকে ডেকে সে বললো, সৈয়দসাহেব, দেখুন তো, ইনিই কি আপনার–

সুদীর্ঘ চব্বিশ বছরের ব্যবধান। মামুন ও প্রতাপ দু’জনেরই চেহারার অনেক পরিবর্তন। হয়েছে, মামুনের গালে অযত্নবর্ধিত দাড়ি, প্রতাপের চুলে পাক ধরেছে, তবু দু’জনে দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়েই চিনতে পারলেন।

এতদিন পরে বাল্যসুহৃদকে দেখে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠা উচিত ছিল, ততটা পারলেন না প্রতাপ। তাঁর মুখে একটা তেতো তেতো ভাব। প্রতাপ বললেন, মামুন! তুমি কবে এসেছো!

মামুনও প্রতাপকে দেখেই লাফিয়ে উঠলেন না। বরং একটু অপরাধীর মতন হেসে বললেন, এসেছি বেশ কিছুদিন, তোমার সন্ধান পাই নাই!

তারপর আলিঙ্গনবদ্ধ হলেন দুই বন্ধু!

রিপোটার অরুণ সেনগুপ্ত বললো, আপনারা আমে-দুধে মিশে গেলেন তো! আমি তাহলে এবার চলি?

মামুনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রতাপ সংক্ষেপে শুনে নিলেন ঢাকার খবর ও মামুনদের রোমহর্ষক পলায়নবৃত্তান্ত। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মেয়ে, তোমার ভাগ্নী সঙ্গে এসেছে, তারা আছে কোথায়?

মামুন বললেন, বেকবাগানের কাছে একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি, সেখানে আছে কোনোরকমে!

প্রতাপ আবার বিমর্ষ হয়ে গেলেন। মামুনের মেয়ে-ভাগ্নী এসেছে, তারা অন্য জায়গায় থাকবে কেন? প্রতাপের বাড়িতে এক্ষুনি তাদের নিয়ে আসা উচিত! প্রতাপ সে কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। কোথায় আনবেন ওদের? আজ রাত্তিরেই যদি আবার বোমা পড়ে! কলকাতা শহরেই প্রতাপের যে প্রায় বাস্তুহারার মতন অবস্থা, তা কি প্রথম দিনেই মামুনকে বোঝানো যাবে!

১৫. বড় তেঁতুল গাছটার নিচে

বড় তেঁতুল গাছটার নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে গোলাপী। আজ আকাশে বড় বেশী জ্যোৎস্না। এই মাঝরাতে জ্যোৎস্না একেবারে ফটফট করছে। দুটো কুকুর লেজ নাড়ছে এসে গোলাপীর পায়ের কাছে, কিন্তু ডাকছে না, গোলাপীর গায়ের গন্ধ তাদের খুব চেনা, তাছাড়া গোলাপী তাদের খেতে দেয়। খানিকটা দূরের কোনো ঘরে একটা বাচ্চা কাঁদছে টা টা করে। আর কোনো শব্দ নেই। সারাদিন অসহ্য গরমের পর এখন বাতাস একটু মোলায়েম হয়েছে, এই সময় সবাই গাঢ়ভাবে ঘুমোয়।

গোলাপী চোখ দুটো যেন জ্বেলে রেখেছে, তার মুখে ও শরীরে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই, সে অতিরিক্ত সাবধানী হতে চায়। তেঁতুল গাছটার তলায় ছায়া আছে, কিন্তু জ্যোৎস্নার মধ্যে হাঁটতে গেলে দৈবাৎ কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে। নেপীর ঠাকুদা কেশো রুগী, সে অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকে ঘরের সামনের দাওয়ায়। গুদাম ঘরের দু’জন গার্ড আছে, তাদেরও জেগে। থাকবার কথা।

একটা দমকা হাওয়ায় গাছের পাতার সরসর শব্দ হলো, তখনই একটা দৌড় দিল গোলাপী। সে নিজেও যেন চলন্ত বাতাস। কুকুর দুটো কিছু দূর এলো তার সঙ্গে, তারপর হঠাৎ এক জায়গায় থেমে গিয়ে উল্টো দিকে ফিরলো। গোলাপী নেমে গেল ঢালু জমিতে, বেশ খানিকটা ঘুরে স্টাফ কোয়াটারের পেছন দিক দিয়ে এসে একটা দরজার সামনে দাঁড়ালো। দরজাটা একটুখানি ফাঁক করা, ভেতরে মোম জ্বলছে। ঘরের মধ্যে একটি মাত্র তাপোশ ছাড়া আর কোনো আসবাব নেই। বিছানার ওপর বসে স্টোর ক্লার্ক বাসুদেব চক্রবর্তী একমনে কী যেন লিখে যাচ্ছে।

গোলাপী দরজাটা সামান্য ঠেলতেই সেই শব্দ শুনে বাসুদেব মুখ ফেরালো। তড়াক করে খাট থেকে নেমে এসে সে গোলাপীর হাত ধরে ভেতরে আনলো, খিল দিল দরজায়। গোলাপীকে খাটে বসিয়ে সে চোপসানো গলায় জিজ্ঞেস করলো, কেউ, কেউ দেখেনি তো?

গোলাপীর চেয়ে বাসুদেবই অনেক বেশী বিচলিত, তার মুখখানা অতিরিক্ত ভয় পাওয়া মানুষের মতন। ঘরের একটি মাত্র জানলাও বন্ধ করে দিয়ে সে আবার ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, সুশীলবাবুর ঘরে আলো জ্বলছিল? ব্যাটা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে।

গোলাপীর ঠোঁটে পাতলা হাসি, সে মাথা নেড়ে জানালো, না। বাসুদেব একটু দূরে দাঁড়িয়ে বললো, তুমি সত্যি এসেছো? আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে। গোলাপী, তুমি জল খাবে? তোমার তেষ্টা পায় নি?

গোলাপী আবার দু’দিকে মাথা নাড়লো।

বাসুদেব নিজেই ঘরের কোণে রাখা কুঁজো থেকে খানিকটা জল গেলাসে ঢেলে খেতে গিয়ে গেঞ্জি ভেজালো। গেঞ্জিটা খুলে ফেললো সে। তার পরণে শুধু লুঙ্গি। গোলাপীও শুধু একটা হলদে ডুরে শাড়ী পরে আছে। রাত্তিরে শোবার সময় সে শায়া-ব্লাউজ পরে না। সেই ভাবেই বিছানা থেকে উঠে এসেছে। গোলাপীকে খাটে বসিয়ে বাসুদেব দাঁড়িয়ে রইলো দরজায় পিঠ দিয়ে। সে গলগল করে ঘামছে। চোখ দুটি বিস্ফারিত। ঘরের মধ্যে জলজ্যান্ত একটি নারী বসে–আছে, এটা সে যেন এখনও হৃদয়ঙ্গম করতে পারছে না। গোলাপী বললো, আপনি আমারে ডেকেছিলেন…

বাসুদের মাটিতে বসে পড়লো গোলাপীর পায়ের কাছে।

গোলাপী বিব্রত হয়ে বললো, একী, একী, আপনি উঠে বসেন।

গোলাপী পা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করতেই বসুদেব তার পা চেপে ধরে বললো, না, আমি এখানেই একটু বসি, তোমাকে দেখি। জানো গোলাপী, আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে আমার এত কাছে এসে বসেনি! কারুকে আমি এভাবে ছুঁয়ে দেখিনি। গোলাপী, তুমি কি ভালো, তুমি আমার মতন একজন মানুষকে গোলাপী, তুমি কি সুন্দর!

–না, আপনি ওপরে উঠে আসেন। মোমবাতিটা নিভায়ে দ্যান, শুধু শুধু জ্বলছে।

–অ্যাঁ, আলো নিভিয়ে দেবো? ঘর অন্ধকার হয়ে যাবে?

–আলো দেখে যদি কেউ এদিকে আসে?

–কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে আমার ভয় করবে! অন্ধকার হলে তোমাকে আমি দেখবো কী।

গোলাপী হেসে ফেললো। বাসুদেবের বাহু দুয়ে সে বললো, আমাকে দেখার কী আছে? আমি একটা সামান্য মেয়ে। অন্ধকারের মধ্যে আপনার ভয় করবে? আমাকে ভয়?

বাসুদেব বললো, তোমাকে ভয় পাবো কেন? আমার এমনিই ভয় করছে। বুকের মধ্যে দুড়ম দুড়ুম শব্দ হচ্ছে। অন্য সময় তোমার দিকে ভালো করে তাকাতে পারি না।

–আপনি ঐ ভাবে বসে থাকলে আমার লজ্জা করে না?

–ঐ আলোটুকু থাক। গোলাপী, তুমি আমার একটা কবিতা শুনবে?

–কবিতা? পদ্য? আমি তো কিছু বুঝবো না!

–হ্যাঁ বুঝবে! নিশ্চয়ই বুঝবে। সব মানুষই কবিতা বোঝে। মানুষের জন্যই তো কবিতা। ঠিক মতন মন দিয়ে পড়তে হয়।

–আমি যে লেখা পড়া শিখিনি। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছি। কুপার্স ক্যাম্পে প্রাইমারি ইস্কুল ছিল।

তাতে কী হয়েছে। তোমার অক্ষরজ্ঞান তো আছে। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল, কোনো মেয়ের পায়ের কাছে বসে কবিতা শোনানো। সেইজন্যই তো ডেকেছি তোমাকে। এই দ্যাখো, এখনও আমার বুক কাঁপছে, তুমি সত্যি সত্যি এসেছো!

–আমি বেশীক্ষণ থাকতে পারবো না।

–না, না, বেশীক্ষণ না, মোটে দুটো কবিতা, ঐ খাতাটা দাও।

কবিতা পড়তে গিয়ে বাসুদেবের গলা কাঁপতে লাগলো। গোলাপী মাথা নিচু করে শুনলো। খুব মন দিয়ে, সে কিছুটা বুঝলো, অনেকটাই বুঝলো না।

পড়া শেষ করে বাসুদেব ব্যাকুল ভাবে জিজ্ঞেস করলো, বুঝতে পারলে? কেমন লেগেছে?

বাসুদেবের মাথার চুলে হাত বুলোতে বুলোতে গোলাপী বললো, খুব সুন্দর হয়েছে! আপনি আমার পায়ে হাত দেবেন না, আমরা ছোট জাত।

–জাত? আমি ওসব জাত-টাত মানি না। মেয়েরা হলো বসুন্ধরার মতন, তারাই তো আমাদের ধারণ করে, তাদের আবার নীচু জাত, উঁচু জাত কী? আমি তোমার পায়ে একটা চুমু খাবো? মোটে একবার। তুমি রাগ করবে না?

গোলাপী জোর করেও পা সরিয়ে নিতে পারলো না। বাসুদেব তার পায়ের পাতায় চুমু খাবার পর মুখ তুলে খুব কাতর ভাবে বললো, গোলাপী, তুমি আমার ওপর রাগ করলে না তো? আমি কি অন্যায় করছি? রাত্তিরবেলা তুমি আমার ঘরে এসেছে, কেউ জেনে ফেললে আমায় খুব খারাপ ভাববে, না? কিন্তু আমি যে তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি, গোলাপী! আর একটা কবিতা শোনাবো?

গোলাপী এবার খাট থেকে নেমে বাসুদেবের পাশে বসে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। বাসুদেব যেন শিউরে উঠলো খানিকটা। অবাক ভাবে গোলাপীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, এত ভালো লাগে? কোনো মেয়ের শরীরের সঙ্গে শরীর ছোঁয়াতে …এতদিন শুধু কল্পনা করেছি। আর একটা কবিতা শুনবে? এই সবগুলোই তোমাকে নিয়ে লেখা, তা বুঝতে পারছো? সেই যে একদিন কোণ্ডাগাঁও-এর রাস্তায় তুমি আমাকে দেখে একটা ধান খেত থেকে উঠে এলে, তোমার সারা গায়ে কাদা, কালো পাথরের মতন মূর্তি, তোমাকে দেখে মনে হলো এক ভিল রমণী, যেন নিবিড় কোনো জঙ্গলে তুমি থাকো, তুমি জঙ্গলের দেবী। এই কবিতায় যে ভিল রমণীর কথা, সে হচ্ছো তুমি!

–ভিল কী?ভিল রমণীরা কোথায় থাকে?

–তা জানি না। কোন বইতে যেন পড়েছি! গোলাপী, তোমার বাবা খুব রাগী লোক, আমায় কিছু সন্দেহ করেনি তো?

–না।

–যদি আমার সাধ্য থাকতো, তোমাকে এই কলোনী থেকে নিয়ে চলে যেতাম। কোনো একটা জঙ্গলে গিয়ে থাকতাম তুমি আর আমি। আমরা বিয়ে করতাম গন্ধর্ব মতে। কিন্তু তার যে উপায় নেই। আমার বাবা মারা গেছে, পাঁচটা ভাই বোন, শুধু আমার দিদি বর্ধমানের একটা ইস্কুলে চাকরি করে, দিদির বিয়ে হয়নি, আমার আরও দুটো বোনের বিয়ে হয়নি। কী করে বিয়ে দেবো বলো, সংসারই চলে না, আমি আড়াই শো টাকা মাইনে পাই, তার মধ্যে দুশো টাকাই মানি অর্ডার করি প্রত্যেক মাসে। দিদি আর বোনেদের বিয়ে না দিতে পারলে আমারও বিয়ে হবে না। বলো, আমি কি বিয়ে করতে পারি?

–দেশে আপনাদের জমি নাই?

–কিসের জমি! নিজস্ব বাড়িই নেই।

–আপনারাও কি আমাদের মতন রিফিউজি?

–না গো! রিফিউজি হলেও গভর্নমেন্টের কাছ থেকে কিছু ভাতা পেতাম। আমরা মেদিনীপুরের লোক। আমার বাবা ছিল পোস্ট অফিসের পিওন, আমি অতিকষ্টে স্কুল ফাইনাল পাস করেছি। আগে জ্যাঠামশাইয়ের সংসারে থাকতুম, বাবা মারা যাবার পর তাড়িয়ে দিয়েছে। এই চাকরিটা না পেলে না খেয়ে মরতুম।

–পশ্চিমবাংলার মানুষেরও নিজের বাড়ি থাকে না?

–কাটোয়ায় দিদি পঁয়তিরিশ টাকা দিয়ে একখানা ঘর ভাড়া নিয়েছে। জানো গোলাপী, এখানে স্টোরের চাবি আমি নিজের কাছে রাখি না। ক্ষিতিবাবু স্টোর থেকে চাল সরায়, বাল্লু সিং তোমাদের ওজন কম দেয়, আমি সব জানি, ক্ষিতিবাবু আমাকে ভাগ দিতে চেয়েছিল, আমি নিই না, চুরির কথা ভাবলেই আমার বুক ধড়ফড় করে। ক্ষিতিবাবুরা ভাবে আমি ভীতু! আর আমি মনে মনে কী ভাবি জানো, আমি ভাবি, আমি তো কবি, আমি কি চোর হতে পারি? মা সরস্বতী তা হলে আমাকে অভিশাপ দেবেন না? গোলাপী, তুমিও কি আমাকে ভীতু ভাবো?

গোলাপী খিলখিল করে হেসে ফেললো!

–আস্তে আস্তে। আচ্ছা গোলাপী, আগে এখানে সুধীর দাস বলে একজন কাজ করতো, তোমার বাবা নাকি তাকে মেরেছিল?

–বাবা আর যোগানন্দ তার এক পায়ের হাঁটু ভেঙে দিয়েছিল। সে খারাপ লোক ছিল। সে আমাকে বিয়ে করবে বলে মিথ্যা কথা বলেছিল।

–সর্বনাশ! তোমার বাবা যদি টের পায় গোলাপী, আমার ইচ্ছে থাকলেও যে তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না! বাড়িতে তিন তিনটে অবিবাহিত বোন, সেখানে তোমাকে নিয়ে গেলে তারা তোমাকে এক দণ্ড তিষ্ঠোতে দেবে না! তাছাড়া আমি এখন বিয়ে করলে সবাই আমাকে বলবে স্বার্থপর! আমার তিন বোনের বিয়ে দিতে দিতেই আমি বুড়ো হয়ে যাবো?

–আপনাকে বিয়ে করতে হবে না। আপনি আর একটা পদ্য বলেন!

–শুনবে? সত্যি শুনবে? আঃ, এর আগে আমাকে কেউ এরকম অনুরোধ করেনি! গোলাপী, আমি তোমার হাতে, এইখানে একটা চুমু খাবো? তাতে কি দোষ হবে? মোটে একবার! আমার ওপর একটু দয়া করো, অনুমতি দাও!

গোলাপী আবার দুলে দুলে হাসতে লাগলো।

মোমটা নিবু নিবু হয়ে আসছে। ঘরের মধ্যে আলোর চেয়ে অন্ধকার বেশী, সেই অন্ধকারও দুলছে। আঁচলটা সরে গিয়ে অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে গোলাপীর নগ্ন বুক, সেদিকে প্রগাঢ় বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে বাসুদেব। ঐ বুক স্পর্শ করার সাহস তার নেই, শুধু দেখেই যেন তার জীবন ধন্য হয়ে যাচ্ছে।

গোলাপী বাসুদেবের একটা হাত ধরে বললো, আপনি সেদিন আমারে বলেছিলেন, আপনার ঘরে আসলে আপনি আমারে পদ্য শোনাবেন। আমি ভেবেছিলাম, পদ্য শোনাবার কথাটা মিছা। কথা।

–না, না, মিছে কথা কেন হবে? আমার জীবনে আর কী আনন্দ আছে বলো? জন্ম থেকেই শুধু দেখছি, অভাব আর অভাব। না খেতে পাওয়ার কষ্ট। বাড়িতে কান্নাকাটি। ছোটবেলা থেকেই আমি শুধু কবিতা লিখে আনন্দ পাই। কয়েকটা পত্রিকায় পাঠিয়েছি, কোথাও ছাপা হয়নি, তবু লিখতে ভালো লাগে।

–আপনি আমারেই শোনাতে চাইলেন কেন? আমি অতি সামান্য মেয়ে, মুখ্যু কিছু জানি না।

–তুমি সামান্য কেন হবে? ঐ যে বললাম, প্রথম দিন ধান খেতের পাশে তোমাকে দেখেই মনে হয়েছিল বনদেবী। আমি একটা নগণ্য মানুষ, কোনো মেয়েকে কোনোদিন কবিতা শোনাতে পারবো, এ তো স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি কবিতা লিখি শুনে ক্ষিতিবাবু, সুশীলবাবুরা ঠাট্টা করে, আমাকে বলে কপি, কপি মানে জানো তো, বাঁদর! আমি চাকরি খোয়াবার ভয়ে কারুর কোনো কথায় প্রতিবাদ করি না। রিফিউজিদের সঙ্গে আমি খারাপ ব্যবহার করি কখনো? তোমাকে আমার ঘরে আসতে বলে দোষ করেছি? আমি শুধু তোমার পায়ে আর হাতে চুমু খেয়েছি। আর কোনো অন্যায় করেছি?

–না। আমি এবার যাই?

–গোলাপী, তুমি আমাকে যে কতখানি ধন্য করে গেলে, তা তুমি নিজেও বুঝবে না! আবার একদিন আসবে? আমি…আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না, শুধু তুমি আমার পাশে একটু বসবে, আমার কবিতা শুনবে…দিনের বেলায় তো এসব করা যায় না…

গোলাপী বাসুদেবের হাতটা নিজের বুকে ছোঁয়ালো। যেন বিদ্যুতের স্পর্শ লেগেছে, এইভাবে বাসুদেব সরিয়ে নিল হাতটা। গোলাপী এবার মাথা ঝুঁকিয়ে এনে বাসুদেবের ঠোঁটে রাখলো নিজের ঠোঁট। গোলাপীর চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে।

খানিক পরে গোলাপী বাসুদেবের কোয়াটার থেকে বেরিয়ে আবার ঢালু জমিটা ঘুরে তেঁতুল গাছটার কাছে আসতেই এক জায়গার দেখতে পেল আগুনের ফুলকি। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে। গোলাপীর মুখের ওপর জ্যোৎস্না, কিন্তু লোকটি দাঁড়িয়ে আছে গাছতলার অন্ধকারে।

গোলাপী একটা দৌড় মারবার চেষ্টা করতেই হারীত মণ্ডল ডাকলো, এদিকে আয় হারামজাদী!

গোলাপী পালাতে পারলো না, এগিয়ে এলো পায়ে পায়ে। হারীত মণ্ডল খপ করে চেপে ধরলো তার মাথার চুল, তার এক হাতে একটা টাঙ্গি। এই টাঙ্গিটা সে মাত্র কয়েকদিন আগে কিনেছে আদিবাসীদের হাট থেকে, এখনো এতে রক্তের ছোঁয়া লাগেনি।

হারীত বললো, দেই এক কোপে ঘেটি ফ্যালাইয়া?

গোলাপী মৃদু স্বরে বললো, দাও!

হারীত দাঁতে দাঁত চেপে বললো, অইন্যেরে আর কত শাস্তি দেবো? এক একবার ভাবি, এক কোপে তরেই শ্যাস কইরা দেই! তুইই যত নষ্টের গোড়া!

গোলাপী বললো, দাও, বাবা, আমারে শ্যাস কইরা দাও!

হারীত গোলাপীর চুল ছেড়ে দিল, টাঙ্গিটা ফেলে দিল মাটিতে।

–তোরে সেই কুপার্স ক্যাম্পেই মাইরা ফালান উচিত ছিল আমার। তাইলে আমি বাঁচতাম। আমারে এইখানকার সক্কলে গুরু বইল্যা মানে, আর তুই আমার মাইয়া হইয়া এমন কলঙ্কের কাজ করোস! আমার মুখে কালি দ্যাস তুই!

–সক্কলেই জানে, আমি তোমার মাইয়া না। আমার বাপ-মা নাই, আমি একটা নষ্ট মাইয়ামানুষ! আমারে নিয়া তোমার এত জ্বালা, তুমি আমারে তখনই খেদাইয়া দ্যাও নাই ক্যান? ক্যান আমারে সাথে লইয়া আদ্র আইছো?

–আইজ তুই আমারে এমন কথা কইলি? আমি তোরে খেদাইয়া দিমু? তুই নিজে নষ্ট না হইলে কেউ তোরে নষ্ট করতে পারে?

–মাইয়া মানুষ একবার নষ্ট হইলেই চিরকালের নষ্ট! এই কলোনির কেউ আমারে ঘরে ঢোকতে দেয় না! কেউ আমারে ভালো চক্ষে দেখে না!

–সেইজইন্যেই বুঝি তুই বাবুদের ঘরে যাস? তোর লজ্জা করে না, আমি বামুন কায়েতগো দুই চক্ষে দ্যাখতে পারি না, তুই জানোস! কলোনির পুরুষ গুলার সাথে তুই গোপনে গোপনে আশনাই করোস, আমি এখন দেইখ্যাও না দেখার ভাণ কইরা থাকি। কিন্তু তুই বাবুগো সাথে…

গোলাপী এবার কেঁদে উঠলো। ফোঁপাতে ফোঁপাতে ভাঙা ভাঙা ভাবে বলতে লাগলো যে, সে কলোনির সব পুরুষদের ঘেন্না করে। এই কলোনির পুরুষরা কেউ প্রকাশ্যে তার সঙ্গে কথা বলার সাহস পায় না, কিন্তু আড়ালে তাকে নিয়ে টানাটানি করে, তার ওপরে জোর করে, এই কলোনিতে তার আর একটুও থাকতে ইচ্ছে করে না!

হারীত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। শত চেষ্টা করেও সে গোলাপীর সমস্যাটা সামাধান করতে পারছে না। গোলাপীকে কেউ বিয়ে করতে চায় না, তার একটি অবৈধ সন্তান আছে সে কথা কেউ ভুলতে পারে না, অথচ গোলাপীর শরীরের প্রতি পুরুষেরা লাভ করে। হারীত কজনকে শাসন করবে?

কিন্তু গোলাপী বাবুশ্রেণী বা ভদ্রলোকশ্রেণীর কারুর সঙ্গে ব্যভিচার করবে, এটা তার আরও অসহ্য মনে হয়। এর থেকে মেয়েটার মরে যাওয়াও ভালো। যুবতী মেয়ে, শরীর না যেন। আগুন!

হারীত জিজ্ঞেস করলো, কার ঘরে গেছিলি?

গোলাপী মুখ তুলে বললো, তুমি তার হাত কিংবা পাও ভাঙবা? না, তার দোষ নাই, আমি নিজের ইচ্ছায় গেছি। সে জোর করে নাই।

–কার ঘরে গেছিলি, নামটা ক! আমি তার নামে হেড অফিসে নালিশ করুম। রিফিউজি মাইয়ারা শস্তা! তাদের ধর্ম নাই, সম্মান নাই!

–বাবা, তোমারে কইলাম তো, আমি নিজের ইচ্ছায় গেছি। আমারে জীবনে কেউ কখনো এমন সম্মান করে নাই। সে ব্রাহ্মণ হইয়া আমার পায় হাত দিছে!

–ব্রাহ্মণ? স্টোরের ছোটবাবু? সে তোর পায় হাত দিছে, ক্যান?

–সে জাইত মানে না। সে আমারে দেবী কইয়া ডাকছে।

–ঐসব ঐ বান্দরদের মন ভুলানো কথা। হারামজাদারা! তোরে পয়সা দিছে? তুই পয়সা ন্যাস!

–পয়সা দেবার ক্ষ্যামতা তার নাই। সে গরিব। তার বাড়িতে অনেকগুলি খাওয়ার মানুষ।

–গরিব? স্টোরের বাবু গরিব হয়? চোর, সব শালারা চোর!

–সে চুরি করতে জানে না। সে আমারে পদ্য শুনাইছে, আর কিছু করে নাই! এবার হারীত বিমূঢ় বোধ করলো। এসব কী নতুন কথা সে শুনছে! কোনো মেয়েকে রাত্তিরবেলা ডেকে নিয়ে একজন পুরুষ পদ্য শোনায়? লোকটা কি অতি বড় শয়তান, না। পাগল। গোলাপীর কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরও অনেক কথা শুনলো হারীত, মনে মনে তখনই ঠিক করলো, এরপর ঐ স্টোরের ছোটবাবুটিকে ভালো করে যাচাই করে দেখে নিতে হবে।

পরের দিনটিই সাপ্তাহিক র‍্যাশান দেবার দিন। স্টোর খোলার পরই হারীত গিয়ে বসলো সেখানে। স্টোরের দু’জন বাবু, ক্ষিতীশ আর বাসুদেব, আর বাল্লু সিং চাল-ডাল ওজন করে দেয়। ক্ষিতীশ মোটাসোটা, লম্বা চওড়া চেহারা, সে-ই বড়বাবু, আর বাসুদেব রোগা-পাতলা, তার চেহারায় একটা শালিক শালিক ভাব।

হারীত একটা টুল টেনে নিয়ে বসে বললো, ওজন টোজন ঠিক মতন দেও তো, সিংজী? দ্যাখতে আইলাম!

বাল্লু সিং রাগের ভাণ করে বললো, কিউ! ম্যায় ওজন কম দেতা? কৌন বোলা!  

হারীত মুচকি হেসে বললো, আমি কি কম দেওয়ার কথা কইছি? গত হপ্তায় তুমি আমারে এক কিলো অড়হর ডাইল দিলা। আমি বাড়ি গিয়া মাইপ্যা দেখি এক কিলোর উপরে এক শো গেরাম বেশী।

ক্ষিতীশ হেসে ফেললো। হারীত লোকটা অত্যন্ত ধূর্ত সে জানে, তার আক্রমণ যে কোন্ দিক দিয়ে আসবে বোঝা যায় না। বাসুদেব হাসলো না, সে মন দিয়ে খাতা লিখছে। হারীতকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখখানা ছাই রঙের হয়ে গেছে।

কলোনির অন্য কোনো লোক এই ফুড স্টোরে টুল টেনে বসবার সাহস পাবে না। কিন্তু হারীত যে এখানকার নেতা তা ক্ষিতীশদের মতন বাবুশ্রেণীর কর্মচারীরা জানে। হারীতকে রাস্তায় ঘাটে দেখলেও কলোনির প্রত্যেকটা লোক জয়বাবা কালাচাঁদ বলে ধ্বনি দেয় এবং প্রণাম করে।

হারীত বললো, সত্যি সিংজী আমারে বেশী দ্যায়। চাউলও বেশী বেশী ঠ্যাকে। তাই আমি ভাবি, আমারে বেশী দিলে অইন্য কেউ কি কম পায়?

ক্ষিতীশ বললো, বসুন, বসুন, একটা সিগারেট খাবেন নাকি?

হারীত নির্লিপ্ত ভাবে হাত বাড়িয়ে বললো, দ্যান একটা!

তারপর বাসুদেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ছোটবাবু সিগ্রেট খান না?

বাসুদেব মুখ না তুলেই বললো, না!

হারীত ক্ষিতীশের জ্বালানো দেশলাই কাঠি থেকে সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বললো, বড়বাবু, এই চাউল কি বম মুলুক থিকা আনছেন নাকি?

ক্ষিতীশ বললো, না, না, বার্মা থেকে আসবে কেন? এ তো ইউ পি’র চাল!

হারীত বললো, কইলাম এই জন্য যে যুদ্ধের সময় আমাগো পূর্ববঙ্গে চাউলের খুব আকাল পড়ছিল। দুর্ভিক্ষ হইছিল জানেন নিশ্চয়। কত মানুষ না খাইয়া মরছে। তারপর গভোর্নমেন্ট র‍্যাশোনে একরকম চাউল দিল, সে চাউলের রং কালা কালা, তাতে আবার ছাইরপোকার গন্ধ। তখন অনেকে কইলো যে সেই চাউল বর্মা মুলুক থিকা আসছে, অতদূর থিকা আসছে তো তাই গন্ধ হইয়া গেছে। এখানের চাউলেও সেই গন্ধ পাই কি না!

ক্ষিতীশ বললো, গন্ধ? কই না তো! আমিও তো এই চাল খাই, কোনো গন্ধ পাই না তো!

–বড়বাবু, আপনেও এই চাউল খান? আপনার তো তাইলে দাঁত খুব শক্ত!

–হেঁ হেঁ হেঁ, দু’চারটে কাঁকর আছে বটে…তা গভর্নমেন্টের চাল, যখন যেমন পাওয়া যায়, একটু কাঁকর বেছে নিতে হয়।

–সেই যে কথায় আছে না, ভিক্ষার চাউল, তার আবার কাঁড়া না আকাঁড়া! আরও একটা কথা আছে, ঠক বাছতে গাঁ উজাড়!

কথা ঘোরাবার জন্য ক্ষিতীশ বললো, ও মশাই, আপনাদের দেশে তো যুদ্ধ বেঁধে গেছে।

চমকে উঠে হারীত জিজ্ঞেস করলো, যুদ্ধ-মানে? ইন্ডিয়া-পাকিস্তান, আবার?

–না, ইন্ডিয়া নেই। এবার ওরা নিজেরাই লড়ালড়ি করছে। মোছলমানরাই মারছে মোছলমানদের। খবরের কাগজে তো প্রত্যেক দিনই জবর খবর! পড়েননি?

–আপনার কাছে খবরের কাগজ আছে?

–আমি মেইন অফিসে গিয়ে পড়ে আসি। আজকেরটা পড়তে যাবো আর খানিক বাদে। বুঝুন দেখি কাণ্ড, মোছলমানরা আলাদা দেশ চায় বলে ইন্ডিয়া থেকে কেটে পাকিস্তান বানালো, আপনাদের দেশ থেকে তাড়ালো, এখন নিজেরা সামলাতে পারছে না। ওয়েস্ট পাকিস্তানীরা ইস্ট পাকিস্তানীদের ধরে বেধড়ক প্যাঁদাচ্ছিল, এখন ইস্ট পাকিস্তানীরাও উল্টে হাতিয়ার ধরেছে, যশোর-খুলনা-চিটাগাঙে জোর লড়াই চলছে।

হারীত তবু অবিশ্বাসের সুরে বললো, মুসলমানরা মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করছে, এ কখনো হয়?

ক্ষিতীশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললো, কেন হবে না? মোগল-পাঠানে লড়াই হয় নি? শের শা’র সঙ্গে হুমায়ুন বাদশার যুদ্ধ-সে সব হিস্ট্রিতে আছে! ইস্ট পাকিস্তানের এখন নাম হয়েছে বাংলাদেশ, ওরা নাকি স্বাধীন হতে চায়! আরও মজার কথা শুনবেন ইন্ডিয়াতে আবার রিফিউজি আসছে দলে দলে। এবার কারা আসছে জানেন, মোছলমানেরা। বোঝে ঠ্যালা! আপনাদের মতন লাখ লাখ রিফিউজি নিয়েই এখনো গভর্নমেন্ট হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে, তার ওপর আবার মোছলমান রিফিউজি। বনগাঁ বড়ার দিয়ে নাকি রোজ হুড় হুড় করে ঢুকছে। কলকাতা ভরে গেছে।

বাসুদেব একবার উঠে গিয়ে বাথরুম করে এলো, তারপরও সে হিসেবের খাতা লিখতে লাগলো ঘাড় নিচু করে, এসব কোনো আলোচনাতেই যোগ দিচ্ছে না।

হারীতের মাথা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। অন্তত গত পাঁচ বছর সে খবরের কাগজ চোখেই দেখেনি, পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদ সে কিছুই জানে না। পশ্চিম বাংলায় কমুনিস্টরা নির্বাচনে জিতে সরকারি দলে এসেছে, এরকম একটা ভাসা ভাসা খবর সে শুনেছিল বাবুদের মুখে। তাতে তার মনে একটা আশা জেগেছিল। কমুনিস্টরা বরাবরই রিফিউজিদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছে। কংগ্রেস সরকারই তো তাদের পশ্চিম বাংলা থেকে ঠেলে পাঠিয়েছে এই এতদূরে, জঙ্গলে আর পাথুরে জমিতে। কমুনিস্টরা ক্ষমতায় এলে নিশ্চয়ই রিফিউজিদের জন্য একটা। কিছু ভালো ব্যবস্থা করবে।

কিন্তু এ যে একেবারে অন্য খবর। পাকিস্তানের মধ্যে ঘরোয়া যুদ্ধ! পূর্ব পাকিস্তানের নাম। এখন বাংলাদেশ? কী মধুর একটা শব্দ।

ক্ষিতীশ আবার বললো, আমার মনে হয় কী জানেন, এ লড়াই বেশীদিন টিকবে না। আবার এতগুলো রিফিউজির বোঝা ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট কতদিন ঘাড়ে নিয়ে বইবে? এবার ইন্ডিয়া। একটা গুতো দিলেই পাকিস্তান ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যাবে! তাতে তো আপনাদেরই সুবিধে হয়ে যাবে মশাই!

হারীত আরও বেশী বিস্মিত হয়ে বললো, আমাদের সুবিধা হবে? কেমন করে?

ক্ষিতীশ বললো, বাঃ, এটা বুঝলেন না? বাংলাদেশ একটা আলাদা রাষ্ট্র হয়ে গেলেই ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট বলবে, তোমাদের রিফিউজিদের ফেরত নাও। তারা নিতে বাধ্য। তখন এই রিফিউজিদের সঙ্গে আপনারাও হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়বেন। কে কবে এসেছে তার কে হিসেব রাখে। তাহলে আপনারা আপনাদের জায়গা জমি ফেরত পেয়ে যাবেন আবার।

হারীতের চোখের সামনে যেন একটা সোনালি রঙের স্বপ্ন ঝিলিক দিয়ে উঠলো। আবার সেই ভিটে মাটিতে ফিরে যাওয়া যাবে? সেই পুকুর-আমবাগান-ধান ক্ষেত। এখানে এই রিফিউজি কলোনিতে চরম অপমানজনক বন্দী জীবনের চেয়ে নিজের ভিটে মাটিতে গিয়ে আধপেটা খেয়ে থাকাও সহস্র গুণ ভালো! সত্যিই কি এই স্বপ্ন সম্ভব হতে পারে! গুরু কালাচাঁদ একদিন স্বপ্নে বলেছিলেন, আবার সুদিন আসবে। সেই সুদিন কাছাকাছি এলে তিনিই জানিয়ে দেবেন। কই, তিনি তো অনেকদিন আর স্বপ্নে দেখা দিচ্ছেন না।

ক্ষিতীশ বললো, তবে ওয়েস্ট বেঙ্গলে যেসব রিফিউজি আছে, বিশেষ করে ক্যালকাটার আশেপাশে, তারাই বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার চান্স নেবে। আপনারা এতদূর থেকে আর কী করবেন? আপনারা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই থাকবেন। কী বললো বাসুদেব, ঠিক বলিনি!

বাসুদেবের সারা কপালে ঘাম, ঠোঁট একেবারে শুকনো। সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ক্ষিতিদা, আমায় একমাস ছুটি দিতে হবে। আমি দেশে যাবো!  

ক্ষিতীশ বললো, সে কি, এখন ছুটি নেবে? এই গরমের মধ্যে ছুটি নিয়ে করবে কী?

বাসুদের বললো, আমি এক বছর আর্নড় লীভ নিইনি। আমার বিশেষ দরকার।

–এখন তোমাদের বর্ধমানে খুব নকশালী হামলা চলছে, এখন যেও না, বিপদে পড়ে যাবে।

–আমায় যেতেই হবে ক্ষিতিদা, আমার মায়ের অসুখ। আমি মেইন অফিসে গিয়ে দরখাস্ত দিয়ে আসবো? এখন যাই!

হারীতও উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আপনি মেন অফিসে যাচ্ছেন, ছোটবাবু? আপনার সাইকেলে আমারে একটু ডাবল ক্যারি করে নিয়ে যাবেন? আমি মেন অফিসে গিয়া খবরের কাগজ পড়ে আসবো!

বাসুদেব প্রায় কাঁপতে কাঁপতে বললো, আমি ডাল ক্যারি করতে পারি না। আমি ভালো সাইকেল চালাতে জানি না!

ক্ষিতীশ হাসতে হাসতে বললো, ও ল্যাকপ্যাক সিং আপনাকে ক্যারি করতে পারবে না। আপনি বরং খানিক ওয়েট করুন। স্টোর বন্ধ করার পর আমি যাবো, তখন আমি নিয়ে যাবো। আপনাকে।

হারীত বললো, থাক আমি হেঁটেই যাবো, কতই বা দূর। আট-নয় মাইলের বেশী না!

পারুলবালার কাছে একটা ছেলেকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে হারীত যোগানন্দকে সঙ্গে নিল। তার মাথায় একটা নতুন চিন্তা এসেছে। কোনোক্রমে গাড়ি ভাড়া জোগাড় করে তাকে একবার কলকাতায় ঘুরে আসতে হবে। অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, পুলিশ নিশ্চয়ই তার ওপর এখন নজর রাখবে না। কলকাতায় গেলে সত্যি সত্যি সীমান্তের ওধারে কী ঘটছে তা জানা যাবে। তার ছেলেটার খোঁজ নিতে হবে। ত্রিদিব-সুলেখার বাড়িতে নিশ্চয়ই কয়েকদিনের জন্য থাকার জায়গা পেয়ে যাবে সে। কাছাকাছি দু’তিনখানা কলোনির মানুষ তাকে গুরু বলে মানে। প্রত্যেকটি পরিবার থেকে যদি দুটো টাকাও চাঁদা দেয়, তাতেই আসা-যাওয়ার খরচ কুলিয়ে যাবে হারীতের।

বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হারীত জিজ্ঞেস করলো, যোগা, তোরে যদি কেউ কয়, দ্যাশের বাড়িতে ফিরা যাবি, না ইন্ডিয়াতেই থাকবি, তাইলে তুই কী করবি?

যোগানন্দ বললো, আপনে এ কী জিগাইলেন বড়কা? সে চাছ পাইলে আমি অ্যাক্ষুনি ইন্ডিয়া ছাইড়া দৌড় লাগামু! কিন্তু সে চানছ কি এই জীবনে আর আসবে!

হারীত বললো, কওন যায় না। আসতেও পারে। পাকিস্তানে ভারী গণ্ডগোল লাগছে। বাংগালী মুসলমানরা নাকি ভেন্ন হইয়া স্বাধীন হইতে চায়। স্বাধীন হইলে তারা আমাগো ফিরাইয়া নেবে না!

–হ্যারাই তো আমাগো তাড়াইছে। হ্যরা আর আমাগো নেবে ক্যান?

–ইন্ডিয়ার সাথে যদি বন্ধুত্ব হয়? পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে তো ওরা মাইর খাইলো। এখন যদি ভাবে যে হিন্দুগো সাথে আর কাইজ্যা কইরা লাভ নাই, বরং মিলা মিশা থাকলে শান্তিতে থাকবে।

–আমার বিশ্বাস হয় না। বড়কর্তা, আমাগো ঘর বাড়ি কি আছে? সেই সব অরা অ্যাদ্দিনে দখল কইরা লয় নাই?

–হেইডা গিয়া একবার ঘুইরা দেইখ্যা আইলে হয়! হ দ্যাখ, আমাগো গেরামের মুসলমানরা খারাপ আছিল না, আমাগো কোনো ক্ষতি করে নাই। শহরে দাঙ্গা হইছে বইল্যাই তো আমরা ভয় পাইছি, তাই না? আমাগো ভিটায় তুলসীমঞ্চ আছিল, মুসলমানরা তুলসীগাছ সহজে নষ্ট করে না।

–বড় কত্তা, জীবনে যদি আর কোনোদিন বাপ-ঠাকুদার ভিটায় তুলসী মঞ্চের ধারে বইস্যা এক গাল মুড়ি খাইতে পারি।

কথা বলতে বলতে গলা ধরে গেল যোগানন্দর, সে বাঁ হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছলো।

প্রখর গ্রীষ্মের গনগনে দুপুর। দু’জনেরই খালি গা, ঘামে চকচক করছে। মাঝে মাঝে দু’একটা লরি ছাড়া এ রাস্তায় এই সময় আর বিশেষ গাড়ি চলে না। পেছন দিক থেকে লরি আসছে কি না, তা ওরা এক একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। একবার দেখতে পেল খুব কাছেই সাইকেল সমেত বসুদেবকে। ছুটির দরখাস্তের মুশাবিদা করতে তার খানিকটা দেরি হয়েছে।

হারীতের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বাসুদেব সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। যেন তার সামনে একটা বিরাট বাধা, আর যাবার উপায় নেই। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো হারীতদের দিকে।

হারীত ভাবলো বাসুদেব বোধহয় তাদের কিছু বলবার জন্য থেমেছে। সে ঘুরে কয়েক পা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে, ছোটবাবু!

বাসুদেবের চোখ দুটো ঝিমিয়ে এলো, যেন সে এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। এখানে গরমের সময় সর্দি-গর্মিতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। প্রত্যেক বছরই এই সময় কয়েকটা শিশু ও বৃদ্ধ মারা যায়। হারীত ব্যস্ত হয়ে আরও এগিয়ে এসে বললো, কী হয়েছে, শরীর খারাপ লাগছে?

বাসুদেব অতিকষ্টে চোখ মেলে ফ্যাসফেসে গলায় বললো, আপনারা আমাকে মারবেন তো, মারুন!

হারীত বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, কী বললেন? কে মারবে আপনারে?

বাসুদেব বললো, আপনারা মারুন। আমি দোষ করেছি, যত ইচ্ছে মারুন। তবে দয়া করে আমার ডান হাতটা ভেঙে দেবেন না, তাহলে আর আমি লিখতে পারবো না। আমার বাঁ হাত, কিংবা যে-কোনো পা…এইটুকু শুধু দয়া করুন আমাকে।

হারীত হা হা করে হেসে উঠে বললো, আপনাকে আমরা মারতে যাবো কেন? আমরা কি ডাকাত? আরে ছিছিঃ! আমি বরং আপনার কাছে একটা সাহাইয্য চাই। আপনি ছুটি নিয়া দ্যাশে যাবেন তো, আমারে সাথে লইয়া যাবেন? আমি তো এইদিকের রেলগাড়ির সব ব্যাপার জানি না। কোথায় কী টিকিট-টুকিট কেনতে হয়…আপনি বর্ধমান পর্যন্ত আমারে পৌঁছাইয়া দিলেই আমি কলকাতায় যাইতে পারবো। নেবেন আমারে আপনার সাথে?

১৬. ছেলের প্যান্ট সেলাই

ছেলের প্যান্ট সেলাই করতে বসেছেন জাহানারা ইমাম। একটা মাত্র কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে যাবে রুমী, তাতে দু’চারখানা জামা কাপড়ের বেশী ধরবে না, অথচ সে কতদিনের জন্য যাচ্ছে কে জানে! একটা প্রায় নতুন প্যান্টের কোমরের কাছে ভেতরের দিকের মুড়ির সেলাই খুলে ফেলে সেখানে ভরে নিলেন দশখানা একশো টাকার নোট, তারপর আবার এমন নিখুঁতভাবে সেলাই করলেন যাতে আর বোঝার উপায় রইলো না। নিজের কাজ দেখে খুশী হবার বদলে ঝর ঝর করে জল পড়তে লাগলো তাঁর চোখ দিয়ে।

রুমী আজ চলে যাবে। কিছুতেই আর তাকে বাধা দেওয়া যাবে না। প্রায় এক মাস ধরে রুমী তার মাকে বোঝাচ্ছে, মায়ের অনুমতি না নিয়ে সে যেতে চায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করা ডিবেটার রুমী, তার সঙ্গে তার মা যুক্তি-তর্কে পারবেন কী করে! জাহানারা ইমামের সচেতন বিবেক রুমীর যুক্তিগুলি অগ্রাহ্য করতে পারে না, কিন্তু মায়ের প্রাণ যে মানতে চায় না। রুমী চলে যাবে, যদি আর না ফেরে!

ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র রুমী, আমেরিকায় ইলিনয়ে আই আই টি-তে সে অ্যাডমিশন পেয়ে গেছে, সেপ্টেম্বরে সেখানে যাবার কথা, আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি। কিন্তু ভাই-বন্ধু-আত্মীয়-স্বজন যখন চতুর্দিকে অসহায়ের মতন মরছে, তখন রুমী শুধু নিজের কেরিয়ার গোছাবার জন্য কিছুতেই আমেরিকায় যেতে চায় না।

সত্যি সত্যি যে কতখানি অত্যাচার হচ্ছে আর কতটা গুজব, তা অনেকদিন ভালো করে বুঝতে পারেননি জাহানারা। পচিশে মার্চের পর কয়েকদিন ঢাকায় কোনো খবরের কাগজই বেরোয়নি, এখন দু’একটি কাগজ বেরুচ্ছে, তাও দু’পাতা, চারপাতা মাত্র, তাতে শুধু সরকারি ঘোষণা ছাড়া আর কোনো খবরই থাকে না। টি ভি, রেডিও আবার চালু হয়েছে, তারা মিলিটারির বেয়নেটের ভয়েই হোক আর যেকারণেই হোক, এখন আবার গাইছে পাকিস্তান সরকারের গুণগান, তাদের কথা শুনলে মনে হয় দেশের অবস্থা স্বাভাবিক। কিন্তু রুমীরা বলে, দেশের একটু নামকরা লোকদের জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে রেডিও টিভিতে ওদের মনোমত কথা বলাচ্ছে। দেখো আম্মা, একদিন তোমার কাছেও আসবে, তোমাকে দিয়েও রেডিওতে মিথ্যে কথা বলাবে।

অথচ কলকাতার রেডিও শুনেও পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। সবাই এখন দরজা-জানলা বন্ধ করে আকাশবাণী শোনে। আকাশবাণীর খবর শুনলে মনে হয়, ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশে, কোনো কোনো শহর অঞ্চল জয় করে নিয়েছে মুক্তিবাহিনী, এসবের কতখানি সত্যি? বেগম সুফিয়া কামাল, নীলিমা ইব্রাহিমকে খুন করেছে পাকিস্তানী সেনা, আবার গভর্নর টিক্কা খাঁ মুক্তিবাহিনীর হাতে খতম, এসব খবরও শোনা গেছে আকাশবাণীতে, কিন্তু সুফিয়া কামাল, নীলিমা ইব্রাহিম মোটেই মারা যাননি। কাগজে তাঁদের ছবি বেরিয়েছে। আর টিক্কা খান তো বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছে। তাহলে ওদের খবর বিশ্বাস করা যায় কী করে?

রুমী বলে, দু’চারটে খবর ভুল হতে পারে। কিন্তু ইউনিভার্সিটির ডঃ জি সি দেব, মনিরুজ্জমান, এফ আর খান, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, শরাফত আলী এদের যে গুলি করে মেরে ফেলেছে, তাতে কি কোনো ভুল আছে? ঢাকার কত বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, তা তো তুমি নিজের চোখেই দেখেছো!

তবু সন্দেহ যায় না। আর্মি-পুলিশ মিলে দারুণ অত্যাচার করছে তা ঠিকই। কিন্তু এরকম তো পাকিস্তানে আগেও হয়েছে। শেখ মুজিব যখন তখন গ্রেফতার হয়েছেন কতবার। হাজার হাজার পলিটিক্যাল ওয়াকারদের জেলে ভরা হয়েছে, গুলি চালানো হয়েছে ছাত্রদের মিছিলে। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মিলিটারির কর্তাদের আলোচনা ভেস্তে যাবার পর জারি হয়েছে সামরিক শাসন। তারপর সব কিছু আবার ঠাণ্ডা। এবারেও কি তাই হবে না? রুমীরা বলছে স্বাধীনতার কথা? কী নিয়ে ওরা লড়বে?

যে-কয়েক ঘণ্টা কারফিউ থাকে না, সেই সময়ে জাহানারা নিজেই সাহস করে গাড়ি নিয়ে ঢাকা শহর ঘুরে দেখে আসেন মাঝে মাঝে। লালবাগ থেকে চকবাজারে গেলে দেখা যায়, প্রায় পুরো বাজারটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। ইসলামপুর, শাঁখারিপট্টি, ওয়াইজ ঘাট, পাটুয়াটুলি, সদরঘাট, নবাবপুর সর্বত্র প্রায় একই দৃশ্য। চতুর্দিকে শুধু ধ্বংসের তাণ্ডব। কামানের গোলা দেগে মহল্লার পর মহল্লা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শাঁখারিপট্টিতে পচা লাশের গন্ধ, দরজা। জানলা ভাঙা যে কয়েকটি দোকানঘর এখনও কোনোক্রমে টিকে আছে, সেগুলোর গায়ে ঝুলছে নতুন চটের পদা, তার উপর সাঁটা কাগজে কী যেন লেখা। কৌতূহল দমন করতে না পেরে জাহানারা গাড়ি থেকে নেমে সেই লেখা পড়তে গিয়েছিলেন। তাতে আছে নতুন মালিকানার ঘোষণা। শাঁখারিপট্টির দোকানগুলো অবাঙালী মুশ্লিমদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হয়েছে।

ক্রমে নিজেদের চোনাশুনো আত্মীয়-স্বজনদের মৃত্যু সংবাদ কানে আসতে লাগল। ঢাকা থেকে যারা পালিয়ে গিয়েছিল বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরায়, সেখানে অনেকেই গুলি খেয়ে মরেছে। গ্রামের পর গ্রাম ঘিরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মিলিটারি, সাধারণ যাত্রীবাহী নৌকোর ওপর হয়েছে মেশিনগানের গুলিবৃষ্টি। জাহানারার এক খালাতো ভাই ভিখু চৌধুরী মারা গেছে। সেইসঙ্গে তার বউ মিলি, সে বাড়ির বুড়ো বাচ্চা কেউ বাদ যায়নি। করটিয়ায় গ্রামের বাড়িতে পুরো একটি পরিবার সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে, চোখ মুখ ধুয়ে নাস্তা খাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, হঠাৎ এসে হানা দিল সাক্ষাৎ যমদূতেরা। ধানমণ্ডিতে ভিখু চৌধুরীর দাদার বাড়িতে গিয়ে সব শুনে জাহানারা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আর্মির লোকেরাও তো মানুষ। পশু তো নয়, তারা এত নিষ্ঠুর হয় কী করে? বিনা প্ররোচনায় বিনা দোষে নিরীহ নারী-পুরুষ শিশুদের তারা হত্যা করে কোন বিবেকে! অথচ সত্যি সত্যি যে এরকম ঘটছে, তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই। গুলি লেগেছে খালা আম্মার তলপেটে, তবু তিনি কোনোক্রমে বেঁচে ফিরে এসেছেন, তাঁরই মুখে জাহানারাকে শুনতে হলো তাঁর ছেলে ভিখু চৌধুরী আর পরিবারের অন্যদের নিধনের বর্ণনা। এতে চোখের জল পর্যন্ত শুকিয়ে যায়!

নারিন্দা থেকে আতা ভাই একদিন এসে শোনালেন আরও সাঙ্ঘাতিক খবর। আজীবন ধর্মানুরক্ত, সদাপ্রসন্ন মানুষ এই আতা ভাই, তাঁকে জাহানারা কখনো রাগতে দেখেননি, তিনি এলেই বাড়িতে আনন্দের সাড়া পড়ে যেত, তিনি অনেক মজার মজার গল্প শোনাতেন। সেই মানুষটি আজ দারুণ উত্তেজিত ও বিচলিত, মনে হয় তিনি রাতের পর রাত ঘুমোননি, তাঁর হাত কাঁপছে। তিনি বললেন, বুঝলে জাহানারা, ওদের আর বেশীদিন নাই। ইসলামের নামে ওরা যা করছে তাতে খোদার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠছে! মসজিদে বসে কোরান তেলাওয়াত করছিলেন কারীসাহেব, তাকে পর্যন্ত গুলি করে মেরেছে। খোদার ঘরে ঢুকে মানুষ খুন! মায়ের সামনে ছোট ছেলেকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। ছেলের সামনে মাকে বেইজ্জত করেছে। খোদাতালা সইবেন এত অত্যাচার?

রুমী বললো, শোনো আম্মা শোনো! এবার বিশ্বাস হয় তোমার? বুড়িগঙ্গা দিয়ে হাত পা বাঁধা ছেলেদের লাশ ভেসে যায়, আমরা প্রত্যেকদিন দেখি। গ্রামের মেয়েদের তুলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে আর্মি। আবার কিছু কিছু লোককে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের শরীর থেকে সিরিঞ্জে করে বার করে নেওয়া হচ্ছে সব রক্ত। অবিকল নাৎসীদের কায়দায়। আমার চেনা একজন ডাক্তারকে চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে এই কাজ করিয়েছে। তুমি তার নিজের মুখে শুনতে চাও? আরও শোনো, ঢাকা শহরের সব ইয়ংম্যানদের নামের লিস্টি বানানো হচ্ছে, তাদের সবাইকে একদিন তুলে নিয়ে যাবে। এলিফ্যান্ট রোডের মোডের মাথায় দু’জন বিহারী মুসলমান সর্বক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, আমরা কখন কোথায় যাই না যাই, তার খবর রাখে। এর পরেও তুমি আমাকে বাড়িতে ধরে রাখতে চাও?

নিউজ উইক পত্রিকার কয়েকটা কাটিং গোপনে জোগাড় করে এনেছে রুমী। তাতে আছে। পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় মুক্তি যুদ্ধের খবর। সীমান্তের কোথায় যেন মুজিবনগর হয়েছে, সেখান থেকে লড়াই চালাচ্ছে অস্থায়ী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার! লড়াই একটা চলছে ঠিকই, আর অস্বীকার করা যায় না।

হাজার হাজার তরুণ নেমে পড়েছে স্বাধীনতার সংগ্রামে, আর রুমী তাতে যোগ দেবে না, তা কী হয়? স্বাস্থ্যবান, টগবগে ছেলে রুমী, সে বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সাহিত্যে খুব আগ্রহী, কবিতা মুখস্ত বলে গড়গড় করে, খেলাধুলোতেও ওস্তাদ, আবার ইতিহাস রাজনীতি নিয়েও মাথা ঘামায়। জাহানারা তাঁর দুই ছেলেকে কখনো স্বার্থপর হতে শেখাননি, তারা মিথ্যে কথা বলে না, সরল সুন্দর আদর্শে উজ্জ্বল তাদের মুখ।

রুমী যদি কারুকে কিছু না জানিয়ে, গোপনে বাড়ি ছেড়ে মুক্তি যুদ্ধে যোগ দিতে চলে যেত, তাহলে হয়তো জাহানার কোনোক্রমে তা মেনে নিতেও পারতেন। কিন্তু এ ছেলে সে ভাবে কিছুতেই যাবে না। সে তার মায়ের অনুমতি চায়। পিছুটান রেখে সে কী করে লড়াই করতে যাবে। সেইজন্য সে প্রত্যেকদিন তর্ক করে মায়ের সঙ্গে। একদিন তর্ক থামিয়ে সে হঠাৎ শান্ত গলায় বললো, ঠিক আছে, আম্মা তুমি যদি জোর করো, তাহলে আমি দেশ ছেড়ে আমেরিকাতে চলে যাবো। তোমাকে খুশী করার জন্য আমি পড়াশুনো করে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো। কিন্তু আমার বিবেকের কাছে চিরকালের মতন অপরাধী হয়ে থাকবো, আম্মা, তুমি কি সত্যি তাই-ই চাও?

জাহানারা চোখ বন্ধ করে বলে উঠেছিলেন, না চাই না! ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানী করে। যা তুই যুদ্ধেই যা!

রুমী অনুমতি পেয়েছে শুনে ছোটভাই জামী লাফিয়ে উঠে বলেছিল সেও যাবে! সেও দাদার সঙ্গে যুদ্ধে যাবে। তাকে অতিকষ্টে নিরস্ত করা হয়েছে এই বলে যে দুটি ছেলেই চলে গেলে এ বাড়ির ওপর সন্দেহ পড়বে, আমি তাদের বাপ-দাদাকেও ছাড়বে না।

প্যান্ট সেলাই করার পর চোখের জল মুছতে মুছতে জাহানারা রুমীর ব্যাগ গোছাতে লাগলেন। রুমী আমের আচার ভালবাসে, এক কৌটো আচার দিলেন ব্যাগ ভরে। একটুখানি গাওয়া ঘি দিলেন না, রাগ করবে রুমী। লাল স্ট্রাইপ শার্টটা ওর খুব প্রিয়, কিন্তু সঙ্গে নেবে না বলেছে, তার বদলে তিন চার খানা গেঞ্জি, গরমকালটা শুধু গেঞ্জি পরেই কাটিয়ে দেবে। ব্যাগের মধ্যে আগে থেকেই দু’খানা বই ঢুকিয়ে রেখেছে রুমী ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ আর ‘সুকান্ত সমগ্র”। যুদ্ধ করতে যাবার সময়েও তার কবিতার বই সঙ্গে রাখা চাই!

বইয়ের খুব শখ রুমীর। পঁচিশে মার্চের পর বাড়ি সার্চ হওয়ার ভয়ে অনেক কিছু সরিয়ে ফেলতে হয়েছে বাড়ি থেকে অনেক পত্র-পত্রিকা-ইস্তাহার পুড়িয়ে ফেলেছে রুমী। মার্কস, এঙ্গেলস, মাও সে তুঙ, রবীন্দ্রনাথ, চে গুয়েভারার বইগুলো সব একটা বস্তায় ভরে রেখে দেওয়া হয়েছে বাথরুমের দেওয়ালের পেছনে একটা গর্তে। প্রিয় বইগুলিকে ওভাবে রাখতে খুবই কষ্ট হয়েছিল রুমীর, কিন্তু উপায় তো নেই!

চারদিন আগে ছিল জাহানারার জন্মদিন। এ বছর জন্মদিন নিয়ে কোনোরকম ঘটা করার প্রশ্নই ওঠে না। অন্য বছর ছেলেরা মায়ের জন্মদিন নিয়ে খুব আনন্দ করে, আগের রাত্তিরেই জাহানারা বলেছিলেন, এবার কোনো স্পেশাল রান্নাও হবে না, বাড়িতে কারুকে ডাকাও হবে না।

তবু সকালবেলা অন্যান্য বছরেরই মতন দুই ছেলে দরজায় টোকা দিয়ে বলেছিল, আম্মা আসি?

প্রত্যেক বছর দুই ভাই, মা বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই দুটি সারপ্রাইজ গিফট দেয়, মাকে নিয়ে নানারকম মজা করে। এবার মায়ের চোখ অশ্রুসিক্ত, ছেলেদের মুখ থমথমে। রুমী চলে যাবে, সব ঠিক হয়ে গেছে।

এবারেও অবশ্য দুই ভাই দুটি উপহার এনেছিল। ছোটভাই জামী বাগান থেকে তুলে এনেছে একটি আধ-ফোঁটা কালো গোলাপ। আর রুমীর হাতে একটা পুরনো বই। রুমী বলল, জামী, তুই আগে বনি-প্রিন্সটা আম্মার হাতে দে।

তারপর সে বইটা মাকে দিয়ে বললো, আম্মা এই বইটা পড়লে তুমি মনে অনেক জোর পাবে। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় নাৎসীবাহিনী পোল্যাণ্ডে ঢুকে যখন অমানুষিক অত্যাচার চালাচ্ছিল, তখন পোলিশরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, যে ভাবে গেরিলা লড়াই চালিয়েছিল, এটা তারই কাহিনী। নাৎসীরা ইহুদীদের মানুষ বলেই গণ্য করতো না, তাদের পোকা মাকড়ের মতন মেরেছে, পশ্চিম পাকিস্তানীরাও আমাদের মানুষ বলে গণ্য করে না, মুসলমান বলে গণ্য করে না। তুমি এই বইটা পড়ো, নাম-ধাম বদলে দিলে তোমার মনে হবে, এ যেন অবিকল বাঙলাদেশেরই কাহিনী।

বইটি লিয়ন ইউরিসের ‘মাইলা-১৮’।

কালচে গোলাপটা হাতে নিয়ে জাহানারার মনে হয়েছিল, এ যেন জমাটবাঁধা রক্তের রং। কত রক্ত ঝরিয়ে আসবে স্বাধীনতা? তিনি কেঁপে উঠেছিলেন।

রুমী এখনও ঘুমিয়ে আছে। কাল রাতে অনেকক্ষণ রুমীর চুলে বিলি কেটে দিয়েছেন জাহানারা। দুই ভাইয়ের ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যেস, ঘুমোবার আগে মাকে চুলে বিলি কেটে দিতে হবেই। কে বেশীক্ষণ পাচ্ছে, আর কে কম, তা নিয়ে দু’জনে ঝগড়া করেছে। কতদিন! কাল জামী স্বেচ্ছায় বলেছিল, আজ আমায় দিতে হবে না, আজ আমার সময়টাও তুমি ভাইয়াকেই দাও!

জাহানারা আদর করছিলেন, আর রুমী আস্তে আস্তে শিস দিয়ে গাইছিল, একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি! মাত্র কিছুদিন আগেই এই ছেলে বিলিতি গান-বাজনার কী ভক্তই না ছিল!

না, চোখের পানি ফেলতে নেই, শেষ সময়ে মন দুর্বল হয়ে গেলে চলবে না। জাহানারা চোখ মুছে নাস্তার ব্যবস্থা করতে গেলেন।

ঘুম থেকে উঠে একেবারে স্নানটান সেরে নিয়ে রুমী খাওয়ার টেবিলে এসে ধীর স্বরে বললো, আম্মা, যাওয়ার সময় নাটকীয় কিছু করতে পারবে না কিন্তু। যেমন অন্যদিন আমরা বাড়ি থেকে বেরোই ঠিক সেই ভাবে যাবো। তুমি গাড়ি চালাবে। আমাকে সেক্রেটারিয়েটের সেকেণ্ড গেটের সামনে নামিয়ে দেবে। তারপর তোমরা চলে যাবে, পিছন ফিরে তাকাবে না একবারও।

জাহানারা ধরা গলায় বললেন, শুধু একটা কথা বল। তোর সাথে কে কে যাবে এবার? কোন দিকে এখন যাবি তোরা?

রুমী বললো, ওসব কথা জিজ্ঞেস করো না, আম্মা। ওসব বলা নিষেধ। জানো তো, আমি মিথ্যে কথা বলতে পারবো না।

রুমীর বাবা শরীফ টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে কাগজের আড়ালে মুখ ঢেকে রয়েছেন। জাহানারার মতন তিনিও রুমীকে যেতে দিতে রাজি হয়েছেন, তবে তাঁর পিতৃহৃদয়ে যে কী তোলপাড় চলছে তা তাঁর মুখ দেখে বোঝা যায় না।

ক’দিন ধরে ঝড়বাদল হচ্ছে বিকেলের দিকে। আজও সকাল থেকেই আকাশ প্রায় অন্ধকার। রুমীর যাবার দিনটাই এরকম কেন? গাড়িতে উঠে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জাহানারা মনে মনে বললেন, ইয়া আল্লা আজ যেন ঝড় বৃষ্টি না আসে!

এয়ার ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে, যেন অন্যদিনের মতনই কলেজ যাচ্ছে, এই ভঙ্গিতে পেছনের সীটে গিয়ে বসলো রুমী, তার পাশে তার বাবা, তাঁর হাতে এখনও খবরের কাগজ।

গাড়িটা খানিকদূর যাবার পর রুমী ঘাড় ঘুরিয়ে একবার একটা দোতলা বাড়ির দিকে তাকালো। তারপর সে বললো, আম্মা, বাবুল চৌধুরী যদি কিছু জিজ্ঞেস করে, তাকে কিছুই বলো না। অন্যদের যদি কিছু বলতে হয় তোত বলবে যে আমি কিছুদিন গুলসানের বাড়িটায় থাকবো।

দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবুল দেখলো রুমীকে। ওদের গাড়িটা এলিফ্যান্ট রোডে পড়ে বাঁক নিল। বাবুল তবু এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সেদিকে। রুমীর সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ায় সে দেখেছিল রুমীর চোখে অদ্ভুত এক চাঞ্চল্য। বুঝতে তার অসুবিধে হয়নি যে রুমীর জীবনে আজ একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। বাড়ি ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দিতে যাচ্ছে ছেলেটা?

বাবুলকে দেখে রুমী অবজ্ঞায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ইদানীং রুমী তাকে দেখলেও কথা বলতো না। অথচ একসময় এই রুমী দু’বেলা আসতো তার কাছে। মাও সে-তুঙ-এর রেড বুকের ব্যাখ্যা শোনার কী উৎসাহ ছিল তার।

বাবুল আপন মনে একটু হাসলো। রুমীর মতন ছেলেরা অনেকেই ইদানীং তাকে এড়িয়ে চলে। এরা কী মনে করে তাকে, দেশদ্রোহী? চতুর্দিকে এখন একেবারে দেশপ্রেমের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেও যারা ছিল মার্কসবাদী, এখন তারা হঠাৎ বাঙালী হয়ে উঠেছে, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নিয়ে উন্মত্ত।

অতি তরলমতি, ভাবালুতাপূর্ণ এই ছেলেরা। কখনো চোস্ত প্যান্ট পরে ফরফর করে ইংরেজি বলে আর আমেরিকান কায়দায় নাচানাচি করে, কখনো চীনা পন্থী হয়ে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, আবার হুজুগে মেতে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভেসে যায়। একটু ধৈর্য নেই! পাকিস্তান এখন যে পথে এগোচ্ছে, তাতে একদিন না একদিন এদেশে সর্বাত্মক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য, তখন শোষকশ্রেণীকে একেবারে ঝাড়েমূলে নির্বংশ করে দেওয়া যাবে। তার বদলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এরা এখন মেতে উঠেছে, স্বাধীন বাংলাদেশের নামে কী চাইছে এরা? এরা কি বোঝে না যে পাকিস্তান সত্যিই যদি দু’টুকরো হয় তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানী আর্মির বদলে আসবে আর একটি শোষকশ্রেণী।

বাবুলের বন্ধুরাও প্রায় কেউ আর যোগাযোগ রাখে না তার সঙ্গে। জহির, কামাল এদের পাত্তা নেই। এরাও ভয় পেয়েছে? ই পি আর এর বিদ্রোহ আর শখের মুক্তিবাহিনীকে দমন করবার জন্য সৈন্যবাহিনী নানা জায়গায় খুব অত্যাচার চালাচ্ছে তা ঠিক। কিন্তু জহির কামালরা কি জানে না যে একটা দেশের বিপ্লব শুরু হবার আগে অত্যাচার আর নিষ্পেষণ কত চরম অবস্থায় পৌঁছোয়! এই বোকারা কি বুঝছে না যে সমাজতন্ত্রী চীন পাকিস্তানের সেনা সরকারকে মদত দিয়ে তাদের আরও সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে!

ইউনিভার্সিটি বন্ধ, বাবুলের কোথাও যাবার জায়গা নেই। ঢাকার অবস্থা অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে, কিছু কিছু দোকান পাট, অফিস কাছারি খুলেছে, ইস্কুলগুলো জোর করে খোলাবার ব্যবস্থা হচ্ছে, কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের সরকার এখনো বিশ্বাস করে না। দরকার নেই এখন পড়াশুনোর।

আলতাফ হঠাৎ ইণ্ডিয়ায় চলে গেছে। সেও যে কেন ভয় পেল, তা বোঝা যাচ্ছে না। ইণ্ডিয়ার প্রতি তার এতদিন বিদ্বেষ ভাবই ছিল। হোসেন সাহেবেরও পাত্তা নেই, তিনি বোধহয় পালিয়েছেন করাচীতে। ওদের কাগজটা কেন বন্ধ করে দিল কে জানে! বছর দুয়েক ধরে কাগজটা তো পাকিস্তান সরকারেরই তোষামোদ করে আসছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় ওরা শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী, বিদেশের দালাল আখ্যা দিয়ে ছবি ছাপাতে প্রায় প্রতিদিন।

বাবুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মঞ্জুও তার ছেলেকে নিয়ে মামুনমামার সঙ্গে চলে গেছে ইণ্ডিয়ায়। বাবুল প্রায় জোর করেই মঞ্জুকে পাঠিয়েছে, জোর করেছিল এইজন্য যে মঞ্জুর প্রবল ইচ্ছে যাওয়ার, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছে না, সেটা বুঝতে পেরেছিল বাবুল। ঢাকা শহরের বাড়ির মধ্যে থেকে মেয়েদের জোর করে ধরে নিয়ে যাবে, এরকম অবস্থা কখনো আসেনি। মামুনমামাকে ভালোবাসে মঞ্জু, বাবুল তা জানে,’হয়তো, হয়তো কেন, নিশ্চিত সে ভালোবাসার মধ্যে কোনো নোংরামি নেই, শারীরিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু এইরকম ভালবাসাও এক এক সময় এমন তীব্র হতে পারে, যাতে কোনো নারীর কাছে তার স্বামীর চেয়েও সেই ভালোবাসার মানুষটি অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে। মামুনমামাকে ঈর্ষা করে না বাবুল, এই সব ঈর্ষাটির্ষা অতি খেলো ব্যাপার, কিন্তু প্রতিদিন বাড়ি ফিরলেই যদি দেখা যায় স্ত্রী কোনো একজন পুরুষের সঙ্গে, সে আত্মীয় হোক আর যেই হোক, গল্পে মেতে আছে, কিংবা তাকে খাতির যত্ন করছে, তাতে কোন স্বামীর ভালো লাগে? মামুন একজন টোটালি কনফিউজড মানুষ, তাকে অত ভক্তিশ্রদ্ধা করারই বা কী আছে, তাও ভেবে পায় না বাবুল!

যাক, কিছুদিন মামুনের সঙ্গে থেকে আসুক মঞ্জু, খুব কাছ থেকে দেখলে হয়তো মানুষটি সম্পর্কে তার মোহ কেটে যেতেও পারে। আশা করি ভারতে গিয়ে ওরা কোনো বিপদে পড়বে না। মঞ্জুর জন্য নয়, ছেলেটার জন্য মাঝে মাঝে বাবুলের মনটা উতলা হয়ে ওঠে। বাড়িতে একটা বাচ্চা থাকলে বাড়ি সরগরম থাকে, সুখু নেই বলেই বাড়িটা এখন নিঝুম মনে হয়।

এ বাড়িতে এখন আড়াইজন মাত্র মানুষ। নিচতলায় মনিরা থাকে একা। সিরাজুলকে পঁচিশে মার্চের পর একবার মাত্র দেখেছে বাবুল। তারপর থেকে সে উধাও সে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে নিশ্চিত। এই অবস্থায় মনিরার কি এ বাড়িতে থাকার কোনো মানে হয়? তাকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবার প্রস্তাব দিয়েছিল বাবুল, কিন্তু এমন জেদী মেয়ে, কিছুতেই শুনবে না। সিরাজুল নাকি এখানেই মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। এই সব মুক্তিযোদ্ধা টোদ্ধাদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ দিতে চায় না বাবুল, তার বাড়িতে থেকে সিরাজুল এসব কাজকর্ম চালাবে, এতে তার ঘোর আপত্তি আছে। কিন্তু মনিরাকে সে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে না।

সেফু নামে কিশোরী মেয়েটিকে মঞ্জু মাথার দিব্যি দিয়ে গেছে, সে যেন সাহেবকে ছেড়ে কোথাও না যায় কখনো। সেই সেফুই বাবুলের জন্য রান্না করে দেয়, গোসলের পানি গরম করে রাখে। গ্রীষ্মকালেও ঈষদুষ্ণ জলে বাবুলের স্নান করা অভ্যেস। দিনের মধ্যে সে আটবার চা খায়।

বারান্দা থেকে ঘরে এসে বাবুল হাঁক দিল, সেফু, এক কাপ চা দিয়ে যা।

একখানা বই খুলে বসলো বাবুল। বই পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। পড়তে পড়তে এক সময় চোখ ব্যথা হয়ে যায়। শুধু পড়াশুনো নয়, এবার একটা কমোদ্যোগে নামতে হবে। বুড়ো ভাসানীও ভারতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে স্বাধীন বাংলার দাবি সমর্থন করে বসে আছেন। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে দলের পুরনো কমারা রয়ে গেছে এখনো কিছু কিছু। এইবার যোগাযোগ করতে হবে তাদের সঙ্গে। কাজ শুরু করতে হবে সম্পূর্ণ গোপনে, রুখতে হবে এই জাতীয়তাবাদের তরঙ্গ।

দু’দিন পরে সকালবেলা বাবুল সবে মাত্র বিছানায় শুয়ে দ্বিতীয়বার চা খেয়েছে, তখনও মুখ বোয়নি, সেফু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, সাব সাব, মিলিটারি আইছে! মিলিটারি!

বাবুল বই থেকে মুখ তুলে বললো, আইছে তো কী হইছে? তুই লাফাইতে আছেস ক্যান?

চোখ প্রায় কপালে তুলে সেফু বললো, আমাগো বাড়িতে আইছে, সাব। মনিরা আপার ঘরে ঢোকছে।

এবার বাবুল একতলায় হুড়ুম ধরাম শব্দ শুনতে পেল। সত্যি তার বাড়িতে আর্মি এসেছে? এরা জানে না যে স্বয়ং টিক্কা খানের সঙ্গে পরিচয় আছে তার।

.

খালি গায়েই নেমে এলেন বাবুল। এরই মধ্যে কয়েকজন সৈন্য মনিরার ঘর থেকে সব জিনিসপত্র টান মেরে ফেলে দিয়েছে বাইরে। একজন মনিরার চুলের মুঠি চেপে ধরে আছে।

সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই বাবুল ইংরেজিতে বললো, থামো! তোমরা কার হুকুমে এ বাড়িতে এসেছো? আগে মেয়েটিকে ছেড়ে দাও। আমি এখনই কর্নেল আনসারীকে টেলিফোন করছি।

কোনো উত্তর না দিয়ে একজন সৈন্য হাতের রিভলভার তুলে পর পর দুবার ফায়ার করলো, তারপর অন্যদের বললো, আব চলো!

হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল বাবুল। যন্ত্রণার চেয়েও মহা বিস্ময়ে সে ভাবলো, সে কি সত্যি মরে যাচ্ছে? মৃত্যু এই রকম? এত তুচ্ছ ভাবে মৃত্যু!

মনিরা চিৎকার করে কাঁদছে, বাবুলের নাম ধরে ডাকছে, তাকে রক্ষা করবার কোনো ক্ষমতাই নেই বাবুলের, ক্রমশই সব শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসছে তার কানে। বুজে আসছে চোখ।

১৭. জানলার পর্দাটা সরালেই

জানলার পর্দাটা সরালেই দেখতে পাওয়া যায় ছোট বাগানা ঝকঝক করছে সকালের রোদে। এরকম একটা ঘর যে পাওয়া যাবে, অতীন স্বপ্নেও ভাবেনি। এতদিন পর তার একটা নিজস্ব ঘর! অতীন মনে মনে বললো, থ্যাংকস্ আ লট, পাঁচুদা!

কার কাছে যে কখন কোন উপকার পাওয়া যাবে, তা কিছুই বলা যায় না আগে থেকে। অতি স্বল্পভাষী পাঁচুদা, অনেকের ভিড়ে এমন এক কোণে বসে থাকেন যে তাঁর প্রতি অন্যদের নজরই পড়ে না। তিনিও অন্যদের নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কিনা তাও বোঝা যায় না কক্ষনো। আসবার আগেরদিন শান্তাবৌদির বাড়িতে আবার খাওয়া-দাওয়া হল। প্রথমদিন শান্তাবৌদির বাড়িতে এসে অতীন যে কুচ্ছিত ব্যবহার করেছিল, তার স্মৃতি সে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে সে রাতে প্রচুর হৈ চৈ করে, সে শান্তাবৌদির গানের সময় তাল দিয়েছে কার্পেট চাপড়ে, নিজেও একসময় হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠেছে অ্যারাইজ ও প্রিজনার অফ স্টার্ভেশন, অ্যারাইজ ও রেচেড অফ দা আর্থ…

এরই মাঝখানে পাঁচুদা একবার হাতছানি দিয়ে অতীনকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি বস্টনে থাকবে কোথায়?

এই সমস্যাটা নিয়ে অতীন চিন্তিত ছিল ভেতরে ভেতরে। বস্টন শহরে, বিশেষত কেমব্রিজে, চট করে বাড়ি পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও একা একটা পুরো অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া নেওয়া অতীনের সামর্থ্যের বাইরে। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছিল, সমীরের দাদা-বৌদি থাকেন ওখানে, সেই বাড়িতেই অতীন আপাতত উঠবে, তারপর ডর্মিটারিতে সীট পাওয়ার চেষ্টা করবে। যদিও অচেনা কোনো পরিবারের মধ্যে থাকাটা অতীনের একেবারে পছন্দ হয় না! কিন্তু আর কোনো উপায় তো নেই!

পাঁচুদা বলেছিলেন, কোনো ব্যবস্থা না হলে আমি সত্যকিংকরকে বলে দেখতে পারি! ওর ওখানে যদি জায়গা থাকে।

এই নামটাও অতীনের পছন্দ হয়নি। সত্যকিংকরটা আবার কে? সমীরের দাদা-বৌদির সঙ্গে তবু তো একটা যোগসূত্র আছে, এই লোকটা তো আরও অচেনা, তার বাড়িতে অতীন থাকতে যাবে কেন?

সে বিনীতভাবে বলেছিল, না, অন্য একটা জায়গায় উঠছি আপাতত। মানে…একটা ব্যাপার কী জানেন, পাঁচুদা, আমার খানিকটা প্রাইভেসি দরকার, কোনো ফ্যামিলির সঙ্গে থাকলে সেটা ঠিক পাওয়া যায় না।

পাঁচুদা হেসে বলেছিলেন, ঠিক তাই। আমাদের দেশের অনেকে প্রাইভেসির মর্মই বোঝে না। সত্যকিংকরের কাছে তোমাকে পয়সা দিয়ে থাকতে হবে। একটা আলাদা ঘর পাবে, মেইন ডোরের পাস কী পাবে, যখন ইচ্ছে আসবে-যাবে, কেউ ডিসটার্ব করবে না। তবে রান্নাঘর, বাথরুম কমন, ভাড়া বোধহয় পঁচাত্তর-আশি ডলার, টেলিফোন বা গ্যাসের আলাদা চার্জ দিতে হয় না।

এবার অতীন একটু উৎসাহ দেখিয়ে বলেছিল, পঁচাত্তর কিংবা আশি ডলারে একটা আলাদা ঘর? ওটা কি মেস বাড়ির মতন ব্যাপার নাকি? ঐ ভাড়ায় একটা ঘর পেলে আমি এক্ষুনি। নিতে রাজি আছি।

টেলিফোনটার দিকে হাত বাড়িয়ে পাঁচুদা বলেছিলেন, দাঁড়াও দেখছি, সত্যকিংকরের বাড়িতে ঘর খালি আছে কি না। না, মেস বাড়ি নয়। সত্যকিংকর মানুষটি ভারি অদ্ভুত, আলাপ করলে তোমার হয়তো ভালো লাগবে। আর যদি ভালো না লাগে দু’এক মাসে অন্য কোথাও চলে যেও!

পাঁচ মিনিটে সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। ফোনে পাওয়া গেল সত্যকিংকরকে। তিনি জানালেন, তাঁর বাড়িতে অ্যাটিকের ঘর খালি আছে, অন্য ঘরের জন্য আশি ডলার লাগে, কিন্তু অ্যাটিকের ঘর বলেই তার ভাড়া বাহাত্তর ডলার।

এ এক অভাবনীয় যোগাযোগ। গম্ভীর, নির্লিপ্ত ধরনের পাঁচুদা যে অতীনের জন্য চিন্তা করেছেন, এই জন্যই তাঁর প্রতি আরও কৃতজ্ঞতাবোধ হয়। শান্তাবৌদির অনেক গুণ। তিনি সুন্দরী, গান গাইতে, অভিনয় করতে পারেন, চমৎকার রান্না করেন, সেইজন্য তাঁর খুব জনপ্রিয়তা, পাঁচুদাকে বিশেষ কেউ পাত্তাই দেয় না, কিন্তু অতীনের মনে হয়েছিল, মানুষ হিসেবে পাঁচুদা অনেক উঁচুতে। পরে অতীন আরও শুনেছে যে পাঁচুদা নাকি চুপি চুপি এরকম অনেকের উপকার করেন।

এদেশে উপার্জনের এক চতুর্থাংশই চলে যায় বাড়ি ভাড়ায়। খাওয়ার খরচটাই সবচেয়ে কম। কিন্তু জামা-কাপড়, যাতায়াত আর বাড়ি ভাড়াতেই অনেক টাকা ব্যয় হয়। সেই তুলনায় অতীন বেশ শস্তায় একটা চমৎকার ঘর পেয়েছে। অ্যাটিকের ঘর তো কী হয়েছে, এটাই তার বেশি ভালো লেগেছে।

যেসব অঞ্চলে খুব বেশী তুষারপাত হয়, সেখানে কোনো বাড়ির ছাদ থাকে না। বাড়িগুলি হয় কৌণিক, ছাদের ঘরটা অনেকটা টোপরের মতন। এতেই অতীনের স্বচ্ছন্দে চলে যাবে। ঘরে সমস্ত আসবাব রয়েছে, খাট, চেয়ার টেবিল, বুক র‍্যাক, ওয়ার্ডরোব, এমনকি কম্বলও কিনতে হয়নি অতীনকে। ঘরখানা তার খুব মনের মতন।

সিদ্ধার্থ-সমীররা গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে অতীনকে। সঙ্গে নীপা আর বাসবীও এসেছিল, নিউইয়র্ক থেকে বস্টন আসতে প্রায় আট ঘণ্টা লেগে গেল, সারা রাত এক ফোঁটাও না ঘুমিয়ে প্রবল হুল্লোড় করতে করতে ওরা এসেছে। শনিবার সকালে পৌঁছে ওরা ফিরে গেছে রবিবার রাত্তিরে।

সত্যকিংকর নামটা শুনলেই মনে হয় গলায় পৈতে আছে, তাদের বাড়িতে দৈনিক নারায়ণ পুজো হয়। আতপ চাল আর চাপা কলা চটকে মেখে প্রসাদ খায়, ফস নিরামিষ চেহারা, মাথায় অল্প টাক… অতীনের মনে এইরকম একটা ছবিই ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সত্যকিংকর লাহিড়ী একজন পাক্কা সাহেব, পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস, স্বাস্থ্যবান পুরুষ, তিনি ঘুম থেকে উঠেই বোধহয় গলায় টাই পরে নেন, কারণ তাঁকে গ্রীষ্মকালেও নাকি কেউ ক্যাজুয়াল পোশাকে দেখেনি। এ দেশে আছেন প্রায় তেইশ বছর, মেম বিয়ে করেছেন, তাঁর স্ত্রীর নাম মাথা। দম্পতিটি নিঃসন্তান।

বাড়িটি সত্যকিংকরের নিজস্ব! চারখানা ঘর ভারতীয় ছাত্রদের ভাড়া দেন, স্বামী-স্ত্রী থাকেন বেসমেন্টে। বাগানওয়ালা এমন একখানা সুন্দর বাড়ির মালিক হয়েও কেন যে নিজেরা মাটির তলার ঘরে থাকেন, তা বোঝা যায় না। সত্যকিংকর বাড়ি ভাড়া দেন লাভের জন্যও নয়, তা হলে তিনি আরও অনেক বেশি ভাড়া চাইতে পারতেন। অতীনের ঘরের ভাড়া বাহাত্তর ডলার, পঁচাত্তর বা আশি তো হতেই পারতো, অন্যান্য ঘরের ভাড়াও আটাত্তর বা চুরাশি এইরকম খুচরো ধরনের, অর্থাৎ সত্যকিংকরের একটা কিছু হিসেব আছে। নিছক চাকরিজীবীদের তিনি বাড়িতে রাখেন না, ছাত্র বা রিসার্চ স্কলারদের শুধু ভাড়া দেন, গুজরাটি, পাঞ্জাবী, মাদ্রাজী, ভারতের যে-কোনো অঞ্চলের ছাত্ররা থাকতে পারে, এমনকি দু’জন পাকিস্তানীও আছে এক ঘরে।

সোমেন দত্ত নামে একজন বাঙালী ছেলে থাকে একতলায়। সে প্রথমদিন আলাপে অতীনকে বলেছিল, বাড়িওয়ালা সত্যদা ভাড়াটেদের কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলান না, তবে তিনি যদি জানতে পারেন যে কোনো ছাত্র পড়াশুনোয় ফাঁকি দিচ্ছে, কোনো সেমেস্টারে পাস করতে পারেনি, তা হলে তিনি তাকে ঘর ছেড়ে দেবার নোটিস দেন। অর্থাৎ মানুষটি আদর্শবাদী।

প্রথম দিন অতীন এসে দেখেছিল, সুট-টাই, জুতো-মোজা পরা সত্যকিংকর অ্যাটিকের ঘরের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পর্দা সেলাই করছেন। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটি রয়েছে একপাশে, বোঝা যায়, তিনি নিজেই একটু আগে ঘর পরিষ্কার করে এখন পর্দা মেরামত করতে লেগে গেছেন। অতীনকে দেখে তিনি বিশেষ কোনো স্বাগত ভাষণ না জানিয়ে শুধু মুখটা একবার ফিরিয়ে বলেছিলেন, হাই! ডিড ইউ হ্যাভ আ গুড জার্নি?।

অতীন একটু শঙ্কিত হয়ে ভেবেছিল, এই রে, এই লোকটা সর্বক্ষণ ইংরিজি বলবে নাকি? এর মেম বউকে সে আগেই নিচে দেখে এসেছে। লন্ডন বা আমেরিকায় অতীন এর আগে শুধু বাঙালীদের সঙ্গেই থেকেছে।

সত্যকিংকর আবার পদ সেলাই করতে করতে ইংরিজিতে বলেছিলেন, তুমি অ্যাটিকের ঘরে আগে কখনো থেকেছো? এখানে শীত একটু বেশি লাগতে পারে। এখনও শীত একেবারে যায়নি, বৃষ্টি হলেই বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। রুম হিটার আছে, তবু যদি শীত করে আমার স্ত্রীর কাছে অতিরিক্ত কম্বল চাইতে পারো।

অতীনের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল সিদ্ধার্থ, সে বাংলাতেই বলে উঠেছিল, মিঃ লাহিড়ী, আপনার এখানে কি কুকিং-এর ব্যবস্থা আছে? ঘরের মধ্যে চা-টা বানানো যাবে?

সতকিংকর এবার কাজ থামিয়ে ঘরে বসে বাংলাতে জিজ্ঞেস করলেন, বাঙালী? এই ঘরে তো দু’জনের থাকার কথা ছিল না। পাঁচুদা আমাকে বলেছিলেন—

অতীন তাড়াতাড়ি বলেছিল, না, না, ও আমার বন্ধু, আমাকে পৌঁছে দিতে এসেছে। আমার নাম অতীন মজুমদার, আমি এখানে থাকবো।

সত্যকিংকর বলেছিলেন, হ্যাঁ, রান্নার ব্যবস্থা আছে নিচের কিচেনে। একটা বড় ফ্রিজ আছে, সেখানে খাবার জিনিসপত্র রাখতে পারেন, তবে বীফ কিংবা পৰ্ক জাতীয় কিছু রাখা যাবে না। দু’জন মুসলমান আছে, একটি গুজরাটি ছেলে আছে, সে বীফের ছোঁয়াও খায় না। ইচ্ছে করলে একটা ছোট ফ্রিজিডেয়ার কিনে নিজের ঘরে রাখতে পারেন। যেমন, বসবার ঘরে টি ভি আর ফোন আছে সকলের ব্যবহারের জন্য, কিন্তু ইচ্ছে করলে যে-কেউ ঘরে আলাদা ফোনের কানেকশান নিতে পারে, নিজের টি ভি-ও রাখতে পারে। সেগুলোর চার্জ যার যার নিজস্ব। আপনার কোন্ ডিসিপ্লিন? পোস্ট ডক্টরেট করতে এসেছেন?

ইংরিজিতে আপনি-তুমি নেই, বাংলায় কথা বলার সময় সত্যকিংকর ওদের আপনি সম্বোধন করায় অতীন খুশী হয়েছিল। বয়েসে বড় বলেই যে হুট করে তুমি বলা শুরু করবে, তার কোনো মানে নেই। লোকটির ইংরিজি উচ্চারণ নিখুঁত হলেও বাংলা কথায় বেশ প্রকট বাঙাল টান। আছে। অতীন তাকে নিজের পড়াশুনো এবং এখানকার কাজের কথা জানালো।

সিদ্ধার্থ একটা সিগারেট ধরাতেই সত্যকিংকর উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আই ডোন্ট মাইন্ড আদার পিপলস স্মোকিং, কিন্তু ধোঁয়ার গন্ধ আমার সহ্য না। আমি এখন যাচ্ছি, কোনো রকম অসুবিধে হলে আমাকে কিংবা আমার স্ত্রীকে বলতে দ্বিধা করবেন না। টেবিলের ড্রয়ারে একটা অ্যাশট্রে আছে, ব্যবহার করবেন।

মার্থার সঙ্গেও আলাপ হয়েছে অতীনের। বেশ মোটা-সোটকা মহিলা, গাল দুটো ফুলে ফুলো এবং একেবারে গোলাপি রঙের, তাঁকে সত্যকিংকরের চেয়ে বয়েসে বড় দেখায়। মার্থার বাবা-মা শ্বেত রাশিয়ান, যদিও মার্থার জন্ম এ দেশেই। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারেন মার্থা, তিনি তাঁর স্বামীর মতন আদব-কায়দা দুরস্ত নন। বেশ কথা বলতে ভালোবাসেন। যদিও তাঁর সন্তান হয়নি, তবু তাঁর ব্যবহারে একটা মা মা ভাব আছে। প্রথম আলাপেই তিনি অতীনের নামটা ঝালিয়ে নেবার চেষ্টা করলেন অনেকবার। উটিন? ওতেন? আটিন? এমন কিছু শক্ত নাম নয়, তবু অতীন কথাটা কিছুতেই তাঁর ঠোঁটে আসে না। হাসতে হাসতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, লোঞ্চ য়ু হ্যাভ আ নিক নেইম?

বাবলু নামটা শুনে তিনি যেন দারুণ স্বস্তি পেয়ে বললেন, দ্যাটস ইজি, এটা আমি পারবো, বাবু? বাবলিউ? নো? বাব-লু? বাবলু! আমি তোমার এই নাম কল করবো! বাব-লু, ভেরি সুইট নেইম!

প্রথম দিনের উপহার হিসেবে তিনি অতীনকে একটা বেশ বড় পিৎসা খাওয়ালেন।

সবদিক থেকেই বাড়িটা বেশ পছন্দ হয়েছে অতীনের। দেশত্যাগ করার পর সে এত আনন্দে আর কখনো থাকেনি।

সিদ্ধার্থ-সমীররা যে দুদিন থেকে গেল, তার মধ্যে শর্মিলার সঙ্গে দেখা হয়নি ওদের। উইক এন্ডে শর্মিলাকে যেতে হয়েছিল ওয়াশিংটন ডি সি-তে তার মামার কাছে। আগে থেকেই ঠিক হয়েছিল, ক্যানসেল করার উপায় ছিল না, শর্মিলার মামা অত্যন্ত জাঁদরেল ধরনের মানুষ, শর্মিলা তাঁকে ভয় পায়। সিদ্ধার্থ-সমীরদের সঙ্গে যে শর্মিলার এ যাত্রায় দেখা হয়নি তাতে অতীন খুশীই হয়েছে। সিদ্ধার্থের জিভ আলগা, শর্মিলার সামনে সে কী উল্টোপাল্টা ইয়ার্কি বলে বসতো তার ঠিক নেই। সেই যে এক রাতে শান্তাবৌদির বাড়ি থেকে ফেরার পথে হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ার ব্যাপারটা অতীন ঘুণাক্ষরেও জানায়নি শর্মিলাকে। সিদ্ধার্থ প্রায়ই ব্ল্যাকমেইল করার ছলে বলতো, টেলিফোন করবো শর্মিলাকে? ওকে বলবো যে তুই আসলে ওকে একটুও ভালোবাসিস না, স্বার্থপরের মতন মরতে গিয়েছিলি।

আজ শর্মিলা ফিরবে দুপুর তিনটের বাসে। অতীন চেয়েছিল বাস স্টেশনে গিয়ে শর্মিলাকে নিয়ে আসতে, কিন্তু শর্মিলা বারণ করেছে। তার সঙ্গে একজন মামাতো বোন থাকবে, বাস স্টেশান থেকে সোজা এখানে আসতে পারবে না শর্মিলা।

আমেরিকায় এসে এই এতগুলো মাসের মধ্যে শর্মিলার সঙ্গে অতীনের দেখা হয়েছে মাত্র দু’বার। একবার নিউ ইয়র্ক এয়ারপোর্টে আর একবার গ্রে হাউন্ড বাস স্টেশানে। কোনো নিভৃত জায়গায় নয়। নিউ ইয়র্ক থেকে বস্টনে আসার গাড়ি ভাড়া ছিল না অতীনের। শর্মিলা এখানে থাকে তার মামাতো বোনের সঙ্গে, তার পক্ষেও যখন তখন নিউ ইয়র্ক যাওয়া সম্ভব ছিল না।

আজ অতীনের একটা নিজস্ব ঘর আছে, সেখানে এসে বসবে শর্মিলা। চার দেওয়ালের মধ্যে শুধু তারা দু’জন জামশেদপুরের পর এই প্রথম।

কাজে যোগ দিতে এখনও দু’দিন দেরি আছে অতীনের, তবু সকালে সে একবার ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘুরে এলো। রান্নাবান্না সে এখনও শুরু করেনি, দুপুরে একটা ড্রাগ স্টোরে ঢুকে দুটো হট ডগ আর কফি নিয়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ একটা থ্রিলার পড়লো। তবু সময় কাটছে না। এই অচেনা শহরে রাস্তায় রাস্তায় একলা ঘুরে বেড়াবার কোনো মানে হয়, তাছাড়া এই মে মাসেও বেশ সিরসিরে হাওয়া দিচ্ছে। মাঝে মাঝে খুব মিহিন বৃষ্টি। অতীনকে একটা রেইন কোট কিনতে হবে।

বাড়িতেই ফিরে এলো অতীন। দুপুরে অন্য ছাত্ররা কেউ থাকে না। সত্যকিংকর অফিসে গেছেন। মাথা কিছুদিন কোনো কাজ করছেন না, এ দেশে এরা যখন ইচ্ছে চাকরি ছাড়ে, মাঝখানে তিন-চার মাস চুপচাপ বসে থেকে আবার একটা কিছু পেয়ে যায়। মাথা একটা কলেজে রুশ ভাষা পড়ান, হঠাৎ তাঁর গ্রীক ভাষা শেখার শখ হয়েছে, তাই তিনি চাকরি ছেড়ে গ্রীক ভাষার চর্চা করছেন। অদ্ভুত এদের ব্যাপার-স্যাপার।

বসবার ঘরে এসে অতীন টি ভি খুললো। দুপুরবেলা প্রায় সব চ্যানেলেই বাজে বাজে সোপ অপেরা হয়, অথবা রান্নার রেসিপি শেখায়, অথবা ন্যাকা ন্যাকা টক শো। সি বি এস-এ একটা পুরনো সিনেমা পাওয়া গেল, তাও আবার হিস্টোরিক্যাল, এইসব সঙের মতন পোশাক পরা হলিউডী ইতিহাস অতীনের একেবারে সহ্য হয় না। নেহাত ইউল ব্রাইনার আছে বলেই দেখা যায়। শর্মিলা তিনটের বাসে পৌঁছালেও পাঁচটার আগে আসতে পারবে না এ বাড়িতে।

টেলিফোনটা বেজে উঠতেই অতীন টি ভির ভলিউম কমিয়ে রিসিভারটা তুলে নিল। আওয়াজ শুনেই তার ধারণা হলো এই টেলিফোন তারই জন্য।

একটি পুরোপুরি মার্কিনী নারী কণ্ঠ আদুরে আদুরে গলায় বললো, হাই ডারলিং, হাউ হ্যাভ যু বীন?

অতীন খানিকটা হতাশ হয়ে বললো, হুম ডু য়ু ওয়ান্ট?

খিলখিল করে হেসে সেই নারী কণ্ঠ বললো, আই ওয়ান্ট যু, সুইটি? আর যু ফ্রি দিস ইভিনিং? আই অ্যাম ফ্রি!

এ বাড়িতে বেশ কয়েকজন অবিবাহিত যুবক থাকে, তাদেরই কারুর বান্ধবী হতে পারে। কিংবা অল্পবয়েসী মেয়েরা টেলিফোনে এরকম ইয়ার্কি করে। নতুন ছেলেরা এই সব মেয়েদের পাল্লায় পড়ে নাকানিচোবানি খায়!

ফোনটা রেখে দিতেই কয়েক সেকেন্ড পড়ে আবার বেজে উঠল। এবারও অতীন শুনলো সেই মেয়েটার হাসি। অন্য সময় হলে অতীন হয়তো এর সঙ্গে খানিকটা রসিকতা করতো, এখন ভেতরে ভেতরে সে উত্তেজনায় কাঁপছে। সে কড়া গলায় বললে, গেট লস্ট! তারপর জোরে শব্দ করে রেখে দিল।

হঠাৎ, খুবই অপ্রাসঙ্গিকভাবে অতীনের মনে পড়ে গেল, অলি আসবে?

যে-কথাটা সে গোপন করে রাখতে চাইছে, কিংবা ভুলে যেতে চাইছে, সেটা অবচেতন। থেকে হঠাৎ হঠাৎ ভূস করে মাথা তুলছে। টেলিফোনে একটা প্রগলভা মেয়ের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে অলির কথা মনে পড়ার কোনো সম্পর্কই নেই, তবু মনে এলো।

অলি হয়তো এ মাসেই পৌঁছে যাবে এদেশে। অলি অ্যাডমিশানের সুযোগ পেয়েছে এদিকের ইউনিভার্সিটিতে, নিউ ইয়র্ক হয়েই তাকে যেতে হবে। নিউ ইয়র্কেও তার বাবার চেনা কেউ থাকতে পারে। অলি কি প্রথম সেখানে উঠবে? না, তা হতেই পারে না। অলি নিশ্চয়ই আশা করবে যে বিমান থেকে নেমেই সে দেখতে পাবে অতীনকে। এ দেশে প্রথমবার পা দিয়ে একটা চেনা মুখ না দেখতে পেলে যে কী খারাপ লাগে, তা কি অতীন জানে না? সে যেদিন প্রথম নিউ ইয়র্কে আসে, সেদিন সিদ্ধার্থ এয়ারপোর্টে পৌঁছোতে চল্লিশ মিনিট দেরি করেছিল, তার মধ্যেই দারুণ বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল অতীন।

অলিকে শর্মিলার কথা কিছুই জানানো হয়নি। শর্মিলাও জানে না অলির কথা। অতীন এদের দু’জনের সঙ্গেই তঞ্চকতা করছে? না, অলি কিংবা শর্মিলাকে কোনো ভাবেই সে ঠকাতে চায় না, ওদের একজনকেও সে আঘাত দিতে চায় না। বলতে তো হবেই, কিন্তু কী করে বলবে? অলিকে কি বলা যায়, আমি তোমাকে আর চাই না, আমি শর্মিলা নামে একটি মেয়েকে ভালোবাসি? তা ছাড়া এটাও তো মিথ্যে, অলিকে তো সে এখনো একটুও কম ভালোবাসে না, অলিকে সে কোনোভাবে দুঃখ দিচ্ছে, এটা ভাবতে গেলেই তার বুক টনটন করে। আর শর্মিলা, সেও একটা অসাধারণ মেয়ে, কোনো রকম স্বার্থ জ্ঞান নেই তার, অতীন যদি শর্মিলাকে বলে যে অলি নামের একটি মেয়ের সঙ্গে তার অনেকদিনের সম্পর্ক, তাহলে শর্মিলা নিশ্চিত সরিয়ে নেবে নিজেকে। সে কাঁদবে হয়তো, কিন্তু অতীনকে জানতে দেবে না।

শর্মিলাকে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। শর্মিলার সঙ্গে সে যতখানি অন্তরঙ্গ হয়েছে, শর্মিলা তার ওপর এত নির্ভর করে, এখন শর্মিলাকে কোনোভাবে সরিয়ে দেবার চিন্তাটাও চরম নীচতা ও কাপুরুষতা!

মুখে বলার চেয়েও চিঠিতে জানানো তবু সহজ। একবার কোনোক্রমে লিখে ফেলতে পারলেই হলো। অলি এখানে এসে পৌঁছোবে, তার সঙ্গে অতীনের দেখা হবে না, এ রকম তো হতেই পারে না! অতীনকে সেদিন যেতেই হবে নিউ ইয়র্ক এয়ারপোর্টে। কিন্তু এখানে পৌঁছোবার পর অলি যখন জানতে পারবে, সে দারুণ আঘাত পাবে না? খুব নরম মেয়ে অলি, বিদেশে এসেই এ রকম একটা আঘাত পেলে যদি একেবারে ভেঙে পড়ে? সে ভাববে, বাবলুদা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুধু করেনি, নিছক বাজে লোকদের মতন সে কথা এতদিন গোপন করেও গেছে। আগে জানতে পারলে তবু অলি মনটাকে শক্ত করে নিতে পারবে। অতীন তো তার বন্ধু থাকছেই। এদেশে অলি এলে অতীন তাকে সব রকম সাহায্য করবে।

চিঠি লেখার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আজকালের মধ্যেই পোস্ট না করলে সে চিঠি হয়তো অলির কাছে আর পৌঁছোবেই না। আজই একটা এরোগ্রাম কিনে আনলে হতো।

আসলে, অতীন অলিকে চিঠি লিখতে পারছে না, তার কারণ সে মন ঠিক করতে পারছে না, কাকে আগে জানাবে? অলি দূরে আছে বলে এমন কি দোষ করেছে যে প্রথম আঘাতটা তাকেই দিতে হবে? অলি এসে পৌঁছবার পর যদি শর্মিলা সব জানতে পারে, তখন শর্মিলার মনে হবে না যে, অতীন এসব কথা তাকে আগে কেন বলেনি?

এই গোপনীয়তার বোঝা অসহ্য হয়ে উঠছে অতীনের, অথচ সে জানিয়েও ফেলতে পারছে না।

সবচেয়ে ভালো হয়, আজই শর্মিলাকে খোলাখুলি সব কিছু জানিয়ে দেওয়া। শর্মিলার পায়ের কাছে বসে অতীন পরিপূর্ণ স্বীকারোক্তি দিয়ে বলবে, এবার তুমি আমার বিচার করো। আমাকে যা খুশি শাস্তি দাও, কিন্তু আমি তোমাকে কিছুতেই ছাড়তে পারবো না।

টি ভি-তে সিনেমা শেষ হয়ে শুরু হয়েছে বাচ্চাদের প্রোগ্রাম, অতীন কিছুই দেখছে না।

তার সিগারেট ফুরিয়ে গেছে কিন্তু বাইরে গিয়ে সিগারেট কিনতে ইচ্ছে করছে না। যদি এর মধ্যেই শর্মিলা এসে পড়ে, কিংবা বাস স্টেশন থেকে ফোন করে? এখানে পৌঁছেই সে হয়তো ফোন করবে। এতটা সময় নষ্ট না করে বইপত্র নিয়ে বসলে হতো। পড়াশুনায় এবার মন দিতে হবে। কিন্তু শর্মিলার সঙ্গে দেখা না হলে এখানে যেন কিছুই শুরু করা যাচ্ছে না। বস্টনে পৌঁছোবার পর অতীন এক ক্যান বীয়ারও খায়নি। সে মদ্যপান ছেড়ে দেবে, সিগারেট খাওয়া কমাবে, এখন শুধু পড়াশুনো। আর টাকা বাঁচিয়ে পাঠাতে হবে বাড়িতে মায়ের একটা ফ্রিজ কেনার শখ ছিল, আজও বোধহয় কেনা হয়নি, হলে মুন্নি নিশ্চয়ই চিঠিতে জানাতে।

শর্মিলার সঙ্গে যদি দেখা না হতো কখনো? শর্মিলার সঙ্গে দেখা হবার পরই তার জীবনের একটা অন্য পর্ব শুরু হয়েছে। শর্মিলার সঙ্গে ঐ একটা সম্পর্ক না হলে সে জেল থেকে বেরিয়ে কিছুতেই বিলেতে পালাতে রাজি হতো না। এ রকম নির্লজ্জের মতন বাঁচতে চাইতো না সে।

বেসমেন্ট থেকে মাথা উঠে এসে বললেন, হাই বাবলু, তুমি বুঝি টি ভি অ্যাডিকট? সাবানের বিজ্ঞাপন দেখতে ভালোবাসো?

বাবা কোনো উত্তর না দিয়ে হাসলো।

মার্থা মাথায় একটা স্কার্ফ বাঁধতে বাঁধতে বললো, আমি একটু শপিং-এ যাচ্ছি!

মার্থা বেরিয়ে পরার একটু পরেই একটা ট্যাক্সি থামলো গেটের সামনে। সময় বাঁচাবার জন্য ট্যাক্সির পয়সা খরচ করে এসেছে শর্মিলা।

যার জন্য সারাদিন উদগ্রীব অপেক্ষা, তাকে দেখেই যে হৃদয় আনন্দে ঝলমল করে উঠবে তার কোনো মানে নেই। শর্মিলাকে দেখেই অতীনের মনে হলো, যদি শর্মিলার বদলে এখন। অলি আসতো? এই প্রথম যেন অতীন আবিষ্কার করলো, শর্মিলার সঙ্গে অলিব চেহারার বেশ মিল আছে।

একটা গোলাপি রঙের শাড়ির ওপর পাতলা সাদা রঙের রেইন কোট পরে এসেছে শর্মিলা। মাথার চুল সব খোলা। তার মুখে সব সময় একটা লজ্জা লজ্জা ভাব থাকে।

অতীন এগিয়ে গিয়ে শর্মিলার হাত ধরতেই সে বললো, সুমিকে একটা মিথ্যে কথা বলে চলে এলুম! এক মিনিট দেরি করতে ইচ্ছে করছিল না!

বাড়িতে এখন কেউ নেই। মার্থা বেরিয়ে যাওয়ায় অতীন খুশী হয়েছে। যদিও সে জানে যে তার ঘরে কোনো বান্ধবীকে নিয়ে গেলে কেউ কিছুই মনে করবে না, তবু অন্যদের সামনে একটু অস্বস্তি লাগে। এখন কেউ দেখবার নেই। এই পর্চে দাঁড়িয়েই শর্মিলাকে চুমু খাওয়া যায়। কিন্তু আজ শর্মিলাকে আগে অলির কথা বলে নেবে অতীন।

শর্মিলা বললো, চমৎকার বাড়ি পেয়েছে, যদিও আমার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে।

–চলো। আমার ঘরটা দেখবে চলো!

শর্মিলার হাত ছেড়ে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি উঠলো অতীন। তার বুকের মধ্যে দুম দুম শব্দ হচ্ছে। অলির কথা শুনে কী প্রতিক্রিয়া হবে শর্মিলার? যদি সে বলে, ছিঃ, তুমি একটা মেয়েকে কষ্ট দিয়ে আমাকে খুশী করতে চাও!

দরজার সামনে এসে সে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়েই আঁতকে উঠলো। চাবি নেই! ঘরের মধ্যে চাবি রেখে সে দরজা টেনে বেরিয়ে এসেছে, এতক্ষণে মনে পড়লো। এখন কী হবে? তার ঘর দেখাতে পারবে না শর্মিলাকে? মাথা বেরিয়ে গেলেন, তাঁর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটাও তো এখন পাওয়া যাবে না।

তার ফ্যাকাশে মুখ দেখে শর্মিলা জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে? অতীন বললো, চাবি ভেতরে রয়ে গেছে… ল্যান্ডলেডিও বাড়িতে নেই, কী করে ঢুকবো?

শর্মিলা বললো, তুমি দেখছি, আমার চেয়েও ভুলো! একটু সরে এসো তো!

অতীনের হাত টেনে ধরে সরিয়ে দিয়ে শর্মিলা নিচু হয়ে দরজার সামনের কার্পেটের কোণটা তুলে দেখলো। তারপর বললো, এই দ্যাখো, তোমাদের মতন গ্রীন হর্নদের জন্য ডুপ্লিকেট চাবিটা এখানে রাখা থাকে।

ঠিক যেন ম্যাজিশিয়ানদের ভঙ্গিতে শর্মিলা চাবিটা দিল অতীনের হাতে।

তক্ষুনি শর্মিলাকে আলিঙ্গন করে দরজার গায়ে চেপে ধরে অসংখ্য চুমু দেবার জন্য আকুলি-বিকুলি করতে লাগলো অতীনের বাসনা। কিন্তু না, আগে অলির কথা বলে নিতে। হবে।

চাবিটা সে শর্মিলাকে ফিরিয়ে দিয়ে বললো, তুমি খোলো।

শর্মিলা দরজাটা খুলে বললো, জানো আমার কী খারাপ লাগছিল? তুমি শনিবার এসে পৌঁছেলে, আমি থাকলে সব জিনিস-টিনিস গুছিয়ে দিতে পারতুম! একী, এত সুন্দর করে সাজিয়ে কে দিল?

অতীন বললো, আগে থেকেই সবকিছু এরকম ছিল। আমি শুধু আমার সুটকেস, বইপত্তর আর রাস্তা থেকে কুড়োনো একটা স্ট্যান্ড ল্যাম্প ছাড়া আর কিছুই আনিনি নিউ ইয়র্ক থেকে। ঘরটা সুন্দর না? জানলার কাছে এসো, নদী দেখা যায়, খানিকটা দূরে অবশ্য।

শর্মিলা বললো, সবকিছুই আগে থেকে ছিল? বিছানার চাঁদর, এটাও তোমার নিজের না?

অতীন দু’দিকে মাথা নাড়লো।

শর্মিলা একটানে চারদটা তুলে ফেলে বললো, অন্যের চাঁদরে তুমি শোবে, তোমার ঘেন্না করে না? কাল আমি তোমায় বেডশীট এনে দেবো।

অতীন বললো, বাঃ, আমরা যখন কোনো হোটেলে থাকি।

শর্মিলা বললো, এটা কি হোটেল? আমি মাঝে মাঝে এখানে দুপুরে এসে থাকবো।

শর্মিলা দ্রুত হাতে ঘরের টুকিটাকি জিনিসপত্র এদিক ওদিক করতে লাগলো। নারী স্পর্শের লালিত্যে ঘরের চেহারাটা কেমন বদলে যায়। অতীন এক দৃষ্টিতে দেখছে শর্মিলাকে, এই ক’মাসে বেশ রোগা হয়ে গেছে যেন, বেরিয়ে গেছে কণ্ঠার হাড়। তবু সে কী সুন্দর, যেন মূর্তিমতী সারল্য!

অতীন বললো, শর্মি, তোমার সঙ্গে আমার একটা বিশেষ কথা আছে।

টেবিলের ওপরের কাঁচটা তুলে বিছানার চাঁদর দিয়ে মুছছিল শর্মিলা, সে মুখ তুলে তাকিয়ে বললো, তোমার কী হয়েছে বলো তো? কীরকম গম্ভীর গম্ভীর দেখছি। জানলার কাছ থেকে ছুটে এলো অতীন। শর্মিলাকে বুকে চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট মেলালো। সে চুম্বনের যেন কোনো শেষ নেই। এখন কথা বলার কোনো উপায় নেই। সেই রকম ঠোঁটে ঠোঁট, বুকে বুক, উদরে উদর, উরুতে উরু মেলানো অবস্থাতেই দু’জনে শুয়ে পড়লো বিছানায়। অতীনের কোনো কথাই বলা হলো না।

১৮. কতদিনই বা আগের কথা

কতদিনই বা আগের কথা, মাত্র পাঁচ ছ’ বছর! এই পথ দিয়ে একদিন দলবেঁধে হৈ হৈ করে যাওয়া হয়েছিল, ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীদের চুপ করিয়ে দিয়ে ওরা চিৎকার করে গেয়েছিল কোরাস গান। আজ ওরা মাত্র দু’জন! আসবার সময় পমপম একটা কথাও বললো না, জানলায় মাথাটা হেলান দিয়ে বসে রইলো চোখ বুজে। অলি মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের একটি সংখ্যা। মন বসাতে পারেনি। লোকাল ট্রেনে ভিড় যথেষ্ট, বিভিন্ন স্টেশানে লোজন উঠছে নামছে, কিন্তু ওদের কোনাকুনি বিপরীত দিকে দু’জন। লোক বসে আছে গ্যাঁট হয়ে, তাদের নামার কোনো লক্ষণ নেই। অলি চোখ তুললেই চোখাচোখি হচ্ছে ওদের সঙ্গে।

দুটি যুবতী মেয়ের দিকে দু’জন পুরুষ মাঝে মাঝে তাকাবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু লোক দুটির গড়াপেটা চেহারা, তেমন অল্প বয়েসীও নয়। ওদের ঠিক রাস্তাঘাটের রোমিও বলে মনে হয় না। পুলিস? অন্য কোনো পাটির ভাড়া করা গুণ্ডা? ওদের চোখে চোখ পড়তেই গা-টা ছমছম করছে অলির। যদিও এখন বেলা এগারোটা, ট্রেনে এত মানুষ, তবু আজকাল প্রকাশ্য দিবালোকেই বহু লোকের চোখের সামনে খুন-জখম হয়, দুটো বোমা ফাটালেই কেউ আর বাধা দিতে আসে না।

মেমারি স্টেশানে অনেক লোক নামলো, অন্য যাত্রীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে পমপমের হাত ধরে নেমে পড়লো অলি। পমপম ফিসফিস করে বললো, আমায় ছেড়ে দে অলি, আমি হাঁটতে পারবো! অলি তবু ছাড়লো না, প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে চলে এলো গেটের বাইরে। আগে পমপমদের গ্রামের বাড়িতে গরুর গাড়িতে যেতে হতো, এখন সাইকেল রিকশা চলে। একটা রিকশায় উঠে পড়ে অলি পেছন দিকে না তাকিয়ে পারলো না, সেই লোকদুটিও এই স্টেশানে। নেমেছে, কিন্তু ওদের অনুসরণ করবার জন্য অন্য রিকশায় চাপেনি, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দু’জন সৈনিকের মতন, জামার পকেটে হাত। ওরা যে সাধারণ যাত্রী নয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এবার কি ওরা গুলি ছুঁড়বে? রিকশাটা চলতে শুরু করলে অলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইলো পেছন দিকেই, ওরা যা খুশি করুক, বাধা দেবার উপায় তো নেই, শুধু ওদের দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দেওয়া যেতে পারে।

লোকদুটি কিছুই করলো না, দাঁড়িয়ে রইলো একইভাবে। রিকশাটা বাঁক ঘুরে যাবার পর অলি ভাবলো, তা হলে কি পমপমের বাবা অশোক সেনগুপ্ত ওদের পাহারা দেবার জন্য পাঠিয়েছেন লোক দুটোকে?

মানিকতলা কেন্দ্রে বাই-ইলেকশানে জিতে কয়েক মাস আগে এম এল এ হয়েছেন অশোক সেনগুপ্ত। তাঁর প্রভাবেই নিশ্চিত ছাড়া পেয়েছে পমপম, যদিও তিনি আগে বলেছিলেন মেয়ের ব্যাপারে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না, পমপমও কিছুতেই তার বাবার সাহায্য নিতে চায়নি। পমপমকে ছাড়া হয়েছে স্বাস্থ্যভঙ্গের কারণে, সে প্রায় শয্যা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। মুক্তি পাবার পরেও মানিকতলার বাড়িতে কয়েকদিন থেকেই আবার বিদ্রোহ করেছিল পমপম, সে বাড়িতে অনবরত তার বাবার পার্টির লোকজন আসছে, অনেকে পমপমকে খুব বাচ্চা বয়েস থেকে চেনেন, তাঁরা পমপমকে উপদেশ দিতে চান, পমপমেরই ভালোর জন্য তাকে অন্যদিকে ফেরাতে চান, অমনি পমপমের সঙ্গে তর্ক বেধে যায়, পমপম। উত্তেজিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে, পমপম গ্রামের বাড়িতে কিছুদিন থেকে শরীর সারাবে। তবে একটা শর্ত আছে, পমপম সেখানে আবার নকশালদের আড্ডা করতে পারবে না। কোনো পলাতককে আশ্রয় দিতে পারবে না। এই শর্তে পমপম রাজি না হলে তাকে ব্যাঙ্গালোরে এক মাসির বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে, এটাই অশোক সেনগুপ্তর শেষ নির্দেশ!

অলি ভাবলো, ঐ গুণ্ডা চেহারার লোকদুটোকে যদি পমপমের বাবা পাঠিয়ে থাকেন, তা হলে ওরা কি পাহারা দেবার জন্য এসেছিল, না ওদের সঙ্গে আর কেউ আসে কি না তাই লক্ষ রাখতে এসেছিল?

পমপম কিছু বুঝতে পারেনি, অলি তাকে কিছু বললোও না।

একমাত্র মনের জোরটাই টিকে আছে পমপমের, তার শরীরটা একেবারে ভেঙে দিয়েছে ওরা। খানিকটা হাঁটলেই তার পা থরথর করে কাঁপে, হাত দুটো যেন শরীরের সঙ্গে আলগা হয়ে ঝুলছে, একখানা বই পড়তে গেলেও যখন-তখন তার হাত থেকে খসে পড়ে যায়। মুখখানা একেবারে রক্তশূন্য। তবু লালবাজারে পমপমের ওপর কী ধরনের অত্যাচার করা হয়েছে, তা সে কিছুতেই বলবে না। এমনকি অলিকেও না। শুধু মাঝে মাঝে ফিসফিস করে, ওদের মুখগুলো তো চিনে রেখেছি, একদিন ঠিক শোধ নেবো! ওদের ছেলেমেয়েরাও ওদের নাম উচ্চারণ করতে লজ্জা পাবে।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পমপমকে যখন কিছুদিনের জন্য পি জি হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। পুলিস পাহারায়, তখন নার্সের পোশাক পরে অলি দেখা করতে গিয়েছিল তার সঙ্গে। পি জির সুপারিনটেনডেন্ট অলির শান্তিমামার বিশেষ বন্ধু, সেইজন্যই এটা সম্ভব হয়েছিল। অলিকে দেখে পমপম শুধু অবাক হয়নি, বিরক্তও হয়েছিল খুব। অলি তাদের দলের কেউ নয়, কয়েকদিন স্টাডি সার্কেলে এসেছিল মাত্র, তারপর নিজে থেকেই সে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, সে কেন এই ঝুঁকি নেবে? অলির ওপর পুলিসের নজর পড়ে যাবেই, অলিকে যদি পুলিস অ্যারেস্ট করে তা হলে পমপমের ওপর যে ধরনের অত্যাচার হয়েছে, অলি তা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। অলি খুবই মেয়েলি ধরনের মেয়ে, তুলো-মোড়া বাক্সের পুতুলের মতন।

পমপমের নিষেধ শোনেনি অলি, তিনবার গিয়েছিল সে, বহরমপুর জেলে আটক কৌশিকদের খবরাখবর সে-ই জানিয়েছে পমপমকে। শুধু মানিকদার কথাটা গোপন করে গেছে।

পমপম ছাড়া পাবার পরেও কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে যায়নি। দলের অধিকাংশই এখন। জেলে, আর যারা পলাতক তাদের মধ্যে কতজন নিহত আর কে কে জীবিত তা জানার উপায় নেই। আর যারা সক্রিয় কর্মী না হলেও সিমপ্যাথাইজার ছিল, তারা কেউ আর সম্পর্ক রাখতে চায় না, ভয়ের চোটে দেখা হলেও না-চেনার ভান করে।

শুধু অলি গেছে পমপমের কাছে, প্রত্যেকদিন।

পিচ নেই, শুধু খোয়া ফেলা রাস্তা, রিকশাটা লাফাচ্ছে অনবরত, অলি পমপমকে চেপে ধরে আছে শক্ত করে। স্টেশন থেকে পমপমদের বাড়ি যে এতখানি দূর, তা আগেরবার মনেই হয়নি। অলির মনে পড়লো, আগেরবার তারা যখন এই রাস্তা দিয়ে ফিরছিল, তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল বাবলুদা, তার ধারণা হয়েছিল, তার পায়ে সেপটিক হয়েছে!

একবার চোখ মেলে পমপম বললো, মানিকদাকে একটু খবর দিতে পারবি? কতদিন মানিকদাকে দেখিনি!

যে-অলি কোনোদিন মিথ্যে কথা বলতে পারে না, সে একটুও গলা না কাঁপিয়ে বললো, আমি এখান থেকেই কৃষ্ণনগর যাবো, যাবার পথে মানিকদার সঙ্গে দেখা করে যাবো।

পমপম অলির কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিয়ে বললো, তুই একা একা কৃষ্ণনগর যাবি কী করে? এখানে দু’চারদিন থাক, আমি একটু শক্ত হলে আমিও তার সঙ্গে যাবো।

অলি বাচ্চা মেয়েকে সান্ত্বনা দেবার মতন করে বললো, না রে পমপম, তোর এখন যাওয়া চলবে না। তুই গেলে পুলিস ফলো করবে।

–আর তোকে কেন পুলিস ফলো করবে না?

–আমাকে তো কেউ চেনে না।

–হ্যাঁরে অলি, একটা সত্যি কথা বলবি? অতীন বেঁচে আছে? তোরা বলছিস, তাকে নাকি বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার বিশ্বাস হয় না। মানিকদাকে ছেড়ে অতীন বিদেশে পালিয়ে যাবে, আমার কিছুতেই বিশ্বাস হয় না।

–তার নামে যে মার্ডার চার্জ ছিল! সে যেতে চায়নি, তাকে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে থাকলে এতদিনে তাকে…

–কৌশিক আর অতীন কি এক জেলে ছিল?

–কৌশিক এখন আর জেলে নেই, জানিস না? ওরা জেল ভেঙে পালিয়েছে!

ধড়মড় করে পমপম নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করলো, যাঁ, কী বললি? কে জেল ভেঙে পালিয়েছে, অতীন, না কৌশিক? কোন্ জেল? আগে বলিস নি কেন আমাকে?

কথাটা হঠাৎ বলে ফেলে অলি একটু বিব্রত হয়ে পড়লো। সে এরকম ভাবে ঠিক জানাতে চায় নি। পমপম বোধহয় খবরের কাগজও পড়ে না। খবরটা যে ঠিক কী ভাবে পমপমকে জানানো উচিত, তা অলি বুঝতে পারছে না।  

সে বললো, আগে বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম নে, তারপর সব বলবো।

পমপম তীব্র গলায় ধমক দিয়ে বললো, না, এক্ষুনি বল! কৌশিক এখন কোথায়?

কৌশিক যে এখন কোথায়, তা অলি জানে না। দু’দিন আগে একটা সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেছে। দমদম জেলের মধ্যে কারারক্ষী ও নকশালপন্থী বন্দীদের মধ্যে মুখোমুখি একটা সংঘর্ষ, রীতিমত যুদ্ধের মতন। একতরফা ভাবে বিনা বিচারে নকশাল ছেলেদের মেরে ফেলার ঘটনা এটা নয়, সম্ভবত আগে থেকেই এরকম কিছু একটা আভাস পেয়ে নকশাল ছেলেরাও তৈরি হয়েছিল। গোলাগুলি চালিয়েছে দু’পক্ষই, সব শুদ্ধ নিহত হয়েছে পনেরো জন এবং সাতাশ। জন আহত, এর মধ্যে বেশ কয়েকজন কারারক্ষীও আছে। তবে কোন পক্ষে কতজন হতাহত, সে তথ্য জানায়নি সরকার। কিন্তু বত্রিশ জন বন্দী এই সুযোগে পালিয়েছে জেলের পাঁচিলের বাইরে।

দু সপ্তাহ আগে বহরমপুর জেল থেকে কৌশিকদের দলটাকে দমদম জেলে আনা হয়েছিল, সে খবর পেয়েছে অলি। কৌশিক নিশ্চয়ই পলাতকদের মধ্যে আছে। কৌশিক কিছুতেই মরতে পারে না, অলির দৃঢ় বিশ্বাস। যেন অলির প্রবল ইচ্ছাশক্তিতেই কৌশিক বেঁচে থাকবে।

দমদম জেলের ঐ ভয়াবহ খবর জানার পর অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছিল অলি। সেই কান্নার মধ্যেই সে বারবার বলেছিল না, না, কৌশিক কিছুতেই মরেনি, সে বেঁচে আছে, সে বেঁচে আছে!

কৌশিক, পমপম, মানিকদা, তপন এরা সবাই অতীনের জীবনের অঙ্গ। এদের কাছাকাছি এলেই অলি তার বাবলুদার সংস্পর্শ বোধ করে।

পমপমের ঠাকুর্দা এখনও বেঁচে আছেন, তবে চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পান না, কানেও কম শোনেন। পমপমের এক কাকা এখানকার চাষবাস দেখেন। আর রয়েছেন দু’জন বিধবা পিসিমা। কিছুদিন আগে এ বাড়িতে একবার পুলিসের হামলা হয়ে গেছে।

পমপমকে পৌঁছোতে এসে অলি পুরো দুটো দিন রয়ে গেল এখানে। পমপম তাকে ছাড়তে চায় না। অলিও অনুভব করলো, পমপম এখানে একা থাকবে কী করে? এ বাড়ির কারুর সঙ্গে তার আর মানসিক যোগাযোগ নেই; কাকিমা, পিসিমাদের সঙ্গে একটুক্ষণ কথা বলেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শরীর সারাবার জন্য পমপমের এখন বিশ্রাম নেওয়া খুবই দরকার, কিন্তু তার একজন সঙ্গী তো চাই।

অলির পক্ষেও এখানে বেশিদিন থাকার উপায় নেই। তারও যে অনেক কাজ!

মে মাসের সাঙ্ঘাতিক গরমেও খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরের মধ্যে তেমন কষ্ট হয় না। চতুর্দিকে অনেক গাছপালা। দ্বিতীয়দিন বিকেলে বেশ একটা ঝড়ের দাপট দেখা দিল, তার সঙ্গে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি। সারাদিন শুয়েই থাকে পমপম, এই সময় সে অলির হাত ধরে ধরে দাওয়ায় এসে বসলো ঝড় দেখার জন্য। অলি যেন তার নার্স, সকালবেলা পমপমের মুখ ধুইয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে তাকে দুধ খাওয়ানো, জোর করে ভাত খাওয়ানো, সবই অলি করে। অলি এর আগে কোনোদিন এভাবে কারুর সেবা করেনি, কিন্তু এ-সব যেন শিখতে হয় না, প্রয়োজনের সময় মানুষ সবই পারে।

পমপম এক সময় বললো, আমি একটু বৃষ্টিতে ভিজবো! দু-দুটো বছর বৃষ্টি দেখিনি।

এই দুর্বল শরীর নিয়ে পমপমের বৃষ্টি ভেজা উচিত কি না তা বুঝতে পারলো না অলি। কিন্তু দু বছর জেলে-হাসপাতালে কাটিয়ে সত্যিই তো বৃষ্টি দেখেনি পমপম। এ যে এক অপূরণীয়

পমপমকে সে উঠোনে নিয়ে আসতেই অন্য একটা ঘর থেকে একজন পিসিমা চেঁচিয়ে উঠলেন, ওমা, একী অলক্ষুণে কাণ্ড! এই অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজলে মরবি যে। ঘরে যা, ঘরে যা!

পমপম বললো, ওদের কথা শুনিসনি, অলি। চল, আমরা আমবাগানের দিকে যাই। ঝড়ের সময় গাছ থেকে কাঁচা আম খসে পড়ে, কতদিন সেই আম কুড়োইনি রে! চল।

অলির মনে হলো, বৃষ্টি ভিজলে পমপমের যেটুকু শারীরিক ক্ষতি হবার সম্ভাবনা, তার চেয়েও তার এই বাসনা পূর্ণ করার মূল্য অনেক বেশি। পমপম যদি আর না বাঁচে!

আমবাগানে যাওয়া হলো না, তখুনি বাড়ির সামনে একটি জিপ এসে থামলো। প্রথমে সেই জিপ থেকে নামলো দু’জন বলিষ্ঠকায় পুরুষ, এই দু’জনকেই অলি দেখেছিল ট্রেনে আসবার সময়। তারা জিপের দু পাশে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখে নিল, তারপর নামলেন পমপমের বাবা। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, মুখে অন্যমনস্কতার ছাপ।

ঝড় থেমে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে বড় বড় ফোঁটায়, ঠিক বর্ষার বৃষ্টি নয়, এ শুধু ভ্রাম্যমান মেঘের ছিটেফোঁটা দাক্ষিণ্য। তবে উত্তাপ অনেকটা কমে গেছে।

অশোক সেনগুপ্ত তাঁর মেয়ের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বললেন, বৃষ্টি ভিজছিস? শরীরটা এখন একটু ভালো লাগছে বুঝি?

পমপম অলির হাত ছেড়ে দিয়ে নিজেই হেঁটে হেঁটে ফিরে গেল ঘরে।

একটু পরেই সেই ঘরে এলেন অশোক সেনগুপ্ত। পমপমের কপালে হাত দিয়ে তাপ দেখলেন। তারপর অলির দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার ব্যবহারে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি। আমি খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি, তুমি ওদের পার্টির অ্যাকটিভিটির সঙ্গে জড়িত ছিলে না, তোমার কোনো পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট নেই, তবু তুমি আমার মেয়ের জন্য এতটা করেছে, এটা সত্যিই আশ্চর্য ব্যাপার। তোমার ওপর পুলিসের নজর পড়তে পারে।

পমপম বললো, ও আমার বন্ধু।

অশোক সেনগুপ্ত বললেন, তা হতে পারে। কিন্তু বিপদের সময় কত বন্ধুই তো বন্ধুকে ছেড়ে যায়। তোদের স্টাডি সার্কেলে কত ছেলেমেয়েই তো ছিল, কই আর কেউ তো তোর খবর নিতে আসে না!

ঘরে একটিই বড় চৌকি, তার ওপর পাতলা তোষক পাতা বিছানা। আর একটি বেতের চেয়ার। সেই চেয়ারে বসে পড়ে তিনি অলিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সাপটাপের ভয়। নেই? আসবার সময় বুড়োশিবতলায় দেখলুম, ছেলেরা একটা সাপ মেরেছে। খুব সম্ভবত দাঁড়াস সাপ। এই সময়টায় খুব সাপের উপদ্রব হয়। এই ঘরটায়, এক সময় আমি থাকতুম। একদিন রাত্তিরবেলা দেখি আমার মশারির ওপর একটা সাপ, সেটা ছিল খরিস সাপ। তুই তখন। খুব ছোট ছিলি, তোর মনে আছে, পমপম! কত কাণ্ড করে সেটাকে মারা হলো।

পমপম জিজ্ঞেস করলো, বাবা, তুমি কি অলিকে ভয় দেখাতে এসেছো? তুমি অলিকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাও?

অশোক সেনগুপ্ত হাসলেন। তাঁর মুখোনি রেখাবহুল। চোখের নীচে গভীর কালো ছাপ। সচ্ছল পরিবারের সন্তান হলেও সারাজীবন তাঁকে অনেক দুভোর্গ সইতে হয়েছে। ছাত্র বয়েস থেকেই বাড়ির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুব কম, এক সময় কংগ্রেসী ছিলেন, বেয়াল্লিশ সালে জেল খাটার সময়ে মার্ক্সবাদে দীক্ষা নেন। তারপর থেকে অনেকবার কারাবাস, পুলিসের নির্যাতন, অজ্ঞাতবাসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বছরের পর বছর। কিন্তু তাঁর স্বভাবে তিক্ততা নেই, হাসতে পারেন যখন তখন।

হাসতে হাসতে তিনি বললেন, শুধু তোরাই আমাদের ভয় দেখাবি, আমরা কিছু বলতে পারবো না? তোর দলের ছেলেমেয়েরা আমাকে খুন করলে তুই খুশি হবি নাকি রে, পমপম?

পমপম কোনো উত্তর না দিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো।

অশোক সেনগুপ্ত পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু একটা বার করতে করতে বললেন, ফরোয়ার্ড ব্লকের অজিত বিশ্বাস কাল খুন হয়ে গেছেন। তারা শুনিসনি নিশ্চয়ই। যারা হেমন্ত বসুকে খুন করেছিল, এটা নিশ্চয়ই তাদেরই কাণ্ড। হেমন্তবাবুর জায়গায় অজিতবাবু ইলেকশানে। দাঁড়াচ্ছিলেন…এ সব কী পাগলামি হচ্ছে বল তো?

পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে তিনি ভাঁজ খুলে দেখালেন। একটা মাথার খুলি আঁকা লাল কালিতে চিঠি। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, অশোক সেনগুপ্ত, এবার তোমার পালা!

অলির মুখখানা বেদনায় কুঁকড়ে গেল, পমপমের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। অশোক সেনগুপ্ত চিঠিখানা কুচি কুচি করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন, যতসব ছেলেমানুষী! এই সব করে কী লাভ হচ্ছে বল তো? এই অকারণ খুনোখুনি, এর নাম মার্ক্সবাদ? এই শিখেছিস তোরা?

পমপম বললো, ওরকম চিঠি আমাদের দলের কেউ লেখে না!

অশোক সেনগুপ্ত বললেন, তোদের পার্টির নাম লেখা আছে, সেটা তো দেখলি? তা হলেই বুঝে দ্যাখ, একটা স্ট্রং পাটিবেস পর্যন্ত তোরা গড়ে তুলতে পারিসনি, এক একটা ইউনিট যা খুশি। তাই করছে, সেন্ট্রালি কোনো কনট্রোল নেই তাদের ওপর, তার আগেই তোরা বিপ্লবে নেমে পড়েছিস? বিপ্লব কি গাছের ফল? এক একটা দেশে মার্ক্সবাদের প্রয়োগ এক একরকম হবে। হতে বাধ্য। যে সব দেশে গণতন্ত্রের একটা কাঠামো অন্তত আছে, সেখানে বিপ্লব করা এত সহজ! সেখানে গণতান্ত্রিক পথেই আগে ক্ষমতা দখল করতে হয়, আমরা সেই পথেই এগোচ্ছি, তোরা সেটা বানচাল করে দিতে চাস, তার মানে তোরা যে প্রতিক্রিয়াশীলদেরই সাহায্য করছিস, তা তোরা বুঝতে পারিস না?

পমপম বললো, ক্ষমতা দখলের নামে তোমাদের ক্ষমতার মোহ পেয়ে বসেছে। পার্লামেন্ট-অ্যাসেম্বলিতে যাওয়াই এখন তোমাদের জীবনের চরম সার্থকতা, এখন কেউ বিপ্লবের কথা বললেই তোমরা ভয় পেয়ে যাও!।

–এসব তোদের মুখস্থ করা বুলি, পমপম। একজন দু’জনের মধ্যে ক্ষমতার মোহ এসে যেতে পারে, কেউ কেউ দুর্বল হয়ে যায়, তবু আমরা পার্টি থেকে ওয়াচ রাখি। কিন্তু দিন দিন আমাদের শক্তি বাড়ছে। অজয় মুখার্জির এই পাপেট সরকারের আয়ু কতদিন! এই সময়ে মার্ক্সবাদীদের মধ্যেই আত্মকলহ যে কত ক্ষতিকর…আমাদের কাছে রিপোর্ট আছে, তোদের দলের দু’একজন চীনে পৌঁছে গিয়েছিল, সেখানে তো চৌ-এন লাইয়ের কাছে ওরা ধমক খেয়েছে। মাও সে তুং নাকি বলেছেন, কলকাতার দেওয়ালে চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান লিখতে কে বলেছে তোমাদের? আমি মোটেই তোমাদের চেয়ারম্যান নই! জানতুম, উনি এই রকম কথাই বলবেন!

–বাবা, এটা কি তোমাদের পার্টির রিপোর্ট, না সি আই এর রিপোর্ট?

–পমপম, তুই এতদিন জেলে ছিলি, জানিস না এর মধ্যে কত কী ঘটে গেছে। চারুবাবু অতি বিপ্লবীপনার থিয়োরি দিয়ে এতগুলো ভালো ভালো ছেলে-মেয়েকে কোথায় ঠেলে দিলেন? এখন তারা হয় মারছে অথবা মরছে। অথচ এ দুটোর কোনোটারই দরকার ছিল না। এই সময় এই হাজার হাজার ডেডিকেটেড ছেলে-মেয়েদের যদি আমাদের সঙ্গে পেতাম, চারুবাবু যদি আমাদের লাইনটা অ্যাকসেপট করতেন, তা হলে আমরা এতদিন কংগ্রেসকে কোথায় ঠেলে দিতুম!

–বিপ্লবের পথ ছাড়া আমরা কোনো পথই স্বীকার করি না। একবার যখন শুরু হয়ে গেছে।

-–তোরা যা শুরু করেছিলি, তা শেষ হতে আর দেরি নেই। এটা বিপ্লব, না রোমান্টিক অ্যাভভেঞ্চার? ইস্ট পাকিস্তানে যেরকম গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেছে, এখন সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট ওয়েস্ট বেঙ্গলে কোনোরকম বিশৃঙ্খলার প্রশ্রয় দেবে না। আমরা খবর পেয়েছি, শিগগিরই অজয় মুখার্জিকে সরিয়ে এখানে প্রেসিডেন্ট রুল হবে, তারপর আর্মি নামিয়ে দেবে। ডেবরা-গোপীবল্লভপুরে আমি মার্চ করাবে, ইস, আরও কত ছেলে-মেয়ে যে মরবে! দ্যাখ পমপম, মানিককে আমি কত ভালোবাসতুম একসময়, ছোটবেলা থেকে তাকে দেখছি, সেই মানিক তোদের ক্ষ্যাপালো-পাটির অনেকে আমাকে দোষ দেয়, আমি নিজের মেয়েকে কেন বোঝাতে পারিনি… মানিকের খবরটা শুনে আমি চোখের জল সামলাতে পারিনি, যতই মিসগাইডেড হোক, একসময় সে ছিল খুবই সিনসিয়ার ওয়ার্কার।

পমপম ঝট করে একবার অলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, মানিকদা?

অলি কিছু বলতে পারলো না, মাথা নীচু করলো। অশোক সেনগুপ্ত ভুরু তুলে বললেন, মানিক মারা গেছে সে খবর পাসনি তোরা? সে তো বেশ কয়েক মাস আগে।

পমপম হঠাৎ এই খবর জেনেও কোনো আবেগ দেখালো না। বাবার সামনে সে কিছুতেই মচকাবে না। সে তাকিয়ে রইলো জানলার দিকে।

অশোক সেনগুপ্ত বললেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে চারুবাবুও আর কতদিন পালিয়ে থাকতে পারবেন? তোদের পার্টি তছনছ হয়ে যেতে আর দেরি নেই। একটা আন্ডার গ্রাউন্ড পার্টি চালাতে গেলে যে কত নিখুঁত সংগঠনের দরকার হয়, তার কোন অভিজ্ঞতাই তোদর নেই। যেখানে সেখানে ইস্কুল বাড়ি পোড়ানো আর কনস্টেবল খুন, এই ধরনের আলট্রা লেফটিইজমের। প্রতিক্রিয়া কী হবে জানিস? চরম রাইট রিঅ্যাকশনারিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। তোরা যাকে তাকে খুন করছিস, এবার তারাও এলোপাথারি খুন চালাবে। পুলিসকে ক্ষেপিয়েছিস, তারাও এখন কনফনট্রেশানের নামে মাঠের মধ্যে বন্দীদের ছেড়ে দিয়ে গুলি করে মারছে। ছি ছি ছি ছি, ইতিহাস থেকে তোরা কোনো শিক্ষাই নিতে পারিসনি!

পমপম বললো, বাবা, তুমি কি কলকাতা থেকে আজ এখানে এলে আমাকে এইসব কথা বলার জন্য?

–আমার কথা তুই শুনবি না, মানতে চাইবি না, এই তো? আমি এসেছি, কাল সকালে বর্ধমান টাউনে আমার একটা মিটিং আছে, রাত্তিরটা এখানে থেকে যাবো। আমার ওপর তোর এত রাগ কেন রে, পমপম?

–আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি একটু ঘুমোই?

–হ্যাঁ ঘুমো, বৃষ্টি ভিজেছিস, মাথাটা একটু মুছে নে। আমি এখানে আরও এলাম, তোর বন্ধু অলিকে একটা খবর দিতে।

তিনি অলির দিকে মুখ তুলে বললেন, তোমার বাবা বিমানবিহারীবাবু আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তুমি তো আমেরিকা যাচ্ছো? গতকাল তোমার ভিসা পাওয়া গেছে, তোমার বাবা বললেন, তোমার খুব তাড়াতাড়ি কলকাতায় ফিরে যাওয়া দরকার।

পমপম আবার বড় বড় চোখ মেলে তাকালো অলির দিকে। অলির মুখখানা লজ্জায় একেবারে নীল হয়ে গেছে। এই কথাটাও সে পমপমকে ঘুণাক্ষরে জানায়নি। পমপমের বাবা কি আড়ালে এই খবরটা দিতে পারতেন না।

পমপম বালিসে মাথা দিয়ে দেয়ালের দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। অশোক সেনগুপ্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি আর দেরি করো না, অলি, কালই কলকাতায় ফিরে যাও। পুলিস। তোমার পেছনে লাগলে পাসপোর্ট ইমপাউন্ড করে নিতে পারে। তুমি চলে গেলে, পমপম এখানে একা থাকবে? পমপম, তুই ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে থেকে আয় না কিছুদিন। তোর মাসি মেসো অনেক যত্ন করবে, ওখানকার ওয়েদারও ভালো।

পমপম অস্ফুট স্বরে বললো, না, আমি এখানেই থাকতে পারবো!

অশোক সেনগুপ্ত কাছে এসে পমপমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায়, বললেন তোর দলের ছেলেরা যদি হঠাৎ আমায় খুন করে, তাতে তুই খুশি হবি কিনা, সে কথা তো বললি না খুকী?

এতক্ষণ বাদে পমপম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। অশোক সেনগুপ্ত মেয়ের মাথায় হাত বুলোতে লাগলেন। তারপর আঙুল দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, না রে, তুই ওসব কিছু ভাবিস না। আমার কিছু হবে না!

তিনি চলে যাবার পর অলি পমপমের গায়ে হাত রাখতেই সে একেবারে জোরে জোরে কেঁদে উঠলো। সেই কান্নার সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগলো, মানিকদা! মানিকদা!

একটু পরে সে ধড়ফড় করে উঠে বসে অলির হাত জড়িয়ে ধরে রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলো, তুই কেন আমাকে মানিকদার খবর দিসনি? ভেবেছিলি আমি দুর্বল? সহ্য করতে পারবো না? আর কে কে মারা গেছেন, তুই বল! খবর্দার, মিথ্যে কথা বলবি না! অতীন, তপন, কৌশিক, সরোজ দত্ত, সুশীতল রায়চৌধুরী, জয়শ্রী, সন্তোষ, বল বল, সত্যি করে বল!

অলিও কাঁদছে। সে অসহায়ের মতন বললো, আমি সকলের খবর জানি না রে! সত্যি জানি না!

–তুই মানিকদার খবর তো আগে জানতিস?

–হ্যাঁ, তা জানতুম। আমার মামা ডাক্তার, তাঁর কাছ থেকে শুনেছি।

–কে মেরেছে মানিকদাকে? সি পি এম? কংগ্রেস?

–না, পুলিস। আমার মামাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল চিকিৎসার জন্য, কিন্তু মামা পৌঁছোবার আগেই…

–তুই আমার সঙ্গে সব সময় সেঁটে আছিস, তার মানে অতীন নেই, তাই না?

–না, না, বাবলুদা বিদেশে গেছে। পালিয়ে বেঁচে গেছে।

–আর কৌশিক?

–কৌশিকের খবর জানি না, তোকে সত্যি কথা বলছি, কোনো খারাপ খবর পাইনি। তারপর দু’জনে হাত ধরাধরি করে মানিকদার নাম করে কাঁদলো অনেকক্ষণ।

পরদিনও অলির কলকাতায় ফেরা হলো না। অশোক সেনগুপ্ত তাঁর মিটিং সেরে ফেরার পথে তাঁর জিপেই অলিকে কলকাতায় নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, অলি রাজি হয়নি। পমপম এমনই ভেঙে পড়েছে, যে তাকে ফেলে যাওয়া অলির পক্ষে অসম্ভব।

সেদিন রাত্তিরবেলা এসে উপস্থিত হলো সমীরণ আর ভানু নামে দুটি ছেলে। তখন রাত। প্রায় দুটো, বাইরে কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে খুব জোরে, সেই শব্দেই অলির ঘুম ভেঙে গেল, তারপর সে শুনলো জানলায় তিনটে টোকার শব্দ। পমপমের পাতলা ঘুম, সেও জেগে উঠেছে, সে মন দিয়ে সেই টোকার শব্দ একটুক্ষণ শুনেই বললো, অলি, দরজা খুলে দে, দরজা খুলে দে, আমাদের দলের ছেলে!

অলি শিউড়ে উঠলো। অশোক সেনগুপ্ত স্পষ্ট বলে গিয়েছিলেন, এ বাড়িতে পমপমের। দলের ছেলেদের আশ্রয় দেওয়া যাবে না। তাঁর লোক কি এ বাড়ির ওপর নজর রাখছে না? এক্ষুনি যদি মারামারি শুরু হয়ে যায়!

তবু তাকে দরজা খুলতেই হলো। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদুটি ভেতরে এসে নিজেরাই দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাতে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালো। একজনের হাতে রিভলভার, অন্যজনের হাতে পাইপ গান। এ ছেলে দুটিকে অলি চেনে না।

সমীরণ বললো, উঃ, আর একটু হলে কুকুরগুলোকেই গুলি করতে হতো। কতক্ষণ ধরে জানলায় ঠকঠক করছি, তোদের ঘুমই ভাঙে না!

পমপম বললো, তোরা কোথা থেকে এলি, সমীরণ? এই গ্রামটা তোদের পক্ষে একদম সেফ নয়!

ভানু বললো, আমরা এক্ষুনি চলে যাবো। পমপম, আমাদের কিছু টাকা লাগবে। কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারবি?

পমপম বললো, বোস আগে, কোথা থেকে এসেছিস, কী ব্যাপার সব বল।

দরজায় হুড়কো দিয়ে ওরা দু’জনে বিছানার কাছে এসে বললো, বেশি দেরি করা যাবে না। হাতে একদম পয়সা নেই, খেতে পাচ্ছি না, ওষুধ কিনতে হবে। তুই কেমন আছিস পমপম? আজই বিকেলে খবর পেলুম যে তুই কলকাতা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিস। আমরা কয়েকজন কাছাকাছিই আছি, জঙ্গলমহলে। কিছু টাকা জোগাড় করে দিতে পারবি না?

পমপম বললো, হাতে তো বিশেষ কিছু নেই। অলি, তোর কাছে কত আছে?

অলি বললো, একশো টাকার মতন।

ভানু বললো, ওতে কিছু হবে না, আমরা সাতজন আছি একসঙ্গে, অন্তত হাজারখানেক টাকা যদি এখন দিতে পারিস!

সমীরণ অলির দিকে তাকিয়ে বললো, কৌশিকের পায়ে গুলি লেগেছে। জেল থেকে পালাবার সময়, গুলিটা ঢুকে বসে আছে, অপারেশন করাতে না পারলে

এই অবস্থাতেও অলির বুক থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো। এ যেন তার ইচ্ছাশক্তিরই জয়। কৌশিক বেঁচে আছে!

খানিকক্ষণ ওদের কাহিনী শোনার পর পমপম বললো, গ্রামের বাড়িতে তো টাকা পয়সা বিশেষ থাকে না। অলির কাছে আর আমার কাছে যা আছে, সব মিলিয়ে বড়জোর শ দেড়েক। আর একটা কাজ করা যায়, আমি তোদর কিছু জিনিস দিতে পারি, তা বিক্রি করলে অন্তত সাত-আটশো টাকা পাবি।

সমীরণ জিজ্ঞেস করলো, কী জিনিস? গয়না-টয়না বিক্রি করতে গেলেই ধরা পড়ে যাবো!

পমপম বললো, গয়না না। এ জিনিস খুব সহজে বিক্রি করা যায়, যে-কোনো মুদির দোকানে। তোরা একটু বোস, নিয়ে আসছি। আয় তো অলি

মিশমিশ করছে অন্ধকার রাত। সারা বাড়ি ঘুমন্ত। কোথা থেকে যেন গায়ে জোর পেয়ে গেছে পমপম, সে অন্ধকারের মধ্যেই বেশ জোরে জোরে হেঁটে উঠোনটা পেরিয়ে গেল। উল্টো দিকের একখানা ঘরে ওর ঠাকুর্দা থাকেন। দাওয়ায় ঘুমোয় বাড়ির একজন মুনিষ। ঠাকুর্দার কখন কী প্রয়োজন হয়, সেই জন্য দরজাটা খোলাই থাকে। সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ঘুমন্ত লোকটির পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকে খাটের নীচে বসে পড়লো ওরা দু’জন। পমপম হাত বাড়িয়ে কয়েকটা কাপড়ের পোঁটলা টেনে বার করলো। সব মিলিয়ে চারটে। পোঁটলাগুলো বেশ ভারি।

সেগুলো নিয়ে আবার খুব সাবধানে ওরা নেমে এলো উঠোনে। অলি এখনও বুঝতে পারছে এই পোঁটলার মধ্যে কী আছে।

পমপম বললো, এগুলো সুপুরি। আমাদের বাগানের। সুপুরির খুব দাম, এগুলো বিক্রি করলে অনেক টাকা হবে।

সুপুরির কত দাম হতে পারে, সে বিষয়ে অলির কোনো ধারণাই নেই। তার খুব আফসোস হচ্ছে, সে কেন সঙ্গে বেশি টাকা আনেনি। বাবার কাছ থেকে সে প্রতিমাসে তিনশো টাকা হাত খরচ পায়।

উঠোনের মাঝখানে হঠাৎ নেমে গিয়ে ভয় পাওয়া গলায় পমপম বললো, কৌশিকের পায়ে গুলি লেগেছে ওরা বললো, পায়ে না লেগে পেটে কিংবা বুকে গুলি লেগে থাকে যদি? তা ওরা। কিছুতেই স্বীকার করবে না! অলি, কৌশিককে বাঁচাতেই হবে! আমি ওদের সঙ্গে যাবো, আমি কৌশিককে নিজের চোখে দেখতে চাই।

অলি বললো, তুই কী করে যাবি? ওরা বললো, জঙ্গলমহলে, পায়ে হেঁটে যেতে হবে অনেকখানি, তুই পারবি না, পমপম। বরং আমি যাই। যদি সেখানে কোনো কাজে লাগতে পারি…।

পমপম বললো, তুই যাবি? তার যে কলকাতায় ফেরা দরকার, তুই বিদেশে যাবি, না রে, অলি, তোর ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি ওদের বলছি, ওরা আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যাবে।

অলি জোর দিয়ে বললো, তুই গেলে, তুই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে, আবার তোক নিয়েই বিপদে পড়ে যাবে ওরা। তার বদলে আমি যাবো। আমি কৌশিককে দেখে আসবো।

সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দ্বিধা করলো না অলি। কৌশিক তার বাবলুদার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কৌশিক আহত হয়েছে শুনলে বাবলুদা কি এক্ষুনি ছুটে যেত না? বাবলুদা নেই, তাকেই যেতে হয়।

১৯. জাহানারা ইমাম খেতে বসেছেন

দুপুরবেলা জাহানারা ইমাম খেতে বসেছেন, এমন সময় বেজে উঠলো কলিংবেল। একটানা বেজেই চললো, কেউ সুইচে আঙুল টিপে রেখেছে। অসময়ে এরকম বেল শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে, তার ওপর, যে-এসেছে সে যেন বিশেষ কোনো ক্ষমতা দেখাতে এসেছে। জাহানারা তবু বাড়ির কাজের লোকটিকে বললেন, দ্যাখ তো কোন বেয়াদপ এমনভাবে বেল বাজায়?

দরজা খোলার পর যে ভেতরে এলো, সকাল থেকে তার কথাই শুধু ভাবছিলেন জাহানারা, খেতে বসেও তার কথা মনে করে খাবার গিলতে পারছিলেন না, অথচ এখন তাকে চোখের সামনে দেখেও বিশ্বাস করতে পারলেন না। প্রায় ভয় পাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠলেন, রুমী তুই?

সারা মুখে ঝলমলে হাসি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা এমনভাবে নামিয়ে রাখলো রুমী, যেন সে অন্য যে-কোনো দিনের মতই কলেজ থেকে ফিরছে। যদিও মাথার চুল উস্কো খুস্কো, চোখ দুটো কোটরে ঢোকা, গায়ের জামাটা তিন চারকার ঘামে ভিজেছে ও শুকিয়েছে। সে বললো, আম্মা, খিদে পেয়েছে, খেতে দাও!

টেবিলে বসে পড়ে সে মায়ের দিকে চোখের ইঙ্গিত করলো। অর্থাৎ এখন কোনো কথা জিজ্ঞেস করা চলবে না।

ডাল, ভাত, মাছের পাত্রগুলো টেবিলের ওপরেই রয়েছে, কাজের লোকটি এনে দিল একটি প্লেট, তারপর দাঁড়িয়ে রইলো কাছেই। আগে রুমী বাইরে থেকে এসে খেতে বসলেই মা বলতেন, এই হাত ধুলি না? যা, আগে হাত ধুয়ে আয়! আজ তাঁর মুখে কোনো কথা নেই। রুমী প্লেটে ভাত তুলে মাছের ঝোল দিয়ে মেখে তিন চার গেরাস খেয়ে নিল বুভুক্ষুর মতন। তারপর মায়ের দিকে তাকালো। ঠিক পটে আঁকা ছবির মতন জাহানারা খাওয়া বন্ধ করে, ছেলের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে বসে আছেন। তাঁর বুকের মধ্যে যত আনন্দ, মুখে ততখানি ভয়ের ছাপ।

রুমী কাজের লোকটিকে বললো, বারেক, রান্নাঘর থেকে দুটো শুকনো মরিচ পুড়িয়ে আনতে। কোনো রান্নায় তো ঝাল দিসনি! দেখবি বেশী পুড়ে না যায় যেন পাবধানে অল্প আঁচে সেকবি আস্তে আস্তে, বুঝলি?

সে চলে যেতেই রুমী মাকে ছদ্ম ধমকের সুরে বললো, এক্ষুনি সব না শুনলে তো তোমার পেটে ভাত হজম হবে না, তাই না? এখন শুধু এইটুকু শুনে রাখো, আমাদের যে রাস্তা দিয়ে যাবার কথা হয়েছিল, সেখানে ঘাপলা হয়েছে। আর একটু হলে আর্মির হাতে ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম। তাই আপাতত ফিরে আসতে হলো!

তারপর সে মন দিয়ে খেয়ে যেতে লাগলো। ভাত শেষ করার পর চুমুক দিয়ে শুধু ডাল খেলো অনেকখানি। বারেককে বললো, ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানি বার করে দে! উঃ, এবার যেন বেশী বেশী গরম পড়েছে!

আঁচাবার পর সে সেদিনকার খবরের কাগজ দু’খানা বগলে নিয়ে শিস দিতে দিতে ওপরে উঠে গেল!

জাহানারা প্রথমেই ভেতরের ঘরে গিয়ে স্বামীর অফিসে ফোন করে জানিয়ে দিলেন খবরটা। তারপর আপাতত শান্ত ভাব বজায় রেখে খাবার-দাবারগুলো গুছোলেন, বারেককে ছুটি দিলেন দুপুরের জন্য। তারপর দৌড়ে দোতলায় উঠে এসে রুমীর ঘরের দরজা বন্ধ করে, হেসে কেঁদে রুমীকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, এবার বল রুমী, কী হলো সব খুলে বল!

ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাবার জন্য যত না দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, তার চেয়েও তাঁর নিজেরই একটি কথা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল সর্বক্ষণ। রুমী যাবার দু’দিন আগে তিনি ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছিলেন, যা, তোকে দেশের জন্য কোরবাণী করে দিলাম!

মায়ের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রুমী বললো, বসো আম্মা, শান্ত হয়ে বসো! সব বলছি। প্রথমে তো আমরা সদরঘাট থেকে বুড়িগঙ্গা পার হলাম।

জাহানারা জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মানে কে কে? তোরা কয়জন ছিলি?

রুমী ভ্রূকুটি করে বললো, এই তো! তোমার বেশী বেশী কৌতূহল! তোমায় আগেই একদিন বলেছি না, অন্যদের নাম ধাম জানতে চাইবে না?

মা যেন বয়েসে অনেক ছোট, এইভাবে বকছে রুমী। মাত্র কিছুদিন আগেই যে ছিল সদ্য যৌবনে ওঠা একটি টগবগে ছেলে, তার মুখে এবমধ্যেই একটা অভিজ্ঞতার ছাপ পড়ে গেছে, তার হাসির আড়ালেও উঁকি মারে একটা গাম্ভীর্য!

কামাল লোহানী, প্রতাপ হাজরা, মনিরুল আর ইশরাক নামে দু’জন ছাত্র নেতা, একজন আহত হাবিলদার ও কয়েকটি হিন্দু পরিবার মিলে রওনা দিয়েছিল সীমান্তের দিকে। বুড়িগঙ্গা পার হবার পর সাত-আট মাইল হাঁটা পথ, সেই সময়ে আবার প্রবল ঝড় বৃষ্টি, হাবিলদারটির হাঁটার ক্ষমতা ছিল না, রুমী আর একজন কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাকে। জল-কাদার মধ্য দিয়ে ওরা সেই অতখানি রাস্তা হেঁটে পৌঁছোয় ধলেশ্বরীর পারে। হাবিলদারটিকে কাছাকাছি একটা গ্রামে লুকিয়ে রেখে ওরা ধলেশ্বরী পার হয়ে এলো সৈয়দপুরে। সেখান থেকে আরও আট মাইল দূরে শ্রীনগর। আগেই খবর পাওয়া গেছে যে শ্রীনগর থানা-অঞ্চল এখন মুক্তিবাহিনীর অধীনে। সেখানে অপেক্ষা করছে সিরাজুল আর কয়েকজন, তারা রুমীদের ত্রিপুরা বড়ারে পৌঁছে দেবে, এইরকমই ঠিক হয়ে আছে।

স্পীড বোটে পুরো দলটা সন্ধের অন্ধকারে পৌঁছোলো শ্রীনগর। রাতটা কাটানো হলো। কাছেই নাগরভাঙা গ্রামে ডাক্তার সুকুমার বর্ধনের বাড়িতে। কিন্তু পরদিন রওনা হওয়া গেল না, এরমধ্যেই ধলেশ্বরী পার হয়ে সৈদপুরে এসে গেছে আর্মি। তারা এগোচ্ছে বিক্রমপুরের দিকে। পুরো অঞ্চলটা তারা ঘিরে ফেলে বহিরাগতদের বেছে বেছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যারা ধরা পড়ছে, তারা কেউ আর ফিরে আসে না।

তখন একমাত্র উপায় কুমিল্লার শ্রীরামপুরের দিক দিয়ে বর্ডার ক্রশ করা। কয়েকটা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ওরা যাত্রা করলো এক ভোর রাতে। তাও বেশী দূর যাওয়া গেল না, এর মধ্যে শ্রীরামপুরেও এসে গেছে পাকিস্তানী বাহিনী। এখন আর সামনে যাওয়া যাবে না, পেছন দিকে সৈদপুরেও ফেরা যাবে না।

বিবরণ থামিয়ে ফিক করে হেসে রুমী বললো, এরপর আমরা কয়েকজন কী করে ঢাকা এসে পৌঁছোলাম, তা আর জানতে চেও না আম্মা! কোনোরকমে, অনেক ঘুর পথে, এক একবার গুলি খেতে খেতেও বেঁচে গিয়ে শেষ পর্যন্ত এসেছি। তবে সবাই আসতে পারেনি। ঝড়ের সময় একটা নৌকা ডুবে গেল, তাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের থামার উপায় ছিল না, আর একটা ছোট দলও সম্ভবত আর্মির হাতে ধরা পড়েছে। তাদের কী হয়েছে জানি না। আমি ঐ দলে থাকতে পারতাম!

প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে শুনতে জাহানারা বললেন, তুই গুলি খেতে খেতে বেঁচে গেছিস? যারা ধরা পড়েছে, তুইও তাদের মধ্যে থাকতে পারতি?

অম্লান মুখে রুমী বললো, হ্যাঁ। বাই চান্স আমি অন্য নৌকায় ছিলাম!

জাহানারা ছেলের পিঠে হাত দিয়ে দেখলেন! এই কি তাঁর সেই রুমী না অন্য কেউ? দু’একদিন আগে যে মৃত্যুর মুখোমুখি গিয়েছিল, সে একটু আগে খাওয়া দাওয়ার পর শিস দিয়ে গান গাইছিল!

রুমী বললো, আম্মা, সাহস দেখলাম বটে সিরাজুলের! গুলি-গোলা কিছু মানে না। এর মধ্যে সে সাতজন খান সেনাকে খতম করেছে নিজের হাতে। আমাদের সাথে সে এলো না, যে দলটা ফিরতে পারে নাই, তাদের খোঁজে সে ফিরে গেল সৈদপুরে। একেবারে সিংহের গুহায়। যাকে বলে।

বার বার শুনেও আশ মেটে না জাহানারার, তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরও জানতে চান। এক সময় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে রুমী, তা হলে তোকে তো এখন আর যেতে হবে না? ঢাকাতেই থাকবি?

রুমী উষ্ণ গলায় বললো, যেতে হবে না মানে? দেশের জন্য যুদ্ধে যোগ দিয়ে যারা ডেজার্ট করে, তাদের দোজখেও স্থান হয় না, জানো না? আমি খালেদ মশারফের আন্ডারে সেক্টর টু-তে। যোগ দেবো, এই ঠিক হয়ে আছে।

জাহানারা মিন মিন করে বললেন, না, তুই যে বললি যাবার রাস্তা সব বন্ধ করে দিয়েছে!

রুমী বললো, রাস্তা নেই অন্য রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে। তা ছাড়া কতদিন ওরা দখল করে রাখবে? ঐ দিক থেকে আমাদের বাহিনী এসে শুতে দেবে না? দু’একদিনের মধ্যেই আমার কাছে খবর আসবে, চলে যেতে হবে সঙ্গে সঙ্গে। আমি কি আরাম করার জন্য ঢাকায়। ফিরে এসেছি? তা ছাড়া শুনে রাখো, হানাদার বাহিনী ঢাকায় কোনো ইয়াং ছেলেকে বাইরে রাখবে না। যুদ্ধে যোগ দাও বা না দাও, একই কথা। বাঙালী হওয়াটাই এখন অপরাধ। কিছু ছেলে এখন আর্মির সাথে হাত মেলাচ্ছে, তারা আর বাঙালী না, তারা রাজাকার! তুমি কি আমাকে রাজাকার হতে বলো?

হঠাৎ থেমে গেল রুমী। মাকে বেশী বেশী বকুনি দেওয়া হয়ে যাচ্ছে ভেবে সে মায়ের কোলে মাথাটা রেখে বললো, আমি জানি, তুমি কখনো আমার কোনো ইচ্ছায় বাধা দেবে না। আমার আম্মা পৃথিবীর বেস্ট আম্মা! আমার কথা তো শুনলে, এবার তোমাদের কথা বলো। তো! কার কী খবর? মোতাহার চাচার খবর কী? মীরপুরের বিহারীরা নাকি রাস্তায় বাস-কোচ থামিয়ে বাঙালী যাত্রীদের খুন করছে?

জাহানারা বললেন, তোদের প্রফেসর বাবুল চৌধুরীর খবর শুনেছিস? তাকে ওরা গুলি। করে গেছে। সে বোধ হয় আর বাঁচবে না।

চোখ বুজিয়ে ফেলেছিল রুমী, চোখ না খুলেই বললো, বাবুল চৌধুরীকে মেরেছে? বেশ করেছে! আমাদেরই কোনো দল ওকে মেরেছে। দেশদ্রোহীদের চরম শাস্তি দেবার একটা প্ল্যান নিয়েছি আমরা। উনি আমাদের কাছে কত বড় বড় কথা বলতেন, অথচ নিজে সাপোর্ট করলেন এই ইয়াহিয়া রেজিমকে। আর্মির সঙ্গে দহরম-মহরম?

জাহানারা বললেন, কিন্তু আর্মির লোকই তো ওকে গুলি করেছে?

বড় বড় করে চোখ মেলে, ধড়ফড় করে উঠে বসে রুমী জিজ্ঞেস করলো, কী বললে? আর্মি। ওকে মেরেছে, তুমি ঠিক জানো?

–এক পাড়ার মধ্যে, জানবো না কেন? সিরাজুলের খোঁজে আর্মি এসেছিল ঐ বাড়ি সার্চ করতে, তারপর ওরা মনিরাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, বাবুল চৌধুরী উপর থেকে নেমে এসে তাকে আটকাতে যেতেই…।

–মনিরাকে ধরে নিয়ে গেছে? কোথায় নিয়ে গেছে, জানো?

–কি কেউ বলতে পারে? আমি সেদিন বাসাতেই ছিলাম, মনিরাকে ওরা টানতে টানতে এনে গাড়িতে উঠালো, মেয়েটার কী বুক ফাটা চিৎকার, কিন্তু কেউ বাধা দিতে পারলো না। ঐ যমের দূত আর্মিগুলোর সামনে কে যাবে বল!

–ইস, আম্মা, এখন সিরাজুলের কী হবে? ঢাকায় আমাদের যে কন্টাক্ট আছে, তাদের বলা হয়েছিল মনিরাকে কোনো নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে। আমি তো জানি মনিরা এর মধ্যে চলে গেছে!

–যাদের ওপর ভার ছিল, তারা দেরি করে ফেলেছে রে। আর কি মেয়েটাকে পাওয়া যাবে? অমন সরল, ভালো মেয়ে, ওরে রুমী, ভাবলেই আমার বুকটা মোচড়ায়। হায় আল্লা, যারা নিদোষ, যারা সৎ তাদের তুমি এমনভাবে শেষ হয়ে যেতে দেবে!

–আমি ভাবছি, সিরাজুলটা পাগল হয়ে না যায়। এর মধ্যে দু’বার সে সাঙ্ঘাতিক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে মনিরাকে দেখতে এসেছিল। আমার বন্ধুরা ওকে জরু কা গোলাম বলে ক্ষ্যাপায়! নিয়তির কী আয়রনি দ্যাখো, আম্মা, বাবুল চৌধুরী এই ফ্যাসিস্ট রেজিমের সাথে গলাগলি করতে গিয়েছিল, টিক্কা খানের সাথেও নাকি তার ভাব, সেই টিক্কা খানের সৈন্যই তাকে শেষ করে দিয়ে গেল! ন্যাপের ভাসানী সাহেবও কলকাতায় গিয়ে চীনের কাছে আবেদন পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশকে সাপোর্ট করার জন্য, আমাদের কলেজে যে সব প্ৰােচাইনীজ নেতা ছিল সবাই মুক্তি যুদ্ধে জয়েন করেছে, শুধু বাবুল চৌধুরী আর দুই চারজন মোটে হার্ড কোর আলট্রা লেফট পুথিগত বিদ্যা নিয়ে এই আন্দোলনে যোগ দেয়নি। বাবুল চৌধুরীর মতন তারা সবাই একে একে শেষ হয়ে যাবে!

জাহানারা বেগম একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন, ছেলের শেষ কথাটি শুনে চমকে উঠে বললেন, ওরে বাবুল এখন মারা যায় নাই, তবে আয়ু আর কতটুক আছে কে জানে।

রুমী বিদ্রূপের সুরে বললো, এখনো মারা যায় নাই?

–অমন করে বলে না, রুমী! তোর শিক্ষক ছিলেন না এক সময়? তাঁর জন্য দোয়া কর। সেদিন কী হলো জানিস? আর্মির লোক তো ওকে গুলি করে ফেলে চলে গেল। ঐ বাসায় সেফু বলে ছোট একটা মেয়ে কাজ করে, মিলিটারি তারে দেখতে পায় নাই, সে রাস্তায় এসে চিৎকার করতে লাগলো, আমার সাহেবরে গুলি করছে, আমার সাহেবরে বাঁচান…। কিন্তু কেউ ভয়ে দরজা খোলে না। একটু পরেই আবার কারফিউ ডিক্লেয়ার হয়ে গেল, কে যাবে? কিন্তু। সেই মেয়েটার আর্তনাদ সহ্য করা যায় না। যেন তার নিজের বাপ মরতে বসেছে। শেষ পর্যন্ত তোর বাবা বললো, আমি একবার দেখে আসি, যা হয় হোক। আমিও গেলাম তার সাথে। গিয়ে দেখি সিঁড়ির শেষ ধাপে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে বাবুল, চতুর্দিকে রক্ত আর রক্ত, কিন্তু তখনও তার বুকটা ধুকপুক করছে। ঐ অবস্থায় ফেলে আসা যায়? ওদের চিনি কতদিন ধরে! কারফিউয়ের মধ্যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহস হলো না। আমাদের গাড়িতে তুলে ওকে নিয়ে গেলাম ডাঃ আজিজের পলি ক্লিনিকে।

–সেখানেই আছে এখনও?

–সব দায়িত্ব পড়ে গেছে আমাদের ওপর। বাবুলের বাপ মা আছেন টাঙ্গাইলে, তাদের খবর দেবার উপায় নাই। টেলিফোন পাওয়া যায় না। ওর বড় ভাই আলতাফ কোথায় জানি উধাও হয়ে গেছে। বাবুলের বউও তো ইন্ডিয়ায় চলে গেছে শুনেছি। শেষ পর্যন্ত যদি কিছু একটা হয়ে যায়, ওর নিকটজন কেউ জানতেই পারবে না!

একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লো রুমী।

বিকেলবেলা সে কোথায় যেন বেরিয়ে গেল, বলে গেল রাত্তিরে নাও ফিরতে পারে! শরীফ আর জামীর সঙ্গে অল্প একটুক্ষণের জন্য দেখা হলো তার, কিন্তু বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে রুমীর গল্প করার সময় নেই। সে যে কোথায় যাচ্ছে, তা জিজ্ঞেস করা চলবে না।

জামীকে বাসায় রেখে এক সময় শরীফ আর জাহানারা গেলেন বাবুল চৌধুরীর খবর নিতে। আজ সন্ধেবেলা কারফিউ নেই, শুরু হবে রাত বারোটায়।

কাছেই মেইন রোডের ওপর ডঃ আজিজের পলি ক্লিনিক কাম নার্সিং হোম। পাশাপাশি দু’খানা বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছে, একটার দোতলায় স্বামী-স্ত্রীর কোয়াটার। আজিজের স্ত্রী সুলতানাও ডাক্তার। এই দুর্দিনে এরা দু’জনে গোপনে অনেকের চিকিৎসা করে যাচ্ছেন। টাকা পয়সার কথা চিন্তা করেন না। আজিজ একটু গম্ভীর প্রকৃতির হলেও সুলতানা সব সময় ছটফটে, হাসি খুশী। কোনো পেশেন্টকে ভেঙে পড়তে দেখলে সুলতানা তার গালে ছোট ছোট চাপড় মেরে বলেন, ও কী, অত মুখ গোমড়া করার কী আছে? হাসো, হাসো! হাসতে ভুলে গেলে বাঁচবে কী করে?

সুলতানা নিজে কখনো হাসতে কার্পণ্য করেন না। চরম দুঃখের কথাও তিনি দিব্যি রসিকতার ছলে বর্ণনা করতে জানেন, এই জন্য আড়ালে কেউ কেউ তাঁকে বলে, পাগলী!

শরীফ আর জাহানারাকে দেখে সুলতানা এক গাল হেসে বললেন, আজ ভালো খবর আছে। আপনাদের পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে পুরোপুরি! খানিক আগে তাকে গল্প বলে বলে আধ গেলাস হরলিকস খাইয়েছি!

জাহানারাও না হেসে পারলেন না। বাবুল চৌধুরী যেন একজন কট্টর বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক নয়, তিন বছরের শিশু। তাকে গল্প বলে হরিলিকস খাওয়াতে হয়!

সুলতানা আবার বললেন, অপারেশান করে ওর পেট থেকে দুটো বুলেট বার করেছি, আল্লর দয়ায় বেঁচে যাবে মনে হয় এ যাত্রায়। কিন্তু কিছুই যে খেতে চায় না। আপনারা দ্যাখেন তো যদি একটা হাফ বয়েল আণ্ডা অন্তত খাওয়াতে পারেন!

জাহানারার ইচ্ছে হলো রুমীর ফিরে আসার কথাটা সুলতানাকে জানাতে। কিন্তু কখন কাকে কী যে বলা উচিত তা-ই যে বুঝে ওঠা যায় না, এখন এমনই এক সন্দেহের সময়।

দোতলার একটি ক্যাবিনে রাখা হয়েছে বাবুলকে। তার পাশের ক্যাবিনেই আছে জাহানারাদের আর এক পরিচিত, তার নাম সালেহা। এই সালেহার স্বামী রসুল সাহেব একজন। ধর্মভীরু পারহেজগার মানুষ। মুখে কালো চাপ দাড়ি, মাথায় কালো জিন্না টুপী, প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন তিনি। রসুল সাহেবের বদলির চাকরি। কিছুকাল আগে ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পঁচিশে মার্চের পর কিছুদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল জয় বাংলা ধ্বনি দেওয়া লোকদের দখলে, তারপরেই সেখানে শুরু হলো পাকবাহিনীর বম্বিং। কোথাও কেউ যুদ্ধ। ঘোষণা করেনি তবু প্লেন থেকে বোমা পড়েছে গ্রামের পর গ্রামে। রসুল সাহেব কোনোরকমে সপরিবারে এক বস্ত্রে পালিয়েছেন, বহু জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত সর্বস্বান্ত হয়ে ঢাকায় এসে উঠেছেন ভূতের গলিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। গ্রামের পথে দৌড়োদৌড়িতে তাঁর স্ত্রীর এক পায়ে একটা হাড় ফুটে গেছে কখনো, প্রথমে সেটা আমল দেননি। এখন সেটা সেপটিক হবার মতন অবস্থা, পা-টা বাদ দিতে হবে কি না ঠিক নেই।

রসুল সাহেব কোনোদিন রাজনীতির সাতে পাঁচে থাকেননি, পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গড়ায় বিশ্বাস করেননি, তবু তাঁর এই অভাবিত দুভাগ্যে একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। জাহানারাই উদ্যোগ করে তাঁর স্ত্রীকে ভর্তি করে দিয়েছেন এই নার্সিং হোমে।

সালেহা যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছে শুনে জাহানারা আর শরীফ আগে উঁকি দিলেন সেই ক্যাবিনে। তাঁদের দেখেই সালেহা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠে বললো, বড় আপা গো, আমি আর বাঁচবে না। আমার ছেলে মেয়েগুলানের কী হবে? আমাদের যে সব গেছে। ওরা খাবে কী?

জাহানারা তার শিয়রের কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, অমন করে না! সব ঠিক হয়ে যাবে!

চোখের সামনে একটা বীভৎস দৃশ্য দেখার মতন ভঙ্গি করে সালেহা বললো, বড় আপা, খান সেনারা কি মানুষ না? এরা কি মুসলমান না? হিন্দু খুঁজে খুঁজে তো কতই মারলো, কলমা। জানা মুসলমানকে পর্যন্ত ওরা কাফের মনে করে মারলো? আল্লার একী বিধান!

জাহানারা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, নার্সিং হোমে অত জোরে চ্যাঁচায় না। তুমি তো ভাগ্যবতী। তোমার গায়ে আর্মির গুলি লাগেনি, পায়ে শুধু হাড় ফুটেছে। সুলতানা আমাকে বললো, অপারেশনে তোমার পা ভালো হয়ে যাবে!

সালেহাকে আরও একটুক্ষণ সান্ত্বনা দিয়ে ওরা এলেন বাবুল চৌধুরীর ক্যাবিনে।

হঠাৎ দেখল মনে হয় বাবুল সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ। সারা গায়ে একটা সাদা চাঁদর ঢাকা, তার পেট জোড়া ব্যান্ডেজ সেই চাঁদরের তলায় ঢাকা পড়ে আছে। তার ফস, নারী সুলভ কমনীয় মুখোনি অনেকটাই রক্তশূন্য, কিন্তু ক্যাবিনের স্বল্প আলোকে তা টের পাওয়া যায় না। বই ছাড়া সে অন্য কিছু দিয়ে সময় কাটাতে জানে না, তাই জ্ঞান ফেরার পরেই সে চোখের সামনে মেলে ধরেছে একটা শক্ত অর্থনীতির বই। তার খাটের পাশেও একটি বইয়ের সারি, সম্ভবত আজই সেফুকে দিয়ে বাড়ি থেকে আনিয়েছে।

জাহানারা পর্দা সরিয়ে ঢুকেই বললেন, ওমা, বাবুল তো ভালো হয়ে উঠেছে দেখছি। ও বাবুল, আল্লা আমাদের ডাক শুনেছেন! তোমার জন্য আমরা দিনরাত দোয়া করেছি!

বইখানা সরিয়ে বাবুল নিঃশব্দ এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।

জাহানারার মনে হলো, আজ রুমী ফিরে এসেছে, আজ তিনি চতুর্দিকেই ভালো কিছু দেখবেন, ভালো শুনবেন। সালেহার পা ঠিক হয়ে যাবে, বাবুল আবার হাঁটা চলা করবে। যদি পাকিস্তানীদের মারণযজ্ঞটাও আজ শেষ হয়ে যেত।

শরীফ বললেন, বাবুল, টাঙ্গাইলে আমি একটা খবর পাঠিয়েছি, রাস্তা খোলা থাকলে ওনার দু’একদিনের মধ্যে এসে পড়বেন নিশ্চয়।

বাবুল এবারেও কোনো কথা বললো না।

জাহানারা বললেন, মঞ্জু ইন্ডিয়ার কোথায় আছে অ্যাড্রেস জানো? তাহলে তাকেও একটা খবর দেবার চেষ্টা করতাম। কাল একজন বললো, এখান থেকে লন্ডনে ফোন করে চেনা কোনো মানুষকে খবর দিলে, সে আবার লন্ডন থেকে কলকাতায় ফোন করে খবর জানাতে পারে। চিঠিও যেতে পারে সেইভাবে।

এবার, যেন কিছু একটা বলতে হয়, সেইভাবে বাবুল বললো, থাক, তাকে ব্যস্ত করার দরকার নাই।

শরীফ বললেন, তুমি কিছু খেতে চাচ্ছো না কেন, বাবুল? না খেলে গায়ের জোর হবে কী করে? একটা আণ্ডা সিদ্ধ খাবে?

বাবুল বললো, আজ না কাল খাবো। পাশের ঘরের মহিলার কী হয়েছে? এত চিৎকার করে কাঁদছেন কেন? ওনার কেউ মারা গেছে?

শরীফ বললেন, না, ওদের ফ্যামিলির কেউ মারা যায় নাই, তবে চোখের সামনে অন্যদের মরতে দেখেছে, আসলে বেশী আঘাত লেগেছে ওদের বিশ্বাসে। ধর্মভীরু মুসলমানকেও যে অন্য মুসলমান আঘাত হানতে পারে, সেটা ওঁরা কিছুতেই এখনও মেনে নিতে পারছেন না!

জাহানারা বললেন, এ তো ক্ষমতা দখলের হিংস্রতা, এখানে আবার ধর্ম কোথায়?

বাবুল উৰ্বনেত্র হয়ে ঘরের ছাদের দিকে তাকালো। তার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই, কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবার আগ্রহও নেই।

শরীফ ও জাহানারা বিদায় নিলেন একটু পরে।

বাবুল আবার চেষ্টা করলো বই পড়ার। তার মনের জোর যতই থাকুক, শরীর খুব দুর্বল হলে। মনকে বশে রাখা যায় না। যেবই সে পড়ছে, তার একবর্ণও আজ মাথায় ঢুকছে না। বইখানা খসে গেল হাত থেকে। আজ বারবার মনে পড়ছে মনিরার কথা ও নিজের ছেলে সুখুর কথা। ভালো করে জ্ঞান ফিরেছে দুপুরের দিকে, তারপর থেকেই মনে হচ্ছে, মনিরার কী হলো? এদেশের মেয়ের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল এদেশেরই সৈন্য, এরপর মনিরার ওপর তারা বলাকার করবে? খুন করবে? দিলারার স্বামী কর্নেল সাহেবকে যদি একবার ফোন করা যেত!

সুখু এখন কোথায়? সে কি বাবার জন্য কাঁদে একবারও? কোথায় যেন একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সব সহ্য করতে পারে বাবুল, কিন্তু শিশুদের কান্নার শব্দ সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না।

বাবুল ঘুমিয়ে পড়েছিল, এক সময় কিসের যেন শব্দে তার চটকা ছুটে গেল। আবার বুঝি ঢাকা শহরের সব বাতি নিবে গেছে, ক্যাবিনের ভিতরটা একেবারে অন্ধকার। শিয়রের কাচের জানলা দিয়ে দিয়ে সামান্য ছাই রঙের জ্যোৎস্না এসে পড়েছে, অর্থাৎ বেশ রাত হয়েছে। ক্যাবিনের মধ্যে কে যেন ঢুকেছে একজন, দেখা যাচ্ছে তার ছায়া-ছায়া মূর্তি। আজিজ ডাক্তার এসেছে ইঞ্জেকশান দিতে?

ছায়ামূর্তিটি বাবুলের খাটের ওপরেই বসে পড়ে কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলো, এই হারামজাদা, মনিরা কোথায়?

বাবুলের মনে হলো, ছায়া মূর্তিটি যেন তার নিজেরই বিবেক। কিংবা তার আত্মা তার শরীর থেকে বেরিয়ে এসে পৃথক সত্তা হয়ে গেছে।

বাবুল অনুতপ্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো, আমি জানি না, সে কোথায়! তুমি বলো, তুমি বলো। আমি জানতে চাই!

ছায়ামূর্তি আবার বললো, নছল্লা করোস আমার সাথে, শুয়ারের বাচ্চা! তারে কোথায় পাঠাইছোস বল আগে!

বাবুল বললো, আমি তাকে কোথাও পাঠাইনি, কে সিরাজুলের কাছে চলে যেতে বলেছিলাম। সে গেল না। আমি তাকে ধরে নিয়ে গেল!

–মিথ্য কথা! তুই-ই আর্মিরে খবর দিছিলি! তুই আর্মির হাতে তারে তুলে দিছিস। এখন নিজে সাধু সাজতেহোস!

–না, না, না, আমি তুলে দিইনি। তা হলে আর্মি আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করবে কেন?

–কোনো একটা বোকা সোলজার ভুল করে গুলি করেছে। হয়তো সে উপরের অর্ডার জানতো না। কিংবা, সবটাই তোর সাজানো। তুই গুলি খাওয়ার ভড়ং কইরা এইখানে লুকাইয়া আছোস! দেখি তো, তোর সত্যিই গুলি লাগছে কি না!

ছায়ামূর্তি বাবুলের গা থেকে চাঁদর সরিয়ে ফেলে তার পেটের ব্যান্ডেজ খুলতে লাগলো।

বাবুলের কথা লাগছে, তার ঘুম ও ওষুধের ঘোর কেটে যাচ্ছে, সে বুঝতে পারলো, এই মাত্র যার সঙ্গে সে কথা বললো, সে তার বিবেক নয়, একজন জলজ্যান্ত মানুষ? নিশ্চয়ই ডাক্তার। আজিজ, এমনই দায়িত্বশীল তিনি যে এই অন্ধকারের মধ্যেও বাবুলের ড্রেসিং চেইঞ্জ করে দিতে এসেছেন। কিন্তু আজিজ ডাক্তার এত তাড়াহুড়ো করে টেনে ব্যথা লাগিয়ে দিচ্ছেন কেন?

যন্ত্রণায় বাবুল চেঁচিয়ে উঠলো, আঃ, আঃ, একটু আস্তে!

তখন সেই ছায়ামূর্তি বাবুলের পেটে একটা চাপড় মেরে বললো, চুপ।

এবারে বাবুলের পরিপূর্ণ বোধ ফিরে এসেছে। সে চিনতে পারলো ছায়ামূর্তির কণ্ঠস্বর। মনিরার স্বামী সিরাজুল।

বাবুল অনেকটা সস্নেহে বলতে চাইলো, সিরাজুল, সিরাজুল, তুমি এত দেরি করলে!

সিরাজুল বাবুলের পেটের ব্যান্ডেজ সবটা খুলে ফেলেছে। একটা টর্চ জ্বেলে সে ক্ষতস্থানটা দেখলো। তারপর বললো, দেরি হয়েছে বটে, কিন্তু তোমারে ছাড়ছি না। বেজম্মা, দালাল!

বাবুল ক্লিষ্ট কণ্ঠে বললো, ওরে সিরাজুল, আমার লাগছে! খুব কষ্ট হচ্ছে! ডান দিকের মিটসেফের উপরে দ্যাখ ওষুধ আছে।

সিরাজুল দাঁতে দাঁত চেপে বললো, তোর সব কষ্ট এখনি কি শেষ হবে রে! হারামজাদা! তোর পেটের সব শিলাই ছিঁড়ে নাড়িভুড়ি লন্ডভণ্ড করে দেবো! আর্মির পা-চাটা কুত্তা।

অসহ্য ব্যথায় প্রায় অবশ হয়ে গিয়ে বাবুল ফিসফিস করে বললো, আমাকে মারিস না, সিরাজুল! আমি মানিরাকে…।

বাবুলের গলা বন্ধ হয়ে আসছে, হাত তুলে সিরাজুলকে বাধা দেবারও ক্ষমতা নেই তার। সে উপুড় হতে চাইলো, পারলো না।

হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সিরাজুল তার কাঁধের ঝোলা থেকে একটা ছুরি বার করলো। তারপর সে আবার বাবুলের উরুর ওপর বসে পড়ে, একহাতে বাবুলের দুটো হাত বন্দী করে অন্য হাতে সাবধানে সেলাই কাটতে লাগলো। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো রক্ত।

তক্ষুনি ক্যাবিনে এসে ঢুকলো আরও দুটি ছায়া মূর্তি। একজন সিরাজুলের কাঁধ ধরে টেনে বললো, এই সিরাজুল, কী করছিস?

সিরাজুল এবারে প্রচণ্ড জোরে গর্জন করে উঠলো, ছাড়, ছাড় আমারে, এই কুত্তাডারে আমি শ্যাষ কইরা দেই আগে!

অন্য দু’জন টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করলো সিরাজুলকে। তিনজনে লেগে গেল ঝটাপটি। পাশের ক্যাবিন থেকে সালেহা চেঁচিয়ে উঠলো, আবার অরা আইছে, অরা আইছে, হায় আল্লা, বাঁচাও বাঁচাও!

চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে জেগে উঠেছে সবাই, ছুটে এলেন ডাক্তার আজিজ আর সুলতানা। ততক্ষণে সিরাজুলের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে রুমী আর ইশরাক তাকে মাটিতে শুইয়ে চেপে ধরেছে।

আলো জ্বেলে দিয়ে ডাক্তার আজিজ সবিস্ময়ে একবার রক্তাক্ত বাবুলের বিছানা ও একবার তিনজন আগন্তুককে দেখে নিয়ে বললেন, এ কী, রুমী, তোমরা? লোকটাকে মেরে ফেললে?

সুলতানা দ্রুত বাবুলের কাছে চলে এসে তার বুকে হাত রেখে বললো, এখনো বেঁচে আছে, শিগগির গরম পানি আনতে বলো, ইঞ্জেকশান রেডি করো।

তারপর রুমীদের দিকে তাকিয়ে হিংস্র কণ্ঠে বললেন, গেট আউট। ক্লিয়ার আউট! না হলে আমি পুলিশে খবর দেবো!

বাবুল চৌধুরী তবু বেঁচে গেল। বিনা অ্যানেসথেসিয়াতেই আবার সেলাই করা হলো তার পেট। দুদিন পরে সেখানে সামান্য একটু ঘায়ের মতন পুঁজ জমে উঠলেও সেপটিক হলো না। তবে এই অবস্থায় সে কিছুই খেতে পারে না, এমনকি সামান্য দুধও সহ্য হয় না। একবার বমি করতে গিয়ে সে এমন কষ্ট পেল যে তার চেয়ে না খাওয়া অনেক ভালো। তার শরীরটা চুপসে গিয়ে লেগে রইলো বিছানার সঙ্গে।

জাহানারা ইমাম ছাড়া কে আর কেউ দেখতে আসে না। আর থাকে সেফু। সে ছলছল চোখ করে চুপটি করে বসে থাকে। সেই রাতের ঘটনার পর সে সাহেবের ঘরে সর্বক্ষণ থাকার জন্য জেদ ধরেছিল, ডাক্তার দম্পতি তাকে অনুমতি দিয়েছেন। ঐটুকু মেয়ে এর মধ্যেই বেশ নার্সিং শিখে গেছে।

বাবুল আর বই পড়ে না, সর্বক্ষণ চুপ করে ওপরের দিকে চেয়ে থাকে। সেফু কথা বলার চেষ্টা করলে সে এক একবার দুর্বল হাতখানি তুলে সেফুর মাথায় রাখে। এই মেয়েটার বাপ-মা।

জাহানারা ইমাম এসে নানারকম খবরাখবর শোনান। তিনি দু’একদিন আগে শহিদ মিনারের দিকটা দেখতে গিয়েছিলেন। শহিদ মিনার ভেঙে চুরমার হয়ে আছে, সেখানে নাকি সরকার মসজিদ বানাবে। রমনার প্রাচীন কালীবাড়ি ভেঙে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছে, সেখানে যে কোনোকালে মন্দির ছিল তা বোঝাই যায় না। বায়তুল মোকাররামের অনেক দোকানপাট লুঠ হয়েছে। নিউজ উইকে প্রবন্ধ বেরিয়েছে, পাকিস্তান প্লাঞ্জেস ইন টু সিভিল ওয়ার’। লিখেছে লোরেন জেংকিনস, সে নিজে ক্র্যাক ডাউনের সময় ঢাকায় উপস্থিত ছিল। এখন আর পাকিস্তান সরকার বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দিতে পারবে না যে কিছু ভারতীয় চরের উস্কানিতে এখানে সেখানে ছোটখাটো গণ্ডগোল হচ্ছে।

কথাবার্তা প্রায় এক তরফাই হয়। বাবুল অধিকাংশ সময় চুপ করেই থাকে। একদিন সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, আপা, আমি যে মানিরাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলাম, তা ওরা বিশ্বাস করলো না। আপনিও কি অবিশ্বাস করেন?

জাহানারা বললেন, না, না, অবিশ্বাস করবো কেন? সেফু আমাদের সব বলেছে। বাবুল, তোমার মতন ভদ্র মানুষ কখনো মেয়েদের অপমান সহ্য করবে, এ কেউ ভাবতে পারে না। রুমীরাও তোমাকে বিশ্বাস করে। সিরাজুলের কথা বাদ দাও, ওর প্রায় মাথা খারাপ হয়ে। গেছে। জানোই তো মনিরাকে ও কত ভালোবাসতো!

–সিরাজুলকে একবার ডেকে আনতে পারেন?।

–সে তো এখানে নাই। আবার অ্যাকশানে যোগ দিতে চলে গেছে।

–কোথায় গেছে? কোন দিকে গেছে?

–তা তো জানি না। সে সব কথা কি আর আমাকে বলে!

–সিরাজুলের সাথে আমার আর একবার দেখা করা খুব দরকার!

অন্য রুগীদের স্থান দেওয়া যাচ্ছে না, তাই বাবুলকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হলো কয়েকদিন পরেই। এখন তার প্রয়োজন শুধু বিশ্রাম। এখনও তার বাবা-মা কোনো খবর পাননি বোধহয়।

শরীরে একটু জোর পাবার পর বাবুল প্রথম দুতিনদিন ঘরের মধ্যে পায়চারি করলো, সেফুকে ধরে ধরে। তারপর সে নিজে হাঁটতে শিখলো। দোতলা থেকে একতলায় নামতে পেটে ব্যথা বোধ হলো কিছুটা, কিন্তু ব্লিডিং হলো না।

সিঁড়ির ঠিক যেখানটায় খান সেনারা বাবুলকে গুলি করেছিল, সেখানে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। সে মরে যায়নি, সে একটা নতুন জীবন পেয়েছে।

সেইদিনই মঞ্জুর ভাই আপেল এসে উপস্থিত হলো।

শ্বশুর বাড়ির লোকেরা যে কেউ ঢাকায় নেই তা জানতো বাবুল। মঞ্জুর বাবা অনেকদিন অসুস্থ, তাঁকে রাখা হয়েছে গ্রামের বাড়িতে, তিনি প্রায় সব সময় বিড়বিড় করে আপন মনে হামদ, নাত, দরুদ, মিলাদ পাঠ করেন আর মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠেন, ঐ আসছে, ঐ আসছে! মঞ্জুর মা পড়েছেন বিপদে, ছেলেগুলো কোনো কম্মের না, এই আপেলও ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক টাকা খুইয়েছে। অন্য সবাই গ্রামে, শুধু আপেল সস্ত্রীক রয়ে গেছে ঢাকার বাড়িতে। মাত্র দুদিন আগে সে কানা ঘুমোয় শুনেছে যে দুলাভাই বাবুল চৌধুরী নাকি গুলি খেয়ে মরতে বসেছে।

এখন সে বাবুলকে সুস্থ দেখে চমকে গেল। ঢাকায় এখন কত রকম গুজবই যে ছড়াচ্ছে। রোজ। বাবুল ও তার কাছে সত্যি কথা ভাঙলো না। হেসে উড়িয়ে দিল গোলাগুলির কথা।

পরদিন বাবুল সিঁড়ি দিয়ে ওপর নীচ করলো দু’তিনবার। তেমন আর অসুবিধে হচ্ছে না। আর দেরি করা যায় না। সন্ধেবেলা সে সেফুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, আমি যদি এই বাসা এখন তালা দিয়ে চলে যাই, তুই কী করবি? কোথায় যাবি?

হাতির পুলের কাছে সেফুর এক গ্রাম সম্পর্কে চাচা থাকে, সে একজন কসাই, সেখানে সেফু কিছুতেই যেতে চায় না। সে বাবুলের হাত জড়িয়ে ধরে ভয় পেয়ে বলে উঠলো, আমি কুথাও যামু না, কুথাও যামু না। ভাবী আমারে বলে গেছেন আপনের লগে লগে থাকতে।

বাবুল তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো, শোন, আমারে যে কাজে যেতে হবে। এইখানে বসে থাকলে, আবার যদি মিলিটারি আসে? বুঝলি না? তুই প্রথমে জাহানারা আপার বাসায় যাবি, বলবি, সাহেব আমারে আপনের এখানে থাকতে বলেছেন। উনি খুব ভালো মানুষ, তোরে রাখবেন। আর যদি দেখিস, ওর বাসায় অনেক লোকজন, তোর থাকোনের জায়গা নাই। তাইলে তুই যাবি আপেল সাহেবের বাড়ি। সে বাড়ি চেনোস তো!

সেফু আবার বললো, সাহেব আমি কুথাও যামু না, আমি এই বাসাতেই থাকুম!

বাবুল বললো, দূর বোকা! আমি চলে গেলে তুই একা থাকবি কী করে, তোরে মিলিটারি ধরে নিয়ে যাবে না? শোন, তুই কিন্তু ঠিক জাহানারা আপা কিংবা আপেল সাহেবের বাসায়। থাকবি, অন্য কোনো বাসায় কাজ নিবি না। তাহলে আমি ফিরে এসে আবার তোরে খুঁজে পাবো কী করে?

সব ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে, সদর দরজায় তালা দিয়ে বাবুল বললো, সেফু, তুই এখানে কিছুক্ষণ বসে থাক। আমি চলে যাবার আধঘণ্টার মধ্যে কাউকে কিছু বলবি না। আমি একটা কাজে যাচ্ছি রে, সেফু। ফিরে আসলে আবার তোরে ডেকে নিয়ে আসবো। মন খারাপ করিস না, কেমন?

বাবুলের নিজেরই চোখ ছলছল করছে সেফুকে ছেড়ে যেতে। তবু সে একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়লো। মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।

২০. প্রায় হাজারখানেক নারী-পুরুষ

প্রায় হাজারখানেক নারী-পুরুষ বড় রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে বাস থামালো। এমন ভাবে থামাবার দরকার ছিল না, এখানে এমনিই বাস স্টপ আছে, তবু সবাই বাসটাকে ঘিরে লাফিয়ে লাফিয়ে চিৎকার করতে লাগলো, জয় বাবা কালাচাঁদ! জয় বাবা কালাচাঁদ! অন্যান্য বাসযাত্রীরা হারীত মণ্ডলকে দেখে ভাবলো, তার নামই বুঝি কালাচাঁদ!

হারতের মুখে এখন ঘন চাপ দাড়ি। মাথার চুল, এখন কিছুটা পাতলা হয়ে গেলেও সে কাটে না কখনো, কাঁধ ছাড়িয়ে নেমেছে। পরনে একটি গেরুয়া রঙে ছোপানো লুঙ্গি ও ফতুয়া, হাতে একটি তেল চুকচুকে লম্বা বাঁশের লাঠি। কলোনির দুঃখী মানুষেরা প্রত্যেক পরিবার থেকে আট আনা করে চাঁদা তুলেছে হারীতের জন্য, তার গলায় পরিয়েছে তিনখানা মোটা মোটা গাঁদা ফুলের মালা, তাদের নেতাকে তারা পাঠাচ্ছে মুক্তির সন্ধানে।

হারীত সঙ্গে নিতে চেয়েছিল শুধু যোগানন্দকে, একজন কেউ সঙ্গে থাকা ভালো, সে নেতা হলেও ফিরে এসে তার লোকজনকে যে-সব খবরাখবর শোনাবে, তার একজন সাক্ষী থাকা দরকার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জোরজার করে বাসে উঠে পড়লো গোলাপীর ছেলে নবা, সে কিছুতেই হারীতকে ছেড়ে থাকবে না। বাস ছাড়তে দেরি হয়ে গেল সেইজন্য। নবার যাওয়া ব্যাপারে জনমত দ্বিধা বিভক্ত, কিন্তু সকলেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। গোলাপী বাসে উঠে এসে টানাটানি করতে লাগলো নবাকে, সে দু’হাতে হারীতের হাঁটু ধরে আছে শক্ত করে। শেষপর্যন্ত হারীত বললো, আচ্ছা, থাক, ও আমার সাথে যাক, তোরা চিন্তা করিস না!

বাসুদেব একটু দূরে একটা জানলার ধারে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। গোলাপীর দিকে একবারও তাকাবার পর্যন্ত সাহস নেই তার। বুকের মধ্যে ট্রেনের ইঞ্জিনের মতন আওয়াজ হচ্ছে। এখনও সে বিশ্বাস করতে পারছে না হারীত মণ্ডলকে। হয়তো এই কলোনি থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়ে হারীত আর যোগানন্দ তার হাত-পা ভেঙে দেবে!

বাসে যেতে হবে রায়পুর, সেখান থেকে ট্রেন।

হারীর গলা থেকে মালাগুলো খুলে ফেললো। এমন অসহ্য গরম যে গায়ে কিছু রাখতে ইচ্ছে করে না। বাসে ভিড় বেশী নেই, হারীত নবাকে ভালো করে পাশে বসালো। টাকাকড়ি যা উঠেছে, তা সে দিয়েছে যোগানন্দের কাছে। নোট নেই, খুচরো পয়সার একটা তোড়া।

কন্ডাকটর সামনে আসতেই হারী যোগানন্দকে বললো, টিকিট কাট।

কন্ডাকটর বিগলিত মুখে বললো, নেহি সাধুবাবা, আপনোগকো টিকিট নেহি লাগে না।

একটু নিচু হয়ে সে ভক্তিভরে হারীতের দুই হাঁটু স্পর্শ করলো।

সাধুদের টিকিট লাগে না! হারীত সাধুর ভেক ধরেছে পুলিশের নজর এড়াবার জন্য। কলকাতা ও চব্বিশ পরগণায় তার প্রবেশ নিষেধ, পুলিশের এই আদেশ এখনও জারি আছে কিনা সে জানে না, তবু সে ঝুঁকি নিতে চায়নি। সাধু সাজলে টিকিটের পয়সাও বাঁচানো যায়? তা হলে কি ট্রেনে টিকিট কাটতে হবে না? মাত্র দু শো বাইশ টাকা সম্বল করে তারা তিনজন চলেছে পশ্চিমবাংলায়।

হারীত কন্ডাক্টটির মাথায় হাত ঠেকিয়ে আশীবাদ জানালো, জিতা রহো! ভগবান তুমহারা মঙ্গল করে গা!

হারীতের একটা বিড়ি খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু এই সাধুবেশে বিড়ি ধরানো ঠিক হবে না। অন্যদের বিড়ি-সিগারেটের গন্ধে তার চিত্ত চঞ্চল হচ্ছে, তাই চোখ বুজে রইলো সে।

প্রায় আট ঘণ্টার পথ, এই গরমের মধ্যে শুধু বসে বসে ঝিমোনো ছাড়া আর কিছুই করার নেই। মাঝখানে কোনো একটা জায়গায় চা খেতে নেমে বাসুদেবের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল। নবার। নবাকে সে জিলিপি খাওয়ালো। যোগানন্দ পাশে এসে দাঁড়াতে তাকেও সে কুণ্ঠিত ভাবে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কিছু খাবেন? আমি দশ টাকার নোট দিয়েছি, খুচরো দিতে পারছে না…

সাধু-সুলভ সংযম দেখিয়ে হারীত চা বা জিলিপি কিছুই খেল না।

রায়পুর স্টেশনেও অপেক্ষা করতে হবে পাঁচ ঘণ্টা। ট্রেন আসবে রাত তিনটের সময়। যোগানন্দর জন্য একখানা ও নবার হাফ টিকিট কাটা হয়েছে, নিজের জন্য টিকিট না কিনে হারীত পরীক্ষা করে দেখতে চায়। যদি সে নিজের টিকিটের পয়সাটা বাঁচাতে পারে, তা হলে ফেরার সময়ে যোগানন্দ আর নবাকেও গেরুয়া রঙের কাপড় পরিয়ে আনবে। আর যদি ধরে, টিকিট চেকারের দয়া না হয়, তা হলে আর এমন কী হবে, বড় জোর নামিয়ে দেবে মাঝখানের কোনো স্টেশনে। তখন দেখা যাবে!

বাসুদেব ওদের নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে নিয়ে এসেছে, সে প্লাটফর্ম এখন নিঝুম, নির্জন। যোগানন্দ আর নবা ঘুমিয়ে পড়লো একটু বাদেই। হারীতদের সঙ্গে কোনো মালপত্র নেই। শুধু দুটি ঝোলা। বাসুদেব টিনের সুটকেস ও সতরঞ্চি জড়িয়ে বাঁধা বেডিং এনেছে, তার ওপরে সে বসে আছে একটু দূরে, ক্ষীণ আলোয় একটা খাতা খুলে কিছু পড়ছে।

সেদিকে একটুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হারীত বললো, ছোটবাবু, একটু শুনেন!

সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো বাসুদেবের। ফ্যাকাসে মুখোনি ফিরিয়ে সে হারীতকে দেখলো। বয়েস হলেও হারীতের শরীরটি এখনও বেশ মজবুত, টানটান। প্রকৃত সাধুর ভঙ্গিতে সে জোড়াসনে সিধে হয়ে বসেছে, পাশে রাখা লাঠিখানা, এখন সে একটা বিড়ি ধরিয়েছে বটে কিন্তু সেটিকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে সে টানছে গাঁজার কল্কের মতন। হারীতের মাথার পেছনেই, খানিকটা দূরে জ্বলজ্বল করছে সিগন্যালের লাল আলো।

এখন হারীত লাঠিটা ঘুরিয়ে একবার মারলেই বাসুদেবের মাথাটা ছাতু হয়ে যাবে!

সে প্রায় লাফিয়ে এসে হুমড়ি খেয়ে হারীতের পায়ের ওপর পড়ে বললো, আমাকে দয়া করুন, আমাকে দয়া করুন! আমি ক্ষমা চাইছি, আমি আপনার শিষ্য হবো!

হারীত বিব্রত ভাবে পা সরিয়ে নিয়ে বললো, এ কী! আপনে ব্রাহ্মণ হয়ে আমার পায়ে হাত দ্যান ক্যান? ছি ছি, এতে আমারই পাপ হবে!

–আপনি সাধু পুরুষ, সাধুদের কোনো জাত নেই। জয় বাবা কালাচাঁদ! জয় বাবা কালাচাঁদ!

–আপনে ভালো করেই জানেন যে আমি আসল সাধু না! বসন রাঙাইলেই কি যোগী হওন যায়? আমি মুখ মানুষ, তন্ত্রমন্ত্র কিছুই জানি না!

–আপনি আমাকে দয়া করুন!

–শোনেন, ঠিক হয়ে বসেন। আপনেরে একটা কথা জিগাই, সঠিক উত্তর দেবেন। আপনে আমার মাইয়া গোলাপীরে রাইতের বেলা আপনার বাসায় ডাকছিলেন পদ্য শুনাবার জইন্য? সত্য কথা বলেন!

–আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনি বিশ্বাস করুন। অন্য সময় এলে লোকে পাঁচ কথা বলতো, তাই ভেবেছিলুম, রাত্তির বেলা, যখন অন্য কেউ জানতে পারবে না, তখন নিরিবিলিতে তাকে একটু কবিতা শোনাবো!

–আপনের অন্য কোনো মতলেব ছিল না? রাত্তিরবেলা একজন সামর্থ্য মেয়েরে ডেকে এনে তার গায়ে হাত দ্যান নাই?

–আমি তার পায়ে হাত দিয়েছি। মা কালীর দিব্যি, আমি শুধু তার পা দু’খানা ধরে—

–কী পদ্য তারে শুনায়েছিলেন, আমারেও শুনান!

–আজ্ঞে?

–আমারেও সেই পদ্য শুনান।

–সে এমন কিছু নয়, আপনার ভালো লাগবে না। আমার লেখা দেখে অনেকেই ঠাট্টা বিদ্রূপ করে। কোনো মেয়ে কখনো আমার লেখা পড়েনি, তাই আমি ভেবেছিলুম…

–এখন পড়েন তো দেখি।

বাসুদেব খাতাটা নিয়ে আসতে বাধ্য হলো। পাতা উল্টে যেতে লাগলো, গোলাপীকে যে কয়েকটা কবিতা সে শুনিয়েছিল, সেগুলি হারীতকে শোনাতে তার সাহস হলো না। সেগুলি নারী বিষয়ক। সে কাঁপা কাঁপা গলায় অন্য একটি কবিতা পড়তে শুরু করলো :

শুকনো নদী শূন্য মাঠ নিরানন্দ গাঁ।

যেখানে যাই যেদিকে চাই তোমাকে দেখি মা….

সমস্ত মনোযোগ ভুরুতে এনে চুপ করে শুনলো হারীত। সে লেখাপড়া বিশেষ শেখেনি বটে কিন্তু সেও একজন শিল্পী। সে এক সময় মাটি দিয়ে ঠাকুর দেবতার মূর্তি গড়েছে। এখনও সে ভালো মতন একটা কাঠের টুকরো পেলে পুতুল বানাতে পারে। তার চোখের সামনে কোনো মূর্তি লাগে না, তার আঙুলের খেলায় অবিকল মানুষের মূর্তি ফুটে ওঠে।

একজন শিল্পী অন্য শিল্পের তরঙ্গও ঠিকই অনুভব করে। কবিতার সব শব্দ ব্যবহার সে ঠিকমতন না বুঝলেও কাব্যরস তার মন স্পর্শ করলো। ক্যাম্প অফিসের একজন কেরানী, যার কাজ টাকা-পয়সা, চাল-ডালের হিসেব রাখা, এই কবিতাগুলির মধ্যে সে যেন একেবারে একজন অন্য মানুষ।

খানিকক্ষণ শোনার পর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে হারীত বললো, আপনে একজন দুঃখী, তাই না? আমার মেয়েটাও বড় দুঃখী, ছোটবাবু! তার কোনো দোষ নাই, যেমন মনে করেন। মাটি, মাটির কি কোনো দোষ আছে, তবু মানুষে মাটির জন্য কামড়াকামড়ি করে। আমি কইলকাতায় যাইতাছি, ছোটবাবু, যদি কোনো কারণে আর না ফিরি, যদি পুলিশে আমারে ধইরা রাখে, আপনে আমার মেয়েটারে দ্যাখবেন। লোকে যা কয় কউক, আপনে তারে বুঝাইয়া। সুঝাইয়া রাইখেন!

এরপর হারীত অনেকক্ষণ গল্প করলো বাসুদেবের সঙ্গে। এক সময়ে ঝমঝমিয়ে এসে গেল ট্রেন। থার্ড ক্লাস কামরায় প্রচণ্ড ভিড়, তার মধ্যে কোনো ক্রমে উঠে পড়লো ওরা। সারা রাস্তায় কেউ টিকিট দেখতে এলো না।

বাসুদেব নেমে গেল খড়গপুরে। ট্রেনও ফাঁকা হয়ে যেতে লাগলো। হারীত বেশী বেশী সাধু সেজে ধ্যানে বসে রইলো চোখ বুজে। যদিও অনেক লোক উঠে দাঁড়িয়ে থাকছে দরজার কাছে, আবার নেমে যাচ্ছে দু-এক স্টেশন পরে, তাদের টিকিটের কোনো ব্যাপারই নেই মনে হয়। নবা খুব অবাক হয়ে গেছে চতুর্দিকে এত বাংলা কথা শুনে। স্টেশনের নাম বাংলায় লেখা, ট্রেনের মধ্যে উঠে হকাররাও চ্যাঁচাচ্ছে বাংলায়।

হাওড়া স্টেশনে এসে ওরা পৌঁছোলো সকাল দশটায়। এই সময় অফিসযাত্রীর এমনই ভিড় ও ঠেলাঠেলি যে টিকিট দেখার যেন প্রশ্নই নেই, ওরা সেই জনস্রোতে প্রায় ভাসতে ভাসতেই বেরিয়ে এলো বাইরে।

নবা বললো, এঃ, আমরা ক্যান টিকিট কাটলাম? রেলে টিকিট লাগে না!

হারীতও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। এত সহজে পয়সা বাঁচানো যাবে সে আশা করেনি। ফেরার সময়ে তা হলে আর চিন্তা নেই। ট্রেনে ভালো খাওয়া হয়নি, এখন আগে পেট ভরে খেয়ে নিতে হবে।

হাওড়া ব্রীজ পেরিয়ে আসবার পর কলকাতার মাটিতে পা দিয়ে হারীতের বুক নয়, সমস্ত শরীর টনটন করে উঠলো। এখানে সে কম মার খায়নি। পুলিশের চোখে সে মাকামারা হয়ে গিয়েছিল, পুলিশ তাকে যখন তখন মেরেছে। মেরে মেরে তাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। সেইসব পুলিশের লোকেরা এখনও কি তাকে চিনতে পারবে?

ছেলেটার খবর নিতে হবে। রাস্তার নাম মনে আছে, মোহনবাগান লেন। সে রাস্তা অনেক দূরে। তার আগে বোধহয় পড়বে তালতলা। রাত্তিরে থাকার জন্য তালতলার মা জননীর কাছে আশ্রয় চাইলে পাবে না?

নবার কাঁধ চাপড়ে হারীত বললো, চল, তোগো আইজ একটা নতুন জিনিস খাওয়ামু। এই কইলকা শহরে খাওনের অনেক মজা।

মাঠ-জঙ্গলের তুলনায় কলকাতার পিচের রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটা বেশী কষ্টকর, কলকাতার গরমে ঘামও বেশী হয়, তবু ওদের যেন কোনো কষ্টই হচ্ছে না। এটা কলকাতা, এই নামটার মধ্যেই একটা জাদু আছে।

লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে ওরা এসে উপস্থিত হলো মনুমেন্টের কাছে। আগে কয়েকবার এসপ্লানেড-ডালহাউসি অঞ্চলে মিটিং-মিছিলে এসে হারীত কিছু শস্তার খাওয়ার জায়গা খুঁজে বার করেছিল। সে জেনেছিল যে কলকাতার রিকশাওয়ালা-ঠেলাওয়ালারাই সব চেয়ে শস্তায় খায়। সে খাবার এমন কিছু খারাপও নয়।

মনুমেন্টের পায়ের কাছে ওরা এক দোকানীর সামনে বসে পড়লো। ঝকমকে কাঁসার থালাভর্তি ছাতু, সঙ্গে নুন আর কাঁচালঙ্কা। আর এক ঘটি জল। হারীত আগে দেখে গিয়েছিল, এই খাদ্যের দাম আশী পয়সা, এখন একটাকা কুড়ি পয়সা হয়েছে। আরও কিছু পয়সা দিলে খানিকটা চিনিও দেয়। আট আনার চিনি কিনে নিয়ে সে নবার ছাতুতে জল ঢেলে, চিনি মিশিয়ে কয়েকটা গোল্লা পাকিয়ে বললো, এবার খাইয়া দ্যাখ, নতুন রকমের মিঠাই।

সেই ছাতুর গোলা খুব আগ্রহের সঙ্গে মুখে দিল নবা, খুব যে ভালো লেগেছে তা তার চোখ মুখ দেখে বোঝা গেল না, তবু অল্প বয়েসের ক্ষুধায় খেতে লাগলো একটা একটা করে। যোগানন্দ নুন-কাঁচালঙ্কা দিয়েই পুরো ছাতুটা উড়িয়ে দিল, হারীত নিজেই ভালো করে খেতে পারলো না, তার গলায় আটকে আটকে যাচ্ছে। তিন ঘটি জলই শেষ করে ফেললো সে।

কলকাতার রাস্তাঘাট ভালো করে জানা নেই হারীতের, তবু সে আন্দাজে আন্দাজে পৌঁছে গেল তালতলায়। ত্রিদিবের বাড়ির সামনের দিকটা অনেকটা বদলে গেছে, লোহার গেট বসেছে, সেখানে একজন নেপালী দারোয়ান। সেই দারোয়ান হারীতের কোনো কথায় পাত্তাই দিতে চাইলো না। বাড়ির ভেতর থেকে একজন অবাঙালী ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেয়া হুয়া, সাধুবাবা? আইয়ে, অন্দর আইয়ে, কৃপয়া বৈঠকে যাইয়ে!

হারীত ভেতরে গেল না, কিন্তু সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বুঝলো, তিনি ত্রিদিব-সুলেখার নাম শোনেননি। এ বাড়ি তারা মাত্র গত বছরই কিনেছেন, সেই বাড়িওয়ালাও বাঙালী ছিল না।

হারীত খুব ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেল। তবে কি তার বাড়ি চিনতে ভুল হচ্ছে? সে গলি দিয়ে হেঁটে এগিয়ে গেল অনেকখানি। পুলিশের তাড়া খেয়ে আহত অবস্থায় দৌড়ে এসে যে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে ত্রিদিবের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল, সেই বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো। দেয়ালে নোনা ধরেছে, তাছাড়া বাড়িটার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ত্রিদিবেরই কোনো এক আত্মীয়ের বাড়ি এটা। প্রায় পা মেপে মেপে সেখান থেকে হারীত আবার ফিরে এলো, এখানে সে অনেকবার এসেছে, তার ভুল হবার কথা নয়। ত্রিদিবের বাড়ি থেকেই সে গ্রেফতার হয়েছিল। দু পাশের দুটো বাড়ি অবিকল এক আছে, মাঝখান থেকে ত্রিদিব-সুলেখার বাড়িটাই অদৃশ্য হয়ে গেছে!

পাশের দোতলা বাড়ির বারান্দা থেকে একজন খালি-গায়ে, লুঙ্গি পরা মাঝবয়েসী লোক বললো, আপনি ত্রিদিববাবুকে খুঁজছেন? উনি তো এ বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন অনেকদিন! তারপর দু বার এ বাড়ি হাতবদল হয়ে গেল।

হারীত মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো, ওনারা কোথায় গেছে? ঠিকানাটা বলতে পারেন?

লোকটি বললো, প্রথমে তো দিল্লি চলে গেলেন। তারপর কোথায় গেছেন জানি না। ও হ্যাঁ, একবার মাঝখানে ত্রিদিববাবু এলেন বাড়ি বেচবার সময়, তখন উনি বললেন, উনি শিগগির বিলেত যাচ্ছেন। হ্যাঁ। আরও কে যেন বললো একদিন, ত্রিদিববাবু বিলেতেই থাকেন!

–বিলাতে চলে গেছেন? ওনার ইস্ত্রীও গেছেন কি?

–ওঁর স্ত্রী তো… কী যেন হয়েছিল…

লোকটি পেছনে মুখ ফিরিয়ে ঘরের মধ্যে কাকে যেন জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁগো, সুলেখাবৌদির কী যেন হয়েছিল?

ঘরের ভেতর থেকে একজন কী উত্তর দিল তা বোঝা গেল না। লোকটির চোখ-মুখ কুঁচকে গেল, কী যেন চিন্তা করে বললো, নাঃ, সুলেখাবৌদির কী হয়েছে আমরা জানি না!

আগ্রহ হারিয়ে লোকটিও ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে। হারীত তবু তাকিয়ে রইলো সেই বারান্দার দিকে। সুলেখার সঙ্গে দেখা হবে না? জগদ্ধাত্রীর মতন রূপ সেই নারীর, হারীত তাকে মা জননী বলে ডেকেছিল। সেরকম দয়াবতী রমণী আর কখনো দেখেনি হারীত। কলকাতা শহরটাই শূন্য মনে হলো।

ওয়েলিংটন স্কোয়ারে এসে কিছুক্ষণ বসলো হারীত। যোগানন্দ কোনো কথা বলছে না, কিন্তু নবা ছটফট করছে। সে কখনো ট্রাম দেখেনি, সিনেমার পোস্টার দেখেনি। এত বড় বড় বাড়ি দেখেনি। আইসক্রিমওয়ালা দেখেনি। তাকে আট আনা দিয়ে একটি লাল রঙের কাঠি আইসক্রিম কিনে দিতেই হলো। এই প্রথম বরফ স্পর্শ করলো তার জিভ।

এবার যেতে হবে মোহনবাগান লেনে। কিন্তু সুলেখাকে দেখবার জন্য হারীত যতখানি উৎসাহ নিয়ে এসেছিল, নিজের ছেলের কাছে যাবার জন্য তেমন উৎসাহ বোধ করছে না। ছেলে যদি লেখাপড়া শিখে ভদ্রলোক হয়ে গিয়ে থাকে, সে কি তা হলে চিনতে পারবে বাবাকে? ছেলে এতদিন কোনো খোঁজ তো নেয়নি, চেষ্টা করলে কি খোঁজ নেওয়া যেত না? হারীত দু’বার পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিল, তারও কোনো উত্তর আসেনি। হয়তো ঐ ঠিকানায় এখন ওরা থাকে না।

যে-মহিলার কাছে ছেলেকে রেখে গিয়েছিল হারীত, আশ্চর্য ব্যাপার, তার নামটা মনে আসছে না। কোথায় যেন নাম-ঠিকানা লেখা ছিল, সে কাগজ হারিয়ে গেছে এতদিনে। মহিলাকে কেমন দেখতে ছিল তাও মনে আসছে না হারীতের। শুধু সুলেখার মুখখানাই চোখের সামনে ভাসছে। সহজে ভেঙে পড়ে না হারীত, এখন তার চোখ ফেটে জল আসছে।

ওয়েলিংটন স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজারের দিকটা হারীতের মনে আছে, ট্রাম লাইন ধরে সোজা হাঁটা পথ। নবা ট্রামে ওঠবার জন্য বায়না ধরলেও হারীত কর্ণপাত করলো না। নিঃস্ব মানুষদের চাঁদার পয়সা, যেমন তেমন ভাবে খরচ করা যায় না। মে মাসের রোদে পিচ গলে যাচ্ছে, পায়ে সেই পিচ লেগে যাওয়ায় নবা বেশ মজা পাচ্ছে। সে ইচ্ছে করে আরও পিচ মাখছে।

মোহনবাগান লেনের বাড়িটাও পাওয়া গেল একসময়ে। এ রাস্তায় তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি। বাড়িটার সামনে একটা চাঁপা ফুলের গাছ। ঘোর দুপুরে সুনসান করছে পাড়া। বড় পালাওয়ালা কাঠের দরজাটায় ধাক্কা দিতেই একজন কিছুটা ফাঁক করে হারীতের আপাদমস্তক দেখে বললো, এখন ভিক্ষেটিক্ষে হবে না, যাও যাও!

বিশ্রী মানসিক অবস্থার মধ্যেও হারীত ক্লিষ্ট ভাবে হাসলো। কলকাতার মানুষ সাধু-সন্ন্যাসীর ভড়ং দেখলেও সহজে ভোলে না। সাধু দেখলে ভিখিরি মনে করে। সে যোগানন্দর দিকে একবার তাকালো। যত অসহায় অবস্থার মধ্যেই পড়তে হোক, এ পর্যন্ত তাদের কখনো ভিক্ষে করতে হয়নি। তারা বাস্তুহারা, কিন্তু ভিক্ষুক নয়।

প্রকৃত সাধুর মতনই হারীত হুংকার দিয়ে বললো, জয় বাবা কালাচাঁদ! জয় বাবা কালাচাঁদ! দরজা আবার ফাঁক করে লোকটি বিরক্তির সঙ্গে বললো, আরে বলছি যে এখানে কিছু হবে না! অন্য জায়গায় যাও বাবা!

হারীত বললো, এই বাড়িতে আসছি, অইন্য জায়গায় যাবো কেন? তোমার বাবুদের ডাকো। সুচরিতবাবু কোথায়?

লোকটি ভুরু কুঁচকে বললো, সুচরিতবাবু? সে আবার কে? ভুল জায়গায় এসেছে, সাধুবাবা, এ বাড়িতে ঐ নামের কেউ নেই!

–সুচরিত এই বাড়িতে নাই?

–বললুম তো, তোমার ঠিকানা ভুল হয়েছে।

হারীত অতি কষ্টে অপ্রস্তুত ভাবটা দমন করলো। সেই মহিলার নাম এখনও তার মনে পড়ছে না। এ বাড়িতে আর কে কে থাকতেন, তাও সে জানে না। হঠাৎ বিদ্যুতের মতন একটা নাম মাথায় এসে গেল। অসমঞ্জু! এই মাস্টার ভদ্রলোকই প্রথম তার ছেলের ভার নিয়েছিল। তার ঠিকানাও হারীতের জানা নেই। এই বাড়ি থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলে ছেলের সন্ধান পাবার আর কোনো সূত্রই থাকবে না হারীতের।

সে বললো, অসমঞ্জুবাবু এ বাড়িতে আসেন না? তাঁর সাথে আমার দেখা করার যে খুব প্রয়োজন ভাইডি!

একটা চেনা নাম শুনে লোকটির মুখ থেকে সন্দেহের ভাব ঘুচে গেল। দরজাটা পুরো খুলে দিয়ে বললো, ভেতরে ছায়ায় এসে বসো! মাস্টারদাদাকে খুঁজতে এসেছো তো আশ্রমে যাওনি কেন?

–আশ্রম মানে, কিসের আশ্রম? কোথায়?

দোতলার জানলা খুলে আনন্দমোহন জিজ্ঞেস করলেন, কে রে বীরু?

আনন্দমোহনকে মাত্র একবারই দেখেছিল হারীত কিন্তু এখন মুখ তুলে তাকিয়েই চিনতে পারলো। যাক, তাহলে ত্রিদিব-সুলেখার মতন ব্যাপার এখানে হবে না।

সে বললো, আজ্ঞে, আমরা অনেক দূর থিকা আসতেছি!

আনন্দমোহন হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলে নিচে এলেন। সামনের চত্বরটা পার হয়ে এরা তিনজনে এসে বসলো একতলার বারান্দায়।

ধুতি ও ধপধপে গেঞ্জি পরা আনন্দমোহন ভেতরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দুহাত জোড় করে বললেন, নমস্কার! আপনারা কোন আশ্রম থেকে আসছেন বললেন?

হারীত তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করতে যেতেই তিনি চমকে বললেন, আরে একী একী, আপনি সাধু মানুষ, আমার পায়ে হাত দিচ্ছেন!

হারীত বললো, আপনি ব্রাহ্মণ। আমি সাধু না, আমি একজন সামান্য রিফিউজি। সরকার আমাগো দণ্ডকারণ্যে নির্বাসন দিছে। সাহস কইরা আবার কইলকাতায় আইয়া পড়ছি একটা সংবাদ নিতে।

আনন্দমোহন অস্ফুট স্বরে বললেন, হারীত মণ্ডল!

–আজ্ঞে আপনের সাথে আমার একবার দেখা হইছিল, অনেক বৎসর আগে, আপনার নিশ্চয় মনে নাই–

–আপনার চেহারা দেখে চিনতে পারিনি। কিন্তু হারীত মণ্ডল নামটা ঠিকই মনে আছে।

–আপনে আমাকে তুমি করে বলেন। গেরুয়া পরেছি ময়লা কম হয় তাই, আমি অতি নগণ্য মানুষ। আমার পোলাডারে, মানে আমার ছেলেরে আপনাগো কাছে রেখে গেছিলাম, বাপ। হয়েও এতদিন তার কোনো খবর নিতে পারি নাই, সে কেমন আছে?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনন্দমোহন বললেন, আমি জানতাম, আপনি একদিন ফিরে আসবেন। আপনার ছেলে আপনার ছেলে, সে অনেকদিন হলো এখানে থাকে না।

–অন্য জাগায় বাসা ভাড়া নিছে?

আনন্দমোহন দ্বিধা করতে লাগলেন। হারীতকে দেখে পুরনো অপরাধবোধটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। সুচরিতের বাবাকে তিনি কী উত্তর দেবেন, সুচরিত বেঁচে আছে কি না তাও তিনি জানেন না।

চন্দ্রা গেছে নৈহাটির আশ্রমে, কালই তার ফেরার কথা। যা কিছু বলার চন্দ্রাই বলবে। তিনি ভাসা ভাসা ভাবে হারীতকে উত্তর দিলেন, সে যেন কোথায় আছে, আমি ঠিক জানি না, আমার মেয়ে জানে, আপনারা আসুন, ভেতরে এসে বসুন। ওরে বীরু, চা করতে বল তো!

চা খেতে খেতে হারীত চন্দ্রার আশ্রম বিষয়ে অনেক কথা শুনলো। তার ছেলের কথা যে এই ভদ্রলোক এড়িয়ে যাচ্ছেন তা বুঝতে হারীতের দেরি হলো না। হ্যাঁ, চন্দ্রা, নামটা মনে পড়েছে এবার, চেহারাটাও ফিরে এসেছে স্মৃতিতে। সেই ঠোঁটে রংমাখা, সিগারেট ফোঁকা মেয়েছেলেটি সন্ন্যাসিনী হয়েছে, এ তো ভারি আশ্চর্যের কথা!

আনন্দমোহন হারীতকে চন্দ্রার আশ্রমের ঠিকানা দিয়ে দিলেন। সেখানে অতিথিশালা আছে, হারীতরা রাত্তিরে থেকে যেতেও পারবে। কিন্তু হারীত পাতিপুকুরের দিকে গেল না। সে গেল কাশীপুরে।

সরকারদের যে বাগানবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছিল হারীত, সে বাড়িটি কিন্তু এখনো উদ্বাস্তুদের দখলেই। সে বাড়ির ভাঙা পাঁচিলের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়লো হারীত। যোগানন্দ এই বাড়ি দেখেনি, সে প্রথম থেকেই আশ্রয় পেয়েছিল কুপার্স ক্যাম্পে আর নবার তো জন্মই বাংলার বাইরে।

এখনকার রিফিউজি কলোনির চেহারা অনেকটা বদলেছে। প্রত্যেকটি পরিবারের টুকরো টুকরো জমিতে বেড়া দেওয়া আলাদা বাড়ি। কারুর কারুর বাড়িতে ইটের দেওয়াল। গাছ কাটা পড়েছে অনেক, মাঝখানের নাচঘরটি ধসে পড়েছে প্রায়। ভেতরে যে-সব বাচ্চাকাচ্চারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা একেবারে রোগা ডিগডিগে নয়। একটি রাজনৈতিক দলের পোস্টার পড়েছে অনেকগুলি দেয়ালে। ডান দিকের কোনের বাড়িটি ছিল হারীতের, সে বাড়ির চালে লকলক করছে লাউ ডগা, একটা বড় লাউয়ের গায়ে চুন লেপা। কে থাকে এখন ঐ বাড়িতে?

এই বাগান বাড়িটি হারীতের নেতৃত্বেই দখল করা হয়েছিল, এখন হারীতেরই এখানে স্থান নেই। পুলিশ তাকে কলকাতার সীমানার মধ্যেই ঢুকতে নিষেধ করেছিল!

নবার হাত ধরে হারীত বললো, আয় যোগা! অ্যারাও আমাগো মতন রিফুজি, আমাগো থিকা অ্যারা অনেক ভালো আছে মনে হয় না? আয় দেইখ্যা আসি!

যোগানন্দ বললো, বড়কর্তা, অরা কইলকাতায় থাকার জায়গা পাইলো, আর আমাগো অত দূরে খেদাইয়া দিল ক্যান?

উত্তর না দিয়ে হারীত হাসলো। জীবনে অনেক কেনরই উত্তর পাওয়া যায় না, তবু মানুষ। জিজ্ঞেস করে, কেন, কেন, কেন?

কলোনির ভেতরে ঢুকে একটা আমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে হারীত হাঁক দিল, জয় বাবা কালাচাঁদ! জয় বাবা কালাচাঁদ!

প্রথমে দৌড়ে এলো বাচ্চারা, ঘিরে দাঁড়ালো হারীতদের। তারপর কয়েকটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো মেয়ে বউদের দল। একজন মাঝবয়সী স্ত্রীলোক হারীতের সামনে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ও বাবা, আমার ভাগ্যটা একটু দেখে দাও। আমার ছেলেটা

কৌতুক করার জন্য হারীত তার হাতের রেখা দেখার ভান করে বললো, তোগো বাড়ি আছিল খুলনার বাঘমারা গেরামে, ঠিক কইছি না? তোর বাপ মরছিল জলে ডুইব্যা। তোর স্বামীর নাম বরদাকান্ত, না? সে কোথায়?

স্ত্রীলোকটি বিমূঢ়ভাবে বললো, সে তো বাজারে দোকান দিছে। কিন্তু আমার ছেলেটা—

হারীত অন্য একজনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, কী পীর মা, তোমার বাতের ব্যামো কমছে? আর তোমার বড় পোলা সুবল, সে ঘুমের মইধ্যে চিকখৈর দ্যায় এখনো?

সন্ন্যাসীর বেশে হারীতকে কেউ চিনতে পারছে না। সন্ন্যাসীর পূর্ব পরিচয় জানবার জন্য সহসা কেউ কৌতূহলও প্রকাশ করে না। হারীতের কথা শুনে সবাই হকচকিয়ে যাচ্ছে।

বিকেল পড়তে ফিরলো পুরুষেরা। তাদের মধ্যে একজন শুধু হারীতের কণ্ঠস্বর শুনে বিস্ময়ের সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো, সোনাকাকা? তুমি সাধু হইছো?

হারীত তার কাঁধে চাপড় মেরে বললো, নারে নেপু, আমি সাধু হই নাই। আমি সাধক কালাচাঁদের ভাবশিষ্য। তোরা সগগলডি এক সাথে আমার লগে লগে বল, জয় বাবা কালাচাঁদ! জয় বাবা কালাচাঁদ! তোরা যশোরের ত্রিকালজ্ঞ সাধক কালাচাঁদ জীউয়ের নাম শুনেছিস তো? তেনার একশো বৎসরের উপর বয়স, তিনি আমারে স্বপ্নে দেখা দিছিলেন, তিনি আমাগো কথা চিন্তা করেন। তিনি কইছেন, ওরে হারীত, তোগো সুদিন আসবে আবার!

এখানকার কেউই সাধক কালাচাঁদের কথা আগে শোনেনি বটে, কিন্তু এই অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পুরুষের কথা বিশ্বাস করতে কারুর দ্বিধা হলো না। তারা হারীতের কাছ থেকে তার গুরুর মাহাত্ম শুনলো।

তারপর অনেক সুখ-দুঃখের গল্প হলো। কে কে আছে, কে কে নেই। দণ্ডকারণ্যের অবস্থা কেমন? আন্দামানে যারা গেছে, তারা নাকি সত্যিই ভালো আছে? এই কলোনির উদ্বাস্তুদের অবস্থা মোটেই ভাল না, এখনও তাদের উৎখাতের চেষ্টা চলছে, সরকারি সাহায্য আর মেলে না। নিজেরাই কোনোক্রমে জীবিকার ব্যবস্থা করছে, তবে এখন পাশাপাশি কলোনির উদ্বাস্তুরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছে…

গোপাল নামে একজন একটু আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল, হারীত একসময় তার হাত ধরে বললো, তোর ভয় নাই রে, তোর ঘর আমি দখল করতে আসি নাই। আমরা আবার ফিরা যাবো।

গোপাল সঙ্গে সঙ্গে বললো, না, না, আপনে আইস্যা থাকেন না, যতদিন ইচ্ছা থাকেন।

হারীত বললো, না রে, আইলে আমি একা আমু না! পাকিস্তানে নাকি যুদ্ধ লাগছে আবার, তোরা শোনছোস কিছু? বর্ডারে নাকি আর পাহারা দেয় না?

নেপু লাফিয়ে উঠে বললো, সোনাকাকা, আমি গেছিলাম, আমি যশোরের মধ্যে ঢুকছিলাম! ঐ ধার থিকা দলে দলে মানুষ এদিকে আসত্যাছে, আমি গেছিলাম উল্টা দিকে।

স্বভাবনীরব যোগানন্দ এবার চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো, তুমি যশোরে ঢুকছিলা? দ্যাশের মাটি ছুঁইছো? কেউ কিছু কইলো না?

নেপু বললো, না, কেউ কিছু কইলো না। মোছলমানেরা পর্যন্ত খাতির করলো। হ্যাঁরা পাকিস্তান আর্মির নামে গালি দ্যায়, ইন্ডিয়ার প্রশংসা করে। এক মোছলমানের বাড়িতে বইস্যা খাইলাম।

যোগানন্দ চোখ বড় বড় করে বললো, আমি যাব। বড় কত্তা, আমি একবার আমাগো দ্যাশের মাটি ছুঁইতে যাবো! ভাবি নাই যে আর কোনোদিন…

হারীত বললো, হ, যামু, আমিও যামু, কাইল সকালেই, যশোরের মাটিতে একবার পা দিয়া কমু, জয় বাংলা!

২১. পেট্রাপোল স্টেশান দিয়ে

পেট্রাপোল স্টেশান দিয়ে অনেক দিন কোনো ট্রেন চলাচল করেনি, রেললাইনে মর্চে ধরে গেছে, টিকিট কাউন্টারে মাকড়সার জাল। সেই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মই এখন লোকে লোকারণ্য, এক দিকে জ্বলছে সদ্য পাতা চারটি উনুন, তার ওপর বড় বড় হাঁড়িতে হচ্ছে খিচুড়ি। দুটি প্ল্যাটফর্মেই কয়েক শো উদ্বাস্তু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে, চতুর্দিকে চ্যাঁচামেচি, হৈ-হট্টগোল, তারই মধ্যে একদল পুলিশবাহিনী এসে দক্ষিণের প্ল্যাটফর্মটি খালি করে দিল। এই পুলিশদের হাতে লাঠি ও বন্দুক আছে বটে, কিন্তু সেগুলি উঁচিয়ে ধরতে হলো না, একজন অফিসার হাতজোড় করে বিনীতভাবে বললো, আপনারা দয়া করে এই দিকটা খালি করে দিন, আমরা অনুরোধ করছি, লাইনের ওপর গিয়ে দাঁড়ান, সবাই দেখতে পাবেন!

কেউ আপত্তি করলো না। সকাল থেকেই রটে গেছে যে আজ একটা বিশেষ দিন। ছন্নছাড়া মানুষগুলোর চোখে মুখে উদ্বেগ ও প্রতীক্ষা। বাচ্চাকাচ্চারাও হঠাৎ কেঁদে উঠলে মায়েরা তাদের থামিয়ে দিচ্ছে। কোনো ট্রেন আসবে না, তাই লাইনের ওপর গিসগিস করছে মানুষ। একটু দূরে কারা যেন ঢাক বাজাচ্ছে, ঠিক দুর্গাপুজোর আগের আবাহনের বাজনা। উদ্বাস্তুদের মধ্যে কিছু ঢাকীও আছে নিশ্চিত।

যেটা এক সময়ে ছিল স্টেশন মাস্টারের-ঘর সেখানে এসে বসেছেন পশ্চিম বাংলা ও কেন্দ্রীয় সরকারের বড় বড় অফিসাররা। একটা ওয়্যারলেস সেটে অদ্ভুত ধাতব মনুষ্য কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। অল্প বয়েসী একটি ছেলে একটি অতিকায় কেটলি ও একসঙ্গে অনেকগুলো মাটির ভাঁড় হাতে নিয়ে এসে দিয়ে গেল চা।

বাংলাদেশ মিশানের কয়েকজন প্রতিনিধির জন্য সেই ঘরের বাইরে পাতা হয়েছে একটি বেঞ্চ, সেখানে দু’জন মাত্র বসে আছেন, তাঁদের পাশে এসে বসলেন মামুন ও প্রতাপ। দু’জনেরই হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, প্রচণ্ড গরমে এত তেষ্টা পেয়েছে যে গলা একেবারে শুকিয়ে কাঠ, কিন্তু জল খাবার উপায় নেই। সবাই এখানে জল খেতে নিষেধ করেছে, কারণ এখানকার শরণার্থী শিবিরগুলোতে কলেরা শুরু হয়ে গেছে। একটু আগে সব জায়গায় ছড়ানো হয়েছে। ব্লিচিং পাউডার, তার তীব্র গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে খিচুড়ি রান্নার গন্ধ।

বাংলাদেশ মিশানের একজন প্রতিনিধি গলাটা লম্বা করে ঝুঁকিয়ে মামুনের বদলে প্রতাপকে জিজ্ঞেস করলেন, কী মনে হয়, বাংলাদেশের স্বীকৃতি আজ ডিক্লেয়ারড হবে?

প্রতাপ বিনীতভাবে বললেন, আজ্ঞে, আমি তো বলতে পারবো না, আমি সে রকম কেউ

বস্তুত এই প্ল্যাটফর্মে ঢোকবার মুখে দু’জন পুলিশ অফিসার প্রতাপদের আটকে দিয়েছিল। মামুনের কাছে বাংলাদেশ মিশানের ছাপ দেওয়া আইডেনটিটি কার্ড দেখে তাঁকে বিনা বাক্যব্যয়ে ছেড়ে দিলেও প্রতাপকে আটকেছিল। মামুন তখন অনুরোধ করেছিলেন, ইনি আমার পুরনো ফ্রেন্ড, আমার সঙ্গে এসেছেন! প্রতাপের তুলনায় মামুনের এখানে সম্মান বেশি।

দু হাঁড়ি খিচুড়ি নেমে গেছে, দেরি করে আর লাভ নেই, স্বেচ্ছাসেবকরা পরিবেশন শুরু করে–দিল। ক্ষুধার্তদের লাইন সামলাতে প্ল্যাটফর্ম থেকে নীচে নেমে গেল কয়েকজন পুলিশ। যদিও তেমন কিছু ঠ্যালাঠেলি, হুড়োহুড়ি নেই, আজ যেন সবাই নিজে থেকেই সুশৃঙ্খল।

হঠাৎ একগাদা ক্যামেরাম্যান ছুটতে ছুটতে ঢুকে পড়তেই বোঝা গেল প্রধানমন্ত্রী এসে গেছেন। এই ফটোগ্রাফাররা সামনে তাকিয়ে পিছু হটে, নাচের ভঙ্গিতে লাফায় ও শরীর মোচড়ায়, কিন্তু কেউ পা পিছলে পড়ে যায় না।

শুরু হয়ে গেল কোলাহল, বাতাসে ছড়িয়ে গেল দারুণ বিমিশ্র এক শব্দতরঙ্গ। বেজে উঠলো শাঁখ, শোনা গেল উলুধ্বনি, গর্জে উঠলো স্লোগান, জয় বাংলা! ইয়াহিয়া হুঁশিয়ার, বাংলার মানুষ আছে তৈয়ার! ভারত সরকার জিন্দাবাদ!

মামুনদের সামনে দিয়েই হেঁটে গেলেন ইন্দিরা গান্ধী। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস, শরীরে এখনও পূর্ণ যৌবন, মুখের চামড়া মসৃণ, নাকটা ঈষৎ লম্বা, মাথার চুলের খানিকটা অংশ শুধু চমকপ্রদ ভাবে সাদা, একটা হালকা নীল রঙের তাঁতের শাড়ি পরে আছেন। গট গট করে হেঁটে এসে তিনি প্ল্যাটফর্মের একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়ালেন, একটুক্ষণ শুনলেন নানা রকমের স্লোগান, তারপর হাত তুলে শান্ত হবার ইঙ্গিত করলেন।

কিন্তু কেউ তাতে ভূক্ষেপ করলো না, ধ্বনি বাড়তেই লাগলো।

এদিকের প্ল্যাটফর্মে কোনো উদ্বাস্তুর থাকার কথাই নয়। তবু কী করে যেন ঢুকে পড়েছে এক বুড়ি। বয়েসের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে, মাথার চুল শনের মতন, ছেঁড়া ঝুলি ঝুলি একটা শাড়ি দিয়ে কোনোরকমে গা ঢাকা। কেউ তাকে লক্ষ করেনি কিংবা গ্রাহ্য করেনি, সে সোজা এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো ইন্দিরা গান্ধীর পায়ের ওপর। কেঁদে, ফুঁপিয়ে কী সব যেন বলতে লাগলো।

ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে চমকে গিয়ে পিছিয়ে গেলেন একটু। দু’জন সরকারী অফিসার বুড়িটাকে টেনে সরিয়ে দিতে গেল, ইন্দিরা গান্ধী তাদের নিষেধ করে বললেন, আপ উঠিয়ে, যো বোলনা হায়, আপ–

তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে, কৈশোরে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে শেখা বাংলাভাষা স্মৃতিতে এনে ইন্দিরা গান্ধী নরম সুরে আবার বললেন, আপনি উঠুন, বুড়ি মা! ভয় নেই, কিছু ভয় নেই!

বুড়ি হাউ হাউ করে কেঁদে বললো, আমার পোলাডারে মাইরা ফালাইছে! রাইক্ষসেরা আমাগো গেরামে আগুন জ্বালাইয়া দিছে।

পাশ থেকে একজন ইন্দিরা গান্ধীকে বুঝিয়ে দিল, পোলা মিনস ছেলে। সান। হার সান ওয়াজ মার্ডার অ্যান্ড দেয়ার ভিলেজ ডেস্ট্রয়েড বাই আরসন।

ইন্দিরা গান্ধী মাথা নাড়লেন। বুড়ি আবার বললো, মাগো, তোমার চরণে আশ্রয় নিছি। ছোট ছোট বাইচ্চারা সাথে আছে, পুতের বৌ, মাগো রক্ষা করো।

পাশের লোকটিকে অনুবাদের সুযোগ না দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী বললেন, বুড়িমা, আপনারা এ দেশের অতিথি, আর কোনো ভয় নেই!

জননী যেমন সন্তানকে আদর করে, কান্না থামিয়ে বুড়িটি সেইভাবে ইন্দিরা গান্ধীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।

সব স্লোগান, সব ধ্বনি স্তব্ধ হয়ে গেছে, সবাই দেখছে এই দৃশ্য। কিন্তু এতখানি নাটকীয়তা বোধহয় ইন্দিরা গান্ধীর পছন্দ হলো না, তিনি বুড়িকে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে! তারপর পেছন ফিরে দ্রুত হেঁটে গেলেন খিচুড়ির হাঁড়ির দিকে।

স্বেচ্ছাসেবকরা পরিবেশন বন্ধ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্দিরা গান্ধী একজনের হাত থেকে পেতলের বড় হাতাটি নিয়ে হাঁড়িতে ডুবিয়ে তুললেন খানিকটা খিচুড়ি। অন্য হাতে সেই গরম খিচুড়িই খানিকটা টিপে দেখে একজন স্বেচ্ছাসেবককে ভর্ৎসনার সুরে বললেন, নট পারফেক্টলি বয়েলড়।

অন্য একটি হাঁড়ি থেকে আবার খিচুড়ি তুলে টিপে দেখে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজেই পরিবেশন করতে গেলেন লাইনের প্রথম লোকটিকে।

লাইনের প্রথমে যে দাঁড়িয়ে আছে সে একজন বাইশ-তেইশ বছরের যুবক, খালি গা, কালো। রঙের চকচকে শরীর, বাঁ হাতে একটা ব্যান্ডেজ। সে সেই আহত হাতটি উঁচু করে তুলে চেঁচিয়ে। বললো, আমাগো খাদ্য চাই না, আমাগো অস্ত্র দ্যান, আমরা ফিরা গিয়া দেশ স্বাধীন করবো!

ইন্দিরা গান্ধী তার চোখে চোখ রেখে বললেন, আগে খেয়ে নিন!

মামুন ফিসফিস করে প্রতাপকে বললেন, একটা ব্যাপারে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি, ওনার কাছাকাছি কোনো সিকিউরিটির লোক নাই? এত বড় দেশের প্রধানমন্ত্রী, তিনি এরকম ভাবে লোকজনের ভিড়ে চলাফিরা করেন! পাকিস্তানে এটা চিন্তাই করা যায় না!

প্রতাপ বললেন, তোমাদের ওখানে আর্মি রুল, তারা সাধারণ মানুষের কাছে আসতে ভয় পায়। কিন্তু ডেমোক্রাসিতে সাধারণ মানুষকে ভয় পাবার তো কোনো কারণ নেই।

মামুন বললেন, ভদ্রমহিলা খুবই তেজস্বিনী, তবুও রিস্ক আছে। ধরো, এখানে কিছু পাকিস্তানী এজেন্টও তো ঢুকে পড়তে পারে? যদি কেউ একটা গুলি-টুলি ছোঁড়ে…পাকিস্তানীরা এখন ইন্ডিয়াতে একটা কমুনাল রায়ট বাধাবারও খুব চেষ্টা করবে, যদি তারা সাকসেসফুল হয়, তাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড়!

প্রতাপ কোনো মন্তব্য করলেন না।

মামুন প্রসঙ্গ বদলে প্রতাপকে একটু খোঁচা মারার জন্য বললেন, তুমি তো খুব গর্বের সুরে ইন্ডিয়ায় ডেমোক্রাসির কথা বললে। খাঁটি গণতন্ত্রই যদি হবে, তাইলে জওহরলাল নেহরুর মেয়ে প্রাইম মিনিস্টার হয় কী করে? দিল্লির মসনদে আবার একখান ডাইনাস্টি?

প্রতাপ বললেন, সেটা হয়েছে, তার কারণ, এ দেশে আর শক্ত মেরুদণ্ডওয়ালা কোনো পুরুষ নেই বোধহয়। অন্তত কংগ্রেসী নেতাদের মধ্যে নেই! মোরারজি একটু চেষ্টা করেছিলেন রুখে দাঁড়াবার, সাপোর্টার পেলেন না!

–ইন্দিরার সঙ্গে যে আর একজন মহিলা এলেন, উনি কে?

–উনি পদ্মজা নাইডু। এখন ওয়েস্ট বেঙ্গলের গভর্নর। সরোজিনী নাইডুকে মনে আছে তো, তাঁর মেয়ে।

–ও, সরোজিনী নাইড়, নাইটিঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া! তাঁর মেয়ে! আর যে ভদ্রলোক ওনার সঙ্গে গল্প করছেন মাথা দুলায়ে দুলায়ে…

–শোনো, তোমাকে চিনিয়ে দিচ্ছি। অজয় মুখার্জিকে তো চিনতে পারছো, মাথায় পাকা চুল, এখন আমাদের চীফ মিনিস্টার, অবশ্য কতদিন থাকবেন তার ঠিক নেই। তার পাশে যে। হ্যান্ডসাম লোকটি, হেসে কথা বলছেন, উনি সিদ্ধার্থ রায়, সেন্ট্রালের শিক্ষামন্ত্রী। ইনি কে জানো তো? সি আর দাশ, মানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নাতি।

–মতিলাল নেহরুর নাতনী আর সি আর দাশের নাতি?

–এককালের কংগ্রেসের সেই প্রো-চেইঞ্জার আর নো-চেইঞ্জারদের দলাদলির কথা মনে আছে? তখন মতিলাল আর চিত্তরঞ্জন হাতে হাত মিলিয়েছিলেন, এখন তাঁদের নাতি-নাতনীরা দেশ শাসন করছে।

–সুভাষবাবু-শরবাবুদের ফ্যামিলির কেউ লাইম লাইটে নাই?

কয়েকজনকে খিচুড়ি পরিবেশন করার পর ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সহচরদের অনুরোধে স্টেশন মাস্টারের ঘরে একটু বিশ্রাম করতে গিয়েছিলেন। মে মাসের অসহ্য গরম, আজ যেন রোদের আঁচ বেশী বেশী, তাঁর সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে গেছে।

একটু পরেই খাদ্য পরিবেশন বন্ধ রইলো। ইন্দিরা গান্ধী আবার বেরিয়ে এলেন বক্তৃতা দিতে। মুহুর্মুহু শ্লোগান শুরু হলো আবার, রিপোর্টাররা নোট বই খুললো। মামুন-প্রতাপরাও কথা থামিয়ে উৎকর্ণ হলেন।

সদ্যস্থাপিত মাইক্রোফোনের সামনে একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে বাংলায় বললেন, মা ও ভাই-বোনেরা! আপনারা আমাদের অতিথি, আমাদের বন্ধু! আমি বেশী কথা বাংলায় বলতে পারি না, সে জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি আস্তে আস্তে হিন্দীতে বলছি!

তারপর তিনি বললেন, ভারত গরিব দেশ, তবু সে যথাসাধ্য অতিথিদের সেবা করবে। গত পঁচিশ বছরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু এসেছে ৭০ লক্ষ, আবার পঁচিশে মার্চের পর মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই উদ্বাস্তু এসেছে প্রায় ২০ লক্ষ এবং প্রতিদিন আসছে। যারা অত্যাচারিত, নিপীড়িত হয়ে ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিতে চায় তাদের একজনকেও ফেরানো হবে না। তবে সারা বিশ্বকে বুঝতে হবে, এই শরণার্থীদের খাওয়ানো-পানো ভারতের একার দায় নয়। এই উদ্বাস্তু সমস্যা একটা আন্তজাতিক সমস্যা! পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রগুলি এখনো চুপ করে আছে। কেন? …পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে আত্মমর্যাদার লড়াইতে নেমেছে, আশা করি তারা সার্থক হবে। অদূর ভবিষ্যতেই সকলে দেশে ফিরে যেতে পারবে…।

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের কোনো প্রসঙ্গই উঠলো না। বাংলাদেশ নামটাও তিনি একবারও উচ্চারণ করলেন না! তাঁর অন্যান্য আশ্বাসবাক্য ভরা বক্তৃতা শুনেও অনেকের মুখে নেমে এলো হতাশার ছায়া!

ইন্দিরা গান্ধী পেট্রাপোল স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেলেন ইটখোলা ক্যাম্পে। সেখানেও ঐ একই বক্তৃত। কয়েকজন চেঁচিয়ে সরাসরি বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিদানের প্রশ্নটি তুললেও তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

সেখান থেকে তিনি এলেন বনগাঁ হাসপাতালে।

ছোট্ট, ঘুমন্ত শহর বনগাঁ যেন ভোজবাজিতে রাতারাতি বদলে গেছে। চতুর্দিকে শুধু মানুষ। আর মানুষ, অসংখ্য মানুষ। একদিকে যেমন উদ্বাস্তুদের স্রোত, তেমনই আবার কলকাতা থেকে আসছে নানান সেবা প্রতিষ্ঠানের লোক ও সরকারি কর্মচারীরা। এরই মধ্যে আবার দেখা যায়, অলিভ রঙের শার্ট পরা, মাথায় বড় বড় চুল তরুণ যুবকদের, তাদের কাঁধে ঝুলছে রাইফেল কিংবা কোমরে রিভলভার। হঠাৎ এক একটি দিকে সেইসব তরুণেরা গলা ফাটিয়ে জয় বাংলা ধ্বনি দিতে দিতে চলে যায়। এই শহরে, গাড়ি ও ফেরিওয়ালার সংখ্যাও অনেক বেড়ে গেছে।

হারীত, যোগানন্দ, নবা ও নেপুদের দলটি বনগাঁ হাসপাতালের কাছে এক ঝলক শুধু দেখতে পেল ইন্দিরা গান্ধীকে। একটা খোলা জিপে এসে তিনি হাসপাতালে আহত ও রোগার্তদের সান্ত্বনা দিতে চলে গেলেন। হারীতের খুব ইচ্ছে ছিল ইন্দিরা গান্ধীর সামনে গিয়ে দুটো কথা জিজ্ঞেস করার, কিন্তু এতই ভিড়ের চাপ যে সে কাছ ঘেঁষবার সুযোগই পেল না। সে হাত তুলে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো!

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের কড়া পাহারা হরিদাসপুর থেকেই। পাকিস্তানী আর্মি নাকি সীমান্তের ওধারে এসে ঘাঁটি গেড়েছে, গত দু’দিন ওদিক থেকে কোনো উদ্বাস্তুও আসছে না, এদিক থেকে ওদিকে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। উদ্বাস্তুরা আসছে অন্যদিক থেকে, রাতের অন্ধকারে নদী পেরিয়ে।

কোনো উদ্বাস্তু শিবিরেও হারীতদের প্রবেশ অধিকার নেই। এবারের সব শরণার্থীদের আলাদা পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে যাতে বাইরের কোনো লোক মিশে যেতে না পারে সেদিকেও নজর রাখা হয়েছে।

তবু বাজার এলাকায় কিছু কিছু যশোর-খুলনার মানুষদের সঙ্গে আলাপ হলো হারীতের। তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের ভেতরের খবর শুনলো। সকলের মুখেই প্রায় এক কথা। কোন অপরাধে এবং কিসের জন্য যে পাকিস্তানী আর্মি সাধারণ মানুষকে মারছে আর গ্রামে। আগুন লাগাচ্ছে, সেটাই তারা বুঝতে পারছে না! হিন্দুদের খুঁজে খুঁজে বেশী মারছে ঠিকই, কিন্তু মুসলমানদেরও তো রেয়াৎ করছে না? শেখ মুজিব ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন বলে এরা মেরে মেরে বাঙালীদের শেষ করে দেবে?

ফেরার পথে ট্রেনের কামরায় তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে পেল হারীরা। একটা জানলার দু’ধারে তারা বসেছে, লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়েছে পা। মুখে অল্প অল্প দাড়ি, তাদের জুতোয় কাদা মাখা, প্যান্ট-শার্টও ঘেঁড়া-ময়লা, তবু দেখলে সচ্ছল ঘরের ছেলে মনে হয়। প্রকাশ্যে তারা কোনো অস্ত্র বহন করছে না, সিগারেট টানছে।

বিকেল হয়ে এসেছে, কামরায় বেশী ভিড় নেই। একজন টিকিট চেকার উঠে প্রথমেই অন্যদের পাশ কাটিয়ে তিনটি ছেলের কাছে এসে বললো, টিকিট!

ছেলে তিনটি কথা থামিয়ে চুপ করে গেল। ওদের মধ্যে যার বয়েস একটু বেশী, সে থুতনিতে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, আমাদের কাছে টিকিট নাই।

চেকারটি বিদ্রূপের সুরে বললো, টিকিট নাই তো ট্রেনে উঠেছেন কেন? এটা কি বাড়ির বৈঠকখানা?

ছেলে তিনটি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। বড় ছেলেটিই আবার কৌতুকের সুরে বললো, বাড়ির বৈঠকখানায় বসি নাই অনেকদিন। আমরা ফ্রিডম ফাঁইটার। মুজিব নগরে যাবো, বডার থেকে বলে দিয়েছে যে পয়সা না থাকলে টিকিট না কাটলেও চলবে।

–ফ্রিডম ফাঁইটার? সঙ্গে কোনো আইডেনটিটি কার্ড আছে?

–দেখি কী আছে!

একটি ছেলে কাত হয়ে প্যান্টের পকেট থেকে প্রথমে বার করলো একটা সিগারেটের প্যাকেট, একটা দামী লাইটার, কয়েকটি বাংলাদেশী টাকা। একটা রিভলভার, কয়েকটা চিউয়িং গাম, গোটা পাঁচেক বুলেট…। ম্যাজিসিয়ানের ভঙ্গিতে সে একটার পর একটা জিনিস পাশে নামিয়ে রাখতে লাগলো। তারপর কৃত্রিম হতাশার সুরে বললো, নাঃ, আইডেনটিটি কার্ড তো কিছু নাই!

চেকারটি চোখ বড় বড় করে রিভলভার ও কার্তুজগুলো দেখলো। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনারা কোথা থেকে আসছেন, আপনাদের নাম কী?

লম্বা ছেলেটি বললো, এ হে হে, ফ্রিডম ফাঁইটারদের নাম জিজ্ঞাসা করতে নাই। ধরে ন্যান, আমাদের নাম রহিম, করিম আর রাম। নিবাস বাংলাদেশ!

চেকারটি এবার ওদের আরও কাছে এসে অত্যুৎসাহী মুখ করে বললো, জানেন আমাদের বাড়ি ছিল খুলনায়, বাগেরহাট। ওদিকের খবর কী? পাকিস্তানী আর্মিদের আপনারা হঠাতে পারবেন?

একটি ছেলে বললো, বাগেরহাট আমি চিনি।

আর একজন বললো, আপনাদের প্রাইম মিনিস্টার তো স্বাধীন বাংলাদেশকে এখনো রেকগনিশান দিচ্ছেন না। ঠিকঠাক আর্মস সাপ্লাই পেলে আমরা হানাদার বাহিনীকে দশদিনে সাবাড় করে দেবো।

–পারবেন? সত্যি পারবেন?

–ইন্ডিয়ার হেল্প না পেলেও আমরা পারবো। একটু বেশী সময় লাগবে, আরও কিছু মানুষ মরবে!

–আচ্ছা ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমরা আমাদের বাড়িঘর দেখতে যেতে পারবো? তখন পাকিস্তানীদের মতন আপনারাও আমাদের মারতে আসবেন না তো?

–আপনাদের বাড়িঘর দেখতে যাবেন, নিশ্চয় যাবেন! তবে শুধু দেখতেই যাবেন, ফিরে আবার সব কিছু দাবি করলে মুশকিল হবে!

–না, না, থাকতে যাবো না, শুধু একবার দেখবো। আমাদের পুকুরের চারদিকে চারটে শিবমন্দির ছিল, এখনও সেসব আছে?

ট্রেন একটা স্টেশানে থেমেছে, কিছু যাত্রী ওঠা-নামা করলো এখানে, ওদের কথা আর শোনা গেল না। হারীত ভাবলো, চেকারটি চলে গেলে সে ঐ ছেলেটির সঙ্গে কথা বলবে, কিন্তু সেটাও সম্ভব হলো না। চেকারটি এবার চলে এলো তাদের দলটির কাছে। যেন সে এক নজর তাকিয়েই বুঝতে পারে, কাদের কাছে টিকিট নেই।

পশ্চিমবাংলায় সাধুর পোশাকের অত খাতির নেই। চেকারটি হারীতকে বললো, এই যে সাধুবাবা, টিকিট দেখি!

হারীত বললো, সার, আমরা রিফুজি। আমাগো পয়সা নাই!

চেকারটি বললো, রিফিউজি তো এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? ক্যাম্প ছেড়ে আপনাদের তো। বাইরে যাবার নিয়ম নেই। কলকাতায় গিয়ে ভিড় বাড়াতে কে বলেছে?

হারীত কোনো তর্ক করার সুযোগই পেল না। চেকারটি প্রায় ঘাড় ধরেই ওদের নামিয়ে দিল হাবড়া স্টেশানে। সত্যিই সে নবার ঘাড় ধরে ঠেলা দিয়েছিল।

ট্রেনটি চলে যাবার পর হারীত প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে বললো, যাঃ কয়লা! আমরা পুরানো রিফিউজি, তাই আমাগো কোনো খাতির নাই!

যোগানন্দ বললো, বড়কর্তা, এখন কী হবে? এ কোথায় নামাইলো?

নেপু বললো, কী আর হবে? আবার পরের ট্রেনটায় উইঠ্যা পড়বো। সব গাড়িতে চ্যাকার থাকে না।

হারীত বললো, জয় বাবা, কালাচাঁদ! ল্যাংটার নাই বাটপাড়ের ভয়! আমাগো আর কী হবে, যতবার নামাইবে, ততবার নামবো। আবার উইঠ্যা পড়বো! ঠিক কইছস, নেপু! আয় জিলাপি খাই! ট্রেনে টিকিট কাইট্টা পয়সা নষ্ট করোনের চাইয়া জিলাপি খাওয়া অনেক ভালো! কী কস, নবা?

আর বিশেষ কিছু ঝকমারি হলো না অবশ্য। পরের ট্রেন এলো শেষ বিকেলে, তাতে যাত্রী আরও কম। হারীত উঠে বসেই একটা গান ধরলো : “শ্মশান ভালোবাসিস বলে, শ্মশান করেছি হৃদি, শ্মশানবাসিনী শ্যামা নাচবি বলে নিরবধি…”

তেমন সুর নেই গলায়, কিন্তু জোর আছে। কয়েকজন ভক্ত জুটে গেল আশেপাশে। পর পর বেশ কয়েকটা গান গেয়ে গেল সে। এইরকম ভক্ত পরিবৃত অবস্থায় কোনো টিকিট চেকার কি তাকে নামিয়ে দিতে পারবে? আর এলোই না কেউ।

হারীতের দলটি নেমে পড়লো দমদম স্টেশানে। কাশীপুরের কলোনিতে পৌঁছোতে হলে এখান দিয়েই যেতে হবে, কিন্তু হারীত এখন যাবে পাতিপুকুরের আশ্রমে। যোগানন্দ আর নবাকে নেপুর সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়ে সে হাঁটতে শুরু করলো।

আজকের সীমান্তের অভিজ্ঞতা খুব আশাপ্রদ নয়। পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে এখনই ফিরে যাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই, অদূর ভবিষ্যতেও কী হবে তা বলা যায় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও কি ফেরা যাবে? সে তখন দেখা যাবে! এখন আর একটি কাজ করা যায়। পশ্চিমবাংলার রিফিউজি কলোনিগুলো ঘুরে ঘুরে একটা যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা অন্তত করা উচিত। যাদের দণ্ডকারণ্যে পাঠানো হয়েছে, তাদের কথা কি এখানকার সকলে ভুলে গেছে? তারা মরলো কি বাঁচলো, সেই খবরও কেউ রাখবে না? এখানকার রিফিউজিদের মধ্যে শুরু কালাচাঁদের বাণী প্রচার করে তাদের বাঁধতে হবে এক সূত্রে।

সন্ধের পর হারীত এসে উপস্থিত হলো পাতিপুকুরের নারী কল্যাণ আশ্রমে। এখানে সবে আরতি শুরু হয়েছে, আশ্রমের বাইরে তিন চারখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে। ভেতরে এসে হারীত দেখতে পেল দেবদেউলের সামনে উপবিষ্ট গেরুয়াবসনধারিণী চন্দ্রাকে। পিঠের ওপর খোলা চুল, চোখ দুটি ভাবের ঘোরে আচ্ছন্ন। যেন এখানে তার বিশেষ অধিকার আছে, এই ভঙ্গিতে হারীত চলে এলো একেবারে সামনে। ঘণ্টাধ্বনি ও নামগান অগ্রাহ্য করে সে বেশ জোরে বলে উঠলো, নমস্কার, দিদিমণি!

চন্দ্রা চোখ মেলে হারীতকে দেখলো, তার মুখে কোনো বিস্ময় বা চাঞ্চল্য ফুটলো না, সে মৃদু স্বরে বললো, হারীত এসেছো? বসো!

অর্থাৎ চন্দ্রা তার বাবার কাছ থেকে আগেই সব শুনেছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই, তাই হারীত বসে পড়লো সিঁড়ির কাছে। ধুলোর ধোঁয়ায় তার চোখ জ্বালা করে উঠলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে অন্য লোকগুলোর মুখ দেখার চেষ্টা করলো। সুচরিত কোথাও নেই।

আরতি শেষ হবার পর প্রসাদ বিতরণ হলো। এখানে কী শান্ত, ভাবগম্ভীর পরিবেশ! দুপুরবেলা হারীত সীমান্তে যে দৃশ্য দেখে এসেছে, লক্ষ অসহায় মুখ, ক্ষুধা, অসুখ, অনিশ্চয়তা, তার সঙ্গে এখানকার কোনো মিলই নেই। এরা যেন কেউ জানেই না, মাত্র পঞ্চাশ-ষাট মাইল দূরে কী ঘটছে।

চন্দ্রা চলে গেল ভেতরে। হারীত ভাবলো, সেও চন্দ্রাকে অনুসরণ করবে কি না, কিন্তু কয়েকজন নারী ও পুরুষ বিনা পায়ের শব্দে ভেতর থেকে আসছে ও যাচ্ছে, তাদের ভঙ্গি দেখেই মনে হয় বিনা অনুমতিতে কেউ ভেতরে যায় না।

হারীত ঠিকই করে ফেললো, সে মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর চাচামেচি শুরু করবে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে, এই আশ্রমের সবটাই ভণ্ডামি। ধনী ব্যক্তিদের ধর্ম বিলাসিতা।

একটু পরেই একজন বিধবা মহিলা এসে বললো, আসুন, আপনাকে চন্দ্রা-মা ডাকছেন!

তার সঙ্গে সঙ্গে হারীত একটা অফিস ঘর পেরিয়ে, উঠোনের পাশ দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় চলে এলো। সেই ঘরের মেঝেতে একটি বাঘ-ছালের ওপর বসে আছে চন্দ্রা। ঘরের চারটি দেয়াল সাদা ধপধপে, কোনো আসবাব সেখানে নেই।

চন্দ্রার সামনে একটি পাথরের থালা ভর্তি ফল ও মিষ্টি। একটি শ্বেত পাথরের গেলাস ভর্তি জল। চন্দ্রা সুমিষ্ট স্বরে বললো, এসো, হারীত, বসো!

হারীত হাঁটু গেড়ে বসলো। তার নিজের অঙ্গেও সন্ন্যাসীর বেশ, সে অন্য কোনো সন্ন্যাসিনীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে না। সে হাত জোড় করে বললো, নমস্কার। ভালো আছেন। আপনি? আমি আমার ছেলেটার খবর নিতে আসছি!

চন্দ্রা বললো, হ্যাঁ, সব কথা হবে। আগে এগুলো খেয়ে নাও! হারীত একটুও দ্বিধা করলো না। ভালো খাবার পেলে সে অগ্রাহ্য করবে কেন? প্রথমেই এক চুমুকে জলটা শেষ করে বললো, আর একটু জল দিতে বলেন। তারপর সে একটা সন্দেশ মুখে ভরলো।

চন্দ্রা জিজ্ঞেস করলো তুমি কার কাছে দীক্ষা নিয়েছো, হারীত?

হারীত বললো, কাউর কাছে না। আমার পোশাকটাই শুধু রঙীন। আমি আপনেরে শেষ যখন দেখি, তখন আপনি অন্যরকম ছিলেন। আপনি কি শ্রীরামকৃষ্ণ-বেলুড় মঠের

চন্দ্রা বললেন, না, আমারও শুধু বসন রাঙানোই বলতে পারো।

–আপনি যোগিনী হইলেন কেন?

–সত্যি কি যোগিনী হয়েছি? ইচ্ছে করলেই কি হওয়া যায়?

–আমার ছেলেটা কি মরে গেছে?

–হারীত, তুমি যদি আমার নামে অভিযোগ জানাও, আমি মাথা পেতে নেবো। তোমার ছেলেকে আমি নিজের কাছে রেখেছিলাম, তাকে লেখাপড়া শেখাবো, দেশের কাজে লাগাবো, এই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি পারিনি। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। ভালো মাস্টার রেখে তাকে পড়ানো হচ্ছিল, কিন্তু আকাশের চিলকে কি খাঁচায় পোষ মানানো যায়? সে থাকলো না।

–সে কিসে মরলো?

–কে বললো, সে মারা গেছে? সে আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু সে কি সহজে হার স্বীকার করার ছেলে? সে উধাও হয়ে গেল বটে, কিন্তু কোনো না কোনো ভাবে সে বেঁচে থাকবেই জানতাম। কিন্তু তার পরিণতি যে এই হবে–

–সে চোর-ছ্যাঁচ্চোড় হইছে?

–সবাই তাকে বলে গুণ্ডা। ল্যাঙা গুণ্ডা। সে নাকি কথায় কথায় ছুরি চালায়। এখন সে পলিটিক্যাল পার্টির হয়ে ভাড়া খাটে। তার একটা দল আছে।

থালাটা প্রায় চেটেপুটে শেষ করে হারীত দ্বিতীয় গেলাস জল খেল। তারপর পরিতৃপ্তির সঙ্গে বললো, আঃ! বড় ভালো লাগলো। ছেলেটা তাইলে মরে নাই? আপনের বাবার কথা শুনে মনে হইছিল… কোথায় গ্যালে তারে পাওয়া যাবে?

চন্দ্রা মুখ নীচু করে বললো, তা তো আমি জানি না। লোকে নানান কথা বলে। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল মাস ছয়েক আগে। সে একা হঠাৎ এই আশ্রমে এসে হাজির হয়েছিল একদিন ভোরে। তখনও কেউ জাগেনি। আমি বাগানে ফুল তুলছি, হঠাৎ দেখি সামনে সুচরিত।

চন্দ্রা মুখ তুলে হারীতের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর খুবই দুঃখিত ভাবে বললো, আমার ওপর তার কেন যে এত রাগ তা জানি না। তাকে দেখে আমি খুব খুশী হয়েছিলাম, ফুলের সাজি ফেলে তাকে ধরে বলেছিলাম, সুচরিত, তুই? ওমা, এতদিন। কোথায় ছিলি? সে আমার কথার কোনো জবাব দিল না, খপ করে আমার হাত চেপে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল।

হারীত জিজ্ঞেস করলো, আপনাকে সে চিনেছিল? সে জানতো যে আপনি যোগিনী হয়েছেন?

–হয়তো সে জানতো না। কিন্তু আমাকে চিনবে না কেন? আমার কি কিছু বদল হয়েছে? সেই সকালবেলাতেই সুচরিতের চোখ টকটকে লাল, মুখে ভকভক করছে নেশার গন্ধ, বুঝলে হারীত, সে কোনো কারণে আমার ওপর খুব রেগে ছিল, আমাকে জোর করে টেনে আশ্রমের বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, ভাগ্যিস সেইসময় আশ্রমের দারোয়ান দেখে ফেললো! কেন আমার ওপর তার এত রাগ থাকবে? তুমি কিছু বলতে পারো? সেদিনের কথা ভাবলেই আমার এত কষ্ট হয়। আর সে আসেনি।

হারীতের কোনো উত্তর দেওয়া হলো না। এই সময়ে ঘরে ঢুকলেন অসমঞ্জ। হারীতের। দিকে না তাকিয়ে তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, চন্দ্রা, ডি সি নর্থ মিঃ চৌধুরী তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চান, বলছেন খুব জরুরি!

চন্দ্রা ভ্রূকুটি করে বললো, পুলিশ? আশ্রমের মধ্যে পুলিশ আসবে কেন? না বলে দাও, দেখা হবে না!

অসমঞ্জ বললেন, তা হলে কি তুমি গেটের বাইরে যাবে?

–তার মানে?

–তোমার নামে ওয়ারেন্ট আছে। আমাকে দেখালেন।

–আমার নামে ওয়ারেন্ট? তুমি কী বলছো অসমঞ্জ? লোকটা তোমাকে ভয় দেখাচ্ছে!–আমি নিজে সেটা হাতে নিয়ে দেখেছি, চন্দ্রা।

–তা হলে তাকে ডাকো।

কয়েক মুহূর্ত বাদেই দু’জন পুলিশ অফিসার ঢুকলেন সেখানে। তাঁরা জুতো খুলে রাখলেন বাইরে। প্যান্ট পরা সত্ত্বেও তাঁরা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে ভক্তি ভরে হাত জোড় করে প্রণাম করলেন চন্দ্রাকে। একজন চকিতে একবার দেখে নিলেন হারীতকে। অন্যজন নম্র গলায় বললেন, আমার নাম বিনায়ক চৌধুরী, আমি ডি সি নর্থ, আর ইনি এস বি ডিপার্টমেন্টের অমরেশ দাশগুপ্ত। আপনাকে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে লজ্জিত। বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি। আপনার কাছে।

মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ বলেই হারীতের মুখের বিবর্ণতা বোঝা যাচ্ছে না। বুক ঢিপঢিপ করছে। তার। পুলিশ দেখলেই তার হৃৎকম্প হয়। শেষ পর্যন্ত এখানেও পুলিশ।

নিজেকে খানিকটা সামলাবার চেষ্টা করে সে ঈষৎ কাঁপা গলায় বললো, আমি তা হলে উঠি, মা জননী?

অমরেশ দাশগুপ্ত মুখ ফিরিয়ে বললেন, না, আপনিও বসুন। আপনার সঙ্গেও কথা আছে। হারী বললো, আমি এনার সাথে শুধু দেখা করতে এসেছিলাম!

অমরেশ দাশগুপ্ত হেসে বললেন, জানি। আপনার নাম হারী মণ্ডল তো? সুচরিত মণ্ডল আপনার ছেলে?

চন্দ্রা বললো, আমি সুচরিতের কোনো খবর জানি না। সে অন্তত ছ’মাসের মধ্যে এখানে আসেনি!

বিনায়ক চৌধুরী বললেন, আমরা সুচরিতের খোঁজে এখানে আসিনি। অত সামান্য ব্যাপারে আপনাকে ডিসটার্ব করতাম না। আপনি বেশ ভালোই তো আশ্রম চালাচ্ছিলেন। এর মধ্যে আবার নকশালদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে গেলেন কেন? আমরা ধর্মস্থানে এসে উৎপাত করতে একেবারেই চাই না, বিশ্বাস করুন। কিন্তু আপনার আশ্রমটা সার্চ করতে আমরা বাধ্য!

চন্দ্রা রেগে উঠে বললো, আমার আশ্রম সার্চ করবেন মানে? কী অধিকার আছে আপনাদের? কোর্ট থেকে অর্ডার এনেছেন?

বিনায়ক চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বাধা দিলে আমাদের কাজটা আরও আনপ্লেজান্ট হবে। আমরা পাকা খবরটবর না নিয়ে তো আসিনি। আপনি বড় ভুল করে ফেলেছেন, চন্দ্রাদেবী।

তারপর তিনি পেছন ফিরে বললেন, অসমঞ্জবাবু, আমাদের বাকি লোকদের ডাকুন!

২২. গোল্ডার্স গ্রীনে তুতুলের অ্যাপার্টমেন্ট

গোল্ডার্স গ্রীনে তুতুলের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় তিনবার টোকা মারলো আলম। এখন সকাল সাড়ে আটটা, এই বছরের মধ্যে এমন ঝকঝকে সোনালি রোদ আর ওঠেনি। গ্লোরিয়াস সান সাইন যাকে বলে! এরকম রোদ দেখলেই মনটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে, বাড়ি ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। ইংরেজরা দেখা হলেই কেন আবহাওয়ার কথা বলে, তা এই সব দিনে। বোঝা যায়। এই দ্বীপভূমিতে রোদ ওঠা-না-ওঠায় অনেক তফাত! মেঘলা কিংবা কুয়াশাভরা দিনে মনের মধ্যে একটা অহেতুক বিষণ্ণতা জমতে থাকে। সুইডেনে একটানা প্র প্র কয়েকদিন মেঘলা থাকলে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে যায়।

কোনো সাড়া না পেয়ে ভুরু কোঁচকালো আলম। যদিও কলিং বেল আছে, তবু দরজায় টোকা মারা তার স্বভাব। শিস দিয়ে একটা গান গাইতে গাইতে আলম আবার টোকা দিল। তিনবার। এত সকালেই তুতুল বেরিয়ে গেছে? তার তো আজ বারোটার আগে হাসপাতালে ডিউটি নেই।

তবু তুতুল শপিং করতে যেতে পারে। কিংবা গতকাল তো ফোনে বলেছিল ওর ত্রিদিবমামা

শহরে এসেছেন, তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে গেছে হয়তো।

এই অ্যাপার্টমেন্টের একটা চাবি থাকে আলমের কাছে। তুতুল বাইরে গেলেও সে এখানে অপেক্ষা করতে পারে। খুট করে দরজাটা খুলে সে ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল। তুতুল ঘুমোচ্ছে!

তুতুলের গায়ের ওপর রূপোলি পাড় দেওয়া একটা সমুদ্রের মতন নীল রঙের কম্বল। শীত-গ্রীষ্ম বারো মাসই তুতুল রাত্তিরে ঘরের হিটিং অফ করে দেয়। বাইরে রোদ থাকলেও তুতুলের ঘরটা এখনও ঠাণ্ডা। সমস্ত পর্দা টানা, তাই আধো অন্ধকার।

একটা পর্দা সরিয়ে দিল আলম। রোদের রেখা সোজাসুজি গিয়ে পড়লো তুতুলের মুখে। তাতেও তার ঘুম ভাঙলো না দেখে আলম বুঝলো, তুতুল স্লিপিং পিল খেয়েছে। ইদানীং প্রায়ই তার ঘুম আসে না বলে ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে হয়।

আলম এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। যেন এক ঘুমন্ত রাজকন্যা। নিঃশ্বাসে সামান্য দুলে উঠছে বুক

মাথার ঈষৎ কোঁকড়া চুল ছড়িয়ে আছে বালিশের ওপর। অনেকগুলি স্বপ্নের রেশ এখনো লেগে আছে মুখশ্রীতে। শিয়র ও পায়ের কাছের সোনার কাঠি রূপোর কাঠি বদলাবদলি না করে দিলে এই কন্যা জাগবে না।

আলম ভাবলো, এই মেয়েটি তার নিজস্ব। পৃথিবীতে এমন কোনো কথা নেই যা সে তুতুলকে বলতে পারে না। সে খুব ভালো করেই জানে, তুতুল তার জন্য প্রাণ দিয়ে দিতে পারে

তুতুল এমনই সৎ যে সে আলমকে ভালোবেসেছে বলে আর কোনো যুবকের সঙ্গে কক্ষনো একটুও ফ্লার্ট করে না। লণ্ডনে ইতিমধ্যে কম ছেলে তো তুতুলকে জ্বালাতন করেনি। এখন অনেকেই জেনে গেছে যে তুতুলের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করতে গিয়ে কোনো সুবিধে হবে না। তবু তুতুল আলমের সঙ্গেও একটা আড়াল রেখেছে। শারীরিক সম্পর্কের বাধার ব্যাপারটা তো আছেই, তুতুল কিছুতেই বিবাহপূর্ব মিলনে রাজি নয়। আলমও কখনো জোর করেনি। কিন্তু তা ছাড়াও আরও একটা কিসের যেন আড়াল রয়ে গেছে, তুতুলকে এক এক সময় বুকে জড়িয়ে ধরেও মনে হয়, সে খুব দূরের মানুষ!

আলম শুনেছে, তার বন্ধুরা আড়ালে বলে, একটা নরম-সরম এক ফোঁটা মেয়ে কী জাদুই জানে। আলমের মতন একটা বেপরোয়া ছেলেকে একেবারে ভেড়া বানিয়ে রেখেছে!

আলম তুতুলের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে তার কপাল থেকে কয়েকটা চুল সরিয়ে দিল, চোখের পাতায় আলতো করে আঙুল বোলালো, ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালো।

এবারে তুতুল জেগে উঠে চোখ মেলে প্রথমে আতঙ্কিত, তারপরেই আলমকে চিনতে পেরে লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে গেল। আলম তার কাঁধ ধরে চেপে বললো, না না না। অমন ধড়ফড় করে ঘুম থেকে ওঠা মোটেই ভালো না স্বাস্থ্যের পক্ষে। টেইক ইয়োর টাইম! আগে চক্ষু মেলে ভালো করে পৃথিবীটা, অর্থাৎ নিজের ঘরটা দেখো, তারপর জানালা দিয়ে অকাশখানা দেখো, তারপর একটা হাত তোলো, বাকি শরীরটার ঘুম ভাঙার আরও সময় দাও!

তুতুল আপত্তি করলো না, সে আবার বালিশে মাথা দিল।

আলম জিজ্ঞেস করলো, কাল আবার স্লিপিং পিল খেয়েছিস? কয়টা?

কাল রাত্তিরে খুব মাথার যন্ত্রণা করছিল, এখনও গাটা ম্যাজম্যাজ করছে, সে কথা তুতুল আলমকে বললো না। আলম খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে। সে আঙুল তুলে দেখালো দুটো। তারপর বললো, তুমি কতক্ষণ এসেছো?

আলম বললো, মনে তো হইতাছে যেন অনন্তকাল! ওরে তুলতুলি, এই সোনা রঙের রোদ্দুর তোর মুখে আইস্যা পড়ছে, তোরে আইজ একেবারে জেনুইন প্রিন্সেস-এর মতন দেখাইতাছে। তা প্রিন্সেস, গোলাম হাজির, কী হুকুম ক’ন!

তুতুল ফ্যাকাসে ভাবে হেসে বললো, চা না খেয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। তুমি কেটলিটায় জল ভরে চাপিয়ে দেবে?

–অবশ্যই! আমি তোরে বেড-টি দিমু! ইভ আই শ্যাল সার্ভ ইয়োর ব্রেকফাস্ট ইন বেড। টোস্ট উইথ মামালেড, এগস অ্যান্ড বেকন।

–আলম, দারুন খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছি কাল–

–সিভিলাইজড লোকেরা স্বপ্ন নিয়ে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করে না। খারাপ স্বপ্নের কথা তো কারুকেই বলতে নাই!

–তোমাকেও বলা যাবে না?

–আমাকে বলতে হবে না, আমি গেস করে নিয়েছি। তুই স্বপ্ন দেখেছিস যে আমি মরে গেছি। তাই তো? তার মানে বহু দিনের মধ্যে আমার মরণ নাই!

–আলম, আমি বাড়িতে যাবো!

–বাড়ি? কোন বাড়ি? তুই আমার বাড়িতে যাইতে চাস? চল চল চল চল, এক্ষুনি চল। কতদিন ধরে তাকে বলছি, শুধু শুধু দুটো অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া গোনার কোনো মানে হয় না।

–আমি দেশে যাবো!

–দেশ, মানে ইণ্ডিয়ায়? স্বার্থপর! তুই না বলেছিলি, আমার সাথে এক সাথে কলকাতায় যাবি? এখন তুই একা একা পালিয়ে যেতে চাস?

–কেন, তুমি যাবে না আমার সঙ্গে? আমরা দু’জনেই যাবো!

–এখন? পাগল নাকি? ফাণ্ড রেইজিং প্রোগ্রাম নিয়ে এখন আমি কত ব্যস্ত জানিস না? এই শনিবারেই তো পিকাডেলিতে একটা বড় জমায়েত আছে। তা ছাড়া আমার আর ছুটি পাওনা কোথায়? পাকিস্তানে আটকা পড়ে সব ছুটি খরচ হয়ে গেছে না?

রান্নাঘরের গ্যাস স্টোভে হুইশলিং কেটলটা হুইশল দিয়ে উঠলো। আলম উঠে গেল সেখানে। তুতুল টি ব্যাগ পছন্দ করে না, তাই আলম পাতা চা ভেজালো। কাবার্ড থেকে কাপ-সসার বার করে, চিনি খুঁজে, দুধটা একটু গরম করে চা বানালো নিপুণ হাতে।

দুটি কাপ হাতে নিয়ে ফিরে আসতে আসতে বললো, দুধবরণ কন্যা ওগো, কুচবরণ কেশ, এই নাও তোমার চা! আমি নিজের হাতে চা বানিয়ে একটা মেয়েকে খাওয়াচ্ছি, এই কথা শুনলে আমার বাপ-দাদারা কবরের মধ্যে শিউরে উঠবে! আমাদের চোদ্দ পুরুষে কেউ এসব করে নাই! দ্যাখ তো, কেমন হয়েছে?

চায়ে চুমুক না দিয়ে তুতুল আলমের দিকে চেয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। তারপর হঠাৎ সে উঠে আলমকে জড়িয়ে তার বুকে মাথা রেখে আর্ত স্বরে বলতে লাগলো, আলম, আমি যদি হঠাৎ মরে যাই! আমার কিছুই কি পাওয়া হবে না? আমি কী এমন দোষ করেছি?

আলম সন্ত্রস্ত বোধ করলো। তুতুলের এইরকম ব্যবহার একেবারেই অস্বাভাবিক। এতদিনের ঘনিষ্ঠতার পরেও তুতুল কখনো নিজে থেকে আমাকে আলিঙ্গন করে না, আলম তাকে কাছে টানলেও সে লজ্জা পায়। আজ কী” এমন ঘটলো? নিশ্চয়ই গত রাত্তিরের দুঃস্বপ্নের ফল!

তুতুলের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে আলম বললো, এ কী ছেলেমানুষী করছিস? হঠাৎ মরার কথা উঠছে কেন? এই তুলতুলি, তাকা, আমার মুখের দিকে তাকা, কী হয়েছে সত্যি করে। বল?

মুখ না তুলে তুতুল বললো, আমি খুব খারাপ! স্বার্থপর! প্রথম প্রথম এসে দেশের জন্য মন ছটফট করতো, প্রত্যেকদিন ফিরে যেতে ইচ্ছে করতো। আর এখন, চার বছর কেটে গেছে, একবারও যাইনি, যাওয়ার কথা মনেই পড়ে না। আমার মা, আমার মামা-মামীমারাও কেউ আমার ফেরার কথা চিঠিতে লেখে না, তারা বুঝে গেছে যে এই স্বার্থপর মেয়েটা আর ফিরবে না, শুধু নিজেকে নিয়েই

-–ঠিক আছে, একবার ঘুরে আয় দেশ থেকে। আমি টিকিটের খোঁজ নিচ্ছি।

–আমি একা যাবো না। তোমাকেও যেতে হবে সঙ্গে।

–আমার যে যাওনের এখন কোনো উপায় নাই রে! হেভি রেসপনসিবিলিটি নিয়া বসছি। এখন লণ্ডন ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তোর মন খারাপ হয়েছে, তুই ঘুরে আয়।

তুতুল এবার সংযত হয়ে চোখ মুছলো। এতদিনেও সে স্লিপিং স্যুটে অভ্যস্ত হয়নি, শাড়ি পরেই শোয়। আঁচল ঠিক করে, মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বললো, গত রবিবারের মিটিং-এ হাসান যে বললো, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তোমরা যে ফান্ড তুলছো, পাঁচ হাজার পাউন্ড উঠলে তোমাদের মধ্যে একজন সেই টাকা নিয়ে যাবে, ওদের হাতে তুলে দেবে। তখন তুমি যেতে পারো না?

–হাসানের নিজেরই যাওয়ার ইচ্ছা খুব।

–হাসানের পাকিস্তানী পাসপোর্ট, ভিসা পাবে কি না ঠিক নেই। কিন্তু তোমার ব্রিটিশ পাসপোর্ট, তোমার পক্ষে যাওয়াই সুবিধে।

–পাঁচ হাজার পাউন্ড তো এখনো ওঠে নাই। তা ছাড়া আমার সাজারি বন্ধ রাখার অসুবিধা আছে। তুই একাই এবার যা। লক্ষ্মীসোনা! শিরিন যে ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করে, সেখান থেকে আমি ধারে তোর টিকিট কেটে দেবো।

–আমি কিছুতেই একা যাবো না! তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমি তোমাকে এখানে। একা ফেলে রেখে যেতে পারবো না। তার মানে আমার দেশে ফেরা হবে না! এর মধ্যে আমি যদি মরে যাই–

তুতুলের চোখে আবার জল এসে যাচ্ছে দেখে আলম পরিবেশ হালকা করার জন্য বললো, ব্ল্যাকমেইল, দিস ইজ ব্ল্যাকমেইল। মেয়েদের চিরকালের অস্ত্র, চোখের জল! ওরে দুষ্টু মেয়ে, আমি তোর মতলোবখানা ভালো করেই বুঝেছি!

–কী বুঝেছো?

–আমারে সাথে নিয়ে তুই কলকাতায় যাবি। তারপরের চিত্রনাট্যখানা এই রকম। ওয়ান। ফাইন মরনিং ড ক্তর মিস বহ্নিশিখা সরকার বিলাত থেকে ফিরবেন কলকাতায়, মামা-মামী, ভাগ্নে-ভাগ্নী আর মায়ের জন্য অনেক প্রেজেন্ট সঙ্গে নিয়ে, টেপ রেকর্ডার, ক্যামেরা, পারফিউম, ট্রানজিস্টার এইসব হাবিজাবি। সবাই খুব খুশি, বাড়িতে হৈ চৈ, চাচামেচি। এর মধ্যে একজন। জিজ্ঞেস করবে, বহ্নিশিখা, তোমার সাথে ঐ লোকটি কে? ঐ যে চোরের মতন মুখ করে। বৈঠকখানায় বসে আছে? ডক্তর মিস বহ্নিশিখা সরকার যেই তার লন্ডনের বন্ধুটির পরিচয়। দেবেন, অমনি তাঁর মা, হিন্দু ঘরের বিধবা চিকখৈর দিয়া ওঠবেন, আঁ? এই সেই মোছলমানের ছাওয়াল, অ্যারে তুই বিয়া করতে চাস? আমি আইজই গলায় দড়ি দিমু, বিষ খামু! এই সব কইতে কইতেই চক্ষু উল্টাইয়া অজ্ঞান! তখন ডক্তর মিস বহ্নিশিখা সরকার অশ্রু ভারাক্রান্ত। নয়নে বলবেন, ভাই আলম, তুমি তো দেখলেই সব। আমার খুবই ইচ্ছে ছিল তোমাকে শাদী। করার, কিন্তু মায়ের মনে দুঃখ দিই কী করে? দশটা নয়, পাঁচটা নয়, আমার একটা মাত্র মা? সেই মা আত্মঘাতিনী হলে আমার যে নরকেও স্থান হবে না। তাই, হে বন্ধু বিদায়! তুমি তোমার পথে যাও, আমি আমার পথে। শেষের কবিতা!

–তুমি বম্বে ফিলমের চিত্রনাট্য লিখলে সত্যিই অনেক টাকা রোজগার করতে পারতে!

–আমার ট্যালেন্ট যে কতদিকে ওয়েস্টেড হলো। ডাক্তারি ছাড়া আমি অন্য অনেক কিছুই ভালো পারি।

–তবে তুমি আমাকে ভালো চেনা না তাই বহ্নিশিখা সরকারের চরিত্রটা একেবারেই দাঁড় করাতে পারোনি। লন্ডন ছাড়ার আগে বহ্নিশিখা সরকার একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিল, সেটা তুমি ভুলে যাচ্ছো!

–ওঃ, আবার সেই দুঃস্বপ্নের কথা। সেটা শুনতেই হবে? বাইরে কী সুন্দর একখানা সকাল, তার মধ্যে দুঃস্বপ্ন! ঠিক আছে, বলো, শুনি!

–আমি দুঃস্বপ্ন দেখেছি যে একটা বিচ্ছিরি চেহারার, বাউণ্ডুলে, দায়িত্বজ্ঞানহীন মুসলমান ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে!

–আঁ? সে আবার কে? স্বপ্নে তার মুখখানা দেখেছো?

–অফ কোর্স দেখেছি! সে একজন পচা ডাক্তার, ডাক্তারি ছাড়া অন্য পাঁচ রকম ব্যাপার নিয়ে মেতে থাকে। ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে হয় না। কলকাতায় যাবার আগেই সেই লোকটার সঙ্গে

আমার বিয়ে হয়ে যাবে! _ খুবই অভিপ্রেত কিছুও হঠাৎ সামনে এসে পড়লে তাকে গ্রহণ করা সহজ হয় না। গত আড়াই বছর ধরে আলম তুতুলকে বিয়ে করার জন্য ঝুলোঝুলি করেছে, তুতুল কিছুতেই তাতে সায় দিতে পারেনি। আজ হঠাৎ তুতুল নিজে থেকেই সে প্রস্তাব দিতে আলমই দ্বিধা করতে লাগলো। তুতুল কি ঝোঁকের মাথায় এরকম বলছে? তুতুলের মায়ের আপত্তির কথা সে জানে, সে ভদ্রমহিলার সেন্টিমেন্টে হঠাৎ আঘাত দেওয়া যায় না, তাঁকে ভালো করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে—

আলম নরম গলায় বললো, তুমি দেশে ফেরার জন্য ডেসপারেট হয়ে এই কথা বলছো, তাই না? আমি জানি, হঠাৎ দেশের মানুষজনের কথা মনে পড়লে কী সাংঘাতিক টান হয়। আর একদিনও এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না। তুমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় যাবে কথা দিয়েছিলে। আমি যদি সেই সঙ্কল্প থেকে তোমাকে মুক্তি দিই? রিয়েলি, আই ওন্ট মাইন্ড, তুমি একা ঘুরে এসো!

তুতুল বিছানা থেকে নেমে এলো। বাথরুমে যাবার জন্য কয়েক পা এগিয়েও ফিরে তাকালো আলমের দিকে। তার মাথা টলটল করছে, দুই ভুরুর মাঝখানে চিড়িক চিড়িক ব্যথা। পায়েও যেন জোর পাচ্ছে না। কাল রাত্তির থেকেই মনে হচ্ছে, তার আর বেশীদিন আয়ু নেই।

আবার সে আলমের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিসফিস করে বললো, আলম, আমাকে ধরো, আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো। আমাকে কোনোদিন ছেড়ে দিও না।

বাড়ি ছেড়ে ওরা বেরিয়ে পড়লো পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে। আকাশ এখনো পরিষ্কার। যদিও ছুটির দিন নয়, তবু আজ টেমস নদীর ধারে বেশ মানুষজনের ভিড়। এর মধ্যে টুরিস্ট আছে অনেক, লন্ডন শহরের বুড়োবুড়িরাও আজ রোদ পোহাতে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অফিস পালিয়ে চলে এসেছে যুবক-যুবতীরা।

ওয়াটালু ব্রীজ পেরিয়ে গাড়িটা পার্ক করে ডান দিকের এমব্যাঙ্কমেন্ট ধরে খানিকটা হাঁটলো তুতুল আর আলম। তুতুলের শরীরটা এখন অনেকটা ভালো লাগছে। দু’ জনের হাতে হাত, ধরা। রেলিং-এর ধারে একটা ফাঁকা বেঞ্চ পেয়ে বসলো ওরা এক সময়। এমন কিছু বড় নদী নয়, তবু এই নদী দিয়ে বহু স্টিমার ও বোট চলে। টুরিস্টদের ঘুরিয়ে দেখায় যে বোটগুলো, সেগুলো আজ ভর্তি। রোদ্দরের দিন মানেই যেন এ দেশে উৎসবের দিন।

কাছেই একটা স্টলে স্যান্ড উইচ, হট ডগ আর কফি বিক্রি হচ্ছে। আলম উঠে গিয়ে হট ডগ, কফি আর এক গোছ পেপার ন্যাপকিন নিয়ে এলো। সকালে ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়নি। দুপুরে ওরা নিয়ম করে লাঞ্চও খাবে না, আজ সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরবে, আর বারে বারে টুকিটাকি খাবে। ইচ্ছে হলে লং ড্রাইভে কোনোদিকে গিয়ে একটা কোনো গ্রামের পাব-এ বসতে পারে।

হঠাৎ একটু দূরে একজন শাড়ী পরা মহিলার দিকে চোখ পড়তেই আলম বললো, শিরিন না?

মহিলাটি ওদের দিকে পেছন ফিরে হাঁটছে, তার সঙ্গে একজন পুরুষ। মনে হচ্ছে শিরিন আর মুরশিদ আলম জিজ্ঞস করলো, ওদের ডাকি?

তুতুল মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালো।

আলমের মুখে তখন অর্ধেক খাবার। সেটা কোনোক্রমে শেষ করে সে উঠে দাঁড়িয়ে। ডাকলো, শিরিন! মুরশিদ! তারপর এদেশের নিয়ম লঙ্ঘন করে আর একবার বেশ জোরেই ডেকে উঠলো।

সেই নারী-পুরুষ যুগল এদিকে ফিরলো না, হঠাৎ নেমে গেল একদিকের সিঁড়ি দিয়ে। অনেকটা দূরে চলে গেছে, এখন দৌড়ে গেলেও বোধহয় ওদের ধরা যাবে না।

আলম আর চেষ্টা করলো না। ফিরে এসে বসে পড়ে বললো, ওরা শুনতে পায়নি!

তুতুল বললো, হ্যাঁ, শুনেছে। শিরিন একবার আমাকে দেখেওছে। ও আজকাল ইচ্ছে করে। আমাকে অ্যাভয়েড করে।

–সেকি? শিরিন তোমাকে অ্যাভয়েড করবে কেন? সে তোমার ভালো বন্ধু না?

–হ্যাঁ, বন্ধুত্ব ছিল এক সময়। কিন্তু গত সপ্তাহে একটা টিউব ট্রেনে শিরিন আর আমি একই কামরায় উঠেছিলুম। শিরিন একটু দূরে বসেছিল। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে ও চোখ ফিরিয়ে নিল। তারপর নেমে গেল পরের স্টেশনে, যতদূর মনে হয় সেখানে ওর নামার দরকার ছিল না, নামার সময় আমার দিকে একবার তাকালো না পর্যন্ত! আলম, তুমি যেমন আমার মায়ের কথা বলো, সে রকম আমাকে বিয়ে করার জন্য তোমার অনেক আত্মীয়বন্ধুও বিরক্ত হবে, তুমি সে জন্য তৈরি থেকো!

আলম গম্ভীরভাবে একটুক্ষণ সিগারেট টানলো। তারপর বললো, এটা সে ব্যাপার নয়। আরও কমপ্লিকেটেড। শিরিন ফেব্রুয়ারি মাসে মুরশিদকে বিয়ে করলো, যদি আর একটা মাস ও ওয়েট করতো! এক মাসের মধ্যে যে অনেক ডিফারেন্স হয়ে গেল!

তুতুল বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো, ফেব্রুয়ারি আর মার্চ মাসের মধ্যে কী ডিফারেন্স হয়ে গেল? |||||||||

–ফেব্রুয়ারি মাসেও মুরশিদ আর আমরা সবাই ছিলাম পাকিস্তানী। কিন্তু পাকিস্তানের দুটো উইং কি আর এক থাকবে? পচিশে মার্চের পর একটা পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন এসে গেল না? একবার যখন লড়াই শুরু হয়েছে, এখন ইস্ট পাকিস্তানে স্বাধীন বাংলাদেশ হবেই! তুমি বোধহয় জানো না, এরমধ্যেই লন্ডনে ইস্ট পাকিস্তানী আর ওয়েস্ট পাকিস্তানীদের মধ্যে শাপ দুটো ভাগ হয়ে গেছে, মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সাউথ লন্ডনের একটা পাবে করাচীর কিছু ছাত্র আর ঢাকার কিছু ছাত্রের মধ্যে তর্কাতর্কির পর হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেছে। মুরশিদ ওয়েস্ট পাকিস্তানী। শিরিন এখন কী করবে : বাঙালীদের সঙ্গে ও কি আর খোলাখুলি মিশতে পারবে?

–কিন্তু মুরশিদ ইজ আ ভেরি গুড ফ্রেন্ড অফ আস। চমৎকার মানুষ। সে ওয়েস্ট পাকিস্তানী বলেই তোমরা তার সঙ্গে আর মিশবে না?

–পরে একসময় হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন খুব বেশী টেনশান, পরস্পরের প্রতি চরম অবিশ্বাস, এখন মেলামেশা শক্ত হবে ঠিকই।

–আমি কোনো মানুষকে তার দেশের পরিচয় বা জাতির পরিচয় দিয়ে বিচার করা খুবই অপছন্দ করি! ব্রাহ্মণ পন্ডিত বলতে যা বোঝায়, বিদ্যাসাগরমশাই কি তাই? আইনস্টাইন কি শুধু ইহুদি? হিটলার জামান ছিলেন বলে কি সব জামান…

–আহা, আমাকে তুমি ছেলেমানুষের মতন বোঝাবার চেষ্টা করছো কেন, আমি কি এসব জানি না? কিন্তু যুদ্ধের সময় ঘৃণা আর অবিশ্বাস এমনই তীব্র হয়।

–যুদ্ধ হচ্ছে ইস্ট পাকিস্তানে, তা বলে লন্ডনেও ঝগড়া করতে হবে? তুমি যাই বলো, আমি আমাদের বিয়েতে মুরশিদকে নেমন্তন্ন করতে চাই!

–আমি তো ওদের ডাকলাম। তুমিও বলছো, ওরা ইচ্ছা করে এলো না! রাত্তিরবেলা টেলিফোন না করেই ওরা দু’জনে উপস্থিত হলো শিরিন-মুরশিদদের বাড়িতে। সারওয়ার মুরশিদ ইতিহাসের দুর্ধর্ষ ছাত্র, অধ্যাপক ব্যাসামের প্রিয় শিষ্য। বেলসাইজ পার্কে ওদের সুন্দর ছোট্ট বাড়ি। সারওয়ার মুরশিদের জন্মস্থান লাহোর, কিন্তু ওর বাবা পাকিস্তান। সিভিল সার্ভিসের বড় অফিসার, সাত বছর ঢাকায় ছিলেন। সেই সুবাদে মুরশিদও পরিষ্কার বাংলা বলতে পারে। পাঠানদের মতন লম্বা-চওড়া চেহারা, তাঁর মুখে বাংলা শুনতে বেশ মজা লাগে।

ওদের দেখে শিরিন খানিকটা আড়ষ্ট বোধ করলেও মুরশিদ সাগ্রহে অভ্যর্থনা জানালো। আজ সন্ধের পরেও ঠাণ্ডা পড়েনি। খুলে দেওয়া হয়েছে জানলার কাচের পাল্লা, সাদা নেটের পর্দা বাতাসে উড়ছে, এদেশে এই দৃশ্য বিশেষ দেখা যায় না।

আলম বললো, তোমাদের দাওয়াত দিতে আসলাম। আগামী শনিবার আমরা বিয়ে করছি। গোল্ডার্স গ্রীনে তুতুলের অ্যাপার্টমেন্টে খুব ছোট্ট একটা পাটি, তোমাদের দুইজনকেই সেখানে আসতে হবে।

শিরিন তেড়ছা চোখে তুতুলের দিকে তাকালো। মুরশিদ বললো, নেক্সট শনিবার? এত তাড়াতাড়ি? হঠাৎ ঠিক হলো বুঝি?

আলম তুতুলের মাথায় টোকা মেরে বললো, এই মেয়েটা একেবারে বিয়ে পাগলী হয়ে গেছে! রোজ ঘ্যান ঘ্যান করছে, আমায় বিয়ে করো, আমায় বিয়ে করো! তাই আর না করে উপায় কী বলো।

মুরশিদ হা-হা করে হেসে উঠে বললো, গুড কজ ফর সেলিব্রেশন। ভালো ইটালিয়ান রেড ওয়াইন আছে, খোলা যাক তা হলে?

আলম বললো, আপত্তি নাই।

তারপরই সে শিরিনের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললো, এই ছেমরি, তুই মুখ গোমড়া কইরা আছোস, কথা কস না যে? আমাগো শাদীর খবর শুইন্যা তুই খুশী হস নাই?

শিরিন কষ্ট করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, ওমা, খুশী হবো না কেন? কিন্তু তোমাদের পার্টিতে আমরা যাবো, অন্য কেউ যদি কিছু মনে করে?

–কে কী মনে করবে? ঐ সব কথা বাদ দে, শুধু ওয়াইন খাবো না, আমার ক্ষুধা পাইছে, কিছু খাবার দে!

শিরিন তবু বললো, আলম ভাই, একটা সাফ কথা বলি। তোমাদের হাসান হাফিজ যদি সেখানে থাকে, সে পার্টিতে আমি আর মুরশিদ যাবো না! সেই লোক কয়েকদিন আগেই আমাকে বলেছে, আমি নাকি বাঙালীর দুশমনরে শাদী করছি!

আলম কিছু উত্তর দেবার আগেই মুরশিদ আলমের হাতে একটা চাপড় মেরে মৃদু হেসে বললো, ডোন্ট ওয়ারি, হাসান ওরকম কথা বললেও আমি তোমাদের পার্টিতে যাবো। আই ডোন্ট মাইন্ড। আমি ডক্তর বহ্নিশিখা সরকারের একজন গ্রেট অ্যাডমায়ারার।

ওয়াইন বোতলের কর্ক খুলে সে দুটি গেলাসে ঢালার পর তুতুলকে জিজ্ঞস করলো, আপনি একটু পান করবেন তো? আজ আপনাকে একটু মুখে ছোঁয়াতেই হবে।

তুতুল বললো, হ্যাঁ, একটু নিতে পারি। শিরিন খাবে না?

মুরশিদ বললো, শিরিন? সাচ্চা মুসলমান জেনানার মতন শরাব ওর কাছে হারাম। যত বোঝাবার চেষ্টা করি যে ওয়াইন আর মদ এক নয়, তা বুঝবে না। আরবরা ওয়াইন কাকে বলে জানতোই না। আরও মজার কথা, শিরিন হালফিল আমার সঙ্গে উর্দুতে বাতচিত শুরু করেছে। শী ওয়ান্টস টু বিকাম আ ট্র পাকিস্তানী!

গেলাসে চুমুক দিয়ে আলম বললো, মুরশিদ, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি, ইস্ট পাকিস্তানে আমি যে অত্যাচার শুরু করেছে, নিরীহ সিভিলিয়ানদের খুন করছে, গ্রাম জ্বালিয়ে। দিচ্ছে, সে খবরে তুমি বিশ্বাস করো?

মুরশিদ বললো, ব্রিটিশ কাগজগুলোতে কিছু কিছু খবর বেরিয়েছে। বিশ্বাস না করে উপায় কী?

–টাইম, নিউজ উইকেও সাঙ্ঘাতিক সব বিবরণ বেরিয়েছে। আমেরিকা বরাবরই পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে মদৎ দেয়, সেই দেশের কাগজে যদি পাক আর্মির অত্যাচারের এমন খবর বেরোয়, তার গুরুত্ব আরও বেশী হবে। তাই না? মুরশিদ, আমি তোমার কাছে জানতে চাই, এই যে ইস্ট পাকিস্তানের মানুষদের ধরে ধরে মারছে, একই দেশের তো মানুষ, তাতে ওয়েস্ট পাকিস্তানে কোনো রিঅ্যাকশান নেই? তুমি তো করাচীর দু-একটা কাগজ রাখো।

–সেখানকার কাগজে এসব কিছু খবর থাকে না।

–পশ্চিম পাকিস্তানে কেউ প্রতিবাদও করছে না? আমি কি মনে করে, শুধু মেরে মেরে ইস্ট পাকিস্তানের জনসংখ্যা কমিয়ে দেবে? কত মানুষ খুন করবে, এক কোটি, দুই কোটি? পশ্চিমের থেকে পুবের মানুষ কম হয়ে যাবে! এইরকম পৈশাচিক পরিকল্পনার কথা কেউ কখনো শুনেছে? পশ্চিম পাকিস্তানে কেউ এর প্রতিবাদ করবে না? যেখানে ফয়েজ আহমদ ফয়েজের মতন কবি আছেন, মান্টোর মতন লেখক, আঃ মান্টোর এক একটা গল্প কী টাচিং, মনে আছে সেই গল্পটা? নামটা ঠিক মনে নাই, পাগলদের গল্প। পাটিশানের পর ভারত আর পাকিস্তানের দুই দেশের কর্তাদেরই টনক নড়লো যে দুই দেশের পাগলা গারদেই তো কিছু হিন্দু আর মুসলমান পাগল রয়ে গেছে। পাকিস্তান ইসলামিক স্টেট, লাহোর করাচীর পাগলা গারদে হিন্দু পাগলদের কেন পোষা হবে সরকারি খরচে? তাই হিন্দু পাগলদের পাঠাতে হবে ইন্ডিয়ায়, কিন্তু পাগলরা তত বোঝেই না, দেশ ভাগ কাকে বলে! এক সদারজী, সে তো কিছুতেই যেতে চায় না লাহোর ছেড়ে, তাকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো, তারপর সে গুলি খেয়ে মরে পড়ে রইলো দুই দেশের সীমানার মাঝখানে হাত পা ছড়িয়ে। আসলে দুই দেশের নেতারা যে কত বড় পাগল এই রকম গল্প লেখা হয়েছে যে পাকিস্তানে, সেখানে এখনকার গণহত্যা নিয়ে কোনো প্রতিবাদ নাই, এটা বিশ্বাস করি কী করে?

–সেখানকার সাধারণ মানুষ সবাই যে আর্মির এই ম্যাসাকার পলিসি সাপোর্ট করছে, তা আমিও বি ঠাস করি না, আলম। পাকিস্তানের প্রেস গ্যাগড, কেউ প্রতিবাদ করলেও সে খবর বেরুবে না। তবে ধমোন্মাদনা সৃষ্টি করা স্বৈরাচারীদের একটা কৌশল। ইয়াহিয়া আর তার হেচম্যানেরা পশ্চিম পাকিস্তানে এরকম একটা ধারণার সৃষ্টি করে দিয়েছে যে শেখ মুজিব ইন্ডিয়ার চর, হিন্দু কনসপিরেটররাই ইস্ট পাকিস্তানে সিসেশানের দাবি তুলেছে, আমি শুধু তাদের দমন করছে। অ্যান্টি ইন্ডিয়া আর অ্যান্টি হিন্দু সেন্টিমেন্ট বেশী করে প্লে আপ করে পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সমর্থন অনেকটা পাওয়া গেছে।

শিরিন ঝাঁঝের সঙ্গে বললো, হিন্দুরাই তে ক্ষ্যাপাচ্ছে, সেটা মিথ্যা নাকি? মোটেই না!

আলম অবাক ভাবে শিরিনের দিকে তাকালো।

মুরশিদ জোরে হেসে উঠে বললো, কইলাম না, তোমার কাজিন খুব র‍্যাপিডলি ওয়েস্ট পাকিস্তানী হয়ে উঠছে! শিরিন জানে না আমার মা হিন্দু, উত্তর প্রদেশের ব্রাহ্মণের মেয়ে। ওকে যখন লাহোরে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাবো, সী উইল হ্যাভ দা শক অফ হার লাইফ টাইম। আমার মা ফেয়ারলি এডুকেটেড। মার সাবজেক্টও হিস্ট্রি। আমার স্পেশালাইজেশন। অ্যানসিয়েন্ট আর্য পিরিয়ড নিয়ে। আমার মায়ের সঙ্গে অনেক সময় আমি সংস্কৃতে কথা বলি!

তুতুল আস্তে আস্তে বললো, আমি আলমকে আজই বলছিলাম, যে-কোনো মানুষকেই শুধু তার দেশের পরিচয় বা জাতের পরিচয় দিয়ে বিচার করা কতখানি ভুল!

মুরশিদ বললো, ঐতিহাসিক কারণে, এক একটা জাতের মধ্যে, বা এক একটা অঞ্চলে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন, বেঙ্গলে পলিটিক্যাল অ্যান্ড সোসাল মুভমেন্ট শুরু হয়েছে গত সেঞ্চুরির মাঝখান থেকে। সেইজন্য বাঙালীরা পলিটিক্যালি যতখানি কনসাস, ওয়েস্ট পাকিস্তানে তা অনেক কম। বাঙালীরা ডেমোক্রাসির স্বাদ আগে থেকেই পেতে শুরু করেছে, ওয়েস্ট পাকিস্তানে অনেকেই এখনও ডেমোক্রেসির মর্ম ঠিক বোঝে না। সেইজন্যই আর্মি রুল হলে ইস্ট পাকিস্তানে যতখানি রি-অ্যাকশান হয়, ছাত্ররা যেমন ক্ষেপে যায়, ওয়েস্ট পাকিস্তানে তা হয় না। তারা মোটামুটি ফিউডাল যুগেই রয়ে গেছে অনেকটা। পশ্চিম পাকিস্তানীরা আরবের কাছাকাছি, আর পূর্ব পাকিস্তানীরা আরব থেকে অনেক দূরে, সেখানকার মুসলমানদের একটা আলাদা কালচার গড়ে উঠেছে, হিন্দু কালচারের প্রতি তাদের একটা অ্যাফিনিটি থাকা খুবই স্বাভাবিক, আরও একটু দূরে, ইন্দো চায়নার মুসলিমদের মধ্যে হিন্দু মাইথোলজির প্রভাব এখনও অনেকখানি। আবার পূর্ব বাংলার হিন্দুদের মধ্যে, উত্তর প্রদেশের হিন্দুদের মধ্যে অনেক মুসলিম ইনফ্লুয়েন্স আছে। এসব অস্বীকার করা কিংবা জোর করে চেপে দেওয়া যায় কখনো? ওয়েস্ট পাকিস্তানের আর্মির কতারা তো বটেই, পলিটিশিয়ানরাও অনেকেই মুখ। তারা বলে যে বাংলা নাকি হিন্দুর ভাষা! বাংলা ভাষায় কত আরবী-ফার্সি শব্দ আছে, তা তারা জানে না! আরবী-ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে বাংলায় পর পর তিন-চারটি সেনটেন্স বলাও প্রায় অসম্ভব! আর উর্দুর মধ্যেও যে কত সংস্কৃত শব্দ আছে, তা এরা কল্পনাও করতে পারবে না! বাঞ্চ অফ ইডিয়েটস্!

আলম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, তবুও মানুষ অকারণে মরছে!

দু’ জন মাত্র সাক্ষী নিয়ে তুতুল আর আলমের রেজিস্ট্রি হলো খুবই বিনা আড়ম্বরে। সন্ধেবেলায় পাটিতেও ডাকা হয়েছে মাত্র দশজনকে। প্রথমে এলেন ত্রিদিব। গ্লাসগো থেকে কাজের জন্য তাঁকে লন্ডনে আসতে হচ্ছে প্রায়ই। এই শনিবারটা তিনি থেকে গেছেন। সেই ছিপছিপে শরীর আর নেই ত্রিদিবের, কিছুটা মেদ লেগেছে, পাতলা হয়ে এসেছে মাথার চুল। আলম আর তুতুলের জন্য একগাদা উপহার এনেছেন তিনি, সঙ্গে একটি শ্যাম্পেন ও একটি ব্ল্যাক লেবেল স্কচের বোতল। শ্যাম্পেনের বোতলটা খোলা হবে সবাই আসার পর, ত্রিদিবের ততক্ষণ অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই, তিনি গেলাসে হুইস্কি ঢেলে বসলেন।

হাসানের স্ত্রী বুলবুল এসে রান্নাবান্না করছে বিকেল থেকে, তুতুল তাকে সাহায্য করতে গেল। একজন দু’জন করে বন্ধুরা আসছে, আলম কথা বলছে তাদের সঙ্গে। এক সময় বেজে উঠলো টেলিফোন। আলম রিসিভার তুলে দু-একটা কথা বলে চেঁচিয়ে ডাকলো, তুতুল, তোমার–!

ফোনটা এসেছে আমেরিকা থেকে, পরিষ্কার কণ্ঠস্বর, তবু তুতুল যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলো না! সে দুবার জিজ্ঞেস করলো, কে বলছেন? হু ইজ স্পিকিং!

অন্যদিক থেকে শোনা গেল, ফুলদি, আমি বাবলু! শোনো, আমি এখন বস্টনে এসেছি, অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছি, তুমি আমার ঠিকানা আর ফোন নাম্বারটা লিখে নাও। তুমি কলকাতা থেকে কোনো চিঠি পেয়েছো? আমি অনেকদিন খবর পাইনি কিছু, দুটো চিঠি দিয়েছি, সবাই ভালো আছে তো?

এখনো তুতুলের বিশ্বাস হচ্ছে না। বাবলু? সত্যি বাবলু? আমেরিকায় যাবার পর এক বছরের মধ্যে বাবলু একদিনও ফোন করেনি। চিঠি লিখলে উত্তর দেয় না, সেই বাবলু নিজে থেকে ফোন করেছে, আজই, এই বিশেষ দিনে?

তার বিয়ের কথা বাড়ির কেউ জানে না। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সূত্র ত্রিদিমামা। সেইজন্যই বিশেষ করে সে আজ ত্রিদিবমামাকে থাকতে বলেছে। আর বাবলু তার ভাই!

তুতুল কোনো কথা বলতে পারছে না। তার চোখে জল এসে যাচ্ছে। এই আকস্মিক যোগাযোগ তার বুকে দারুণ একটা আন্দোলন তুলে দিল। তার অসম্ভব আনন্দ হচ্ছে। অথচ বাবলুকে খবরটা জানাতেও লজ্জা করছে তার।

বাবলু আপন মনে কথা বলে যাচ্ছে, তিন মিনিট হলেই কেটে দেবে, তাই তুতুল হঠাৎ বলে ফেললো, বাবলু, তুই আজ ফোন করে কী ভালো যে করেছিস, বাবলু, আজ একটু আগে আমি বিয়ে করেছি!

কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল বাবলু, যেন সে কথাটা বুঝতে পারেনি। আবার জিজ্ঞেস করলো। তুমি কী করেছো বললে? বিয়ে? কাকে?

লন্ডনে থাকার সময় তুই তো ডক্তর আলমকে দেখেছিলি, আমার বন্ধু, সেই আলমকে, এখানে ত্রিদিবমামাও আছেন।

–তুমি সত্যি বিয়ে করেছো? তোমার ব্রত কেটে গেছে তা হলে?

–ব্রত? কিসের ব্রত!

–কংগ্রাচুলেশনস, ফুলদি! ইউ আর আ ব্রেভ গাল!

এমন অসভ্য ছেলে বাবলু, পয়সা বেশী খরচ হবার ভয়ে কট করে কেটে দিল এর পরেই। বাবলুকে আরও অনেক কথা বলার ছিল, আরও একটুক্ষণ বাবলুর গলার আওয়াজ শুনতে ইচ্ছে। করছিল। ও কালেক্ট কল করলেই পারতো!

তুতুল নিজেই বাবলুর নাম্বারটা নিয়ে চেষ্টা করবে কি না ভাবতে ভাবতেই এসে উপস্থিত হলেন শাজাহান চৌধুরী। একটা অসম্ভব সুন্দর সামার-সুট পরে এসেছেন তিনি, হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ ও একটি ভেলভেটের বাক্স। নিছক কলকাতার লোক এবং ত্রিদিবমামার বন্ধু বলেই শাজাহান চৌধুরীকে আজ ডেকেছে তুতুল।

অন্যদের সঙ্গে পরিচয় ও অভিবাদন করতে করতে ত্রিদিবকে দেখে হঠাৎ যেন থমকে গেলেন শাজাহান। গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে তাকালেন ত্রিদিবের দিকে। এক চুমুকে গেলাসের স্কচটা শেষ করে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ত্রিদিব। শাজাহানকে এখানে দেখতে পাবেন, তা যেন তিনি ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করেননি আগে।

আলম বললো, ডোন্ট য়ু নো ইচ আদার?

সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে ত্রিদিব শুকনো ভদ্রতার সঙ্গে বললেন, অফ কোর্স। হ্যালো শাজাহান–

শাজাহানও ততোধিক ভদ্রতার সুরে বললেন, হ্যালো, ত্রিদিব–

এরপরেও অন্যদের অগ্রাহ্য করে দু’জনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। যেন দুই যুযুধান।

অন্য সবাই নিজেদের মধ্যে গল্পে মত্ত। তুতুল বিস্মিত ভাবে দু’ জনের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো, কিছু একটা গণ্ডগোল ঘটে গেছে। আজ সন্ধেয় এদের এক সঙ্গে ডাকা ঠিক হয় নি। এই দু’জন পুরুষের দৃষ্টির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অদৃশ্য নারী। সুলেখা। আজকের বিশেষ দিনটিতেও সুলেখার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় তুতুলের মন খারাপ হয়ে গেল।

২৩. ক্রিস্টোফার রোডে বিরাট লম্বা লাইন

ক্রিস্টোফার রোডে বিরাট লম্বা লাইন পড়েছে ভোর থেকে। মঞ্জু-হেনা-সুখুকে নিয়ে মামুন যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি এসেও দাঁড়ালেন প্রায় আড়াই শো-তিন শো জনের পেছনে। লরিতে চেপে বিভিন্ন ক্লাবের ছেলেমেয়েরা আসছে দল বেঁধে। কেটল ড্রাম ও বিউল বাজাতে বাজাতে এলো একটা মিছিল, সব মিলিয়ে একটা উৎসবের পরিবেশ। একটু দূরে একটা মাইক্রোফোনে শোনা যাচ্ছে ভরাট গলায় আবৃত্তি :

মশা মেরে ঐ গরজে কামান—’বিপ্লব মারিয়াছি।
আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি।’
মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি
টিকি দাড়ি নিয়ে আজো বেঁচে আছি
বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,
যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার মরে বাঁচি!

মঞ্জু আর হেনা দু’জনেই সাতসকালে উঠে স্নান সেরে নিয়েছে, তাদের ভিজে চুল ও চোখের পল্লবে লেগে আছে স্নিগ্ধতা। সুখুর উৎসাহ সবচেয়ে বেশী, তার ভালো নাম নজরুল ইসলাম, সে এসেছে আর এক নজরুল ইসলামকে দেখতে। নতুন কুর্তা-পাজামা পরানো হয়েছে তাকে, মাথায় একটি জরির টুপি। এই ফুটফুটে ছেলেটিকে অনেকেই গাল টিপে আদর করে যাচ্ছে।

ধীর গতিতে এগোচ্ছে লাইন। মঞ্জু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, আবার না বৃষ্টি অ্যাইস্যা পড়ে!

গত রাত্রে খুব একচোট ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশ এখনও পরিষ্কার নয়, তবে গরমটা একটু কমেছে। হেনা বললো, বৃষ্টি নামলেও ভিজবো!

মামুন একটা সিগারেট ধরিয়েছেন। তাঁর মনে পড়ছে নজরুলের অনেক কবিতার লাইন। এদিক ওদিক তাকিয়ে তিনি খুঁজতে লাগলেন চেনাশুনো কেউ এসেছে কি না। সেরকম কারুকে চোখে পড়লো না। এখানে কত দেরি হবে! তিনি ভেবেছিলেন, দশটার মধ্যে এখান থেকে চলে যেতে পারবেন।

এক ঘণ্টা কেটে যাবার পর সুখু আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছে না, ছটফট করছে, এক সময় সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে সামনের দিকে ছুটে যেতেই মামুন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরলেন। পুরোনো আমলের একটা অদ্ভুত জন্তুর মুখের মতন কপোরেশনের কল থেকে জল ঝরে পড়ছে। অবিরাম। সুখু সেই জল খেতে চায়। মামুন তাকে একটা মৃদু ধমক দিলেন।

সারা গায়ে দু’তিনটি ক্যামেরা ঝোলানো একজন ফটোগ্রাফার খচাখচ করে সুখু ও মামুনের দু’তিনটি ছবি তুলে ফেললো। একটি জলের কল, জড়ির টুপি পরা বালক ও এক প্রৌঢ়, এই কমপোজিশন সম্ভবত তাকে আকৃষ্ট করেছে। ছবি তোলার পর ফটোগ্রাফারটি বললো, আপনারা কী জয় বাংলার লোক?

মামুন মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, জী!

ফটোগ্রাফারটি বললো, আপনারা কতক্ষণ এই লাইনে দাঁড়াবেন? সঙ্গে বাচ্চা রয়েছে, আসুন আমার সঙ্গে!

মামুন বললেন, আমার সাথে আরও দুটি মেয়ে রয়েছে, আমার কন্যা আর ভাগনী!

–তাদেরও নিয়ে আসুন, আমি ঢুকিয়ে দিচ্ছি! ফটোগ্রাফারটি সত্যি বেশ করিৎকর্মা। সে ভিড় ঠেলে, দু’তিনজনকে ফিসফিস করে কী সব বুঝিয়ে সে মামুনদের দলটিকে ঠিক নিয়ে গেল ভেতরে।

সেই সময় বাংলাদেশ মিশনের হোসেন আলী উপস্থিত হয়েছেন সদলবলে, এসেছেন কলকাতা শহরের মেয়র, আরও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি, তাই বাইরের লাইনের লোকদের এখন আসতে দেওয়া হচ্ছে না।

একটা ফরাসের মাঝখানে বসে আছেন কবি। এদিকে ওদিকে ছড়ানো অসংখ্য ফুল ও মালা। কবির কোনোদিকে ভূক্ষেপ নেই। ফটোগ্রাফাররা বলছে, একবার মুখ তুলুন, একবার এদিকে তাকান। কেউ কেউ চেঁচিয়ে তাঁকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করছে তাঁরই কবিতার লাইন। কবি কিছুই দেখছেন না, কিছুই শুনছেন না।

মামুনের মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হলো একটা গানের লাইন : ফুলের জলশায় নীরব কেন কবি?

হোসেন আলী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মাল্যদান করলেন কবিকে। কবি হাত দিয়ে সেই মালা ছেড়বার চেষ্টা করতে লাগলেন। নগর-কোটাল পাঠ করলেন কবির উদ্দেশে একটি মানপত্র, কবি বিড়বিড় করতে লাগলেন আপন মনে। কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী ভক্তদের আনা উপহারের বাক্সগুলি থেকে একটা সন্দেশ নিয়ে ভেঙে খাওয়াতে গেলেন। কবিকে, কবি থুঃ থুঃ করে ছেটাতে লাগলেন চারদিকে। কল্যাণী অনুনয় করে বলতে লাগলেন, বাবা, খান, একটুখানি খান।

মামুনের বারবার মনে পড়ছে ছাত্র বয়েসে দেখা কবির চেহারা, কোথায় গেল মাথার সেই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, চোখের দীপ্ত জ্যোতি। কী সুন্দর করে হেসে বলেছিলেন, তুমি মোতাহারের ব্যাটা না?

পাশ ফিরে তিনি দেখলেন, হেনার মুখখানা যেন ভীতি-বিহ্বল আর মঞ্জুর চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু। সুখু এখনও বুঝতেই পারেনি, এর মধ্যে কোনজনকে দেখতে আসা হয়েছে, সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে, আম্মা, কে? কে?

আর বেশীক্ষণ এখানে থাকার কোনো মানে হয় না, মামুন সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন বাইরে। ঘরের মধ্যে খুব গরম ছিল, ঘামে ভিজে গেছে সারা গা।

কবি যে সুস্থ নেই তা জানতেন মামুন, কিন্তু নিজের চোখে দেখার অভিঘাত অনেক প্রবল। তাঁর মনটা বিষণ্ণ হয়ে রইলো, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মামুন একটুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না।

নিজের নামের আর একজন মানুষকে দেখার সাধ মিটে গেছে সুখুর। সে মামুনের হাত ধরে। টেনে বলতে লাগলো, চিড়িয়াখানা! চিড়িয়াখানায় যাবো এবার!

মামুন আজ ওদের ভিক্টোরিয়া ও চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ওদের তো বাড়ি থেকে বেরুনোই হয় না।

মৌলালির মোড়ে এসে বাসস্টপে দাঁড়াবার কয়েক মুহূর্ত পরেই একখানা প্রাইভেট গাড়ি থামলো তাঁদের সামনে। সেই গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে একজন জিজ্ঞেস করলো, হক সাহেব

! আপনে কবে আইলেন? মামুন প্রায় স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। হোটেলওয়ালা হোসেন সাহেব, দিনকাল পত্রিকার মালিক! এই ব্যক্তিকে মামুন কলকাতায় দেখবেন আশাই করেননি। ঢাকায় গণ্ডগোল হলে এর পক্ষে করাচি কিংবা রাওয়ালপিণ্ডিতে আশ্রয় নেওয়াই স্বাভাবিক ছিল।

হোসেন সাহেব সহর্ষে বললেন, আচ্ছালামো আলাইকুম! আচ্ছালামো আলাইকুম!

মামুন শুকনো গলায় প্রতি-অভিবাদন জানালেন।

হোসেন সাহেব বললেন, কোথায় যাইত্যাছেন? গাড়িতে উঠেন! গাড়িতে উঠেন!

হোসেন সাহেবকে দেখে মামুনের উল্লসিত হবার কোনো কারণ নেই। এই ব্যক্তিটি একসময় তাঁকে বিনা নোটিসে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। তাঁকে বলেছিল, ইন্ডিয়ার দালাল!

মামুন বললেন, ধন্যবাদ। আমরা বাস ধরবো!

হোসেন সাহেব বললেন, ওঠেন, ওঠেন! যেহানে যাবেন, লামাইয়া দিমু! বিদ্যাশে কোনো চেনা মানুষরে দ্যাখলেই আনন্দ হয়।

সুখু এর মধ্যে গাড়ির দরজা খুলে ফেলেছে। তার গাড়ি চড়ার লোেভ। মামুন আর আপত্তি করতে পারলেন না।

হোসেন সাহেব বসছেন সামনে ড্রাইভারের পাশে, মামুন সপরিবারে উঠলেন পেছনে। খুব সম্ভবত ভাড়া করা গাড়ি, ড্রাইভারটির মুখ ভাবলেশহীন।

–কোন দিকে যাবেন?

–ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে।

–ভালো কথা, ভালো কথা, আমিও হেইখানে যামু। দেইখ্যা লমু আপনাগো লগে লগে! গাড়িটা চলতে শুরু করার পর হোসেন সাহেব পেছন ফিরে একটা সোনার সিগারেট কেস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ন্যান! ধূমপান করেন। বাসা লইছেন কোথায়? নাকি কোনো রিলেটিভ আছে কইলকাতায়?

হোসেন সাহেব পরে আছেন একটি সূক্ষ্ম, স্বচ্ছ আদ্দির পাঞ্জাবি। দাড়ি কামানো মসৃণ মুখ। দুহাতে হীরে-মুক্ত বসানো অন্তত সাত-আটটি আংটি। যে-লাইটারটি বাড়িয়ে তিনি মামুনের সিগারেট ধরিয়ে দিলেন, সেটাও সোনার।

তিনি বললেন, আজমীর শরীফ ঘুইরা আসলাম ইতিমধ্যে, বোঝলেন? আপনি গ্যাছেন নাকি? বড় সুন্দর দ্যাশ এই ইন্ডিয়া, রেল ব্যবস্থা খুব ভালো, আপনি যখন যেখানে ইচ্ছা যান, কোনো অসুবিধা নাই। রাজস্থানে আছিলাম দশদিন, হোটেলের চার্জ শস্তা।

মামুনের হাসি পেল। এই হোসেন সাহেব প্রতিদিন ইন্ডিয়ার মুণ্ডপাত না করে পানি খেত না, আজ তার মুখে ইন্ডিয়ার এত প্রশংসা! এক জীবনে কতরকম ভেল্কির খেলাই যে দেখতে হয়!

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, আলতাফের কী খবর? সে আপনার সাথে আসে নাই?

হোসেন সাহেব বললেন, নাঃ! সে আসলো না! কী জানি সে কোথায় আছে! আইচ্ছা, হক সাহেব, কইলকাতা থিকা একটা পেপার বার করা যায় না? আমাগো স্বাধীন বাংলাদেশের সব খবর থাকবে? আমি কিছু কিছু হোটেল মালিকের সাথে আলাপ করত্যাছি, যদি এইখানে একটা হোটেল খোলন যায়, অনেকেই তো আসতে আছে বর্ডার ক্রশ কইরা–

মামুন বললেন, পত্রিকা তো বার হচ্ছে একটা।

–ঐ বালু হক্কাক লেনের ‘জয় বাঙলা? গেছিলাম অগো আয়। ঐ প্যাপারে কোনো কাম হবে না! আপনার মতন একজন তেজী সম্পাদক চাই!

মামুন এবার সশব্দে হেসে উঠলেন। মানুষ এমন অম্লান বদনে বিপরীত কথা বলতে পারে।

–হাসলেন যে? আমি সীরিয়াস। কেপিটাল আমি যোগাড় করমু, হ্যাঁর জন্য কোনো চিন্তা নাই, আমার সোর্স আছে। আসেন, খুব শিগগিরই আপনার সাথে বইস্যা আলোচনা করা যাক। কাইল আসবেন, গ্র্যান্ড হোটেলে আমার সাথে লাঞ্চ খান!

–আমার আর সম্পাদক হবার শখ নাই!

–এটা কি শখের ব্যাপার? দ্যাশের কাজ! দ্যাশ স্বাধীন করতে হবে! হক সাহেব, টাকা পয়সার কথা ভাইবেন না, ইন্ডিয়ার যে-কোনো প্যাপারের এডিটরের সমান বেতন পাবেন।

–আপনার অফারের জন্য ধন্যবাদ। আপনি অন্য সম্পাদক খোঁজেন, হোসেন সাহেব। আমি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সাথে অন্য একটি কাজে যুক্ত আছি।

গাড়িটা এসে থামলো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের গেটে। হোসেন সাহেব আরও অনেকক্ষণ। সঙ্গে সেঁটে থাকবে ভেবে মামুন শঙ্কিত বোধ করছিলেন, কিন্তু হোসেন সাহেব এর মধ্যেই আবার মত বদলেছেন।

মামুনরা নামতেই তিনি বললেন, এই রাখেন আমার কার্ড। কাইল পরশুর মধ্যে একবার আইস্যা পড়েন, আপনার সাথে আরও অইন্য কথা আছে। আমি আর নামলাম না, আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে বাংলাদেশ মিশনে।

গাড়িটা চলে যাবার পর মামুন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তারপর তিনি বললেন, ইস, প্রতাপের মেয়েটা বুঝি এতক্ষণে ফিরে চলে গেছে?

গেটের উল্টোদিকে মহারানীর ভিক্তোরিয়ার মূর্তির পাদদেশে একটা বই হাতে নিয়ে বসে। আছে মুন্নি। সে এসেছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে তার কপালে।

সিঁড়ি থেকে নেমে এসে সে বললো, মামুনকাকা, এই যে আমি! তারপর সে মামুনের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।

মামুন তার কাঁধ ধরে টেনে তুলে বললেন, আহা রে, তোরে কতক্ষণ বসায়ে রেখেছি। নিদারুণ ভিড় হয়েছিল রে কবির বাসায়।

মুন্নি বললো, আমি একবার দেখতে গিয়েছিলাম ওঁর জন্মদিনে। প্রত্যেক বছরই ভিড় হয়।

–এ বৎসর আরও বেশি ভিড়। জয় বাংলার সক্কলেই গেছে তো! বাসার সব কেমন আছে, মুন্নি? তোমার মায়ের জ্বর সারছে?

–হ্যাঁ, সেরে গেছে। আজ দুপুরে আমাদের বাড়িতে আপনাদের সবার নেমন্তন্ন। বাবা বিশেষ করে বলে দিয়েছেন।

–এর মধ্যে আবার ওসব কেন? নতুন বাসা, এখনও সব সাজানো-গুছানো হয় নাই।

–মোটামুটি হয়ে গেছে। নেমন্তন্ন মানে কী, দুপুরে খাওয়াটা ওখানে গিয়ে খাবেন।

মামুন বললেন, মঞ্জু, হেনা, তোরা মুন্নির সাথে ভিতরে গিয়ে দেখে আয় সব। আমি আর। যাবো না, আগে তো দেখেছি, আমি গাছের ছায়ায় গিয়ে একটু বসি।

সুখু বললো, চিড়িয়াখানা? আমরা চিড়িয়াখানায় যাবো না?

মামুন তার মাথায় চাঁটি মেরে বললেন, যাবো, যাবো, আগে এটা দেখে নে! এটাও কত সুন্দর।

ফাঁকা জায়গা পেয়ে সুখু এক দৌড় লাগালো। তিন তরুণী আস্তে আস্তে এগোতে লাগলো শ্বেত সৌধের পটভূমিকায়, মামুন সেদিকে একটুক্ষণ মুগ্ধ ভাবে তাকিয়ে থেকে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলেন।

বোধশক্তিহীন কবিকে দেখে তাঁর মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছিল, হোটেলওয়ালা হোসেন সাহেবকে দেখার পর তাঁর মন অন্যরকম জর্জর বোধ হচ্ছে।

হোসেন সাহেব কট্টর ইসলামী এবং পাকিস্তানের গোঁড়া সমর্থক। হঠাৎ পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ব্যাপারে তাঁর এত উৎসাহ জাগলো কেন? মানুষ কি রাতারাতি বদলে যেতে পারে? নাকি এর মধ্যে অন্য কিছু আছে?

এই বিষয়টি নিয়ে অন্তরঙ্গ কয়েকজনের সঙ্গে মাঝে মাঝেই আলোচনা হয়েছে।

পশ্চিম বাংলায় তথা ভারতে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, যেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষই পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে, সকলেই স্বাধীনতা চায়। প্রবাসী সরকারকে জোরদার করার জন্য এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য এরকম একটা প্রচারও চালানো হচ্ছে সঙ্গত কারণেই।কিন্তু মামুনরা তো জানেন, এরকম একটা সর্বাত্মক দেশাত্মবোধ অলীক ব্যাপার। এখনো অনেকেই মনে করে হিন্দু ইন্ডিয়া ইসলামের দুশমন। ইন্ডিয়ার সাহায্য নিয়ে পাকিস্তানকে ভাঙার অর্থ ইন্ডিয়ার ফাঁদেই পা দেওয়া। অনেক মানুষ কি পাকিস্তানী শাসকদের সঙ্গে হাত মেলায়নি? অনেকেই কি ভাবছে না যে এই আন্দোলন কিছুদিন পরেই থেমে যাবে, পাকিস্তান যেমন ছিল তেমনই থাকবে?

সীমান্ত পেরিয়ে যারা এদিকে চলে আসছে, তারা সকলেই কি স্বাধীন বাংলার সমর্থক? মাঝে মাঝেই এমন কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, যারা কিছুদিন আগেই ছিল কট্টর মৌলবাদী, তারা বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ইসলামবিরোধী মনে করে। তাছাড়া উগ্র চীনা পন্থীরাও পাকিস্তানী জঙ্গী শাসনের বিরোধিতা করে নি, তারা এদিকে আসছে কেন? হোসেন সাহেবের মতন মানুষ এদেশে এসেও এত টাকা পাচ্ছেন কোথা থেকে? কেউ কেউ কি স্বাধীনতা আন্দোলনে স্যাবোটাজ করার চেষ্টা করবে না? সে সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেউ কেউ নিশ্চয়ই এসেছে সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ও কলকাতায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের গোপন ক্রিয়াকর্মের কথা ঢাকায় জানিয়ে দেবার জন্য। ঢাকা বেতারে মাঝে মাঝেই এসব খবর প্রচার করছে, যা শুনলে চমকে যেতে হয়। একটা যুদ্ধ মানেই অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, গুপ্তচরদের তৎপরতা, বিশ্বসঘাতকতা, এইরকম অনেক কিছু।

রোদ্দুরে ঝকঝক করছে অনেক রকম ফুল। দু’দিকে দুটি সুন্দর বাঁধানো পুষ্করিণী, তাতে টলটল করছে স্বচ্ছ জল। পাশের ঝোঁপটায় ডাকছে কয়েকটা বুলবুলি পাখি, একটু দূরে এক ঝাঁক শালিক। মেমোরিয়ালের উঁচু গম্বুজের চুড়ায় ডানা-মেলা কৃষ্ণপরীর ওপর দিয়ে উড়ে গেল এক ঝাঁক টিয়া পাখি।

চতুর্দিকে এতসব সুন্দর, এর মাঝখানে বসে মামুন ভেবে যাচ্ছেন যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতার কথা? এক সময় যিনি কবিতা লিখতেন, তাঁর মনে একটুও কবিত্ব জাগছে না। মামুন নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করলেন। এই পারিপার্শ্বিকের মধ্যে জীবন কত শান্ত, নিরুদ্বেগ। জোড়ায় জোড়ায় তরুণী ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঠে, কেউ কেউ বসেছে ঘাসের ওপর। দূরে দ্রুত, চলন্ত গাড়ির শাঁ শাঁ শব্দ, বড় বড় রেনট্রি ও কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোর ওপর দিয়ে হিল্লোলিত হচ্ছে বাতাস।

একগুচ্ছ রক্তিম রঙ্গন ফুলের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন মামুন। একটা বড় আকারের ভোমরা সেখানে ঘুরে ঘুরে উড়ছে বোঁ বোঁ শব্দ করে। এত ব্যস্ত ও হুড়োহুড়িময় কলকাতা শহরের মধ্যেও এই জায়গাটা এমন নিস্তব্ধ যে পাখির ডাক, ভোমরার ডানার শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়।

সেই ফুলের গুচ্ছের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকেও মামুনের মনে কোনো কবিত্ব জাগলো। না, চোখের সামনে ভেসে উঠলো থকথকে রক্ত। ছাব্বিশে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তিনি দেখেছিলেন এখানে সেখানে ছড়ানো লাশ, আর কালো রাস্তার ওপর টগবগে তরুণ ছেলেদের রক্তের দাগ।

ভিক্টোরিয়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে যাওয়া হলো চিড়িয়াখানা। সেখানে বেশীক্ষণ থাকা হলো না , গরমে টেকা যায় না। এর মধ্যে হেনা একবার বমি করে ফেললো। মেয়েটার বমির ধাত আছে। মামুন আরও ভয় পেলেন গরমে সর্দি-গর্মি না হয়ে যায়। কলকাতায় গরম যেন এখন। অনেক বেশী পড়ে। ঢাকায় এত গরম লাগে না মে মাসে। মামুনের যৌবনেও কলকাতা বোধহয় এত তেতে উঠতো না। চিড়িয়াখানার জন্তু-জানোয়ারেরাও এই গরমে ঝিমিয়ে পড়েছে।

সেখান থেকে দু’বার বাস বদলে আসা হলো ঢাকুরিয়ায়। মাত্র সাতদিন আগে বাড়ি বদল করেছেন প্রতাপ, বড় রাস্তা থেকে পাঁচ সাত মিনিট হাঁটা পথে, গলির মধ্যে একটা বাড়ির দোতলায় ছোট ছোট তিনখানা ঘর, আর এক চিলতে বারান্দা। বাড়িটা পশ্চিমমুখা, ভালো করে আলো ঢোকে না। কিছুক্ষণ আগে চিড়িয়াখানায় দেখা খাঁচায়বন্দী বাঘের ছবিটাই মামুনের মনে আসে প্রতাপকে দেখে।

কালীঘাটের বাড়িতে অনেক ঝাট চলছিল বলে মামুনদের সবাইকে এ পর্যন্ত একদিনও নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে পারেননি প্রতাপ। বাইরে অনেকবার দেখা হয়েছে, মামুনও কালীঘাটের বাড়ি ঘুরে গেছেন দু’বার। প্রতাপ আজ ছুটি নিয়েছেন। পাজামা ও গেঞ্জি পরে দাঁড়িয়েছিলেন বারান্দায়, ওদের দেখে নিচে নেমে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এত দেরি হলো তোমাদের? মুন্নি, তুই রাস্তা ভুল করেছিলি নাকি?

মামুন বললেন, না, না, মুন্নিমা আমাদের খুব ভালো করে সব ঘুরিয়ে দেখিয়েছে, আমরাই দেরি করে ফেলেছি।

সরু, অন্ধকার সিঁড়ি। তা দিয়ে উঠতে উঠতে মামুনের মনে পড়লো, মালখানগরে প্রতাপদের কত বিরাট বাড়ি ছিল। প্রতাপের মনটাও ছিল বড়। এখনও তার মন সেইরকমই আছে, কিন্তু সামর্থ্য নেই। প্রতাপের আর্থিক অনটনের কথা মামুনের বুঝে নিতে দেরি হয় নি, তবু প্রতাপ মামুনের সঙ্গে ট্রামে বাসে উঠলে কিছুতে মামুনকে টিকিট কাটতে দেবেন না। মামুনের সিগারেট তিনি কিনে দেবেন, এর মধ্যেই মমতার নাম করে মঞ্জু-হেনা-সুখুকে শাড়ী জামাও দিয়েছেন। প্রতাপকে নিষেধ করেও কোনো লাভ নেই।

প্রতাপ বললেন, নিশ্চয়ই তোমাদের খিদে পেয়েছে, আগে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে যাও

মামুন বললেন, আগে ছোটরা খেয়ে নিক, তুমি আর আমি পরে বসবো!

তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে তিনজন মহিলা এসে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগলেন দরজার কাছে। টুনটুনির কাছে তাঁরা আগই শুনেছিলেন যে আজ কয়েকজন জয় বাংলার মানুষ আসবে এ বাড়িতে। জয় বাংলার মানুষ এখন একটা দ্রষ্টব্য বিষয়।

মঞ্জু আর হেনাকে ঘিরে ধরে সেই মহিলারা নানান প্রশ্ন করতে লাগলেন। ওরা দু’জনেই যে পরিষ্কার বাংলা বলতে পারে, এটাই যেন মহা বিস্ময়ের ব্যাপার। পশ্চিম বাংলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে পূর্ব বাংলার বাঙালীদের বিচ্ছেদ মাঝখানের কতকগুলি বছরে এমনই গম্ভীর হয়ে গেছে যে, এদিকের মানুষ ওদিক সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। মুসলমান মেয়েরাও স্বাভাবিক বাংলায় কথা বলে, একইভাবে শাড়ী পরে, কপালে টিপ দেয়! তিনতলার মহিলাদের ধারণা ছিল, ঢাকার মেয়েরা বুঝি বোরখা না পরে বাইরে বেরোয় না।

ওঘরের কিছু কিছু কথা ছিটকে আসছে এ ঘরে, মামুন কৌতুক বোধ করছেন। এমনকি মঞ্জু হঠাৎ লাজুক লাজুক গলায় এক সময় দু’লাইন গান গেয়েও শোনালো ওদের।

এক সময় মামুন বললেন, প্রতাপ, তোমার দিদি কোথায়? একদিনও তাঁর সাথে দেখা হলো। না।

মামুন এর আগে যে-দুদিন এসেছিলেন, সুপ্রীতি তখন বাড়িতে ছিলেন না। কানুর স্ত্রী হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, বাড়িতে দুটি অল্পবয়েসী ছেলেমেয়ে, বিপদে পড়ে কানু এসে খুব কাকুতি-মিনতি করেছিল। দিদি, দাদা-বৌদিরাই তো তার নিজের লোক। মমতা দু’দিন গিয়ে দেখে এসেছেন কানুর স্ত্রীকে, সুপ্রীতিকে কয়েকদিন থাকতে হয়েছিল।

সুপ্রীতি অবশ্য এখন ফিরে এসেছেন। তবু প্রতাপ আমতা আমতা করে বললেন, থাক, খাওয়া-দাওয়া সেরে নাও, পরে বিকেলে না হয়–

মামুন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না, না, আগে দিদির সাথে দেখা করে আসি!

প্রতাপ মামুনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি অস্বস্তি লুকোতে পারছেন না। এরা সবাই আসার পরেও দিদি একবারও ঘর থেকে বেরোননি। সকালবেলাতেই তিনি বলে রেখেছেন। বাড়িতে অতিথি আসবে আসুক, তিনি কোনো ব্যাপারের মধ্যে থাকবেন না!

প্রতাপের মনে পড়লো, দায়ুদকান্দিতে মামুনদের বাড়িতে সেই প্রথম যাওয়ার দিনটির কথা। সেদিন মামুনের মনের ভাব কী হয়েছিল, তা আজ প্রতাপ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। ঘাম জমে যাচ্ছে প্রতাপের কপালে। বন্ধুর মুখের দিকে ভালো করে তাকাতে পারছেন না। তাঁর নিজের বাড়িতে যে কখনো এরকম একটা অবস্থা হবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন না। সুপ্রীতি এক সময় মামুনকে ঠিক নিজের ভাইয়ের মতনই স্নেহ করতেন। কিন্তু তুতুলের ব্যাপারে তিনি। একেবারে অবুঝ হয়ে গেছেন।

প্রতাপ বললেন, শোনো, মামুন, দিদির বয়েস হয়েছে তো, শুচিবাই হয়েছে, পুজো-আচ্চার দিকে মন গেছে। এমন ছোঁয়াছুঁয়ির বাতিক হয়েছে যে স্নান করার পর আমাদেরই ছুঁতে চান।

মামুন হেসে উঠে বললেন, আমি মোছলমান বলে দিদি আমারে ছোঁবেন না? দূর, তাও কী। হয়? দিদিরে আমি চিনি না? দিদির বরানগরের বাসায় গিয়ে কতবার আমি খেয়ে এসেছি।

মামুন ঘর থেকে বেরুতে উদ্যত হতে প্রতাপ তাঁর পিঠে হাত রেখে ধীর স্বরে বললেন, শোনো, মামুন, আরও দু’একটা কথা আছে। দিদির জীবনে অনেক দুভোর্গ গেছে। জানো তো, জামাইবাবু অসময়ে হঠাৎ মারা যান। শ্বশুরবাড়িতে ওরা দিদিকে থাকতে দেয়নি, সম্পত্তির ভাগ দেয় নি, দিদি তবু কারুর কাছে মাথা নীচু করেননি কখনো। বড়লোকের বাড়ির বউ ছিলেন, আমার এখানে এতগুলো বছর কষ্ট করে কাটালেন…।

তুমিও এক সময় বড়লোকের ছেলে ছিলে।

–সে তো প্রায় আগের জন্মের কথা! দিদির একটাই মোটে মেয়ে, ভালো মেয়ে, পড়াশুনায় খুব ভালো, ডাক্তার, দিদির শেষ গয়না বিক্রি করে তাকে বিলেতে পাঠানো হলো, দিদির খুব আশা ছিল, সে ফিরে এলে একটু সুখের মুখ দেখবেন। কিন্তু তাতেও একটা মুশকিল হয়ে গেল–

–সেই মেয়ে ফিরে আসে নাই?

ব্যাপার হলো কী জানো, তুতুল ওখানে গিয়ে একটা মুসলমান ছেলের সঙ্গে ভাব করলো, তাকেই বিয়ে করতে চাইলো। তাতে দিদির ঘোর আপত্তি! চিঠি পেয়েই দিদি একেবারে ক্ষেপে উঠেছিলেন।

মামুন ভুরু কুঁচকে দু’এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বিরক্তির সঙ্গে বললেন, সেই মেয়েরই বা কেন মুসলমান বিয়ে করার জন্য জেদ ধরা? বিধবা মায়ের যদি আপত্তি থাকে… স্বজাতির মধ্যে কি ভালো পাত্র পাওয়া যায় না?।

প্রতাপ বললেন, ঐভাবে তো বলা যায় না। আজকালকার লেখাপড়া জানা মেয়ে, বিলেতে গেছে, তার যদি কারুকে বিশেষ পছন্দ হয়–

–তুমি সে বিয়েতে মত দিয়েছিলে?

–আমি না-ও বলিনি, হা-ও বলিনি!

–আমি হলে আপত্তি জানাতাম। তোমার দিদি সারা জীবন অত কষ্ট পেয়েছেন, তার ওপরে তাঁকে আবার দুঃখ দেওয়া মোটেই উচিত নয়। বয়স্ক লোকদের কিছু কিছু বিশ্বাস, সংস্কারের মূল্য দিতে হয়।

–বিয়েটা এখনও হয় নি। তার ফল আরও খারাপ হয়েছে। মেয়ে বিয়েও করে না, দেশেও ফেরে না। কিছুদিন আগে একবার সে কিছু টাকা পাঠিয়েছিল, দিদি রিফিউজ করে দিয়েছেন!

–ঠিক করেছেন! সেইজন্যই কি দিদির সব মুসলমানদের ওপরেই রাগ? দিদির চোখে আমিও কি মুসলমান? তা হতেই পারে না!

–থাক, মামুন, দিদিকে এখন আর ঘাঁটাবার দরকার নেই। খাওয়ার আগে যদি তোমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, মঞ্জুরা যদি কিছু শুনে ফেলে

–দিদি আমাকে দূর দূর ছাই ছাই করলেও আমি কিছু মনে করবো না! ঘরের দরজা ভেজিয়ে রেখেছিলেন সুপ্রীতি। প্রতাপ ঠেলা দিয়ে সেই দরজা খুললেন, তাঁর মতন মানুষেরও কথা বলতে গিয়ে গলা কেঁপে গেল। মামুনদের তিনি আজ খাবার নেমন্তন্ন করেছেন, এই সময় দিদি যদি ওদের কোনো রকম অপমান করেন।

প্রতাপ বললেন, দিদি, মামুন, তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। মনে আছে তো মামুনকে?

ঘরটা অবছা অন্ধকার। চৌকির ওপর জোড়াসনে বসে আছেন সুপ্রীতি, সাদা থান পরা, চেহারাটা শীর্ণ শালিকের মতন।

মামুন ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়তেই সুপ্রীতি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, থাক থাক, ঐখান থেকে কথা বললো! ঐখান থেকে।

মামুন বললেন, দিদি, আপনাকে প্রণাম করবো না?

সুপ্রীতি বললো, না, প্রণামের কী দরকার?

মামুন বললেন, দিদি আপনার মনে আছে, বরানগরে আপনার শ্বশুরবাড়িতে কতদিন গিয়ে আপনার হাতের রান্না খেয়েছি। অসিতদাদা আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

সুপ্রীতি নীরস গলায় বললেন, তোমরা সব সুখে থাকো, ভালো থাকো।

মামুন বললেন, সুখে থাকবো, ভালো থাকবো কী দিদি! আমার বউ আর এক মেয়েকে ওখানে ফেলে আসতে হয়েছে, তাদের জন্য সর্বক্ষণ চিন্তা। আমার সাথে যে ভাগ্নী এসেছে, তার স্বামী আছে ওখানে, তার কোনো খবর পাই না। আবার কবে দেশে ফিরবো তা জানি না, এই অবস্থায় কী ভালো থাকা যায়? আমার মেয়েকে আপনি দেখবেন না? প্রতাপ, হেনা আর মঞ্জুকে একটু ডাকো!

সুপ্রীতি বললেন, থাক, থাক, এখন ডাকার দরকার নেই। বললাম তো, তোমরা সুখে থাকো, বেঁচে বর্তে থাকো, আমার আর কদিন! আমি আছি নেই, তাতেই বা কি আসে। যায়।

–আপনে এরকম ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে থাকবেন? বাইরে আসেন দিদি!

–আমি এখন ঘুমোবো!

প্রতাপ মামুনের হাত ধরে টানলেন। আর দরকার নেই, দিদি যে রাগারাগি করেননি, সেটাই যথেষ্ট! মামুনকে তিনি বাইরে নিয়ে এলেন।

এ বাড়িতে কোনো খাওয়ার ঘর নেই। মঞ্জু-হেনাদের খেতে দেওয়া হয়েছে মুন্নির ঘরে। তাদের খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। প্রতাপ বললেন, বড় খিদে পেয়ে গেছে, মমো আমাদের এই বারান্দাতেই জায়গা করে দাও!

পুরোনো আমলের দুটি পশমের আসন পেতে দেওয়া হলো। আজ তিনি কাঁসার থালা ও গেলাসও বার করেছেন। বারান্দায় জল ছিটিয়ে থালা পাতলেন মমতা। প্রথমে বাটিতে করে মাছ তরকারি সাজিয়ে দিলেন।

আসনে বসে পড়ে মামুন বললেন, পাগলের কাণ্ড, এর কোনো মানে হয়!

তিনরকম মাছ রান্না করা হয়েছে, সেই সঙ্গে মুগীর মাংস। মোচার তরকারি, দু’রকম ডাল, পটল ভাজা, আলু ভাজা। কলকাতায় মাছের কী আগুন দাম তা মামুন জানেন, বড় চিংড়ি মাছ। তো ছোঁয়াই যায় না। প্রতাপ গাদা খানেক টাকা খরচ করেছেন আজ।

মমতা ভাত বেড়ে দিতে এলে মামুন হাত তুলে তাকে বাধা দিয়ে বললেন, বৌঠান, আপনার হাতের রান্না এরপরেও বহুদিন খেতে হবে। আপনি নেমন্তন্ন না করলেও আসবো। কিন্তু আজ দিদি নিজের হাতে পরিবেশন না করলে আমি খাবো না!

প্রতাপ অনুরোধের চোখে মামুনের দিকে তাকালেন। কেন মামুন সব কিছু কঠিন করে তুলছেন আজ!

এত ছোট ফ্ল্যাট যে বারান্দার কথা যে-কোনো ঘর থেকেই শোনা যায়। সুপ্রীতিও নিশ্চয়ই শুনেছেন। মামুন আবার চেঁচিয়ে বললেন, দিদিকে বলো, উনি পরিবেশন না করলে তাঁর ছোটভাই মামুন আজ খাবে না কিছুতেই।

তারপর প্রতাপের দিকে ফিরে তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন, সত্যিই আমি খাবো না।

প্রতাপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মমো, তুমি ডেকে বলবে দিদিকে?

মুন্নি বেরিয়ে এসেছে এর মধ্যে। সে বললো, আমি ডাকছি!

ঘরের দরজা খুলেই সে চেঁচিয়ে বললো, ওমা, পিসিমা আবার ফিট হয়ে গেছেন!

মামুন আর প্রতাপ একসঙ্গে আসন ছেড়ে উঠে এলেন। খাটের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়েছেন সুপ্রীতি, দু’দিকে ছড়ানো হাত দুটো মুঠো করা, পা দুটো ছটফট করছে, মুখ দিয়ে তিনি ই-ই-ই করে একটা শব্দ করছেন।

প্রতাপ বিচলিত হলেন না, তিনি বললেন, মুন্নি, স্মেলিং সল্ট নিয়ে আয়–।

২৪. চার্লস নদীর এক পারে

চার্লস নদীর এক পারে বস্টন শহর, অন্য পারে কেমব্রিজ। না, কলকাতা-হাওড়ার সঙ্গে কোনোমতেই তুলনা করা চলে না। এখানকার এই দুই সহোদরা নগরীই বড় চোখ জুড়োনো সুন্দর। এর মধ্যে কেমব্রিজের ছোট ছোট বাড়ি ও নিরিবিলি রাস্তাগুলির সঙ্গে যেন পুরোনো লন্ডনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। জনস্রোতে ঝলমলে পোশাকে ছাত্র-ছাত্রীদেরই বেশী করে চোখে পড়ে বলে কেমব্রিজকে মনে হয় যৌবনের শহর।

এক একদিন বিকেলবেলা শর্মিলা অতীনকে নিয়ে শহর চেনাতে বেরোয়। শীতের বাতাস শেষ বিদায় নিয়েছে, এখন সত্যি সত্যি বসন্তকাল। চতুর্দিকে ফুলের সমারোহ। এদেশের শহরগুলি অনেকখানি যান্ত্রিক হলেও প্রকৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা আছে, যত্নও আছে। গাছের পাতাগুলি খাঁটি সবুজ, ধুলোর আস্তরণে মলিন নয়। একদিন এক বাগানের মালিকে বড় বড় গাছের ডগায় পাইপে করে জল ছিটিয়ে দিতে দেখে অতীন বিস্মিত হয়েছিল। ভারতে কৃষ্ণচূড়া বা দেবদারু গাছের পাতা জল দিয়ে ধুইয়ে দিতে কে কবে দেখেছে?

একদিন কেমব্রিজ শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে, যেখানে চার্লস নদীর ওপরে একটা বাঁধ দেওয়া হয়েছে, তার কাছেই সায়েন্স মিউজিয়াম দেখতে গেল ওরা দু’জনে। ভিড় নেই, ঠেলাঠেলি নেই, লোকেরা চেঁচিয়ে কথা বলে না, এখানকার মিউজিয়ামগুলিতে তিন চার ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে।

সারা দুপুর সেই প্রদর্শনী দেখে, নদী পেরিয়ে ওরা বস্টনের দিক দিয়ে হাঁটতে লাগলো উদ্দেশ্যহীনভাবে। শর্মিলা হাঁটতে ভালোবাসে, তার ধারণা হেঁটে হেঁটে না ঘুরলে কোনো শহরকেই ভালোভাবে চেনা যায় না। অতীনের অবশ্য শহর চেনার জন্য এমন কিছু ব্যস্ততা নেই, এখানেই যখন বেশ কিছুদিন থাকতে হবে, তখন আস্তে আস্তে সব কিছু তো চেনা হবেই। কিন্তু এই বসন্তকালে শর্মিলা ঘরের মধ্যে বা রেস্তোরাঁয় বেশীক্ষণ বসে থাকতে রাজি নয়।

অতীন বাস কিংবা ট্রেন নিতে চাইছে কিন্তু শর্মিলা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে যে আজ সে অতীনের সঙ্গে লংফেলো ব্রীজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নদী দেখবে। যেন ওই ব্রীজের সঙ্গে তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। শর্মিলার এরকম থাকে। অন্য লোকেরা যেরকমভাবে সিনেমা-থিয়েটার কনসার্টে যায়, শর্মিলাও সেইরকম মাঝে মাঝেই কোনো বিশেষ রাস্তা কিংবা পার্ক কিংবা গীজা দেখার কথা ঠিক করে ফেলে। যেমন দুদিন আগেই সে সকালবেলা অতীনকে ফোন করে বলেছিল, সে সমারভিল-এ স্প্রিং ফিলড স্ট্রিটের একটি ছোট দোকানে চা খেতে যাবে। সেই দোকানটির চায়ের আলাদা কোনো খ্যাতি নেই, তবু অতদুরের ওই বিশেষ দোকানটিতেই কেন চা খেতে যেতে হবে, তার যুক্তি অন্য কেউ বুঝবে না। সেই দোকানটার সামনের পেভমেন্টে অনেকগুলো পায়রা এসে খেলা করে, ঘুম থেকে উঠেই যেন শর্মিলার চোখে ঝকঝকে রোদূরে সেই পায়রাদের ওড়াউড়ির দৃশ্যটা ভেসে উঠেছে। তক্ষুনি একবার গিয়ে সেই দৃশ্যটা না দেখলে তার চলবে না।

মুখে আপত্তি জানালেও অতীন শর্মিলার এই সমস্ত পাগলামি পছন্দই করে।

কিন্তু আজ মিউজিয়ামে অনেকক্ষণ দু পায়ে খাড়া থাকতে হয়েছে, তারপরে হাঁটতে হয়েছে যথেষ্ট, এরপর আর অতীনের ব্রীজ দেখার শখ নেই। অবশ্য নদী পারাপারের জন্য ওরা হাভার্ড ব্রীজই বেশী ব্যবহার করে, লংফেলো ব্রীজে তেমন আসা হয় না, কিন্তু দুটো ব্রীজে তফাত কী আছে, তা অতীন বোঝে না। একজন কবির নামে ব্রীজ বলেই সেটা বিশেষ দর্শনীয় হবে? একথা শুনে শর্মিলা যেন আকাশ থেকে পড়ে। একটা সেতুর সঙ্গে আর একটা সেতুর কোনো মিল থাকতে পারে? প্যারিস শহরে প্রত্যেকটি সেতুই কি বিশেষ দ্রষ্টব্য নয়? প্রতিটি সেতু থেকেই শহরকে অন্যরকম দেখায়।

অতীন প্যারিসে যায়নি, সে আর তর্ক করে না শর্মিলার সঙ্গে।

লংফেলো ব্রীজের ওপর কিছুটা আসতেই হাওয়ায় উড়তে থাকে শর্মিলার জদা রঙের সিল্কের শাড়ির আঁচল। যেন তার মাথার ওপর একটা পতাকা ছটফট করছে। এমনই প্রবল বাতাস এখানে যে শর্মিলা সামলাতেই পারছে না তার শাড়ি, অতীন মজা পেয়ে হাসছে হা-হা করে। অন্য কয়েকজন নারী-পুরুষ শর্মিলাকে সকৌতুকে দেখতে দেখতে চলে গেল।

সায়েন্স মিউজিয়াম থেকে পাওয়া কতকগুলো বুকলেট খসে পড়ে গেল শর্মিলার হাত থেকে, সে কোনোক্রমে দাঁড়ালো রেলিং ঘেঁষে। অতীন বই-কাগজপত্রগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বললো, হার্ভার্ড ব্রীজে কোনোদিন আমি এরকম অবাধ্য বাতাস দেখিনি, এই ব্রীজটা সত্যি আলাদা।

শর্মিলা বললো, সিল্কের শাড়ি না পরে আসাই উচিত ছিল। এমন মুশকিল হয়…

অতীন শর্মিলার কাঁধে হাত রেখে বললো, আমি তোমাকে ধরে থাকছি!

বিকেল শেষ হয়ে আসছে, আকাশে লাল রঙের আভা। নদীর জলও এখন রঙীন। কিন্তু এখানে নিস্তব্ধতা কিংবা নিঃসঙ্গতা বোধ করার কোনো উপায় নেই। ব্রীজের মাঝখান দিয়ে। যাচ্ছে অনবরত গাড়ি, নদীর জলও চূর্ণ-বিচূর্ণ করছে অনেকগুলি স্পীড বোট। এখানকার আকাশে সন্ধেবেলা ঘরে-ফেরা পাখির ঝাঁক চোখে পড়ে না। ফট ফট ফট ফট শব্দ করে ঘুরছে। দুটো হেলিকপ্টার। আবহাওয়া সুন্দর বলে পায়ে-হেঁটে ব্রীজ পারাপার করছে অনেক মানুষ। তবু এর মধ্যেও আলাদা হয়ে যাওয়া যায়। অতীন শর্মিলাকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে, শর্মিলার গালের সঙ্গে ঠেকে গেছে তার গাল, কিন্তু কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছে না, কেউ তাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না।

কলকাতায় যে দুটো ব্রীজ আছে, হাওড়া ব্রীজ আর বালি ব্রীজ, দুটো কি একরকম? হাওড়া ব্রীজ দিয়ে কক্ষনো হাঁটতে ইচ্ছে করে না কিন্তু বালি ব্রীজ দিয়ে বেড়াতে কী ভালো লাগে!

অতীন বললো, আমি তো বালি ব্রীজের ওপর দিয়ে কোনোদিন বেডাইনি! ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে দু’একবার গেছি দক্ষিণেশ্বরে, কিন্তু বালি ব্রীজে উঠেছি কি না মনে পড়ে না!

আমার মামার বাড়ি দক্ষিণেশ্বরে। আমি কতবার গেছি! তুমি তো নিউ ইয়র্ক শহরে এতগুলো দিন রইলে, ব্রুকলীন ব্রীজ আর ওয়াশিংটন ব্রীজ দেখোনি? কত তফাত! ব্রুকলিনের দিক থেকে এইরকম কোনো শেষ বিকেলে ম্যানহাটনের দিকে তাকিয়ে দেখেছো? সারা পৃথিবীতে এরকম দৃশ্য আর নেই। ঠিক মনে হবে সোনা দিয়ে তৈরি এক স্বৰ্ণনগরী।

–স্বৰ্ণনগরী, না স্বর্ণলঙ্কা?

–তুমি কোনোদিন কোনো নদীতে সাঁতার কেটেছো?

–আমি সাঁতারই জানি না!

শর্মিলা যেন প্রায় শিউরে উঠে অতীনের দিকে ফিরে বললো, এত বড় ছেলে, তুমি সাঁতার জানো না? এই সামারেই তুমি পাবলিক সুইমিং পুলে সাঁতর শিখে নেবে!

কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীনের কাছে সেই অনুভূতিটা ফিরে এলো। সে ডুবে যাচ্ছে, চতুর্দিকে জল, লোহার মতন কঠিন জল, সেই জল তার গলা টিপে শ্বস বার করে নিতে চাইছে। হঠাৎ দেখতে পেল কাছে তার দাদার মুখ, দাদা তাকে বাঁচাবে, সে প্রাণপণে জড়িয়ে। ধরলো দাদাকে…।

ছবিটাকে মুছে ফেলার জন্য সে টপ করে শর্মিলার ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো।

শর্মিলা ছটফটিয়ে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো নিজেকে। এদেশে ছেলেমেয়েদের প্রকাশ্য চুম্বন একেবারেই অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু শর্মিলার খুব লজ্জা। এর আগে অতীন কয়েকবার পীড়াপীড়ি করলেও সে রাজি হয়নি, তার মতে, শাড়ি পরা মেয়েদের এরকম তাসভ্যতা মানায় না।

অতীন আজ কিছুতেই শর্মিলাকে ছাড়লো না, সে একেবারে বজ্র আঁটুনিতে চেপে ধরে রাখলো শর্মিলার মাথাটা, জোর করে এমন দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন দিল যে প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসার মতন অবস্থা।

শর্মিলা অতীনের বুকে কিল মারতে মারতে বলতে লাগলো, অসভ্য! তুমি এমন খারাপ আর পাজী–

অতীন হাসছে, তার মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেছে।

শর্মিলা একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিল কেউ তাদের লক্ষ করছে কি না। কেউ তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপও করেনি। শর্মিলা তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে লিপস্টিক বার করলো, অতীন এত হাওয়ার মধ্যেও কায়দা করে ধরালো একটা সিগারেট।

শর্মিলা বললো, খবরদার আবার যদি কক্ষনো এরকম করো, তোমার সঙ্গে কথা বলবো না!

অতীন শর্মিলার কোমর জড়িয়ে ধরে বললো, চুমু খাবার পরেই ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে নেই। একটুবাদে টয়লেটে যাবার ছুতো করে ঠোঁটের রঙ ফিরিয়ে আসতে হয়। এদেশে এতদিন আছো, এই এটিকেট শেখোনি?

শর্মিলা ভুরু কুঁচকে বললো, তুমি শিখলে কী করে? অন্য কোনো মেয়ে বলেছে বুঝি?

–টিভি দেখলেই শেখা যায়। দুপুরবেলার টিভি প্রোগ্রামগুলো সবই তো চুম্বনের সহজপাঠ! কতরকমভাবেই যে এরা চুমু খেতে পারে!

–দুপুরবেলা বসে বসে বুঝি ওই অখাদ্য সিরিয়াল গুলো দেখা হয়?

–নিউ ইয়র্কে সিদ্ধার্থর সঙ্গে যখন থাকতাম, দুপুরে কোনো কাজ ছিল না, টিভি শুনে শুনে অ্যাকসেন্ট শিখতাম।

–ছাই শিখেছো! তুমি এখনো শিডিউলড বলো, স্কেজুউল বলতে পারো না!

–মিলি, তোমাকে আমার আগে আর কেউ চুমু খায়নি?

–ভ্যাট। আবার অসভ্যের মতন কথা। তোমাকে বলেছি না, আমার কোনো বন্ধু ছিল না, আমি এত লাজুক ছিলুম, অচেনা কারুর সঙ্গে কথা বলতে পারতুম না। শুধু তোমার সঙ্গেই যে কী করে এই সব হয়ে গেল।

–বন্ধু না থাক, তোমার কোনো মাসতুতো দাদা কিংবা জামাইবাবু, এরকম কেউও চুমু খায়নি? বলো না, আমি কিছু মনে করবো না!

–কী অদ্ভুত কথা বলছো, এরকম আবার হয় নাকি? মাসতুতো দাদা, জামাইবাবু যাঃ। মেয়েরা কক্ষনো এত শক্ত হয় না। এর আগে আমার গায়ে কেউ সামান্য হাত ছোঁয়াতে সাহস। করেনি। এক তুমিই একটা ডাকাত …

–-তোমার ছেলেবেলার কথা আমার জানতে ইচ্ছে করে। বাচ্চা বয়েসে তুমি ফ্রক পরে কোথায় দৌড়োদৗড়ি করতে? জামশেদপুরেই ইস্কুলে পড়েছো?

–না, তখন বাবা বদলি হয়েছিলেন পাটনায়। একদিন বেশ তুমি আর আমি পা ছড়িয়ে বসে ছেলেবেলার গল্প করবো!

–আমার ছেলেবেলাটা খুব খারাপ কেটেছে। শোনাবার মতন কিছু নেই!

–তোমাদের দেশ তো ছিল পূর্ববঙ্গে। তুমি মা-বাবার সঙ্গে গিয়েছো নিশ্চয়ই। তোমার কিছু মনে আছে?

–মিলি, এত হাওয়ায় আমার একটু শীত শীত করছে। চলো এবার বাড়ি যাই!

–তোমার শীত করছে? ওই দ্যাখো, ছেলেরা শুধু গেঞ্জি পরে যাচ্ছে! আলোগুলো জ্বলুক, তখন এখান থেকে দুদিকের দুটো শহর কী সুন্দর যে দেখাবে!

কয়েকদিন ধরেই বিকেল বেশ দীর্ঘ। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে না। গাড়ি গুলো এখনও হেডলাইট জ্বালেনি। এক দঙ্গল জার্সি পরা ছেলে কোনো ফুটবল মাঠ থেকে হৈ হৈ করে ফিরছে।

কেউ একটা খবরের কাগজ ফেলে রেখে গেছে, সেটা রেলিং-এ আটকে ফরফর করে উড়ছে। অতীন সেটা তুলে নিয়ে জলে ফেলে দিতে যেতেই শর্মিলা তার হাত চেপে ধরে বললো, এই, এই, কী করছো!

–খবরের কাগজের শব্দ আমার ঠিক পছন্দ হয় না!

–তা বলে নদীতে ফেলবে? এইভাবেই নদীগুলো পলিউটেড হয়!

–এটা তো ভাই কোনো সাহেবই ফেলে গেছে, আমি তো ফেলিনি। একটু বাদে জলে গিয়ে পড়তোই। পলিউশানের জন্য আমি দায়ী নই!

–ওটা হাতে রেখে দাও, পরে কোনো ট্র্যাশ ক্যান-এ ফেলে দেবে!

অতীন কাগজটা চোখের সামনে মেলে একপলক দেখলো। শস্তা ধরনের পত্রিকা, প্রথম পাতাতে শুধু রগরগে খবর। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চিত্রতারকাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ। একটি ন-দশবছরের ফুটফুটে বালিকার মুখের প্রায় সিকি পৃষ্ঠা জোড়া ছবি, তার নীচে ষাট পয়েন্টের টাইপে রোমহর্ষক হেডিং।

শর্মিলা কাগজের পৃষ্ঠাটির দিকে একবার মাত্র অন্যমনস্কভাবে তাকিয়েই চোখ বুজে ফেললো। ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার মুখ, ঠোঁট কাঁপছে। হঠাৎ সে রেলিং-এর ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে দিল।

অতীন তখনও সিগারেট টানতে টানতে কাগজটা পড়ে যাচ্ছে, ওদিকে শর্মিলার যেন হঠাৎ বদলে যাচ্ছে সমস্ত জীবন। পৃথিবীটা ঘুরছে। এই ঘুরন্ত পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে সে, অতীন তাকে ধরে রাখতে পারবে না। অতীন তাকে ধরতে চাইবে না, বরং সে-ও যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে।

অতীন অন্যমনস্ক ভাবে শর্মিলার হাতটা ধরতে গেল, শর্মিলা সেটা ছাড়িয়ে নিল।

অতীন তার পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো, কী হলো?

মুখ না তুলেই শর্মিলা বললো, আমার শরীর খারাপ লাগছে! আমি মরে যাচ্ছি!

–কী হয়েছে? কী রকম খারাপ লাগছে?

–আমার মাথা ঘুরছে! সারা শরীর ঝিমঝিম করছে, আমি আর দাঁড়াতে পারছি না! বাবলু, বাড়ি চলো!

–চলো তা হলে!

–আমি হাঁটতে পারছি না। আমার ভীষণ মাথা ঘুরছে!

–কিন্তু এই ব্রীজের মাঝখানে তো বাসটাসে উঠতে পারবো না। ট্যাক্সিও থামবে না। চলো, আমি তোমাকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছি! হঠাৎ কেন এরকম হলো তোমার?

শর্মিলাকে একেবারে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কয়েক পা মাত্র গেল অতীন। যতই শরীর খারাপ লাগুক, কোনো মাতালকে তার সঙ্গী যেভাবে টেনে নিয়ে যায়, সেইভাবে রাস্তা দিয়ে যেতে পারবে না শর্মিলা। বাবলুকে ছেড়ে সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু চোখ খুলে রাখতে পারছে না। অতীনের হাত ধরে বললো, চলো, আমি যেতে পারবো!

অতীন বেশ ঘাবড়ে গেছে। এরকম আকস্মিক অসুস্থতা শুধু বুঝি মেয়েদেরই হয়! শর্মিলা যেরকম করছে, এর মধ্যে যদি অজ্ঞান হয়ে যায়, তা হলে সে কী করবে? রাস্তার কোনো চলন্ত গাড়ি থামিয়ে লিফট চাইবে?

কোনোক্রমে ব্রীজটা পেরিয়ে এলো শর্মিলা। এর মধ্যে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। ব্রীজ থেকে আলোকময় নগর দেখার এত ইচ্ছে ছিল শর্মিলার, এখন সে চোখই খুললো না। একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল সামনেই।

ট্যাক্সিতে ওঠার পরেও মাথাটা হেলিয়ে চোখ বুজে রইলো শর্মিলা। অতীন জিজ্ঞেস করলো, খুব কষ্ট হচ্ছে?

শর্মিলা কাতরভাবে বললো, হ্যাঁ। আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও, বাবলু! আমি আর পারছি না! সহ্য করতে পারছি না!

–এই তো সোজা বাড়িতেই যাচ্ছি। তার আগে, কোনো ডাক্তারের কাছে যাবে?

–না। ডাক্তার দরকার নেই। বাড়ি গেলেই ঠিক হয়ে যাবে! অতীন শর্মিলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে গেলে সে সরিয়ে দিল হাতটা। সারা রাস্তা সে আর একটাও কথা বললো না।

পাল স্ট্রিটে মামাতো বোনের সঙ্গে একখানা ঘর ভাগাভাগি করে থাকে শর্মিলা। ঘরখানা একতলাতেই। বয়েসে একটু ছোট হলেও সুমি যেন শর্মিলার অভিভাবিকা। তাকে শর্মিলা ভয় পায়। তার জন্যই অতীনকে কখনো এ বাড়িতে আসতে বলে না শর্মিলা। আজ অতীন ঠিক করলো, শর্মিলাকে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে সুমিকে বলবে কোনো ওষুধ-উষুধের ব্যবস্থা করতে।

কিন্তু ট্যাক্সি থেকে নামার পরই শর্মিলা প্রায় যেন রুক্ষ ভাবে বললো, ঠিক আছে, তুমি এবার যাও! তারপর সে প্রায় দৌড়ে ঢুকে গেল ভেতরে।

কয়েক মুহূর্ত হতবুদ্ধির মতন দাঁড়িয়ে রইলো অতীন। তার একটা অপরাধবোধ হচ্ছে। শর্মিলার কি সত্যি শরীর খারাপ হয়েছে, না মেজাজ খারাপ হলো? ব্রীজে দাঁড়িয়ে অতীন কি তাকে এমন কিছু বলেছে, যাতে সে আঘাত পেয়েছে? এমনভাবে চলে গেল কেন শর্মিলা?

অতীন কি তাকে কোনো সাহায্যই করতে পারতো না? ওষুধ-টষুধ এনে দিতে পারলে অন্তত দরকার হলে।

ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিয়েছে, এবার হাঁটতে আরম্ভ করলো অতীন। এখান থেকে তার বাড়ি বেশ দূর। দুবার বাস বদল করতে হবে বলে সে আর সেই ঝাটে গেল না। হঠাৎ কী হলো শর্মিলার? না, প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার জন্য রাগ এটা নয়। ওতে শর্মিলা লজ্জা পেয়েছে বেশী, রাগেনি। ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতেই শর্মিলার সারা মুখখানা উষ্ণ হয়ে উঠেছিল, তার মধ্যে প্রত্যাখ্যান ছিল না। তা হলে কী জন্য সে এমন বদলে গেল। যদি শরীর খারাপ হয়েও থাকে, তাতে সে অতীনের সঙ্গে ভালো করে কথা বলবে না? বাড়ির সামনে থেকে তাকে বিদায় করে দিল ঠিক একটা এলেবেলে লোকের মতন!

অতীন আশঙ্কা করেছিল, ট্যাক্সির ভাড়া মেটাবার জন্য তাকে শর্মিলার ব্যাগ খুলে পয়সা নিতে হবে। তা অবশ্য হয়নি, ভাড়া উঠেছিল দশ ডলার, ড্রাইভারকে এক ডলার টিপস দিতে হয়েছে, এখন অতীনের পকেটে খুচরো কিছু পয়সা পড়ে আছে। এই পয়সায় এক প্যাকেট সিগারেটও হয় না। অতীনের সিগারেট ফুরিয়ে গেছে, এমন জ্বালাতন, এদেশে এক প্যাকেটের কম সিগারেট কেনার উপায় নেই।

আস্তে আস্তে অভিমানের বাষ্পে ভরে যাচ্ছে অতীনের মন। কেন শর্মিলা ততক্ষণ চোখ বুজে রইলো? এমনকি বাড়িতে ঢোকার সময়েও সে একবারও অতীনের দিকে তাকালো না!

মেয়েদের কি বুকের ভেতরটাও দেখে ফেলার বিশেষ কোনো ক্ষমতা আছে? আজ ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে সিগারেট টানার সময় দু-একবার অলির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সেই সে সেবারে নবদ্বীপ থেকে নৌকোয় গঙ্গা পার হয়ে কৃষ্ণনগরের দিকে আসা, তারপর অন্ধকারের মধ্যে বসে অলি গান গাইলো…সেই দিনটা কত দূরে সরে গেছে, অলি এখন পৃথিবীর উল্টোপিঠে, তবু হঠাৎ হঠাৎ অলির মুখটা মনে পড়া তো কেউ আটকাতে পারবে না। শর্মিলা কি টের পেয়ে গিয়েছিল যে তার পাশে দাঁড়িয়েও অতীন অন্য একটি মেয়ের কথা ভাবছে? সে শর্মিলাকে ঠকাচ্ছে?

একদিন না একদিন শর্মিলাকে বলতেই হবে অলির কথা। তখন অতীন একথাও জানাবে। যে, সে আর কোনোদিন অলির কাছে ফিরে যাবে না বটে, কিন্তু অলিকে সে তার জীবন থেকে একেবারে বাদ দিতেও পারবে না! এ ব্যাপারটা কি শর্মিলা মেনে নেবে? হ্যাঁ, মানবে, তাকে। মানতেই হবে। শর্মিলা খুব নরম, সুন্দর মনের মানুষ, সে ঠিকই বুঝবে।

প্রায় এক ঘণ্টার রাস্তায় অতীন একবারও অন্য কোনোদিকে তাকায়নি। শুধু শর্মিলার সঙ্গে মনে মনে কথা বলতে বলতে এলো। এখনো সে বুঝতে পারেনি, শর্মিলা কোন কারণে রেগে গেল তার ওপর!

লিভিং রুমে টিভি চলছে, সেখানে বসে আছে সোমেন। সে প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলা নিয়ম করে খবর শোনে। ওয়াল্টার কনক্রাইটের গলা না শুনলে বুঝি তার ঘুম হয় না। পর্চে দাঁড়িয়ে সত্যকিঙ্কর দেখছেন রাত্রির আকাশ। আস্ট্রোনমিতে তাঁর খুব উৎসাহ। আজ রাতের আকাশ প্রচুর নক্ষত্রময়।

এদেশীয় ভদ্রতা অনুযায়ী চেনা কারুর সামনে দিয়ে যেতে হলে দুটো কথা বলতেই হয় তার সঙ্গে। তা সে যত অকিঞ্চিৎকর কথাই হোক। এমনকি পথ চলতি অচেনা মানুষের চোখে চোখ পড়ে গেলেও মুখ ফিরিয়ে নেবার নিয়ম নেই, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলতে হয়, হাই! ইংল্যান্ডে এসব ব্যাপার নেই, তাই প্রথম প্রথম আমেরিকায় এসে অচেনা মানুষের মুখে এরকম সম্বোধন শুনে অতীন চমকে চমকে উঠতো।

বাড়িওয়ালার সঙ্গে রোজ রোজ কী আর কথা বলা যায়! সত্যকিঙ্করকে দূরে সরিয়ে দেবার একমাত্র উপায়, ওঁর সামনে সিগারেট ধরানো। উনি ধোঁয়া সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু এখন অতীনের পকেটে সিগারেটও নেই।

অতীন বললো, “ইভনিং! আজকের আকাশটা খুব পরিষ্কার। এত তারা কোলকাতার আকাশে কোনোদিন দেখা যায় না।

বয়েসে অনেক বড় হলেও সত্যকিঙ্কর তাঁর কোনো ভাড়াটেকে তুমি বলেন না। তাঁর কণ্ঠস্বর সবসময় মৃদু। তিনি বললেন, আমার ছেলেবয়েস কেটেছে পাবনায়। সেখানেও পরিষ্কার আকাশ দেখেছি। ওই দেখুন, গ্রেট বীয়ার আর লিটল বীয়ার দুটোই আজ এত স্পষ্ট…গ্রেট বীয়ারকে কী যেন বলে বাংলায়?

নামটা জানা থাকলেও অতীন মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ঠিক জানি না।

এখন গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে আলোচনা করার একটুও উৎসাহ নেই অতীনের। সে চাঞ্চল্য গোপন করতে পারছে না। সত্যকিঙ্কর আঙুল তুলে আরও নক্ষত্রের নাম বলে যাচ্ছেন, তিনি মুখখানা নামালে অতীন বিদায় নিতে পারছে না।

সুরেশ নামে গুজরাতি ছেলেটি এই সময় এসে পড়ায় অতীন মুক্তি পেল। সুরেশ বেশ জমিয়ে গল্প করতে পারে, পৃথিবীর যে কোনো বিষয়েই তার কিছু কিছু জ্ঞান আছে।

দু’তিন ধাপ সিঁড়ি একসঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে এসে অতীন নিজের ঘরে ঢুকে বেশ জোরে শব্দ করে বন্ধ করে দিল দরজাটা। এখন এই ঘরের মধ্যে তার ছোট্ট নিজস্ব জগৎ, এখানে কেউ তাকে বিরক্ত করতে আসবে না।

সারাদিন ধরে দরজা-জানলা বন্ধ, ঘরটা বশ গরম হয়ে আছে। পদাগুলো সব টানা। জামা-প্যান্ট খুলতে লাগলো অতীন, ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো প্যান্ট-শার্ট। বাড়ির পোশাক পরে নেবার বদলে সে ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলো নগ্ন হয়ে। ঘরটা আজ অসম্ভব খালি খালি লাগছে। যেন এটা তার নিজের ঘর নয়। এরকম একটা ছাদ-নীচু ঘরে সে মাসের পর মাস কাটাবে কী করে?

কথা ছিল, সায়েন্স মিউজিয়াম থেকে ফেরার পথে কিছু খাবার-টাবার কিনে এনে শর্মিলা আর সে এই ঘরে সারা সন্ধেটা কাটাবে। শর্মিলা তাকে একটা সেকেণ্ড হ্যান্ড রেকর্ড প্লেয়ার কিনে দিয়েছে। রেকর্ডও জোগাড় হয়েছে কয়েকটা, গানবাজনা শুনতে শুনতে গল্প আর ভালোবাসাবাসি। হঠাৎ সব কিছু বদলে গেল।

ব্রীজের ওপর অমন চমৎকার হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ কী এমন অসুখ হতে পারে? পেট ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা? শর্মিলার এরকম কোনো রোগের কথা অতীন শোনেনি। শর্মিলার মাঝে মাঝে মাথা ধরে, একটু রোদ লাগলেই তাকে ওষুধ খেতে হয়। সব মেয়েরই নাকি একটু আধটু মাথা ধরার রোগ থাকে। পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের মাথার বেশী স্পর্শকাতর। আজ তো সে রকম চড়া রোদ ছিল না! অতীন একবার শর্মিলার মাথায় হাত রাখতেই সে জোর করে সরিয়ে দিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেও তার আপত্তি? মাথা ধরাটা এমন কিছু রোগ নয় যে তার মধ্যে কোনো কথা বলা যাবে না!

টেবিলের ওপর একটা সিগারেটের প্যাকেট আছে। পোশাক না পরেই অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে একটা জানলা খুলে দিল। তার ঘরটা অন্ধকার, অন্য কোনো বাড়ি থেকে তাকে–দেখা যাবে না। একেবারে গায় ঘেঁষাঘেষি অন্য কোনোও বাড়িও নেই।

শর্মিলা, আমি কী খারাপ ব্যবহার করেছি তোমার সঙ্গে? একবার বুকে হাত লেগে গিয়েছিল, কিন্তু তা তো আমি ইচ্ছে করে দিইনি? এদেশে অনেক লোকের চোখের সামনে চুমু খাওয়া যায়। কিন্তু তার বেশী কিছু করাটা রুচিহীনতা। আলিঙ্গন চলে কিন্তু বুকে হাত দেওয়া চলে না, অতীন তা ভালোই জানে। হঠাৎ বুকে একবার হাত লেগে যাওয়াটা দোষের কিছু নয় শর্মিলা, তুমি কি তা বুঝতে পারোনি? তাও তো বেশ কিছুক্ষণ আগে, তার পরেও তুমি আমার সঙ্গে কথা বললে, হাসলে! আর কী দোষ করেছি? এর আগে কোনোদিন তুমি আমাকে এরকমভাবে অগ্রাহ্য করোনি!…

অতীন মজুমদার, অতীন মজুমদার, তোমার এতদূর অধঃপতন হয়েছে যে তুমি আধঘণ্টা ধরে ন্যাংটা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ের কথা চিন্তা করে যাচ্ছো? তোমার আর কোনো কাজ নেই? একটা মেয়েই তোমার কাছে এখন সব কিছু?

অতীন ঠাস ঠাস করে নিজের দু গালে দুটো চড় কষালো বেশ জোরে। অভিমান কিংবা হতাশার বদলে এখন তার শরীর জ্বলছে রাগে! শর্মিলা ভালো মেয়ে, সরল মেয়ে, কিন্তু বড় জেদী। সে কি ভেবেছে, অতীনের সঙ্গে যেমন খুশী ব্যবহার করা যায়? কোনো কারণে যদি তাকে শর্মিলার ভালো না লাগে, তা হলে কক্ষনো সে আর শর্মিলাকে বিরক্ত করতে যাবে না! শর্মিলা এরকম যখন-তখন মেজাজ দেখালে অতীন মজুমদার কিছুতেই তা সহ্য করবে না। এরপর শর্মিলা যদি আবার নিজে থেকে তার কাছে আসে, তাহলে শর্মিলাকেই ক্ষমা চাইতে হবে।

এখন শর্মিলার কথা একেবারে ভুলে যাওয়া দরকার।

অতীন দ্রুত একটা প্যান্ট পরে নিয়ে টেবিলে বসলো। ঘরে আধ বোতল মদ আর এক প্যাকেট কুকি ছাড়া আর কোনো খাদ্য পানীয় নেই। না, অতীন এখন মদ খাবে না। একটা মেয়ের ওপর রাগ করে একা বসে বসে মদ্যপান করা টিপিক্যাল দেবদাসের ব্যাপার। তার খিদে পেয়েছে, কিন্তু বাইরে বেরিয়ে খাবার কিনে আনার একটুও ইচ্ছে নেই।

দরকারি বই খুলে সে মিষ্টি নারকোলি বিস্কুটই দাঁতে কাটতে লাগলো একটা একটা করে। অতীনের এই ক্ষমতাটা আছে, যখন সে বই পড়ায় মন দেয় তখন সে আর অন্য কোনো কথা ভাবে না। খাতায় সে নোট নিতে লাগলো গভীর মনোযোগ দিয়ে। পি-এইচ ডি করে ফেলতেই হবে এক বছরের মধ্যে।

রাত সাড়ে এগারোটায় অতীনের সিগারেট শেষ, মিষ্টি বিস্কুট শেষ। এবার পড়া বন্ধ করে ঘুমোনো যায়। একটা হাই তুলে বই বন্ধ করতেই শর্মিলার মুখচ্ছবি ফিরে এলো আবার!

আজ এত উৎসাহ করে শর্মিলা নিয়ে গেল লংফেলো ব্রীজে, কত হাসি আর গল্প, তার মধ্যে হঠাৎ শর্মিলার এই ভাবান্তর, এই রহস্যটা কী সেটাই অতীনের জানা দরকার। শর্মিলা না চাইলে অতীন আর তার সঙ্গে দেখা করবে না। কিন্তু সে কী জন্য…

আবার অতীনের মন অনুশোচনায় ভরে গেল। ইস, ছি ছি, সে শুধু নিজের দিকটাই ভাবছে! শর্মিলার যদি সত্যি সত্যি কোনো কঠিন অসুখ হয়ে থাকে? সে হয়তো অতীনকে কোনো দায়িত্বের মধ্যে ফেলতে চায়নি বলেই মুখ ফুটে কিছু বলেনি। তা বলে অতীন স্বার্থপরের মতন দূরে সরে থাকবে?

দরজা খুলে সে দৌড়ে নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে। লিভিং রুমে এখন কেউ নেই। আলো জ্বেলেই অতীন ফোনটা তুলে নিল।

ওদিক থেকে ফোন ধরলো সুমি। সে নীরস গলায় বললো, শর্মিলা এখন ঘুমোচ্ছে!

অতীন জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে শর্মিলার?

সুমি বললো, তার শরীর খারাপ!

অতীন অস্থিরভাবে বললো, তা জানি! তার কী অসুখ হয়েছে? ডাক্তারকে কিছু জানানো হয়েছে? এখানে ডাক্তার সবাধিকারী আছেন আমাদের চেনা।

সুমি বললো, না, আজ আর কিছু করা হয়নি। ওর মাথা ধরেছিল, এখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

–সুমি, আমি ওর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।

–এখন সম্ভব নয়। আমি ডাকতে পারবো না। গুড নাইট।

লাইন কেটে দিয়েছে সুমি। এই মেয়েটা যে কেন গোড়া থেকেই অতীনকে অপছন্দ করেছে, তা কে জানে? মরালিস্ট? কিন্তু ওরও তো বয় ফ্রেন্ড আছে একজন। কিন্তু সুমি অতীনের সঙ্গে কথা বলতেই চায় না।

অতীন আবার টেলিফোন তুললো। শুধু মাথা ধরা? না, হতেই পারে না।

এবার অতীনের গলার স্বর শুনেই লাইন কেটে দিল সুমি। অতীনের মুখের চামড়ায় জ্বালা করছে! বাড়ি ফিরেও শর্মিলা তাকে কোনো কিছু বলতে পারতো না? সাড়ে এগারোটা এমন কিছু রাত নয়, এখন শর্মিলাকে ডাকা যাবে না কেন? অতীন কি একটা এলেবেলে মানুষ!

আবার ফোন করতেই অতীন শুনতে পেল এনগেজড টোন। অর্থাৎ সুমি রিসিভারটা নামিয়ে রেখেছে। সারারাত আর ফোন করা যাবে না। ছোট্ট একটা ঘরে, দুটো খাটের মাঝখানে ফোন। দু বার ফোন বাজলো, তবু শর্মিলা শুনতে পায়নি? কিংবা শর্মিলা ইচ্ছে করে ফোন। ধরছে না?

শর্মিলা, তুমি তবে এখনো অতীন মজুমদারকে ভালো করে চেনোনি!

২৫. ল্যাবরেটরিতে কাজ করছে অতীন

অন্য সবাই চলে গেছে, ল্যাবরেটরিতে একা একা কাজ করছে অতীন। সাতটা বেজে গেছে, তার খেয়ালই নেই। কেউ অবশ্য তাকে যেতে বলবে না। দারোয়ান বা গার্ড এসে বলবে না, এবার আপনি যান, দরজা বন্ধ করবো। এখানে লাইব্রেরি খোলা থাকে রাত দুটো পর্যন্ত, যদি একজন বা দু’জন মাত্র পাঠক থাকে, তাদেরও বই সরবরাহ করার জন্য উপস্থিত থাকে একজন লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট। এই লেবরেটরিতেও রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করা যায়। তারপরেও যদি কেউ থাকতে চায় তা হলে দরজা বন্ধ করার দায়িত্ব তার ওপর। সে বেরুবার সময় দরজাটা। টেনে দিয়ে যাবে। এত সব অ্যাপারেটাস, বীকার, বানার, টেস্ট টিউব, মাইক্রোসকোপ, রি-এজেন্ট, সল্ট, লিটমাস পেপার চতুর্দিকে ছড়ানো, তবু চুরি যাবার প্রশ্ন নেই।

সিগারেট খাওয়ার জন্য মনটা আনচান করছে অনেকক্ষণ ধরে, অতীন এক সময় কাজ থামিয়ে মুখ তুলে তাকালো। এত বড় লেবরেটরিতে সে যে একা রয়েছে তা অতীন খেয়াল করলো এইমাত্র। অনেকগুলো আলো জ্বলছে। আজ ক্যামপাস হলে কুরোসোয়ার একটা নতুন ফিলম দেখাচ্ছে, সেটা দেখতেই গেছে সবাই। কোনো একটা টেবিলে কেউ তাড়াহুড়োতে বুনসেন বানার নিবিয়ে দিতে ভুলে গেছে, সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছে, অতীন সেটা নিবিয়ে দিল, তারপর সিগারেট টানার জন্য দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো।

এরমধ্যেই এটা তার অভ্যেস হয়ে গেছে। লেবরেটরির মধ্যে সিগারেট খাওয়ার নিয়ম নেই, সবাইকেই বাইরে যেতে হয়, কিন্তু এখন তো নিষেধ করার কেউ নেই, অতীন অনায়াসেই নিজের জায়গাতে বসেই সিগারেট খেতে পারতো, তবু সে বাইরে চলে এলো। অতীন দেখেছে, রাত তিন-চারটের সময় ফাঁকা রাস্তায় একটা মাত্র গাড়ি, আর কোনো দিকে অন্য গাড়ির চিহ্ন নেই, ট্রাফিক পুলিশ থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না, তবু মোড়ের মাথায় লাল আলো দেখে সেই গাড়িটা থেমে যায়। অভ্যেস!

অতীন ড্রাইভিং লেসন নিতে শুরু করেছে দু’দিন ধরে। গাড়ি চালানো না জানলে এদেশে জীবনযাপন করা খুব শক্ত। এরপর সে একটা সেকেণ্ড হ্যাণ্ড গাড়ি কিনবে। শ দেড়েক। ডলারের মধ্যেই মোটামুটি চলনসই গাড়ি পাওয়া যায়। পুরনো গাড়ি তো অনেকে ফেলেই দেয় এখানে। তাও যেখানে সেখানে ফেলার উপায় নেই, পুলিশ ঠিক গাড়ির মালিককে খুঁজে বার করে এত ফাইন করবে যে ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাবে। অনেক জায়গাতেই আছে পুরনো গাড়ির কবরখানা, অটোমোবিল গ্রেভ ইয়ার্ড। মানুষের কবরখানার মতন, সেখানেও গাড়ি কবর দিতে গেলে পয়সা খরচ করতে হয়।

অতীন আপাতত একটা সাইকেল কিনেছে। বাস কিংবা ট্রেন ভাড়ায় বড় খরচ পড়ে যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকেই এখানে সাইকেল ব্যবহার করে। সেই বাগবাজারে থাকার সময় স্কুলজীবনে অতীন সাইকেল চালানো শিখেছিল, সেটা এখন কাজে লেগে গেল। শিলিগুড়িতেও সে মাঝে মাঝে সাইকেল ব্যবহার করেছে।

সিগারেটটা টানতে টানতে অতীন অনুভব করলো তার বেশী খিদে পেয়েছে। দুপুরে সে। ক্যান্টিনে একটা সুপ ও একটা হ্যামবার্গার খেয়েছে মাত্র। অন্তত পাঁচ দিন সে ভাত খায়নি, এইসব খেয়েই কাটিয়ে দিচ্ছে। আগে তার মনে হতো, দিনে একবেলা অন্তত ভাত না খেলে পেটই ভরে না।

পেটে খিদের জ্বালাটা নিয়েই অতীন আরও এক ঘণ্টা কাজ করলো লেবরেটরিতে। এক এক সময় খিদেটাকেও নেশার মতন মনে হয়, সেটাকে মিটিয়ে না দিয়ে টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। শরীরটাও বেশ তরতাজা লাগে। অতীন ঠিক করে ফেললো, আজ রাত্তিরে সে আর কিছু খাবে।

খাতা-পত্র বন্ধ করে সে বাতি নেবাতে লাগলো। সবকটা টেবল ঘুরে দেখল কোথাও কোনো আগুন জ্বলছে কি না, কিংবা অ্যাসিডের বৈয়ম খোলা আছে কি না। তারপর নির্জন লম্বা। বারান্দা দিয়ে হেঁটে এলো। গেটের মুখে একটি ছোট্ট ঘরে একজন হৃষ্টপুষ্ট ব্যক্তি গভীর মনোযোগ দিয়ে টাইম ম্যাগাজিন পড়ছে। অতীন বললো, গুন্নাইট, জর্জ!

লোকটি মুখ তুলে বললো, ওয়ার্কিং লেট? ইউ ডোন্ট কেয়ার ফর জাপানিজ ফিল্মস? অতীন হেসে বললো, আই অ্যাম নট আ ফিলম বাফ! আই হার্ডলি স্পেন্ড মাই মানি ফর। মুভিজ। লোকটিও হেসে উত্তর দিল, গুড ফর ইয়োর হেলথ!

বাইরে এসে অতীন দেখলো টিপি টিপি বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের মধ্যে থেকে কিছুই বোঝা যায়নি। অতীন রেইন কোট কিংবা ছাতা আনেনি। কিন্তু একলা একলা দাঁড়িয়ে থাকারও কোনো মানে হয় না, এই বৃষ্টি কখন থামবে তার ঠিক নেই। অতীন সাইকেলে চেপে বসলো।

দুপুরবেলায় বেশ গরম ছিল, কিন্তু বৃষ্টি নামলেই গা শিরশির করে। এই বৃষ্টিতে ভিজলে নাকি নিঘাৎ জ্বর হবার কথা। দেখা যাক! সেই জামসেদপুরের পর আর অতীনের একবারও জ্বর হয়নি!

শর্মিলার সঙ্গে আর একবারও দেখা হয়নি সেদিনের পর। শর্মিলা ওয়াশিংটন ডি সি-তে। তার মামার কাছে আছে। সে একলা গেছে, সুমি এখানেই আছে। শর্মিলা তেমন কিছু অসুস্থ হলে একলা গ্ৰেহাউণ্ড বাসে চেপে অতদূর যেত কি? সুমির সঙ্গে চোখাচোখি হলেও অতীন কথা বলবে না ভেবেছিল, সুমি নিজেই একদিন একটা বইয়ের দোকানের সামনে অতীনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে শর্মিলার খবরটা জানালো।

অতীন ওয়াশিংটন ডি সি-তে শর্মিলার মামার ফোন নাম্বার জানে না, সুমিকে জিজ্ঞেসও। করেনি। শর্মিলা নিজে থেকেই কি ফোন করতে পারতো না? শর্মিলা হঠাৎ ওখানে চলে গেছে নিশ্চিত অতীনকেই এড়াবার জন্য। এর কী দরকার ছিল, শর্মিলা যদি চায়, অতীন। বস্টন-কেমিব্রিজ ছেড়েই চলে যেতে রাজি আছে!

বৃষ্টি বাড়ছে ক্রমশ, অতীন মাথাটা নিচু করে চালাচ্ছে সাইকেল, বৃষ্টির ঝাঁপটা বাঁচাবার জন্য। ক্রমশ সে স্পীড বাড়াচ্ছে। সে বাতাস কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছে।

কালো কুচকুচে রাস্তা, দুপাশে আলো। সামনে যতদূর দেখা যায়, রাস্তাটায় কোনো বাঁক নেই, যেন সোজা চলে গেছে অসীমে। পথিক নেই একটিও, বৃষ্টির মধ্যে সাইকেলেও কেউ যাচ্ছে না এসময়, গাড়ির অবশ্য বিরাম নেই, বৃষ্টির শব্দ আর গাড়ির গতির শব্দ মিলে একটা অন্যরকম ঝংকার। অতীনের হঠাৎ মনে হলো, এটা কোন দেশ, এখানে সে কী করছে? এখানে তো তার থাকার কথা নয়। এখানে তার কোনো কাজ নেই, কোনো প্রতিষ্ঠা নেই, কোনো বন্ধু নেই। সে কি হাওয়ায় উড়ে আসা তুলোর বীজ? সে আর এক দণ্ডও এই বিদেশে থাকবে না, এই সাইকেল চালিয়েই সে সোজা চলে যাবে বন্দরে…

বিকট আওয়াজ করে একটা গাড়ি ব্রেক কষতেই অতীন সাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে গেল। কখন যেন ভুল করে সে রাস্তার বাঁ দিকে লে এসেছিল। এই ভুলটা তার প্রায়ই হয়। এদেশের রাস্তায় ডান দিক দিয়ে সব গাড়ি চলে, সেটা অতীন এখনও রপ্ত করতে পারেনি।

রাস্তায় পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই অতীন ভাবলো, গাড়িটা কি তাকে এবার চাপা দেবে? তেলে দেবে শরীর? না, গাড়িটা থেমে গেছে। অতীন তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। তার কি হাত কিংবা পা ভেঙেছে। চোখে চোট লেগেছে? না, কিছুই হয়নি। অতীন মজুমদারকে মারা অত সহজ নয়। স্বয়ং মৃতই যেন তাকে পাহারা দেয়।

গাড়ির চালকটি একটা কথাও বললো না। এটা প্রধানত ছাত্রদের শহর, এখানে সাইকেল আরোহীদের বিশেষ অধিকার আছে। সে এক নজরে অতীনকে সুস্থ অবস্থায় দেখে নিয়ে আবার গাড়িতে স্টার্ট দিল।

সাইকেলটা তুলে টাল ঠিক করলো অতীন। তার জামা-প্যান্ট সম্পূর্ণ ভেজা, রুমাল বার করে মুখটা মুছে নিল একবার। এইরকম সময়ে একটা সাংঘাতিক একাকিত্ব বোধ হয়! সে সাইকেল থেকে পড়ে গেল, অথচ রাস্তার একটা লোকও তার কাছে এসে একটা কথা বললো না! অবশ্য সে যদি হাত ছড়িয়ে রাস্তাতেই শুয়ে থাকতো, তাহলে প্রায় ভোজবাজির মতনই হঠাৎ এসে উপস্থিত হতো একটা পুলিশের গাড়ি, তারপর একটা অ্যাম্বুলেন্স, অনেকগুলো মুখ ঝুঁকে আসতো তার কাছে।

শরীরে কোনো আঘাত না লাগলেও মনে একটা ধাক্কা লেগেছে, অতীন আবার বাস্তবে ফিরে এসেছে। সে বন্দরে যাবে না, নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরবে। এখানেই তাকে থাকতে হবে আরও অন্তত দু’তিন বছর।

বাড়িতে পৌঁছে সে সাইকেলটা উঁচু করে তুলে এনেপর্চে রেখে তালা ছিল। অন্য কিছু চুরি গেলেও এখানে সাইকেল বেশ চুরি হয়। কে কার সাইকেল নিয়ে কখন চলে যাবে, কোনো ঠিক নেই। অতীন ঠিক করে রেখেছে, তার সাইকেলটা যদি হঠাৎ চুরি যায়, তা হলে সে আর নতুন সাইকেল না কিনে সেও ক্যামপাস থেকে অন্য কারুর সাইকেল তুলে নেবে।

আজও লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছে সোমেন। ঘাড় ফিরিয়ে সে উত্তেজিত ভাবে বললো, অতীনবাবু, এদিকে দেখবেন আসুন, চট করে আসুন!

সোমেনের সঙ্গে ঠিক বন্ধুত্ব না হলেও বেশ আলাপ হয়েছে অতীনের। সোমেন অর্থনীতির ছাত্র, তার কথাবার্তাও বেশ গম্ভীর গম্ভীর হলেও সে বেশ ভালো গান করে। বিশেষত পল্লীগীতি। সেগুলো শুনতে অতীনের ভালো লাগে।

অনেকের সঙ্গে একসঙ্গে বসে টিভি দেখা অতীনের পছন্দ নয়। এক একজন এক একরকম মন্তব্য করে, যা শুনলে কখনো কখনো গা জ্বলে যায়। তাছাড়া চ্যানেল নিয়ে মতভেদ হয়, অতীনের সি বি এস-এর অনুষ্ঠানগুলি বেশী পছন্দ, অন্যরা অনেকেই দেখতে চায় এন বি সি, কেউ কেউ দেখতে চায় স্থানীয় প্রোগ্রাম। দুপুরবেলা সুযোগ পেলে অতীন একা টিভি দেখে, সন্ধেবেলা সাধারণত এঘরে ঢোকে না। অন্য কেউ ডাকলেও সে এড়িয়ে যায়।

আজ সে সোমেনের ডাকে সাড়া দিল। এখন নিজের ঘরে গিয়ে একা থাকতে ইচ্ছে করছে না। সারাদিন সে প্রায় মুখ বুজে কাজ করছে, এখন সে একটু মানুষের সঙ্গ চায়।

ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অতীন ভাবলো, এরা কেউ জানে না যে মাত্র মিনিট দশেক আগে তার সাইকেল একটা গাড়ির সঙ্গে প্রায় ধাক্কা মেরেছিল। আর দু’এক সেকেণ্ড এদিক ওদিক হলেই তাকে যেতে হতো হাসপাতালে কিংবা মর্গে। চিরকালের জন্য হারিয়ে যেত অতীন মজুমদার। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে এত সূক্ষ্ম একটা সুতো। তাকে দেখে এরা কেউ বুঝতে পারবে না যে সে প্রায় পুনর্জীবন পেয়ে ফিরে এলো। এখন কারুকে কিছু বলারও মানে হয় না। শর্মিলাও কোনো কিছুই জানতে পারবে না। সেদিন ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেন বদলে গেল শর্মিলা?

সোমেন বললো, শিগগির এসে বসুন, একটা দারুণ ব্যাপার দেখাচ্ছে।

সোমেন ছাড়াও ঘরের মধ্যে রয়েছে সুরেশ আর তার বান্ধবী তিন্নি। আর আবিদ হোসেন। অতীন একটা চেয়ার ঘুরিয়ে বসলো। বাড়িওয়ালা উপস্থিত নেই, সুতরাং এখানে বসে অনায়াসে সিগারেট খাওয়া যায়।

সাড়ে আটটায় টক শো। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। রয় রবসন নামে একজন অতি বুদ্ধিমান সুবক্তা, প্রতিটি অনুষ্ঠানে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে একজন কারুকে বেছে নিয়ে আসে, তারপর তাকে নানান প্রশ্ন করে তার জীবনকাহিনীটা সবার সামনে তুলে ধরে। প্রশ্ন করার গুণে প্রতিটি জীবনকাহিনীই মনে হয় এক একটা রোমাঞ্চকর গল্প।

সোমেন ফিসফিস করে বললো, আজ রয় রবসন যে ‘অতিথি’-কে নিয়ে এসেছে তার নাম পল গ্রে। এই লোকটা জাহাজী ইঞ্জিনিয়ার, জাহাজে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। দু’মাস ওদের জাহাজ চিটাগাং-এ আটকা পড়েছিল। এই সবে শুরু হলো…

রয় রবসন : মিঃ গ্রে, আপনি যে-জাহাজে কাজ করেন, সেই জাহাজ কী ধরনের মালপত্র নিয়ে যায়?

পল গ্রে : নানা ধরনের মালপত্র, কখনো কোনো মেশিন, তারপর গাড়ি, ইয়ে, বিমানের যন্ত্রাংশ।

রয় রবসন : আপনাদের এই জাহাজে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যাওয়া হয় নিশ্চয়ই?

পল গ্রে : হ্যাঁ, কিছু কিছু হালকা ধরনের অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হয়।

রয় রবসন : কী ধরনের হালকা অস্ত্র?

পল গ্রে : সেটা বলা নিষেধ।

রয় রবসন : এবারে আপনাদের যে-জাহাজ চিটাগাং পোর্টে গিয়ে আটকে ছিল, সেটাতেও অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই ছিল নিশ্চয়ই।

পল গ্রে : না, না, এবারের মালপত্র ছিল শুধু খাদ্য। শুধু গম।

রয় রবসন : গম বোঝাই জাহাজ! ও! চিটাগাং পোর্টে আপনাদের কতদিন আটকে থাকতে। হয়েছিল?

পল গ্রে : প্রায় তিন সপ্তাহ। মাল খালাস হচ্ছিল না, আমরা অধৈর্য হয়ে উঠেছিলাম। রয় রবসন : মাল খালাস হতে দেরি হচ্ছিল কেন?

পল গ্রে : সেখানে কিছু একটা গোলমাল চলছিল, এক ধরনের বিদ্রোহ। আপনি জানেন কি না জানি না। পাকিস্তানে দুটি জাতি আছে। একটি পাকিস্তানী, আর একটি বাঙালী। এই দুই জাতির মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল।

রয় রবসন : বাঙালীরাও পাকিস্তানী। মনে করুন, আমাদের এখানেও অনেক ইতালিয়ান বা গ্রীক অরিজিনের লোক আছে। কিন্তু তারাও তো আমেরিকান তাই না? আপনি বলতে চাইছেন, সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের লড়াই চলছিল।

পল গ্রে : অনেকটা বই।

রয় রবসন : আপনারা জাহাজ ভর্তি অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন ঐ সৈন্যবাহিনীকে সাহায্য করবার জন্য।

পল গ্রে : না, না, না, আমরা গম নিয়ে গিয়েছিলাম। ওরা তো গরিব, ওরা খেতে পায় না, তাই আমরা গম দিয়ে সাহায্য করি।

রয় রবসন : তাহলে গম খালাস করতে দেরি হচ্ছিল কেন? ক্ষুধার্ত লোকেরা তো যত তাড়াতাড়ি খাবার পাবে, ততই খুশি হবে।

পল গ্রে : হয়তো সৈন্যবাহিনী চাইছিল, সাধারণ মানুষকে না খাইয়ে রেখে জব্দ করতে। আমরা প্রথম কয়েকদিন বন্দুক ও কামানের গোলাগুলির শব্দ পেয়েছি। তারপর সব থেমে গেল। কিন্তু মাল খালাস করার জন্য বন্দরে কোনো কুলি ছিল না। বন্দর একেবারে জনমানবশূন্য ছিল।

রয় রবসন : আপনারা কি তাহলে দিনের পর দিন জাহাজে বসে থাকতেন?

পল গ্রে : মাঝে মাঝে আমরা শহরে যেতাম। অবশ্য চিটাগাং ক্লাব ছাড়া ওই শহরে আর কোনো ভালো পানাহারের জায়গা নেই, বাধ্য হয়েই যেতাম সেখানে।

রয় রবসন : মিঃ গ্রে, চিটাগাঙে এই প্রথমবার গেলেন আপনি?

পল গ্রে : না, এই নিয়ে তৃতীয়বার, প্রত্যেকবারই ঐ চিটাগাং ক্লাবে গেছি। কয়েকজনের সঙ্গে আলাপও হয়ে গিয়েছিল।

রয় রবসন : যাদের সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল, তাদের মধ্যে কোনো বাঙালী ছিল?

পল গ্রে : আগের দু’বার কয়েকজন বাঙালীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। কিন্তু এবার তাদের দেখিনি। আমি একজন আর্মি ক্যাপটেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মিঃ হামিদ কোথায়? ক্যাপটেনটি ঘৃণায় নাক কুঁচকে বললো, হামিদ? সে তো একটা বেজন্মা বাঙালী! তার নাম আর উচ্চারণ করো না। ভবিষ্যতে এই চিটাগাং ক্লাবে কোনো কুকুর কিংবা বাঙালীকে ঢুকতে দেওয়া হবে না! যদিও সেই ক্লাব প্রাঙ্গণে কয়েকটা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আপনি জানেন কি না জানি না, মিঃ রবসন। প্রাচ্য দেশের যে কোনো শহরেই রাস্তায় অনেক কুকুর ঘুরে বেড়ায়। তারা বড় বড় হোটেল এবং ক্লাবেও ঢুকে পড়ে।

রয় রবসন : খুবই কৌতূহলজনক, খুবই কৌতূহলজনক। আপনি চিটাগাং ক্লাবে কুকুর দেখেছেন, কিন্তু বাঙালী দেখেননি। চিটাগাং তো দেখছি বেঙ্গল-এরই একটি শহর? সানফ্রান্সিসকোর কোনো ক্লাবে সানফ্রান্সিসকোর কোনো অধিবাসী ঢুকতে পারে না, এরকম কি হতে পারে?

পল গ্রে : প্রাচ্য দেশে এরকম হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, রোডেশিয়াতে এরকম হয়। এমনকি আমাদের ফ্লোরিডার অনেক ক্লাবেও ফ্লোরিডার কালো মানুষদের ঢুকতে দেওয়া হয় না!

রয় রবসন : বাঙালীরা কি কালো?

পল গ্রে : পাকিস্তানী ও বাঙালীদের মধ্যে আমি গাত্রবর্ণের কোনো তফাত বুঝতে পারিনি। তবে বাঙালীদের ওপর ঐ পাকিস্তানীদের খুবই রাগ। সেই ক্যাপটেন বলেছিল যে, এরপর আর কোনো বাঙালীকে গাড়ি চড়তেও দেওয়া হবে না। যাদের গাড়ি আছে, সেইসব পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে। আর প্রত্যেক পাকিস্তানী সৈন্য একজন করে বাঙালী মেয়েকে রক্ষিত রাখবে।

রয় রবসন : ওরা বাঙালী পুরুষদের ঘৃণা করে আর বাঙালী মেয়েদের পছন্দ করে?

পল গ্রে : হয়তো তাই। ক্যাপটেনটি অবশ্য অন্য কারণ দেখিয়েছিল। বাঙালীদের সংখ্যা নাবি পাকিস্তানীদের চেয়ে কিছুটা বেশি। এরা কিছু বাঙালীকে মেরে ফেলবে, আর বাঙালী রক্ষিতাদের গর্ভে যে সন্তান জন্মাবে তারাও হবে পাকিস্তানী।

রয় রবসন : তোমার সঙ্গে কোনো বাঙালীর কোনো কথাই হয়নি এবারে?

পল গ্রে : না, কোনো বাঙালীকে দেখতে পাইনি। তারা ভয় পেয়ে পালিয়েছিল। কিছু বাঙালী শহরের বাইরে থেকে লড়াই করছিল।

রয় রবসন : তোমার সঙ্গে শুধু পাকিস্তানী আর্মির লোকেদেরই কথা হয়েছে। কী করে জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র খালাস করা যায়, সেই ব্যাপারে তারা আলোচনা করেছিল?

পল গ্রে : না, না, অস্ত্র-শস্ত্র নয়, গম। তাছাড়া মাল খালাসের ব্যাপারে তারা জাহাজের ক্যাপটেনের সঙ্গে আলোচনা করবে, আমার সে দায়িত্ব নয়।

রয় রবসন : ওখানে যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে, তার কোনো নমুনা তুমি নিজের চোখে দেখেছো?

পল গ্রে : একটি দৃশ্যই আমি দেখেছি। আমি তখন বন্দর থেকে চিটাগাং ক্লাবের দিকে যাচ্ছিলাম। এক জায়গায় দেখি একটি ব্যারাকবাড়ির দেওয়ালের দিকে মুখ করে দশ বারো জন লোককে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুনলাম তারা বিদ্রোহী পুলিশ। তাদের গুলি করে মারা। হলো, আমি তার একটা ছবিও তুলেছি।

পর্দায় ভেসে উঠলো সেই ছবি। লুঙ্গি পরা, খালি গায়ে রোগা রোগা কয়েকজন মানুষ, তাদের কোনোক্রমেই পুলিশ বলে মনে হয় না। পেছন ফিরে হাত তোলা অবস্থায় গুলি খেয়ে তারা যখন পড়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ছবিটি তোলা।

আমেরিকান টিভিতে নিরুপদ্রবে কোনো অনুষ্ঠান দেখার উপায় নেই। বিশেষ বিশেষ আগ্রহের মুহূর্তেই অনুষ্ঠান থামিয়ে দিয়ে শুরু হয়ে যায় বিজ্ঞাপনমালা।

ওরা এতক্ষণ প্রায় নির্বাক হয়ে দেখছিল, এবার তিন্নি বললো, এই বীভৎস দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারি না।

সুরেশ বললো, এটা একজন আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আমেরিকান টিভি-তে এটা দেখাচ্ছে সেটাই খুব আশ্চর্যের ব্যাপার। আমেরিকা তো পাকিস্তানী আর্মির এক নম্বর সাপোর্টরি। ঐ যে রয় রবসন ইঙ্গিত করছিল না, জাহাজটায় গম আছে না অস্ত্র আছে, আসলে আমেরিকান অস্ত্র নিয়েই তো ওরা লড়ছে।

ওড়নাটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে তিন্নি বললো, আমি আর দেখবো না। আমি বাড়ি যাচ্ছি।

সুরেশ তাকে এগিয়ে দিতে গেল।

আবিদ হোসেন থুতনিতে হাত দিয়ে ঝিম মেরে বসে আছে। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। তিন-চারদিন আগেও সে পাকিস্তানের সমর্থনে তুমুল তর্ক করেছে সোমেনের সঙ্গে। তার মতে শেখ মুজিব একজন দেশদ্রোহী।

সোমেন জিজ্ঞেস করলো, আবিদ সাহেব, এবার আপনার বিশ্বাস হলো কী? নাকি, আপনি মনে করেন, পুরো প্রোগ্রামটাই ককটেড?

আবিদ হোসেন ফিসফিস করে বললো, চিটাগাং ক্লাবে কোনো বাঙ্গালী ঢোকে না? আমার ফাদার ঐ ক্লাবের সেক্রেটারি। তিনি কিছু জানান নাই।

–ক’দিন আগে তাঁর চিঠি পেয়েছেন? ২০৪

উত্তর না দিয়ে আবিদ হোসেন স্থির ভাবে চেয়ে রইলো সোমেনের দিকে। তার মুখে ছায়া ঘনিয়ে আসছে। চট্টগ্রাম সম্পর্কে বেশ কয়েকটা খবর বেরিয়েছে সংবাদপত্রে, এখন শোনা গেল একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। রয় রবসনের অনুষ্ঠানে কেউ মিথ্যে কথা বলে পার পায় না।

অতীন চুপ করে বসে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা নিয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট মতামত গড়ে ওঠেনি তার মনে। এটা উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে স্বৈরাচাবীদের সংঘর্ষ, এর মধ্যে কোনো পক্ষকেই সমর্থন করা যায় না। কিন্ত শক্তিশালী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অত্যাচারে পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষ প্রাণ দিচ্ছে, এটাও অস্বীকার করা যায় না। আমেরিকান টিভি চ্যানেল গুলো বেসরকারী, এরা আমেরিকান সরকারের নীতি মানতে বাধ্য নয়, এরা অনেক সময় সত্যি খবর দেয়। এমন কি ভিয়েৎনামে আমেরিকান সৈন্যদের বদমায়েশীর অনেক চমকপ্রদ তথ্যও টিভিতে দেখা যায়।

সে শুকনো গলায় সোমেনকে জিজ্ঞেস করলো, এরা অনেকদিন ইণ্ডিয়ার খবর দেয় না, এরা ইণ্ডিয়াকে অ্যাভয়েড করে, তাই না?

সোমেন উত্তেজিত ভাবে বললো, কালকেই তো একটা সাঙ্ঘাতিক খবর দিয়েছে, আপনি দেখেন নি? কলকাতার খবর! দমদমে জেল ব্রেক। রিসেন্ট টাইমসে এত বড় জেল-ব্রেক আর হয়নি! দমদম জেলে নকশাল বন্দীদের সঙ্গে গার্ডদের লড়াই। নকশালীরা প্রচুর আর্মর্স-অ্যামুনিশান স্মাগল করে এনেছিল জেলের মধ্যে, ভেবে দেখুন, ওরা জেলের মধ্যে বোম চার্জ করেছে, প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে দু’পক্ষ গুলি বিনিময় করেছে, খবরে বললো যে ১৫টি ৭শাল ছেলে মারা গেছে আর ৩২ জন পালাতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত!

অতীনের সমস্ত শরীরটা কাঁপতে লাগলো। মাথায় যেন এক শো পাঁচ ডিগ্রি জ্বর। এরকম একটা সংবাদের ধাক্কা সে সামলাতে পারছে না। কোনোক্রমে সে বললো, ১৫ জন মারা গেছে?

সোমেন বললো, জেলের ভেতরের একটা ছবিও দেখিয়েছে। কী করে এরা এইসব ছবি পায় কে জানে! ডেড বড়ির ছবি। অবশ্য কতজন গার্ড মারা গেছে সে কথা বলেনি।

–মৃতদের নাম বলেছে?

–না, নাম বলেনি! আজকের নিউ ইয়র্ক টাইমসেও ছোট করে খবরটা বেরিয়েছে। আজকের পেপারে আরও একটা বড় খবর আছে, লক্ষ করেন নি? ইন্দিরা গান্ধী ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলো ন্যাশনালাইজ করেছে। এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্টেপ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মন্তব্য করেছে যে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার পুরোপুরি সোভিয়েত ক্যাম্পে চলে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট নিকসন এখনো তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।

অতীনের আর কিছু শোনার মতন অবস্থা নেই। সে ঘোর লাগা মানুষের মতন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ১৫ জন নিহত। মানিকদা, কৌশিক, পমপম, তপন, অরিন্দম, এরা কি কেউ ছিল তার মধ্যে? অনেকদিন ওদের কোনো খবর জানে না অতীন!

যুদ্ধ এখনও চলছে। তার বন্ধুরা হার মানেনি। জেলের দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকতে তারা রাজি নয়, জেল ভেঙে বেরিয়ে আসছে, বাইরে এসে সঙঘবদ্ধ হয়ে তারা আবার শোষকশ্রেণীকে আঘাত হানবে!

আর সে কী করছে, সে আমেরিকায় বসে আছে? সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ধনতন্ত্রী এই দেশটির বিরুদ্ধেই তাদের প্রধান আক্রোশ, আর সে এই দেশেরই টাকায় খাচ্ছে, পরছে, ঘুরে। বেড়াচ্ছে।

দু’তিন ধাপ সিঁড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে অতীন উঠে এলো নিজের ঘরে। আর একদিনও একা থাকা চলে না। তাকে ফিরে যেতেই হবে, তারপর যা হয় হোক! ওয়ার্ডরোব থেকে সে সুটকেসটা টেনে বার করলো। খুব প্রয়োজনীয় জিনিস কটা গুছিয়ে নিতে হবে শুধু! ১৫ জন মারা গেছে! কে কে আছে তাদের মধ্যে? মানিকদা, কৌশিকদের যদি কিছু হয়ে থাকে, তাহলে তার বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়?

দরকারি কয়েকটা বই ও জামা কাপড় উত্তেজনা বশে সুটকেসে ভরতে ভরতেই তার মনে হলো, টিকিট কাটতে হবে, টাকাটা কোথায় পাওয়া যাবে? এ তো হাঁটা পথ নয়, মাঝখানে রয়েছে দুটো মহা সমুদ্র!

টাকা, অনেক টাকার ব্যাপার! কে দেবে তাকে সেই টাকা?

তাকে ফিরে যেতেই হবে, যে-কোনো উপায়ে!

জাহাজ-ফাহাজে আজকাল কেউ যায় না। প্যাসেঞ্জার লাইনারগুলো উঠে গেছে। যেতে হবে প্লেনেই। অত টাকা কোথায় পাওয়া যায়? কে ধার দিতে পারে?

এখানকার ব্যাঙ্ক টাকা ধার দেয়। এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদেরও দেয়। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে পালিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু অতীনের নতুন অ্যাকাউন্ট, মাত্র দশ বারো ডলার পড়ে আছে, তাকে দেবে না, শর্মিলা পেতে পারে। শর্মিলার মামা এখানে বড় চাকরি করেন, তিনি গ্যারান্টার হলে কোনো অসুবিধেই নেই। শর্মিলা? শর্মিলা তো অতীনের কেউ নয়। সে অতীনকে সহ্য করতে পারে না বলে ওয়াশিংটন ডি সি-তে পালিয়ে গেছে। শর্মিলার সঙ্গে এই ঘরে, এই বিছানায় সে রাত্রি কাটিয়েছে, শর্মিলা নিশ্চয়ই সেই স্মৃতিও মুছে ফেলতে চায়!

আর কে ধার দিতে পারে?

অতীনের হঠাৎ পাঁচুদার কথা মনে পড়লো। স্বল্পভাষী পাঁচুদাকে দেখলেই যেন একটা আস্থা। পাওয়া যায়। পাঁচুদা অতীনের মনের অবস্থাটা নিশ্চয়ই বুঝবেন। ইচ্ছের বিরুদ্ধে অতীন এখানে আর কিছুদিন থাকলে পাগল হয়ে যাবে! জেলখানায় তার ১৫ জন বন্ধু মারা গেছে, আর সে এখানে বসে ডিগ্রি অর্জনের বিলাসিতা করবে? আমেরিকান ডিগ্রির মুখে লাথি!

কিন্তু, পাঁচুদার সঙ্গে কোনো আত্মীয়তা নেই, মাত্র অল্প দিনের পরিচয়, তার কাছে কি মুখ ফুটে অতগুলো টাকা ধার চাওয়া যায়? ধার মানে কি, অতীন জীবনে কি কখনো তিন-চার হাজার ডলার শোধ দিতে পারবে? পাঁচুদার কাছে চাইবার পর তিনি যদি না বলেন, শান্তা বৌদিও খুব ভালো, কিন্তু তিনি যদি বলেন, আমাদের ভাই বন্ধুত্বের সম্পর্ক, তার মধ্যে টাকা পয়সার কথা এনো না! প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারে না অতীন!

সিদ্ধার্থ, সিদ্ধার্থ দিতে পারে। সিদ্ধার্থ নতুন গাড়ি কিনেছে, অন্য অ্যাপার্টমেন্টে গেছে, ওর হাতে এখন বিশেষ পয়সা নেই, কিন্তু অফিস থেকে কিংবা ব্যাঙ্ক থেকে যোগাড় করে দেওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব নয়। ওর এক পাঞ্জাবী বন্ধুর ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে, তার কাছ থেকে বাকিতে একটা টিকিট যোগাড় করে দিতে পারবে না?

অতীনকে দেশে ফিরে যেতেই হবে।

সে খালি পায়ে তরতর করে নেমে এলো নিচে। লিভিং রুম এখন ফাঁকা, সবাই যে-যার ঘরে চলে গেছে। অতি ব্যস্তভাবে অতীন সিদ্ধার্থকে ফোন করলো। সিদ্ধার্থ বাড়িতে না থাকলেই মুশকিল।

কয়েকবার রিং হবার পর সিদ্ধার্থ এসে ফোন ধরলো। অতীনের গলা শুনে সে বেশ বিরক্তভরে বললো, তুই কি ফোন করার আর সময় পেলি না? আমি একজনকে কবিতা পড়ে শোনাচ্ছিলুম। তুই নিজে তো কবিতা টবিতা।

অতীন তাকে বাধা দিয়ে প্রায় চিৎকার করে বললো, সিদ্ধার্থ আমি দেশে ফিরে যেতে চাই। কালকেই।

সিদ্ধার্থ বললো, দেশে ফিরতে চাস! দেশ কি মামারবাড়ি নাকি? যখন ইচ্ছে যাওয়া যায়?

–সিদ্ধার্থ, আমাকে যেতেই হবে! আমাকে যেতেই হবে, আমি আর একদিনও থাকতে চাই! আমি ডিগ্রি-ফিগ্রি কিছু চাই না! এই ক্যাপিটলিস্টদের দেশে আমার অসহ্য লাগছে!

–গাধার মতন চ্যাঁচাচ্ছিস কেন? আস্তে বলা যায় না? আমার কান ফেটে যাচ্ছে।

–তুই শুনেছিস, দমদম জেলে ওরা ১৫ জন নকশালকে গুলি করে মেরে ফেলেছে? টিভিতে বলেছে। কাগজে বেরিয়েছে।

–হ্যাঁ, আমি টিভিতে শুনেছি।

–তারপরেও তুই বলতে চাস, আমি এদেশে পড়ে থাকবো? আমি কি মানুষ না? তুই বুঝতে পারছিস না…

–আমি ঠিকই বুঝতে পারছি। তোর বিবেক দংশন হচ্ছে। বিবেক থাকলেই তাতে মাঝে মাঝে দংশন হবে। তুই এক কাজ কর, আজ স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমো। তারপর স্বপ্নে দেশে ফিরে যা। আমি তো স্বপ্নে এরকম কত বার যাওয়া আসা করি।

–ঠাট্টা নয়রে, সিদ্ধার্থ। আমি যাবোই ঠিক করেছি। তুই আমার টিকিটের টাকাটা ধার দিবি?

–দিবি না! তোকে আমি শোধ করে দেবো, যে কোনো উপায়ে হোক। আমি মরে গেলেও তুই টাকাটা পাবি। তুই আমার একটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দে।

–স্যরি ওল্ড চ্যাপ! টাকা ফাঁকা আমি দিতে পারবো না।

–সিদ্ধার্থ, আই বিসিচ ইউ, প্লীজ, তুই আমার এই লাস্ট উপকারটা কর।

–অতীন, টাকা ফাঁকার কথা আমার কাছে আর উচ্চারণ করিস না। রাত দশটার পর টাকা। কথাটাই আমার কাছে অশ্লীল বলে মনে হয়!

–চশমখোর, আমি এত করে বলছি, তুই আমাকে এই টাকাটা দিবি না! এটা আমার জীবন মরণ প্রশ্ন!

–আমি চশমখোর তো বটেই। আমি চেনাশুনো সবাইকে টেলিফোন করে বলে দেবো! কেউ যেন ভুল করেও তোকে টিকিট কাটার টাকাটা না দেয়!

–আমি ফিরতে চাইলে কে আমাকে আটকাবে?

–হনুমানের মতন লাফিয়ে সমুদ্র পার হয়ে যা! তারপর কলকাতায় গেলেই তাকে পুলিশ ক্যাঁক করে ধরবে! তোর নামে এখনও ওয়ারেন্ট ঝুলছে, তা কি আমি জানি না? সেন্টিমেন্টাল ফুলের মতন তুই দেশে ফিরে গেলেই ধরা পড়বি, আবার জেলে যাবি, হয়তো ঐ ১৫ জনের মতন তুইও গুলি খেয়ে মরবি। তাতে বিপ্লবের কী উপকারটা হবে শুনি?

–আমি ধরা পড়বো না! আমি সোজা কলকাতায় না গিয়ে দিল্লিতে নেমে, তারপর সেখান থেকে এ

–দিল্লিতে বুঝি পুলিশ নেই? ধরা তুই পড়বিই।

–শোন, সিদ্ধার্থ—

–আমার আর এসব আজে বাজে কথা শোনার সময় নেই! আমি ব্যস্ত আছি! কট করে সিদ্ধার্থ লাইন কেটে দিল। কয়েক মুহূর্ত বিহ্বল ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো অতীন। খাঁচায় বন্দী পশুর ছবিটা ফিরে এলো তার কাছে। কোনো উপায় নেই, ফিরে যাবার কোনো উপায় নেই। মানিকদা, কৌশিক পমপমরা তাকে কাপুরুষ, পলাতক ভাবছে!

বহুদিন বাদে অতীনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এলো। অসম্ভব এক নিমর্ম একাকিত্ব যেন শক্ত দড়ির মতন হাত-পা পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলেছে। সে শিশুর মতন দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে বলতে লাগলো, মা, মা, মা।

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে। সারা বাড়িতে কোনো শব্দ নেই। যানবাহন হাল্কা হয়ে এসেছে রাস্তায়। অতীন এক সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। খালি পা, গেঞ্জি গায়ে। কালো রঙের রাস্তাটার মাঝখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। কোনো গাড়ি তাকে চাপা দেবে না, সে। জানে। দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু নেই। কিন্তু অসুখ-বিসুখও কি তার হতে পারে না? আজ সে সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজবে এখানে দাঁড়িয়ে।

২৬. বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গাড়ি

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গাড়ি পার্ক করে বিমানবিহারী, মামুন এবং প্রতাপ ট্রামলাইন পার হয়ে এলেন। কলেজ স্কোয়ারের গেটের দুপাশে দুটি পুলিশের গাড়ি পার্ক করা। রাইফেলধারী সিপাহীরা সকলেই দাঁড়িয়ে আছে, তারা পিঠে পিঠ দিয়ে নজর রেখেছে দু’দিকে। পার্কের মধ্যে জমায়েত হয়েছে কুড়ি-পঁচিশজন মানুষ, প্রায় সকলেই বেশ বয়স্ক, তাদের চোখে মুখে অশান্তির চিহ্ন। কয়েকজনের হাতে ফুল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক মুখোমুখি বসানো বিদ্যাসাগরের মূর্তিটির মাথা সাদা কাপড় দিয়ে। মোড়া। মাত্র কয়েকদিন আগেও এই পথের পথচারীরা দেখেছে বিদ্যাসাগরের মুণ্ডহীন মূর্তি। শিক্ষা-দীক্ষার কেন্দ্র এই কলেজ স্ট্রিটে এদেশে নারী ও শিশুদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ব্যবস্থার অগ্রণী পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মুণ্ডপাত করা হয়েছিল কিছুদিন আগে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি।

বিপ্লবী যুবসমাজ এখন মূর্তিভাঙার উল্লাসে মত্ত। বিদ্যাসাগর ছাড়াও রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী ও অন্যান্য জাতীয় নেতাদের মূর্তি ভাঙা হয়েছে অনেক জায়গায়, দেয়াল থেকে তাঁদের ছবি নামিয়ে এনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে আগুনে। বিদ্যাসাগরের ওপর রাগটাই যেন বেশী, বিদ্যাসাগরের শুধু মুণ্ডুই কাটা হয়নি, তাঁর প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিও ছড়িয়ে পড়েছে প্রচণ্ড ঘৃণা, দিকে দিকে স্কুল-কলেজে ভাঙচুর-তছনছ হচ্ছে, এমনকি স্কুলের ছাত্ররাও পুড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের স্কুল। প্রতিবাদ করার সাহস কারুর নেই। বিপ্লবী ছাত্রদের কাছে এখন প্রচুর হাতবোমা, সেগুলি যথেষ্ট কার্যকর, তাতে শুধু ভয়-ধরানো প্রচণ্ড শব্দই হয় না, মানুষও মরে। একসঙ্গে তিন চারটি যুবক ও তাদের সঙ্গে তিন চারটি হাতবোমা, এদের দেখলেই সাধারণ মানুষ। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে পালায়, যেন নতুন বর্গীর আমল এসেছে।

মূর্তি ভাঙার এই বিপ্লবের নির্দেশ যে ঠিক কার কাছ থেকে প্রথম এসেছিল তা ঠিক জানা যায় না। পরীক্ষার হলে ছাত্ররা হঠাৎ প্রশ্নপত্র ও খাতা ছিঁড়ে, চেয়ার-টেবিল ভেঙে পরীক্ষা। ব্যবস্থাটাকেই লণ্ডভণ্ড করতে গিয়ে কখনো হয়তো গান্ধী-রবীন্দ্রনাথের ছবিও ভেঙে ফেলেছে। পূজনীয় মনীষীদের প্রতি এই অসম্মানে মধ্যবিত্ত নীতিবাগিশ শ্রেণীর মধ্যে যে হাহাকার জেগে। ওঠে, তা দেখেই যেন বেশী মজা পেয়েছে অল্প বয়েসীরা। মধ্যবিত্ত মানসিকতায় আঘাত করতেই তো তারা চায়। ভাঙুক, সব কিছু ভাঙুক, পুড়ে যাক, পুরোনো সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাক!

মূর্তি ও ছবি এবং শিক্ষাব্যবস্থা ভাঙার ব্যাপারে যুবসমাজের এই প্রবল ও স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ দেখে নকশাল আন্দোলনের নেতারা এতে নৈতিক সমর্থন জানালেন। এই সব অত্যুৎসাহী ছাত্রেরা সি পি আই (এম এল) দলের সদস্য নয়, কিন্তু তারাও বিপ্লবী। এই ভাবেই তো বিপ্লব ছড়ায়। তাত্ত্বিক নেতা সরোজ দত্তের মতে, এইসব ছাত্র ও যুবকেরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো নির্দেশ না পেয়েই এই মূর্তি ভাঙা শুরু করেছে, কিন্তু এরা জনসাধারণের চিন্তা ধারা ঠিক মতন অনুধাবন করতে পেরেছে, বিপ্লবী দলের রাজনৈতিক লাইনের সঙ্গেও এর কোনো অমিল নেই। এরা মূর্তি ভাঙছে নতুন মূর্তি গড়বে বলে। গান্ধীকে সরিয়ে এরা ঝাঁসীর রাণীর মূর্তি বসাবে, ব্যারাকপুরের গান্ধীঘাট হবে মঙ্গল পাণ্ডে ঘাট। এই সব নবীনেরা শোধনবাদী অতীতের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়!

চারু মজুমদারও সমর্থন জানালেন এই তারুণ্যের উদ্দীপনাকে। তিনি লিখলেন, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা আর ধনতন্ত্রের দালালদের প্রতিষ্ঠিত মূর্তিগুলো না ভাঙলে নতুন বিপ্লবী-শিক্ষা ও সংস্কৃতির পত্তন করা যাবে না। বাংলায় সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ আজ এক বাস্তব সত্য–তারই প্রতিক্রিয়ায় ছাত্র ও যুবসমাজ অস্থির হয়ে উঠেছে। যারা বারবার সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহকে শান্তির বাণী ও শোধনবাদ দিয়ে চাপা দিতে চেয়েছে, তাদেরই মূর্তিতে এখন আঘাত হানছে ছাত্ররা। এই ছাত্র ও যুবসমাজের লড়াই সেইজন্য সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহেরই অঙ্গ!

ভাঙতে গেলে শেষ পর্যন্ত আর বাদ বিচার থাকে না, একটা মূর্তি ভাঙলে অন্য মূর্তি ভাঙতেই বা দোষ কী! আবেগপ্রবণ বাঙালী মানুষ খুনের চেয়েও কোনো পূজনীয় পাথরের মূর্তির শিরচ্ছেদে বেশী শিহরিত হয়। অল্প বয়েসীদের তাতেই বেশী আনন্দ! বিপ্লবী পার্টির বয়স্ক নেতারা তাতেও আপত্তি জানালেন না। শুধু সুশীতল রায়চৌধুরীর মনে একটু দ্বিধা এসেছিল। গান্ধী আর বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথকে সমান পর্যায়ে দেখা কি ঠিক? এদের কয়েকজনকে অন্তত কি বুর্জোয়া ডেমোক্রাট বলা যায় না? ইস্কুল কলেজের চেয়ার-টেবিল ভাঙা ও ফাঁইল পোড়ানোর বদলে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের একটা আন্দোলনও কি শুরু করা উচিত নয়? রবীন্দ্রনাথের বুর্জোয়া মানবতাবাদ ও সীমাবদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাকে কি কাজে লাগানো যায় না?

এর উত্তরে চারু মজুমদার কমরেড পূর্ণকে (সুশীতলের ছদ্মনাম) সতর্ক করে দিলেন একটি প্যামফ্লেটে যে, পার্টি কংগ্রেসের প্রোগ্রামেই বলা হয়েছে, ভারতীয় বুর্জোয়ারা প্রথম থেকেই একটি দালাল শ্রেণী। তাদের মধ্য থেকে বুর্জোয়া ডেমোক্রাটদের খুঁজে বার করার চেষ্টাই পাটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে। এদেশের ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশ এবং সাধারণ মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়। বিপ্লবী আদর্শ এবং মাও সে তুং-এর চিন্তা ধারায় যারা বিশ্বাসী, এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করাই তাদের পবিত্র দায়িত্ব। সেই ঘৃণা থেকে যদি ছাত্ররা চেয়ার-টেবিল ভাঙে, কাগজপত্র পোড়ায়, তাহলে কোনো বিপ্লবীর তাদের বাধা দেবার অধিকার নেই।

হুগলীর এক গুপ্ত সভায় সরোজ দত্ত আরও আগুন ছড়ালেন। জনসাধারণ কখনো ভুল করতে পারে না। বিপ্লবের সময় কিছু বাড়াবাড়ি হয়েই থাকে। বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিপ্লবও এগিয়ে যাবে। তিনি সহকর্মীদের বললেন, অতীতকে ভুলে যাও! পুরোনো কবিদের ভুলে যাও! সংগ্রামী কৃষকদের মধ্য থেকেই লড়াকু কবিরা এগিয়ে আসবে। চারু মজুমদারের বাণীই আজকের কবিতা! “আজ অনুতাপের সময় নয়, আজ প্রদীপ্ত শিখার মত জ্বলে ওঠার দিন,” কিংবা “সত্তরের দশক মুক্তির দশক হোক” এই সবই তো কবিতা।

সুতরাং সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ছেলেমেয়েরা, যারা রবীন্দ্ররচনাবলীর একশো ভাগের এক ভাগও পড়েনি, রামমোহন কে ছিলেন ভালো ভাবে জানে না, বিদ্যাসাগর সিপাহী বিদ্রোহের সময় তাদের সমর্থন করেননি শুধু এইটুকুই শুনেছে কারুর কাছ থেকে, তারা ভাঙতে লাগলো, ভাঙার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠলো। বাধা পেল না বিশেষ। খবরের কাগজে বিস্তর অশ্রু বর্ষণ। হলেও একটাও ভাঙা মূর্তি জোড়া লাগাতে এগিয়ে এলো না কেউ।

মূর্তি ভাঙা ও স্কুল বাড়ি পোড়ানোর সার্থকতার পর তরুণ বিপ্লবীরা এবার জীবন্ত শত্রুর দিকে মন দিল। বিপ্লবীদের দমনে পুলিশী অত্যাচার ক্রমশ কঠোর হয়ে উঠছে, ডেবরায়, গোপীবল্লভপুর, শ্রীকাকুলাম থেকে নৃশংস অত্যাচারের কাহিনী ভেসে আসছে, সুতরাং এবার প্রতিশোধের পালা। শুরু হলো পুলিশ খুন। প্রথম দিকে তার সার্থকতাও চমকপ্রদ। প্রকাশ্য দিবালোকে চার পাঁচটি ছেলে শুধু ছুরি-ভোজালি দিয়েই একজন কনস্টেবলকে খুন করে বিনা বাধায় চলে যেতে পারে। রাস্তার লোকজনেরা বিস্ফারিত চোখে দেখে কিংবা ভয়ে পালায়। পুলিশ তো ধনিক শ্রেণীর পাহারাদার, তাদের হত্যা করতে কোনো রকম দ্বিধা নেই। মেরে মেরে পুলিশ বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে, তাদের মনে এমন ভয় ঢুকিয়ে দিতে হবে যাতে তারা চাকরি ছেড়ে পালাতে শুরু করে।

অতর্কিতে কোনো কনস্টেবল বা ইনসপেক্টারকে আক্রমণ করে তার অস্ত্রটাও কেড়ে নেওয়া যায়। গ্রামের জোতদার কিংবা মফস্বলের ব্যবসায়ীদেরও অনেকেরই বন্দুক থাকে, সেগুলোও দখল করে নিতে পারলে বিপ্লবের জন্য অস্ত্র মজুত হবে।

মূর্তি ভাঙা, পুলিশ খুন, অস্ত্র লুঠ, শোধনবাদী পার্টির কর্মীদের বিনাশ এইসব চলতে লাগলো মাসের পর মাস। যেন মনে হলো, সত্যিকারের বিপ্লব এসে গেল, এসে গেল!

তারপর শুরু হলো চরম প্রতিক্রিয়া। পশ্চিম বাংলায় সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির শাসনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হয়ে এলেন সিদ্ধার্থ রায়। পুলিশের বদলে নামানো হলো বি এস এফ এবং সি আর পি।

গেরিলা যুদ্ধের কোনোরকম ট্রেনিং যারা নেয়নি, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপ্লবের আদর্শ প্রচার করার পরিকল্পনা যারা নেয়নি, যারা শুধু দেয়ালে স্লোগান লিখেছে, পাথরের মূর্তি ভেঙেছে, একা পেয়ে কোনো কনস্টেবলকে খুন করে হাত পাকিয়েছে, সেইসব মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত ঘরের আদর্শবাদী ছেলেরা এবার সম্মুখীন হলো এক সুশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনীর। প্যারা মিলিটারি ফোর্সের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সামনে তারা সামান্য হাতবোমা, পাইপগান কিংবা পুরোনো রিভলভার নিয়ে দাঁড়াতেই পারলো না।

অন্য মার্কসবাদী দল এবং কংগ্রেসের ছেলেরাও এবার উঠে পড়ে লাগলো নকশালদের নির্মূল করার কাজে। মাঠে-ঘাটে, রেল লাইনের ধারে প্রতিদিন দেখা যেতে লাগলো সুন্দর, সুকুমার, স্বপ্নময় চোখের ছেলেদের মৃতদেহ। শাসকদের শক্তি এবং অন্য দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিশোধ স্পৃহা, এই ত্রিমুখী আক্রমণে পর্যুদস্ত হতে লাগলো নকশালপন্থীরা। জেলখানাও ভরে যেতে লাগলো।

বিদ্যাসাগর, রামমোহন, গান্ধীর ভাঙা মূর্তিগুলো এতদিন এমনই পড়ে ছিল, এবার কারুর কারুর নজর পড়লো সেদিকে। বিবেক দংশন তীব্র হলো।

কলেজ স্ট্রিটে দোকানে আসার পথে বিমানবিহারী বিদ্যাসাগর মশাইয়ের ভাঙা মূর্তিটার দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিতেন! অসহ্য কষ্ট হতো তাঁর। কয়েক মাস ধরেই তিনি কয়েকজন প্রকাশককে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন যে, এই মূর্তিটা সারানো তাঁদেরই পবিত্র কর্তব্য। বিদ্যাসাগর শুধু এদেশে বিদ্যাচচারই প্রসার ঘটাননি, তিনি বাংলার প্রকাশকদেরও আদি গুরু। কিন্তু অন্যরা কেউ উদ্যোগ নিতে সাহস পাননি, যে ঐ মূর্তি সারাতে যাবে, নকশালরা তার ওপরেই প্রতিশোধ নেবে।

এখন নকশালরা অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় এসে পড়েছে, তাই অনেকে এগিয়ে এসেছে বিদ্যাসাগরের মূর্তি পুনরুদ্ধারের কাজে। গতকাল রাতেই বিদ্যাসাগরের কাঁধে নতুন মাথা বসানো হয়েছে, আজ সকাল দশটায় তার উদ্বোধন হবে। আহ্বান করা হয়েছে সর্বদলীয় নেতাদের। আজ তাঁরা এখানে বাংলার যুবসমাজের মধ্যে খুনোখুনি বন্ধের প্রস্তাব নেবেন।

বিমানবিহারীরা একটু আগে এসে পড়েছেন। সাবধানের মার নেই বলে দু’গাড়ি সি আর পি মোতায়েন করা হয়েছে আজ, কেন না নকশালরা এখনও মরীয়া হয়ে এখানে সেখানে আক্রমণ চালাচ্ছে, হঠাৎ কলেজ স্কোয়ারেও বোমা চার্জ করতে পারে।

তিন প্রৌঢ় সিগারেট ধরালেন। আজ ভোরবেলাই বেশ এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, তাই এখন বিশেষ গরম নেই, চারদিক ভিজে ভিজে। আকাশ এখনো মেঘলা।

মামুন বিদ্যাসাগরের বিশেষ ভক্ত। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যাসাগরের মতন একজনও জন্মাননি, তাই গত শতাব্দীতে বাঙালী মুসলমানরা শিক্ষার ব্যাপারে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। অবশ্য যৌবনে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরার সময় মামুন একথাও বুঝেছিলেন যে, একজন মুসলমান বিদ্যাসাগর যদি গত শতাব্দীতে বহুবিবাহ রদের কথা, স্ত্রী-শিক্ষার কথা প্রচার করতেন, তাহলে মুসলমানরা কি তাঁকে বাঁচতে দিত! হিন্দুদের বিদ্যাসাগর আবার নাস্তিক ছিলেন, একজন নাস্তিক মুসলমান সমাজ সংস্কারকের কথা কি এখনও কল্পনা করা যায়?

মামুন বললেন, ভাই, এই সব নকশাল ছেলেমেয়েরা তো বিদ্যাসাগর মশাইয়ের পন্থাতেই লেখাপড়া শিখেছে। আর লেখাপড়া শিখেই তো তারা মার্কসবাদ বলো আর যাই-ই বলো। বুঝতে শিখেছে। তবু বিদ্যাসাগরের উপর তাদের এত রাগ কেন সেটাই বুঝি না!

প্রতাপ বললেন, ওদের মতে ইংরেজ সরকার নিজেদের দরকারে কেরানী বানাবার জন্য ইংরেজি শিক্ষা চালু করেছিলেন, বিদ্যাসাগর তাতেই মদত দিয়েছেন। এটা বিজাতীয় শিক্ষা!

বিমানবিহারী অসহিষ্ণুভাবে বললেন, তুমি কী বলছে, প্রতাপ? শিক্ষার আবার জাত আছে নাকি? শিক্ষা জিনিসটাকে যে যেভাবে নিতে পারে। সব দেশেই কিছু লোক লেখাপড়া শিখে কেরানী হয়, কিছু লোক পণ্ডিত, চিন্তাবিদ হয়। এই শিক্ষাতেই আমাদের দেশে জগদীশ বোস, সি ভি রমন, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন বড় হননি? চারু মজুমদার নিজেই কি চীনে গিয়ে এ বি সি ডি পড়ে এসেছে? মামুন বললেন, এরা মূর্তি তো ভাঙছে, তার বদলে কার মূর্তি গড়বে তা কি বলেছে? শুধু কি মাও সে তুং আর লেনিন, কার্ল মার্কস? এদেশে কোনো নেতা নেই?

প্ৰতাপ বললেন, এদের একটা লিফলেটে ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের কথা পড়েছিলাম একবার।

বিমানবিহারী বললেন, মুখ, মুখ! আসলে এরা নিজেরাই পড়াশুনো কিছু করে নি। আর কারুকে খুঁজে পেল না। শেষ পর্যন্ত ঝাঁসীর রাণী হলো আদর্শ!

প্রতাপ বললেন, বিমান, তুমি এদের আর যাই বলো, মুখু বলতে পারো না! এদের মধ্যে অনেকেই ফাস্ট-সেকেন্ড হওয়া ছেলে, প্রেসিডেন্সি কলেজের নাম করা ছাত্র।

বিমানবিহারী বললেন, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলেই ভালো ছাত্র হয় না! স্বাধীন চিন্তাশক্তির বিকাশই যথার্থ শিক্ষার লক্ষণ। তা না, চিলে কান নিয়ে গেছে শুনেই চিলের পিছনে ছোটা। সাধারণ যাত্রা-থিয়েটারে ঝাঁসীর রাণী একজন হিরোইন হতে পারে কিন্তু ইতিহাসে তার স্থান কোথায় তা যারা মন দিয়ে ইতিহাস পড়েছে তারাই জানে। রমেশ মজুমদাবের বই খুলে দ্যাখো, সেখানেই আছে যে ঝাঁসীর রাণী নিজে চিঠি লিখে ইংরেজদের জানিয়েছিল যে, সে নিজে মোটেই বিদ্রোহে যোগ দিতে চায় না, কিন্তু সেপাইরা তাকে ভয় দেখাচ্ছে। সে তাদের। দলে যোগ না দিলে সেপাইরা তার প্রাসাদ উড়িয়ে দেবার হুমকি দিয়েছে। অর্থাৎ সেপাই। বন্দুকের নল দিয়ে পিছন থেকে ঠেলে ঠেলে এনে সব বাণীকে নেত্রী করেছে।

মামুন বললেন, তাই নাকি? এটা তো আমার জানা ছিল না!

বিমানবিহারী বললেন, যাত্রা-থিয়েটারের যে গলা কাঁপানো সেন্টিমেন্ট, সেটাই আমাদের দেশে দেশাত্মবোধ হিসেবে চলে ‘ এই জঙ্গী বিপ্লবীরাও সেই সেন্টিমেন্টেই চলছে। আদর্শ মানে শুধু গাল ভরা কথার ফুলঝুরি! হুঃ বিপ্লব! বিপ্লব যেন হাতের মোয়া! আমি মাও সে তুং-কে তবু শ্রদ্ধা করি, তিনি অনেক দিনের প্রস্তুতি নিয়ে তারপর সংগ্রামে নেমেছিলেন। আর এরা যুদ্ধ কাকে বলে জানেই না! শুধু শুধু কিছু লোক মারলো, এখন নিজেরা মরছে।

মামুন বললেন, এই নকশালদের দেখে আমার সেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বিপ্লবীদের কথা মনে পড়ে। খুব মিল আছে। তোমাদের মনে আছে সেই সময়টার কথা?

বিমানবিহারী বললেন, তখন আমি খুবই ছোট ছিলুম, তবে জানি, ব্যাপারটা জানি, ওটা আবার বিপ্লব নাকি? আমরা অনেক বাড়িয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখেছি। সিনেমা বানিয়েছি, কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই তো একটা ফিয়াসকো! ইংরেজরা নিশ্চয়ই খুব হেসেছিল সেই সময়!

মামুন বললেন, একবার অনন্ত সিং-এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাঁর মুখে আমি আসল সত্যি কথাটা শুনেছি। ওনারা চিটাগাং-এর অস্ত্রাগার লুঠ করতে গিয়েছিলেন কিন্তু আর্মস অ্যামিউনিশান সম্পর্কে কোনো ট্রেনিং-ই ছিল না। একটা হোটেলে খাবারের অর্ডার দিয়ে ওনারা গেলেন আমারি রেইড করতে, যেন ব্যাপারটা অতই সোজা! তবু তো ফাঁকতালে ইংরেজদের খানিকটা অসতর্কতার সুযোগে অনেক অস্ত্র পেয়ে গেলেন, কিন্তু একটাও ব্যবহার করতে পারেননি শেষ পর্যন্ত! কেন পারেননি জানো? তার কারণ, অস্ত্র পেয়েছিলেন, গোলাগুলি পাননি! ওঁরা এই সিম্পল ব্যাপারটাই জানতেন না যে, কোনো দেশেই অস্ত্র আর গোলাবারুদ এক জায়গায় রাখা হয় না!

বিমানবিহারী বললেন, গোলাবারুদের ডিপোটা ছিল মাত্র এক মাইল দূরে, সেখানেও সে রাতে তেমন কিছু পাহারা ছিল না, তবু ওরা সন্ধানটাই পায়নি! এই তো বিপ্লবীদের মহান কীর্তি! শুধু নিজেদের প্রাণ নষ্ট করেছে। ওরা যখন পালাতে যাচ্ছিল, তখন নিজের দেশের মানুষই ওদের সাধারণ ডাকাত মনে করে ওদের কয়েকজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে!

প্রতাপ অন্য দুই বন্ধুর এই সব মন্তব্য ঠিক পছন্দ করতে পারলেন না। তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। তিনি বললেন, তোমরা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ব্যাপারটা যে এত তুচ্ছ বলে মনে করছো, সেটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। ঐ ঘটনার ফলে সারা দেশে যে বিপুল উত্তেজনা এসেছিল, তা কি অস্বীকার করতে পারো? সূর্য সেনের মতন মানুষ মৃত্যুর পরেও হাজার হাজার অল্প বয়েসী ছেলেদের মনে প্রেরণা জুগিয়েছেন।

বিমানবিহারী বললেন, না, না, আমি চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ব্যাপারটাকে তুচ্ছ করতে চাই না মোটেই। সূর্য সেনও অবশ্যই নমস্য। আমি বলছি, বিপ্লবের প্রস্তুতির কথা। ঠিক মতন। জন সংযোগ না হলে, একটা ব্যবস্থার বদলের জন্য সাধারণ মানুষকে আগ্রহী করা, শুধু আগ্রহীই নয়, দরকার হলে সাধারণ লোকে এ যাতে রাস্তায় নেমে পড়ে হাতিয়ার ধরতে পারে, সেই ভাবে। তাদের উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে, শুধু দু চারটে খুন-জখম করলে বিপ্লব হয়?

মামুন বললেন, এই নকশালদের ধরন-ধারণ দেখলে তো মনে হয়, ওরা যুদ্ধের কোনো ট্রেনিংই নেয়নি। ইস্কুল-কলেজের ভালো ছাত্র, মনে রয়েছে একটা আদর্শবাদ, কিন্তু ঠিক মতন তৈরি হয়ে না নিলে…

প্রতাপ অন্যমনস্কভাবে জলের দিকে তাকিয়েছিলেন। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, মামুন, তোমাদের ওখানেও তো পাকিস্তানী শক্তিশালী আর্মির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ লড়াইতে নেমেছে, তারা কি ট্রেনিং নিয়েছে?

মামুন বললেন, তারা তো ভাই বাধ্য হয়ে নেমেছে। মরতে মরতে রুখে দাঁড়িয়েছে। আর তো কোনো উপায় ছিল না। তাও তো আমি মনে করি, এভাবে লড়াই করে পাকিস্তানী ট্রেইনড আর্মিকে কোনোদিন হারানো যাবে না, যদি না অন্য কোনো দেশ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। চার মাস কেটে গেল, কী যে হবে! ২

বাইরের রাস্তায় একজন কোনো বড় গোছের নেতা নামলেন গাড়ি থেকে। তাঁর সঙ্গে একটি জিপ, তাতে রয়েছে কয়েকজন যুবক, তাদের হাতে লাঠি। ঐ নেতার দেহরক্ষী যুবকদের পকেটে বোমা-পিস্তল থাকাও বিচিত্র কিছু নয়। এরাও বোধহয় আশঙ্কা করেছে যে আজ এখানে নকশাল হামলা হতে পারে।

সেদিকে তাকিয়ে প্রতাপ ভাবলেন, শেষ পর্যন্ত কি সত্যিই একটা সামান্য পাথরের মূর্তিকে কেন্দ্র করে এখানে একটা খণ্ডযুদ্ধ ঘটে যাবে?

বিমানবিহারী একবার নিজের কোমরটা থাবড়ে দেখে নিলেন। তাঁর নিরীহ খদ্দরের সাদা। পাঞ্জাবির নিচে তিনি রিভলভারটা গুঁজে এনেছেন। ইদানীং তিনি সবসময় সশস্ত্র থাকেন।

ভাইস চ্যান্সেলরের আসবার কথা। তিনি এখনো এসে পৌঁছোননি বলেই অনুষ্ঠান শুরু হতে পারছে না। তবে ভিড়টা হয়েছে মন্দ না, সত্তর-আশিজন হবেই। এর মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা। নগণ্য, তিন চারজনের বেশী না। এদেশের রমণীদের জন্যই বিদ্যাসাগর জীবনের অনেক গুলি বছর খেটে খেটে মুখে রক্ত তুলেছেন।

দূরে কোথাও একটা বিকট শব্দ হলো। পটকা না গাড়ির টায়ার-টিউব বাস্ট করার আওয়াজ? এরকম কিছু শুনলেই গা ছমছম করে। গতকালও হাওড়ায় এক সাংবাদিক রাখাল নাহা খুন হয়েছে। এস এস কে এম হাসপাতাল থেকে একজন নামকরা নকশাল নেতা মহাদের মুখার্জি পালিয়ে গেছে। নকশালরা নাকি ঘোষণা করেছে, এক একজন বিপ্লবীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার হন। একশো জন প্রতি বিপ্লবীকে খতম করা হবে। এই বাজারে কে যে বিপ্লবী আর কে যে প্রতিবিপ্লবী তা বোঝার উপায় নেই। বিমানবিহারীর বাড়িতে পুলিশের একজন বড় কত বলছিলেন, নকশাল আর সি পি এম-এর মধ্যে যখন মারামারি হয়, তখন আমরা চোখ বুজে থাকি, ওদের মধ্যে কে কত বড় মার্কসবাদী, তা ওরা নিজেরাই বুঝে নিক, আমাদের মাথা গলাবার দরকার কী! সে কথা শুনে প্রতাপের ইচ্ছে হয়েছিল পুলিশের কতটিকে ঠাস করে একটা চড় কষাতে। তাঁর আজকাল প্রায়ই এরকম পাগলাটে ইচ্ছে হয়। ইদানীং তিনি যেন অনেক বেশী অধৈর্য ও খিটখিটে হয়ে গেছেন। খবরের কাগজ খুললেই শুধু নরহত্যার খবর তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না।

মামুন হঠাৎ পাংশু মুখে বললেন, ভাই, আমাদের কী হবে বলো তো? তোমাদের ইন্দিরা গান্ধী যে একেবারে চুপ মেরে গ্যালেন। আমরা কি আর দেশে ফিরতে পারবো না?

বিমানবিহারী বললেন, কেন, এখানে খুব খারাপ লাগছে?

মামুন বললেন, খারাপ-ভালো লাগার প্রশ্ন নয়। শেষে কি আমাদের টিবেটান রিফিউজিদের মতন দশা হবে? আমাদের কথা সারা পৃথিবী ভুলে যাবে?

বিমানবিহারী বললেন, রিফিউজিদের সংখ্যা সত্তর লাখ ছাড়িয়ে গেছে শুনছি! এত রিফিউজিকে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট কতদিন খাওয়াবে? ইন্দিরা গান্ধীকে একটা কিছু ব্যবস্থা নিতেই হবে। তার আগে দেশের ভেতরকার অবস্থাটা একটু গুছিয়ে নিতে হবে না?

প্রতাপদের কাছেই একটি যুবক এসে দাঁড়িয়েছে এটু আগে। বছর উনিশ বুড়ি বয়েস। খাঁকি প্যান্টের ওপর একটা গেঞ্জি পরা, খালি পা। চুলে অনেকদিন চিরুনি পড়েনি, কিন্তু মুখখানা বড় সুন্দর। মোমের তৈরি কোনো দেবতার মুখের মতন কোমল।

ছেলেটি প্রতাপদের কাথাই যেন শুনছে মন দিয়ে। হঠাৎ সে জামার পকেট থেকে একটা দোমড়ানো সিগারেট বার করে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে খ্যাসখসে গলায় বললো, দাদা একটু দেশলাইটা দিন তো!

দেশলাই দেবার বদলে প্রতাপের ইচ্ছে হলো ছেলেটির কান মুলে দিতে। আজও প্রতাপ নিজে তাঁর চেয়ে বেশী বয়স্ক ব্যক্তিদের সামনে সিগারেট ধরান না। তাঁদের যৌবনে যে-কোনো অচেনা বয়স্ক ব্যক্তিদেরই গুরুজন মনে করা হতো। এখনকার ছেলেরা যত ইচ্ছে সিগারেট খাবে খাক না, তা বলে বেয়াদপি করবে কেন?

প্রতাপ ছেলেটির কথা না শোনার ভান করে মুখ ফিরিয়ে রইলেন।

ছেলেটি এবার প্রতাপের গায়ে ঠেলা দিয়ে বললো, এই যে দাদা, আগুনটা—

প্রতাপ বললেন, আমার কাছে দেশলাই নেই।

কথাটা মিথ্যে নয়, প্রতাপ বিমানবিহারীর লাইটার থেকে সিগারেট ধরিয়েছেন। মামুন আর বিমানবিহারী নিজেদের মধ্যে কথা বলায় ব্যস্ত। ছেলেটি তবু প্রতাপের ঠোঁটের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, আপনার সিগারেটটা দিন, বিয়ে নিচ্ছি!

রাগে প্রতাপের গা জ্বলছে, তবু কিছু বলা যাবে না। যৌবন এমনই মহা শক্তিমান ব্যাপার যে তার কোনো প্রতিবাদ করা যায় না। প্রতাপ অর্ধ সমাপ্ত সিগারেটটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে ছেলেটিকে দিলেন। সে নিজের কাজ সেরে সেটা আবার ফেরত দিতে এলে প্রতাপ অসীম অবজ্ঞার সঙ্গে বললেন, দরকার নেই, ফেলে দাও!

ছেলেটি মুচকি হেসে নিজের সিগারেটটা টানবার আগে প্রতাপেরটাও দু’টান টেনে নিল। তারপর জিজ্ঞেস করলো, এখানে কিসের মচ্ছব হচ্ছে?

এই ছেলেটির সঙ্গে বাক্যালাপ করার কেনো ইচ্ছে নেই প্রতাপের, তিনি সেখান থেকে সরে গেলেন খানিকটা। ছেলেটির চোখ ঘন ঘন পিট পিট করছে। প্রতাপ সরে এসে ছেলেটির পিঠের দিকটা দেখলেন, তার কাঁধের কাছে কালো গোল গোল দাগ।

ছেলেটি এবার মামুনকে বললো, ও দাদা, এখানে আজ কিসের মোচ্ছব হচ্ছে?

মামুন বললেন, আজ এখানে-সকলে এসেছেন-বিদ্যাসাগরের মূর্তি…

ছেলেটি বললো,ঐ মূর্তিটা তো? ওর মুণ্ডুটা সারিয়েছে, না? মুণ্ডুটা কে ভেঙেছিল জানেন? আমি, আমি, আমি! এই সমীর নাগ!

মামুন ও বিমানবিহারী বিস্ফারিত চোখে তাকালেন ছেলেটির দিকে। বিমানবিহারী বিদ্রূপের সুরে বললেন, তুমি ভেঙেছিলে? কেন ভেঙেছিলে?

ছেলেটি কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, বেশ করেছি! তাতে তোর কী রে শালা?

প্রতাপ বিমানবিহারীর হাত ধরে টেনে সরিয়ে আনলেন। ছেলেটির চোখ পিটপিটুনি দেখেই সন্দেহ হয়েছিল, এখন স্পষ্ট বোঝা গেল এর মাথায় গোলমাল আছে। এর ধারে কাছে থাকা ঠিক নয়।

তিন প্রৌঢ়ই সরে গেলেন বেশ খানিকটা দূরে। মামুন আপসোসের সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ইস, চেহারা দেখে মনে হয় ভালো ঘরের ছেলে। খালি পায়ে ঘুরছে। নিশ্চয় ছাড়া-পাগল!

ছেলেটি রেলিংয়ের গায়ে ঠেস দিয়ে গলা ফাটিয়ে সবাইকে শুনিয়ে বললো, অ্যাই শুয়োরের বাচ্চারা শোন, ঐ শুয়োরের বাচ্চা বিদ্যাসাগরের মুণ্ডুটা আমি ভেঙেছি! বেশ করেছি!

বিমানবিহারী বললেন, ঘাড়ের কাছে কালো দাগগুলো দেখছো? খুব সম্ভবত পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করেছে। তারপর পাগল হবার পর ছেড়ে দিয়েছে। কিংবা ওর বাড়ির লোক ইনফ্লুয়েন্স খাঁটিয়ে ছাড়িয়ে এনেছে। কিন্তু ওকে নজরে রাখা উচিত ছিল।

ছেলেটির চিৎকার অনেকেই শুনতে পেয়ে ঘুরে তাকিয়েছে। আজ সবাই একটা পবিত্র মনোভাব নিয়ে এখানে এসেছে, তার মধ্যে একি উৎপাত? ছেলেটি পাগল হলেও তার মুখ। যথেষ্ট খারাপ!

ছেলেটি আবার চেঁচিয়ে বললো, আমি সমীর নাগ। পুলিশের বাপকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর আমাকে চেনে কি না। আমি ঐ বিদ্যাসাগরের মুণ্ডু ভেঙেছি। তোরা নতুন করে বসা, আবার ভাঙবো! তোদের ভক্তি-শ্রদ্ধার মুখে আগুন জ্বালাবো! পুরোনো বই পুড়িয়ে দাও, নতুন বই লেখা হবে।

বড় দরের রাজনৈতিক নেতার দেহরক্ষী যুবকেরা এগিয়ে এলো এবার। পাগল-ছাগল যাই হোক, এর মুখে শেয়ানার মতন কথা। পাগল হলেও নকশাল। এ নিজে যদি বিদ্যাসাগরের মুণ্ডু না ভেঙেও থাকে, তবু এ ভাঙাটাকে সমর্থন করে। লাঠি-হাতে এক যুবক রুক্ষ ভাবে বললো, আই, যা বাড়ি যা! ফোট!

ছেলেটি একটা কুৎসিত গালাগালি দিয়ে সেই মাস্তান যুবককে লাথি মারতে গেল। তখন লাঠি তুললো আরও দু’জন। একজন ঐ ছেলেটির মাথাটা রেলিং-এ খুব জোরে ঠুকে দিয়ে বললো, এখানে রংবাজি করতে এসছিস?

মামুন ভয়ার্ত গলায় বললেন, ও বিমান, ওরা ঐ পাগলটাকে মেরে ফেলবে নাকি?

হঠাৎ প্রতাপের চোখ জ্বালা করে উঠলো। তাঁর কোনোদিন এমন হয় না, লোকজনের সামনে তিনি আবেগ দেখানো পছন্দ করেন না। কিন্তু তাঁর মনে হলো, ঐ সুকুমার চেহারার ছেলেটি ঠিক বাবলুর বয়েসী না? বাবলুর মুখের সঙ্গে একটা মিল আছে না?

প্রতাপ ছুটে গিয়ে, অন্যদের ঠেলে সরিয়ে দিতে দিতে বললেন, মেরো না, মেরো না, ওকে। ছেড়ে দাও, আমি ওকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।

একজন মাস্তান প্রতাপের হাত চেপে ধরতেই প্রতাপ কাতর ভাবে বললেন, ও তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। ওকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, দয়া করে ভাই ছেড়ে দাও ওকে, ও আমার খুব চেনা। ও আমার।

তারপর প্রতাপ সেই পাগলটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

২৭. শেষ পর্যন্ত অলিকে

শেষ পর্যন্ত অলিকে একলা যেতে দিতে রাজি হয়নি পমপম। তার শরীর যতই দুর্বল হোক, তার মন এখনও সুদৃঢ় ধনুকের ছিলার মতন টানটান। চোখদুটো অনেকখানি কোটরগত, তাতে তার দৃষ্টি যেন আরও বেশী তীক্ষ্ণ। তাকে যে নার্ভের ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তার একটার বদলে তিনটে ট্যাবলেট সে খেয়ে ফেললো অলিকে লুকিয়ে। অন্য ওষুধও প্রত্যেকটাই দ্বিগুণ করে খেল। তার ঘণ্টাখানেক পরে, উঠোনের তারে যে কাপড় শুকোতে দেওয়া হয়েছিল তা সে পাড়লো লাফিয়ে লাফিয়ে, ঠাকুর্দার ঘর থেকে সুপুরির পুঁটুলি চুরি হয়ে গেছে বলে সে নিপুণ অভিনয়ে ধমকালো বাড়ির প্রত্যেকটি লোককে। তার শোয়ার ঘরের বারান্দার এক প্রান্তে। দাঁড়িয়ে সে বললো, দ্যাখ অলি, আমি একদম ভালো হয়ে গেছি। দেখবি, এখান থেকে নীচে ঝাঁপাবো, ছেলেবেলার মতন।

অলি তার হাত চেপে ধরে বললো, থাক, অত আর বাড়াবাড়ি করতে হবে না। তবে তোর চোখ-মুখ আজ অনেকটাই ভালো দেখাচ্ছে। আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যেতে পারবো। যদিও কলকাতায় ফিরতে আমার একটুও ভালো লাগছে না!

পমপম বললো, তোর বাবা খবর পাঠিয়েছেন, তোক তো ফিরতেই হবে রে! বাইরে যাওয়ার কত রকম ফর্মালিটি আছে। আমি তোকে স্টেশানে পৌঁছে দিয়ে আসবো।

অলির তাতে ঘোর আপত্তি। পমপমের স্টেশানে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। এ বাড়ির একজন মুনিষ তাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসবে। কিংবা একটা সাইকেল রিকশা নিয়ে সে একাও চলে যেতে পারে। পমপমের যাবার কোনো দরকার নেই।

কিন্তু অলি একা আর পমপমকে কতখানি বাধা দেবে। এ বাড়িতে সব কিছুই কেমন যেন ছাড়া ছাড়া। ঠাকুর্দা চোখে দেখতে পান না, পমপমের এক বিধবা পিসি ও কাকা কাকীমা রয়েছেন, তাঁরা পমপমের কোনো ব্যাপারে মাথা ঘামান না। কথাই বলতে চান না ভালো করে। পমপম এখানে থাকবে না চলে যাবে, তাতে যেন তাঁদের কিছু যায় আসে না। পমপম যেন অনেকটা অচ্ছুৎ! অলি ঠিক বুঝতে পারে না, কেন তাঁদের এরকম মনোভাব। পমপম তার বাবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্যরকম রাজনীতি করেছে বলে? কিংবা, লালবাজার লকআপে পমপমের ওপর যে অত্যাচার করা হয়েছিল, তারই কোনো অতিরঞ্জিত কাহিনীতে তারা পমপমকে ধর্ষিতা মনে করে?

এরকম উদাসীন বা বিরূপ আত্মীয়দের মধ্যে পমপমকে একা রেখে যেতেও ইচ্ছে করছে না অলির, অথচ এখন তার আর থাকার উপায় নেই। কলকাতার বাড়িতেও পমপম যেতে চায় না, তা হলে সে থাকবে কোথায়?

দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতে হতেই অলি চঞ্চল হয়ে উঠলো। তাকে পাঁচটা কুড়ির ট্রেন ধরতেই হবে। সে অনুনয় করে বললো, পমপম, লক্ষ্মীটি, তুই স্টেশনে আসিস না, ফিরতে ফিরতে তোর রাত হয়ে যাবে। আমি যদি বিদেশে যাই, তার আগে আর একবার এসে দেখা করে যাবো তোর সঙ্গে।

পমপম একটা ছোট্ট ব্যাগ তুলে নিয়ে বললো, আমি মত পাল্টে ফেলেছি, আমি তোকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছি না, আমিও তোর সঙ্গে ফিরবো। এখানে আমার একা থাকতে ইচ্ছে করছে না।

অলি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে বললো, তুই আজই ফিরবি? আর দুদিন অন্তত থাক, তোর বাবা আবার এখানে আসবেন বলে গেলেন, তার সঙ্গে তুই গাড়িতে চলে যেতে পারিস কলকাতায়।

অলির চোখের দিকে গাঢ় ভাবে কয়েকপলক তাকিয়ে থেকে পমপম বললো, জিপে এতখানি রাস্তা যাওয়ার চেয়ে ট্রেনে যাওয়া অনেক বেশী আরামের। তোর সঙ্গে এসেছি, তোর সঙ্গেই ফিরবো।

অলি তবু আমতা আমতা করে বললো, আমি ভাবছিলুম, সোজা কলকাতায় না গিয়ে কৃষ্ণনগর হয়ে ফিরবো। ট্রেন থেকে নেমে বাস বদল করতে হবে, নদী পার হতে হবে, তোর খুব কষ্ট হবে পমপম, তুই পারবি না!

পমপম অলির বাহুতে হাত রেখে বললো, তোর তো মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস নেই। তুই আমাকে ভোলাতে পারবি না। আমরা প্রায় স্কুল থেকেই রাজনীতি করছি, আমরা যখন তখন মিথ্যে কথা বলতে পারি। একটাও চোখের পাতা কাঁপে না। আমি জানতুম, তুই সোজা কলকাতায় ফিরবি না।

–পমপম, এই শরীর নিয়ে তোর যাওয়াটা কিছুতেই ঠিক হবে না।

–আমি যদি না যাই, তা হলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোর জন্য দুশ্চিন্তায় এতখানি দগ্ধাবো যে তাতে আমার শরীরের আরও বেশী ক্ষতি হবে! চল, আর দেরি করে লাভ নেই।

সারাদিনই ঝেকে ঝেকে বৃষ্টি আসছে। এখন বৃষ্টি ইলশেগুড়ি। রিকশার সামনের পর্দাটাও ফেলে দিতে হলো। রাস্তায় বেশ কাদা। একটু আগেই একটা ট্রেন এসে পৌঁছেছে, তাই এ পথ দিয়ে অনেক রিকশা আর সাইকেল ফিরছে।

রিকশার ঝাঁকুনিতে কষ্ট হচ্ছে পমপমের, তার শরীরের সমস্ত হাড় পাঁজরা যেন আলগা হয়ে গেছে। বেশী নড়াচড়া করলেই তার নিম্ন উদরে একটা ব্যথা শুরু হয়, বারবার হিসি পায়। অনর্গল কথা বলে গেলে ব্যথার উপলব্ধিটা অনেক কম হয়।

পমপম বললো, তুই কৌশিককে কতদিন চিনিস, অলি? নিশ্চয়ই অতীনের বন্ধু হিসেবে

অলি বললো, হ্যাঁ, বাবলুদার বি এসসি পরীক্ষার পর কৌশিক প্রথম একদিন বাবলুদার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। খুব লাজুক মনে হয়েছিল প্রথম দিনটায়।

পমপম বললো, আমি ওকে চিনি প্রায় বাচ্চা বয়েস থেকে। এক সময় ওরা আমাদের পাড়ায় থাকতো। মানিকতলায় আমাদের বাড়ির ঠিক দুখানা বাড়ি পরে। ঐ পাড়াতেই অতুল্য। ঘোষের বাড়ি জানিস তো? অতুল্য ঘোষের ভাইপো ভাইঝিদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল, ওদের বাড়িতে খেলতে যেতুম, তাদের সঙ্গে আমার এখনও বন্ধুত্ব আছে। সেই বাড়িতে কৌশিক ও যেত। ঐ বাড়ির দিলীপদার সঙ্গে তো কিছুদিন আগেও দেখা হয়েছে, দিলীপদা রাজনীতিতে যান নি।

–তুই কংগ্রেসীদের বাড়িতে যেতিস?

–হ্যাঁ। ছেলেবেলায় অত শত তো বুঝতুম না। তবে ওদের বাড়ির পরিবেশটা খুব ভালো লাগতো আমার। অতুল্যবাবুকেও জ্যেঠু জ্যেঠু বলতুম, তিনি বেশ হেসে হেসে,গল্প করতেন, কয়েকবার প্রফুল্ল সেনকেও দেখেছি ঐ বাড়িতে। ওঁরা দু’জনেই খুব পাওয়ারফুল নেতা, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে খুব অমায়িক, সেটা স্বীকার করতেই হবে। আমার বাবা সি পি আই-এর নেতা, ছেলেবেলায় আমি কমুনিস্ট আর কংগ্রেসী অনেক নেতাকেই দেখেছি খুব কাছ থেকে, সি পি আই-এর বয়স্ক নেতারাও অনেকে একসময় কংগ্রেসী ছিল, আমার বাবাও স্বাধীনতার আগে ছিলেন কংগ্রেসের ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টে, অতুল্যবাবু তো আমাকে দেখলেই বলতেন, হ্যাঁরে খুকী, তোর মা কেমন আছেন? তোর মা যা চমৎকার ধোকার ডালনা রাঁধে…অতুল্যবাবু একবার আমাদের এই মেমারির বাড়িতেও এসেছিলেন, আমার মায়ের হাতের রান্না খেয়েছেন, আমার মা তখন হাঁপানিতে শয্যাশায়ী, হ্যাঁ, যা বলছিলুম, ঐ বাড়িতেই কৌশিকের সঙ্গে পরিচয়, তখন আমাদের প্রায় পুতুলখেলার বয়েস। তারপর কৌশিকরা একসময় নিউ আলিপুরে বাড়ি করে উঠে গেল, তারপরেও যোগাযোগ নষ্ট হয় নি, কৌশিকের মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন, আমার মা মারা যাবার পর তিনি আমাকে নিউ আলিপুরের বাড়িতে মাঝে মাঝে নিয়ে গিয়ে সারাদিন রেখে দিতেন।

হঠাৎ কথা থামিয়ে পমপম রিকশাটাকে থামাতে বললো। সে আর অবদমন করতে পারছে না। অন্ধকার রাস্তা। এরমধ্যে যানবাহন কিছুটা কমে এসেছে। পমপম রিকশা থেকে নেমে চলে গেল একটা ঝোঁপের আড়ালে। লজ্জা পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ছোট বাথরুম করতে গেলেই তার মাথা ঝিমঝিম করে, এ কথা সে এ পর্যন্ত কারুকে বলেনি, ডাক্তারকেও না।

আস্তে আস্তে পা ফেলে সে ফিরে এসে রিকশায় উঠে জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো, অলি, একটা লবঙ্গ দে তো! আর মিনিট দশেকের মধ্যে স্টেশনে পৌঁছে যাবো।

অলি আড়ষ্ট গলায় বললো, লালবাজারে তোকে খুব কষ্ট দিয়েছে, নারে?

পমপম বললো, ওসব কথা এখন থাক। কৌশিকের কথা শোন। কৌশিক ছাত্র হিসেবে ব্রিলিয়ান্ট ছিল, অতীনের চেয়ে অনেক ভালো, অতীন তো স্কুল ফাইনালেও ভাল রেজাল্ট করেনি, ফাঁকিবাজ টাইপের ছিল।

অলি বললো, বাবলুদার কাছে শুনেছি, ওর পড়াশুনোয় তেমন মন ছিল না, খেলাধুলোর দিকেই ঝোঁক ছিল বেশি। কিন্তু ওর দাদা, সে ছিল সত্যিকারের ব্রিলিয়ান্ট, সে হঠাৎ জলে ডুবে মারা যায়, তখন বাবলুদা ওর বাবা-মায়ের দুঃখ কিছুটা ঘোচাবার জন্যই পড়াশুনোয় মন দেয়।

–ওর দাদা ওর জীবনে একটা ছায়া ফেলে আছে। তুই জানিস না, অলি, অতীন মাঝে মধ্যেই আফসোস করে বলতো, দাদাটা মরে গিয়ে আসলে আমাকে ডুবিয়ে দিয়ে গেছে। আমার সব সময় একটা পিছুটান। দাদা বেঁচে থাকলে বাবা-মাকে খুশী রাখতে পারতো, আমি সংসার ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে যা খুশী করতে পারতুম! একসময় অতীনকে নেপাল ঘুরে চীনে পাঠাবার প্রস্তাব হয়েছিল আর একজনের সঙ্গে, খুবই রিস্কি জানি, শেষ পর্যন্ত অতীন যেতে পারেনি তার বাবা-মায়ের কথা কনসিডার করে! কিন্তু আলটিমেটলি তো ছাড়তেই হলো, এখন ইংল্যান্ড না আমেরিকা কোথায় গিয়ে যেন বসে আছে!

–তুই কৌশিকের কথা বলছিলি!

–কৌশিক ছিল সত্যিকারের পড়ুয়া। ইনট্রোভার্ট। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখতো। সেই কৌশিক সেকেন্ড ইয়ারে উঠে প্রেম নিবেদন করে ফেললো আমাকে।

–তাকে?

–কেন, আমায় বুঝি কেউ প্রেম নিবেদন করতে পারে না। আমাকে এতই নীরস আর কাঠখোট্টা মনে করিস?

–না, না, সেজন্য নয়। কৌশিকের সঙ্গে তার অন্যরকম সম্পর্ক দেখেছি।

–আমি কৌশিককে শুনিয়েছিলুম সুভাষবাবুর একটা কবিতার লাইন, ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা… তখন আমি ছাত্র রাজনীতিতে দরুণভাবে জড়িয়ে পড়েছি। আমি বুঝতে পেরেছিলুম, আমার বাবাদের জেনারেশান আমাদের দারুণভাবে বিট্রে করেছে। আমাদের বাড়িতে বাবার বন্ধু আর পাটি ওয়ার্কারদের মুখে আমি কতবার বিপ্লবের কথা শুনেছি। একটা টোটাল রেভলিউশান ছাড়া এদেশের সমাজ ব্যবস্থার কোনো বদল হতে পারে না। বিপ্লব শব্দটা শুনলেই আমার রোমাঞ্চ হতো। আমি স্বপ্ন দেখতুম, সারা দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেছে লড়াই, আমিও তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছি, আমার হাতে লাল পতাকা… কিন্তু কোথায় সেই বিপ্লবের প্রস্তুতি? আমাদের বাবা-কাকারা মুখেই বিপ্লবের কথা বলেন, কিন্তু আসলে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির নিশ্চিন্ত পথের দিকেই তাঁদের ঝোঁক। এই সব ব্যাপার। নিয়ে আমি খুব রেগে আছি। তার মধ্যে হঠাৎ কারুর মুখে প্রেমের প্যানপ্যানানির কথা কি সহ্য করা যায়? তবে ন্যাকা মেয়েদের মতন আমি কৌশিকের কথা শুনে বিগলিতও হইনি, আবার ফোঁস করে উঠে তাকে কামড়ে দিতেও যাইনি। আমি ঠিক করেছিলুম, কৌশিককে আমি নিজের হাতে তৈরি করবো। কৌশিককে আমি প্রায় জোর করে নিয়ে এলুম আমাদের পার্টিতে।

–তার আগে কৌশিক রাজনীতি করতো না?

-–একদম মাথাই ঘামাতো না। ওদের বাড়িতেও কোনো পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। বুর্জোয়া মিডল ক্লাশ বাড়ির টিপিক্যাল ভালো ছেলেদের মতন কৌশিকের বিলেত আমেরিকায় গিয়ে সো কলড উচ্চশিক্ষা নেবার কথা ছিল। কিন্তু কৌশিক কতখানি বদলেছে। তুই ভেবে দ্যাখ। তার মতন লাজুক ছেলের মধ্যেও যে এতখানি সংগঠন শক্তি থাকতে পারে তা কজন কল্পনা করতে পারে? আমাদের স্টাডি সার্কেলটা তো কৌশিকই মেইনলি অর্গানাইজ করেছে। কৌশিকই তো ডেকে এনেছে অতীনকে। অনুনয়, তপেশ্বর, বারীন, জয়শ্রী এদের মতন আরও অনেকে কৌশিকের রিক্রুট। চারু মজুমদারের সঙ্গে কলকাতার বিপ্লবী ছাত্রদের প্রথম দিকের লিংকও কৌশিক। বুঝলি অলি, আমি যদি কৌশিককে দলে না টানতুম, তা হলে তোর বাবলুদাও এসবের মধ্যে আসতো না, তাকে এরকম ফেরার হয়ে পালিয়ে বেড়াতে হতো না। তোকেও এরকম জলকাদার মধ্যে গ্রামে আসতে হতো না, একটা অসুস্থ মেয়ের নার্সগিরি করতে হতো না। তা হলে বুঝে দ্যাখ, তোর সব বিপদের মূলে আমিই।

–আরও বেশী মূলে যেতে গেলে তোর বাবাকেই কৃতিত্ব দিতে হয়। কারণ তিনি তোর মতন একটি বিপদের আগুনের জন্ম দিয়েছেন, তাই না?

–জন্ম দেবার কোনো কৃতিত্ব নেই। ওটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। রোজই তো লাখ লাখ জন্মাচ্ছে। আমি নিজেকে নিজে তৈরি করেছি। কৌশিকও কতটা নিজেকে তৈরি করেছে ভাব। যে একদিন আমাকে প্রেম নিবেদন করেছিল, সে এরপর কত জায়গায়, কত রকম পরিবেশে আমার পাশে শুয়ে থেকেছে, কিন্তু কোনোদিন আমার শরীরে একবারও হাত ছোঁয়ায়নি। এই না হলে পুরুষ? সেই কৌশিক পায়ে গুলি খেয়ে এক জায়গায় মরো মরো অবস্থায় পড়ে আছে, সে খবর জেনেও আমি তাকে দেখতে যাবো না? নিজে বাঁচবার চেষ্টা করবো? সবাই তোর অতীনদার মতন স্বার্থপর হয় না।

–বাবলুদা বিদেশে চলে গিয়ে জেল খাটলেই বুঝি ভালো ছিল? মার্ডার চার্জে তার। ফাঁসীও হতে পারতো।

–কেন, সেও কৌশিকের মতন জেল ভেঙে পালাবার চেষ্টা করতে পারতো না? কৌশিক পারে, সে পারবে না কেন?

–তুই বুঝি বাবলুদাকে ঘেন্না করিস, পমপম। একথা আগে কোনোদিন বলিস নি তো! মানিকদাকে বাঁচাবার জন্য বাবলুদা একজন মানুষকে মারতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর সেই মাড়ার চার্জে সে যখন ধরা পড়ে, তখন কেউ তাকে সাহায্য করতে আসেনি। আমি নিজে জানি, মানিকদাই খবর পাঠিয়েছিলেন তাকে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে।

অলিকে জড়িয়ে ধরে পমপম বললো, না রে, না রে, আমি অতীনকে মোটেই ঘেন্না করি না। এটা আমার রাগের কথা। অভিমানের কথা। কৌশিকের এই রকম অবস্থার কথা শুনে আমার যেন মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কৌশিক যদি মরতে বসে থাকে, তা হলে এই সময় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অতীন তার পাশে নেই, এই কথাটাই মনে হচ্ছে বারবার। অতীন যখন খুনটা করে, সেই সময় আমাদের অ্যানিহিলেশনের প্রোগ্রাম শুরুই হয়নি, সেইজন্য ও একা পড়ে গিয়েছিল। জেলেও ওর সঙ্গে আর কেউ ছিল না। ও দেশের বাইরে চলে গিয়ে ঠিকই করেছে।

অলি তার ক্ষোভের সঙ্গে বললো, বাবলুদাকে তোরা আর যা কিছু মনে করতে পারিস, সে স্বার্থপর নয়। আমি ঠিকই বুঝতে পারি, বিদেশে বসে থেকে সে খুবই কষ্ট পাচ্ছে, সেইজন্য চিঠিপত্র পর্যন্ত লেখে না।

পমপম নরম গলায় বললো, এইবার তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো, অলি, তুই আমাদের পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক ছেড়ে দিয়েছিলি। অতীনও তোকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে দলে রাখতে পারেনি। তোর প্রসঙ্গ উঠলে অতীন এক এক সময় বলতো, ও বড়লোকের আদুরী মেয়ে, ওর দ্বারা কিছু হবে না! তবু তুই আমাদের মধ্যে ফিরে এলি কেন? বিশেষ করে এখন চতুর্দিকে বিপদ।

–আমি তো ফিরে আসি নি। তোদের পার্টির কাজ করার ক্ষমতা আমার নেই। মারামারি, খুনোখুনি, ওরে বাবা, আমি রক্ত সহ্যই করতে পারি না।

–তুই যে আমার জন্য এতটা করলি–

–তোমার জন্য কিছুই করা হয় নি। পার্টির মেম্বার ছাড়া বুঝি বন্ধু থাকে না? বন্ধুর অসুখ হলে বুঝি বন্ধু দেখতে আসে না?

–আমাকে তুই দেখতে এসেছিস, সেটাও না হয় বুঝলুম। আমি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি, আমার বাবা ইলেকশানে জিতেছেন, পুলিশ এখন আর চট করে আমাদের বিশেষ ঘাঁটাবে না। কিন্তু কৌশিক জেল ভেঙে পালিয়েছে পুলিস তাকে খুঁজছে, দেখলেই পাগলা কুকুরের মতন গুলি করে মারবে। তবু তুই কৌশিকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিস কোন সাহসে?

অলি সরলভাবে বললো, কেন, পুলিশ কি আমাকেও গুলি করে মারবে নাকি?

দাঁতে দাঁত চেপে পমপম বললো, এ দেশের পুলিশই হলো সবচেয়ে বড় অর্গানাইজড গুণ্ডা বাহিনী। মেয়েদের দিকে গুলি ছুঁড়তেও তাদের হাত একটুও কাঁপে না। পুলিশ যে কতখানি হিংস্র, অমানুষ হতে পারে, তা তো আমি জানি

পমপমের পিঠে হাত দিয়ে অলি ব্যাকুল ভাবে বললো, পমপম, তোর সারা শরীরটা কাঁপছে। কেন রে? তোর খুব কষ্ট হচ্ছে?

–না, আমি ঠিক আছি। অলি, পুলিসের গুলি যদি তোর গায়ে নাও লাগে, ঐ জায়গায় ধরা পড়লেও পুলিস তোকে সহজে ছাড়বে না। তা হলে ইউ এস গভর্নমেন্ট তোর ভিসা আটকে দেবে, ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টও তার পাসপোর্ট ইমপাউন্ড করবে। আর এক সপ্তাহের মধ্যে তার বাইরে যাওয়ার কথা।

–তাতে আর কী হবে, আমার বাইরে যাওয়া হবে না! যাবো না!

–প্লীজ পাগলামি করিসনি, অলি, এবার তোকে আমার কথা শুনতেই হবে। তুই সোজা কলকাতায় ফিরে যা। আমি তো যাচ্ছিই কৌশিকের কাছে। দু’জনে মিলে যাবার দরকার নেই। প্লীজ, অলি, আমার এই কথাটা শোন!

–কী অদ্ভুত কথা বলছিস, পমপম। তোর শরীরের এই অবস্থা, আমি তোকে একলা ছেড়ে দেবো? আমার বিদেশ যাওয়ার অত গরজ নেই।

–অলি, তুই বুঝতে পারছিস না। আমি কমিটেড। আমার যাই হোক না কেন, আমি শেষ দেখে ছাড়বো না। কৌশিকের কাছে আমাকে যেতেই হবে। সে আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, বন্ধুর চেয়েও অনেক বেশি। কৌশিকের জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেলে আমার বেঁচে থাকার কোনো মানেই থাকবে না। কিন্তু কৌশিকের সঙ্গে তো তোর এতখানি ঘনিষ্ঠতা হয় নি কখনো! কৌশিক তোক দেখলে খুশীও হবে না। তুই মাঝপথে পার্টি ছেড়ে দিয়েছিলি বলে তোর ওপর কৌশিকের রাগ আছে।

–তা রাগ করুক না। তবু আমি যাবোই।

–তুই অতীনের কথা ভাবছিস?

–অনেকটা তাই। ওরা দু’জনে প্রাণের বন্ধু, বাবলুদা যদি জেল থেকে পালাতে গিয়ে এরকম ভাবে ইনজিওরড হতো, আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যেতুম না? বহরমপুর জেলে। আমি কৌশিকের সঙ্গে দেখা করে তোর খবর বাবলুদার খবর ওকে পৌঁছে দিয়েছি। তা ছাড়া ধর, সত্যি যদি আমার বিদেশে যাওয়া হয়, বাবলুদার সঙ্গে দেখা হলে সে প্রথমেই কৌশিকের খবর জিজ্ঞেস করবে। আমি কী বলবো, জানি না? কিংবা বলবো, জেল থেকে পালাতে গিয়ে। তার গায়ে দু তিনটে বুলেট লেগেছে, সেই অবস্থায় সে কোনো জঙ্গলের মধ্যে পালিয়েছে। সেই খবর জেনেও আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাইনি? তুই বাবলুদার মেজাজ জানিস না? একথা শুনলে সে হয়তো আমাকে চড় মেরেই বসবে, জীবনে আর আমার মুখ দেখতে চাইবে না!

–আমি তবু বলছি, অলি, রিসক বড় বেশি। তুই কলকাতায় ফিরে যা, আমি তোকে কৌশিকের সব খবর জানাবো।

স্টেশান এসে গেছে। রিক্সা থেকে নেমে অলি পয়সা মেটাতে লাগলো, আর পমপম প্রায় ছুটে চলে গেল প্ল্যাটফর্মের বাথরুমে। তার মাথাটা ঘুরছে, নিম্নাঙ্গে অসহ্য ব্যথা। হঠাৎ যেন সে অজ্ঞান হয়ে যাবে। দেয়াল ধরে সে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তাদের দলে আরও তো কয়েকটি মেয়ে ছিল, তাদের কেউ এলো না, অলিকেই আসতে হলো? পমপম একলা বোধহয় সত্যিই পৌঁছোতে পারবে না। কৌশিকের কাছ থেকে যে ছেলেদুটি এসেছিল, তারা অলির সঙ্গেই যোগাযোগের ব্যবস্থাটা ঠিক করে গেছে।

এই সময় বর্ধমানের দিকের ট্রেনে বেশ ভিড়। কলকাতার নিত্যযাত্রীরা ফিরছে। বসবার জায়গা পেল না ওরা, দাঁড়িয়ে যেতে হলো, অলি ধরে থাকলো পমপমের কাঁধ।

বর্ধমান স্টেশানে নেমে ওরা দু’জনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। অলি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো, কেউ তাদের অনুসরণ করছে কিনা। অনুসরণকারীদের চোখ মুখ সে দেখতে লাগলো, সে তাদের অনেকটা চিনতে শিখেছে। নিজেদের ব্যাগ দুটো নামিয়ে রাখলো পায়ের কাছে।

ভিড় পাতলা হয়ে যাবার পর একজন কুলি এসে ওদের ব্যাগদুটো তুলে নিয়ে বললো, আসুন, রিক্সায় যাবেন তো?

অলি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে অনুসরণ করলো কুলিটিকে। বাইরে এসে একটি রিক্সায় বসে সে কুলিটিকে দুটি টাকা দিল। কুলিটি নমস্কার জানিয়ে চলে যাবার পর সে তাকালো পমপমের দিকে। তারা দু’জনেই তপনকে চিনতে পেরেছে।

সাইকেল রিক্সার চালকটিকে অবশ্য চিনতে পারলো না। অলি অন্যদের শুনিয়ে তাকে বললো, সুধা হোটেলে যাবো।

সুধা হোটেলটি শহরের মধ্যেই, কিন্তু সাইকেল রিক্সাটি শহর ছাড়িয়ে চললো জঙ্গল মহলের দিকে। পমপম অলির কাঁধে মাথা দিয়ে আছে। ওষুধ খাওয়ার কৃত্রিম তেজ ফুরিয়ে আসছে, সে এখন খুবই অবসন্ন বোধ করছে। রিক্সার ঝাঁকুনিতেই তার বেশী কষ্ট হয়, হাঁটলে এতটা হয় না। তবু কৌশিকের সামনে তাকে স্বাভাবিক ব্যবহার করতেই হবে।

প্রায় এক ঘণ্টা রিক্সাটা চলার পর রাস্তার পাশে একটা হোটেলের সামনে থামলো। এটা সুধা হোটেল নয়, পাঞ্জাবীদের ধাবা। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে অলিরা তার ভেতরে ঢুকে গিয়ে চায়ের অর্ডার দিল। এক গেলাস চা খাবার পর পমপম বললো, আমার আরও একটু চা চাই। গরম চায়ে তার উপকার হচ্ছে। আরও দু গেলাস চা খেল ওরা।

তারপর অলি বেয়ারাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনাদের এখানে বাথরুম আছে!

বেয়ারাটি বললো, হ্যাঁ, আছে, আসুন।

দোকানের পেছন দিকে বাইরে মাঠের মধ্যে চট দিয়ে ঘেরা বাথরুম। পমপম ঢুকে পড়লো সেখানেই। পাশেই জঙ্গল, একেবারে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। অলি তাকিয়ে রইলো সেই অন্ধকারের দিকে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। তা হলে কি তারা তাড়াতাড়ি এসে পড়েছে?

একটু পরে সেই জঙ্গলের মধ্যে খুব মৃদু ক্রিং ক্রিং সাইকেলের বেলের শব্দ হলো দুবার। পমপম বাথরুম থেকে বেরোবার পর অলি তার হাত ধরে সেই বেলের আওয়াজের দিকে এগিয়ে গেল।

দুখানা সাইকেল নিয়ে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন। তাদের মধ্যে একজন তপন, সে পৌঁছে গেছে এরই মধ্যে।

তপন পমপমকে মৃদু ধমক দিয়ে বললো, তুমি এলে কেন? তোমার তো আসার দরকার ছিল না?

দলের কর্মীদের মধ্যে তপনের স্থান পমপমের অনেক নীচে, তার ধমক দেবার অধিকার নেই। পমপমই রাগের সঙ্গে হিসহিস করে বললো, অ্যামেচারিস প্ল্যান। যেকোনো মোমেন্টে পুলিস ধরে ফেলতে পারতো। এবার কী করে যেতে হবে, বল।

তপন বললো, দুটো সাইকেল আছে, তোমাদের দু’জনকে ক্যারি করবো।

পমপম শিউরে উঠলো। আবার সাইকেল? তাকে পা ঝুলিয়ে বসে যেতে হবে। কিন্তু অন্য কোনো ব্যবস্থা এখন নিশ্চয়ই আর করা যাবে না। সে তপনের সাইকেলের মাঝখানের রডে উঠে বসলো।

আলো নেই, ঠিক মতন রাস্তা নেই, সাইকেলটা অনবরত লাফাচ্ছে। যাতে যন্ত্রণার শব্দ না বেরিয়ে যায়, সেইজন্য নিজের ঠোঁট কামড়ে আছে পমপম! কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ পারবে না। কথা বলতে হবে, কথা বলে ভুলে যাবার চেষ্টা করতে হবে।

সে জিজ্ঞেস করলো, হ্যাঁরে তপন, ও কি মানিকদার খবর জানে?

তপন বললো, চুপ।

পমপম তবু বললো, এই, তোকে যা জিজ্ঞেস করছি, উত্তর দে!

–এখন কথা বলা চলবে না।

–হ্যাঁ, চলবে। না হলে আমাকে নামিয়ে দে। আমি হেঁটে যাবো।

–সাত-আট মাইল রাস্তা, তুমি কতক্ষণ ধরে হাঁটবে, না, কৌশিক মানিকদার কথা এখনো কিছু জানে না।

–কৌশিকের কোন পায়ে গুলি লেগেছে?

–এসব কথা এখন বলা চলবে না।

–ইডিয়েট, একটু বাদে গিয়েই তো আমি কৌশিককে দেখতে পাবো। যা বলছি, সত্যি করে উত্তর দে। কৌশিক বেঁচে আছে?

–হ্যাঁ, হ্যাঁ, বেঁচে আছে।

–শুধু পায়ে গুলি লেগেছে, না আরও কোথাও?

–পায়ে আসলে গুলি লাগেই নি। ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় পা ভেঙেছে। গুলি লেগেছে একটা পেটে আর একটা বাঁ কাঁধে। এর মধ্যে পেটের গুলিটা এখনও বার করা যায়নি।

–জেলের মধ্যে কজন মারা গেছে? কাগজে বেরিয়েছে ষোলোজন।

–মিথ্যে কথা লিখেছে। অন্তত পয়তিরিশজনকে ওরা গুলি করে মেরেছে। সবাইকে মেরে ফেলতো। আমাদের সেদিন জেল ভাঙার কোনো প্ল্যান ছিল না। ওরা দুএকটা গেট খুলে দিলে, ফলস অ্যালার্ম বাজিয়ে গুলি করতে শুরু করলো, জেলের গার্ড সেন্ট্রি ছাড়াও বাইরে থেকে সি আর পি এনেছিল। শুয়ারের বাচ্চা গভর্নমেন্ট সব নকশালদের শেষ করতে চেয়েছিল একদিনে। কিন্তু আমরা কিছু আর্মস জোগাড় করে রেখেছিলাম। তাই দিয়ে রেজিস্ট করেছি বলেই এই কজন পালাতে পেরেছি।

–আমাদের চেনার মধ্যে কে কে গেছে?

–মুর্শিদাবাদ আর নদীয়া গ্রুপের ছেলেরাই মরেছে বেশী। আর কথা নয়, পমপম, সামনে একটা গ্রাম আছে।

দেড়ঘণ্টা সাইকেল চালাবার পর তপন আর তার সঙ্গী থামলো একটা ঝুপড়ির সামনে। বাইরে পাহারা দিচ্ছে সাত আটজন। ঝুপড়ির ভেতরে শুধু একটা মোমের আলো।

সাইকেল থেকে নেমেই হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল পমপম। সঙ্গে সঙ্গেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমি ঠিক আছি।

পমপমের শাড়ী ভেজা, তার গা দিয়ে হিসির গন্ধ বেরুচ্ছে, এতটা পথ সে সামলাতে পারেনি। তবু এখানে সে নেত্রীর ভূমিকা নিয়ে আদেশের সুরে বললো, কৌশিকের সঙ্গে প্রথম শুধু আমি আর অলি কথা বলবো। তখন আর কেউ সেখানে থাকবে না।

ভেতরে একটা খড়ের গাদায় হেলান দিয়ে বসে আছে কৌশিক। একটা ব্যান্ডেজ বাঁধা পা সামনে ছড়ানো। তার পেটে ব্যান্ডেজ, বুক জুড়ে ব্যান্ডেজ। ব্যান্ডেজ মানে কী, ধুতি শার্ট ছিডে বাঁধা। খালি গা। মাথায় বড় বড় চুল, গালে সাত আট দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মোমের আলোয় তার মুখোনি দেখেই চমকে উঠলো দুই তরুণী। সেই মুখে পরিষ্কার মৃত্যুর ছায়া। যে কখনো মৃত্যু দেখেনি, সেও এই ছায়া চিনতে পারে।

সেই ঝুপড়ির মধ্যে শুয়ে আছে আরও চার পাঁচজন, সম্ভবত তারাও আহত কিংবা ঘুমন্ত। একমাত্র জেগে আছে কৌশিক। সে মুখ তুলে প্রথমে চমকে উঠলো, তারপর বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে গেল।

সে কর্কশ ভাবে বললো, আরে এখানে মেয়েদের কে আসতে বললো? এই তপন, এই বিদ্যুৎ, কে তোদের অর্ডার দিয়েছে?

দরজার কাছে তপন দাঁড়িয়ে, সে কোনো সাড়া দিল না।

পমপম হাঁটু গেড়ে বসলো কৌশিকের পাশে। তারপর মৃদু অথচ দৃঢ় গলায় বললো, আমি যখন এসে পড়েছি, এবার থেকে আমিই অর্ডার দেবো।–পমপম কৌশিকের মাথায় হাত রাখতে যেতেই কৌশিক ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললো, এসব কী ন্যাকামি হচ্ছে, পমপম? যে কোনো সময় এনকাউন্টার হতে পারে। এখানে তোরা এসে আরও বিপদ বাড়িয়ে দিলি? জানিস, সুবীরকে আমি চোখের সামনে মরতে দেখেছি। সুবীর আমার পাশে পাশে দৌড়োচ্ছিল।

দরজার আড়াল থেকে তপন বললো, না, না, সুবীর বেঁচে আছে। সুবীর এখানেই আছে। কৌশিক পাগলাটে গলায় বললো, আর ইউ সিয়োর? কোথায় সুবীর, তাকে আমি দেখতে চাই। আমার দু পাশ থেকে আমার নিজের হাত-পা খসে যাবার মতন কে কে চলে গেল, আমার জানা দরকার।

পমপম জিজ্ঞেস করলো। তোকে কোনো ডাক্তার দেখেছে, কৌশিক?

কৌশিক বললো, বিদ্যুৎ দেখেছে, বিদ্যুৎ ডাক্তারির থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছে। আই অ্যাম ফাইন।

তারপরই হঠাৎ সে গলা চড়িয়ে বললো, কে এই মেয়েদুটোকে এখানে এনেছে। এক্ষুনি

এদের ডাবল মার্চ করিয়ে জঙ্গলের বাইরে দিয়ে আয়।

পমপম ধমক দিয়ে বললো, আস্তে আস্তে। কমরেড কৌশিক রায়, আমি মানিকদার কাছ থেকে একটা জরুরি অর্ডার নিয়ে এসেছি।

কৌশিক দারুণ অবাক হয়ে বললো, মানিকদা? কোথায় আছেন মানিকদা? এরা কেউ মানিকদার সঙ্গে কনটাক্ট করতে পারছে না। আমি সবাইকে বলছি।

–মানিকদা যেখানেই থাকুন, তিনি আমার থু দিয়ে অর্ডার পাঠিয়েছেন।

–মানিকদার সঙ্গে তোর দেখা হয়েছে? কবে?

–অফ কোর্স দেখা হয়েছে। মানিকদা বলে পাঠিয়েছেন, তোদের এই জঙ্গল মহল থেকে ডিসপার্স করতে হবে। এখানে বসে থেকে পুলিশ আর্মির সঙ্গে কনফ্রনটেশানে যাওয়াটা মুখামি হবে।

–এখানকার ট্রাইবালরা আমাদের সাপোর্ট করছে। পুলিস সহজে ঢুকতে পারবে না। আমি এখানকার কমান্ডার, শুধু উঠে দাঁড়াতে পারছি না।

–কমরেড কৌশিক রায়, তোমার সম্পর্কে স্পেশাল ইনস্ট্রাকশান আছে। আজ রাত্তিরেই তোমাকে এখান থেকে রিমুভ করতে হবে। প্রথমে যাবে ঘাটশিলায়। সেখানে আমাদের নিজস্ব একটা হসপিটাল সেট আপ করা হয়েছে। সেখান থেকে একটু সুস্থ হলেই তুমি প্রসিড় করবে বাঙ্গালোরে। সেখানে আমার মাসির বাড়িতে থাকবে তুমি।

–কেন, হঠাৎ বাঙ্গালোরে কেন? তোর মাসির বাড়িতে দুধ ভাত খেতে যাবো? যা ভাগ, বাজে বক বক করিস নি, পমপম। এখানে আমরা ব্যস্ত আছি। কুত্তার বাচ্চাদের যে কটাকে পারি খতম করবো।

–তোমাকে বাঙ্গালোরে যেতে হবে, কারণ অন্ধ্র ইউনিট তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে সেখানে। কমরেড নাগি রেড়ি আসবেন। ফারদার ইনস্ট্রাকশান না পাওয়া পর্যন্ত তুমি বাঙ্গালোরে অপেক্ষা করবে। এটাই মানিকদার নির্দেশ। আমি তোমায় বাঙ্গালোরে নিয়ে যাবো।

–এটা মানিকদার নির্দেশ? রিটেন কিছু আছে? কই, দেখি।

–মানিকদা কমরেড চারু মজুমদারের সঙ্গে ঘুরছেন। এখন রিটেন কিছু দেবার তার সময় আছে?

–আমি তোকে বিশ্বাস করতে পারছি না।

পমপম মুখ তুলে একবার তীব্র দৃষ্টিপাত করলো অলির দিকে। তারপর আবার কৌশিকের। দিকে ফিরে বললো, সেইজন্য আমি অলিকে সঙ্গে এনেছি। মানিকদা যখন দেখা করতে আসেন তখন অলি আমার পাশে ছিল। একথা সবাই জানে যে অলি কক্ষনো মিথ্যে কথা বলে না। মিথ্যা কথা বলার ক্ষমতাই ওর নেই। অলি তুই বলতে মানিকদা কী কী নির্দেশ দিয়েছেন?

অলি একটুও গলা না কাঁপিয়ে বলল, মানিকদা বলেছেন, আমি নিজের কানে শুনেছি, কৌশিককে এক্ষুনি ঘাটশিলায় যেতে হবে। হয়তো সেখানেই মানিকদার সঙ্গে তার দেখা হয়ে। যাবে। ঘাটশিলা থেকে কৌশিককে যেতে হবে বাঙ্গালোরে।

২৮. জ্বর কিংবা কোনো শক্ত অসুখ

অনেক চেষ্টা করেও অতীন জ্বর কিংবা কোনো শক্ত অসুখ বাধাতে পারেনি, কিন্তু গেঞ্জি গায়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে তার এমন ঠাণ্ডা লেগেছে যে বুকে সর্দি বসে গেছে। সে ঘঙ ঘঙ করে কাশে, একবার কাশি শুরু হলে আর থামতে চায় না। এদিককার ঠাণ্ডা একবার লেগে গেলে আর ছাড়তে চায় না সহজে। সাধে কি আর এদেশের লোক এত জামা কাপড় পরে থাকে! একমাত্র রোদ পোহাবার সময় এরা পোশাকের জবরজং থেকে মুক্ত হয়।

শীতকালে ঠাণ্ডা লাগেনি অতীনের, লেগে গেল বসন্তকালে। সকালবেলা বিছানা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করে না, দুর্বল লাগে শরীরটা। কেউ কি এক কাপ চা নিয়ে এসে তার ঘুম ভাঙাবে? সে বিছানা না ছাড়লে কেউ তাকে ডাকবেও না। কেউ ফোনও করবে না। শর্মিলা ছাড়া আর তো কেউ চেনা নেই এখানে। সে যদি এই বিছানায় শুয়ে হঠাৎ হার্ট ফেইলিয়রে মারা যায়, তা হলে যতক্ষণ না এ ঘর থেকে পচা গন্ধ বেরুচ্ছে…

অতীন উঠে স্টোভ জ্বালিয়ে কেটলি বসালো। চা বানাবার অনেক ঝামেলা, টি-ব্যাগে ঠিক মতন স্বাদ হয় না, তাই সে কফি খায়। তার ঘরে ফ্রিজ নেই, তাই দুধও থাকে না। নিচের রান্নাঘর পর্যন্ত কে যাবে, দুধ ছাড়া কালো কফিই চালিয়ে দেয় অতীন।

অ্যামেরিকানদের মতন পর পর তিন চার কাপ কফি না খেলে তার শরীরটা ধাতস্থ হয় না। তারপর দিনের প্রথম সিগারেট। সেটা ধরানোমাত্র কাশির দমক শুরু হয়ে যাবে, তবু না ধরিয়েও তো উপায় নেই। বাথরুম যাওয়ার আগে সিগারেট ধরানো অভ্যেস হয়ে গেছে।

বুকে হাত দিয়ে কাশতে লাগলো অতীন। আগের দিন এত কাশি হয়েছিল যে পিঠটা ব্যথা হয়ে আছে। কোনো রকম ওষুধ খাচ্ছে না অতীন। সর্দি কাশির আবার ওষুধ কী? দেশে থাকতে, ছোটবেলায় কখনো বুকে ঠাণ্ডা বসে গেলে মা নানারকম জিনিস মিশিয়ে সেদ্ধ করে একটা পাঁচন বানাতো, সেটা গরম গরম খেতে হতো। স্বাদটা বেশ ভালোই লাগতো। তালমিছরি আদা গোলমরিচ ছাড়া আর কী কী থাকতো কে জানে! অতীন সুপার মার্কেট থেকে খানিকটা টাটকা আদা কিনে এনেছে, তারই একটা টুকরো মুখে দিল।

মায়ের একটা চিঠি এসেছে গতকাল। এ পর্যন্ত অন্তত সাতবার পড়া হয়েছে চিঠিটা, অতীন আর একবার চোখ বুলোলো। চিঠিটাতে যে বিশেষ কোনো খবর আছে তা নয়, মায়ের চিঠিতে কোনো অভিযোগ, আফসোসও থাকে না। এমনি, অতীন বুঝতে পারে, মা ইচ্ছে করে কলকাতার কোনো খারাপ খবরও লেখে না। প্রত্যেক চিঠির শেষে মা লেখে, আমরা সবাই বেশ ভালো আছি। তুমি ভালো থেকো, শরীরের যত্ন নিও।

অতীন উত্তর না দিলেও মায়ের চিঠি আসে প্রত্যেক সপ্তাহে। অতীন প্রায় পনেরো কুড়ি দিন বাড়িতে চিঠি লিখতে পারেনি। মা অতীনের এই বস্টনের নতুন বাড়ির একটা ছবি পাঠাতে অনুরোধ করেছে। একটা শস্তায় ক্যামেরা কিনে কিছু ছবি তুলতে হবে।

সাড়ে আটটার মধ্যে পৌঁছোতে হবে ইস্কুলে। এখানে প্রায় সবাই ইউনিভার্সিটিকে স্কুল বলে। সিদ্ধার্থ ঠাট্টা করে বলে, তোর তো আর বয়েস বাড়লো না, ইস্কুলের পড়াশোনা মন দিয়ে করিস! শরীর খারাপ লাগলেও অতীনের না গিয়ে উপায় নেই, সকালের দিকটায় তাকে ল্যাব-অ্যাসিস্টেন্টের কাজ করতে হয়, কামাই করা চলে না। আধ ঘণ্টা দেরি করে গেলেও মাইনে কাটে। অতীনের কাছে এখন প্রতিটি ডলার মহা মূল্যবান।

হাতঘড়িটা পরে নিয়ে অতীন বাথরুমে গেল। খবরের কাগজ আনতে গেলে নিচে যেতে হবে, আর নিচে যেতে হলে গায়ে ড্রেসিং গাউন জড়াতে হবে কিংবা পুরো প্যান্ট শার্ট পরে নিতে হবে। অতীনের ড্রেসিং গাউন নেই, শ্লিপিং সুট নেই, সে এখনো দেশ থেকে আনা পাজামা-গেঞ্জি পরে শোয়। এই পোশাকে নিচে নামা বাড়িওয়ালা পছন্দ করেন না। খবরের কাগজের বদলে অতীন একটা ডিটেকটিভ বই নিয়ে গেল টয়লেটে, কিন্তু তাতেও এক বিন্দু মন বসলো না।

ঠিক আটটা দশে দাড়ি কামিয়ে, জুতো মোজা পরে অতীন নামতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে। একতলায় সোমেনের ঘরে গীটারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মৃদু গলায় গান গাইছে সোমেন। একটুখানি দাঁড়িয়ে গানটা শুনলো অতীন, তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। এই গানের কথা যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই : মন তুই পড়গা ইস্কুলে, নইলে কষ্ট পাবি শেষ কালে, পড়গা ইস্কুলে…। সোমন এইসব ফোক সঙই ভালো গায়, একদিন ওর ঘরে বসে ভালো করে গান শুনতে হবে।

সাইকেলটা বারান্দা থেকে নামালো অতীন। ঠিক পনেরো মিনিট লাগল তার পোঁছোতে। বাইরের হাওয়ায় প্রথম ঝাঁপটাতেই তার কাশি শুরু হলো। কাশতে কাশতে যেন গলা চিড়ে যায়, কিন্তু রক্ত পড়েনি এখনও।

শর্মিলা বস্টনে ফিরে এসেছে, অতীন জানে। তবু শর্মিলা একবারও যোগাযোগ করেনি। অতীনের সঙ্গে। শর্মিলার মতন মেয়েও যে এত নিষ্ঠুর হতে পারে, তা আগে কল্পনাই করা যায়নি। অতীনকে সে সরাসরি অবজ্ঞা করছে, যেন অতীন একটা মানুষই না, তার সঙ্গে একটা। কথাও বলা যায় না। শর্মিলার কাছাকাছি থাকতে পারবে বলেই অতীন এখানকার এই কাজটা নিয়েছে, এর থেকেও আর একটা ভালো অফার সে পেয়েছিল ফিলাডেলফিয়ায়। এখন শর্মিলা তার মুখও দেখতে চায় না।

ঠাণ্ডামাথায় অতীন অনেক ভেবে দেখেছে, শর্মিলার হঠাৎ এইরকম ভাবে বদলে যাবার কারণ কী হতে পারে? একটাই কারণ থাকা সম্ভব, শর্মিলা হঠাৎ উপলব্ধি করেছে যে অতীন একজন খুনী, তার সঙ্গে মেলামেশা করা বিপজ্জনক। সেই ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে অতীন একটা কুড়োনো খবরের কাগজ পড়ছিল, তাতে অনেক খুন জখমের কথা ছিল, একটা সদ্য খুন হওয়া মেয়ের ছবিও ছিল, সেই কাগজটা দেখেই শর্মিলার ভাবান্তর হলো। তখনই কি শর্মিলা ভাবলো যে অতীনও তার গলা টিপে মেরে ব্রীজ থেকে জলে ফেলে দিতে পারে? একবার যে খুন করে, সে খুনীই থেকে যায়?

অতীন ঐ ব্যাপারটা শর্মিলার কাছে একটুও লুকোয়নি। উত্তর বাংলার একটা ফাঁকা মাঠে মেঘলা বিকেলে একজন সমাজবিরোধীর দিকে কেন রিভলভার চালিয়েছিল, তা অতীন অনেকবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলেছে। সেই লোকটা আগে বোমা চার্জ করেছিল, তারপর লোহার ডান্ডা দিয়ে মারতে এসেছিল, সে ছিল প্রকৃত খুনী, মানিকদাকে খতম করে দেওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য, অতীনকেও ছাড়তো না, সেই লোকটার হাতে অসহায়ভাবে প্রাণ দেওয়াটাই ছিল গৌরবের? শর্মিলা প্রত্যেকবার শুনে বলতো, বেশ করেছো, তুমি ঠিকই করেছো, একটা পাগলা কুকুর কামড়াতে এলে তাকে মেরে ফেলা মোটেই দোষের নয় …কোর্টে মামলাটা সাজানো হয়েছিল অন্যভাবে, ষড়যন্ত্রের রঙ দেওয়া হয়েছিল গাঢ় ভাবে, একজন কলেজের অধ্যাপক। হয়েও অতীন ঐ নির্জন মাঠে রিভলভার সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল কেন, সেই প্রশ্নই তোলা হয়েছিল বারবার। কিন্তু শর্মিলা অতীনকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিল। সেই বিশ্বাস তার ভেঙে গেল একটা রগরগে খবরের কাগজের ছবি দেখে! অতীনকে সে এখন ভয় পায়। মেয়েরা এমন বদলে যায়! অতীনের সঙ্গে এতদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সে অস্বীকার করলো একেবারে?

যাক, চুলোয় যাক, শর্মিলাকে সে মন থেকে মুছে ফেলবে একেবারে। একটু সময় লাগবে, এখনো নামটা মনে পড়লেই বুকটা মুচড়ে মুচড়ে ওঠে, তার নিজের বিছানায় সে শর্মিলার গন্ধ পায়…আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। অলির কাছে সে অন্যায় করেছে, সেইজন্য তার এই শাস্তি। অলি কোনোদিন তার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করতে পারতো না।

সাড়ে আটটা বাজার দু মিনিট আগে অতীন পৌঁছে গেল ল্যাবে। ছাত্রছাত্রীরা এখনো কেউ আসেনি, অতীন ঝট করে একটা ওভারঅল পরে তৈরি হয়ে নিল। কাজে ডুবে গেলে এসব। কথা আর মনে পড়ে না। অতীনের এখন দুটো উদ্দেশ্য। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পি-এইচ ডি শেষ করতে হবে, আর দেশে ফেরার জন্য ভাড়ার টাকা জমাতে হবে। টাকাটা যদি আগেই জমে যায়, তা হলে সে পি. এইচ ডি শেষ না করেই পালাবে এই দেশ থেকে।

দেশে যাদের ডেমনস্ট্রেটর বলে, এখানে তাদেরই নাম ল্যাব-টিচার। ফাঁকি মারার উপায় নেই, ছাত্রছাত্রীরা খাঁটিয়ে খাঁটিয়ে মারে। এখানে ছাত্রছাত্রীরাও যে ফাঁকি দেয় না তার কারণ আছে। অধিকাংশ ছেলেমেয়েই বাবার টাকা নেয় না, নিজেরা উপার্জন করে পড়াশুনোর খরচ চালায়। হোটেল রেস্তোরাঁয় ডিশ ধোয়ার কাজ করে, সুপার মার্কেটে সেলসম্যান বা সেলস গার্ল হয়। অনেকে ছ’মাস চাকরি করে টাকা জমিয়ে বাকি ছ’মাস ইউনিভার্সিটিতে একটা কোর্স পড়ে নেয়। এখানে পড়াশুনোর খরচও যথেষ্ট। একটা সেমেস্টার ফেল করলে আবার দ্বিগুণ টাকা। খরচ করতে হবে এই ভয়ে এরা দিরাত খেটে “স করার চেষ্টা করে।

তিনটি ভারতীয় ছাত্রও আছে এখানে। তাদের পড়াশুনোর প্রতি নিষ্ঠা দেখলে দেশের মা বাবারা হাঁ হয়ে যাবে। এরা তিনজনেই পার্ট টাইম চাকরি করে পড়ছে, দৈত্যের মতন খাটে। নিজেদের উপার্জন করা পয়সায় পড়তে হচ্ছে বলেই এদের পাস করার এত গরজ। অথচ দেশে থাকতে এইসব ছেলেরাই বাপ-মায়ের আদরের দুলাল, হোটেলে বাসন মাজার চাকরির কথা কল্পনাও করতে পারে না। এদের মধ্যে একটি ছাত্রের নাম ভূপিন্দর সিং, সে এক ধনী পাঞ্জাবী ব্যবসায়ীর ছেলে, কিন্তু অতীন তাকে দেখেছে ম্যাকডোনাল্ডের দোকানে মাথায় টুপি পরে রান্না ঘরে আলু ভাজার কাজ করতে।

সর্দিকাশির জন্য অতীন একটু আড়ষ্ট হয়ে আছে। কাশি উঠলে চেপে রাখা যায় না, আবার ল্যাবের ভেতরটায় কনকনে ঠাণ্ডা বলে নাক দিয়ে পাতলা সর্দিও গড়াচ্ছে। রুমালে কুলোচ্ছে। না। শ্রাদ্ধ হচ্ছে টিসু পেপারের। কাশির শব্দ শুনে পাশের ডেস্কের জুড়ি বড় বড় চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে।

অ্যামেরিকানদের দারুণ স্বাস্থ্যবাতিক। কারুর সর্দি হলে অন্য কেউ তার হাতটা পর্যন্ত ছোঁয়। নিঃশ্বাসের দুরত্বের থেকেও দুরে থাকে। জুডি অন্যদিন তার টেবল থেকে এটা সেটা জিনিসপত্র নেয়, মাঝে মাঝে হেসে গল্প করে। আজ অতীন প্রথম দর্শনে হাই জুডি, হাউ হ্যাভ ইউ বীন, এইটুকু শুধু বলেই পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছে। এ দেশে যখন তখন ছুটি নেবার প্রশ্নই ওঠে না, সর্দি হয়েছে বলে অতীন তো আর তার মাইনে খোয়াতে পারে না!

জুড়ি মেয়েটি বেশ লম্বা, পাঁচ ফুট আট ন’ইঞ্চি তো হবেই, অতীনের প্রায় মাথায় মাথায় সমান। সুতরাং মেয়েদের তুলনায় সে যথেষ্টই লম্বা, কিন্তু ধ্যাঙ্গো নয়, স্বাস্থ্যটিও ভালো, তাকে অনায়াসেই দৈত্যবংশের কন্যা বলা যায়। মাথার চুল ভালো করে আঁচড়ায় না জুড়ি, সাজ-পোশাকেরও কোনো যত্ন নেই।

এখানে স্টিভ নামে আর একজন ল্যাব টিচার আছে, তার সঙ্গে অতীনের মোটামুটি ভাব আছে। পড়াশুনোয় খুব তীক্ষ্ণ, কিন্তু স্টিভ মাঝে মাঝে বেশ খারাপ কথা বলতে ভালোবাসে। স্টিভ একদিন বলেছিল, বেচারা জুডির কোনো বয় ফ্রেন্ড নেই কেন জানো? ওর সঙ্গে কেউ ডেটিং করে না, এর কারণ, অত লম্বা মেয়ের পাশাপাশি হাঁটতে কোনো ছেলে পছন্দ করে না। ছেলেরা চায়, মেয়েদের মুখটা তাদের বুকের কাছাকাছি থাকবে, চুমু খাওয়ার সময় মেয়েরা মুখটা ওপরের দিকে তুলবে, ছেলেরা মুখটা নামিয়ে আনবে, দ্যাট ইজ দা আইডিয়াল পজিশান, মেয়েদের লোয়ার পোরশান কিন্তু ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশী লম্বা হয়, সেটা দেখেছো তো! সেইজন্য আলিঙ্গনের সময় বেঁটে মেয়েদের অ্যাবডোমেনও ছেলেদের সঙ্গে ঠেকে থাকে।

স্টিভ বেচারি অবশ্য বেশ বেটে, জুডির তুলনায় অনেকখানি ছোট লাগে। জুডির কাছে প্রেম জানিয়ে সে কখনো ব্যর্থ হয়েছে কি না কে জানে! শুধু লম্বা বলেই জুডির ওপর তার বেশ রাগ। অবশ্য স্টিভের বান্ধবীর সংখ্যা একাধিক।

স্টিভ অতীনের তুলনায় এক বছরের বেশী অভিজ্ঞ। কাজের ব্যাপারে অতীনকে মাঝে মাঝে স্টিভের সাহায্য নিতে হয়। স্টিভ ভারতীয় পুরাণ ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহী। ওপেন হাইমারের সূত্র ধরে এ দেশের বিজ্ঞানের ছাত্রদের মধ্যে ভগবদ গীতা বইটির নাম মোটামুটি পরিচিত। স্টিভ কখনো গীতা বিষয়ে প্রশ্ন করলে অতীন হকচকিয়ে যায়। সে গীতা টিতা পড়ে নি কক্ষনো, তাদের বাড়িতেও এ সবের চর্চা ছিল না।

লাঞ্চ আওয়ারে অতীন কোনোরকমে গোটা দুয়েক সান্ডউইচ খেয়ে নিয়ে লাইব্রেরিতে খবরের কাগজ পড়তে যায়। যে-সব দোকানে আগে সে শর্মিলার সঙ্গে কখনো কখনো খেতে গেছে, সে-সব দোকানের ধারেকাছেও সে ঘেঁষে না। শর্মিলার মুখোমুখি পড়তে চায় না সে। লাইব্রেরিতে লুকিয়ে বসে থাকে। ভারতীয় সংবাদপত্রও যে এখানে পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে তার আগে কোনো ধারণাই ছিল না। সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে এমনকি বাংলা কাগজও পাওয়া যায়, একদিন সে আনন্দবাজার দেখেছে। কত দেশের কাগজই যে এরা রাখে!

নিজেদের লাইব্রেরিতে বসে সে স্টেটসম্যানের ওভারসীজ এডিশান পড়ে। এতদিন অতীন যেন ইচ্ছে করেই দেশের খবর রাখতে চায়নি। সে নিবাসিত, সেই অভিমানে সে মহাসমুদ্রের ওপারের দেশের দিকে ফিরে তাকাতে চায়নি আর। দমদম জেলে পনেরোজন নকশাল খুনের খবরটা শোনার পর থেকে সে আর স্থির থাকতে পারছে না। মানিকদা কিংবা কৌশিক তাকে এ পর্যন্ত একটা চিঠি লেখেনি, অলির চিঠিও আসেনি বেশ কিছুদিন। দেশ ছাড়ার সময় কৌশিক তাকে বলেছিল, তুই আমাদের চিঠি লিখিস না, আমরা কখন কোথায় থাকবো তুই জানতে পারবি না, কিন্তু আমরা লিখবো। অলির কাছ থেকে ঠিকানা যোগাড় করে আমরা তোকে নিয়মিত সব খবর দেবো। কথা রাখেনি কৌশিক।

দেশের খবরের কাগজে পাকিস্তান বাংলাদেশের খবরই এখন বেশী থাকছে। পশ্চিমবাংলায়, অন্ধ্রে, পাঞ্জাবে বিপ্লবের প্রস্তুতিও চাপা থাকছে না। পশ্চিমবাংলায় রিভলভার বন্দুক কাড়া চলছে নিয়মিত। জোড়াতালি দেওয়া সরকার ভেঙে এখন সেখানে রাষ্ট্রপতির শাসন। বীরভূমের সব থানার ও সি বদলি করা হয়েছে। অতীনের বরাবরই ধারণা ছিল বীরভূম আর মেদিনীপুরে তাদের শক্ত ঘাঁটি হবে। কানু সান্যাল, অসীম, সন্তোষদের নামের উল্লেখ থাকে মাঝে মাঝে, মানিকদা-কৌশিকদের কোনো খবর পাওয়া যায় কি না, অতীন। তন্ন তন্ন করে খোঁজে।

গতকাল এ দেশের সংবাদপত্রে একটা বড় খবর বেরিয়েছে। অধিকাংশ কাগজেই হেড লাইন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিকসনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে চীন। হেনরি কিসিংগার গোপনে গিয়েছিল পাকিস্তানে। পাকিস্তানের মাধ্যমেই চীনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। এই জন্যই পাকিস্তান সরকারের প্রতি কিসিংগার-নিকসনের এত দরদ!

খবরটার মর্ম ঠিক বুঝতে পারেনি অতীন। চীন এতকাল বলে এসেছে যে শোষিত দুনিয়ার এক নম্বরের শত্রু হলো আমেরিকান সরকার। সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে নিজের বাড়িতে নেমন্তন্ন করলো চীন? মাও সে তুং এই লোকটার সঙ্গে হেসে কথা বলবেন? শুধু তাই নয়, চৌ এন লাই বিবৃতি দিয়েছেন যে শান্তিপূর্ণ পথেই বিশ্বের সমস্যাগুলির সমাধান করতে হবে।

শান্তিপূর্ণ পথ! চৌ এন লাই হঠাৎ গান্ধীবাদী হয়ে গেলেন নাকি?

সন্ধেবেলা নিজে ল্যাবে কাজ করার বদলে অতীন বাড়ি ফিরবে ঠিক করলো। হঠাৎ শনশনে হাওয়া দিতে শুরু করেছে। সমুদ্রের ধারের শহরের এই একটা মুশকিল, আবহাওয়ার স্বভাব চরিত্র ঠিক থাকে না। আকাশের অবস্থা ভালো নয়, রাত্তিরে বৃষ্টি হতে পারে। চমৎকার রোদ চলছে ক’দিন, এখন বৃষ্টি হলে আবার মন খারাপ লাগবে।

বাড়ি ফিরে আবার রাত্তিরের খাওয়ার জন্য বেরুবার কোনো মানে হয় না। একটা দোকান থেকে অতীন কিছু ব্রাউন ব্রেড, মাখন আর স্যালামি কিনে নিল। এতেই চলে যাবে। অন্তত দিন সাতেক অতীন বীয়ার কিংবা মদ কেনেনি, পয়সা বাঁচাতে হচ্ছে। প্রতিটি ডাইম গুনে গুনে খরচ করবে। ড্রাইভিং লেন নেওয়াও আপাতত বন্ধ, গাড়ি-ফাড়ি কেনার কোনো দরকার নেই, সাইকেলেই বেশ চলে যাচ্ছে। গাড়ি কেনার কথা সে ভেবেছিল শর্মিলার জন্য। শর্মিলা বেড়াতে ভালোবাসে।

হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়লো অতীনের। টানা আট দিন সে একবারও ভাত খায়নি। মা জানতে পারলে আঁতকে উঠতো। দেশে থাকতে অতীন অসুখ-বিসুখ হলেও রুটি খেতে চাইতো না। অতীন বেশী রাত করে ফিরলেও মা ভাত গরম করে দিত।

অতীন নিজে এখন ভালোই রান্না করতে পারে। শিলিগুড়িতে মানিকদাদের সঙ্গে থাকবার সময় রান্না শিখেছিল, নিউ ইয়র্কে সিদ্ধার্থর কাছে থাকবার সময় তো রান্নার পুরো দায়িত্বই ছিল তার ওপর। এখানেও সে শর্মিলাকে স্যামন মাছের ঝোল রেধে খাইয়েছে। এখানে পাওয়া যায় তো সব কিছুই। অনেকরকম মাছ, নানা ধরনের তরকারি, বেগুন আর ফুলকপিগুলো বিরাট বিরাট, আর মুসুরির ডালের চমৎকার স্বাদ। মুসুরির ইংরিজি যে লেনটিল সেটা অতীন জানতো না আগে, ইটালিয়ানরা খুব লেনটিল সুপ খায়, সেটা তো প্রায় সম্ভার না দেওয়া মুসুরির ডাল সেদ্ধ! আর একটা ইংরিজি ভুল শেখানো হয় দেশের ছেলেমেয়েদের, অতীনও শিখেছিল বেগুনের ইংরিজি ব্রিঞ্জাল! অথচ এ দেশে বেগুনকে বলে এগপ্ল্যান্ট, ব্রিঞ্জাল বললে কেউ বোঝেই না। দইকেও কেউ কার্ড বলে না। বলে ইউগার্ট। এ দেশের দইয়ের স্বাদ বড় ভালো।

শুধু নিজের জন্য কি আর রান্না করতে ইচ্ছে করে! স্টিভ বলেছিল, ওকে একদিন ভারতীয় খাবার খাওয়াতে। কোনো একটা ছুটির দিন দেখে স্টিভকে নেমন্তন্ন করে অতীন ভাত রাঁধবে। কিংবা স্টিভকে খিচুড়িও খাওয়ানো যায়।

একটা মাফলার কিংবা স্কার্ফ গলায় জড়িয়ে নিতে পারলে ভালো হতো। সাইকেলটা একটু জোরে চালাতে গেলেই বেশ শীত শীত করছে আর কাশি হচ্ছে। সাইকেল থেকে নেমে হাঁটতে লাগলো অতীন, তার এমন কিছু তাড়া নেই।

একটু পরেই সে দেখতে পেল, উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসছে জুডি, তার দুহাতে দুটি বেশ পেল্লায় শপিং ব্যাগ, তাছাড়া বেশ কয়েকখানা বই ও পত্রিকা, রীতিমতন ব্যালান্স করে হাঁটতে হচ্ছে তাকে। জুডি বোধ হয় এক সপ্তাহের বাজার করে ফেলেছে।

দেখা মাত্রই অতীন বললো, হাই জুড়ি! মে আই ক্যারি ইয়োর ব্যাস?

এটা প্রায় অভ্যেস বশেই বলা। চেনা কোনো মহিলাকে ভারী ভারী বোঝা বহন করতে দেখলে যে-কোনো পুরুষই এমন প্রস্তাব দেবে।

জুডি বললো, তুমি একটা ব্যাগ ধরো তা হলে, আটিন্‌!

অতীন দু’টো শপিং ব্যাগই ঝুলিয়ে নিল তার সাইকেলের হ্যাঁন্ডেলে। তারপর বললো, চলো, তোমার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসছি।

জুডি বললো, আমার বাড়ি বেশী দূর নয়। তোমার কোনো তাড়া ছিল না তো?

অতীন দু’দিকে মাথা নাড়লো। তারপর বললো, দেখছো, আজ রাত্তিরে বোধ হয় আবার বৃষ্টি আসবে।

জুডি বললো, আই লাভ ইট! বিশেষত রাত্রে বৃষ্টির শব্দ আমার খুব ভালো লাগে।

অতীন একটু অবাক হলো। এটা একটু অন্যরকম কথা। এ দেশের কোনো ছেলেমেয়েই বৃষ্টি পছন্দ করে না। এরা রৌদ্র-প্রিয়।

জুডি জিজ্ঞেস করলো, তুমি ভারতীয় হয়ে বৃষ্টি ভালোবাসো না? তোমাদের দেশে তো এখন বৃষ্টির সিজন শুরু হয়ে গেছে। আমার জন্ম ইন্দোনেশিয়ায়, আমার বাবা ওখানে পোস্টেড ছিলেন, ছেলেবেলায় আমি খুব বৃষ্টি দেখেছি।

অতীন বললো, আমাদের দেশে বৃষ্টিতে ভিজলে এরকম চট করে ঠাণ্ডা লাগে না।

জুডি বললো, ওঃ হো, আজ তো সকালে তোমার রানিং নোজ দেখেছি। খুব ঠাণ্ডা লাগিয়ে বসেছো বুঝি?

অতীন শঙ্কিত বোধ করলো। এই রে, সর্দি-নাকে সে জুডির পাশাপাশি হাঁটছে, এটা তো ঠিক হয়নি! জুডির শপিং ব্যাগ সে হাতে ছুঁয়েছে, তাতে সব কিছু অশুচি হয়ে যাবে না তো?

জুডিকে দেখে সাহায্য করার সময় এই কথাটা তার মনেই ছিল না। জুডিও তো আপত্তি করলে। পারতো।

জুডি বললো, তুমি কিছু ওষুধ খেয়েছো?

–ওষুধে কি সর্দি সারে?

–তা সারে না বটে! হ্যাভ ইউ ট্রায়েড গ্ৰগ?

–গ্রগ? সেটা আবার কী?

–একটা কনককশান। দু’বছর আগে আমি যখন ফ্রান্সে গিয়েছিলাম, তখন আমারও খুব ঠাণ্ডা লেগে গিয়েছিল। শীতকালে ঠাণ্ডা লাগে না, এইরকম ওয়েদারেই অসাবধান থাকলে চট করে বুকে ঠাণ্ডা বসে যায়, তখন ওখানে এগ খেয়ে বেশ উপকার পেয়েছিলাম।

অতীন ভাবলো, এখানকার ছেলেমেয়েরা গোটা পৃথিবীটাকেই হাতের মুঠোয় এনে ফেলেছে। জুডির জন্ম ইন্দোনেশিয়ায়, এক সময় ফ্রান্সে গিয়েছিল, কিছু দিন সে সাউথ আমেরিকায় ছিল, তা অতীন আগেই শুনেছে, সেইজন্য সে স্প্যানীশ ভাষা জানে। অনেক

ছেলেমেয়েই পৃথিবীর এদিক-ওদিক ঘুরে এসেছে।

জুডির বাড়ি কাছেই একটা ছোট রাস্তায় ঢুকে। তিনতলা বাড়ির ওপরের তলায় থাকে জুডি। পর্চে ব্যাগ দু’টো নামিয়ে রাখলে জুডি দু’বারে এসে নিয়ে যেতে পারবে। অতীন বললো, গুড নাইট, জুডি। সী ইউ টুমরো!

জুডি বললো, খুব যদি ব্যস্ত না থাকো, ওপরে এলে তোমাকে আমি গ্ৰগ খাওয়াতে পারি।

অতীনের এত সর্দি জেনেও যে জুড়ি তাকে ওপরে ডাকলো, এতে সে কৃতজ্ঞ বোধ করলো। তা হলে ওপরে না যাওয়ার তো কোনো কারণ নেই!

সাইকেলটা ওপরে তুলে তালা দিয়ে সে দু’টো ব্যাগই নিয়ে উঠে এলো তিনতলায়। জুডির ঘরটা প্রায় ঠিক তার ঘরেরই মতন অ্যাটিকে। অতীনের চেয়েও এলোমেলো স্বভাব জুডির, মেঝেতে পর্যন্ত বইপত্র ছড়ানো, বিছানার ওপর ব্রা, প্যান্টিহোস। সারা ঘরে মেয়েলি গন্ধ।

অত বড় চেহারা জুডির, মনে হয় যেন তার মাথা ছাদে ঠেকে যাবে, তার হাঁটার সময় কাঠের মেঝেতে দুম দুম শব্দ হয়। দ্রুত হাতে জিনিসপত্র কিছুটা সাফসুতরো করে জুডি বললো, বসো, আটি। আমার ঘরে অনেকদিন কেউ আসেনি! তুমি এখানে সিগারেট খেতে পারো। অ্যাশট্রে নেই, একটা সসার দিচ্ছি।

ঘরে একটাই আরাম কেদারা, তার খোলের মধ্যে অনেক বই-খাতা। খাটে না বসে অতীন। বই-খাতা সরিয়ে সেই চেয়ারেই বসলো। এক পাশে পদ না-টানা অনেকখানি কাচের জানলা। সারা দেয়ালে প্রচুর ছবির প্রিন্ট সাঁটা, তার মধ্যে অতীন একটাই চিনতে পারলো ভ্যান গঘের ‘সূর্যমুখী’। আগে অতীন বিদেশী চিত্রকলা সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানতো না। এখন খানিকটা বুঝতে শিখেছে। এ দেশের বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীরাও ছবি-গান-সাহিত্য সম্পর্কেও মোটামুটি খবর রাখে।

কাবার্ড থেকে একটা জামাইকান রামের বোতল বার করে জুড়ি জিজ্ঞেস করলো, তোমার অ্যালকোহল পান করার অভ্যেস আছে তো? তুমি কি অধিকাংশ ভারতীয়ের মতই নিরামিষাশী?

অতীন বললো, ভারতীয়দের মধ্যে আমরা আবার বাঙালী। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ বাছ-বিচার নেই। তাঁ, অ্যালকোহলও আমার সহ্য হয়।

জুডি বললো, তা হলে এগ বানানোটা শিখে নাও!

একটা ছোট সসপ্যানে সে খানিকটা রাম ঢাললো। তাতে মেশালো কয়েক চামচ চিনি। তারপর দিল একটুখানি গোলমরিচ। এবার তাতে কিছুটা জল মিশিয়ে সপ্যানটা রাখলো জ্বলন্ত স্টোভে। একবার ফুটে উঠতেই নামিয়ে নিয়ে সে সেই তরল পদার্থটি একটা গেলাসে ঢেলে বললো, একটু একটু চুমুক দিয়ে পান করো, গরম থাকতে থাকতে।

দু’তিনবার চুমুক দিয়েই অতীনের মুখে একটা পাতলা হাসি ফুটে উঠলো। তার মা তালমিছরি-আদা দিয়ে যে পাঁচনটা বানাতো, এর স্বাদও অনেকটা সেইরকম। সর্দির সময় মিষ্টি গরম কিছু খেতে হয়, আইডিয়াটা একই।

কিন্তু এই কথাটা জুডিকে বলা যাবে না। মায়ের কথা তুললেই সে ভাববে যে তার বয়েস সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। এ দেশের মেয়েরা বয়েস সম্পর্কে বড় স্পর্শকাতর।

সে বললো, চমৎকার হয়েছে তো! খেতে খুব ভালো লাগছে।

জুডি বললো, মাঝে মাঝে বানিয়ে খেয়ো। কাশি অনেক কমে যাবে।

অতীন বললো, আমি এ দেশে এসে আগে কক্ষনো রাম খাইনি। তুমি বুঝি জ্যামাইকান রাম ভালোবাসো?

জুডি বললো, আমি রাম খাই না, স্কচ বারবান খাই না, আমি পারতপক্ষে হার্ড ড্রিংক্স খেতে চাই না। তবে রাম, ব্র্যান্ডি বাড়িতে রাখি, অনেক রান্নার রেসিপিতে লাগে। রান্না করা আমার শখ। রান্নাও তো কেমিস্ত্রি, তাই না? তুমি আজ আমার সঙ্গে খেয়ে যাও না, আটি। আমি এখন রান্না করবো।

অতীন বললো, আমার খাবার কিনে এনেছি। নষ্ট হবে।

–নষ্ট কেন হবে, ফ্রিজে রেখে দিও। এরপর তুমি একদিন আমাকে রান্না করে খাইয়ো। আমি অবশ্য ইন্ডিয়ান রান্না দু’একটা জানি। লন্ডনে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় কারি খেয়েছি, সেখান থেকে কারি রান্নাও শিখে নিয়েছি। তুমি ওয়াইল্ড রাইস খেয়েছো?

–না। নাম শুনেছি বটে। সত্যি ওয়াইল্ড রাইস কিনতে পাওয়া যায়?

–হ্যাঁ, দাম একটু বেশী। ওয়াইল্ড রাইস-এর সঙ্গে কর্ড বীফের একটা খুব ভালো প্রিপারেশান হয়। আমি রান্না শুরু করি, তুমি আমার সঙ্গে গল্প করো, আমাকে ইন্ডিয়ার গল্প বলো!

গ্ৰগ পান করতে করতে অতীনের খুব গরম লাগছে, ঘামের বিন্দু ফুটে উঠেছে কপালে। তা দেখতে পেয়ে জুডি বললো, এই তো তুমি ঘামছে, অর্থাৎ তোমার কাজ হচ্ছে। দাঁড়াও, ঘাম মোছার জন্য তোমাকে একটা জিনিস দিচ্ছি, না, না, রুমাল ব্যবহার করো না, একটু ধৈর্য ধরো!

সিঙ্কে গরম জলের কলটা খুলে দিয়ে অনেকখানি জল আগে ছেড়ে দিল জুডি। যখন গরম জল থেকে ধোঁয়া বেরুতে লাগলো, তখন তাতে একটা ছোট ভোয়ালে ভেজাতে লাগলো সে। তার আগে সে দু’হাতে দ্রুত দস্তানা পরে নিয়েছে। মিনিট দু’এক সেই আগুন-গরম জলে তোয়ালেটা ভেজাবার পর চিপড়ে নিয়েই সে সেটা এনে অতীনের মুখে চেপে ধরলো। তারপর খুব যত্ন করে মুছিয়ে দিতে লাগলো অতীনের মুখ।

এত সর্দি হয়েছে জেনেও জুডি তাকে একটুও অবজ্ঞা করছে না, অতি আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা করছে। অতীন এরকম স্বপ্নেও ভাবেনি। জুডির সঙ্গে তার ভালো করে ভাবই হয়নি আগে।

তোয়ালেটা ঠাণ্ডা হয়ে যেতেই জুডি আবার সেটা গরম জলে ভিজিয়ে এনে অতীনের মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললো, এরকম রোজ দু’তিনবার করবে, দেখবে নাক পরিষ্কার হয়ে যাবে, রাত্রে ভালো ঘুম হবে।

জুডির বিশাল উরুর স্পর্শ লেগেছে অতীনের বাহুতে। এক একবার তার স্তনের ছোঁয়া লাগছে অতীনের মাথায়। অতীন আরামে চোখ বুজে আছে।

এ দেশে আসার পর প্রথম প্রথম, সিদ্ধার্থ যখন জানতো না যে অলি বা শর্মিলার সঙ্গে অতীনের আগে থেকেই সম্পর্ক আছে, তখন সিদ্ধার্থ অতীনকে নানারকম উপদেশ দিত। সিদ্ধার্থ বলেছিল, এ দেশের মেয়েদের সঙ্গে ডেটিং করার নিয়ম কী জানিস? শিখে নে! যখন তখন অসভ্যতা করে ফেলিসনি। ফোনে মেয়ের সঙ্গে ডেট করে তাকে নিয়ে সিনেমায় যেতে পারিস, কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে পারিস, কিন্তু প্রথম দুতিনদিন গায়ে-টায়ে হাত দিস না যেন। মেয়েটি যদি সন্ধের পর বাড়ি পৌঁছে দিতে বলে, বাড়ির দরজায় পৌঁছেই যদি হাত নেড়ে বিদায় জানায়, তা হলে তক্ষুনি চলে যাবি। কিন্তু মেয়েটি যদি সঙ্গে সঙ্গে গুড নাইট না বলে পর্চে দাঁড়িয়ে দু’মিনিট গল্প করে, তা হলে বুঝতে হবে, সে তোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা হলে তাকে একটা চুমু খেতে চাইবি। না, না, গালে-টালে না, গালে চুমু খেলে মেয়েটা তোর সঙ্গে আর কথাই বলবে না, ঠোঁটে চুমু খাবি, মাত্র একবার। হ্যাংলামি করতে নেই প্রথম প্রথম। সেইসময় ঠোঁটে চুমু খেতে না চাইলে মেয়েটি অপমানিত বোধ করবে। তারপর তার রি-অ্যাকশান লক্ষ করবি। চুমু খাওয়ার পরেও মেয়েটি যদি বলে, ওপরে এসো না, আমার ঘরে একটা ড্রিংক নাও, কিংবা একটু কফি খেয়ে যাও, তা হলে বুঝবি, কী বুঝবি? গাড়লের মতন তাকিয়ে আছিস কেন? মেয়েরা একা বেড রুমে ডেকে নিয়ে গেলে সেই বেড রুমের পুরোপুরি ব্যবহার করতে হয়!

সিদ্ধার্থর সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল অতীনের। জুডির সঙ্গে সে ডেট করেনি, এমনিই হঠাৎ রাস্তায় দেখা। পর্চে দাঁড়িয়ে সে জুডিকে চুমু খায়নি, সে প্রশ্নই ওঠে না। জুডি তাকে ওপরে ডেকে নিয়ে এসেছে। দরজা বন্ধ, জুডি তাকে অনেকক্ষণ থাকতে বলছে। এর কি সত্যিই অন্য কোনো মানে আছে? সেক্স ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক হতে পারে না মেয়েদের

জুডিকে এক একবার তার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে ঠিকই। কিন্তু এই ইচ্ছেটাও তেমন তীব্র নয়। শর্মিলার ওপর তার যতই রাগ বা অভিমান হোক, শর্মিলার বদলে অন্য কোনো মেয়েকে তেমনভাবে স্পর্শ করতে তার মন চাইছে না। বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে শর্মিলার কথা।

এরপর দেড় ঘণ্টা সেখানে রইলো অতীন। আরও এক গেলাস এগ পান করলো। জুডি তাকে বন্য চাল ও মাংসের কিমা দিয়ে নতুন ধরনের একটা রান্না খাওয়ালো, গল্প করলো অনেক। কিন্তু জুডির ব্যবহারে কোনোরকম শারীরিক ইঙ্গিত নেই। অতীনকে সে শুধু একজন বন্ধু বলে ধরে নিয়েছে। এ দেশে নারী ও পুরুষের বন্ধুত্ব হলেই তার মধ্যে বিছানায় স্থান অবধারিত। কিন্তু জুডি যেন সে ব্যাপারটা জানেই না। অতীনের হাত ধরে টেনে সে একবার নিয়ে গেল রান্না ঘরে, কিন্তু চোখে মুখে লাস্য ফোঁটালো না।

বিদায় নেবার সময় তাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো জুডি। নির্জন, আধো-অন্ধকার সিঁড়ি, মনে হয় যেন সারা বাড়িতে আর জনপ্রাণী নেই।

জুডি তার কাঁধে একটা চাপড় মেরে বললো, তোমার সর্দি অনেকটা সেরে গেছে না?

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে জুডিকে জড়িয়ে ধরলো অতীন। ফিস ফিস করে বললো, থ্যাঙ্ক ইউ জুডি, থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং!

জুডি নিজেকে ছাড়িয়ে নিল না, আবার চুম্বনের প্রতীক্ষাও রাখলো না ওষ্ঠে। সুন্দর করে হাসলো। অতীনেরও চুমু খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। এই আলিঙ্গনের মধ্যেও অন্য কিছু নেই, শুধু বন্ধুত্বের বন্ধনটা দৃঢ় করা।

বাইরে বেরিয়ে তার মনটা হঠাৎ ভালো লাগলো অনেক দিন পর।

২৯. খবরের কাগজের জন্য একটা প্রবন্ধ

খবরের কাগজের জন্য একটা প্রবন্ধ কালই দিতে হবে, তাই মামুন লিখতে বসেছেন সন্ধেবেলা। কয়েকদিন আগে সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল একটা পাটিতে, মামুন মাসখানেক কোনো লেখা দেননি বলে তিনি ভর্ৎসনা করেছেন। তিনি মামুনের কাছে বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকার ওপর একটা বড় লেখা চান। ভদ্রলোকের ইতিহাস ও ভূগোল জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়ে যান মামুন। কোনো বইপত্র না দেখেই তিনি বহু ঐতিহাসিক ঘটনার নিখুঁত সাল তারিখ মুখে মুখে বলে যান গড়গড় করে। ওঁর জন্ম পূর্ব বাংলায়। এখনও সেখানকার প্রতিটি মহকুমা এবং রাস্তাঘাটের এমন বর্ণনা দেন যেন কয়েকদিন আগেই সেখান থেকে ঘুরে এসেছেন! মামুনের আগের লেখাটিতে তিনি দুটি ভুল বার করেছিলেন, সামান্য খুঁটিনাটির ভুল, তবু ভুল তো বটে।

থিয়েটার রোডের অস্থায়ী মুজিবনগরে এখন ঢাকার কিছু কিছু বই ও পত্র-পত্রিকা পাওয়া যায়। মামুন আজ দু’খানা বই নিয়ে এসেছেন, লিখতে লিখতে মামুন বই খুলে মিলিয়ে নিচ্ছেন রেফারেন্স। কিন্তু লেখায় পুরোপুরি মন দিতে পারছেন না তিনি।

ঘরে চেয়ার-টেবিল নেই, মামাকে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে লিখতে হয়। পাশের খাটে রেডিও শুনছে মঞ্জু আর হেনা। সন্ধের পর রেডিও শোনা ছাড়া ওদের আর তো কোনো সময় কাটাবার আকর্ষণ নেই, তাই মামুন ওদের রেডিও বন্ধ করতে বলতে পারেন না। মঞ্জু এক একদিন ঢাকায় ফেরার জন্য উতলা হয়ে ওঠে, অথচ ফেরার কোনো উপায়ও যে নেই, তাও বোঝে। এরমধ্যে মামুনকে মিথ্যে করেই বলতে হয়েছে যে ঢাকা থেকে সদ্য আগত দু’জনের মুখে তিনি মঞ্জুর স্বামী বাবুল চৌধুরীর খবর পেয়েছেন, বাবুল ভালো আছে।

মঞ্জু আর হেনা রেডিওর কাঁটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একবার কলকাতার আকাশবাণী আর একবার স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রর অনুষ্ঠান শোনে। আকাশবাণীতে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ভদ্রলোকের খবর পড়া ওদের প্রতিদিন শোনা চাই-ই। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বরে এমন আবেগ ফুটে ওঠে যে কখনো রক্ত চনমন করে ওঠে, কখনো চোখে জল এসে যায়। মঞ্জুর ছেলে এই ভদ্রলোকের গলা নকল করার চেষ্টা করে।

একটা গান শুনে মামুন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা সেই অতি পরিচিত গান, একুশে ফেব্রুয়ারি। হঠাৎ মামুন চমকে উঠলেন, আরে, এই গানটা তো তাঁর কাজে লাগবে! গানটির সব কথা তাঁর মুখস্থ নেই। কিন্তু ভাষা আন্দোলনবিষয়ক লেখাটিতে এই গানটি ব্যবহার করা দরকার।

গানটির শেষ অংশ গাওয়া হচ্ছে, মামুন দ্রুত হাতে লিখে নিতে লাগলেন।

ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি, একুশে ফেব্রুয়ারি।

তুমি আজ জাগো, তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বলিছে ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি, একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি…

মামুনের মনে পড়লো, গাফফার যখন সেকেণ্ড ইয়ারের ছাত্র, সেই সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বেড়ে একটি বুলেটবিদ্ধ তরুণের শিয়রে বসে সে এই কবিতাটা লিখেছিল। কতদিন আগেকার কথা, পাকিস্তানের বয়েস তখন মাত্র পাঁচ বছর, সেই সময়ই বাঙালী মুসলমান তরুণসমাজের মনে হয়েছিল, ‘ওরা এ দেশের নয়। মামুন তখন জেলে ছিলেন, শাসকশ্রেণীর প্রতি একটা তিক্ততার বোধ তাঁরও ওষ্ঠে লেগেছিল, কিন্তু পাকিস্তানকে ভাঙার কথা তিনি তখন স্বপ্নেও ভাবেননি। এখন পাকিস্তানকে কে ভাঙতে চাইছে, শেখ মুজিব, বাঙালী উগ্রপন্থী তরুণেরা, না পশ্চিমের অত্যাচারী সামরিক শাসকেরা?

হেনা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো, আলু, চরমপত্র! চরমপত্র!

এই অনুষ্ঠানটা মামুনও বাদ দিতে চান না। তিনি কাগজপত্রের ওপর বই চাপা দিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। এই অভিনব অনুষ্ঠানটির তুলনা নেই। চরমপত্র যিনি পড়েন তাঁর নামটি গোপন রাখা হয়, কিন্তু প্রথমদিন শুনেই হেনা-মঞ্জুরা চিনতে পেরেছিল। এম আর আখতার মুকুলের সঙ্গে তাঁরা দেশ ছাড়ার সময় অনেকটা পথ একসঙ্গে এসেছিলেন। এখানেও পার্ক সাকসে বালু হক্কাক লেনে ‘জয় বাংলা পত্রিকা অফিসে মুকুলের সঙ্গে মামুনের দেখা হয়েছে। কয়েকবার। এই দুঃসময়েও তিনি আড্ডায়, হাসি-গল্পে অনেককে মাতিয়ে রাখেন।

“…যা ভাবছিলাম, তাই-ই হইছে, মুক্তিবাহিনীর বিচ্চুগুলার আকা, গাবুর, কেচকা আর গাজুরিয়া মাইর একটুক কইর‍্যা কড়া হইয়া উঠতাছে আর খেইলটা জমছে। এর মাইদ্দে টিক্কা-নিয়াজীর হেই জিনিস খারাপ হইয়া গেছে গা! তাগো তিনটা ডিভিশানের বেস্ট সোলজাররা বাংলাদেশের কেঁদোর মাইদ্দে ঘুমাইয়া পড়ছে। এইদিকে নদার্ন রেনজারস, গিলগিট স্কাউট, লাহোর রেনজারস, পশ্চিম পাকিস্তানী আমর্ড পুলিশ জাগোই ময়দানে নামাইতাছে, তারাই আছাড় খাইতাছে। আইজ কাইল এইগুলা আছাড় খাইলে আর কান্দে না। লগে লগে আগরী দমড়া ছাইড়া দেয়। বাংলাদেশের দখলীকৃত এলাকায় হানাদার সোলজাররা ট্রেনে চাপলে ডিনামাইট, রাস্তায় গেলে মাইন, টাউনে ঘুরলে হ্যান্ড গ্রেনেড আর দরিয়াতে নামলেই খালি চুবানি খাইতে হয়! এইরকম একটা অবস্থায় পড়ায় চাইর মাস যুদ্ধ হওনের পর টিক্কা-নিয়াজী জমা-খরচের হিসাব কইর‍্যা ভিমরী খাইছে। এলায় করি কী?…

খালি কলসের আওয়াজ বেশী। ঠং ঠং কইর‍্যা আওয়াজ হইলো। বাংলাদেশের কেঁদোর মাইদ্দে আড়াই ডিভিশান সোলজার নষ্ট করনের পর ইয়াহিয়া সাব এলায় অতৃকা ইন্ডিয়ার লগে যুদ্ধ করনের ধমক দেখাইছেন। বেড়া এক খান। হেতনে কইছে ইন্ডিয়া যদি বাংলাদেশের কোনো এলাকার দখলী লইতে চায়, তয় যুদ্ধ ঘোষণা কইরা দিমু। হগল দনিয়ারে কইয়া দিতাছি, আমি ইন্ডিয়ার লগে যুদ্ধ করমু। আর আমি একলা নাইক্যা, আমার লগে মামু আছে। চাচা রইছে।

“কেমন বুঝতাছেন? হেতনে জ্ঞান পাগল হইছে…।”

হেনা জিজ্ঞেস করলো, আলু, গাজুরিয়া মাইর’ কী? মামুন হাসলেন। মুকুল সাহেব এমন এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন, যার অর্থ তিনিও জানেন না। কিন্তু শুনতে বেশ মজা লাগে। এই চরমপত্র’ শুনলে খানিকটা ভরসাও পাওয়া যায়, মনে। হয়, মুক্তিবাহিনী কোথাও থেমে নেই। একদিন না একদিন তাদের জয় হবেই।

কিন্তু সেই জয় কত দূরে?

মামুন আবার লেখায় মন দিলেন। রেডিওতে এরপর আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটা শুরু হতেই তাতে গলা মেলালো মঞ্জু।

একটু পরে দরজায় টক টক শব্দ হলো। দরজা বন্ধ নয়, ভেজানো। সুখু গিয়ে দৌড়ে খুলে। দিল। বাইরে থেকে একজন বললো, মামুনভাই, আসতে পারি? আমি শওকত?

মামুন ব্যস্ত হয়ে বললেন, কে? শওকত ওসমান সাহেব? আসেন, আসেন!

লোকটি মুখ বাড়িয়ে বললো, না, আমি মীর শওকত আলী। আপনার ঠিকানা লইলাম কামরুল হাসান সাহেবের কাছ থিকা!

মামুন এবারে চিনলেন। তিনি যখন দিনকাল পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তখন এই মীর শওকত আলী ছিল তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি। মামুনের চাকরি যাবার পর শওকতও চাকরি ছেড়ে দেয়, তারপর সে চলে গিয়েছিল চিটাগাঙ। ছেলেটিকে মনে রাখবার আর একটি কারণ, সে চমৎকার গান গাইতো।

দেশের যে-কোনো মানুষকে দেখলেই খুশি হবার কথা, কিন্তু মামুন এখন ততটা উৎসাহিত হতে পারলেন না। লেখাটা শেষ হবে কী করে? লেখার মাঝখানে কেউ এসে পড়লে বিরক্তি গোপন করাটাই মুশকিল হয়ে পড়ে।  

খুব পরিচিত ছাড়া অন্য কারকে মামুন বাড়িতে আসতেও বলেন না। একটাই মোটে ঘর, বাইরের লোকরা এসে বসলে মেয়েরা যায় কোথায়? মেয়েদের আব্রু রক্ষা করার একটা ব্যাপার আছে। অনেক সময়, সে রকম কোনো অতিথি এলে মঞ্জু আর হেনা গিয়ে রান্নাঘরে বসে থাকে। রান্নাঘরটা ঘুপচি অন্ধকার মতন, সেখানে কি বেশীক্ষণ বসে থাকা যায়? মঞ্জুর আবার খুব মাকড়সার ভয়! এক একজন অতিথি এমন বে-আক্কেলে হয় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলেও উঠতে চায় না।

মামুন অপ্রসন্ন ভাবে বললেন, আসো শওকত। কী ব্যাপার কও!

শওকত বললো, মামুনভাই, আমার সাথে একজন ভদ্রলোক আসছেন, আমি তো রাস্তাঘাট চিনি না, এনার নাম পলাশ ভাদুড়ী।

মামুন এবারে খাট থেকে নামলেন। শওকতের সঙ্গে একজন সুদর্শন হিন্দু যুবক এসেছে, এর প্রতি অগ্রাহ্যের ভাব দেখানো যায় না।

মামুন আপ্যায়ন করে বললেন, আসুন, আসুন, ভেতরে আসুন, না, না, জুতা খুলতে হবে না, চেয়ার-টেয়ার কিছু নাই, এই খাটেই বসুন!

মঞ্জু আর হেনা রেডিও বন্ধ করে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসেছে। মামুন তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওরে হেনা-মঞ্জু, বাসায় মেহমান এসেছে, একটু চা খাওয়াবি না?

অর্থাৎ মঞ্জু-হেনাকে রান্না ঘরে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন মামুন।

শওকত বললো, মামুনভাই, আমি মাত্র তিনদিন আগে আসছি বর্ডার পার হইয়া।

সে যে মাত্র তিনদিন আগে ওপার থেকে এসেছে, সেটাই তার বড় পরিচয়। নতুন কেউ এলেই সবাই তাকে হেঁকে ধরে টাটকা খবর শোনার জন্য। প্রেমের বিরহের চেয়ে দেশত্যাগীদের বিরহও কিছুমাত্র কম তীব্র নয়। বাধ্য হয়ে যারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের খবর জানার জন্য ব্যাকুল। গত সপ্তাহে মঞ্জুর নামে একটি ছেলে আত্মহত্যা করেছে। কারণটি ঠিক জানা না গেলেও অনেকে বলাবলি করছে যে দেশে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তার টেনশান সে আর সহ্য করতে পারছিল না।

মামুন অবশ্য তেমন আগ্রহ দেখালেন না, তাঁর লেখাটার চিন্তাই মাথায় ঘুরছে, তিনি বললেন, আগে বসো।

শওকত আর পলাশ ভাদুড়ী প্রায় সমবয়েসী। পলাশ প্যান্ট ও হাওয়াই শার্ট পরা, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, চোখ ও ওষ্ঠে কৌতুকমাখা হাসি।

সে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বললো, মামুন সাহেব, আমায় চিনতে পারেননি নিশ্চয়ই? আমি কিন্তু জানতুম না যে আপনারা এখানে থাকেন। শওকত যে ঠিকানা লেখা কাগজটা দেখালো, তাতে সৈয়দ মোজাম্মেল হকের নাম লেখা। আপনার পুরো নাম আমার জানাও ছিল না।

মামুন যুবকটির মুখের দিকে ভালো করে তাকালেন। অপরিচিত হিন্দু নাম সব সময় মনে। থাকে না। এই যুবকটিকে তিনি আগে কখনো দেখেছেন বলেও মনে পড়লো না।

হেনা আর মঞ্জুকে দরজা দিয়ে বাইরে বেরুতে গেলে এদের খাটের পাশ দিয়েই যেতে হবে। পলাশ প্রথমে হেনাকে দেখে বললো, মামুন সাহেব, এই আপনার মেয়ে না? ইস, কত বড় হয়ে গেছে!

তারপর সে মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছো, মঞ্জু?

মঞ্জু গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে এক পলকের জন্য দেখলো পলাশকে। তারপর প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

পলাশ হেসে বললো, মঞ্জুও আমায় চিনতে পারে নি। মামুন সাহেব, আপনাকে মনে করিয়ে দিই, আমি আমার এক বন্ধু শহীদের সঙ্গে একবার ঢাকায় গিয়েছিলুম, সিকস্টি ফাইভের আগে—

মামুনের মস্তিষ্কে একটা বিদ্যুৎ চমক হলো। সেই পলাশ আর শহীদ! যে-দু’জন যুবককে দেখে মঞ্জু প্রথম কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে উত্তীর্ণ হয়েছিল, যাদের জন্য মঞ্জু দিনের পর দিন কেঁদেছে।

তিনি বললেন, ও, তুমি সেই পলাশ, সুরঞ্জন ভাদুড়ীর ছেলে? চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, এরকম দাড়িও আগে ছিল না বোধহয়! শহীদ কোথায়?

পলাশ বললো, শহীদ নর্থবেঙ্গলে ওদের চা বাগানে আছে। সামনের সপ্তাহে এসে পড়বে! আমরা কেউ খবরই পাইনি যে আপনারা এখানে আছেন। আমি কালই শহীদকে টেলিফোনে জানাবো। আপনার দিদির বাড়িতে কত মজা করেছি, কত গান বাজনা হয়েছিল।

মামুন বললেন, হাঁ, হ্যাঁ, মনে আছে। দ্যাখো দেখি কী কাণ্ড, মঞ্জু তোমাকে চিনতেই পারে নি! দাঁড়াও।

মামুন তাড়াতালি মঞ্জুকে ডেকে আনতে গেলেন।

তাঁর আরও একটা কথা মনে পড়লো। পলাশ আর শহীদ, এই দু’জনের কোনো একজনের প্রেমে পড়েছিল মঞ্জু। ঠিক কার যে প্রেমে পড়েছিল, তা মঞ্জু খুলে বলেনি, মামুনও নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারেননি। ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে শহীদের প্রতিই মঞ্জুর দুর্বলতা, শহীদের সঙ্গে মঞ্জুর বিয়ের প্রস্তাবও উঠেছিল, শহীদ রাজি হয়নি। তা হলে কি তখন পলাশকেই ভালোবেসেছিল মঞ্জু? অল্প বয়েসের ব্যাপার, ওতে গুরুত্ব দেবার কিছু নেই, কিন্তু মেয়েরা কি প্রথম প্রেমের কথা ভুলে যেতে পারে?

রান্নাঘরে গিয়ে মামুন মঞ্জুর হাত ধরে রঙ্গ করে বললেন, কী রে মঞ্জু,ঐ ছেলেটিকে চিনতে পারলি না? এক সময় ওদের সাথে কলকাতায় আসবি বলে বায়না তুলে কেঁদে ভাসিয়েছিলি! ওর নাম পলাশ।

মঞ্জু চমকালো না। সে চিনতে পেরেছে ঠিকই। কিন্তু মামুন ধরে টানাটানি করলেও সে ও ঘরে গিয়ে পলাশের সঙ্গে কথা বলতে রাজি নয়। লজ্জায় তার মুখখানা লাল হয়ে গেছে। মামুন প্রায় তাকে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে এলেন।

পলাশ খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললো, কী মঞ্জু, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে বলে আমাদের আর চিনতে পারছে না? এই বুঝি তোমার ছেলে? কী সুন্দর দেখতে হয়েছে ছেলেকে।

শওকত বললো, পলাশদাদা খুব নাম করা গায়ক। আমার সাথে পরশুদিনই একটা ফাংশানে আলাপ হইলো। দ্যাশে থাকতেও ওনার রেকর্ড শুনেছি।

পলাশ বললো, মঞ্জুও তো চমৎকার গান জানে। মঞ্জু, তোমার কোনো রেকর্ড বেরোয় নি!

মঞ্জু মাথা নিচু করে নোখ দিয়ে মেঝে খুঁটতে লাগলো। মামুন বললো, বিয়ের পর ও তো গানের চর্চা একেবারে ছেড়েই দিল!

শওকত বললো, আমরা সিঁড়ি দিয়া ওঠার সময় এই ঘরে গান শুনতে পাইছিলাম। কে গাইছিল?

পলাশ বললো, এখানে বাংলাদেশের জন্য প্রায়ই তো ফাংশন হচ্ছে এখানে সেখানে। সেখানে মঞ্জু গান গাইছে না কেন? আজই তো একটা ফাংশান আছে, এই কাছেই, পার্ক সার্কাস ময়দানে, আমার প্রোগ্রাম আছে সাড়ে আটটায়। চলো, যাবে?

মঞ্জু দু’দিকে মাথা নেড়ে দৌড়ে চলে গেল চা আনতে। মামুন শওকতের দিকে তাকালেন, এবার তিনি শওকতের কথা শুনতে চান।

শওকত চিটাগাঙ শহরে হাঙ্গামা শুরু হবার পর পালিয়ে গিয়েছিল কুমিল্লায়, গ্রামে গিয়েও সুস্থির ভাবে থাকতে পারেনি, তারপর আগরতলা বর্ডার দিয়ে সে ইন্ডিয়ায় ঢুকেছে। শওকতের কাহিনীর মধ্যে অভিনবত্ব কিছু নেই, সকলেরই প্রায় একইরকম অভিজ্ঞতা, গ্রামে আগুন মিলিটারির অত্যাচার, চোখের সামনে প্রিয়জনের মৃত্যু।

কিন্তু শওকত শুধু এসব শোনাবার জন্যই আসেনি। এক জায়গায় থেমে গিয়ে সে হঠাৎ বললো, মামুনভাই, আগরতলায় আলতাফের সাথে দেখা হয়েছিল আমার। সে তো এখন মুক্তিফৌজের কমাণ্ডার।

মামুন অনেকখানি চমকে উঠলেন। আলতাফ? কোন আলতাফ?

শওকত বললো, আমাদের অফিসের সেই জেনারেল ম্যানেজার আলতাফ হাজব্যান্ড বাবুল চৌধুরীর বড় ভাই!

মামুন আবার ভুরু তুললেন। সেই আলতাফ? অল্প বয়েসে যে বিপ্লবের আদর্শে গলা ফাটাতো, একবার মাত্র জেল খেটেই যে পালিয়েছিল জার্মানিতে, ফিরে এসেছিল একটি সুখী, বিলাসী, হ্যাঁপি গো লাকি চরিত্র হয়ে, হোটেলের ব্যবসায় আর পত্রিকার ব্যবসায় যে হয়ে উঠেছিল তার মামা হোসেন সাহেবের এক নম্বর খোসামুদে, আইয়ুব খাঁর আমলে যে ছিল পাকিস্তানী সরকারের স্তাবক, সেই আলতাফ যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীতে? মামুন কানাঘুষো শুনেছিলেন যে আলতাফ পালিয়ে গেছে করাচীতে, কিংবা সে আবার জার্মানিতে ফিরে গেছে, তার বদলে মুক্তিবাহিনীর কঠোর পরিশ্রম ও বিপদসঙ্কুল জীবন সে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে? শেখ মুজিবের ভক্ত ছিল না সে কোনোদিনও, এখন সে শেখ মুজিবের নামে শপথ নিতে দ্বিধা করেনি!

মামুনের বিস্ময় দেখে শওকত বললো,আলতাফের বেশ নাম হয়েছে, দুই তিনটা দুঃসাহসিক অপারেশানে সে সাকসেসফুল হয়ে ফিরে এসেছে, সবাই বললো।

তারপর কাঁধের ঝোলাটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে সে বললো, আমার উপরে একটা দায়িত্ব দিয়েছিল আলতাফ, সেইজন্যই আমি কলকাতায় এসেই আপনার খোঁজ করেছি। একটা চিঠি পৌঁছায়ে দিতে বলেছে আপনার হাতে, খুব জরুরি আর সিক্রেট।

খামটির মুখ বন্ধ, মামুন দ্রুত ছিঁড়ে ফেললেন সেটা। মঞ্জু আর হেনা চা এনেছে, পলাশ আর শওকত কথা বলছে তাদের সঙ্গে, মামুন চিঠিখানা পড়তে গিয়ে কেঁপে উঠলেন। সংক্ষিপ্ত বারো-চোদ্দ লাইনের চিঠি, সেটাই তিনি পড়ে যেতে লাগলেন একাধিকবার।

চিঠি দেখে মঞ্জু উৎসুক ভাবে তাকাতেই অকম্পিত গলায় মামুন বললেন, টপ সিক্রেট, মুজিবনগর সরকারকে একটা খবর দিতে হবে, কাল সকালেই যাবো।

চিঠিখানা ভাজ করে তিনি রাখলেন পাঞ্জাবির পকেটে।

শওকত বললো, আমার রেসপনসিবিলিটি শেষ। পলাশদাদা, আপনার ফাংশানের দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো? কয়টা বাজে? আমার ঘড়িটা বেচে দিতে হয়েছে আসার পথে।

পলাশ নিজের হাতঘড়ি দেখে বললো, এখনো মিনিট কুড়ি দেরি আছে। মঞ্জু, যাবে না। আমাদের সঙ্গে? শওকতকে দিয়েও গান গাওয়াবো!

হেনা বললো, চলো, চলো, আব্ব, আমরা যাবো? যাই না!

শওকত বললো, মামুনভাই, আপনেও চলেন।

মঞ্জু হেনারা বাড়ির মধ্যেই অধিকাংশ সময় আবদ্ধ থাকে, বাইরে যাবার যে-কোনো প্রস্তাব পেলেই লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু মঙ পলাশকে দেখে এখনও লজ্জা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তার ফর্সা মুখোনিতে লালচে আভা। শুধু পলাশ-শওকতের সঙ্গে বাড়ির বাইরে যেতে মঞ্জু রাজি হচ্ছে না। মামুন নিজে সঙ্গে গেলে নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না।

কিন্তু মামুন যাবে কী করে? লেখাটা শেষ করতে হবে না?

তবু মামুনের মনে হলো, এখন মঞ্জুর একটু বেড়িয়ে আসা খুবই দরকার। কিছুক্ষণ মঞ্জু তাঁর চোখের আড়ালে থাকলে তিনি স্বস্তি বোধ করবেন।

মামুন বললেন, আমি তো যেতে পারবো না। আমার কাজ আছে। তোরা যা তবে। মঞ্জু, একটু তৈরি হয়ে নে।

মঞ্জু বুকে চিবুক ঠেকিয়ে বললো, হেনা যাক তাইলে। আমি যাবো না।

পলাশ বললো, আরে চলো! ঠিক আছে, তোমাকে গান গাইতে বলবো না, তুমি শুনবে। একবার তোমাদের দেখা পেয়েছি, আর কি সহজে ছাড়ছি? শহীদকেও আনিয়ে নিচ্ছি। কলকাতায়। তুমি কি কলকাতায় পদানশীন হয়ে থাকবে ভাবছো নাকি?

শওকত বললো, আমি আগে কলকাতায় আসি নাই। বড় মজার জায়গা। রাত্তির দশটা পর্যন্ত ফাংশান হয়, লোকজন বসে বসে শোনে।

পলাশ বললো, রাত দশটা কেন, অনেক ক্লাসিকাল গানবাজনার জলসা সারা রাত চলে। এখন গরমকাল বলে ঐসব একটু কম।

মামুন বললেন, আমরা ঢাকায় তো কারফিউ আর মারশাল ল-তে ভুগছি অনেকদিন ধরে, সন্ধ্যার পর কোনো অ্যাকটিভিটি থাকতো না। এখানে তো সেরকম কোনো ভয় নাই।

পলাশ বললো, আছে, এখানেও এখন নকশালদের ব্যাপারে লোকে ভয় পায়। কোথায় কখন বোমাবাজি শুরু হবে তার ঠিক নেই। তবুও লোকে গান বাজনা শুনতে আসে। মঞ্জু, আর দেরি করলে কিন্তু আমাদের দৌড় লাগাতে হবে।

মামুন বেশী বেশী উৎসাহ দেখিয়ে মঞ্জুকে তাড়া দিয়ে বললেন, দেরি করিস না। দেরি করিস না, তৈরি হয়ে নে! সবসময় কি আর আমি তোদর নিয়ে যেতে পারবো!

মঞ্জু হঠাৎ শওকতকে জিজ্ঞেস করলো, আপনার সাথে আলতাফ ভাইয়ার দেখা হয়েছিল, উনি তার ছোট ভাইয়ের কথা কিছু বলেন নাই?

শওকত মামুনের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো, না, বলেন নাই কিছু! তিনি ঢাকাতেই আছেন শুনেছি।

পলাশ মঞ্জুকে বললো, আর সাজগোজ করতে হবে না। যেমন আছে তেমনি এসো আর করো না সাজ! এরপর সত্যি দেরি হয়ে যাবে!

মঞ্জুর আর কোনো আপত্তি টিকলো না। সুখুকেও সঙ্গে নিয়ে গেল ওরা। মামুন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ওদের বিদায় দিলেন।

এখন নিরিবিলিতে লেখাটা শেষ করার সুবর্ণ সুযোগ। তবু মামুন খাটে ফিরে না গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। এতসব ঝাটের মধ্যে কি লেখা হয়? মাথাটা একেবারে গোলমাল হয়ে গেছে।

নির্বাসিত মামুনের একটা দিনও বোধহয় শান্তিতে যায় না। আজ পলাশ এলো, মঞ্জুর কুমারী জীবনের একটা বিশেষ স্মৃতি ঝিলিক দিয়ে যাবার কথা। পলাশকে দেখে যতখানি উচ্ছাস দেখানো উচিত ছিল, ততটা দেখাতে পারেননি মামুন। বাবুল চৌধুরী সঙ্গে আসেনি, এই ক’মাসে তার কাছ থেকে কোনো খবরও আসেনি, মঞ্জু তাঁর সঙ্গে রয়েছে বলে মামুনের একটা অতিরিক্ত দায়িত্ববোধ আছে। এখন পলাশ-শহীদদের সঙ্গে মঞ্জুর নতুন করে মেলামেশা করতে দেওয়াটা ঠিক হবে কিনা, তা মামুন বুঝতে পারছেন না। তবু তিনি জোর করেই যে মঞ্জুকে পলাশদের সঙ্গে এখন পাঠালেন, তার কারণ মামুনের ভালো অভিনয় ক্ষমতা নেই। শওকত এসেছে ভগ্নদূত হয়ে।

পকেট থেকে তিনি চিঠিটা আবার বার করে পড়লেন। আলতাফ লিখেছে তার ছোট ভাই সম্পর্কে। গত মাস দেড়েক ধরে বাবুল চৌধুরীর কোনো খোঁজ নেই। শেষ খবর পাওয়া গিয়েছিল যে সে আর্মির গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিল। তাদের বাড়ি থেকে আর্মির লোকজন সিরাজুলের স্ত্রী মনিরাকে ধরে নিয়ে গেছে। তাদের প্রতিবেশিনী জাহানারা বেগমও বাবুলের আর কোনো সন্ধান জানেন না। যতদূর মনে হয়, বাবুল চৌধুরীকে আর্মি ব্যারাকেই আটকে রাখা হয়েছে। অথবা সে ইন্ডিয়ায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে কি না, সে সংবাদ মামুনই ভালো জানবেন।

মামুন অস্ফুট ভাবে বললেন, আর্মি ব্যারাক!

আর্মি ব্যারাকে যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তারা আর কেউ ফেরে না। এরকম শত শত ঘটনা শোনা গেছে। আর বাবুল যদি ইন্ডিয়ায় পালিয়ে আসে, তা হলে কলকাতা ছাড়া আর কোথায় যাবে? ইন্ডিয়ার প্রতি বরাবর একটা অশ্রদ্ধার ভাব ছিল বাবুলের। তবু যদি সে কলকাতায় আসতো, নিজের স্ত্রী-পুত্রের খোঁজ করতে না? শওকত যে-ভাবে মামুনের ঠিকানা যোগাড় করেছে, সে ভাবে বাবুলও এই বাসায় চলে আসতে পারতো।

মঞ্জুকে কী বলবেন মামুন? তিনি চিঠিখানা কুচি কুচি করে ছিড়লেন, তারপর উড়িয়ে দিলেন। জানলা দিয়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখার জন্য তাঁর বুক ব্যথা করছে।

৩০. পুলিস হারীতকে মারধর করলো না

এবারে পুলিস হারীতকে মারধর করলো না কেন, তা হারীত নিজেই বুঝতে পারলো না। পুলিসের গাড়িতে ওঠার পরই হারীত ধরে নিয়েছিল, বুড়ো হাড়ে সে আর মার সহ্য করতে পারবে না। এবারে পুলিস তাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু একটা রুলের আঘাতও পড়লো না তার শরীরে, তার বদলে শুধু জেরা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন। সে জেরারও কোনো মাথা মুণ্ডু নেই, পুলিস যেন সব কথাই জানে, তবু সেইসব কথাই তারা আবার হারীতের মুখ দিয়ে বলাতে চায়।

সেদিন চন্দ্রার আশ্রমে পুলিসের কাণ্ডকারখানা দেখে হারীত হাঁ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিনের ব্যবধান, হারীতের মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ এবং শরীরে সাধুর পোশাক সত্ত্বেও পুলিসদের একজন তাকে চিনতে পেরে নাম ধরে ডেকেছিল। তবে তখুনি তাকে হাতকড়াও পরায়নি কিংবা মাথার চুল খামচে ধরে শালা-হারামজাদাও বলেনি। বরং আপনি আজ্ঞে সম্বোধন করে মিষ্টিভাবে বলেছিল, আপনি বসুন হারীতবাবু, আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে।

পুলিস প্রথমে প্রমীলা আশ্রম তন্নতন্ন করে সার্চ করলো। তারা নকশালদের খোঁজ করতে এসেছিল। হারীতের ধারণা, পুলিসের কখনো ভুল হয় না, তারা যা খুঁজতে এসেছে তা পাবেই। চন্দ্রা একটুও ভয় পায়নি, তার মুখের একটা রেখাও কাঁপেনি, বাঘছালের আসন ছেড়ে সে। একবারও উঠলো না পর্যন্ত। গোটা আশ্রমটা খুঁজে খালি হাতে ফিরে আসার পরে চন্দ্রা তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের সুরে বলেছিল, পেছন দিকে একটা নতুন গোয়ালঘর করা হয়েছে, সেটা দেখেছেন? চারটে গরু রাখা হয়েছে সেখানে। গোয়ালঘরটাও একবার দেখে আসুন, যদি সেখানে কিছু লুকোনো থাকে! তবে সাবধান, একটা ভাগলপুরী গরু আছে, সেটা বড় গুতোয়!

পুলিস আবার গোয়ালঘরটা দেখতে গেল এবং ফিরে এলো খালি হাতে। চন্দ্রার তুলনায় অসমঞ্জ বরং অনেকটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল, সার্চ করার সময় তিনি সর্বক্ষণ পুলিসের সঙ্গে সঙ্গে থেকেছেন। পুলিস যখন সত্যিই কিছু পেল না, তখন অসমঞ্জ ব্যক্তিত্ব ফিরে পেয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। তিনি বলতে গেলেন, আপনারা মিছিমিছি একটা আশ্রমে ঢুকে হ্যারাস করলেন, আমি পুলিস কমিশনারের কাছে,…খবরের কাগজে

চন্দ্রা হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, তুমি চুপ করো, অসম! ওঁদের ডিউটি ওঁরা। করেছেন। ওঁদের যখন একটা সন্দেহ হয়েছিল

পুলিস অফিসার দু’জনের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রা বলেছিল, তা হলে এবার স্বীকার করছেন, আপনাদের ভুল হয়েছে? আপনারা এই আশ্রমে অযথা উৎপাত করতে এসেছেন!

পুলিস দু’জন কোনো কথা না বলে অপ্রস্তুত ভাবে হাসলো।

চন্দ্রা বললো, ভুল করলে শাস্তি পেতে হয়। আমি পুলিস কমিশনারের কাছে নালিস করতে চাই না, খবরের কাগজেও কিছু জানাতে চাই না। আপনারা দু’জন কান ধরে পাঁচবার ওঠবোস করুন, তাহলেই আমি খুশি হব।

হারীতের চোখ দুটি কপালে ওঠার উপক্রম হয়েছিল। এই স্ত্রীলোকটির এত তেজ, পুলিসকে কান ধরতে বলে? চন্দ্রার চোখ দিয়ে যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে, সত্যিই কিছু অলৌকিক শক্তি আছে। নাকি তার?

এস বি অফিসার অমরেশ দাশগুপ্ত বাচ্চা ছেলের মতন লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকে বলেছিলেন, আজ্ঞে, সেই ইস্কুল-টিস্কুল ছাড়ার পর তো আর কেউ কান ধরে ওঠবোস করতে বলেনি, তাই ওটা ঠিক পারবো না। আপনি বরং অন্য কিছু শাস্তির কথা ভাবুন। তার আগে। আপনাকে গোটা কতক প্রশ্ন করতে পারি?

অসমঞ্জ গলা গরম করে বললেন, আপনারা যথেষ্ট সময় নষ্ট করেছেন। আর কোনো প্রশ্ন। নয়। আমাদের এখন জরুরি কাজ আছে।

বিনয়ের অবতার হয়ে বিনায়ক চৌধুরী বললেন, সত্যি, অনেকটা সময় নিয়ে নিয়েছি, আর মিনিট পাঁচেকের বেশী লাগবে না। মিঃ দাশগুপ্ত, আপনিই শুরু করুন তা হলে?

অমরেশ দাশগুপ্ত পকেট থেকে একটা ছোট্ট নোট বই বার করে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন, কী যেন নামটা? আপনাদের আশ্রমের সুপার, এই যে হ্যাঁ, পেয়েছি, পেয়েছি, কুমুদিনী, কুমুদিনী সাহা, তিনি এখন কোথায়?

অসমঞ্জর দিকে একবার চোখাচোখি করে চন্দ্রা বললো, হ্যাঁ, সে আগে ছিল এখানে। এখন চলে গেছে।

–কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে, না, ছুটিতে বাড়ি-টাড়ি চলে গেছে?

–এখানে কেউ চাকরি করে না, সুতরাং কাজ ছাড়ার প্রশ্ন ওঠে না। কুমুদিনীর কোথাও কোনো বাড়িঘর আছে কি না তাও আমরা জানি না। এখানে তার মন টেকেনি, অনেকে তাকে বাঘিনী বলে খেপাতো, আমি বারণ করলেও আড়ালে কেউ কেউ বলতো, সেইজন্য সে এখান থেকে চলে গিয়ে সম্ভবত অন্য কোনো আশ্রমে যোগ দিয়েছে।

–সম্ভবত বলছেন, ঠিক কোন আশ্রমে তিনি যোগ দিয়েছেন, তা আপনি জানেন না?

–না, জানি না।

–আপনি দু’ দিন আগে নৈহাটি গিয়েছিলেন?

–আমি কোথায় যাই, না যাই, সে সম্পর্কেও আপনাদের কৈফিয়ৎ দিতে হবে?

–না, না, কৈফিয়ৎ নয়, ও ভাবে ধরছেন কেন। সামান্য দু-একটা ইনফরমেশন। নৈহাটিতে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?

–নৈহাটিতে একজন একটা ছোট বাড়ি দান করেছে, সেখানে আর একটি আশ্রম খোলা হচ্ছে। সেটাই তদারকি করতে গিয়েছিলাম।

–তার মানে, আপনাদের প্রমীলা আশ্রমের একটা ব্রাঞ্চ খুলছেন নৈহাটিতে, এই তো! এখানকার এই আশ্রমে অনাথা মেয়েদের রাখা হয়, ঐ নৈহাটির আশ্রমে কাদের রাখা হবে?

–সেখানেও অসহায় মেয়েদেরই রাখা হবে! অলরেডি ছ’-সাতজনকে রাখাও হয়েছে।

–আমি যদি বলি, নৈহাটির সেই আশ্রমে একটি মেয়ে নেই, সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল কয়েকজন আহত নকশাল ছেলেকে? তাদের মধ্যে দু’জন আবার দাগী ক্রিমিনাল, এখনকার ভাষায় লুমপেন প্রলেতারিয়েত। আপনি পরশুদিন একজন ডাক্তার নিয়ে গিয়েছিলেন। নৈহাটির সেই বাড়িতে।

বিনায়ক চৌধুরী কবজি উল্টে ঘড়ি দেখে বললেন, এবার ওয়াইণ্ড আপ করুন! পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে।

যেন খুব খুদে খুদে অক্ষর পড়তে হচ্ছে, এইভাবে নোট বুকটাকে প্রায় চোখের সামনে এনে অমরেশ দাশগুপ্ত বললেন, হ্যাঁ, নৈহাটির আশ্রম সার্চ করে পাওয়া গেছে দুটি রিভলভার, একুশটা বোমা, তিনটে পাইপগান, চন্দ্রা দেবীর ওখানকার একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাস বই, জেলের কয়েদীদের তিনটে জামা, রিসেন্টলি দমদম জেল ব্রেক থেকে পালানো চার-পাঁচজন ওখানে ছিল, তাদের মধ্যে দু’জন ধরা পড়েছে অবশ্য।

ফট করে হারাতের দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি বললেন, আপনার ছেলে সুচিরতও নৈহাটির বাড়িতে ছিল, কিন্তু এবারেও সে পালিয়েছে, তবে বেশী দূর যেতে পারবে না।

আবার চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কুমুদিনী সাহাকে আপনি সেই নকশাল আশ্রম চালাবার ভার দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, তা ভদ্রমহিলার বাঘিনী নামটা সার্থক, রেজিস্ট করেছিলেন খুব, শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁকেও ধরে আনা হয়েছে, বাইরে গাড়িতেই আছেন।

ফিক করে হেসে ফেলে তিনি বললেন, তাহলেই বুঝতে পারছেন, চন্দ্রা দেবী, ভুল আমাদের হয়নি, এবারে আর আপনি আমাদের কোনো শাস্তি দিতে পারছেন না। আপনি তৈরি হয়ে নিন, একটু যেতে হবে আমাদের সঙ্গে।

অসম বললেন, এসব কী বলছেন আপনারা? সব মিথ্যে কথা! চন্দ্রাকে আপনারা ধরে নিয়ে যাবেন? শী ইজ আ হোলি পারসন, স্পিরিচুয়াল লীডার অফ সো মেনি ডিভোটিজ! আমি আগে একজন ল-ইয়ার ডেকে আনবো।

বিনায়ক চৌধুরী বললেন, আজকাল আর ল-ইয়ার লাগে না, আমরা এমনিই অ্যারেস্ট করতে পারি। চ্যাঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই।

অমরেশ দাশগুপ্ত বললেন, অসমঞ্জবাবু, আপনি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের রীডার, এই আশ্রমের অন্যতম ট্রাস্টি, আপনাদের ট্রাস্ট ডিডে কি নৈহাটি ব্রাঞ্চেরও নাম আছে? মানে, নৈহাটি আশ্রমের কোনো দায়িত্বও কি আপনাকে নিতে হয়?

পাংশুমুখে অসমঞ্জ বললেন, না, না, না, নৈহাটি আশ্রমের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আমি কিছুই জানি না! সেখানে যে একটা আশ্রম খোলা হয়েছে, সে কথাও আমাকে জানানো হয়নি!

–দেন, উই হ্যাভ নাথিং এগেইনস্ট ইউ! এই আশ্রম সার্চ করে কোনোরকম ইনক্রিমিনেটিং অবজেক্টস পাওয়া যায়নি, সুতরাং এ আশ্রম যেমন চলছে তেমনি চলতে পারে। প্রার্থনা-ট্রার্থনা শেষ হয়ে যাবার পর, বাইরের লোকজন সব চলে গেলে আমরা এসেছি। ব্যান্ড পাবলিসিটি আমরা দিতে চাইনি। শুধু চন্দ্রা দেবী আপাতত অ্যাবসেন্ট থাকবেন!

চন্দ্রা শিরদাঁড়া সোজা করে বসে একদৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে চেয়ে আছে।

অমরেশ দাশগুপ্ত বললেন, চন্দ্রা দেবী, আপনি যদি কিছু পোশাক-টোশাক সঙ্গে নিতে চান, নিতে পারেন।

চন্দ্রা মুখ ফিরিয়ে আস্তে আস্তে বললো, পুলিসে চাকরি করলেও আপনারা তো এদেশেরই মানুষ? আদর্শবাদী, বিপ্লবী ছেলেগুলোকে আপনারা ক্রিমিনাল সাজাচ্ছেন, যখন তখন গুলি করে মারছেন, আপনাদের কি বিবেক বলে কিছু নেই?

হঠাৎ বিনায়ক চৌধুরী অস্বাভাবিকভাবে চেঁচিয়ে বললেন, শাট আপ! ওসব বাজে বক্তৃতা আমাদের শোনাবেন না! কতকগুলো ফলস আদর্শের কথা শুনিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের মাথা খাচ্ছেন আপনারা! শুধু শুধু তারা মরছে!

ধমক খেয়েও চুপসে না গিয়ে চন্দ্রা একই রকম ঠাণ্ডা, কঠিন গলায় বললো, নৈহাটিতে নিশীথ সরকার নামে একটি ছেলেকে আপনারা গুলি করে মেরেছেন, জীবনে সে কখনো

একটাও অন্যায় কাজ করেনি, সে ছিল তার বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান।

–সি পি এম কিংবা কংগ্রেসের যে-সব ছেলেদের আপনারা মারছেন, তারা কেউ বুঝি কোনো বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান হতে পারে না?

অমরেশ দাশগুপ্ত বললেন, এখন তো সাধারণ গুণ্ডা বদমাশরাও যাকে তাকে খুন করে নকশালী বিপ্লব বলে চালাচ্ছে। বেশ মজা পেয়েছে ওরা। এই তো হারীতবাবুর ছেলেই অন্তত তিনটে খুন করেছে। আগে সে এক কংগ্রেস লীডারের হয়ে গুণ্ডামি করতো, এখন সে নকশাল হয়ে গেছে! কলেজ ইউনিভারসিটির অধ্যাপকদের মেরে কিসের বিপ্লব হয়, অসমঞ্জবাবু, আপনিই বলুন না!

অসমঞ্জ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, আমি কোনোরকম পলিটিকসের মধ্যেই নেই! আমার মনে হয়, আপনাদের এখনও ভুল হচ্ছে। চন্দ্রাও কখনো রাজনীতি নিয়ে…নৈহাটির বাড়িটায় আপনারা যে সব আমস পেয়েছেন, সেগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা রেখে যায়নি তো?

–নৈহাটিতে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা? হাসালেন মশাই! চন্দ্রা দেবী, চলুন, চলুন, আর দেরি করে কী হবে?

চন্দ্রা আর হারীতকে এক গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলেও রাখা হলো না একই জায়গায়। চন্দ্রাকে সেদিনের পর আর হারাত দেখেনি, চন্দ্রার ভাগ্যে কী ঘটেছে তাও সে জানে না।

পশ্চিম বাংলায় ফিরে আসার ব্যাপারে হারীতের ওপরে যে একটা নিষেধাজ্ঞা ছিল, সে ব্যাপারটা একবারও উল্লেখ করেনি পুলিস। তারা শুধু সুচরিত্র সম্পর্কে আগ্রহী। মোহনবাগান। লেনে আনন্দমোহনের সঙ্গে দেখা করার পর থেকে হারীতের গতিবিধি সবই পুলিসের জানা। হারীত বনগাঁ সীমান্তে গিয়েছিল কেন? সেখানেই কি কোথাও লুকিয়ে আছে সুচরিত! কিংবা সে বর্ডার ক্রশ করে ওপারে পালিয়েছে? কাশীপুরের রিফিউজি কলোনিও সার্চ করে দেখা হয়েছে, সেখানেও সুচরিত নেই। চন্দ্রার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে হারীতই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে তার ছেলেকে, সেই জায়গাটা কোথায়?

পুলিস একই কথা বারবার বলে। ঐ অমরেশ দাশগুপ্ত নামে লোকটির ধৈর্য অসীম, একটুও রাগ করেন না, হাসিমুখে বলেন, হারীতবাবু, আপনি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছেন না, আমাদের হাতে ধরা পড়লে তবু আপনার ছেলের বাঁচার আশা আছে। সে জেল খাটবে। বাইরে থাকলে একদিন না একদিন সে খুন হবেই। কংগ্রেসের একজন বড়গোছের চাঁইয়ের হত্যার ব্যাপারে তার নাম জড়িত, কংগ্রেসের ছেলেরা বদলা না নিয়ে ছাড়বে?

পুলিসের কাছ থেকেই হারীতকে তার ছেলের জীবন কাহিনী শুনতে হয়। অথচ পারুলবালা এতদিন আশা করেছিল, কলকাতার ভালো বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে তার মেধাবী ছেলে অনেক লেখাপড়া শিখবে, একদিন সে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হবে!

দিন সাতেক পরে গারদ থেকে বার করে হারীতকে চাপানো হলো একটা ঢাকা গাড়িতে, ভেতরে পাহারাদারদের সঙ্গে আরও দু’জন কয়েদী। সেই দু’জনই কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে, হাত-পা লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা। চোখ চেয়ে থাকলেও মনে হয় যেন ঘুমন্ত। বুঝতে অসুবিধে হয় না, তাদের এত মারধর করা হয়েছে যে এর মধ্যেই তারা প্রায় অর্ধমৃত। আশ্চর্য, হারীত মারধরও খায়নি, তার হাত-পা বাঁধেনি। সাধুর পোশাক পরেছিল বলেই কি তার প্রতি এতখানি খাতির?

তখন প্রায় শেষ বিকেল। শহর ছাড়িয়ে গাড়িটা ছুটলো গ্রামের দিকে। কিছুদূর যাবার পরই শুরু হলো ঝড় বৃষ্টি, ভাঙা রাস্তায় গাড়িটা লাফাচ্ছে অনবরত। ঢাকা গাড়ি হলেও ওপরটা ফুটো, জল আসছে সেখান থেকে। দু’জন সিপাহী গায়ে বর্ষাতি জড়িয়ে নিয়ে সিগারেট টানতে লাগলো। ক’দিন ধরে এমনিতেই কাশি হয়েছে হারীতের, বৃষ্টি ভিজলে আরও বাড়বে। কিন্তু সে দুশ্চিন্তার থেকেও সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধে তার মন বেশী আনচান করে উঠলো।এই কদিনের গারদবাসে সে ধূমপানের কোনো সুযোগ পায়নি।

সে হঠাৎ বলে উঠলো, জয়বাবা কালাচাঁদ! জয় শংকর! ও সেপাইজী, একটা কথা বলবো!

একজন কনস্টেবল খেঁকিয়ে উঠে বললো, এই চুপ যা!

হারীত তবু বললো, বোম ভোলানাথ! বোম শংকর! সেপাইজী, আমি সাধু মানুষ, আমায় ভুল করে ধরেছে। তবে হ্যাঁ, একটা কথা বলবো, সরকার বাহাদুর ভুল করে ধরলেও আমায় কোনো অযত্ন করে নাই! তোমাদের মঙ্গল হোক, বাল বাচ্চারা সুখে থাকুক!

আশীর্বাদের ভঙ্গিতে সে হাত তুললো সিপাহীদের দিকে। মনে মনে সে একটা পৈতের অভাব বোধ করলো। সাধুই যখন সেজেছে, তখন একটা পৈতে লাগালেই বা কী ক্ষতি হতো! আশীবাদের সময় পৈতেটা হাতে জড়িয়ে নিলে আরও ভাল দেখায়। দেশে থাকতে সে পণ্ডিতমশাইদের এই ভাবেই আশীর্বাদ করতে দেখেছে।

সিপাহীদের মধ্যে যে একটু বয়স্ক সে হাতজোড় করে হারীতের দিকে একটা নমস্কার জানিয়ে ফেললো। তার এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হারীত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, একটু সিগারেট টানতে দাও বাবা! তোমাদের পুণ্য হবে! ছেলে পুলিসে নোকরি পাবে, মেয়ের শাদী হবে ‘দারোগার সাথে।

বয়স্ক সিপাহীটি একটু হেসে নিজের অর্ধেক সিগারেটটাই এগিয়ে দিল হারীতের দিকে।

লোভীর মতন সেটা নিয়েই হারীত জোরে টান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে কাশিতে নুয়ে পড়লো। কয়েকদিনের অনভ্যাস। কষ্ট হবে খুব, তবু নেশার সুখটাও পাওয়া যাচ্ছে খানিকটা।

অন্য ছেলে দুটি একটু নড়ে চড়ে বসতেই তাদের হাত-পায়ের শিকলের ঝনঝন শব্দ হল। ছোকরা সিপাইটা রাইফেলের কুঁদো দিয়ে একজনের কাঁধে খোঁচা দিয়ে বলল, কেয়া হুয়া রে?

তীব্র ঝলকে একটা বিদ্যুৎ আর জোর শব্দে বজ্রপাত হল এই সময়ে।

হারীতের একবার মনে হল, ঐ ছেলে দুটির হাত-পা যদি শিকল বাঁধা না থাকত, তা হলে সেপাই দুটোকে কাবু করে এই গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করা যেত একবার। এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে গাড়ির গতি বেশী নয়, অন্ধকার মাঠের মধ্য দিয়ে ছুটে পালানোও শক্ত হত না। তার নিজের জীবন তো শেষ হতেই চলেছে, এই অল্পবয়েসী ছেলে দুটিকে কোনক্রমে বাঁচানো যায় না? কী এমন দোষ করতে পারে এরা!

কিন্তু ছেলেদুটির সমস্ত উদ্যমই যেন নষ্ট হয়ে গেছে। মার খেয়ে তারা কোঁকাচ্ছে, ফুঁসে উঠতে পারছে না। আহা রে, ছেলেদুটির মায়েদের নিশ্চয়ই বুক ফাটছে শোকে-দুঃখে।

এক সময় গাড়ি এসে থামলো বসিরহাট থানায়। অমরেশ দাশগুপ্ত সেখানে আগে থেকেই বসে আছেন, তাঁর হাতে চায়ের কাপ। গাড়ি থেকে তিনজন কয়েদীকে নামাবার পর তিনি একজন সাব ইনসপেকটরকে বললেন, অন্য ছেলে দুটিকে নিয়ে যেতে। তারপর হারীতকে আপ্যায়ন করে বললেন, আসুন হারী বাবু, আসন, চা খান! এই কৌন হয়, একঠো কুর্সি লাও!

সত্যিই অতবড় একজন পুলিস সাহেবের পাশে একটি চেয়ারে বসতে দেওয়া হল হারীতকে। গরম চা দেওয়া হল। দাশগুপ্ত সাহেব নিজে থেকেই বললেন, সিগারেট খাবেন নাকি, এই নিন!

তারপর স্মৃতি রোমন্থনের ভঙ্গিতে তিনি বললেন, আমারও বাড়ি ছিল খুলনায়, বুঝলেন। আপনি তো এক সময় মূর্তি-টুর্তি গড়তেন, তাই না? আমাদের দেশের বাড়িতে খুব বড় করে দুর্গাপুজো হত, প্রতিমা যে বানাতো, তার নাম সৃষ্টিধর, কী অপূর্ব হাত ছিল তার, মায়ের চোখ একেবারে জীবন্ত। খুব নাম ছিল আমাদের বাড়ির প্রতিমার। সেই সৃষ্টিধরের চেহারা ছিল অনেকটা আপনারই মতন। সে এখন কোথায় আছে কে জানে, হয়তো আপনারই মতন কোনো রিফিউজি ক্যাম্পে!

এসব কথায় না ভুলে হারীত লঘু সুরে জিজ্ঞেস করল, আমাকে এত দূরে নিয়া আসলেন ক্যানো সার? এইখানে বুঝি ফাঁসি হয়?

অমরেশ দাশগুপ্ত চমকে উঠে বললেন, ফাঁসি! আপনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে কেন? তাছাড়া, আমরা কি ফাঁসি দেবার মালিক? সে তো আদালতের ব্যাপার, আমাদের কাজ ইনভেস্টিগেট করা। হঠাৎ ফাঁসির কথা আপনার মনে এল কেন?

মুচকি হেসে হারীত বলল, গারদের মইধ্যে অইন্যরা বলতেছিল কি না যে এখানে আর একরকম ফাঁসি হয়। মাঠের মাঝখানে গাড়ি থিকা লামাইয়া দিয়া পিছন থিকা দুই একখান গুলি চালাইলেই, ব্যাস, কাম ফতে। জজ-ম্যাজিস্ট্রেটের ঝামেলাও নাই!

অমরেশ দাশগুপ্ত রেগে উঠে বললেন, বাজে কথা! এসব কথা কে বলেছে আপনাকে? কে কে বলেছে, তাদের নাম বলুন!

–আমি কি কাউর নাম জানি? অন্ধকারের মইধ্যে মুখও দেখি নাই! গাড়িতে আসতে আসতে দ্যাখলাম, এই দিকে বেশ সুন্দর সুন্দর ফাঁকা মাঠ আছে। আমি মরলে, কাশীপুরের নেতাজী কলোনিতে আমার এক পালিত পোলা আছে, তারে একটা খবর দিবেন, সার? সে ঠিক আমার পোলা না, নাতি, কিন্তু আমারে বাবা বইল্যা ডাকে। তার নাম নবা!

–আহ, হারীতবাবু, আপনি মিছিমিছি এসব বাজে কথা বলছেন। আপনার মরার কোশ্চেন উঠছে কোথায়? আপনাকে এ পর্যন্ত কেউ ট্রচার করেছে? আমি নিজে ইস্ট বেঙ্গলের লোক, আই হ্যাভ স্ট্রং সিমপ্যাথি টু দা রেফিউজিস্!

–আমি ইংরিজি বুঝি না, সার!

–বলছি যে, রেফিউজিদের প্রতি আমার পুরো সিমপ্যাথি, মানে, ইয়ে, সহানুভূতি আছে। তারা তো আমাদেরই জাত ভাই।

–রিফুজিদের উপর গভরনমেন্টের যা সহানুভূতি, তার চোটেই আমরা কোনোরকমে আধমড়া হয়ে আছি। আর বেশী সহানুভূতি দেখাইলে একেবারে পঞ্চভূতে বিলীন হইয়া যাব, সার। সহানুভূতির কথা শোনলেই আমার ভয় করে। এই সহানুভূতির ঠ্যালায় আমাগো কতগুলা ক্যাম্পে যে ঘুরতে হইছে তা তো জানেন না!

–হারীতবাবু, আপনি বড়ড সিনিক হয়ে গেছেন। গভর্নমেন্ট যথাসাধ্য করছে, কিন্তু এত রেফিউজি, তার ওপর দেখুন না, ইস্ট পাকিস্তান থেকে আবার লাখ লাখ আসতে শুরু করেছে!

–আমাকে এতদূরে কেন আনলেন, তাতো কইলেন না?

–আপনাকে একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে। তারপরেই আপনার ছুটি।

–কী ছোট কাজ?

–বসুন, চা খান ভাল করে। ইস, একেবারে ভিজে গেছেন দেখছি। আপনার বড় ছেলেটাকে কলকাতায় রেখে গেলেন কেন, হারীতবাবু? আপনাদের সঙ্গে সে দণ্ডকারণ্যে গেলে সংসারের অনেক সাহায্য করতে পারত। আই অ্যাম সরি টু সে, কলকাতার আশেপাশে যেসব রেফিউজি থেকে গেছে, তাদের ছেলেরা হয় বড় বেশী পলিটিকস নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে, অথবা ক্রিমিন্যাল হয়ে যাচ্ছে!

–আপনি ইস্টবেঙ্গলের মানুষ হইলেও আপনার ছেলেমেয়েরা ভাল আছে তো, সার?

একটু বাদেই হারীত দেখল, সেই শিকল-বাঁধা ছেলে দুটিকে ঠেলতে ঠেলতে এনে আবার তোলা হল গাড়িতে। অল্প আলোতেও দেখতে পাওয়া যায়, তাদের দু’জনেরই নাক দিয়ে গড়াচ্ছে রক্তের ধারা।

অমরেশ দাশগুপ্ত উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে কাকে যেন জিজ্ঞেস করলেন, ওরা আইডেন্টিফাই করেনি তো? জানতাম!

তারপর তিনি হারীতের হাত ধরে বললেন, এবার আপনি চলুন!

একজন লোক ছাতা মাথায় ধরলো অমরেশ দাশগুপ্তর, হারীত ভিজছে দেখে তিনি তাকে কাছে টেনে নিলেন। মানুষের কাছ থেকে এত ভাল ব্যবহার পেতে দেখলেই হারীতের ভয় করে। এই লোকটার মত লোব কী? ছেলের অপরাধে বাপকে মেরে ফেলবে? অমরেশ দাশগুপ্তর ভালোমানুষীর সুযোগ নিয়ে সে আর একটা সিগারেট চাইল। যা থাকে কপালে, আগে তো দামী সিগারেট খেয়ে নেওয়া যাক।

ওরা এসে দাঁড়াল একটা টিনের ঘরের সামনে। দরজাটা ভেজানো। সেটা খোলার আগে অমরেশ দাশগুপ্ত বলল, একটু মন শক্ত করুন, হারীতবাবু! আপনাকে এমন একটা দৃশ্য দেখতে হবে, হঠাৎ খুব আঘাত পাবেন। আই অ্যাম সরি, কিন্তু আমাদের চাকরিতে এরকম কতবার যে করতে হয়!

ঘরের মধ্যে খড়ের ওপর শোয়ানো একটি মনুষ্য মূর্তি। সাদা চাঁদর দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা। একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে, বিচ্ছিরি একটা ভ্যাপসা গন্ধ, কিচ কিচ শব্দ করে পালালো কয়েকটা ইঁদুর।

একজন কনস্টেবল টান মেরে সরিয়ে দিল চাঁদরটা। এত পোড় খাওয়া মানুষ হয়েও আঁতকে উঠল হারীত। সম্পূর্ণ নগ্ন যুবকটির বুক থেকে পেটের অংশটা একেবারে ছিন্নভিন্ন, মনে। হয় কেউ যেন কোদাল দিয়ে কুপিয়েছে। ইঁদুরেও ঠুকরে খেয়েছে সেই মাংস। তবে মুখটা প্রায় অবিকৃত, বয়েস হবে পঁচিশ-তিরিশের মধ্যে, মাথা ভর্তি চুল।

নাকে রুমাল চাপা দিয়ে অমরেশ দাশগুপ্ত বললেন, বাঁ পায়ের পাতাটা দোমরানো, খুঁড়িয়ে হাঁটতো, সেই জন্য ওর ডাক নাম ল্যাঙা। আর কোন বার্থ মার্ক দেখতে পাচ্ছেন? আমি তো বলেইছিলাম, হারীতবাবু, আমাদের কাছে ধরা দিলে প্রাণে বেঁচে যেতে পারত। এই খেলায় যারা একবার নামে, তারা শেষ পর্যন্ত কেউ বাঁচে না।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মনস্থির করে নিল হারীত। সেই মৃতদেহের ওপর আছড়ে পড়ে সে আর্তনাদ করতে লাগল, ওরে ভুল! ভুলুরে! আমার কপালে এই ছিল! তোর মায়রে আমি কী কমু! তোর মায় কত আশা কইরা আছে, ওরে ভুলুরে, তুই আছিলি আমাগো শেষ আশা-ভরসা।

একজন কনস্টেবল হারীতের কাঁধ ধরে টেনে সরিয়ে নিয়ে এল। অমরেশ অন্য একজনকে বললেন, নোট করে নিন, আর একটা ডাক নাম ভুলু! আহা, ভদ্দরলোককে একটু কাঁদতে দিন না, এতদিন পর ছেলের দেখা পেলেন!

হারীত প্রায় বুক আছড়ে কাঁদতে লাগল। বারবার সে একই কথা বলতে লাগল, তোর মায়রে কী কবো, ভুলু! তুই এত নিষ্ঠুর হইতে পারলি, মায়ের কথা একবার ভাবলি না, তুই ল্যাখাপড়া শিখা আমাগো উদ্ধার করবি, সেই ভরসায় আছিলাম! ভুলুরে একটু বাদে অমরেশ জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে এ ঠিকই আপনার ছেলে সুচরিত! কোনো আইডেনটিটি মার্ক, বার্থ মার্ক আছে কিনা মিলিয়ে দেখেছেন?

ইংরিজি না বুঝেও হারীত বলল, ঐ যে নাকের উপর তিল! সেই চক্ষু, সেই নাক, কে আমার ভুলুর এমন সর্বনাশ করল, বলেন সার? পুলিসে মারে নাই, তয় কে মারছে?

অমরেশ বললেন, সে সব কথা এখন থাক। বডি এখন পোস্ট মর্টেমে যাবে। আপনারা যদি পরে বডি দাহ করতে চান লর্ড সিনহা রোডে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন কাল-পরশু। হারীতবাবু, আপনাকে আর আটকে রাখতে চাই না। ইউ আর ফ্রি!)

একটা রিপোর্ট তৈরিই ছিল, হারীত তাতে টিপসই দিল। যদিও সে খানিকটা লেখাপড়া জানে, নাম সই করতে তো জানেই, কিন্তু কেউ তাকে সই দিতে বলল না, আগেই বুড়ো আঙুলের ছাপ নেবার জন্য নিয়ে এসেছিল স্ট্যাম্প প্যাড।

অমরেশ আর হারীতের সঙ্গে কোনো কথা না বলে বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে ডেড বডিটা শহরে পাঠাবার জন্য কিছু নির্দেশ দিলেন। হারীতকে তিনি হঠাৎ মুক্তি দিলেও এই রাতে, বৃষ্টির মধ্যে সে কী করে ফিরবে, তা চিন্তাও করলেন না।

হারীত থানার কম্পাউণ্ড থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল, কাছেই একটা বাজার, সেখানে কিছু দোকানপাট খোলা আছে। বাজারটা পেরিয়েও চলে গেল হারীত, একটু ফাঁকা জায়গায় এসে সে আপন মনে চেঁচিয়ে উঠলো, জয় বাবা, কালাচাঁদ! প্রভু, তুমি ধন্য!

হারীতের এখন নাচতে ইচ্ছে করছে। গুরু কালাচাঁদ ঠিক সবসময় তাকে রক্ষা করে চলেছেন। এবার তাকে মার খেতে হয়নি, গারদেও থাকতে হয়নি বেশীদিন। গুরু কালাচাঁদের দয়াতেই বেঁচে আছে তার ছেলে সুচরিত। ভুলুর নাকের ডগায় কস্মিন কালেও অতবড় তিল ছিল না। ঐ মৃত যুবকটি আর কোন মাবাবার স্নেহের দুলাল, মুখখানা দেখলে মনে হয় ভাল ঘরের ছেলে। লেখাপড়া জানে। কিন্তু সে কিছুতেই সুচরিত নয়। পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করতে পেরেছে হারীত। এখনও তার সারা মুখ চোখের জলে মাখামাখি।

৩১. আজ ছুটির দিন

আজ ছুটির দিন, অতীন ঠিক করেই ফেলেছে যে আজ সারাদিন সে বাড়ি থেকে বেরুবে না। এমন কি ঘর থেকে বেরুবারও কোনো দরকার নেই। কোথায় যাবে সে? এক একদিন বাইরের কোনো দৃশ্য না দেখলে নিজের ঘরটাই পৃথিবী হয়ে যায়। এক একটা দিন তো নিজেকেও দেখা দরকার। অন্য মানুষজনের মধ্যে থাকলে নিজের দিকে চোখই পড়ে না।

ঘুম ভাঙার পরেও অনেকক্ষণ সে বিছানা ছেড়ে উঠলো না। নিচে গেলে খবরের কাগজ আনা যায়, ইউনিভার্সিটির একটা দৈনিক পত্রিকা বিনা পয়সায় পায় অতীন। কিন্তু একদিন কাগজ না পড়লে কী আসবে যাবে? ডাক পিওন এসে যায় বেশ সকালে, এখানকার সব বিদেশী ছাত্রেরই ঘুম ভাঙার পর ছুটে গিয়ে চিঠির বাক্সটা খুলে দেখা একটা নেশা। রোজ কিছু না কিছু চিঠি থাকবেই, তার মধ্যে অধিকাংশই বিজ্ঞাপন, তার মধ্যে আবার নানারকম উপহারও থাকে, ব্লেড, টুথ পেস্ট, পুঁচকে পুঁচকে শিশিতে পারফিউম, একদিন সে একটা মাঝারি সাইজের বোতলের রান্নার তেলও পেয়েছিল। এই সপ্তাহেই অতীন দেশ থেকে মায়ের চিঠি পেয়েছে, আজ আর কোনো দরকারি চিঠি পাবার আশা নেই।

সাড়ে নটার সময় অতীন উঠলো। তার শরীরে কোনো পোশাক নেই। রাত্তিরে এই অবস্থাতেই সে একটা চাঁদর ঢাকা দিয়ে শোয়। ঘর থেকে বেরুতে না হলে শুধু শুধু গায়ে জামা কাপড় চাপাবারই বা কী মানে হয়? দুদিন ধরে বেশ পচা গরম পড়েছে। এ দেশে ঘর গরম করার ব্যবস্থা আছে, ঘর ঠাণ্ডা করার কোনো ব্যবস্থা নেই। এই সাহেবদের দেশেও যে এত গরম পড়ে তা অতীন আগে অনুভব করেনি। নিউ ইয়র্ক কিংবা লন্ডনেও সে গ্রীষ্মকালে গরম পেয়েছে, কিন্তু এতটা নয়, বস্টনের মতন বন্দর-শহরে যখন হঠাৎ হাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তখন রীতিমতন চিটচিটে গরম লাগে।

দ্রুত ব্রেক ফাস্ট সেরে নিয়েই অতীন পড়ার বই হাতে নিল। পাগলের মতন পড়াশুনো শুরু করেছে সে, ঠিক কলকাতায় পরীক্ষার আগেকার দিনগুলোর মতন। সে কলকাতার কথা, বন্ধুবান্ধবদের কথা একবারও ভাববে না, অলি কিংবা শর্মিলার কথা মনেও আনবে না। তাকে পড়াশুনো শেষ করে এদেশ থেকে পালাতে হবে। আমেরিকা ছাড়ার আগে সে বস্টন থেকে অন্তত দূরে চলে যাবে।

সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় অতীন হাতে একটা বই নিয়ে ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে। দৌড়োচ্ছে। বিছানায় শুয়ে কিংবা টেবিলে বসে তার পড়ায় ঠিক মন লাগে না। দৌড়ে দৌড়ে পড়বার একটা সুবিধে, তাতে পড়াও হয়, খানিকটা ব্যায়ামও হয়।

মাঝে মাঝে থামতে হয় অবশ্য। জুডির তৈরি এগ খেয়ে তার সর্দিটা অনেকটা কমেছে বটে কিন্তু ঘঙঘঙ কাশিটা একেবারে যায়নি। সে জন্য সে সিগারেট খাওয়া কমিয়েছে কিন্তু কোনো ওষুধ খাবে না প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে।

এক সময় তার সারা শরীর ঘামে জবজবে হয়ে গেল। ব্যায়াম হয়েছে ভালোই, পড়াশুনোও মন্দ চলছে না। এখন মিনিট দশেক রিসেস নেওয়া যায়। তেষ্টাও পেয়েছে খুব। ঘরে গোটা ছয়েক বীয়ারের ক্যান আছে, এ বাড়ির একটি পাঞ্জাবী ছেলে নিজের ঘর ছেড়ে চলে যাবার সময় তার একটা মিনি ফ্রিজ পনেরো ডলারে বিক্রি করে গেছে অতীনকে। অতীন বীয়ার নিল না, কফির জন্য জল চড়ালো। গতকালই সে মাইনে পেয়ে অনেক কিছু বাজার করে এনেছে, কিন্তু সে স্কচ বা বার্বনের মতন হার্ড ড্রিংকস কিছু কেনেনি, এক এক বীয়ার ক্যান যে এনেছে তাও ঘরে কোনো অতিথি এলে তাকে অফার করবার জন্য। অতীন এখন প্রতিটি ডাইম ও নিকেল জমাতে চায়। সিদ্ধার্থর কাছে এখনো তার কিছু ধার আছে। মাস গেলে তার বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাবদ মাইনের অর্ধেকের বেশী খরচ হয়ে যায়। হঠাৎ প্লেনে চেপে এ দেশ থেকে পালানোও তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে তো আসলে নিবাসিত, কবে তার মেয়াদ শেষ হবে?

ঘামে ভেজা শরীর নিয়েই অতীন ধপাস করে শুয়ে পড়লো বিছানায়। চাঁদরটা অনেকদিন কাঁচা হয়নি। শর্মিলা এসে দেখলে প্রথমেই একটানে চাঁদরটা খুলে ফেলে দিত। এই চাঁদরটাও শর্মিলারই কেনা। শর্মিলা এ ঘরে আর কোনোদিন আসবে না।

শর্মিলাকে নিশ্চয়ই কেউ অলির কথা বলে দিয়েছে। ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিল শর্মিলার? তাছাড়া আর তো কোনো ব্যাখ্যা নেই। অলির ওপর অবিচার করেছে অতীন, সে ব্যাপারটা তার নিজের মুখেই বলা উচিত ছিল শর্মিলাকে। তা সে পারেনি, সেই জন্য সে শাস্তি পেয়েছে। তার জীবনে এখন অলিও নেই, শর্মিলাও নেই। না, অলিকেও সে কিছুতেই মিথ্যে কথা বলতে পারবে না। যাক, তার আর কারুকেই দরকার নেই।

মাঝে মাঝে একটা সাঙ্ঘাতিক নৈরাশ্য যেন দৈত্যের মতন ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। কী হলো এই জীবনে? একটার পর একটা ভুল। তাহলে কি আর বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়? অথচ, আশ্চর্য, মৃত্যু তাকে ছোঁয় না। এই যে সেদিন তার সাইকেলের সঙ্গে একটা গাড়ির ধাক্কা লাগলো, তবু তার শরীরে একটা আঁচড়ও পড়লো না? এইসব দুর্ঘটনায় যখন-তখন লোক মারা। যায়।

গায়ের ঘামটা শুকোচ্ছে না, একটা জানলা খুলতে হবে, যদি হাওয়া আসে একটু। কফি বানিয়ে, কাপটা হাতে নিয়ে একদিকের পদার পাশে দাঁড়িয়ে অতীন জানলার একটা পাল্লা খুলে দিল। তার কোমর পর্যন্ত দেখা যাবে না। বাইরে একেবারে তলোয়ারের মতন রোদ। এখান থেকে একটি বাড়ির বাগান সোজাসুজি চোখে পড়ে। এই রোদের মধ্যেও বাগানে একটা ডেক-চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছে একটি যুবতী মেয়ে। গায়ের চামড়া টান করার কী সাঙ্ঘাতিক চেষ্টা। শুধু একটা জাঙ্গিয়া পরা, কিছু একটা ক্রিম মেখেছে সারা গায়ে, মেয়েটিকে দেখাচ্ছে কোনো অয়েল পেইন্টিং-এর মতন।

অতীন মেয়েটিকে দেখছে না, এমনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নৈরাশ্যের দৈত্যটা ছাড়ছে। না তাকে। খালি মনে হচ্ছে, কী হলো, এ জীবনে কী হলো? দেশের সমাজব্যবস্থা পাল্টাবার জন্য পারিবারিক বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে শুধুমাত্র একটা মানুষ খুন করে পালাতে হলো তাকে? না, না, মাঠের মধ্যে ঐ লোকটাকে অতীন মারেনি। যে-মৃত্যু সবসময় অতীনকে রক্ষা। করে, সেই মৃত্যুই অতীনের হাত দিয়ে ওকে শেষ করে দিয়েছে। নইলে, জীবনে কক্ষনো রিভলভার ছোঁড়েনি অতীন, তবু তার গুলি লোকটার গায়ে লাগলো! অবশ্য তারপরেও অতীন একটা লোহার ডাণ্ডা দিয়ে লোকটাকে পিটিয়েছিল, তখন সে ভেবেছিল, মানিকদা শেষ! একজন বিপ্লবী হয়ে সে তার প্রতিশোধ নেবে না? মানিকদা একটা চিঠি লিখলেন না, এতদিনের মধ্যে, এমন কি কৌশিক, তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু কৌশিক, সেও কি ভুলে গেছে অতীনকে?

বাগানের সেই যুবতীটি হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে বোঝা গেল, তার উধ্বাঙ্গেও কোনো বক্ষবন্ধনী নেই। সে চেয়ারটাকে টেনে নিয়ে গেল একটা ন্যাসপাতি গাছের নিচে। আশপাশের বাড়ি থেকে কেউ তাকে দেখছে কি না, তাতে তার কোনো লুক্ষেপই নেই। এরা শরীর দেখাতে ভালোবাসে। অতীন এবার লক্ষ না করে পারলো না যে মেয়েটির সারা শরীরের তুলনায় সুগোল স্তনদুটি বেশী ফর্সা, ব্রেসিয়ারের পরিষ্কার দাগ।

সঙ্গে সঙ্গে তার দরজায় খট খট শব্দ হলো। প্রচণ্ড অপরাধবোধে কেঁপে উঠলো অতীন। যেন সে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি পর্দা টেনে দিল সে। কিন্তু নিজের এই অবস্থায় দরজাই বা খোলে কী করে?

জাঙ্গিয়াটা পায়ে গলাতে গলাতে সে জিজ্ঞেস করলো, হু ইজ ইট?

বাইরে থেকে শোনা গেল, আমি সোমেন। আপনার টেলিফোন।

–একটু ধরতে বলুন, প্লীজ। আমি এক্ষুনি আসছি!

এই সময় কে তাকে টেলিফোন করবে? পয়সা সস্তা হয় বলে সিদ্ধার্থ করে রাত দশটার। পর। কাল সন্ধেবেলা জুড়ি একবার ফোন করেছিল, অতীন দু’দিন সন্ধেবেলা ল্যাবে নিজের কাজ করতে যায়নি, সেইজন্য সে অতীনের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছিল। জুডি একদিন তাকে রান্না করে খাইয়েছে। অতীনের উচিত তাকেও একদিন ডেকে খাওয়ানো। এদেশে সবসময় একটা অদৃশ্য বিনিময় প্রথা চলে।

প্যান্টের মধ্যে একটা শার্ট গলিয়ে নিয়ে বেল্টটা বাঁধতে বাঁধতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। অতীন। লিভিংরুমে একা মুখ চুন করে বসে আছে আবিদ হোসেন। কদিন ধরেই ওর মন খুব খারাপ। দেশ থেকে কোনো চিঠি পাচ্ছে না, টেলিফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

ফোনটা তুলে, ওদিকের কণ্ঠস্বর শুনে অতীনের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা জলের স্রোত নেমে এলো। শর্মিলা? সত্যি শর্মিলা?

শর্মিলার গলায় কোনো আবেগ নেই, সে শান্তভাবে বললো, সরি, বাবলু, তোমায় বিরক্ত করলুম। তুমি কি ব্যস্ত ছিলে? ২৪৮

অতীনও নিস্পৃহ গলায় বললো, সেরকম কিছু না। শর্মিলা বললো, আমি একটা চাবি খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কি আমায় একটু হেল্প করতে পারবে?

অতীন বললো, চাবি? কিসের চাবি?

–আমি তো প্রায়ই চাবি হারিয়ে ফেলি, এই চাবিটা অনেকদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছি না, মানে, আমার কলেজের ফাইল ক্যাবিনেটের চাবি, অনেক দরকারি কাগজপত্র আছে, খুলতে পারছি না। বলে এত অসুবিধে হচ্ছে–

–সেজন্য আমি কী করতে পারি?

–চাবিটা কি বাই এনি চান্স তোমার ঘরে কখনো ফেলে এসেছি? তুমি কি ভ্যাকুয়াম ক্লিনিং করার সময় কোনো চাবি পেয়েছো?

শর্মিলার সঙ্গে শেষ দেখা হবার পর অতীন একদিনও ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালায়নি। কিন্তু ফ্লোরে কোনো চাবি পড়ে থাকলে কি সে দেখতে পেত না?

–না, কোনো চাবি পাইনি!

–তোমার ওয়ার্ডরোবে আমি মাঝে মাঝে আমার হ্যান্ডব্যাগটা ঝুলিয়ে ১.খতুম। ওখানে যদি পড়ে গিয়ে থাকে, যদি একটু খুঁজে দ্যাখো …

–ঠিক আছে, দেখবো খুঁজে…

–বাবলু, কাল ক্যাবিনেটটা খোল৷ খুবই দরকার, আমার প্রফেসার একটা কাজের ভার দিয়েছিলেন, সেটা যদি কাল সাবমিট না করি…আমি ফোনটা ধরে আছি, তুমি একটু ওয়ার্ডরোবটা খুঁজে দেখে এসে বলবে প্লীজ?

–আচ্ছা ধরো, দেখে আসছি!

সে রিসিভারটা নামিয়ে রাখতেই আবিদ হোসেন গোমড়া মুখে বললো, আমি অপারেটরকে একটা কল বুক করেছি, এনি মোমেন্ট এসে যেতে পারে।

অতীন বললো, কানেকশন পেয়ে গেলে ওরা ইন্টারসেপট করবে, তখন আপনি লাইন নিয়ে নেবেন।

দৌড়ে সে উঠে গেল ওপরে। তার মুখটা তেতো লাগছে। শর্মিলা তার সঙ্গে শুধু একটা চাবি নিয়ে কথা বলে গেল? যেন একটা চাবি খুঁজে পাওয়া ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে তার অতীনের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহই নেই। তার গলায় অতিরিক্ত ভদ্রতার কৃত্রিম সুর।

ওয়ার্ডরোবে কোনো চাবি পড়ে নেই জেনেও অতীন ভালো করেই খুঁজে দেখলো। শর্মিলা এখানে তার হ্যান্ডব্যাগটা ঝুলিয়ে রাখতো ঠিকই। একদিন বৃষ্টি ভিজে এসে শর্মিলা তার শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ সব খুলে রুম হিটারে শুকোতে দিয়ে অতীনের প্যান্ট-শার্ট পরে নিয়েছিল।

সে সব যেন গত জন্মের কথা।

ফিরে এসে অতীন এবার বেশ কঠিন গলাতেই বললো, আমার ঘরে তোমার চাবি কিংবা

অন্য কোনো কিছুই পড়ে নেই!

শর্মিলা বললো, এক্সট্রিমলি সরি টু বদার ইউ, বাবলু! কিছুতেই চাবিটা পাচ্ছি না, আই যাস্ট টুক আ চান্স! থ্যাঙ্কস অল দা সেইম! তোমার কাশি হয়েছে?

–কে বললো, না তো!

–দু একবার কাশছিলে। শরীরের যত্ন নিও।

–থ্যাঙ্কস ফর দা অ্যাডভাইস!

অতীন নিজেই রেখে দিল ফোনটা। তারপর আবিদ হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললো, এখনও লাইন পাননি? বসে থাকুন, আশা ছাড়বেন না। গুড লাক!

অতীন ঠিক করলো, নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে আবার পড়তে পড়তে সে জানলাটা খোলাই রাখবে। পাশের বাড়ির সবুজ বাগানে একজন প্রায় নগ্ন শ্বেতাঙ্গিনীকে দেখতে দোষ কী? দেখলে তো ভালোই লাগে। জুড়িকেও সে দু’একদিনের মধ্যেই নেমন্তন্ন করে তার ঘরে এনে বেঁধে খাওয়াবে। এতে দোষ কী আছে? জুড়ি মেয়েটি মোটেই-সাধারণ অ্যামেরিকান মেয়েদের মত নয়!

তবু ওপরে ওঠবার আগে সে সোমেনের দরজার কাছে দাঁড়ালো। এদেশে থাকতে থাকতে একটা ধন্যবাদ-কালচারে অভ্যস্ত হতেই হয়। থ্যাঙ্কস আর থ্যাঙ্ক ইউ সবসময় ঝুলিয়ে রাখতে হয় ঠোঁটে। একটি অত্যন্ত বিষাক্ত টেলিফোন-ডাক হলেও সোমেন ওপরে গিয়ে অতীনকে এই টেলিফোনের খবর দিয়ে এসেছে, এ জন্য তাকে ধন্যবাদ না জানানো অত্যন্ত অভদ্রতা।

দরজাটা ভেজানেনা, ভেতরে গীটার বাজিয়ে গান চলছে। মনে হচ্ছে, সোমেন ছাড়াও ঘরে আরও কেউ আছে। সোমেনের এক অ্যামেরিকান বান্ধবী আসে মাঝে মাঝে। অতীন দরজায় মৃদু টোকা দিল।

সোমেনের বদলে অর্ধেক দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে একটি সুদর্শন যুবক বললো, ইয়েস? কাম অন ইন!

অতীন বললো, আমি সোমেনের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই!

অপরিচিত যুবকটি সরে গেল, সোমেন দরজার কাছে আসতেই অতীন বললো, আই যাস্ট ওয়ান্টেড টু থ্যাঙ্ক ইউ!

সোমেন অতীনের হাত ধরে টেনে বললো, আরে মশাই, ভেতরে আসুন না! এখানে আড্ডা হচ্ছে। আমার এক বন্ধু সদ্য লন্ডন থেকে এসেছে।

অতীনের আপত্তি সত্ত্বেও সোমেন ছাড়লো না, অতীনকে ভেতরে নিয়ে গেল। ঘরটি সিগারেটের ধোঁয়ায় ভর্তি। কিন্তু গন্ধটা সিগারেটের তামাকের নয়, অন্য কিছুর। সেই অপরিচিত যুবকটি ছাড়াও সোমেনের বান্ধবী লিন্ডা রয়েছে, তার ঢুলু ঢুলু চোখ দেখেই বোঝা যায়, সে গাঁজা টেনেছে। এর আগে দু’একদিন কথা বলেই অতীন বুঝেছে, এই লিন্ডা নামের মেয়েটি একটি প্রাক্তনী হিপিনী এবং এখনও ভারত-উন্মাদিনী। এর কাছে ভারতবর্ষ মানে। গাঁজা-চরস-সাধু-সন্ন্যাসী-অতীন্দ্রিয় দর্শন এবং মোক্ষ সাধনা। অর্থাৎ দু’ হাজার বছর আগেকার ভারতবর্ষ।

সোমেন বললো, লিন্ডাকে তো তুমি চেনোই, আর এ আমার বাল্যবন্ধু, লন্ডন থেকে পরশুই। এ দেশে পা দিয়ে দেশটাকে ধন্য করেছে, এর নাম বাপ্পা, সরি, বাপ্পা ওর ডাক নাম, ভালো নাম জ্যোতি রায়, ও অবশ্য নিজেকে বলে জিওটি রে! খুব সাহেব তো! আর এ আমার নেবার। সরি, হাউসহোল্ড মেট অ্যান্ড গ্রেট স্কলার অতীন মজুমদার! আ রিয়াল নখশ্যালাইট লীডার ফ্রম বেঙ্গল!

অতীন বুঝতে পারলো, সোমেনও আজ তার বান্ধবীর পাল্লায় পড়ে গাঁজা সেবন করেছে। অন্য সময় সে অতীনকে আপনি বলে, এখন বললো তুমি। নকশালাইট লীডার বললো কেন? সোমেনের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কোনোদিনই আলোচনা হয়নি। সবাই সবকিছু জেনে যায় কী করে?

লিন্ডা বললো, কাট ইঁট আউট! লেটস হিয়ার দা সঙ!

স্প্যানীশ গীটারটা তুলে নিয়ে বাজাতে বাজাতে সোমেন ধরলো একটা খাঁটি বাংলা গান : রঙ্গিলা ভাসুর গো, তুমি কেন দাওর হইলা না! ও রঙ্গিলা ভাসুর গো…

লিন্ডা সেই গানে তাল দিচ্ছে মহা উৎসাহে এবং গলা মেলাবার চেষ্টা করছে। অতীনের একটা ব্যাপার ভালো লাগলো, লিন্ডার বাংলা উচ্চারণ খুব খারাপ নয়, সোমেনের কাছ থেকে সে অনেকটা শিখেছে। সোমেনের নবাগত বিলিতি বন্ধু অবশ্য এই গান খুব একটা উপভোগ করছে বলে মনে হয় না!

সোমেনের পরের গান : ডাইল রান্ধো রে কাঁচা মরিচ দিয়া, গুরুর কাছে লওগা মন্তর বিরলে বসিয়া, ও মন ডাইল রান্ধো রে!

গানের মাঝে মাঝে সোমেন লিন্ডাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে অর্থ। হঠাৎ সে জ্যোতি রায়ের দিকে ফিরে বললো, আমার এই সাহেব বন্ধুটাও কিন্তু অনেক বাংলা কথার মানে বোঝে না! কী রে ব্যাটা, তুই কাঁচা মরিচ কারে কয় বোঝোস?

জ্যোতি রায় চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, আই আন্ডারস্ট্যান্ড ব্রডলি দা মিনিং! বাট হোয়াট ইজ কাঁচা মরিচ!

–গ্রীন চিলি! কাঁচা লঙ্কা! শালা, তুই-ও তো বাঙালের বাচ্চা, তুই কাঁচা মরিচ চিনিস না? কাঁচা মরিচ ছাড়া ডাল রান্নাই হয় না।

জ্যোতি রায় বললো, মাই ফাদার ওয়াজ আ বাঙাল অলরাইট, বাট আই হার্ডলি রিমেমবার ভিজিটিং দ্যাট পার্ট অফ আওয়ার কান্ট্রি!

লিন্ডা বললো, লেটুস হীয়ার অ্যানাদার সঙ! ডাইল র‍্যান্ডে রে, কাসা মরিচ ডিয়া…লাভলি, লাভলি।

তারপরেই সে অতীনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, হোয়াট হ্যাঁপনড় টু দ্যাট গাই? হি সিম টু বী বোরড় টু ডেথ!

অতীন বস্তুত গান শুনছিল না, এ ঘরের কোনো ব্যাপারে মনোযোগও দিতে পারেনি, সে পালাবার সুযোগ খুঁজছিল। তার কিছুই ভালো লাগছে না।

সে সচেতন হয়ে, মুখে কষ্ট করে হাসি ফুটিয়ে বললো, না, সোমেনবাবু, গান করুন, গান করুন, গানের মাঝখানে এত কথা ভালো লাগছে না।

সোমেন বললো, তুমি এত গোমড়া মুখ করে আছো কেন ভাই? কী হয়েছে? তুমি এখানে বসে আছে। অথচ তুমি যেন এখানে নেই। তাহলে শোনো। এবারে তোমাকে নিয়ে একটা গান গাইছি!

গীটারে খানিকটা টুং টাং করে সে গাইলো, তুই লালপাহাড়ীর দেশে যা, রাঙামাটির দেশে যা, হেথায় তুরে মানাইছে না গো! ইক্কেবারে মানাইছে না গো!

গাইতে গাইতে এগিয়ে এসে সে অতীনের থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে বললো, হেথায় তুরে মানাইছে না গো! ইক্কেবারে মানাইছে না গো! তুই লালপাহাড়ীর দেশে যা…

সোমেনের এই গানটি গেথে গেল অতীনের মাথায়। খানিক পরে ওপরে নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে সে ঝরঝর করে কাঁদলো, কাঁদতে কাঁদতে নিজেই ঐ গানটা গাইতে লাগলো। বারবার!

সোমেনের ঘরে লিন্ডার সনির্বন্ধ অনুরোধেও অতীন গাঁজাভরা সিগারেটে টান দিতে রাজি হয়নি, কিন্তু সোমেনের পেড়াপীড়িতে কিছু খাবার খেতে হয়েছে। সোমেনের বন্ধু জ্যোতি রায় খুব সাহেব হলেও মাছ খেতে ভালোবাসে। বিলেতে ভালো মাছ পাওয়া যায় না, অ্যামেরিকায়। মাছ অঢেল। সোমেন রান্না করেছে এ দেশের ইলিশ অর্থাৎ শ্যাড মাছ! সে মাছ অতীনের মুখে রোচেনি, সে দু এক টুকরো ভেঙে খেলেও বাকিটা ফেলে দিয়েছে গোপনে। ইলিশ শুনলেই তার বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা ইলিশ মাছ ভালোবাসেন খুব। এক একদিন রাত্তিরবেলা ইলিশ মাছ নিয়ে আসতেন অনেক উৎসাহ করে, মা রাগারাগি করতেন, অতীনও দু একবার। খেতে চায়নি, বাবা দুঃখ পেয়েছেন। তখন কিছু বুঝতে পারেনি, কিন্তু এখন সে-সবের উপলব্ধি হয়। শেষের দিকে বাবা পয়সার অভাবে তেলাপিয়া মাছ কিনতেন।

একটা স্মৃতি থেকে অন্য স্মৃতি। এ বাড়িতে একটা বারোয়ারি রেফ্রিজারেটর থাকা সত্ত্বেও অতীন নিজের ঘরের জন্য আর একটা শস্তার ফ্রিজ কিনেছে। কিন্তু তাদের কলকাতার বাড়িতে আজও ফ্রিজ নেই। কতবার সে ভেবেছে, একটা ফ্রিজ কেনার জন্য মাকে টাকা পাঠাবে। কলকাতায় একটা ফ্রিজের দাম কত, চার পাঁচশো ডলার হবে নিশ্চয়ই? অত টাকা অতীন কোথায় পাবে? সে নিজেই এখনও কুলিয়ে উঠতে পারছে না। দেশে সবাই মনে করে, অ্যামেরিকায় যা-ই যায়, তারাই লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করে!…দাদা বলেছিল, চাকরি করে। সে মাকে একটা অল ওয়েভ রেডিও কিনে দেবে। দাদা দিতে পারেনি, অতীনও তো এর বাবা-মাকে কিছুই দেয়নি! ফুলদি বরং হাউস সার্জন থাকার সময় নিজের সামান্য উপার্জনে বাড়ির জন্য একটা রেডিও কিনেছিল। যেমন করেই হোক, অতীন সামনের মাসেই মায়ের নামে অন্তত এক শো ডলার পাঠাবে!

সোমেনের বন্ধু জ্যোতি রায় আর একটা কথা মনে করিয়ে দিল! জ্যোতি রায় মাঝে মাঝেই ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছিল অতীনের দিকে, এক সময় সে জিজ্ঞেস করলো, আপনাকে আগে। কোথায় দেখেছি বলুন তো?

এইসব কথা শুনলেই অতীন ভয় পায়। তবে কি এই ছেলেটি জলপাইগুড়ি কিংবা উত্তরবাংলা থেকে এসেছে? রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল? পুরোনো প্রসঙ্গ খুঁচিয়ে তুলবে?

অতীন আড়ষ্ট গলায় বলেছিল, আমি লন্ডনে কিছুদিন ছিলাম বটে, বাট আই ডোন্ট থিংক উই মেট বিফোর!

জ্যোতি রায় মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছি, নো, নট ইন লানড়ান! তারও আগে। আমি মানুষের মুখ মনে রাখতে পারি, আপনাকে চেনা লাগছে, কিন্তু কোথায় দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি

অতীন বলেছিল, হয়তো আমার মতন চেহারার অন্য কারুর সঙ্গে আপনি গুলিয়ে ফেলছেন। আপনাকে আমি আগে দেখিনি।

অতীন সরে গিয়েছিল জ্যোতি রায়ের পাশ থেকে। এ কথা ঠিক, জ্যোতি রায়কে সে আগে কখনো দেখেনি। বেশ লম্বা চওড়া চেহারা জ্যোতি রায়ের, অতীনের থেকে দু’চার বছরের বড় হবে বয়েসে, এর মধ্যেই তার মাথায় সামান্য টাক পড়েছে। চোখের দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা আছে।

একটু পরে জ্যোতি রায় আবার তার কাছে এসে কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিল, লেট মি ট্রাই এগেইন। আপনি কখনো বিহারের একটা শহরে, দেওঘর অর বৈদনাথধাম, এরকম একটা জায়গায় থাকতেন? আপনার কোনো আত্মীয়ের গানের ইকুল ছিল?

সঙ্গে সঙ্গে অতীনের সব মনে পড়ে গেল। মাথায় টাকপড়া, এই নিখুঁত সাহেবী পোশাক পরা সুপুরুষ ব্যক্তিটিকে ভেদ করে সে দেখতে পেল একটি জেদী কিশোরকে। দেওঘর! বাপ্পা! বুলা মাসির ছেলে! একবার বুলা মাসিদের সঙ্গে ত্রিকূট পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল, সেবার কি বাপ্পা ছিল সঙ্গে? সেবারের কথা মনে না থাকলেও আর একবার পুজোর সময় দেওঘরে গিয়ে এই বাপ্পার সঙ্গে খুব ভাব হয়েছিল, সে প্রায়ই খেলতে আসতো তাদের সঙ্গে, সেই বয়েসেই সে ইংরিজি গান গাইতো। অতীনের চেয়ে তার দাদার সঙ্গেই বাপ্পার বন্ধুত্ব হয়েছিল বেশী।

অতীনের উদ্ভাসিত মুখ দেখে জ্যোতি রায় বলেছিল, ইউ সি, আই ডোন্ট ফরগেট ফেসেস! অনেকদিন আগেকার কথা, তাই না? তুমি খুব পোয়েট্রি রিসাইট করতে। তোমার কথা আমার পারটিকুলারলি মনে আছে, কারণ, একদিন হঠাৎ তোমার সঙ্গে আমার মারামারি হয়েছিল, আমি ঘুষি মেরে তোমার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলাম।

–আমার নয়, আমার দাদার!

–তোমার দাদাকে মেরেছিলাম? অফ কোর্স, তোমরা দু ভাই ছিলে, ঠিক! তোমাদের দু’ ভাইয়ের মুখের খুব মিল আছে তো! দোষটা আমারই ছিল। আই ওয়াজ ভেরি ইমপালসিভ দোজ ডেইজ, পরে আমি রিগ্রেট করেছি। তোমার দাদা এখন কোথায় আছেন, দেশে? তাকে চিঠি লেখার সময় তুমি জানিয়ে দিও প্লীজ যে, সেই জ্যোতি রায় এতদিন পরেও সিনসিয়ারলি তার কাছে ক্ষমা চাইছে!

নিজের ঘরে ফিরে অতীনের বারবার এইসব কথাই মনে পড়তে লাগলো। দেওঘরের সেই দিনগুলো কী অপূর্ব সুন্দর ছিল, হ্যাঁ, এই বাপ্পার সঙ্গে তার দাদার একবার মারামারি হয়েছিল বটে, দাদা বিশেষ মারামারি করতে পারতো না, বাপ্পাটাই ছিল গোঁয়ার, কিন্তু সে এমন কিছু না, পরে বাপ্পার সঙ্গে দাদার আবার ভাবও হয়ে গিয়েছিল, যতদূর মনে পড়ে। দাদার সঙ্গে তার মুখের মিল আছে, একথা তো বহুদিন কেউ বলেনি!

আজ সারাদিন পড়াশুনো করার কথা ছিল, অন্য কোনো কথা একবারও ভাববে না ঠিক করেছিল অতীন, কিন্তু এখন পড়াশুনো মাথায় উঠে গেল, যত রাজ্যের পুরোনো কথাই মনে পড়ছে! চোখের জল সে সামলাতে পারছে না কিছুতেই। হেথায় তুমায় মানাইছে না গো! ইক্কেবারে মানাইছে না গো!

এক সময় মুখ তুলতেই সে দেখতে পেল তার টেবিলের এক কোণে একটা চাবি পড়ে আছে। সে দারুণ চমকে উঠলো। এ কি ব্যাপার? ম্যাজিক নাকি? এখানেই পড়ে আছে চাবিটা, অথচ সে গত দু’ সপ্তাহের মধ্যে একবারও দেখতে পায়নি? মাঝখানে কেউ এসে রেখে গেছে? না, তা হতেই পারে না। তার ঘরে অন্য কে ঢুকবে? দরজার বাইরে পাপোসের তলায় তার ঘরে ঢোকার আর একটা চাবি আছে বটে, শর্মিলা কখনো সখনো একা এসে পড়লে সেটা ব্যবহার করতো। কিন্তু শর্মিলা এই কদিনের মধ্যে তার ঘরে আসবে, সে প্রশ্নই ওঠে না। চাবিটা আগে থেকেই এখানে পড়ে আছে, অতীন খেয়াল করেনি, হয়তো কোনো বইতে চাপা পড়ে গিয়েছিল, এ ছাড়া আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে?

চাবিটা অতীন হাতে তুলে নিয়ে চুপ করে বসে রইলো। ছোট একটা চাবি, টেবিল ক্লকে দম দেবার চাবির মতন, হ্যাঁ, ফাইল ক্যাবিনেটের চাবিও এই রকমই হয়। শর্মিলা এই চাবিটাই খুঁজছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দরকারি চাবি, তবু সেটার কথা এতদিন পর মনে পড়লো শর্মিলার?

এখন এটা নিয়ে কী করা যায়? শর্মিলাকে ফোন করে বলবে, এসে নিয়ে যেতে? না, তা হয় না। শর্মিলাকে কোনো ছুতোতেই সে আর তার বাড়িতে আসতে বলতে পারে না। শর্মিলা আজ টেলিফোনে যে-সুরে কথা বললো, তাতেই বোঝা যায়, সে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। অতীন এতদিন চাবিটা দেখতে পায়নি, আজও টেলিফোন করার সময় খুঁজতে এসে পায়নি, এখন হঠাৎ পেয়ে গেল, এটা কি শর্মিলা বিশ্বাস করবে?

সবচেয়ে সহজ উপায়, চাবিটা একটা খামে ভরে পোস্ট করে দেওয়া। এখানে অনেক লোক হোটেলের চাবি ভুল করে পকেটে নিয়ে চলে যায়, পরে কোনো একটা জায়গা থেকে পোস্টে সেই চাবি হোটেলে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

পোস্ট করলে শর্মিলা চাবিটা পশুর আগে পাবে না। শর্মিলা বলছিল, কাল সকালে চাবিটা ওর বিশেষ দরকার। এইসব চাবি ডুপ্লিকেট করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। অতীনের উচিত চাবিটা পৌঁছে দিয়ে আসা। শর্মিলার সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই, তবে পুরোনো সম্পর্কের খাতিরে কি সে এইটুকু উপকার করতে পারে না!

বাড়ি থেকে বেরুবে না ভেবেছিল, তাও বেরুতে হলো। সে অবশ্য দাড়ি কামালো না, সাইকেলটাও নিল না। সন্ধে হতে এখনও কিছুটা দেরি আছে, সে হাঁটবে। শর্মিলার সঙ্গে দেখা করেও চাবিটা পৌঁছে দেবার একটা উপায় ভেবে ফেলেছে সে। শর্মিলার বাড়ির লেটার বক্সে সে চাবিটা ফেলে দিয়ে আসবে গোপনে। চাবিটা সেইজন্য সে একটা সাদা খামে ভরে এনেছে। কাল সকালে বেরুবার আগে শর্মিলা লেটার বক্স দেখবেই।

একটু ঘুর পথে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলো অতীন। আকাশে আবার মেঘ জমেছে, যাক, গরমটা এবার কাটবে। আজ রাত্তিরেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে পারে। সর্দিটা জমে শুকনো হয়ে গেছে তার বুকে, আর একবার বৃষ্টি না ভিজলে গলবে না।

পার্ল স্ট্রিটে শর্মিলাদের বাড়ির কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতে অন্ধকার হয়ে এলো। কিন্তু একটু দূরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো অতীন। ঐ বাড়ির পর্চে দাঁড়িয়ে তিনটি সাদা ছেলেমেয়ে গল্প করছে। ওদের সামনে দিয়ে গিয়ে লেটার বক্সে কি কিছু ফেলা যায়? ফেললেও ওরা কিছুই বলবে না, অতীনের দিকে ফিরেও তাকাবে না, তবু, ওদের মধ্যে কেউ যদি অতীনকে চিনে। ফেলে? অতীন নিজেই যে চাবিটা ফেরত দিতে এসেছে, সে কথা সে কারুকে জানাতে চায় না।

একটা স্ট্রিট লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে পর পর দুটো সিগারেট পোড়ালো অতীন। সিগারেট টানলেই কাশি আসছে, তবু একা একা কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? ছেলেমেয়েগুলো যে যাচ্ছে না! এই চাবিটা দেবার পরেই শর্মিলার সঙ্গে সব যোগাযোগের ইতি। বেরুবার আগে অতীন খুব ভালো করে নিজের ঘরটা দেখে এসেছে, শর্মিলার আর কোনো কিছুই সেখানে পড়ে নেই। চাবিটা টেবিলের ওপরেই ছিল, এটা যেন প্রায় একটা মিরাল।

রাস্তায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে দারুণ বোকা বোকা লাগে। কাঁধটা উঁচু করে রয়েছে। দুপুরবেলা সোমেনের ঘরে অত হৈ হল্লা হচ্ছিল কিন্তু অতীন তার সঙ্গে সুর মেলাতে পারেনি। সে আমেরিকান ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও প্রাণখুলে মিশতে পারে না, বাঙালী কিংবা ভারতীয়দের সঙ্গেও হৃদ্যতা হয় না। সব জায়গাতেই সে আড়ষ্ট, এমন কি এই যে একা একা দাঁড়িয়ে থাকা, এখানেও সে স্বাভাবিক নয়। হেথায় তুমায় মানাইছে না গো! ইক্কেবারে মানাইছে না গো!

ছেলেমেয়ে তিনটি এবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে অতীনের সামনে দিয়েই চলে গেল। ভাগ্যিস অতীন যায়নি, ওদের মধ্যে একটি মেয়ে শর্মিলাদের পাশের ঘরেই থাকে। শর্মিলার বোন সুমির মুখোমুখিও পড়তে চায় না অতীন। সুমিকে সে ভয় পায়।

আরও দু মিনিট অপেক্ষা করার পর অতীন এগোলো। খামটা পকেট থেকে বার করে হাতে নিয়েছে। পরপর অনেকগুলো চিঠির বাক্স, এর মধ্যে কোনটা শর্মিলাদের? এই জায়গাটায় আলো জ্বালা নেই। সুইচটা কোথায় কে জানে! আধো-অন্ধকারের মধ্যেই অতীন ঝুঁকে ঝুঁকে বাক্সর নামগুলো পড়তে লাগলো।

ভেতরের দরজাটা ঠেলে হঠাৎ বেরিয়ে এলো শর্মিলা, প্রথমে সে অতীনকে দেখতে পায়নি, দ্রুত নেমে যেতে যাচ্ছিল, অতীন সোজা হয়ে দাঁড়াতেই সে মুখ ফেরালো। বলে উঠলো বাবলু?

অতীন খামসুদ্ধ হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে নিরাসক্ত গলায় বললো, তোমার চাবি!

যেন চাবি শব্দটা সে জীবনেই শোনেনি, এইরকম প্রগাঢ় বিস্ময়ে শর্মিলা বললো, চাবি? কিসের চাবি?

অতীন ভুরু কুঁচকে বললো, তোমার চাবি, হারিয়ে ফেলেছিলে! সেটা কি পেয়ে গেছো নাকি?

সঙ্গে সঙ্গে আবার বদলে গেল শর্মিলা, হাহাকারের মতন তার গলা ভেঙে গেল, সে বললো, না, পাইনি, আমার চাবি হারিয়ে গেছে!

অতীন বললো, এই নাও, আমার ঘরেই পড়ে ছিল, আমি আগে দেখতে। পাইনি।

অতীনের চোখের দিকে না শুকিয়ে শর্মিলা খামটা নিল। নিজের হাতব্যাগে সেটা ভরতে গিয়েও ফেলে দিল মাটিতে। তখুনি তুলে নেবার বদলে সে ঘুরে গিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে হু-হুঁ করে কেঁদে ফেলে বললো, তুমি আমায় ক্ষমা করো বাবলু, যদি পারো, যদি পারো, আমি আর কোনোদিন তোমাকে মুখ দেখাতে পারবো না!

শর্মিলার কান্নাটা অতীনের ন্যাকামি মনে হলো। মানুষকে অপমান করে, দিনের পর দিন অবহেলা দেখিয়ে তারপর একবার ক্ষমা চাইলেই হলো! শর্মিলা তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না সেটা সোজাসুজি বলে দিলেই পারতো, এত নাটক করার কী দরকার ছিল?

অতীন কড়া গলায় বললো, ক্ষমা টমার কী আছে! আমি তোমার চাবিটা আগে খুঁজে পাইনি, আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট!

শর্মিলা দেয়ালে মাথা রেখে বললো, বাবলু, তুমি আমাকে ভুলে যেও! আমি তোমার কাছে। মিথ্যে কথা বলেছি। আমি খারাপ, খুব খারাপ, আমি তোমার যোগ্য নই। আমি অনেক কথা ভুলে যাই, লোকে বিশ্বাস করে না, আমি ইচ্ছে করে তোমায় মিথ্যে কথা বলিনি বাবলু, সত্যি আমার মনে ছিল না…।

–মিথ্যে কথা? কী মিথ্যে কথা তুমি বলেছিলে আমাকে?

–একটা সাংঘাতিক মিথ্যে, মানে, এমন একটা অন্যায় আমি গোপন করে গেছি, যার কোনো ক্ষমা নেই!

–অন্যায়? কিসের অন্যায়? আমার সঙ্গে তোমার…

তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে, আমার সঙ্গে আগে কারুর সম্পর্ক ছিল কি না। কেউ আমাকে কখনো আদর-কেউ আমাকে আগে ছুঁয়েছে, আমি বলেছিলাম, না, কেউ না, সেটা মিথ্যে কথা বাবলু! কিন্তু আমি ইচ্ছে করে তোমাকে ঠকাতে চাইনি বাবলু, সত্যি আমার মনে ছিল না! লংফেলো ব্রীজে তুমি একটা কাগজ কুড়িয়ে নিলে, তাতে একটা ছবি দেখে হঠাৎ সব মনে পড়ে গেল। ছি ছি ছি, বাবলু, আমি তোমাকে ঠকাতে গিয়েছিলুম। আমি নষ্ট, আমি, আমি, তোমার মতন একজন মানুষকে।

এবারে অতীনের অবাক হবার পালা। এসব কী বলছে শর্মিলা? শর্মিলা আর যাই করুক, তার মতন মেয়ে কারুকে ঠকাবে, মিথ্যে কথা বলবে, এটা বিশ্বাস করা যায় না। শর্মিলা জেদী, অভিমানী, কিন্তু সে কিছুতেই অসৎ হতে পারে না!

–তুমি আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিলে? না, আমি তা বিশ্বাস করি না।

–আমার জীবনটাই মিথ্যে হয়ে গেছে, বাবলু! ঐ কাগজটায় একটা বাচ্চা মেয়ের ছবি ছিল, ঠিক আমার ঐ বয়েসে…আমাদের বাড়িতে একজন মাস্টার মশাই থাকতেন, আমরা তাকে মাস্টারজ্যেই বলতুম, ভাইবোন সবাইকে পড়াতেন, সেই মাস্টারজ্যেঠু একদিন আমার ঠোঁটে… আমাকে জোর করে কোলে নিয়ে…আমার ফ্রক খুলে, আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমি নষ্ট, নষ্ট, বাবলু, তোমাকে বলিনি আগে, তুমি আমাকে এত বিশ্বাস করেছিলে

অতীন শর্মিলার হাত চেপে ধরে বললো, এসব কী বলছো তুমি? তোমার আট-ন বছর বয়েসে কী একটা ঘটেছিল, সেই জন্য তুমি এরকম করছো? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি?

শর্মিলা নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে করতে বললো, আমাকে আর ছুঁয়ো না বাবলু, আমি তোমার যোগ্য নই, আমি ভীষণ খারাপ?

সত্যিই প্রায় উন্মাদিনীর মতন হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে দেখে অতীন তাকে জোর করে বুকে চেপে ধরে বললো, মিলি, চুপ করো! চুপ করো! আট ন’ বছর বয়েসে, তখন তোমার ভালো করে জ্ঞান হয়নি, সেইসময় একটা পারভার্ট তোমার শরীর ছুঁয়েছিল, সেটা আবার একটা মনে রাখবার মতন ব্যাপার নাকি? এটা জানলে আমি কিছু মনে করবো, তুমি আমাকে এতই অর্ডিনারি ভাবো? তুমি আমাকে একটুও চেনোনি?

জলভরা মুখখানা তুলে শর্মিলা ধারালো গলায় বললো, এইসব শুনেও তুমি আমাকে ঘেন্না। করবে না?

অতীন বললো, অত ছোট বয়েসের ওটা তো কোনো ব্যাপারই নয়, বড় বয়েসেও কেউ যদি

হঠাৎ কোনোদিন তোমার শরীর নিয়ে হলেও আমি কিছুই ভাবতাম না। তবু তুমি আমার কাছে পবিত্র!

–আমার মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল বাবলু! আমি আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলুম, আমি ওয়াশিংটন ডি সি-তে গিয়ে একদিন শিপিং পিল–

–ছিঃ মিলি! চুপ করো, চুপ করো, তুমি আমাকে কত কষ্ট দিয়েছো জানো না? আমাকে তুমি একটা কথাও বলোনি…।

বাবলু, আমি ভেবেছিলুম, সারা জীবন তোমাকে আমার এই মুখটা আর দেখাতে পারবো না!

অতীন এবার জিভ দিয়ে শর্মিলার চোখের জল চেটে নিতে লাগলো। সুমি এসে পড়তে পারে, কিংবা অন্য কেউ দেখলো বা না দেখলো তাতে কিছু আসে যায় না। অতীন টের পেল তার বুক অসম্ভব জোরে কাঁপছে, শর্মিলারও সারা শরীর কাঁপছে থরথর করে। শুধু দুটি হৃদয় নয়, দুটি শরীবও পরস্পরের জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল।

সুমি বাড়িতে নেই। একটু পরে শর্মিলা অতীনকে ডেকে নিয়ে গেল ভেতরে। তারপর কান্নায়-হাসিতে, আদরে-উত্তাপে কাটতে লাগলো সময়। এর আগে কোনোদিন ওরা এই ঘরে মিলিত হতে সাহস করেনি। কিন্তু আজ সবকিছু তুচ্ছ।

এক সময় শর্মিলার পাশে শুয়ে একটা সিগারেট ধরাবার পর অতীন ভাবলো, এবার কি সে শর্মিলাকে অলির ব্যাপারটা সব খুলে বলবে? পরক্ষণেই সে মন বদলে ফেললো! শর্মিলার বালিকা বয়েসের ঐ তুচ্ছ ঘটনাটার সঙ্গে তার আর অলির সম্পর্কের কোনো তুলনাই চলে না। এখন অলির কথা তুললে অলিকে ছোট করা হবে! অলির প্রতি হাজার অবিচার করলেও অলির মর্যাদাকে তুচ্ছ করার কোনো অধিকার তার নেই।

৩২. আজ রাতেই অলির প্লেন

আজ রাতেই অলির প্লেন, অথচ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পারমিশান পাওয়া গেল দুপুর দেড়টার সময়। অর্থাৎ সেইসময় পর্যন্ত অলির যাওয়াটা অনিশ্চিত ছিল। পাশপোর্ট থেকে আরম্ভ করে প্রায় সব কটা সরকারি অফিসেই প্রায় শেষ মুহূর্তের আগে কাজ হয় না। অলির থেকেও তার বাবা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় অনেক বেশী কাহিল হয়ে পড়লেন।

ব্যাঙ্কের কাজ শেষ করেই অলিকে দৌড়োতে হলো ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একটা দর্জির দোকানে। অলি রেডিমেড পোশাক পরতে পারে না। শীতের ভয় দেখিয়ে অনেকেই অলিকে বলেছে কয়েকটা টেরিউলের ব্লাউজ ও ড্রয়ার নিয়ে যেতে, একজন চেনা দর্জির কাছে তার মাপ দেওয়া ছিল, আগেরদিন পর্যন্ত সে সেগুলো ডেলিভারি দিতে পারেনি। কিছু কিছু উপহারের জিনিসও কিনে নিয়ে যাওয়া দরকার। অনবরত এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছোটাছুটি, অলির সঙ্গে সর্বক্ষণ রয়েছে বর্ষা।

এরই মধ্যে অলির মনে একটা অপরাধবোধ খচখচ করছে। আজ দুপুরে মমতা তাকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবেন বলেছেন, কয়েকদিন আগেই কথা দেওয়া আছে, মমতারা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছেন। ওঁদের বাড়িতে টেলিফোন নেই, তাই খবরও দেওয়া যায়নি, সেখানে একবার যেতেই হবে। বর্ষা বলেছে আজ সে সারাদিন থাকবে অলির সঙ্গে, একেবারে এয়ারপোর্টে তুলে দিয়ে আসবে। বর্ষাকে কি অতীনদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যায়? মমতাকাকীমা অলির সঙ্গে নিরিবিলিতে কথা বলবেন বলে আর কারুকেই নেমন্তন্ন করেননি।

পৌনে তিনটের সময় অলি নিরুপায়ভাবে বলে উঠলো, বর্ষা, বাবলুদার মা আমাকে ওদের বাড়িতে খেতে বলেছেন, একবার না গেলে ওঁরা খুব দুঃখ পাবেন। তুই যাবি আমার সঙ্গে, একটু বসবি ওখানে?

বর্ষা রীতিমতন বিরক্ত হয়ে বললো, আজই নেমন্তন্ন? তোর মাথা খারাপ, শেষদিন কেউ নেমন্তন্ন নেয়? রাত দেড়টায় প্লেন, তোর এখন বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া উচিত, তা ছাড়া আরও কত খুঁটিনাটি দরকারি জিনিসের কথা মনে পড়বে…

পমপম আর কৌশিকদের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ায় এর মধ্যে অলি নিজেই আগে আর মমতার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। দোষটা তো অলিরই! তা ছাড়া আজ সকাল থেকে দেড়টা পর্যন্ত যে শুধু রিজার্ভ ব্যাঙ্কেই ধনা দিয়ে বসে থাকতে হবে, তা কি অলি আগে বুঝেছিল? সে ভেবেছিল, শেষ দিনটাতেই দুপুরে তার কিছু করার থাকবে না।

অলি বললো, আমাকে একবার যেতেই হবে রে, বর্ষা!

বর্ষা বললো, ঠিক আছে, তুই ঘুরে আয়, আমি তোদের বাড়িতে বসছি। একঘণ্টার বেশী দেরি করিস না!

শহরের উপান্তে মমতাদের বাড়ি যখন পৌঁছোলো অলি, তখন তিনটে বাজে। সে প্রায় হাঁফাচ্ছে!

আদালত থেকে ছুটি নিয়ে একটার সময় বাড়ি চলে এসেছেন প্রতাপ, কারুরই খাওয়া হয়নি, সবাই অপেক্ষা করছেন অলির জন্য। অলির চোখমুখের অবস্থা দেখে শিউরে উঠে মমতা বললেন, একী, কী হয়েছে তোর, আজ যাওয়া হবে না?

ব্যাঙ্ক ক্লিয়ারেন্সের ঝাটের ঘটনাটা প্রতাপ সবিস্তারে শুনলেন এবং গজরাতে লাগলেন। অনুমতি যখন দিলই, আগে দিলে কী হতো? আজই যাবার তারিখ, একটি মেয়ে একা একা অত দূর বিদেশে যাবে, তার যে কতখানি টেনশন হয়, তা কি ওই সরকারি লোকগুলো বোঝে না?

মমতা বললেন, যাক, শেষপর্যন্ত তো ব্যবস্থা হয়েছে! এখন খেতে বোস, অলি, তারপর কথা বলবো?

অলি ক্লিষ্ট মুখে বললো, আর এখন খেতে ইচ্ছে করছে না, কাকীমা!

মমতা অলির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, সত্যি, এত দৌড়োদৗড়ি করলে কি আর খিদে থাকে? একটুখানি খেয়ে নে, যেটুকু ইচ্ছে হয়, তোর জন্য কইমাছের পাতলা ঝোল করেছি, তুই কইমাছ ভালোবাসিস, ওদেশে তো আর এসব মাছ পাওয়া যায় না!

সকাল থেকেই অলি কিছু খায়নি, খেতে বসে দেখলো, তার খারাপ লাগছে না, ভেতরে একটা চাপা খিদে রয়ে গিয়েছিল ঠিকই।

আজ অলি বিদেশে যাবে, তাই হঠাৎ সে সকলের একসঙ্গে মনোযোগের কেন্দ্রমণি হয়ে উঠেছে। মুন্নি-টুনটুনিরা একদৃষ্টিতে তার খাওয়া দেখছে।

সুপ্রীতি নেই, পরশুদিন সুপ্রীতিকে ভর্তি করতে হয়েছে নীলরতন হাসপাতালে। তাঁর কিডনিতে অসহ্য ব্যথা, অপারেশন করা ছাড়া গতি নেই।

প্রতাপ জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে কী ঠিক হলো, অলি, তুই কি মাঝপথে লণ্ডনে থেমে যাবি?

কইমাছের কাঁটা বাছতে বাছতে অলি বললো, হ্যাঁ, লণ্ডনে তিনদিন থাকবো। বাবার এক বন্ধু আছেন, তাঁর বাড়িতে।

প্রতাপ বললেন, হ্যাঁ, রমেশ দাশগুপ্ত, আমিও চিনি, সে এয়ারপোর্টে আসবে তোকে নিতে?

অলি বললো, হ্যাঁ। বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে।

মমতা বললেন, তুতুলকেও লিখে দেওয়া হয়েছে, সেও নিশ্চয়ই এয়ারপোর্টে দেখা করতে আসবে তোর সঙ্গে। আমার তো মনে হয়, তুতুলই জোর করে তোকে নিয়ে যাবে তার কাছে।

প্রতাপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এ বাড়ির দুটি ছেলেমেয়ে চলে গেছে বিদেশে। কেন যেন মনে হয়, তারা হারিয়ে গেছে চিরকালের মতন। ছেলেটার তো দেশে ফেরার পথ বন্ধ, আর তুতুল, সে তার মাকে এত ভালোবাসতো, সেও তার মায়ের কষ্টের কথা চিন্তা করে না?

মমতা বললেন, দিদির অসুখের কথা কি তুতুলকে জানানো ঠিক হবে? কিডনির অপারেশন এমন কিছু ভয়ের তো না! শুধু শুধু অতদূরে বসে মেয়েটা দুশ্চিন্তা করবে!

প্রতাপ কোনো মতামত দিলেন না।

মমতা নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বললেন, আমার তো মনে হয়, না বলাই ভালো। তুই ওসব কিছু বলিস না রে, অলি। বলবি, আমরা সবাই ভালো আছি।

অলির তৎক্ষণাৎ মনে হলো, হাসপাতালে সুপ্রীতির সঙ্গে তার একবার দেখা করে যাওয়া উচিত। সুপ্রীতি নিশ্চয়ই সেরকম আশা করে রয়েছেন। এদিকে বাড়িতে একগাদা আত্মীয়স্বজনের আসবার কথা বিকেলে, অনেকেই চেনাশুনো কারুর জন্য জিনিসপত্র পাঠাবে। তবু সন্ধের আগে খানিকটা সময় বার করতেই হবে অলিকে।

প্রতাপ এবার বললেন, মাস দেড়েক আগে তুতুল লিখেছিল, শিগগিরই সে দেশে আসবে একবার। তারপর আর তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। কী ব্যাপার কিছুই বুঝলাম না।

মমতা বললেন, তারপরেও তো তুতুলের দুখানা চিঠি এসেছে। তুমি দেখোনি বোধ হয়। ও প্রায় প্রত্যেক সপ্তাহেই চিঠি লেখে, সে বিষয়ে ও মেয়ের কোনো গাফিলতি নেই।

প্রতাপ বললেন, দুখানা চিঠি লিখেছে আমি জানি, কিন্তু তাতে দেশে ফেরার বিষয়ে তো আর কিছু উচ্চবাচ্য করেনি! দিদি অনেক আশা করেছিল, লাস্ট চিঠি পাবার পর থেকেই তো দিদির পেট ব্যথাটা বাড়লো!

মমতা বললেন, কোনো অসুবিধেয় পড়েছে নিশ্চয়ই। হয়তো ছুটি পাচ্ছে না। ওদেশে ছুটি পাওয়া খুব শক্ত না?

প্রতাপ বললেন, হ্যাঁ, ছুটি পাওয়া শক্ত। তা হলেও কেউ কি বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করবার জন্য দেশে ফেরে না।

অপ্রিয় প্রসঙ্গটা এড়াবার জন্য মমতা তাড়াতাড়ি অলিকে বললেন, তুই লণ্ডনে পৌঁছেই আমাদের একটা চিঠি দিস, কেমন?

অলি আমেরিকায় পড়াশুনো করতে যাচ্ছে বলে মমতাই যেন সবচেয়ে বেশী খুশী হয়েছেন। অলির সঙ্গে বাবলুর দেখা হবে। অলি চমকার মেয়ে, বাবলুর মতন গোঁয়ারগোবিন্দ, মাথা-গরম ছেলেকে অলি ঠিক সামলে রাখতে পারবে। আর যে কথাটা দুই পরিবারের মধ্যে আজও একবারও উচ্চারিত হয়নি, সেটা কি এবার ঘটবে না?

মাছ খাওয়া হয়ে গেছে অলির, মমতা একটা ছোট্ট বাটি করে খানিকটা পায়েস দিলেন তাকে।

অলি বললো, কাকীমা, আমি আর খেতে পারছি না। মিষ্টি খাবো না!

মমতা ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, একটুখানি মুখে দে অন্তত।

পায়েস রাঁধবার কারণটা মমতাকে বলতে হলো না, মুন্নি বলে উঠলো, আজ কেন পায়েস রান্না হয়েছে জানো, অলিদি? আজ ছোড়দার জন্মদিন। ছোড়দা তো আর খেতে পেল না, তুমি একটু খাও, ছোড়দাকে গিয়ে বলো! ছোড়দা বোধ হয় নিজের জন্মদিনের কথা মনেই রাখে না!

মমতার মনটা প্রসন্নতায় ভরে গেল, প্রত্যেক ছেলেমেয়ের জন্মদিনেই তিনি পায়েস রান্না করেন। সেই নর্থবেঙ্গলে চাকরি করতে যাবার পর থেকেই অতীন আর বাড়িতে আসেনি, তিন তিনটে জন্মদিন সে বাড়ির বাইরে, তবু মমতা প্রত্যেক বছর তার জন্মদিনে পায়েস বেঁধেছেন। কী আশ্চর্য যোগাযোগ, অলি আজ বাইরে যাচ্ছে, আজই বাবলুর জন্মদিন, আজ অলিকে তিনি এই পায়েস খাওয়াতে পারছেন বলে কত ভালো লাগলো।

পায়েস মুখে দিতে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হয়ে গেল অলি। বাবলুদার জন্মদিন বলেই আজকের দিনে বিশেষ করে অলিকে নেমন্তন্ন করেছিলেন মমতা। যদি অলি শেষপর্যন্ত আসতে পারতো, তা হলে মমতা কত আঘাত পেতেন! এরপর পায়েসটুকু সব শেষ করে সে বললো, দারুণ ভালো হয়েছে, কাকীমা, নারকোল দিয়ে রান্না করেছেন, আর একটু দিন!

মমতা কিংবা প্রতাপ মুখ ফুটে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারেননি। মুন্নি জিজ্ঞেস করলো, ছোড়দাকে তোমার যাবার কথা জানিয়েছে তো? ছোড়দা উত্তর দিয়েছে?

অলি লাজুক ভাবে বললো, হ্যাঁ। বস্টন থেকে নিউ ইয়র্ক এসে আমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করবে লিখেছে। লণ্ডন থেকে আমি ফ্লাইট নাম্বার আর তারিখ জানিয়ে দেবো।

প্রতাপ বললেন, মমো, এবার অলিকে ছেড়ে দাও, ওর নিশ্চয়ই আরও অনেকের সঙ্গে দেখা করবার আছে।

মমতা উঠে গিয়ে একটা প্যাকেট নিয়ে এসে বললেন, এই নে, অলি, এটা আমি তোর জন্য এনেছি, তুই না বলতে পারবি না!

অলি প্রায় আঁতকে উঠে বললো, এত দামি টাঙ্গাইল শাড়ি! কাকীমা, আমার অনেক শাড়ি জমে গেছে, বেশী নিতে পারবো না, এটা মুন্নিকে দিন!

মমতা ছদ্ম ধমক দিয়ে বললেন, তুই নে তো! তোর নাম করে কিনেছি, তুই পরবি ওখানে গিয়ে–

প্রতাপ বললেন, সুতির শাড়ি কি ওখানে পরার স্কোপ পাবে?

অলি শাড়িটা হাতে নিয়ে বললো, হ্যাঁ, তা পরা যাবে। ওখানে বুঝি গরম পড়ে না? রঙটা খুব সুন্দর, এটা আমি নিয়ে যাবো, কাকীমা!

মুন্নি বললো, অলিদি, তুমি আজই এটা পরে যেও।

মমতা এরপর খানিকটা কুণ্ঠিতভাবে বললেন, তোর কি অনেক জিনিসপত্তর হয়ে গেছে অলি? বাবলুর জন্য দু-একটা জিনিস নিয়ে যেতে পারবি?

অলি বললো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেন নিতে পারবো না? কুড়ি কেজি পর্যন্ত অ্যালাউড, কম নাকি?

মমতা বললেন, বাবলুর জন্য একটা শার্ট, আর এক শিশি ঘি। ও ঘি দিয়ে গরম ভাত খেতে ভালোবাসে, ও দেশে মাখন পাওয়া গেলেও ঘি তো পাওয়া যায় না!

মুন্নি বললো, আমি ছোড়দার জন্য ছখানা রুমাল দেবো। আমেরিকায় সুতির রুমালের খুব দাম। ফুলদির জন্য ব্লাউজ পীস আর একজোড়া দুল।

মমতা বললেন, বাবলুর জন্য একটু আচার আর পাঁপর আর…

প্রতাপ এবার বাধা দিয়ে বললেন, আর বাড়িও না, আর বাড়িও না। মেয়েটার ঘাড়ে কত কী চাপাবে?

মমতা বললেন, তুতুলের জন্য একটা শাড়ি তো নিতেই হবে। সেটাও আমি আগেই কিনে রেখেছি।

প্রতাপ বললেন, তুতুল দেশে আসবার কথা লিখেছিল, যদি শিগগির আসতে পারে, তা হলে আর তার জন্য শাড়ি পাঠানোর কী দরকার?

মমতা ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, তবু পাঠাতে হয়, তুমি বোঝো না, সোঝো না, চুপ করো তো!

অলি তুতুলের শাড়িটাও হাত পেতে নিল।

প্রতাপ বললেন, ব্যস, এ পর্যন্ত। আচার পাঁপর-টাপর আর দিতে হবে না। ওদের কাস্টমসে অনেক সময় ফুড মেটেরিয়াল অ্যালাউ করে না, কাগজে পড়েছি।

অলি বললো, না, এগুলোও দিয়ে দিন কাকীমা। নিয়ে তো যাই, কাস্টমস যদি অ্যালাউ না করে তখন বলবো, তোমরা তা হলে রাখো। নিজেরাই খাও!

মমতা বললেন, তুতুল আচার খায় না। ঘিয়ের শিশি থেকে তুই অর্ধেকটা তুতুলকে ঢেলে নিতে বলিস।

বিদায় নেবার সময় মমতা অলিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই অতদূরে যাবি, জীবনে। যে-মেয়ে একা একা কৃষ্ণনগরে পর্যন্ত যায়নি। খুব সাবধানে থাকিস অলি, আর আমার ছেলেটাকে বলিস–

ছেলেকে কী বলতে হবে তা আর জানাতে পারলেন না, মিতা, হঠাৎ তাঁর চোখে জল এসে গলা বুজে গেল। কান্নায় কান্না টানে। অলিও সামলাতে পারলো না নিজেকে। কিসের জন্য এই কান্না কে জানে!

প্রতাপ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, অলি, আর দেরি করিস না। তোর বাবার সঙ্গে কথা হয়ে আছে, রাত্তিরে আমিও যাবো এয়ারপোর্টে।

বাবলুর সময়ে প্রতাপ যেতে পারেননি। একটা চোরাই জিনিসের মতন বাবলুকে পাচার করা হয়েছিল গোপনে। তাও ট্রেনে তাকে আগে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বম্বে। বিমানবিহারী প্রতাপকে হাওড়া স্টেশনেও যেতে দেননি, যদি পুলিশ প্রতাপের ওপর নজর রেখে থাকে, তা হলে একটা ঝুঁকির ব্যাপার হবে। প্রতাপকে সেদিন অন্যদিনের মতই বসতে হয়েছিল আদালতের এজলাশে। পাঁচ-পাঁচটা মামলার হিয়ারিং শুনতে হয়েছিল ধৈর্য ধরে।

আজ অলি যাবে, আজকের দিনটা প্রতাপের পক্ষে ভালো নয়। দিদিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে বলে মনটা ভালো নেই। হাসপাতালের বিশ্রী নোংরা পরিবেশে, জেনারেল ওয়ার্ডে সাত-সতেরো রকম রুগীদের সঙ্গে শুয়ে আছেন সুপ্রীতি। প্রথমদিন সেখানে দিদিকে রেখে আসার সময় প্রতাপের বুক মুচড়ে মুচড়ে উঠছিল। মালখানগরের ভবদেব মজুমদারের কন্যা, বরানগরের একদা বিখ্যাত সরকার পরিবারের বধূ, সুপ্রীতিকে বাধ্য হয়েই দিতে হয়েছে জেনারেল ওয়ার্ডে, অনেক চেষ্টা করেও ক্যাবিন পাওয়া যায়নি। দিদিকে নার্সিংহোমে রাখার সাধ্য নেই প্রতাপের। কেউ কি বিশ্বাস করবে যে এই মহিলারই মেয়ে বিলেতের ডাক্তার! সুপ্রীতি প্রতাপকে মাথার দিব্যি দিয়েছেন, তাঁর অসুখের কথা যাতে কিছুতেই তুতুলকে চিঠিতে জানানো না হয়।

কদিন ধরে প্রতাপের নিজের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। মাথাটা ঝিম ঝিম করে মাঝে মাঝে। এটা তাঁর একটা পুরোনো রোগ, রাস্তায় ঘাটে এরকম হলেই শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। এই অস্বস্তিটার জন্য রাত্তিরে ঘুমও হচ্ছে না ভালো। এখন দিদির অসুখ, প্রতাপ নিজের এই শারীরিক অসুবিধের কথা কারুকে জানাননি।

তবু তিনি অলিকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে যাবেনই ঠিক করেছেন। অলিকে তিনি খুব পছন্দ করেন। অলির মুখের মধ্যেই এমন একটা পরিচ্ছন্নতার ছাপ আছে, যা আজকাল খুবই দুর্লভ, যেন সে জানেই না অন্যায় কাকে বলে।

অলির সঙ্গে প্রতাপও বাইরে বেরিয়ে এলেন। চারটে বেজে গেছে, তিনি হাসপাতালে দিদির কাছে যাবেন। মমতা-মুন্নিরা সকালে গিয়েছিল। এ বেলা প্রতাপের যাওয়ার পালা।

অলি জিজ্ঞেস করলো, কাকাবাবু, আপনাকে আমি খানিকটা পৌঁছে দেবো?

প্রতাপ বললেন, নারে, আমি এই তো ঢাকুরিয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে চলে যাবো। শিয়ালদায়, তাতেই সুবিধে হবে। তুই কতদিন বিদেশে থাকবি, অলি, কিছু ঠিক করেছিস?

অলি বললো, দু বছরের বেশী একদিনও নয়! আপনি লিখে রাখতে পারেন, প্রতাপকাকা। ওখানে গিয়ে তো আমাকে আবার এম এ করতে হবে। এক বছরে বোধ হয় শেষ করে উঠতে পারবো না। পি এইচ ডি করার বিন্দুমাত্র বাসনা আমার নেই। দু একটা পাবলিশিং ফার্মে ট্রেনিং নেবার ইচ্ছে আছে বরং।

প্রতাপ বললো, হ্যাঁ, তাই করিস। খুব বেশীদিন থাকিস না। তুই তোর বাবা-মা’র অনেকখানি ভরসা। তবে, বাবলুকে তুই বলিস, সে যেন হঠাৎ ফিরে আসার চেষ্টা না করে। দেশের অবস্থা কীরকম, তুই তো দেখেই যাচ্ছিস। পুলিশ এখন একটু নকশাল গন্ধ পেলেই ছেলে গুলোকে খুন করছে। আরও অন্তত বছর দুয়েক কাটুক …

অলি জিজ্ঞেস করলো, প্রতাপকাকা, তুতুলদির মা’র অসুখটা কী খুব সিরিয়াস? তুতুলদির সঙ্গে দেখা হলে তো জিজ্ঞেস করবেই।

উত্তর দেবার জন্য প্রতাপ একটু সময় নিলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে যে ছেড়ে বললেন, ডাক্তাররা তো বলছেন, খুব একটা ভয়ের কিছু নেই। তোর কাকীমা যে বললো, তুতুলকে কিছু না জানাতে, দিদিরও সেটাই ইচ্ছে। না জানানোই ভালো বোধ হয়। তুতুল ওখানে একজনকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, সে ব্যাপারে তুই কিছু জানিস?

অলি দু দিকে মাথা নাড়লো।

প্রতাপ বললেন, তুতুল আমাদের মতামত না নিয়ে আগেই একজনকে পছন্দ করেছে, সেইজন্যই দিদির অভিমান হয়েছে খুব। তুতুল তো সেরকম মেয়ে ছিল না। যাই হোক, সে সম্পর্কেও তুতুল আর কিছু লেখে না।

পরক্ষণেই প্রতাপ ব্যস্ত হয়ে বললেন, তুই আজ যাচ্ছিস, তোকে এত সব কথা ভাবতে হবে তো! তুই যা, বাড়িতে সবাই নিশ্চয়ই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে এতক্ষণে। তোর মায়ের সঙ্গেও তো খানিকটা সময় কাটাবি!

গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে তুতুলকে উঠতে দিয়ে প্রতাপ বললেন, গিয়েই কিন্তু চিঠি লিখিস!

অলি বাড়িতে এসে দেখলো বর্ষা ছাড়াও তার কলেজের কয়েকজন বন্ধুবান্ধবী এসে বসে আছে তার ঘরে। দোতলায় বাবার কাছে এসেছেন তাঁর কয়েকজন বন্ধু এবং তাঁদের স্ত্রীরা তিনতলায় মায়ের কাছে। সারা বাড়ি ভর্তি মানুষজন, যেন একটা উৎসব।

নিজের বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে পারলো না অলি, মা তাকে ডেকে পাঠালেন। মায়ের ঘরে মহিলাদের কয়েকজনের মুখচেনা, কয়েকজন একেবারে অপরিচিতা। এদের সকলেরই ছেলে কিংবা মেয়ে-জামাই কিংবা ভাই-টাই কেউ থাকে বিলেত–আমেরিকায়। প্রত্যেকেরই হাতে একটি করে প্যাকেট। অলি দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে, এতসব জিনিস, এত ঠিকানা, সে সব সামলাবে কী করে?

মুখের ওপর কারুকেই কোনো ব্যাপারে না বলতে পারে না অলি, মায়ের নির্দেশে সবাইকেই প্রণাম করে। সকলেরই জিনিসপত্র এক জায়গায় রেখে দিচ্ছে অলি। সে নিচ্ছে একটা সুটকেশ, এতগুলি প্যাকেট দুটো সুটকেশেও আঁটবে না। মা-ও কিছু বুঝছেন না, শেষ পর্যন্ত বাবার সাহায্য নিতে হবে অলিকে।

সম্ভ্রান্ত চেহারার মহিলারা শুধু যে আপনজনের জন্য উপহার দ্রব্য দিচ্ছেন অলিকে তাই-ই নয়, উপদেশও দিচ্ছেন অনেক। অলি মাথা নেড়ে শুনে যাচ্ছে সব।

একজন এমনকি বলে উঠলেন, এই বয়েসের মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে বিদেশে পাঠাচ্ছো, কল্যাণী, তোমার সাহস তো কম নয়! শেষে যদি তোমার সাহেবজামাই হয়?

কয়েকজন মহিলা মিষ্টির বাক্সও এনেছেন। তাঁরা ওই মিষ্টি কল্যাণীকে দেননি, অলির হাতে তুলে দিয়ে বলছেন, তোমার জন্য এনেছি! অলি কি আজই এই সব মিষ্টি খাবে, না সঙ্গে নিয়ে যাবে?

কৌশিক-পমপমদের ঘাটশিলায় পৌঁছে দিয়ে অলি কলকাতায় ফিরে এসেছে মাত্র চারদিন আগে। এর মধ্যে গত দিন সাতেকে সে এত মিথ্যে কথা বলেছে, তার এতদিনের জীবনেও সেরকম বলতে হয়নি। সে মার কাছে মিথ্যে কথা বলেছে, বাবার কাছে মিথ্যে কথা বলেছে। মিথ্যে কথা সম্পর্কে তার মনের মধ্যে একটা ঘৃণার ভাব ছিল, এখন সে নিজের কাছে পরিষ্কার থাকার জন্য অনবরত মনে মনে বলে যাচ্ছে উইলিয়াম ব্লেকের দুটো লাইন :

A truth told with bad intent
is worse than all lies that you can invent…

সত্যিকথা বলা অনেক সময় ক্ষতিকর। অলি এবার প্রত্যক্ষভাবে নিজে তা বুঝেছে। পমপমের কথায় সাক্ষ্য দেবার জন্য সে কৌশিকের কাছে মানিকদার নামে মিথ্যে কথা বলেছে, সে সময় সত্যি কথা বললে কৌশিককে বাঁচানো যেত না। কৌশিকের সারা শরীরে ব্যাণ্ডেজ বলে ট্রেনে নেবার সময় কৌশিককে শাড়ি পরিয়ে মেয়ে সাজানো হয়েছিল, নইলে তার সারা শরীর ঢাকা যেতো না। ট্রেনের কামরার এক কোণে কৌশিক মাথায় ঘোমটা দিয়ে ঘুমের ভান করে পড়েছিল। খড়গপুর স্টেশনে দাঁড়াবার পরেই সেই কামরায় তিনজন পুলিশের লোক উঠেছিল। এমনই চমকপ্রদ ব্যাপার, তাদের মধ্যে একজন চিনতে পারলো অলিকে। অলি কিন্তু পুলিশটিকে চেনে না। কিন্তু সে অলির নাম ঠিকঠাক বললো, তার বাবাকে চেনে, অলিদের বাড়িতে সে ছাত্রজীবনে এসেছে কয়েকবার, অলির বাবা নাকি তার পড়াশুনোর ব্যাপারে কিছু সাহায্য করেছিলেন। সেই লোকটি অলিকে যেই জিজ্ঞেস করলো যে সে কোথায় যাচ্ছে, অমনি অলি উত্তর দিয়েছিল, সে তার এক অসুস্থ দিদিকে তাঁর শ্বশুরবাড়ি রাঁচিতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে। কী করে যে এই উত্তরটা সেই মুহূর্তে তার মাথায় এলো, তা সে নিজেই এখনো বুঝতে পারছে না। অদ্ভুত কাজ হলো তাতেই। পুলিশ তিনটি কামরার কিছু লোকের ঘুম ভাঙিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেসবাদ করছিল, অলিদের কাছে আর ঘেষলোই না। দামামা ধ্বনির মতন শব্দ হচ্ছিল তখন অলির বুকের মধ্যে, কিন্তু তার মুখ দেখে কেউ কি কিছু বুঝেছে? পুলিশের সেই ছেলেটিকে মিষ্টি হেসে অলি বলেছিল, আপনি আসবেন একদিন আমাদের বাড়িতে, বাবাকে বলবো আপনার কথা!

সেইসময় সত্যি কথা বলাটা মানুষ খুন করার মতন অপরাধ হতো না? দারুণ আহত ও অসুস্থ হলেও কৌশিক তার সঙ্গে অস্ত্রটা রেখেছিল এবং সে ঠিক করেই রেখেছিল, পুলিশের কাছে সে নিরীহভাবে ধরা দেবে না, পুলিশ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে এলেই সে গুলি চালাতে। কী একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার হতো তা হলে!

এমনকি বর্ষাকেও অলি সঠিক বলেনি, সে পমপমের সঙ্গে কোথায় গিয়েছিল। ঘাটশিলা নামটাই উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ। একটা বিরাট গোপনীয়তার বোঝা সে বহন করে চলেছে। আজ সারাদিন ধরে তার এত ব্যস্ততা, এত লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে, তবু ভেতরে ভেতরে সে অনবরত ভেবে চলেছে কৌশিক-পমপমদের কথা। নিশ্চয়ই ওদের আর কোনো বিপদ হয়নি।

একবার বাবার ডাক শুনে দোতলায় নেমে যাচ্ছে অলি, অচেনা প্রেীদের সামনে লাজুক লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আঙুল খুঁটতে খুটতে অবান্তর কথা শুনে যেতে হচ্ছে। একবার দৌড়ে আসছে বন্ধুদের কাছে, সেখানে শুনতে হচ্ছে নানারকম রসিকতা। অলি ঠোঁটে হাসি ফোঁটাচ্ছে বটে কিন্তু কিছুতেই যেন যোগ দিতে পারছে না। এরই মধ্যে মায়ের ঘরে এক দূর সম্পর্কের পিসিমা একটা হাস্যকর ব্যাপার করলেন।

এই পিসিমা এ বাড়িতে বিশেষ আসেন না। এর কোনো ছেলেমেয়ে আত্মীয়াও লণ্ডন বা আমেরিকায় নেই। কিন্তু ইনি এসেছেন একটি বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে। তাঁর ঝোলার মধ্যে একখানা জগদীশবাবুর বাংলা গীতা। সেই গীতা ছুঁয়ে অলিকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে সাহেবদের দেশে গিয়ে সে কোনোদিন কোনোক্রমেই গো-মাংস স্পর্শ করবে না।

গোরুর মাংস খাওয়া না-খাওয়া সম্পর্কে অলি কিছু চিন্তা করেনি। গোরুর মাংস হয়তো সে এমনিতেই খেত না কোনোদিন, কারণ সে কোনো মাংসই বিশেষ পছন্দ করে না। কিন্তু এত প্রতিজ্ঞার বাড়াবাড়ির কী আছে? কিন্তু বাতিকগ্রস্ত ওই পিসিমাটির ধারণা, এ বংশের একজন কেউ গো-মাংস ভক্ষণ করলেই সমস্ত বংশটির জাত যাবে।

কল্যাণীও অতিশয় ভদ্র বলে কারুকে মুখের ওপর কিছু কঠিন কথা বলতে পারেন না। এই পিসিমাটিকেও বাধা দিতে পারছেন না তিনি। মাস কয়েক আগে হলেও অলি গীতা ছুঁয়ে এরকম একটা প্রতিজ্ঞা করতে দ্বিধা করতো, কিন্তু গত কয়েকটা দিনে সে অনেক বেশী অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে, সে বুঝেছে, সত্য মিথ্যে, ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাখ্যা নির্ভর করে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে, এবং সেই সব ব্যাখ্যার সামান্য গোঁড়ামিতে মানুষের জীবন-মৃত্যুও নির্ভর করতে পারে। সুতরাং এইরকম একটা প্রতিজ্ঞা করা না করাতেও কিছু আসে যায় না।

সে বিদেশে যাচ্ছে একাধিক গোপনীয়তার বোঝা নিয়ে। পমপম বারবার বলে দিয়েছে, মানিকদার মৃত্যুর কথাটা এখন যেন অতীনকেও জানানো না হয়। মানিকদা অ্যাবসকণ্ড করে আছেন, এইটুকু জানানোই যথেষ্ট।

লণ্ডনে গিয়ে তুতুলদিকে জানানো চলবে না তার মায়ের অসুখের কথা। কিন্তু আমেরিকায় বাবলুদার কাছে সে মানিকদার খবরটা কতদিন গোপন রাখবে? বাবলুদার সামনে সে মিথ্যে অভিনয় চালিয়ে যেতে পারবে কী? তুতুলদির কাছে পারলেও বাবলুদাকে নিয়েই তার ভয়!

৩৩. বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে

বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি ছোট্ট বাড়িতে প্রায় সারা দিনরাত ধরেই চলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজ; নাটক ও গানের রিহার্সাল, প্রোগ্রামের রেকর্ডিং। এই পাড়াটি এমনিতে নির্জন ও নিরিবিলি, অধিকাংশই উচ্চবিত্ত মানুষদের বাড়ি, অনেকখানি জুড়ে আর্মির এলাকা, এরই মধ্যে একটি বাড়ি সবসময় সরগরম। কিছুদিন আগে এই বাড়িটিই ছিল মুজিবর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের দফতর, এখন তিনি বেতারকর্মীদের ব্যবহার ও বাসস্থানের জন্য বাড়িটি ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র উঠে গেছেন।

এই একই বাড়িতে বেতারকেন্দ্রের সবরকম কাজ ও প্রায় সত্তর জন শিল্পী, সংগঠক ও কলাকুশলীদের মাথা গোঁজার জায়গা। যে যেখানে পারে পাঁচ-ছ’ ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয়। দুটো মাত্র বাথরুম, এক একসময় সে দুটোর দরজার সামনে লাইন পড়ে যায়। খেতে হয় দু বেলাই খিচুড়ি কিংবা ভাত-ডাল আর একটা লম্বা ঝোল। তবু সবাই মিলে এক জায়গায় থাকার একটা আনন্দ আছে, কেউ কেউ আগে বেশ আরাম ও বিলাসিতার জীবনে অভ্যস্ত থাকলেও এখানে দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের গরিমা উপভোগ করার মেজাজে মেনে নিচ্ছে সব অসুবিধে। অবশ্য হঠাৎ হঠাৎ ছোট ছোট দল-উপদলে ধারণা, চাচামেচি ও ঝগড়াঝাঁটি চলে, শিল্পীদের পক্ষে সর্বক্ষণ একজোট হয়ে থাকা সম্ভব নয় বোধহয়, কিন্তু বৃহত্তর কারণটি মনে পড়ে যেতেই আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যায়!

মাঝে মাঝেই সীমান্তের ওপার থেকে নতুন মানুষ এসে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের ছ’টি বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানী প্রচার যন্ত্রের চাকরি ছেড়ে দলে দলে যোগ দিচ্ছেন মুজিবনগর সরকারের পক্ষে। কেউ কেউ আগেই চাকরি ছেড়ে, গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন। এরা অনেকে পাচার করে আনছেন কিছু কিছু পুরোনো অনুষ্ঠানের, গানবাজনার টেপ, এদের মুখে শোনা যায় পাকিস্তানী বাহিনীর অত্যাচারের নতুন নতুন কাহিনী।

সবচেয়ে সাড়া পড়ে গিয়েছিল চট্টগ্রামের বেতারকর্মীদের আগমনের দিনটিতে। বেলাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে সেই এগারোজন পেয়েছিলেন বীরের অভ্যর্থনা। পাকিস্তানী শাসকদের অগ্রাহ্য করে এরাই প্রথম স্থাপন করেছিলেন বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। ২৫ শে মার্চ শুরু হয়েছিল পাকিস্তানী বাহিনীর নারকীয় অত্যাচার, পরের দিনই কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ভবন থেকে এই বিদ্রোহী কর্মীরা স্বাধীনতার বাণী ঘোষণা করে দেন। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের এক মেজর জিয়াউর রহমান এই গোপন কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের নাম করে যখন আবার স্বাধীন বাংলাদেশ স্থাপনের বাণী ঘোষণা করেন, তখন তা নিপীড়িত, শঙ্কাতুর কিন্তু প্রতিবাদে উন্মুখ বাঙালীদের মনে ভরসা যুগিয়েছিল।

বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটি বেতার কেন্দ্র হলেও এখান থেকে ট্রান্সমিশনের ব্যবস্থা নেই। এখান থেকে রেকর্ড করা অনুষ্ঠানের টেপ নিয়ে যাওয়া হয় সীমান্তের কাছাকাছি কোনো একটি জায়গায় একটি পঞ্চাশ কিলোওয়াটের ট্রান্সমিটারে সম্প্রচারের জন্য। সে জায়গাটির নাম স্যত্নে গোপন রাখা হয়েছে, কেননা, পাকিস্তানী সামরিক শক্তি যে-কোনো উপায়ে সেই ট্রান্সমিশন যন্ত্র ধ্বংস করে দিতে চাইবেই, এবং সীমান্তের এপারেও পাকিস্তানী গুপ্তচরদের অভাব নেই।

তাজউদ্দীন সাহেবের নিজস্ব ঘরখানাকেই বানানো হয়েছে স্টুডিও। সাউণ্ড প্রুফ করার জন্য বিছানার চাঁদর ঝুলিয়ে আর তুলো গুঁজে কোনোক্রমে বন্ধ করা হয়েছে জানলা-দরজার ফুটোফাটা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ধার দিয়েছেন দুটো পুরোনো টেপ রেকর্ডার, অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও রেকর্ডিং-এর জন্য তাঁরা কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সহযোগিতারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিবনগর সরকারের প্রচার দফতরের দায়িত্বে রয়েছেন যিনি, সেই টাঙ্গাইলের জনাব আবদুল মান্নান বলেছিলেন, নাঃ, আমাগো প্রোগ্রাম আমাগো পোলাপানরাই করবো। আপনারা ট্রান্সমিশনের ব্যবস্থা করতেছেন, সেইটাই যথেষ্ট!

যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অপ্রতুলতা পূরণ করে দিয়েছে এখানকার কর্মী শিল্পীদের অদম্য প্রাণশক্তি ও অফুরান উৎসাহ। সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধারা জলকাদার মধ্যে প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শহরে-গ্রামে অসংখ্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গড়ে তুলছে প্রতিরোধ, সীমান্তের এপারে যারা আশ্রয় নিয়েছে, সেই শিল্পী বুদ্ধিজীবীরাও কোনো না কোনো ভাবে এই যুদ্ধে অংশ নিতে চান। স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠানগুলিও এক হিসেবে যুদ্ধ, তাই এ বাড়িতে সর্বক্ষণই যেন যুদ্ধকালীন ব্যস্ততা।

শওকতের সঙ্গে মঞ্জু আর হেনা একদিন এলো এই বেতার কেন্দ্রটি দেখতে। মামুন আজ বাড়িতে থাকবেন, তিনি সুখুর দেখাশুনো করবেন, তিনিই জোর করে পাঠিয়েছেন মেয়েদুটিকে। বাবুল চৌধুরীর এখনও কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, অজিত রায়, কাঁদেরী কিবরিয়া এইসব শিল্পীদের দেখতে পেয়ে মঞ্জু আর হেনা দু’জনেই বেশ উত্তেজিত। এইসব বিখ্যাত লোকদের ছবিই আগে দেখেছে ওরা, এখন তাঁরাই জলজ্যান্ত অবস্থায় চোখের সামনে! এবং এদের চালচলন একেবারে সাধারণ মানুষের মতন! লুঙ্গি পরে খালি গায়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানের তালিম নিচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা মাত্র কয়েকমাস আগেও ঢাকায় ছিলেন সুদূর তারকালোকের মানুষ। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটা শুনলেই রোমাঞ্চ হয়! একটা ঘরে বসে কামাল লোহানী খবর লিখে যাচ্ছেন। পাশের ঘরে রিহার্সাল চলছে জল্লাদের দরবার’ নাটকের। চরমপত্রের জন্য বিখ্যাত এম আর আখতার মুকুল মঞ্জু আর হেনাকে দেখে চিনতে পেরে বললেন, কী! তোমরাও গান করবা নাকি? আমাগো কোরাসের জন্য কয়েকটা ফিমেল ভয়েস দরকার।

সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসও চিনতে পারলেন মঞ্জুকে। একসময় তিনি ওদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন, মঞ্জুর গান শুনেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম বিলকিস বানু না? তুমি তো অনেক নজরুলের গান শিখেছিলে, আমাদের এখানে গান করো!

মঞ্জু লজ্জায় শরীর মোচড়াতে থাকে। অনেক দিন অভ্যেস নেই, বিয়ের পর সে গান গাওয়া ছেড়েই দিয়েছে।

শওকত চোখ টিপে বললো, আপনি ছাড়বেন না, সমরদা। ওরে আপনারা গানের দলের সাথে জুইড়া লন! সেইজন্যই ওরে নিয়া আসছি।

সমর দাস হাতঘড়ি দেখে বললেন, আমাকে একটা রি-রেকর্ডিং করতে হবে। এখন একটু ব্যস্ত আছি। আপনেরা একটু ঘোরেন ফেরেন। ঠিক ফরটি ফাইভ মিনিট পর আমি এই মেয়েটিরে নিয়ে বসবো।

সেই ঘর থেকে বেরিয়েই একজন লোককে দেখে শওকত বললো, সেলাম আলেকুম, জহির ভাই! আপনি এখানে?

সেই ভদ্রলোক বললেন, এই যে শওকত, তুমিও আইস্যা পড়ছো? আমার একটা টক আছে, রেকর্ড করাবো।

শওকত মঞ্জু আর হেনার দিকে চেয়ে বললো, ইনি কে চিনেছো? জনাব জহির রায়হান, ফেমাস ফিল্ম ডাইরেকটার অ্যান্ড রাইটার।

মঞ্জু আর হেনা দু’জনেই ওঁর নাম আগে শুনেছে, তারা অভিবাদন জানালো। শওকত আবার বললো, জহিরভাই, আপনার জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটার নাকি একটা প্রিন্ট এসেছে? কলকাতায় দেখানো হবে?

জহির রায়হান বললেন, চেষ্টা চলছে। কিছু এডিটিং দরকার। পরে কথা হবে, বাংলাদেশ মিশানে এসে দেখা করো!

শওকত বললো, আপনি টক দেবেন, আমরা একটু শোনতে পারি না?

–ভিতরে বোধহয় ঢুকতে দেবে না। বাইরে দাঁড়াতে পারো। অন্য কেউ একজন ওদের কথাবার্তা শুনে বললো, ঠিক আছে, ভিতরেই আসো, কিন্তু কোনো শব্দ করবা না, হাঁচি কাশির রোগ নাই তো?

হেনা-মঞ্জুরা রেকর্ডিং রুমে ঢুকে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইলো। বেশ তীব্র উত্তেজনা বোধ করছে তারা। স্পষ্টভাবে উচ্চারিত না হলেও তারা বুঝতে পারছে যে তারা এখানে ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।

জহির রায়হানের কথিকাটির নাম ‘পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ’। পরিষ্কার উচ্চারণে তিনি বলতে লাগলেন, পাকিস্তানের এই অপমৃত্যুর জন্য বাংলাদেশের মানুষ দায়ী নয়। দায়ী পাকিস্তানের শাসক চক্র, যারা পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষী অঞ্চলের স্বাধিকারের প্রশ্নকে লক্ষ লক্ষ মৃতের লাশের নিচে দাবিয়ে রাখতে পেরেছে…। বাংলাদেশ এখন প্রতিটি বাঙালীর প্রাণ। বাংলাদেশে তারা পাকিস্তানের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে দেবে না। সেখানে তারা গড়ে তুলবে এক শোষণহীন সমাজব্যবস্থা, সেখানে মানুষ প্রাণভরে হাসতে পারবে, সুখে শান্তিতে থাকতে পারবে…

পড়া শেষ হতেই কলাকুশলীরা সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো। চমৎকার বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের সুন্দর ছবিটা যেন সকলের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঐ ছবিটাই তো বর্তমানের সব দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে জহির রায়হান বললেন, কলকাতায় যেন ঢাকার থেকেও বেশী গরম পড়ে মনে হয়, তাই না?

শওকত বললো, কইলকাতায় কত মানুষ! বাপরে বাপ! রাস্তা দিয়ে হাঁটনের সময়েও মাইনষের গায় মাইনষের ধাক্কা লাগে!

জহির রায়হান বললেন, তবে সন্ধ্যাবেলা কলকাতায় একটা সুন্দর বাতাস ওঠে প্রায়ই, বঙ্গোপসাগরের হাওয়া।

মঞ্জু শওকতকে মৃদু খোঁচা মেরে বললো, শওকতভাই, এবার বাসায় চলো।

শওকত বললো, সমরদার কথা শুনে পলাইতে চাও তাই না? ঐসব হবে না, আজ তোমারে গান গাইতেই হবে।

সমর দাস অন্য কাজ শেষ করার পর হারমোনিয়াম নিয়ে বসে সা-পা টিপে বললেন, দেখি গলা খোলো তো! একটা লাইন গাও!

মঞ্জু তবুও দ্বিধা-শরম কাটাতে পারছে না, তার ফর্সা মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে। হেনা আর শওকত দু’জনে মিলে তাকে অনেক করে বোঝাতে লাগলো। শওকত বললো, শোনো মঞ্জু, স্বাধীনতা এমনি এমনি পাওয়া যায় না, তার জন্য প্রত্যেককেই কিছু না কিছু দিতে হয়। এখানে ঘরে বসে শুধু দিনগুলো নষ্ট করবে কেন? স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান শুনে মুক্তিযোদ্ধারা কতটা প্রেরণা পায় তা তুমি জানো? আমি নিজে দেখে আসছি,

হেনা বললো, আপা, বাংলাদেশের মইধ্যে সকলে এই প্রোগ্রাম শোনে। দুলাভাই তোমার গলা শোনলেই চেনতে পারবেন! তাইলে তিনি বোঝবেন যে আমরা ভালো আছি। চিঠিপত্র তে পাওয়া যায় না!

এই কথা শুনে মঞ্জু চোখ বড় বড় করে তাকালো।

শওকত বললো, হেনা ঠিক বলেছে। এইভাবেই তো দেশের মইধ্যে অনেকে আমাগো খবর পায়। তুমি যদি বাবুল চৌধুরীর একটা ফেভারিট গান করো, সেইটাই হবে তোমার চিঠি!

সমর দাস খানিকটা অস্থিরভাবে বললেন, কোন গান বলো, আমিও ধরছি!

মঞ্জু এবার খুব আস্তে আস্তে শুরু করলো, “দুঃখ যদি না পাবে তো, দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে…

সমর দাস একটুক্ষণ গলা মিলিয়ে থেকে হঠাৎ থেমে গেলেন। অনেকদিনের অনভ্যাসের জন্য মঞ্জুর গলা কাঁপা কাঁপা লাগছে, লয়ও ঠিক থাকছে না। সমর দাস মন দিয়ে শোনার পর বললেন, হু, গলায় সুর আছে কিন্তু কয়েকটা দিন প্র্যাকটিস করা দরকার। এখনই প্রোগ্রাম করা ঠিক হবে না।

এরপর শুরু হলো মঞ্জুর গলা সাধা। শওকত, পলাশ আর তার এক বন্ধু বরুণ নিয়মিত এসে উৎসাহ দিতে লাগলো। এরা তিনজনেই গান-পাগল, এরা মঞ্জুকে গায়িকা করে তুলবেই। বরুণ একটা হারমোনিয়াম এনে দিল মঞ্জুকে। মঞ্জুর সঙ্গে সঙ্গে ওরাও গান করে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে।

মামুন নিজে গান বাজনা ভালোবাসলেও ঘরের মধ্যে এই হৈ হট্টগোলে খানিকটা অস্বস্তিতে পড়লেন। ছেলেগুলো ভালো, এদের উৎসাহ উদ্দীপনায় মঞ্জু যেন একটা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, তার মুখ অন্যরকম দেখায়। হেনার গানের গলা নেই কিন্তু সেও স্বাধীন বাংলা বেতারে অনুষ্ঠান করবে বলে নজরুলের কবিতা বেছে আবৃত্তির অনুশীলন শুরু করে দিয়েছে, এতে মামুনের খুশি হবারই কথা, তিনি অখুশিও নন, তবু তার নিজের কাজের অসুবিধেটাও অনুভব করছেন।

একদিন মঞ্জু বললো, মামুনমামাও ভালো গান করে।

পলাশ বললো, ঠিক তো, আমি মামুনমামার গান শুনেছি তোমাদের বাড়িতে। আপনিও একটা গান করুন না!

বরুণ এসে মামুনের হাত ধরে টানাটানি করে বললো, আসেন মামুনভাই, আসেন, আমাদের একটা গান শোনান!

মামুন লজ্জায় মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, আরে দুর দুর আমি গুন গুন করতাম, সেও অনেকদিন আগে, সেসব তোমাদের শোনাবার মতন নয়।

ওরা নাছোড়বান্দা, মামুনকে টানতে টানতে নিয়ে বসালো হারমোনিয়ামের সামনে। পলাশ সেটা বাজায়, বরুণ একটা মোটা বইতে টোকা মেরে তবলার তাল দেয়। অনেকদিন পর মামুনের যেন বয়েস কমে গেল। তিনি শুধু গান করতে বাধ্য হলেন না, গলা খুলে হাসলেনও। বরুণ তার গান শুনে মন্তব্য করলো, মামুনভাই, আপনার গলা তো ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতন! মামুন বললেন, আর তোমার গান তো অন্যদিকে ফিরে শুনলে মনে হয় হেমন্তবাবু গাইছেন!

দশদিন পর মঞ্জুর দু’খানা গানের রেকর্ডিং হলো বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের স্টুডিওতে। বেশ সুনাম হলো তার গানের।

শুধু স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠানেই নয়, বাংলাদেশের শিল্পীরা কলকাতা ও কাছাকাছি মফস্বলের নানান জলসাতেও অংশ গ্রহণ করেন। ক্রমে সেইসব আসরেও ডাক পড়তে লাগলো। মঞ্জুর। ব্যারাকপুর, চন্দননগর কিংবা বর্ধমানে দলবল মিলে হৈ হৈ করতে করতে যাওয়া, সেখানে বিপুল সংবর্ধনা ও গানবাজনা, খাওয়া-দাওয়া, তা ছাড়া রিলিফ ফাণ্ডের জন্য কিছু টাকাও পাওয়া যায়। অনেক গায়ক, শিল্পী, সাংবাদিক এসে পড়েছেন, তাঁদের সকলের স্থান সঙ্কুলান হয় না বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে, কলকাতায় শুভার্থীরা তাঁদের জন্য আলাদা আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ল্যান্সডাউন রোডের একটা ফ্ল্যাটে এরকম রয়েছেন পনেরো-ষোলোজন, পলাশ ও বরুণরা বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেছে, সেখানেও প্রায় সবসময়েই চলে গান বাজনা ও নাটকের মহড়া।

মঞ্জু ও হেনাকে সেখানে নিয়ে যায় শওকত। মামুন আপত্তি করেন না, সন্ধেবেলাটা ঘর ফাঁকা থাকলে তাঁর লেখালেখির সুবিধে হয়। আবার মনের মধ্যে একটা খটকাও থাকে। এভাবে মঞ্জু হেনাকে ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? এখনকার ছেলেমেয়েরা সমানভাবে মেশে, কলকাতায় এটা প্রায় স্বাভাবিক ব্যাপার, তবে কি মামুন এখনও ভেতরে ভেতরে প্রাচীনপন্থী রয়ে গেছেন?

হেনা আর মঞ্জুকে অনেকেই ভাবে পিঠোপিঠি দুই সহোদরা, মঞ্জু একটু সাজগোজ করলে মনেই হয় না যে তার একটি সন্তান আছে। এই দু’জনের প্রতি যুবকদের উৎসাহ দেখলে ভয় হবারই কথা। এখানে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তৌফিক ইমামের সঙ্গে মামুনের বেশ পরিচয় হয়ে গেছে, কাছেই তার বাড়ি। জাস্টিস ইমামের পরিবারের লোকজন হেনা-মঞ্জুদের। বেশ পছন্দ করে, ওরা সে বাড়িতে প্রায়ই যায়। সুখুর সমবয়েসী দুটি বাচ্চা আছে বলে মঞ্জু মাঝে মাঝে সেখানে সুখুকে রেখে আসে। একদিন মঞ্জু বলেছিল, মামুনমামা, জজসাহেবের মেজো ছেলে ফারুককে তো আপনি দেখেছেন। কী সুন্দর ব্যবহার। ওর সাথে হেনার বিয়ের সম্বন্ধ করলে কেমন হয়? হেনার সাথে খুব ভালো মানাবে!

মামুন প্রবল বেগে মাথা নেড়েছেন। দেশ স্বাধীন হবার আগে তিনি মেয়ের বিয়ের কথা চিন্তাই করতে চান না। কিন্তু তার আগেই মেয়ে যদি কারুকে পছন্দ করে বসে?

বাংলাদেশ মিশনের ঠিকানায় লণ্ডন থেকে ফিরোজার এক ভাইয়ের একটা চিঠি এসেছে মামুনের নামে। তাতে তিনি জেনেছেন যে, ফিরোজা এবং তার ছোট মেয়ে গ্রামের বাড়িতে ভালো আছে, মামুনও লণ্ডন ঘুরিয়ে একটা চিঠি লিখেছেন স্ত্রীকে

মাদারীপুরে সেরকম কিছু হামলা হয়নি, সে খবরও তিনি পেয়েছেন আগে। বাবুল চৌধুরীর এখনও কোনো সন্ধান নেই। ঢাকা থেকে যারা আসছে, তারাও বাবুল সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না।

শ্রীরামপুরে বাংলাদেশের শিল্পীদের একটা বিরাট সংবর্ধনা সভা হবে, সেখানে মঞ্জুকে নিয়ে যেতে চায় শওকত। আরও দু’জন মহিলা শিল্পীও যাচ্ছে। তিনখানা কোরাস গানে মঞ্জুর রিহার্সাল দেওয়া আছে, সেইজন্য মঞ্জুকে বিশেষ দরকার।

মামুন বললেন, শ্রীরামপুর? সে তো অনেকদূর।

শওকত বললো দূর কোথায়, মামুনভাই! গাড়িতে যাওয়া-আসা, আমরা রাত্তির সাড়ে নটা-দশটার মধ্যে ফিরে আসবো। অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে পাঁচটায়।

মামুন খুঁত খুঁত করতে লাগলেন। মঞ্জুকে অতদূর পাঠাতে তাঁর মোটেই ইচ্ছে করছে না, অথচ সরাসরি আপত্তি জানাতেও পারছেন না। শওকত হেনাকে নিয়ে যাবার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেনি, মামুন শেষ পর্যন্ত বললেন, হেনাও তাহলে সঙ্গে যাক। তোমার ওপরে দায়িত্ব দিলাম, শওকত।

হেনাকে তিনি সঙ্গে পাঠাতে চান মঞ্জুকে পাহারা দেবার জন্য। কিন্তু মঞ্জু যদি গানাটান নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন হেনাকে কে পাহারা দেবে? মঞ্জুর চেয়ে হেনার বয়েস অনেক কম, তার যদি মাথা ঘুরে যায়? কোন্ দিকটা যে মামুন সামলাবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। শওকতকে তিনি বিন্দুমাত্র অবিশ্বাস করেন না। মামুন রাগ করতে পারেন এমন কোনো কাজ শওকত কিছুতেই করবে না। কিন্তু অচেনা যায়গায় কত রকম মানুষ থাকে!

একজন বিবাহিতা রমণী অনাত্মীয়দের সঙ্গে দূরের কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইতে যাবে, এটা কিছুদিন আগেও অবিশ্বাস্য ছিল, কিন্তু হঠাৎ কেমন যেন সবকিছু পাল্টে গেছে। এই কয়েক মাসের মধ্যেই পরিবর্তিত হয়েছে অনেক মূল্যবোধ।

ওরা চলে যাবার পর মামুন একটা লেখা শেষ করবেন ভেবে বসলেন। কিন্তু একলাইনও লেখা এগোচ্ছে না। গোলমালের মধ্যেই তার লেখা অভ্যেস হয়ে গেছে। এখন নির্জনতার মধ্যে আর চিন্তাশক্তি কাজ করতে চায় না। সুখুকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে জাস্টিস ইমামের বাড়িতে, মামুন আজ প্রকৃতই একা।

লেখা ছেড়ে মামুন রেডিওটা নিয়ে খুটখাট করতে লাগলেন। এখন ভালো কোনো প্রোগ্রাম নেই। খাটে শুয়ে কিছুক্ষণ একটা বই পড়ার চেষ্টা করলেন, তাতেও মন বসলো না। ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। একবার ভাবলেন, প্রতাপের বাড়িতে যাবেন আড্ডা দিতে, কিন্তু সে বাড়ি অনেক দূর, সন্ধের পর গেলে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায়। বালু হক্কাক লেনে ‘জয় বাংলা’ অফিসে গিয়ে দেখলেন সেখানেও আজ কেউ নেই।

পার্ক সার্কাস ময়দানে ঢুকে মামুন চিনেবাদাম খেতে লাগলেন। সারাদিন অসহ্য গরম গেছে, সন্ধের পর অনেকেই পার্কে হাওয়া খেতে আসে। আকাশে মেঘের চিহ্ন নেই, বেশ জ্যোৎস্না উঠেছে, পার্কের মধ্যে এদিকে সেদিকে জোড়ায় জোড়ায় নারী-পুরুষদের বসে থাকতে দেখা যায়। দুদিন আগেই এই তল্লাটে নকশালরা প্রচুর বোমাবাজি করেছে তবু লোকে সন্ধের পর এখানে আসতে ভয় পায় না।

মামুনের মনে পড়ে গেল ঢাকার কথা। শোনা যায়, প্রায়ই সন্ধের পর ঢাকা শহরে কারফিউ থাকে। আজও কি কারফিউ? কলকাতার আকাশে জ্যোৎস্না ফুটলে ঢাকাতেও আজ জ্যোৎস্না থাকতে পারে। কতই বা দূর! জ্যোৎস্নার মধ্যে ঢাকার রাস্তাঘাট সব সুনসান ফাঁকা? মাঝে মাঝে দারুণ দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বোমা ফাটাতে শুরু করেছে, চোরাগোপ্তা খুনও হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকেরা। এই সময় কি সেনাবাহিনী ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে পেট্রোল দিতে? প্রেস ক্লাব বিল্ডিং-এ পঁচিশে মার্চ রাতে গোলাবর্ষণ করা হয়েছিল,তারপরেও কি সেখানে আর কেউ যায়? ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে যারা দিনের পর দিন কুৎসিত সব মিথ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তারাও তো বাঙালী, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায় না? কিংবা শুধু আর্মির ভয়েই তারা জেনেশুনে এইসব মিথ্যে প্রচার করছে? বাবুল চৌধুরী কোনোদিন আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদ সমর্থন করেনি, এই যুদ্ধ সম্পর্কে তার কোনো আগ্রহ নেই, আর্মির অফিসারদের সঙ্গে তার চেনাশুনো আছে, সুতরাং তার কোনো বিপদ হবার কথা নয়। হয়তো সে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ নিয়ে কোনো কাজ করছে এখন, আর তার বউ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা দেবার জন্য গান গাইছে বেতারে!

শ্রীরামপুরের অনুষ্ঠানে তাঁকেও তো ডাকলে পারতো। তিনি হেনা-মঞ্জুদের সঙ্গে গেলে আর কোনো চিন্তা থাকতো না। তাঁর মতন একজন বয়স্ক মানুষকে ওরা সবসময় সঙ্গে নিতে চায় না। তাতে অনেক মজা মাটি হয়। পৃথিবীটাই যৌবনভোগ্যা। মামুনের মতন প্রবীণদের এখন স্থান ছেড়ে দিতে হবে।

নটা বাজবার আগেই মামুন বাড়িতে ফিরে এলেন। মঞ্জুরা যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে রান্না করে রেখে গেছে। খরচা বাঁচাবার জন্য এমনিতেই প্রায় দিনই একবেলা রান্না হয়। ভাতে পানি ঢালা আছে, এই গরমে পান্তা ভাত বেশ ভালোই লাগে।

সুখু আজ রাতটা জজ সাহেবের বাড়িতেই থাকবে। হেনা-মঞ্জুরা খুব সম্ভবত খেয়েই আসবে। ভাত না খাওয়ালেও এইসব অনুষ্ঠানের পর এতসব নোন্তা আর মিষ্টি খাবার দেয় যে তারপর আর বাড়িতে এসে কিছু খেতে ইচ্ছে করে না।

রেডিওটা চালিয়ে ঘড়ির দিকে চোখ রেখে মামুন একাই খেতে বসলেন সাড়ে নটার সময়। কিছু কাজ করার না থাকলেই বেশি খিদে পায়। এইবার মঞ্জুদের এসে পড়া উচিত।

দশটা বেজে গেল, তবু ওদের ফেরার নাম নেই। শওকত কথা দিয়ে গিয়েছিল, এরা কথা রাখতে জানে না। দশটা কি কম রাত? গাড়ি করে আসবে, পথে কত রকম বিপদ হতে পারে, ওদের কি তাড়াতাড়ি রওনা দেওয়া উচিত ছিল না? ছেলে ছোকরাদের কোনো আক্কেল নেই।

শওকত বিয়ে করেছিল তাঁরই পরিচিত ওয়ালীউল ইসলামের ছোট মেয়ে নাসিমকে। বড় চাপা আর নিরীহ মেয়ে ছিল সে। সে বেচারি প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। তারপর কি আর শওকত বিয়ে করেছে? কিছু বলেনি তো! মঞ্জুকে সে কি শুধু স্নেহ করে না অন্যকিছু? হঠাৎ মামুনের মনে পড়ে গেল, বাবুল চৌধুরীর সঙ্গে শওকতের কোনোদিন ঠিকমতন ভাব জমেনি। একদিন শওকতের সঙ্গে বাবুলের কী নিয়ে যেন খুব কথাকাটাকাটি হয়েছিল না? শওকত এখানে প্রথম দিন এসে আলতাফের চিঠি দিয়েছিল, তারপর সে আর বাবুল সম্পর্কে কোনোরকম উচ্চবাচ্য করেনি। বাবুলের কোনো বিপদ হলেও যেন কিছু যায় আসে না। সে মঞ্জুকে নিয়ে মেতে উঠেছে।

এগারোটা বেজে যাবার পর মামুন রীতিমতন ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। জনবহুল কলকাতা রাস্তাও এখন প্রায় নিঃশব্দ হয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই কোনো বিপদ হয়েছে ওদের। মঞ্জুর যদি খারাপ কিছু ঘটে যায়, তা হলে মামুন তাঁর দিদির কাছে, মঞ্জুর স্বামীর কাছে কী কৈফিয়ত দেবেন? সকলেই বলবে, মামুন কেন মঞ্জুকে অতদূর যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন! মঞ্জুর সঙ্গে হেনাও গেছে, সেটা তাঁর আরও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কাজ হয়েছে।

এখন মামুন কী করবেন, কাকে খবর দেবেন? থানায় যাওয়া উচিত? বাংলাদেশ মিশনে? সেখানে এত রাতে কেউ থাকবে?

অসহায়ভাবে ছটফট করতে লাগলেন মামুন, কিছুক্ষণ বাড়ির সামনে রাস্তায় পায়চারি করলেন, তারপর ওপরে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন জানলায়।

পৌনে একটার সময় বাড়ির সামনে একটা প্রাইভেট গাড়ি থামলো। সদর দরজা খোলাই রেখেছেন মামুন, তিনি দেখলেন প্রথমে হেনা নেমেই দৌড়ে ঢুকে এলো বাড়ির মধ্যে। তারপর মঞ্জু নেমে কয়েক পা এগোতেই গাড়ির মধ্যে থেকে কেউ তাকে ডাকলো।

গাড়ি থেকে নামলো পলাশ, শওকত কোথায়? গাড়িতে আর কেউ আছে বলে তো মনে হয় না। নিয়ে গেল শওকত আর ফিরে এলো পলাশের সঙ্গে? পলাশের হাতে কিসের যেন একটা বড় প্যাকেট। মঞ্জুর কাছে এসে সে প্যাকেটটি তুলে দেবার আগে মঞ্জুর মুখের দিকে তাকালো, মঞ্জুও চেয়ে রইলো একদৃষ্টিতে। যেন সেই দৃষ্টির মধ্যে একটা সেতুবন্ধন আছে। দপ করে মামুনের মাথার মধ্যে জ্বলে উঠলো একটা তীব্র শিখা। সেটা রাগ না ঈর্ষা! বাবুল চৌধুরীকে কী কৈফিয়ত দেবেন সে কথা মামুনের মনে পড়লো না, তার মনে হলো পলাশ নামের ঐ ছোকরা মঞ্জুকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে! ঐ ছেলেটার চোখদুটো উপড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে হলো মামুনের।

৩৪. দু শো-আড়াই শো জন যুবক

দু শো-আড়াই শো জন যুবক মিলে একটা পুকুর কাটতে শুরু করেছে। পাশের গ্রামের চাষীদের কাছ থেকে যে যা পারে খন্তা-কোদাল-শাবল ধার করে এনেছে, ঝুড়ি-ঝোড়াও যোগাড় হয়েছে কিছু। খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে সকাল থেকে, দুপুরবেলাতেই আকাশে ঘনাচ্ছে কালো। মেঘ, আজ সন্ধেবেলা আবার নির্ঘাৎ ঝড় বৃষ্টি নামবে, কাজ শেষ করে ফেলতে হবে তার আগে আগে।

একেবারে শুকনো জায়গায় পুকুর কাটা হচ্ছে না, এখানে একটা কাদাজলের ডোবা ছিল আগেই। কাছাকাছি কোনো জনবসতি নেই, চার পাশটা অনেকটা পতিত জমির মতন। এখানে কয়েকসার নতুন ক্যাম্প বসাবারও জায়গা পাওয়া যাবে।

এখন যুদ্ধের চেয়ে পুকুর খোঁড়াটাই বেশী জরুরি। বেলুনিয়া পতনের পর বোঝা গেছে, বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু আক্রমণ ও প্রতিরোধ করে মুক্তিযুদ্ধ চালানো যাবে না। যুদ্ধের প্রস্তুতি ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।

কিন্তু প্রতিদিন শত শত যুবক আসছে মুক্তি যুদ্ধের সৈনিক হবার জন্য নাম লেখাতে। ভারতীয় সীমান্তের ক্যাম্পগুলিতে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। এদের ট্রেনিং দেবার উপায় তো দূরে থাক, শুধু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেই হিমসিম খাবার মতন অবস্থা সেক্টর কমাণ্ডারদের। অথচ ছেলেগুলি আসছে প্রচণ্ড উদ্দীপনা এবং দেশ স্বাধীন করার মৃত্যুপণ নিয়ে, এদের ফিরিয়ে দেওয়াও যায় না! তাঁবুগুলির অতি জীর্ণদশা, ইতিমধ্যে নেমে গেছে প্রবল বর্ষা, এখন কোনোক্রমে মাথা গোঁজাই একটা বড় সমস্যা। দু’বেলা আহার্যের মধ্যে শুধু চাল আর ডাল, তাও দু’একদিন অন্তরই চাল ফুরিয়ে যাওয়ায় আবার বস্তা বস্তা চাল যোগাড় করার জন্য মাথা ঘামাতে হচ্ছে। প্রতিবছরই জুন-জুলাই মাসে চালের দর বাড়ে, এবার আরও বেড়েছে।

খাদ্যের চেয়েও পানীয় জল এবং গোসল করার পানির সমস্যা কম জরুরি নয়। সীমান্ত। ক্যাম্পগুলির কাছাকাছি পুকুরের জল দূষিত হয়ে গেছে। হুড়োহুড়ি করে যে দু’চারটি টিউবওয়েল খোঁড়া হয়েছিল, তাও অকেজো হয়ে যাচ্ছে অতি ব্যবহারে। খাদ্যের চেয়েও পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তা যে কত বেশী, তা বোঝা যায় এইসব সঙ্কটের সময়ে। দু’একটি ক্যাম্পে কলেরা শুরু হতেই ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, তার ওপর শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক চোখের অসুখ। হঠাৎ চোখ লাল হতে শুরু করে, তারপর চোখের কোণে পুঁজ জমতে থাকে। সেই সঙ্গে দুর্বিষহ জ্বালা। ডাক্তাররা এই রোগের নাম বলেন কনজাংকটিভাইটিস। কিন্তু লোকের মুখে মুখে এ রোগের নতুন নাম হয়েছে জয় বাংলা! কেউ বলে, এই রোগ আসছে ঢাকা থেকে, কেন না পাকিস্তানী সৈন্যদের মধ্যেও এই চোখ লাল করা রোগ ছড়িয়েছে, আবার কেউ বলে ভারত থেকেই আসছে এই ভাইরাস! মোটকথা, ঢাকা-আগরতলা-কলকাতা, কোথাও এই বিরক্তিকর রোগের উপদ্রব কম নয়। ঢাকাতে কলেরাও শুরু হয়ে গেছে এবং পাকিস্তান রেডিও অশ্রান্ত ভাবে প্রচার করে যাচ্ছে যে এই কলেরার বীজাণু ছড়াচ্ছে ভারত।

চোখের রোগটার কোনো ওষুধ নেই, শুধু জলের ঝাঁপটা দিলে খানিকটা জ্বালার উপশম হয়। কিন্তু প্রাণে ধরে কি কেউ নিজের চোখে দুর্গন্ধ নোংরা জলের ঝাঁপটা দিতে পারে! তাই গত দু’দিন ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলিতে অন্য সব কাজ বন্ধ রেখে শুধু নতুন পুকুর কাটার উদম চলছে।

যারা মাটি কাটছে ও মাটি বইছে, তাদের দেখলেই বোঝা যায় যে, তারা জীবনে কখনো এই কাজ করেনি। অধিকাংশই কলেজের ছাত্র, সচ্ছল বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে এসে তাদের পক্ষে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ দেওয়া তবু সহজ, কিন্তু পুকুর কাটা, কলেরা রোগীর সেবা করা, কিংবা ছেঁড়া তাবু, বাঁশ, চাটাই, বেড়া, হাঁড়িকুড়ি মাথায় করে বয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া এদের পক্ষে অনেক শক্ত কাজ। টি ভারতীয় সীমান্তের ঠিক ধার ঘেঁষে ঠাকুর গাঁও শিবিরের কাছাকাছি দুটি পুকুরই একেবারে নোংরা হয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরাই নতুন পুকুর খোঁড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এত কষ্টের মধ্যেও হাস্য পরিহাস বন্ধ হয়নি।

টাঙ্গাইলের এক ছেলে গৃহত্যাগ করার সময় তাদের পারিবারিক সম্পত্তির মধ্যে থেকে একটি পুরোনো তলোয়ার সঙ্গে এনেছিল, শাবল-কোদাল কিছু যোগাড় করতে না পেরে সে সেই তলোয়ার দিয়েই মাটি খুঁড়ছে, তার কাছাকাছি লোকেরা প্রবল হা হা শব্দে হাসছে। তলোয়ার দিয়ে পুকুর খোঁড়া, এটা হাসির ব্যাপার নয়! কাদার মধ্যে বারবার আছাড় খেয়ে কারুর চেহারা হয়েছে ভূতের মতন।

বিকেলের দিকে সনে হাওয়া ও টিপিটিপি বৃষ্টি শুরু হলো। দুপুরে কেউ কিছু খায়নি, তবু এই বৃষ্টির মধ্যেও কেউ কাজ ছেড়ে চলে গেল না। আজ সন্ধের মধ্যে শেষ করতে পারলে বৃষ্টির জলে পুকুর ভরে যাবে। কুমিল্লা ভিকটোরিয়া কলেজের অধ্যাপক হাসমত সাহেব সবকিছু দেখাশুনোর দায়িত্ব নিয়েছেন, রোগা-পাতলা মানুষটি পুকুরের চার ধার ঘুরে ঘুরে লাফিয়ে লাফিয়ে বলছেন, হাত চালাও! হাত চালাও! ভাই ও বন্ধু হাত চালাও, হাত চালাও! সন্ধ্যার সময় গরম গরম খিচুড়ির সাথে আইজ ডিম সেদ্ধ পাবা, হাত চালাও, হাত চালাও!

হঠাৎ হাসমত সাহেবের নজর গেল একজনের প্রতি। টাউজার্স ও গেঞ্জিপরা এই ব্যক্তিটি অসম্ভব রূপবান, গায়ের রং রক্তচন্দনের মতন, বেশ দীর্ঘকায় ও ছিপছিপে, তীক্ষ্ণ নাক, ওষ্ঠাধর এমনই পাতলা যে নারীদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যদিও সারা মুখে অল্প অল্প দাড়ি, তবু এই মানুষটিকে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হয় হাসমত সাহেবের। এই লোকটি কারুর সঙ্গে কোনো কথা বলছে না, নিজেই কোদালে মাটি কেটে একটা ঝুড়িতে ভরছে, তারপর নিজেই সেটা মাথায় নিয়ে ওপরে উঠে এনে ফেলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট জায়গায়। লোকটার চোখেমুখে যে চাপা আভিজাত্যের ছাপ, তাতেই বোঝা যায় যে, তাকে অন্য কোনো সম্মানীয় কাজ দেওয়া উচিত ছিল। বয়েসেও সে অন্যদের চেয়ে বড় মনে হয়।

হাসমত তবু বিশেষ মাথা ঘামালেন না। চেনা লোক হলেও তার সঙ্গে এখন আলাপ করার সময় নয়। তা ছাড়া চেনা কারুর সঙ্গে কথা বলতেও ভয় হয়, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ট্র্যাজিক কাহিনী বহন করে এনেছে। কত আর শোনা যায়! সারা বাংলাদেশে পাক বাহিনীর অত্যাচার সমস্ত বিশ্বাসযোগ্যতার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

খানিকবাদে এক জায়গায় হৈ চৈ ও ক্ষুব্ধ চিৎকার শুনে হাসমত সেদিকে ছুটলেন। এখানে মারামারি লেগে গেছে। এরকম মারামারি লাগছে প্রায়ই। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়বার জন্য ছুটে এলেও এইসব যুবকেরা এখনো পুরোনো রাজনৈতিক দলাদলি কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা পুরোপুরি ভুলতে পারেনি। শরীরের বিষ ফোঁড়ার মতনই ক্রোধ ও বিদ্বেষ মাঝে মাঝে খুঁসে ফুঁসে ওঠে। মুক্তি যোদ্ধাদের ক্যাম্প চালাতে গিয়ে হাসমত গোড়া থেকেই অনুভব করছেন যে শুধু দেশপ্রেমের আবেগই যথেষ্ট নয়, একটা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে গেলে প্রত্যেককে আগে কঠোর ভাবে নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষার ট্রেনিং দেওয়ারও খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তার সময় কোথায়? দলে দলে ছেলেরা আসছে, তাদের চার-পাঁচ দিন কোনরকমে প্রাথমিক গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়ে আবার ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরা একটা রোমান্টিক যুদ্ধের স্বপ্ন চোখে নিয়ে এসেছে, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো অ্যাকশানে যেতে চায়, কিন্তু প্রত্যেকের হাতে তুলে দেবার মতন অস্ত্রও নেই, তা ছাড়া এলোমেলো অ্যাকশনেরও কোনো মানে হয় না।

হাসমত ছুটে এসে দেখলেন, সেই ফর্সা, সুদর্শন পুরুষটিকেই মাটিতে শুইয়ে ফেলে তার বুকের ওপর চেপে বসেছে একজন, আর দশ-বারোজন এক সঙ্গে চ্যাঁচাচ্ছে, মার, মার, খতম কইরা ফ্যালা!

হাসমত রুক্ষভাবে অন্যদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে গিয়ে বললেন, থাম, থাম! কী হইছে, কী হইছে আগে ক!

সবাই চেঁচিয়ে উঠলো, স্পাই! স্পাই! রাজাকার! আলবদর!

কয়েকজন শাবল, খন্তা উচিয়েছে, এখুনি লোকটির মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবে, হাসমত দু’হাত তুলে গলা ফাটিয়ে বললেন, খবর্দার, কেউ মারবা না! সেকটর কমাণ্ডারের অর্ডার, স্পাই ধরা পড়লে হ্যাঁর কাছে নিয়া যাইতে হবে! ইন্টারোগেশান কইরা খবর বাইর করতে হবে! অরে আমার হাতে দ্যাও!

স্পাই শব্দটাই এমন যে একবার উচ্চারিত হলেই বিদ্যুৎ তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, স্পাইকে খুন করার আগ্রহে ছড়িয়ে পড়ে দারুণ উল্লাস। ফর্সা লোকটির বুকে যে চেপে বসে আছে তার নাম সিরাজুল। দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে এর মধ্যেই তার খুব নাম ছড়িয়েছে। একটি প্লাটুনের নেতৃত্বের ভার তার ওপর। সেই সিরাজুল রক্ত চক্ষু তুলে বললো, সার এডারে আমি ভালো। কইরা চিনি, আমি নিজের হাতে এড়ারে শ্যাষ কইরা দিতে চাই!

হাসমত কঠোরভাবে বললেন, ছাড় অরে তুই! উইঠ্যা আয়!

কোথা থেকে দড়ি যোগাড় হয়ে গেল, লম্বা লোকটির হাত দুটো বাঁধা হলো পিছমোড়া করে। তার নাক দিয়ে দরদর করে গড়াচ্ছে রক্ত, একটা চোখ বুজে গেছে, হাসমত আর এক মিনিট দেরি করলে একে আর খুঁজে পাওয়া যেত না। অন্যরা চ্যাঁচামেচি করে যা অভিযোগ জানাচ্ছে তার মর্মার্থ এই যে, এই লোকটা গত তিন চার দিন হলো এখানকার ক্যাম্পে যোগ দিয়েছে। কিন্তু সে কারুর সঙ্গে একটাও কথা বলেনি, এর নাম কেউ জানে না, কোথা থেকে এসেছে তারও কোনো উদ্দেশ নেই। এর সম্পর্কে অনেকের মনেই সন্দেহ জেগেছিল, আজ সিরাজুল একে একজন কোলাবোরেটার হিসেবে চিনে ফেলেছে!

হাসমত বললেন, আমি এরে মেজর সাহেবের কাছে নিয়ে যাইতাছি, তোমরা কাজ করো, কাজ করো! কাজ শেষ না করলে ছুটি নাই!

যেন অন্যদের খুশি করার জন্যই হাসমত সেই বন্দীর গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই, তুই কথা কস্ না ক্যান? তোর নাম কী?

থাপ্পড় খেয়ে লোকটির মুখখানা একদিকে বেঁকে গেল, তবু কোনো শব্দ বেরলো না।

সিরাজুল বললো, সার, আমিও আপনার সাথে যামু। এডারে আমি কিছুতেই ছাড়ুম না।

তারপর সে লোকটিকে এক ঠ্যালা মেরে বললো, চল, হারামজাদা!

অন্য লোকজনদের ছাড়িয়ে, ফাঁকা মাঠের মধ্যে এসে সিরাজুল হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো, গভীর বিস্ময়ে মুখ ফিরিয়ে হাসমত জিজ্ঞেস করলেন, তোর আবার কী হইলো? এই সিরাজুল, কী হইলো?

কান্নার আবেগে সিরাজুল কোনো কথা বলতে পারছে না। যেন তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে, মাটিতে বসে পড়ে সে প্রায় দম বন্ধ গলায় চিৎকার করতে লাগলো, মনিরা, মনিরা!

সিরাজুলের মতন একটা বেপরোয়া জেদী ছেলে যে এরকম ভাবে কাঁদতে পারে তা যেন। বিশ্বাস করতে পারছেন না হাসমত। তিনি বারবার হাত বাঁধা লোকটির মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। এখন আরও বেশী চেনা চেনা লাগছে। মুখোনি গভীর বিষাদে মাখা। কিন্তু যার উপলব্ধি গভীর নয়, তার মুখে এরকম বিষাদ ফুটতে পারে না। এরকম চেহারার মানুষ কি গুপ্তচর হতে পারে? গ্রামের অশিক্ষিত গুণ্ডা ধরনের ছেলেদের নিয়েই রাজাকার, আলবদর বাহিনী গড়েছে পাকিস্তানী সরকার। এই মানুষ কিছুতেই সে রকম হতে পারে না।

হাত বাঁধা লোকটি এবার আস্তে আস্তে বললো, আমি মানিরাকে অনেক খুঁজেছি, সিরাজুল, বিশ্বাস করো—

সেই কণ্ঠস্বর শুনেই চিনতে পারলেন হাসমত। এ যে তাঁর সহপাঠী। বাবুল চৌধুরী, তাঁদের সময়কার ফাস্ট বয়!

তিনি বলে উঠলেন, বাবুল? আমারে চিনতে পারস নাই? আমি হাসমত। বাবুল, তুই এইখানে।

সিরাজুল কান্না থামিয়ে লাফিয়ে উঠে বাবুল চৌধুরীর টুটি চেপে ধরে বললো, আজরাইল! এই আজরাইলডা আমার সর্বনাশ করছে! অরে আমি নিজের হাতে।

অতি কষ্টে সিরাজুলের হাত থেকে বাবুলকে ছাড়িয়ে হাসমত তাকে নিয়ে গেলেন সেকটর ওয়ান-এর কমাণ্ডার মেজর রফিকুল ইসলামের কাছে। মেজর রফিকুল ইসলাম তখন আরও কয়েকজন সামরিক অফিসারের সঙ্গে জরুরি বিষয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন, তিনি হাসমতের ওপরেই ভার দিলেন এই বিবাদের নিষ্পত্তি করতে।

একটা ফাঁকা তাঁবুতে বাবুল চৌধুরীকে নিয়ে বসলেন হাসমত, কিন্তু সিরাজুল এমনই চ্যাঁচামেচি করতে লাগলো যে আসল ঘটনা জানারই কোনো উপায় রইলো না। তার চিৎকার শুনে আশেপাশে অন্য লোকও জড়ো হয়ে যায়। একটু পরে অবশ্য খানিকটা সুবিধে হলো, মেজর রফিকুল ইসলামের অডার্লি এসে ডেকে নিয়ে গেল সিরাজুলকে।

হাসমত দু’কাপ চা যোগাড় করে আনলেন। তারপর নিজের সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ইস, এমনভাবে মারছে আগে আমার সাথে যোগাযোগ করিস নাই ক্যান? তোর এই অবস্থা হইলো ক্যামনে? তুই মাটি কাটতে গেছোস…সব কথা আমারে খুইলা বল তো এবার!

চা-টা খেয়ে নিল বাবুল, কিন্তু সিগারেট প্রত্যাখ্যান করলো। কথা বলতেও তার ইচ্ছে করছে না। সে দীর্ঘশ্বাস নিতে লাগলো বারবার। তার ইচ্ছে করছে শুয়ে পড়তে।

হাসমত বাবুলকে একটা ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সিরাজুলের সাথে তোর আগে কোথায় দেখা হইছিল? মনিরা কে? ব্যাপারটা কী ঘটছে?

বাবুল হাসমতের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন অনেক দূরে। অস্ফুট স্বরে সে বললো, আমি দেখলাম একজন মা নিজের হাতে তার ছেলেটারে মেরে ফেললো!

হাসমত আঁতকে উঠে বললেন, কোন মা? সেই কি মনিরা?

বাবুল দু’দিকে মাথা নাড়লো।

গত কয়েক মাসে বাবুল বহু সাঙ্ঘাতিক অভিজ্ঞতা পার হয়ে এসেছে কিন্তু তার এখন শুধু মনে পড়ছে মাত্র দিন সাতেক আগের একটা ঘটনা। সেটা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না বলে কথাও বলতে পারছে না।

প্রতিদিন দলে দলে মানুষ যাচ্ছে সীমান্তের দিকে। গ্রাম থেকে যুবকেরা অনেক আগেই সরে পড়েছে। এখন যাচ্ছে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের স্রোত। অসহায়, দুঃখী মানুষেরা চলেছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। ভারতের রেফিউজি ক্যাম্পগুলিতে কলেরার তাণ্ডবের খবর এদিকেও এসে পৌঁছেছে, তবু এরা নিবৃত্ত হচ্ছে না। রোগ ভোগের মৃত্যুটা প্রকৃতির সংহার। হানাদারের অস্ত্রে মরার চেয়েও সেটাও বোধহয় শ্রেয়।

বাবুল শেষপর্যন্ত জুটে পড়েছিল এই রকম একটি দলে। দিনেরবেলা ঝোপেজঙ্গলে লুকিয়ে থেকে রাত্তিরবেলা পথ চলা। রাত্তিরে যখন তখন আর্মি পেট্রল কিংবা হেলিকপটার-টহলে ধরা পড়ে যাবার ভয় থাকে। এই দলটারই কিছু লোক আর্মির গুলিতে মরেছে, দুটি যুবতাঁকে সকলের সামনে লাঞ্ছনা করেছে, তারা শেষপর্যন্ত আর আসতেই পারেনি।

তৃতীয় দিন ভোরবেলা ওরা হঠাৎ প্রায় ধরা পড়ে যেতে বসেছিল। একটা ছোট নদী পার হতেই দেখলো দূরে দুটি মিলিটারির গাড়ি। তখন আর পেছোবার উপায় নেই। পাশেই একটা পাট ক্ষেত দেখে সবাই ঢুকে পড়লো সেখানে। প্রায় সাত-আট ফুট লম্বা পাট গাছের বিস্তীর্ণ ক্ষেত। তারমধ্যে একদল মানুষ ঢুকে বসে থাকলে বোঝবার উপায় নেই। শুধু কোনো শব্দ করা যাবে না, বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও এটা বুঝে গেছে, তবু দু’আড়াই বছরের একটি শিশু মায়ের কোলের মধ্যে হঠাৎ কেঁদে উঠলো। হয়তো তাকে কোনো পোকা কামড়ে ধরেছিল, কিন্তু তখন আর তা দেখার সময় নেই, মা তার সন্তানের মুখটা চেপে ধরলো। তখন মিলিটারির গাড়ি পাট ক্ষেতের ধার দিয়ে যাচ্ছে, কী শ্লথ তাদের গতি, যেন কিছু সন্দেহ করেছে, খান সেনাদের কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে। শিশুটি কিছু বুঝছে না, সে মায়ের হাত ছাড়াবার জন্য ছটফট করছে, আর তার মা প্রাণপণে চেপে ধরে আছে তার মুখ…

খানসেনারা নদী পার হবার আগেই শিশুটি মারা গেছে তার মায়েরই হাতের চাপে। কেউ তার জন্য জিভের চুকচুক শব্দও করল না, এতগুলি মানুষের জীবনের তুলনায় একটা শিশুর জীবন অতি তুচ্ছ। তার সামান্য কান্নার আওয়াজ শোনা গেলেই দলকে দল নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। সবাই বললো, ছেলেটাকে ঐ পাটক্ষেতেই ফেলে চলে যেতে, এমন কি শিশুটির বাবা পর্যন্ত, কিন্তু জননীটির তখন এক অদ্ভুত বিহ্বল অবস্থা, সে যেন তখনও ঠিক ভুলতে পারছে না যে সে কি একজন হত্যাকারিণী, না এতগুলি মানুষের জীবনদাত্রী। এই শিশুটির জীবনের বিনিময়েই যদি এতগুলি মানুষ প্রাণে বাঁচে থাকে তা হলে তার জন্য এই শিশুটি কোনো সম্মান পাবে না! মৃত শিশুটিকে বুকে চেপে ধরে তার মা একটা দৌড় লাগালো।

শিশুটির মুখ একবারই মাত্র দেখেছিল বাবুল। অবিকল যেন তার ছেলে সুখুর মতন।

এই ঘটনা কি কারুর কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করা যায়? সে ভাষা নেই বাবুলের।

নিজের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার পর বাবুল তার পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ করেছিল। জহিরের বাসা ফাঁকা, সেখানে কেউ নেই, কোথায় গেছে তাও কেউ বলতে পারে না। অন্য বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন ইণ্ডিয়ায় পালিয়ে গেছে, কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামে, আর দু’একজন যোগ দিয়েছে শান্তি কমিটিতে। পল্টন যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীতে, সে আছে মেজর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে।

মনিরার খোঁজ করার জন্য বাবুল আর্মি ক্যান্টনমেন্টে পর্যন্ত গিয়েছিল। তার বন্ধু পাকিস্তানী কর্নেলটি তাকে জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। একটু দেরি হলে তারা বাবুলকেও ছাড়তো না। সাধারণ সোলজাররা কোনো যুবতাঁকে জোর করে ধরে নিয়ে গেলে তারপর আর তার খোঁজ করা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিছুদিন পরেই তার লাশ শিয়াল-শকুনের খাদ্য হবে। কিন্তু মনিরার লাশ না দেখা পর্যন্ত বাবুল নিবৃত্ত হতে চায়নি। সে শুধু এইটুকু খবর পেয়েছিল যে, যে হাবিলদারটি মনিরার হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সে বদলি হয়ে গেছে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। চট্টগ্রাম পর্যন্ত আর পৌঁছোতে পারেনি বাবুল।

সন্ধে হতে না হতেই বৃষ্টি নামলো। হৈ হৈ করে গান গাইতে গাইতে ফিরে এলো পুকুর কাটা যুবকের দল। হাসমত বাবুলের মুখ থেকে কোনো কথা বার করতে না পেরে শেষপর্যন্ত ধৈর্য। হারিয়ে ফেলে বললেন, তাইলে তুই শুইয়া থাক, বিশ্রাম নে। তবে কোথাও চইল্যা যাইস না, মেজর সাহেবের কাছে আমারে তোর ব্যাপারে রিপোর্ট করতে হবে।

বাবুল এবারে হাসমতের হাত চেপে ধরে বললো, সিরাজুলের সাথে আমার কথা বলতেই হবে। ও যদি আমারে খুন করতে চায় তো করুক। কিন্তু নিজের জান দিয়াও আমি মনিরারে বাঁচাবার চেষ্টা করেছি, সে কথাটা ওরে বিশ্বাস করাতেই হবে!

হাসমত বললো, আইচ্ছা, তুই বয়, আমি দেখি সিরাজুল কোথায়!

খোঁজ নিয়ে জানা গেল সিরাজুল তখনও রয়েছে মেজর সাহেবের ক্যাম্পে। সেখানে দু’জন পরিচিত ব্যক্তিও রয়েছে, খুব সম্ভবত ইণ্ডিয়ান বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের দু’জন অফিসার। সেখানে চলেছে দীর্ঘ ইন্টারভিউ।

আরও আধ ঘণ্টা পরে সিরাজুল সেই ক্যাম্প থেকে বেরুতেই হাসমত তাকে ধরলেন। সিরাজুলের চোখ মুখের চেহারা এখন সম্পূর্ণ অন্য রকম, যেন বেশ একটা গর্ব আর আনন্দের ভাব। বিকেলবেলা মাঠের মধ্যে বসে যে কেঁদেছিল, সে যেন অন্য সিরাজুল।

বি এস এফ-এর অফিসাররা দু’জন খুব ভালো সাঁতার জানা, শক্ত সমর্থ, সাহসী যুবককে নিতে এসেছে, কোনো একটা বিশেষ ব্যাপারে ট্রেনিং দেবার জন্য। মেজর সাহেব বেছে বেছে। পনেরো জনকে হাজির করিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে একমাত্র সিরাজুল মনোনীত হয়েছে। রফিকুল ইসলাম নিজে সিরাজুলের কাঁধ চাপড়ে তাকে কনগ্রাচুলেট করেছেন। শিগগিরই তাকে নিয়ে যাওয়া হবে কোনো অজ্ঞাত জায়গায়।

নিজেকে এখন খুব দামী আর প্রয়োজনীয় মনে করছে সিরাজুল। সেইজন্যই যেন বাবুল চৌধুরীর ওপর রাগ কমে গেছে অনেকখানি।

হাসমত তাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, শোন, আমি তো বাবুল চৌধুরীকে অনেকদিন থিকা চিনি। সে মিথ্যা কথা কওয়ার মানুষ না। সে কইছে, সে নিজের জান দিয়াও তোর বউরে বাঁচাবার চেষ্টা করছিল। হয়তো তোর বউ আছে কোথাও পলাইয়া।

সিরাজুল হাসমতের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ও কথা বাদ দ্যান, সার। কিন্তু আসল। কথা হইলো, বাবুল চৌধুরী আমাগো ক্যাম্পে আইছে ক্যান সেইটা জানছেন? সে মুক্তিযুদ্ধ সাপোর্ট করে না, স্বাধীন বাংলা দেশ মানে না, সে তো চীনাপন্থী।

হাসমত বললেন, অনেক চীনাপন্থী এখনে মত চেইঞ্জ করছে, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। আসতেছে।

সিরাজুল বললো, আমি বিশ্বাস করি না, সার। অনেক আর্মি অফিসারের সঙ্গে তার দোস্তি আছে, সে একজন কোলাবরেটর। সে এখানে কোনো মতলোবে আইছে!

–এ কথা ঠিক না, সিরাজুল। বাবুল চৌধুরীগো মতন মানুষ স্পাই হয় না। তার। ইডিয়লজির সাথে তোমার মিল না হইতে পারে কিন্তু সে খাঁটি মানুষ।

–তার সাথে আর্মি অফিসারগো দোস্তি আছে, আমি নিজে জানি! অনেকেই জানে।

–আর একটা বিরাট পরিবর্তন হইছে, কেমন যেন ঘোর লাগা মানুষের মতন ভাব। সিরাজুল, তুমি বাবুলরে কয়দিন জানো? সে নিজে নিজে পুকুরের মাটি কাটতে গেছিলো।

–সার, আপনেরে আমি সাফ কথা বলি। সে কি কোনো অ্যাকশানে যাবে? সে দেশের জন্য প্রাণ দিতে রাজি? আজ রাত্তিরেই দুইটা অ্যাকশন টিম অ্যামবুশ করতে যাবে। তারে একটা দলে পাঠান।

–এত তাড়াতাড়ি না। সে অসুস্থ, শুধু শরীরে না, মনেও। তা ছাড়া তার ট্রেনিং নাই।

–সে যে পাপ করেছে, সেই পাপস্খলন হবে যদি সে দেশের জন্য প্রাণ দিতে যায়। নইলে আমি আপনেরে কইয়া দিলাম, সার, ঢাকায় তারে যারা জানতো, সেইরকম কোনো মুক্তিযোদ্ধা তারে দ্যাখলেই মাইরা ফেলবে। আমি না মারি, অন্য কেউ মারবে, সিওর!

সিরাজুলকে নিয়ে হাসমত একটু পরে গেলেন বাবুল চৌধুরীর কাছে। বাবুল ঠিক একই জায়গায় ঠায় একেবারে বসে আছে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে তার।

সিরাজুলকে দেখে সে শান্তভাবে বললো, আমারে মারিস না, আমারে মারলে একজন ফ্রিডম ফাইটার কমে যাবে।

সিরাজুল হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বললো, ওঠো বাবুল চৌধুরী, আজই তোমারে রাইফেল নিয়া যুদ্ধে যাইতে হবে। তুমি কী রকম ফ্রিডম ফাইটার তার প্রমাণ দাও।

৩৫. তার নাম তোতা মিঞা

খবরটা এনেছিল একটি দশ-এগারো বছরের ছেলে। তার নাম তোতা মিঞা, সে নিজেই বলে, আমার নাম সাব, তোতা মিঞা, আমি ইসকুলে কেলাস ফোরে পড়ি। তার পরনে একটা ঢোলা খাঁকি হাফ প্যান্ট, সেটা তার নিজের নয়, প্রাপ্তবয়স্ক কারুর তা বোঝাই যায়, গায়ের রং পদ্মপাতার মতন, চোখ দুটি টানাটানা, তার মুখে এখনো শৈশবের দুধ-লাবণ্য লেগে আছে। যদিও সে কথা বলে বেশ জোর দিয়ে, দায়িত্বের সঙ্গে, মাঝে মাঝে চঞ্চলভাবে পিছন ফিরে তাকায়, যেন এই কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় সে অনেক বয়স্ক হয়ে উঠেছে।

এমনই দিনকাল যে এইটুকু একটি বালকের কথাও সহজে বিশ্বাস করা যায় না। দিন দিন। নিত্যনতুন সংবাদ আসছে যে দেশের মধ্যে অনেক শিক্ষিত ভদ্রলোকও জালিমদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, নামে শান্তি কমিটি গড়লেও গণ-হত্যায় সম্মতি দিতে তাদের কোনো বিবেকের বাধা নেই। এখন পাকিস্তানী আর্মি মোকাবিলা করছে সীমান্ত মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে। আর দেশের অভ্যন্তরে শান্তি কমিটির নেতৃত্বে আল বদর, জামাতে ইসলামী, আল শামস, মুজাহিদ, রাজাকার, ইপকাফ ইত্যাদি সশস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, এরা অত্যাচারীদের সহচর।

হরিণা এবং ঠাকুরগাঁও ক্যাম্পে এরকম একটি শান্তি কমিটির মিটিং-এর ইস্তাহার এসে পৌঁছেছে কোনো ক্রমে। শান্তি কমিটির এই মিটিংটি হয়েছিল লাকসামে, মে মাসের গোড়ার দিকে। তাতে বলা হয়েছে যে (১) তথাকথিত মুক্তিবাহিনী এবং তাদের তহবিল সংগ্রহ, সদস্যভুক্তি ইত্যাদি গোপন কার্যক্রমের বিস্তৃত বিবরণ, তথ্যাদি যথাশীঘ্র কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটিকে জানানো হোক। যারা মুক্তি বাহিনীর জন্য চাঁদা আদায় করছে এবং যারা চাঁদা প্রদান করছে, তাদের একটি তালিকা কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কাছে পেশ করা হোক। (২) লাইসেন্স ছাড়া সমস্ত বন্দুক, রাইফেল ও অন্যান্য সাজসরঞ্জামের খোঁজ জানানো হোক। (৩) ইউনিয়ন শান্তি কমিটিকে পুনরায় অনুরোধ জানানো হল যে, মালি, মেথর, পেশাদার ধোপী, জেলে এবং নাপিত ছাড়া সকল হিন্দুকে উৎখাত করা হোক। (৪) পাকিস্তানে আশঙ্কামুক্ত হয়ে সকল বৌদ্ধ যাতে বাস করতে পারে সেজন্য তাদের সব রকম সুযোগসুবিধা দেওয়া হোক। (৫) অধুনালুপ্ত ও বে-আইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের যে সব সদস্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছে, তাদের এই মর্মে সম্পর্ক ছেদের ঘোষণা দিতে বলা হোক যে, (ক) অধুনালুপ্ত আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের বিভক্তির জন্য এবং কার্যত ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার জন্য কাজ করে এবং (খ) উক্ত রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে শ্রেণীভিত্তিক ঘৃণা ছড়ায়। তাদের মধ্যে জাতিসত্তাগত বা প্রদেশগত সংঘর্ষে উৎসাহিত করে এবং তারাই পাকিস্তানের সর্বাত্মক ক্ষতি করার জন্য দায়ী! (৬) সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সমূহের সামরিক লোকদের ও প্রাক্তন সামরিক ব্যক্তিদের তালিকা পেশ করা হোক। (৭) সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসারবৃন্দ ও কারখানার শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য উৎসাহিত করা হোক। ইত্যাদি।

ইস্তাহারটি পড়ার পর মুক্তি বাহিনীর কেউ কেউ যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি শুরু করলেও অনেকেরই মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে যায়। অনেকেরই বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন রয়ে গেছে দেশের মধ্যে, তাঁদের ওপর কী ধরনের অত্যাচার হচ্ছে কে জানে! এমনও শোনা যাচ্ছে যে প্রতিদিন নাকি ছয় থেকে বারো হাজার মানুষ খুন হচ্ছে বাংলাদেশে। এরচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর কী কোথাও ঘটেছে পৃথিবীতে? শান্তি কমিটির নাম নিয়ে এমন হিংসা ও অত্যাচারের ঘটনা আর কি কখনো দেখা গেছে ইতিহাসে? এদের তালিকায় যাদের নাম ওঠে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না!

কয়েকজন সেই ইস্তাহার দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছে, কয়েকজন দাঁতে দাঁত চেপে বলেছে, একবার স্বাধীনতা আসুক, তারপর ঐ খুনি দালালদের প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হবে রমনার ময়দানে।

বালক তোতা মিঞার কাহিনী সেইজন্যই প্রথমে বিশ্বাস করা যায়নি। সে যদি গুপ্তচর হয়? তাকে হয়তো সেনাবাহিনী থেকে পাঠানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ফাঁদে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যারা এই বয়েসী বালকদের বেয়নেটের খোঁচায় ছিন্নভিন্ন করতে পারে, তারা এই রকম একটি বালককে দিয়ে যে-কোনো জঘন্য কাজ করাতেও দ্বিধা করবে না।

তোতা মিঞা সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে এসে সোজা ঢুকে পড়েছিল সেক্টর কমান্ডারের তাঁবুতে। আর কোথাও গেল না, সে সেক্টর কমান্ডারের কাছেই প্রথমে এলো কী করে, কে তাকে ঐ তাঁবু চেনালো? সে এসেছে ছুটতে ছুটতে। সেক্টর কমান্ডারের পায়ের কাছে বসে পড়ে সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল, সাব, সাব, দুইশো জন ধরা পড়ছে! আপনেরা অগো বাঁচান! অগো মাইরা ফেলাবে!

তার বক্তব্য এই যে, ফারিয়াবাজারে বাত্যাগী বাঙালীদের একটা বড় দলকে আটক করে বেখেছে পাকিস্তানী সৈন্যরা। ওদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেইজন্য আশ্রয়ের আশায় ওরা রওনা হয়েছিল ভারত সীমান্তের দিকে।

পাকিস্তান সরকার এখন সারা বিশ্বে প্রচার করতে চাইছে যে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা পুরোপুরি শান্ত, ভারতের শত উস্কানিতেও এখন দেশ ছেড়ে আর কেউ ভারতে যেতে চাইছে না, বরং ভারতের শরণার্থীরাই ফিরে আসছে দলে দলে। এই প্রচারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য তারা যথাসম্ভব বড়ার সীল করে দিচ্ছে, উদ্বাস্তুদের স্রোত দেখলেই বন্দী করছে কিংবা গুলি করে শেষ করে দিচ্ছে। সুতরাং কারিয়াবাজারে দুশো জনের একটি দলের ধরা পড়ার ঘটনা খুবই বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু অবিশ্বাস্য লাগে ছেলেটির নিখুঁত বর্ণনা দেবার ভঙ্গিটি সে একটা কাঠি নিয়ে নরম মাটিতে একে দেখিয়ে দেয়, এইটা হাই স্কুল, এই বাড়িতে রয়েছে ৫৪ জন পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্য, তাদের দলপতি একজন মেজর। আর স্কুলবাড়ির পাশে চারখানা দোকানঘর আর একটা ফাঁকা বাড়িতে রাখা হয়েছে বন্দীদের। মধ্যের এই দুটি ঘরে আছে নারী ও শিশুরা। দু’দিন ধরে তাদের কিছু খেতে দেওয়া হয়নি। সৈন্যরা সবাইকে একসঙ্গে মারছে না। কাল বিকেলে বারোজন বন্দীকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল খানিকটা দূরের একটা আমগাছ তলায়। তারপর সৈন্যরা রাইফেল নিয়ে টারগেট প্র্যাকটিস করেছে। কাল মাঝরাতে স্কুলবাড়ির ছাদ থেকে একটি তরুণী সারা গায়ে আগুন লাগা অবস্থায় লাফিয়ে পড়েছে নিচে।

সেক্টর কমান্ডার বারবার ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করেন, তোরে কে পাঠাইছে এখানে? তুই বর্ডার ক্রশ করলি ক্যামনে?

তোতা মিঞা সরল চোখে প্রত্যেকবার একই উত্তর দেয় যে, তাকে কেউ পাঠায়নি। সে নিজেই এসেছে। বর্ডারে তাকে কেউ আটকায় নি। তবে তার বাবা সেনাবাহিনীর অধীনে বাবুর্চির কাজ করে। সেই জন্য সে সব কিছু নিজের চোখে দেখেছে। সে জানে যে লম্বা-চওড়া খান সেনারা মুক্তির নামে ভয় পায়। মাত্র চুয়ান্ন জন খান সেনার সঙ্গে এতবড় মুক্তিবাহিনী লড়াই করে জিততে পারবে না? তারা গিয়ে না বাঁচালে ঐ বাঙালীদের একজনেরও প্রাণে বাঁচার আশা নেই।

সেক্টর কমান্ডার এবং তাঁর চার পাঁচজন সহকারী অনেক জেরা করেও তোতা মিঞার কাছ থেকে আর অন্য কোনো কথা বার করতে পারলেন না। ছেলেটির কথা সত্যি হলে ঐ বন্দীদের উদ্ধার করার জন্য একটা অ্যাকশানে যাওয়া উচিত। আর যদি ফাঁদ হয়?

সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের আক্রমণাত্মক উদ্যমে কিছুটা ভাটা পড়েছে। পঁচিশে মার্চের পর যে স্বতঃস্ফুর্ত প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তাতে অনেক জায়গায় পাকিস্তানী বাহিনী আকস্মিক আঘাতে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। এখন তারা শক্তি সংহত করেছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দুটি নতুন ডিভিশন এনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সীমান্তের সর্বত্র। এ দিকে মুক্তিবাহিনীর হাতে যথেষ্ট অস্ত্র নেই, প্রয়োজনীয় সরবরাহ নেই, খাদ্য নেই, এই অবস্থায় শুধু মনোবল নিয়ে তারা কতটা লড়তে পারে? মুক্তিবাহিনীর প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছিল। সেই জন্য কিছুদিন অ্যাকশন স্থগিত রাখা হয়েছে। চিন্তা করতে হচ্ছে নতুন স্ট্র্যাটেজি।

আজও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে পৃথিবীর কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের কাছ থেকে যতখানি সাহায্য পাওয়া যাবে আশা করা গিয়েছিল, তা প্রায় কিছুই পাওয়া যায়নি। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে বটে, মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্তের এপার থেকে তৎপরতা চালাতে বাধা দেয়নি। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানীদের মুখোমুখি হতে আগ্রহী নয়। ভারত সরকার সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে চায় না। পাকিস্তান সরকার প্রথম থেকেই ভারতকে মুসলমানের শত্রু বলে চিহ্নিত করে এসেছে। ভারত যুদ্ধে নেমে পড়লে কি বাংলাদেশের সমস্ত মানুষের সমর্থন পাবে? শুধু সেনাবাহিনীকে পরাজিত করলেই তো যুদ্ধে জেতা যায় না! তা ছাড়া, ভারত যুদ্ধে ব্যাপৃত হলে সারা বিশ্বে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী প্রচারই সত্য বলে গণ্য হবে। সকলেই বলবে, ভারত নিজের স্বার্থে পাকিস্তান ভাঙতে চাইছে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে জেতার ক্ষমতাও কি আছে ভারতের? চীন যে-কোনো সময় আবার আক্রমণ করতে পারে বলে ভারতীয় বাহিনীর একটি বিশাল অংশ চীন সীমান্তে মোতায়েন করা আছে। পশ্চিম পাকিস্তানী সীমান্তেও সতর্ক পাহারা দিতে হচ্ছে। পূর্ব ভারতে মিজো-নাগা বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে অনবরত, পশ্চিমবাংলাতেও নকশালপন্থীদের দমন করার জন্য সৈন্যবাহিনী নামাতে হয়েছে। ভারত এখন নিজের ঘর সামলাবে, না বাংলাদেশকে মুক্ত করতে আসবে?

কয়েক দিন আগে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চ পর্যায়ের সেনানীদের একটা গোপন কনফারেন্স হয়ে গেছে কলকাতার থিয়েটার রোডে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন এবং প্রধান সেনাপতি এম ওসমানী। সেখানে নানান আলোচনা ও তর্কবিতর্কের মধ্যে ঠিক হয়েছে যে এলোমেলো ভাবে যুদ্ধ করে আর কোনো লাভ হবে না। দুর্ধর্ষ ও সুশৃঙ্খল পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়তে গেলে বাংলাদেশ বাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরও পুরোপুরি নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে, সম্মুখ সমর এড়িয়ে জোর দিতে হবে গেরিলা যুদ্ধে, তার জন্য চাই উপযুক্ত ট্রেনিং। সমগ্র বাংলাদেশকে ভাগ করা হল এগারোটি সেক্টরে, সেইসব সেক্টর কমান্ডারের অধীনে কতগুলি সাব সেক্টর ও ট্রপস থাকবে ও নিধারিত হল।

এইসব সত্ত্বেও অনেকেই হতাশার মনোভাব চাপা দিতে পারেননি। বাংলাদেশ কি তা হলে আর একটি ভিয়েৎনাম হতে যাচ্ছে? কতদিন চলবে এই গেরিলা যুদ্ধ, পনেরো বছর? কুড়ি বছর? সাধারণ মানুষের মনোবল কতদিন অটুট থাকবে?

শুধু হতাশা নয়, তার থেকে বেরিয়ে আসে তিক্ততা। কেউ কেউ আড়ালে প্রশ্ন তুললো, শেখ মুজিব সাতই মার্চের মিটিং-এ স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়ে বসলেন, কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামের যে দীর্ঘ প্রস্তুতি লাগে, তা তিনি জানতেন না? যুব সমাজের মধ্যে সামরিক ট্রেনিং এবং অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করেননি কেন? একবার তিনি বলে ফেললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, তবু তিনি সংগ্রামের বদলে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা পাওয়ার আশায় পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় কাটালেন, সেই সুযোগে ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ব্যাটেলিয়ানের পর ব্যাটেলিয়ান সৈন্য আনিয়ে নিলেন এদিকে। সংগ্রাম। পরিচালনার জন্য শেখ মুজিবের কি আন্ডারগ্রাউন্ডে যাওয়া উচিত ছিল না আগেই? তিনি প্রথমেই ধরা দিয়ে বসলেন? আওয়ামী লীগের নেতারাও সকলেই চলে গেলেন কলকাতার নিরাপদ আশ্রয়ে! আর বাংলাদেশের জ্বলন্ত যৌবন, স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছাত্রসমাজ, সমাজতন্ত্রে। দীক্ষিত রাজনৈতিক কর্মী, ই পি আর, পুলিশ আর সামরিক বাহিনীর লোকেরা, যারা প্রথম থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তারাই শুধু রণাঙ্গনে জলকাদার মধ্যে প্রাণ দেবে?

কলকাতার কনফারেন্স সেরে নিজের এলাকায় ফিরে এসেছে এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম। এখন কিছুদিন সীমান্ত পেরিয়ে অ্যাকশন, অ্যামবুশ বন্ধ রেখে তিনি তার বাহিনীটি গুছিয়ে নিতে চান। এরই মধ্যে এসে পড়লো তো মিনা নামের এই বিস্ময়কর বালক এবং তার রোমহর্ষক কাহিনী। একবেলার মধ্যেই তোতা মিঞার কথা ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত ক্যাম্পে।

সিরাজুল প্রথম থেকেই তোতা মিঞাকে বিশ্বাস করেছে। সে নিজেতোকে নাস্তা খাইয়ে অনেক গল্প করেছে তার সঙ্গে। তারপর সে তোতার হাত ধরে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে মেজর সাহেবের কাছে। সে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে তার বক্তব্য। সে বলতে চায় যে, সবাই তোতাকে সন্দেহ করছে, কিন্তু এর উল্টো দিকটা তারা ভেবে দেখছে না কেন? শেখ মুজিবের আহ্বানে এই দেশটা আজ কতখানি বদলে গেছে যে একটি এগারো বছরের বালকও দেশপ্রেমিক হয়ে উঠেছে, সে বিপদের পরোয়া না করে ছুটে এসেছে সীমান্ত পেরিয়ে। রাজাকার, আল বদরদের বিরুদ্ধে এই বালকই তো এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। যে-দেশ এরকম ছেলের জন্ম দিতে পারে, সে-দেশ কিছুতেই পরাধীন থাকতে পারে না। দুশো জন বন্দীকে বাঁচাবার জন্য এই বালকের প্রাণ কেঁদেছে, আর আমরা কি এতই কাপুরুষ যে তাদের উদ্ধার করার জন্য ছুটে যাবো না!

সিরাজুলের মতামতের একটা বিশেষ মূল্য আছে। পর পর কয়েকটি অ্যাকশানে সে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছে। মাত্র দু সপ্তাহ আগেই সে রামগড় করেরহাট রোডের চিকনছড়ায় একটা সাংঘাতিক কাণ্ড করেছিল। ঘন বনঘেরা পাহাড়ী পথ, সেখান দিয়ে পাক আর্মি শক্তি সমাবেশ করছিল রামগড়ের দিকে। উদ্দেশ্য ছিল তাদের সাপ্লাই লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। কিন্তু পাক আর্মির তীব্র সার্চ লাইট ও গোলাবর্ষণের জন্য কিছুতেই কাছে এগোনো যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে সিরাজুল কী করে যেন সেই সড়কের ওপর ঝুঁকে পড়া একটা গাছের ওপর গিয়ে বসেছিল সারাদিন। সন্ধের মুখে সে একটা মাইক্রোবাসের ওপর লাফিয়ে পড়ে, তাতে ছিল একজন কাপ্টেন ও বেশ কয়েকজন অফিসার, সিরাজুল এল এম জি চালিয়ে সবাইকে খতম করে দেয়। মাইক্রোবাসটা রাস্তা জুড়ে পড়ে থাকে, দিনের পর দিন ঐ পাকিস্তানী সৈন্যদের মৃতদেহ সরাতেও কেউ আসেনি!

সিরাজুল দাবি ধরে বসলো, সে কারিয়াবাজারে বন্দীদের মুক্ত করার জন্য একটা অভিযান পরিচালনা করতে চায়। মেজর রফিকুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত এই অভিযানে একটি দল পাঠাতে রাজি হলেন, কিন্তু সিরাজুলকে তিনি যেতে দিতে চান না। সিরাজুল দক্ষ সাঁতারু বলে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং-এর জন্য নির্বাচিত হয়েছে, তার এখন কোনো অ্যাকশানে না যাওয়াই উচিত, যদি সে কোনো কারণে আহত হয়ে পড়ে! সিরাজুল সে কথা শুনতেই চাইলো না। সে বললো যে, সে যদি এরকম একটা অ্যাকশানে আহত হয়ে পড়ে, তা হলে বুঝতে হবে, সে বড় কোনো ট্রেনিং-এর যোগ্যই না!

আজকের অভিযানের দলটিও নির্বাচন করতে চায় সিরাজুল। পয়তাল্লিশ জন ট্রেইনড় গেরিলার সঙ্গে সিরাজুল বেছে নিল বাবুল চৌধুরীকেও।

সন্ধে থেকেই প্রবল বর্ষণে তাদের পুকুর কাটা সার্থক হয়েছে বটে, কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনা করা সহজ কথা নয়। প্রায় কারুরই পায়ে জুতো নেই, অতিকষ্টে কিছু রবারের চটি সংগ্রহ করা গেছে। কাঁধে দু ইঞ্চি মটরি, রকেট লঞ্চার, এল এম জি কিংবা রাইফেল আর পায়ে রবারের চটি! বেশ কয়েকজনের গায়ে জামাও নেই, যদিও এখানে বৃষ্টি পড়লে বেশ শীত শীত করে।

এই বৃষ্টির মধ্যে চতুর্দিক এক্কেবারে মিশমিশে অন্ধকার। আকাশের দিকে তাকালে মনেই হয় যে কোনোদিন সেখানে চাঁদ-নক্ষত্রের আলো থাকে। দিক হারাবার ভয় পদে পদে। একটি এগারো বছরের বালকের কথার ওপর ভরসা করে তারা এগোচ্ছে।

তোতা মিঞাকে সিরাজুল রেখেছে নিজের পাশে। এক সময় তার কাঁধ চাপড়ে সিরাজুল বললো, দ্যাখ ছ্যামড়া, তুই যদি রাস্তা ভুল করোছ, তাইলে আমরা তো মরুমই, তুইও পুটুস কইরা মইরা যাবি!

তোতা মিঞা বালিকার মতো সুরেলা গলায় বললো, না সাব, আমি ভুল করুম না। একেবারে নাক বরাবর রাস্তা।

তারপর সে বেশী উৎসাহিত হয়ে বললো, সাব, বৃষ্টি হইছে তো আরও ভালো হইছে। এই রাত্তিরে খান স্যানারা নাকে ত্যাল দিয়া ঘুমাবে ‘ইনসানাল্লা,আইজ সব কয়টা খতম হবে!

সিরাজুলের মনটা একটু খচখচ করে। সে নিজের দায়িত্বে এতগুলি মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে এনেছে! তোতা যদি সত্যিই স্পাই হয়? সে নিজেই বলেছে যে তার বাবা আর্মি ক্যান্টিনের বাবুর্চি, তার বাবার প্রাণের ভয় দেখিয়ে ছেলেকে গুপ্তচর হতে বাধ্য করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এইটুকু ছেলে কি এত নিখুঁত অভিনয় করতে পারে? যদি ফাঁদও হয়, তবু যেতে হবে, মুক্তিবাহিনী এমনি এমনি প্রাণ দেবে না, যেকজন পাকিস্তানী সেনাকে সম্ভব মেরে তারপর মরবে।

দু’শো জন বাঙালীকে ওরা বন্দী করে রেখেছে। যদি তাদের মধ্যে মনিরা থাকে? খানসেনাদের হাত থেকে কোনোক্রমে ছাড়া পেলে মনিরা কি সীমান্তের দিকে পালিয়ে আসবার চেষ্টা করবে না? এই সম্ভাবনাই সিরাজুলকে আরও উদ্দীপ্ত করে তোলে।

সামনেই একটা সরু খাল। গতকালও এই খালটা প্রায় শুকনোই দেখে গেছে সিরাজুল, কিন্তু আজকের বৃষ্টিতে কতখানি পানি জমেছে তার ঠিক নেই। খালের ও ধারেই পাক সেনারা ওঁত পেতে আছে কি না তাই বা কে জানে!

সিরাজুল মাটির দিকে টর্চ জ্বাললো। তার পিছনের বাহিনীকে শুয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়ে সে অপেক্ষা করলো খানিকক্ষণ। খালের ওপারে কোনো সাড়া শব্দ নেই। বৃষ্টির জন্য টর্চের আলোও ওপার পর্যন্ত পৌঁছয় না।

মিনিট পাঁচেক পর সে টর্চের আলো বাবুল চৌধুরীর মুখের ওপর ফেলে বললো, তুমি আগে। নামো, তুমি আগে খাল পার হয়ে দেখে আসো!

বাবুল চৌধুরীর হাতে একটা রাইফেল। ঠাকুরগাঁও ক্যাম্পে এসে সে মাত্র দু’দিন রাইফেল ছোঁড়া প্র্যাকটিস করেছে, তার আগে জীবনে কখনো অস্ত্র ধরেনি। শহুরে মানুষ সে, জলকাদায় চলাচল করতে অভ্যস্ত নয় একেবারেই। সে তবু একটুও দ্বিধা করলো না, খালে নেমে পড়লো।

সিরাজুল চাপা গলায় আদেশ দিল। শব্দ করবা না!

বাবুল চৌধুরীর পরনে একটা প্যান্ট ও হাওয়াই শার্ট, দুটোই কাদালেপা, তার খালি পা, সে বকের মতন এক পা তুলে তুলে এগোতে লাগলো। টর্চ নিবিয়ে দিল সিরাজুল।

খালের জল বাবুলের হাঁটু ছাড়ালো না। তবে তলায় এমনই কাদা যে পা গেঁথে যায়, অন্য পা ফেলার সময় ব্যালান্স রাখা শক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সে একবারও আছাড় খেল না। খালের অন্য পাড়ে এসে সে মিনিট খানেক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সামনে কিছু দেখা যায় না, পেছনে সিরাজুলের দলটাও যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে, এই রণক্ষেত্রে বাবুল একা। দূর থেকে একটা গুলি এসে তাকে বিদ্ধ করলে সে চিরকালের মতন হারিয়ে যাবে।

বাবুল আবার খাল পেরিয়ে ফিরে এসে বললো, পানি বেশী নাই, ওপারেও এনিমি ট্রেঞ্চ নাই। ক্লিয়ার!

তোতাকে নিয়ে এবার প্রথম খালে নামলো সিরাজুল। তোতার কাঁধটা সে প্রায় খিমচে ধরে আছে। ছেলেটাকে সে অবিশ্বাস করতে পারে না, তবু দেখতে হবে যেন ছেলেটা এই পর্যন্ত এসে কোনোক্রমে পালিয়ে না যায়।

খালপাড়ের উঁচু বাঁধের আড়াল দিয়ে সবাই কোমর পর্যন্ত মাথা ঝুঁকিয়ে এগোতে লাগলো এক পা এক পা করে। সিরাজুল সবার আগে, অন্যরা খানিকটা দূরত্বে। যদি কোনো ফাঁদ থাকে, সিরাজুল নিজে তাতে ধরা পড়লেও অন্যদের জানিয়ে দেবে।

একসময় দু’ একটি বাড়িঘরের চিহ্ন দেখে বুঝতে পারা গেল, তারা কারিয়াবাজার গ্রামের সীমান্তে এসে পৌঁছেছে। পাকবাহিনী যে-গ্রামে বা শহরে আশ্রয় নেয়, সেখানকার প্রান্তবর্তী বাড়িগুলো পুড়িয়ে দিয়ে সামনেটা খোলা রাখে। এখানেও সে কাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি।

সিরাজুল তোতাকে জিজ্ঞেস করলো, এবার ইস্কুলবাড়ি কোন দিকে?

তোতা বললো, আমাগো ইস্কুলে আমি চক্ষু বুইজ্যাই যাইতে পারি, সাব। আর বেশি দূর নাই।

সিরাজুল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চার পাশটা একবার দেখে নিল। বৃষ্টি অনেক কমে এসেছে। অন্ধকার চোখে সইয়ে নিয়ে এখন দূরের কিছু কিছু গাছপালা ও বাড়ি দেখা যায়। কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না। হয়তো এ গ্রামে অন্য কোনো মানুষজন নেই। কিংবা হানাদার বাহিনী যেখানে এসে থানা গেড়েছে, সেখানকার কোনো গৃহস্থই এত রাতে আলো জ্বালার সাহস পাবে না। কিন্তু পাক সেনারা যেখানে রয়েছে, সেখানে নিশ্চিত আলো জ্বলবে, বাইরে সেন্ট্রি থাকবে। কোথায় সেই আলো।

তোতার মাথার চুল মুঠো করে ধরে সিরাজুল মনে মনে বললো, ওরে বিচ্ছু, যদি তুই বিশ্বাসঘাতক হস, তোরে আগে আমি নিজে কচুকাটা করবো!

অন্ধকে যেমন ভাবে পথ দেখায়, সেইভাবে সিরাজুলের হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো তোতা মিঞা। এই দিকটায় বেশ কিছু ছাড়া ছাড়া বড় গাছ, মনে হয় যেন একটা ফলের বাগান, তার কিনারায় এসে তোতা বললো, ঐ দ্যাখেন সাব, ইস্কুল!

‘শ পাঁচেক গজ দূরে ইস্কুলবাড়িটার গেটের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে দুটো মশাল। পরপর সার দেওয়া পাঁচখানা ট্রাক ও একটি বাস। কোনো সেন্ট্রিকে দেখা যাচ্ছে না এখান থেকে, কিন্তু বাড়িটার ভেতর থেকে মানুষের গলার মৃদু গুঞ্জন ভেসে আসছে। তার মধ্য থেকে কি ফুটে উঠছে কোনো স্ত্রীলোকের তীক্ষ্ণ কান্নার আওয়াজ? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দূর থেকে কান্নার শব্দ ও হাসির শব্দ অনেক সময় একই রকম শোনায়।

এই জায়গাটা বেশ সুবিধেজনক, বড় বড় গাছগুলোর আড়াল পাওয়া যাবে। এই এগারো। বছরের বালকটি কি যুদ্ধনীতি বোঝে যে ঠিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাদের এই বাগানের মধ্য দিয়ে। নিয়ে এসেছে? এ পর্যন্ত কোনো ফাঁদের আভাস পাওয়া যায়নি। আর দ্বিধা করার কোনো মানে হয় না; ঐ গাড়িগুলো দেখেই বোঝা গেছে যে ঐ বাড়িতে পাক সেনারা রয়েছে। এরপর হয়। মারো নয় মরো! যে কটি শত্রসৈন্যকে খতম করা যাবে, সেই কয়েক পা এগিয়ে যাওয়া হবে স্বাধীনতার দিকে।

বন্দীরা কোথায়? এখান থেকে গোলাগুলি চালালে তাদেরও গায়ে লাগবে না তো? তোতা। আঙুল তুলে যে দোকানঘরগুলি দেখিয়ে দিল, সেগুলি ইস্কুলবাড়ির বেশ কাছাকাছি। একটু দূরে একটা একতলা বাড়ি।

সিরাজুল তার বাহিনীকে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিল ডানদিকে। আর দেরি করা যাবে না। তোত যদি বিশ্বাসঘাতক হয়, তা হলে যে-কোনো মুহূর্তে পেছন দিক থেকে এসে পড়বে পাকবাহিনী। সিরাজুল সবাইকে বলে দিল একসঙ্গে আক্রমণ চালাতে হবে শুধু স্কুলবাড়িটার ওপর, ওখানে পাক সেনাদের আটকে রাখতে পারলে বন্দীরা পালাবার সুযোগ পাবে। গাড়িগুলি দেখেই সিরাজুল শত্রুপক্ষের শক্তি অনেকটা আন্দাজ করে নিয়েছে, এখানে সিরাজুলরা বেশীক্ষণ। যুদ্ধ চালাতে পারবে না, পাকিস্তানী সৈন্যরা একবার স্কুলবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারলে তাদের আর জয়ের আশা নেই।

সিরাজুল নিজেই প্রথম মটরি চার্জ করলো। সঙ্গে সঙ্গে গর্জন করে উঠলো এল এম জি ও রাইফেল। একটা রকেট সোজা গিয়ে পড়লো স্কুলবাড়ির ছাদে। মর্টারের গোলায় আগুন ধরে গেল একটা ট্রাকে।

পাকিস্তানীরা সত্যিই অসতর্ক ছিল, প্রথম দু তিন মিনিট তাদের দিক থেকে কোনো প্রতিআক্রমণ এলো না। শুধু চিৎকার-চাচামেচি, আগুনের শিখায় পরিষ্কার দেখা গেল কয়েকজন খানসেনা খালি গায়ে শুধু জাঙ্গিয়া পড়ে দৌড়োচ্ছে।

মুক্তিবাহিনীর সবাই গোলাগুলি চালাতে চালাতে তারস্বরে বলতে লাগলো, বন্দীরা পালাও! বন্দীরা পালাও!

সবকটা দোকানঘর ও পাশের একতলা বাড়িটা থেকে ভেসে এলো আর্তকান্নার রব। প্রত্যেকটি দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ, তারা দরজা ভেঙে বেরুতে পারছে না।

এর মধ্যেই পাক সেনারা শুরু করলো পাল্টা গোলাবর্ষণ। তারা বুঝতে পেরেছে যে মুক্তিযোদ্ধারা বন্দীদের মুক্ত করার জন্যই এসেছে, সেই জন্য তারা দোকানঘরগুলোর দিকেও ফায়ারিং করছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ যে দৌড়ে গিয়ে দরজাগুলো খুলে দেবে তারও উপায় নেই, সামনের ফাঁকা জায়গাটা পেরুতে গেলেই ব্রাশ ফায়ারের মধ্যে পড়তে হবে।

স্কুলবাড়িটার জানলা ভেঙে লাফিয়ে বেরিয়ে আসছে পাক সৈনিকরা। সিরাজুল তার এল এম জির লক্ষ্য স্থির রেখে শেষ করে দিচ্ছে এক একজনকে। স্কুল বাড়িটার পেছন দিক থেকেও এগিয়ে আসছে একটা টুপ, মটার দিয়ে ঠেকানো হচ্ছে তাদের। আর সময় নেই, আর সময় নেই, আর ঠেকানো যাবে না, এরপর আর পালাবার সুযোগও পাওয়া যাবে না! এখনই সিরাজুলের রিট্রিট অর্ডার দেওয়া উচিত।

চাইনীজ মেশিনগান থেকে ঝড়ের মতন গুলি বর্ষণ হচ্ছে মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটাতে, পাকিস্তানী সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীকে কিছুতেই আমবাগান ছেড়ে বেরুতে দেবে না। তা হলে কি বন্দীদের মুক্ত করা যাবে না? পাক বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের ক্ষমতা নেই সিরাজুলদের, তাতে তাদের অনর্থক শক্তি ক্ষয় হবে। কিন্তু মনিরা, বন্দীদের মধ্যে যদি মনিরা থাকে?

হঠাৎ একজন লম্বা চেহারার লোক ছুটে গেল বন্দীদের ঘরগুলির দিকে। সিরাজুল দেখলো, সেই লোকটি বাবুল চৌধুরী। লাইট মেশিনগানের গুলিবৃষ্টির মধ্যে সে ছুটে যাচ্ছে একেবেঁকে। ও কি পৌঁছোতে পারবে? সেদিকে মনোযোগ দেবার উপায় নেই, সিরাজুল তার মটরি চার্জ করলো পাক সেনাদের দিকে।

পরের মুহূর্তেই তার পাশ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল তোতা মিঞা। বাবুল চৌধুরী দোকানঘরগুলোর কাছে পৌঁছে গেছে, তীরের মতন ছুটে গিয়ে তোতা তাকে দেখিয়ে দিচ্ছে মেয়েদের ঘর দুটো। বাবুল রাইফেলের বাঁট দিয়ে মেরে মেরে তালা ভাঙার চেষ্টা করছে। আঃ, ও এত বোকামি করছে কেন, তালার ওপর গুলি চালাতে পারছে না?

বন্দীরা বেরিয়ে আসছে হুড়মুড় করে। এবার ওরা গুলি খেয়ে পোকামাকড়ের মতন মরবে। পাকবাহিনীর আক্রমণ ওদিক থেকে ফেরাতেই হবে। দ’ জন পাক সৈন্য অনেকখানি এগিয়ে গেছে বাবুল চৌধুরীর দিকে, সিরাজুল আর দ্বিধা করলো না। আমবাগান ছেড়ে সে বেরিয়ে এলো বাইরে, তার দেখাদেখি আরও কয়েকজন, লাফাতে লাফাতে তারা চাচাতে লাগলো,আয় শালারা! হিম্মৎ থাকে তত আয়!

শেষ ঘরের দরজাটাও খুলে দিয়েছে বাবুল চৌধুরী। তখনই সেই ঘরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে এলো দু’ জন পাক সৈন্য। তাদের রাইফেল তোলার সুযোগ দিল না সিরাজুল, তার এল এম জি-র মুখ সেদিকে ঘুরিয়ে সে হুংকার দিয়ে উঠলো ইসানাল্লা,আজ সব কয়টা জানোয়ার খতম এরপর সিরাজুল যা করতে গেল, সেটা যুদ্ধ নয়, পাগলামি মুক্তিবাহিনীর ফায়ারিং পাওয়ার সহ্য করতে না পেরে পাক সৈন্যরাই রিট্রিট করে আশ্রয় নিচ্ছে স্কুলবাড়িটার পেছন দিকে, মুক্তিবাহিনীর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে গেছে, এখনই ফিরে যাওয়ার প্রকৃষ্ট সময়, তবু সে সবকটি পাক সৈন্যকে হত্যা করার জন্য ধেয়ে যেতে চায়। সেকেন্ড ইন কমান্ড হাসমত এসে তাকে টেনে ধরলো এবং সেই হুইশল বাজিয়ে দিল।

এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে অনেকগুলো লাশ। দু তিন জায়গায় আগুন জ্বলছে, এরই মধ্যে দিয়ে পিছু হঠতে হঠতে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে মুক্তিবাহিনী। পাক সেনা ছাড়াও বন্দীদের মধ্যে মারা পড়েছে বেশ কয়েকজন। বাবুল আর সিরাজুল দু জনেই এরই মধ্যে দেখে নিচ্ছে চেনা কোনো মুখ আছে কি না সেই নিহতদের মধ্যে। এক জায়গায় তাদের দু’জনেরই চোখ আটকে গেল।

শেষের কয়েক মিনিট তোতা মিঞার ওপর আর নজর রাখা হয়নি। শেষ রক্ষা করতে পারলো না ছেলেটা। হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে সেই বালক, বুকের গর্ত দিয়ে এখনও বেরিয়ে আসছে রক্ত, তার চোখ দুটি নিষ্পলক, কী সরল ও সুন্দর সেই চোখ।

রাইফেলটা অন্য একজনকে দিয়ে বাবুল চৌধুরী দু হাতে কোলে তুলে নিল সেই বালকের নিস্পন্দ শরীর।

৩৬. হাসপাতাল থেকে তুতুল ফিরে এসেছে

হাসপাতাল থেকে প্রায় জোরজার করেই গতকাল তুতুল ফিরে এসেছে গোল্ডার্স গ্রীনের অ্যাপার্টমেন্টে। তার মাথা জোড়া ব্যাণ্ডেজ, শরীর অত্যন্ত দুর্বল তো বটেই, কথা বলতে বলতে হঠাৎ সে ঘুমে ঢলে পড়ে। তরল খাদ্য ছাড়া কিছুই সে খেতে পারে না, তাতেও তার রুচি নেই। আলম একই সঙ্গে তার ডাক্তার ও নার্স, এক মুহূর্তের জন্যও সে বাড়ি ছেড়ে বেরুচ্ছে না।

সন্ধের পরই ট্রাঙ্কুইলাইজার দিয়ে তুতুলকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার কথা, কিন্তু তুতুল আজ কিছুতেই ঘুমোবে না। আলম তাকে ওষুধ খাওয়াতে এলে সে প্রত্যেকটা ওষুধ খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছে, তাকে ফাঁকি দেবার উপায় নেই। আলম তাকে চিকেন স্টু জোর করে খাওয়াতে গেলেও সে দু’চুমুক দিয়ে রেখে দিয়ে বললো, আমাকে একটু ব্র্যাণ্ডি দেবে? তোমার যে রেমি মারার বোতল ছিল, তার থেকে একটুখানি?

আলম প্রসন্ন বিস্ময়ের সঙ্গে বললো, সেই বোতলটার কথাও তার মনে আছে? ডাক্তাররা। তাইলে তোর ব্রেনের খোপগুলো উল্টাপাল্টা কইরা দ্যায় নাই!

তুতুল ক্লিষ্টভাবে হেসে বললো, আমার সব মনে আছে।

অ্যালকোহল ততলের ঠিক সহ্য হয় না, স্বাদও পছন্দ হয় না। কোনো পার্টিতে অন্যরা জোরজার করলে সে কখনো-সখনো রেড ওয়াইনে দু’এক চুমুক দিয়েছে। আজ সে নিজে থেকেই ব্রাণ্ডি চাইছে কেন তা আলম জানে। খুব ছোট্ট একটা লিকিওর গ্লাসে খানিকটা ঢেলে এনে বিছানার পাশে বসে সে প্রথমে তুতুলের পাণ্ডুর ঠোঁটে একটা চুম্বন দিল, তারপর জিজ্ঞেস করলো, আমি খাইয়ে দেবো?

তুতুল বললো, না, আমাকে দাও! আমাকে একটু উঁচু করে তুলে দাও!

পেছনে দুটো বালিশ দিয়ে তুতুলকে বসিয়ে দিল আলম। একটা সোনালি রঙের লেপ দিয়ে। তার শরীর ঢাকা। পাতলা মেঘের আড়ালে ডুবে যাওয়া চাঁদের মতন তার মুখোনি অস্পষ্ট। ঘরখানার চারদিকে সে একবার চোখ বোলালো। সব কিছুই তার এখন এত প্রিয় লাগছে। এমনকি হাতল-ভাঙা টি-পটটাও, আগে অনেকবার ভেবেছিল ওটাকে ফেলে দেবে, এখন মনে হচ্ছে, থাক, এটাও থাক হাসপাতাল থেকে তুতুল যে এ বাড়িতে আর কখনো ফিরে আসবে, তা যেন সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। যতদূর মনে হয়, এ যাত্রা সে বেঁচে যাবে। কিন্তু এই বেঁচে ওঠার মধ্যেও একটা বিষণ্ণতা বোধ আছে। তার জীবনের বিনিময়ে মৃত্যু যদি অন্য কিছু দাবি করে? পিকলুদা, জয়দীপ এরা যেন তুতুলকে তাদের আয়ু দিয়ে চলে গেছে। এরপর আলমের আবার কিছু হবে না তো? জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছে আলম, আত্মবিশ্বাস ও কৌতুক মাখানো তার মুখ, সে এত ভালো, তার কোনোরকম ক্ষতি হলে তুতুল কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না!

আলমকে এই আশঙ্কার কথা বললেই সে হেসে উড়িয়ে দেয়।

তুতুল বললো, অলির আসতে এখনো তো কিছুটা দেরি আছে। তুমি আমাকে একটা প্যাড আর কলম দেবে? মা’কে চিঠি লেখা হয়নি অনেক দিন, কবে যেন শেষ চিঠিটা লিখেছি? ইস,

কাগজ-কলম নিয়ে এসে আলম বললো, তুই এখন চিঠি লিখতে পারবি? তুতুল বললো, হ্যাঁ, পারবো। মাকে প্রত্যেক সপ্তাহে একটা করে লিখি মা চিন্তা করছে কত

–তোর হাতের লেখা নকল করে আমি লিখে দেবো?

–যাঃ! অন্য হাতের লেখা মা ঠিক বুঝে ফেলবে! তা হলে তো সাংঘাতিক ভয় পেয়ে যাবে না।

–এক লাইন লিখে স্যাম্পল দেখাচ্ছি তোকে। বেশ গোটা গোটা গোল গোল করে লিখবো

–আমার হাতের লেখা মোটেই গোল গোল না। এই, তুমি সবে যাও। আমি কী লিখছি, তুমি দেখবে না!

লিখতে গিয়েই তুতুল বুঝলো, তার হাতে একটুও জোর নেই, কলম কাঁপছে। তবু লিখতেই হবে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে সে এক চুমুক কনিয়াক খেয়ে নিল। তারপর প্যাডটা নিয়ে এলো বুকের কাছে।

মা,

তোমাকে গত সপ্তাহে চিঠি লিখতে পারিনি, সে জন্য রাগ করেছে নিশ্চয়ই। আমাকে হঠাৎ লন্ডনের বাইরে যেতে হয়েছিল…। ক লণ্ডন শব্দটা বাংলায় লিখতে তিনবার কাটলো তুতুল। কিছুতেই ‘ণ্ড’ লিখতে পারছে না, কলম একেবেঁকে যাচ্ছে। ইংরিজিতে লেখা সোজা। হাতের লেখা যাচ্ছেতাই হয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে আসছে হঠাৎ।

আবাব সে মনের জোর এনে লিখলো, আমরা চারজন গিয়েছিলাম। জায়গাটা দারুণ সুন্দর। এবার সমুদ্রে স্নান করলাম খুব। জানো তো, এখানে এসে আমি সাঁতার শিখেছি। তোমার শরীর, তোমার শরীর, তোমার শরীর আমি ত্রিদিবমামাকে বলেছি. কলকাতায় এখন আমি খুব ভালো আছি, আমার তিন পাউ, তিন পাউ, তিন পাউ ওজন বেড়েছে…তোমার শরীর তোমার শরীর একদিন স্বপ্ন…

একটু পরে আলম পেছন থেকে এসে প্যাড আর কলম সরিয়ে নিতে গেল। তুতুল ঘুমে ঢলে পড়েছে। আলমের ছোঁয়া পেতেই সে জেগে উঠে বললো, কী? কী হয়েছে?

আলম হাসতে হাসতে বললো, আরে এই চিঠি পড়লে তোর মা ভাববে তুই গাঁজা। খেয়েছিস! হাতের লেখাটা দ্যাখ, তুই নিজেই চিনতে পারবি না।

তুতুল চিঠিটা পড়তে গিয়ে হেসে ফেললো। তারপর বললো, দাও, ওটা ছিঁড়ে ফেলে আমি আর একটা লিখছি।

আলম বললো, ক্ষ্যামা দে, ছেমরী! পারবি না। এর থেকে আমার হাতের লেখা অনেকটা কাছাকাছি হবে। আমি তোর থেকে ভালো গল্প বানাতে পারবো। তুই আবার সমুদ্রে স্নান করলি কবে রে?

তুতুল বললো, থাক, কাল লিখবো। তুমি তোমার দাড়ি কামাবার আয়নাটা একবার দাও তো!

সেই আয়নায় তুতুল যেন নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না। তার মুখখানা রক্তশূন্য, চোখে জ্যোতি নেই, চামড়াও খসখসে হয়ে গেছে। সে আস্তে আস্তে বললো, আমার ঠোঁট দুটো শুকনো হয়ে গেল কী করে?

আলম ঝুঁকে এসে একটি আলতো চুম্বন দিয়ে বললো, এখন আর শুকনো নাই। তুতুল মাথার ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে বললো, এটা ঢাকা যায় না? যদি একটা স্কার্ফ বেঁধে রাখি?

আলম বললো, দাঁড়া তোকে আমি সাজিয়ে দিচ্ছি। স্নো-পমেটম লাগিয়ে একেবারে সিনেমার হিরোইন বানিয়ে দেবো!

একটা জাপানী সিল্কের স্কার্ফ এনে আলম এমনভাবে তুতুলের মাথায় বেঁধে দিল যে সত্যিই ঢাকা পড়ে গেল ব্যাণ্ডেজ। ঠোঁটে বুলিয়ে দিল হালকা করে লিপস্টিক। গালে রুজ লাগাতে গেলে তুতুল আপত্তি করলো, আলম শুনলো না।

আয়নাটা তুলে আলম বললো, এইবার দ্যাখ, আগের চেহারা ফিরে এসেছে কি না! আর একটু কনিয়াক খেয়ে নে, তাইলে গায়ে জোর পাবি।

তারপর একটু দূরে সরে গিয়ে তুতুলকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার পর আলম বললো, শোন, একটা কথা বলি। আমি বাইরে চলে যাবো? তোর দেশ থেকে চেনা মানুষ আসবে, সে তো আমার কথা কিছু জানে না।

তুতুল বললো, না, তুমি কোথায় যাবে? তোমার কথা আমি জানিয়ে দেবো। মা’কেও এবারের চিঠিতেই সব লিখবো। কিন্তু তুমি আমার অসুখের কথাটা বলো না, প্লীজ। মা দারুণ ভয় পেয়ে গিয়ে নিজেই একটা অসুখ বাধিয়ে বসবে।

একটু থেমে তুতুল আবার বললো, তুমি আমায় এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে যেও না।

অলি এলো ঠিক সাড়ে সাতটার সময়। তার সঙ্গে তার বাবার বন্ধুর মেয়ে বিশাখা। আলম তো দরজা খোলার সময়েই তুতুল কনিয়াকে শেষ চুমুক দিয়ে গেলাসটা নীচে ফেলে দিয়ে হাসি। মুখে বললো, আয় রে, অলি। দ্যাখ আমার কী অবস্থা! সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে আছাড় খেয়ে কোমরে চোট লেগেছে, উঠতে পারছি না বিছানা ছেড়ে! দু’দিন হয়ে গেল!

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, অল্প অল্প ভিজে এসেছে অলি। মাথার চুল খোলা। তুতুল প্রথমেই লক্ষ করলো, অলির সারা শরীরে ঝলমল করছে স্বাস্থ্যের দীপ্তি। অলির হাত ধরে সে বললো, তুই কী সুন্দর হয়েছিস রে, অলি! কতদিন পর তোকে দেখলাম।

অলি বললো, তুমি এত রোগা হয়ে গেলে কী করে, তুতুলদি? অবশ্য রোগা হলেও তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।

–আমি বুঝি কোনোদিন মোটা ছিলাম? এ দেশে সবাই রোগা হবার সাধনা করে। আলাপ করিয়ে দিই। এই আমার স্বামী আলম! আর এই অলি, অলিকে আমি ওর বাচ্চা বয়েস থেকে চিনি, ফ্রক পরে খেলা করতে আসতো!

আলমের পরিচয় পেয়ে অলি অবাক হয়নি। লণ্ডনের বাঙালী মহলে তুতুল ও আলমের বিয়ের কথা অনেকেই জানেন। বাংলাদেশ যুদ্ধের জন্য প্রচার ও চাঁদা তোলার অনুষ্ঠানের একজন প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে আলমের নাম বেশ পরিচিত, এই বিবাহ-কাহিনীটি বহু-আলোচিত। অলিও লণ্ডনে পা দেবার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুনেছে।

উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে অলি বললো, আপনি তা হলে আমার জামাইবাবু!

বিশাখা বললো, ওরা বলেন দুলাভাই, তাই না?

বিশাখা অনেক কম বয়েস থেকে রয়েছে এ দেশে, তার উচ্চারণে খানিকটা জড়তা থাকলেও সে মোটামুটি বাংলা বলতে পারে। সে একটি স্কুলে পড়ায়। আলম তাকে বললো, আসুন আমরা একটু অন্য জায়গায় বসি, ওরা দু’জনে তো এখন কলকাতার গল্প করবে!

তুতুল বললো, কেন, তোমাদের বুঝি কলকাতার গল্প শুনতে ইচ্ছে করে না? আগে আমার মায়ের কথা বলো, অলি। আসবার সময় আমার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

মিথ্যে কথা বলতে অলির আর দ্বিধা নেই। প্রতাপকাকাও তাকে মিথ্যে বলার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। সে বললো, হ্যাঁ, আসবার দিন বিকেলেই তো পিসিমণির সঙ্গে দেখা হয়েছে। পিসিমণি ভালো আছেন। তুমি আজকাল কম চিঠি লেখো বললেন!

তারপর প্যাকেট খুলে বললো, এই নাও, তোমার জন্য শাড়ী পাঠিয়েছেন পিসিমণি। আর তোমার ঘি আর আচার। মুন্নি তোমার জন্য পাঠিয়েছে দুল। দুলাভাই, আপনার জন্য কিন্তু কিছু নেই, আপনারা বিয়ের কথা এখনো জানাননি।

আলম বললো, এমন বিয়াই করলাম, জামাই আদর আর কোনোদিন ভাগ্যে জুটবে না!

-–কেন, আপনারা কলকাতায় যাবেন না?

তুতুল বললো, এই সেপ্টেম্বরেই যাবো ঠিক করেছি রে! এবার ঠিক যাবো। এতদিন যাবো যাবো করে কিছুতেই যাওয়া হয়নি!

আলম বললো, আমাকেও নিয়ে যেতে চাও? তারপর শাশুড়ি যদি আমার দিকে ঝাঁটা নিয়ে তেড়ে আসেন?

অলি বললো, যাঃ, কী বলছেন? পিসিমণি মোটেই সেরকম মানুষ নন।

আলম হাসলো। তুতুল যখন তার মাকে প্রথম তার মনোনীত মুসলমান স্বামীর কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছিল, তার উত্তরে তিনি লিখেছিলেন যে মুসলমান বিয়ে করলে তিনি জীবনে আর মেয়ের মুখ দেখবেন না। সে চিঠি আলম দেখেছে। এরপর যে তুতুলের মায়ের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন ঘটেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তুতুল তবু জোর দিয়ে বললো, এবার আমরা কলকাতা যাবোই!

বিশাখা এখনো বিয়ে করেনি। তার একজন ঘনিষ্ঠ পুরুষ বন্ধুও মুসলমান, তবে সে আলজিরিয়ার লোক। তার সঙ্গে মেলামেশার সময় সে হিন্দু-মুসলমানের পার্থক্যের ব্যাপারটা কিছুই বোঝেনি, অথচ দেশের লোকদের মুখেই শুধু এই ধরনের কথা শোনা যায়। আলম-তুতুলের বিয়ে নিয়ে তাদের বাড়িতেও অনেক কথা হয়েছে, তার মা এর বিপক্ষে। অথচ তার আলজিরিয়ান বন্ধু হামিদের মা তাকে খুব পছন্দ করেন। হিন্দু-মুসলমানের যত দ্বন্দ্ব কি শুধু ইণ্ডিয়া-পাকিস্তানে? অবশ্য আলজিরিয়ায় হিন্দু নেই।

অন্যান্য গল্প হতে হতে তুতুল এক সময় জিজ্ঞেস করলো, তুই কবে নিউ ইয়র্ক যাচ্ছিস রে, অলি? এখান থেকে বাবলুকে ফোন করেছিস?

অলি বললো, না, ফোন করিনি। আমি এখানে চারদিন থাকবো।

–লণ্ডনে পৌঁছে একবারও ফোন করিসনি? এখন কর, আমাদের এখান থেকেই কর, তা হলে আমিও কথা বলবো! আলম, লাইনটা ধরে দাও না। দ্যাখো, বস্টনের নম্বর লেখা আছে।

তুতুল বললো, পার্সন টু পার্সন কল করো। অলির গলা শুনে একেবারে চমকে যাবে। ছেলেটা!

অলির একটু একটু লজ্জা করছে। এখানে এতজনের সামনে সে বাবলুদার সঙ্গে কী কথা। বলবে? সে কবে-কখন নিউইয়র্ক পৌঁছোচ্ছে, সে খবর তো বাবলুদা জানেই। তার মৃদু আপত্তি কেউ শুনলো না।

আলম বললো, খুব ভালো হবে, একটা প্লেজান্ট সারপ্রাইজ হবে। শুধু তাকে এখন বাড়িতে পেলে হয়।

টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিয়ে আলম বললো, আমাদের বিয়ের রাত্তিরেই অতীন ওখান থেকে ফোন করেছিল। ভেরি নাইস অফ হিম। তুতুল, তোমার ভাইয়ের পদবীটা যেন কী?

অন্য তিনজন কথা থামিয়ে উৎকর্ণ হয়ে রইলো। আলম কথা বললো অপারেটরের সঙ্গে, একটুক্ষণ ধরে রইলো, তারপর বললো, নট অ্যাট হোম। জানি তো, আমেরিকায় ইয়াং ছেলে-পুলেরা বাড়িতে প্রায় থাকেই না! কাল রাতেও সে নাকি বাড়িতে ফেরে নি।

অলি আস্তে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর বললো, তুতুলদি, আজ বিশাখা আমাদের জন্য সিনেমার টিকিট কিনেছে, বেশীক্ষণ থাকতে পারছি না।

তুতুল বললো, ওমা, আজই সিনেমায় যাবি? কিছুই তো শোনা হলো না। আলম তাদের চা-ও খাওয়ালো না।

আলম বললো, সন্ধ্যার পর চা খাওয়া ভালো না। ব্যাড ফর হেলথ। যদি ওয়াইন-টোয়াইন। খেতে চাও…

অলি উঠে দাঁড়িয়ে বললো, না, না, ওসব কিছু খাবো না। আজ তা হলে যেতে হয়।

তুতুল বললো, সিনেমা তো সব জায়গাতেই দেখতে পাবি। লণ্ডনে দু’একটা থিয়েটার দেখে যা। ব্রিটিশ মিউজিয়াম আর টেট গ্যালারিতে অবশ্যই একবার যাবি। আমার হঠাৎ এই কোমরে ব্যথা না হলে আমিই তোকে নিয়ে যেতে পারতাম।

.

অলি বললো, বিশাখাই আমাকে অনেক জায়গায় ঘোরাচ্ছে। ওর স্কুল এখন ছুটি। আজই। তো টেট গ্যালারি আর মাদাম টুসো দেখলম। কাল যাচ্ছি স্টার্ট ফোর্ড অন আভন।

তুতুল অলির চোখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বললো, অলি, সত্যি কথা বল। তো, আমার মায়ের শরীর কেমন আছে? একদিন স্বপ্নে দেখলাম…

.

অলি জোর দিয়ে বললো, পিসিমণি এখন সত্যি বেশ ভালো আছেন। মাঝখানে কিছুদিন সর্দি কাশিতে ভুগেছিলেন, সে মাসখানেক আগে। উনি আমার সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে একতলার দরজা পর্যন্ত নেমে এলেন। আমার হাত ধরে বললেন, মেয়েটা আজকাল আর বেশী চিঠি লেখে না, তুই গিয়েই একটা খবর দিবি–

তুতুল বললো, তুই যেন আমার কোমরে ব্যথার কথাটা মাকে লিখতে যাস না। দু’দিনেই ভালো হয়ে যাবো। কালকেই মাকে চিঠি লিখবো। আমার বিয়ের কথাটা এবারে জানাবো। আমিই জানাবো, তোর লেখার দরকার নেই।

–সেই ভালো! তুতুলদি, আমি যাবার আগে পারলে আর একবার আসবো!

আলম ওদের এগিয়ে দিতে গেল লিফট পর্যন্ত। সে একটা সিগারেট ধরালো। সিগারেটের ধোঁয়ায় যদি হঠাৎ তুতুলের হাঁচি আসে, তাতে তার খুব ক্ষতি হবে, সেই জন্য আলম ঘরের মধ্যে সিগারেট খায় না।

অলি জিজ্ঞেস করলো, অপারেশন তো সাকসেসফুল হয়েছে? আর কোনো ভয় নেই, তাই না?

আলম তার বিস্ময়ের চমকটা লুকোতে পারলো না। তার দু’চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

বিশাখা বললো, মিঃ আলম, আপনারা দু’জনে একটি রোমান্টিক কাপল হিসেবে লণ্ডনে বেশ। ফেমাস। মিসেস আলমের যে ব্রেইন টিউমার অপারেশান হয়েছে, তাও অনেকে জানে। বিয়ের পরেই এরকম একটা অসুখ…

.

আলম বললো, আপনি বুঝতে পেরে গেছেন? আপনার চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য তুতুলকে কত রকম মেক আপ দেওয়া হলো।

অলি বললো, মেয়েদের চোখ ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। সত্যি কী হয়েছিল এবার বলুন।

আলম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, অসুখের সিমটম দেখা গিয়েছিল। বিয়ের আগেই। খুবই সাকসেসফুল অপারেশান হয়েছে। রিকভার করতে খানিকটা সময় লাগবে, কিন্তু আর ভয়ের কিছু নেই।

অলি বললো, তুতুলদি ভালো হয়ে যাবেন। নিশ্চয়ই ভালো হয়ে উঠবেন।

আলম বললো, আই মাস্ট থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি যে বুঝতে পেরেছেন বা জানেন, সেটা ওকে একবারও বুঝতে দেননি।

অলি বললো, আমি ওঁর মাকে কিছু লিখবো না। চিন্তা করতে বারণ করবেন। এই সময় চিন্তা করা খুব খারাপ। কলকাতার সবাই ভালো আছে, আপনি বুঝিয়ে বলবেন ওঁকে।

তুতুলদিকে সবাই ভালোবাসে, তার কোনো কাজে কেউ রাগ করবে না।

অলিরা চলে যাবার পর আলম সিগারেটটা অর্ধেক অবস্থাতেই ফেলে দিয়ে ফিরে এলো ঘরে। তুতুল চোখ বুজে ছিল, শব্দ শুনে চোখ মেলে, ফ্যাকাসেভাবে হেসে জিজ্ঞেস করলো, আমি কেমন অভিনয় করলাম?

আলম বললো, যেমন ফুটফুটে সুন্দরী দেখাচ্ছে, তেমনই দুর্দান্ত অভিনয়, তোরে এবার সিনেমায় নামাতেই হবে দেখছি!

আলমকে বিছানার কাছে ডেকে বসিয়ে তুতুল বললো, অলিকে দেখে আমার এমন মন কেমন করলো কলকাতার জন্য। মাঝে মাঝে জোর করে কলকাতার কথা ভুলে থাকতে চেষ্টা করি! অলি আগে খুব লাজুক ছিল, এখন বেশ স্মার্ট হয়েছে। তোমার ওকে ভালো লাগেনি?

আলম বললো, হুঁ, বেশ স্মার্ট। এবার তুই ঘুমা। ওষুধগুলা দেই?

–আমার আজ এত তাড়াতাড়ি ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না। আর একটু গল্প করি। আলম, এই সেপ্টেম্বরে কিন্তু সত্যিই একবার দেশে যাবো।

–তোমার দেশে তুমি যেতে পারো। আমি তো ঢাকায় যেতে পারবো না। কতদিনে আমাদের যুদ্ধ শেষ হবে কে জানে!

–তুমিও কলকাতায় যাবে। মা এখন ঠিকই বুঝবে। তোমাকে দেখলেই মা সব রাগ ভুলে যাবে।

–আচ্ছা, সে কথা পরে হবে। এখন কিন্তু তোমারে ঘুমাইতেই হবে। ত্রিদিববাবুর আজ আসার কথা আছে একবার। ফোন করেছিলেন। তখনই তুমি ঘুমায়ে থাকলেও ক্ষতি নেই। আমি ওনার সাথে কথা বলবো।

–তুমি কিন্তু ত্রিদিবমামাকে আজ মদ খাওয়াবে না। মদ খেলে উনি উঠতেই চান না, বড্ড রাত করে দেন।

–উনি যে স্কচ খান, তা রাখিই নাই আমার কাছে।

–উনি তো নিজেই নিয়ে আসেন। তুমি গেলাস দেবে না। ঘরের মধ্যে চুরুট খাওয়াও অ্যালাউ করবে না।

–ঠিক আছে, ঠিক আছে, অতশত ভাবতে হবে না। তুমি এবার চোখ বুজে শুয়ে থাকো।

আলম তুতুলকে পর পর কয়েকটা ওষুধ খাওয়ালো। জল খাওয়াবার পর ঠোঁট মুছিয়ে দিয়ে বললো, এইবার একখান ঘুমপাড়ানি গান করবো? আয় ঘুম যায় ঘুম দত্ত পাড়া দিয়ে, দত্তদের বউ পান খেয়েছে এলাচদানা দিয়ে…

ঝনঝন করে বেজে উঠলো টেলিফোন। অল্প একটুক্ষণ কথা বলে আলম ফিরে আসার পর তুতুল জিজ্ঞেস করলো, কে? বাবলু?

–না। ভারি মজার ব্যাপার। শাজাহান সাহেব, তিনি কাছেই এক জায়গায় আছেন, একবার আসতে চান। একেই বলে বোধহয় নিয়তি।

–কেন, নিয়তি কেন?

–যে দিন তোমার ত্রিদিবমামা আসেন, সে দিনই শাজাহান সাহেবও এসে হাজির হয়ে যান। অথচ ওনারা দু’জন যে পরস্পরকে পছন্দ করেন না, তা তো বোঝাই যায়। আমি আর কী করবো, শাজাহান সাহেব আসতে চাইলে তো না বলতে পারি না।

–এবার আমার সত্যি ঘুম পেয়ে গেল। ওরা দু’জন এলে তুমি বেশী ঝুত করো না। আর একটা কথা শোনো। কাল থেকে তুমি সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকবে না আমার জন্য। তুমি তোমার কাজ করতে যাবে। তোমার এখন কত কাজ!

–এই যে একটু আগে কইলা যে আমি যেন এক মুহূর্তের জন্যও তোমারে ছেড়ে না যাই।

–সেটা অন্য। তুমি দূরে থাকলেও আমাকে ছেড়ে যাবে না।

শাজাহানই এলেন ত্রিদিবের আগে। যথারীতি তাঁর নিখুঁত পোশাক, হাতে এক গুচ্ছ ফুল। এর আগে তিনি হাসপাতালেও তুতুলকে দেখতে গিয়েছিলেন। তুতুলকে ঘুমন্ত দেখে তিনি নিঃশব্দে চলে এলেন জানলার ধারে। আলমকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন খবরাখবর।

তুতুল একবার চোখটা একটু খুলে জিজ্ঞেস করলো, কে?

শাজাহান এগিয়ে এসে ব্যগ্রভাবে বললেন, কেমন আছো, বহিশিখা? আমি শাজাহান। তুতুল অস্ফুট গলায় বললো, ভালো আছেন, শাজাহানভাই?

শাজাহান বললেন, আমরা তো ভালো আছিই। আমরা তোমার জন্য তুমি খুব জলদি সেরে উঠলেই আমাদের আনন্দ…

তুতুল আর কথা বললো না, তার চোখ বুজে গেল, সে ফিরে গেছে তার জগতে।

তুতুলের একটা হাত তুলে নিয়ে সামান্য চাপ দিলেন শাজাহান। তারপর আবার জানলার কাছে এসে আলমকে বললেন, এরপর ওকে নিয়ে একবার সুইজারল্যাণ্ড ঘুরে আসো বরং। তাড়াতাড়ি ওর শরীর সারবে সেখানে। যদি বলো, আমি জুরিখে থাকার জায়গার বন্দোবস্ত করে দিতে পারি।

আলম বললো, আর কয়েকটা দিন যাক। ও যেতে চাইবে কি না…

এরপরেই এসে পড়লেন ত্রিদিব। যারা আট-দশ বছর আগে ত্রিদিবকে দেখেছে কলকাতায়, তারা এই মানুষটিকে চিনতেই পারবে না। সেই অতিমাত্রায় ভদ্র, সুরুচি সম্পন্ন, ছিমছাম চেহারার ত্রিদিব এখন অন্য মানুষ। হঠাৎ অতিরিক্ত মোটা হয়ে গেছেন, শুধু মোটা নয়, শরীরে একটা থলথলে ভাব, হাঁটেন থপথপ করে। কলকাতা বা দিল্লিতে যিনি এক ফোঁটা মদ স্পর্শ করতেন না, আজ তিনি অ্যালকোহলিক। বেশী মদ খেলেই তিনি বেশী কথা বলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে যেন পশ্চিম দিগন্তের মেঘলা সূর্যাস্ত। শেষ বর্ণাঢ্য ভাবুটাও নেই।

তিনি ঘরে ঢুকলেনই শেকপীয়ারের কোনো ট্র্যাজেডির চরিত্র হয়ে। প্রায় ছুটে তুতুলের বিছানার কাছে গিয়ে বললেন, তুতুল! তুতুল কেমন আছে? জ্ঞান ফেরেনি?

তারপর দু’হাত তুলে হাহাকার করে বলে উঠলেন, কর্ডেলিয়া, কর্ডেলিয়া, স্টে আ লিটল!

ত্রিদিব তুতুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন, আলম শেষ মুহূর্তে তাঁকে ধরে ফেলে মৃদু অথচ দৃঢ় গলায় বললো, এ দিকে আসুন। ওকে ডিসটার্ব করবেন না।

ত্রিদিবের মুখে জ্বলন্ত চুরুট, আজ তিনি ক্ষমতার অতিরিক্ত পান করে ফেলেছেন। তিনি খানিকটা টলে গিয়ে, কান্না কান্না গলায় বললেন, তুতুলের জন্য আমার এত কষ্ট হয়, ওর সার্জন মিঃ রবিনসন আমায় বললেন সে দিন, খুবই ক্রিটিক্যাল কেস, ইউ হ্যাভ টু কিপ ইয়োর ফিংগার ক্রসড়! আমাদের তুতুল…

আলম বললেন, সে কথা উনি বলেছিলেন অপারেশানের আগে। কিন্তু অপারেশান সেন্ট পারসেন্ট সাকসেসফুল বলা যায়।

আলমের দু’কাঁধে হাত রেখে ত্রিদিব বললেন, আলম, তুই তুতুলের ভার নিয়েছিস, তুই অতি ভাগ্যবান রে। তুতুলের মতন এমন লক্ষ্মী মেয়ে আর হয় না!

ত্রিদিবের ঠোঁট থেকে চুরুটটা ছাড়িয়ে নিয়ে আলম বললো, আপনি বসুন।

ত্রিদিব তবু কাতর ভাবে বললেন, আলম, তুই আমাকে সত্যি কথা বল, ধোঁকা দিস না, ওর জ্ঞান ফেরেনি, তবু তুই ওকে হাসপাতাল থেকে কেন নিয়ে এলি?

শাজাহান বললেন, বহিশিখা ঘুমোচ্ছে, এ ঘরে এত গোলমাল না করে আমরা বাইরে গিয়ে কথা বলতে পারি।

ত্রিদিব যেন এই প্রথম শাজাহানকে দেখলেন। তাঁর দিকে ঘোলাটে চোখ দুটো তুলে বললেন, তুমি এখানে এত ঘন ঘন আসো কেন বলো তো? আমি যখনই আসি, তোমাকে দেখি।

শাজাহান অতি ভদ্রভাবে বললেন, ইঁট মাস্ট বী আ কয়েনসিডেন্স। উল্টো করে বলা যেতে পারে, আমি যখনই আসি, সে দিনই তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।

ত্রিদিব বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বললেন, এসো না। তুমি এখন এই মেয়েটার কাছে এসো না। তুমি অপয়া।

শাজাহানের মুখখানা অপমানে রক্তাভ হয়ে গেল। তবু তিনি ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন না করে শান্ত গলায় বললেন, হোয়াট ডু ইউ মীন?

–তুমি এই মেয়েটার কাছে এত ঘন ঘন আসো কেন? সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তুমি আঠার মতন লেগে থাকো। স্পেয়ার তুতুল, প্লিজ, শাজাহান, আই বিসিচ ইউ…

–ইউ হ্যাভ গট আ ডার্টি মাইণ্ড, ত্রিদিব! আমি আসি, আমি আসি…তার আগে বলো, তুমি কেন আসো!

আলম দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললো, জেন্টেলমেন, আই অ্যাম অ্যাফ্রেড, আমাকে একটা অপ্রিয় কথা বলতে হবে। আপনারা দু’জনেই এখন প্লিজ বাইরে যান।

ত্রিদিব তেড়িয়াভাবে বললেন, দ্যাখ আলম, তুই তুতুলকে বিয়ে করেছিল বলেই একেবারে মাথা কিনে নিসনি। সব সময় মনে রাখবি, এই তুতুল, প্রতাপ মজুমদারের অতি আদরের ভাগ্নী, জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু প্রতাপ, আমার ভগ্নিপতি, সে কখনো পরিবারের লোকজনকে তা বুঝতে দেয়নি। প্রতাপ, তার দিদি আশা করে আছে, বড় ডাক্তার হয়ে তুতুল একদিন দেশে ফিরবে, সকলের–

এই সময় তুতুল হঠাৎ চোখ মেলে ধড়মড় করে উঠে বসে বললো, ত্রিদিবমামা এসেছে? আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম এই মাত্র…

ত্রিদিব সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিরাট উল্লাসের চিৎকার করে বললেন, কর্ডেলিয়া, মাই কর্ডেলিয়া, শী ইজ ব্যাক!

ত্রিদিব আর একটু হলেই তুতুলের বিছানার ওপর পড়ে যেতেন, এবার শাজাহান আর আলম দু’জনেই তাঁকে ধরে ফেললেন। আলম প্রায় ধাক্কা দিয়েই ত্রিদিবকে সরিয়ে দিয়ে তুতুলের মাথায় হাত দিয়ে বললো, কিছু হয়নি। তুমি শুয়ে পড়ো। তুমি ঘুমোও!

তুতুল একজন ঘোরলাগা মানুষের মত বললো, আমি স্বপ্ন দেখলাম, সুলেখা মামীমাকে। আলম, তুমি সুলেখা মামীমার কথা জানো না! ত্রিদিবমামার বউ ছিলেন। কোথায় তিনি হারিয়ে গেলেন। হঠাৎ আমি সুলেখা মামীমাকে আজই স্বপ্নে দেখলাম কেন এই মাত্র!

–তুতুল, প্লীজ কথা বলো না। আবার শুয়ে পড়ো।

–না, আমার ঘুম চলে গেছে। ঐ তো ত্রিদিমামা! ত্রিদিবমামা, সুলেখা মামীমার কী হয়েছিল?

ত্রিদিব হঠাৎ শান্ত হয়ে গেলেন। তুতুলকে প্রায় সুস্থভাবে কথা বলতে শুনেই তিনি যেন সংযত হয়েছেন। তিনি রুমাল দিয়ে মুখ মুছে বললেন, সুলেখার তো কিছু হয়নি। সে ভালো আছে। তুই সুলেখাকে স্বপ্ন দেখলি? তুই কি ভাগ্যবান, আমি একবারও দেখি না!

তুতুল বললো, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, তোমরা কথা বলছিলে, এই সময় আমি দেখলাম, সুলেখা মামীমা এসেছে, ঐ দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে।

ত্রিদিব বললেন, কী বলছিস তুই। সুলেখা এখানে আসবে কী করে? না, না, তুই এ সব কথা ভাবিস না! সুলেখা নেই, কোথাও নেই রে! আমি যেখানে থাকি, সেখানে তো সুলেখা কিছুতেই আসবে না। সে যে আমার ওপরেই বিষম অভিমান করে চলে গেছে। সেই জন্য একবারও স্বপ্নেও সে আমাকে দেখা দেয় না।

তুতুল এবারে পরিষ্কার সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো, স্বপ্ন নয়, যেন সত্যি সুলেখা মামীমাকে দেখলাম। ত্রিদিবমামা, বলো, কেন সুলেখা মামীমা চলে গিয়েছিল? কিসের অভিমান!

ত্রিদিব ধরা গলায় বললেন, এই শাজাহান জানে। ওকে বলতে বল! শাজাহান আকাশ থেকে পড়ার মতন ভঙ্গিতে বললেন, আমি? আমিও তো এত বছর ধরে সেই উত্তরটাই খুঁজছি!

জানলার কাচ খুলে বাইরের টাটকা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিয়ে ত্রিদিব বললেন, এই কথা নিয়ে আমি কারুর সঙ্গে এতদিন কোনো আলোচনা করিনি। তুতুল, তুই জিজ্ঞেস করলি…

আলম বললো, আজকের মতন এ সব আলোচনা বন্ধ রাখলে হয় না? আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা খুব মর্বিড় মনে হচ্ছে!

ত্রিদিব আলমের দিকে হাত তুললেন, তুতুল বললো, আলম, একটু শুনতে দাও, তারপর, আই প্রমিজ, ঘুমিয়ে পড়বো!

ত্রিদিব জানলার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালেন একজন অভিনেতার মতন। কোটের দু’পকেট চাপড়ে চুরুট খুঁজলেন। না পেয়ে কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে তিনি বললেন, সুলেখা, এর মধ্যেই সে যেন কত দূরের মানুষ! কারুক্কে সুলেখার কথা বলিনি। তুতুল, তুই জিজ্ঞেস করলি, তোর এত অসুখ, তোর অনুরোধ ফেলতে পারি না। তাকে সেরে উঠতেই হবে রে! তোর মা, তোর মামা প্রতীক্ষা করে আছে তোর জন্য হ্যাঁ, সুলেখার কথা। জীবনে আমি সুলেখাকে একটাও রাগের কথা বলিনি। শুধু একবার, সেটাও কিন্তু রাগের কথা নয়। ভগবান শুধু সাক্ষী। আমি রাগ করে বলিনি, কেই বা তা বিশ্বাস করবে? ভগবান তো তার সাক্ষী দিতে আসে না কখনো।

শাজাহান বললেন, আমি আলমের সঙ্গে এক মত। আজ এ সব কথা থাক।

ত্রিদিব বললেন, শাট আপ! আমাকে বলতে দাও! জানিস তুতুল, আমার বউ সুলেখা, সে তার অ্যাডমায়ারার, ভক্ত আর প্রেমিকদের এড়াবার জন্য কলকাতা ছেড়ে চলে এসেছিল দিল্লি। আমাদের কী সুন্দর দিন কাটছিল দিল্লিতে। আমরা প্রত্যেক উইক এণ্ডে নিজেদের নেমন্তন্ন করতুম, মনে আছে লোদি গার্ডেনসে, গরমের দিনে দুপুর রোদ্দুরে গেছি, ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ, আমরা ছায়া খুঁজছি, কতরকম ফুল ফুটেছে, কাঠবেড়ালিরা দৌড়োদৌড়ি করছে, এক জায়গায় সুলেখা তার জীবনে প্রথম ম্যাগনোলিয়া গ্র্যান্ডিফ্লোরা ফুল দেখলো, কী খুশি সে.তবু আমরা বাড়ি ফিরলেই দেখতুম, কলকাতা থেকে তার কোনো প্রেমিক এসে হাজির হয়েছে। এই শাজাহান কিংবা রাতুল! যেন দিল্লিতে তাদের কত কাজ! আমি ওদের আদর যত্ন করে আমার বাড়িতে থাকতে দিয়েছি। কিন্তু ওরা তো আমার জন্য আসতো না। আসতো সুলেখার জন্য!

শাজাহান বললেন, ত্রিদিব, প্লীজ, এ সব কথা সত্যি নয়। উই ওয়ার গ্রেট ফ্রেণ্ডস! থ্রি অব আস!

ত্রিদিব সে কথা অগ্রাহ্য করে বললেন, একদিন, বুঝলে তুতুল, আমি বাড়িতে ছিলুম না। এই শাজাহান আর রাতুল বলে আমাদের আর এক বন্ধু মারামারি করলো, লাইক টু ডগস ফাইটিং ওভারে আ পিস অব মিট, সেই মাংসের টুকরোটা ছিল সুলেখা! যেন আমি কেউ নয়!

–ত্রিদিব, ইউ আর মিসটেকেন! আমি মারামারি করিনি। তোমাদের সেই বন্ধু রাতুল, সে একটা গোঁয়ার এবং বুট, সে-ই শুরু করেছিল, তোমরা যে কী করে তাকে প্রশ্রয় দিতে!

–চুপ করো, শাজাহান! আমরা সবাইকেই প্রশ্রয় দিতুম। আমি আর সুলেখা ছিলুম। ভদ্রতার কারাগারে বন্দী। আজ তুতুল জানতে চেয়েছে…সে দিন বাড়ি ফিরে ঘটনাটা শোনার পর, আই ফেল্ট সো স্যাড, আমার মনে হয়েছিল, আমি সুলেখার যোগ্য নই, আমি বিচালির গাদায় কুকুরের মতন সুলেখাকে শুধু শুধু আটকে রেখেছি। সারা পৃথিবী সুলেখাকে চায়। হঠাৎ সেই কথা আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, ওনলি ওয়ান সেনটেন্স, একটি মাত্র বাক্য, দ্যাট রুইনড টু লাইভস, আমি বলেছিলুম, সুলেখা, আমি বোধহয় তোমাকে বন্দী করে রেখেছি, এবার আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম, তুমি যে-কোনো একজনকে বেছে নিতে পারো, পারহ্যাপস। শাজাহানের সঙ্গই তুমি নতুন জীবন শুরু করতে পারো। এ কথা শুনেই সুলেখা বুক হাটা আওয়াজ করলো, কী বললে? তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না? আমার যেন মনে হলো, সুলেখার সর্বাঙ্গে জ্বালা ধরে গেছে আমার এ কথা শুনে, সে এমন ছটফট করতে লাগলো, যেন আগুন লেগেছে, আমি ছুটে তাকে ধরতে পারলুম না! তারপর এক সময় দেখি, সত্যিই তার সারা গায়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে.তুতুল, তোকে আমি…

ত্রিদিব আর কথা শেষ না করে দু’হাতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলেন। শাজাহান ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন নিঃশব্দে।

তুতুল একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আলম, আমাকে একটু ধরো। আলম আপত্তি করতে পারলো না। তুতুলকে বিছানা ছেড়ে উঠতে সাহায্য করলো। সে ভেবেছিল, তুতুলকে বাথরুমে নিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে এসে তুতুল কিছুতেই বেড় প্যান। নিতে চায় না!

তুতুল টলটলে পায়ে এগিয়ে এসে ত্রিদিবের পিঠে হাত রেখে বললো, ত্রিদিমামা, এ তো অনেকদিন আগেকার ঘটনা। তবু তুমি এখনো এত কষ্ট পাও? নিজেকে একেবারে নষ্ট করে ফেলছো?

ত্রিদিব মুখ না তুলেই বললেন, আমি নিজেকে নষ্ট করছি না রে, তুতুল। আমার জীবনে আর কোনো উন্নতির আশাও কেউ করে না। আমি ভালোও নেই, খারাপও নেই। অথচ বেশ আছি! আমি সুলেখার কথা আর বিশেষ ভাবি না, সুলেখাও আমার জীবনে কিংবা স্বপ্নে ফিরে আসে না। তবু সে চলে যাবার পরেও হয়তো কোথাও আছে। আমি এখনো চলে যাইনি। কিন্তু আমি এখানেও নেই!

মুখ তুলে তিনি আলমকে বললেন, আমার চুরুটটা কোথায় ফেলে দিলে? একবার তুলে এনে দাও, প্লীজ! একটুও মদ নেই তোমার বাড়িতে? থাকলে একটু দাও, অন্তত দু’এক পেগও যদি থাকে…বড্ড তেষ্টা, বড্ড যন্ত্রণা! তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে ওঠো, তুতুল, আমাদের আয়ু। আমরা তোমাকে দেবো! তুমি ভালো হয়ে ওঠো! তুমি এত ভালো!

৩৭. সকাল থেকেই বৃষ্টির বিরাম নেই

সকাল থেকেই বৃষ্টির বিরাম নেই, তাই দুপুরে খিচুড়ি রান্না হয়েছে। সঙ্গে মাংস আর ফজলি আম। এই দিয়েই আজ বেগম জাহানারা ও জনাব শরীফ ইমামের চব্বিশতম বিবাহবার্ষিকীর ভোজ। অন্যবছর এই দিনটিতে আত্মীয়-বন্ধুদের দাওয়াত দেওয়া হতো। এ বছর আর কারুকে ডাকা হয়নি, তবে একজন আছে বিশিষ্ট অতিথি। রুমী, হ্যাঁ, অতিথিই তো রুমী, সে কখন আসবে, কখন চলে যাবে তার কোনো ঠিক নেই, সে সম্পর্কে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করাও চলবে না। সে হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়েছে কাল সন্ধের পর।

মাঝখানে বেশ কিছুদিন রুমীর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। শুধু শোনা গিয়েছিল যে সে মেলাবাড়ি নামে একটা জায়গার ক্যাম্পে আছে। কোথায় যে সেই মেলাবাড়ি, সেটা আধা শহর না গ্রাম, সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই জাহানারা ইমামের। তবে কয়েক সপ্তাহ আগে দুটি যুবক এসে দেখা করেছিল ওঁদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। দু’জনেরই মাথার লম্বা চুল ঘাড় পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে, জুলপি নেমে গেছে কানের লতির কাছে, নাকের নিচে মোটা গোঁফ। যুবকদুটিই অতি গম্ভীর ধরনের, চঞ্চল চোখে মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকায়। সিগারেটের প্যাকেট খুলে ভেতরের পাতলা কাগজটায় লেখা একটা দু’লাইনের চিঠি তারা দেখিয়েছিল, “পত্রবাহক দু’জনকে দরকার হলে কিছু সাহায্য করবেন। আমি ভালো আছি।-মণি।” চিঠিটা দেখেই অদ্ভুত এক আনন্দ, বিস্ময় ও রোমাঞ্চ বোধ করেছিলেন জাহানারা আর শরীফ! মণি হচ্ছে মেজর খালেদ মোশাররফ-এর ডাক নাম, তাঁর হাতের লেখাও ওঁদের চেনা। খালেদ মোশারফ-এর মতন পেশাদার যোদ্ধারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে কিংবা দেয়নি, কে কোথায় আছে, ঢাকায় বসে তা কিছুই জানার উপায় নেই। ঐ ছেলেটির কাছেই শোনা গল যে রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর সেকটর টু এবং কে-ফোর্সের কমাণ্ডার এখন খালেদ মোশাররফ, তিনি আছেন আগরতলার কাছাকাছি একটা জায়গায়, সেখানেই গেরিলা ট্রেনিং নিচ্ছে রুমী।

ঐ স্বল্পভাষী যুবকদুটিকে খালেদ মোশাররফ পাঠিয়েছিলেন ঢাকার চেনাশুনো মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য, কিছু কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসও তাঁর দরকার। যুবকদুটি শুধু কাজের কথাই বলে, রুমীর সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে কি না কিংবা রুমীকে তারা আদৌ চেনে কি না সেরকম কোনো প্রশ্নেই তারা মুখ খুলতে চায় না।

পরের সপ্তাহেই অবশ্য ঐ ছেলেদুটিকে জাহানারা ইমামের মনে হয়েছিল যেন সশরীর ফেরেস্তা। তারা রুমীর চিঠি এনেছিল, রুমীর নিজের হাতে লেখা! চিঠি তো নয়, যেন টেলিগ্রাম। “আমি ভালো। মণিভাইদের সঙ্গে আছি। এদের যা যা দরকার সব দিও।–রুমী।”

সে চিঠি পেয়ে জাহানারা দারুণ উতলা হয়ে উঠেছিলেন। কী কী চায় ওরা? কোনো কিছু যদি কিনে দিতে হয়, টাকাপয়সা যা লাগবে, তাঁর সমস্ত গয়নাগাঁটি বিক্রি করে, যথাসর্বস্ব দিতেও তিনি রাজি। শরীফ হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ওরা টাকা পয়সা চায় না, ওরা চায় ব্রীজ!

খালেদ মোশাররফ গোপন নির্দেশ পাঠিয়েছেন যে বাংলাদেশের সবকটা ব্রীজ আর কালভার্টের তালিকা তাঁর দরকার। এবং সেতুগুলিতে বিস্ফোরণ ঘটানো বিষয়ে কিছু তথ্য। শরীফ নিজে একসময় সরকারের রোডস অ্যাণ্ড হাইওয়েজ-এর ডিজাইন ডিভিশনে কাজ করেছেন। সে কথা খালেদ মোশাররফ মনে রেখেছেন। শরীফ অনেক কৌশলে সেই ফাইল বার করে তার থেকে প্রয়োজনীয় নকশা সব কপি করে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তারপরেই রুমীর ফিরে আসা। সে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে তা এখনো বলেনি।

কাল গল্প হয়েছে রাত তিনটে পর্যন্ত। এখন দুপুর বারোটা, রুমী এখনো ঘুমোচ্ছে। রান্নাবান্না সব হয়ে গেছে, তবু রুমীকে জাগাতে ইচ্ছে করে না।

ঢাকা শহরের অবস্থা এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। যদিও কিছু কিছু আগুনে-পোড়া বস্তি এখনো চোখে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলা-বিধবস্ত হলগুলি জনমানবশূন্য, একুশে ফেব্রুয়ারি স্মৃতিস্তম্ভটি অর্ধেক ভাঙা, তার গায়ে মসজিদ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে, রমনা মাঠের প্রাচীন কালীবাড়িটি একেবারে নিশ্চিহ্ন, তবু দোকানপাট খুলেছে, অফিস-আদালতে কাজ চালু হয়েছে, বাজার বসছে। দিনের বেলা অন্তত ঢাকার যে-কোনো জায়গায় আনাগোনা করা যায়। বিদেশী পত্র-পত্রিকা কিছুই পাওয়া যায় না, রেডিওতে বি বি সি, আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ধরলে শোনা যায় সীমান্ত-যুদ্ধের খবর, আবার পাকিস্তানী বেতার শুনলে মনে হয়, ঐ সবকিছুই মিথ্যে, পাকিস্তানী আর্মি সমস্ত ভারতীয় চর ও দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করে দেশে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার কথাটা ছিল কিছু কিছু হঠকারী ও উন্মাদের অলীক স্বপ্ন, তারা আশ্রয় নিয়েছে ভারতে, পাকিস্তান এখন আগের চেয়েও সুদৃঢ় ও একতাবদ্ধ।

তবু সন্ধের পর হঠাৎ হঠাৎ শোনা যায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। মেশিনগানের চকিত ফায়ারিং। ঢাকার মানুষ ব্যাকুল হয়ে জানতে চায় কোথায় কী ঘটছে! কিন্তু জানবার উপায় নেই, সে সময় বাইরে বেরুতে কেউ সাহস করে না, এমন কি ছাদে উঠেও উঁকি ঝুঁকি মারা যায় না, দৈবাৎ আর্মি-পেট্রোলের চোখে পড়ে গেলে সে বাড়ি সার্চ হবে। সেইসব বিস্ফোরণের পরই বাতি নিবে যায়, দু’তিন দিন আর কারেন্ট আসে না, কল দিয়ে জলও পড়ে না। বোঝা যায় যে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এসে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সরকারি অফিসগুলিতে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ক্রমে, দিনের বেলাতেও তাদের পরাক্রম দেখা যাচ্ছে, সেইসব অসম সাহসী বিচ্ছুরা মোটর সাইকেল কিংবা জিপে চেপে এসে আকস্মিকভাবে কোনো পথের মোড়ে কিংবা জরুরি কোনো অফিসের সামনে পাকিস্তানী আর্মি ও প্যারা মিলিশিয়ার ওপর এক ঝাঁক গুলিবর্ষণ করে মিলিয়ে যাচ্ছে চোখের নিমেষে। এই বিচ্ছুরা যেন যখন তখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। পাকিস্তানী সেনারা এখনো জানেই না, মুক্তিদের দেখতে কেমন?

খোদ ঢাকা শহরের বুকের ওপর এসে এই ধরনের আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে যে স্বাধীনতার সংগ্রাম মোটেই বন্ধ হয়নি, পাকিস্তানের সামরিক শক্তিকে তারা ভয় পায় না।

রুমী কিছু বলতে না চাইলেও জাহানারা ইমাম বুঝেছেন যে সীমান্ত ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং নিয়ে কিছু কিছু ছেলে যে ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে আবার ফিরে আসছে, নিশ্চয়ই তার বিশেষ কারণ আছে। যুদ্ধে যোগ দিতে গিয়েও তারা বাড়ি ফিরে আসবে কেন? ঢাকার ভেতরে থেকেই বড় রকম কোনো আঘাত দেবার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে তারা? রাত্তিরে বোমার শব্দ শুনলে জাহানারার মতন আরও অনেকের আনন্দ হয়, গর্ব হয়, ইলেকট্রিসিটি কিংবা ওয়াটার সাপ্লাই দিনের পর দিন বন্ধ থাকলে যত অসুবিধেই হোক, তবু তাতে মনে হয়, তাঁদের ছেলেরা জিতছে। কিন্তু জাহানারা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না যে রুমীর পক্ষে সীমান্ত ক্যাম্পে থাকার চেয়েও ঢাকায় ফিরে আসা বেশি বিপজ্জনক কি না। এতদিন রুমী চোখের আড়ালে ছিল, কোনো খবর পাননি, দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। আজ রুমী বাড়িতে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে, তবু অজ্ঞাত আশঙ্কায় মায়ের বুক ছমছম করে।

একটু পরে তিনি রুমীর ঘরে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়ালেন। খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে রুমী, রোদে পুড়ে তার চামড়ার রং যেন পুরোনো কাঁসার মতন হয়ে গেছে। মাথাভর্তি চুলের সঙ্গে যেন চিরুনির সম্পর্কই নেই। কাল রুমী বলছিল পাক আর্মির নজর ফাঁকি দেবার জন্য ওদের অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুর-নালার পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকতে হয়। এ বাড়ির প্রথম সন্তান এই রুমী, কত আদরের, এর আগে সে বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকেনি, মাত্র কয়েক মাসে সে কত বড় হয়ে গেল! এই সময়ে তার বিদেশে গিয়ে পড়াশুনো করার সব ঠিকঠাক ছিল।

ঘুমন্ত সন্তানকে একটু আদর করতে ইচ্ছে হলো জাহানারার। আস্তে তিনি রুমীর পিঠে হাত রাখলেন।

সঙ্গে সঙ্গে রুমী ছিটকে একপাশে সরে গিয়ে বললো, কে? কে?

ঘুমের মধ্যেও এত সতর্কতা, এও কি গেরিলা ট্রেনিং? জাহানারা হাসতে হাসতে বললেন, ওরে, আমি রে, আমি!

এখনো দু’চোখের পাতায় ঘুম লেগে আছে, তবু পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে রুমী জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে, আম্মা? কেউ এসেছে?

জাহানারা বললেন, না, কেউ আসেনি। একটা বেজে গেছে, গোসল করবি না? খাবার-দাবার সব রেডি!

একটা বড় নিঃশ্বাস টেনে রুমী বললো, হু, সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে, নিশ্চয়ই খিচুড়ি হয়েছে। আজ! গ্র্যাণ্ড! কতদিন ঘি দিয়ে খিচুড়ি খাইনি! এত বেলা হয়েছে, তুমি আমাকে আগে ডাকোনি কেন, আম্মা?

–তোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তুই যেন কত মাস ঘুমাস নাই! তোর সারা শরীরে ঘুম লেগেছিল।

উঠে দাঁড়িয়ে কয়েকবার লাফালো রুমী। কোমর বাঁকিয়ে ব্যায়াম করে ঘুম তাড়াতে লাগলো। তারপর মায়ের আঁচল ধরে চার বছরের বালকের মতন গলায় বললো, আজ আমি নিজের হাতে খাবো না। তুমি খাইয়ে দেবে? অন্তত প্রথম দুই এক গেরাস!

জাহানারা তাড়া দিয়ে বললেন, যা যা, বাথরুম ঘুরে আয়। জামী বসে আছে না খেয়ে।

একটুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিচের খাবার ঘরে চলে এলো রুমী। টেবিলে বসার আগে সে হঠাৎ জাহানারার পা ছুঁয়ে কদমবুসি করে বললো, আম্মা, আজ তোমাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। বাবার সঙ্গে তোমার বিয়ে না হলে আমি আর জামী জন্মতামই না, তাই না?

মুখে আঁচল চাপা দিয়ে জাহানারা বললেন, শোনো ছেলের অদ্ভুত কথা! নে, নে, এখন খেতে বোস!

ছোট ভাই জামী প্লেট সামনে নিয়ে বসে মৃদু মৃদু হাসছে। কাল রাতে রুমীর মুখ থেকে সবাই যখন যুদ্ধের গল্প শুনছিল, তখন তার ঘুম এসেছিল, তার অনেক গল্প শোনা বাকি।

সে জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া, ক্যাম্পে প্রায়ই তো খিচুড়ি খাওয়ায়?

রুমী বললো, খিচুড়ি কী বলছিস! আমাদের দারুণ খাওয়া দাওয়া হয়। একদিন অন্তর একদিন বিরিয়ানি গোস্ত, নাস্তার সময় দুটো করে আণ্ডা, সপ্তাহে দু’দিন মুর্গি, আর মাছ তো। রোজ আছেই!

জাহানারা আর জামী দু’জনেই চমকে উঠলো। জাহানারা বললেন, এত খাবার? সত্যি? কে দেয়? ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট তো রিফিউজিদেরই খাওয়াতে পারছে না শুনি!

–মুক্তিযোদ্ধাদের স্পেশাল খাতির! সেইজন্যই তো প্রত্যেকদিন হাজার হাজার ছেলে। ক্যাম্পে যোগ দিতে যাচ্ছে। কি রে, জামী। তুই-ও এবার যাবি নাকি?

জামী বললো, এত খাবার খেলে তো সবাই মোটা হয়ে যাবে। লড়াই করবে কী করে?

রুমী মুখ তুলে বললো, আম্মা, খাইয়ে দাও!

প্রথম গেরাসটি নেবার পর সে বললো, আঃ, অমৃত! অমৃত! এত ভালো ঘি সহ্য হলে হয়। না রে, জামী, আমাদের ওখানে খিচুড়িও বিশেষ হয় না। ভাত-রুটির সঙ্গে একরকমের ডাল দেয়, কে আমরা বলি ঘোড়ার ডাল!

জাহানারা আঁতকে উঠে বললেন, ঘোড়ার ডাল, সে আবার কী?

–চোকলা মোকলা সুদ্ধ একধরনের গোটা গোটা ডাল, নর্মাল টাইমে বোধহয় ঘোড়াকে খাওয়ানো হয়। আর রুটির মধ্যে মাঝে মাঝে মরা পোকা পাই, রুটির সঙ্গেই সেঁকা হয়ে যায়।

–রুটির মধ্যে পোকা? তখন কী করিস, রুটিটা ফেলে দিস?

–ফেলে দেবো, তুমি কি পাগল হয়েছে আম্মা! অত শস্তা নাকি? পোকাটাই নখে খুঁটে ফেলে দিই।

জামী তার মায়ের সঙ্গে চোখাচোখি করলো। খাওয়ার ব্যাপারে রুমীর খুঁতখুঁতে স্বভাবের কথা কে না জানে! প্লেটে সামান্য একটু ময়লা দাগ দেখলে সে খাওয়া ছে চাইতো!

রুমী আবার মুচকি হেসে বললো, ঐ রুটি-ঘোড়ার ডালই যে কত ভালো লাগে, তা তুই বুঝবি কী করে জামী! ঐ খাবারও যে রোজ জোটে না! হাংগার ইজ দা বেস্ট সস, এখন মর্মে মর্মে বুঝি! একবার কী হলো জানো আম্মা, একটা অ্যাকশানে গেছি, দু’দিন কিছু খাদ্যবস্তু জোটেনি। শেষে খিদের চোটে গাছ থেকে একটা আধপাকা কাঁঠাল ছিঁড়ে নিয়ে খেতে শুরু করলাম। আমি তিন-চার কোয়া মোটে খেয়েছি, একজন লোভের চোটে পনেরো কুড়ি কোয়া খেয়ে নিতেই তারপর তার সাঙ্ঘাতিক পেট ব্যথা আর বারবার…

জাহানারা বললেন, থাম, তোকে আর ঐ খাওয়ার গল্প করতে হবে না। আর একটু খিচুড়ি নিবি? গোস্তের সুরুয়া দিয়ে খেয়ে নে।

–একদিনে বেশি না, আম্মা। এখন তো বাড়িতেই থাকছি?

–কয়দিন থাকবি?

–তা বলতে পারি না। আজকের দিনটা আছি, সেটা জানি। তোমাকে খুশি করার জন্য কালও না হয় থেকে যাবো।

জামী জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ভাইয়া, তুমি নিজের হাতে কোনো খান সেনাকে খতম করেছে। এ পর্যন্ত?

ছোট ভাইয়ের চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক ভাবে চেয়ে থেকে গম্ভীর ভাবে রুমী বললো, ওসব কথা জিজ্ঞাসা করতে নাই। শুধু একটা কথা মনে রাখিস জামী, খান সেনাদের ভূমিকা হলো শোষক আর অত্যাচারীর ভূমিকা। আর আমরা মুক্তিসংগ্রামী। আমরা মানুষ মারি না, আমরা আমাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করছি।

গল্প করতে করতে এঁটো হাত শুকিয়ে গেছে, উঠে হাত ধুয়ে এসে রুমী একটা সিগারেট ধরালো। তা দেখে বিস্ফারিত হয়ে গেল জামীর দুই চোখ। এ বাড়িতে সিগারেট? তার বাবা সিগারেট খান না, আম্মা সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারেন না। একদিন কাকে যেন সিগারেট ধরাতে দেখে খুব বকেছিলেন।

জাহানারা ছোট ছেলের দিকে চোখের ইঙ্গিতে জানালেন যে তাঁর সম্মতি আছে।

জাহানারা একসময় রুমীকে বলেছিলেন, যদি কোনোদিন সিগারেট ধরিস, আমাকে আগে জানাবি। অন্য কেউ এসে বলবে যে তোমার ছেলে সিগারেট খায়, তা আমি সহ্য করতে পারবো না। কলেজে উঠেও রুমী একদিনও সিগারেট টানেনি। কিন্তু কাল রাত্তিরে সে জানিয়েছে যে ক্যাম্পে থাকার সময় সে সিগারেট খাওয়া অভ্যাস করে ফেলেছে। সেখানে অনেকেই সিগারেট খায়। অ্যাকশানে যাবার সময়, ঝোপে-জঙ্গলে বহুক্ষণ ঘাপটি মেরে একলা একলা বসে থাকতে থাকতে সিগারেটটাকেই সঙ্গী মনে হয়। খাবার না জুটলেও সিগারেটের ধোঁয়ায় খিদে মরে। এখন সে সিগারেট ছাড়তে পারবে না। মায়ের আপত্তি থাকলে সে সামনে খাবে না। বাইরে উঠে যাবে!

জাহানারা সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি দিয়েছেন। তুচ্ছ সিগারেটের জন্য ছেলেকে কয়েক মিনিটের জন্যও তিনি চোখের আড়ালে যেতে দিতে চান না। আজ তিনি নিজেই রুমীর জন্য ভালো সিগারেট কিনে আনিয়েছেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে রুমী, তুই বাবুল চৌধুরীর কোনো খবর জানিস? রুমী অন্যমনস্ক ভাবে বললো, উঁহু!

–ওদের বাড়িতে যে বাচ্চা মেড সারভেন্টটা ছিল, সেফু, সে প্রায়ই এসে বাবুলের খোঁজ করে আর কাঁদে। মেয়েটা খুব ভালোবাসে বাবুলকে। বাবুল কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল?

–তা জানি না। তবে সিরাজুলের খবর পাই মাঝে মাঝে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সে খুব। নাম করেছে, দারুণ তার সাহস। তবে এখনও নাকি সে হঠাৎ হঠাৎ মনিরার নাম ধরে কাঁদে।

–ওঃ, মনিরাকে যেদিন ধরে নিয়ে গেল, সেদিনের কথা ভাবলে আজও বুক কাঁপে। আর কি মনিরাকে কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে? কোনো ট্রেসই রাখলো না মেয়েটার!

–হয়তো মনিরাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আম্মা, যে রাক্ষসরা মনিরাকে ছিঁড়ে খেয়েছে, তারা নিস্তার পাবে না। তাদের একটা একটা করে শেষ করবো!

সিগারেটটা জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে রুমী হঠাৎ আবৃত্তি করে উঠলো :

দেখতে কেমন তুমি? কী রকম পোশাক-আশাক
পরে করো চলাফেরা? মাথায় আছে কি জটাজাল?
পেছনে দেখাতে পারো জ্যোতিশ্চক্র সন্তের মতন?
টুপিতে পালক গুঁজে অথচ জবরজং ঢোলা
পাজামা কামিজ গায়ে মগডালে একা শিস দাও
পাখির মতই কিংবা চা-খানায় বসো ছায়াচ্ছন্ন?
দেখতে কেমন তুমি? অনেকেই প্রশ্ন করে, খোঁজে
কুলুজি তোমার আঁতিপাঁতি। তোমার সন্ধানে ঘোরে
ঝানু গুপ্তচর, সৈন্য, পাড়ায় পাড়ায়। তন্নতন্ন করে
খোঁজে প্রতিঘর…

জাহানারা মুগ্ধ হয়ে শোনবার পর জিজ্ঞেস করলেন, এটা কার কবিতা রে? শামসুর রাহমানের?

রুমী ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বললো, নাম জিজ্ঞেস করতে নেই, নাম জিজ্ঞেস করতে নেই!

তারপর সে বেরিয়ে গেল।

এরপর কয়েকদিন রুমী কখন আসে, কখন বেরিয়ে যায় তার কিছু ঠিক নেই। দু’একদিন রাত্তিরে বাড়ি ফেরে না। সেসব রাত্রে ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচণ্ড বুম বুম শব্দ শোনা যায়। রুমীকে কোনো প্রশ্ন করার উপায় নেই। কখনো তার সঙ্গে আসে কয়েকজন বন্ধু, বদি, আলম, স্বপন, চুন্নু, সুন্দর হাসিখুশি সব ছেলেরা, এরাই যে ভেতরে ভেতরে কী সাঙ্ঘাতিক পরিকলপনা আঁটছে, তা বোঝার উপায় নেই।

বাড়িতে অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতদের ভিড় লেগেই আছে। কারুকেই ফেরানো যায় না, কারুকেই অবিশ্বাস করা যায় না। তবু জাহানারার বুক সবসময় আশঙ্কায় কাঁপে। এমন এক একটা বাড়ি সার্চের খবর শোনা যায়, মিলিটারি পুলিশ সোজা রান্নাঘরে এসে মেঝে খুঁড়তে শুরু করে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় কেউ খবর দিয়েছে। কখন কী ঘটে যায় কে জানে!

একদিন রুমী মাকে কিছু না জানিয়ে ঢাকা ছেড়ে চলে গেল পিরুলিয়া গ্রামে। সেখানে ওদের একটা গোপন ক্যাম্প আছে। সেখান থেকে দুটি বস্তা ভর্তি অস্ত্র নিয়ে ফিরলো পরদিন সন্ধের সময়। বন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকে প্ল্যান করাই ছিল, ধানমণ্ডি থেকে হাইজ্যাক করা হলো দুটো গাড়ি, একটা মাজদা আর একটা ফিয়াট। দুটো দলে ভাগ হয়ে ওরা উঠলো দুটো গাড়িতে। আজ রাতে অনেকগুলি অকশান হবে। একটা গাড়ি থেকে শাহাদত জিজ্ঞেস করলো, হোয়াট আর ইয়োর টার্গেটস? কোনদিকে যাচ্ছো? অন্য গাড়ি থেকে উত্তর এলো, ডেস্টিনেশান আনোন; টারগেট-মোবাইল।

রুমীরা কয়েকজন অবশ্য ঠিক করে রেখেছিল ধানমণ্ডির কুড়ি নম্বর রাস্তায় চীনা দূতাবাসের কোনো এক কর্তাব্যক্তির বাড়ি, তার সামনে বেশ কয়েকজন মিলিটারি পুলিশ পাহারা দেয়। অতর্কিতে খতম করতে হবে তাদের। তারপর আক্রমণ চালাতে হবে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের গেটে, তারপর গুলশানে এক আর্মি অফিসারের বাড়িতে। চতুর্দিকে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে পাকিস্তানী শাসকদের বোঝাতে হবে যে বাংলার যুবশক্তিকে ভয় দেখিয়ে দমন করা যাবে না।

মাজদা গাড়িটায় উঠেছে ওরা ছ’জন, পেছনের সীটের মাঝখানে রুমী। কুড়ি নম্বর রাস্তায়। এসে সেই চীনা ডিপ্লোম্যাটের বাড়ির সামনে এসে ওরা হতাশ হলো। আজ সেখানে মিলিটারি পুলিশ পাহারা নেই। গাড়ি ঘুরিয়ে ওরা এলো আঠেরো নম্বর রাস্তায়, সেখানে আর একটি বাড়ির সামনে সাত-আটজন পুলিশ শরীর এলিয়ে বসে আছে, গালগল্প করছে। ওদের সামনে। দিয়ে গাড়িটা চলে গেল, ওরা ভূক্ষেপও করলো না।

গাড়িটা সোজা গিয়ে আবার ঘুরে এলো সাতমসজিদের মোড় থেকে। এবার বাড়িটা পড়বে বাঁ দিকে। একজন গাড়ি চালাচ্ছে, তিনজন একসঙ্গে ফায়ার করবে আর বাকি দু’জন অ্যালার্ট থাকবে অন্যদিক থেকে কোনো আক্রমণের সম্ভাবনা আছে কি না তা লক্ষ্য রাখবার জন্য। বাড়িটার সামনে এসে গাড়িটার গতি একটু ধীর হয়ে গেল, আলম চাপা গলায় অর্ডার দিল, ফায়ার!

তিনটে স্টেনগান গর্জন করে উঠলো এক সঙ্গে। আগেই বলে রাখা ছিল, তিনটে স্টেনগান গুলি চালাবে তিন লেভেলে, পেটে, বুকে, মাথায়। হাসি-তামাসা করতে করতে পুলিশ গুলো উঠে দাঁড়াবারও সুযোগ পেল না। ফুড়ে গেল মাটিতে। প্রতিপক্ষের একটা গুলিও ছুটে এলো না রুমীদের দিকে। অপারেশন সেন্ট পারসেন্ট সাকসেসফুল! কিন্তু এখানেই থামলে চলবে। গাড়িটা আবার চলে এলো কুড়ি নম্বর রাস্তায়। সেই চীনা কূটনৈতিকের সামনে এখনো পুলিশ নেই, কী হলো ব্যাপারটা? ভদ্রলোক কি ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন?

এখন অন্য গাড়িটার সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। আলম এদিক ওদিক গাড়িটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে মীরপুর রোডে এসে পড়লো। তারপর ছুটলো নিউ মার্কেটের দিকে। খানিকটা এগোতেই দেখলো সামনের রাস্তায় সার বেঁধে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাস্তায় প্রত্যেক গাড়ি চেক করা হচ্ছে। এরই মধ্যে খবর পৌঁছে গেল?

গাড়ি ঘোরাবার আর উপায় নেই। পেছন দিক দিয়েও আসছে দুটো আর্মি ট্রাক। সামনে ব্যারিকেড, সেখানে এল এম জি তাক করে দু’জন সৈন্য শুয়ে আছে মাটিতে। আর দু’জন সৈন্য হাত উঁচু করে গাড়ি থামাতে বলে এগিয়ে এলো।

গাড়ির মধ্যে সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে। গাড়ির চালক আলমকে কেউ কোনো কথা বললো না। আলম লাইট অফ করে ডান দিকে টার্ন নেবার ইনডিকেটর জ্বালিয়ে সামান্য ঘোরাবার ভঙ্গি করলো। একজন মিলিটারি পুলিশ চেঁচিয়ে বললো, বাস্টার্ডস! কিধার যাতা হ্যায়? গাড়ি রুখো!

সঙ্গে সঙ্গে আলম দারুণ বেগে বাঁ দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে সেই সৈন্য দুটোর প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়লো। রুমী চেঁচিয়ে বললো, মাটিতে দু’জন এল এম জি হাতে। ফায়ার।

তিনটে স্টেন গান থেকে এত তাড়াতাড়ি গুলি ছুটে এলো যে এখানেও এল এম জি কাজ করার সুযোগ পেল না। এবারেও কোনো প্রতিরোধ নেই বলতে গেলে। আলম গাড়িটাকে নিয়ে এলো ধানমণ্ডির পাঁচ নম্বর রাস্তায়, সামনেই গ্রীন রোড। রুমী পেছন ফিরে বসে রাস্তা দেখছে। হঠাৎ সে দেখতে পেল একটা মিলিটারি জিপ কোন গলি দিয়ে যেন এসে পড়েছে তাদের খুব কাছে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। রুমী স্টেন গানের বাঁট দিয়ে ভেঙে ফেললো তাদের গাড়ির পেছনের কাঁচ, তারপরে গুলি চালালো। তার সঙ্গে বদি আর স্বপন। জিপটা মাতালের মতন টলতে টলতে গিয়ে ধাক্কা মারলো একটা ল্যাম্প পোস্টে।

এবারেও ওদের নিরঙ্কুশ জয়!

কিছু দূরে আরও একটা জিপ আর দুটো ট্রাক আসছে ওদের ফলো করে। কিন্তু এইসব ছেলেরা ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো যেমন চেনে, মিলিটারি ড্রাইভারদের সাধ্য আছে কি ওদের সঙ্গে পাল্লা দেয়! অনেক গলি খুঁজির মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে, অনুসরণকারীদের চোখে ধুলো দিয়ে নিউ এলিফ্যান্ট রোডে পড়ে আলম হেড লাইট জ্বালালো, তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো ওরা ছ’জন। আজ শত্রুপক্ষ যথেষ্ট ঘায়েল হয়েছে, কিন্তু ওদের গায়ে একটা আঁচড়ও দিতে পারেনি!

দরজায় ঘন ঘন বেল শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন জাহানারা। দরজা খুলতে তাঁকে প্রায় ঠেলেই যেন ঢুকে পড়লো রুমী আর দুটি ছেলে। তাদের চোখ মুখ লাল, ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। আজ আর রুমী কিছু গোপন করতে পারলো না। মায়ের হাত চেপে ধরে আনন্দে-গর্বে-উত্তেজনায় বলে ফেললো, আম্মা, আজ একটা দারুণ অ্যাকশান করে এসেছি!

সবাই ওপরে চলে এলো রুমীর ঘরে। জামীকে সঙ্গে নিয়ে শরীফও এলেন। তারপর সবিস্তারে শোনা হলো সব ঘটনা। সব মিলিয়ে মাত্র আধঘণ্টায় এত কিছু ঘটেছে।

রুমী বললো, আম্মা, দেখ, আমার ঘাড়ে, কাঁধে স্টেন থেকে আগুনের ফুলকি ছুটে কীরকম ফোস্কা পড়ে গেছে। মিলিটারি ধরলে এগুলো দেখলেই বুঝে যাবে। কটা দিন আর রাস্তায় বেরুনো যাবে না!

জাহানারা ছেলের জামার কলার সরিয়ে দেখলেন। অনেকগুলো কালো কালো ছোট ছোট ফোকা। জামাটারও কয়েক জায়গায় ফুটো ফুটো।

তিনি ডেটল এনে লাগাতে যেতেই রুমী বললো, একটু পরে এসব দিও। আমাদের আর্মসগুলো একটা জায়গায় রেখে এসেছি। সেগুলো আজই আনতে হবে। সেগুলো নষ্ট করা যাবে না! আম্মা, তুমি যাবে আমার সঙ্গে? মহিলা ড্রাইভার দেখলে ওরা হয়তো গাড়ি থামাবে না।

জাহানারা চমকে উঠে বললেন, এখনই আবার বেরুবি? রুমী বললো, উপায় নেই। যার বাড়িতে রেখেছি, তিনি বলেছেন, আজ রাত্তিরে ওখানে আর্মস রাখা চলবে না। এইসব এক একটা অস্ত্র আমাদের বুকের রক্তের চেয়েও দামী!

অন্য দুটি ছেলে মুখ নীচু করে আছে। তাদেরও মনের ভাব একই।

শরীফ বললেন, যাও, ঘুরে এসো। খোদা হাফেজ!

জাহানারা বিনা বাক্যব্যয়ে নিচে নেমে এসে গাড়ি বার করলেন গ্যারাজ থেকে। যে-সাঙ্ঘাতিক অ্যাকশান করে এসেছে রুমীরা, এখন মিলিটারি পুলিশ নিশ্চয়ই তাদের পাগলা কুকুরের মতন খুঁজে বেড়াচ্ছে। এত বড় বিপদ থেকে বেঁচে এসেও রুমী আবার বেরুতে চাইছে। এত সাহস এরা পেল কোথা থেকে।

জাহানারা স্টিয়ারিং-এ বসলেন, রুমী পেছন দিকে সীটের সঙ্গে মিশে শুয়ে রইলো। চাপা গলায় বললো, বেশি দূর যেতে হবে না, একটা গলি ছাড়িয়েই ডান দিকে। হাই সাহেবের বাড়ির সামনে গাড়ি থামাবে। তারপর গলির শেষমাথায় গিয়ে আবার ঘুরে আসবে। দেখে নেবে কেউ আমাদের ফলো করছে কিনা!

সেটা একটা কানা গলি। সুনসান, নিঃশব্দ প্রায়। একটি বাড়ির বৈঠকখানায় কয়েকজন লোক তাস খেলছে। রুমী বললো, আবার হাই সাহেবের গেটের সামনে পার্ক করো। আর দু’খানা বাড়ি পরে জিনিসগুলো আছে। আমি দেখে আসি, সে বাড়িতে বাইরের কোনো লোক আছে কি না!

রুমী চলে গেল, জাহানারা বসে রইলেন। এখন তিনি এক অন্যরকম উত্তেজনা বোধ করছেন। কিছুই যেন ঠিক বিশ্বাস হয় না এখনও। বিপ্লব, গেরিলাযুদ্ধ, আর্মির বিরুদ্ধে কলেজের ছেলেদের বন্দুক-মেশিনগান নিয়ে যুদ্ধ, এসব এতদিন তিনি বইতে পড়েছেন, বিদেশী সিনেমায় দেখেছেন। ঠিক সেই জিনিসই এখন ঘটছে নিজের দেশে, তাঁর নিজের ছেলে একজন বিপ্লবী? এমনকি তিনি নিজেও, এই যে অস্ত্র উদ্ধার করতে এসেছেন, তিনি নিজেও তো এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন? এই যে রুমী ফিরে আসার জন্য তীব্র ব্যাকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করছেন, তাঁর বুক কাঁপছে থরথর করে, এসবই স্বপ্ন নয় তো?

রুমী ফিরে এলো দুটো বস্তা ঘাড়ে নিয়ে। তারপর বললো, শিগগির চলো-।

শরীফ বাড়ির সামনের বাতিগুলো নিবিয়ে রেখেছেন। অন্ধকারের মধ্যেই গাড়িটা ফিরে এলো গ্যারাজে। বস্তাদুটি ওপরে নিয়ে আসা মাত্র জাহানারা বললেন, দেখি, দেখি, তোদের অস্ত্র গুলো একবার নিজের চোখে দেখি!

পাঁচটা স্টেনগান, একটা পিস্তল, দুটো হ্যাণ্ড গ্রেনেড়। হ্যাণ্ড গ্রেনেডগুলোর চেহারা অনেকটা আনারসের মতন, ডাক নামও পাইন অ্যাপল। স্টেনগানগুলোর দিকে তাকালেই গা ছমছম। করে, এই অস্ত্র কখন কার হাতে থাকবে, কিংবা কে প্রথম কী উদ্দেশ্য নিয়ে চালাবে, তার ওপরেই নির্ভর করছে জীবন কিংবা মৃত্যু। রুমীরা এই অস্ত্র নিয়ে একটু আগে জয়ী হয়ে এসেছে, আবার পাকিস্তানী সেনাদের হাতে এই স্টেনগানই অত্যাচারের প্রধান হাতিয়ার।

অস্ত্রগুলো কিন্তু দেখতে বেশ সুন্দর, স্মার্ট, ঝকঝকে। ওদের কোনো দোষ নেই। যারা বানায় এবং যারা ব্যবহার করে, তারাও হয়তো ধার্মিক এবংঈশ্বর-বিশ্বাসী, তবু ঈশ্বরের সন্তানদের বিনাশ করতে তারা কোনো দ্বিধা করে না।

জাহানারা সেই অস্ত্রগুলোর গায়ে হাত বুলাতে লাগলেন।

রুমী বললো, আম্মা, এক্ষুনি এগুলো লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা দরকার।

সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো একতলার পানির বিরাট ট্যাংকটি, যাকে হাউজ বলে। হাউজটা আট ফুট চওড়া, আর দশ ফুট লম্বা, প্রচুর পানি ধরে। এক কোণে একটা গোল। ম্যানহোল; তা দিয়ে ভেতরে নামা যায়। জামী নেমে গেল একটা ছোট টুল নিয়ে। টুলটাকে সে অনেক ভেতরে নিয়ে বসিয়ে দিল। তারপর অস্ত্রগুলো বস্তায় মুড়ে, দড়ি দিয়ে ভালো করে বেঁধে রাখা হলো সেই টুলের ওপর।

সব ব্যবস্থা নিখুঁত হবার পরও রুমী বললো, কিন্তু মিলিটারি পুলিশ এসে এত বড় একটা পানির হাউজ দেখতে বাদ দেবে? আব্ব, তুমি হলে কী করতে!

শরীফ তাঁর হাতের টর্চটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন, অফকোর্স, এটা দেখলে আমার সন্দেহ হতো। আমি এসে এর ঢাকনা খুলে দেখতাম, ভিতরে কোনো মানুষ লুকিয়ে আছে কি না।

জাহানারা বললেন, ঢাকনা খুলে, টর্চ মেরে দ্যাখো! কী দ্যাখলা?

শরীফ বললেন, শুধু পানি চকচক করছে, এটাই দেখছি। ভিতরের দিকটা কিছু দেখা যায় না।

–ভিতরের দিকটাও দেখতে হলে পানির মধ্যে নামা ছাড়া উপায় নাই। ওয়েস্ট পাকিস্তানীরা পানিতে নামবে বলে মনে হয়? ওরা পানিকে ডরায়।

রুমী বললো, ওর ভিতরে নামলে সে ব্যাটাকে ঠুসে ধরবো।

এরপর দু’দিন রুমী প্রায় সর্বক্ষণই বিছানায় শুয়ে রইলো আর গান শুনতে লাগলো অবিরাম। বন্ধুরাও আসছে অনেকে। ধানমণ্ডি ও মীরপুর রোডের সেই সাঙ্ঘাতিক ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে, ঢাকা অ্যাডমিনিস্ট্রেশান একটা বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু রুমীদের দলটাকে সামান্য ক্ষতিও স্বীকার করতে হয়নি।

দু’দিন পর রুমী আবার একটু একটু বেরুতে শুরু করলো। আরও বেশি অস্ত্রশস্ত্র আনাবার প্রস্তুতি চলছে। আগামী মাসের ছ’ তারিখে পাকিস্তান সরকার প্রতিরক্ষা দিবস পালনের তোড়জোড় করছে, সেইদিনই মুক্তিযোদ্ধারা এক বড় রকমের আঘাত দিতে চায়। ঢাকায় এখন গেরিলাদের মোট ন’টি গ্রুপ, সেদিন তারা আক্রমণ চালাবে একযোগে।

সকালে নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে গেছে রুমী, ফিরলো সন্ধের পর। মুখটা শুকনো, শরীর ভালো নেই তা বোঝা যায়, কিন্তু কিছুতেই তা স্বীকার করবে না। জাহানারা বারবার জিজ্ঞেস করলে সে একসময় ক্লিষ্ট হেসে বললো, আম্মা, মাথাটা কেন জানি দপদপ করছে, ভালো করে বিলি করে দাও তো!

তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়লো রুমী। জাহানারা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। জামী আর হাফিজ নামে ওদের এক বন্ধু কাছে এসে বসে গল্প শুনতে লাগলো, এখন শুধুই যুদ্ধের গল্প। পাশে একটা রেডিও, তাতে পরপর বেজে চলেছে বাংলা গান, আকাশবাণীর অনুষ্ঠান। একটা গান শুনে চমকে উঠলো রুমী।

এই সেই খুদিরামের ফাঁসি উপলক্ষে বাংলার মর্ম নিঙড়ানো গান :

একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
ও মা হাসি হাসি পরো ফাঁসি
দেখবে জগতবাসী…

এই গানটা রুমীর খুব প্রিয়, তবু সে ভুরু কুঁচকে বললো, এই গানটা আজ দুপুরে আর একবার শুনেছি। রেডিওতেই, কোন স্টেশান কে জানে! একই দিনে এই গান দু’বার।

জামী বললো, জিম রীভত্স-এর রেকর্ড চালাবো? তুমি ভালোবাসো…

রুমী বললো, না থাক।

তারপর সে ঘুমিয়ে পড়লো। অন্যরাও চলে গেল যে-যার বিছানায়।

মধ্যরাত্রি পার হবার পর জাহানারা বেগম গেটের কাছে দুমদাম শব্দ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসলেন। ছুটে গেলেন জানলার কাছে। গাড়ির শব্দ, বুটের আওয়াজ, তীব্র সার্চ লাইট। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অন্তত কুড়ি জন মিলিটারি। তিনি ঝড়ের মতন চলে এলেন রুমীদের ঘরে। ওরা ঘরের ঠিক মাঝখানটায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ সব দিকের জানলা দিয়ে দেখা হয়ে গেছে, সব দিকেই মিলিটারি পুলিশ, তাদের সংখ্যা। কত কে জানে! এ বাড়ির বাগানের মধ্যে একদল পুলিশ ঢুকে পড়ে গেটে ধাক্কা দিচ্ছে।

পালাবার কোনো উপায়ই নেই। বাড়ির উঠোনে, বারান্দায়, বাগানে তীব্র আলো ফেলছে, চকচক করছে পুলিশদের হাতের রাইফেলের বেয়নেট। এই অবস্থাতেও জাহানারার একটা কথা মনে পড়ে গেল। রুমী একদিন বলেছিল, আমাদের সেক্টর কমাণ্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কী বলেন জানো? তিনি বলেন, কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না। চায় রক্তস্নাত শহিদ মামণি, আমরা সবাই শহিদ হয়ে যাবো, এই কথা ভেবে মনকে তৈরি করে ফেলেছি।

আতঙ্কে তিনি রুমীর হাত চেপে ধরলেন।

পুলিশের কর্কশ চিৎকার শরীফকে নিচে নেমে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই হলো। ভেতরে ঢুকে এলো একজন ক্যাপটেন ও একজন সুবেদার আর কয়েকজন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী পুলিশ। ক্যাপ্টেনটিকে মনে হয় পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো কলেজের ছাত্র, রুমীর চেয়ে বয়েস খুব বেশি হবে না, দেশের অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে সে আর রুমী হয়তো দু’টিমের হয়ে ফুটবল খেলতে পারতো, আজ সে এসেছে ঘাতকের ভূমিকায় আর রুমীও তার আদর্শের জন্য যে কোনো উপায়ে একে হত্যা করতে দ্বিধা করবে না। সঙ্গের সুবেদারটি মধ্যবয়স্ক, উর্দুভাষী বিহারী।

সমস্ত বাড়ি তন্নতন্ন করে সার্চ করলো তারা। শরীফ যেমন ভেবেছিলেন, জলের ট্যাংকটির ঢাকনা খুলে একবার টর্চ মেরে দেখলো শুধু। কোনো অস্ত্র না পেলেও রুমী, জামী, আর শরীফদের একতলার উঠোনে এনে দাঁড় করালো তারা। ক্যাপটেনটি গ্যারাজের গাড়িটার দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করলো, ইয়োর কার? ড্রাইভার চালায়, না নিজে চালাতে জানেন?

শরীফ বললেন, চালাতে জানি।

ক্যাপ্টেন বললো, ড্রাইভ অ্যালং উইথ আস্।

রুমীদের হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বাইরে। জাহানারা ছুটে এসে বললেন, ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আমিও তা হলে সঙ্গে যাবো!

ক্যাপ্টেনটি শান্ত গলায় বললো, রুটিন ইন্টারোগেশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রমনা থানায়। দে উইল বী ব্যাক সুন!

শরীফ চোখের ইসারায় স্ত্রীকে সঙ্গে না আসার জন্য মিনতি জানালেন।

শরীফ আর জামী ফিরে এলো সেই রাত এবং পরের রাত পেরিয়ে তার পরের বিকেলের দিকে। তাদের লুঙ্গি-পাঞ্জাবি ছেঁড়া, ধুলো কাদা মাখা, চোখের নিচে কালো দাগ, ঠোঁটের কোণায় রক্ত, মাথার চুলে রক্ত, গভীর অপমানে বিবর্ণ মুখ।

জাহানারা আর্ত চিৎকার করে উঠলেন, রুমী? রুমী কোথায় গেল?

পিতা-পুত্র দু’জন চুপ করে রইলো। কণ্ঠ এতই শুকনো যে কথা বলারও ক্ষমতা নেই, পা দুটিও যেন শরীরের ভার বহন করতে পারছে না।

রুমীকে ওরা ছাড়েনি। রুমী সম্পর্কে ওরা অনেক কিছু জানে।

৩৮. প্রথমে মামুনের মনে হলো

প্রথমে মামুনের মনে হলো, কোথা থেকে ধোঁয়া এসে ভরে গেছে ক্যাবিন, কুণ্ডলী পাকানো নীলাভ ধোঁয়া, কেউ কি কাছেই একটা খুঁটে কয়লার ভোলা উনুন ধরিয়েছে? ক্রমে সেই ধোঁয়ার রং কালচে হয়ে এলো, দরজাটা দেখা যাচ্ছে না, ইস সিস্টার-মেট্রোনরা কেউ নজর দিচ্ছে না এদিকে, এরকম একটা অস্বাস্থ্যকর ব্যাপার…

ওদের ডাকবার জন্য একটা বেল-এর সুইচ আছে, সকাল থেকে সেটা খারাপ, কেউ এখন আসবে না, কেউ জানবে না, মামুনের দম বন্ধ হয়ে যাবে…। আস্তে আস্তে সেই ধোঁয়া জমাট বেঁধে একটা মূর্তির রূপ নিতে লাগলো, মানুষ না অতিপ্রাকৃত কিছু? মামুন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চোখ বুজে আঁ আঁ করে উঠলেন।

শরীর যতই দুর্বল হোক মামুন তাঁর যুক্তিবোধ একেবারে বিসর্জন দিতে পারেন না। তিনি ভয়ও পাচ্ছেন আবার সেই সঙ্গেই মনে হচ্ছে, এরকম হতে পারে না, এরকম হতে পারে না। তবে কি মৃত্যুর আগে মানুষ চোখে এমন ভুল দেখে? কিন্তু মামুন জ্ঞান হারাতে চান না, তিনি শেষপর্যন্ত দেখে যেতে চান, তিনি আবার জোর করে চোখ খুললেন।

এবার মূর্তিটা অনেকখানি স্পষ্ট, একজন দীর্ঘকায় মানুষ, কাঁধদুটি ঈষৎ ঝুঁকে আছে, চোখে কালো চশমা, মুখ দিয়ে সত্যিই ধোঁয়া বেরুচ্ছে। মামুন আরও ভয় পেয়ে গেলেন, তাঁর বুকে প্রবল ব্যথা হতে লাগলো, চোখে জল এসে গেল। তাঁর পায়ের কাছে যে দাঁড়িয়ে আছে, সত্যিকারের মানুষের মতনই তার অবয়ব, এবং মামুনের চেনা, সেইজন্যই অবিশ্বাস্য। তবে কি শয়তান এসেছে এই বেশে? সঙ্গে সঙ্গে মামুন ভাবলেন, না, না, শয়তান টয়তান কিছু আসে না, ওসব কুসংস্কার, তিনি হার মানবেন না। তিনি উঠে বসার চেষ্টা করলেন।

দীর্ঘকায় মানুষটি বললো, মোজম্মেল হক সাহেব, ঘুম ভাঙালাম নাকি? আছেন কেমন?

এই সেই মুসাফির, চোখে সানগ্লাস, মুখে চুরুট। এখনও মামুনের মনে হচ্ছে, এটা কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা। ভারতে আসার পর চার মাসের মধ্যেও মামুন কখনো মুসাফিরের সন্ধান। পাননি, কারুর মুখে এর কথা শোনেনওনি, সেই লোক হঠাৎ এসে কী করে দেখা দিল সন্ধেবেলা হাসপাতালের ক্যাবিনে?

মামুন বালিশের তলা হাতড়াতে লাগলেন। এক্ষুনি সরবিট্রেট জিভে দিতে না পারলে তাঁর দম বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি সহ্য করতে পারছেন না, এত উত্তেজনা কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না।

মুসাফির একটু কাছে এসে বললেন, কী খোঁজেন? ওষুধ? শরীর খারাপ লাগছে?

আধখানা সরবিট্রেট জিভের তলায় দিয়ে মামুন কয়েক পলক চোখ বুজে থেকে মনটাকে বশে আনবার চেষ্টা করলেন। ক্যাবিনের মধ্যে চুরুটের সামান্য ধোঁয়া ছাড়া আর ধোঁয়া নেই, কিন্তু জানলার বাইরেটা অন্ধকার, ভেতরেও আলো জ্বালা হয়নি, এরই মধ্যে সন্ধে হয়ে এলো? অথচ হেনা-মঞ্জুরা এলো না?

মুসাফির আরও কিছু বলে যাচ্ছিলেন, মামুন হঠাৎ তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত, দৃঢ় গলায় বললেন, আপনি এখানে?

মুসাফির হেসে বললেন, আমিও তো আপনার মতন এই হাসপাতালেরই রুগী। আমি আছি তিনতলায়। আজ দুপুরেই আপনাকে প্রথম দেখতে পেলাম।

অতি সাধারণ ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা। দু জনে একই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু না। এই চার মাস মুসাফিরের সঙ্গে দেখা হয়নি, দৈবাৎ তিনি এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলেই দেখা হয়ে গেল। এই দিকটা মামুন চিন্তা না করেই কেন অত ভয় পেয়েছিলেন? তাঁর মনের একটা দিকে কি প্যারালিসিস হয়ে গেছে?

মুসাফির জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কী হয়েছে, হার্ট?

এই লোকটা জ্যোতিষী না ভবিষ্যদ্বক্তা কী যেন! কিন্তু মামুন যে হার্ট পেশেন্ট হিসেবে এই ক্যাবিনে শুয়ে আছেন, তা জানার জন্য ওসব কিছু লাগে না।

শিয়ালদার কাছে মামুন একদিন বিকেলে বুকে অসহ্য ব্যথা বোধ করার পর চোখে অন্ধকার দেখেছিলেন। তিনি নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন রাস্তায়। এই ভিড়ে-ভরা নিষ্ঠুর শহর, এখানে কেউ কারুর দিকে ফিরেও তাকায় না, বিকেলবেলা অফিস ভাঙার পর ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা পাগলের মতন স্টেশনের দিকে ছোটে। লোকের পায়ের ধাক্কায় মামুন সেদিনই শেষ হয়ে যেতে পারতেন। তাঁর পরম সৌভাগ্য, কয়েকজন পথচারী ধরাধরি করে তাঁকে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল কাছাকাছি নীলরতন সরকার হাসপাতালে। মামুনদের কলেজ-জীবনে এর নাম ছিল ক্যাম্পবেল হাসপাতাল, এখনও মামুনের সেই নামটাই মনে পড়ে।

প্রথমে তিনি স্থান পেয়েছিলেন জেনারেল বেডে, জ্ঞান ফেরার পরই তিনি একটা খবর দিতে বলেছিলেন বাংলাদেশ মিশনে। তিনি জয় বাংলার লোক শুনেই তরুণ ডাক্তাররা তাঁকে খাতির করতে লাগলেন, তাঁকে সরিয়ে আনা হলো ক্যাবিনে। ঠিক হার্ট অ্যাটাক নয়, মামুনের হৃদরোগটির নাম অ্যানজাইমা পেকটোরিস। সবাই বলছে, ততটা ভয়ের কিছু নেই।

বাইরে এখন গাঢ় অন্ধকার, সন্ধে পেরিয়ে রাত নামছে, আজ তা হলে হেনা-মঞ্জুরা আর আসবেই না তাঁকে দেখতে! আদালত এত কাছে, প্রতাপও এলো না? হাসপাতালের রুগীদের কাছে রোজ রোজ আসতে কারই বা ভালো লাগে। অন্য কেউ আসেনি, তাই মুসাফির এসেছে।

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী জন্য ভর্তি হয়েছেন এখানে?

মুসাফির বললেন, আমার হৃদয় দৌর্বল্য নেই, তবে পাকস্থলীতে বড় রকমের ক্ষত হয়েছে। মনে হয়। কোনো কিছুই খেয়ে হজম করতে পারি না।

–আপনি সেই সিক্সটি ফাইভে ঢাকায় গিয়ে আটকা পড়েছিলেন, তারপর কবে এদেশে ফিরে এলেন কিছুই খবর পাইনি।

–আপনাদের জেলখানার দানাপানি খাওয়া আমার কপালে লেখা ছিল বোধহয়। আমার আর খবর বিশেষ কিছু নাই। মফস্বলে থাকি, বহরমপুরের দিকে, কলকাতায় বিশেষ আসি না। ওখানে চিকিৎসায় কোনো কাজ হলো না। কবি জসিমুদ্দিন কেমন আছেন? উনি কি ঢাকাতেই রয়ে গেলেন?

–আমি ঠিক জানি না।

–গোবিন্দচন্দ্র দেব, মনিরুজ্জামান এনারা সত্যিই খুন হয়েছেন? কাগজে পড়েছি, তবু বিশ্বাস হয় না। সেবারে এদের দু জনের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছিল।

উত্তর না দিয়ে মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পচিশে মার্চের ঘটনা বাড়িয়ে বলার কিছু নেই, যে-সব বীভৎস ব্যাপার ঘটেছে তার একাংশ শুনলেও এখানে অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না। ভারতীয় নগর-জীবনে সামরিক বাহিনীর কোনো তাণ্ডব এ পর্যন্ত ঘটেনি, তাই এরা কল্পনাও করতে পারে না ব্যাপারটা।

হাই হিল জুতোর টক টক শব্দ করে একটি নার্স এই ক্যাবিনে এসেই মুসাফিরকে ভর্ৎসনা করে বললেন, আপনি এখানে চুরুট খাচ্ছেন? আপনারা কি হাসপাতালের কোনো নিয়ম মানবেন না? পাশের হলঘরটায় পর্যন্ত গন্ধে টেকা যাচ্ছে না!

মুসাফির কাঁচুমাচুভাবে বললেন, আপনাদের কাছ থেকে ধমক খাবার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এবার ফেলে দিচ্ছি। এই বদ নেশা কিছুতেই ছাড়তে পারি না যে!

মামুন ভাবলেন, ঐ চুরুটের গন্ধের অনুষঙ্গেই তিনি অতখানি ধোঁয়ার দৃশ্য কল্পনা করেছিলেন। বোধহয়। আজ,আটদিন হলো তিনি একটাও সিগারেট খাননি, ডাক্তাররা বলছে, আর কখনো খাওয়া চলবে না। তবু চুরুটের গন্ধে তাঁর মনটা চনমন করছে।

আলোটা জ্বেলে দিয়ে নার্সটি একটি থার্মোমিটার মামুনের মুখের মধ্যে ভরে দিলেন যান্ত্রিকভাবে। তারপর ঘড়ি দেখতে লাগলেন।

জানলার কাছে গিয়ে চুরুটটা নিবিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে মুসাফির বললেন, কী মেঘটাই না করেছে! মোটে সোয়া তিনটে বাজে, এর মধ্যে মনে হচ্ছে যেন রাত্তির হয়ে গেল। এ বছর বন্যা না ডাকিয়ে ছাড়বে না।

মামুন চমকে উঠলেন। মুখের মধ্যে থার্মোমিটার, তাই কথা বলতে পারছেন না। মাত্র দুপুর সোয়া তিনটে? মেঘের জন্য আকাশ অন্ধকার? তা হলে তো হেনা-মঞ্জু কিংবা প্রতাপের আসার সময় যায়নি! অথচ রাত হয়ে গেছে ভেবে মামুন ওদের ওপর অভিমান করছিলেন!

ভুল বোঝাবুঝি, কত সামান্য কারণে ভুল বোঝাবুঝি! একটা দিকের ওপর বেশি ঝোঁক দিলে অন্য দিকটা আর দেখাই হয় না। তারই জন্য রাগারাগি কিংবা মনে মনে কষ্ট পাওয়া। আগে তো মামুনের মধ্যে এরকম অস্থিরতা ছিল না!

মামুনের অসুস্থতার খবর পেয়ে এত ব্যস্ততার মধ্যেও মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়েছিলেন এই হাসপাতালে। তিনি মামুনের স্ত্রীর দিক দিয়ে কিছুটা আত্মীয় এবং এককালের বন্ধুও বটে। তিনি বলেছিলেন, তোমার হার্টে ব্যামো হয়েছে শুনে আশ্চর্য হই নাই, বুঝলে মামুন। এই যে যুদ্ধের অংগজাইটি, আনসার্টেনিটি, এর ফলে অনেকেরই হার্ট ডিজিজ হবে, ডায়াবিটিস হবে, হইতে বাধ্য! এই সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখাই সবচেয়ে শক্ত কাজ!

নার্সটি টেম্পারেচার নিয়ে চলে যেতেই মামুন মুসাফিরের দিকে তাকিয়ে ব্যগ্রভাবে বললেন, আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করবো? যদি আপনি কিছু মনে না করেন, কিংবা আপত্তি না থাকে…

মুসাফির বললেন, হার্ট ট্রাবল থাকলে সবসময় মন খোলসা করা উচিত, মনের মধ্যে কিছু চেপে রাখবেন না। বলুন!

–আপনি সবসময় চোখে কালো চশমা পরে থাকেন কেন? এমনকি ঘরের মধ্যেও, অন্ধকারে–

বেশ জোরে একটা নাটকীয় ধরনের অট্টহাসি দিয়ে মুসাফির বললেন, এটা বোঝেননি? নিজেকে বেশ একটা রহস্যময় চরিত্র বানিয়ে রাখার জন্য…আমার চশমা খুললে আমার চক্ষুদুটো দেখলে আপনি আঁতকে উঠবেন, না দেখাই ভালো!

–আপনার আসল নাম কী? সবাই আপনাকে মুসাফির বলে,

–অতি সিম্পল ব্যাপার। বাপ-মা আমার নাম রেখেছিল রেজাউল করীম। এই নামে একজন লেখক ছিলেন, আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই? আমি যখন একটু-আধটু লিখতে শুরু করি, তখন যাতে কনফিউশান না হয়, সেইজন্য পেন-নেম নিয়েছিলাম মুসাফির। এইটাই এখন নিজের নাম হয়ে গেছে। পোস্টঅফিসে নাম সই করি মুসাফির খান!

–মুসাফির, আপনি তো দূরদর্শী মানুষ। আপনি বলেন তো, আমাদের এই স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিণতি কী হবে? কতদিন এই যুদ্ধ চলবে?

–এই যুদ্ধের পরিণতিতে আপনাদের কপালে অশেষ দুর্গতি ভোগ আছে।

–অ্যাঁ? সে কী? আমরা স্বাধীনতা পাবো না?

–কেন পাবেন না? স্বাধীনতাযুদ্ধের পরিণতিতে স্বাধীনতা আসেই। কিন্তু তাতে আপনাদের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচবে, তা কে বলেছে? ভারতও তে স্বাধীন, কিন্তু এদিকের মানুষের দুঃখ কষ্ট কমেছে, না বেড়েছে?

–আপাতত স্বাধীনতা পাওয়াটাই বড় কথা। সেটা যদি পেয়ে যাই

–সেটা নির্ভর করছে স্বাধীনতা বলতে কে কী বোঝে তার ওপর। কার কাছ থেকে স্বাধীনতা, কাদের জন্য স্বাধীনতা? আপনারা স্বাধীনতা পাবার জন্য তড়িঘড়ি ভারত ভাগ করে ফেললেন। তখন তোত ভেবেছিলেন–

–আমরা ভারত ভাগ করেছি?

–আপনারা সবাই তখন মুসলিম লীগের সাপোটার ছিলেন না? আপনারা তখন অবাধ্য বালকের মতন পাটিশানের জন্য ঝুলোঝুলি করেননি?

–মুসাফির, আপনি কী বলছেন? আমাদের পার্টিশান চাওয়ার পিছনে কতগুলো কারণ ছিল। তা ভেবে দেখবেন না? কারা আমাদের বাধ্য করেছিল? সে সময়কার কংগ্রেস মুভমেন্টের ইতিহাস ভালো করে খুঁটিয়ে দেখুন, সবসময় হিন্দু কমিউনালিজম আধিপত্য বিস্তার করে ছিল। আপনার মনে নেই, জিন্না সাহেব যখন কংগ্রেসের নেতা, তখনও গুজরাটের বেনিয়া গান্ধী জিন্না সাহেবকে মুসলিম লীডার বলেছেন? আসলে ওরা নিজেরাই কখনো ভুলতে পারেনি যে ওরা জাতীয়তাবাদী, কংগ্রেসী বা ভারতীয় ইত্যাদি যাই হোক না কেন, তারচেয়েও বড় পরিচয়, ওরা হিন্দু! সুতরাং আমাদেরও মুসলিম আইডেনটিটি রক্ষা করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল, সেইজন্যই আমরা পাকিস্তান চেয়েছিলাম।

–বিহার, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবাংলা, আসামের কোটি কোটি মুসলমানকে ফেলে রেখে, তাদের ভাগ্য অনিশ্চিত রেখে, আপনারা পাকিস্তান নিয়ে সরে পড়লেন।

–হয়তো সব দিক বিবেচনা করা হয়নি। মুসাফির সাহেব, আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনি নিজে মুসলমান হয়ে সেই চল্লিশের দশকে আপনিও কি পাকিস্তানের দাবি সাপোর্ট করেননি?

–হয়তো করেছিলাম। কিন্তু সেই চাওয়াটা যে সঠিক হয়েছিল তার তো কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না! এই চব্বিশ বছরে যে-সব ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে গেল, পাটিশান না হলে হয়তো এরচেয়ে বেশি কিছু নাও ঘটতে পারতো! এই একটা জীবনে যত ট্রাজেডি আমরা দেখলাম, তারচেয়ে আর কী বেশি হতে পারে? আপনারা মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গড়ার দু’ চার বছরের মধ্যেই পূর্ব আর পশ্চিমে বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠলো। বাজেনি?

–তখন বুঝিনি যে এক ধর্মের মানুষ হলেও অত্যাচারী, শোষকরা ক্ষান্ত হয় না। তারা ঠিকই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে!

–এখন বুঝি ভাবছেন, এক ভাষাভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র হলেই অত্যাচারী, শোষক আনডেমোক্রাটিক ফোর্সগুলো মাটির তলায় লুকোবে? মুনাফা আর ক্ষমতার নেশায় যারা শত-সহস্র মানুষকে বঞ্চিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না, তারা কখনো ধর্ম কিংবা ভাষার তোয়াক্কা করে? ভাষা-সংস্কৃতির ব্যাপারটা অনেকটাই ইনটেলেকচুয়ালদের ধোঁকাবাজি, আমাদের মতন দেশের সাধারণ মানুষদের ওতে কিছু যায় আসে না!

–আপনি এত পেসিমিস্টিক কথা বলছেন, আপনি কি বলতে চান, আমাদের এই স্বাধীনতার জন্য লড়াইটা ভুল? সিকস্টি নাইনের পর আমাদের ওখানে কী সিচুয়েশন হয়েছিল আপনি বুঝবেন না। ইস্ট পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না।

–মার্ক টোয়েনের সেই কথাটা মনে নেই? পূর্ব হচ্ছে পূর্ব আর পশ্চিম হচ্ছে পশ্চিম, এই দু’ জনের কখনো মিল হতে পারে না?

–আপনি ঠাট্টা করছেন। আপনি ঠাট্টা করছেন আমার সঙ্গে?

–আহা, অত উত্তেজিত হবেন না, মামুন সাহেব। আমি ঠাট্টা-ইয়ার্কির সুরে ছাড়া কথা বলতে পারি না। এই জন্যই তো আমার জীবনে কিছু হলো না। প্লিজ টেক নো অফেন্স। এবার একটা অন্য কথা বলি! আপনার কপালে যে ভাঁজ দেখতে পাচ্ছি, সে তো শুধু স্বাধীনতার জন্য দুশ্চিন্তা নয়। আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও দুশ্চিন্তা অতি প্রবল।

–হোয়াট ডু ইউ মীন?

–আপনি আপনার জীবন থেকে নারীদের বাদ দেবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো এক নারীই আপনার মনটাকে তছনছ করে দিচ্ছে। আপনার বুকের ব্যথার কারণও সেইটাই।

–শুনুন মুসাফির সাহেব, আমি জ্যোতিষ-ট্যোতিষদের শালাটান মনে করি। এইসব বোগাস ফোরকাস্ট শুনে আমি ইমপ্রেসড হই না। আপনি এই ধরনের কথা আমাকে আগেও বলেছিলেন। আমার জীবনে কোনো রহস্যময়ী নারী-টারী নেই, অন্তত বছর পনেরো ধরে আমি সে রকম কোনো নারীর কথা চিন্তাই করি না। আমার সে মনোবৃত্তি নাই, সময়ও নাই!

–কোনো নারীর কথা চিন্তা করেন না, তা হলে কবিতা লেখেন কী করে?

–শুধু নারীর কথা চিন্তা করলেই কবিতা লেখা যায়, এরকম কথা যে বলে সে গণ্ডমূর্খ। দ্বিতীয়ত, আমি অনেকদিন কবিতা লিখি না, হয়তো আর কোনোদিন লিখতেও পারবো না! আপনি একদিন ঢাকায় আমার প্রতি ঐ অ্যাপারসন দেবার পর আমি নিজেকে অনেক ভাবে অ্যানালাইজ করেছি। অন্য নারী বলতে আমার বড় আপার মেয়ে মঞ্জু, তাকে আমি স্নেহ করি, হয়তো একটু বেশিই স্নেহ করি, কিন্তু তা স্নেহ ছাড়া আর কিছুই না, এর মধ্যে কোনো আমিষ। সম্পর্ক নাই। আপনারা বুঝি এই স্নেহের সম্পর্কটাকেও অন্য একটা কালার না দিলে শান্তি পান না?

–বিদ্যাসাগর মশাই লিখেছেন জানেন না, স্নেহ অতি বিষম বস্তু! কখনো কখনো অতিরিক্ত স্নেহ প্রেমের চেয়েও মারাত্মক হয়। ভালোবাসার তবু প্রতিদান পাওয়া যায়, কিন্তু স্নেহের প্রতিদান বড়ই দুর্লভ।

–স্নেহ নিম্নগামী!

–অবশ্যই, অবশ্যই। তবু মানুষ তা মানতে চায় না, বুকে জ্বালা ধরে থাকে, মনে হয় সমস্ত পৃথিবীটাই অকৃতজ্ঞ।

বাইরে কয়েকটি কলকণ্ঠ শোনা গেল, মামুন বুঝতে পারলেন যে হেনা-মঞ্জুরা এসে গেছে। ঠিক চারটের সময় ওরা আসে।

মুসাফির ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনার ভিজিটার এসে গেছে, এবার আমি চলি!

মামুন ব্যস্ত হয়ে বললেন, না, না, আপনি বসেন। ওদের সাথে আলাপ করবেন। আপনার সাথে আমার আরও কথা আছে।

মুসাফির বললেন, আমার কাছেও এখন ভিজিটার আসবে, আমি যাই। আর একদিন হবে!

ক্যাবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে মঞ্জু কথা বলছে নার্সের সঙ্গে, সে ভেতরে আসবার আগেই মুসাফির বেরিয়ে গেলেন। মামুনের আবার একটা অযৌক্তিক চিন্তা ও ভয় মাথায় খেলে গেল। মুসাফির সাহেব কি সত্যিই পেসেন্ট হিসেবে এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন? নাকি একটি দুষ্ট আত্মার মতন তিনি হঠাৎ উদয় হয়ে ভয় দেখিয়ে গেলেন?

হেনা-মঞ্জুর সঙ্গে এসেছে বরুণ আর পলাশ। হেনা দৌড়ে বাবার কাছে এসে হাত ধরে বললো, রাস্তায় কী বৃষ্টি, আলু, এক হাঁটু পানি জমে গেছে।

মামুন মেয়ের মাথায় অন্য হাত রেখে দেখলেন, তার চুল ভেজা, কানের লতির পাশ দিয়ে গড়িয়ে আসছে বিন্দু বিন্দু জল। তিনি বললেন, ইস ভিজে ভিজে আসলি, একটু দেরি করতে পারলি না! তোয়ালে আছে, মাথা মুছে নে!

মঞ্জু বললো, মামুনমামা, আজ তোমার জ্বর মোটে নাইন্টি নাইন পয়েন্ট টু! ব্লাড রিপোর্টও ভালো।

মামুন মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারলেন না। আজ যেন তাকে অসাধারণ সুন্দর দেখাচ্ছে। একটা হালকা গোলাপী রঙের শাড়ি পরেছে, চুলগুলো সব খোলা, মুখখানা এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কেন? যেন সারা মুখে চিকচিক করছে অভ্রবিন্দু, ঠোঁটে লিপস্টিক মেখেছে নাকি, না, মঞ্জু ওসব ব্যবহার করে না, অন্তত কলকাতায় এসে কোনোদিন করেনি। এখন আর কবিতা না লিখলেও সৌন্দর্যপ্রিয়তা তো মামুনকে ছেড়ে যায়নি, নিজের ভাগ্নী হলেও মঞ্জুর রূপ দেখে তিনি মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। কিন্তু সে তো শুধু মুগ্ধতাই, আর কিছু না!

মঞ্জু আজ একটু বেশি সাজগোজ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার স্বামীর আজও কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি, সেই দুশ্চিন্তার কোনো ছাপ নেই মঞ্জুর মুখে। মামুন অসুস্থ, হাসপাতালে তাঁকে দেখতে আসার জন্য মঞ্জু এত সেজেছে, এটা নির্লজ্জতা নয়? মামুনের মনটা কুঁকড়ে গেল।

বরুণ বক্সী বললো, মামুন সাহেব, আপনি তো আজকে বেশ ভালো আছেন, নার্স-ডাক্তাররা কইলো। খুব ফ্রেস দেখাইত্যাছে। আর কয়দিন এরকম হাসপাতালে শুইয়া থাকবেন? এবার বাড়ি চলেন!

মামুন জোর করে হাসলেন। এদিকের যাদের একসময় পূর্ববঙ্গে বাড়ি ছিল, তারা এখন জয় বাংলার মানুষ দেখলেই বাঙালভাষা ঝালিয়ে নিতে চায়। এতদিনের অনভ্যাসে অনেকেরই ঠিক সুরটা আর হয় না, ভুল জায়গায় অ্যাকসেন্ট দেয়, শুনতে বেশ মজাই লাগে।

মামুন বললেন, আমি তো বাসাতেই ফিরে যেতে চাই। তোমরা ব্যবস্থা করো।

বরুণ বললো, ডাক্তার বললেন, আপনি নাকি একেবারে হাঁটেন না? সারাদিন শুইয়া থাকেন? একটু হাঁটা চলা করা হার্টের পক্ষে ভালো। ওঠেন, ওঠেন, আমার হাত ধরেন, বারান্দায় আপনারে হাঁটাইয়া নিয়া আসি।

মামুন বললেন, এখন থাক। এখন তোমরা এসেছে, গল্প করা যাক।

বরুণ একেবারে মামুনের মুখের কাছে মুখ এনে গোপন কথা বলার সুরে বললো, মামুন সাহেব, কাল আমরা কয়েকজন বড়ারে যাবো, কিছু জিনিসপত্র নিয়ে, ওষুধ আর ওয়্যারলেস সেট, গাড়িতে যাওয়া হবে, মঞ্জু আর হেনাও যেতে চাইছে আমাদের সঙ্গে। ওদের নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে?

মামুন সবেগে মাথা নেড়ে বললেন, না, না, না, বর্ডারে ওরা যাবে? আউট অফ কোয়েশ্চেন। আমাদের কতরকম শত্রু আছে, এখানকার বিহারী মুসলমানরা ক্ষেপে আছে। আমাদের ওপর…

বরুণ বললো, আপনার পারমিশন না নিয়ে ওদের নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ভোরবেলা বেরিয়ে আমরা দিনে দিনেই ফিরে আসবো, তবু বলা তো যায় না, গাড়ি খারাপ হতে পারে, রাত হয়ে যেতে পারে, আমারও মনে হয় ওদের না যাওয়াই ভালো।

হেনা বললো, আব্ব, কিছু হবে না, আমরা যাই না?

মামুন মঞ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে কঠোরভাবে বললেন, না!

বরুণ বললো, মামুন সাহেব, আপনি ভালো করে বলে দ্যান তো। ওরা আমাদের কথা শুনতে চায় না। বড়ারে যাওয়া এখন সত্যি রিস্কি, মাঝে মাঝে গুলিগোলা ছুটে আসে এদিকে।

পলাশ কোনো কথা বলছে না, মামুনের চোখে চোখ পড়তেই সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। পলাশ। ঠিক বুঝেছে যে মামুন তাকে ইদানীং একটুও পছন্দ করতে পারেন না। অন্য কেউ হয়তো টের পায়নি, কিন্তু তাঁরা পরস্পর কথা খুব কম বলেন। মামুন হাসপাতালে, এই সুযোগে তার বাসায় এখন পলাশরা নিয়মিত আড্ডা জমায়। ভাবলেই মামুনের গা জ্বলে। সেইজন্যই তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যেতে চান। বরুণ রোজ এখানে আসে না, কিন্তু পলাশ প্রত্যেকদিন মঞ্জু আর হেনাকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে আসে। ওর এত দরদ কিসের?

মুসাফিরের চুরুটের ধোঁয়ার গন্ধ এখনও যেন পাওয়া যাচ্ছে একটু একটু! হঠাৎ মামুনের মনে হলো, পলাশের ওপর তিনি যে রাগ করছেন, সেটা কি আসলে ঈষা? নাকি অভিভাবকসুলভ সতর্কতা? মঞ্জু-হেনাকে কেউ না নিয়ে এলে ওরা হাসপাতালে দু বেলা আসতো কী করে? ওরা কি কলকাতা শহরের রাস্তা চেনে? আজ অত বৃষ্টির মধ্যে ওদের আসা তো অসম্ভব ছিল।

সেই মুহূর্তে মামুন ঠিক করলেন, পলাশকে তিনি ক্ষমা করবেন। পলাশের কোনো কুমতলবের এখনো ঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেদিন বর্ধমান থেকে ফেরার পথে চন্দননগরের কাছে ওদের গাড়ি বিকল হয়েছিল, পলাশ অত রাতে কোথা থেকে যোগাড় করেছিল একটা ট্যাক্সি। বাংলাদেশের শিল্পীরা এটা পারতো না, পলাশ সঙ্গে না থাকলে ওদের আরও বিপদ হতো, এসব কথা মামুন পরে শুনেছেন।

মামুন পলাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিও কাল যাচ্ছো নাকি বর্ডারে?

পলাশ বিনীতভাবে বললো, আজ্ঞে না, কাল দুপুরে আমার একটা রেকর্ডিং আছে।

তা হলে মঞ্জু-হেনাকে নিয়ে বর্ডারে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনাটা পলাশের নয়! বরুণও ওদের নিয়ে যাবার জন্য খুব আগ্রহী নয়, হেনা-মঞ্জুই জোর করেছিল। মঞ্জু-হেনা এখনও যুদ্ধের গুরুত্বটা বোঝে না। পাকিস্তানী বাহিনী নতুন করে শক্তিশালী হয়েছে, মুক্তি বাহিনীর দখলীকৃত এলাকাগুলো প্রায় সবই ছিনিয়ে নিয়েছে আবার।

তিনি বরুণকে বললেন, তুমি বড়ারে জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছো, খুব সাবধানে, আমার অনুরোধ, বেশি ঝুঁকি নিও না।

বরুণ হেসে বললো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যদি একটা কাঠবিড়ালীর মতনও সামান্য একটু সাহায্য করতে পারি, তাতেই আমার জীবনটা ধন্য হয়ে যাবে! আপনি চা খেয়েছেন…মামুন সাহেব? আনাবো?

মামুন উত্তর দেবার আগেই দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন প্রতাপ। মাথার চুল এবং জামা একেবারে চুপচুপে ভেজা, হাতে একটা বড় সন্দেশের বাক্স। প্রত্যেকদিনই প্রতাপ মিষ্টি কিংবা গাদাখানেক কমলালেবু-আপেল আনবেনই, কোনো দরকার নেই আনবার, বারণ করলেও শুনবেন না প্রতাপ। মালখানগরের মজুমদাররা বোধহয় কখনো খালি হাতে হাসপাতালে যায়

মামুনের আহারের রুচি ফেরেনি, মিষ্টি কিংবা ফলটল কিছুই তাঁর খেতে ইচ্ছে করে না। ওসব ভিজিটাররাই খায়। বরুণ বলে উঠলো, এই তো হাকিম সাহেব সন্দেশ এনেছেন। দ্যান দ্যান, আমার বেশ ক্ষুধা পাইছে।

প্রতাপের হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে বরুণ সবাইকে ভাগ করে দিতে লাগলো, মামুনকেও একটা সন্দেশ জোর করে খাইয়ে ছাড়লো। মামুন ভাবলেন, এই হাসিখুশি দিলখোলা ছেলেটির হঠাৎ কোনো বিপদ হবে না তো? এদিককার দু’ জন সাংবাদিক-ফটোগ্রাফার জোর করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছিল, তাদের নাকি আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

মিষ্টি খাওয়ার পর বরুণ কী করে যেন সকলের জন্যই চায়ের ব্যবস্থা করে ফেললো।

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, প্রতাপ, দিদি কেমন আছেন?

প্রতাপ সামান্য মাথা নেড়ে বললেন, ভালো।

অর্থাৎ সুপ্রীতি ভালো নেই, কিন্তু সে বিষয়ে প্রতাপ মামুনকে বিশেষ কিছু জানাতে চান না। প্রতাপ রোজ একবার করে না এলে মামুন ক্ষুব্ধ হন, অথচ তিনি জানেন, সুতির কাছেও যেতে হয় প্রতাপকে, প্রতিদিন দুটি হাসপাতালে যাওয়া-আসা করা কি সোজা কথা! প্রতাপের সারা মুখে ক্লান্তির ময়লা ছাপ। বৃষ্টিভেজার জন্যও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

সমস্ত রাস্তায় জল জমেছে, ট্রাফিক বিপর্যস্ত, বাড়ি ফিরতে কত সময় লাগবে কে জানে! প্রতাপ উঠে পড়লেন একটু আগেই। মঞ্জুরা গেল শেষ ঘণ্টা বাজার পর। মামুন ওদেরও তাড়া দিচ্ছিলেন ফিরে যাবার জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত থেকে গেল ওরা।

হঠাৎ ক্যাবিনটা একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতন নির্জন হয়ে গেল। এক হিসেবে জেনারাল ওয়ার্ড তবু ভালো, পাশাপাশি অন্য মানুষ দেখা যায়, নার্স-ডাক্তারদের চলাফেরা দেখা যায়। এরপর একজন খাবার দিতে আসবে, এখানকার বড় ডাক্তার রাউন্ডে আসবেন রাত সাড়ে আটটার পর। বৃষ্টির মধ্যে কি তিনি আসতে পারবেন আজ? হেনা-মঞ্জুরা চলে যাবার পর প্রত্যেকদিনই শরীরটা দুর্বল লাগে।

হেনা একবার বলে ফেলেছিল যে আজ সন্ধেবেলা মহাজাতি সদনে বড় একটা অনুষ্ঠান আছে। পলাশ তাড়াতাড়ি সেটা চাপা দিয়ে বলেছিল, এত বৃষ্টিতে সেটা বন্ধ হয়ে যাবে!

সেইজন্যই মঞ্জু অত সেজেছে আজ। হাসপাতালে মামুনকে দেখার জন্য নয়, এখান থেকে বেরিয়ে মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠান শুনতে যাবার প্ল্যান ছিল!

মামুনের বুকটা চিড়চিড় করতে লাগলো। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন, আর ওরা ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠানের কথা মঞ্জু তো নিজের মুখে কিছু বলেনি, সে কি গোপন করতে চেয়েছিল? এখান থেকে বেরিয়ে ওরা কি সত্যি বাড়ি ফিরবে, না একবার মহাজাতি সদন পর্যন্ত দেখতে যাবে যে সত্যি অনুষ্ঠানটা বন্ধ হয়েছে কি না।

মামুন নিজের বুকে হাত বুলাতে লাগলেন। এত উত্তেজনা ভালো নয়। পলাশকে তিনি ক্ষমা করতে চেয়েছিলেন, তবু তার ওপর আবার এত রাগ হচ্ছে কেন? তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন বলেই ওরা বাড়িতে চুপ করে বসে থাকবে? মহাজাতি সদনে একটা অনুষ্ঠান শুনতে গেলে তাতে দোষের কী আছে? যৌবনের ধর্মই তো এই, তারা অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তা করে বর্তমানটাকে অবহেলা করে না বুড়োদের মতন। গাড়ি-ঘোড়া না পেলে ওরা হেঁটেই যাওয়ার চেষ্টা করবে মহাজাতি সদনের দিকে। রাস্তায় এক হাঁটু পানির মধ্যেও ওরা লাফালাফি করবে, মঞ্জু ধরেছে পলাশের হাত, কৌতুক-হাস্যে দুলে দুলে উঠছে, মামুন যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পেলেন দৃশ্যটা!

মামুন নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলেন, মনটাকে আবার স্ববশে আনলেন। বুকটা ঘষে ঘষে তিনি যেন তাড়িয়ে দিতে চাইলেন রাগ-দ্বেষ। ওদের পক্ষে এইটাই তো স্বাভাবিক। ওরা হাঁটুক মহাজাতি সদনের দিকে, আজ যেন সেখানে অনুষ্ঠান বন্ধ না থাকে। ভবিষ্যতে আরও কত কষ্ট-দুর্দিন অপেক্ষা করে আছে কে জানে, হেনা-মঞ্জুরা এখন যে-কটা দিন পারে আনন্দ করে নিক!

৩৯. এক একটা গান হঠাৎ

এক একটা গান হঠাৎ এমনভাবে মাথায় গেঁথে যায় যে কিছুতেই আর যেতে চায় না। গানের কলিগুলোর অর্থটাও সবসময় প্রাসঙ্গিক থাকে না, সুরের বিশেষত্বও এমন কিছু নয়, তবু চলতে ফিরতে যখন তখন সেই গান গুঞ্জরণ তোলে।

লারেন্স লোয়েল লেকচার হল থেকে বেরিয়ে অতীন হাঁটতে লাগলো অন্যমনস্কভাবে। শীতও নেই, গরমও নেই, চমৎকার বসন্তকালের মতন হাওয়া। জিন্স আর ইজিপশিয়ান কটনের একটা শার্ট পরে আছে অতীন, এই শার্টটা কয়েকদিন আগে শর্মিলা তাকে উপহার দিয়েছে, ভারি মোলায়েম। চতুর্দিকে অজস্র ফুল, অনেক গাছের পাতায় সোনালি রং ধরেছে। হাঁটতে হাঁটতে অতীন আপন মনে গুন গুন করে গাইছে, হেথায় তোমায় মানাইছে না গো, ইক্কেবারে মানাইছে না গো! তু লাল পাহাড়ীর দেশে যা, রাঙা মাটির দেশে যা…। এরই মধ্যে পথ-চলতি কেউ কেউ অতীনের দিকে চেয়ে বলছে, হাই! অতীনও যন্ত্রের মতন উত্তর দিয়ে যাচ্ছে, হাই!

সায়েন্স সেন্টারের পাশ দিয়ে অতীন এগোলো হাভার্ড ইয়ার্ডের দিকে। অ্যাপলটন চ্যাপেলের পাশে একটা ছোট্ট দোকানে নানারকম আইসক্রিম পাওয়া যায়। অতীন বেছে বেছে দু’প্যাকেট আইসক্রিম কিনলো, কাগজের প্যাকেটে আইসক্রিম এমনই ফ্রোজেন অবস্থায় থাকে যে নিয়ে যেতে যেতে গলে যাবার সম্ভাবনা নেই। দোকানের কাউন্টারে পয়সা দিতে দিতেও অতীন মনে মনে গাইছে, হেথায় তোমায় মানাইছে না গো, ইক্কেবারে মানাইছে না গো.। এই গানটার বাকি কথাগুলো অতীন জানে না, তার জানার দরকারও নেই।

তারপর সে বাসে চেপে পৌঁছে গেল শর্মিলার বাড়িতে।

সদর দরজা বন্ধ। এইসব বাড়িতে বাইরের লোক হুট করে ভেতরে ঢুকতে পারে না। শর্মিলার নাম লেখা লেটার বক্সের ওপরের বোতামটা টিপতেই শর্মিলার গলা শোনা গেল, হু

অতীন বললো, তোমার যম! দা বস্টন স্ট্র্যাংগলার!

তিনতলা থেকেই শর্মিলা একটা বোতাম টিপে খুলে দিল সদর দরজা। অতীন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। এখন বিকেল সাড়ে ছটা, সন্ধে হবে আটটার পর। এই সময়টায় শর্মিলার মামাতো বোন সুমি বাড়িতে থাকে না। যদিও সুমি এখন অনেকটা মেনে নিয়েছে অতীনকে, তবু অতীন ওকে এড়িয়ে চলে।

এ বাড়ির লিফটটা আদ্যিকালের, মাঝে মাঝে হঠাৎ ঝনঝন শব্দ করে কেপে ওঠে। বয়েস হয়েছে, বিশ্রাম চাইছে। কিন্তু একেবারে অকেজো না হলে লিফটটাকে বদলানো হবে না, এইসব অ্যান্টিক জিনিসের আলাদা মযাদা আছে। লিফটের দরজাটা বন্ধ করতেই একটা সুন্দর পারফিউমের গন্ধ পাওয়া গেল। এ বাড়িটাতে মেয়েরাই বেশি থাকে, তাই প্রায় সারা বাড়িতেই মেয়েলি গন্ধ। বন্ধ লিফটের মধ্যে অতীন বেশ জোরে জোরে গেয়ে উঠলো, হেথায় তোমায় মানাইছে না গো…।

শর্মিলার ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করা। অতীন ভেতরে এসে শর্মিলাকে দেখতে পেল। শব্দ পেয়ে পাশের বাথরুম থেকে শর্মিলা বললো, একটু বসো, প্লীজ, আমি টপ করে স্নানটা সেরে নিই।

এক ঘরের অ্যাপার্টমেন্ট, সঙ্গে ছোট রান্নাঘর আর বাথরুম। অতীনের চেয়ে শর্মিলাদের ভাড়া বেশি দিতে হয়, কারণ ওরা দু’জন থাকে। অতীন রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে আইসক্রিমের বাক্স দুটো ঢুকিয়ে রাখলো। একটা বড় কোকাকোলার বোতল থেকে খানিকটা চুমুক দিয়ে রেখে দিল আবার। সিগারেট ধরিয়ে বাথরুমের দরজার কাছে এসে বললো, তুমি তাড়াতাড়ি করো, তারপর আমিও স্নান করবো।

পাশাপাশি দুটো খাট, অতীন কক্ষনো সুমির খাটে বসে না। এই খাটদুটো দেখলে অতীনের কলকাতার বাড়ির ফুলদির ঘরটা মনে পড়ে। ফুলদি আর মুন্নি এইরকম পাশাপাশি খাটে শুত। অতীনের নিজের ঘরটায় এখন কে থাকে, টুনটুনি?

দেয়ালে ঝোলানো টেলিফোনটা বেজে উঠলো। অতীন ধরতে পারবে না। সে যে এখন শর্মিলার ঘরে এসে বসে আছে, তা কারুকে জানানো চলে না। শর্মিলা কী অবস্থায় আছে, এখন কি বেরুতে পারবে? এখানে অনেকে বাথরুমেও একটা টেলিফোন রাখে, শর্মিলার অবশ্য নেই। টিভি-টা খোলা, শব্দ নেই, মহাকাশের দৃশ্য নিয়ে বোধহয় কোনো সিনেমা চলছে।

একটা হাউস-কোট গায়ে চাপিয়ে ভিজে চুল নিয়ে বেরিয়ে এলো শর্মিলা। রিসিভারটা হুক থেকে নামিয়ে দু’একটা কথা শুনেই সে তে হাত চাপা দিয়ে ফিস ফিস করে বললো, মার্থা! ওকে এখানে আসতে বলবো!

অতীন মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো। মার্থার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গেছে শর্মিলার। মাঝে মাঝে মাথাকে এ ঘরে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো হয়, মার্থার বাড়িতেও ওরা দু’জনে একসঙ্গে যায়। মার্থার কোনো ছেলে বন্ধু নেই বলে শর্মিলার খুব দুশ্চিন্তা, সে প্রায়ই তার চেনাশুনো ছেলেদের সঙ্গে মার্থার আলাপ করিয়ে দেয়।

ফোনটা রেখে শর্মিলা বললো, ওকে শনিবার আসতে বলেছি। তুমি স্নান করবে বললে, যাও, চলে যাও। আমার হয়ে গেছে। একটা গোলাপি রঙের তোয়ালে আছে, সেটা ব্যবহার করো।

শার্টটা খুলে ফেলে অতীন বাথরুমের দরজার কাছে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করি। একজন সদ্য স্নান সেরে বেরিয়েছে, আর একজন স্নান করতে যাচ্ছে, এই অবস্থায় কি চুমু খাওয়া চলে?

ঠোঁটে হাসি টিপে শর্মিলা মাথা নাড়িয়ে বললো, না, মোটেই চলে না!

অতীন প্রায় দৌড়ে এসে শর্মিলাকে জড়িয়ে ধরে বললো, তুমি কিছু জানো না। যারা হিসেব করে চুমু খায়, তারা অতি বদ লোক হয়।

এরপর অতীনের স্নান করতে যাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে যাচ্ছিল, শর্মিলা জোর করে তাকে ঠেলে পাঠালো। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে অতীন চিৎকার করে গাইতে লাগলো, হেথায় তোমায় মানাইছে না গো, ইক্কেবারে মানাইছে না গো!

শর্মিলা দ্রুত চুল আঁচড়ে নিল, পোশাক বদলালো। এত ছোট অ্যাপার্টমেন্টের এই একটা প্রধান অসুবিধে, ঘরে অন্য কেউ থাকলে জামা-কাপড় পাল্টানো যায় না। শর্মিলা অন্য কোনো মেয়ের সামনেও এসব পারে না, এমনকি অতীন থাকলেও সে লজ্জা পায়। অতীনের বাড়িতে জলের একটু অসুবিধে আছে, তাই সে এখানে এলেই স্নান করে নেয়।

বাথরুম থেকে প্যান্টের বেল্ট আটকাতে আটকাতে বেরিয়ে এসে অতীন দেখলো শর্মিলা অতি মনোযোগ দিয়ে টিভির দিকে চেয়ে আছে। তার দু’চোখে বিস্ময়।

অতীন বললো, কী ব্যাপার, এখন তুমি সিনেমা দেখছো? শর্মিলা বললো, সিনেমা নয়। এসো, দেখবে এসো, মানুষ চাঁদে গাড়ি চালাচ্ছে। লাইভ দেখাচ্ছে।

অতীন টিভির সাউন্ডটা বাড়িয়ে দিয়ে শর্মিলার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে বললো, স্কট আর আরউইন, সত্যি একটা গাড়ি চালাচ্ছে! আমি আগে দেখে ভেবেছিলাম সায়েন্স ফিকশান।

–কী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! পাশে ঐ যে পাহাড় মতন, ওর নাম মাউন্ট হেডলি! চাঁদের পাহাড়!

–এটা অ্যাপিনাইন এরিয়া। একটা জিনিস লক্ষ করছো, গাড়িটা লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। না, চাঁদের গ্র্যাভিটি…

শর্মিলা পাশ ফিরে তীব্র আবেগময় মুখে বললো, বাবলু, দ্যাখো, আমার সারা শরীরে রোমাঞ্চ হচ্ছে, দ্যাখো, দ্যাখো! মানুষের এই সাংঘাতিক কীর্তি, আজ সারা পৃথিবীতে একটা উৎসব হওয়া উচিত ছিল না? মানুষ, আমাদেরই মতন মানুষ, চাঁদে নেমে এরকম একটা কাণ্ড করছে, এত বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট, জানো, খানিকটা আগে টিভি-তে দেখাচ্ছিল ফুটবল খেলার মাঠে কী ভিড়! আজ মুভি হাউজ, থিয়েটার, কনসার্ট হলেও লোক যাবে, কত লোক এখন বসে বসে খাচ্ছে, এত বড় একটা ব্যাপার গ্রাহ্যই করছে না।

হঠাৎ উঠে গিয়ে শর্মিলা জানলার পর্দা সরিয়ে আকাশের চাঁদ দেখার চেষ্টা করলো।

অতীন অবশ্য শর্মিলার মতন অতটা উত্তেজিত বোধ করছে না। এর আগেই নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা দিয়েছে, এরপর আমেরিকানরা চাঁদে গাড়ি পাঠাবে, বাড়ি বানাবে এগুলো যেন স্বতঃসিদ্ধ। বিজ্ঞানের অগ্রগতির এক একটা স্তর। অর্থাৎ সে এই চন্দ্রাভিযানের রোমান্টিক দিকটা না ভেবে বাস্তব দিকটাই দেখছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য চাঁদে শুধু রকেট পাঠাবার বদলে প্রচুর ঝুঁকি ও অর্থব্যয় করে মানুষ পাঠানো, সোভিয়েত ইউনিয়ানের সঙ্গে টক্কর দিয়ে খানিকটা আমেরিকান হুজুগেপনাও মনে হয় তার।

শর্মিলার কাঁধে হাত দিয়ে সেও জানলার পাশে দাঁড়ালো। এখান থেকে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। বাইরে এখনও দিনের আলো।

অতীন বললো, চলো আমরা একটু পরে বেরিয়ে একটা পার্কে গিয়ে বসি। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবো।

শর্মিলা বললো, ওরা চাঁদে ঘুরছে, আর সঙ্গে সঙ্গে টিভি-তে সেই ছবি চলে আসছে, এটাও একটা অদ্ভুত কাণ্ড না?

অতীন বললো, নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা দিয়েই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিল তোমার মনে আছে? তখন আরও বেশি অবাক হয়েছিলাম।

টিভি-তে চাঁদের দৃশ্য মুছে গিয়ে শুরু হলো বিজ্ঞাপন। আমেরিকানরা চাঁদে মানুষ পাঠাক বা যাই-ই করুক, সাবান ও তেল বিক্রি করা তার চেয়ে কম জরুরি নয়।

শর্মিলা বললো, চলো, আমরা চট করে খানিকটা ডিনার খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আজ ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না।

কিছু কিছু খাবার রান্না করাই ছিল, নুডুলসের সঙ্গে কর্ন বিফ, মাইওনেজ স্যালাড। সেগুলো প্লেটে সাজাতে সাজাতে শর্মিলা জিজ্ঞেস করলো, এই অ্যামন্ড দেওয়া আইসক্রিম তুমি এনেছো? তোমার ঠিক মনে আছে তো! এটা আমার খুব ফেভারিট!

অতীন বললো, আমায় আইসক্রিম দিও না, তোমার আর সুমির জন্য এনেছি।

–তুমি খাবে না কেন? আরো অনেক আছে, সুমির জন্যও থাকবে!

–আমি আইসক্রিম খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। ভেবে দেখলাম, আইসক্রিম খাওয়াটা মেয়েদেরই মানায়।

–মানায় আবার কী! যার যেটা ভালো লাগে! একটু খাও, প্লীজ!

–আমাকে আলাদা করে দিও না, সত্যি আমার আর আইসক্রিম ভালো লাগে না, তোমার থেকে একটুখানি টেস্ট করবো।

–বাবলু, তুমি কিন্তু রোগা হয়ে যাচ্ছো, তোমার ডায়েটিং করার দরকার নেই! খাবার টেবিলে বসার বদলে দু’জনে প্লেট হাতে ফিরে এলো বিছানায়। শর্মিলা টিভি-তে আরও চন্দ্র-দৃশ্য দেখতে চায়। পাশাপাশি গা ঠেকিয়ে বসলো দু’জনে। শর্মিলার সারা মুখে একটা ভালোলাগার আবেশ ছড়ানো।

একটু পরে অতীন বললো, পরশু আমাকে একবার নিউ ইয়র্কে যেতে হবে।

শর্মিলা বললো, কেন? সিদ্ধার্থ বুঝি কোনো পার্টি দিচ্ছে?

–না, আমার বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মেয়ে আসছে, তাকে রিসিভ করতে হবে এয়ারপোর্টে।

–বেড়াতে আসছে, না পড়তে-টড়তে?

–পড়তে। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে।

–ভার্জিনিয়া মেরিল্যান্ড? নিউ ইয়র্ক থেকে সোজা সেখানে চলে যাবে? যাবার পথে যদি বস্টন-কেমব্রিজ ঘুরে যেতে চায়, তা হলে আমাদের এখানে থাকতে পারে। দুটো খাট জোড়া দিলে তিনজন শোওয়ার কোনো অসুবিধে হয় না।

–ঠিক আছে, তাকে বলে দেখবো!

–সোমবার ছুটি। লং উইক এন্ড। তোমার সঙ্গে আমিও তো নিউ ইয়র্ক ঘুরে আসতে পারি?

শর্মিলার মুখের দিকে তাকিয়ে, সামান্য একটু দ্বিধা করে অতীন বললো, তুমি যাবে? হ্যাঁ, চলো!

অতীনের কণ্ঠস্বরের সেই একটুখানি কাঁপুনিও শর্মিলা ঠিক বুঝে ফেললো। সে সরলভাবে হাসতে হাসতে বললো, কী ব্যাপার বলো তো, তুমি আমাকে নিয়ে যেতে চাও না? সিদ্ধার্থর সঙ্গে অন্য কিছু প্ল্যান করেছো বুঝি?

অতীন বললো, না, সেসব কিছু নেই। তুমি চলো, তুমি গেলে ভালোই হবে!

–মেয়েটির নাম কী? কী পড়তে আসছে?

–অলি চৌধুরী। ইংলিশের ছাত্রী ছিল, এখানে অন্য কিছু পড়বে কি না জানি না?

–বাঃ বেশ সুন্দর নাম তো। অলি! আগে এরকম নাম শুনিনি। ভালোই হবে, মেরিল্যান্ড তো বেশি দূর নয়, আমাদের এখানে মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করতে পারবে!

একটু পরে বাইরে বেরিয়ে একটা পার্কের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শর্মিলার হঠাৎ মনে পড়লো, এই সপ্তাহান্তের ছুটিতে ওয়াশিংটন ডি সি থেকে তার মামা আসছেন এখানে। তিনি যদিও হাভার্ডের একটা গেস্ট হাউসে উঠবেন, তবু এই সময় শর্মিলার বাইরে যাওয়াটা ভালো। দেখায় না।

অতীনই শর্মিলাকে জোর করতে লাগলো নিউ ইয়র্কে যাবার জন্য। আন্তরিকভাবে। তার মনে হচ্ছে, শর্মিলা তার সঙ্গে থাকলে ভালোই হবে, প্রথমেই সে একা অলির মুখোমুখি দাঁড়াতে চায় না।

কিন্তু শর্মিলা তার মামাকে বেশ ভয় পায়। তিনি মস্ত বড় পণ্ডিত এবং খুবই রাসভারি মানুষ। দেশে থাকতে তিনি কট্টর কংগ্রেসী ছিলেন।

পরিষ্কার আকাশে এখন চাঁদ দেখা যাচ্ছে। পূর্ণিমার কাছাকাছি গোল চাঁদ। সে দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে শর্মিলা অতীনের একটা হাত নিজের গালে চুঁইয়ে বললো, আজ আমার কী দারুণ ভালো লাগছে, বাবলু!

তারপর অনেকক্ষণ দু’জনে কোনো কথা বললো না।

শুক্রবার রাত দশটার বাস ধরলো অতীন। সাত ঘণ্টার জার্নি, ভোরের আগেই পৌঁছে যাবে। যাবার আগেও সে শর্মিলাকে ফোন করে আর একবার অনুরোধ জানিয়েছিল তার সঙ্গে নিউ ইয়র্ক যাবার জন্য, কিন্তু শর্মিলার উপায় নেই।

সিগারেট টানার সুবিধের জন্য গ্রে হাউন্ড বাসের একেবারে পেছন দিকে জানলার ধারে বসেছে বাবলু। ছাড়ার একটু পরেই ভেতরের আলো নিবিয়ে দেওয়া হলো। নাইট জার্নিতে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে নেয়। মসৃণ রাস্তা, একটুও ঝাঁকুনি নেই। এ দেশের লোকেরা কেউ চলন্ত বাসে চেঁচিয়ে গল্প করে না। কথাই বলে না প্রায়। শুধু মাঝখানের দু’পাশের দুটি সীটে দু’জোড়া। প্রেমিক-প্রেমিকা ফিস ফিস করে কথা বলছে, খিল খিল করে হাসছে আর চুমু খাচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাত খুন মাপ, ওরা আরও জোরে শব্দ করলেও বিরক্তি প্রকাশ করবে না কেউ।

বাবলুর পাশেই বসে আছে দুটি কালো যুবক। তাদের সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ শুকেই বোঝা যাচ্ছে, ওতে গাঁজা মেশানো আছে। ম্যারুয়ানা অর্থাৎ গাঁজা এখানে সাংঘাতিক বেআইনী, পুলিস একবার হাতে নাতে ধরতে পারলে পাঁচ-সাত বছর জেল দিয়ে দেবে, তবু এরা বেপরোয়া।

যুবক দুটি অতীনের সঙ্গে ভাব জমাবার চেষ্টা করছিল বাস চলতে আরম্ভ করার আগে। থেকেই। অতীন উৎসাহ দেখায়নি, হু-হাঁ করে এড়িয়ে গেছে। অতীন জানে, এ দেশের কালো মানুষ, আগে যাদের বলা হত নিগ্রো, তাদের অভিযোগ আছে যে ভারতীয়রা তাদের সঙ্গে বিশেষ মেশে না, সাদাদের তোষামোদ করতেই ভালোবাসে। অভিযোগটা সঠিক হলেও এখন দু’জন গাঁজাখোর কালো যুবকের সঙ্গে যে অতীনকে বন্ধুত্ব করতেই হবে তার কোনো মানে নেই। তার তো এই সময় কারুর সঙ্গে কথা না বলারও ইচ্ছে হতে পারে।

একটা সিগারেট ধরিয়ে অতীন বাইরে তাকিয়ে আছে। ধোঁয়া রঙের কাঁচ, বাসের ভেতরে আলো জ্বললে বাইরের কিছু দেখা যায় না। এখন দেখা যাচ্ছে শুধু জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাওয়া প্রান্তর। মাইলের পর মাইল একটাও মানুষ কিংবা বাড়ি-ঘর চোখে পড়ে না। সাধারণ কথায়। লোকে বলে, যন্ত্রসভ্যতার দেশ আমেরিকা। কিন্তু রাত্তিরবেলা এই নিঝুম প্রান্তরগুলি দেখলে মনে হয় যেন আদিম পৃথিবী। কোথাও কোথাও গাছপালাও প্রচুর।

রাস্তাটা কোথাও বাঁক নিলে দেখা যায় সামনে অনেক দূর পর্যন্ত লাল আলোর মিছিল। সামনের গাড়িগুলোর ব্যাক লাইট, আলোর মিছিলের মতনই মনে হয়। দিনের বেলার চেয়েও রাত্রে এইসব হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি যেন বেশি চলে। এ রাস্তায় পাশাপাশি পাঁচ ছ’খানা গাড়ি অনায়াসে এক দিকে যেতে পারে। এ দেশের রাস্তাগুলো নিখুঁত শিল্পের মতন।

অতীনের চোখে ঘুমের নাম-গন্ধ নেই। বাইরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক এক সময় তার মনে হচ্ছে, বাসের গতির সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে একজন কেউ যেন ছুটছে রাস্তা দিয়ে। অসম্ভব ব্যাপার! গ্রে হাউন্ড বাস ঠিক ঘণ্টায় পঞ্চান্ন মাইল গতিতে যায়। চোখের ভুল তো অবশ্যই, অতীন সজাগ হলে আর মূর্তিটাকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু একটু পরেই আবার ফিরে আসছে। বাসটার কোনো একটা অংশের ছায়া রাস্তায় পড়লে এরকম দেখাতে পারে। ছায়া নয়, মানুষেরই মতন। আরও একটু পরে অতীন চিনতে পারলো, সেই মানুষটা আসলে সে নিজে। ছাই রঙের প্যান্টের ওপর সাদা ফুল শার্ট পরা, হাত দুটো গোটানো। জলপাইগুড়িতে মাঠের মধ্যে সেই মূর্তিমান উপদ্রবটিকে গুলি করার পর কি অতীন এত জোরে ছুটেছিল?

সে-দিন ছোটার সময় অতীন মনে মনে শুধু একটাই কথা বলছিল বার বার, কেউ তাকে ধরতে পারবে না! কেউ তাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু পুলিস তাকে ঠিক ধরলো জামসেদপুরে এসে!

কৌশিক তাকে জামসেদপুরে নিয়ে যাবার বদলে যদি হাজারিরাগ কিংবা ডাল্টনগঞ্জে নিয়ে যেত, তা হলে হয়তো সে ধরা পড়তো না। মানিকদা, তপন যেমন ধরা পড়েনি। তা হলে অতীনের জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। সে বিপ্লবের কাজে এগিয়ে যেতে পারতো অনেকখানি, এই ধনতন্ত্রের দেশে তাকে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হতো না। জামসেদপুরে গেলে শর্মিলার সঙ্গেও দেখা হতো না তার।

না, না, শর্মিলার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক হওয়ার জন্য সে একটুও অনুতপ্ত নয়! শর্মিলার মতন এমন সরল অথচ সাহসী এবং খাঁটি মেয়ের বন্ধুত্ব পাওয়া দুর্লভ ভাগ্যের ব্যাপার। ঠিক সময়ে শর্মিলার কাছে আশ্রয় না পেলে তার হয়তো মাথার গোলমাল হয়ে যেতে পারতো! এরকম কারুর কারুর হয়েছে। নিউ জার্সিতে একটি ছেলেকে দেখেছিল অতীন, পাগলাটে পাগলাটে ভাব, সে নাকি যাদবপুরের গোপাল সেনকে খুন করার সময় সেই দলে ছিল! নিজেকে সে আর জাস্টিফাই করতে পারছে না, তাই যুক্তিবোধটাই বিসর্জন দিচ্ছে। শর্মিলা অতীনকে বাঁচিয়েছে। এখানে এসেও প্রথম প্রথম ঠিক চাকরি না পেয়ে মদ খাওয়ার দারুণ ঝোঁক চেপে গিয়েছিল অতীনের, টাইম স্কোয়ারে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে বেলেল্লা করতেও তীব্র ইচ্ছে করতো এক এক সময়, শর্মিলা এসে না পড়লে সে হয়তো তলিয়ে যেতে পারতো।

শর্মিলাকে অলির কথা বলা হলো না এখনো। অলির নামটা শুধু বলেছে, আর কিছু না। ঠিক কী করে যে বলা যায়, সেটাই অতীনের মনে আসছে না। অতীন নিউ ইয়র্কে অলি নামে একটা মেয়েকে রিসিভ করতে যাচ্ছে শুনে শর্মিলা কী সুন্দর বললো, অলিকে কেমব্রিজে নিয়ে আসতে। মেয়েটার মনের মধ্যে একটুও মালিন্য নেই।

রাস্তার ছুটন্ত ছায়ামূর্তিটি এবারে জানলার কাঁচে টকটক শব্দ করলো। অতীন জিজ্ঞেস করলো, তুমি কে? কী চাও?

ছায়ামূর্তি বললো, আমি কলকাতার বাবলু। প্রতাপ মজুমদারের ছেলে। তুই অ্যামেরিকার অতীন, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? পুরোপুরি অ্যামেরিকান হয়ে গেছিস?

অতীন বললো, কেন চিনতে পারবো না? আমি কি কিছু ভুলে গেছি নাকি?

বাবলু বললো, হ্যাঁ ভুলে গেছিস! কৌশিককে মনে আছে?

–নিশ্চয়ই মনে আছে। আমি একটু আগেই কৌশিকের কথা ভাবছিলাম।

–তুই কি খবর রাখিস যে কৌশিক মারা গেছে?

–অ্যাঁ? না, না, বাজে কথা, অসম্ভব। অলি চিঠিতে জানিয়েছে যে কৌশিক ভালো আছে।

–অলি? কোন্ অলি? তোর বাবার এক বন্ধুর মেয়ে, সামান্য একটু চেনা, তাই না? অলি তোর নিজের কেউ না!

–শর্মিলাকে ঐভাবে বলেছি, পরে সব বলবো। কিছুই লুকোবো না। শর্মিলা আমার কাছে কিছু গোপন করে না, আমার ওপর ও দারুণ নির্ভর করে থাকে, আমি কি ওর সঙ্গে এ ব্যাপার নিয়ে লুকোচুরি করতে পারি? তা হলে আমাদের সম্পর্কটা কোনোদিন খাঁটি হবে না। না, আমি শর্মিলাকে এক সময় বলবো, ঠিকই বলবো!

–আর অলিকে বুঝি কিছু বলবি না? এয়ারপোর্টে অলিকে রিসিভ করে তারপর তাকে তাড়াতাড়ি মেরিল্যান্ড পাঠিয়ে দিবি, যাতে সে শর্মিলার কথা কিছু জানতে না পারে!

–ধ্যাৎ, এইভাবে ক’দিন গোপন রাখা যাবে? অলিকেও বলবো শর্মিলার কথা। অলি আমার বন্ধু, সে বন্ধুই থাকবে। এ দেশে তার যা যা সাহায্য লাগে নিশ্চয়ই করবো। কিন্তু আমি কি অলিকে কোনোদিন বিয়ে করার কথা বলেছি? সেরকম কোনো কথা হয়নি। ছেলেবেলার বন্ধুত্ব, সেটা থাকবে!

–সব কথা বুঝি মুখে বলতে হয়? অলির একজন গানের মাস্টার, তারপর একজন ইংরিজির অধ্যাপক, এদের অলি ছাড়িয়ে দিয়েছিল শুধু তুই জোর করেছিলি বলে। আর সেই যে সেবার, মেমারি থেকে কৃষ্ণনগর যাবার সময়, ফেরি পেরিয়ে সন্ধেবেলা গঙ্গার ধারে, একটু পরে চলন্ত রিকশায় তুই অলিকে কী বলেছিলি রে অতীন?

–বাবলু, ওসব কথা রাখ। তুই কৌশিক সম্পর্কে কী বললি? স্বীকার কর যে ওটা বাজে কথা?

–অর্থাৎ তুই এখন অলির কথা মনে আনতে চাস না, তাই কৌশিকের কথা আবার টেনে আনছিস!

–গেট লস্ট, বাবলু!

অতীন উঠে দাঁড়ালো। তার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। এই বাসের মধ্যে বাথরুম আছে, সে সেখানে ঢুকে পড়লো, পাশের ছেলেদুটোর গাঁজার ধোঁয়াতেই কি তার মনে এইসব উল্টো পাল্টা চিন্তা আসছে? সে ঘাড়ে মাথায় জল দিল। শরীরটা সত্যি বেশ দুর্বল লাগছে। শরীরটা যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে আসছে, সবঙ্গে একটা চোর চোর ভাব। যেন সে একটা অন্যায় করে। কোথাও পালাচ্ছে। পালাচ্ছে, না সে একটা অন্যায় করতে যাচ্ছে?

ফিরে এসে আবার সে রাস্তায় সেই ছায়াটা দেখতে পেল। ছায়াটা তার সঙ্গে দৌড়তেই লাগলো সারাক্ষণ।

সিদ্ধার্থ বলেই দিয়েছিল, অত সকালে সে অতীনকে নিতে আসতে পারবে না। সিদ্ধার্থ এখন বাড়ি নিয়েছে ব্রুকলিন-এ, ঠিকানা খুঁজে যেতে অতীনের অসুবিধে নেই। তবে নিউ ইয়র্কের গ্রে হাউন্ড বাস স্টেশানটা এত বিশাল যে অতীন এখনো খানিকটা দিশেহারা হয়ে যায়। চব্বিশ ঘণ্টাই মানুষের ভিড়ে এ জায়গাটা গমগম করে।

সারা রাত অতীনের ঘুম হয়নি, সে প্রথমেই বড় এক কাপ কালো কফি খেল। তারপর একটু খুঁজে নেমে গেল সাবওয়ে স্টেশানে। তার কাঁধে ঝোলানো শুধু একটি ব্যাগ।

সিদ্ধার্থদের বিল্ডিং-এর সদর দরজা খুলে বেরুচ্ছিল একজন মধ্যবয়স্ক লোক, অতীন সেই সুযোগে দরজার পাল্লাটা ধরে ভেতরে ঢুকে গেল। এরকম নিয়ম নয়, লোকটি শুধু একবার তাকালো অতীনের দিকে, মুখে কিছু বললো না। সম্ভবত এ বাড়িতে বেশ কিছু ভারতীয় বা পাকিস্তানী থাকে, অতীনের মতন চেহারা দেখতে লোকটি অভ্যস্ত।

লিফটে অতীন উঠে এলো আটতলায়। ঠিক পাশেই সিদ্ধার্থর অ্যাপার্টমেন্টের নম্বর। দু’তিনবার বেল দেবার পর দরজা খুললো একটি শ্বেতাঙ্গিনী যুবতী। মাথা ভর্তি অবিন্যস্ত সোনালি চুল, ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে মুছে গেছে, পরনে একটা সিল্কের ড্রেসিং গাউন। ঘুম-মাখা মুখেও আললে হাসি হেসে সে বললো, হাই! ইউ মাস্ট বী টিনটিন ফ্রম কেমব্রিজ? কাম অন ইন। ইয়োর ফ্রেন্ড ইজ স্টিল অ্যাপি।

বিস্ময় প্রকাশ করার কোনো নিয়ম নেই। সিদ্ধার্থ অতীনকে ঘুণাক্ষরেও জানায়নি যে সে একটি সাদা মেয়ের সঙ্গে লিভিং টুগেদার করছে। কিংবা এই মেয়েটিকে কি এক রাত্তিরের জন্য এনেছে নাকি?

অতীনও হাই বলে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলো। ভোরের দিকে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, অতীনের কাছে কোনো গরম জামা নেই, ঘরের ভেতরে এসে আরাম লাগলো তার।

মেয়েটি কফির জল চড়িয়ে দিয়ে এসে বললো, হোয়াই ডোচ ইউ সীট ডাউন, বী কমফর্টেবল!

যেন এ বাড়ির সে-ই গৃহিণী, অতিথিকে অভ্যর্থনা করছে। সিদ্ধার্থর সঙ্গে এক অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করে ছিল অতীন বেশ কিছুদিন, এখন নিজেকে সত্যিই তার বাইরের লোক মনে হচ্ছে।

একটি বেশ রাগী রাগী বাঙালী মেয়ের সঙ্গে এক সময় খুব ভাব হয়েছিল সিদ্ধার্থর, নীপা না কী যেন নাম, সে কোথায় গেল? অবশ্য সিদ্ধার্থ অতীনকে অনেকবার ঠাট্টা করে বলেছে, এ দেশে এসে এ দেশের কোনো মেয়ের সঙ্গে মিশলি ‘না, এখানকার সোসাইটি কত পারমিসিভ তা বুঝলি না, ট্যাকে করে একটা বাঙালী প্রেমিকা নিয়ে এলি?

মেয়েটি বললো, টিনটিন, আই অ্যাম সুজান।

তারপর করমর্দনের বদলে সে তার গালটা এগিয়ে দিল। অতীন তার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ঠোনা মারলো। সঙ্গে সঙ্গে সে যেন সুজানের শরীরে ভাটফুলের গন্ধ পেল। উত্তর বাংলার জঙ্গলে সে ভাট ফুলের গন্ধ পেয়েছে অনেকবার, কেমন যেন যৌন গন্ধ বলে মনে হয়।

বেডরুমের দরজাটা অর্ধেকটা খোলা, সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে যে সমস্ত বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে সিদ্ধার্থ। পরনে শুধু একটা জাঙ্গিয়া। আগেকার দিন হলে অতীন সিদ্ধার্থর ঠ্যাং ধরে টেনে নামাতে বিছানা থেকে, কিন্তু অপিরিচিত শ্বেতাঙ্গিনীর সামনে সে আড়ষ্ট বোধ করছে।

অতীনের উল্টো দিকের সোফায় পা মুড়ে বসলো সুজান। তার উরুর কাছে উঠে গেল ড্রেসিং গাউন, বুকেরও অনেকটা দেখা যাচ্ছে, এ সব কিছুই না, সোজা তাকিয়ে কথা বলতে দোষ নেই, তবু অতীন ওয়াল পেপার দেখার ভঙ্গি করে বললো, ওকে ডাকবে না?

সুজান বললো, কাল আমরা আড়াইটের সময় একটা পার্টি থেকে ফিরেছি। তোমার বন্ধু খুবই ক্লান্ত, ন’টার আগে জাগাতে বারণ করেছে, আমরা দু’জনে ততক্ষণ কফি খেতে খেতে গল্প করি না?

সকালে অন্তত চার পাঁচ কাপ কফি খাওয়া অ্যামেরিকানদের অভ্যেস। অতীন এক কাপের বেশি খায় না, তবু সে এখানে আর এক কাপ নিল। নিছক কথা চালাবার জন্যই সুজান বললো, সিড বলছিল, তোমরা দু’জনে অনেক দিনের বন্ধু। তুমি নাকি খুব বড় স্কলার, টিনটিন? হাভার্ডে রিসার্চ করো।

টিনটিন নামটাতে আপত্তি করে কোনো লাভ নেই। গতকাল রাত্রে সিদ্ধার্থ নিশ্চয়ই অনেকবার অতীনের নামটা মুখস্থ করাবার চেষ্টা করেছে সুজানকে। এরা অতীন বলতে পারে না, সেই জন্যই টিনটিন, আর সিদ্ধার্থ হয়েছে সিড। সুজানকে সুজাতা বললে ওর কেমন লাগতো!

অতীন সুজান সম্পর্কে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করলো না, সেটা ভালো দেখায় না। সে সুজানকেই একতরফা কথা বলতে দিল। এরই মধ্যে সুজান জানালো যে সে হিন্দুদের জন্মান্তরবাদ খুব পছন্দ করে।

ন’টা বাজবার খানিক আগেই নিজে থেকে বিছানা থেকে উঠে এলো সিদ্ধার্থ। সুজানকে হুকুমের সুরে বললো, দাও দাও, আমার কফি দাও।

অতীনের সঙ্গে প্রথমে একটাও কথা না বলে সে আবার শোবার ঘরে গিয়ে হাতে করে একটা চাবি নিয়ে এলো। সেটা অতীনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, এই নে। তুই ছ’তলার ছ’শো বত্রিশ নম্বরে চলে যা। তোর জন্য আমি একটা ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করে রেখেছি।

অতীন চাবিটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

সিদ্ধার্থ শ্লেষ্ম জড়ানো গলায় বললো, তুই দুপুরে ঘুমাবি তো? আমিও আর একবার ঘুমিয়ে নেবো। সুজান লাঞ্চ তৈরি করে তোকে ডাকবে। ঐ অ্যাপার্টমেন্টটা একজন ইস্ট পাকিস্তানের ছেলের, সে কলকাতায় চলে গেছে, বাংলাদেশ নিয়ে যুদ্ধ করবে, চাবিটা দিয়ে গেছে আমাকে। দেশ থেকে তোর যে মেয়ে বন্ধু আসছে, তার সঙ্গে তুই ওখানে কয়েকদিন থেকে যেতেও পারিস। সুজান তোকে অ্যাপার্টমেন্টটা দেখিয়ে দিয়ে আসবে? যদি কিছু গুছিয়ে টুছিয়ে দিতে হয়, ডার্লিং, উইল ইউ প্লীজ।

অতীন শুকনো গলায় বললো, নো থ্যাঙ্কস। আই উইল ম্যানেজ।

নিচে এসে অতীন ভাবলো, বন্ধুদের ওপর যখন-তখন রাগ করার কোনো মানে হয় না। সিদ্ধার্থ তার সঙ্গে ভালো করে কথা না বলে প্রায় ঠেলেই যেন অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিল। সিদ্ধার্থটা এইরকমই। হয়তো সুজান বিষয়ে এক্ষুনি সে কিছু আলোচনা করতে চায় না।

ইস্ট পাকিস্তানী ছেলেটির ঘরে প্রচুর বই। অধিকাংশই বাংলা। এত বাংলা বই একসঙ্গে অতীন বহুদিন দেখেনি। অনেক বাংলা গানের রেকর্ডও রয়েছে। ঘরের মাঝখানে একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো অতীন। এ দেশে এটা খুবই স্বাভাবিক, কেউ বাইরে গেলে তার অ্যাপার্টমেন্টটা চেনাশুনো কারুকে ব্যবহার করতে দিয়ে যায়। কিন্তু অতীন আগে কখনো এরকমভাবে থাকেনি। তার অস্বস্তি লাগছে। কোনো জিনিস হারিয়েন্টারিয়ে গেলে বা ভেঙে গেলে কে দায়ী হবে? সিদ্ধার্থটা সুজানকে এই ঘরে রাখতে পারতো না?

একটা টেলিফোন করা দরকার। শর্মিলা বারবার বলে দিয়েছে পৌঁছেই একটা খবর দিতে। সিদ্ধার্থর ঘর থেকে অতীন ফোন করবে ভেবেছিল। কিন্তু সিদ্ধার্থ তো তাকে সময়ই দিল না। অচেনা লোকের ঘর থেকে কি ফোন করা যায়? পয়সাটা দেওয়া যাবে কী করে? বাইরে বেরিয়ে রাস্তা থেকে টেলিফোন করতে হবে? না, এ ঘর থেকেও কালেক্ট কল করা যেতে পারে। এরকম তো হয়ই, পকেটে খুচরো পয়সা না থাকলে লোকে রাস্তা থেকেও কালেক্ট কল করে।

শর্মিলাই ফোন ধরলো। অতীন কিছু বলার আগেই শর্মিলা খুশীর উত্তেজনার সঙ্গে বললো, এই জানো, কী হয়েছে? তুমি চলে যাবার একটু পরেই বড়মামা ফোনে জানালেন, ওঁর শরীর খারাপ হয়েছে, উনি ট্রিপ ক্যানসেল করেছেন। তা হলে তো আমি নিউ ইয়র্ক ঘুরে আসতেই পারি! ইস, তোমার সঙ্গেই যেতে পারতুম, সারা রাত একসঙ্গে, কী ভালো লাগতো,! আজ আসবো? এই ধরো এগারোটার বাসে? সুমি একলা থাকবে বলছে। বাবলু, আমি আসবো?

অতীন দু তিন মুহূর্ত মাত্র দ্বিধা করলো, তারপর হেসে বললো, হ্যাঁ এসো! তুমি চলে এসো!

৪০. ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও কয়েকটি আর্ট গ্যালারি

ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও কয়েকটি আর্ট গ্যালারি দু’তিনদিনে দেখে নিল অলি। তারপর বিশাখাকে নিয়ে সে এলো ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। দেশের খবরের কাগজ পড়ার জন্য তার মন ছটফট করছিল। দুতিনটি বাংলা কাগজে সে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল, খবর মোটেই ভালো নয়, বন্যা শুরু হয়ে গেছে, মালদহ বিচ্ছিন্ন, মানিকতলায় আবার একজন কনস্টেবল হত্যা, গত দেড় বছরে এই নিয়ে ৩৮ জন পুলিশ খুন হলো, আসানসোল স্পেশাল জেলে এক সংঘর্ষে ন’জন নকশাল বন্দী নিহত বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত সত্তর লক্ষ উদ্বাস্তু এসেছে…। অলি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলো, কৌশিকদের ধরা পড়ার কোনো খবর নেই। অলি কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।

সেখান থেকে ওরা দু’জনে চলে এলো ট্রাফালগার স্কোয়ারে। লন্ডন শহরে যে কত বাঙালী থাকে তার কিছুটা আন্দাজ পাওয়া গেল এখানে এসে। আজ এখানে শুধু বাংলা কথা শোনা যাচ্ছে। চতুর্দিকে বাঙালী মুখ। বাংলাদেশের বিচারপতি আবু সয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আজ এখানে এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। বিচারপতি আবু সয়ীদ চৌধুরী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশ্বদূত, তিনি নিপীড়িত, মুক্তিকামী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের দাবির সমর্থনে দেশে দেশে প্রচার অভিযান চালাচ্ছেন।

ট্রাফালগার স্কোয়ারে সব সময় টুরিস্টদের ভিড় লেগেই থাকে। আজ সেখানে প্রায় চার পাঁচ হাজার বাঙালী এসে জড়ো হয়েছে। প্রথমে এক শো তিরিশ জন ব্রিটিশ এম পির স্বাক্ষরিত একটি আবেদন পাঠ করে শোনানো হলো, তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করেছেন। তারপর বিভিন্ন বক্তা শোনাতে লাগলেন বাংলার গ্রামে গঞ্জে পাকিস্তানী সৈন্যদের অমানুষ অত্যাচারের কাহিনী। একজন প্রস্তাব তুললেন, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সকে পৃথিবীর সব দেশের বয়কট করা উচিত, কারণ, তাদের যাত্রীবাহী বিমান বেআইনী ভাবে অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক বাহিনী বহন করে নিয়ে যাচ্ছে ঢাকায়।

একজনের বক্তৃতার মাঝখানেই হঠাৎ একটা উল্লাসের কোলাহল শোনা গেল। এইমাত্র লন্ডনের পাকিস্তান হাই কমিশনের দ্বিতীয় সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ করে এসে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য জানাতে এসেছেন। হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে উঠলো, জয় বাংলা! জয় বাংলা!

অলি বিশাখাকে জিজ্ঞেস করলো, মঞ্চে সভাপতির পেছনে ঐ যে দাঁড়িয়ে আছেন, উনি ডাক্তার আলম না?

বিশাখা বললো, তাইতো মনে হচ্ছে। ইয়েস, দ্যাটস হিম। তোমার দুলাভাই!

অলি বললো, তাহলে তুতুলদি নিশ্চয়ই একটু ভালো আছেন। উনি যখন মিটিং-এ এসেছেন…কাল যাবার আগে তুতুলদির সঙ্গে আর একবার দেখা করে যেতে হবে।

বিশাখা বললো, অলি, আই মাস্ট সে, তোমার ঐ তুতুলদি ইজ আ ব্রেইভ উয়োম্যান!

অলি বললো, আমরা দেশে থাকতে কিন্তু তুতুলদিকে দেখেছি, দারুণ লাজুক, কারুর সঙ্গে ভালো করে কথাই বলতে পারতো না।

একটু থেমে অলি আবার বললো, অনেকে ভাবে লাজুকরা বুঝি সব সময় খুব দুর্বল হয়। তা। ঠিক না। কোনো কোনো সময়ে লাজুক মেয়েরাও সাঙ্ঘাতিক মনের জোর দেখাতে পারে। আমি ছোটবেলা থেকেই তুতুলদিকে খুব অ্যাডমায়ার করি।

ওরা পুরো মিটিং না শুনে আবার বেরিয়ে পড়লো। হঠাৎ আজ বেশ গরম পড়ে গেছে। আমেরিকার অল্পবয়েসী টুরিস্টরা গেঞ্জি পরে রাস্তায় ঘুরছে। লন্ডনে যে এরকম স্বল্পবাস মানুষ দেখা যেতে পারে, সে সম্পর্কে অলির কোনো ধারণাই ছিল না। ইংরিজি সাহিত্যে সে ইংল্যান্ডের গরমের কোনো বর্ণনা পড়েনি।

টিউব স্টেশানের দিকে যেতে যেতে অলি বললো, এই ইংল্যান্ড ঘুরে গিয়ে এক সময় আমাদের দেশের লোকেরা কী রকম পাক্কা সাহেবের ভাব করতে! আজ সকালে দেখলুম, তোমাদের বাড়ির উল্টোদিকে একজন বুড়ো ইংরেজ খালি গায়ে বাগানে মাটি খুঁড়ছে। আগে। আমার ধারণা ছিল, সমুদ্রের ধারে ছাড়া আর কোথাও সাহেবরা খালি গা হয় না!

পাঁচ-সাতটি ছেলে সিঁড়ির ওপর দিয়ে হুড়মুড় করে নামতে নামতে অলিদের ধাক্কা দিয়ে ঠেলে চলে গেল। অলি বিশাখার দিকে তাকালো, যেন সে বলতে চায়, এই কি বিখ্যাত ব্রিটিশ ভদ্রতার নমুনা?

বিশাখা বললো, বাঁদিকের রেলিং ধরে চলো। ট্রেন ধরার তাড়ায় এইসব টিন এজারদের কোনো জ্ঞান থাকে না।

অলির স্বভাবে কোনো তিক্ততা নেই। একটু পরেই সে বললো, আমার কিন্তু লন্ডন শহরটা। খুব ভালো লেগে গেছে। আমার কল্পনার সঙ্গে অনেকটাই মেলেনি যদিও, তবু সব মিলিয়ে খুব লাইভলি।

–তা হলে, তুমি ইংলিশ লিটরেচার পড়তে আমেরিকা যাচ্ছে। কেন? ইংল্যান্ডেই পড়তে পারতে।

–এখানে আমাকে কে স্কলারশীপ দেবে?

–অ্যামেরিকায় গেলে তোমার কালচার শক অনেক বেশি হবে। ওখানকার ক্যাম্পাসগুলো হিপিতে ভরে গেছে। বিটনিকদের দল, তারপর হিপিরা এসে হোল ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে পোশাকের কনসেপ্ট, আরও অনেকগুলো ভ্যালুজ-এ খুব জোর ধাক্কা দিয়েছে! শুনেছি ওখানকার ক্যাম্পাসের মাঠেই জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে শুয়ে থাকে। নতুন একটা স্লোগান উঠেছে। মেক লাভ, নট ওয়ার।

–সাউন্ডস্ গুড। আমেরিকানরা যুদ্ধ চায় না?

–ইয়াংগার জেনারেশান চায় না। ভিয়েৎনাম যুদ্ধের বিরোধিতা থেকেই তো হিপি মুভমেন্টের শুরু।

–তা হলে বাংলাদেশে যে এত অত্যাচার হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার প্রতিবাদ না করে পাকিস্তানের মিলিটারি রেজিমকেই সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে কেন?

–সেটা তো সরকারের ব্যাপার, স্টেট পাওয়ার। পেন্টাগন। বড় বড় আর্মস ম্যানুফ্যাকচারারদের চাপে আমেরিকান সরকার পৃথিবীতে সব সময়ই কোথাও না কোথাও যুদ্ধ। চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ফর দা ফাস্ট টাইম অ্যামেরিকান ইয়ুথ এই সরকারি পলিসির বিরুদ্ধে গেছে। গায়ক বব ডিলান, কবি অ্যালেন গীনস্‌বার্গ এরা অনেকে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশ ভিকটিমদের জন্য চাঁদা তুলছে।

রাত্তিরে অলির নেমন্তন্ন তার বান্ধবী চন্দনার বাড়িতে। চন্দনা খুব করে ধরেছে, তাকে যেতে হবেই। চন্দনারা থাকে রিডিং স্টেশানের কাছে, তারা স্টেশানে অপেক্ষা করবে অলির জন্য। বিশাখা অলিকে ট্রেনে তুলে দিল।

বিলেতের ট্রেনে কেউ কারুর সঙ্গে যেচে কথা বলে না। কম্পার্টমেন্টে চার পাঁচজন ভরতীয় নারীপুরুষ রয়েছে, তারাও চোখে চোখ পড়লে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। প্রায় সকলেরই হাতে একখানা করে বই কিংবা খবরের কাগজ। সিনেমায় এরকম পশ্চিমী ট্রেনের দৃশ্য অনেক দেখেছে অলি, কিন্তু পাশাপাশি বসে থাকলেও যে মানুষে মানুষে এতখানি দূরত্ব হতে পারে তা সে এই প্রথম অনুভব করলো।

কম্পার্টমেন্টে যথেষ্ট ভিড়। রিডিং-এ নামবে অনেকেই। হঠাৎ যদি ট্রেন ছেড়ে দেয় এই ভয়ে অলি একটু ব্যস্তভাবেই নামতে গেল, তাতে সে একটা ঠ্যালাঠেলির মধ্যে পড়ে গেল। প্ল্যাটফর্মে পা দিয়েই সে অনুভব করলো তার হাতটা খালি। হ্যান্ডব্যাগ কোথায় গেল? ট্রেনে ফেলে এলো? না, ব্যাগটা সে সব সময় কোলের ওপর রেখেছিল, সেটা নিয়েই উঠে দাঁড়িয়েছিল। তাহলে–

অলির মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো। বিশাখার বাবা প্রথম দিনই সাবধান করে দিয়েছিলেন এখানকার ট্রেনে প্রায়ই পকেটমারি আর ছিনতাই হয়। এই প্রথম অলি বিশাখাকে বাদ দিয়ে একা ট্রেন জার্নি করলো। ভিড়ের মধ্যে কেউ তার ব্যাগটা টেনে নিয়ে গেছে!

হাতব্যাগের মধ্যে রয়েছে পাসপোর্ট, প্লেনের টিকিট, তিরিশ-বত্রিশ পাউন্ড ক্যাশ, দুশো ডলার ট্রাভার্স চেক, জরুরি ঠিকানা লেখা একটা নোট বই, এক জোড়া সোনার দুল। প্লেনের টিকিটটা সে আজ নিয়ে বেরিয়েছিল তার আমেরিকার ফ্লাইট কনফার্ম করার জন্য। পর পর অনেকগুলো ভয় অলির শরীরের মধ্যে পাক খেতে লাগলো, টিকিট হারাবার জন্য সে আর আমেরিকা যেতে পারবে না, বাবলুদা এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে যাবে, মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে তার ভর্তি হবার দিন পেরিয়ে যাবে, পাসপোর্ট নেই বলে তাকে পুলিশে ধরবে, তারপর অপমান করে তাকে দেশে ফেরত পাঠাবে…।

প্ল্যাটফর্ম প্রায় খালি হয়ে গেছে, চন্দনা আর তার স্বামী মনোজ এসে দেখলো অলি ট্রেন লাইনের দিকে স্থির ভাবে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখখানা রক্তশূন্য। চন্দনা তাকে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিতে অলি খুব আস্তে আস্তে বললো, আমার সব শেষ!

ব্যাপারটা অবশ্য এত গুরুতর কিছু নয়। মনোজ সব শুনে বললো, ডুপ্লিকেট পাসপোর্টের ব্যবস্থা হয়ে যাবে, আবার ইউ এস ভিসা নিতে হবে। থানায় ডায়েরি করলে টিকিটও পাওয়া যাবে, ট্রাভলার্স চেকের নম্বরগুলো আলাদা করে রেখেছেন তো? আর যা গেছে তা তো গেছেই—

প্রথমেই তারা অলিকে নিয়ে গেল থানায়। অফিসারটি সহানুভূতির সঙ্গে সব শুনে বললেন, এই লাইনে একটা গ্যাং অপারেট করছে, প্রত্যেকদিনই একটা-দুটো কেস রিপোর্টেড হচ্ছে, এবার ওরা ধরা পড়ে যাবে! তারপর তিনি মনোজকে জিজ্ঞেস করলেন, স্টেশানের পুরুষদের টয়লেটটা একবার দেখে এসেছেন তো?

তক্ষুনি আবার ফিরে যাওয়া হলো স্টেশানে। অলি আর বউকে দাঁড় করিয়ে মনোজ ছুটে চলে গেল, ফিরে এলো হাসতে হাসতে। অফিসারটি ঠিকই বলেছেন। ছিনতাইবাজরা ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে যায় না, ভেতরের জিনিসগুলো বার করে ব্যাগটা ফেলে রেখে যায় কাছাকাছি কোনো টয়লেটে বা ট্র্যাশ ক্যানে। প্লেনের টিকিট আর পাসপোর্টটাও ওরা অপ্রয়োজনীয় বোধে রেখে গেছে। বাকি জিনিসগুলো আর পাবার আশা নেই। ট্রাভলার্স চেকের নম্বর লেখা কাগজটাও অলি আলাদা করে রাখেনি।

মাত্র আধঘণ্টার জন্য অলির জীবনটা একেবারে বিস্বাদ হয়ে গিয়েছিল, এখন আবার সে একটা বিরাট স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। এর আগে কোনোদিনই তার সেরকম কিছু জিনিস হারায়নি, প্রথম বিদেশে এসেই সে সর্বস্বান্ত হতে বসেছিল! লজ্জায়-দুঃখে-অভিমানে তার আত্মহত্যা করার কথাও মনে জেগেছিল সেই সময়ে। ঘটনা পরিবর্তনের দ্রুততায় সে দারুণ ক্লান্ত বোধ করলো।

প্রেসিডেন্সি কলেজে অলির সহপাঠিনী ছিল চন্দনা। উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে, পড়াশুনোতেও ব্রিলিয়ান্ট ছিল, গ্র্যাজুয়েট হবার আগেই বিয়ে করে চলে আসে এদেশে।

অলি আর চন্দনাকে বাড়িতে নামিয়ে মনোজ চলে গেল ওদের আড়াই বছরের ছেলেকে কিছু দূরের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে। স্বামী স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করে, তাই প্রত্যেকদিন দু’জনে বেরুবার সময় শিশু সন্তানকে অন্যবাড়িতে রেখে যায়।

অলি লক্ষ করলো, চন্দনার মুখে একটা ক্লান্তির ছাপ। সকাল সাড়ে সাতটায় বেরুতে হয় তাকে, সে কাজ করে একটা ডেফ অ্যান্ড ডামব স্কুলে। একদা ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবিনী ছাত্রী ডেফ অ্যান্ড ডামৰ স্কুলে কী কাজ করে তা আর জিজ্ঞেস করলো না অলি। মনোজ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, কথায় কথায় সে বলে, আমি মিস্তিরি মানুষ, বই-টই কিছু পড়ি না।

দু’খানা বেডরুমের ছোট বাড়ি। আজ ছুটির দিন নয়, তাই সারাদিন খেটেখুটে ফিরে চন্দনাকে এখন রান্না করতে হবে। অলির লজ্জা করতে লাগলো। তার বিশেষ কিছু খাবার ইচ্ছে নেই, কিন্তু চন্দনা সে কথা কিছুতেই শুনছে না। ওরা নিজেরা অনায়াসেই স্যান্ডউইচ খেয়ে চালিয়ে দিতে পারতো, কিন্তু অতিথিকে তা দেওয়া যায় না। এখানে যারাই অলিকে নেমন্তন্ন করে, তারাই ভাত-ডাল-মাছের ঝোল খাওয়াবার চেষ্টা করে। অলি মাত্র কয়েকদিন আগে দেশ ছেড়ে এসেছে, ভাত-মাছের জন্য তার একটুও অভাববোধ নেই, সে বিলিতি খাবার স্বচ্ছন্দে খেতে পারে, কিন্তু এরা কেউ তা বুঝবে না। কিংবা অলির মতন দেশ থেকে সদ্য আগত কারুককে দেখলেই বোধহয় এদের নিজেদের ভাত-মাছ খাওয়ার ইচ্ছেটা জেগে ওঠে।

ছেলেকে আনতে গিয়ে মনোজ তার জামাইবাবুর সঙ্গে দু’এক গেলাস বীয়ার পান করে আসে, তাই তার ফিরতে একটু দেরি হয়। রান্নাঘরে চন্দনাকে সাহায্য করতে করতে অলি জিজ্ঞেস করলো, এখানে কেমন আছিস রে, চন্দনা?

পেঁয়াজ কাটা থামিয়ে চন্দনা অলির দিকে কয়েক পলক গাঢ় ভাবে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো, এক একদিন রাত্তিরে মনে হয় এক্ষুনি দেশে ফিরে যাই। আবার সকালবেলা উঠে সেই ইচ্ছেটা চলে যায়।

অলি বললো, তুই তো বিয়ের পর সেই যে চলে এলি, আর একবার বেড়াতেও গেলি না!

চন্দনা বললো, টাকা জমাচ্ছি। এখনো বাড়ি কিনতে পারিনি। তা ছাড়া বাচ্চাটা হলো–এখানে এত খাটতে খাটতে প্রাণ বেরিয়ে যায় যে আমার মনে হয়, একবার দেশে গেলে আর আমার কিছুতেই এখানে ফিরতে ইচ্ছে করবে না। আর যাই বল, দেশে বিনা পরিশ্রমে দিন কাটাবার মতন সুখ এখানে পাবি না!

–তাহলে এখানে কী আছে? কিসের টানে অনেকেই থেকে যায়?

–এক ধরনের সিকিউরিটি। এখানে ছেলেটাকে ভেজাল খাওয়াতে হবে না, ঠিক মতন লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাবে, আমরা দু’জনে আর দশ বছর চাকরি করতে পারলে যা টাকা জমবে, তাতে বাকি জীবনটা নিশ্চিন্তে চলে যাবে। এখানে লোকে সুখ খোঁজে না, আরাম খোঁজে। মেটেরিয়াল কমফর্ট।

–প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় চন্দনা ব্যনার্জির মুখে কখনো টাকা পয়সার আলোচনা শুনিনি। আমাদের ধারণা ছিল, তুই ভালো করে টাকা গুনতেই জানিস না। একদিন কফি হাউসে সাড়ে সাত টাকার বিল হয়েছিল, তুই কুড়ি টাকার নোট দিয়ে বলেছিলি খুচরো ফেরত চাই না, তোর মনে আছে? আমরা সবাই মিলে চেঁচিয়ে উঠেছিলুম!

–তখন বড় সরল আর বোকা ছিলুম রে, অলি। আমাদের বাবা মায়েরা আমাদের আদর যত্নের তুলোয় মুড়ে রাখতো। অনেক কিছুই জানতে বুঝতে শিখিনি। এদেশে হিসেবী হতেই হয়। এখানকার যে কোনো ইন্ডিয়ানদের বাড়িতে গিয়ে তুই শুনবি বাড়ি আর গাড়ির গল্প। আমার কী মনে হয় জানিস, অলি, সুখ কথাটা বোধহয় একটা ফিলোসফিক্যাল ধাপ্পা, আমাদের দেশেই বা ক’জন মানুষ সত্যিকারের সুখে থাকে? সাধারণ মানুষের সুখ নামে একটা এলিউসিভ ব্যাপারের পেছনে ছোটা উচিত নয়, তার চেয়ে বাড়ি-গাড়ি ভালো খাওয়া-দাওয়া, এসব পেলেই তো জীবনটা আরামে কাটে!

–হয়তো এর পরেও নিজের ভালো লাগা বলে একটা ব্যাপার আছে রে, চন্দনা। সেইজন্যই কেউ কেউ এইসব ক্রিচার কমফর্ট ছেড়েও তো চলে যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজের ভালো ভালো ছেলেরা বনে জঙ্গলে গিয়ে পিজান্ট মুভমেন্ট অর্গানাইজ করছে।

–দেশের অবস্থা তো খুব খারাপ শুনতে পাই। কলকাতায় রোজ খুন হচ্ছে। এখানে কলকাতার নাম শুনলেই সবাই ঠাট্টা করে। তুই চলে এসেছিস ভালো করেছিস। তোর সেই বন্ধু, কী যেন নাম, অতীন, তাই না? সে কিছুদিন লন্ডনে এসে ছিল শুনেছি, সে নাকি জেল থেকে পালিয়ে এসেছে? আর দেরি করিস নি, তোরা দু’জনে এবার একটা কিছু ঠিকঠাক করে ফ্যাল!

বাচ্চাকে নিয়ে মনোজ ফিরে এলো, আর এবিষয়ে কোনো কথা হলো না।

আগেই ঠিক ছিল অলি আজ রাতটা এখানেই থেকে যাবে। তবু বেশী রাত পর্যন্ত গল্প হলো না। ছুটি নেবার উপায় নেই, কাল ভোর থেকেই চন্দনা আর মনোজকে কাজে বেরুবার তোড়জোড় করতে হবে। মনোজ আর চন্দনার ব্যবহার দেখে কিছু বোঝা না গেলেও অলির কেন যেন মনে হতে লাগলো, ওদের দু’জনের মধ্যে কিসের যেন একটা টানাপোড়েন চলছে। চন্দনা অন্যদিকে মুখ ফেরালেই তার মুখখানা বিষণ্ণ হয়ে যায়, মনোজের চিবুকে ঝিলিক দিয়ে যায় একটা কিছু অস্বস্তি বা বিরক্তির রেখা। এত পীড়াপীড়ি করে চন্দনা অলিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে রাখলো, হয়তো সে নিজের কথা কিছু বলবে ঠিক করেছিল, অথচ প্রাণ খুলে কিছুই বললো না। চন্দনা মনে করে, সুখ কথাটা একটা ফিলোসফিক্যাল ধাপ্পা! এটা তো এক ধরনের সিনিসিজম, যা চন্দনার মতন মেয়ের কাছ থেকে আশাই করা যায় না।

বিছানায় শুয়ে অলির আবার মনে পড়লো ব্যাগ হারাবার ঘটনাটা। তার মর্মমূল পর্যন্ত একেবারে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। চোর-জোচ্চোর পৃথিবীর সব দেশেই আছে, ইংল্যান্ডেই বা থাকবে না কেন? ইংরেজদের লেখা ক্রাইম স্টোরি কী সে পড়েনি? তবু কয়েক মিনিটের জন্য অলির মনে হয়েছিল, এই কী ভারতের তুলনায় অনেক উন্নতদেশের আইন শৃঙ্খলার নমুনা? টাকা পয়সা যা গেছে যাক, তবু ভাগ্যিস পাসপোর্ট আর টিকিটটা ফেলে গেছে। তা না হলে বাবলুদার সঙ্গে আর দেখা হতো না! আর অলির লন্ডন ভালো লাগছে না। পরশু সন্ধেবেলা তার ফ্লাইট, সেই পরশু যেন কত দূরে! বাবলুদা কি এখনও দাড়ি রেখেছে?

অলির ঘুম আসছে না, এই বিছানাটায় একটা শিশু-গন্ধ। এদেশে খুব বাচ্চা ছেলে-মেয়েরাও মা-বাবার কাছ থেকে আলাদা শোওয়া অভ্যেস করে। উত্তর কলকাতায় চন্দনাদের মস্ত বড় বাড়ি, সে বাড়িতে অন্তত তিরিশ-চল্লিশজন মানুষ দেখেছিল অলি, আর এখানে চন্দনার ছেলেকে দেখবার জন্য একজনও কেউ নেই। ঝি-চাকর রাখার প্রশ্নই ওঠে না, মনোজের দাদা-বৌদিরা কাছাকাছি না থাকলে চন্দনার ছেলেকে কে রাখতো সারাদিন?।

অলি বিছানা ছেড়ে জানলার কাছে এসে দাঁড়ালো। সারাদিন গরমের পর ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। সামনের বাগানে দু তিনটে গোলাপ গাছ, সেই বৃষ্টিতে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। একবার বাইরে বেরিয়ে বৃষ্টি ভিজতে ইচ্ছে করলে অলির, কিন্তু সদর দরজাটা খুলতে গেলে শব্দ হবে, অলি আগেই লক্ষ করেছে যে ভেতরের সুইইং ডোরটা খুলতে গেলেই ক্যাঁচ করে শব্দ হয়, তাতে চন্দনারা জেগে উঠতে পারে। অলি একদৃষ্টিতে বাগানটার দিকে চেয়ে রইলো। বিলিতি গোলাপ ফুলের ওপর ঝরে পড়ছে বিলিতি বৃষ্টি। দেশে থাকবার সময় বিলেত কথাটা শুনলেই এক ধরনের রোমাঞ্চ হতো, এখন অলি সত্যিই সেই বিলেতে এসেছে, কিন্তু তীব্র কোনো অনুভব তাকে কাঁপিয়ে দেয়নি। অ্যামেরিকা কি এর চেয়ে খুব বেশী আলাদা হবে?

এক ঝলক তার মনে পড়ছে বাবলুদার মুখ, আবার পরের মুহূর্তে মনে আসছে কৌশিক আর পমপমদের কথা। বাবলুদা আর কৌশিক দুই প্রাণের বন্ধু, অথচ দু’ জনের জীবন চলে গেল দু’ দিকে। জেল ভেঙে পালিয়ে এসেছে কৌশিক, দু হাতে রিভলভার চালিয়েছে, এসব গল্পে শোনা যায়, সিনেমায় দেখা যায়, কিন্তু তাদের অতি পরিচিত কৌশিক সেই রকম একটা ঘটনার সত্যিকারের নায়ক। বাবার মুখে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা শুনেছে অলি, বইতেও পড়েছে, মাস্টারদা, গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং-এর মতন বীর যোদ্ধাদের সঙ্গে কৌশিকদের তুলনা করতে ইচ্ছে করে। কৌশিককে বাঁচতেই হবে। পমপম আর কৌশিকের কথা মনে পড়লেই অলির বুকটায় একটু ব্যথা হয়।

বাবলুদা আমেরিকায় রয়েছে বলে অনেকে তাকে ভুল বুঝছে। ওদের পার্টির কেউ কেউ বাবলুদার নামে বিরূপ মন্তব্য করে। ওরা আসলে সব কথা জানে না। বাবলুদা মোটেই আসতে চায়নি, তাকে জোর করে পাঠানো হয়েছে, সেই সময় অবস্থা অন্য রকম ছিল, পালিয়ে না এলে বাবলুদাকে অন্য পার্টির ছেলেরা খুন করে ফেলতো।

বাগানের গোলাপ গাছের পাশে অলি যেন দেখতে পেল বাবলুদাকে। পা-জামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে তার চুল। অলি ফিসফিস করে বললো, বাবলুদা, আমি আসছি, আমি আসছি, আমি আর তোমাকে ছেড়ে দূরে থাকতে পারছি না।

পরদিন সকালে কোনোরকমে ব্রেক ফাস্ট খেয়েই ওরা বেরিয়ে পড়লো। চন্দনার ছেলে এখনও ঘুমোচ্ছ, সেই অবস্থায় তাকে পৌঁছে দেওয়া হলো মনোজের দিদির বাড়িতে। মনোজের দিদি এখন কোনো চাকরি করছেন না, সেই জন্যই তাঁর কাছে বাচ্চাটাকে রাখা যায়। এতবড় সুবিধের জন্যই তো চন্দনারা রিডিং-এ পড়ে আছে। বাচ্চাটা শনি-রবিবার ছাড়া বাবা-মাকে ভালো করে দেখতেই পায় না।

অলি একা একা প্যাডিংটন স্টেশানে নামলো পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে। হাতের ব্যাগটা সে দোলাচ্ছে, কেউ এসে নিক তো আর একবার! চন্দনাদের কাছ থেকে তাকে পাঁচটা পাউন্ড ধার করতে হয়েছে, বিশাখাকে বলতে হবে একটা চেক পাঠিয়ে দিতে।

আজ থেকে বিশাখার আবার কাজ শুরু, সে সারাদিন অলিকে সঙ্গ দিতে পারবে না। টিউব রেলের ম্যাপ দেখে অলি একা একা ঘুরে বেড়াতে পারে। কিন্তু যাবে কোথায়? নোট বইটা খোয়া গেছে, তুতুলের বাড়ির ঠিকানা কিংবা ফোন নম্বর তার মনে নেই। ইস, তুতুলদি ভাববে, অলি আর একবার তার খোঁজও নিল না!

লন্ডনের মিউজিয়াম কিংবা আর্ট গ্যালারিগুলোতে ঢুকতে কোনো পয়সা লাগে না। এই একটা বড় সুবিধে। দশটা বাজবার পর অলি আবার টেট গ্যালারিতে ঢুকে পড়লো। এখানে অনেকক্ষণ কাটানো যায়। সে একা, স্বাধীন, যেখানে খুশি যেতে পারে, আজই যেন সে লন্ডন শহরে প্রথম ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে কবি-শিল্পীদের লন্ডন, ইতিহাসের লন্ডন। তবু, মনের মধ্যে কোথায় যেন খচখচ করে। পৃথিবীর অন্যদেশের আগন্তুকরা যেভাবে লন্ডনকে দেখবে, একজন ভারতীয়ের পক্ষেও কি ততটা মুগ্ধভাবে দেখা সম্ভব? দু শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের কথা মনে পড়েই যায়। এক একটা মোটা মোটা থামওয়ালা প্রাচীন বাড়ি দেখলে মনে হয়, কলোনির কুলিদের রক্ত জল করা টাকায় কি এসব তৈরি হয়নি? অবশ্য দেখতে দেখতে চোখে সয়ে গেলে কিছুদিন পরে আর এসব মনে পড়ার কথা নয়!

রাস্তা দিয়ে অনেকক্ষণ ঘুরলো অলি, হাইড পার্ক কর্নারে বসেও ছিল কিছুক্ষণ, তবু একজন কেউও তার সঙ্গে কথা বলেনি। তার দিকে তাকিয়েছে অনেকে, যদিও শাড়িপরা নারী এখানে দুর্লভ কিছু নয়, তাহলেও কিছু লোক, হয়তো তারা কনটিনেন্টের টুরিস্ট, শাড়িপরা মেয়েদের দিকে ফিরে ফিরে চায়। কিন্তু কেউ আলাপ করতে এগিয়ে আসে না। ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের এই চরম রূপটি দেখে অলি আহত হয় না, বিস্মিত বোধ করে। একটা শব্দও উচ্চারণ না করে এ শহরে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে বাড়ি ফেরা যায়।

হঠাৎ বৃষ্টি নামতে অলিকে বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরতেই হলো।

পরদিন বিশাখা আর তার বাবা তাকে তুলে দিতে এলেন হিথরো এয়ারপোর্টে। অলির কাছে একটাও ডলার বা পাউন্ড নেই। শেষপর্যন্ত টাকা হারাবার ঘটনাটা সে বিশাখাদের কাছে বলতে পারেনি, চন্দনার ধারটাও শোধ দেওয়া হলো না। টাকা-পয়সা আর লাগবে কিসে? নিউ ইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্টে বাবলুদা তাকে নিতে আসবে, সব ঠিক হয়ে আছে।

সুটকেস চেক ইন করার পর অলি বিশাখা আর তার বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এরপর বাবলুদার ওপর তার পুরোপুরি নির্ভরতা। মাঝখানে আর কেউ রইলো না। অলি হঠাৎ একটু মুচকি হাসলো। নিউ ইয়র্কে প্লেন থেকে নেমেই সে বাবলুদাকে বলবে, আমি নিঃস্ব হয়ে তোমার কাছে এসেছি।

সঙ্গে একটাও পয়সা না থাকলে কেমন যেন অসহায় অসহায় লাগে। যদিও অলি বারবার নিজেকে বোঝাচ্ছে, মাঝখানে পয়সা খরচ করার কোনো প্রশ্নই উঠছে না। বিমানটি এবার এক লাফে আটলান্টিক পাড়ি দেবে, যাত্রীরা শুধু খাবে আর ঘুমোবে। কেউ কেউ অবশ্য নিজের পয়সায় মদ কিনে খায়।

অলির পাশে একজন মাঝবয়সী পুরুষ বসেছে, মুখ দেখে মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ। গায়ে একটু একটু রসুনের গন্ধ। বিমানটি আকাশে ওড়ার পরেই সে সীট-বেল্ট খুলে পাশ ফিরে অলিকে জিজ্ঞেস করলো, পাকিস্তানী? ইন্ডিয়ান?

লোকটি ইংরিজি বলে ভাঙা ভাঙা, তার কণ্ঠস্বরে একটা সরল, ভালো মানুষীর ভাব আছে। এই যে বিনা দ্বিধায় তার আলাপ করার চেষ্টা, এটাতেই অলি একটা প্রাচ্যদেশীয় স্পর্শ পায়। লোকটির বাড়ি কায়রো শহরে, সে শিকাগোতে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে, তার ছেলে সেখানে স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো করে।

অলি বললো, তোমরা এক সময় পিরামিড বানিয়েছে, আর এখন সেই তোমরাই নিজের ছেলেদের স্থাপত্যবিদ্যা শেখার জন্য আমেরিকা পাঠাচ্ছো?

লোকটি গলা কাঁপিয়ে হা হা শব্দে হেসে উঠলো।

আগে হয়তো অলির এই ধরনের হাসি কর্কশ কিংবা সভ্যতাসম্মত মনে হতো না, কিন্তু এখন মনে হলো, সে যেন কোনো মরুভূমির বেদুইনের হাসি শুনলো এই বিমানের মধ্যে। তার বেশ পছন্দই হলো।

লোকটি একটু পরেই হুইস্কির অর্ডার দিয়ে অলিকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার জন্য কী। নেবো? অলি কিছু চায় না, লোকটিও নাছোড়বান্দা। জিন, কোনিয়াক বা ওয়াইন একটা কিছু নিতেই হবে। অলির আবার মনে পড়লো তার কাছে পয়সা নেই। লোকটিকে নিবৃত্ত করার জন্য সে একটা কিছু নরম পানীয় কিনতে পারতো। লোকটি জোর করে একটি ছোট বোতল রেড ওয়াইন নিল অলির জন্য। তার সনির্বন্ধ অনুরোধে অলি একটুখানি ঠোঁটে ছোঁয়াতেও বাধ্য হলো।

বেশ জোরে জোরেই গল্প জুড়ে দিল লোকটি। সে শাড়িপরা যুবতী এর আগে দু’তিনজন মাত্র দেখেছে। ভারতীয় পুরুষদের তুলনায় ভারতীয় মেয়েরা খুব কমনীয় হয়। অবশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী একজন মহিলা, তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে কী যেন একটা গণ্ডগোল করছেন! পূর্ব পাকিস্তানের সব মুসলমানদের তিনি হিন্দু করে দিতে চাইছেন না? এই রকম খবরই তো তাঁর দেশের কাগজে বেরোয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তো একজন আর্মি জেনারেল, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করে কি ঐ মহিলা পারবেন?

তৃতীয় পেগ হুইস্কি শেষ করার পর লোকটি অবলীলাক্রমে অলির উরুতে হাত রাখলো।

অলি ভয় পেল না। সে তার নরম হাতের মুঠিতে লোকটির হাত ধরে গভীর মিনতির সুরে, খুব আস্তে বললো, প্লীজ, এরকম করো না।

লোকটি অবাক চোখে অলির মুখের দিকে চেয়ে রইলো। অলি আবার বললো, তোমার হাতটা সরিয়ে নাও। নইলে আমাদের বন্ধুত্ব থাকবে না!

বন্ধুত্ব শব্দটির মধ্যে যেন একটা জাদু আছে। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে হাতটা সরিয়ে নিল। আর কথা বললো না একটাও। একটু পরে ঘুমিয়ে পড়লো।

অলির ঘুম আসছে না। পাশের লোকটি তার উরুর যেখানটায় হাত রেখেছিল, সেই জায়গাটার শাড়ি সে প্লেন করলো অনেকবার। যেন ঐ স্পর্শটা মুছে দিতে চাইছে। সে জানে, ওরকম একটু আধটু ছোঁয়াছুঁয়িতে কিছু আসে যায় না। লোকটি খারাপ নয়, তার ওপর কোনো জোর করেনি, মদের নেশায় একটু উচ্ছল হতে চেয়েছিল।

বাবলুদা ছাড়া আজ পর্যন্ত কেউ তাকে পুরুষ হিসেবে স্পর্শ করতে পারেনি। এ জন্য মনে মনে অলির একটু গর্ব আছে। চেষ্টা করেছে অনেকে, এমনকি পমপম আর কৌশিকের সঙ্গে সে যখন ঘাটশিলায় যায়, তখন কৌশিকের এক বন্ধু তাকে নিবিড় ভাবে কামনা করেছিল, দু’তিনবার জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু কখনো মেনে নিতে হয়নি, কোনোবারই চাচামেচি করে নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা করতে হয়নি। তার শান্ত দৃঢ় প্রত্যাখ্যান অন্যরা ঠিক বোঝে–এই জোর অলির আছে। একমাত্র বাবলুদাই তার কোনো বাধা বা নিষেধ মানেনি, সেইজন্য বাবলুদার জন্যই তার শরীর মন উন্মুখ হয়ে আছে।

বাবলুদার সঙ্গে প্রথম দেখা হলে কী কী মিথ্যে কথা বলতে হবে, অলি মনে মনে আবার ঝালিয়ে নেয়। বিদেশে যারা একা থাকে, তাদের হঠাৎ খারাপ খবর দিতে নেই। মানিকদার মৃত্যুসংবাদ দেওয়া চলবে না। জেল ভেঙে পালাবার সময় কৌশিক যে সাঙ্ঘাতিক আহত হয়ে এখনো মৃত্যুর কাছাকাছি রয়েছে, তা বলা যাবে না। পমপমকে লালবাজারে কী ধরনের অত্যচার করেছে, তাও বলার দরকার নেই। ওরা সব ভালো আছে ৷ বাবলুদার পিসিমণি ভালো আছে। লন্ডনে যে তুতুলদির এত বড় অপারেশন হয়েছে, তাও উল্লেখ না করাই সঙ্গত। আর?

আটলান্টিক মহাসমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে বিমান, ওপরে রাত্রির আকাশ। মেঘের স্তরের ওপর দিয়ে যাচ্ছে বলে চাঁদটা অনেক বেশী উজ্জ্বল। বিমানের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই এখন ঘুমন্ত। সোজা হয়ে বসে আছে অলি। প্রতি মিনিটে সে প্রায় আট মাইল করে এগিয়ে। যাচ্ছে বাবলুদার দিকে।

একবারও সে তন্দ্রায় ঢলে পড়লো না। পুরো সময়টা জেগেই কাটালো। এক সময় জেগে উঠলো ভেতরের আলো, ফুটে উঠলো সটি-বেল্ট বাঁধার নির্দেশ। পাশের লোকটির পিঠে। আলতো করে হাত রেখে অলি ডাকলো, প্লীজ গেট আপ!

পিকচার পোস্টকার্ডের ছবির মতন দেখা যাচ্ছে নিউ ইয়র্ক শহর। বড় বড় আলোকোজ্জ্বল বাড়ি। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং চিনতে অসুবিধে হয় না। এক ঝলক দেখা যায় স্ট্যাচু অফ লিবার্টি।

বিমানটি ভূমি স্পর্শ করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ইজিপশিয়ান লোকটির চোখে মুখে খানিকটা আশঙ্কা জমেছিল। মৃদু ঝাঁকুনিটি লাগার পর সে অলিকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে কেউ নিতে আসবে তত? না হলে আমি তোমাকে কোনো হোটলে পৌঁছে দিতে পারি।

অলি বললো, ধন্যবাদ। আমাকে নিতে আসবে একজন। তোমার সঙ্গে কথা বলে আমি যথেষ্ট আনন্দ পেয়েছি।

তারপরেই অলির বুকটা একবার কেঁপে উঠলো। যদি বাবলুদা কোনো কারণে না আসতে পারে? তার কাছে একটা টেলিফোন করারও পয়সা নেই। পরমুহূর্তেই সে এই আশঙ্কাটাকে ঝেড়ে ফেলে দিল। বাবলুদার ওপর সে ভরসা রাখতে পারছে না? সে এত দুর্বল?

ইমিগ্রেশান, কাস্টমস পেরুবার পরই সে দেখতে পেল অতীনকে। এই দু’আড়াই বছরে সে। যেন আরও রোগা আর লম্বা হয়েছে, মুখে দাড়ি নেই, সে হাতছানি দিচ্ছে অলির দিকে। অলি যেন তার সুটকেসটা টানতে পারছে না। ইচ্ছে করছে সুটকেসটা ফেলেই ছুটে যেতে। ছেলেমেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরছে, এখানেই চুমু খাচ্ছে সবার সামনে। অলি চাইছে বাবলুদার বুকের ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

অলি কাছাকাছি আসতেই অতীন বেশ চেঁচিয়ে বাংলায় বললো, অলি! অলি! তুই এসেছিস তা হলে শেষ পর্যন্ত! আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। প্লেন প্রায় চল্লিশ মিনিট লেট।

তারপর অলি কিছু বলার আগেই সে একটু সরে গিয়ে পাশের একটি যুবতীর দিকে হাতের পাঞ্জা তুলে বললো, আলাপ করিয়ে দিই, এ আমার বান্ধবী শর্মিলা, আর শর্মিলা এই হচ্ছে অলি।

এর পরেও সে অলিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললো, তোমরা দু’জনে এখানে। একটু দাঁড়াও, আমি দেখি সিদ্ধার্থ গাড়িটা কোথায় পার্ক করলো। ও বেচারা জায়গাই পাচ্ছিল না!

অতীন দৌড়ে চলে গেল। শর্মিলা কাছে এসে অলির হাত ধরে জিজ্ঞেস করলো। খুব টায়ার্ড, তাই না? লন্ডন থেকে এই জার্নিটা একটানা এতক্ষণ, বড় বোরিং। আসুন ভাই, এই দিকটায় সরে আসুন। ওখানে বৃষ্টির ছাঁট লাগছে। দু’দিন ধরে নিউ ইয়র্কে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। লন্ডনের ওয়েদার কী রকম ছিল?

অতীনের ব্যবহারের আড়ষ্টতা চোখে পড়লেও এই মেয়েটির কথার মধ্যে আন্তরিক সুরটা স্পর্শ করলো অলিকে। প্রথম দর্শনেই সে শর্মিলাকে পছন্দ করে ফেললো। সে শর্মিলার কাছ থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল না।

৪১. সারাদিন একটানা বৃষ্টি পড়ছে

সারাদিন একটানা বৃষ্টি পড়ছে। এ বৎসর বৃষ্টি অতি প্রবল।

পুকুর-ডোবা-খাল-বিল এখন জলে টইটম্বুর, নদীগুলিও ভরে গিয়ে তটরেখা ছাপিয়ে যেতে চাইছে, কোনো কোনো জেলায় বন্যা শুরু হয়ে গেছে। চতুর্দিকের প্রকৃতি এখন সজল।

শ্রাবণ মাস ভরসার মাস, আবার দুঃখেরও মাস। বর্ষার জল পেয়ে ধান গাছ খলখলিয়ে বাড়ে, আবার অতিবৃষ্টি হলে সব নষ্ট হয়ে যাবারও আশঙ্কা থাকে। এবারের ফসলের সম্ভাবনা এ পর্যন্ত ভালোই। তবে, একটানা বর্ষণ হলে অন্যান্য রোজগারপাতি বন্ধ থাকে, হাটবাজার ঠিকমতন বসে না। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশী মানুষের দিন আনি দিন খাই অবস্থা। এক একটা দিন নষ্ট হলে তাদের উনুনে আঁচ পড়ে না!

অবশ্য জনসংখ্যা এখন আর সাড়ে সাত কোটি নেই, বেশ কমতে শুরু করেছে, এর মধ্যেই পঁচাত্তর-আশি লাখ মানুষ পাড়ি দিয়েছে ভারতের দিকে। কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিং, চিটাগাং, দিনাজপুরের সীমান্ত দিয়ে এখনও প্রতিদিন হাজারে হাজার নারী-পুরুষ চলেছে এই বৃষ্টির মধ্যে, সামান্য পোঁটলা-পুটলি মাথায় করে। দুবেলা আহার না জুটলেও মানুষ নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে চলে যেতে চায় না, তবু এরা যাচ্ছে নিছক প্রাণ বাঁচাবার আশায়, এরা চোখের সামনে জ্বলতে দেখেছে গ্রাম, গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়তে দেখেছে দলে দলে মানুষকে, স্বামীর সামনে ধর্ষিত হয়েছে স্ত্রী, ভাইকে খুন করে কেড়ে নিয়ে যেতে দেখেছে বোনকে, এমনকি শিশুর শরীর ও ছিন্নভিন্ন হয়েছে বেয়নেটে। বৃষ্টি বাদলা, জল কাদার মধ্য দিয়ে উদভ্রান্ত এই পলাতকরা জানে না সীমান্তের ওপারে গিয়ে তারা কী পাবে। তবু তারা ছুটছে তাড়া-খাওয়া অসহায় প্রাণীর মতন এবং পথের মধ্যেও কোনো কোনো দল পড়ে যাচ্ছে হানাদারদের সামনে।

ভারত সীমান্তের ঠিক ওপারের ছোট ছোট শহরগুলিতে হঠাৎ জনসংখ্যা হয়ে গেছে দ্বিগুণের বেশী। এত শরণার্থীদের আশ্রয় দেবার ব্যবস্থা করতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে রাজ্য সরকারগুলি, যারা এমনিতেই নিজেদের নানা সমস্যায় জর্জরিত। আগেকার উদ্বাস্তুদের সমস্যারই সমাধান। করা যায়নি, ভারত সরকারকে নতুন করে খুলতে হচ্ছে শরণার্থী ক্যাম্প। এক দলের জন্য মাথার ওপর আচ্ছাদন, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না করতেই এসে যাচ্ছে আরও দলের পর দল, এই জনস্রোতের বিরাম নেই। আরও কত মানুষ আসবে, কতদিন থাকবে এরা?

সারা পৃথিবী এই ব্যাপারে নির্বিকার। কোনো কোনো দেশ শরণার্থীদের কিছু সাহায্য পাঠিয়ে তাদের বিবেকের দায় চুকিয়ে দিচ্ছে, মূল সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কারুর কোনো আগ্রহ বৃষ্টি পড়ছে কলকাতা শহরেও, সারারাত এবং পরের দিন

বৃষ্টিতে বড় শহরের জনজীবন একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায় না, কিছু কিছু গাড়ি-ঘোড়া চলে, অফিস-কাছারি খোলা থাকে। কলকাতার জনসংখ্যাও সূফীত হচ্ছে দিন দিন আশ্রয়প্রার্থীদের আগমনে। বাংলাদেশের ভদ্রলোকশ্রেণীর শরণার্থীরা কোনোক্রমে মাথা গোঁজবার স্থান পেয়েছে কলকাতায়, আর দমদম বিমানবন্দরের পর থেকে যশোর রোডের দু ধারে, বনগাঁ সীমান্ত পর্যন্ত সারি সারি ক্যাম্পে জড়ামারি করে রয়েছে লক্ষ লক্ষ নাম-না-জানা নারী-পুরুষ।

শ্রমিক অসন্তোষ, খাদ্যাভাব, দল-বদলের রাজনীতি, নকশালপন্থী যুবকদের সশস্ত্র আন্দোলন, এইসব সমস্যায় পশ্চিমবাংলার আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত, তার ওপর হঠাৎ এই লক্ষ লক্ষ অনাহুত অতিথিদের চাপ। এদের আহার-বাসস্থানের বন্দোবস্ত করার দায়ের চেয়েও আর একটা বড় ভয় সব সময় অনেকের মনে জেগে আছে, আবার নতুন করে দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হয়ে যাবে না তো? সাতচল্লিশ সালের পর থেকে যারা বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছে, যাদের অনেকেই এখনও মানবেতর প্রাণীর মতন জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের মন থেকে তিক্ততার স্বাদ মুছে যাবার কথা নয়। তারা কি এই নবাগতদের মেনে নেবে? বিদেশী চর ও স্বার্থান্বেষী উস্কানিদাতারাও এই সুযোগে গণ্ডগোল সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেরকম কিছু এখনও দেখা যায়নি। বরং পশ্চিমবাংলার অধিকাংশ মানুষ আবেগে উত্তাল হয়ে উঠেছে, অনেকদিন পর যেন উভয় বাংলার শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্য থেকে মুছে গেছে বিচ্ছেদের রেখা। ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ভাষার টান। নতুন করে সবাই ভাবতে শুরু করেছে যে রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ দ্বিখণ্ডিত হলেও পারস্পরিক আদান-প্রদান ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ঠিক হয়নি। কলকাতার অফিসগুলিতে কর্মচারিরা মাসে একদিনের বেতন দান করছে শরণার্থীদের জন্য। ভারত সরকার শরণার্থীদের ব্যয় বহন করার জন্য অতিরিক্ত ডাকমাশুল চাপালে কেউ আপত্তি করেনি। দূরবর্তী জেলা শহর, গ্রামগঞ্জের মানুষও অসহায় বহিরাগতদের জন্য জায়গা করে দিচ্ছে।

যাদের আবেগ কম তারা সংশয়বাদী হয়। এমন মানুষও আছে, যারা হিন্দু-মুসলমানদের প্রশ্ন ভুলতে পারে না। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তারা ঘরোয়া আলোচনায় প্রশ্ন তোলে, এই মুসলমানদের এখন তো আদর-যত্ন করে খাওয়ানো হচ্ছে, সব মিটে গেলেই দেখবে ওরা আবার আমাদের শত্রু হয়ে গেছে, চুটিয়ে ভারতের নিন্দে করবে। এখন তো খুব বাংলা বাংলা করছে, কিন্তু আসলে ওদের মন-প্রাণ আরবের দিকে!

যাদের গায়ে দেশ বিভাগের আঁচড়টিও লাগেনি, তাদেরও কারো কারো মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা। পাকিস্তান দু টুকরো হয়ে যাবার সম্ভাবনায় তারা খুশি, কারণ পাশের মুসলমান রাষ্ট্রটি এবার দুর্বল হয়ে যাবে। যদি বাংলাদেশ বলে নতুন রাষ্ট্রটির সত্যিই জন্ম হয়, তা হলে তার ওপরে চোখ রাঙানো যাবে যখন তখন। তারা চাপা গলায় বলে, আরে, এই যে সত্তর-আশি লাখ মানুষ ওপার থেকে এসেছে, এরে মধ্যে মুসলমান ক’জন? ক্যাম্পগুলোতে দ্যাখো গিয়ে বেশীর ভাগই হিন্দু। কিছু মুসলমান নেতা আর বুদ্ধিজীবী কলকাতায় বসে মজা মারছে, তারা আর ক’জন? পাকিস্তানের মিলিটারি তো হিন্দুদেরই মেরে মেরে তাড়াচ্ছে!

এরপর কি এরাও পার্মানেন্টলি এদেশে থেকে যাবে?

এইসব সংশয়বাদীরা অবশ্য প্রকাশ্যে গলা খুলতে পারছে না। অফিসে, ক্লাবে, পাড়ায় পাড়ায় আড়ায় এখন কেউ সাম্প্রদায়িকতার সামান্য ইঙ্গিত দিলেই অন্যরা রে রে করে উঠে প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অস্ত্রাঘাতের এই একটা মাত্র সুফল দেখা যাচ্ছে এখন, দু দিকের বাংলার অন্তত কয়েক কোটি মানুষ বুঝতে পেরেছে সাম্প্রদায়িক বিভেদের

বৃষ্টিতে জল জমে গেছে কলকাতার রাস্তায়। আজ অনেকেই বাড়ি থেকে বেরুতে পারেননি। মামুনের মতন কয়েক হাজার নিবাসিত মানুষ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ মনে ভাবছে, কবে নিজের দেশে, নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানায় ফিরে যাওয়া যাবে!

বৃষ্টি পড়ছে ঢাকায়। বৃষ্টি পড়ছে রাজশাহী, বগুড়া, টাঙ্গাইল, খুলনায়। বৃষ্টির সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কণায় যেন ছড়িয়ে পড়ছে মন খারাপের বীজাণু। আগামী দিনগুলি আরও কত ভয়ংকর রূপ নিয়ে আসবে কেউ জানে না। ভয় ও আশঙ্কার বদলে আস্তে আস্তে বুকে জমছে নৈরাশ্য।

ঢাকা শহরে মুক্তিবাহিনীর গোপন তৎপরতা বন্ধ হয়ে গেছে হঠাৎ। পাকিস্তানী মিলিটারি ও পুলিশ একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাজার হাজার ছেলেকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে কতজনকে এখনো আটকে রেখেছে আর কতজনকে হত্যা করে নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে লাশ, তা কেউ জানে না।

রুমীর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি এ পর্যন্ত। রুমীর বন্ধুরা, বদি, চুলু, জুয়েল, কাজী, বাশার, বেনায়েত এরা কেউই ফেরেনি। ওদের শেষ দেখা যায় এস পি এ হস্টেলে, যেটা এখন আর্মি ইনটেলিজেন্সের ঘাঁটি। জাহানারা ইমামের মাথা খারাপ হয়ে যাবার মতন অবস্থা। শেষপর্যন্ত তিনি পাগলাবাবার আখড়ায় গিয়ে ধনা দিয়েছেন। পাগলাবাবা একজন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পীর, তিনি নাকি দূরের অনেক কিছু দেখতে পান। শিক্ষিতা, যুক্তিবাদী, জাহানারা ইমামের আগে এসব পীর-ফকিরে বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু মায়ের প্রাণ, যে একটু ভরসা দেবে তাকেই আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে। পাগলাবাবার আস্তানায় এখন এরকম প্রচুর ব্যাকুল ৩৩০

মা বাবার ভিড়, সেখানে বড় করে মিলাদ-মাহফিল হয়। পাগলাবাবা একদিন জায়নামাজে বসে খাসদেলে ধ্যান করে জেনেছেন যে রুমী ও আরও অনেকে বেঁচে আছে। তিনি ওদের শিগগিরই মুক্ত করে আনবেন।

আজ এই বৃষ্টির মধ্যেও জাহানারা ইমাম দশ সের অমৃতি নিয়ে এসেছেন পাগলাবাবার আশ্রমে মিলাদের জন্য।

বৃষ্টি পড়ছে গ্রামবাংলায়, বৃষ্টি পড়ছে চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা সীমান্তে।

মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আজ সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছে, কেউ কেউ গুলতানি করছে। কেউ কেউ বিমর্ষ মুখে চেয়ে আছে বাইরের দিকে, ওই মাঠঘাট পেরিয়ে কোনো এক জায়গায় তাদের বাড়ি, সেখানে ফেরা যাবে না।

যে প্রচণ্ড উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে প্রতিরোধ লড়াই শুরু হয়েছিল, হঠাৎ তাতে ভাটা পড়েছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। পাকিস্তানী বাহিনী যেন নতুন ভাবে অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে এবং সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়ে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে সীমান্তের ওপারে। এখন তাদের ওপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়েও সুবিধে করা যাচ্ছে না, অযথা শক্তিক্ষয় হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর!

এরপর কী হবে? পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ তো দূরের কথা ভারত সরকারই আজও স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশকে। অর্থবল নেই, অস্ত্রবল নেই, শুধু মনের জোর নিয়ে আর কতদিন লড়াই চালানো যাবে? মনের জোরও নষ্ট হয়ে যায় আস্তে আস্তে।

একটা পরিত্যক্ত ইস্কুলবাড়ির বারান্দায় বসে গোটা পাঁচেক স্টেনগান পরিষ্কার করছে বাবুল চৌধুরী। তার ওপর এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অস্ত্রগুলো ঠিকমতন কাজ করছে না, পরিষ্কার করার পর গুলি চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হবে। বারান্দায় অন্য এক প্রান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ছোট দলের মধ্যে তীব্র তর্কাতর্কি থেকে এখন কুৎসিত গালাগালি শুরু হয়ে গেছে, বাবুল সেদিকে একবারও মুখ ফেরায়নি। কোনো কাজ নেই বলেই এরকম ঝগড়া আর দলাদলি শুরু হয়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝে। এমনকি দিনতিনেক আগে একজন মুক্তিযোদ্ধা খুন হয়েছে এই ক্যাম্পের মধ্যে। অ্যাকশানের সময় এরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে পারে, কিন্তু আলস্যের সময়ই ফুটে বেরোয়, কে কার শত্রু ছিল আগে, কে আওয়ামী লীগের আর কে ন্যাপের।

সিরাজুল এখানে নেই। ভারতের কোনো গুপ্ত জায়গায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বিশেষ কোনো ট্রেইনিং-এ।

বৃষ্টি পড়ছে করাটিয়া, গোপালপুর, কোদালিয়া, নেয়ামতপুর, নাটিয়াপাড়া, জগন্নাথগঞ্জ, পাকুল্লা, মির্জাপুর, ভাতকুরা, ভুয়াপুর, পাথরাইল চণ্ডী, কালিহাতি গ্রামে। বর্ষণ হচ্ছে সারা বাংলার আকাশে। এই বৃষ্টির মধ্যেও চাষীকে বেরুতে হয়েছে মাঠে, জেলের নৌকো ভেসেছে নদীতে, তাঁতী বন্ধ করেনি তাঁত, এমনকি যে ভিখারিণীটি রোজ গান গেয়ে ভিক্ষে করে সে-ও ভিজতে ভিজতে যাচ্ছে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি। অন্নচিন্তা বড় চিন্তা। ভাত এমন চিজ খোদার সঙ্গে উনিশ-বিশ।

অনেক মানুষ জানেই না দেশ কাকে বলে, স্বাধীনতা কী বস্তু! করাচী রাওয়ালপিণ্ডি তো দূরের কথা। এইসব মানুষ অনেকেই ঢাকা শহরও চক্ষে দেখেনি। দশ-পনেরো মাইল বৃত্তের পরিধিতেই এদের কেটে যায় সারাটা জীবন। রাওয়ালপিণ্ডি, ইসলামাবাদ বা ঢাকায় বসে যারা শাসনযন্ত্র চালায়, তারা উর্দুতে কথা বলে না বাংলায় কথা বলে, তাতে এদের কিছুই যায় আসে না। হিন্দু জমিদারদের আমলেও এরা পেট ভরে খেতে পায়নি, পাকিস্তানী আমলেও এদের দু বেলা ভাত জোটার নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের যুবশক্তির একটা অংশ যেমন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে গেছে, তেমনি আবার একটা বেশ বড় অংশ তৈরি করেছে রাজাকার আলবদর বাহিনী। পাকিস্তানী সৈন্যরা এদের কাজে লাগায় লুঠতরাজ, হিন্দু বিতাড়ন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান দেবার জন্য। শতকরা সাতানব্বই জন লোক শেখ মুজিবকে ভোট দিয়েছিল কিন্তু তাদের অনেকেই এখন পাকিস্তানী অত্যাচারীদের সমর্থক। অনেক অধ্যাপক, স্কুলমাস্টার, জেলা পরিষদের প্রেসিডেন্টও এখন শান্তি কমিটির উৎসাহী সদস্য এবং গণহত্যার অংশীদার। পবিত্র ইসলামের নামে শপথ নিয়ে যে কোনো অমানবিক, বীভৎস কাজ করতেও তাদের আটকায় না। আবার অল্পবয়েসী নিরক্ষর। এমন অনেক ছেলে রাজাকার হয়েছে, যাদের এটুকু বোধও নেই যে রাজাকার হওয়াটা কিছু অন্যায় ব্যাপার। তাদের মুরুব্বিরা যা বলে, তারা তাই শোনে। রাজাকার হলে তারা হাতে দুটো পয়সা পায়, অস্ত্র পায়, দু বেলা আহার জোটে। লোকের বাড়িতে আগুন জ্বালালে কিংবা হাট-বাজার লুট করলে কেউ কোনো শাস্তি দেয় না, এও তো এক মজার ব্যাপার।

আত্মরক্ষার জন্য মানুষকে কত কিছু সহ্য করতে হয়, সেই তুলনায় ধর্মত্যাগই বা এমন কি বড় কথা! পচিশে মার্চের পর যে-সব এলাকার হিন্দুরা পালিয়ে যেতে পারেনি তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধর্মান্তরিত হয়ে প্রাণে বেঁচেছে। এবার হিন্দুদের বিরুদ্ধে সরকারি প্রচারও তীব্র। ঢাকায় হিন্দু নামের রাস্তাগুলির সব কটার নাম পরিবর্তন করে ঘোষণা জারি হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ জানে যে পূর্বাঞ্চলে বিভেদমূলক গণ্ডগোল শুরু করেছে হিন্দুরা এবং সীমান্ত-সংঘর্ষ হচ্ছে হিন্দু ভারতের শত্রুতায়। পাকিস্তানী আর্মি হিন্দু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শায়েস্তা করছে, এটা তো দোষের কিছু নয়!

সামরিক শাসন এখন শক্ত থাবা গেড়ে বসেছে। বাংলাদেশের সব জেলাগুলিতেই বেছে বেছে নিমূল করা হয়েছে বিদ্রোহীদের। ভারতীয় আকাশবাণী কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার যাই-ই বলুক, একথা সত্যি যে পূর্ব পাকিস্তানে আইনশৃঙ্খলা ফিরে এসেছে অনেকখানি। স্কুল-কলেজ খোলানো হয়েছে জোর করে। অফিস-ব্যাঙ্ক-কলকারখানা আবার চালু হয়েছে। মনে মনে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থক তারাও মুখ বুজে এখন বাধ্য হয়েছে কাজে যোগ দিতে। শান্তি কমিটিগুলিকে দেওয়া হয়েছে অপর্যাপ্ত ক্ষমতা।

টাঙ্গাইলে বিন্দুবাসিনী স্কুলের মাঠে এক জনসভায় শান্তি কমিটির সেক্রেটারি অধ্যাপক আবদুল খালেক ঘোষণা করলো যে পাকিস্তানে একমাত্র মুসলমানরাই থাকবে। পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র, এ রাষ্ট্রে মুসলমান ব্যতীত অন্য জাতের কোনো নাগরিক অধিকার নেই। নিচু জাতের হিন্দু, যেমন ধোপা, নাপিত, মেথর, মুচিদের রেখে দেওয়া হবে, কারণ মুসলমানরা ওই ধরনের ছোট কাজ করে না। অন্য হিন্দুরা স্বেচ্ছায় মুসলমান হলে পাকিস্তানী হতে পারবে, কিন্তু উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কোনো হিন্দু মুসলমান হলে তাকে কোরবানী করা হবে!

এর আগে অনেক হিন্দুকে হানাদার-রাজাকাররা খুন করেছে, অনেক হিন্দু ভারতে পালিয়েছে। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোর দুরবস্থা ও মড়কের খবরও পৌঁছেছে এখানে, তাই কিছু হিন্দু মনে করেছিল, যা হয় হোক, তবু পিতৃ-পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে মরতে যাবো না। এবার তাদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠলো। আবদুল খালেক হিন্দুদের নামের তালিকা তৈরি করে ফেলেছে, এখন আর তাদের পালাবারও উপায় নেই, পালাতে গেলেও মরতে হবে।

টাঙ্গাইলের বড় মসজিদে শুরু হলো দীক্ষার অনুষ্ঠান। নিকুঞ্জবিহারী সাহা, দুলাল কর্মকার, অসিত নিয়োগী, হরিপদ সরকার, বাদল বসাক, বিজয় চৌধুরী এইসব নামের প্রায় তিন শো জনকে দাঁড় করানো হলো মসজিদের বাইরে। শান্তি কমিটির নেতারা তাদের প্রত্যেককে উপহার দিল একটি করে টুপী। তুলা নামের এক মোল্লা এদের অজুর নিয়মকানুন ও কলেমা শেখাবার দায়িত্ব নিল। এই তুলা বড় মসজিদে দীর্ঘদিন আযান দিয়ে আসছে, আজ সে দারুণ খুশি, এতদিন আযান দেওয়ার পুণ্যে সে এতগুলি কাফেরকে দীক্ষা দেবার দায়িত্ব পেয়েছে, এবার সে সরাসরি আল্লাহের খাস দরবারে পৌঁছে যাবে।

এই মজা দেখার জন্য মসজিদের সামনে ভিড় করে এসেছে হাজার হাজার মানুষ। তাতেও অধ্যাপক আবদুল খালেকের খুব রাগ, তিনি চিৎকার করে ধমকাতে লাগলেন, এদের দেখার কী আছে! এরা কেউ আল্লার ফেরেস্তা না! এরা এখনও কাফের, এখনও মুসলমান হয়ে সারেনি।

তবু যেন শুরু হয়ে গেল উৎসব। নব দীক্ষিত মুসলমানদের মিষ্টি খাওয়াবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। নিকুঞ্জ সাহা, দুলাল কর্মকারদের দল রহিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিন হয়ে বাড়ি ফেরার একটু পরে সেখানেও ধেয়ে এলো ধর্মের ধ্বজাধারীরা এবং কৌতূহলী জনতা। শুধু পুরুষরাই তো মুসলমান হলে চলবে না, বাড়ির মহিলাদেরও ধর্মান্তরিত করাতে হবে।

এতে আর আপত্তি করার কী আছে। পুরুষরা জাত বদলালে মেয়েরাই বা বাকি থাকে কেন? মেয়েদের মতামত নেবার প্রশ্ন ওঠে না।

মাগরেবের নামাজের পর শুরু হলো মেয়েদের দীক্ষা দেবার পালা। অতি সর্টকাট পদ্ধতিতে। অন্তঃপুরচারিণী হিন্দু মহিলারা পরপুরুষের সামনে আসবে না, তাই একখানা কালো শাড়ির এক প্রান্ত ধরে বাইরে দাঁড়ালেন ইমাম সাহেব, সেই শাড়ির অন্য প্রান্তটি ধরে রইলো অন্দরমহলের লক্ষ্মীরানী, সিদ্ধিরানী, জ্যোৎস্নারানী, মিনু, পলি, অৰ্চনারা। ইমাম সাহেব কলেমা উচ্চারণ করলেন ভেতর থেকে ফৌপাতে ফোঁপাতে ওইসব মেয়েরা সেই উর্দু শ্লোকের কতটা সঠিক প্রতিধ্বনি করলো সে বিচারের দরকার নেই। ওতেই হবে।

বাইরের জনতা জয়ধ্বনি করে উঠলো।

এইভাবে ধর্মান্তরের অনুষ্ঠান চলতে লাগলো দিনের পর দিন। শুধু সাহাবসাক-চৌধুরীরাই নয়, চক্রবর্তী-ভট্টাচার্যরাও বাদ পড়লো না। এবং তারা যে প্রকৃত মুসলমান হয়ে উঠেছে তা প্রমাণ করার জন্য অতি উৎসাহ দেখিয়ে তারা নামাজের জমায়েতে বেশী বেশী ভিড় করে। অনেক সময় দেখা গেল, পুরোনো মুসলমানদের চেয়ে নব্যরাই মসজিদে আসছে বেশী সংখ্যায়। অভ্যেস নেই বলে কেউ কেউ নামাজ পড়তে গিয়ে হাঁটুতে চোট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। সেরকম একজনকে এক কট্টর মৌলবাদী দয়াপরবশ হয়ে বললো, আপনি শুধু মসজিদে এসে বসে থাকবেন, তাতেই চলবে, তাতেই আপনি সরাসরি বেহেশতে চলে যাবেন।

কৌতূহলী জনতার মধ্যে অবশ্য সবাই মজা দেখতে বা আনন্দ করতে আসেনি। এদের মধ্যে লুকিয়ে আছে কিছু কিছু যুবক, যারা শান্তি কমিটির হঠাৎ-নেতা এবং ধর্মের দালালদের নাম লিখে নিচ্ছে ও মুখগুলো চিনে রাখছে। তারা মনে মনে শপথ নিয়েছে, একদিন এই সমস্ত ব্যক্তিদের যারা ভয় দেখিয়ে ও জোর জুলুম করে মুসলমান বানাচ্ছে, যারা পবিত্র ইসলামের নামে কলঙ্কলেপন করছে, তাদের চরম শাস্তি দিতে হবে! একজনও নিস্তার পাবে না।

গোটা বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দাপটে ঠাণ্ডা হয়ে গেলেও এই টাঙ্গাইল মহকুমাতেই গোপনে এক দুর্জয় শক্তিশালী যোদ্ধার দল কাজ করে যাচ্ছে। তাদের নেতার নাম কাদের সিদ্দিকী।

মাত্র চব্বিশ বছরের এক যুবক এই কাদের, তার ডাক নাম বজ্র। পড়াশুনো ছেড়ে সে। একসময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। বছর দু-এক থাকার পর তার মন টেকেনি, সৈনিকের চাকরি ছেড়ে এসে সে আবার কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনো শুরু করেছিল, যোগ দিয়েছিল ছাত্র রাজনীতিতে। বেশ লম্বা চেহারা, সুঠাম শরীর, মুখে ফিডেল কাস্ত্রোর মতন দাড়িগোঁফ। কিছুদিন আগেও লোকে তাকে চিনতে টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের নেতা এবং জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য জনাব আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ছোট ভাই ডানপিটে বজ্র হিসেবে।

ঢাকা শহর থেকে টাঙ্গাইলের দূরত্ব মাত্র ষাট মাইল। পচিশে মার্চ রাত্রে টাঙ্গাইলে কোনো অত্যাচারের ঘটনা ঘটেনি, ঢাকায় কী ঘটেছে তা জানা যায়নি। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই ঢাকা থেকে সোজা সড়ক পথে ছুটে আসতে লাগলো হাজার হাজার মানুষ, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু কেউ বাদ নেই, তাদের মুখ চোখে সাঙ্ঘাতিক আতঙ্ক,কেউ কোনো কথা বলতে পারে না, তারা পালাতে চায় গ্রামের দিকে। ক্রমে জানা গেল, ঢাকায় মিলিটারিরা ট্যাঙ্ক ও কামান। নিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করেছে সাধারণ নাগরিকদের, বহু বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, রাস্তায় পড়ে আছে। শত শত লাশ, রাজারবাগ-পিলখানায় গোলাগুলি চলেছে, গৃহস্থের ঘরে ঢুকে সৈন্যরা গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে বাঙালী মারছে। একজন জানালো যে তার বাড়ি ধানমণ্ডিতে, সে দেখেছে মধ্যরাত্রিতে একদল সৈন্য এসে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গোলা চালাতে থাকে, বঙ্গবন্ধু অসীম সাহসে বেরিয়ে আসেন তাদের সামনে, তারা বঙ্গবন্ধুকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে একটা গাড়িতে তুলে কোথায় নিয়ে গেছে কে জানে!

ক্রমে ঢাকায় অত্যাচারের কাহিনীর সত্যতা সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। তখন টাঙ্গাইলের প্রতিরক্ষা বিষয়ে নেতাদের চিন্তা করতেই হয়। নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি ও সমস্ত দলের নেতাদের নিয়ে তৈরি হলো এক কমিটি, টাঙ্গাইলের সমস্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হলো সেই কমিটির ওপর। একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর গ্রেফতারের আশঙ্কা করে আগেই তাঁর একটি নির্দেশ ঘোষণার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন, কাগমারী বেতারে শোনা গেল সেই ঘোষণা, তিনি বাঙালী জাতিকে শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলেছেন।

বাড়িতে বাড়িতে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে ফেলে ওড়ানো হলো সবুজ-লাল ও সোনালী রঙের বাংলাদেশের পতাকা। শুধু টাঙ্গাইলের সার্কিট হাউসে তখনও উড়ছে পাকিস্তানী পতাকা, এই সার্কিট হাউসে রয়েছে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি, সৈন্যসংখ্যা ১৫০ জন, তাদের পাঁচজন অফিসারের মধ্যে দু’জন পাঞ্জাবী। এই বাঙালী সৈন্যরা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে ইচ্ছুক কি না তা এখনও জানা যাচ্ছে না। এরা পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে রেখেছে কেন? এর মধ্যে পুলিশ ও আনসার বাহিনী গণপরিষদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু সার্কিট হাউসের সৈন্যবাহিনী বশ্যতা স্বীকার না করলে টাঙ্গাইলের নিরাপত্তা সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই!

লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কাদের সিদ্দিকী চায় তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে সার্কিট হাউস ঘেরাও করতে। হাই কমাণ্ডকে রাজি হতেই হলো। কাঁদেরের দলে ছিল কিছু ছাত্র, শ্রমিক ও রিকশাচালক, তাদের সঙ্গে যোগ দিল কিছু পুলিশ ও আনসার বাহিনী। সব মিলিয়ে সত্তর পঁচাত্তর জন, এদের হাতের অস্ত্র কিছু অতি পুরোনো থ্রি-ও-থ্রি রাইফেল ও দু-একটা মান্ধাতার আমলের ব্রেটাগান। মাঝরাত্তিরে এই দলটি রওনা হলো, বিবেকানন্দ আশ্রমের পাশ দিয়ে, লৌহজং নদীর পাড় ঘেষে। শুশানঘাট পেরিয়ে সার্কিট হাউসের হাজার গজের মধ্যে এসে পড়তেই অতি উৎসাহী কেউ কোদালিয়া পুলের ওপর থেকে চালিয়ে দিল কয়েক রাউণ্ড গুলি। সঙ্গে সঙ্গে সার্কিট হাউস থেকে গর্জে উঠলো চাইনিজ মেশিনগান, বৃষ্টির মতন ছুটে আসতে লাগলো গুলি। এই আনাড়ি যোদ্ধারা সবাই আছড়ে পড়লো মাটিতে, মেশিনগানের ভয়ংকর শব্দে তছনছ হয়ে গেল রাত্রির স্তব্ধতা।

কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ বন্ধ হলে কাদের দেখলো তার নিজস্ব কয়েকজন সঙ্গীসাথী ছাড়া বাকিরা সবাই উধাও। পুলিশ ও আনসাররা ভয়ে পালিয়েছে সবার আগে। কাদের কিছুতেই পশ্চাদপসরণ করতে রাজি নয়। যদিও সে জানে যে এই সামান্য অস্ত্র দিয়ে এক সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীর মোকাবিলা করা যায় না। তবু সে সারা রাত জেগে বসে রইলো সেখানে।

ভোরবেলা সে বন্ধুদের দিয়ে কয়েকটা মাইক্রোফোন যোগাড় করে আনলো। তার উদ্দেশ্য। বাঙালী সৈন্যদের সমর্থন আদায় করা। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা নয়। শেষ পর্যন্ত সেই মাইক্রোফোনে বারবার আবেদন জানিয়ে সে ওই দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে ফেললো, সার্কিট হাউসে ওড়ানো হলো বাংলাদেশের পতাকা।

কিন্তু শেষপর্যন্ত দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট টাঙ্গাইল ছেড়ে পিছিয়ে গেল ময়মনসিংহের দিকে। এরপর এলো ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একটি বাহিনী, তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চায়। এদিকে ঢাকা থেকে পাকিস্তানী আর্মি টাঙ্গাইলকে জব্দ করতে এগিয়ে আসছে। ই পি আর বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে কাদের তার সঙ্গীদের নিয়ে এগিয়ে গেল মুখোমুখি সংঘর্ষে।

আশিকপুরে যাদুকর পি সি সরকারের প্রাক্তন বাড়ির পাশে নির্বিঘ্নে কাটলো সেই রাত। পরদিন করাতিপাড়া। তারপর গোরান-সাটিয়াচোরায় পাকিস্তানী আর্মির সঙ্গে টাঙ্গাইলের মুক্তিবাহিনীর প্রথম লড়াই হলো। রাস্তার দু ধারে লুকিয়ে থাকা মুক্তিবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণে পাকিস্তানী আর্মির বেশ কয়েকটি গাড়ি উল্টে গেল, প্রস্তুত হবার আগেই মারা পড়লো অনেক জওয়ান। তারপর শুরু হলো পাল্টা আক্রমণ, ভারী ভারী কামানের গোলা ও হেলিকপ্টারে মেশিনগানের স্ট্র্যাফিং-এ মুক্তিবাহিনী দাঁড়াতে পারলো না।

থানাগুলোতে আবার উড়লো পাকিস্তানী পতাকা, কিছু লোক যারা বাংলাদেশ স্বাধীন করবে বলে লাফিয়েছিল তারা মুহূর্তে ভোল পাল্টালো। রাজনৈতিক নেতারা টাঙ্গাইলের আস্তানা ছেড়ে কেউ কেউ লুকোলেন গ্রামে, অনেকেই চলে গেলেন ভারত সীমান্তের দিকে। কাদের সিদ্দিকী কিছুতেই পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নয়, সে তার ছোট দলটি নিয়ে এবং কয়েকটা গাড়িতে যতদূর সম্ভব অস্ত্র রসদ সংগ্রহ করে আত্মগোপন করতে চলে গেল পাহাড়ী জঙ্গলে।

অসীম ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে সে কিছুদিনের মধ্যেই গড়ে তুললো নিজস্ব এক মুক্তিবাহিনী। অকস্মাৎ এই বাহিনী কোনো থানা আক্রমণ করে অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেয় কিংবা রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানী আর্মির কোনো ঘাঁটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বেশ কিছু সৈন্যকে খতম করে আবার পালিয়ে যায় জঙ্গলে। এই বাহিনীকে দেখা যায় না, ধরা-ছোঁওয়া যায় না। সরকার থেকে ঘোষণা করা হলো, দেশদ্রোহী কাদের সিদ্দিকীকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে পারলে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। পাকিস্তানের দুশমন এই কাদের সিদ্দিকীকে কেউ আশ্রয় দিলে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। তবু গ্রামের মানুষ কাদের ও তার সঙ্গী-সাথীদের আশ্রয় দেয়, রাত দুপুরে তারা এসে পড়লে, রান্না করে খাওয়ায়। পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর তার চোরাগোপ্তা আক্রমণও অব্যাহত রইলো। কাঁদেরের দল শুধু পাকিস্তানী শক্তিকেই আঘাত করে না, হঠাৎ এক-একটা গ্রামে উপস্থিত হয়ে কুখ্যাত কোনো বিশ্বাসঘাতক বা দালালকে ধরে সকলের সামনে তার বিচার করে, দোষী প্রমাণিত হলে তৎক্ষণাৎ তাকে গুলি করে মারে। চোর-ডাকাতরাও এখন এই মুক্তিবাহিনীকে ভয় পায়।

গ্রামে গ্রামে রটে গেল কাদের সিদ্দিকী অর্থাৎ বজ্র ভাই অলৌকিক শক্তির অধিকারী। তার আর একটা ডাক নাম হলো টাইগার এবং তার দলটির নাম কাঁদেরিয়া বাহিনী।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী পিছু হঠতে হঠতে শেষপর্যন্ত ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে গেছে। এখন ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের তত্ত্বাবধানে তাদের প্রশিক্ষণ ও গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু টাঙ্গাইলের এই কাঁদেরিয়া বাহিনী সম্পূর্ণ নিজেদের চেষ্টায় কী করে এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে? প্রথমে মুজিব নগরের বাংলাদেশ সরকার কিংবা ভারতীয় সহায়ক সেনানীরা এই বাহিনীর অস্তিত্ব বিশ্বাস করতে চায়নি, কিন্তু পাকিস্তানী ফোর্সের ওয়্যারলেস মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে এদের খবর পাওয়া যেতে লাগলো। পাকিস্তানী ফোর্স এদের হামলায় ব্যতিব্যস্ত, কোথাও কোথাও তাদের ক্ষতি মারাত্মক। দুর্ধর্ষ পাকিস্তানী বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যে এসে এরা হামলা চালিয়ে যায়।

স্বাধীন বাংলা বেতারের চরমপত্রে এবার টাঙ্গাইলের এই বিচ্ছুদের গাজুরিয়া মাইরের কথা বলা হতে লাগলো। বিদেশের কয়েকটি সংবাদপত্রে বিস্ময় প্রকাশ করা হলো। ক্রমে জানা গেল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ছ’সাত হাজার মুক্তিযোদ্ধার একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মিত বাহিনী গড়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে একদিন ঘাটাইল-ধলাপাড়ার সম্মুখ যুদ্ধে একটা ঘটনা ঘটে গেল। অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে কাদের এল এম জি নিয়ে হানাদার খতম করে যাচ্ছে, হঠাৎ, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো তার ডান হাত দিয়ে। কী হয়েছে কিছুই বুঝতে পারলো না সে, কিন্তু তার সারা গায়ে রক্ত, এমনকি তার এল এম জি-টাও রক্তে ভেসে যাবার উপক্রম। সেই অবস্থায় গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সে রাস্তার পাশের ঢালু জমি দিয়ে নেমে গেল। নিজের সম্পর্কে তার চিন্তা করার সময় নেই, এই যুদ্ধে হানাদারদের যথেষ্ট ক্ষতি হলেও কাঁদেরের সহযোদ্ধা হাতেম শাহাদাৎ মৃত্যুবরণ করেছে।

কিছু পরে নিরাপদ জায়গায় সরে এসে একটা চালাঘরে আশ্রয় নিয়ে কাদের পরীক্ষা করে দেখলো নিজেকে। শত্রুপক্ষের একটা গুলি এসে তার এল এম জির ফোরসাইট নবে লাগে। নক্টা ভেঙে সৃপ্লিনটার তার ডান হাতের তালু ভেদ করে চলে গেছে, আর বুলেটটা এক হাঁটুর ইঞ্চিখানেক ওপরে ঢুকে বসে আছে। সবাধিনায়কের এই অবস্থা দেখে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মাটি আছড়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। কাদের তার হাঁটুর কাছে প্যান্ট ছিঁড়ে ক্ষতস্থানটায় ঢুকিয়ে দিল বাঁ হাতের কড়ে আঙুল। খানিকটা টেপাটেপি করতেই বেরিয়ে এলো গুলিটা। কাদের তার সঙ্গীদের বললো, কাঁদছিস কেন? এই দ্যাখ আমার কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছি।

ভারতীয় সীমান্তের ওপাশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের সঙ্গে এর আগেই যোগাযোগ হয়েছিল। এখন সেখানে হঠাৎ খবর এলো, পাকিস্তানী বাহিনী সর্বত্র সগর্বে প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, ধলাপাড়ার যুদ্ধে কাদের সিদ্দিকী খতম হয়ে গেছে। পাকিস্তানী ফৌজ মিষ্টি বিতরণও শুরু করে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই আনন্দ বেশীদিন স্থায়ী হলো না, আহত অবস্থায় প্রায় দেড় শো মাইল পায়ে হেঁটে, অনেকগুলি নদী পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বুগাই নদীর অপর পারে ভারতীয় শিবিরে এসে উপস্থিত হলো কাদের সিদ্দিকী। অনেক চমকপ্রদ অভিযানের নায়ককে এবার সশরীরে জলজ্যান্ত অবস্থায় দেখা গেল। আহত হলেও সে কাহিল হয়নি, টাইগার নামটি তাকে মানায়।

ভারতীয় এলাকায় চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হবার পর প্রচুর সংবর্ধনা পাচ্ছিল কাদের, তবু সে দারুণ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আবার ফিরে গেল নিজের এলাকায়। নিজের বাহিনী ছেড়ে সে দূরে থাকতে চায় না, সে আবার লড়াই চালিয়ে যেতে চায়, টাঙ্গাইল শত্রু মুক্ত করার জন্য।

ধলেশ্বরী নদীর বুকে এই বাহিনী একদিন এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়ে দিল। নারায়ণগঞ্জ থেকে সৈন্য ও গোলাবারুদ ভর্তি সাতটি স্টিমার ও জাহাজ চলেছে উত্তরবঙ্গের দিকে। টাঙ্গাইল শহর এখন পুরোপুরি পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অধীনে, এ ছাড়া কালিহাতি, ঘাটাইল, সিরাজগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মধুপুরেও হানাদারদের প্রচুর অস্ত্র ও সৈন্য মজুত। সেই জন্যই জাহাজগুলি চলেছে নিশ্চিন্তে, ঢিলেঢালা গতিতে। কিন্তু এরই মধ্যে ভুয়াপুর নামে একটি ছোট্ট জায়গায় রয়েছে মুক্তিবাহিনীর একটি গুপ্ত ঘাঁটি। সেখানে এসে পৌঁছোল ঐ জাহাজ চলাচলের খবর। কাদের সিদ্দিকী সেখানে নেই, তবে সে নদীপথের ওপর নজর রাখার পরামর্শ দিয়ে রেখেছে। ঐ জাহাজগুলির একটি বাঙালী সারেং গোপনে কিছু খবরও পাঠিয়েছে। সর্বাধিনায়ক ভুয়াপুরের ঐ মুক্তিবাহিনীর ইউনিটকে জাহাজগুলি আক্রমণ করার নির্দেশ পাঠালো।

এটা একটা অসম্ভব প্রস্তাব। এ যেন ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সদরের এক দৈত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতন। গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও সামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে কি পাকিস্তানী নৌবাহিনীর মোকাবিলা করা যায়? কিন্তু এত সব অস্ত্র গোলাবারুদ উত্তরবঙ্গে পোঁছোলে সেখানে পাকিস্তানী সীমান্ত রক্ষীরা দুর্জয় হয়ে উঠবে। মুক্তিবাহিনীরও সাঙ্ঘাতিক অস্ত্রের ক্ষুধা।

অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্যই তারা লেগে পড়লো। ধলেশ্বরীর ধারে মাটি-কাটা নামে একটি গ্রাম, সেখানে ঘাপটি মেরে বসে রইলো মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ছোট দলের কমান্ডার মেজর হাবিব ও তার কয়েকজন সঙ্গী। এর আগে ছেঁড়া লুঙ্গি পরে, মাথায় গামছা বেঁধে ও কাঁধে ঝাঁকি

জাল ঝুলিয়ে সাধারণ গ্রাম্য জেলের ছদ্মবেশে হাবিব জাহাজগুলোর কাছ থেকে ঘুরে এসেছে, পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলে এসেছে। এদের মনে কোনো রকম উদ্বেগের চিহ্নমাত্র নেই।

হাবিবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা মাত্র আঠেরো জন, আর সঙ্গে আছে দু ইঞ্চি মর্টার তিনখানা, দু’টা এল এম জি, কয়েকটি চাইনিজ ও ব্রিটিশ রাইফেল ও একটি ব্রিটিশ রকেট লঞ্চার। সাতটি জাহাজ সমান দূরত্ব রেখে আস্তে আস্তে এগোচ্ছে, হাবিব আগেই বলে রেখেছে। যে সে প্রথম গুলি না ছুড়লে অন্য কেউ আক্রমণ করতে পারবে না। একটি জাহাজ পার হয়ে গেল, অল্প বয়েসী ছেলেরা অস্ত্র হাতে ছটফট করছে, কিন্তু হাবিব নীরব, স্থির। দুটি জাহাজ গেল, তিনটি জাহাজ গেল, তবু হাবিব অস্ত্র তুললো না।

নদীর মাঝখানে চর, পূর্ব দিকে জলের গভীরতা বেশী, জাহাজগুলি যাচ্ছে সেইদিক দিয়ে, ক্তিযোদ্ধারা ও সেই পাড়েই বসে আছে। পাঁচখানা জাহাজ পার হয়ে যাবার পর শেষ দুটি জাহাজ এলো, তাদের আকার বিরাট, আগাগোড়া ত্রিপলে ঢাকা। ওপরে অস্ত্র কোলে নিয়ে পাহারাদার সৈন্যরা গল্পগুজব করছে। রেঞ্জের মধ্যে আসতেই মেজর হাবিবের এল এম জি থেকে গুলি বর্ষণ শুরু হলো, সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের অস্ত্রগুলো একসঙ্গে গর্জন করে উঠলো।

আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে কোনো রকম প্রতি-আক্রমণও এলো না প্রায়। কয়েকজন পাকিস্তানী সৈন্য প্রথম গুলির ঝাঁকে প্রাণ দিল, বাকিরা প্রাণ ভয়ে লাফিয়ে পড়লো নদীতে। অগ্রবর্তী জাহাজগুলো সাহায্যের জন্য পিছিয়ে এলো না, বরং তারা যেন আরও ভয় পেয়ে গতি বাড়িয়ে পালালো সিরাজগঞ্জের দিকে। তারা কল্পনাই করতে পারেনি যে, মুক্তিবাহিনী এত বড় দুটি জাহাজকে আক্রমণ করতে সাহস করবে। তা ছাড়া, জাহাজ দুটি গোলাবারুদে ঠাসা, যে-কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে সব শুদ্ধ উড়ে যেতে পারে।

জাহাজ দুটো ঠেকে গেল মাটির চড়ায়। তখনি বিস্ফোরণ ঘটলো না। অসমসাহসী হাবিব তিন-চারজনকে সঙ্গে নিয়ে একটা ছোট নৌকোয় চেপে একটা জাহাজে উঠলো। এদিকে ওদিকে কয়েকটি মৃতদেহ ছড়ানো, আর জাহাজভর্তি লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি কার্তুজ, বুলেট ও কামানের গোলা, এ ছাড়া কিছু কামান ও মর্টার।

কাছাকাছি গ্রাম থেকে দলে দলে ছুটে এলো স্বেচ্ছাসেবকেরা। নামানো শুরু হলো অস্ত্র ও গোলাবারুদ। প্রায় পাঁচশো জন লোক ছ’ঘণ্টা ধরে ওঠা-নামা করেও সেই দুটি জাহাজের এক-চতুর্থাংশের বেশী অস্ত্র গোলাবারুদের পেটি খালাস করতে পারলো না। আর দেরি করা যায় না, যে-কোনো মুহূর্তে হানাদার বাহিনী ফিরে আসবে। জাহাজ দুটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। তার আগেই অস্ত্র ভর্তি নৌকোগুলো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে সকলের স্থানত্যাগ করাবার ব্যবস্থা হয়েছে।

পরবর্তী কয়েক দিন ধরে চললো সেই অগ্নিদগ্ধ জাহাজ দুটি থেকে গোলাবারুদের বিস্ফোরণ, কানে তালা ধরানো ভয়ংকর শব্দ। প্রতিশোধ নেবার জন্য তিন দিক থেকে এগিয়ে এলো পাকিস্তানী সৈন্যদল, আকাশ দিয়ে উড়ে এলো দুটি বিমান, একসঙ্গে গোলা বর্ষণ করেও তারা মুক্তিবাহিনীর গায়ে আঁচড় বসাতে পারলো না, তারা তখন একটার পর একটা সেতু ধ্বংস করে পিছিয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তান বাহিনীর দুটি জাহাজ সমেত প্রায় একুশ কোটি টাকার অস্ত্র ধ্বংস করে ফেললো গুটি কয়েক বাঙালী ছেলে, যাদের মধ্যে অনেকেই মাত্র কয়েক মাস আগেও কোনো অস্ত্র ছুঁয়ে দেখেনি।

৪২. আগরতলা থেকে প্লেনে চাপলো সিরাজুল

আগরতলা থেকে প্লেনে চাপলো সিরাজুল। এর আগে আকাশ দিয়ে সে প্লেন উড়তেই দেখেছে শুধু, সে যে কখনো আকাশপথের যাত্রী হবে, তা যেন স্বপ্নেও ভাবেনি। তার ধারণা ছিল প্লেনে বুঝি শুধু সুট-টাই পরা বড়লোকরাই যাওয়া-আসা করে, কিন্তু আগরতলার এই প্লোনের অনেক যাত্রীরই চেহারা ও পোশাক গ্রামে-গঞ্জে দেখা মানুষের মতন। কেউ কেউ সঙ্গে এনেছে চটের থলে, তার থেকে উপছে বেরিয়ে আসছে লাউ-কাঁঠাল। অনেকদিন পর সিরাজুল নিজেই পরেছে পরিষ্কার নতুন জামা-কাপড়, পায়ে কেডস। তাকে দু’ সেট এই পোশাক কিনে দেওয়া হয়েছে।

আকাশ আজ পরিষ্কার, বিমানের জানলা দিয়ে নীচের অনেক কিছুই দেখা যায়। প্রথম প্রথম তো ছোট ছোট বাড়ি ও মাঠের লাঙল হাতে চাষা আর গরুর পালও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, একটু পরে বন-জঙ্গল ও পাহাড়, তারপর একটা নদীতে পাল তুলে নৌকো যাচ্ছে। মোচার খোলার মতন ছোট্ট দেখাচ্ছে নৌকোগুলোকে, তবু ঐ নদীর দৃশ্য দেখে সিরাজুলের বুকটা মুচড়ে উঠলো। এটা কি তার খুব চেনা মেঘনা নদী? ইন্ডিয়ার প্লেন কি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যায়?

তার পাশ থেকে মতিনও গলা বাড়িয়ে জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে, তাকে সিরাজুল জিজ্ঞেস করলো, এইডা কোন নদী রে?

মতিনও বলতে পারে না। আকাশ থেকে দেখা ভূ-চিত্র সম্পর্কে তারও কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

ওদের সামনের সীটে বসেছে নির্মল আর জাহাঙ্গীর। এই চারজন এসেছে কাছাকাছি ক্যাম্প থেকে, পরস্পরের চেনা। এখনও ওরা কেউই জানে না যে ওদের গন্তব্য কোথায়।

দুটি সুন্দরী এয়ার হস্টেস দু’পাশ দিয়ে খাবারের প্যাকেট আর চা দিয়ে গেল। প্যাকেটের মধ্যে রয়েছে দুটি স্যান্ডুইচ, একটি চপ ও একটি মিষ্টি। সিরাজুল মতিনের দিকে তাকালো, দু’জনে নিঃশব্দে একই কথা বলতে চাইছে। একদিন আগেও ওরা ছিল ক্যাম্পে, সেখানে মানুষের ভিড়ে একেবারে গাদাগাদি, প্রবল বৃষ্টিতে চারপাশে থিকথিকে কাদা আর ব্লিচিং পাউডারের কটু গন্ধ, দু বেলা খিচুড়ি খেতে খেতে জিভে আর কোনো স্বাদ ছিল না। আর এখন তারা এরোপ্লেনের মধ্যে বাৰু সেজে স্যান্ডুইচ খাচ্ছে। ঠিক যেন সিনেমার মতন।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল দমদম বিমানবন্দরে।

এই তা হলে কলকাতা! সিরাজুলের এক মামু একসময় কলকাতায় চাকরি করেছে, পাটিশানের আগে, সেই মামুর কাছ থেকে সে কলকাতা সম্পর্কে অনেক লম্বা-চওড়া গল্প শুনেছে। কলকাতার রাস্তায় নাকি মানুষ হারিয়ে যায়। সারা রাত দোকান খোলা থাকে, পয়সা। দিলে বাঘের দুধও মেলে। ছেলেবেলায় শোনা সেই গল্পের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে শোনা অনেক খবর মিলে যায়। কলকাতায় রয়েছেন তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সবাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী। কলকাতার নকশাল ছেলেরা যখন-তখন পুলিশ খুন করে, রাস্তায় যে-কোনো সময়ে বোমা ফাটে, আবার তারই মধ্যে অনেক গান-বাজনার অনুষ্ঠান হয়। সিরাজুলের প্রিয় গায়ক দেবব্রত বিশ্বাসকে স্বচক্ষে দেখা যায় বহু ফাংশানে।

সিরাজুলের বুক উত্তেজনায় ধক ধক করতে লাগলো। সে যেন কল্পনায় দেখতে পেল, কর্নেল ওসমানী তার কাঁধ চাপড়ে বলছেন, তোমার কথা অনেক শুনেছি, তোমাকে এবার আরও বড় দায়িত্ব নিতে হবে।

সিরাজুলদের তোলা হলো একটা ছাউনি দেওয়া আর্মি ট্রাকে। সেখানে তার মতন আরও পঁচিশ-তিরিশজন যুবক। এরকম পর পর চারটি ট্রাক, সেই ট্রাকের কনভয়টি বিমানবন্দর ছেড়ে ঘুরে গেল ডান দিকে। কলকাতা দেখার জন্য সিরাজুল আর মতিন উৎসুকভাবে চেয়ে রইলো বাইরের দিকে, কিন্তু খানিকক্ষণ যাবার পরই মনে হলো তারা তো শহরে যাচ্ছে না, ক্রমশই রাস্তার দু’ধারে গ্রামের মতন দৃশ্য চোখে পড়ছে। কেন যেন সিরাজুলের ধারণা ছিল যে তাদের দেশের তুলনায় পশ্চিমবাংলা অনেক শুকনো, খটখটে। কিন্তু এখানকার গ্রামের সঙ্গে তো তাদের গ্রামের কোনো তফাত দেখা যাচ্ছে না। একই রকম ধানের ক্ষেত, মাটির বাড়ি, গরুর গাড়ি, রাস্তার দু’ধারে খাল, মাঝে মাঝে নদীর ওপরের ব্রিজ দিয়ে যাচ্ছে তাদের গাড়ি, রাস্তা। দিয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেলে যে-সব মানুষজন যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেককেই মুসলমান বলে চেনা যায়। চোখ পড়ে মসজিদ-মাজার।

তবু তফাত একটা আছে ঠিকই। এখানে যুদ্ধের করাল ছায়া নেই। রাস্তা দিয়ে যে এতগুলো। আর্মি ট্রাক যাচ্ছে, সেদিকে কেউ মুখ তুলে তাকাচ্ছে না।

সিরাজুলদের যে ইন্ডিয়ার মধ্যে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, সে সম্পর্কে তাদের সেকটর কমান্ডারও কিছু বলেননি। তাদের শুধু জানানো হয়েছিল যে ক্যাম্প ‘সি-২ পি’-তে তাদের পাঠানো হচ্ছে একটা বিশেষ ট্রেইনিং-এর জন্য।

প্রায় বিকেলের দিকে ট্রাকগুলি বড় রাস্তা ছেড়ে মাঠের মধ্যে নেমে এসে আরও বেশ কিছুটা দূর যাবার পর একটা গাছপালা ঘেরা জায়গায় থামলো। এখানে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশটি তাঁবু খাটানো রয়েছে, রাইফেলধারী সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে গেটে।

প্রথমে সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে একজন পাঞ্জাবী অফিসার মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানিয়ে বললেন, আজ কোনো কাজ নেই, আজ যার যার থাকার জায়গা বুঝে নিয়ে তারপর বিশ্রাম। এখানে ভলিবল খেলার ব্যবস্থা আছে, যার ইচ্ছে সে খেলাতেও অংশ নিতে পারে। সন্ধের পর ক্যান্টিনে সিনেমা দেখানো হয়। কাল ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে ট্রেনিং শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি একটাই অনুরোধ, তারা যেন কোনোক্রমেই কখনো বিনা অনুমতিতে ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে না যায়।

সিরাজুলেরা চারজনে একটাই তাঁবু পেয়ে গেল। জাহাঙ্গীর উত্তেজিত ভাবে বললো, তোরা জানোস, এই অঞ্চলটার নাম পলাশী। আমি রোড সাইন দেখছি!

মতিন বললো, কোন পলাশী? আমরা ইতিহাসে যে পলাশীর নাম পড়ছি?

জাহাঙ্গীর বললো, আর কোন পলাশী হবে? এইডা একটা হিস্টোরিক্যাল সাইট! বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ ধারেকাছেই হবে মনে লয়।

নির্মল বললো, আসার পথে অনেকগুলা আমগাছ দ্যাখলাম। তাইলে এইডাই বোধ করি সেই পলাশীর আম্রকানন। চল, একটু ঘুইরা ঘাইরা ক্যাম্পাসটা দেখি!

বিছানা-টিছানা সাজিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়লো। এখানের আর্মি ক্যাম্পটি নতুন মনে হয়, সবকিছুই পরিষ্কার, ঝকঝকে। একপাশে গোটা বারো আরমারড় কার, সেগুলির লম্বা লম্বা কামানের নল দেখলে মনে হয়, এখনো একবারও ব্যবহার করা হয়নি। ওরা সেগুলোর খুব। কাছে গেলেও কেউ বাধা দিল না। একদিকে অফিসার্স কোয়াটার, সেখানে খাঁকি হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি পরে ভলিবল খেলছে কয়েকজন অবাঙালী জওয়ান। ওদের দেখে দাড়ি ও মাথার চুলে গিট বাঁধা একজন সদারজী জিজ্ঞেস করলো, আও, খেলা গে?

সিরাজুলরা কেউ তখনই খেলতে চাইলো না, তারা জানালো, তারা শুধু দেখতে এসেছে।

ঘুরতে ঘুরতে ওরা এলো ক্যান্টিনে। এটা একটা লম্বা হলঘরের মতন, ওপরে টালির চাল। একদিকের দেয়ালে সিনেমা দেখবার স্ক্রিন, তার কাছেই টেবিল টেনিস-এর বোর্ড। এখানে সিগারেট, চকলেট, সাবান, ব্লেড ইত্যাদি কিনতে পাওয়া যায়। আগরতলায় প্লেনে ওঠার আগে। সিরাজুলদের প্রত্যেককে দু শো করে ভারতীয় টাকা দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে দেখা গেল সেগুলোর দাম খুবই শস্তা। জাহাঙ্গীর পাঁচ টাকা দিয়ে দশখানা চকলেটবার কিনে ফেললো, তার একটা মুখে দিয়ে ফ্যাকাসে ভাবে হেসে বললো, জীবনে আর কোনোদিন যে চকলেট খামু, তা ভাবি নাই! তোগো মনে হয় নাই যে ক্যাম্পের খিচুড়ি কিংবা হানাদারগো বুলেট খাইয়াই একদিন প্রাণডা বাইরইয়া যাবে?

সেই ক্যান্টিনে বসে ওরা ‘ডক্টর কোটনীস কি অমর কাহানী’ নামে একটি হিন্দী সিনেমা দেখলো, ফিলমের নায়ক একজন ভারতীয় ডাক্তার, সে বিপ্লবের সময় চীনে গিয়েছিল ডাক্তার-নার্সদের একটি দল নিয়ে আহতদের সেবা করতে। খুব মহৎ ব্যাপার, নাচ-গান বিশেষ

দেখতে দেখতে সিরাজুল ফিসফিস করে নির্মলকে জিজ্ঞেস করলো, ইন্ডিয়ানগো সাথে তো চায়নার এখন শত্রুতা, তবু অরা আর্মিব্যারাকে এই সিনেমা দ্যাখায় ক্যান রে?

নির্মল বিজ্ঞের মতন বললো, এইডা অনেক পুরানো বই।

মতিন বললো, নোটিস বোর্ডে দ্যাখলাম, এই শনিবার ‘মোগল-ই-আজম’ দ্যাখাবে, সেই বইয়ের খুব নাম শুনছি।

খাওয়া দাওয়া সেরে ওদের দশটার মধ্যে শুয়ে পড়তে হলো। পাশাপাশি চারখানা নেয়ারের খাঁটিয়া। অন্ধকারের মধ্যে চারটি সিগারেটের আগুন জ্বলছে। গতকাল রাত্রেও ওরা ছিল আখাউড়া সীমান্তের এক ছোট ক্যাম্পের খড়ের শয্যায়, পাশের তাঁবু থেকে কেউ একজন হঠাৎ সাপ সাপ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। তারপর ওরা আর ভালো করে ঘুমোতেই পারেনি। আজ ওদের বিছানায় নতুন নতুন গন্ধ, তাতেও ঘুম আসতে চায় না।

এক সময় মতিন বললো, আইজ যে আরমারড় কারগুলো দ্যাখলাম, ঐগুলা দেইখ্যা আমার কী মনে হইতাছিল জানোস? ঢাকার রাস্তায় এই গাড়িগুলা দ্যাখলেই ভয়ে প্রাণ কাঁপতো। এখন গায়ে হাত বুলাইলাম। একই তো গাড়ি!

জাহাঙ্গীর বললো, এই মুর্শিদাবাদ ডিস্ট্রিক্টে কোথায় জানি আমার বাবায় পোস্টমাস্টার আছিলেন। পার্টিশানের পর অপশান দিয়া ঐ ধারে চইল্যা গ্যালেন। এইখানে নাকি আমাগো বাড়িও আছিল। বাবা-মায় যে জায়গা ছাইড়া পলাইয়া গ্যালেন, আমি আবার সেহানেই আসলাম ট্রেইনিং নিতে। মজার ব্যাপার না?

সিরাজুল বললো, সিক্সটি ফাইভের ওয়ারের দিনগুলার কথা তোগো মনে আছে?

নির্মল বললো, হ, সেই সময় আমি অ্যারেস্ট হইছিলাম।

সিরাজুল বললো, সেই সিক্সটি ফাইভে এই ইন্ডিয়ান আর্মি আমাগো চোখে ছিল কী দারুণ দুশমন। আর এখন তাগো ক্যাম্পেই আমরা শুইয়া আছি। হুঁ, মজা না মজা! অবস্থা ক্যামনে বদলায়!

মতিন বললো, ইন্ডিয়ান আর্মির বড় বড় অফিসার সবই তো দেখি পাঞ্জাবী! আমাগো ঐদিকের মেজর-মুজর, ক্যাপ্টেন-ম্যাপ্টেনগুলাও পাঞ্জাবী! কে যে কখন ফ্রেন্ড আর কখন এনিমি হয়, তার ঠিক নাই!

জাহাঙ্গীর বললো, পঁয়ষট্টির সেই যুদ্ধের ফ্যাচাংয়ে আমি লাহোরে আটকা পড়ছিলাম, ইন্ডিয়ান আর্মির বোমার তা খাইয়া মইরা যাইতেই তো পারতাম তখন। আর আইজ ইন্ডিয়ান আর্মি ক্যাম্পে মুর্গীর মাংস আর রুটি খাইলাম। সবই কপাল!

মতিন বললো, আবার কোনদিন আমাগো ইন্ডিয়ান আর্মির এগেইনস্টেই লড়াই করতে হবে কিনা তাই-ই বা কে জানে!

নির্মল বললো, মাংসে বেশি ঝাল দিছিল, নারে? সিরাজুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরলো। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেছে মনিরার মুখখানা। কী ঝাল খেতেই না ভালোবাসতো মেয়েটা! সে বলতো, বেশ ঝাল দিলে শুধু কৰ্মী শাক দিয়েই এক থাল ভাত খাওন যায়!

পরদিন ভোর পৌনে পাঁচটায় বিউগল বাজলো। আগেই নির্দেশ দেওয়া ছিল, ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নিয়ে সামনের মাঠে ফল ইন করতে হবে। বাইরে ভালো করে আলো। ফোটেনি, তবু ওরা বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে শুরু করে দিল হুড়োহুড়ি।

প্রথম কয়েকদিন ফিজিক্যাল ট্রেইনিং আর দৌড় করানো হলো ওদের। তারপর এক সপ্তাহ ধরে শুধু সাঁতার। ক্যাম্পের পাশেই একটা বড় পুকুর আছে, কিছুদূরে রয়েছে একটা সদ্য কাটা খাল, এই বর্ষার জলে একেবারে টইটম্বুর ভরা। ছোট ছোট দলে ভাগ করে সাঁতারের প্রতিযোগিতা হয়। একজন সুবেদার স্টপ ওয়াচ নিয়ে রেকর্ড করে, কে কতক্ষণ ডুব দিয়ে থাকতে পারে জলের তলায়। কিংবা ডুবো সাঁতারে কে কতখানি দূরে যায়।

এদিককার পানি একটু ভারি, সাঁতার কাটার পক্ষে তেমন সুবিধেজনক নয়, তবু সিরাজুল কয়েকদিনেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। ডুবসাঁতারে তার রেকর্ড কেউ ছুঁতে পারে না। গোটা ক্যাম্পের মধ্যে সিরাজুল চ্যাম্পিয়ান।

হঠাৎ একদিন মাঝ রাত্রে ওদের ঘুম থেকে তুলে এনে দশ বারোজনের একটি দলকে চাপানো হলে গাড়িতে। মিনিট পনেরো পর একটা নদীর ধারে গাড়ি থামলো। চতুর্দিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, এর মধ্যেই তাদের সাঁতরে নদী পার হতে হবে। প্রত্যেককে দেওয়া হলো এক জোড়া করে ফিন, এই ফিন পায়ে বেঁধে নিলে সাঁতারের পরিশ্রম কম হয়, শব্দও কম হয়।

পর পর কয়েকটা রাত নদীতে সাঁতার কাটার পর এক রাতে একটা চমকপ্রদ কাণ্ড হলো। সে। রাতে দেখা গেল, নদীর মাঝখানে স্থির হয়ে রয়েছে এক লঞ্চ, সেটা আলোর মালায় সাজানো। চতুর্দিকের নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে সেটাকে দেখাচ্ছে যেন স্বপ্নতরীর মতন। সেটার দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

ব্রিগেডিয়ার জ্ঞান সিং প্রত্যেকের হাতে লিমপেট মাইন দিয়ে বললেন, নিঃশব্দে মাঝনদীতে সাঁতরে গিয়ে ঐ লঞ্চের গায়ে সেগুলো আটকে দিয়ে আসতে হবে। সাবধান, এটাকে খেলা মনে করো না। ঐ লঞ্চের লোকেরা যেন কিছু টের না পায়।

চারজনের ছোট দলটির নেতা নির্বাচিত হলো সিরাজুল। যাওয়া-আসা মিলিয়ে সময় ঠিক আধ ঘণ্টা।

কাজটা খুব শক্ত মনে হলো না সিরাজুলের। এই নদীর নাম ভাগীরথী, আবার স্থানীয় লোক একেই বলে গঙ্গা। স্রোতের টান বেশী নেই। সিরাজুল গায়ে তেল চাপড়াতে লাগলো। পানিতে নামার আগে তার বরাবর গায়ে সর্ষের তেল মাখা অভ্যেস।

পাঁচজনে নিঃশব্দে সাঁতরে গিয়ে লঞ্চের গায়ে লিমপেট মাইন আটকে দিল স্বচ্ছন্দে। লঞ্চের মধ্যে খুব খানাপিনা নাচ গান হচ্ছে মনে হয়, কেউ ওদের দেখতে পায়নি। কাজ সেরে ওরা ফিরতে শুরু করার দু’তিন মিনিট পরেই অকস্মাৎ যেন বজ গর্জন শুরু হয়ে গেল। এই আওয়াজ সিরাজুলের খুব চেনা। মেশিনগানের ফায়ারিং হচ্ছে। লঞ্চ থেকে জোরালো আলোও এসে পড়লো তাদের দিকে। ডেকের ওপর ছোটাছুটি করছে অনেক মানুষের ছায়া।

সিরাজুল প্রথমটায় হকচকিয়ে গেল। কী ব্যাপার, এটা কি পাকিস্তানী জাহাজ? আজ রাতে সত্যিকারের কোনো অপারেশান? তাদের কিছুই বলা হয় নি! এখন প্রাণে বাঁচার একমাত্র উপায় ডুবসাঁতার।

একবার মাথা তুলতেই সিরাজুল মতিনের কাতর গলা শুনতে পেল, উঃ মইলাম রে, মইলাম!

কাছেই আর একটা মাথা দেখে সিরাজুল বললো, নির্মল, ওরে ধর! মাথা ডুবাইয়া থাক।

অতি কষ্টে ওরা পাড়ে এসে পৌঁছে আরও অবাক হলো। সুবেদার জ্ঞান সিং নেই, গাড়ি নেই, কেউ নেই। ওদের কি মৃত ভেবে অন্যরা চলে গেছে? জাহাঙ্গীর একটু দূরে চিৎপাত হয়ে শুয়ে হাঁপাচ্ছে, কিন্তু তার গুলি লাগেনি, একমাত্র আহত হয়েছে মতিন। এ জায়গাটা যদি পাকিস্তানী সৈন্যদের এলাকা হয়, তাহলে এখানে বসে থাকা একটুও নিরাপদ নয়। মতিনকে বয়ে নিয়ে ওরা ছুটলো।

যে রাস্তাটা দিয়ে গাড়ি এসেছিল, আন্দাজে সেই রাস্তা বুঝে বুঝে ওরা এগোতে লাগলো। হাতে কোনো অস্ত্র নেই বলেই সিরাজুল ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছে। শত্রুর মুখোমুখি পড়ে গেলে অন্তত একজনকেও খতম করা যাবে না?

এক সময় দেখা গেল তাদের ক্যাম্পের আলো। গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে ব্রিগেডিয়ার জ্ঞান সিং, সে এগিয়ে এসে সিরাজুলকে জাপটে ধরে বললো, ব্রাভো! ব্রাভো! তুমনে কামাল কিয়া, সিরাজুল! এক্সেলেন্ট টাইমিং!

সবটাই ট্রেইনিং! গুলি থেকে আত্মরক্ষা করা, অন্ধকার রাস্তা খুঁজে ক্যাম্পে আসা, এই সবকিছুই। মতিনের আঘাত গুরুতর নয়, সে ভয় পেয়েছে বেশী। মেশিনগানের ফায়ারিং হয়েছে আকাশের দিকে, আর ওদের দিকে ছোঁড়া হয়েছে ছররা। তারই একটা লেগেছে মতিনের পায়ে। মেশিনগানের গুলি ভেবে সে এরমধ্যেই প্রায় মুমূর্য হয়ে পড়েছিল।

ব্রগেডিয়ার জ্ঞান সিং বললেন, আজ দারুণ আনন্দের রাত। এইমাত্র মেসেজ এসেছে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ফ্রেন্ডশীপ ট্রিটি সাইনড হয়েছে। কুড়ি বৎসরের মৈত্রীচুক্তি। গ্রোমিকো দিল্লিতে এসে ঘোষণা করেছেন, পৃথিবীর যে-কোনো দেশ ভারতকে আক্রমণ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে এসে দাঁড়াবে।

অনেক রাত পর্যন্ত হৈ চৈ করে মিষ্টি খাওয়া হলো। ভাংরা নাচ নেচে দেখালো কয়েকজন জওয়ান। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলা গান গাইলো সমস্বরে।

ঠিক একমাস পাঁচ দিন পর ট্রেনিং সমাপ্ত করে সিরাজুলদের দলটাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কলকাতায়। শেষের কয়েকটা দিন সিরাজুল অস্থির বোধ করছিল, এদের এখানে তার সাঁতারের ব্যাপারে আর কিছু শেখার নেই। এই ক্যাম্পে ভালো খাওয়াদাওয়া হয় বটে, কিন্তু সে রণাঙ্গনে। ফিরে যেতে চায়। মনিরার কথা মনে পড়লেই শক্ত হয়ে ওঠে তার চোয়াল।

কলকাতায় এসে হঠাৎ তারা ছুটি পেয়ে গেল। তাদের রাখা হলো বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটা ফাঁকা ফ্ল্যাটবাড়িতে, যাওয়া-আসার কোনো কড়াকড়ি নেই, ভোরে উঠেই ট্রেইনিং-এর বালাই নেই, শুধু খাও-দাও, ঘুমোও আর ইচ্ছেমতন ঘুরে বেরাও।

সিরাজুলেরা বাংলাদেশ মিশন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, ভিকটোরিয়া মেমোরিয়াল, নাখোদা মসজিদ, জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বাড়ি দেখলো, চিৎপুরের রয়াল হোটেলের বিখ্যাত চাঁপ ও রুমালি রুটির স্বাদ নিল। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করার খুব সাধ সিরাজুলের, বাংলাদেশ মিশনের একজন কর্মীকে ধরে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও ঠিক হলো দু’দিন পরে। সেই কর্মীটি বললো, আইজ ময়দানে কলকাতার সাহিত্যিক-শিল্পীদের খুব বড় মিটিং আছে, দ্যাখতে যাইবেন নাকি?.বাংলাদেশের সাপোর্টে…

সেখান দেবব্রত বিশ্বাসকে দেখতে পাওয়া যেতে পারে এই আশায় সিরাজুল যেতে রাজি হলো। সিরাজুলরা পৌঁছোবার আগেই সভা শুরু হয়ে গেছে, বক্তৃতা দিচ্ছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সে বক্তৃতার একটি অক্ষরও শোনা হলো না সিরাজুলের। বড়রাস্তা পেরিয়ে, টাটা বিল্ডিং-এর উল্টোদিকের ময়দানে সবে মাত্র পা দিয়েছে সে, এমন সময় এক নারী তাকে জিজ্ঞেস করলো, এই, তুমি সিরাজুল না?

জীবনে যেন এতটা কখনো চমকে ওঠেনি সিরাজুল। বস্তৃত কলকাতায় এসে একবারও মঞ্জুর কথা মনে পড়েনি তার। মনে পড়লে তো এসেই সে মঞ্জুর খোঁজ করতো। গত কয়েক মাসে মনিরা ছাড়া আর কোনো নারীর কথা তার চিন্তায় স্থান পায়নি। সেইজন্যে মঞ্জুই কে প্রথম দেখেছে! এখন সিরাজুলের চোখের সামনে থেকে যেন আর সবকিছু মুছে গেল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক পরমা রূপবতী রমণী। শুধু রমণী নয়, সিরাজুলের চোখে দয়াবতীও, মনিরাকে মঞ্জু ছোট বোনের মতন ভালাবাসতো, তাদের দৈন-অপমানের দিনে মঞ্জু তাদের কত আপন করে নিয়েছে।

যেন কৃতজ্ঞতার শোধ দেবার জন্যই সিরাজুল প্রথমেই বললো, মঞ্জুভাবী! বাবুলভাই ভালো আছে! আপনারা কোথায় উঠেছেন! কোনো অসুবিধা নাই তো!

যেন একজন নিকট-আত্মীয়কে দেখেছে মঞ্জু, আনন্দে তার চোখে জল এসে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, সিরাজুল, তুই কলকাতায় আসলি কবে? আমাদের সাথে দেখা করিস নাই!

সিরাজুল বললো, আমি তো জানি না, আপনেরা কোথায় আছেন।

মঞ্জু অভিমানের সঙ্গে বললো, বাংলাদেশ মিশনে মামুনমামাকে সকলেই চেনে। সিরাজুল, তোর সাথে ওনার দেখা হয়েছিল? উনি কোথায়?

–ভাবী, বাবুলভাই আর আমি এক ক্যাম্পে আছি। বাবুলভাই এখনে ‘ভালো আছেন, সেই যে চোট লেগেছিল, এক্কেবারে সেরে উঠেছেন।

–কিসের চোট লেগেছিল?

–ও, তাও আপনি জানেন না? জানবেনই বা ক্যামনে। সে এমন কিছু না, পায়ে গুলি লেগেছিল। এখন বাবুলভাই ফ্রিডম ফাইটার। অনেক চেইঞ্জ হয়ে গেছে মানুষটার।

–তুই একা আসছোস, সিরাজুল? মনিরা কই?

–মনিরা?

সিরাজুল উদ্ভ্রান্তের মতন তাকালো তার সঙ্গী মতিন, নির্মল, জাহাঙ্গীরের দিকে। তারা চোখের ইসারায় মঞ্জুকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করলো, কিন্তু মঞ্জু বুঝলো না। সে আবার সরল ভাবে জিজ্ঞেস করলো, মনিরা আসে নাই? তারে কোথায় রেখে আসলি? স্থান-কাল ভুলে গেল সিরাজুল। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো মাটিতে!

তাকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে, মিটিং থেকে খানিকটা দূরে একটা বড় রেইনট্রি গাছের তলায় বসলো এই ছোট দলটি। তারপর দুঃখের কাহিনী বিনিময় হতে লাগলো। সিরাজুল আর মঞ্জু দু’জনেই কেঁদে ভাসালো বুক।

একটু পরে মজুদের উঠতে হলো, আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবেন মামুন। সিরাজুলদেরও সন্ধেবেলা একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে বি এস এফ-এর একজন অফিসারের সঙ্গে। তাই ঠিক হলো, আগামীকাল দুপুরে সিরাজুলরা চারজনেই খেতে যাবে মঞ্জুদের কাছে, মঞ্জু বাবুল চৌধুরীর নামে চিঠি লিখে দেবে। চোখের জল মুছে ওরা চলে গেল দু দিকে।

সিরাজুলরা নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরতেই দেখলো বি এস এফ-এর অফিসার মেজর যশোবন্ত চোপরা আগে থেকেই বসে আছে। ওদের দেখেই বললো, অর্ডার এসে গেছে, প্যাক আপ ইয়োর থিংস! আজ রাতেই এয়ার ফোর্সের প্লেনে তোমাদের যেতে হবে।

সিরাজুল উত্তেজিত ভাবে বললো, আজ রাতেই যেতে হবে কেন? কোথায় যাবো? কোথায় যাবো?

মেজর চোপরা বললো, নো কোয়েশ্চেন! অর্ডার এসেছে যেতে হবে! ব্রিগেডিয়ার জ্ঞান সিং যেরকম হাসিহাসি মানুষ, মেজর চোপরা সেরকম নয়। তার নাকের নীচে মস্ত বড় মোচ, ঠোঁটের ভঙ্গিতে উৎকট গাম্ভীর্য।

সিরাজুলরা আরও একটা দিন কলকাতায় থেকে যাবার জন্য সময় চাইলেও সে সেই অনুরোধে কর্ণপাতও করলো না। তখন সিরাজুল প্রায় বিদ্রোহ করে বলে উঠলো, বাংলাদেশ সরকার কিংবা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর কোনো কমাণ্ডারের নির্দেশ না পেলে সে মেজর চোপরার আদেশ মানতে বাধ্য নয়।

মেজর চোপরা এবার সামান্য একটু হাসলো। তারপর বললো, শোনো, অপারেশন জ্যাকপট শুরু হবে কাল থেকে। তোমাদের ট্রেইনিং দেওয়া হয়েছে সেইজন্য। তোমরা যদি এবার অপারেশানে যোগ দিতে না চাও, ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাও, তাহলে কি তোমাদের জোর করা হবে? মোটেই না! তোমরা তো ইন্ডিয়ান আর্মি কিংবা বি এস এফ-এর রিক্রুট নও। তোমরা মুক্তিযোদ্ধা, তোমরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে এসেছো, এখন যদি যুদ্ধ করতে না চাও, করো না। তোমরা ফ্রি, যেখানে খুশি যেতে পারো!

এ যে উল্টোরকম চাপ। তারা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে কে বললো? জাহাঙ্গীর আর নির্মল সিরাজুলের কাঁধে হাত রাখলো।

সিরাজুল বললো, আমরা নিশ্চয়ই অপারেশানে যেতে চাই। আমরা শুধু একটা দিন সময় চাইছি।

মেজর চোপরা বললো, নো ওয়ে! শোনো, পূর্ণিমা, জোয়ার-ভাটা, আবহাওয়া, বাতাসের গতি এইসব অনেক কিছু ক্যালকুলেশন করে টাইমিং ঠিক হয়। অপারেশান জ্যাকপট পরিচালনা করবে তোমাদের মুক্তিবাহিনীরই কমান্ডাররা, আমরা নয়। আমরা যুদ্ধে নামিনি। তোমরা চেয়েছে বলে আমরা তোমাদের ট্রেইনিং দিয়ে সাহায্য করছি, জায়গামতন পৌঁছে দিচ্ছি। এক শো পঞ্চাশজনকে ট্রেইনিং দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ফাইনাল সিলেকশান করা হয়েছে ষাটজনকে, তোমরা তার মধ্যে আছো। তোমরা যেতে না চাও, কোনো অসুবিধে নেই, কলকাতায় থাকো, ফুর্তি করো। অন্য চারজন যাবে। তোমাদের আর কোনোদিনই ডাকা হবে না।

এরপর আর ক্ষীণতম আপত্তিরও প্রশ্ন ওঠে না। জাহাঙ্গীর জিজ্ঞেস করলো, আমাদের কখন রেডি হতে হবে, মেজর সাহেব?

সিরাজুলের মনটা যথেষ্ট দমে গেল। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা হলো না? মঞ্জুভাবীর সঙ্গেও আর দেখা হবে না?

অনেক কাকুতি-মিনতি করে এইটুকু শুধু অনুমতি পাওয়া গেল যে এয়ারপোর্ট যাবার পথে ওদের গাড়িটা মদের বাড়ির সামনে থামানো হবে। সেখানে সময় পাওয়া যাবে মাত্র দশ মিনিট।

মামুন হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছেন ঘণ্টাখানেক আগে। কোনো দরকার না থাকলেও তাঁর গায়ে একটা চাঁদর মুড়ি দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিনি জোড়াসনে বসে আছেন খাটের ওপর। মামুন সম্পাদক থাকার সময় দিনকাল’ অফিসে কিছুদিন প্রফ রিডারের চাকরি করেছিল। সিরাজুল। সে এসে মামুনের দুই হাঁটু ছুঁয়ে অভিবাদন করলো। তার দেখাদেখি অন্যরাও।

সিরাজুল মঞ্জুকে বললো, ভাবী, এবারে আর দাওয়াত খাওয়া হলো না। ইনসাল্লা, কলকাতায় আবার যখন আসবো, কিংবা আপনেরা ঢাকায় গ্যালে একটুও সময় নাই, এয়ারফোর্সের প্লেন আমাদের জন্য এক মিনিটও দেরি করবে না! আপনি বাবুল ভাইকে জলদি জলদি চিঠি লিখে দ্যান।

মামুন বিস্ফারিত চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরা মুক্তিযোদ্ধা? এত কাছ থেকে তিনি কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেননি। অল্প সময়ের নোটিসে এয়ারফোর্সের বিমানে এদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার মানে এরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে যাচ্ছে। তিনি শুনেছেন, ১৪ আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতার দিনে সারা বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী একসঙ্গে খুব বড় রকম আঘাত

মামুন অসুস্থ, বয়েসও হয়েছে, তা ছাড়া তিনি লেখক মানুষ, রাইফেল নিয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে তিনি পারতেন না। তবু আজ তাঁর আত্মার এক একটা টুকরো যেন এই চারটি যুবকের সঙ্গে রণাঙ্গনে যেতে চাইছে।

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, বাবুল চৌধুরীকে তুই দেখেছিস? সে ভালো আছে! এ খবর শুনে কী যে শান্তি পাইলাম! আর আলতাফ কোথায়? শুনেছিলাম, সেও একজন ফ্রিডম ফাইটার?

সিরাজুল বললো, শখের! আলতাফ সাহেব প্রথম প্রথম দুই চারদিন খুব লাফালাফি করছিলেন, তেনার পায়ের কাছে একদিন শেল ফাটলো, এমন কিছু লাগে নাই, তাইতেই ওনার চক্ষু চড়কগাছ! দশ বারোদিন হাসপাতালে রইলেন, তারপর কোথায় যে উধাও হইলেন, কেউ জানে না। তার কোনো খবর নাই। কিন্তু বাবুল ভাই সক্কলরে অবাক কইরা দিচ্ছেন। শরীরে যেন এক বিন্দু ভয়ডর নাই। প্রত্যেক অ্যাকশানে সামনে থাকেন–

জাহাঙ্গীর বললো, সত্যিই, বাবুল চৌধুরীর এই চেইঞ্জ না দ্যাখলে বিশ্বাস করা যায় না। অসম্ভব সাহসী মানুষ!

মঞ্জু ওদের একেবারে ধার ঘেঁষে বসে সব শুনছে, তার চোখে মুখে আনন্দ-গর্ব-বেদনা মাখানো। অতিদ্রত বাবুলকে চিঠি লিখছে সে, তার মধ্যে চার পাঁচ বার আছে, তুমি ভালো থেকো, তুমি ভালো থেকো।

চিঠিখানা দেবার আগে সে সিরাজুলকে জিজ্ঞেস করলো, তোরা এমন হুট করে চলে যাচ্ছিস। কোনো বিপদ হবে না তো?

সিরাজুল হেসে বললো, বিপদ আর কী! জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন! দ্যান চিঠিটা, আর দেরি করা যাবে না!

চাঁদরটা ফেলে খাট থেকে নেমে এসে মামুন ওদের গায়ে হাত বুলোতে লাগলেন। এরা যেন তাঁরই সন্তান, এদের তিনি পাঠাচ্ছেন সাঙ্ঘাতিক বিপদের মুখে।

সিরাজুল বললেন, মামুনসাহেব, দোয়া করবেন। আমরা যেন কার্যসিদ্ধি করে আসতে পারি।

মামুন হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি কী বললেন তা বোঝাই গেল না। অসুখ তাঁকে দুর্বল করে ফেলেছে, তাঁকে এভাবে কাঁদতে আগে কেউ দেখেনি।

নীচে গাড়িতে হর্ন দিয়েছে, আর সময় নেই, মঞ্জুর কাছ থেকে অসমাপ্ত চিঠিটা প্রায় কেড়েই নিতে গেল সিরাজুল। কোনোরকমে নিজের নামটি লিখে, একটা খামে ভরে মঞ্জু ভারী গলায় বললো, ওরে দিস, দিয়া বলিস যে, কোনো উপায়ে যেন আমারে একটা উত্তর পাঠায়।

সিরাজুল মাথা নেড়ে পেছনে ফিরতে যেতেই মঞ্জু তার হাত ধরে বললো, মনিরারে তুই ঠিক ফিরা পাবি। আমি কইলাম, সে ফিরা আসবে!

অন্যরা আগেই নামতে শুরু করেছিল, সিরাজুল দৌড় মারলো সিঁড়ির দিকে।

এয়ারফোর্সের বিমান আগরতলায় পৌঁছে দেবার পর সেই রাত্রেই সিরাজুলদের নিয়ে যাওয়া হলো হরিণা ক্যাম্পে। সিরাজুলরা নিজেদের ঘাঁটিতে একটুক্ষণের জন্যও যেতে পারলো না, সুতরাং বাবুল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হবারও প্রশ্ন রইলো না।

অপারেশন জ্যাকপটের কার্যসূচি হলো চট্টগ্রাম ও মঙ্গলার সামুদ্রিক বন্দর দুটিতে এবং চাঁদপুর, দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জ, আসুগঞ্জ, নগরবাড়ি, খুলনা, বরিশাল, গোয়ালন্দ ও ফুলছড়ি ঘাট ও আরিচা ঘাটের নদী বন্দরগুলির ওপর সরাসরি আক্রমণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজ, চট্টগ্রাম বন্দরে আঘাত হানার দায়িত্ব দেওয়া হলো যে তিনটি দলকে, তার একটির কমান্ডার নিযুক্ত হলো সিরাজুল। সে তার বন্ধুদের সঙ্গে পেল।

পরদিন সকাল থেকেই যাত্রা শুরু। সঙ্গে বেশ কিছু মালপত্র ও একজন গাইড, চারদিনের হাঁটা পথ। গাইডটা কিছুটা এলাকা পার করে দিলে আবার আসবে অন্য গাইড। পূর্ব নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মতন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে গেরিলারা অপেক্ষা করছে তাদের নিরাপদে পার করে দেওয়ার জন্য। হরিণা ক্যাম্পেই সিরাজুল আভাস পেয়েছিল যে ধরা পড়ার সম্ভাবনা এত বেশি যে তাদের বিকল্প আরও দুটি দল তৈরি রাখা হয়েছে। একদল ধরা পড়লে অন্য দল এগিয়ে যাবে। তাদের পৌঁছোতে হবে চট্টগ্রাম শহর পার হয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপারে চরলাক্ষায়।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম শহরটা পার হওয়াই সবচেয়ে বিপজ্জনক। সন্ধে থেকেই কারফিউ, তাই। রাত্তিরে বেরুনো যাবে না। দিনের বেলাতেও মেশিনগান ফিট করা অনেকগুলো জিপ সারা শহর টহল দিচ্ছে, পথের মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট, যখন-তখন তল্লাশী হয়, কারুকে একটু সন্দেহ হলেই আর বিচারের প্রশ্ন নেই, তৎক্ষণাৎ সেখানেই গুলি করে মারে।

তবু, এখনো চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে গেরিলারা অতি গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। তারা যোগাড় করে রেখেছিল একটা অ্যাম্বুলেন্স ভ্যান, তাতে সিরাজুলদের ভরে নিয়ে, ভোরবেলা কারফিউ শেষ হতেই সেটা রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। সাতখানা চেকপোস্ট পেরিয়ে গেল তারা, কেউ সন্দেহ করলো না।

অ্যাম্বুলেন্স ভ্যানটা ওদের নামিয়ে দিল নদীর ধারে একটা বাজারের কাছে। এর মধ্যেই সিরাজুলরা পোশাক বদলে নিয়েছিল। লুঙ্গি আর ছেঁড়া গেঞ্জি, কাঁধে গামছা। প্রত্যেকের সঙ্গে একটা বড় আকারের ধামা। বাজারে নেমে ওরা লাউ, কুমরো, কচুর শাক, কুমড়োর শাক, কিছু পুঁটি বাঁশপাতা মাছ কিনল। যেন ওরা সাধারণ গ্রাম্য মানুষ, হাট-বাজার সেরে বাড়ি ফিরছে।

ফেরীঘাটেও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে নিয়ে পাহারা দিচ্ছে পাক আর্মি, তাদের নাকের ডগা দিয়ে পেরিয়ে গিয়ে ওরা উঠে পড়লো নৌকোয়। কর্ণফুলীতে ফেরী নৌকোটা ভেসে পড়বার পর ওরা নিশ্চিন্তে বিড়ি ধরালো।

বাজার এখনও ভালো করে জমে ওঠেনি, গ্রাম থেকে খদ্দেররা সবে মাত্র আসতে শুরু করেছে, ফেরার যাত্রী কম। নৌকোতে সিরাজুলরা সাতজন, কয়েকজন স্ত্রীলোক ও শিশু, দু’জন মাঝি ছাড়া আর একটি বলিষ্ঠকায় লোক। মথার চুল ছোট করে ছাঁটা, গায়ে একটা ঝ্যালঝেলে সিল্কের পাঞ্জাবি, দু’ হাতের আঙুলে গোটা ছয়েক সোনার আংটি, তার একটি দাঁতও সোনা দিয়ে বাঁধানো।

সেই লোকটি সিরাজুলদের মতন একই বয়েসী সাতজন জোয়ান ছেলের দিকে বারবার চোখ বুলিয়ে কিছু যেন সন্দেহ করলো। লুঙ্গির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কোমর চুলকোতে চুলকোতে সে জিজ্ঞেস করলো, এই, তোগো বাড়ি কোন গেরামে?

আগে থেকে মুখস্থই ছিল, চরলাক্ষা বাদ দিয়ে আর তিনটে গ্রামের নাম বললো ওরা। লোকটি একটুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে হাসলো। তারপর ওদের একজনের ধামা থেকে একটা লাউ তুলে জিজ্ঞেস করলো, এইডার দাম কয় পয়সা?

সিরাজুল বিনীত ভাবে বললো, এইগুলা বিক্রির না কী, আমরা খরিদ কইর‍্যা আনছি!

লোকটি সেকথা গ্রাহ্য না করে ধামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কুমড়ো শাক টেনে তুললো। তারপর বললো, লালশায় থাকোস আর আমারে চেনোস না?

লোকটি কথা বলে যাচ্ছে খাস চিটাগাং-এর উচ্চারণে, সিরাজুলদের গলায় সে টান আসছে। তা ছাড়া লোকটি অভদ্রের মতন অন্যের ধামায় হাত দিয়ে একটার পর একটা জিনিস তুলে নিচ্ছে। অন্যের জিনিস জোর করে নিয়ে নেবার স্বভাব আছে নিশ্চয়ই। লোকটিকে প্রথমে মনে হয়েছিল রাজাকার, এখন মনে হচ্ছে শান্তি কমিটির কেউকেটা। এদের এড়িয়ে যাবারই কথা। ছিল, কিন্তু লোকটি যেভাবে ধামার মধ্যে হাত ঢোকাচ্ছে, তাতে এক্ষুনি অন্য কিছুর সন্ধান পেয়ে যাবে। লাউ-কুমরো, শাক-পাতা দিয়ে ঢাকা দেওয়া আছে বস্তায় বাঁধা লিমপেট মাইন, ফিন, মেশিনগান ও ট্রানজিস্টার।

লোকটির ঠিক পেছনেই বসে আছে নির্মল। সিরাজুল তাকে চোখের সামান্য ইঙ্গিত করতেই নির্মল সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড জোরে লোকটির ঘাড়ে একটা রদ্দা কষালো, তারপর এক ধাক্কায় ফেলে দিল নদীতে। লোকটি হাবুডুবু খেয়ে একবার মাথা তুলতেই সিরাজুল প্রায়। কোমর পর্যন্ত ঝুঁকে ওর চুলের মুঠি ধরে ঠেসে রাখলো।

লোকটি জলের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড মাছের মতন দাপাচ্ছে, সিরাজুল তাকে একবারও নিশ্বাস নেবার সুযোগ দিল না। কিন্তু সিরাজুলের মুখে কোনো উত্তেজনা নেই, তার বজ্রকঠিন ডান হাতের মুষ্টিই লোকটিকে চেপে রেখেছে নদীতে।

জাহাঙ্গীর স্ত্রীলোকদের দিকে হাতজোড় করে বললো, মা জননীরা ভয় পাবেন না। ওড়া একটা নামরুদ।

তারপর মাঝিদের দিকে তাকিয়ে বললো, আপনেরা থামলেন ক্যান, চালান, চালান!

একটু পরেই সিরাজুলরা নৌকো বদল করলো। বেশ খানিকটা ঘুরে দুপুরের ঠা-ঠা রোদে এসে নামলো চরলাক্ষায়। সেখানে দুটি কুড়ে ঘরের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই বাড়িদুটি ওদের জন্য প্রস্তুত।

মতিন আর জাহাঙ্গীর নৌকোর ঘটনাটা নিয়ে আলোচনা করতে যেতেই সিরাজুল বললো, ঐ বিষয়ে আর একটা কথা না। মনে কর, কিছুই ঘটে নাই। এহানে শুধু আমরা খাবো-দাবো আর ঘুমাবো। আয় গান শুনি।

সে ট্রানজিস্টার রেডিও খুলে সত্যিই ভারতীয় বেতারের গান শুনতে লাগলো। সারাদিন সেই রেডিও কানের কাছে নিয়ে শুয়ে শুয়ে কাটালো সিরাজুল। অন্যরা কেউ রান্না। করলো, কেউ ঘুমোলো। রাতটা কেটে গেল নিরুপদ্রবে। পরদিনও গান শুনতে শুনতে হঠাৎ এক সময় একটা গান শুনে লাফিয়ে উঠলো সিরাজুল। পুরোনো আমলের একটা বাংলা গান বাজছে, “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি”। সিরাজুল ফিসফিস করে বলে উঠলো, সব রেডি হয়ে নে। আর টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স। আইজই আর একটা দল আইস্যা পড়বে!

এদের মধ্যে জাহাঙ্গীরই একটু বেশী লেখাপড়া করেছে। সে জানে যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নমন্ডি উপকূলে যখন মিত্র বাহিনী ল্যান্ড করে, তখন লন্ডনের বি বি সি থেকে এরকম সাংকেতিক গান বাজানো হয়েছিল। কিন্তু একটা গান তো নয়, চব্বিশ ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় আর একটি গান বাজবার কথা। সেই দ্বিতীয় গানটি কী?

সিরাজুল বললো, সেটা আমাকে জানানো হয়নি। অন্য দলের কমান্ডার সেটা জানে।

তারপর সে ব্যাগ থেকে একটা খাম বার করে বললো, দ্যাখ, যদি আমি আর ফিরতে না পারি, তাইলে এই চিঠিখান বাবুল চৌধুরীরে তোরা পৌঁছাইয়া দিস।

জাহাঙ্গীর বললো, এডা কী কও মিঞা? তুমি না ফেরলে আমরাই বা ফেরবো ক্যামনে?

সিরাজুল হেসে বললো, গেরিলাদের টার্গেটে পৌঁছানোর থিকাও ফেরা অনেক কঠিন।

সন্ধের পর অন্যদিক থেকে নদীপথে এসে পৌঁছোলো দ্বিতীয় একটি দল। তার কমান্ডার বাচ্চু। সিরাজুলদের তুলনায় তারা অনেকগুলি বিপদ পার হয়ে এসেছে, খুবই ক্লান্ত, এসেই তারা ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন দুপুরে বাচ্চু ট্রানজিস্টার শুনতে শুনতে এক সময় বললো, আইজ রাত একটায় জিরো আওয়ার! তখন সাইগলের একটি অতি পরিচিত গান বাজছে, “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান, তার বদলে আমি চাইনি কোনো দান…”।

সন্ধের আগে খেয়ে নিয়ে সবাই ঘুমিয়ে নিল কিছুটা। তারপর এক সময় উঠে বেশ কিছুটা হেঁটে এসে ঠিক রাত একটায় তারা নদীতে নেমে পড়লো। জোয়ার শেষ, এখনো ভাটা শুরু হয়নি, নদী এখন শান্ত। এদিকে অন্ধকার, ওদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলো আলোয় ঝলমল করছে। নদীর ওপরেও অনেকখানি সার্চ লাইটে আলোকিত, কোনো রকম নৌকো কিংবা জলযান দেখলেই শান্ত্রীদের গুলি ছুটে আসবে।

এখন যারা বন্দর পাহারা দিচ্ছে, তাদের ডিউটি শেষ রাত দুটোয়। তখন আসবে নতুন দল। ডিউটির শেষ দিকটায় প্রহরীরা খানিকটা অসতর্ক ও অলস হয়ে পড়ে, ঘুম তাড়াতে ব্যস্ত হয়। সেটাও হিসেবের মধ্যে ধরা আছে।

১২ নম্বর জেটিতে নোঙ্গর করা রয়েছে এম ভি আল আব্বাস, এতে আছে ১০৪১ টন। সামরিক সরঞ্জাম। ৬ নম্বর অরিয়েন্ট বার্জে ২৭৬ টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ। সবচেয়ে বড় জাহাজ এম ভি হরমুজ, তাতে রয়েছে ৯৯ ১০ টন কামান ও ট্যাঙ্ক। এছাড়া আরও কয়েকটি গান। বোট ও বার্জ।

পায়ে ফিন বেঁধে, মাথাটা অল্প একটু জলে ভাসিয়ে সাঁতরে এলো একদল যুবক। কে-কোন জাহাজে মাইন লাগাবে ও আগে থেকে নির্দিষ্ট আছে। অতি দুঃসাহসী সিরাজুল হরমুজ জাহাজের তলা দিয়ে ডুব দিয়ে পোর্ট সাইডে চলে এলো। জল থেকে উঠে আসা একটা প্রাণীর মতন সে সেঁটে রইলো জাহাজটার গায়। আলো পড়েছে তার ওপরে, প্রহরীদের নজর একবার এদিকে ফিরলে সেই মুহূর্তে সে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। লিমপেট মাইনগুলো ঠিক মতন আটকে দিয়ে সরে আসতেই শুরু হলো ভাটার টান। নিঃশব্দে তারা গা ভাসিয়ে দিল। তাদের পরিকল্পনা শতকরা এক শো ভাগ সার্থক।

প্রথম বিস্ফোরণ হলো ঠিক রাত ১-৪০ মিনিটে। সেই শব্দে কেঁপে উঠলো পুরো চট্টগ্রাম শহর। তার পাঁচ মিনিট পর আর একটা, এই বিস্ফোরণ আরও জোরে, কানের পর্দা ফেটে যাবার জোগাড়, এবার এম ভি হরমুজ ডুবছে। এবার পর পর গর্জন। যেন প্রলয় এসে গেছে, এই ভেবে কান্নাকাটি শুরু করে দিল শহরের মানুষ।

সিরাজুলরা চরলাক্ষায় আগের জায়গায় ফিরে গেল না। তারা একসময় এসে উঠলো পাটিয়া গ্রামের প্রান্তে। এখানে তারা বিশ্রাম নিতে লাগলো। ভোরের আগে যাত্রা করা যাবে না, তাদের ফেরার পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে স্বেচ্ছাসেবকরা।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ দিয়ে উড়ে এলো হেলিকপ্টার। গ্রামগুলোতে ব্রাস ফায়ার চালালো, নদী দিয়ে লঞ্চে করেও নেমে এলো আর্মি, গ্রামের লোকদের টেনে টেনে বাইরে এনে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, মুক্তি কোথায়? কোথায় সেই ছেলেরা?

সিরাজুলদের সাহায্য করার লোক আগেই এসে গেছে। তারা নদীর ঢাল দিয়ে দৌড়াচ্ছে, খানিক পরেই তারা জঙ্গলে ঢুকে যেতে পারবে। হঠাৎ সিরাজুল পেছন ফিরে বললো, পাটিয়া গ্রামে আগুন! সাধারণ মাইনষের ঘরবাড়ি জ্বালাইয়া দিতাছে!

তা জ্বলুক, ওদের আর দেরি করার সময় নেই। কমান্ডার বাচ্চু সিরাজুলকে ঠেলা দিয়ে বললো, চল, চল!

সিরাজুল তবু থমকে দাঁড়িয়ে বললো, আমাগো জইন্যে গ্রামের লোকগুলা মরবে?

এসব চিন্তা করার উপায় নেই। এখন যুদ্ধ চলছে। গেরিলারা শুধু নির্দেশ মতন চলবে, অন্যদিকে তাকানো যাবে না। কিন্তু সিরাজুল রুখে দাঁড়ালো। তার চোখ দুটো যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

সে পেছন ফিরে দৌড় শুরু করতেই মতিন-জাহাঙ্গীর-নির্মলরা তাকে টেনে ধরাবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সিরাজুলের শরীরে তখন অসুরের শক্তি, বন্ধুদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে সে ছুটে গেল। দুতিনবারের চেষ্টাতেও তাকে আটকানো গেল না।

মতিনরা খানিকটা দূর তার পেছন পেছন গিয়েও থেমে যেতে বাধ্য হলো। গ্রামের লোকদের সারবেঁধে দাঁড় করিয়েছে পাক আর্মি, এখুনি গুলি চালাবে। ওপর দিয়ে উড়ে আসছে। একটা হেলিকপ্টার।

এই অবস্থায় ফিরে যাওয়া মানে আত্মহত্যারই নামান্তর। গেরিলারা এরকম অপারেশানে এসে কক্ষনো বিপক্ষের সৈন্যদের মুখোমুখি যেতে চায় না। সেরকম নিয়ম নেই। সিরাজুল তবু ছুটছে। দিনের পর দিন উত্তেজনা, টেনশান, তারপর আসল কার্যসিদ্ধির পর অনেকে মাথার ঠিক রাখতে পারে না, সমস্ত রুদ্ধ আবেগ এক সঙ্গে বেরিয়ে আসে। ট্রেইনিং-এর সময়েই এই ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল।

মতিন, জাহাঙ্গীর চিৎকার করছে, সিরাজুল! সিরাজুল!

সিরাজুল তা শুনতে পাচ্ছে না। সামনের গ্রামটায় আর্মির অত্যাচারে মেয়েরা আর্ত চিৎকার করছে, সিরাজুল তার মধ্যে যেন চিনতে পারছে মনিরার কণ্ঠস্বর। সিরাজুলের দৃঢ় ধারণা হলো, ওখানেই রয়েছে মনিরা। বাবুল চৌধুরী একবার বলেছিল না যে মনিরাকে নিয়ে আসা হয়েছে। চিটাগাং-এর দিকে! মনিরাকে উদ্ধার না করে সিরাজুল ফিরে যাবে?

সে চেঁচিয়ে বললো, মনিরা, মনিরারে, আমি আসতেছি…

তার মাথার ওপরে গর্জন করে উড়ে এলো একটা হেলিকপ্টার।

সিরাজুল চিৎকার করে উঠলো, হারামজাদারা? পুঙ্গিরপুত।

মেশিনগান দিয়ে গুলি চালাতে চালাতে সে নিজেও একটা বুলেটের মতন ছুটে গেল গ্রামের দিকে।

জাহাঙ্গীর কপাল চাপড়ে বললো, হায় আল্লা, পাগল হইয়া গ্যাছে গা!

তারা আর ফিরে তাকাবারও সময় পেল না। সিরাজুলের দেহটা মাটির সঙ্গে ফুড়ে যাবার দৃশ্যটা তাদের আর দেখতে হলো না।

৪৩. দেশ থেকে লন্ডনে যাওয়ার সময়

দেশ থেকে লন্ডনে যাওয়ার সময় অলি কোনো ক্লান্তি বা অস্বস্তি বোধ করেনি। কিন্তু এত বড় আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সে জেট-ল্যাগে ভুগতে লাগলো। সর্বাঙ্গে নিদারুণ অবসাদ, ঘুমে চোখ টেনে আসছে। নতুন জায়গায় এসে লোকজনের সঙ্গে কথা বলবে কী, সে তাকাতেই পারছে না ভালো করে, অথচ প্লেনে তার এক ফোঁটাও ঘুম আসেনি। শর্মিলা তার অবস্থা বুঝতে পেরে ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে সেই সন্ধেবেলাতেই তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। এই সময় আহারে রুচি থাকে না, তাই খাওয়ার জন্যও জোর করলো না।

অলির ঘুম ভাঙালো খুব ভোরে। প্রথমে তার মনেই পড়লো না যে সে কোথায়। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখলো একটি সম্পূর্ণ অচেনা ঘর। তার পাশেই একটি মেয়ে শুয়ে আছে। এ কে? ঝুঁকে মুখখানা দেখার পর মনে পড়লো, এর নাম শর্মিলা, কাল প্লেন থেকে নেমেই এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। শর্মিলা ঘুমিয়ে আছে পাশ ফিরে, মুখখানা দেখলেই বোঝা যায় সে খুব উপভোগ করছে এই ভোরবেলার ঘুম। সে গোলাপি রঙের আধা স্বচ্ছ বেশ সুন্দর কুঁচি দেওয়া ম্যাক্সি পরে আছে, শর্মিলার গায়ের রং শ্যামলা। নইলে তাকে মেমসাহেব মনে করা যেতে পারতো।

মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরখানা দেখতে লাগলো অলি। ওয়ালপেপারের ওপর নানারকম। পোস্টার ও খবরের কাগজের ছবি সাঁটা। রবীন্দ্রনাথ, চে গুয়েভারা, শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানী, আর কয়েকটি ছবি অলি চিনতে পারলো না। একখানা বড় রঙিন ছবিতে গ্রাম্যদৃশ্য, মাথায় ধানের আঁটি নিয়ে যাচ্ছে এক জোড়া নারী ও পুরুষ, তাদের মুখের হাসি দেখলেই বাঙালী বলে বোঝা যায়। এটা কি বাবলুদার ঘর? অলির মনেই পড়লো না যে তার বাবুলদা নিউ ইয়র্কে থাকে না। বাবলুদা কোথায়, পাশের ঘরে?

সন্তর্পণে খাট থেকে নেমে অলি প্রথমে যে দরজাটা খুললো, তার বাইরে কমন প্যাসেজ। ঘরের মধ্যে বিপরীত দিকের দরজাটি বাথরুমের, পাশেরটি রান্নাঘরের। আর কোনো ঘর নেই। তাহলে বাবলুদা তাকে এখানে রাত্তিরে ফেলে রেখে কোথায় চলে গেছে?

নিজের শাড়িটা দেখে অলি আরও অবাক হলো। এই হাফ সিল্কের পাড়হীন হলুদ শাড়ি তো তার নয়! নিজের শাড়ি ছেড়ে এই শাড়ি সে পরলো কখন? সে কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, অন্য কেউ পরিয়ে দিয়েছে? এই কথাটা ভাবতেই লজ্জায় অলির কর্ণমূল রক্তিম ও উষ্ণ হয়ে উঠলো। দেয়ালের পাশে দাঁড় করানো রয়েছে তার সুটকেসটা, সেটার চাবি খোলা হয়নি।

তারপর আস্তে আস্তে অলির মনে পড়লো। নেশাগ্রস্তের মতন অলির গত বিকেলের পরের সব স্মৃতি ঝাঁপসা হয়ে গেছে, অথচ অলি মোটেই নেশা করেনি, প্লেনে সেই ইজিপসিয়ান ভদ্রলোকের দেওয়া রেড ওয়াইন সামান্য একটু ঠোঁটে স্পর্শ করেছিল মাত্র, তাতে মোটেই নেশা হতে পারে না। তবু তার একটা আচ্ছন্নের ভাব এসেছিল। এয়ারপোর্ট থেকে এখানে আসার সময় গাড়িতে কারা কারা যেন ছিল, বাবলুদা কথা বলছিল খুব কম। তারপর একটা ঘরে আসা। হলো, সেটা এই ঘরটাই? আশ্চর্য, অলি কি তখন দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখেনি? হ্যাঁ, অলি সুটকেস খোলার চাবি খুঁজে পাচ্ছিল না, কিছুতেই পায়নি, চাবিটা কি হারিয়ে গেল? সুটকেসের চাবি তো তার হ্যাণ্ডব্যাগের মধ্যে ছিল না, লণ্ডনে বিশাখাদের বাড়ি ছাড়ার আগে সে। এই সুটকেসে চাবি লাগিয়েছে, তা হলে? প্লেনের মধ্যেই চাবিটা হারিয়ে গেল?

সুটকেস খুলতে পারেনি বলেই শর্মিলা তাকে কাল রাতে ব্যবহার করার জন্য একটা শাড়ি দিয়েছিল। অলি নিজেই বাথরুমে গিয়ে পোশাক বদল করেছে, তার মনে পড়েছে। বাথরুমের দরজাটা আবার খুলে অলি দেখলো শাওয়ার স্ক্রিনের ওপর তার শাড়িটা ঝুলছে, বাথরুমটাও এখন চেনা লাগছে। শর্মিলা ওয়ার্ডরোব থেকে তার শাড়ি বার করে দিয়েছিল, শর্মিলা কি এখানেই থাকে? অথচ টেবিলের ওপর ছড়ানো কয়েকটি বইতে একটি মুসলমানের নাম লেখা। তুতুলদির মতন, এই শর্মিলাও কোনো মুসলমানকে বিয়ে করেছে? না, তাহলে শর্মিলা বাবলুদার কে? না, না, তা হতেই পারে না।

দ্বিতীয় যে হ্যাণ্ডব্যাগটা অলি সঙ্গে এনেছে, সেটাও রয়েছে টেবিলের ওপর। অলি ব্যাগটা খুলে একেবারে উল্টে দিয়ে চাবি খুঁজতে লাগলো। না, চাবিটা সত্যিই নেই। সুটকেসের তালা ভাঙতে হবে। শর্মিলা মেয়েটি কত ভালো, সামান্য আলাপেই তাকে নিজের শাড়ি ব্যবহার। করতে দিয়েছে। শর্মিলার ব্যবহারের মধ্যে একটা স্নিগ্ধতা আছে, সেটাও মনে পড়লো অলির। সে অবশ্য মনে মনে কল্পনা করেছিল, এয়ারপোর্টে বাবলুদা একা থাকবে।

হ্যাণ্ডব্যাগে অলি তার টুথব্রাশ ও পেস্ট পেয়ে গেল। দ্রুত দাঁত মেজে ফেলার পরেই তার চা তেষ্টা ও খিদের উদ্রেক হলো একসঙ্গে। মনে হয় যেন কতদিন সে কিছু খায়নি। খিদের সঙ্গে পয়সার সম্পর্ক, এবার তার মনে পড়ে গেল তার কাছে টাকা পয়সা কিছুই নেই। সে ট্রাভলার্স চেক পর্যন্ত খুইয়েছে। অবশ্য এখন রাস্তায় বেরিয়ে পয়সা দিয়ে খাবার কেনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, সে তো এখানকার কিছুই চেনে না। অলি এখনও নিউ ইয়র্কের কিছুই দেখেনি। এই ঘরটাই অ্যামেরিকা।

সে একটা জানলার পর্দা সরিয়ে দিল। এই ঘরখানা বেশ উঁচুতে, ছ’ সাততলা হবে বোধ হয়। অলি কখনো এত উঁচু বাড়িতে থাকেনি, লণ্ডনে বিশাখাদের বাড়িটা বেসমেন্ট নিয়ে দোতলা, রিডিং-এ তার বান্ধবীর বাড়িটাও সেরকমই ছিল। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে সামনের বাগান, বেশ বড় কম্পাউন্ড, তার পরে বৃষ্টিভেজা কালো রাস্তা, এখনও বৃষ্টি পড়ছে, রাস্তার দু’ ধারে অনেক গাড়ি পার্ক করা। লন্ডনের সঙ্গে যেটুকু পার্থক্য চোখে পড়ছে, তা হলো কাছাকাছি বাড়িগুলো সবই বড় বড়, রাস্তার গাড়ি গুলোও বেশ বড় আকারের। কাল এয়ারপোর্ট থেকে আসার পথে কে যেন বলছিল, তারা ব্রুকলিনে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্কের সঙ্গে ব্রুকলিনের যে কী তফাত, তা অলি ঠিক জানে না। বিখ্যাত ব্রুকলিন ব্রীজ তো নিউ ইয়র্কেই, তাই না?

অলির সত্যিই খিদে পেয়েছে। রান্না ঘরে একটা ফ্রিজ আছে। এদেশে প্রত্যেক বাড়িতেই ফ্রিজে নানারকম খাবার-দাবার থাকে, দুধ, আইসক্রিম তো থাকবেই। তা বলে অলি কি একটা অচেনা বাড়ির ফ্রিজ খুলে কিছু খেতে পারে? ছেলেরা হলে পারতো। শর্মিলা জেগে উঠুক, তারপর দেখা যাবে।

বাথরুমে গিয়ে অলি খুব তাড়াতাড়ি, যেন এখুনি প্লেন ধরতে হবে এরকম ব্যস্ততায়, শর্মিলার শাড়িটা ছেড়ে নিজের পুরোনো শাড়িটাই পরে নিল। প্লেনে আসার জন্য তার শাড়ি তো ময়লা হয়নি, এটা পরেই রাত্তিরে স্বচ্ছন্দে শোওয়া যেত, কেন বদলাতে হলো কে জানে! অন্যের জিনিস ব্যবহার করলে অলির খুব অস্বস্তি হয়।

বাথরুমের দরজাটার পেছন জোড়া লম্বা আয়না। এই বাথরুমে ঢুকলেই নিজেকে না দেখে উপায় নেই। নিজের মুখের দিকে তাকাতেই কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে এলো অলির চোখ দিয়ে। অলি আর সামলাতে পারলো না, বেশ বুক খালি করে সে কাঁদলো নিঃশব্দে। তার কষ্ট হচ্ছে খুব, তবু কিসের জন্য এই কান্না তা সে জানে না।

বাবার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। শেষের দিকে বাবাই তাঁকে বেশি বেশি উৎসাহ দেখিয়ে এখানে পাঠালেন। কিন্তু বাবার কি সত্যিই ইচ্ছে ছিল? বিমানবিহারী চেয়েছিলেন যে, তাঁর পুত্রসন্তান নেই, তাঁর বড় মেয়ে অলিই তাঁর ব্যবসাপত্তর দেখবে। অলি প্রকাশনা ব্যবসার অনেকটাই বুঝে নিয়েছে, ঠিক দু’ বছর এখানে কাটিয়েই সে ফিরে যাবে। বাবা কি দু বছর অপেক্ষা করতে পারবেন না? দমদমে শেষ মুহূর্তে বাবার মুখখানায় যেন একটা গম্ভীর হতাশার ছাপ পড়েছিল। কেন? বাবা কি বাবলুদা সম্পর্কে আগেই কিছু জানতে পেরেছিলেন?

বাবলুদা তার সঙ্গে একবারও নিভৃতে কিছু বলার চেষ্টা করেনি, তার হাতখানাও ছোঁয়নি। কেমন যেন আলগা আলগা ভাব। লন্ডনের আবহাওয়া, সেখানে কার কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, এইসব জিজ্ঞেস করলো, কলকাতায় তার প্রিয়জনদের কথা এ পর্যন্ত সে জানতে চাইলো না। অথচ এই বাবলুদাই আঘাত পাবে ভেবে কতকগুলো কঠিন সত্যকে মোহময় মিথ্যের সাজ পরিয়ে এনেছে অলি!

শর্মিলা নামের মেয়েটির সঙ্গে বাবলুদার কী সম্পর্ক তা আর বলে দেবার অপেক্ষা রাখে না। কাল যে গাড়ি চালাচ্ছিল, তার নাম কী যেন, সিদ্ধার্থ? হ্যাঁ সিদ্ধার্থ, তার সঙ্গে শর্মিলা যেভাবে কথা বলছিল, তারচেয়ে বাবলুদার সঙ্গে কথা বলছিল একেবারে সম্পূর্ণ অন্য সুরে। সে সুর শুনলেই বোঝা যায়। পুরুষরা না বুঝুক, মেয়েরা বোঝে। বাবলুদার সঙ্গে শর্মিলার কথার মধ্যে আছে একটা বিশ্বাসের অধিকারবোধ।

অলি চোখের জল মুছে ফেললো। শর্মিলার ওপর সে একটুও রাগ করতে পারছে না। শর্মিলার মধ্যে সে কোন কপটতা দেখেনি। শর্মিলার ব্যবহারের সারল্য কিছুতেই অভিনয় হতে পারে না। শর্মিলা তার সম্পর্কে কিছু জানে না।

বাবলুদার সঙ্গে অলির চাক্ষুষ দেখা হয়নি প্রায় তিন বছর। দীর্ঘ বিচ্ছেদ। অথচ অলি একদিনের জন্যও বাবলুদার সঙ্গে তার কোনো দূরত্ব অনুভব করেনি। শিলিগুড়িতে লেকচারারের চাকরি নিয়ে যাবার পর বাবলুদা তো আর কলকাতাতে ফিরতেই পারলো না। সেই শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ডে শেষ দেখা। বাবলুদা কিংবা অলি কেউ তো ইচ্ছে করে এই দূরত্ব রচনা করেনি, এর মধ্যে ছিল জীবন-মরণের প্রশ্ন। সেই জন্যই বাবলুদার ওপর তার কখনো তেমন রাগ বা অভিমান হয়নি। সে জানতো, তার আর বাবলুদার মধ্যে কখনো ভুল বোঝাবুঝি হবে না। অলি অপর কোনো পুরুষের মুখে সুতি শুনলেই হেসে অন্য প্রসঙ্গে চলে এসেছে, সে পুরুষটি নাছোড়বান্দা ধরনের হলে তার ধারেকাছেই আর যায়নি। অলি তো জানতো সে অতীন মজুমদারের বাকদত্তা। দু’ জনের মধ্যে একবারও সেরকম কিছু কথা হয়নি, তবু অব্যক্ত কথা দেওয়া ছিল। নিউ ইয়র্কে পা দেবার কিছুক্ষণের মধ্যেই অলি বুঝেছিল, বাবলুদা অনেক দূরে সরে গেছে, বাবলুদার ওপর তার আর বিশ্বাসের কোনো জোর নেই। এই উপলব্ধির আঘাত সহ্য করতে না পেরেই কি অলি ঘুমের মধ্যে আত্মগোপন করতে চেয়েছিল? ঘুম যে এসেছিল, তাও সত্যি। এতই কষ্ট হয়েছিল যে কষ্টের কোনো বোধ ছিল না।

অলির কাছে যদি কিছু টাকা পয়সা থাকতো, তা হলে এই ভোরেই সে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়তে পারতো। হয়তো এই অচেনা বিদেশ-বিভূঁইয়ে পথ হারাতে কয়েকবার, তাতেই বা কী। এমন ক্ষতি হতো, শেষপর্যন্ত ঠেকতে ঠেকতে সে ঠিকই পৌঁছে যেত মেরিল্যান্ডে।

সেখানে তার জন্য অ্যাপার্টমেন্ট থাকবে নিশ্চয়ই। পিটার মেয়ার নামে বৃদ্ধ অধ্যাপক যিনি ওখানে অলির মেন্টর, যিনি কয়েকখানি উপন্যাসও লিখেছেন, একখানি উপন্যাসের জন্য পুলিৎজার প্রাইজও পেয়েছেন, তাঁর সঙ্গে অলির চিঠিপত্রে এমনই আলাপ হয়ে গেছে যে মনে হয় যেন অনেকদিনের চেনা। লন্ডন থেকে তাঁর সঙ্গে টেলিফোনেও কথা হয়েছে, তিনি বাকি সব ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। কিন্তু একটাও পয়সা হাতে না নিয়ে অলি রাস্তায় বেরুবে কী করে? তার পারিবারিক শিক্ষাতেই যে এটা অকল্পনীয়। সে কি পথে নেমে পথের মানুষের দয়া চাইতে পারে? লন্ডনের ট্রেনের ছিনতাইবাজদের ওপর অলির নতুন করে রাগ হলো। ঠিক ঐদিন তারা কি অন্য কারুর হ্যাণ্ডব্যাগ কেড়ে নিতে পারতো না?

অলিকে একজন অচেনা মানুষের ঘরে রেখে বাবলুদা কোথায় চলে গেছে কে জানে! বাবলুদা আসবার আগেই, শর্মিলা যদি জেগে ওঠে, তা হলে অলি শর্মিলার কাছ থেকেই কিছু ডলার ধার চাইতে পারে।

শর্মিলা কখন উঠবে? লন্ডনে সে বিশাখাকে দেখেছে, ছুটির দিনে দশটা পর্যন্ত ঘুমোয়। শর্মিলার শুয়ে থাকার ভাবভঙ্গিও সেরকম। ঘড়িতে এখন পৌনে সাতটা। অলি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে শর্মিলার বিছানার পাশে দাঁড়ালো, নারী হিসেবে সে দেখতে লাগলো আর একজন নারীকে। শর্মিলার শরীরের গড়নে তেমন আহামরি কিছু নেই, রোগাটে লম্বা চেহারা, এরা প্রায় সব সময় মোজা পরে বলে পায়ের পাতা মসৃণ, গোড়ালি একটুও ফাটা নয়, বেশ সরু কোমর, হাতের আঙুলগুলো সুন্দর, কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে, ছোট চিবুক, ঠোঁটের ভঙ্গিতে সতোর স্পষ্ট চিহ্ন, চুল কেটে ফেললেও চুলের খুব গোছ। শর্মিলার গা থেকে চাপা একটা পারফিউমের গন্ধ আসছে, পারফিউমের ব্যাপারে ওর রুচি আছে। শোওয়ার ধরনটাও সংযত, কেউ হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকলে দেখতে বিশ্রী লাগে। এই নিশ্চিন্তে নিদ্রিতা মেয়েটি এখন বাবলুদার খুব আপন।

অলি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ঠিক করলো, শর্মিলার কাছে সে কিছুতেই হার স্বীকার করবে না।

নৈকট্যের একটা উষ্ণতা আছে, দৃষ্টির একটা তরঙ্গ আছে, একজন আর একজনকে লক্ষ করলে তার মধ্যে একটা আহ্বান এসে যায়। অলি শর্মিলার গায়ে হাত ছোঁয়ায়নি, তবু শর্মিলা এই অসময়ে জেগে উঠে চোখ মেলে তাকালো। ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি এর মধ্যেই উঠে পড়েছো,? রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল?

অলি মাথা নাড়লো।

শর্মিলা কি তার চেয়ে বয়েসে বড়? হলেও এক দু’ বছরের বেশি নয়। শর্মিলা তাকে তুমি বলতে শুরু করেছে। অলিও ওকে তুমি বলবে।

শর্মিলা উঠে বসে দু হাতে চোখ ঘষতে লাগলো। তারপর মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে মাথায় একটু ঝাঁকুনি দিয়ে ঘুম তাড়িয়ে বললো, তুমি কাল ঘুমের মধ্যেও ছটফট করছিলে। আমার এক একবার ভয় করছিল, ভাবছিলুম তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে কি না। জেট-ল্যাগের পর অনেকের ঘুম পায়, কিন্তু তোমার মতন এতটা ঘুমোতে আর কারুকে দেখিনি। এখন ফিট লাগছে?

অলি আবার মাথা নাড়লো।

শর্মিলা খাট থেকে নেমে বললো, চা-কফি কিছু খাওনি নিশ্চয়ই। নতুন জায়গা, কোথায় কী আছে, তা তুমি কী করেই বা জানবে! আমিও এখানে পরশুদিনই মোটে এসেছি। এটা সিদ্ধার্থর এক বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্ট, ভদ্রলোকের কী দারুণ বাংলা গানের রেকর্ডের কালেকশান!

গ্যাস জ্বালিয়ে তার ওপরে জল গরম করার কেটলি চাপিয়ে এসে শর্মিলা বললো, কাল রাত্তিরে খুব মজা হয়েছিল। তুমি তো সাত তাড়াতাড়ি এখানে ঘুমিয়ে পড়লে, অলমোস্ট নড় আউট, তারপর আমরা এইটথ ফ্লোরে সিদ্ধার্থর ঘরে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলুম। তারপর কথা উঠলো, কে কোথায় শোবে। ওপরে সিদ্ধার্থর সঙ্গে সুজান বলে এক বান্ধবী আছে, ওদের সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। বাবলুকে বলা হলো এই ঘরে এসে সোফায় শুয়ে পড়তে, তাতে ও রাজি নয়। দুটি মেয়ের সঙ্গে এক ঘরে ও কিছুতেই শোবে না। কাল বাবলু বড় বেশি ড্রিংক করে ফেলেছিল, তুমি জানো না বোধ হয়, একবার ও জেদ ধরে কোনো ব্যাপারে না বললে কিছুতেই আর ওকে দিয়ে হ্যাঁ বলানো যায় না। আমার কোনো প্রবলেম ছিল না, এই ব্লুমিংটনেই আমার চেনা একটি মেয়ে থাকে, আমি তার কাছে চলে যেতে পারতুম, কিন্তু অত রাতে আমাকে যেতে দেবে না। সুজান তখন অফার দিল, সে এসে এই ঘরে শোবে, এই খাটটা বেশ বড়, তিনজনে কুলিয়ে যেত, বাবলু তা হলে সিদ্ধার্থর সঙ্গে শুতে পারে। বাবলুর তাতেও আপত্তি, সুজান কেন স্যাক্রিফাইস করবে! একটা রাত্তিরের ব্যাপার, এতে স্যাক্রিফাইসের কী আছে বলো? আমি বাবলুর মাথায় এক গেলাশ জল ঢেলে দিলুম, তাও ওর নেশা কাটে না!

কাবার্ড খুলে একটা বিস্কিটের প্যাকেট এনে শর্মিলা বললো, এটা খেয়ে দ্যাখো, বেশ মজার। বিস্কিটের মধ্যে বেকন মেশানো আছে। তুমি সব মাংস-টাংস খাও তো?

অলি মাথা নেড়ে দুটি তিনকোণা, পাতলা বিস্কিট তুলে মুখে দিল, তার ভালোই লাগলো। খিদে পেয়েছে বলে সে তুলে নিল আরও কয়েকটা।

শর্মিলা অলির মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, বাড়ির জন্য মন কেমন করছে?

অলি বললো, একটু একটু।

শর্মিলা বললো, তোমার এমন সুন্দর মুখখানা বড় শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে। জানো, আমিও এখানে আসবার পর প্রথম প্রথম কী ভীষণ মন খারাপ লাগতো, যখন-তখন কেঁদে ফেলতুম, ইচ্ছে হতো তক্ষুনি ফিরে যাই।

কাল রাত্তিরের ঘটনাটা শর্মিলা অসমাপ্ত রেখেছে। বাবলুদা শেষণর্যন্ত কোথায় শুতে গেল তা জানা হলো না।

শর্মিলা আবার বললো, এদেশের ছেলেমেয়েরা বাড়ি ছেড়ে পৃথিবীর কত দূর দূর দেশে চলে যায়, সেখানে দু তিন বছর পড়ে থাকে। কিছু গ্রাহ্য করে না! আমরা আসলে ফ্যামিলির প্রতি বেশি অ্যাটাচড়। তোমার বাড়িতে কে কে আছে, অলি? . গল্পে গল্পে কফি তৈরি হয়ে গেল। শর্মিলা দুধ-চিনি ছাড়া কালো কফি খায়। অলি এখনো। কফিতে অভ্যস্ত হয়নি, তাদের বাড়িতে শুধু চায়েরই চল ছিল।

রেকর্ড প্লেয়ারে ফিরোজা বেগমের নজরুল গীতি চালিয়ে দিয়ে জানলার কাছে গিয়ে শর্মিলা বললো, বৃষ্টি পড়ছে। আজ সোমবার হলেও ছুটি। ছেলেরা সহজে ঘুম থেকে উঠবে না। আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে নিই, কী বলো? মুখ দেখেই বুঝতে পারছি তোমার খিদে পেয়েছে।

ফ্রিজ খুলে দুধ, ডিম, স্যালামি বার করতে করতে শর্মিলা বললো, কাল বাবলু আর আমি গ্রসারি স্টোর থেকে এসব বাজার করে এনেছি। এখানে দু একদিন থাকবো। তোমারও নিউ ইয়র্ক শহরটা দেখা হয়ে যাবে। ঐ যে দ্যাখো কাবার্ডে পাঁউরুটি আছে, তুমি ব্রাউন ব্রেড খেয়েছো আগে? খেয়ে দ্যাখো, অন্য রকম টেস্ট। তুমি টোস্টারে দুটো করে পীস্ চাপিয়ে দাও, আমি ডিমটা তৈরি করে ফেলি। তুমি ডিমের পোচ খাবে, না বয়েলড়? আমি ওয়াটার পোচ পছন্দ করি।

অলি বললো, আমি এখানে কয়েকদিন থাকবো কী করে? আমাকে আজই মেরিল্যাণ্ডে গিয়ে ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করতে হবে।

আজ কী করে জয়েন করবে? আজ সারা অ্যামেরিকা ছুটি। তোমার রেজিস্ট্রেশানের তারিখ কবে? এখনও নতুন সেমেস্টার শুরু হয়নি, সময় আছে, তোমার কোনো চিন্তা নেই, আমরা সব ব্যবস্থা করে দেবো। আমরা তোমায় মেরিল্যান্ড পৌঁছে দিয়ে আসবো।

যে প্রফেশারের আণ্ডারে আমি কাজ করবো, তিনি বলেছিলেন, এখানে পৌঁছেই তাঁকে একটা ফোন করতে।

আজ ফোন করতে গেলে তো বাড়িতে ফোন করতে হবে। বাড়ির নাম্বার আছে তোমার। কাছে?

আছে বোধ হয়, চিঠিতে, সুটকেসের মধ্যে।

তোমার সুটকেসের তো চাবিই খুঁজে পেলে না। ঠিক আছে, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নেহাত খুব বিপদে না পড়লে ছুটির দিনে কারুর বাড়িতে এত সকালে কেউ ফোন করে না।

অলি নিজের ঠোঁটটা কামড়ে ধরলো। তার কাছে একটা ডলারও নেই, একটা নতুন দেশে সে এসেছে শূন্য হাতে। বাবলুদা একবারও সেই হাতটা ছোঁয়নি।

দরজায় একটা বেল বাজতেই শর্মিলা অলির দিকে তাকালো। দু’জনেরই ধারণা হলো, অতীন এসেছে। শর্মিলা প্যানে ডিমের পোচ ভাজতে শুরু করেছে, সে অলিকে ইঙ্গিত করলো। দরজা খুলে দিতে।

কেন বুকটা কাঁপছে অলির? সত্যি যেন তার ভয় করছে। বাবলুদাকে ভয়? কিংবা অলি ভয় পায় কোনো নাটকীয় পরিস্থিতিকে।

দরজা খুলে সে দেখলো সম্পূর্ণ অপরিচিত একজোড়া ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাকে। মহিলাটি শাড়ি পরা। তারা দু’জন শর্মিলাকে দেখে আরও বেশি অবাক। ভদ্রলোকটি অস্ফুট স্বরে বললেন, উই হ্যাভ কাম টু মীট ইউসুফ।

অলি বলল, হি ইজ নট হিয়ার।

ভদ্রলোক আবার বললেন, ইউসুফ। তারপর দরজার গায়ে অ্যাপার্টমেন্ট নাম্বারটা আবার দেখে নিয়ে বললেন, ইউসুফ আলি, উই আর ফ্রেন্ডস অফ ইউসুফ আলি।

এরপর কী বলতে হবে অলি জানে না। সে শর্মিলাকে ডাকলো। শর্মিলা এখনও নাইট ড্রেসটা বদলায়নি, সেটা পরেই সচ্ছলভাবে এগিয়ে এসে বললো, ইউসুফ আলি ইজ নট হিয়ার। হি হ্যাঁজ গন টু ইন্ডিয়া, নো, পাকিস্তান, নো, নো, বাংলাদেশ!

দু পক্ষই বাঙালী, তবু কেউ বাংলা বলতে পারছে না। দম্পতিটি চলে যাবার পর দরজা বন্ধ করে শর্মিলা হেসে বললো, আমি ইউসুফ আলি সম্পর্কে কিছুই জানি না। ইউসুফের ঘরে আমাদের মতন দুটি মেয়েকে দেখে ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে! ওদের বোধ হয় ভেতরে এসে বসবার ইচ্ছে ছিল, বৃষ্টির মধ্যে এসেছে……।

অলি ভাবলো, তাকে একটা অচেনা জায়গায় রেখে বাবলুদা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। এখনো বাবলুদা তার বাবা-মায়ের কথা, মানিকদা-কৌশিকদের কথাও জানতে চাইলো না।

টোস্টের ওপর স্যালামি, শশা আর কোলম্যানস মাস্টার্ড দিয়ে স্যান্ডুইচ বানিয়ে ফেললো শর্মিলা। বড় বড় দুটো গেলাস ভর্তি দুধ নিল। অলিকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি দুধ ভালোবাসো তো? দুধের সত্যিকারের স্বাদ যে কী রকম, তা এদেশে এসেই ঠিক বোঝা যায়।

অলি দুধ ভালোবাসে, লন্ডনের দুধ খেয়েই সে শর্মিলার কথার সত্যতা বুঝেছে। গেলাসে একটা চুমুক দিয়ে তার এখানকার দুধ আরও বেশি ভালো লাগলো।

এবার বেজে উঠলো টেলিফোন। খাওয়ার টেবিলে যেখানে অলি বসে আছে, ফোনটা তার কাছেই। শর্মিলা বললো, তুমি ধরো।

অলি বললো, আমি তো কিছুই বলতে পারবো না।

শর্মিলা বললো, এটা নিশ্চয়ই বাবলুর কল। তুমি কথা বলো না!

তবু অলি ফোন ধরলো না, শর্মিলাকেই উঠতে হলো। এবারেও অতীন নয়, শর্মিলা ইংরিজিতে কথা বলছে। শুয়ে থাকার সময় বোঝা যায়নি, এখন অলি দেখলো, শর্মিলার বুকের গড়ন খুব সুন্দর আর একটু হাসলেই তার সারা মুখখানা ঝলমল করে।

অলি আবার মনে মনে ভাবলো, সে কিছুতেই শর্মিলার কাছে হেরে যাবে না। সে শর্মিলাব মনে সামান্য দুঃখও দিতে চায় না।

শর্মিলা রিসিভার নামিয়ে এসে বললো, ওপর থেকে সুজান ফোন করেছিল, আমাদের ব্রেকফাস্ট খেতে ডাকছিল। আমরা একটু পরে ওপরে যাবো. কী বলো।

স্টোভের ওপর হুইশলিং কেটলটা শব্দ করে উঠলো, জল গরম হয়ে গেছে। শর্মিলা আবার কফি বানাতে যাচ্ছিল, অলি বললো, আমি এবারে একটু চা খাবো। চা নেই?

শর্মিলা বললো, আমরা চা কিনিনি। কিন্তু এই ইউসুফ আলির স্টকে দু’ তিন রকম চা আছে, একটু নিলে কোনো দোষ নেই, কী বলল? ও তো দেশ থেকে ফেরার সময় ভালো চা আনবেই।

পটে চা ভিজিয়ে, টি-কোজি দিয়ে তা ঢেকে দিয়ে শর্মিলা বললো, এখনো বাবলুর পাত্তা নেই, দেখলে? সাড়ে আটটা বেজে গেল। ওপরে সিদ্ধার্থ পর্যন্ত জেগে গেছে।

বাবলুদা কোথায়?

সে নাকি এই কাছেই যামিনী মুখার্জি বলে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে শুতে গেছে। কী পাগলামি বলো তো! আমাদের এই ঘরটায় সচ্ছন্দে তিনজনে ঘুমোতে পারতুম না?

আমরা যে এখানে আছি, এর জন্য ভাড়া লাগবে না?

নাঃ! ছুটিতে কেউ গেলে অন্যদের এমনি ব্যবহার করতে দিয়ে যায়। এখানে সবাই করে। ঐ যে ওর কয়েকটা টবের গাছ আছে, তাতে জল দেওয়াও হবে। ফ্রিজ-ট্রিজগুলো অনেকদিন ব্যবহার না করলে খারাপ হয়ে যায়। তোমার বাবলুদা জানো তো এক একদিন দশটা-এগারোটা পর্যন্ত ঘুমোয়। কেমব্রিজে ও একটা অ্যাটিকের ঘরে একা থাকে, ডাকবার কেউ নেই, এক একদিন আমি গিয়ে ওকে জাগাই। কফি বানিয়ে একদিন ওর মুখের কাছে এনে ধরি। একদিন ওর কানের ফুটোয় জল ঢেলে দিয়েছিলুম, বাবলু এমন চিৎকার করে লাফিয়ে উঠেছিল।

দরজা বন্ধ থাকে না?

আমার কাছে একটা চাবি থাকে ওর অ্যাপার্টমেন্টের।

তোমাদের কবে বিয়ে হয়েছে?

মুখ তুলে, অবাক হয়ে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে শর্মিলা বললো, বিয়ে? আমাদের বিয়ে হয়েছে কে বললো?

অলি দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বললো, কলকাতায় বাবলুদার বন্ধুদের মধ্যে গুজব দাঁড়িয়েছে যে ওর গোপনে বিয়ে হয়ে গেছে!

শর্মিলা খানিকটা রক্তিম হয়ে বললো, পড়াশুনো এখনো শেষ হয়নি, এর মধ্যেই বিয়ে…আমরা বিয়ের কথা এখনো কেউ ভাবিনি!

অলি একই রকম হাসি ঠোঁটে রেখে বললো, এই গুজবটা প্রতাপকাকার কানেও গেছে। প্রতাপকাকা আমাকে আসবার আগে বললেন, ছেলেটা সত্যিই বিয়ে করেছে কিনা, তুই গিয়েই আমাদের জানাবি। যদি বিয়েই করতে চায় সে, আমাদের লিখবে না কেন? আমরা কি আপত্তি করতাম? সত্যি জানো শর্মিলাদি, প্রতাপকাকা আর কাকিমা চমৎকার মানুষ। আমি চিঠি লিখে দেবো, পাত্রী আমার খুব পছন্দ হয়েছে। যেমন গুণী মেয়ে, তেমনি দেখতেও খুব সুন্দর।

শর্মিলা বললো, অ্যাই, তুমি আমার গুণের কী পরিচয় পেলে? আর আমাকে দেখতে মোটেই কেউ সুন্দর বলে না। আমার মাসিরা বললো, আমাদের বংশে এরকম একটা কালো মেয়ে কোথা থেকে এলো?

তুমি-তুমি হচ্ছো তন্বী শ্যামা, শিখরিদশনা…।

যাঃ! অলি, তুমিই খুব সুন্দর। এখানকার বাঙালী ছেলেরা তোমাকে দেখলেই প্রেমে পড়ে যাবে।

ওরে বাবা, আমার আর প্রেমের দরকার নেই।

ওরে বাবা কেন? এর মধ্যেই প্রেম হয়ে গেছে নাকি?

অলি হঠাৎ চুপ করে গেল। তারপর তাকিয়ে রইলো শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে। শর্মিলা কাপ প্লেটগুলো নিয়ে উঠে গেল ধুয়ে রাখতে। একটু পরে ফিরে এসে দেখলো অলি তখনও একই ভাবে বসে আছে।

অলির কাঁধে হাত রেখে খুব নরমভাবে শর্মিলা বললো, এই, তুমি মুখখানা এমন মলিন করে ফেললে যে? আমি না জেনে কি তোমাকে কোনো আঘাত দিয়েছি?

অলি বললো, না। শর্মিলাদি, তোমাকে আমার খুব আপন মনে হচ্ছে, তাই তোমাকে বলছি। আমি বোধ হয় জোরজার করে এখানে চলে এসে একটা ভুলই করেছি। না আসাই উচিত ছিল। এখন বুঝতে পারছি, এয়ারপোর্টে পা দেবার পরই মনে হচ্ছিল, আমি ঠিক সহ্য করতে পারবো না।

শর্মিলা বললো, কেন, কী হয়েছে!

অলি অন্যদিকে তাকিয়ে বললো, দেশে আমার একজন খুব বন্ধু আছে। তার নাম শৌনক

সে আমাকে আসতে বারণ করেছিল। আমার বাবারও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু এক্ষুনি বিয়ে করে আমার সংসারী হতে ইচ্ছে হয়নি। অ্যামেরিকায় পড়তে আসার স্বপ্ন ছিল অনেকদিনের। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এখানে আমার মন টিকবে না, অতদিন থাকতে পারবো না।

শর্মিলা বললো, দুটো বছর তো, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। প্রতি ছ’ মাস বেশ কষ্ট হবে, প্রত্যেকটা দিনই মনে হবে খুব লম্বা। তোমার সেই বন্ধু কী করেন?

অ্যাকটিভ পলিটিকস্ করে। বাবলুদা শুনলে চটে যাবে।–কেন, চটে যাবে কেন?

শৌনক সি পি এমের অ্যাকটিভ মেম্বার। বাবলুদাদের তো ওদের সঙ্গে খুব ঝগড়া। শুধু ঝগড়া নয়, শত্রতা; দেশে গেলে বাবলুদা বোধ হয় শৌনকের সঙ্গে কথাই বলবে না।

যাঃ! পলিটিক্যাল ইডিয়লজির ডিফারেন্স ব্যক্তিগত সম্পর্কের লেভেলে নিয়ে আসবে কেন?

তুমি শৌনকের ব্যাপারটা বাবলুদাকে প্রথমেই কিছু বলল না। আস্তে আস্তে কোনো একসময় বুঝিয়ে বলো। মানুষ হিসেবে শৌনক খুব খাঁটি।

দু জনে গল্প করতে করতে কাটিয়ে দিল আরও একঘণ্টা।

তারপর সিদ্ধার্থ, সুজান আর অতীন একসঙ্গে এলো এই ঘরে। অন্য বাড়ি থেকে ফিরে অতীন প্রথমেই এখানে আসেনি, ওপর থেকে সিদ্ধার্থদের ডেকে এনেছে। সিদ্ধার্থ শর্মিলাকে বকুনি দিয়ে বললো, অ্যাই, তুমি এখনো ঐ রাত্তিরের জামাটা পরে আছো? তৈরি হওনি! আজ একেবারে দেশের মতন বর্ষার ওয়েদার, লং ড্রাইভে বেরুবো। চলো চলো, চলো!

অতীন অলিকে জিজ্ঞেস করলো, ভালো করে ঘুমিয়ে নিয়েছো?

অলি হাসি মুখে বললো, হ্যাঁ। এখনো কিছুই দেখা হলো না, ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছে না।

অতীনের চোখ এখনো লালচে, মাথার চুল উস্কোখুস্কো। সে চঞ্চল চোখে একবার শর্মিলা আর একবার অলির দিকে তাকাচ্ছে। ফস করে সে একটা সিগারেট ধরালো।

শর্মিলা বাথরুমে গেল পোশাক বদলাতে। অলি এসে জানলা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়ালো। মনে মনে বললো, শৌনক, তোমাকে কেমন দেখতে? তুমি কি খুব লম্বা, না মাঝারি? তোমার দাড়ি আছে? তুমি সিগারেট খাও?

শৌনক, তোমাকে আমি একটু একটু করে গড়ে তুলবো। তুমি হবে আমার সৃষ্টি, আমার নিজস্ব। তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না!

৪৪. বাবার আমল থেকে রয়েছে চাবুকটা

বাবার আমল থেকে রয়েছে চাবুকটা। মালখানগরের কত দামি দামি জিনিসই তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু এই চাবুকটা কলকাতায় প্রতাপ কতবার বাড়ি বদল করেছেন। এই চাবুকটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেছে। মুণ্ডুটা পেতলের, পাকানো পাকানো চামড়ায় ছাতা ধরে গেলেও জীর্ণ হয়নি। একেবারে। বহুকাল আগে পুরী বেড়াতে গিয়ে ভবদেব মজুমদার এটা কিনেছিলেন। এখন প্রতাপদের বসবার ঘরে ঝোলানো থাকে।

বাবার হাতে কখনো এই চাবুকের মার খেতে হয়নি প্রতাপকে, কিন্তু তিনি বাবলকে মেরেছেন। বোধহয় একবারই। কানু মার খেয়েছে দুতিনবার। কলেজে ভর্তি হবার পর বাবলু একদিন মমতাকে বলেছিল, বসবার ঘরে এটা ঝুলিয়ে রাখার কী মানে হয়, মা? এটা কি একটা ডেকরেশান? বাবার যা মেজাজ, আবার কোন দিন কাকে মেরে বসবে, তার ঠিক নেই। চাবুকটা তখন সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বটে, এখানে সেখানে পড়ে থাকত, ঐ পেতলের মুণ্ডুটার জন্যই একেবারে ফেলে দেওয়া হয়নি, বাড়ির ঠিকে ঝি একদিন সেটাকে তুলে আবার টাঙিয়ে দিয়েছিল পুরোনো জায়গায়। এখন ওটা এমনই দেয়ালের অঙ্গ হয়ে গেছে যে চোখেই পড়ে না।

মমতা ঘরে ঢুকে দেখলেন, প্রতাপ সেই চাবুকটা দেয়াল থেকে নামিয়ে চুপ করে বসে আছেন। চেয়ারটা ভাঙা, সারানো হয়ে উঠছে না, জোড়াতালি দিয়ে রাখা হয়েছে, পেছন দিকে ভুল করে হেলান দিতে গেলেই উলেট পড়ে যায়। সামনের টেবিলটারও একটা পায়া বদলানো দরকার। প্রতাপ মাটির দিকে স্থিরভাবে চেয়ে রয়েছেন, অর্থাৎ তাঁর মন এখানে নেই।

চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে মমতা বললেন, হাকিম সাহেব এখন কার বিচার করছেন? আসামী খুব কড়া শাস্তি পাবে মনে হচ্ছে?

প্রতাপ একটু চমকে মুখ তুললেন। বেদনা ও রাগ পরিষ্কার আলাদাভাবে ফুটে আছে। তিনি কোনো কথা বললেন না। সকালের ডাকে আসা একটা পোস্ট কার্ড পড়ে আছে প্রতাপের সামনে। মমতা বুঝলেন, ঐ চিঠিখানাই তাঁর স্বামীর মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে। আজকাল কোনো চিঠিতেই ভালো খবর আসে না।

মমতা চিঠিটা তুলতে যেতেই প্রতাপ তাড়াতাড়ি সেখানা হাতে নিয়ে নিলেন। মমতা আগেই দেখে নিয়েছেন চিঠিখানা বিদেশ থেকে আসেনি। সেই জন্যই তেমন কিছু উদ্বিগ্ন না হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে লিখেছে? আমায় পড়তে দেবে না?

প্রতাপ মমতার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন, না! তোমার এখন পড়ার দরকার নেই। আমাকে আগে একটু চিন্তা করতে দাও!

মমতা তার অবুঝ স্বামীটির মেজাজের কথা ভালোই জানেন। এখন প্রতাপের সঙ্গে নরম সুরে কথা বললে তিনি আরও পেয়ে বসবেন, হুঙ্কার দিয়ে চ্যাঁচামেচি করে ব্যক্তিত্ব ফলাবেন। এখন আর স্বামীকে ঘাঁটাতে চাইলেন না মমতা, তাঁর রান্না ঘরে কাজ আছে।

তিনি বললেন, চা-টা খেয়ে নাও, তারপর আজ তোমাকে অলিদের বাড়ি যেতে হবে মনে আছে?

একটু পরে মুন্নি রান্না ঘরে এসে ফিসফিস করে বললো, মা, বাবার কী হয়েছে? বাইরের ঘরে বাবা চুপ করে বসে আছে, চোখ দিয়ে জল পড়ছে! আমি ডাকতেও সাড়া দিল না।

প্রতাপের চোখে জল, এটা প্রায় একটা বাঘের ঘাস খাওয়ার মতন ঘটনা। মমতা বিচলিত হয়ে তাড়াতাড়ি উনুন থেকে কড়াইটা নামিয়ে রেখে, আঁচলে হাত মুছে চলে এলেন বাইরের ঘরে। প্রতাপ সেই ভাঙা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আছেন পাথরের মূর্তির মতন, হাতে চাবুকটা। ৩৫৮

ধরা এবং সত্যিই তাঁর চোখে জল। প্রতাপ রাগারাগি করলে মমতা ভয় পান না, কিন্তু তাঁর এরকম দুর্বলতা দেখলে ঘাবড়ে যান। শরীর খারাপ হয়নি তো? নিজের অসুখ-বিসুখের ব্যাপারে প্রতাপ দারুণ চাপা, কক্ষনো কিছু বলতে চান না।

মমতা স্বামীর কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, কী হলো তোমার? আবার বুক ব্যথা করছে?

প্রতাপ দু দিকে মাথা নেড়ে বাঁ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর মমতা ও মুন্নির দিকে তাকিয়ে মুন্নিকেই জিজ্ঞেস করলেন, টুনটুনি কোথায় রে?

পড়াশুনোয় মাথা নেই বলে টুনটুনিকে টাইপ রাইটিং শেখার জন্য একটা স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। সকালবেলা সে গড়িয়াহাট বাজারের কাছে সেই স্কুলে চলে যায়। কোনোদিনই সে ঠিক সময়ে ফেরে না।

প্রতাপ বললেন, মুন্নি, তুই গিয়ে টুনটুনিকে ডেকে আনতে পারবি?

মন্নি বললো, এখন অত দরে কী করে যাবো? আমার যে কলেজ আছে। টুনটুনি এসে পড়বে এগারোটা–সাড়ে এগারোটার মধ্যে। কী হয়েছে, বাবা, ওকে হঠাৎ ডাকতে হবে কেন?

আদেশ নয়, ধরা গলায় অনুরোধের সুরে প্রতাপ মেয়েকে বললেন, কলেজে দেরি করে যাস, একবার যা, টুনটুনিকে ডেকে নিয়ে আয়।

মমতা বললেন, দেওঘর থেকে কোনো খবর এসেছে? চিঠিটা আমাকে পড়তে দিলে না কেন?

প্রতাপ বললেন, এরকম চিঠি পড়াও পাপ। মমো, ছোড়দি মারা গেছে। মমতা কেঁপে উঠলেন। টুনটুনিকে ডাকতে পাঠাবার কথা শুনেই মমতা তার পিতৃবিয়োগের খবরের আশঙ্কা করেছিলেন। বিশ্বনাথ গুহের যে-কোনো দুসংবাদ আসা আশ্চর্য কিছু না। কিন্তু শান্তি ঠাকুরঝি? তার অসুস্থতার কথাও বিশ্বনাথ জানাননি।

চিঠিখানা সত্যিই বিচিত্র।

মাই ডিয়ার প্রতাপ,

তোমাকে একটা সুসংবাদ দেই। আমাদের নিয়ে তোমাকে আর কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে। তোমার ছোড়দি শান্তি গত শনিবার অকস্মাৎ সন্ন্যাস রোগে সকলের মায়া কাটাইয়া পরপারে চলে গেছে। আমার প্রতি অবশ্য শেষদিকে তাহার কোনো মায়া ছিলও না। এতদিন পরে সে যথার্থ শান্তি পাবে। ইতিমধ্যে সংসার চালানো অসম্ভব হওয়ায় বাড়িখানি বিক্রয় করিয়া দিয়াছি। তোমার স্মরণে আছে নিশ্চয় যে তোমার মাতা ঠাকুরানী এই বাড়ি তোমার ছোড়দিকেই ওয়ারিশ করিয়া দিয়াছিলেন। শান্তির জীবিতাবস্থায়, তার সম্মতিতেই বাড়ি বিক্রয় হয়। আমি অবশিষ্ট জীবন কাশীধামে কাটাবো ঠিক করিয়াছি। ধার শোধেই অনেক টাকা ব্যয় হইয়া গেল। এক হাজার টাকা মানি অর্ডার যোগে তোমার নামে পাঠাইলাম, টুনটুনির বিবাহের জন্য রাখিয়া দিও। বিদায়, ব্রাদার, বিদায়। সকলই ঈশ্বরের ইচ্ছা। এ জীবনে ঈশ্বর আমাদের দয়া করলেন না। ইতি তোমার ওস্তাদজী (প্রাক্তন) বিশ্বনাথ গুহ।

টেবিলের ওপর একটা ঘুষি মেরে প্রতাপ বললেন, খুনী! লোকটা ছোড়দিকে মেরে ফেলেছে!

উল্টোদিকের চেয়ারে বসে পড়ে মমতা বিবর্ণ মুখে বললেন, ছোড়দি? ছোড়দি চলে গেল! কতগুলো কথা মুখে উচ্চারণ করা যায় না, তবু মনে আসে। ক্ষয়কাশের রোগী বিশ্বনাথ গুহকে অনেকদিন ধরেই খরচের খাতায় ধরে রাখা হয়েছিল। এমনকি মমতা এমন কথাও মাঝে। মাঝে ভেবেছেন যে, বিশ্বনাথের মৃত্যুর পর শান্তিকে কলকাতার বাড়িতেই এনে রাখতে হবে। কিছুদিন আগে সুপ্রীতির কী সাংঘাতিক অসুখ গেল, শেষ পর্যন্ত বাদ দিতে হলো একটা কিডনি, শরীর একেবারে রক্তশূন্য, সাত বোতল রক্ত দিতে হয়েছিল, তবু তো তিনি বেঁচে ফিরে এলেন। বিশ্বনাথ বেঁচে রইলেন, সুপ্রীতি রইলেন আর মরতে হলো শান্তিকে। নিয়তির কী আশ্চর্য কৌতুক।

প্রতাপ আর সুপ্রীতির তুলনায় শান্তি বরাবরই একটা নিষ্প্রভ জীবন কাটিয়ে গেলেন। কোনোদিন তিনি জোরে কথা বলেননি, অন্য কারুর ওপর নিজস্ব মতামত খাটাতে পারেননি। মমতার সব সময়ই শান্তিকে মনে হত তাঁর শাশুড়ির ছায়া। মা-বাবার প্রিয় মেয়ে ছিলেন শান্তি। বিয়ের পরেও তাঁকে বাপের বাড়ি ছাড়তে হয়নি, তাঁর গান-পাগল স্বামী বছরে একবার দুবার দেখা করে যেতেন, সেটাই তাঁর পক্ষে যথেষ্ট সুখের ছিল। দেশের বাড়ি ছেড়ে দেওঘরে যেতে হলো বলেই সেই নিশ্চিন্ত জীবন তছনছ হয়ে গেল।

প্রতাপ ফাটা ফাটা গলায় বললেন, বাড়ি বিক্রি করেছে। আমাদের না জানিয়ে বাড়ি বিক্রি করেছে, তারপর বউকে মেরেছে। ঐ চশমখোরটা সব পারে!

মমতা বললেন, আস্তে। অত চেঁচিয়ো না। দিদিকে ধীরেসুস্থে খবরটা দিতে হবে।

প্রতাপ একটুখানি গলা নামিয়ে বললেন, আমি আজই দেওঘরে গিয়ে ওকে ধরবো। কাশীতে গেলেও পার পাবে না!

মমতা অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললেন, চিঠিটার তারিখ পাঁচ দিন আগের, সোমবার, ছোড়দি চলে গেছেন আরও দু দিন আগে। আমাদের কি অশৌচ হবে?

প্রতাপ নিদারুণ বিস্মিতভাবে বললেন, ছোড়দি মারা গেছে, আমাদের অশৌচ মানতে হবে না? এটা আবার জিজ্ঞেস করছো?

শোকের মধ্যে নানা রকম ছোটখাটো কথাও মনে আসে। সকালেই প্রতাপ বাজার থেকে মাগুর মাছ এনেছেন, একটু আগে মমতা সেই মাছ কুটে কড়াইতে চাপিয়েছিলেন। দামী মাছ, ফেলে দিতে হবে। আজও তো এ বাড়িতে ফ্রিজ কেনা হলো না। প্রতাপ যদি চিঠিটা পাবার সঙ্গে সঙ্গে মমতাকে জানাতেন, তাহলেও ঐ জিওল মাছ না কুটে বাঁচিয়ে রাখা যেত কয়েক দিন। মমতার ধারণা, বোন মারা গেলে তিনদিনের বেশী অশৌচ থাকে না।

শুধু শুধু খরচের বোঝা বাড়াবার কোনো মানে হয় না। মমতা বললেন, যা হবার তা তো হয়েই গেছে, তুমি আর দেওঘর গিয়ে কী করবে? টুনটুনিকে দিয়ে এখানেই শ্রাদ্ধ করাও।

প্রতাপ আবার ক্ষেপে উঠে বললেন, যাবো না মানে? ঐ মাতাল, জোচ্চোরটাকে আমি পালাতে দেবো ভেবেছো? ওর টি বি কক্ষনো হয়নি, কিচ্ছু হয়নি, টি বি হলে এতদিন কেউ বাঁচে? আমাদের ঠকিয়েছে, সাধারণ কাশির অসুখ, ঐ জন্যই ডাক্তার দেখাতে চাইতো না। আমার ছোড়দিকে কত কষ্ট দিয়েছে। আমি আজই বিকেলের ট্রেনে গিয়ে ওকে ধরবো!

মমতা চুপ করে সব শুনলেন, তারপর দৃঢ়ভাবে বললেন, না, তুমি যাবে না!

মমতা আবার চলে গেলেন রান্না ঘরে। অশৌচ যখন মানতেই হবে, তখন বাড়িতে আমিষের গন্ধ থাকাও ঠিক নয়। সুপ্রীতি এখনও বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। এখন সব কিছু সামলাতে হবে তো মমতাকেই।

মায়ের পেটের বোন শান্তির জন্য প্রতাপ আর সুপ্রীতির যতটা শোক হবে, মমতা ততোটা বোধ করবেন না, এটা স্বাভাবিক। কতটুকু বা দেখেছেন শান্তিকে, মমতা তো কখনো একটানা বেশীদিন শ্বশুরবাড়িতে থাকেননি। তবু মুখচোরা, ব্যক্তিত্বহীনা, নিপাট ভালোমানুষ শান্তির জন্য মমতার কষ্ট হতে লাগলো। শেষের ক’টা বছর কী যাতনাই না ভোগ করতে হলো ওকে!

এমনকি বিশ্বনাথের জন্যও কষ্ট বোধ করলেন মমতা। টি বি হোক বা না হোক, মুখ দিয়ে রক্ত তো পড়তোই, আর ঐ কাশির অসুখটার জন্যই বিশ্বনাথের গানের গলা একেবারে নষ্ট হয়ে। গেল। বিশ্বনাথের ধারণা, গুরুর অভিশাপেই এরকম হয়েছে, তিনি ছাত্রছাত্রীদের গান শিখিয়ে পয়সা নিতেন। কিন্তু পয়সা উপার্জনের আর কোনো পন্থাও তো বিশ্বনাথের জানা ছিল না। গায়ক মানুষের কণ্ঠস্বর নষ্ট হয়ে গেলে আর কী থাকে! দিলখোলা, বেপরোয়া সেই মানুষটার কী পরিণতি! দেওঘরের ঐ বাড়ি বিক্রি করাই বা কী এমন অপরাধ হয়েছে? প্রতাপ নিজেই কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ঐ বাড়ি উদ্ধারের কোনো আশা নেই। কয়েকটি গুণ্ডাগোছের ভাড়াটে একতলাটা দখল করে রেখেছে, তারা এক পয়সাও ভাড়া দেয় না, তাদের উঠিয়ে দেবারও কোনো উপায় নেই। ঐ বাড়ি কেনার খদ্দের যে পাওয়া গেছে তাই-ই যথেষ্ট, হয়তো যৎসামান্য দাম ধরে দিয়েছে।

অসুস্থ শরীর নিয়ে বিশ্বনাথ কোথায় একা একা ঘুরবেন? কলকাতায় এসে যাতে প্রতাপদের ঘাড়ের বোঝা হতে না হয়, তাই বিশ্বনাথ ইচ্ছে করে হারিয়ে গেলেন জনারণ্যে, এটাও বুঝতে পারলেন মমতা। বিশ্বনাথের জন্য দুঃখ হলো মমতার, আবার কৃতজ্ঞতাও বোধ করলেন। বিশ্বনাথকে এ বাড়িতে রাখা খুবই কষ্টকর হতো!

এই সব চিন্তার ফাঁকে ফাঁকেও মমতার মনে পড়তে লাগলো বাবলুর কথা। ছেলেটা অনেকদিন চিঠি লেখে না। অলি পৌঁছেই চিঠি দেবে বলেছিল, তাও তো এলো না। আমেরিকার রাস্তায় নাকি যখন-তখন অ্যাকসিডেন্ট হয়। কয়েকদিন আগেই কাগজে একটা। খবর বেরিয়েছে যে, নিউইয়র্কে একটি বাঙালী ছাত্র আত্মহত্যা করেছে, বন্ধ ঘরের মধ্যে তিন দিন তার লাশ পড়েছিল, কেউ টের পায়নি। এসব ভাবলেই বুক কাঁপে।

সুপ্রীতিকে শান্তির মৃত্যু-সংবাদ জানাবার ভার মমতাকেই নিতে হল। সুপ্রীতি বিষম কোনো আঘাত কিংবা শোকের উচ্ছাস দেখালেন না। শরীর দুর্বল হলে মানুষের আবেগও কমে যায়। সুপ্রীতি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমার আগেই চলে গেল! মায়ের কাছে গেছে, মা ওকে ডেকে নিয়েছে, ওখানেই শান্তি ভালো থাকবে!

সুপ্রীতি আরও বললেন, তুতুল বাবলুকে এ খবর এখন লিখো না, মমো। প্রবাসে অশৌচ মানতে হয় না। টুনটুনির কোমরে একটা লোহার চাবি বেঁধে দিও।

টুনটুনিকে খুঁজতে গিয়ে পেল না মুন্নি। টাইপিং স্কুলে এসে একটা খারাপ খবর শুনলো মুন্নি। টুনটুনি এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল বটে, কিন্তু গত এক মাসের মধ্যে সে একদিনও আসেনি। ইনস্ট্রাক্টরকে সে বলেছে যে, তার টাইপ শিখতে ভালো লাগে না। তা হলে রোজ সকালে টাইপ শেখার নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ‘টুনটুনি কোথায় যায়? এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না।

এখন টুনটুনিকে না নিয়ে বাড়ি ফিরবে কী করে মুন্নি? আসল কথাটা শুনলে বাবা রেগে যাবে, অথচ কী মিথ্যে কথাই বা বলা যায়? দেওঘরের খবরটা সে জেনে এসেছে। শান্তি পিসিকে তার ভালো করে মনেই নেই, কিন্তু টুনটুনি তো তার মাকে হারালো। মা বাবার কথা বেশি বলেই না টুনটুনি, যদি বা কখনো প্রসঙ্গ ওঠে তখন বাবার প্রতি অসম্ভব একটা রাগের ভাব টুনটুনির কথায় ফুটে বেরোয়। কিসের জন্য রাগ কে জানে।

টাইপিং স্কুল থেকে টুনটুনির এগারোটায় ফেরার কথা, অতক্ষণ তা হলে মুন্নিকে অন্য কোথাও কাটিয়ে যেতে হয়। মহা মুশকিলের ব্যাপার। দেশপ্রিয় পার্কের কাছে মুন্নির এক বান্ধবীর বাড়ি আছে, কিন্তু সে নিশ্চয়ই এখন কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।

গোলপার্কের মোড়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে মুন্নি একটা ল্যান্ড মাস্টার গাড়ির সামনে পড়ে গেল। গাড়িটা তাকে দেখেই ব্রেক কষেছে। একজন মোটাসোটা লোক গলা বাড়িয়ে বললো, অ্যাই মুন্নি, কোথায় যাচ্ছিস? খানিকটা এগিয়ে দেবো!

চিনতে কয়েক পলক অসুবিধে হলো মুন্নির। কানুকাকা! এই কানুকাকা ন’মাসে ছ’মাসে তাদের বাড়িতে আসে, কিন্তু দিন দিনই মোটা হচ্ছে বলে প্রত্যেকবারই অন্য রকম মনে হয়। এখন গাল দুটো একেবারে বাতাবী লেবুর মতন।

বড়বাজারে একটা কাপড়ের দোকানের অর্ধেক মালিক এই কানুকাকা। প্রত্যেক বছর মাকে আর পিসিমণিকে ভালো শাড়ি দেয়। কিন্তু বাবাকে কিছু দেয় না। বড়বাজারে যারা ব্যবসা করে, তাদের বুঝি মোটা হওয়াই নিয়ম।

কানুর মুখভর্তি পান, সে রাস্তায় পিক ফেলে বললো, বড়দি কেমন আছে রে?

তখন মুন্নির মনে পড়ে গেল। শান্তিপিসিও তো কানুকাকার দিদি হয়। সুতরাং, আজকের গুরুতর খবরটি কানুকাকাকে জানানো উচিত। সে জিজ্ঞেস করলো, দেওঘরের শান্তিপিসির কথা তোমার মনে আছে, কানুকাকা?

কানু বললো, কেন মনে থাকবে না? কী হয়েছে ছোড়দির?

খবরটা শুনে কানু বেশ বিহ্বল হয়ে গেল। তারপর অস্ফুটভাবে বললো, বিশ্বনাথ-জামাইবাবু। আমার কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা ধার নিয়েছিল, সে কি আর শোধ দেবে?

পেছন থেকে অন্য গাড়ি হর্ন দিচ্ছে, কানুর গাড়িটা বেয়াড়াভাবে দাঁড় করানো, বুড়ো ড্রাইভার গাড়িটা সাইড করলো। কানু নেমে পড়ে বিষাদাচ্ছন্ন গলায় বললো, মালখানগরের মজুমদার বংশের আর একজন চলে গেল! ছোড়দি বড় ভালো মানুষ ছিল, রে। জানিস মুন্নি, গত বছর। তোর কাকিমা আর হোল ফ্যামিলি নিয়ে আমি দেওঘরে গেছিলাম। বাহান্ন বিঘাতে বাড়ি ভাড়া করে ছিলাম এক মাস। বিরাট প্যালেশিয়াল বিল্ডিং, ঐ বিশ্বনাথ-জামাইবাবুই ঠিক করে দিয়েছিলেন। তখনই দেখি যে ছোড়দির খুব অ্যানিমিয়া, আমি দৈনিক এক সের দুধের ব্যবস্থা করে দিলাম, কিন্তু ছোড়দি সেই দুধ নিজে না খেয়ে জামাইবাবুকেই খাইয়ে দিত! আমি যখন ছোট ছিলাম, দেশের বাড়িতে ছোড়দি আমাকে দুধ-মুড়ি-পাটালি গুড় মেখে কতদিন খেতে দিয়েছে। সেই ছোড়দি…! ওঠ মুন্নি, গাড়িতে ওঠ, তাদের বাসায় গিয়ে সকলের সাথে দেখা করে আসি!

কানু এসে পড়ায় মমতার সুবিধেই হলো। কানু উদ্যোগী, কর্মী পুরুষ। বিশ্বনাথ গুহ শান্তির শ্রাদ্ধের কিছু ব্যবস্থা করেছেন কি না তা জানাননি, নিয়ম রক্ষার জন্য এ বাড়িতেই একটা ছোটখাটো শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান হলো। পুরুত ডাকা, জিনিসপত্রের জোগাড়যন্ত্র করা, সে সব দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিয়ে নিল কানু।

যথেষ্ট টাকা-পয়সা করেছে কানু, নিজের বাড়ি ও গাড়ি আছে, তবু তার একটাই ক্ষোভ, সে তার সেজদার কাছ থেকে নিজের প্রাপ্য মর্যাদা আদায় করতে পারলো না। প্রতাপ এখনও কানুকে বিশেষ গ্রাহ্যই করেন না। আগের মতন বকুনি-দাবড়ানি দেন না বটে, কিন্তু কথাও বিশেষ বলেন না, হু-হাঁ করে কোনো মতে এড়িয়ে যান। কানুর এখন শ্বশুর বাড়ির বেশ বড় একটা গোষ্ঠী আছে, ব্যবসার জগতের পরিচিতমণ্ডলী আছে, তবু যেন, একদা যে পরিবার থেকে সে প্রায় বিতাড়িত হয়েছিল, সেখানে এসে ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তি না দেখাতে পারলে যেন তার সুখ হয় না। তাই সে এ বাড়িতে ঘুরে ফিরে আসে।

তিন-চারদিনের মধ্যেই শান্তির প্রসঙ্গ একেবারে চুকেবুকে গেল। দেওঘরে সকলে মিলে সুখের দিনের একটা গ্রুপ ফটোগ্রাফ তোরঙ্গ থেকে বার করে মমতা বাঁধাতে দিলেন, ঐ ছবিতেও শান্তি সকলের আড়ালে পড়ে গেছেন, কোনোক্রমে মুখটা শুধু একটুখানি দেখা যায়।

সপ্তাহখানেক পরে এক রাত্তিরে মমতা হালকা মেজাজে প্রতাপকে জিজ্ঞেস করলেন, সেদিন জামাইবাবুর পোস্টকার্ডটা আসবার পর তুমি দেয়াল থেকে চাবুকটা পেড়ে হাতে নিয়ে বসেছিলে কেন বলো তো? কাকে মারবে ভেবেছিলে? যমকে?

প্রতাপ কোনো উত্তর দিলেন না। মুখ নীচু করে সিগারেট টানতে লাগলেন। মমতা কাছে এসে তাঁর স্বামীর গেঞ্জিপরা চওড়া কাঁধে হাত রেখে আবার জিজ্ঞেস করলেন, বলো না, কাকে মারবে ভেবেছিলে? যমের বদলে বিশ্বনাথ গুহকে নাকি? তিনি রইলেন। ৩৬২

দেওঘরে না কাশীতে, আর তুমি কলকাতায় বসে তাঁকে মারবার জন্য চাবুক তুললে? লোকে যে কেন তোমাকে পাগল বলে না, তাই ভাবি!

প্রতাপ বললেন, তুমি তা হলে আমাকে পাগলই ভাবো?

মমতা বললেন, ভাববো না? এক এক সময় যা কাণ্ড করো! শোনো, এবারে ঐ চাবুকটা ফেলে দাও! বসবার ঘরে কেউ চাবুক সাজিয়ে রাখে না। সেদিন কানু হাসতে হাসতে বলছিল, সেজদা ওটা কাকে মারবার জন্য রেখেছে? এ প্রতাপ বললেন, এটা যেখানে আছে, সেখানেই থাকবে! ওটা আমাদের বংশের একটা চিহ্ন।

মমতা বললেন, আহা হা, কী এমন চিহ্ন! তোমার মায়ের আনা ভালো ভালো কাঁসার বাসনগুলো তো সব দেওঘরেই পড়ে রইলো। আমি দুটো থালা আনতে চেয়েছিলাম, তুমি তাও আনতে দাওনি।

প্রতাপ বললেন, ওরকম মোটাসোটা কাঁসার থালা আজকাল আর কে ব্যবহার করে? আনলেও তো বাক্সে ভরে রাখতে।

মমতা বললেন, তবু স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে থেকে যেত। ঐ রকম চাবুক বুঝি কেউ ব্যবহার করে আজকাল?

প্রতাপ বললেন, সেদিন চাবুকটা কেন হাতে নিয়েছিলাম জানো? ওটা সত্যি সত্যি ব্যবহার করি বা না করি, কিন্তু প্রয়োজন হলে ব্যবহার করার ইচ্ছেটা যেন চলে না যায়! সেই ইচ্ছেটা চলে যাওয়াই হচ্ছে চূড়ান্ত কমপ্রোমাইজ। সে রকম কমপ্রোমাইজের জীবন আমার দ্বারা হবে। না, বুঝলে! তা তুমি আমাকে পাগলই বলো, আর যাই-ই বলো!

মমতা স্বামীর মাথার চুল মুঠো করে ধরে সকৌতুকে বললেন, পাগল, আমার বদ্ধ পাগল! বাইরের লোকের সামনে আর বেশী পাগলামি করতে যেও না, এ বয়েসে মানায় না।

অনেকদিন পর বিছানায় শুয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্প হলো, প্রণয় হলো, তারপর মমতা তাঁর স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।

কয়েকদিন পর প্রতাপ সত্যিই পাগলের মতন দাপাদাপি শুরু করে দিলেন ঘরের মধ্যে। মমতা কিছুতেই তাঁকে ধরে রাখতে পারেন না।

গতকালই টুনটুনি মমতার কাছে স্বীকার করেছে যে, সে গর্ভবতী। তাদের প্রাক্তন বাড়িওয়ালার ছেলে পরেশই তার প্রেমিক। তবে পরেশ তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু পরেশের বাবাও কিছুদিন আগেই মারা গেছেন, এখনও তার কালাশৌচ কাটেনি, তাই আনুষ্ঠানিক বিয়ে হবে না, পরেশের বন্ধুরা গোপনে রেজিষ্ট্রি বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। আজ সেই বিয়ে, সন্ধের পর পরেশ আর টুনটুনি আসবে এ বাড়ির গুরুজনদের প্রণাম করতে। টুনটুনি আপাতত এ বাড়িতেই থাকবে, এক বছর পরে পরেশ তার স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে।

টুনটুনির যে একটা হিল্লে হয়ে গেল, এতে সকলের খুশী হবারই কথা। তবু প্রতাপ রাগে ফেটে পড়লেন। সমস্ত ব্যাপারটাই প্রতাপের কাছে অত্যন্ত অপবিত্র মনে হচ্ছে। টুনটুনির মায়ের মৃত্যুর এক মাসও পূর্ণ হয়নি, এর মধ্যেই সে কুমারীত্ব নষ্ট করলো? মমতা বোঝালেন যে টুনটুনির ঐ ব্যাপারটা কয়েক মাস আগেই শুরু হয়েছে নিশ্চয়ই, এর সঙ্গে মায়ের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রতাপ বললেন, বিয়ে করবে ঐ স্কাউন্ট্রেল পরেশটাকে? ওকে গলায় দড়ি দিতে বলো! ওকে বাড়ি থেকে দূর করে দাও, আমি কোনোদিন আর ওর মুখ দেখতে চাই না!

প্রতাপের বাহুতে হাত রেখে মমতা বললেন, এ সব তোমার পাগলামির কথা! আজকাল মেনে নিতে হয়। মেনে না নিলেই অশান্তি বাড়ে। ভুল করুক বা যাই-ই করুক, মেয়েটা যখন একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসেছে, তখন যার সঙ্গে ঐ সব ব্যাপার, সেই-ই যে ওকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, সেটাই তো ওর মহাভাগ্যের ব্যাপার। না হলে ও মেয়ের কি আর কারুর সঙ্গে বিয়ে। হতো কখনো? এখন তুমি আর মাথা গরম করো না!

প্রতাপ বললেন, তোমার মনে নেই, আমাদের কালীঘাটের বাড়িতে এসে ঐ পরেশ কত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে গিয়েছিল। আমাকে মুখের ওপর শাসিয়েছিল। মাঝ রাতে বোমা ছুঁড়ে ছিল! সেই হারামজাদাকে আমরা জামাই করে বাড়িতে বরণ করে নেবো? আমাদের কি মান-সম্মান বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই? গরিব হয়ে গেছি বলে…আসুক ও এ বাড়িতে, আমি চাবুক পেটা করে ওর পিঠের চামড়া তুলে নেবো!

মমতা দু’দিকে মাথা নাড়তে নাড়তে শান্ত গলায় বললেন, না, তুমি চাবুক মারবে না। কারুকেই চাবুক মারবে না। অবস্থার গতিকে পুরোনো অনেক কথা ভুলে যেতেই হয়।

এর পরেও মমতা অনেকক্ষণ ধরে প্রতাপকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, প্রতাপের মেজাজ উত্তরোত্তর চড়তে লাগলো। পরেশের নামটাই তিনি সহ্য করতে পারছেন না। এই বিয়েটাও তিনি স্বীকার করতে চান না। তাঁর মতে, ঐ গোপনে বিয়ে করাটরা একেবারে বাজে কথা! রেজিস্ট্রি বিয়েরও কোনো দাম নেই। টুনটুনিকে এ বাড়িতেই ফেলে রাখবে, পরেশ কোনোদিনই তার এই বউকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে না। ওরা অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে, ওদের পরিবারে ছেলের বিয়ে দিয়ে শুধু বউ আনা হয় না, এক কাঁড়ি টাকা আর সোনাদানাও আনে! মমতা বললেন, এক বছর অন্তত অপেক্ষা করে তা দেখা যাক। তারপর পরেশের মতিগতি সত্যি খারাপ দেখলে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। তার বদলে পরেশকে এখন চাবুক মারলে তো কোনো কিছুরই সুরাহা হবে না।

অবুঝ প্রতাপের প্রতি মমতা তাঁর শেষ অস্ত্রটি নিক্ষেপ করলেন। তিনি বললেন, বেশ, এতই যদি তোমার জেদ, তুমি যদি আমার কথা মোটেই শুনতে না চাও, তা হলে তুমি যা ইচ্ছে তাই করো। টুনটুনিকে, পরেশকে মারধোর করো, পাড়ার লোক এসে জমুক বাড়িতে, যা খুশী হোক! মুন্নিকে নিয়ে আমি বিকেলবেলাই চলে যাবো আমার ছোট বোনের কাছে। তুমি যেন আমাদের আর কোনো দিন ডাকতে যেও না!

সন্ধের একটু পরে এলো টুনটুনিরা। পরেশ একা আসেনি, সঙ্গে তিনজন বন্ধুকে নিয়ে। এসেছে। রেজিষ্ট্রি বিয়ে হলেও টুনটুনিকে ওরা কিনে দিয়েছে একটা লাল বেনারসী শাড়ি, মাথায় অর্ধেক ঘোমটা দেওয়া, সিঁথিতে সিঁদুর পরা টুনটুনিকে দেখাচ্ছে একেবারে অন্য রকম।

মমতা আগেই মিষ্টি আনিয়ে রেখেছিলেন, মন্নি সবাইকে পরিবেশন করলো। বেশ একটা আনন্দ-হুল্লোড়ের পরিবেশ হলো। বিয়ের কনের মতনই লজ্জা লজ্জা মুখ করে বসে আছে টুনটুনি, পরেশের এক বন্ধু পর পর তিনখানি গজল গান শোনালো।

পরেশই এক সময় মমতাকে জিজ্ঞেস করলো, কাকিমা, কাকাবাবু নেই বাড়িতে?

অসুস্থ শরীর নিয়ে সুপ্রীতিও একবার এ ঘরে এসে সকলের প্রণাম নিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রতাপ আসেননি। নিজের ঘরে তিনি উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়।

মুন্নি মিথ্যে কথা বলতে যাচ্ছিল, মমতা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আছেন বাড়িতে। স্নান করছিলেন, তোমরা বসো, আমি ডেকে আনছি।

শয়নকক্ষে এসে দুষ্ট ছেলেকে কড়া শাসনের ভঙ্গিতে মমতা বললেন, এই শেষবারের মতন তোমাকে বলছি, তুমি একবার ওঘরে আসবে কি না?

প্রতাপ বিছানা থেকে উঠে এসে অতিশয় কাতরভাবে বললেন, আমাকে কি যেতেই হবে? কেন আমাকে এসবের মধ্যে জড়াচ্ছো?

মমতা বললেন, মুখটা মুছে নাও, একটা গেঞ্জি পরো।

প্রতাপকে দেখে সবাই সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালো। থেমে গেল গজল গান। পরেশ এগিয়ে এসে একেবারে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে প্রতাপের পায়ের ধুলো নিয়ে বিগলিতভাবে বললো, কাকাবাবু, বাবা মারা গেছেন শুনেছেন তো? আজ থেকে আপনি আমার বাবার মতন হলেন…

এই ছেলে মাত্র কয়েক মাস আগে বোমা মেরে কালীঘাটের বাড়ি থেকে তাঁদের তাড়িয়েছিল, সেই সময় প্রতাপ দারুণ বিপত্তির মধ্যে পড়েছিলেন, এখন তার মুখে এই রকম কথা শুনলে ঠাস করে চড় কষাতে ইচ্ছে করে না? আসলে পরেশ প্রতিশোধ নিতে এসেছে, সে দেখিয়ে দিল, এ বাড়ির একটি মেয়েকে নিয়ে সে যেমন খুশী খেলা খেলতে পারে। একটা কাগজে সই করা বিয়ে করতে রাজি হয়েছে বলেই তার সাত খুন মাপ? প্রতাপের মনে হলো, এই বিয়েতে তাঁর বাবার অপমান, মায়ের অপমান, ছোড়দির অপমান। তাঁর নিজের অপমান তো বটেই।

প্রতাপ দেয়ালের দিকে তাকালেন। মমতা চাবুকটা সরিয়ে ফেলেছেন। ময়লা দেয়ালে। চাবুকটার জায়গায় একটা ফর্সা, লম্বা দাগ। সত্যি সত্যি চাবুক না মারলেও চাবুক ব্যবহার করার ইচ্ছেটা যেন চলে না যায়। প্রতাপ ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে অদৃশ্য চাবুক ধরে রইলেন।

মমতার সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হলো। মমতা ইঙ্গিতে বলছেন–নতুন বর-বধূকে আশীবাদ করতে। প্রতাপ একবার ভাবলেন বলে উঠবেন, যথেষ্ট আদিখ্যেতা হয়েছে, এবার বিদায় হও! পরক্ষণেই তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন। তার ঘাড় ব্যথা করছে। হাতের মুঠো খুলে তিনি করতল রাখলেন পরেশের মাথার সিকি ইঞ্চি উঁচুতে, আশীর্বাদের ভঙ্গিতে। তিনি ওর শরীর স্পর্শ করলেন না।

৪৫. আজ কাজের দিন

আজ কাজের দিন, আজ আর কোনো খেলা নয়। গত রাত্রে প্রায় আড়াইটে পর্যন্ত আড়া চললেও সিদ্ধার্থ সকাল সাতটার মধ্যে মান পর্যন্ত সেরে নিয়েছে। নিজেই কফি বানিয়েছে জেগে উঠে, এরপর সে ব্রেক ফাস্ট সেরে নিয়েই দৌড়োবে।

গতকাল শহর ছাড়িয়ে অনেকটা দূর যাওয়া হয়েছিল, ফেরার পথে সিদ্ধার্থর বান্ধবী নেমে গেছে স্কারসডেলে, সেখানে তার এক বোন থাকে। সুতরাং রাত্তির বেলা অতীনের ঘুমোবার জায়গা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ টাই-এর গিট বাঁধছে, আয়নার মধ্যেই সে দেখলো অতীন। হঠাৎ বিছানায় উঠে বসে আচ্ছন্নের মতন চেয়ে আছে।

সিদ্ধার্থ বললো, কী রে, তুই এর মধ্যে উঠে পড়লি? তুই তো আর অফিস যাচ্ছিস না!

অতীন জিজ্ঞেস করলো, কটা বাজে? আমাদের বাস ধরতে হবে না?

সিদ্ধার্থ বললো, নিউ ইয়র্ক থেকে বস্টনের বাস প্রতি ঘণ্টায় ছাড়ে। ব্যস্ত হবার কী আছে? আজকের দিনটা থেকে যা, রাত্তিরের বাসে যাবি!

অতীন বিছানা থেকে নেমে এসে বললো, না, না, আটটার বাস ধরতেই হবে। আর দেরি করা চলবে না।

সিদ্ধার্থ বললো, মেয়েরা এখনও ঘুমোচ্ছে। ওদের ডেকে তুলে রেডি করে তুই আটটার বাস ধরবি? পাগল নাকি? দশটার আগে কিছুতেই পারবি না, আই ক্যান বেট! আজ আর ইউনিভার্সিটি অ্যাটেন্ড করতে পারবি না, সো ফরগেট ইট। সারা দিনটা ঘুরে বেড়া, শর্মিলা গুগেনহাইম মিউজিয়াম দেখেনি বলছিল, দেখিয়ে নিয়ে আয়।

হঠাৎ কথা থামিয়ে সিদ্ধার্থ এক ঝলক থামলো। অতীনের দিকে ভুরু নাচিয়ে বললো, বেশ আছিস, অ্যাঁ? এবার দুটো মেয়েকে নিয়ে হারেম বানাবি?

অতীন কোনো কথা না বলে রান্নার জায়গায় এসে কফি বানাতে লাগলো।

সিদ্ধার্থ বললো, আমার জন্য দুটো ডিম ফ্রাই করে দে তো! কালকের খাবারের অনেক লেফট ওভার রয়ে গেছে ফ্রিজে, আজ আর দুপুরে তোরা রান্না-বান্না করিসনি।

টেবিলে এসে বসে টোস্টে দ্রত মাখন মাখাতে মাখাতে সিদ্ধার্থ বললো, আমি আজ টিউবে যাবো। তুই আজ ইচ্ছে করলে আমার গাড়িটা নিতে পারিস। মেয়ে দুটিকে শহর ঘুরিয়ে নিয়ে আয়!

সিদ্ধার্থর মেজাজ কখন যে কী রকম থাকবে তা বোঝা শক্ত। কাল বাইরে বেড়াবার সময় অতীন বেশ কয়েকবার মিনতি করেছিল তাকে একটু চালাতে দেবার জন্য। টানা হাইওয়ে, কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু অতীন নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে, তাই সিদ্ধার্থ কিছুতেই তার হাতে নিজের গাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে দিতে রাজি নয়। সে বলেছিল, অত শখ কেন, চাঁদু? আগে নিজের পয়সায় গাড়ি কেন, তারপর যত ইচ্ছে অ্যাকসিডেন্ট করিস! আমার গাড়ি আমি অন্যের হাতে দিই না!

আজ সেই সিদ্ধার্থ নিজে থেকেই অতীনকে গাড়ি দিতে চাইছে, তাও শহরে চালাবার জন্য।

অতীন ভারী গলায় বললো, না, গাড়ি লাগবে না। একটু বাদে বাস-স্টেশনে চলে যাবো। আজ আর শহর ঘোরা-টোরা হবে না!

–হোয়াটস দা হারি, ম্যান! নীচে-ওপরে দু’ খানা অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি থেকে না বেরুতে চাস, একবার এ বিছানায়, আর একবার ও বিছানায়, হ্যাভ ফান!

আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে সপাটে সিদ্ধার্থর গালে একটা চড় কষালো অতীন। চিৎকার করে বললো, মুখ সামলে কথা বলবি!

সিদ্ধার্থর প্লেট থেকে একটা টোস্টের টুকরো ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। সিদ্ধার্থ মনোযোগ দিয়ে সেটা তুললো। তারপর আবার খাওয়া শুরু করলো।

একটু খানি চুপ করে থেকে অতীন বললো, সব সময় ঠাট্টা-ইয়ার্কি ভালো লাগে না!

সিদ্ধার্থ মুখ না তুলে বললো, গেট আউট অফ মাই হাউস, রাইট নাউ, লক স্টক অ্যান্ড ব্যারেল!

অতীন ঘুরে গিয়ে সিদ্ধার্থর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো, আই অ্যাম সরি, সিদ্ধার্থ। হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল।

–আই সে ক্লিয়ার আউট! অ্যান্ড টেক দোজ টু বেবীজ ইন ইয়োর আর্মস। নেভার সেট ফুট ইন মাই হাউজ এগেইন!

–আমি ক্ষমা চাইছি, সিদ্ধার্থ। আমরা দশটার বাসেই চলে যাবো, কথা দিচ্ছি।

–ক্ষমা? এতদিন বন্ধু ভেবে তোকে দুধকলা দিয়ে কাল সাপ পুষেছি! আমাকে চড় মারলি, তোর এত সাহস! এক্ষুনি ঘুষি মেরে তোর নাক ভেঙে দিতে পারি। কিন্তু আমি ফিজিক্যাল ভায়োলেন্স পছন্দ করি না। বেরিয়ে যা, এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে দূর হয়ে যা!

–আচ্ছা যাচ্ছি। একটু পরেই

–একটু পরে না। এক্ষুনি! আমি আর তোর মুখ দেখতে চাই না। কোনোদিন আমাকে। টেলিফোনও করবি না। ঐ মেয়েদুটোকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই কর গিয়ে-…

–তোকে আর জ্বালাতন করবো না, সিদ্ধার্থ। আমি ক্ষমা পাবার যোগ্য নয়!

এবার সিদ্ধার্থ মুখ তুলে হো হো করে হেসে উঠলো। নিজের অভিনয়টা বেশ উপভোগ করে সে বললো, টি-ভি’র সোপগুলোতে এইরকম এক একটা দৃশ্য থাকে না? বন্ধুতে বন্ধুতে ভুল বোঝাবুঝি, তারপর থেকে তারা ঘোরতর শত্রু!

অতীন অনুতাপে ও লজ্জায় নির্বাক।

সিদ্ধার্থ বললো, আমার ডিম দুটো ভেজেছিস? দে! কী আমার বীরপুরুষ, বন্ধুকে চড় মেরে রাগ দেখানো হচ্ছে। ব্রেকফাস্টের আগে ভায়োলেন্স, ছি ছি, মোস্ট ডিটেস্টেবল বিহেভিয়ার। আমি বেশিক্ষণ চালাতে পারলুম না, হাসি পেয়ে গেল! কিন্তু সত্যি অতীন, তুই এই নতুন মেয়েটার সঙ্গে যে রকম ব্যবহার করছিস, আমার খুব খারাপ লাগছে! মেয়েটা এতদূর থেকে এসেছে, একটা নতুন দেশ, তোকে ছাড়া আর কারুকে চেনে না, আর তুই তার সঙ্গে ভালো করে কথাও বলছিস না? তুই যে ওকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলছিস, তা সবাই বুঝতে পারছে। এমন কি সুজান পর্যন্ত বলছিল, দেয়ার মাস্ট বী সামথিং রং…

অতীন বলো, হ্যাঁ, এবার অলিকে বলতে হবে!

–কী বলবি?

–শর্মিলার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপারটা খুলে বলতে হবে। আমি শুধু ভাবছিলাম, ইস্ট থেকে ওয়েস্টে এলে মনটা অ্যাডযাস্ট করতে কয়েকদিন সময় লাগে, তাই কয়েকটা দিন কেটে গেলে–

–তার মানে তুই ওকে আরও কয়েকটা দিন মিথ্যে আশা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চাস। আমার মতে সেটা অন্যায়। দেখলে মনে হয়, মেয়েটি খুবই সরল, পিওর অ্যান্ড ডিভাইনাল বিউটিফুল, অ্যান্ড মোস্ট প্রবাবলি আ ভার্জিন!

–সেইটাই তো মুশকিল। অলি মিথ্যে কথা কাকে বলে তাই জানে না প্রায়। ওর সামনে আমিও কোনো মিথ্যে কথা বলতে পারবো না, প্রথমেই আমার দিক থেকে সত্যি কথাটা শুনলে ও কতটা আঘাত পাবে তার ঠিক নেই। সেইজন্যই আমি ওর সামনে দাঁড়াতে পারছি না।

–তুই একটা জিনিস বুঝতে পারছিস না, অতীন। ব্যাপারটা কিন্তু শর্মিলার পক্ষেও বেশ অপমানজনক। শর্মিলা তোর জন্য অনেক স্যাক্রিফাইস করেছে, আর তুই ওর নাকের সামনে একটি প্রেমিকা ঝুলিয়ে রাখবি, দ্যাট ইজ আটারলি রিডিকুলাস।

–আমার জায়গায় তুই পড়লে কী করতি, সিদ্ধার্থ?

–আমি হলে? আমি ঐ এয়ারপোর্টে অলি নামবার সঙ্গে সঙ্গে তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে বললুম, হে দেবী, দীর্ঘদিন তোমার অদর্শনে আমি আর একটি মেয়েকে ভালোবেসেছি, তার সঙ্গে ভুল করে দু-চারবার শুয়েও ফেলেছি, তুমি আমায় ক্ষমা করো। আজ থেকে তুমি আমার ভগিনী হয়ে গেলে। নহ প্রিয়া, নহ বধু, তুমি মম সুন্দরী ভগিনী

–আবার চ্যাংড়ামি করছিস, সিদ্ধার্থ?

–এই রে, আবার চড় কষাবি নাকি? বড় জোরে লেগেছিল কিন্তু। শোন, সিরিয়াসলি বলছি, তোর এখন উচিত, অন্তত একটা ঘণ্টা এই অলির সঙ্গে নিরিবিলিতে কাটানো। অন্যান্য টুকিটাকি কথা বল। তুই যদি ডিটারমিনড় থাকিস যে ওকে সত্যি কথাটাই বলতে চাস, তা হলে ঠিক এক সময় বেরিয়ে আসবে।–শর্মিলার সঙ্গে ওর খুব ভাব হয়ে গেছে।

–তাই দেখছি! শর্মিলা তোর চেয়ে হাজারগুণ ভালো মেয়ে। একলা একলা এতদূর থেকে অলি এসেছে, ওর একটা তীব্র হোম সিকনেস হতেই পারে, সেটা বুঝতে পেরেই শর্মিলা ওকে নানা কথায় ভুলিয়ে রাখছে।

–শর্মিলার কাছ থেকে অলিকে আলাদা করাই যে যাচ্ছে না।

–বাজে কথা বলিস না! তুই চেষ্টা করলে বুঝি পারা যেত না। শোন, আমার বেশী সময় নেই, আমাকে এক্ষুনি বেরুতে হবে। আমি শর্মিলাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি।

–তুই শর্মিলাকে কোথায় নিয়ে যাবি এখন? একটা কিছু প্লজিবল এক্সপ্লানেশান তে চাই!

–সেটা আমার মাথায় আছে। তুই চট করে শর্মিলাকে একবার ডেকে নিয়ে আয়।

–ওরা দু’জনে এক সঙ্গে ঘুমোচ্ছে। আমি ওখান থেকে একলা শর্মিলাকে কী করে ডেকে আনবো?

–সেটাও আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে? প্রেমে পড়লে লোকে বোকা হয়ে যায়, আর একসঙ্গে ডবল প্রেমে পড়লে তোর মতন যে একেবারে বুদ্ধ হয়ে যায়, সেটা আমার জানা ছিল না। ওহে কফি হাউসের অতীন মজুমদার, আয়নায় একবার মুখখানা দ্যাখো! অবিকল হুতোম প্যাঁচা!

খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে জুতো পরে নিয়ে সিদ্ধার্থ বললো, আমার সঙ্গে নীচে চুল।

অন্য অ্যাপার্টমেন্টটার দরজার সামনে গিয়ে সিদ্ধার্থ বললো, বেল দিলে কে এসে দরজা খুলবে, কার চান্স বেশী বল, অতীন?

অতীন বললো, ফিফটি ফিফটি চান্স!

সিদ্ধার্থ বললো, মোটেই না। বেল শুনে যদি অলি জেগেও ওঠে, তবু নতুন জায়গায় সে একা দরজা খুলবে না। শর্মিলাকে ডাকবে। ইউ ওয়ান্ট টু বেট?

অতীন বেলে আঙুল রাখলো।

সিদ্ধার্থর কথাই ঠিক, একটু পরে এসে দরজা খুলে দাঁড়ালো শর্মিলা। বিরাট হাই তুলতে গিয়ে মুখের সামনে হাত চাপা দিয়ে বললো, কী ব্যাপার, কটা বাজে?

অতীন বললো, এখনো ঘুমোচ্ছো? আমাদের ফিরতে হবে না?

শর্মিলা বললো, আমি মঙ্গলবার ছুটি নিয়ে এসেছি।

সিদ্ধার্থ বললো, শর্মিলা, তোমাদের আরও ঘুমোতে দেওয়া উচিত ছিল। এক্সট্রিমলি স্যরি, তোমাকে ডাকতে হলো। উইল ইউ ডু মি আ ফেভার?

শর্মিলা ঘুম মাখা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো, ফেভার? কিসের ফেভার?

সিদ্ধার্থ বললো, আমাকে অফিস যাবার পথে একবার ব্যাঙ্কে যেতে হবে, বুঝলে? আমি একটা লোন নিচ্ছি, তাই গ্যারান্টর হিসেবে একজনকে সই করতে হবে। তুমি আমার গ্যারান্টর। হবে?

শর্মিলা ঈষৎ বিরক্তভাবে বললো, এই জন্য ঘুম ভাঙালে? কেন, বাবলু গ্যারান্টর হতে পারে

–অতীনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট একদম নতুন। ওকে দিয়ে ঠিক হবে না।

–দাও, ফর্মটা দাও, সই করে দিচ্ছি!

–ফর্ম আমার কাছে নেই। তাছাড়া গ্যারান্টরকে ইন পার্সন নিয়ে গেলে ভালো হয়। বেশিক্ষণ লাগবে না, যাস্ট আ ফমালিটি। তবে আমাকে কাজটা আজই করতে হবে। একটু তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, প্লীজ। ফিরে এসে আবার ঘুমিয়ো। চুল না আঁচড়ালে তোমায় কী সুন্দর দেখায়, শর্মিলা! এই ঘুম ঘুম চোখ, কোনোরকমে একটা শাড়ী জড়ানো, মোস্ট ক্যাজুয়াল ভঙ্গি, তাতেই তোমায় যা মানাবে না, ব্যাঙ্কের সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে।

–বাজে বকো না। আমায় দশ মিনিট টাইম দাও!

–ন মিনিট পঞ্চাশ সেকেন্ড। অলির ঘুম ভাঙাবার দরকার নেই। তুমি বরং চাবিটা নিয়ে চলে এসো, নইলে ও ভুল করে বাইরে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেই কেলেংকারি। অতীন ততক্ষণে ব্রেকফাস্টের জন্য কিছু কিনে–টিনে আনুক।

সিদ্ধার্থ আবার ওপরে এসে বললো, আজ আমার সত্যি ব্যাঙ্কে কাজ আছে। অফিসের কাজ। সেই সঙ্গে আমার একটা লোন অ্যাপ্লিকেশনও করে দেবো। এভরিথিং রেগুলার। তুই ততক্ষণ আমাকে আর এক কাপ কফি খাওয়া।

মোটামুটি দশ মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে এলো শর্মিলা। এরই মধ্যে সে চুল আঁচড়েছে, একটুখানি সাজগোজও করেছে। চাবিটা টেবিলের ওপর রেখে সে বললো, অলি ঘুমোচ্ছে, ঘুমোক। আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরে আসতে পারবো না?

সিদ্ধার্থ বললো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তার বেশী লাগবে না। অতীন, তুই যা পাঁউরুটি-ফাঁউরুটি নিয়ে আয়।

অতীন বললো, তোরা এগো। আমি একটু পরে যাচ্ছি।

শর্মিলা আর অতীন লিফটের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। লিফটটা নীচে নামছে, আবার ওপরে আসতে মিনিট খানেক দেরি হবে। সিদ্ধার্থ জ্যাকেটের দু পকেট চাপড়ে বললো, ওঃ হো, লাইটারটা আনতে ভুলে গেছি। শর্মিলা, আমি এক্ষুনি আসছি!

দ্রত ঘরের মধ্যে ফিরে এসে সে অতীনের পশ্চাৎদেশে একখানা লাথি কষিয়ে বললো, টিট ফর ট্যাট, ইউ টেইক দ্যাট! শোন, এবার যদি বেগড়বাঁই করিস তা হলে ভালো হবে না কিন্তু! পরিষ্কার, সত্যি কথা বলবি, যা যা হয়েছিল, সব বলবি, একেবারে সেই জামসেদপুর থেকে! মেক আ ক্লিন ব্রেষ্ট অফ ইট! আমি ব্যাঙ্ক থেকে ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে তোকে ঐ নীচের অ্যাপার্টমেন্টে ফোন করবো। তুই যদি আমাকে তখনো অল ক্লিয়ার না দিতে পারিস, তা হলে আমি নিজেই শর্মিলার কাছে সব ফাঁস করে দেবো। আই মীন ইট!

দরজার কাছে চলে গিয়েও আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ বললো, মেয়েটা যদি খুব কান্নাকাটি করে, তা হলে বড় জোর তাকে দু-একটা চুমু-টুমু খেয়ে সান্ত্বনা দিতে পারিস, এর বেশি কিছু করে ফেলিস না কিন্তু রাস্কেল!

দড়াম করে দরজাটা টেনে দিল সিদ্ধার্থ। অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে, স্থির দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে, নিথরভাবে বসে সেটা শেষ করলো।

তার মনে পড়ছে নীল-নীল জলের দৃশ্য। জলের কী সাঙ্ঘাতিক ওজন, তার বুক চেপে শেষ নিশ্বাস বার করে আনছিল প্রায়। কেন সে সেদিনই শেষ হয়ে গেল না? এ পৃথিবীতে তার বদলে তার দাদার মতন একজন ছেলের বেঁচে থাকার অনেক বেশী প্রয়োজন ছিল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীন উঠে দাঁড়ালো। সিদ্ধার্থ ঠিকই বলেছে, অলিকে বলতেই হবে। সব কিছু, আর দেরি করাটা আরও বেশি অন্যায় হয়ে যাবে। শর্মিলার প্রতিও অন্যায়।

চাবিটা নিয়ে অতীন নেমে এলো সিঁড়ি দিয়ে। সিদ্ধার্থর বন্ধুটির ফ্ল্যাটে দরজায় চাবি লাগাতে যেতেই উল্টো দিকের দরজাটা খুলে গেল হঠাৎ। অতীন এমনভাবে চমকে কেঁপে উঠলো যেন সে চুরি করতে এসে ধরা পড়ে গেছে। একজন বয়স্কা মহিলা সারা মুখে রুজ-পাউডার মাখা, হাতে একটা শপিং ব্যাগ, অতীনের দিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না, সোজা এসে দাঁড়ালেন লিফটের সামনে, সঙ্গে সঙ্গে লিফট এসেও গেল, তিনি ঢুকে গেলেন তার গহুরে।

এরকম ভয় পাবার জন্য অতীনের নিজের গালে চড় মারার ইচ্ছে হলো। এটা অন্য দেশ। প্রায় একটা অন্য গৃহ। এখানে কে কখন কোন অ্যাপর্টমেন্টে আসছে, কে কোথায় কার সঙ্গে শুচ্ছে, তা নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে একটা কথাও উচ্চারণ করবে না। যার হাতে যখন চাবি, সেই তখন মালিক।

প্রায় নিঃশব্দে দরজাটা খুললো অতীন। বড় বিছানাটার এক কোণে গুটিশুটি মেরে শুয়ে। আছে অলি। অতীন কি কখনো অলিকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছে? তার মনে পড়ছে না। ভবানীপুরের বাড়ির তিনতলায় অলির নিজস্ব ঘরটায় কখনো কখনো ও শুয়ে শুয়ে পড়াশুনো করতো, অতীন হঠাৎ সেখানে ঢুকে পড়েছে কোনো দুপুরে, একদিন বোধহয় চোখ বোঁজাও ছিল, তবু সে দৃশ্য অন্যরকম। সেখানে সারা বাড়িতে লোক, এখানে দরজা বন্ধ করলেই আর গোটা পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগ নেই।

বিছানার কাছে গিয়ে কয়েক মিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো অতীন। দেয়াল থেকে রবীন্দ্রনাথ, চে গুয়েভারা, মৌলানা ভাসানী ব্যগ্রভাবে চেয়ে আছেন তার দিকে। মৃদু নিঃশ্বাসে ওঠা-পড়া করছে অলির বুক, তার শরীরটাই যেন একটা পাখির মতন।

খুব আস্তে অতীন দু বার ডাকলো, অলি, অলি!

অলির ঘুম ভাঙলো না। অতীনের তখন মনে হলো, একটু দূরে সরে গিয়ে কোনো একটা শব্দ করে অলিকে জাগানোই ভালো। হঠাৎ খুব কাছে অতীনকে দেখলে অলি ভয় পেয়ে যেতে পারে। খুব জোরে রেকর্ড প্লেয়ার চালিয়ে দিলে কেমন হয়?

পরমুহূর্তেই অতীন সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে অলির একটা হাত মুঠো করে ধরে ডেকে উঠলো, অলি! অলি!

অলি এবার চোখ মেলে চাইলো। অতীনকে দেখেই তাড়াতাড়ি অন্য পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করলো, শর্মিলা কোথায়?

অতীন বললো, শর্মিলা একটু বাইরে গেছে।

অলি বললো, ওমা, আমায় ডাকলো না? আমি বুঝি বড় বেশী ঘুমিয়েছি? কটা বাজে এখন?

অলি নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলো, অতীন সেটা শক্ত করে ধরে রেখে বললো, তুই কেমন আছিস, অলি!

অলি কোনো উত্তর না দিয়ে কয়েক পলক চুপ করে তাকিয়ে রইলো। অতীনের মনের মধ্যে একটা প্রবল ইচ্ছে করছে অলিকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে। এই সেই অলি, তার একেবারে নিজস্ব, অলির ওপর সে কত অত্যাচার করেছে, অলির ঠোঁট কামড়ে রক্ত বার করে দিয়েছিল

একদিন, অলি সব সহ্য করেছে, তার ওপর ছিল অলির অসীম নির্ভরতা!

কিন্তু অতীন এটাও বুঝলো, অলিকে এখন জড়িয়ে ধরে আদর করা আর যায় না। সে শর্মিলাকেও অপমান করতে পারে না।

অলির সারা মুখে একটা লজ্জা লজ্জা ভাব ছড়িয়ে পড়লো। সে মুখ নীচু করে বললো, বাবলুদা, তুমি আমার ওপর খুব রেগে গেছো, তাই না? কলকাতা থেকে কেউ নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে তোমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছে!

অতীন বললো, তার মানে? কেউ তো আমায় কিছু লেখেনি!

অলি বললো, এখানে পৌঁছোবার পর আমি তোমাকে এড়িয়ে এড়িয়ে থাকছিলুম, তুমি বুঝতে পারোনি? সব সময় শর্মিলার পাশাপাশি থেকেছি, যাতে তোমার সঙ্গে একলা পড়ে যেতে না হয়। বাবলুদা, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে তো?

অতীন এবার ভুরু তুলে বললো, কী বলছিস তুই? কী হয়েছে অলি?

অলি মুখ না তুলেই অপরাধিনীর মতন বললো, আমি আরও জোরজার করে অ্যামিরিকায় এলুম কেন জানো? শুধু তোমার জন্য! মানে, তোমার কাছে সব কথা খুলে বলবো, চিঠিতে লেখা যেত না, চিঠিতে বোঝানো যায় না।

অলির হাত ছেড়ে কার্পেটের ওপর বসে পড়ে অতীন সিগারেট খুঁজতে লাগলো। সে এখনো কিছুই বুঝতে পারছে না, কিংবা বুঝতে চাইছে না।

অলি বললো, তুমি অনেকদিন ছিলে না, আমি বড় একা হয়ে পড়েছিলুম, বাবলুদা। আমার তো আর কোনো বন্ধু ছিল না। বর্ষাও চাকরি নিয়ে বাইরে চলে গেল। একমাত্র পমপমের। সঙ্গেই যোগাযোগ ছিল, পমপম জেলে যাবার পর, আর কেউ রইলো না! তখন একজন এলো, আমার পাশে দাঁড়ালো, আমার মনটা খুবই দুর্বল, তুমি তখন অ্যাবণ্ড করে আছো, তোমার হোয়্যার আবাউটস কেউ জানে না, এমনকি কৌশিকও জানে না বলেছিল, বাবলুদা, আমি তখন প্রায় ভেঙে পড়েছিলাম, সেই সময় একজন আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, সেই হাত আমি ফেরাতে পারিনি।

অতীন তীক্ষ্ণ স্বরে বললো, তোর সঙ্গে একজন কারুর ভাব হয়েছে? কে সে?

অলি বললো, তুমি তাকে দেখেছো, হয়তো হয়তো নামটা মনে নেই। তার নাম শৌনক ব্যানার্জি, পমপমের বাবার হয়ে ইলেকশন ক্যামপেন করেছিল।

–শৌনিক ব্যানার্জি? পমপমের বাবার হয়ে কাজ করেছিল, তার মানে সি পি এম?

–বাবলুদা, শুধু কোন পার্টির লোক, এই হিসেব করে কি মানুষের বিচার করা যায়? শৌনক খুব পরিচ্ছন্ন মানুষ, আমাকে সে খুব ভালো বোঝে। এত ভদ্র যে কোনোদিন ব্যবহারে কোনো রকম বেচাল কিছু, মানে, সত্যি কথা বলছি, তুমি রাগ করো না, বাবলুদা, তার সঙ্গে তোমার স্বভাবের অনেক দিক থেকে মিল আছে। সেই সময়টায় আমার মনের যা অবস্থা, শৌনক আমার পাশে এসে না দাঁড়ালে আমি বোধহয় পাগল হয়ে যেতুম! আমি দুর্বল বাবলুদা, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি। তুমি আমাকে ক্ষমা করবে?

ঘুম থেকে সদ্য জেগে উঠলেও অলির কণ্ঠস্বরে একটুও জড়তা নেই। শেীনকের চেহারাও তার কাছে স্পষ্ট। শুধু শৌনকের চোখ দুটো সে দেখতে পায় না। যেন একটা মাটির মূর্তিতে এখনো চক্ষু দান হয়নি। যেন একজন নবীন শিল্পীর গড়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ মূর্তি, তাই এর প্রতি বিশেষ মায়া ও আসক্তি। সেইরকম আসক্তি নিয়েই সে শৌনক সম্পর্কে কথা বলে যেতে লাগলো। একটু একটু লজ্জায় তার মুখে লালচে আভা।

অতীনের সবঙ্গ রাগে জ্বলে উঠলো। নিশ্চিত কোনো মতলববাজ ছেলে অলির মতন একটা নরম মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করার সুযোগ নিয়েছে। অলিকে পাওয়ার লোভ তো আছেই, অলির বাবার সম্পত্তি পাবার লোভও থাকতে পারে। ঐ সি পি এমের ছেলেগুলো এখন ভোটে বিশ্বাস করে, পাওয়ারে গিয়ে আখের গুছিয়ে নিতে চায়। সব কটা এখন কেরিয়ারিস্ট!

আবার কাছে এসে অন্যরকমভাবে অলির হাত চেপে ধরে অতীন কড়া গলায় বললো, কে ঐ শৌনক, তুই আমাকে সব খুলে বল তো! তোকে যদি কেউ ঠকাবার চেষ্টা করে, আমি তাকে শেষ করে দেবো!

অলি মুখ তুলে ফ্যাকাশে-ভাবে হেসে বললো, বাবলুদা, আমি যেমন তোমার অলি ছিলুম, চিরকাল সেইরকমই থাকবো। শুধু সম্পর্কটা একটা আলাদা হবে। আমি শৌনককে কথা দিয়ে ফেলেছি। তুমি ওর ওপর রাগ করো না! আমার ওপর যতখুশী রাগ করতে পারো।

অতীন বললো, সি পি এমের ছেলে, তার মানে কৌশিকদের সঙ্গে তুই কোনো সম্পর্ক রাখিসনি?

অলি বললো, ঠিক তার উল্টো। কৌশিক-পমপমদের সঙ্গে শৌনকের যতই মতবাদের তফাত থাকুক, তবু শৌনক ওদের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলে না। বরং ইনডাইরেক্টলি আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। শৌনক চায়, মানিকদা-কৌশিকদের মতন এককালের সিনসিয়ার ওয়াকারদের আবার দলে ফিরিয়ে আনতে। নিজেদের মধ্যে মারামারি-খুনোখুনি ও ঘৃণা করে।

–অলি, আমি আগে এই শৌনক নামের ক্যারেকটারটিকে দেখতে চাই! আমি সি পি এমের ছেলেদের বিশ্বাস করি না। ওরা সরোজ দত্ত, সুশীতলদাকে দল থেকে কৌশিক এখন কোথায়?

–কৌশিক জেল ব্রেক করেছে, তা তুমি নিশ্চয়ই জানো। এত সাকসেসফুলি পালিয়েছে, যে এরকম নাকি ওখানকার হিষ্ট্রিতে কখনো হয়নি। কৌশিক এখনও পুরোপুরি অ্যাকটিভ।

–আর মানিকদা?

–অ্যাবসকন্ড করে আছেন। শৌনকেরই একটা চেনা বাড়িতে, মানিকদা অবশ্য সেটা জানেন না। মানিকদা তোমার কথা খুব বলেন।

অতীনের প্রশ্নগুলো শৌনককে ছেড়ে অন্যদিকে চলে যেতে অলি অনেকটা স্বাভাবিক বোধ করলো।

ঝনঝন করে বেজে উঠলো টেলিফোন। অতীন গিয়ে ধরতেই সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করলো, হ্যালো ওল্ড চ্যাপ, অল ক্লিয়ার?

ক্লান্ত, পরাজিত, বিমর্ষ সুরে অতীন বললো, হুঁ। অল ক্লিয়ার।

৪৬. পঁচিশে মার্চের পর টিক্কা খানের নাম

পঁচিশে মার্চের পর টিক্কা খানের নামটিই বাঙালীর মনে ত্রাসের সৃষ্টি করে। তিনি একই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এবং সামরিক আইন প্রশাসক। লেফটেনান্ট জেনারেল টিক্কা খান শক্ত মেজাজের মানুষ। পঁচিশে মার্চ রাত্রের সেই যে গোপন পরিকল্পনা, একই সঙ্গে বাঙালী সৈনিক, পুলিশ ও সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংবাদপত্র অফিসে আক্রমণ, শেখ মুজিবকে আটক ও প্রতিটি শহরে ভীতির অবস্থা সৃষ্টি করা, যে পরিকল্পনার সামরিক নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট, তার প্রধান পরিচালক এই টিক্কা খান। অগ্নিকাণ্ড ও রক্তের স্রোত বইয়ে দেবার ব্যাপারে তাঁর কোনো গ্লানি হয়নি, কারণ এ সবই তো তাঁকে করতে হয়েছে নিছক কর্তব্যের খাতিরে, পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর।

মাস ছয়েকের মধ্যে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহ অনেকটা ঠাণ্ডা করে এনেছেন। সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে এখনও সংঘর্ষ চলছে বটে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে বিশ্বাসঘাতক মুক্তিযোদ্ধারা চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শহরগুলির অবস্থা অনেকটা স্বাভাবিক, সরকারি কাজকর্ম মোটামুটি চলছে, দোকান বাজার সব খুলেছে। এই সব কৃতিত্বই টিক্কা খানের।

হঠাৎ এই সময় তার বদলির আদেশ এলো!

পচিশে মার্চ যেমন ভাবে তোক বাঙালীদের দমন করার আদেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেই যে গোপনে রাওয়ালপিন্ডি চলে গেলেন, তারপর আর তিনি পূর্ব পাকিস্তানমুখো হননি। তার ঘনিষ্ঠ সহচররা কেউ কেউ বলে, তিনি বাঙালীদের অকৃতজ্ঞতায় বড়ই বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। ঐ বাঙালীগুলো আধা-হিন্দু, ওরা পাকিস্তানকে না-পাক করে দিতে চায়। মূর্তিপূজক, অপবিত্র হিন্দুদের থেকে পৃথক হবার জন্যই তো জন্ম হলো পাকিস্তানের, এখন ঐ পূর্ব পাকিস্তানীরা আবার ভারতের খপ্পরে সাধ করে যেতে চায়?

মনের খেদ মেটাতে তিনি সঙ্গী করলেন সুরার বোতল, দু-একটি রক্ত মাংসের সঙ্গিনীও রইলো তাঁর সেবার জন্য। দিনের পর দিন তিনি ঘর থেকে বেরুতেই চান না।

মাঝে মাঝে তার হুঁস হয়, তখন তাঁর বুক জ্বালা করে ওঠে। তিনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান নন, তিনি। একজন পেশাদার সেনাধ্যক্ষ। তার এত বড় শক্তিশালী পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী থাকতেও যদি পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তার থেকে অপমানের আর কী আছে? ভারত যতই মদত দিক, পাকিস্তানের সৈনিকেরা তার মুকাবিলা করতে পারবে না? ভারতের প্রধানমন্ত্রী একজন স্ত্রীলোক, যুদ্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, সেই স্ত্রীলোকটির কাছে হার স্বীকার করবেন তিনি?

এক এক সময় তার ইচ্ছে হয়, বন্দী শেখ মুজিবের মুণ্ডটা এক কোপে উড়িয়ে দিয়ে তিনি আবার ঢাকায় যাবেন। সেখানে গিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেবেন যে তিনিই পাকিস্তানের দুই অংশের একেশ্বর। তেজের মাথায় তিনি করাচি পর্যন্ত চলে এলেও তার বিশ্বস্ত পরামর্শদাতারা। তাঁকে আটকে দেয়। এখন কোনোক্রমেই তার পক্ষে পূর্ব দিকে যাওয়া ঠিক নয়। বিশ্বাসঘাতকরা তাঁর বিমান ধ্বংস করে দিতে পারে, ঢাকা শহরেও যখন তখন বিস্ফোরণ ঘটছে। আর মুজিবকে হত্যা করাও উচিত কাজ হবে না, কারণ মৃত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

তাদের আরও মত এই যে, এখনও একটা রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করা দরকার।

রাজনৈতিক সমাধানের জন্য তো ইয়াহিয়া কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু লারকানার ভুট্টোই তো কিছুতেই মুজিবের সঙ্গে আপোসে এলো না! ভুট্টো যতই চালাক চালাক কথা বলুক, পূর্ব

পাকিস্তানে তার পার্টির জন্য সে ভোটও আদায় করতে পারেনি, আবার মুজিবের সঙ্গে ক্ষমতা। ভাগাভাগির প্রশ্নে সে কোনো যুক্তিরও ধার ধারেনি। পাকিস্তান যদি ভাঙে, তবে তার জন্য কে বেশী দায়ী হবে, মুজিব না ভুট্টো?

ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি করেছে, তা করুক, চীন ও আমেরিকা পাকিস্তানের বন্ধু। চুড়ান্ত বিপদের সময় তারা সাহায্য করবে। কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে ইঙ্গিত আসছে যে চীন ও আমেরিকা মনে করে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উচিত সামরিক চাপ কমিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের মন জয় করা। আর একটা উপ-নির্বাচন, জনপ্রতিনিধিদের হাতে কিছুটা ক্ষমতার হস্তান্তর, খানিকটা গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা করা। ভাবপ্রবণ বাঙালীরা তো এই সবই চায়।

সেপ্টেম্বরের গোড়ায় ইয়াহিয়া খান হঠাৎ ঠিক করলেন, পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীকে আলাদা করে দেবেন। এর জন্য প্রথমেই দরকার একজন বেসামরিক গভর্নরের। প্রথমে প্রস্তাব গেল নুরুল আমিনের কাছে। এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদটি কিছুদিন এদিককার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা যথেষ্ট, নিষ্ঠাবান মুসলমান, আওয়ামী লীগের ঘোরতর বিরোধী এবং খাঁটি পাকিস্তান সমর্থক। তিনি উপযুক্ত ব্যক্তি তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু স্বাস্থ্যের কারণে জনাব নুরুল আমিন এই গুরু দায়িত্ব নিতে নাকি চাইলেন না।

তখন ঠিক করা হলো ডাক্তার এ এম মালিককে। তিনি একজন দাঁতের ডাক্তার এবং বয়েসও পঁচাত্তরের কাছাকাছি, একসময় ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনীতি করেছেন বটে, কিন্তু অনেকদিন সেসব থেকে দূরে ছিলেন। তিনি গভর্নরের পদ নিতে রাজি হয়ে গেলেন।

নতুন গভর্নরের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় উপস্থিত থাকলেন অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি, যেমন সবুর খান, ফজলু কাদের চৌধুরী, প্রাক্তন গভর্নর মোনেম খান ইত্যাদি। এসেছেন অনেক ব্যবসায়ী, সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রদূত। বৃদ্ধ ডাক্তার মালিকের গায়ের চামড়া থলথল করছে, চোখে বেশী পাওয়ারের চশমা, তাঁকে দেখে অনেকেই ভাবতে লাগলো, এই লোকটি আসছে লৌহমানব টিক্কা খানের বদলে শাসনভার নিতে! এই দুঃসময়ে এমন পরিবর্তন!

ক্ষমতার অর্ধেক চলে যাওয়ার টিক্কা খান ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করলেন। অচিরেই জানা গেল যে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান হয়েও আসছেন আর একজন, লেফটেনান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী।

টিক্কা খানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদ দেবার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট নন। এক এলাহি নৈশভোজ দেওয়া হলো তাঁর বিদায় সম্মানে, সেখানেও তিনি মুখ গোমড়া করে রইলেন। যখন তাঁকে একটা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দিতে বলা হলো, তিনি স্পষ্টই বলে ফেললেন, পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্ব নেবার জন্য আমাকে তাড়াহুড়ো করে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ডেকে আনা হয়েছিল ৪ঠা মার্চ। এখন কেন হঠাৎ আমাকে চলে যেতে বলা হচ্ছে তা আমি জানি না, সে বিষয়ে মন্তব্যও করতে চাই না। প্রেসিডেন্ট যা ভালো বুঝবেন নিশ্চয়ই তা করবেন। যে কাজে আমি হাত দিয়েছিলাম, সেটা শেষ করে যেতে পারলেই আমি খুশি হতাম। আমি দুঃখিত যে আপনাদের মধ্যস্রোতে ফেলে রেখে যাচ্ছি। যাই হোক, আপনারা নিয়াজীর মতন একজন অভিজ্ঞ কমান্ডারকে পেয়েছেন, সেটাই আশার কথা। আপনাদের প্রতি আমার শুধু এই একটাই অনুরোধ, সব সময় মনে রাখবেন, মুঠো আলগা করা চলবে না, এই বাঙালী জাতটাকে শক্ত করে চেপে রাখবেন!

অভিজ্ঞ সেনানী হলেও আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর স্বভাবটা অনেকটা ঢিলেঢালা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মতন তিনিও ভোগী পুরুষ। তাঁর মুখ আলগা, আদি রসাত্মক ইয়ার্কি ঠাট্টার জন্য তিনি আর্মি ব্যারাকে প্রসিদ্ধ। বক্তৃতা পর্বের মধ্যে নিয়াজী একসময় প্রবল হাসি-হুল্লোড়ের মধ্যে নানারকম মন্তব্য করতে করতে শেষে বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না টিক্কা খান সাহেব, আমি ঐ মুক্তিযোদ্ধা ব্যাটাদের পেছনগুলো একে একে এমন…

অনেক বাঙালীই টিক্কা খানের নাম শুনে ভয় পেত, তাকে মান্য করতো। ডক্টর মালিককে তারা প্রথম থেকেই অগ্রাহ্য করতে শুরু করলো। এমনকি যারা নিজেরা দালাল, তারাও অন্য দালালদের পছন্দ করে না।

রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে গিয়ে ইয়াহিয়া খান আর একটি ভুল করলেন। যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, তারা ছাড়া তিনি আর সব কারাবন্দীদের মুক্তির আদেশ দিলেন এবং সমস্ত দুষ্কৃতকারীদের ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। তিনি বা তার উপদেষ্টারা বোধহয় ভেবেছিলেন যে ক্ষমার কথা শুনলেই বুঝি মুক্তিযোদ্ধারা সব অনুতপ্ত হয়ে সুড়সুড় করে বাপমায়ের কাছে ফিরে আসবে। সেরকম কিছুই ঘটলো না। বরং এই সুযোগে মুক্তিযোদ্ধারা আরও দুঃসাহসী হয়ে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে এসে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতে লাগলো।

বন্দীমুক্তির ঘোষণায় প্রকটিত হয়ে উঠলো সেনাবাহিনীর এত দিনের অত্যাচারের বীভৎস রূপ। প্রেসিডেন্টের দয়ায় জয়দেবপুর, ঢাকার জেলখানা থেকে ছাড়া পেল মাত্র শ’দুয়েক বন্দী। তাহলে যাদের নামে কোনো চার্জশিট নেই অথচ এবারে মুক্তিও পেল না। সেইরকম হাজার হাজার যুবকেরা গেল কোথায়? তাদের বিনা বিচারেই হত্যা করে লাশ গায়েব করে ফেলা হয়েছে নিশ্চয়ই। বেগম জাহানারা ইমামের ছেলে রুমীও এই সময় ছাড়া পেল না। তার কোনো সন্ধানও পাওয়া গেল না। অবশ্য ফকির পাগলাবাবা এখনও বলে চলেছেন, ফিরে আসবে। রুমী ঠিক ফিরে আসবে। জাহানারা ইমামের মতন অনেক জননী সেই বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বসে আছেন, বলা তো যায় না, হয়তো ওরা জেলখানা ভেঙে পালিয়ে গিয়ে সীমান্তের ওপারে কোথাও আত্মগোপন করে রয়েছে।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমা ঘোষণায় সাধারণ মানুষের আরও মনে হলো, এবার বুঝি তাহলে শেখ মুজিবও ফিরে আসবেন। ইয়াহিয়া খান কোনো বড় শক্তির চাপেই এমন নরম হয়েছেন। এবার তিনি শেখ মুজিবকেও মুক্তি দিতে বাধ্য হবেন। এই ধারণা নতুন আশার সঞ্চার করলো। যারা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সন্দিহান হয়ে উঠেছিল ইতিমধ্যে তারা ভাবলো, শেখ মুজিব ফিরে এলে স্বাধীনতা না নিয়ে ছাড়বেন না। তা হলে আর পাকিস্তানী কর্তাদের মান্য করার কী মানে হয়!

লেফটেনান্ট জেনারেল নিয়াজী খাবার টেবিলে বসে অনেকক্ষণ গালগল্প করতে ভালোবাসেন। মাঝেমাঝেই তিনি গর্ব করে সহযোদ্ধাদের বলেন, এটা জেনে রেখো, ইন্ডিয়া যদি টোটাল ওয়ার শুরু করতে চায়, তাহলে সে যুদ্ধ হবে ভারতের মাটিতে! আমার পাকিস্তানে আমি কোনো ক্ষয়ক্ষতি হতে দেবো না!

একদিন তিনি আরও বাড়িয়ে বলে ফেললেন, তোমরা দেখতে চাও, আমি কলকাতার বুকে কামানের গোলা ফেলতে পারি কিনা? আমি ইচ্ছে করলে যে-কোনো সময়ে কলকাতা দখল করে নিতে পারি। ইনসাল্লা, আমরা কলকাতার সবচেয়ে বড় হোটেলে শিগগিরই খানা খাবো। তবে কিনা, কলকাতা শহরটা বড় গন্ধা, আমার যেতে ইচ্ছে করে না।

নিয়াজী এক এক সময় বিদেশী সাংবাদিকদের সামনেও এইরকম কথা বলে ফেলেন বলে তার প্রেস অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স অফিসার সিদ্দিক সালিক বড় অপ্রস্তুতে পড়ে যায়। সেনাপতির এরকম বাগাড়ম্বরে অন্য দেশের সাংবাদিকরা গুরুত্ব দেবে কেন?

একদিন নিরিবিলিতে পেয়ে সিদ্দিক বিনীতভাবে বললেন, জেনারেল, আমাদের সামরিক শক্তির ব্যাপারটা এতখানি বাড়িয়ে বলা কি ভালো?

নিয়াজী হাসতে হাসতে বললেন, এ আর আমি এমনকি বাড়িয়ে বলেছি হে! তুমি জানো না, ধাপ্পা আর মিথ্যে স্ট্যাটিসস্টিকই হলো সব যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার।

সিদ্দিক বললো, জেনারেল, যদি অভয় দেন তো বলি, আমরা নিজেদেরই ধাপ্পা দিচ্ছি না। তো? এখনো পুরো যুদ্ধ লাগেনি, এরই মধ্যে আমাদের সীমান্তের ৩০০০ বর্গমাইল ভারতের অধীনে চলে গেছে।

নিয়াজী বললেন, ঐ জায়গা আমরা আবার যে কোনো সময়ে পুনর্দখল করে নিতে পারি। আমার অধীনে সত্তর হাজার অতি সুশিক্ষিত সৈন্য আছে। আরও পাঁচ ব্যাটেলিয়ন আসছে। স্থলযুদ্ধে আমরা ভারতের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী, বুঝলে হে!

–কিন্তু জেনারেল, বিমান ও নৌবহরের শক্তিতে আমরা কিছুই না। মানে, পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কখনো জোরালো করা হয়নি, পশ্চিমেই বেশীর ভাগ রাখা হয়েছে।

–শোনো সিদ্দিক, শুধু সৈন্যসংখ্যা দিয়ে আর প্লেন আর জাহাজ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। যুদ্ধে জয় পরাজয় হয় সেনাপতির জন্য। সঠিক সংখ্যক সৈন্য, সঠিক জায়গায় এবং সঠিক সময়ে নিয়োগের কায়দা যে সেনাপতি জানে, সে-ই জেতে। পূর্ব পাকিস্তান ভাগ্যবান, তারা যথাসময়ে একজন যোগ্য সেনাপতি পেয়েছে।

–সেটা ঠিকই বলেছেন, স্যার। আপনার মতন সেনাপতি কজন আছে এখন পৃথিবীতে। তবে কি না, আমাদের শত্রু দু’দিকে। দেশের মধ্যে আর বাইরে। দেশের মানুষও যদি শত্রুতা করে, তবে সেই যুদ্ধ যে-কোনো সেনাবাহিনীর পক্ষে দুঃসহ হয়ে ওঠে। ঠিক কি না, বলুন?

–তা অনেকটা ঠিক বটে। কিন্তু দেশের মানুষের মন বদলাবার দায়িত্ব তো তোমাদের মতন। অফিসারদের। রেডিও, টি ভি, খবরের কাগজ সব জায়গায় দেশাত্মবোধের সুর তোলো, পবিত্র ইসলামের জয়গান করো, হিন্দু ভারতের পিণ্ডি চটকাও!

–তার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে মনে হয়। স্যার, আমি আপনার থেকে কিছু আগে এসেছি ঢাকায়, আমি এসেছি সত্তর সালে, ইলেকশানের আগে। তখন থেকেই দেখছি, আমরা বাঙালীদের ওপর জোর জুলুম করেছি, কিন্তু গোড়া থেকে বন্ধুভাবে নিইনি। আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের অনেকেরই ধারণা, বাঙালী মুসলমানরা পুরোপুরি মুসলমান নয়!

–কেন, সেটা কি ভুল নাকি?

–জী, অবশ্যই ভুল। আমি অনেক বাঙালী মুসলমানের অন্তঃপুরে গিয়ে দেখেছি। তারা নিষ্ঠাবান মুসলমান। তারা ইসলামকে যে অন্তর দিয়ে মান্য করে শুধু তাই নয়, তারা ইসলাম সম্পর্কে আমাদের অনেকের চেয়ে বেশী জানে। তবে তাদের কিছু আচার আচরণ আছে, যা আমাদের নেই। যেমন শবে বরাত। তাতে কিছু যায় আসে না।

 –কিছু ধার্মিক মুসলমান তো থাকতেই পারে। তারাও কি পাকিস্তানের বিরোধী?

–তারা পাকিস্তানের বিরোধী নয় স্যার। তারা পাকিস্তানের গণতন্ত্রের পক্ষে। ওয়েস্টে কখনো ডেমোক্রেসির ধারণা স্পষ্ট ছিল না, হয়তো আজও নেই, কিন্তু এই ইস্টার্ন সাইডে ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই, বলতে পারেন সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। এখানকার ছাত্ররা পলিটিক্যালি অনেক বেশী কনসাস, এটা একটা রিয়েলিটি। ওয়েস্ট পাকিস্তানের মানুষ সদ্য ফিউডল যুগ পেরিয়ে এসেছে, আর্মি রুল সেখানে এখনও এমন কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু এরা আর্মি রুল সহ্য করতে পারে না। তবু আমরা আর্মি দিয়ে এদের রিপ্রেস করার চেষ্টা করেছি, আর্মিকে এদের বন্ধু বা সাহায্যকারী হিসেবে প্রমাণ করার কখনো চেষ্টা করিনি।

–এখনও সময় যায়নি, সিদ্দিক। তুমি এদের সাইকোলজি আরও ভালো ভাবে বুঝবার চেষ্টা করো। সেই অনুযায়ী ক্যামপেইন শুরু করো।

–আমি আপনাকে একটা উদাহরণ দেবো, স্যার? কয়েক মাস আগে ঢাকার একটি বাংলা কাগজের সম্পাদক, কাগজটির নাম দিন কাল, তার মালিক বেশ অবস্থাপন্ন, পত্রিকার ব্যবসা ছাড়াও তার কয়েকটি হোটেল আছে, সেই সম্পাদকটি প্রায় জোর করেই তার বাড়িতে আমাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেল। আমি অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম। যেতে চাইনি, কিন্তু সে অনুনয় বিনয় করলো। কারণটি হচ্ছে এই যে, এর দু’তিন দিন আগেই ভদ্রলোকটির শ্যালিকার বাড়িতে অতি তুচ্ছ কারণে মিলিটারি হামলা হয়েছিল। বাড়ি সার্চ করার নাম করে দু’তিনজন সৈন্য ঐ শ্যালিকাকে এবং বাড়ির আরও একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে। সেইজন্য এই সম্পাদকটির বাড়ির সবাই খুব আতঙ্কিত। উনি বললেন, আমাকে দেখলে বাড়ির সবাই তবু কিছুটা সান্ত্বনা ও ভরসা পাবে, কারণ আমিও মিলিটারিদের একজন।

–তুমি কি ইউনিফর্ম পরে গেলে সেই বাড়িতে।

–জী! ভদ্রলোক একেবারে অন্দর মহলে আমাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর মা, বোন ও অন্যান্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার। তারপর খুব সুন্দর সাজানো একটি ঘরে নিয়ে এলেন আমায়, সেখানে একটি দারুণ রূপসী তরুণী বসে আছে। সেই ভদ্রলোকের যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, শুনলাম ঐ যুবতীটি তাঁর তৃতীয় স্ত্রী। আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েই ভদ্রলোক বললেন, আপনারা একটু গল্প করুন। আমি এখুনি একবার হোটেল ইন্টারকন থেকে আসছি, সেখান থেকে আর একজন অতিথিকে আনতে হবে। আমাদের দু’জনকে ঐ ভাবে বসিয়ে রেখে ভদ্রলোক কেন যে চলে গেলেন তা বুঝতে পারলুম না।

–এর একটাই মানে হয়। তারপর তুমি কী করলে ইডিয়েট?

–দারুণ অস্বস্তিজনক অবস্থা। কেউ কোনো কথা বলতে পারছি না। আমি খালি ভাবছি, তৃতীয় পক্ষের বউ হলেও এই যুবতীটি বাড়ির অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে না থেকে, এই ঘরে একজন পরপুরুষের সামনে কেন বসে রইলো!

–সাধে কি আর তোমাকে ইডিয়েট বলেছি? তোমার সামনে কেউ এক প্লেট গরম কাবাব রেখে গেল, আর তুমি কি তখন ভাববে বাজারে গোস্তের দাম কত? তৃতীয় পক্ষের বউ না ছাই! ঐ ডরপুক বাঙালীটা তোমাকে খুশি করার জন্য একটা খুব সুরৎ লেড়কী যোগাড় করে এনেছিল। তুমি কিছু করলে না?

–বাকিটা শুনুন স্যার। মহিলাটিকে আমার কিন্তু মনে হলো, লেখাপড়া জানা, সফিসটিকেটেড মেজবান। খানিকক্ষণ চুপ করে কাটাবার পর আমি বললাম, শুনেছি আপনার বোনের বাড়িতে একটা মিসহ্যাপ হয়ে গেছে। শুনে আমি খুবই দুঃখিত।

–শুধু মুখের কথা বললে? মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরলে না? বেওকুফ আর কাকে বলে! ৩৭৬

–আমি ঐ কথাটা বলতেই, স্যার, ইস্ট পাকিস্তানে এক রকম সাপ আছে, তার নাম। কালনাগিনী, মেয়েটি সেই রকম কালনাগিনীর মতন ফোঁস করে উঠে বললো, দুঃখিত! আপনার লজ্জা করে না? আপনারা বাড়ি ঘর ধ্বংস করছেন, যখন তখন মানুষ মারছেন, মেয়েদের ইজ্জত কেড়ে নিচ্ছেন, তারপর শুধু ‘দুঃখিত’? আমি বললাম, দেখুন, বেগমসাহেবা, সবাই এক নয়, আমি স্বীকার করছি যে মিলিটারিতে এরকম কিছু লোক আছে… আমাকে বাধা দিয়ে মেয়েটি আবার বললো, যেন দু’চোখে আগুন ছিটিয়ে বললো, আমি আপনাদের ঐ খাঁকি উর্দির প্রত্যেকটা সুতোকে ঘেন্না করি! প্রতিটি পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যের চেহারায় ও ব্যবহারে বর্বরতার ছাপ, আমাদের ওপর অত্যাচার করাটা তারা পবিত্র কাজ মনে করে। আমি বুঝতে পারছি না, আমার স্বামী আপনাকে কেন এখানে বসিয়ে রেখে গেলেন। আমার বোনের ওপর যারা অত্যাচার করেছে, আপনিও সেই পশুদের একজন!

–তুমি কেন তাকে দেখিয়ে দিলে না যে পশুদের মতন নয়, যথার্থ প্রেমিকদের মতনও আমরা মেয়েদের খুশি করতে পারি!

–স্যার, সেই মেয়েটির কথা শুনে আমার এমন লজ্জা হলো! আমার এমনও মনে হলো যে তার কাছে হয়তো জহরের কৌটো লুকোনো আছে, আমি তাকে স্পর্শ করতে গেলেই সে আত্মহত্যা করবে। নিপীড়িত, অপমানিত মানবীরও যে এমন তেজ থাকে, তা আমি আগে দেখিনি। সেই তেজে তার মুখখানা ঝকঝক করছিল। আমি মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেলাম সেই ঘর থেকে।

নিয়াজী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলো তো, কোন বাড়ি, কোন বাড়ি, আমি সেই সুন্দরী তেজস্বিনীকে এক্ষুনি দেখতে চাই!

সিদ্দিক বললো, তার দেখা পাবেন না। সেই বাঙালী সম্পাদকটি তার পরদিনই সপরিবারে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারা ইণ্ডিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে।

মাটিতে পা ঠুকে নিয়াজী বললেন, তুমি একটি অপদার্থ, সিদ্দিক। তোমার ট্রাউজার্স খোলো তো, দেখি তোমার ঐ জিনসটি আছে কি না! ওরকম একটা চমৎকার মেয়েকে তুমি ছেড়ে দিলে? আমাদের সুন্দরী মেয়েদের যদি ইণ্ডিয়া নিয়ে নেয়, দেন ইঁট ইজ ওয়ান মোর রিজন টু ক্রাস ইণ্ডিয়া!

সিদ্দিক বললো, জেনারেল, আপনি সব ব্যাপারটা কৌতুকের সঙ্গে নিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের সৈন্যরা যদি এ রকম নির্বিচারে বাঙালী মেয়েদের ধর্ষণ করে চলে, তা হলে আমাদের প্রতি বাঙালীদের মনে তো গভীর ঘৃণার সৃষ্টি হবেই। আমাদের যত সামরিক শক্তিই থাক, কিছুতেই আর তাদের মন জয় করা যাবে না।

নিয়াজী এবারেও হালকা ভাবে বললেন, এটা ঠিক বলছো, আমাদের সৈন্যদের মধ্যে কিছুতেই ধর্ষণের প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। তাদের প্রেমিক হতে হবে। তা হলে কি আর্মির মধ্যে দা আর্ট অব লাভ মেকিং বিষয়ে একটা কোর্স চালু করবো?

–স্যার, যে আমি পুরোপুরি ইমমরাল হয়ে যায়, তারা ভালো করে যুদ্ধও করতে পারে না। আপনি বড়ারে গেলে দেখবেন, মুক্তিবাহিনীর সামান্য অ্যাটাকেও আমাদের আর্মি রিট্রিট করে। তারা ‘মুক্তি’ শব্দটাকেই ভয় পায়।

নিয়াজী এবার রেগে উঠে বললেন, সেসব আমি দেখছি! নতুন করে অর্ডার দেওয়া হবে, অন্তত সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি না হলে কোনো জায়গা থেকে রিট্রিট করা চলবে না। চলো, আমি সীমান্ত পরিদর্শনে যাবো!

কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলো কুখ্যাত প্রাক্তন গভর্নর মোনেম খান। ঢাকার রাস্তায় যেখানে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটতে লাগলো, প্রচণ্ড শক্তিশালী বোমায় উড়ে গেল ইন্টারকন হোটলের একটা অংশ, বিমানবন্দরের রানওয়েতেও মুক্তিবাহিনীর মটারের শেল এস পড়তে লাগলো। সীমান্তের বহু এলাকা থেকে পাক বাহিনীর পিছু হঠে আসার সংবাদ আসছে

এরই মধ্যে নিয়াজী বেরুলেন সীমান্ত সফরে। তিনি প্রকাশ্যে বেশী বেশী বীরত্ব দেখাতে চান বলে কখনো কখনো খোলা জিপেও দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সিদ্দিক ফিসফিস করে বলে, জেনারেল গ্রামের মানুষগুলোকে লক্ষ করুন। এরকম রোগা, হাড় জিরজিরে কুঁজো হয়ে পড়া অসংখ্য মানুষ কি পশ্চিম পাকিস্তানে দেখেছেন? আমরা শুধু এদের কম মুসলমান বলে দোষারোপ করেছি, কিন্তু আমরা কি এদের খেতে পরতেও কম দিইনি? এরা যে মরীয়া হয়ে স্বাধীনতা চাইছে, এটা কি আমরা একবারও ভেবে দেখবো না?

নিয়াজী অবহেলার সঙ্গে বললেন, ওসব রাজনীতির ব্যাপার। আমি রাজনীতি বুঝি না। আমি সোলজার, আমি শুধু জানি যে-কোনো উপায়ে তোক পাকিস্তানের ইনটিগ্রিটি রক্ষা করতে হবে। ইণ্ডিয়া আমাদের পিছন দিক থেকে ছুরি মারতে চাইছে, আমার সেনাবাহনী ইণ্ডিয়াকে উচিত শিক্ষা দেবে!

সিদ্দিক বললো, আমরা ইণ্ডিয়ার ঘাড়ে সব দোষ চাপাচ্ছি, সেটা প্রায় একচক্ষু বন্ধ করে থাকার মতন নয় কি? পূর্ব পাকিস্তানের বিরাট সংখ্যক মানুষ বিদ্রোহী হয়ে না উঠলে কি ইণ্ডিয়া এর মধ্যে নাক গলাতে পারতো? স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করে, তারা অনেক সময়ই পাশের রাষ্ট্রের সাহায্য নেয়, এতে নতুন কিছু নয়। আমার শত্রুর যে শত্ৰু, সে আমার বন্ধু, এই নীতি তো বহু স্বাধীনতার যুদ্ধেই দেখা গেছে।

নিয়াজী বললেন, তুমি আবার রাজনীতির কথা বলছো, সিদ্দিক! আমি চিন্তা করছি যুদ্ধের কথা। ওসব বলে তুমি আমার মাথা ঘুলিয়ে দিও না!

ঘুরতে ঘুরতে নিয়াজী এলেন হিলি এলাকায়। সেখানে কয়েকদিন আগেই বেশ বড় রকমের সংঘর্ষ হয়ে গেছে। এমনকি একটা ভারতীয় ট্যাংকও ঢুকে পড়েছিল অনেকখানি ভেতরে, সেটাকে অবশ্য ঘায়েল করা হয়েছে কোনোক্রমে।

একদল সাংবাদিককে জড়ো করে নিয়াজী দেখালেন সেই ট্যাংক। ভারতের বদমাইশির প্রত্যক্ষ নিদর্শন। যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, তবু ভারত ট্যাংক পাঠাচ্ছে পর্যন্ত!

ডাক বাংলোর ঘরে খানাপিনার ব্যবস্থা হলো, সেখানে নিয়াজী সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন।

একজন তরুণী সাংবাদিক এক সময় জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা জেনারাল, ইণ্ডিয়ার সঙ্গে টোটাল ওয়ার সত্যিই কি হবে! যদি হয়, আপনার ধারণায় কবে থেকে তা শুরু হতে পারে?

প্লেট থেকে মুৰ্গীর কাবাব তুলে নিয়ে মুখে ভরে দিয়ে নিয়াজী বললেন, আমার জন্য টোটাল ওয়ার তো অলরেডি শুরু হয়ে গেছে।

সেই দ্ব্যর্থক রসিকতায় অনেকেই হেসে উঠলো। তরুণী সাংবাদিকটি বললো, আমার আরও অনেকগুলো প্রশ্ন আছে।

নিয়াজী দেখলেন, মেয়েটির মুখখানা পালিশ করা, ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল, চোখের দৃষ্টিতে সেই ঝিলিক আছে যা পুরুষদের বুক কাঁপায়।

তিনি হেসে বললেন, আমি এক্ষুনি হেলিকপ্টারে ঢাকায় ফিরছি। তুমিও আমার সঙ্গে চলো। তারপর ফ্লাগ স্টাফ হাউসে তোমার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকার। তুমি যতক্ষণ চাও!

৪৭. ছোট ছোট শহরের বিশ্ববিদ্যালয়

ছোট ছোট শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভর্তি হওয়ার সমস্যার চেয়েও সেখানে থাকার জায়গা পাওয়া কম কঠিন নয়। দেশের ছাত্রাবাসগুলোকে বলে হস্টেল বা হল, এখানে সেগুলোর নাম ডর্ম। কোনো ডর্মে অলি জায়গা পায়নি। অনেক প্রাইভেট বাড়ি ছাত্র-ছাত্রীদের ভাড়া দেওয়া হয়, সেরকমও খালি নেই একটাও। একটিমাত্র অ্যাপার্টমেন্ট খালি আছে। কিন্তু তার অনেক ভাড়া, সাধারণত দু’জন ছাত্র বা ছাত্রী এরকম অ্যাপার্টমেন্ট ভাগাভাগি করে নেয়। অন্য কোনো মেয়ে আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না, একজন বিদেশী অধ্যাপক এ অ্যাপার্টমেন্টের অর্ধেক নিতে আগ্রহী। পিটার মেয়ার সেটাই ধরে রেখেছিলেন অলির জন্য। এখানে ছেলে-মেয়েদের একসঙ্গে থাকা মোটেই বিচিত্র কিছু নয়। দুটি বেডরুমের মাঝখানে কিচেন, টয়লেট, ডাইনিং রুম, সেগুলো দু’জনের ব্যবহারের জন্য, আবার বেডরুমের দরজা বন্ধ করলে দুটো দিক সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। দু’দিক দিয়েই ঢাকা-বেরুনোর ব্যবস্থা আছে। নরোয়েজিয়ান অধ্যাপকটি মাত্র ছ’ মাসের জন্য এসেছেন। সেইজন্যই তিনি বেশি দামের বাড়ি ভাড়া নিতে চান না।

কিন্তু প্রস্তাবটি শুনেই অলি বেঁকে বসলো। সে একজন অচেনা সাহেবের সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে থাকবে? অসম্ভব! লজ্জাতেই সে মরে যাবে। বস্টনে দু’দিন কাটাবার পর শর্মিলা আর অতীন অলিকে পৌঁছে দিতে এসে এই সমস্যায় পড়ে গেল। অলি তাহলে থাকবে কোথায়? পরের দিনই রেজিস্ট্রেশন, অলির পক্ষে বস্টনে ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়।

শর্মিলার মামা ও মামিমার বাড়ি রাজধানী ওয়াশিংটন ডি সির উপকণ্ঠে, সেখানে অলি স্বচ্ছন্দে থেকে যেতে পারে। মেরিল্যান্ড থেকে খুব বেশি দূর নয়। তবে যাতায়াতে রোজ অনেকটা সময় চলে যাবে, পয়সাও তো খরচ হবে। তবু আপাতত কিছুদিন তো এইভাবেই চলুক। শর্মিলার এই প্রস্তাবেও অলি চুপ করে ছিল, মন থেকে সায় দিতে পারেনি। শর্মিলার মামা তার কাছ থেকে পয়সা নেবেন না। সে কেন একজনের বাড়িতে আশ্রিতের মতন থাকতে যাবে?

অলির অধ্যাপক পিটার মেয়ার বললেন, আর দুটি অল্টারনেটিভ আছে। কী বলো তো? প্রথমত, অন্তত দিন দশেক কোনো মোটেলে থাকো, তার মধ্যে আমি নিশ্চয়ই কোনো ডর্মে ব্যবস্থা করতে পারবো। দু চারদিন কাটলেই বোঝা যাবে যে কোন কোন পুরোনো ছাত্র-ছাত্রী এই সেমেস্টারে আর ভর্তি হচ্ছে না। তখন সীট খালি পাওয়া যাবে।

অলি কিছু বলার আগে অতীনই আপত্তি জানালো। যেন সে অলির অভিভাবক। মোটেল মানে সরাইখানা। সেখানে সাধারণত এক রাতের অতিথিরা আসে। দীর্ঘ পথ গাড়ি চালিয়ে

এসে শ্রান্তি অপনোদনের জন্য তাদের কেউ কেউ মদ খেয়ে হল্লা করে। সে রকম জায়গায়। একা থাকবে অলি? তার চেয়ে ওয়াশিংটন ডি সি-তে শর্মিলার মামার বাড়ি অনেক ভালো। কত আর দূর? কলকাতার অনেক ছেলে মেয়ে তো বর্ধমান থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে।

পিটার মেয়ার বললেন, তা হলে দ্বিতীয় অলটারনেটিভ হচ্ছে…চলো, বরং জায়গাটা দেখে আসি আগে।

জিন্স আর হলুদ গেঞ্জি পরা, মাথার কাঁচা-পাকা চুলে কোনোদিন চিরুনি পড়েনি মনে হয়, মুখে পরিচর্যাহীন দাড়ি-গোঁফ, রোগা আর লম্বা চেহারা, এতই লম্বা যে একটুখানি কুঁজো দেখায়, রয়েস প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, পিটার মেয়ারকে অধ্যাপক বলে মনেই হয় না। মনে হয়, কোনো ঐতিহাসিক কাহিনী চিত্রের পার্শ্ব অভিনেতা। তিনি শুধু অধ্যাপকই নন, কিছু লোক নাম জানে এমন একজন লেখকও বটে, মোট তিনখানি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে এ পর্যন্ত, গত চার বছর ধরে তিনি আর একটি উপন্যাস রচনা করেছেন, তার মাত্র সত্তর পৃষ্ঠা তিনি লিখে উঠতে পেরেছেন, সেটুকুও তৃতীয় খসড়া।

প্রথম কয়েকবার তিনি অলিকে আলি, আলি বলে ডাকছিলেন, যখন তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে আলি মুসলমান পুরুষদের নাম হয়, তারপর থেকে তিনি বেশ যত্ন করে ওলি বলতে লাগলেন। বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের থাকা-টাকার দায়িত্বও যে একজন অধ্যাপক স্বেচ্ছায় ঘাড় পেতে নেন, তা দেখে অলি গোড়া থেকেই মুগ্ধ।

পিটার মেয়ারের একটা ঝরঝরে পুরোনো গাড়ি আছে, উনি সেটাকে কার না বলে বলছিলেন। জ্যালোপি। শর্মিলা এক সময় অলির কানে কানে বলে দিয়েছে যে, এদেশে যার পুরোনো গাড়ি, তাকেই কিন্তু গরিব ভেবো না। এ বছর পুরোনো ধরনের গাড়ি চালানোটাই ফ্যাশান। গত বছর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ফ্যাশান ছিল ময়লা কেডস জুতো পরা। অনেকেই নতুন কেডস কিনে তাতে গাড়ির মোবিল একটুখানি লাগিয়ে নিত।

সেই গাড়িতে ওঠার পর পিটার মেয়ার বললেন, তোমাদের ক্যালকাটার খবর এখন প্রায় এখানকার টেলিভিশান আর খবরের কাগজে থাকে। তোমাদের ঐ ওভার ক্রাউডেড সিটিতে নাকি আবার মিলিয়ানস অফ রেফিউজিস এসেছে? এই বাংলাদেশ সমস্যাটা নিয়ে তোমরা কী মনে করো? শিগগির মিটবে?

অলির থাকার জায়গা এখনো ঠিক হয়নি, তাই নিয়ে ওরা তিনজনেই উদ্বিগ্ন, এখন বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করায় ওদের আগ্রহ নেই। তবু কিছু তো একটা উত্তর দিতে হবে, তাই অতীন প্রথমে নিরুত্তাপ গলায় বললো, সহজে মিটবে না, অনেকদিন চলবে। একদিকে ধর্মীয় উন্মাদনা আর সামরিক নিষ্পেষণ আর অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের সেন্টিমেন্ট আর ভাষা নিয়ে উচ্ছাস, এর কোনোটাতেই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কিছু যায় আসে না, এটা বিপ্লব কিংবা বিদ্রোহ নয়, একটা ভাবাবেগের লড়াই, এতে কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না।…

বলতে বলতে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে অতীন বললো, তোমরা অ্যামেরিকানরাই তো পাকিস্তানকে গাদা গাদা অস্ত্র দিচ্ছো, আর সেই অস্ত্রে সাধারণ মানুষ মরছে! ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে-কোনো ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে থাকে।

পিটার মেয়ার বললেন, সেটা অস্বাভাবিক তো নয়। তোমাদের ইন্ডিয়ার সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ানের সামরিক চুক্তি হয়েছে। আগে থেকেই অনেকটা ছিল, এখন তো বলতে গেলে ইন্ডিয়া পুরোপুরি সোভিয়েত শিবিরে। তা হলে অ্যামেরিকা তো পাকিস্তানকে হাতে রাখতে চাইবেই।

শর্মিলা বললো, সোভিয়েত ইউনিয়ানের সঙ্গে ইন্ডিয়ার সামরিক চুক্তি হয়নি, কুড়ি বছরের বন্ধুত্ব চুক্তি হয়েছে।

পিটার মেয়ার হেসে বললেন, অস্ত্রের কথা বাদ দিয়ে কি দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব হয়? সোভিয়েত ইউনিয়ানের সেনাপতিরা দিল্লিতে ঘন ঘন যাতায়াত করছে কেন? ইন্ডিয়া মিগ বিমান পেয়েছে কার কাছ থেকে?

অতীন প্রায় ধমক দিয়ে বললো, তোমরা অ্যামেরিকানরা গণতন্ত্রের গর্ব করো, কিন্তু পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে বাদ দিয়ে তোমরা ভাব জমাও যত সব সামরিক একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে। জঘন্য ব্যাপার। আসলে তোমাদের মতলব, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর চার পাশে কামান বসিয়ে রাখা।

পিটার মেয়ার বললো, অনেকদিন ধরে সামরিক শাসন চলছে যে পাকিস্তানে, তার সঙ্গে চীনেরও তো বেশ বন্ধুত্ব। পাকিস্তানের মধ্যস্থ করে এখন চীনের সঙ্গে অ্যামেরিকারও ভাব জমতে শুরু করেছে। নিক্সনের দূত কিসিংগার এই মহুর্তে পিকিং-এ। রাষ্ট্রপুঞ্জে তাইওয়ানকে হঠিয়ে দিয়ে কম্যুনিস্ট চীনকে সদস্য করা হলো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্ডিয়া এখন অনেকটা একঘরে হয়ে পড়লো, তাই না?

শর্মিলা বললো, ভারত একটা গরিব দেশ, তবু তাকে অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করেছে এই পাকিস্তান আর চীন। ক্ষুধার্ত শিশুরা খেতে পায় না, আর অস্ত্রের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়। ধনী দেশগুলো সেই সব অস্ত্র বিক্রি করে আরও ধনী হয়। আমেরিকা। এক ধমক দিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, শেখ মুজিব আর ভুট্টোকে আবার আলোচনার টেবিলে বসাতে পারতো না? ওরা রাজনৈতিক ভাবে মিটিয়ে নিলে ভারতকে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর ভার বহন করতে হতো না, সীমান্তের সংঘর্ষও এড়ানো যেত, এত নিরীহ মানুষেরও প্রাণ যেত

পিটার মেয়ার বললো, তা বলে ভেবো না যেন আমি রাষ্ট্রপতি নিক্সনের সব নীতি সমর্থন করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ঐ লোকটা একটা গোঁয়ার ও নিবোধ!

অলি একটাও কথা বলছে না, সে জানলা দিয়ে দেখছে এই নতুন দেশ। অবশ্য সব কথা তার কানে আসছে। সে লক্ষ করলো, চীনের প্রসঙ্গ ওঠার পর বাবলুদা কেমন যেন চুপসে গেল, আর কোনো মন্তব্য করছে না। সে আরও লক্ষ করলো, আন্তজাতিক রাজনীতি সম্পর্কে শর্মিলার বেশ পরিষ্কার মতামত আছে, সে দ্বিধাহীন ভাবে কথা বলতে পারে, এবং তার মতামতের সঙ্গে অলির অনেকটাই মেলে।

একটু পরে পিটার মেয়র আবার বললেন, নিউ ইয়র্কের ভিলেজ ভয়েস নামে একটা পত্রিকায় অ্যালেন গীত্সবার্গের সাক্ষাৎকার ও একটা কবিতা পড়লাম। সে এর মধ্যে ইন্ডিয়ায় ঘুরে এলো। গীনসবার্গ আমার বন্ধু। সে বলেছে যে কলকাতার একজন কাউকে সঙ্গে নিয়ে সে পূর্ব-পাকিস্তান সীমান্তে গিয়েছিল। কবিতাটার নাম সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। তাতে উদ্বাস্তু শিবিরগুলোর দুর্দশার যে বর্ণনা আছে, তা পড়ে আমি চোখের জল সামলাতে পারিনি। গীনসবার্গের মা নাওমি-কে নিয়ে লেখা কাদিস’ কবিতাটার পর এইটাই তার দ্বিতীয় মর্মান্তিক কবিতা। আচ্ছা, যশোর রোডটা ঠিক কোথায়? কবিতাটা পড়ে আমার সেখানে যেতে ইচ্ছে করছে।

এতক্ষণ পরে অলি বললো, স্যার, যশোর রোডটা কলকাতা থেকে শুরু হয়ে চলে গেছে পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশের যশোর শহর পর্যন্ত। দেশ ভাগ হবার পরেও রাস্তাটার ঐ একই নাম আছে। এখন ঐ রাস্তার দু’পাশেই উদ্বাস্তু শিবির। আপনি দেখতে যাবেন স্যার? তা হলে কলকাতায় আমার বন্ধুদের চিঠি লিখে দিতে পারি।

পিটার মেয়ার হো-হো করে হেসে উঠে বললো, তুমি আমাকে এত স্যার স্যার বলছো কেন, ওলি? তোমরা খুব ব্রিটিশ কায়দা মানো, তাই না? তুমি আমাকে শুধু পিটার বলবে। হ্যাঁ, আমার ইচ্ছে তো হয় একবার ইন্ডিয়ায় যাওয়ার, কিন্তু আমার উপন্যাসটা শেষ করতে না পারলে গাড়িটা বড় রাস্তা ছেড়ে ছোট রাস্তায় ঢুকে কয়েকটা বাঁক ঘুরে একটা বাড়ির সামনে থামলো। নীলাভ সাদা রঙের দোতলা কাঠের বাড়ি, সামনে একটা বড় বাগান। দেখলেই বোঝা যায় বাড়ির মালিকের বেশ যত্ন আছে বাগানের প্রতি, চমৎকার গোলাপ আর। চন্দ্রমল্লিকা ফুটে আছে। পার্কের ধারে সারি সারি ক্যাকটাসের টব। দোতলার একটা ছোট্ট বারান্দাতেও অনেক রকম ফুল গাছ। বাইরে থেকে প্রথম দর্শনে বাড়িটাকে একটা সুন্দর ছবি ছবি মনে হয়।

গাড়িটাকে বাইরে পার্ক করে পিটার মেয়ার বাগানের গেট খুলে সদলবলে ভেতরে চলে এলেন। পার্কে উঠে বেল-এ আঙুল ছোঁয়াতেই শোনা গেল একটা কুকুরের গম্ভীর গর্জন। ঠিক দু’বার। পিটার মেয়ার কুকুরটির পরিচয় দিয়ে বললেন, এর নাম ফ্রাইডে।

দরজা খুলে দিলেন একজন মধ্য বয়স্কা মহিলা মাথায় চুল ঠিক পাকা বলা যায় না, বরফের মতন সাদা, স্বাস্থ্য বেশ ভালো, চোখে পাতলা রঙীন কাচের চশমা। পিটার মেয়ারের সঙ্গে এতজন অচেনা লোক দেখেও তিনি বিস্মিত হলেন না। হাসিমুখে বললেন, হাই!

পিটার মেয়ার অলিদের তিনজনেরই পদবী সুষ্ঠু নাম প্রায় সঠিক ভাবে উচ্চারণ করে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অলি ভাবলো, এতগুলো বিদেশী নাম উনি মনে রাখলেন কী করে?

মহিলাটির নাম মেরি উইলসন। পিটার মেয়ার তাঁকে জড়িয়ে ধরে দু গালে তিনবার চুমো খেয়ে বললো, মেরি, এরা আমার ভারতীয় বন্ধু। তোমার সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে এলাম।

বসবার ঘরটিতে পুরু কার্পেট পাতা, তিনটি বেশ জানলা, জানলার পাশে রঙীন টবে রবার গাছ, চীনে বাঁশ ও নানান রকমের ফান। একদিকের দেয়ালে একটা বিশাল জাপানী ছবি। ঘরটির সাজসজ্জার মধ্যে ঐশ্বর্য ও সুরুচি একসঙ্গে মিশে আছে।

সকলে সোফায় বসবার পর পিটার মেয়ার অলিদের বললেন, মেরি আগে আমাদের সহকর্মিনী ছিলেন, ওঁর স্বামী ছিলেন একটা করপোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট, আমাদের খুব বন্ধু। দু বছর চার মাস আগে একটা সাংঘাতিক দুর্ঘটনায় ওঁর স্বামীকে হারাতে হয়, মেরিরও একটা পা বাদ যায়। চোখ দুটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখন অনেকটা ঠিক হয়েছে।

ওরা তিনজনই মেরির পায়ের দিকে তাকালো। একটা পা নেই? একটা হালকা নীল রঙের লম্বা গাউন পরে আছেন মহিলা, পা অনেকটা ঢাকা, কিন্তু দুটি পায়েরই জুতো দেখা যাচ্ছে। নকল পা?

পিটার মেয়ার ওদের মনের প্রশ্নটা বুঝেই আবার বললেন, একটি পা কৃত্রিম, তাতে এখন ওর বিশেষ অসুবিধে হয় না। কিন্তু কৃত্রিম পা থাকলে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। সেইজন্য মেরি কলেজের কাজ ছেড়ে দিয়েছে, আমরা একজন অতি সুযোগ্যা সহকর্মিণীকে হারিয়েছি। মেরি এখন বাড়িতে বসে ছবি আঁকে। শুধু ফুলের ছবি। মাই গড, এর মধ্যেই মেরির খুব নাম হয়েছে। মেরিল্যান্ডে যারাই নতুন বাড়ি কেনে, তারাই তাদের লিভিং রুমে মেরি উইলসনের একটা ফুলের ছবি টাঙায়। মেরি, তোমার স্টুডিয়োতে নতুন আঁকা ছবি আমাদের দেখাবে না?

মেরি হেসে বললেন, দাঁড়াও, পরে হবে। পিট, তুমি তো শুধু আমার সম্পর্কেই অনেক কথা বলে যাচ্ছো, এদের পরিচয় দাও!

শর্মিলা আর অতীন নিজেরাই বললো কেমব্রিজে তাদের পড়াশুনোর কথা। অলি যে সদ্য এদেশে এসে পৌঁছেছে, সে কথাও জানানো হলো।

পিটার মেয়ার বললেন, ওলি যে দেশ থেকে এসেছে, মেরি সেই দেশেই বেড়াতে যাচ্ছে আগামী শনিবার। মেরি নেপালে যাচ্ছে হিমালয়ান ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা স্টাডি করতে। ফুলের ছবি আঁকে তো, ও সব সময় নতুন নতুন ফুল দেখতে চায়।

নেপালের কথা শুনে অতীন খুব আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলো, কাঠমাণ্ডু? তা হলে আপনি নিশ্চয়ই কলকাতা হয়ে যাবেন?

মেরি বললেন, দিল্লি থেকে কলকাতায় শুধু প্লেন বদল করবো। ঐ শহরে ঢুকছি না। আমার ট্রাভল এজেন্ট কলকাতায় থাকতে বারণ করেছে। কলকাতা নোংরা শহর, যখন তখন বোমা ফাটে, রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য দিল্লি আর আগ্রা ভালো করে দেখবো।

অলির সঙ্গে অতীনের চোখাচোখি হলো। শমিলা কলকাতার মেয়ে নয়, তবু কলকাতার নিন্দে তারও খারাপ লেগেছে।

পিটার মেয়ার বললেন, তা ছাড়া কলকাতায় এখন লক্ষ লক্ষ রেফিউজি, তোমার সেখানে না। যাওয়াই ভালো। মেরি, তুমি তো হার্ড ড্রিংকস কিছু রাখো না, বীয়ার আছে? বড় তেষ্টা ৩৮২

পেয়েছে, একটা বীয়ার পেলে মন্দ হতো না।

মেরি বললো, আমার বাড়িতে কোনো অ্যালকহলিক বীভারেজ রাখি না। নরম পানীয় ( দিতে পারি।

পিটার মেয়ার বললেন, আমি নিয়ে আসছি। কোথায় আছে দেখিয়ে দাও!

ওঁরা দু’জনেই উঠে চলে গেলেন একটা ভেতরের ঘরে। অ্যামেরিকায় এসে অলি এই প্রথম কোনো অ্যামেরিকানের বাড়ি দেখছে। এই এক পা-ওয়ালা মহিলাটি এতবড় বাড়িতে একা থাকেন? ওঁর ছেলেমেয়ে নেই? গাড়ি চালাবার লাইসেন্স নেই বলে উনি অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, এটা একটা অদ্ভুত কথা।

শর্মিলা বললো, আমাদের এখানে কেন নিয়ে এলো বুঝতে পারছি না ঠিক। উনি কি পেয়িং গেস্ট রাখবেন? দেখে মনে হচ্ছে বেশ বড়লোক, সাধারণত এত বড়লোকরা পেয়িং গেস্ট রাখে

অলি বললো, আমাকে এমনি এমনি থাকতে বললে আমি থাকবো না।

অতীন বললো, শর্মিলার মামা বাড়িতে থাকাটাই ভালো হবে। এখান থেকে বেরিয়ে স্ট্রেট সেখানে চলে যাবো।

পিটার মেয়ার ও মেরি যখন ফিরে এলো, তখন তাদের সঙ্গে এলো একটা কুকুর। লম্বা, সাদা রঙের, সারা গায়ে ফুটকি ফুটকি, জাতে ডালমেশিয়ান। কুকুরটা ওদের তিনজনের পাশ দিয়ে একবার ঘুরে উল্টোদিকে গিয়ে বসলো।

মেরি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেউ কুকুর অপছন্দ করো না তো?

অলিদের বাড়িতে এক সময় কুকুর ছিল। বিমানবিহারী এক সময় অ্যালসেশিয়ান পুষতেন, বাচ্চা বয়েসে অলি সেই কুকুরের সঙ্গে অনেক খেলা করেছে। সেই প্রিয় অ্যালসেশিয়ানটি মারা যাবার পর আর বাড়িতে কুকুর আনা হয়নি। কুকুর সম্পর্কে অলির ভয় নেই, কিন্তু সে জালে বাবলুদা কুকুর পছন্দ করে না। বড় কুকুর দেখলে আড়ষ্ট হয়ে যায়। সে চোরা চোখে চেয়ে দেখলো, অতীন কাঁধ দুটো উঁচু করে শক্ত হয়ে বসে আছে, কুকুরটাও চেয়ে আছে অতীনেরই দিকে।

সকলের হাতে কোকের টিন দিয়ে পিটার মেয়ার বললেন, আমাদের একটা প্রস্তাব আছে। মেরি আর দুদিন পরেই নেপাল চলে যাচ্ছে, তারপর সিঙ্গাপুর, জাপান হয়ে ফিরবে প্রায় এক মাস পরে। ওর বাড়িতে ফুল গাছে জল দেওয়া আর কুকুরটিকে খেতে দেওয়া একটা সমস্যা। আমাকে মেরি অনুরোধ করেছিল, কিন্তু আমি রোজ আসার সময় পাবো না। ওলি, তুমি কি সেই ভার নিতে পারবে।

মেরি উইলসন অলির দিকে চেয়ে বললেন, তুমি যদি অনুগ্রহ করে সেই ভার নাও, তাহলে আমি কৃতজ্ঞ বোধ করবো। আমি ফ্রাইডে-কে কেনেল ক্লাবে পাঠাতে চাই না, এই বাড়িতেই ও বাচ্চা বয়েস থেকে আছে, একজন কেউ ওর দেখাশুনোর ভার নিলে আমি নিশ্চিন্তে যেতে পারবো। ফ্রাইডে খুব শান্ত কুকুর, তোমার কোনো অসুবিধে ঘটাবে না। এর মধ্যেই ও তোমাদের পছন্দ করেছে।

পিটার মেয়ার বললেন, অফ কোর্স তোমার এই সার্ভিসের জন্য মেরি তোমাকে কিছু পে করবে। সেটা পরে ঠিক করে নিলেই হবে।

মেরি বললেন, আমি তো আরও দুদিন থাকছি, এ বাড়ির কোথায় কী আছে সব বুঝিয়ে দেবো।

পিটার মেয়ার বললেন, তাহলে এটাই ঠিক হলো? গাড়ি থেকে ওলির লাগেজ নিয়ে আসা যাক, কী বলো?

ওরা তিনজনই চুপ। এত সহজে অলির থাকার সমস্যা মিটে গেল! এত বড় বাড়ি ঐ। মহিলা অলির হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যাবেন? এই প্রস্তাবে হ্যাঁ কিংবা না, কোনোটাই যেন বলা যায় না।

মেরি যেন অলিকে একটু তোষামোদ করার সুরে বললেন, তুমি ইচ্ছে মতন আমার টেলিফোন ব্যবহার করবে, তুমি তোমার বন্ধুদেরও উইক এন্ডে নেমন্তন্ন করতে পারো

অতীন উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এ তো খুব ভালো ব্যবস্থা। চলুন, সুটকেসটা নিয়ে আসি।

পিটার মেয়ার সব ব্যবস্থা করে বিদায় নিলেন একটু পরে। শর্মিলা আর অতীন আরও কিছুক্ষণ রয়ে গেল।

অলিকে মেরি দেখিয়ে দিয়ে গেলেন দোতলায় গেস্ট রুম। সেই ঘরটিও খুব পরিচ্ছন্ন ভাবে সাজানো। ধপধপে সাদা বিছানা, লেখার টেবিল, ফোন, একটা ছোট টি ভি, একটা র‍্যাক ভর্তি বই, পাশে ব্যালকনি। সংলগ্ন বাথরুম মস্ত বড়, সঙ্গে ড্রেসিং রুম, ওয়ার্ড রোব, আসল পোর্সিলিনের বাথ টাব। সব কিছু ঝকঝকে তকতকে। বাড়িতে ঐ মহিলা ছাড়া আর কোনো লোক নেই, তবে এত সব পরিষ্কার করে কে?

শর্মিলা বললো, গেস্ট রুমটাই কী দারুণ। অনেক দামি হোটেলেও এত সুন্দর ঘর পাওয়া যায় না। অলি তুমি খুব লাকি।

অতীন বললো, দু দিন বাদে ঐ ভদ্রমহিলা চলে গেলে এতবড় বাড়িতে একা একা থাকতে তোর ভয় করবে না তো?

অলি অন্যমনস্কভাবে দু দিকে মাথা নাড়লো!

অতীন বললো, মালিনী! অলিকে রোজ বাগানে জল দিতে হবে, তার জন্য আবার মাইনেও পাবে! তুই যেন টাকা নিতে অস্বীকার করিস না। অ্যামেরিকানরা যে-কোনো কাজের বদলেই টাকা দেয়। এমনকি বাবা তার ছেলেকে দিয়ে কোনো কাজ করালেও টাকা দেয়।

শর্মিলা বললো, বাগানে জল দেওয়া মোটেই খারাপ কাজ। এরা কোনো কাজকেই ছোট। কাজ মনে করে না।

অতীন বললো, আমি নিউইয়র্কে বেশ কিছুদিন কুলিগিরি করেছি। অলি তো সেসব জানে না।

শর্মিলা বললো, তুমি আবার বড় বেশি বাড়িয়ে বলো। তুমি শপ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলে, আমি সিদ্ধার্থর কাছে শুনেছি। আমাকেও মাঝে মাঝে বেবি সিটিং করতে হয়েছে। অলি, ভদ্রমহিলা

তো পারমিশান দিয়েছেনই, আমরা এখানে মাঝে মাঝে এসে উইক এন্ড কাটিয়ে যাবো। এত সুন্দর বাড়িতে আমি কখনো থাকিনি।

অতীন বললো, ভদ্রমহিলা কিন্তু আমাদের ডিনার খেয়ে যেতে বলেননি। আর বেশিক্ষণ আমাদের এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।

অলির সুটকেসের চাবি পাওয়া যায়নি, শেষ পর্যন্ত তালা ভাঙতে হয়েছে। সুটকেস থেকে জিনিসপত্র বার করে শর্মিলা দ্রুত হাতে অলির ঘর গুছিয়ে দিল। তারপর নিজের কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে বার করলো একটা প্যাকেট। তার মধ্যে রয়েছে একটা নতুন বিছানার চাঁদর আর বালিশের ওয়াড়। এ ঘরের বালিশের ওয়াড়টা খুলতে খুলতে শর্মিলা বললো, যতই পরিষ্কার দেখাক বাবা, অন্যের ব্যবহার করা বেড শীট আর বালিশের ওয়াড়ে শোওয়া যায় না!

অলি অবাক হয়ে বললো, এগুলো তুমি আমার জন্য কিনে এনেছো?

অতীন হাসতে হাসতে বললো, তোমাকে কখনো হোটেলে থাকতে হলে তুমি কী করবে বলো তো?

শর্মিলা ব্যাগ থেকে আরও বার করলো একটা বিস্কুটের প্যাকেট, দু-তিন রকম চকোলেট আর বাদাম, একটা ছোট পারফিউমের শিশি।

অলি প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠলো, এসব তুমি কী করেছো? এত জিনিস আনতে গেলে কেন?

শর্মিলা বললো, প্রথম দু একদিনেই তুমি দোকান টোকানে গিয়ে কেনাকাটি করতে যাবে নাকি? সব চিনতে কয়েকদিন সময় লাগবে না? এসব জিনিসের দরকার লাগে। আগে অবশ্য ভেবেছিলুম, তুমি ডর্মে থাকবে। চলো এবার যাই!

বিদায় নেবার সময় শর্মিলা অলির একটা হাত জড়িয়ে ধরে বললো, যখন যা দরকার হবে, আমাদের ফোন করবে। লজ্জা করো না কিন্তু! ভার্জিনিয়ায় অনেক বাঙালী আছে, তাদের সঙ্গে এ তোমার আস্তে আস্তে যোগাযোগ হয়ে যাবে!

অতীন শর্মিলাকে তাড়া দিয়ে বললো, চলো, চলো। ছটার বাস ধরবো। অলি, খুব ভালোই ব্যবস্থা হয়েছে তোর, চিন্তার কিছু নেই। আমরা তোর খবর নেবো সব সময়। পিটার মেয়ার লোকটা ভালো।

শর্মিলা বললো, যখন এ বাড়িতে প্রথম নিয়ে এলো, আমি ভাবলুম, পিটার মেয়ার বুঝি নিজের বাড়িতেই অলিকে থাকতে দিচ্ছেন।

অতীন বললো, এখানকার প্রফেসাররা বাড়িতে কোনো ছাত্র-ছাত্রী রাখে না। তবে বাড়িতে ডাকবে, ডিনার খেতে প্রায়ই ডাকবে।

অলি ওদের সঙ্গে নীচে নেমে বাগানের গেট পর্যন্ত এলো। শর্মিলা বললো, এই, তুমি ভেতরের দরজাটা খুলে রেখে এসেছা, কুকুরটা যদি বেরিয়ে যায়? আর এসো না, যাও, তুমি ভেতরে যাও!

অলি প্রায় দৌড়ে বাড়ির মধ্যে চলে এলো। মেরিকে দেখা গেল না, তিনি স্টুডিওতে গেছেন, সন্ধে আটটার সময় অলির সঙ্গে আবার দেখা করবেন বলেছেন। কুকুরটা চুপ করে শুয়ে আছে বসবার ঘরে। অলি উঠে এলো ওপরে। ব্যালকনিটার দরজা খুলে সেখানে দাঁড়ালো। এখানেও অনেক রকম ফুলের গাছ, দেয়াল বেয়ে উঠেছে আইভি লতা।

এটা বাড়ির পেছন দিক। এদিকেও রয়েছে খানিকটা বাগান, তারপর অন্য রাস্তা। খানিকটা দূরে সে দেখতে পেল শর্মিলা আর অতীনকে, ওরা সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে, হাত ধরাধরি করে। একটু পরেই ওদের আর দেখা গেল না।

হু হু করে জল এসে গেল অলির চোখে।

বাবলুদা একবারও তার হাত ছোঁয়নি। সে আর জীবনে কখনো বাবলুদাকে স্পর্শ করবে না। বাবলুদা আর তার কেউ নয়। না, না, সে আর এই রকম কথা চিন্তাও করবে না কোনোদিন। শর্মিলা কী ভালো মেয়ে, বাবলুদার সঙ্গে তাকে চমৎকার মানিয়েছে।

শৌনক, আমার শৌনক আছে। সে কোনোদিন আমাকে ভুলে যাবে না বাবলুদার মতন। শৌনক শুধু আমার, শুধু আমার! মনে মনে এই কথা বারবার বলতে বলতে অলি চোখ মুছতে লাগলো। তবু কান্না থামছে না। তার হেঁচকি উঠে আসছে।

সে বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুলো ভালো করে। বুকের মধ্যে ব্যথা করছে, বুকটা মুচড়ে যাচ্ছে। কেন হচ্ছে এরকম, বাবলুদার ওপর তো তার রাগ অভিমান নেই। মনটা অন্যদিকে ফেরানো দরকার।

চিঠি লিখলে সময় কাটবে। অনেক চিঠি লিখতে হবে। মা-বাবাকে, পমপমকে, বর্ষাকে, প্রতাপকাকাকে। সবচেয়ে আগে শৌনককে চিঠি লেখা উচিত না? শৌনিকের ঠিকানা কী? তার চোখ দুটো এখনো স্পষ্ট হয়নি। তার গলার আওয়াজ কী রকম? পিগম্যালিয়ান যেরকম একটা মূর্তিকে জীবন্ত করেছিল, সেইরকম অলি একজন পুরুষকে সৃষ্টি করতে পারবে না, যে তার সারা জীবনের সঙ্গী হবে!

চিঠি লেখার সাদা পাতায় টপটপ করে পড়ছে চোখের জল। অলি একটা লাইনও লিখতে পারছে না। শর্মিলা আর বাবলুদা হাত ধরাধরি করে মিলিয়ে গেল রাস্তার বাঁকে, এই দৃশ্যটা দুলছে তার চোখের সামনে, কান্নায় ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছে, ফিরে আসছে আবার। অলি মুখে আঁচল। চাপা দিল।

নাঃ, অন্যদিকে মন ফেরাতেই হবে। এই বাড়ির ভদ্রমহিলাটির কী মনের জোর। অ্যাকসিডেন্টে স্বামী মারা গেছেন, নিজের একটা পা নেই, তবু একলা একলা তিনি নিজের জীবনটাকে সার্থক করার চেষ্টা করছেন। একটা পা নেই, তবু ইনি নেপালে যাচ্ছেন হিমালয়ের ফুল দেখবেন বলে? সাহস আছে বটে! ভদ্রমহিলা অসম্ভব ভদ্র। এটা তো বোঝাই গেল যে অলি কোথাও থাকার জায়গা পায়নি, তার অসহায় অবস্থার জন্যই মেরি তাকে এ বাড়িতে থাকতে দিলেন। নেপালে যাবার টিকিট কাটা হয়ে গেছে, দু দিন পরে চলে যাবেন। এ বাড়ির বাগানে জল দেওয়া আর কুকুরকে খাওয়ানোর অন্য ব্যবস্থা ছিল নিশ্চয়ই, তিনি তো আর অলির অপেক্ষায় বসেছিলেন না! কিন্তু এমন অনুরোধের সুরে বললেন, যেন অলি থাকতে রাজি হলে। তিনি ধন্য হয়ে যাবেন! আবার টাকা দিতে চান। অলি কিছুতেই সে টাকা নেবে না।

ভদ্রমহিলা ছবি এঁকে নাম করেছেন। অনেকে তাঁর ছবি কেনে ঘর সাজাবার জন্য, উনি যখন। খুশী পৃথিবীর যে-কোনো জায়গায় চলে যেতে পারেন। উনি আবার বিয়ে করেননি কেন? কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান, গলার আওয়াজটা বিষণ্ণ হয়ে যায়, একটা নিঃসঙ্গতা বোধ যেন চাঁদরের মতন জড়িয়ে আছে ওঁর সারা গায়ে। এই বাড়িটা এত সুন্দর, তবু যেন অসম্ভব রকমের শূন্য।

কখন অন্ধকার হয়ে গেছে অলি খেয়ালও করেনি। টেবিল ছেড়ে উঠে অলি আলো জ্বালতে গেল। সুইচ কোথায়? আগে দেখে রাখেনি। দেয়ালে হাত বুলোত বুলাতে হঠাৎ থেমে গেল অলি। তাকে এখানে একা ফেলে শর্মিলার হাত ধরে চলে গেল বাবলুদা। আজই অলি চিরবিদায় দিয়ে দিল বাবলুদাকে। এখন এই গোটা অ্যামেরিকা মহাদেশটাই অলির কাছে শূন্য। কী হবে আর এখানে থেকে?

অন্ধকার ঘরে, দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে ছটফট করে কাঁদতে লাগলো অলি। মানুষের চোখের কত গভীরে এত অশু জমা থাকে? অলি কাঁদতে চায় না, তবু তার চোখ দিয়ে জল ঝরছে। যাতে কোনো শব্দ না শোনা যায় তাই সে শক্ত করে চেপে ধরে আছে নিজের মুখ।

৪৮. প্রতিমার গায়ে রং লাগানো হয়ে গেছে

প্রতিমার গায়ে রং লাগানো হয়ে গেছে, গর্জন তেল মাখিয়ে পালিশও করা হয়েছে। আজ চোখ ফোঁটাবার দিন। আজকের দিনটাই আসল। এতদিন ছিল নিছক মাটির প্রতিমা, আজ তিনি হবেন মা দুর্গা।

জায়গাটা চট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। দুগ-লক্ষ্মী-সরস্বতী কোনো মূর্তিকেই এখনো কাপড় পরানো হয়নি, তাই বাইরের লোকদের দেখতে নেই। শুধু বাচ্চারা সেই চট সরিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে, তারা বারণ শোনে না। শিশুদের আর শিল্পীদের দোষ হয় না।

ব্যানার্জিবাবুদের বাড়ির প্রতিমা গড়ার বায়না পেয়েছে হলধর পাল, তার সহকারী হয়েছে হারীত মণ্ডল। ব্যানার্জিরা এ তল্লাটের অবস্থাপন্ন মানুষ, তাদের পাটের কারবার আছে। তাদের যৌথ পরিবারে এখনও পুরোনো চাল বজায় আছে, প্রতি বছর এ বাড়িতে দুর্গা পূজা হয়। এখন পারিবারিক দুর্গাপূজা উঠেই যাচ্ছে প্রায়, এখন বারোয়ারি দুর্গোৎসব হয়। বসিরহাটের ব্যানার্জিরা কলকাতার কুমোরটুলি থেকে মূর্তি আনেন না। নিজেদের বাড়িতেই কুমোর ডেকে মূর্তি গড়ান, এটাও তাঁদের অনেক কালের পারিবারিক প্রথা। বাড়ির উঠোনে মণ্ডপ তৈরি হয়, কয়েক বছর আগেও পাঁঠা বলি হত, সম্প্রতি এ বাড়ির ছোটবাবু তা বন্ধ করেছেন, নিয়ম রক্ষার জন্য হাঁড়িকাঠে বলি দেওয়া হয় চালকুমড়ো আর আখ।

প্রতিমার দৃষ্টিদান হয় পঞ্চমীর দিন বিকেলে। এ বাড়ির কুমারী ও সধবা মহিলারা ওই দিন সুতির শাড়ি পরে না। সকালেই স্নান সেরে পট্টবস্ত্র ধারণ করে সারাদিন উপবাসে, শুদ্ধভাবে থাকে। আজকাল অবশ্য কুমারী মেয়েরা লুকিয়ে লুকিয়ে বাতাসা বা তেতুলের আচার খেয়ে নেয়, সধবারা প্রকাশ্যেই চা খায়।

হারীত মণ্ডল ধ্যানে বসেছে। না, লোক দেখানো ভান নয়, সে সত্যিই চোখ বুজে ধ্যানের মধ্যে দেখতে চাইছে একজোড়া চোখ। সে নিজেও আজ সারাদিন কিছু খায়নি। হলধর জেদ ধরেছে যে মা দুর্গার চোখ হারীতকেই আঁকতে হবে।

হারীতের তুলনায় হলধরের বয়েস খুব বেশি না হলেও তার চোখে ছানি পড়ে গেছে, চশমা নিয়েও সে ভাল দেখতে পায় না। লক্ষ্মী-সরস্বতী, কার্তিক-গণেশের চোখ তারা দু’জনে ভাগাভাগি করে আঁকলেও মা দুর্গার চোখ হলধর আঁকতে সাহস পায় না। এ চোখ তো একবার একে আর মোছা যায় না। একটানে আঁকতে হয়।

হারীত বেশ বিপদেই পড়ে গেছে। সে পেশাদার কুমোর কোনও কালেই ছিল না। শখ করে সে মূর্তি গড়া শিখেছে, কাঠের পুতুলও বানাতে পারে, তাও তো অনেকদিন অভ্যেস নেই। আজ যখন সে তুলি হাতে নিয়েছে, তাকে কাজ শেষ করতেই হবে। কিন্তু তার ভয় করছে, এ তো সামান্য কোনও পুতুল তৈরি করা নয়, এ যে মায়ের মুখ। চোখ বুজে, মনটাকে দুই ভুরুর মাঝখানে এনে হারীত একটি দুগা প্রতিমার মুখ দেখতে চাইছে, মনে আসছেও সে রকম ছবি, কিন্তু স্থির নয়, বড় চঞ্চল। তার মনে পড়ে যাচ্ছে সুলেখার কথা, তার জীবনে যে একমাত্র নারীকে সে দেবীর স্থানে বসিয়েছিল, সেই শান্ত, সুন্দর দুটি চোখ, তালতলার বাড়িতে হারীত যেদিন গ্রেফতার হয় সেদিন সুলেখা খালি পায়ে রাস্তায় নেমে এসে পুলিশের কাছে মিনতি করেছিলেন না, না, কোনও জীবিত মানুষের চোখের আদলে কি ঠাকুরের চোখ আঁকা যায়, তাতে পাপ হবে না? হারীতের আরও মনে পড়ছে গোলাপীর মুখ, তার স্ত্রীর মুখ, আরও অনেক রোগা, গাল তোবড়ানো নারীদের মুখ, কিছু কিছু নিষ্প্রভ চোখ… এতো বড় জ্বালা!

হারীত তার মনটাকে নাড়া দিয়ে ফিরে যেতে চাইল তার বাল্য-কৈশোরে, যখন দুগা ঠাকুরের মুখের দিকে সে সত্যিকারের বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত, মনে হত ডান দিকে বা বাঁ দিকে, যেদিকেই সে সরে যাক, মা তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। তাদের বাড়িতেও চৌধুরীবাড়ির পুজোয় একমাস আগে থেকে প্রতিমা একমেটে, দোমেটে হত। তারপর সাদা রং, প্রতিটি স্তরে হারীত দেখত হাঁ করে… আশ্বিন মাসের মাঠভরা সবুজ ধান, সেই ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে এক কিশোর, আকাশে, বাতাসে ঢাকের বাজনা বাজছে, দূরে দেখা যাচ্ছে তাদের বাড়ি, ডাল-পালা মেলে টিয়া তুটি আম গাছটা যেন ডাকছে, হারী, হারীত

হলধর তাকে একটা ঠেলা দিয়ে বলল, কী হইলো, তোমার চক্ষু দিয়া জল পড়ে ক্যান? ঘুমাইয়া পড়লা নাকি?

হারীতের ঘোর ভাঙল। হা, সে প্রায় এক স্বপ্নের দেশেই চলে গিয়েছিল।

তুলি হাতে নিয়ে হারীত উঠে দাঁড়াল। কালো রঙের মধ্যে সেটা ডোবাতে ডোবাতে সে কয়েক পলক চেয়ে রইল দুগার মুখের দিকে। এখন দেখলে মনে হয় এক সুন্দরী অন্ধ যুবতী। হারীত ভাবল, কী হবে চোখ একে? ঠাকুর-দেবতারা তো সব অন্ধই! তাঁরা কি মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখতে পান? এই যে এত মানুষ ভিটে-মাটি ছাড়া হয়ে হা-ঘরের মতন ঘুরছে, অনাহারে, রোগে ভোগে মরছে, দেবতারা কি তার প্রতিকারের কিছু চেষ্টা করেন কখনও?

তুলিতে বেশি রঙ নিয়ে হারীত প্রায় বিদ্যুৎ বেগেই ভুরু জোড়া আঁকল। তারপর চোখের দুটি মণি। তারপর সরু করে চোখের রেখা।

হলধর ব্য গ্রভাবে দেখছিল, হারীত একটু পিছিয়ে আসতেই তাকে জড়িয়ে ধরে হলধর বলল, গুরুবল আছে তোমার, হারীত! বড় সুন্দর হইছে। মা হাসতেছেন, দ্যাখো হারীত, মা তোমারে আশীবাদ করতেছেন।

হারীত চোখ কুঁচকে দেখতে লাগল। সে খুশি হয়নি। তার চোখে খুঁত ধরা পড়ছে, ভুরু দুটো সমান নয়, সে দৈবী প্রেরণা পায়নি, শিল্পী হিসেবে সে সন্তুষ্ট নয়। তবে চলে যাবে, ঠাকুরের মূর্তি কেউ অত খুঁটিয়ে দেখে না, এখন মাথায় জরির মুকুট ও গায়ে চকচকে রং করা পাটের কাপড় পরিয়ে দিলেই অনেক জমকালো দেখাবে।

হলধর বলল, এবার তুমি বিশ্রাম নাও। যেটুকু বাকি আছে, আমি সাইরা দেবো অ্যানে।

হারীত বলল, অসুরের চক্ষু দুইটাও আমিই কইর‍্যা দেই। ঐ দুটা আরও ভাল পারুম। সারাজীবনে অসুর তো কম দ্যাখলাম না।

চটের পর্দা সরিয়ে হলধর একটি বাচ্চা মেয়েকে বলল, ভিতরে গিয়ে খবর দায় তো মা, চক্ষুদান হইয়া গ্যাসে।

বাচ্চারা হাততালি দিয়ে উঠল, পর্দা ঠেলে একবার উঁকি মেরে সবাই প্রণাম করল। তারপর ছুটে গেল বাড়ির মধ্যে।

ব্যানার্জিদের মেজোবাবু চটি ফটফটিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে হলধর?

হলধর বলল, আর শুধু সাজ পরানো বাকি। বড় জোর এক-দ্যাড় ঘণ্টা লাগবে বাবু! মেজোবাবু বললেন, আগে তোমরা কিছু খেয়ে নাও। বেশ বেলাবেলিই তো হয়ে গেল। তিনি চক্ষুষ্মণা প্রতিমা দেখার জন্য কোনও আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। পুরুত এসে ঘটে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার আগে মায়ের মুখ দেখেন না এ বাড়ির পুরুষেরা।

একটি যোল-সতেরো বছরের তথী মেয়ে দুটি থালায় করে লুচি-আলুর দম আর মিষ্টি দিয়ে গেল দু’জনের জন্য। অন্যদিন এরা খোরাকির টাকা পায়, শুধু আজকের দিনটাতেই বাড়ির ভেতর থেকে খাবার আসে। হলধর ভাল করে হাত না ধুয়েই খেতে শুরু করে দিল। হারীত একটা বিড়ি ধরিয়ে বারবার দেখছে দুর্গা প্রতিমার চোখের দিকে। শিল্প সৃষ্টির অতৃপ্তি তার খিদে ভুলিয়ে দিয়েছে। খুব খারাপ হয়নি। কিন্তু আরো অনেক ভাল হতে পারত।

সব কাজ সারতে সন্ধে হয়ে গেল। এখন যেতে হবে দু-আড়াই মাইল দূরে। হাঁটতে হাঁটতে ইলধর নিজের বুকে হাত বুলাতে লাগল মাঝে মাঝে। কথাও সে কম বলছে। একটু বেশি বয়স হলে অনেক মানুষেরই বেশি কথা বলা রোগ হয়, হলধর কিন্তু চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। হারীতও আপনমনে বিড়ি টেনে যাচ্ছে। তার বগলে একটা নতুন ধুতি।

হলধরকে কয়েকবার বুকে হাত বুলোতে দেখে হারীত জিজ্ঞেস করল, কী হইলো গো দাদা, বুক ব্যথা করে নাকি?

হলধর বলল, না, ব্যথা নাই। তয় বুকখানা কেমন য্যান খালি খালি লাগে।

হারীত বলল, আতদিনের পরিশ্রম আইজ শেষ হইল, আইজ তো ফুর্তি করার কথা। তুমি মুখ শুকনা কইরা রইলা?

হলধর বলল, হ। ঠিকই।

–কিসের কী ঠিকই?

–আইজ ফুর্তি করার কথা। তবু বুকখান খালি খালি লাগে। পিরতিমার কাজ সম্পূর্ণ হইল, তবু আমার খালি খালি লাগে।

হারীত যেন এবার খানিকটা বুঝল। সে নিজেও ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারবে না, তবে কোনও একটা কাজ খুব মন দিয়ে সম্পূর্ণ করার পর একধরনের শূন্যতাবোধ তারও হয় কখনও কখনও। একটা অতৃপ্তির স্বাদ মুখে লেগে থাকে।

যেতে হবে বাজারের পাশ দিয়ে। এখন দোকানপাট অনেক রাত্তির পর্যন্ত খোলা থাকে। পথে মানুষজন অনেক, বেশ একটা পুজো পুজো ভাব এসে গেছে। এক জায়গায় কয়েকজন ঢাকী-টুলি জড়ো হয়ে আছে, বারোয়ারির পুজো কমিটিগুলি তাদের এখনও নিতে আসেনি, মাঝে মাঝে তারা ঢাকে কাঠি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ঐ ঢাকের আওয়াজ শুনলেই উৎসব উৎসব মনে হয়।

হলধর এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার কিছু কেনাকাটি আছে? এখন টাকা নিবা?

হারীত দুদিকে মাথা নাড়ল। কার জন্য সে পুজোর বাজার করবে, তার তো কেউ নেই এখানে? নবাকে নিয়ে যোগানন্দ ফিরে গেছে, হারীত পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পরেই। কাশীপুর কলোনিও সার্চ হয়েছিল, সেখানকার লোকজন প্রায় জোর করেই নবা আর যোগানন্দর টিকিট কেটে তাদের ট্রেনে তুলে দিয়েছিল। পুলিশের ভয়ে তারা হারীতের সঙ্গে কোনও সংস্পর্শ রাখতে চায় না। তারা ভেবেছিল, হারীত সহজে ছাড়া পাবে না।

নবার জন্য একটু মনঃকষ্ট হল হারীতের। ছেলেটা থাকলে একটা নতুন জামা কিনে দিত হারীত, ওর বেলুন আর আইসক্রিমের খুব শখ ছিল…

হারীত নিজে কতকাল পর পুজোর সময় নতুন বস্ত্র পরবে।

হারীতের হাত ধরে টেনে হলধর বলল, আস এদিকে। এখনই বাড়ি যাওনের তাড়া নাই। এটু মনডারে জুড়াই।

বাজারের পেছনদিকে একটা দেশী মদের আখড়া। প্রত্যেকদিনই ভিড় থাকে, আজ একেবারে মাছির মতন মানুষের মাথা। সিগারেট-বিড়ির ধোঁয়ায় টালির ঘরটা ভরে গেছে। বসার জায়গা নেই, তাই কাউন্টারে অন্যদের ঠেলেঠুলে ওরা দু’জনে দাঁড়াল। হলধর আঙুল দেখিয়ে বলল, দুইটা ফাইল!

হারীত একটু অস্বস্তি বোধ করছে। সে যে কোনওদিন মদ স্পর্শ করেনি, তা নয়। এই আখড়াতেই হলধরের সঙ্গে বারতিনেক এসেছে। খানিকটা খেয়েই হলধর বেসামাল হয়ে পড়ে, তার পায়ের জোর কমে যায়। এখানে প্রায় প্রত্যেকদিনই বন্ধ হবার একটু আগে ঝগড়াঝাঁটি-মারামারি শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ সোডার বোতল ছোঁড়ে, কেউ ছুরি বার করে। মারামারিটা অবশ্য বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবু বলা তো যায় না। আজ হলধরের কাছে অনেক টাকা, ব্যানার্জিবাবুরা মোট এগারো শো টাকায় চুক্তি করেছিলেন, তার মধ্যে ছ শো টাকা আগেই নেওয়া হয়ে গিয়েছিল, আজ চুকিয়ে দিয়েছেন বাকি টাকা। এছাড়া দু’খানা ধুতি দিয়েছেন।

এই বারের মালিক ইসমাইল মিঞা, জঙ্গলের শিমুল গাছের মতন চেহারা। গলার আওয়াজও বাজখাই। গণ্ডগোল-মারামারির সময় সে অকুতোভয়ে মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়, দু’দিকে চড়-চাপড় চালায়। ইসমাইল মিঞার গায়ে কেউ হাত তুলতে সাহস করে না। এমনকি কোনও মাতাল খুব নেশামিশ্রিত রাগে ছুরি বার করলেও ইসমাইল মিঞা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে, কী রে, খুব গরম খেয়ে গেছিস, না? লবাবী করছিস এখানে? দাঁত ক’খানা সব ফেলে দেব?

আজ ইসমাইল মিএই ভরসা। ঘামে তার সারা মুখ চকচক করছে, যেন গর্জন তেল মাখানো হয়েছে। চোখ দুটো ধোঁয়ায় লালচে, সে একফোঁটাও মদ খায় না। ম্যানেজার মকবুল আজ একা এত খদ্দের সামলাতে পারছে না, তাই ইসমাইল মিঞাও মাল ঢালার কাজে হাত লাগিয়েছে।

হলধর বলল, এই যে, মে ভাই, আমাগো দুইটা গেলাস!

ইসমাইল মিঞা বলল, দিচ্ছি, দিচ্ছি, সবুর করো! আজ গেলাস শর্ট আছে। ভাঁড় চলবে?

তাই সই। একটা বাচ্চা ছেলে কয়েকটা মাটির ভাঁড় এনে রাখল কাউন্টারে। এই ছেলেটাই ঘুগনি আর মেটের চাঁট বিক্রি করে। হলধর তাকেও আঙুল দেখিয়ে বলল, দুটো স্পেশাল। অর্থাৎ দু’প্লেট মেটে। হলধর অসম্ভব ঝাল খেতে পারে।

নিজের ভাঁড়টা নিয়ে হারীত প্রথমে তাতে কড়ে আঙুল ডুবিয়ে একটু মদ তুলল। সেটা ছিটিয়ে দিল ভূমিতে, বিড় বিড় করে বলল, জয় বাবা কালাচাঁদ, জয় বাবা কালাচাঁদ। তার দেখাদেখি আজকাল হলধরও গুরু কালাচাঁদের নাম নেয়।

অন্যরা হল্লা করছে, কেউ ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণের একজনকে কোনও গোপন খবর শোনাচ্ছে, কেউ কেউ গান ধরেছে। হলধর গল্প করার লোক নয়, তার নেশা হলেই সে আরও গুম হয়ে যাবে। হারীত এদিক ওদিক তাকিয়ে চেনা মানুষ খোঁজে।

হারীতের ডানপাশেই যে রুখু দাড়িওয়ালা লোকটি দাঁড়িয়েছে, সে খাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে, তার কান্নার দশা এসে গেছে। সে হারীতকে চেনে না, তবু আপনজনের মতন তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এবার আমাগো দ্যাশে একখানাও পূজা হবে না! বরিশাল-ফরিদপুর-খুলনা, মায়ের পূজা নাই।

পাশ থেকে তার সঙ্গী কাঁধে চাপড় মেরে বলল, আরে শালা, কবে বরিশাল ছেড়ে এসেছিস, সেই পঞ্চাশ সনে, এখনও বলিস আমাগো দ্যাশ! তাদের লজ্জা করে না?

রুখু দাড়িওয়ালা লোকটি বলল, আলবাৎ কমু। আমার বাপ-দাদারা সেহানে জন্মগ্রহণ করছে, সেহানেই মরছে। আমাগো সাত পুরুষের ভিটা আছিল।

সঙ্গীটি ভেঙচিয়ে বলল, তুই-ও সেখানে জন্মগ্রহণ করিছিস। তুইও সেখানে মরতে যা তা হলে? এখানে ভিড় বাড়াচ্ছিস কেন?

লোকটি ঠিক উত্তর খুঁজে না পেয়ে হারীতের দিকে তাকাল। হারীত জিজ্ঞেস করল, বরিশাল-ফরিদপুরে পূজা হবে না কেন এবার?

লোকটি এবার হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, খান সেনারা খুন করবে। মা দুগারে দ্যাখলে তারেও খুন করবে। হিন্দুরা সব পলাইছে!

একটু দূর থেকে একজন বলল, ও বুড়োদা, আজ তিনজন খান সেনা ধরা দিয়েছে, দেখেছেন? নদীর ওপর দিয়ে নৌকো করে নিয়ে এল, হাত বাঁধা ছিল। কী ইয়া ইয়া চেহারা, মুখগুলো লাল।

আর একজন বলল, ওরা পাঠান। বুঝলেন। পাঠানরা অনেকে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করতে চায় না। তারা পালিয়ে এসে বি এস এফ-এর কাছে ধরা দিচ্ছে। ইছামতী নদীর ওপর দিয়ে তা প্রায় রোজই দুটো-তিনটে আসছে।

আগের লোকটা বলল, বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করতে চায় না। কে বললে? আসলে এখন উল্টো হুড়কো খাচ্ছে যে! মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের হাতে ধরা পড়লে কচুকাটা হবে তাই বি এস এফএর হাতে ধরা দিচ্ছে।

ইসমাইল মিঞা একজনকে জিজ্ঞেস করল, অ্যাইলে তাই, তাদের পাড়ার পুজোয় কোন্ যাত্রাপাটি আসছে রে?

নিতাই নামের লোকটি বলল, সত্যম্বর অপেরা। সব কলকাতার আর্টিস্ট। ‘পতিঘাতিনী সতী’ আর ‘বিদ্রোহী বাদশা’। ফিমেল আর্টিস্ট আছে, ঝর্ণাকুমারী দুলালী চ্যাটার্জি, ছন্দা পাল। মিঞাদাদা, তোমার কিন্তু এবার পঞ্চাশ টাকা চাঁদা।

–যা ভাগ। পঞ্চাশ দোব না ইয়ে দেব! গতবারে তিরিশ দিয়েছি।

–সব জিনিসের দাম বেড়েছে এবারে! তুমি মালের দাম বাড়াওনি? পঞ্চাশ দিও, তোমার সামনের দিকে সীট রিজার্ভ থাকবে।

–হ্যাঁ রে, ঐ ঝণাকুমারী নাকি মোছলমানের মেয়ে!

–মোছলমানের মেয়ে নয় গো, হিন্দুবাড়ির বউ ছিল। আর একজনকে বিয়ে করবে বলে মোছলমান হয়েছে। ঐ যেমন সিনেমার শর্মিলা টেগোর।

কেউ একজন এই তথ্যে আপত্তি জানাল। অন্য দু-তিনজন পূর্ববর্তী বক্তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল যে, এ খবর কাগজে বেরিয়েছে।

আর একজন চিৎকার করে বলল, আরে শালা ঝণাকুমোরীকে পেলে আমিও এক্ষুনি মোছলমান হতে রাজি আছি। যা দু’খানা হেভী হেভী:-ঝণাকুমোরী কাবাব বেঁধে খাওয়াবে একদিন, আমি পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকব, কত টাকা লাগে বল তো?

ইসমাইল মিঞা বলল, আরে তোর যে মুখ দিয়ে লালা গড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঝণাকুমোরীকে পেলে তুই আগে কেই কাবাব বানিয়ে খাবি।

একটা হাসির ঢেউ বয়ে গেল।

হারীত অনেকক্ষণ থেকেই হাসছে মুচকি মুচকি। এ এক বিচিত্র জগৎ। এখানে হিন্দু-মুসলমান, বাঙাল-ঘটির কোনও তফাত নেই। এখানে ঝগড়া হয় বটে, আবার পরের দিন তারাই গলা জড়াজড়ি করে। শুড়িখানায় কোনও হিন্দুস্থান-পাকিস্তান নেই। সীমান্তের ওপার থেকে পালিয়ে আসা মানুষ এখানে আসে, আবার এই বাজারের বিহারী মুসলমান পাইকাররাও আসে।

হলধরকে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে হারীত জিজ্ঞেস করল, কী দাদা, কদ্দুর?

হলধর বলল, বুকখান এহোনও খালি খালি লাগত্যাছে রে!

-–ও আর আইজ ঠিক হবে না, চলো বাসায় যাই!

হলধর যেতে চায় না। হারীত একটা পাঁইট কিনে নিয়ে প্রায় জোর করেই তাকে টেনে বাইরে এনে রিকশায় তুলল। হাঁটিয়ে নিতে গেলে হলধর মাঝে মাঝে বসে পড়বে। নতুন ধুতি দুখানা ঠিক আছে, হলধরের কোমরে টাকার গেজেটা ঠিক আছে।

একটুখানি যেতে না যেতেই হলধর হারীতের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। একটু পরেই নদীর ওপারে বুম বুম করে দুটো জোর শব্দ হল। বোমা হতে পারে, গুলির শব্দ হতে পারে। এরকম শব্দ শুনলে এখন কেউ বিশেষ চমকায় না। হলধরের ঘুমও ভাঙল না।

রিকশাওয়ালাটিও রিফিউজি। সে আপনমনেই বলল, আইজ আবার মুক্তির পোলারা বড়ার অ্যাটাক করছে।

এখান থেকে মাত্র দশ-পনেরো মাইল দূরে যুদ্ধ চলছে একটা। মানুষ মরে, মানুষই মানুষকে মারে। মাত্র দুটো-তিনটে লোক আলাপ-আলোচনায় বসে একমত হতে পারলে এই অসংখ্য খুনোখুনি বন্ধ হতে পারত।

হলধরের বাড়িতে এসে হারীত ভাড়া মিটিয়ে দিল। দুখানা মাত্র টিনের চালের ঘর, বিজলি বাতি নেই, সামনের এক চিলতে বারান্দায় হলধরের পাগল বউ হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে।

বসিরহাট থানা থেকে ছাড়া পেয়ে ঘুরতে ঘুরতে হারীত একদিন এই বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিল। সেদিন এই বারান্দায় ছড়ানো ছিল অনেকগুলো মাটির পুতুল, তখনও বেশিরভাগই রং করা বাকি। বাইরে তুমুল ঝড়বৃষ্টি। হারীত এই বারান্দায় উঠে এসে এক কোণে বসেছিল, হলধর একবার মাত্র মুখ তুলে তাকিয়েছিল তার দিকে, কোনও কথা বলেনি। তখন প্রায় বিকেল, হারীত সারাদিন কিছু খায়নি, এক কাপ চাও না। খানিকক্ষণ বসে বসে হলধরের পুতুল। রং-করা দেখতে দেখতে হারীত এক সময় চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিল, আমারে এক গাল। মুড়ি খাইতে দেবেন? আমি রং দেওয়ায় আপনারে সাহায্য করতে পারি।

নানা জায়গা থেকে বিতাড়িত, মাকর্মিরা উদ্বাস্তু হলেও হারীত ভিখিরি হতে পারে না। তার পরনে গেরুয়া লুঙ্গি, তবু সন্ন্যাসীর ভেক ধরে সে কারুর কাছে হাত পাতেনি। এখানে, এই লোকটির বাড়িতে এসে সে কাজের বিনিময়ে কিছু খাবার চেয়েছিল।

হলধর জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি রঙের কাজ জানো?

হারীত বলেছিল, একখান আগে করি, আপনে দ্যাখেন।

পুতুলগুলো ছিল অতি সাধারণ ছাঁচে ঢালা লক্ষ্মী। একটা তুলে নিয়ে তাতে যত্ন করে রং লাগাবার পর হলধর জিজ্ঞেস করেছিল, বাড়ি কোথায়?

হারীত হাত তুলে বলেছিল, আগে ছিল ঐ পারে। এখনে, এখনে, কোথাও নাই।

-–তাই বুঝি গেরুয়া নিছো? তবু ভাত জোটে না?

সেই থেকে বন্ধুত্ব। হলধররাও হারীতের মতনই বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে এসেছে, তবে অনেক আগে, সেই পঞ্চাশ সালে। রিফিউজি ক্যাম্পে থাকেনি হলধর। তার সামান্য কিছু মূলধন ছিল, তা ছাড়া জাতে কুমোর, হাতের কাজ বিক্রি করে কোনওরকমে পেট চালিয়ে নিতে পারে। কুপার্স ক্যাম্পে থাকার সময় হারীতকে তার স্ত্রী পারুলবালা অনেকবার বলেছিল ক্যাম্প ছেড়ে পালাতে। তারাও কি অন্য কোনও জায়গায় কোনও রকমে মাথা গুঁজে জীবিকা চালিয়ে নিতে পারত না? রিফিউজি পরিচয়টা মুছে ফেলে মিশে যেতে পারত পশ্চিম বাংলার অগণ্য মানুষের মধ্যে। কিন্তু হারীত যে পাকেচক্রে রিফিউজিদের একটা দলের নেতা হয়ে গিয়েছিল। সবাই ভরসা করত তার ওপরে। সে কী করে অন্যদের ছেড়ে পালায়।

নেতা হবার যে কী মূল্য, তা তো হারীত বুঝেছে অনেকবার। কাশীপুরের বাগানবাড়িটা তো তারই জেদে দখল হয়েছিল, সে মার খেয়ে নিজের মাথা ফাটিয়েছে। খুনের অপবাদ নিয়ে পুলিশের কাছে শুয়োর-পেটা হয়েছে। সেই কাশীপুর কলোনির লোকজনরা এখন তার। নাতিটাকেও আশ্রয় দিল না! এতখানি জীবনের অভিজ্ঞতায় হারীত দেখেছে, গরিবরাও গরিবদের শত্রু হয়, গরিবরাও গরবিদের কম ঠাকায় না!

হলধরের স্ত্রী যে পাগল তা হারীত প্রথম কয়েকদিন বুঝতেই পারেনি। সে ভেবেছিল বোবা! চুপচাপ বাড়ির কাজকর্ম করে, রাঁধে, মাঝে মাঝে দেওয়ালের দিকে ফিরে চুপ করে বসে থাকে। হলধরের এক বিধবা দিদিও আছে এ বাড়িতে, সেই সংসার চালায়। পরে হারীত জেনেছিল, দেশ ছেড়ে আসার সময় হলধরের দুই ছেলেমেয়েই হারিয়ে যায়।

এখানে কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে হারীতের। দণ্ডকারণ্যে ফিরে যেতে মন চায় না, যে-জন্য সে এসেছিল, তার তো কিছুই হল না। সেই পাথুরে-জঙ্গলের দেশ থেকে সবাইকে সে কি এই বাংলায় ফিরিয়ে আনতে পারবে? এখনকার সীমান্তে সে নতুন শরণার্থীদের অনেক ক্যাম্প ঘুরে দেখেছে, এদের অবস্থা মোটেই ঈর্ষা করার মতন কিছু নয়। পূর্ব বাংলায় ফেরার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এই নৈরাশের সংবাদ সে ফিরে গিয়ে দেবে কী করে? পারুলবালাকে অবশ্য সে পোস্টকার্ড লিখেছে দু’খানা।

পুজোর মধ্যেই হলধর আর হারীত আবার কাজে লেগে গেল। এবার লক্ষ্মী ঠাকুর গড়তে হবে, তারপর কার্তিক ঠাকুর। আশ্বিন মাস থেকেই শুরু হয় একটার পর একটা পুজো, চলবে সেই বৈশাখের আগে পর্যন্ত। হারীত ঠিক করেছে, এই কয়েকটা মাস এখানেই থেকে গিয়ে কিছু রোজগার করে তারপর সে ক্যাম্পে ফিরবে। কোনও আশার বাণী নিয়ে যেতে না পাক, নিজের হাতে তো কিছু থাকা চাই। হলধর তাকে ভালই পয়সা দেয়।

মোল্লাখালিতে চারখানা লক্ষ্মী ঠাকুরের অর্ডার ছিল, সেখানকার লোক এসেছে নিয়ে যাবার জন্য। হলধর আর হারীত দ্রুত হাত চালিয়ে কাজ শেষ করতে লাগল, খদ্দের দুটি বিড়ি টানছে বারান্দার এককোণে বসে। তারা সুন্দরবনের গল্প শোনাচ্ছে। ওরা জঙ্গলে ঢুকে মধু আনতে যায়, তার আগে বনবিবির পুজো করে। হলধর ওদের বনবিবির মূর্তি গড়ে দিয়েছে এক আগে। একবার বাঘের মুখে পড়ে গিয়েও বনবিবির মন্ত্র পড়তে পড়তে ওদের গুণিন সামনে এগিয়ে যেতেই সুন্দরবনের সেই ভয়ংকর বাঘ মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিল, এই রোমহর্ষক গল্প শুনতে শুনতে হাতের কাজ বন্ধ হয়ে যায় হারতের।

সে জিজ্ঞেস করল, মধু ভাঙতে গিয়া কেউ বাঘের প্যাটে যায় না?

গল্পের বক্তাটি উদাসীন ভাবে বলল, যায় দু-একজনা। যখন তাদের সময় ফুরায়। সময় ফুরাইলে কেউ কি আর পৃথিবীতে থাকতে পারে রে দাদা! চির কাল কে আর বাঁচে?

হারীত বলল, জঙ্গলে যারা যায়, তারা তো সব অপনেগো মতনই জোয়ান-মদ্দ। বুড়াধুড়ারা তো কেউ যায় না। তাগো দিন ফুরাবে কেন?

লোকটি বলল, তেমন তেমন জোয়ান হইলে বাঘের ঘাড়েও কোপ বসায়। জঙ্গলের বাঘ ও মাইনসেরে ডরায়।

তারপর সে তার সঙ্গীটি দেখিয়ে বলে, এই বাসুদাই তো একবার সাক্ষাৎ যমের মুখে পড়েছিলো, পিছন থিকা কান্ধের ওপর আইস্যা পড়ছিল বাঘ, তা এই বাসুদা টাঙ্গির কোপ মারল, একেবারে চক্ষুর উপর। বাঘের সে কি চিকখৈর! ও বাসুদা, জামা খুইল্যা তোমার জখমি দাগটা দ্যাখাও না!

বলিষ্ঠকায় লোকটি জামা খুলে দেখালো বটে কিন্তু সে বিশেষ গল্পবাজ নয়, নিজের বীরত্বের কোনও অহংকারও তার নেই। সে বলল, বনবিবির দয়ায় বাঘের হাত থেকেও বাঁচা যায়, কিন্ত মা মনসা বড় নিষ্ঠুর। সাপের কামড়েই তো বেশি মানুষ মরে।

সুন্দরবনের গল্প শুনতে শুনতে হারীত উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। হলধরের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে। সেও মোল্লাখালির লোক দুটির সঙ্গে চেপে বসল লঞ্চে।

এই দিককার, সব লঞ্চেই মাছের আঁশটে গন্ধ। ভোরবেলা মাছচালানীদের ঝুড়িতে প্রায় গোটা লঞ্চ ভরা থাকে, বিকেলবেলা তারা খালি ঝুড়ি নিয়ে ফেরে। এত যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও জয়বাংলা থেকে মাছ ব্যবসায়ীরা চলে আসে এপারের বাজারে। সাপ ও বাঘের মতনই তারা পুলিশ বা মিলিটারিকে আর এক রকম প্রাকৃতিক উপদ্রব মনে করে, তার বেশি কিছু না।

একটার পর একটা নদী-নালা পার হয়ে সেই লঞ্চ এসে পড়ে বিরাট রায়মঙ্গল নদীতে। এবারের প্রবল বর্ষায় নদী একেবারে সমুদ্রের মতন চওড়া। বড় বড় ঢেউ। ধু-ধু করা ওপারের তটরেখাই জয়বাংলা। এত জলের দৃশ্যে হারীতের মনটা হু হু করে, মাছের গন্ধমাখা বাতাসে সে বারবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। লঞ্চ যেসব গ্রামে থামে, সেইসব গ্রামের নাম তার খুব চেনা মনে হয়।

নদীর একদিকে চোখে পড়ে চাষের খেত, অন্যদিকে জঙ্গল। মাছধরা ছোট ছোট নৌকোগুলো ওপারের জঙ্গল ঘেষে জাল ফেলছে। যাত্রীবোঝাই ফেরী নৌকো যাচ্ছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। জীবন চলেছে নিজস্ব নিয়মে।

ছোট ছোট গাছপালা ভর্তি একটা দ্বীপের দিকে হাত তুলে হারীত তার এক সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করল, ঐ গ্রামটার নাম কী?

লোকটি বলল, ঐটার নাম মরিচঝাঁপি। ওখানে গ্রাম নাই। অরও আউগাইলে পাইবেন সাতজেলিয়া গ্রাম। আর এইদিকে দ্যাখেন, ডাইন দিকে, মোল্লাখালি আইয়া পড়ছে।

মোল্লাখালিতে দিন কতক থেকে গেল হারীত। ডিঙ্গি নৌকোয় করে ধারেকাছের আরও কয়েকটি গ্রাম ঘুরল। এখানে যুদ্ধের কোনও চিহ্ন নেই। এখানে মানুষজনের সংমিশ্রণও বিচিত্র। মুসলমান আছে, মেদিনীপুরের হিন্দু আছে, পূর্ব বাংলার কিছু প্রাক্তন উদ্বাস্তু আছে, উড়িষ্যা থেকে আসা কিছু মানুষও বসতি নিয়েছে, এমনকি কিছু সাঁওতালও রয়েছে। কারুর সঙ্গে কারুর কোনও দ্বন্দ্ব নেই। যে-যার আপনমনে চালিয়ে যাচ্ছে জীবন-সংগ্রাম।

এই সজল গ্রাম্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ছেড়ে হারীতের আর যেতে ইচ্ছে করে না। অথচ নবার জন্য, গোলাপীর জন্য, নিজের স্ত্রীর জন্য, কলোনির অন্য মানুষজনের জন্য মাঝে মাঝে মন কেমন করে। তার একা পেট চালাবার কোনো চিন্তা নেই কিন্তু সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকাতেই তার আনন্দ। তাকে ফিরতে হবেই। সুচরিতের আর কোনো খোঁজ সে পায়নি। সে বেঁচে আছে না মরে গেছে তা কে জানে। হয়তো তার খোঁজ করতে যাওয়াটাই বিপজ্জনক। পুলিশ আবার তার পেছনে লাগবে। খবরের কাগজে এর মধ্যে একদিন হারীত পড়েছিল, পাতিপুকুর আশ্রমের সেই সন্ন্যাসিনী চন্দ্রাকেও পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। তিনি কি জানেন সুচরিতের খবর? থাক, সুচরিত যদি বেঁচে থাকে, সে নিজে সুখে থাকার চেষ্টা করুক!

হারীত মনঃস্থির করে ফেলল। এখানে এখনও অনেক এমন দ্বীপ রয়েছে, যেখানে-মনুষ্যবাস। নেই। তার ক্যাম্পের কয়েক হাজার মানুষ তো অনায়াসেই এখানে এসে আশ্রয় নিতে পারে। জঙ্গল তো কারুর জমিদারি বাগানবাড়ি নয়। জবরদখলের প্রশ্ন নেই। সরকার বাহাদুরকে তারা বলবে, আমাদের র‍্যাশন কিংবা ক্যাশ ডোল দিয়া সাহায্য করার দরকার নাই। আমাদের। শুধু বাংলার মাটিতে থাকতে দিন। এই নরম মাটিতে আমরা চাষ করব, নদীতে মাছ ধরব, লতেই আমাদের চলে যাবে। সরকারের গলগ্রহ হবার বদলে আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ দিন। এতে বাঁচতে পারি বাঁচব, নয় যদি কপালে মরণ থাকে তো মরব।

সরকার বাহাদুর এই আবেদন শুনবেন না? নিশ্চয় শুনবেন। তাঁদের ক্ষতি তো কিছু নাই। তাঁদের অনেক ব্যাট বেচে যাবে, বছরের পর বছর রিফিউজিদের খরচ টানতে হবে না।

অনেকদিন পর হারীত বেশ প্রফুল্ল বোধ করল।

৪৯. চুরুটটা নিভে গেছে অনেকক্ষণ

চুরুটটা নিভে গেছে অনেকক্ষণ, তবু ত্রিদিব সেটা ধরে আছেন দু’আঙুলে। মাঝে মাঝে ঠোঁটেও ছোঁয়াচ্ছেন, পকেটে দেশলাই নেই, ত্রিদিব লাইটার ব্যবহার করেন না, যখন তখন দেশলাই ফুরিয়ে যায়, তবু চুরুটটা ধরে থাকলেও নেশার কাজ হয়। পিকাডেলি সাকাসে একটা রাস্তা পার হবার উদ্যত ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ত্রিদিব। মাঝে মাঝেই থেমে যাচ্ছে ট্রাফিক, রাস্তা পার হবার সঙ্কেত জ্বলে উঠছে। দু দিক থেকে আসা যাওয়া করছে ব্যস্ত মানুষ, ত্রিদিব যেন একটা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দেবেন কি দেবেন না ভাবছেন।

এখন সন্ধে সাড়ে ছ’টা, অফিস ফেরা নারী পুরুষরা এখনো ছুটছে টিউব স্টেশনের দিকে, আকাশ সারাদিন ঝিম মেরে আছে, হাওয়া একেবারে বন্ধ, এখন যে-কোনো মুহূর্তে তুষারপাত শুরু হতে পারে। অনেক গাছের পাতা ঝরে গেছে, আবার সামনে আসছে সুদীর্ঘ শীত। ত্রিদিব একবার ওভারকোটের পকেটগুলো চাপড়ালেন, তিনি যে কী খুঁজছেন, সেটাই মনে নেই। আজ অবশ্য এখনো মদ্যপান করেননি ত্রিদিব, তাঁর ঠোঁটে চাপা কৌতুকের হাসি।

একজন লোক অসাবধানে ত্রিদিবকে একটা জোর ধাক্কা মেরে রাস্তায় নেমে গিয়ে আবার ফিরে এসে বললো। আ’ম স্যরি। ত্রিদিব লোকটিকে গ্রাহ্যই করলেন না। ঠাণ্ডা চুরুটে একটা টান দিলেন। এবার তাঁর খেয়াল হলো যে তাঁর তেষ্টা পেয়েছে।

ধারে কাছেই গোটা দুয়েক পাব আছে বটে কিন্তু ত্রিদিব চেনা পাব ছাড়া যান না। তিনি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। মিনিট দশেক হেঁটে একটা গলির মধ্যে ছোট পাব-এর দরজা ঠেলে ঢুকলেন। ভেতরটা ধোঁয়ায় ভর্তি, এত লোকজন যে অনেকেই বসার জায়গা পায়নি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করছে। এখানে থিয়েটারের উঠতি অভিনেতারা অনেকে আসে, তাদের পোশাক বিচিত্র, কথাবার্তা এবং হাসিও নাটকীয় ধরনের। বার কাউন্টার একেবারে ভর্তি, প্রত্যেকটা উঁচু টুলে লোক বসে আছে, তবু ত্রিদিব ঠেলেঠুলে এক কোণে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত বারটেন্ডারের উদ্দেশে বেশ চেঁচিয়ে বললেন, ‘ইভনিং, ম্যাক!

প্রায় বৃদ্ধ ব্যক্তিটি কিছুতেই ত্রিদিবের নাম মনে রাখতে পারে না, তাই সে বললো, ‘ইভিনিং, মাই ফ্রেন্ড। অ্যাজ ইউজুয়াল?

ত্রিদিব মাথা নেড়ে পকেট থেকে একটা দশ পাউন্ডের নোট বার করলেন।

বারটেন্ডারটি প্রথমে একটা বড় কাচের জাগে লাগার দিয়ে গেল, একটু পরে এক প্লেট ডিম ও সসেজ এনে রাখলো। সেই খাবার শেষ হতে না হতেই ত্রিদিবের বীয়ার শেষ, তাঁকে আর কিছু বলতে হলো না, দ্বিতীয় জাগ এসে পড়লো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

পাব-এ কেউ শুধু মদ্যপান করতে যায় না, ইংলিশ পাব হলো ইংরেজদের মন খোলসা করার তীর্থস্থান। শ্রমিক কিংবা অফিস ক্লার্করা সন্ধেবেলা পাবে এসে কথায় কথায় রাজা উজির মারে, বুদ্ধিজীবীরা তাদের চেয়েও উচ্চদরের বুদ্ধিজীবীদের মুণ্ডপাত করে, এ ছাড়াও অনেকে আসে বউয়ের সঙ্গে বেশি সময় না কাটাবার জন্য। পাব-এ সাধারণত কেউ চুপচাপ একা একা মদ খায় না, এখানে নিয়ম হলো, কাছাকাছি তিন চারজনকে তুমি এক রাউন্ড খাওয়াও, তারপর তারাও প্রত্যেকে এক রাউন্ড করে খাওয়াবে। এতে অন্যদের খাওয়ানোও হলো, অথচ খরচও বেশি পড়লো না।

ত্রিদিব অবশ্য এর ব্যতিক্রম। এই পাব-এ তিনি প্রায়ই আসেন বলে বেশ কয়েকজন তাঁর মুখ চেনা, কিন্তু চোখাচোখি হলে নড় করা ছাড়া ত্রিদিব কারুর সঙ্গে কথা বলেন না। তিনি সব সময়েই কাউন্টারে এসে দাঁড়ান, বারটেন্ডার, যে এই পাব-এর মালিকও বটে তার সঙ্গে দুটো একটা কথা হয়।

এখানে প্রায় সবাই ওভারকোট খুলে ঝুলিয়ে রাখে হ্যাঁঙারে। ভেতরটা বেশ গরম, তবু ত্রিদিব ওভারকোট খোলেন নি। তাঁর বিভিন্ন পকেটে অনেক কিছু থাকে। পাশের লোকটি চলে যাওয়ায় তিনি একটা উঁচু টুল পেয়ে গেলেন। অন্যদিন তিনি পকেট থেকে কোনো বই বার করে পড়তে শুরু করেন, আজ বার করলেন একটা ছোট্ট, সাদা, চৌকো কার্ড। সেটা একটা সামান্য ভিজিটিং কার্ড, অথচ সেটার দিকেই চেয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে, মুখে মুচকি মুচকি হাসি।

আজ টিউব ট্রেনে আসবার সময় ত্রিদিবের ঠিক মুখোমুখি বসেছিলেন রাতুল। ত্রিদিবের বাল্যবন্ধু সেই রাতুল, বম্বে থেকে বিপত্নীক হয়ে ফেরার পরে যাঁর সঙ্গে আবার নতুন করে ঘনিষ্ঠতা হয়। সেই রাতুল লন্ডনে! ত্রিদিব অন্যমনস্ক স্বভাবের মানুষ, ট্রেনের সহযাত্রীদের দিকে তিনি নজরই দেন না, ট্রেনে উঠেই বই খুলে বসেন। রাতুল নিশ্চয়ই দেখেছিলেন, অন্তত দু’ তিনটি স্টেশন মুখোমুখি বসে থেকেও রাতুল একবারও ত্রিদিবকে ডাকেননি। হঠাৎ কী

একটা বাংলা কথা শুনে ত্রিদিব মুখ তুললেন। রাতুলকে দেখেও ত্রিদিব যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ট্রেনের কামরায় ভারতীয় বেশ কিছু থাকে, বাংলা কথাও শোনা যায়, কিন্তু এ যে সত্যিই রাতুল।

ত্রিদিবের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই রাতুল উঠে দাঁড়ালেন। ট্রেনের গতি মন্থর হয়ে এসেছে, একটা স্টেশনে থামবে। রাতুল পাশের এক মহিলাকে বললেন, এসো! মহিলাটি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কেন! রাতুল আবার জোর দিয়ে বললেন, এসো!

এক মুহূর্তের জন্য ত্রিদিবের মনে হয়েছিল মহিলাটি যেন অবিকল সুলেখা। সেই রকম দৈর্ঘ্য, মাথা ভর্তি চুল, টানা টানা দুটি গভীর চোখ, একই রকম শরীরের গড়ন। পর মুহূর্তেই ত্রিদিব বুঝলেন, সুলেখা কী করে হবে? সুলেখা তো আর নেই, তাছাড়া মাত্র এই কয়েকটি বছরে তিনি কি সুলেখার মুখখানা ভুলে গেলেন? অন্য কোনো মেয়েই সুলেখা হতে পারে না। সুলেখা ছিল ইউনিক!

ত্রিদিবকে দেখেও রাতুল এগিয়ে যাচ্ছিলেন দরজার দিকে, ত্রিদিব হতভম্বের মতন বললেন, রাতুল! তুমি ইংল্যান্ডে কবে এলে?

রাতুল ভুরু কুঁচকে অতিশয় কৃত্রিম ভদ্রতার সঙ্গে বললেন, আই অ্যাম অ্যাফ্রেড…

ত্রিদিব বললেন, আমায় চিনতে পারছে না? আমি ত্রিদিব!

রাতুল মহা বিস্ময়ের ভাব দেখিয়ে বললেন, ত্রিদিব? এ রকম চেহারা করলে কী করে, সত্যি আমি চিনতে পারিনি।

ট্রেনটা প্রায় থেমে এসেছে, এখনো দরজা খোলে নি। রাতুল বললেন, আমায় এখানে নামতে হবে, একটা জরুরি কাজ আছে।

ত্রিদিব বললেন, তুমি কোথায় আছো? তোমার সঙ্গে যোগাযোগ হবে কী করে?

দরজা খুলে গেছে, আর অপেক্ষা করার উপায় নেই, পেছনের লোকরা ঠেলছে, রাতুল দ্রুত পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে ত্রিদিবের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, টেলিফোন করো! তারপর সঙ্গিনীর কোমরে হাত দিয়ে নেমে গেলেন প্ল্যাটফর্মে।

ট্রেনটা আবার ছেড়ে যাবার পর ত্রিদিবের মনে হয়েছিল, তিনিও নেমে পড়লেন না কেন? তাঁর এমন কিছু রাজকার্য ছিল না, কিছুক্ষণ রাতুলের সঙ্গে কথা বলে আবার পরের ট্রেনে উঠে পড়তে পারতেন। কিন্তু একটু একটু করে তিনি উপলব্ধি করলেন যে রাতুলের ব্যবহারটাই ছিল অস্বাভাবিক। ত্রিদিবের চেহারা কি এতই বদলে গেছে যে একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও তাঁকে চিনতে পারবেন না? ত্রিদিকে দেখার পরেই রাতুল ধড়ফড় করে নেমে যেতে চাইলেন, ত্রিদিব নিজের মুখে না বললে রাতুল ভবিষ্যতে কোনো যোগাযোগ করারও ইচ্ছে প্রকাশ করেননি।

রাতুলের সঙ্গে একজন মহিলা, সে কি রাতুলের স্ত্রী? মহিলাটির সঙ্গে রাতুলের ব্যবহারে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল। রাতুল আবার বিয়ে করেছে? এত সহজে সে সুলেখাকে ভুলে যেতে পারলো? রাতুল ভাগ্যবান। যারা সহজে অনেক কিছু ভুলে যেতে পারে, তারাই বুঝি জীবনে সার্থক হয়। এই ক’ বছরেও চেহারা একটুও টকায়নি রাতুলের, তাঁকে অনায়াসে এখনো কোনো ক্রিকেট টিমের ক্যাপটেন করা যায়।

সুলেখার মৃত্যুর পর রাতুল আর কোনো সম্পর্কই রাখেননি ত্রিদিবের সঙ্গে। সুলেখার আত্মহত্যার জন্য রাতুল আর শাজাহান দু’জনেই ত্রিদিবকে দায়ী করেছিলেন, যেন ত্রিদিবই নিজের হাতে সুলেখার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

হ্যাঁ, দায়ীই তো ত্রিদিব! তিনি নিজে তা অস্বীকার করতে পারেন না! সুলেখা ত্রিদিবের জন্য অন্য সমস্ত প্রলোভন জয় করতে পেরেছিল, তবু ত্রিদিব তাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। কী কঠিন, নির্মম সেই মুক্তি, কী করে ত্রিদিব উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন সেই কথা! অপমানে নীল হয়ে গিয়ে সুলেখা বলেছিলেন, তুমি চাও, আমি চলে যাই!

এক চুমুকে তৃতীয় বীয়ারটি শেষ করলেন ত্রিদিব, খানিকটা ঝরঝর করে পড়লো তাঁর বুকের জামায়। কাচের জাগটি কাউন্টারে ঠুকে ত্রিদিব আবার নেবা চুরুটটা ঠোঁটে গুজলেন।

ম্যাক আর এক জাগ বীয়ার নিয়ে এসে ত্রিদিবের ঠোঁট থেকে চুরুটটা কেড়ে নিল। একটা লম্বা নতুন চুরুট ত্রিদিবের ঠোঁটে লাগিয়ে দিয়ে লাইটারে ধরিয়ে দিয়ে বললো, দিস ইজ অন দা হাউজ!

ত্রিদিব হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানালেন শুধু, ম্যাকের সঙ্গে কোনো কথাবার্তা বলার ইচ্ছে নেই তাঁর এখন।

কতদিন আগে এদেশে এসেছে রাতুল? নিছক বেড়াতে এলে কেউ কার্ড ছাপে না। কার্ডে রাতুলের অফিস ও বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নাম্বার। ক্লোরাইড কম্পানি, হ্যাঁ, দেশে থাকতে রাতুল ক্লোরাইডেরই বড় অফিসার ছিল। হয়তো দু তিন বছর ধরেই এখানে আছে। লন্ডনে রাস্তায় ঘাটে চেনা কারুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটাই অস্বাভাবিক। ত্রিদিবও আগে লন্ডনে থাকতেন না, মাস ছয়েক হলো চাকরি বদল করে এসেছেন।

পাব-এ হৈ-হল্লা বাড়ছে, গোটা তিনেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ছেলে গায়ে পড়ে পাশের লোকদের সঙ্গে ঝগড়া বাধালো। ত্রিদিবের কোনোদিকে ভূক্ষেপই নেই। তিনি সেই ছোট্ট কার্ডটাই দেখছেন একদৃষ্টিতে, যেন তাতে লেখা আছে অনেকদিনের ইতিহাস।

গোটা চারেক বীয়ার শেষ করার পর ত্রিদিবের অন্য কথা মনে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি তিনি উঁচু টুল থেকে নেমে পড়লেন, কাউন্টারের ওপরে রাখলেন দু’ পাউন্ড টিপস। বেরিয়ে এসে তিনি টিউবের জন্য না নেমে একটা ট্যাক্সি ধরে চলে এলেন গোল্ডার্স গ্রীনে। চুরুটটা আবার নিভে গেছে, ধরাবার কথা খেয়াল নেই।

ত্রিদিবকে দেখেই তুতুল ভুরু কুঁচকে বললো, ত্রিদিবমামা, আবার তুমি টিপসি হয়ে এসেছো? তোমাকে তো বলেইছি, আলম এটা পছন্দ করে না!

ত্রিদিব সেই বকুনি অগ্রাহ্য করে উদাসীনভাবে হাসলেন। তারপর বললেন, আসলে এই রকম সময়েই আমি সুস্থ থাকি, তোরা বুঝিস না! আলম কই রে?

তুতুল বললো, সার্জারিতে ডিউটিতে গেছে। ফিরতে দেরি হবে।

সোফায় বসে পড়ে ত্রিদিব বেশ শব্দ করে একটা ঢেকুর তুললেন। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বললেন, বেশ ভালো রান্নার গন্ধ বেরিয়েছে, চিংড়ি মাছ, তাই না? তুতুল তুই তো। আমাকে কোনোদিনও নেমন্তন্ন করে খাওয়াস না!

তুতুল বললো, খাওয়াতে পারি, কিন্তু সেদিন ড্রিংক করে আসতে পারবে না। এখানেও মদ পাবে না।

–মুসলমানের বউ হয়ে তুই আরও বেশি অ্যান্টি-ড্রিংকিং হয়ে গেছিস! ওরে বীয়ারকে কেউ মদ বলে না! আসল মদ খাবো এখন!

ওভারকোটের পকেট থেকে একটা ছোট শিশি বার করে ত্রিদিব খানিকটা স্কচ গলায় ঢাললেন।

তুতুল রীতিমতন রাগ করে ঝাঁঝালো গলায় কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। বিলেতে প্রথম এসে তুতুল যখন অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছিল, তখন ত্রিদিব তাকে দুশো পাউন্ড দিয়েছিলেন না চাইতেই। তুতুল অবশ্য টাকাটা শোধ করে দিয়েছে, কিন্তু সেই উপকার কি ভোলা যায়? তাছাড়া ত্রিদিব যে তুতুল আর আলমকে সত্যিকারের স্নেহ করেন, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

তুতুল কারভাবে বললো, ত্রিদিমামা, তুমি কেন এমনভাবে নিজেকে শেষ করছো! আমি অনেকবার বলেছি, যা হবার তা তো হয়েই গেছে, তুমি পুরোনো কথা ভুলে যাও! তুমি মোটেই গিল্টি নও! রাগের মুহূর্তে মানুষ ও রকম অনেক কথাই বলে ফেলে!

ত্রিদিব এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন তুতুলের দিকে। সুস্থ হয়ে উঠতে যথেষ্ট সময় নিয়েছে তুতুল, এখন অনেকটা ভালো আছে। কিন্তু তার মুখের ফ্যাকাসে ভাবটা যায় নি, তার হাঁটার মধ্যে একটা টলমলে ভাব আছে, তবু সে জোর করেই নিজেকে পুরোপুরি ফিট প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আলম অবশ্য তাকে কাজে যোগ দিতে দেয়নি, কিন্তু সে একা একা বাইরে বেরোয়। আজ শাড়ির বদলে একটা হাউস কোর্ট পরে আছে তুতুল, মাথার সব চুল খোলা, তার চোখ দুটিতে ঈষৎ সজল ভাব।

ত্রিদিব বললেন, হ্যাঁ, এবার বদলে যাবো, সময় হয়েছে, আজ একজনকে দেখলাম…হ্যাঁরে তুতুল, তুই শাজাহানের ঠিকানাটা জানিস?

তুতুল আবার তীক্ষ্ণ হয়ে গিয়ে বাচ্চাকে বকুনি দেবার ভঙ্গিতে বললো, না তুমি শাজাহান সাহেবের সঙ্গে দেখা করবে না। তোমরা দেখা হলেই ঝগড়া করো।

–নারে, ঝগড়া করবো না। শাজাহানের সঙ্গে আমি খারাপ ব্যবহার করেছি, তার কাছে ক্ষমা চাইবো।

–তার বাড়ি গিয়ে তুমি ক্ষমা চাইবে! সেটারও কোনো দরকার নেই, তুমি বরং ওর নামে একটা নোট লিখে দিও, আমরা পৌঁছে দেবো। তবে তাড়াতাড়ি দিও, ত্রিদিবমামা, আমরা সপ্তাহ দু’ একের মধ্যে কলকাতা যাচ্ছি। তোমার কারুকে কোনো খবর দেবার আছে তো বলো!

কলকাতার প্রসঙ্গে ত্রিদিব কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলেন না। আর এক ঢোঁক পান করে মদের বোতলটায় ছিপি আঁটলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাদের টেলিফোন নোট বুকটা কোথায়?

তুতুল বললো, চিংড়ি মাছের তরকারি বেঁধেছি। ভাত হয়নি এখনো। তুমি দুটো টোস্ট দিয়ে একটু খাবে আমার রান্না! বসো, আমি গরম করে দিচ্ছি এক্ষুনি!

–কথা ঘেরাবার চেষ্টা করছিস কেন রে, তুতুল? আমি কিছুই খাবো না। আই নেভার টেইক এনিথিং সলিড আফটার সানডাউন! পাব-এ ডিম আর সসেজ খেয়েছি, পেট ভরে গেছে!

–রোজ রোজ তুমি বাইরের ঐসব ভাজাভুজি, গারবেজ ফুড খাও?

–নাউ আ ডক্টর ইজ স্পিকিং! তুই শাজাহানের ঠিকানাটা আমাকে দিবি কি দিবি না বল?

–ঠিকানা আমাদের কাছে লেখা নেই।

-–ফোন নাম্বার থাকলে ঠিকানা জানা বুঝি শক্ত কিছু!

–তুমি কেন শুধু শুধু ওর বাড়িতে যাবে? ত্রিদিবমামা, শাজাহান সাহেব তার পরেও অনেকবার এসেছেন এখানে। তোমার সেদিনকার ব্যবহারে উনি মোটেই রাগ করেননি। উনি বুঝেছেন যে তুমি আমার জন্য চিন্তা করে খুব আপসেট হয়েছিলে। তুমি বোধ হয় ভেবেছিলে, আমি আর বাঁচবো না, মরেই যাবো!

–বালাই ষাট! তুই মরবি কেন? তোদের মতন ছেলেমেয়েরা মরে গেলে এই পৃথিবীটা আরও শুকনো আর বিচ্ছিরি হয়ে যাবে! কই, তোদের নোট বুকটা দেখাবি না?

কালো রঙের নোট বুকটার ভেতরের খাপে অনেকগুলো কার্ড গোঁজা। তার মধ্যে সবচেয়ে ওপরেরটাই শাজাহানের। সুদৃশ্য, আইভরি ফিনিশ কাগজে ছাপা, তাতে শাজাহানের নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম, দু’তিনটি ফোন নাম্বার ও ঠিকানা রয়েছে।

তুতুল লজ্জা পেয়ে বললো, ও-মা, এই কার্ডটা যে এখানে আছে আমি জানতাম না, সত্যি বিশ্বাস করো, আলম কখন রেখেছে …

ত্রিদিব বললেন, আমি তোকে বিশ্বাস করছি রে, তুতুল। এমন কিছু ব্যাপার তো নয়। এই কার্ডটা আমি নিলুম আজ, পরে ফেরত দিয়ে যাবো। দ্যাখ, এদের থেকেও অনেক বেশিদিন আমি বিলেতে আছি, কিন্তু আমার কোনো কার্ড নেই! কেউ আমার ঠিকানা জানে না। ইজট ইঁট ফানি! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!

তুতুল ওর হাত চেপে ধরে ব্যাকুলভাবে বললো, ত্রিদিবমামা…

–কী রে?

–তুমি কথা দাও–

–কথা দিচ্ছি রে তুতুল! আই শ্যাল নেভার মিসবিহেভ উইথ শাজাহান! আমাদের দু’জনের মধ্যে একটা কমন বন্ডেজ আছে।

হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে তুতুলের মাথায় রেখে ত্রিদিব বললেন, বেঁচে থাক, বেঁচে থাক, মৃত্যুর কথা কখনো চিন্তা করিস না। মৃত্যু বড় ঠাণ্ডা, বড় ভালগার রকমের ফাইন্যাল।

ঈষৎ স্খলিত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ত্রিদিব। আবার একটা ট্যাক্সি ধরলেন। শাজাহানের মতন একজন ব্যস্ত মানুষকে বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে বাড়িতে পাওয়া যাবে কি না সেকথা চিন্তাও করলেন না।

নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছোনোর পর বেল দিতে দরজা খুলে দিলেন স্বয়ং শাজাহান। ত্রিদিকে দেখে বিস্ময় গোপন করে কঠোর মুখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়েস?

ত্রিদিব বললেন, ইয়েস আবার কী? আমি তোমার সঙ্গে দু একটা কথা বলতে এসেছি। আমি কি তোমার অচেনা যে এমন দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছো?

শাজাহান বললেন, আমি এখন একটু এনগেজড আছি। আমার বাসায় কয়েকজন গেস্ট রয়েছেন।

ত্রিদিব প্রকৃত মাতালের মতন ফুরফুরেভাবে হেসে বললেন, বাসায়? এতদিন বিলেতে থেকেও পাখির বাসা ছাড়তে পারলে না? গেস্ট আছে তো কী হয়েছে? আমি অপেক্ষা করবো। গেস্ট চলে গেলে তোমার সঙ্গে কথা বলবো। জরুরি কথা!

শাজাহান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ত্রিদিব তাঁকে প্রায় ঠেলেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে।

বাইরের ঘরের সোফাগুলি ফাঁকা, কার্পেটের ওপরে বসে আছে পাঁচ ছ জন যুবক ও দু জন যুবতী। তাদের সামনে ছড়ানো অনেক কাগজপত্র ও বেশ কিছু পাউন্ডের নোট। সবাই ত্রিদিবকে দেখে বিব্রত হয়ে কথা বন্ধ করে চেয়ে রইলো।

ত্রিদিব প্যান্টের দু’ পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ঈষৎ দুলতে দুলতে বললেন, সবকটা মুসলমান। পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বাংলাদেশ! বল্ডারড্যাস্! পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ তৈরি হলেই বা কী এমন হাতিঘোড়া লাভ হবে? এনিওয়ে, ইউ মে ইগনোর মাই প্রেজেনস! আমি কেউ না!

সেই যুবকেরা শাজাহানের দিকে সপ্রশ্নভাবে তাকালো। শাজাহান বিব্রতভাবে বললেন, ঠিক আছে, তোমরা এবার গুছিয়ে ফেলো! কথা তো হয়েই গেল। নেকস্ট ক্যাম্পেন হবে সাসেক্স-এ। আমরা বারট্রান্ড রাসেলকে দিয়ে একটা অ্যাপিল করাবো।

ত্রিদিব একজনের প্রায় ঘাড়ের কাছে বসে পড়ে বললেন, তোমরা সব সাচ্চা মুসলমান, সন্ধের পর লুকিয়ে লুকিয়ে মিটিং করো, কিন্তু মদ খাও না। আমি ব্যাটা এক ব্লাডি হিন্দু, আ ব্লাডি ড্রাঙ্ক অ্যাজ ওয়েল, আমি এই সময় মদ খাই। আমি তোমাদের ডিসটার্ব করবো না, বাট মে আই হ্যাভ আ গ্লাস অ্যান্ড সাম ব্লাডি আইস?

শাজাহান বললেন, বসুন, সব দিচ্ছি।

কাবার্ড খুলে তিনি গ্লাস, সোডার বোতল, একটি ব্ল্যাক লেবেল স্কচের বোতল বার করলেন।

ভেতরে গিয়ে বরফও নিয়ে এলেন। একটা ছোট টেবল টেনে তার ওপরে সব কিছু রেখে বললেন, প্লিজ হেল্প ইয়োরশেলফ।

ত্রিদিবের উত্তরোত্তর নেশা বাড়ছে। এর মধ্যেই তিনি নিজের বোতলের কাঁচা হুইস্কিতে আরও দু তিন চুমুক দিয়েছেন। এবার তিনি ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, হেলপ ইয়োরশেলফ। ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে খারাপ শব্দ! মোস্ট হ্যাঁকনিড এক্সপ্রেশান, শুনলেই আমার গা জ্বালা করে। আরে বাবা, নিজের মদ নিজের গেলাসে ঢালবো। তাকেই বলে হেলপ ইয়োর শেলফ! ডিসগাসটিং! ওঃ হো, আমি আপনাদের ডিসটার্ব করছি, তাই না! দুঃখিত, দুঃখিত, ইউ প্লিজ গো অ্যাহেড! আর আমি কোনো কথা বলব না। তবে, শাজাহান ভাইয়া, তোমার ঐ ফ্যান্সি স্কচ আমি খাবো না! যে বাড়ির হোস্ট নিজে ড্রিংক করে না, তার মদ আমি দুই না। আমি আমার নিজের বোতল থেকে খাবো। ওকে? তোমরা মিটিং করো, আমি স্পিকটি নট!

যুবকের দল টাকা পয়সাগুলো গুনে তুলে একটি ভেলভেটের গয়নার বাক্সে ভরলো। তারা। বুঝে নিয়েছে যে আজ আর কোনো আলোচনা হবে না। তবু দু একটা কথাতেও কথা বাড়ে। সামনের সপ্তাহেই ফান্ড রেইজিং-এর জন্য কনসার্ট আছে, সে বিষয়ে কিছু কথা না বললেই নয়।

ত্রিদিব আর কোনো মন্তব্য না করে চুপচাপ মদ খেয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর ঠোঁটে একটা অভিব্যক্তিহীন হাসি লেগেই আছে। তাঁর চোখে সুদূর দৃষ্টি।

একটু পরে শাজাহানের অতিথিরা বিদায় নিয়ে চলে গেল। তারা ভদ্রতাসূচক দু একটা কথা বলতেও চাইলো ত্রিদিবের সঙ্গে, কিন্তু ত্রিদিব গ্রাহ্যই করলেন না। তিনি অন্য কিছুতে বিভোর।

শাজাহান সবাইকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, নাও, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?

ত্রিদিব ঘোর ভেঙে কয়েক পলক চেয়ে রইলেন শাজাহানের দিকে। তারপর বিদ্রূপের সুরে বললেন, তুমি এত অর্ডিনারি কবে থেকে হয়ে গেলে, শাজাহান? হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ? এটা কি ইংরিজি, না তার আবারেশন? কেউ কি কারুর জন্য সত্যি কিছু করতে পারে? যত রাজের দোকানদাররা এই কথা বলে। শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা! তুমি শাজাহান সিরাজ, তুমি একজন শেক্সশপীয়ার-বিশেষজ্ঞ, তোমার মুখে এত সাধারণ কথা?

শাজাহান চোয়াল আড়ষ্ট করে বললেন, ফরগেট শেক্সপীয়ার! আপনি আমার কাছে কী জরুরি কথা বলতে এসেছেন, সেটাই বলে ফেলুন। আমি একটু তাড়াতাড়ি শুতে যাই!

ত্রিদিব আবেগ মথিত গলায় বললেন, শাজাহান, তোমার সঙ্গে কতদিন আমি শেক্সপীয়ার বিষয়ে নোট এক্সচেঞ্জ করিনি! এদেশের অধিকাংশ ইংরেজই শেক্সপীয়ারের দু’তিন লাইনও মুখস্ত বলতে পারে না। র‍্যাঙ্ক ইডিয়েটস। একদিন এক ব্যাটা দোকানদারকে বললুম, ম্যাড অ্যাজ দা সী. অ্যান্ড উইন্ড, হোয়েন বোথ কনটেন্ট, হুইচ ইজ দা মাইটিয়ার… তা সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। আমি বললুম। ওরে ব্যাটা, এ তোদেরই মহাকবির রচনা, হ্যামলেটের মায়ের সংকল্প, তাও কিছু বোঝে না। যেন হ্যামলেটের নামও শোনেনি!

শাজাহান কঠোর গলায় বললেন, ত্রিদিববাবু, এত রাত্রে আমি এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী নই। আপনার যদি অন্য কিছু…

তাকে বাধা দিয়ে ত্রিদিব বললেন, আজ রাতুলের সঙ্গে দেখা হলো।

প্রায় আমূল চমকে উঠে, কণ্ঠস্বর পুরো বদলে শাজাহান জিজ্ঞেস করলেন, কে? কার সঙ্গে দেখা হল বললেন?

ত্রিদিব হাসতে হাসতে বললেন, রাতুল, রাতুল, মনে নেই? সেই যে অ্যাথলিট ও প্রেমিক, বিরহী ও বিয়ে পাগলা, অতি সাধারণ একটি জীব, কোনোদিন কবিতা পড়েনি, পড়লেও বোঝেনি, সেই রাতুল এখন লন্ডনে।

শাজাহান জিজ্ঞেস করলেন, সে কোথায় থাকে?

ত্রিদিব বললেন, ঠিক আমার মনেও এই প্রশ্ন জেগেছিল। সে কোথায় থাকে? সে নিশ্চিত কোথাও না কোথাও থাকে। সে সাধারণ একজন টুরিস্ট নয়। সে এদেশে আছে বেশ কিছুদিন। শাজাহান, তুমি, আমি আর রাতুল, দ্যাট ওল্ড থ্রিসাম! আবার আমরা মিট করতে পারি না? ধরো আমরা তিনজনে এক সঙ্গে বসে আড্ডা দিতে দিতে প্ল্যানচেটে সুলেখাকে ডাকলুম!

শাজাহান ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ত্রিদিব, তুমি রাতুলকে কোথায় দেখলে? সে কি এদেশে আরও কিছুদিন থাকবে?

ত্রিদিব বললেন, প্ল্যানচেট ব্যাপারটাকে তুমি হয়তো বোগাস মনে করতে পারো আমারও খুব একটা বিশ্বাস নেই। তবু তো, বিশেষ একজনের কথা চিন্তা করে তিনজনের এক হওয়া। আমরা মাথায় মাথা ঠেকাবো। আমাদের ভাইব্রেশান সঞ্চারিত হবে এক মাথা থেকে অন্য মাথায়, তাতেই সুলেখা আবার ফিরে আসবে তিনজনের কাছে।

শাজাহান উত্তেজিত ভাবে বললেন, ত্রিদিব, সুলেখা সম্পর্কে এতটা অবসেড থাকার কোনো মানে হয় না। জীবিতেরা যখন হারিয়ে যায়, তখন তারা বড় বেশি হারিয়ে যায়। তুমি মনে মনে এখনো যে সুলেখার স্মৃতি নারচার করছে, সেটা তোমার মনগড়া এক নারী। সে আসলে সুলেখা নয়!

ত্রিদিব ঠাট্টার সুরে বললেন, থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর অ্যাডভাইস! ওভার সিমপ্লিফিকেশান! সব কিছুরই তুমি একটা ব্যাখ্যা দিতে পারো, তাই না? তোমার মনে তা হলে সুলেখার কোনো স্মৃতি নেই? বেচারা সুলেখা, সে মরে গিয়েও হেরে গেল! রাতুলই তা হলে ভালো আছে, সে অন্য মেয়ের কাছে সান্ত্বনা পেয়েছে!

শাজাহান জিজ্ঞেস করলেন, রাতুল কোথায়?

ত্রিদিব পকেট থেকে কার্ডটা বার করে, সেটা ঝটো কোনো হীরে কিংবা আসল এই ভঙ্গিতে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে বললেন, এই যে এখানে, এ দেশেই!

শাজাহান হাত বাড়িয়ে বললেন, কার্ডটা আমাকে দাও!

ত্রিদিব বললেন, আর এক বোতল সোডা! আর একটু পান করবো। মনে হচ্ছে, আজ রাতটা তোমার এখানেই শুয়ে থাকতে হবে। তুমি আমাকে যদি অবশ্য তাড়িয়ে না দাও, শাজাহান! বয়েস হয়েছে, হাঁটুতে ব্যথা হয়, বেশি রাত্তিরে রাস্তায় বেরুতে ভয় পাই! তবে, একদিন রাতুলকে ডাকবো, আমরা তিনজন এক সঙ্গে—

–কার্ডটা আমাকে দাও, ত্রিদিব!

–না! এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? আমিই সব ব্যবস্থা করবো। বিচিত্রভাবে হেসে শাজাহান বললেন, ঠিক আছে, দিও না! আমার স্মৃতি শক্তি ভালো, তুমি যে একবার দেখালে তাতে আমার টেলিফোন নাম্বারগুলোও মুখস্ত হয়ে গেছে। রাতুলের সঙ্গে শিগগিরই আমার দেখা হবে! কিন্তু সেখানে তুমি থাকবে না। ওর সঙ্গে আমার বোঝাঁপড়া বাকি আছে।

৫০. হঠাৎ লণ্ডনের ব্যবসা গুটিয়ে

হঠাৎ লণ্ডনের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে শুরু করলেন শাজাহান। তিনি কোনওদিন কারুর সঙ্গে পার্টনারশিপে বিজনেস করেন না, নিজের চেষ্টাতেই লণ্ডনে সুতিবস্ত্র, তোয়ালে এবং কার্পেট আমদানির ব্যবসা বেশ জমিয়ে তুলেছিলেন, একখানা নিজস্ব ওয়্যারহাউজ ভাড়া নিয়ে রেখেছেন। এমন ব্যবসা বন্ধ করে দেবার কোনো মানেই হয় না, তবু তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। কলকাতা ছেড়ে ঢাকাতে গিয়েও তিনি বেশি দিন মন বসাতে পারেননি। তিনি খুব কম মানুষের সঙ্গেই সহজভাবে মিশতে পারেন, কিন্তু কোনো এক জায়গায় বছরের পর বছর থাকলে পরিচিতের সংখ্যা বেড়েই যায়। তাদের সকলের সঙ্গেই নিখুঁত ভদ্র ব্যবহার করেন। তিনি, অথচ ভেতরে ভেতরে বিরক্তি বোধ থেকেই যায়।

এত দিনেও আর বিয়ে করলেন না শাজাহান। তাঁদের কলকাতার বাড়িতে অনেক ভাই-বোন, বাবা-মা এখনো বেঁচে আছেন, কিন্তু লণ্ডনে শাজাহান একা থাকেন। একটা সুন্দর, ছোট্ট বাড়ি কিনেছেন কেনসিংটনে। কলকাতাতেও জামাকাপড় ও কার্পেটের পারিবারিক ব্যবসা আছে তাঁদের, এই ব্যবসা তিনি ভালোই জানেন। কিন্তু অন্যান্য সার্থক ব্যবসায়ীদের মতন তিনি সারা দিনে আঠেরো ঘণ্টাই এই নিয়ে মাথা ঘামান না। প্রত্যেক কাজের জন্য তাঁর আলাদা সময় ভাগ করা আছে। ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ প্রাতঃভ্রমণ, একা একা টেমস নদীর ধার দিয়ে হেঁটে বেড়াতে তাঁর খুব ভালো লাগে, বৃষ্টির মধ্যেও তিনি ম্যাকিনটস চাপিয়ে ছাতা নিয়ে বেরোন, বাইরের কোনো রেস্তোরাঁয় ব্রেক ফাস্ট খেয়ে ফিরে এসে চিঠিপত্র লিখতে বসেন। পুরো দুপুরটা তিনি ব্যয় করেন ব্যবসার কাজে, সেন্ট্রাল লণ্ডনে একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে ভাগাভাগি করে তাঁর একটা ছোট্ট অফিস আছে, তা ছাড়া ব্যাঙ্ক, ইনসিওরেন্স, ক্লিয়ারিং এজেন্টদের অফিসে ঘোরাঘুরিও করতে হয়। সন্ধের পর নিতান্ত জরুরি না হলে তিনি ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো লোকের সঙ্গে দেখা করেন না, ঐ বিষয়ে আলোচনাও করতে চান না কারুর সঙ্গে। বাড়িতে একা একা গান বাজনা শোনেন এবং বই পড়েন। এই দুটোই তাঁর প্রিয় নেশা, তিনি মদ খান না, সিগারেট খান না, গত ছ-সাত বছর ধরে কোনো নারীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন না।

এইভাবে বেশ চলছিল, হঠাৎ তাসের ঘরের মতন তিনি সব কিছু ভেঙে দিতে চাইলেন। লণ্ডন আর তাঁর ভালো লাগছে না। প্রথমেই তিনি বাড়িটা প্রায় জলের দামে বিক্রি করে দিলেন, তার পর উঠলেন সাউথহলের একটা শস্তা হোটেলে। তিন-চার দিন পরেই সেই হোটেল আবার বদলালেন। তাঁর মালপত্রের স্টক পুরোটাই মার্ক অ্যাণ্ড স্পেনসারকে দিয়ে দিলেন চড়া কমিশনে। আরও যেসব কনসাইনমেন্ট আসছে সেইসব এবং তাঁর কম্পানির নামের গুড় উইল বেচে দেবার জন্য কথাবার্তা চালাতে লাগলেন গুজরাতি এবং পাকিস্তানী সিন্ধ্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। যেন যে কোনো কারণেই হোক, এক্ষুনি তাঁর প্রচুর ক্যাশ টাকা দরকার।

শাজাহানের পরিচিতরা অনেকে বলতে লাগলো, তিনি এইসব পাগলামি করছেন শুধু ত্রিদিবকে এড়াবার জন্য। ত্রিদিব ইদানীং বড় উপদ্রব শুরু করেছিলেন। শাজাহানের মতন একজন সূক্ষ্ম স্বভাবের মানুষের বাড়িতে এমন মাতালের চিৎকার ও দাপাদাপি যেন কল্পনাই করা যায় না।

তুতুল আর আলমের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে শাজাহান ইচ্ছেতেই হোক কিংবা অনিচ্ছেতেই হোক, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে খানিকটা জড়িয়ে পড়েছেন দু-এক মাস ধরে। শাজাহান নিজেকে ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানী কিছুই মনে করেন না। যদিও অধিকাংশ বাঙালিদের তুলনায় তাঁর গায়ের রং বেশ ফর্সা, ছিপছিপে শরীর, স্যাভিল রোর দোকান থেকে তৈরি করা খাঁটি বিলিতি পোশাক পরেন, তা হলেও ইংরেজরা যে কোনোদিন তাঁকে আপনজন মনে করে না তা তিনি জানেন। মনে মনে নিজেকে তিনি একজন বিশ্ব নাগরিক ভাবেন। শেক্সপীয়ার-টলস্টয়-গ্যেটের রচনা কিংবা বাখ-মোৎসার্ট-চাইকভস্কির সঙ্গীত যেমন কোনো বিশেষ দেশের সম্পত্তি নয়, তেমনি যারা মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শিল্পগুলি উপভোগ করে, তারা মানব সভ্যতারই অঙ্গ। রাষ্ট্রনায়করা অবশ্য এসবের তোয়াক্কা করেন না। তাঁরা ক্রমশই মানুষকে আরও সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছেন।

পাকিস্তানকে দু খণ্ড করার আলোচনায় শাজাহান কখনো কোনো মতামত প্রকাশ করেননি। রাজনীতিতে তিনি মাথা গলাতে চান না, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে নৃশংস অত্যাচার, গণহত্যার খবর জেনে বিচলিত না হয়ে পারেন না। ঢাকায় তাঁর পরিচিতদের মধ্যে কেউ কেউ লণ্ডনে পালিয়ে এলে তিনি গোপনে তাঁদের টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন। এখন আমরা তাঁকে চেপে ধরেছে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে অর্থ সংগ্রহ অভিযানে সাহায্য করার জন্য। শাজাহান নিজে কিছু টাকা দিয়ে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলমের দলবল তাঁকে ছাড়েনি।

এই ব্যাপারে তাঁর বাড়িতে প্রায়ই মিটিং হচ্ছিল, সেখানে প্রায় প্রত্যেক দিনই মত্ত অবস্থায় হাজির হচ্ছিলেন ত্রিদিব। ত্রিদিব এলে আর কোনো কাজের কথা হয় না, শাজাহান তাঁর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতেও পারেন না।

কিন্তু শুধুমাত্র এই কারণে কী কেউ বাড়ি বিক্রি করে দেয়, ব্যবসা তুলে দিতে চায়?

ত্রিদিবের সঙ্গে আবার নতুন করে বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নিতে উৎসাহী নন শাজাহান। তাঁর জীবন থেকে দিল্লির সেই পরিচ্ছেদটা তিনি মুছে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সুলেখার স্মৃতিও অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। সুলেখার মুখখানা মনে পড়লে এখনও একটু একটু বুক ব্যথা করে, তবে সেই ব্যথার মধ্যে পরিতাপের জ্বালার চেয়ে মাধুর্যই বেশি। এর মধ্যে রাতুল এসে পড়ে পুরোনো রাগ, ক্ষোভ, শোকানল আবার জ্বালিয়ে দিল।

রাতুলের কথা শুনে শাজাহান প্রথমে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়লেও আস্তে আস্তে তা দমন করেছেন। শাজাহানের দৃঢ় বিশ্বাস, রাতুলের নির্লজ্জ ব্যবহারের জন্যই সুলেখা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। শাজাহান নিজে তো কখনো ভদ্রতার সীমারেখা লঙঘন করেননি, সুলেখার সঙ্গে কখনো ঘনিষ্ঠতার দাবি জানাননি, ত্রিদিব ও সুলেখা দু’জনের সঙ্গেই ছিল তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্ক, ওঁদের সঙ্গ তিনি উপভোগ করতেন। এর মধ্যে রাতুলের কোনো স্থান ছিল না। তবু রাতুল এক সকালবেলা তাঁকে চড় মেরেছিল। তাঁকে বলেছিল পাকিস্তানের স্পাই। রাতুলের কলাকৌশলেই শাজাহান সিক্সটি ফাইভের ওয়ারের সময় ডিটেইনড় হয়েছিলেন। সে কি প্রচণ্ড অপমান! তাদের পরিবার তিন পুরুষের কংগ্রেস সমর্থক, কলকাতায় তাদের নিজস্ব বাড়ি, তবু তিনি শুধু মুসলমান বলেই স্পাইইং-এর অভিযোগ! মারোয়াড়ি, গুজরাতি, বাঙালি হিন্দুরা পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা করেনি?

তবু সেই তিক্ততা সারাজীবন পুষে রেখে লাভ কী? অতীতের কোনো বোঝা ঘাড়ে চেপে থাকলে ভবিষ্যতের দিকে ঠিক মতন পা ফেলে এগোনো যায় না। সেই জন্যই তিনি ত্রিদিবের প্রস্তাবে সায় দেননি, রাতুলকে ডেকে তাঁরা তিন জনে একসঙ্গে বসার কোনো অর্থ হয় না। রাতুলকে তিনি ক্ষমা করতে পারবেন না, আবার রাগারাগি ঝগড়াঝাঁটি করাও তাঁর স্বভাব নয়।

ত্রিদিবের জন্য নয়, রাতুলের জন্যই তিনি লণ্ডন ছেড়ে যাওয়া ঠিক করেছেন। একই শহরে তিনি আর রাতুল থাকতে পারবেন না, যদি রাতুলের সঙ্গে হঠাৎ কোথাও দেখা হয়ে যায়! আমস্টারডামে কিংবা ফ্রাংকফুর্টে আপাতত কিছু দিন থাকা যেতে পারে, ঐ দুই জায়গায় ব্যবসার সুযোগ বাড়ছে দিন দিন।

বাড়ি বিক্রি করে হোটেলে চলে যাওয়ার পর শাজাহান আর আলম-তুতুলের সঙ্গেও দেখা করতে যাননি, কারুকেই তিনি আর ঠিকানা জানাতে চান না। তিনি যে ব্যবসা বিক্রি করে দিচ্ছেন, সে কথাও ঘুণাক্ষরে জানতে দেননি কারুকে।

অক্সফোর্ড ধরে হাঁটতে হাঁটতে শাজাহান একবার কাঁধ ঝাঁকালেন। নিজের ব্যবহার তাঁর নিজেরই কাছে দুবোধ্য হয়ে উঠছে ক্রমশ। একটু আগে তিনি একটা বাড়ির সামনে প্রায় আধ ঘণ্টা চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। সেই বাড়িটাতে রাতুলের অফিস। শাজাহান রাতুলের সঙ্গে দেখা করতে চান না, তা হলে রাতুলের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কী মানে হয়? এরকম তাঁকে মোটেই মানায় না। নিজের ওপরে বেশ বিরক্ত হলেন তিনি।

পর দিন ক্লিয়ারিং এজেন্টদের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখার জন্য তাঁকে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের কাছাকাছি আবার আসতেই হলো। কাজ শেষ হয়ে গেল সাড়ে তিনটের সময়। শাজাহান নিজে গাড়ি চালান না, তাই ট্যাক্সিতেই অধিকাংশ সময় যাতায়াত করেন। এখন ট্যাক্সি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খানিকদূর এসে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকলেন চা খাওয়ার জন্য। বসলেন জানলার পাশে একটা টেবিলে, উল্টো দিকের কোণাকুণি বাড়িটা যে রাতুলের অফিস, তা যেন তিনি খেয়ালই করছেন না, তিনি যে-কোনো একটা রেস্তোরাঁয় এসেছেন। পকেট থেকে একটা বই বার করে মনোযোগ দিলেন সে দিকে।

সাড়ে চারটের সময় রাতুল বেরিয়ে এলেন অফিস থেকে, ব্লু ফ্লানেল সুট পরা, হাতে ব্রীফ কেস। শাজাহান সঙ্গে সঙ্গে দাম মিটিয়ে দিয়ে চলে এলেন রাস্তায়। বিপরীত পেভমেন্ট দিয়ে রাতুল হাঁটছে, সত্যি দেখলে মনে হয় তার একটুও বয়েস বাড়েনি, ব্যাকব্রাশ করা মাথার চুল কুচকুচে কালো, হাতের ব্যাগটা দোলাতে দোলাতে হালকা মেজাজে হাঁটছে সে। শাজাহান বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেন, আমি ওর সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছি কেন? কেন? কেন?

হাইড পার্ক করে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে, রাস্তা ঐশ করে গিয়ে রাতুল তার সঙ্গে কথা বলতে লাগলো। আগে থেকেই এখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল নিশ্চয়ই ওদের। ওখানে দুটি জনতার গোল বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাত পা ছুঁড়ে বক্তৃতা দিচ্ছে দু’জন শৌখিন বক্তা, তাদের মধ্যে একজন আলমের বন্ধু হামিদ। গলা ফাটিয়ে সে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের শ্রাদ্ধ করছে, মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে শ্রোতাদের মধ্য থেকে প্রতিবাদ করছে কয়েকজন পাকিস্তানী, তীব্র গালি-গালাজ চলছে দু’পক্ষে, পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তিনজন পুলিশ। এখানে সবরকম গালমন্দই চলতে পারে, কিন্তু হাতাহাতির উপক্রম হলেই পুলিশ বাধা দেবে।

এরকম ভিড়ের জায়গায় একটি মেয়ের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে কেন রাতুল? উত্তরটা বুঝতে শাজাহানের অসুবিধে হলো না। মহিলাটি বিবাহিতা, হিন্দু বাড়ির বউ, সিঁথিতে সূক্ষ্ম সিঁদুরের রেখা। রাতুল যেভাবে মহিলাটির কোমর জড়িয়ে ধরে ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে, নিজের স্ত্রীর সঙ্গে সাধারণত কেউ এরকম আদিখ্যেতা করে না। পরস্ত্রীদের সঙ্গে প্রেম করার ব্যাপারেই রাতুল স্পেশালাইজ করেছে।

মিনিট পাঁচেক পরেই রাতুল মহিলাটিকে নিয়ে পার্কের মধ্যে চলে গেল। একটি ঝোঁপের আড়ালে বসে দু-এক মিনিট খুনসুটি করার পর যখন ওরা প্রথম চুম্বনে আবদ্ধ হলো, সেই পর্যন্ত। দেখে শাজাহান মুখ ফেরালেন। তাঁর মন আত্মগ্লানিতে ভরে গেল। ছি ছি, এত নীচে তিনি নামলেন কী করে? লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি অন্যের প্রেম করার দৃশ্য দেখছেন, তাঁর এত দূর অধঃপতন! রাতুল যা ইচ্ছে করুক।

বেশ কয়েক বছর ধরে নিঃসঙ্গতাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন শাজাহান, কিন্তু আজ কিছুতেই হোটেলের ফাঁকা ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হলো না। খুব পছন্দের দু-চারজন ছাড়া শাজাহান কখনো অন্যদের বাড়ি যান না, আজ তিনি বিষমভাবে চাইলেন মানুষের সাহচর্য! অন্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি রাতুলকে ভুলতে চান। কিন্তু কোথায় যাবেন? হঠাৎ কারুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হওয়া শাজাহানের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। একটা পাবলিক বুথে গিয়ে তিনি ৪ ০৪

ফোন করলেন আলমকে।

আলম বাড়িতে নেই, ফোন ধরলো তুতুল। শাজাহান প্রথমে তার স্বাস্থ্যের খবর নিয়ে তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আজ ইভনিং-এ তোমরা আমার সঙ্গে বাইরে ডিনার খাবে? আমি শিগগিরই অ্যামস্টারডাম চলে যাচ্ছি, বেশ কিছু দিন সেখানে থাকতে হবে, তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না।

তুতুল বললো, আজ সন্ধেবেলা আমাদের এখানেই যে আলমের কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আসছে। আমি রান্না করছি। আপনিও চলে আসুন না। আসুন, আমাদের খুব ভালো লাগবে।

একটু থেমে তুতুল আবার হাসতে হাসতে বললো, ত্রিদিবমামার আসার কোনো কথা নেই। আর যদি হঠাৎ চলে আসেন, তাতেই বা কী, আরও তো অনেকে থাকবে। আমরা শিগগিরই কলকাতায় যাচ্ছি তো, তাই আজকের এই পার্টি। আপনি আসুন!

যে-পার্টিতে শাজাহানকে অন্তত তিন দিন আগে নেমন্তন্ন করা হয় না, সেখানে তিনি কখনো যোগ দিতে পারেন না। রবাহূত হয়ে কোনো পার্টিতে উপস্থিত হয়ে কেউ কেউ বেশ হৈ চৈ করে জমিয়ে দিতে পারে, সে যারা পারে, তারাই পারে, শাজাহানের চরিত্রে সেই উপাদান নেই। তিনি আরও দু-একজনকে ডিনারে নেমন্তন্ন করে ফেলেছেন বলে তুতুলের কাছে মাপ চেয়ে নিলেন।

এর পর শাজাহান ফোন করলেন আর একজনকে। ইনি পাকিস্তানী, বেশ সহৃদয় ও শিক্ষিত মানুষ। এর সঙ্গে কথা বলে শাজাহান আনন্দ পান। ফোন বেজে গেল, কেউ ধরলো না।

শাজাহান পকেট থেকে নোট বই বার করে আর একটি টেলিফোন নাম্বার খুঁজতে গিয়েও থেমে গেলেন। কেউ দেখছে না, তবু মানুষের সাহচর্য পাবার জন্য এই রকম হ্যাংলামিপানায় তিনি লজ্জিত বোধ করলেন। নাঃ, আর চেষ্টা করার দরকার নেই।

টিকিট কেটে তিনি ঢুকে পড়লেন একটি সিনেমা হলে। এখানে তো কত লোক রয়েছে। পর্দায় নারী-পুরুষেরা নড়ছে, কথা বলছে, তবু কিছুতেই শাজাহানের মন বসলো না। রাতুল একটি নারীকে চুম্বন করছে, এই দৃশ্যটি তিনি ভুলতে পারলেন না। তাঁর মনে হচ্ছে, ঐ নারীটি সুলেখা!

ফিল্মটি শেষ হবার অনেক আগেই বেরিয়ে এসে শাজাহান চলে এলেন সোহে স্কোয়ারে। আজ তিনি অন্যরকম একটি পরীক্ষা করে দেখবেন। এখানে একটি বার-এর নাম কনট্যাকট। নিজে আগে না এলেও শাজাহান এই ধরনের বারগুলির ব্যাপার স্যাপার জানেন। তিনি দোতলায় উঠে একটা ফাঁকা টেবিলে বসলেন। ভেতরটা আবছা অন্ধকার, কাউন্টারের দু’পাশে তিন-চারটি করে যুবতী দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মুখে ও ঠোঁটে উগ্র রং।

শাজাহান একটি দীর্ঘকায়া যুবতীর দিকে কয়েকবার তাকাতেই মেয়েটি তাঁর টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, হ্যালো, লাভ, মে আই জয়েন ইউ?

শাজাহান মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। মেয়েটি তাঁর পাশের চেয়ারে বসলো উরুতে উরু ছুঁইয়ে। শস্তা পারফিউমের গন্ধে শাজাহানের নাক একটু কুঁচকে গেল, তবু তিনি হেসে বললেন, হোয়াট উইল ইউ হ্যাভ?

মেয়েটি বললো, আই ওয়াজ হ্যাঁভিং স্কাছ! দুটি প্রিমিয়াম স্কচের পেগ এসে গেল টেবিলে। তার মধ্যে মেয়েটির গেলাসের মদে আগে থেকেই সোডা মেশানো। শাজাহান খুব ভালো করেই জানেন যে ঐ মেয়েটিকে শুধু একটু রং করা সোড়া দেওয়া হয়েছে, ওর মধ্যে স্কচের নাম-গন্ধও নেই। খদ্দেরদের ঠকিয়ে মদের বিলের অঙ্ক বাড়ানোই ওদের কাজ।

মেয়েটি বললো, আই অ্যাম ক্রিস্টিন। হোয়াটস ইয়োর নেইম, ডারলিং?

শাজাহান আবার হাসলেন। ব্রিটিশ মন্ত্রী জন প্রোফিউমোর সঙ্গে বারবনিতা ক্রিস্টিন কীলারের সম্পর্ক ফাঁস হয়ে যাবার পর অনেক দিন ধরে কেচ্ছা জমেছিল। তা এখনো মিলিয়ে যায়নি।

শাজাহান বললেন, ইফ ইউ আর ক্রিস্টিন, দেন আই অ্যাম জেনারেল আইয়ুব খান।

মেয়েটিও এবার হেসে উঠলো খিলখিল করে। পাকিস্তানের আগের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গেও যে ক্রিস্টিন কলারের একটা সম্পর্ক ছিল, তা এই মেয়েটি জানে।

শাজাহান নিজের গেলাসে ঠোঁটও ছোঁয়ালেন না, আধ ঘণ্টার মধ্যেই মেয়েটি তিন গেলাস। সাবাড় করে দিল। বিল মেটাবার ইঙ্গিত করে শাজাহান বললেন, চলো, আমরা বাইরে গিয়ে ডিনার খাই।

ক্রিস্টিন বললো, আমার অ্যাপার্টমেন্টে যাবে? বাইরে থেকে কিছু খাবার পিক আপ করে নিয়ে যেতে পারি। সেখানে তুমি রিল্যাক্স করতে পারবে।

শাজাহান বললো, সে তো খুব ভালো কথা। তাই চলো। ক্রিস্টিন গলা নামিয়ে বললো, তুমি আমাকে একশো পঁচিশ পাউণ্ড ধার দিতে পারবে? আমার বিশেষ দরকার আছে।

একেবারে দরাদরি না করলে যুবতীটি তাঁকে একেবারে সদ্য আগত গবেট ভাববে, তাই তিনি বললেন, আমি সেভেন্টি ফাইভ পর্যন্ত স্পেয়ার করতে পারি।

ক্রিস্টিন বললো, মেক ইঁট ওয়ান হান্ড্রেড!

শাজাহান ওয়ালেট বার করে নোটগুলো শুনে টেবিলের ওপর রাখলেন। মেয়েটি সেগুলো নিয়ে উঠে চলে গেল। নতুন লোক দেখলে এরা আগে টাকা নিয়ে নেয়, এখানেই জমা রাখে? এই হোটেলের মালিক একটা পারসেন্টেজ কেটে নেয়? শাজাহান এদের ব্যবসার ধরনটা বোঝার চেষ্টা করলেন।

ফিরে এসে ক্রিস্টিন বললো, চল!

বাইরে তিন-চারখানা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। এই ট্যাক্সি চালকদের সঙ্গেও এদের বিশেষ চুক্তি আছে। ইচ্ছে করে অনেকটা ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে, মিটার বেশি বলবে। গাড়িতে ওঠার পর ক্রিস্টিন শাজাহানের একটা হাত জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি প্যাকি না ইণ্ডিয়ান?

শাজাহান কৌতুক করে বললেন, কোনোটাই না। আমি ইজিপশিয়ান। ক্রিস্টিন চোখ বড় বড় করে বললো, ইজিপশিয়ান? দে আর গ্রেট লাভারস! ওমর শরীফ!

শাজাহান ভাবলেন, তিনি নিজেকে ইণ্ডিয়ান বললে, এই মেয়েটি কোন ভারতীয় প্রেমিকের নাম করে উচ্ছ্বসিত হতো? হলিউডের এককালের অভিনেতা সাবু ছাড়া আর কোনো ভারতীয় ফিল্মস্টারকে কি এরা চেনে?

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জমলো না।

খানিকটা খাবারদাবার কিনে নিয়ে যাওয়া হলো ক্রিস্টিনের ফ্ল্যাটে। যুবতীটি বেশ সরল, নানা বিষয়ে কৌতূহল আছে। কিন্তু সে যখন প্রায় নগ্ন হয়ে শাজাহানকে ডাকলো, শাজাহান নিজের মধ্যে কোনো সাড়া পেলেন না। এর শরীর সম্পর্কে তাঁর একটুও আগ্রহ জাগছে না। ক্রিস্টিন একবার প্রায় জোর করে তাঁকে আলিঙ্গন করলে তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, কোল্ড মিট! ক্রিস্টিন তাঁকে চুম্বন করতে এলে তিনি মুখ সরিয়ে নিলেন।

মাত্র কিছুক্ষণের আলাপেই একটি নারীর সঙ্গে এতখানি ঘনিষ্ঠ হওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। অন্য অনেকে কী করে পারে? যে-ছবিটা তিনি মুছতে চেয়েছিলেন, সেই ছবিটাই চোখে ভেসে উঠছে বারবার, হাইড পার্কে রাতুল চুমু খাচ্ছে একটি বিবাহিতা বাঙালি মহিলাকে। সে কি কোনোদিন সুলেখাকেও…

ক্রিস্টিনের সঙ্গে শুধু গল্প করতে তাঁর মন লাগছিল না, কিন্তু শারীরিক আহ্বান প্রত্যাখ্যান করায় সে দারুণ চটে গেল, গালাগাল করতে শুরু করলো শাজাহানকে। আরও পঁচিশটি পাউণ্ড তার ড্রেসিং টেবলের ওপর রেখে শাজাহান বেরিয়ে এলেন।

তাঁর অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে, বুকটা মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। না, তিনি অস্কার ওয়াইল্ডের মতন সমকামী নন, সেটা তিনি ভালোই জানেন। শুধু করমর্দন ছাড়া তিনি পুরুষের স্পর্শ বাঁচিয়ে চলেন, কখনো বাধ্য হয়ে ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে হলে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। তাঁর আকর্ষণ নারীদের প্রতি, কোনো সুন্দরী রমণীর মুখের দিকে তাকিয়েও তিনি এক ধরনের আনন্দ পান, অথচ কারুর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা হয় না, তিনি নিজেই পিছিয়ে যান, কোথায় যেন একটা বাধা এসে যায়। এইরকম ভাবেই বাকি জীবনটা কেটে যাবে?

ক্রিস্টিনের অ্যাপার্টমেন্টে কী রকম যেন একটা গন্ধ ছিল, তাতে শাজাহানের একটু একটু গা। ঘিনঘিন করছিল, সেই জন্য তিনি একটুও খাবার মুখে তোলেননি। আর কিছু খেতেও ইচ্ছে। করলো না, সোজা ফিরে এলেন হোটেলে। দ্রুত পোশাক ছেড়ে তিনি গরম জলে স্নান করলেন অনেকক্ষণ ধরে। বারবার আপনমনে বলতে লাগলেন, রাতুল আমাকে চড় মেরেছিল, তবু আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি সুলেখাকে ভুলে যাবো। ত্রিদিবের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না!

গোসল করে এসে তিনি শেক্সপীয়ারের রচনাবলী খুলে বসলেন। শেক্সপীয়ার তাঁর সব কিছু ভুলিয়ে দিতে পারেন। কোনো বিশেষ লেখার কথা চিন্তা না করে তিনি বইটার যে কোনো একটা জায়গা খুললেন, ডান দিকের পাতার দ্বিতীয় কলামের ওপর থেকে পড়তে শুরু করলেন :

Of one that loved not wisely, but too well;
Of one not easily jealous, but being wrought,
Perplexed in the extreme; of one whose hand,
Like the base Indian, threw a pearl away,
Richer than all his tribe; of one whose subdu’d eyes
Albeit unused to the melting mood…

বাকিটা আর পড়ার দরকার হয় না, শাজাহানের মুখস্থ। ওথেলো নাটকের একেবারে শেষ অংশ। তাঁর নিজের মনের কথার সঙ্গে যেন একেবারে মিলে যাচ্ছে। নিজের গলায় হাত দিয়ে তিনি আস্তে আস্তে বললেন, I took by the throat the circumcised dog…।

না, ক্রোধ, হিংসা, ঈষার ঊর্ধ্বে উঠতে চান শাজাহান, এখন ওথেলো তাঁর ভালো লাগবে। না। তিনি আন্দাজে আবার পাতা ওল্টালেন। আবার তাঁর চোখে পড়লো এইরকমই লাইন :

My hate to Március. Where I find him, were it
At home, upon my brothers guard, even there
Against the hospitable Canon, would I
Wash my fierce in his heart…

শাজাহান চোখ বুজে ফেললেন। প্রতিহিংসায় কখনো শান্তি পাওয়া যায় না। ট্রাজেডির নায়কেরা কাব্যেই মহান হয়, কিন্তু জীবনে তারা শুধু কিছু অনর্থই সৃষ্টি করে যায়। শাজাহান আর কারুকে তো আঘাত দিতে চান না, তিনি নিজেই দূরে সরে যাবেন।

তার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।

শেক্সপীয়ার বন্ধ করে তিনি কয়েক মিনিট চিন্তা করলেন। তার পর টেনে নিলেন কোরআন শরীফ। ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের অনুবাদ করা কোরআন শরীফখানা তিনি সব সময় সঙ্গে রাখেন। শাজাহান ধর্মচচা বিশেষ করেন না কিন্তু ধর্মশাস্ত্র পাঠে আগ্রহ আছে। বাংলা ভাষায় তেমন অধিকার নেই শাজাহানের। তিনি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশুনো করেছেন এবং তাঁদের পরিবারে উর্দুতেই কথাবার্তা বলা হতো। বাংলা তিনি পড়তে জানেন, তবে সব কথার অর্থ বুঝতে অসুবিধে হয়।

তিনি পড়তে লাগলেন : যেমন একটি শস্যবীজ সাতটি শস্যমঞ্জুরী উৎপাদন করে, প্রত্যেক মঞ্জুরীতে শত শস্য উৎপন্ন হয়, পরমেশ্বরের পথে যাহারা স্বীয় সম্পত্তি ব্যয় করে তাহাদের অবস্থা তদ্রুপ, এবং যাহাকে ইচ্ছা হয় ঈশ্বর দ্বিগুণ প্রদান করেন, এবং ঈশ্বর দাতা ও জ্ঞাতা।…

দানের পরে ক্লেশ প্রদান করা অপেক্ষা কোমল কথা বলা ও ক্ষমা করা শ্রেয়ঃ, এবং ঈশ্বর নিরাকাঙক্ষ ও প্রশান্ত।

হে বিশ্বাসী লোকসকল, উপকার স্থাপন ও ক্লেশ দান করিয়া যে ব্যক্তি তোক প্রদর্শনের জন্য স্বীয় ধন দান করে, পরমেশ্বর ও পরকালে বিশ্বাস রাখে না, তাহার ন্যায় তোমাদিগের ধমর্থ দান তোমরা ব্যর্থ করিও না। সে মৃত্তিকাবৃত কঠিন প্রস্তরের ন্যায়…

পড়তে পড়তে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন শাজাহান। তার ওষ্ঠে লেগে রইলো যন্ত্রণার রেখা।

পর দিনও শাজাহানের মন শান্ত হলো না। সারা দিন কাজের মধ্যে ডুবে থেকেও তিনি বিকেলবেলা আবার এসে হাজির হলেন রাতুলের অফিসের সামনে। তাঁর নিয়তি তাকে যেন টেনে নিয়ে আসছে। রাতুলকে খানিকক্ষণ অনুসরণ করবার পর তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন। নিজের গলা টিপে ধরার ইচ্ছে হলো তাঁর। রাতুলের মতন একজন সামান্য জীবের জন্য তিনি এরকম ভাবে সময় নষ্ট করছেন! উল্টো দিকে ফিরে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় তিনি এসে পৌঁছোলেন ওয়াটার্ল ব্রীজে। ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলেন এক ঘণ্টা। অন্তত তিনবার তাঁর নদীতে ঝাঁপ দেবার তীব্র ইচ্ছে জাগলো। তিনি রেলিং চেপে ধরে রইলেন, তিনি অনুভব করলেন, কোনো একটা রোগ তাঁর মনোবল জীর্ণ করে দিয়েছে। জীবনের সব কিছুই বিস্বাদ লাগছে। বেঁচে থাকার মর্মটাই হারিয়ে যাচ্ছে যেন।

ব্রিস্টলের একটা ফাণ্ড রেইজিং মিটিং-এ যোগ দিতে শাজাহান চলে এলেন জোর করে। শনিবার মিটিং, রবিবারটাও তিনি থেকে গেলেন একটা হোটেলে, বেশ কিছু ভারতীয় ও পাকিস্তানী বাঙালির সঙ্গে সময় কাটালেন অনেকক্ষণ, টাকাও মন্দ উঠলো না। এই দুদিন তিনি রাতুলকে অনেকটা ভুলে থাকতে পেরেছিলেন। এর পরের মিটিং গ্লাসগো-তে, সেখানে শাজাহান যাবেন ঠিক করেও যাওয়া হলো না। লণ্ডন থেকে তাঁর অফিস সেক্রেটারি ফোন করে জানালো যে তাঁর ব্যবসা কেনার জন্য একজন বিশেষ আগ্রহী, অবিলম্বে কথা বলতে চায়।

লণ্ডনে ফিরতেই শাজাহানের মনটা আবার বিষিয়ে গেল। এই শহরের রাস্তা দিয়ে রাতুল হেঁটে বেড়ায়, দিব্যি আনন্দে আছে সে। এই চিন্তাটা শাজাহান কিছুতেই সহ্য করতে পারছেন না। মাঝে মাঝে অস্ফুটভাবে তিনি বলতে লাগলেন, কে আমাকে শিখিয়ে দেবে, কী করে একজন শত্রুকেও নিঃশর্তে ক্ষমা করা যায়?

বিকেল থেকে রাত পৌনে এগারোটা পর্যন্ত শাজাহান রাতুলের পেছনে পেছনে ঘুরলেন। ঝানু গোয়েন্দার চেয়েও যেন তার দৃষ্টি প্রখর, ধৈর্য অনেক বেশি। একবারও তিনি রাতুলকে চোখের আড়ালে যেতে দেননি।

রাতুল আজও সেই মহিলাটির সঙ্গে দেখা করেছে বেলসাইজ পার্কের কাছে একটি রেস্তোরাঁয়। সেখানে একটুক্ষণ বসার পরেই তারা একটা থিয়েটার দেখতে গেল। ওদের আগেই টিকিট কাটা ছিল, শাজাহান টিকিট পেলেন না, তিনি বাইরে বাইরে ঘুরে সময় কাটালেন। থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ওরা হাতে হাত ধরে কিছুক্ষণ বেড়ালো। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেল। তারপর মহিলাটিকে একটি বাসে তুলে দিল রাতুল। ওরা কেউ কারুরর বাড়ি যায় না, নিশ্চয়ই কোনো বাধা আছে।

রাতুল টিউবে ওঠার পর শাজাহান সেই একই কম্পার্টমেন্টে উঠলেন। এই কামরায় মাত্র দশ বারোজন যাত্রী, শাজাহান এক কোণে গিয়ে বসলেও রাতুল তাঁকে দেখে ফেলতে পারে। তাতে কোনো ক্ষতি নেই, শাজাহান বুঝেছেন যে রাতুলের সঙ্গে কথা না বলে তিনি ফিরতে পারবেন। না। আজ তিনি সব সংযম হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু রাতুল অন্য কোনো দিকে মনই দিচ্ছে না, সে খানিকটা শরীর এলিয়ে বসে পায়ের ওপর পা তুলে নাচাচ্ছে।

প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে, ট্রেন ভূগর্ভ ছেড়ে মাটির ওপরে ওঠার পর একটা স্টেশনে রাতুল নামতেই শাজাহানও সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লেন। সম্ভবত টারমিনাসের কাছাকাছি এসে গেছে, আরও বেশ কিছু যাত্রী নামলো এখানে। রাতুল বেশ দ্রুত এগিয়ে গেল, স্টেশন থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে মিনিট পাঁচেক হেঁটে রাতুল ঢুকে পড়লো একটা পার্কিং লটে। সেখানে একটিমাত্র গাড়ি রয়েছে।

শাজাহান বুঝলেন যে রাতুলের নিজের গাড়ি থাকলেও লন্ডন শহরে নিয়ে যায় না। অক্সফোর্ড স্ট্রিটে গাড়ি পার্ক করা অসম্ভব ব্যাপার। সেই জন্যই রাতুল নিজের বাড়ি থেকে এই পর্যন্ত গাড়িতে আসে, তারপর গাড়িটা পার্কিং লটে রেখে ট্রেনে যাতায়াত করে। এবার রাতুল হুস করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবে, শাজাহান আর তাকে ধরতে পারবেন না। কাছাকাছি কোনো ট্যাক্সিও নেই।

রাতুল গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করলো কয়েকবার, কিন্তু ইঞ্জিন থেকে একটা বেসুরো শব্দ বেরুলো। আজ সারাদিন খুব ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, এখন আবার ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। প্রথম দিকের শীতটাই বেশি কনকনে লাগে। গাড়ির ইঞ্জিনেরও ঠাণ্ডা লেগেছে বোধ হয়। রাতুল বেরিয়ে এসে গাড়ির বনেটটা খুলে উঁকি দিল।

নিয়তি শাজাহানকে এই পর্যন্ত টেনে এনেছে, নিয়তিই যেন এই সুযোগ করে দিল, আর দ্বিধা করার কোনো মানে হয় না। কাছে এগিয়ে গিয়ে শাজাহান বললেন, গুড ইভনিং। এনি প্রবলেম? মে আই হেল্প ইউ?

চমকে মাথাটা তুলে রাতুল বেশ কয়েক পলক তাকিয়ে রইলো শাজাহানের দিকে। ত্রিদিবের মতন শাজাহানের চেহারার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি, তাঁকে চিনতে না পারার কোনো কারণ। নেই। আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে রাতুল বললো, কী ব্যাপার?।

শাজাহান বললেন, আপনাকে দেখলাম এই স্টেশনে নামতে। আপনার গাড়ি নিয়ে কোনো প্রবলেম হয়েছে?

রাতুল ভুরু কুঁচকে বললো, আপনি এদিকে এত রাত্রে? হ্যাঁরোতেই থাকেন নাকি?

শাজাহান আলগাভাবে বললেন, জী, কাছাকাছিই থাকি বলতে পারেন।

আপনার গাড়িতে খানিকটা লিফট নেবো? এতদিন পরে দেখা হলো, অনেক কথা আছে। আমি ভেতরে বসে অ্যাক্সিলারেটার চাপবো, তাতে সুবিধে হবে?

রাতুল গম্ভীরভাবে বললো, থ্যাঙ্কস! নো, ইটস গোয়িং টু বি অল রাইট।

শাজাহান রাতুলের কথা অগ্রাহ্য করে ড্রাইভারের সীটে বসে পড়লেন। এককালে তাঁর গাড়ি চালাবার যথেষ্ট অভ্যাস ছিল। কিন্তু তিনি কিছু করার আগেই ইঞ্জিনটা সুস্থ হয়ে উঠলো। বনেট চেপে দিয়ে রাতুল এদিকে আসতেই শাজাহান পাশের সীটে সরে গিয়ে বললেন, আসুন। আই অ্যাম লাকি!

রাতুল ড্রাইভারের সীটে বসে বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বললো, লিন, লেটস বী স্ট্রেট! পুরনো সম্পর্ক নিয়ে আমার কোনো হ্যাঁঙ-আপ নেই। পুরনো ব্যাপার-ট্যাপার আমি সব মুছে ফেলেছি। আমি আজ খুবই টায়ার্ড, সোজা বাড়ি যাবো, আপনাকে লিফট দিতে পারছি না।

শাজাহান বললেন : মুছে ফেলবো বললেই কি সব মোছা যায়? মানুষের মন তো আর স্লেট নয়! ত্রিদিবের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়নি?

রাতুল কর্কশ গলায় বললো, সে আমাকে টেলিফোনে মাঝে মাঝে পেস্টার করছে। আমি তাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছি, আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইন্টারেস্টেড নই। কলকাতা আর দিল্লির চ্যাপটার ক্লোজড। নাউ ইফ ইউ প্লিজ গেট অফ…।

–পুরনো সব চ্যাপটার ক্লোজড। ত্রিদিবের জীবনটা আপনি নষ্ট করে দিয়েছেন। আমি নিজেও আজ পর্যন্ত সাফার করছি। আর আপনি শুধু সব কিছু ভুলে গিয়ে আবার প্রেম করবেন, চাকরিতে উন্নতি করবেন, আনন্দে থাকবেন? সিক্সটি ফাইভের ওয়ারের সময় আপনি যে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাও ভুলে গেছেন?

–হু সেইড আই ডিড দ্যাট!

–প্রমাণ আছে, আমি ঠিকই জেনেছি। দিল্লিতে আপনি আমাকে চড় মেরেছিলেন, পাকিস্তানের স্পাই বলেছিলেন।

–ইউ স্টিল আর আ ডাটি স্পাই। আপনি আমার পেছন পেছন ফলো করে এই পর্যন্ত এসেছেন। এখন বুঝতে পারছি। কী চান আপনি?

সুলেখা তোমারই জন্য মরেছে। তুমি ওদের বাড়িতে নোংরামি করে ফেলেছিলে তাই পারফেক্ট জেন্টলম্যান ত্রিদিব সুলেখাকে মুক্তি দেবার কথা বলেছিল। তোমার জন্যই সে বলেছিল। সে কথা শুনে ঘেন্নায় সুলেখা গায়ে আগুন লাগিয়েছে। দোষ তোমার, পুরোপুরি তোমার, ত্রিদিবের নয়।

–স্কাউন্ট্রেলের মতন কথা বলো না, শাজাহান। আমি এসব কথা সহ্য করতে রাজি নই। শুনতেও চাই না। লীভ মি অ্যালোন!

–তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে, সব কিছুর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।

খুব সম্ভবত শাজাহানকে একটা চড় মারার জন্যই ঘুরে গিয়ে হাত তুলেছিল রাতুল, অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিল। তারপর ঝুঁকে অন্য দিকের দরজাটা খুলে দিয়ে সে শাজাহানকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, নাউ, গেট আউট!

হয়তো এটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন শাজাহান। কোটের পকেট থেকে ফস করে একটা রিভলভার বার করে রাতুলের নাকে ঠেকালেন, অন্য হাতে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিয়ে বললেন, আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আর কখনো কোনো লোককে এভাবে ধাক্কা দিও না। আমি মুসলমান, আমরা কখনো বেইমানি ক্ষমা করি না। তুমি একবার আমার গায়ে হাত তুলে অপমান করেছিলে, আমি তার শোধ নিইনি। তবু তুমি দ্বিতীয়বার আমার গায়ে হাত তোলার সাহস করলে!

শাজাহানের হাতের অস্ত্রটাকে বেশি গুরুত্ব দিল না রাতুল। শাজাহানের মতন চরিত্রের মানুষের হাতে একটা রিভলভার খুবই বেমানান, প্রায় অবিশ্বাসই মনে হয়। আত্মবিশ্বাস, অহঙ্কার ও রাগে রাতুলের মুখখানা জ্বলজ্বল করছে। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, তুমি এতদিন পর আমাকে এই সব বাজে কথা শোনাতে এসেছো। তুমি জানো, সুলেখা আমাকে বিয়ে করতে। রাজি হয়েছিল? সে নিজের মুখে আমাকে বলেছে, কলকাতা ছাড়ার আগে।

বাট ইউ ওয়্যার দা ডগ ইন দা ম্যানজার! তুমি সব সময় ওদের বাড়িতে সেঁটে থাকতে। ত্রিদিব তোমার জন্যই সুলেখাকে সন্দেহ করে!

শাজাহান বললেন, তোমার মতন একটা মিথ্যেবাদী, ক্রুড, কোর্স, আনকাল্ডারড় মানুষকে সুলেখা…

রাতুল হাত দিয়ে রিভলভারটা ধরার চেষ্টা করতেই শাজাহান পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে দু’বার তাকে গুলি করলেন। গাড়ির সব কাচ বন্ধ, তাই বাইরে বিশেষ শব্দ গেল না।

বেশ কয়েক মুহূর্ত হুমড়ি খেয়ে পড়া নিস্পন্দ দেহটার দিকে তাকিয়ে থেকে শাজাহান ফিসফিস করে বললেন, গুড বাই, রাতুল। খোদা হাফেজ!

দরজা খুলে বেরিয়ে এসে তিনি চারদিকটা দেখে নিলেন একবার। পার্কিং লটে কোনো গার্ড নেই, কাছাকাছি কোনো বাড়িও নেই। বৃষ্টির জলে কিছুটা জায়গা কাদা কাদা হয়ে আছে, এখনও বৃষ্টি পড়েই চলেছে। শাজাহান ওভার কোটের কলারটা তুলে দিয়ে, দু’ পকেটে হাত ঢুকিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলেন রাস্তা দিয়ে। এই স্টেশন দিয়ে তিনি ট্রেনে উঠতে চান না।

একটুও অপরাধ বোধ নেই, বরং তাঁর মনটা যেন বেশ হালকা হয়ে গেছে। অনেকগুলো জীবন নষ্ট করেছে রাতুল, তার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। কাল সকালের আগে রাতুলের মৃতদেহ কারুর চোখেও পড়বে না। সকালবেলায় যারা গাড়ি রাখতে আসবে, তারা সাধারণত অন্য গাড়ির দিকে চেয়েও দেখে না। সম্ভবত বিকেল হয়ে যাবে। একজন এশিয়ান খুন হলে তা নিয়ে ইংরেজ পুলিশ কি খুব বেশি মাথা ঘামায়?

বৃষ্টি ভিজলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই শাজাহানের। তিনি হেঁটে চলেছেন মাইলের পর মাইল। পথে আর কোনো মানুষ নেই, এ পর্যন্ত কোনো পুলিশের গাড়িও তাঁর নজরে পড়েনি। একটা প্রশ্ন তিনি নিজেকে করছেন বার বার, ত্রিদিবের মুখ থেকে লন্ডনে রাতুলের উপস্থিতি জানবার পরই কি রাতুলকে খুন করার কথা তিনি ভেবেছিলেন? না হলে সেদিন থেকেই তিনি। রিভলভারটা সব সময় সঙ্গে রাখতে শুরু করেছিলেন কেন? এতদিন ধরে এতখানি ক্রোধ চাপা দেওয়া ছিল? অথচ রাতুলকে তিনি ক্ষমা করতেও চেয়েছিলেন। রাতুল ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতার কোনো প্রমাণ দিতে পারলো না।

পরদিন সকাল আটটায় শাজাহান সেন্ট্রাল লন্ডনে এসে একটা ইওরোপিয়ান কোচের টিকিট কেটে উঠে বসলেন। সেখান থেকে ডোভার। সুটকেসটা চেক ইন করিয়ে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন লাউঞ্জে। একটু পরেই তাঁর জাহাজে ওঠার ডাক পড়বে। তিনি আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না। একবার ইংলিশ চ্যানেল পার হতে পারলেই নিশ্চিন্ত।

লাউঞ্জটা হিপিতে ভর্তি। কয়েকজন ভারতীয়-পাকিস্তানীও রয়েছে। শাজাহান একটা সোফায় বসে ইমিগ্রেশান কন্ট্রোল গেটের দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর হাতে বোর্ডিং কার্ড, আর কতক্ষণ, আর কতক্ষণ?

প্রথমে একটা বিরাট আকারের কুকুর, তারপর দু জন পুলিশ অফিসার ঢুকে এলো লাউঞ্জে। শাজাহানের বুকে দুম দুম শব্দ হচ্ছে। এর মধ্যেই ওরা টের পেয়ে গেল? একমাত্র ত্রিদিব ছাড়া আর তো কেউ রাতুলের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগসূত্র আবিষ্কার করতে পারবে না। ত্রিদিব তাঁকে ধরিয়ে দেবেন?

পুলিশ দু জন এদিক ওদিক চেয়ে সোজা শাজাহানের দিকেই আসছে। শাজাহান একবার ভাবলেন উঠে টয়লেটে ঢুকে পড়বেন। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। আর কোনো উপায় নেই।

একজন পুলিশ শাজাহানের পাশে এসে বললো, এক্সকিউজ মি, আর ইউ মিঃ যোগিন্ডার সিং?

বোমা ফাটার মতন শব্দ করে শাজাহান বললেন, নো!

পুলিশটি হাত বাড়িয়ে বললো, মে আই সি ইয়োর পাসপোর্ট?

হঠাৎ কুকুরটি গর্জন করে একজনের দিকে তেড়ে গেল। সে দরজার দিকে পালাবার চেষ্টা করছিল। কুকুরটি তার গায়ে দু পা তুলে হিংস্রভাবে চ্যাঁচাচ্ছে। অফিসারটি তাড়াতাড়ি শাজাহানকে পাসপোর্টটা ফেরত দিয়েই ছুটে গেল সেদিকে। খুব সম্ভবত নারকোটিক্স স্মাগলিং-এর ব্যাপার।

এই সব গোলমালের মধ্যেই মাইক্রোফোনে শাজাহানের জাহাজের নাম ঘোষণা করা হলো। তিনি পাসপোর্ট হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। বুকের মধ্যে দুম দুম শব্দটা এখনো থামেনি, তার হাত-পা কাঁপছে।

তারপর জাহাজ যখন ভেসে পড়লো ইংলিশ চ্যানেলে, ডেকে দাঁড়িয়ে অনেকখানি সামুদ্রিক বাতাস বুকে টেনে নিয়ে শাজাহান মনে মনে বললেন, মুক্তি, মুক্তি! এখন থেকে তিনি অন্য মানুষ।

৫১. দরজাটা সামান্য ফাঁক করে

দরজাটা সামান্য ফাঁক করে তপন দেখলো, খাঁটিয়ার ওপর কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। কৌশিক। তিন চারদিন দাড়ি কামায়নি, খালি গা বলে আজ বোঝা যাচ্ছে যে সে কত রোগা হয়ে গেছে, পাঁজরাগুলো সব গোনা যায়। সারা ঘরে বইপত্র এলোমেলোভাবে ছড়ানো, কিছু বই মাঝখান থেকে ছেঁড়া। দেয়ালের পাশে একটা এঁটো থালায় আধখানা রুটি আর খানিকটা শুকিয়ে যাওয়া আলুর দমের ঝোল। খাঁটিয়ার মাথার দিকে দাঁড় করানো দুটি ক্রাচ, তার ওপরে। একটা দলা পাকানো লুঙ্গি।

তপন একবার দ্বিধা করলো কৌশিককে ডাকবে কি না। ঘুমটাই কৌশিকের সমস্যা, রাতের পর রাত ঘুমোতে পারে না সে। আজ সে বিকেলবেলাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তপনের হাতে বেশি সময় নেই। ভেতরে ঢুকে সে নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার হাতের দু’খানা বই আর একটা নতুন জামার প্যাকেট নামিয়ে রাখলো এক পাশে। এ ঘরে একটি মাত্র জানলা, সেটা একবার খুলেই বন্ধ করে দিল তপন, ওখান থেকে সবসময় পেচ্ছাপের গন্ধ আসে, তাই কৌশিক জানলাটা বন্ধ রাখে।

গন্ধটা কাটাবার জন্য তপন একটা সিগারেট ধরালো। ঐ খাঁটিয়াটা ছাড়া ঘরে আর কোনো বসবার জায়গা নেই। তপন দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। একটাই চিন্তা তার মাথায় ঘুরছে। এইভাবে কৌশিককে আর কতদিন রাখা যাবে। কৌশিককে ব্যাঙ্গালোরে পাঠানো যায়নি, ঘাটশিলাতেই সে প্রায় মরতে বসেছিল, জামসেদপুর থেকে একজন ডাক্তারকে গোপনে নিয়ে আসা হয়েছিল, তিনিও ওর পেটের গুলিটা বার করতে পারেননি। কয়েকদিনের মধ্যেই ঘাটশিলার হাইড আউটের কথা পুলিশ জেনে যায়, প্রায় শেষ মুহূর্তে কৌশিককে সরানো গিয়েছিল সেখান থেকে। তারপর থেকে অন্তত পাঁচ জায়গায় রাখা হয়েছে কৌশিককে। তবু সে মরলো না। তার কাঁধের গুলির ক্ষতটা সেরে গেছে, পা দুটোও অনেকটা ভালো হয়ে এসেছে, কিন্তু পেটের মধ্যে গুলিটা রয়ে গেছে। পটে লিভারের মধ্যে একটা বুলেট গেঁথে থাকলেও মানুষ বাঁচে? কৌশিকের তুলনায় অনেক অম আহত হয়েছিল সুবীর, কিন্তু সে পট করে মরে গেল। সুবীরের মৃত্যুর খবর তার মা-বাবা জানতে পারেন প্রায় একমাস বাদে।

এর মধ্যে অবস্থা অনেক বদলে গেছে। দলের কর্মীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। যারা জেলের বাইরে আছে,তারা যে কে কোথায় আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে গেছে তার কোনো ঠিক নেই, তাদের খোঁজ করাও বিপজ্জনক। যারা ওপরের মহলের সিমপ্যাথাইজার ছিল, তারাও এখন আর সম্পর্ক রাখতে চায় না। আগে কলকাতার নামকরা কিছু লোক টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন, তাঁরা সাহায্য বন্ধ করেছেন, দেখাও করতে চান না। তপন সে রকম একজন ব্যক্তির বাড়িতে তিনবার গিয়েছিল, তিনি তৃতীয়বারে চাকরের হাত দিয়ে দশটা টাকা পাঠিয়ে দিয়ে বলেছেন, তপন যেন আর কোনোদিন না আসে।

জেল ভেঙে পালাবার সময় কৌশিকরা চিন্তাও করেনি যে এরপর পুলিশ যখন হন্যে হয়ে খুঁজবে, তখন আত্মগোপন করা হবে কোথায়। আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। অবশ্য কৌশিকরা জেল থেকে পালিয়েছে মরীয়া হয়ে, নইলে জেলের মধ্যেই তাদের মেরে ফেলতো। সে রকম অনেককে মেরেছে।

অনেক কিছুই আগে থেকে চিন্তা করা হয়নি!

তপন সবচেয়ে মুস্কিলে পড়েছে টাকা পয়সার ব্যাপার নিয়ে। মাসের পর মাস কৌশিককে কোনো গোপন আস্তানায় লুকিয়ে রাখতে গেলে তার তো একটা খরচও আছে, সেটা কে দেবে? পাশে দাঁড়াবার মতন আর কেউ নেই। বাড়ি ফেরারও উপায় নেই কৌশিকের, তার বাড়ির ওপর পুলিশের নজর আছে। এবারে ধরা পড়লে কোশিককে আর জেলে রাখবে না, পুলিশ তাকে শেষ রাতে কোনো ফাঁকা মাঠে নিয়ে গিয়ে গুলি করে খতম করবে। কৌশিকের সঙ্গে যেক’জন জেল থেকে পালিয়েছিল, তাদের মধ্যে তিনজন আবার ধরা পড়েছে, কিন্তু তারা কোথায় আছে তার কোনো খবর নেই। একজন মারা গেছে, আর বাকিরা ছড়িয়ে পড়েছে দূর দুর জায়গায়। কৌশিকেরই শুধু কোথাও যাবার জায়গা নেই। সে এখনো ক্রাচ ছাড়া হাঁটতে পারে না, পুলিশের সামনে পড়ে গেলে আত্মরক্ষাও করতে পারবে না।

তপনের বিপদ অনেকটা কেটে গেছে, সে ফিরে গেছে দমদমের কলোনিতে। পাড়ার মধ্যে কেউ তার রাজনৈতিক পরিচয় কখনো জানতে পারেনি, তবু অতিরিক্ত সাবধানতার জন্য সে ইদানীং কংগ্রেসী ছেলেদের সঙ্গে একটু একটু ভাব জমাচ্ছে। এর আগেই তার একটা ইনসিওরেন্সের এজেন্সি নেওয়া ছিল, সেই কাজই সে শুরু করেছে আবার, সেই সঙ্গে ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেটও বিক্রি করে। কোন মাসে কত রোজগার হবে তার কিছু ঠিক নেই, জ্যাঠামশাইয়ের সংসারে তাকে খরচ দিতে হয়, তারপর আর হাতে প্রায় কিছুই থাকে না।

তবু কৌশিককে সে ছাড়বে কী করে? অসুস্থ, অসহায় কৌশিককে ছেড়ে সে কি শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যস্ত হতে পারে? কৌশিকের মতন সম্পূর্ণ স্বার্থশূন্য, মহৎ চরিত্রের ছেলেকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে কি পালিয়ে যাওয়া যায়? পাটির অন্যান্য বন্ধুরা যে যোগাযোগ রাখতে পারছে না, সেটাও তাদের দোষ নয়, তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতেই ব্যতিব্যস্ত, কয়েকজন অবশ্য বড়লোক বাপ-মায়ের আশ্রয়ে ফিরে গেছে। তপনের ওপর কখনো পুলিশের নজর তেমনভাবে পড়েনি, সে কলকাতার বড় ঘরের ছেলে নয়, বিখ্যাত ছাত্রও নয়, কোনো বড় রকমের অ্যাকশান বা খুনোখুনির নায়কও সে নয়। তবে, সে যে মানিক ভট্টাচার্যের গ্রুপে ছিল, তা পুলিশ জানে, জলপাইগুড়ির সেই মার্ডারটার সঙ্গে তার যোগসূত্র টানা যেতে পারে, কিন্তু তারপর এত মার্ডার হয়েছে যে সেটার কথা পুলিশও বোধহয় ভুলে গেছে। আই বির একজন অফিসার কিছুদিন তার পেছনে লেগেছিল, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, কথায় কথায় বেরিয়ে গেল যে সেই গোয়েন্দা অফিসারটির বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গের সরাইলে, তপনের সব পরিচয় জেনে সে বেশ নরম হয়ে গেল। তপনকে কংগ্রেসী ছেলেদের দলে ভিড়ে যেতে সে-ই পরামর্শ দিয়েছে। অবশ্য পুলিশের চোখে কৌশিক এমনই দামি আসামী যে কৌশিকের সঙ্গে তুপনও যদি ধরা পড়ে, তাহলে ঐ আই বি অফিসারটিও তপনকে বাঁচাতে পারবে না।

নৈহাটির কাছাকাছি একটা জুটমিলের কুলি বস্তির মধ্যে এই ঘরখানা ভাড়া নেওয়া হয়েছে দিন দশেক আগে। এই বস্তির লোকেরা অধিকাংশই বিহারী মুসলমান, জুট মিলটায় সম্প্রতি লক আউট হয়েছে বলে তারা এতই উত্তেজিত হয়ে আছে যে কৌশিককে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কাছাকাছি একটা ভাতের হোটেল থেকে একটা বাচ্চা ছেলে কৌশিককে খাবার দিয়ে যায়। তা হলেও এই ব্যবস্থা মোটেই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়, কৌশিককে আবার সরাতে হবে।

তপনের কাছে এখন টাকার চিন্তাটাই প্রধান। কিন্তু সে কথা কৌশিকের সামনে ঘুণাক্ষরে উচ্চারণ করা যায় না। পেটের মধ্যে একটা বুলেট ঢুকে বসে আছে, তপনের ধারণা, কৌশিককে বাঁচাতে গেলে তার আরও ভালো করে চিকিৎসা করানো দরকার। কিন্তু কে করাবে?

কৌশিকের বাবা নেই, কিন্তু মা বেঁচে আছে, নিউ আলিপুরে ওদের নিজস্ব বাড়ি। সেই বাড়ির ছেলে নৈহাটির এক চটকলের বস্তিতে শুয়ে আছে। এই রকম ভাবে ক্লাস ক্যারেকটার পরিবর্তনের একটা মহিমা আছে। কিন্তু এরপর কী সেটাই তপন বুঝতে পারে না। কৌশিকের মতন একটা ছেলে যদি নষ্ট হয়ে যায়, পুলিশের গুলিতে খরচ হয়ে যায়, তাহলে সেটা যে একটা বিরাট ক্ষতি।

দু’দিন আসতে পারে নি তপন, আজও কে সন্ধের ট্রেন ধরে ফিরতে হবে। কলোনির মধ্যে বেশি রাত করে ফিরলে লোকে সন্দেহ করে, তাছাড়া দমদমে প্রায়ই একটু রাত করে বোমাবাজি শুরু হয়। তপন আস্তে আস্তে ডাকলো, কৌশিক, এই কৌশিক!

কয়েকবারের ডাকেও উঠলো না বলে তপন কৌশিকের গায়ে হাত দিল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো সে। কপালটা বেশ গরম, আজ আবার কৌশিকের জ্বর এসেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল তপনের।

কৌশিক চোখ মেলেই জিজ্ঞেস করলো, পমপম? পমপম কোথায়?

তপন নিঃশব্দে মাথা নাড়লো। মাস দু’ এক ধরে পমপমের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে। তাতেই আরও বেশি মুস্কিলে পড়েছে তপন। এর আগে পর্যন্ত কৌশিক অনেকটা পমপমের দায়িত্বেই ছিল। যদিও টাকা পয়সার টানাটানি শুরু হয়ে গেছে তার আগে থেকেই। বাবার কাছ থেকে টাকা পয়সা নেয় না পমপম, তারও উৎসগুলো শুকিয়ে আসছিল। তবু পমপম কলকাতার উঁচু সমাজের অনেককে চেনে, খুব বিপদে পড়লে কারুর কাছে ধার চাইতে পারে। রেফিউজি কলোনির ছেলে তপনকে কে ধার দেবে?

কৌশিককে যখন দুর্গাপুরে রাখা হয়েছিল, তখন ব্যবস্থাটা ভালোই ছিল। কিন্তু যিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন, তিনি হঠাৎ নোটিস দিলেন যে তাঁর স্ত্রী বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসছে, বাড়িতে আর জায়গা হবে না। হাতে মাত্র চারদিন সময়। বাঁকুড়ায় পমপমের এক অল্প চেনা লোকের বাড়িতে পরবর্তী আশ্রয় খুঁজতে যাওয়ার কথা, হঠাৎ হাওড়া স্টেশনে এসে পমপম অজ্ঞান হয়ে গেল।

কী বিপদেই সেদিন পড়েছিল তপন! তার সব সময় পুলিশের ভয়। ভিড় জমে গেলেই পুলিশ আসতে পারে। কৌশিক জেল পালাবার পর পুলিশ আবার পমপমকে অ্যারেস্ট করতে চেয়েছিল। পমপমের বাবা এম এল এ হলেও পুলিশ এখন তোয়াক্কা করছে না। ওয়েস্ট বেঙ্গলে প্রেসিডেন্টস রুল জারি করার পর পুলিশ একেবারে বেপরোয়া। তাছাড়া মাঝখানে একটা কাণ্ড হয়ে গিয়েছিল, কোথাকার একদল নকশাল ছেলে পমপমদের মানিকতলার বাড়িতে একদিন বোমা চার্জ করে বসলো। পমপমের বাবার ওপর তারা আটেমপট নিয়েছিল। কোন। দল যে কোথা থেকে কী অ্যাকশন চালাচ্ছে, তা বোঝার উপায় নেই। এই অবস্থায় অশোক সেনগুপ্ত তাঁর বাড়িতে মেয়েকে রাখেন কী করে? তাঁকেও তো তাঁর পাটির কাছে মুখব। করতে হবে। পমপম সেই জন্য তার কলজ আমলের বন্ধু বান্ধবীদের বাড়িতে থাকছিল। তপনের সঙ্গে দেখা করতে হাওড়া স্টেশনে।

লালবাজারে সেই অত্যাচারের জের পমপমের শরীরে অনেকখানিই রয়ে গেছে। যখন-তখন তার শাড়ী নষ্ট হয়ে যায়। অসহ্য পেট ব্যথা হয়, সেই ব্যথাতেই সে মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। হাওড়া স্টেশন থেকে অজ্ঞান অবস্থায় পমপমকে কোনোক্রমে ধরাধরি করে একটা ট্যাক্সিতে তুলেছিল তপন। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে? কোনো হাসপাতালে নিলে যদি পুলিশ কেস হয়, তাহলে পমপমই পরে তপনকে ক্ষমা করবে না। আর কোথায় যাওয়া যায়? পমপম তো একটা মেয়ে, তাকে যেখানে সেখানে রাখা যায় না, দমদমের কলোনিতেও হঠাৎ এই অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায় না। দিশেহারা হয়ে গিয়ে সে পমপমকে মানিকতলার বাড়িতেই নিয়ে গেল।

ভাগ্যক্রমে অশোক সেনগুপ্ত তখন বাড়িতে ছিলেন। সেদিন পমপমের বাবার মতন একজন পোড় খাওয়া পলিটিশিয়ানের চোখেও জল দেখেছিল তপন। পমপমের নিঃস্পন্দ শরীর ও বিবর্ণ মুখ দেখে তিনি প্রথম ভেবেছিলেন, পমপমকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। তিনি খুকি, খুকি বলে হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেছিলেন মেয়েকে। খানিকবাদে সজল মুখ ফিরিয়ে তিনি তপনকে বলেছিলেন, তোমরা আর কিছুদিন খোঁজ করতে এসো না। মেয়েটাকে বাঁচতে দেবে তো? এই শরীর নিয়ে ঘোরাঘুরি করলে ও কি বাঁচবে।

তবু দু’দিন বাদে তপন গিয়েছিল পমপমের খবর নিতে। অনেক চেষ্টায় পমপমের বাবার সঙ্গে দেখা হলো, তিনি রীতিমতন ধমক দিয়ে তপনকে বললেন, আমার বাড়িতে কি তোমরা তোমাদের আখড়া করবে ভেবেছো নাকি? পমপম এখানে নেই। তার চিকিৎসা চলছে, এখন তার সঙ্গে দেখা হবে না!

কৌশিককে এসব কথা বোঝানো যাবে কী করে? অসুস্থ শরীর ও একাকীত্বের জন্য সে অবুঝ হয়ে গেছে। পমপমের যদি হাঁটা চলার ক্ষমতা থাকলে, তাহলে কোনো বাধাই সে মানতো না, ঠিকই দেখা করতে কৌশিকের সঙ্গে। কৌশিকের ধারণা, পমপম ফের পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, আর তপন সে কথা গোপন করে যাচ্ছে।

উঠে বসে কৌশিক বললো, পমপম কোথায় তুই বলবি না?

তপন বললো, এখনও খবর পাইনি। চেষ্টা করছি। ওর বাবার সঙ্গে কিছুতেই দেখা হচ্ছে না। তা ছাড়া ওপাড়ার সি পি এমের ছেলেরা আমাকে চেনে।

তপনকে একটা ধাক্কা দিয়ে কৌশিক বললো, তোকে বলেছি না, পমপমের খবর না নিয়ে তুই। আমার কাছে আর আসবি না!

শুধু অবুঝ নয়, খিটখিটেও হয়ে গেছে কৌশিক। দেখা হলেই প্রথমে সে তপনের সঙ্গে ঝগড়া করে। যেন তপনই তার সমস্ত দুভোগের জনা দায়ী।

তপন তবু নরম ভাবে বললো, চেষ্টা করছি, দু’একদিনের মধ্যেই কিছু খবর পেয়ে যাবো। তবে এটুকু বলতে পারি, সে জেলে নেই।

কৌশিক চোখ রাঙিয়ে বললো, তুই বুঝি সব কটা জেল ঘুরে দেখেছিস? ওগুলো কী বই এনেছিস? কী বই দেখি!

বই দু’ খানা উল্টে পাল্টে দেখে কৌশিক ছুঁড়ে ফেলে দিল। মুখখানা কুঁচকে বললো, এই সব বাজে গল্পের বই, যত রাজ্যের ট্র্যাশ, তোকে কে আনতে বলেছে? তুই কি কোনো ভালো বই কখনো চোখে দেখিসনি?

একা একা থাকে, ঘুম হয় না, তাই কৌশিকের বই পড়ার অসম্ভব ক্ষুধা। কিন্তু তপন এত বই জোগাবে কেমন করে? নতুন বই কেনার সামর্থ্য তার নেই। লোকের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে আনতে হয়। সে এখন যাদের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, তারা কেউ উচ্চাঙ্গের বই পড়ে না। পুরোনো খবরের কাগজ যারা বাড়ি থেকে কেনে তাদের একজনকে ধরেছে তপন। অনেক লোক কিছু কিছু ছেঁড়া খোঁড়া বইও খবরের কাগজের সঙ্গে ওজন দরে বিক্রি করে দেয়। তপন সেইসব বই চারআনা আটআনা দিয়ে কিনে আনে। ইংরিজি, বাংলা দু’রকমই থাকে, কিন্তু বিশেষ বাছাবাছি করার সুযোগ নেই। তাছাড়া তপন নিজেও কৌশিকের মতন অত লেখাপড়া জানে না।

তপন অবশ্য জানে, যতই রাগারাগি করুক, কৌশিক এই বইও পড়বে ঠিক। হয়তো পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে ছিড়বে এক সময়, তবু এমনই নেশা যে চোখের সামনে কিছু ছাপা অক্ষর চাই-ই তার।

অন্য প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কৌশিক জিজ্ঞেস করলো, এটা কী? জামা? কার জন্য?

কৌশিকের একটি মাত্র জামা, তাও ছিঁড়ে ঝুলিঝুলি হয়ে গেছে। স্টাডি সার্কেলের গোড়ার দিকে অন্য সব সদস্যের মধ্যে কৌশিককেই সবচেয়ে শৌখিন জামা-প্যান্ট পরতে দেখেছিল তপন সচ্ছল বাড়ির ছেলে, আদরে-যত্নে মানুষ। তপন নিজে কাটা-ছেঁড়া জামা গায় দিতে পারে, কিন্তু কৌশিককে ময়লা, ছেঁড়া পরতে দেখলে তার কষ্ট হয়। বর্ধমানে থাকার সময় তপন বেশ কয়েকবার স্টেশনের কুলি আর ঝাঁকামুটের ছদ্মবেশ ধরেছিল, কিন্তু কৌশিককে ঐ সব। ছদ্মবেশে একেবারেই মানাতো না।

ক’দিন ধরে একটু একটু ঠাণ্ডা পড়েছে। সামনে শীত আসছে। পেটের মধ্যে বুলেট থাকার জন্যই হোক বা যে-কারণেই হোক কৌশিক মাঝে মাঝে খকখক করে কাশে। সেই জন্য চৌরঙ্গির ফুটপাথ থেকে দরাদরি করে আঠারো টাকা দিয়ে কৌশিকের জন্য একটা মোটা কাপড়ের জামা কিনে এনেছে।

পকেট থেকে দু’প্যাকেট চারমিনার সিগারেট বার করলো তপন। আগে কৌশিক সিগারেট খেত না, এখন সিগারেট ছাড়া তার চলে না।

প্যাকেট দুটো বাড়িয়ে দিয়ে তপন জিজ্ঞেস করলো, আর কিছু লাগবে? ওঃ হো, দাড়ি কামাবার ব্লেড আনতে আজও ভুলে গেছি।

কৌশিক আবার ধমক দিয়ে বললো, তুই জামাটা কেন এনেছিস, সে কথা বল! তপন শুকনো গলায় বললো, আমি ভাবছি, এই ভাবে আর কতদিন চলবে?

–আমার পায়ে আর একটু জোর এলেই আমি বেরিয়ে পড়বো।

–বেরিয়ে কোথায় যাবি? আমি ভাবছিলাম জানিস, কৌশিক? তোর শরীর এখনও এত দুর্বল, একটু দুধ কিংবা ডিমসেদ্ধ না খেলে সারবে কী করে? কিন্তু এসব কেনার পয়সা কোথায় পাওয়া যাবে? সেই জন্যই বলছিলাম।

–কী পাগলের মতন কথা বলছিস! আমি দুধ-ডিম খাবো? কেন, আমি কি কচি খোকা নাকি? এই বস্তিতে কে দুধ খায়, ডিম খায়?

–ওদের কথা আলাদা। ওরা কেউ তোর মতন অসুস্থ নয়। আমার কথাটা শেষ করতে দে। আমি একবার তোর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবো?

-–মা? কেন, তুই আমার মাকেও জেল খাটাতে চাস বুঝি?

–খুব সাবধানে, তোর মামাবাড়িতে গিয়ে টেলিফোন করে…তোর মা তোর কোনো খবর জানেন না, তাঁকে একবার সব জানানো দরকার, তাছাড়া তোর মামারা যদি কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন।

–আমার কোনো মা নেই। আমার এখন মা নেই, ভাই-বোন নেই, মামা-টামা কেউ নেই! শোন তপন, একবার আমি বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি, এরপর আবার বাচ্চা ছেলের মতন ভয় পেয়ে মায়ের আঁচলের তলায় ফিরে যাবো?

–আমি প্র্যাকটিক্যাল কথা বলছি।

–হ্যাং ইয়োর প্র্যাকটিক্যাল কথা! তোকে দিয়ে কোনো কাজের কাজ হয় না। এতদিনে। পমপমের একটা খবর আনতে পারলি না।

–আমি বলছি, তোর মা আর মামারা যদি ব্যবস্থা করতে পারেন, তাহলে অতীনের মতন তোরও বিলেতে চলে যাওয়া উচিত। সেখানে চিকিৎসা করাতে পারবি। পেট থেকে গুলিটা বার করতে হবে না?

–ঐ বুলেট আমি হজম করে ফেলেছি! গোলা খা ডালা! শুনিস নি সে কথা! আমি বিলেত, আমেরিকা কোনোদিন যাবো না। সোভিয়েত রাশিয়াতেও চিকিৎসা করাতে যাবো না। যদি কোনোদিন সুযোগ পাই তো চীনে যাবো। কিংবা আলবেনিয়ায়।

–তোর প্রাণের বন্ধু অতীন যদি যেতে পারে।

–অতীন গেছে বেশ করেছে! অতীনের ব্যাপার তুই কি বুঝবি রে ইডিয়েট?

–পরশুদিন দেওঘরে অসীম চ্যাটার্জি ধরা পড়ে গেছে। কয়েক মুহূর্ত থেমে রইলো কৌশিক, কিন্তু অবাক হলো না। গম্ভীর গলায় বললো, জানি। কালকে হোটেলের ছোকরাটাকে দিয়ে একটা খবরের কাগজ আনিয়েছিলুম। কালই বেরিয়েছে খবরটা। ওরা পুলিশকে রেজিস্ট করেছিল কি না জানিস?

–তা জানি না। কৌশিক, আমাদের দলের মানিকদা মারা গেছেন। গুরুদাস, সুদেব, শশী ওরা কেউ বেঁচে নেই। আগস্ট মাসের গোড়ার দিকে কমরেড সরোজ দত্তকে পুলিশ গুলি করে মেরেছে। এরপর আর কী হবে?

–আর কী হবে মানে? আমরা তো বেঁচে আছি। কমরেড চারু মজুমদার আছেন। ভারতবর্ষের পুলিশের সাধ্য নেইই তাঁকে ছোঁয়। আমাদের ছেলেরা শেষরক্তের ফোঁটা দিয়ে তাঁকে আড়াল করে রাখবে। অনেকে তো মরবেই। চেয়ারম্যান বলেছেন, এইসব ধাক্কা খাওয়ারও প্রয়োজন আছে।

–আমি কিন্তু সামনে কোনো পথ দেখতে পাচ্ছি না। হঠাৎ উঠে এসে তপনের কাঁধটা খামচে ধরে কৌশিক রক্তচক্ষে জিজ্ঞেস করলো, তুই তখন আমাকে দুধ-ডিম খাওয়ার কথা বললি কেন রে, ছোটলোক?

–আমি… আমি ছোটলোক? তুই আমাকে ছোটলোক বললি।

ছোটলোক মানে ছোট জাত বা নীচু জাত বলিনি, মনের দিক দিয়ে ছোট। আলবাৎ তুই ছোট লোক! তুই আমাকে দুধ-ডিম খাওয়াবি, তুই আমাকে দয়া করতে চাস?

–আমি মোটেই সে কথা বলিনি!

–ড্যাম ইট। আমি জানতে চাই, কে তোকে পয়সা সাপ্লাই করে? তুই আমার নাম করে হ্যাংলার মতন লোকের কাছে চাঁদা তুলছিস!

–এসব বাজে কথা।

–আমি বাজে কথা বলছি? দ্যাখ তপন, তুই ভাবিস না, আমি তোর দয়ার ওপর বেঁচে আছি। আই ক্যান টেক কেয়ার অফ মাইসেলফ! তোকে আর আসতে হবে না!

–কৌশিক ছেলেমানুষী করিস না। অত চাচাচ্ছিস কেন, তোর জ্বর হয়েছে দেখলাম।

–এসব ন্যাকামি আমার ভালো লাগে না! জ্বর সবারই হয়। আমার জন্য জামা আনতে কে বলেছে? কে কিনে দিয়েছে বল আগে? দুধ আর ডিমের লোভ দেখানো! তারপরেই ও মারা গেছে, সে মারা গেছে, এইসব বলার মানে কী? অন্যরা মারা যাচ্ছে, আমি দুধ আর ডিম খাবো?

–আমি সেইভাবে বলিনি।

–আই হেইট ইউ! বুর্জোয়া আর শোধনবাদীদের মতন বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাবো আমি? গেট আউট! আমি আর কোনোদিন তোর মুখ দেখতে চাই না।

পাগলের মতন হয়ে গিয়ে তপনকে ধাক্কা দিয়ে বার করার চেষ্টা করতে লাগলো কৌশিক। তপন দুতিনবার বলার চেষ্টা করলো, এই কী হচ্ছে, কী করছিস, কিন্তু কৌশিক যেন হিংস্র হয়ে উঠেছে। এক সময় ধৈর্য হারিয়ে তপন বলে ফেললো, ধুর শালা!

ক্রাচ ছাড়া হাঁটতে পারে না কৌশিক, তবু সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজা পর্যন্ত এসে বললো, তুই আর কোনোদিন এখানে আসবি না, এলেও আর আমাকে দেখতে পাবি না। আই স্পিট অন ইয়োর চ্যারিটি! বেরিয়ে যা।

কৌশিক ঠেলাঠেলি করতে লাগলো এমনভাবে যে তপনকে একসময় বাধা দিতেই হলো। এই ঘরখানা সে নিজের অতি কষ্টের উপার্জনের পয়সায় ভাড়া করেছে কৌশিকের জন্য, আর এখান থেকে কৌশিক তাকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেবে? সে অন্যের পয়সায় কৌশিকের জন্য জামা কিনেছে? একথা শুনলে তার রাগ হবে না? একটু বেশি জোর করেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গেল তপন, পায়ে জোর নেই বলে টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল কৌশিক।

তপন আর পেছন ফিরে তাকালো না, হনহন করে চলে গেল গলি দিয়ে। এখান থেকে স্টেশন প্রায় পঁচিশ মিনিটের পথ। তপন আপনমনে বিড় বিড় করতে লাগলো, আমি আর কত ধৈর্য ধরবো। আমি যথেষ্ট করেছি, কেউ আমাকে দায়িত্ব দেয় নি। আর সবাই তো কেটে পড়েছে। স্টাডি সার্কেলে যারা বড় বড় কথা বলতো, তারা দিব্যি বড় বড় চাকরি বাগিয়ে বসেছে, দেখা হলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আমি রিফিউজি বাড়ির ছেলে, আমি কখনো। বিপ্লব-টিপ্লবের কথা বলেছি? কৌশিকরাই হল আমাকে ভিড়িয়েছিল। আমি যথাসাধ্য করেছি ওদের জন্য। ওরা কেউ বড় চাকরি করে, কেউ বিলেত যাবে, আমি যেখানে পড়ে আছি সেখানেই থাকবো। আমি মাসের পর মাস কী করে কৌশিকের খরচ চালাবো, আমার নিজেরই চলে না। পকেটে মাত্র সাতটা টাকা রয়েছে, কাল কী জুটবে তার ঠিক নেই।

পাঁচ মিনিট হেঁটে তপন থামলো। রাগে-অভিমানে তার চোখে জল এসে গেছে। কৌশিক তাকে ছোটলোক বললো? কৌশিক ভাবে যে সে কৌশিকের নাম করে অন্যদের কাছ থেকে টাকা আনছে? পমপম অসুস্থ হবার পর কেউ তাক একটা পয়সাও দেয়নি। আজ থেকে কৌশিকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। সে নিজেরটা নিজে বুঝে নিতে যদি পারে তবে ভালোই তো! তপন আর এসব ঝাটের মধ্যে নিজেকে জড়াবে না।

রাস্তার আলোর নীচে তপন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।

এই মুহূর্তে তপন ছাড়া আর একজনও জানে না যে কৌশিক কোথায় আছে। কৌশিকের এখনও একা চলা ফেরা করার সাধ্য নেই। আর কেউ তাকে এখানে সাহায্য করতে আসবে না!

কৌশিক আজ রাত্তিরে খাবে কী? তপন জানে, কৌশিকের কাছে একটা দাড়ি কামাবার শস্তা। ব্লেড কেনারও পয়সা নেই। তপন ভেবেছিল, তার সাত টাকার মধ্যে ছটা টাকা কৌশিককে দিয়ে আসবে। সামনের হোটেলটায় বারো আনায় ভাত বা রুটি আর ডাল আর একটু তরকারি, অন্তত ছ’টা টাকা ওকে দিয়ে আসা উচিত। দরজাটা খুলে ছুঁড়ে দিয়ে আসবে।

তপন ফিরে এসে গলির মোড়টার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলো। ছেঁড়া জামাটা গায়ে দিয়ে, একখানা মাত্র ক্রাচ ডান বগলে দিয়ে গলির মোড়টায় দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক। এখনো ভালো করে সন্ধে হয়নি। এর মধ্যে বেরিয়ে এসেছে, একা একা কোথায় যাবার চেষ্টা করছে ও? এ যে প্রায় আত্মহত্যা! শ্রমিক বিক্ষোভ হচ্ছে বলে এ রাস্তায় যখন তখন পুলিশ আসে। স্টেশনের কাছে বসে থাকে একদল অন্য পার্টির ছেলে। এদের মধ্যে কেউ যদি কৌশিককে। চিনতে পারে, তাহলেই শেষ। এখন চতুর্দিকে শুরু হয়েছে বদলা নেবার পালা।

দৃঢ় আদর্শবাদী, দুর্দান্ত সাহসী কৌশিক রায়কে কী অসহায় দেখাচ্ছে এখন। রোগা হাড় জিরজিরে চেহারা, চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে, বগলে একটা ক্ৰাচ, সে কোথাও যেতে পারবে না তার কোনো যাবার জায়গা নেই।

বুকটা টনটন করে উঠলো তপনের, সে কান্না সামলাতে পারছে না। সে তো জানে, কৌশিকের মত খাঁটি মানুষ কত দুর্লভ! একটা রুমালও নেই ছাই, সে জামার হাত দিয়ে চোখ মুছলো। তারপর কাছে এসে শুধু বললো, কৌশিক।

অদ্ভুত বিস্ময়ের সঙ্গে কৌশিক একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তপনের দিকে। তারপর দুবোধ্য কোনো ভাষার মতন আস্তে আস্তে বললো, তপন, তুই আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছিলি? তুই আমার কাছে আর আসতে চাস না?

তপন বললো, পাগল নাকি, কোথায় চলে যাবো? এই এমনি একটু বেরিয়েছিলাম। চল, ঘরে চল।

৫২. দুপুরবেলা মমতাদের খাওয়া-দাওয়া

দুপুরবেলা মমতাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার একটু পরেই এসে হাজির হলো পরেশ। তার হাতে একখানা এল পি রেকর্ড আর এক বাক্স মিষ্টি। এ রকম সে প্রায়ই অসময়ে আসে, কিছু না কিছু উপহারও সঙ্গে আনে। চাকরি করে না পরেশ, সে তার দাদার সঙ্গে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা শুরু করেছে, তাই তাকে দশটা-পাঁচটায় আবদ্ধ থাকতে হয় না কোথাও। সে এখন এ বাড়ির জামাই, তার তো এ বাড়িতে যখন তখন আসার অধিকার আছেই।

দরজা খুলে দিয়েছে টুনটুনি, তবু সে গলা তুলে জিজ্ঞেস করলো, কাকিমা কোথায়? কাকিমাকে ডাকো!

মমতা নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছিলেন, তাঁকে আবার বেরিয়ে আসতেই হলো। পরেশ যখন। যে-জিনিসই আনুক তা সে শুধু টুনটুনিকে দিতে চায় না, সাড়ম্বরে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে মমতার হাতে তুলে দেয়। নিজের বউকে চুপি-চুপি শুধু উপহার না দিয়ে সে যে বাড়ির গুরুজনদের হাতে সবকিছু দেয় এটা হয়তো তাদের পারিবারিক রীতি, কিন্তু এর মধ্যে খানিকটা দেখানেপনাও আছে।

পরেশ বললো, কাকিমা, আপনার জন্য এই ফিরোজা বেগমের নজরুলগীতির রেকর্ডটা এনেছি, আপনি গান শুনতে ভালোবাসেন। আর এই সন্দেশ আমাদের পাড়ার ভীম নাগের, স্পেশাল অর্ডার দিয়ে তৈরি।

মমতা যথারীতি কিন্তু কিন্তু ভাবে বললেন, আবার কেন এতসব এনেছো!

এর আগে পরেশ একটা রেকর্ড প্লেয়ারও এনে দিয়েছিল এইভাবে। সেটা টুনটুনির ঘরেই থাকে। রেকর্ডটাও টুনটুনিই বাজাবে, তবু মমতাকে হাত পেতে নিতে হয়, যেন এসব শুধু তাঁরই জন্য আনা হয়েছে।

মমতা খুবই অস্বস্তি বোধ করেন। মানুষের কাছ থেকে কিছু পেলে, প্রতিদানেও কিছু দিতে হয়। এমনি এমনি কারুর কাছ থেকে কোনো জিনিস নিতে অভ্যস্ত নন মমতা। তা ছাড়া পরেশ এ বাড়ির নতুন জামাই, কেই তো কিছু দেওয়া উচিত।

সঞ্চয় বলতে আর কিছুই নেই মমতার। প্রতাপকে মাঝে মাঝেই অফিসের পেশকার-দারোয়ানদের কাছ থেকে ধার করতে হয়। বিমানবিহারীর কাছে বেশ মোটা টাকার ধার আছে, তা আজও শোধ করা হয়নি। তবু সংসারের টাকা ভেঙে মমতা এই কয়েক মাসে পরেশের জন্য শার্ট, স্যুটের কাপড় কিনে দিয়েছেন। পিকলু বাবলুর অন্নপ্রাশনের সময় পাওয়া অনেকগুলো ছোট ছোট সোনার আংটি ছিল, অন্যান্য কিছু গয়না অভাবের সময় বিক্রি করতে হলেও মমতা তাঁর ছেলেদের এই আংটিগুলো এতকাল রেখে দিয়েছিলেন। অত ছোট আংটি তো আর কোনো কাজে লাগবে না, এবারে সেগুলো ভেঙে টুনটুনির জন্য কানের একজোড়া দুল আর পরেশের জন্য একটা আংটি গড়িয়ে দিয়েছিলেন। মমতার একটা নাকছাবির হীরেও বসিয়ে দিয়েছিলেন পরেশের সেই আংটিতে। ওদের বিয়ে উপলক্ষে একটা কিছু তো দেওয়া দরকার, আর দিতে গেলে ভালো জিনিসই দিতে হয়। হালকা ফিনফিনে গয়না মমতা কিছুতেই কারুকে দিতে পারেন না।

শুধু পিকলুকে তার ঠাকুদার দেওয়া একটা আংটি রেখে দিলেন মমতা। পিকলুর জিনিসপত্র সব চলে গেলে যেন পিকলুও চিরকালের মতন হারিয়ে যাবে।

এই যে আজ একটা লং প্লেয়িং রেকর্ড আনলো পরেশ, মমতার হাতে প্রথম তুলে দিল, এ জন্য পরেশকে আবার কিছু দিতে হবে। যতক্ষণ না দিচ্ছেন, মমতা শান্তি পাবেন না।

বিয়ে হয়েছে বলেই টুনটুনিকে আলাদা একটা নিজস্ব ঘর দিতে হয়েছে। পরেশ মাঝে মাঝে রাত্তিরটাও থেকে যায়। মুন্নিকে এখন শুতে হয় সুপ্রীতির সঙ্গে, ও বেচারার পড়াশুনোর খুব ক্ষতি হয় তাতে। সে ঘরটা একেবারে সরু, এক ফালি, আগে ভাঁড়ার ঘর ছিল। উপায় কী, আর

তা কোনো জায়গাও নেই। যতবার বাড়ি বদলানো হচ্ছে, ততবার জায়গা কমে যাচ্ছে, ঘরগুলোও ছোট ছোট হয় আজকাল, একটুও অতিরিক্ত জায়গা কেউ রাখে না। কালিঘাটের বাড়ি থেকে এই পরেশই জোর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল মমতাদের, সে কথা যেন তার মনেই নেই, দিব্যি অম্লান বদনে হেসে হেসে কথা বলে।

বাড়িতে জামাই এলে কিছু খেতে দিতে হয়। মমতা সেই চিন্তা করতে লাগলেন।

রেকর্ড প্লেয়ারে ফিরোজা বেগমের রেকর্ডখানা চাপিয়ে পরেশ বললো, কাকিমা, আপনিও আসুন, শুনবেন আসুন! এই টুনটুনি, কাকিমাকে বসতে দাও!

গান শুনতে ভালোবাসেন মমতা, কিন্তু তিনি শুধু ভেবে যাচ্ছেন, পরেশকে কী খেতে দেবেন? বাড়িতে সে রকম কিছু নেই। দোকান থেকে কিছু কিনে আনতে হলেও কে যাবে? মুন্নি কলেজে গেছে। টুনটুনিকে তার বরের সামনে থেকে উঠিয়ে দোকানে পাঠানো যায় না। একটা ঠিকে ঝি শুধু সকালে আর বিকেলে এসে বাসন মেজে দিয়ে যায়, আর কোনো কাজের লোক রাখা হয়নি। অসময়ে কোনো অতিথি এসে পড়লে এই মুশকিল হয়।

বাড়িতে কয়েকখানা লুচি ভেজে, বেগুন ভাজা করে দেওয়া যায়। ময়দা থাকলেও ঘি নেই। ঘি খাওয়া তে উঠেই গেছে। প্রতাপ গরম ভাতের সঙ্গে ঘি পছন্দ করতেন, এখন ভালো ঘি’র অসম্ভব দাম বলে প্রতাপ ঘি কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। দালদা’র লুচি কি নতুন জামাইকে দেওয়া যায়! মমতা কিছুতেই তা পারবেন না। লুচির সঙ্গে দু’একটা মিষ্টিও দেওয়া উচিত। পরেশ যে মিষ্টি এনেছে, সেই মিষ্টিই তাকে খাওয়ানোটা মোটেই ভালো দেখায় না।

ধুত, মাথার মধ্যে এইসব চিন্তা ঘুরলে কি গান শোনা যায়? মমতা বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে।

দোকান থেকে একটু ঘি আর মিষ্টি আনা দরকার। মমতা কোনোদিন একা একা মুদির দোকানে, মিষ্টির দোকানে যাননি। দুপুরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে-মমতার হঠাৎ কান্না এসে গেল। এবং এই কান্নার সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে মনে পড়ে গেল বাবলুর কথা। ছেলেটা অনেকদিন চিঠি দেয় না। প্রায় দেড় মাস অ্যামেরিকা থেকে কোনো চিঠি আসেনি। তবু বাবলুর ওপর রাগ হয় না তাঁর। মমতার মনে হয়, বাবলুকে এদেশ থেকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই জন্য সে অভিমান করে আছে।

আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন মমতা।

টুনটুনির ঘরের দরজাটা খোলা ছিল, এখন সেটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। ওদের কোনো চক্ষুলজ্জা নেই। ভেতরে এখনো জোরে জোরে গান বাজছে, আর কোনো শব্দ শোনা যাবে না।

তবু নতুন জামাইকে কিছু খাবার না দেওয়াটা খুবই অভদ্রতা। মমতা আটপৌরে শাড়িটাই একটু ঠিক করে পরে নিয়ে, পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। আগে করেননি কখনো, তাও করতে হবে। জীবনের আরও কী বাকি আছে কে জানে!

মাত্র চারটি রসগোল্লা কিনলেন বলে মিষ্টি দোকানের লোকটি তাঁকে গ্রাহ্যই করলো না। বোধ হয় ভেবেছে, কোনো বাড়ির ঝি। শাড়িটা পাল্টে আসা উচিত ছিল বোধ হয়। কিংবা এক সঙ্গে দশ-পনেরো টাকার জিনিস কিনলে হয়তো লোকটি মমতার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতো।

মমতা এক শো গ্রাম ঘি কিনবেন ভেবেছিলেন, তাঁর কাছে বেশি টাকাও নেই, কিন্তু পাড়ার মুদির দোকানটি বন্ধ। একটা স্টেশনারি দোকান খোলা আছে, সেখানে টিনের ঘি পাওয়া যায়, আড়াই শো গ্রামের কম নেই। দোকানের মধ্যে দাঁড়িয়েই মমতা ছোট্ট ব্যাগটা খুলে পয়সার হিসেব করে দেখলেন, আড়াই শো গ্রামের টিন কেনা যাবে না।

এই দোকানের কাউন্টারের একটি ফর্সা, অল্প বয়েসী ছেলে বললো, আপনি নিয়ে যান না, মাসিমা। পরে দাম দেবেন।

মমতা আড়ষ্টভাবে বললেন, পরে?

ছেলেটি ঘিয়ের টিনটা একটা কাগজের ঠোঙায় ভরতে ভরতে বললো, পরে এক সময়। পাঠিয়ে দেবেন। আমি চিনি আপনাকে। মুন্নিদির মা তো? মুন্নিদি এই দোকান থেকে প্রায়ই পাঁউরুটি নিয়ে যায়।

মমতা বিরাট একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। দোকানে কোনো জিনিস কিনতে ঢুকেও পয়সার অভাবে না কিনে ফিরে যাবার অভিজ্ঞতা তাঁর আগে কখনো হয়নি। হয়তো এটা এমন কিছুই ব্যাপার নয়। অনেকেরই এরকম হয়, দোকানদাররা কিছু মনে করে না। তবু মমতা। লজ্জায়, ক্ষোভে যেন মরমে মরে যাচ্ছিলেন, তাঁর চোখে আবার জল এসে যাবার উপক্রম। এই ছেলেটি যে তাঁকে কতখানি গ্লানি থেকে বাঁচালো, তা ও নিজেই বোধ হয় জানে না।

মমতা কৃতজ্ঞভাবে হেসে বললেন, সন্ধেবেলাতেই আমার মেয়ে এসে দাম দিয়ে যাবে।

ফিরে এসে মমতাকে রান্নাঘরে আবার কেরোসিন স্টোভ জ্বালতে হলো। তারপর তিনি ময়দা মাখতে বসলেন।

টনটনির ঘরের দরজা বন্ধ। বিরাট জোরে গান বাজছে। পরেশ দুপুরবেলা এলে ঐ ঘর থেকে টুনটুনিকে আর বেরুতেই দেয় না। আর আড়াই মাস বাদে টুনটুনির বাচ্চা হবে।

ময়দা মাখা হয়ে যাবার পর লেচি করে সবে বেলতে শুরু করেছেন মমতা, এই সময় সুপ্রীতি এলেন রান্নাঘরে। এই সময় সুপ্রীতি ঘুমিয়ে থাকেন, কিন্তু পাশের ঘরে এত জোরে গান বাজলে কার সাধ্য ঘুমোয়!

রোগা হতে হতে একেবারে শালিক পাখির মতন চেহারা হয়েছে সুপ্রীতির। সেই সঙ্গে বেড়েছে শুচিবাই। ঘরে তিন-চারটি ঠাকুর দেবতার পট টাঙিয়ে পুজো-আচ্চা করেন। একমাত্র মুন্নি ছাড়া আর কারুর সঙ্গে তাঁর বিশেষ কথাবাতাই হয় না আজকাল।

মমতার ঠিক সামনে বসে পড়ে সুপ্রীতি বললেন, আজ আবার দুপুরবেলা পরেশ এসেছে।

এটা ঠিক প্রশ্ন নয়, বেশ স্পষ্ট অপছন্দের উক্তি মমতা কিছু বললেন না।

সুপ্রীতি আবার বললেন, যখন তখন এরকমভাবে আসে, এত জোরে জোরে গান বাজায়, মাঝে মাঝে ওর বন্ধুদের আনে, এরপর খোকন না একদিন হঠাৎ মাথা গরম করে বসে!

এটা মমতারও মনের কথা। প্রতাপের মেজাজের জন্য সবসময় মমতাকে কাঁটা হয়ে থাকতে হয়। টুনটুনির সঙ্গে পরেশের বিয়েটা এখনও প্রতাপ মেনে নিতে পারেননি। কোনদিন যে প্রতাপ পরেশকে হঠাৎ দাবড়ানি দিয়ে বসবেন, তার ঠিক নেই।

মমতা তবু মৃদু গলায় বললেন, পরেশ এখন বাড়ির জামাই, সে তো আসবেই।

সুপ্রীতি বললেন, বাড়ির জামাই, তাকে নেমন্তন্ন না করলে আসবে কেন? আমাদের সময়। জামাইরা এমন নির্লজ্জ ছিল না।

মমতা বললেন, এখন দিনকাল অন্য রকম, অত নিয়মটিয়ম কেউ মানে না। ওদের অল্প বয়েস!

–বিয়ে করে পরেশ ওর বউকে এখানে কতদিন ফেলে রাখবে? টুনটুনিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে না?

–আপনি ভুলে গেছেন দিদি, পরেশের বাবা মারা গেছে, এখনও কালাশৌচ চলছে, এক বছরের মধ্যে বিয়ে করা চলে না। সেই জন্যই তো গোপনে রেজিষ্ট্রি বিয়ে করেছে, বাড়িতে কিছু জানায়নি।

–টুনটুনিরও তো এখন কালাশৌচ, তার মধ্যে এইসব কাণ্ড, ছি ছি ছি ছি, ভাবলেও গা-টা ঘিন ঘিন করে। বাড়িতে জানায়নি তো আমরা কী করবো? আমরা কি ওকে ঘরজামাই হতে বলেছি? ওদের তো শুনি অনেক পয়সা আছে, অন্য জায়গায় বাড়ি ভাড়া করে পরেশ তার বউকে রাখতে পারে না?

মমতা চোখ তুলে সুপ্রীতির দিকে তাকালেন। এই প্রশ্নের উত্তর মমতা দেবেন কী করে? তিনি কি পরেশকে এ কথা জিজ্ঞেস করতে পারেন?

সুপ্রীতি আবার বললেন, এই দুপুরবেলা, তোমার একটু বিশ্রাম নেই, তুমি ওদের জন্য লুচি ভাজতে বসলে। টুনটুনিটা কি, সে নিজে এসব করতে পারে না?

মমতা বললেন, তাতে কী হয়েছে? ওদের নতুন বিয়ে…আমি দু’খানা লুচি ভেজে দেবো, তাতে আর কতক্ষণ সময় লাগবে। আপনি শুয়ে পড়ুন গিয়ে দিদি!

সুপ্রীতি বললেন, মমো, আমি জানলা দিয়ে দেখলাম, তুমি বাইরে বেরুলে। তুমি বুঝি ওদের জন্য কিছু কিনতে টিনতে গিয়েছিলে?

–বাড়িতে কিছু ছিল না, লুচি ভাজার জন্য একটু ঘি…

–মমো, তুমি নিজে গেলে ঐ সব আনতে? টুনটুনিকে বলতে পারলে না? তুমি ঐ সব কিনে ফিরে আসছিলে, তোমাকে দেখে আমার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল! আমাদের বাড়ির কত আদরের বউ ছিলে তুমি, খোকন আমাদের একটা মাত্র ভাই, তার ঘাড়ের ওপর আমরা সবাই চেপে বসেছি। আমি এতদিন অসুখে ভুগলাম, সব ধকল তোমাকেই তো সহ্য করতে হলো!

–আহা একটু দোকানে গেছি, তাতে কী হয়েছে? আজকাল এ রকম অনেকেই যায়!

–তুমি মজুমদার বাড়ির বউ! টুনটুনি ভেবেছি কি, মামাবাড়িতে বসে যা খুশি করবে? ওর বাপটা একটা অপদার্থ, অমানুষ! মেয়েটার কথা একবার ভাবলোও না?

সদর দরজায় বেল বেজে উঠলো। কথা থামিয়ে সুপ্রীতি আর মমতা দু’জনেই উৎকর্ণ হলেন। এখন আবার কে আসবে? মুন্নির কলেজ থেকে ফেরার সময় হয়নি, ঠিকে ঝি পাঁচটার আগে আসে না। প্রতাপ হঠাৎ আদালত থেকে ফিরে এলেই মুশকিল।

মমতার হাতে ময়দা মাখা, সুপ্রীতি বললেন, আমি দেখছি।

সুপ্রীতি দরজার কাছে পৌঁছোবার আগেই টুনটুনি আর পরেশ বেরিয়ে এসেছে। পরেশই দরজা খুলে দিল। তারই বয়েসী আর দুটি যুবক এসেছে। যেন এটা পরেশেরই নিজের বাড়ি,

এই ভঙ্গিতে পরেশ বললো, আয়, আয়, এত দেরি করলি!

সুপ্রীতি রান্নাঘরে ফিরে এসে মুখ চোখ গোঁজ করে বললেন, পরেশের দু’জন বন্ধু এসেছে। এ সব কী শুরু হলো, মমো? এটা কি একটা আড্ডাখানা?

মমতা নীরবে হাঁটুতে থুতনি চেপে রইলেন।

সুপ্রীতি বললেন, আমি টুনটুনিকে ডেকে বলছি, এ বাড়িতে এসব উপদ্রব চলবে না। প্রতাপ এসে দেখলে দাপাদাপি করবে! প্রতাপেরও শরীর ভালো না।

মমতা বললো, থাক, আজকের দিনটা থাক।

সুপ্রীতি বললেন, পরেশ এ বাড়িতে বন্ধুদের ডেকে আড্ডা বসাবে, আর তুমি তাদের সবাইকে লুচি ভেজে খাওয়াবে? এত আস্কারা দিও না। তুমি মুখে কিছু বলতে না পারো, আমি পরেশকে ডেকে বলছি, তোমার বউকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাও।

মমতা আবার বললেন, আজ থাক। টুনটুনির বাচ্চা হবে, এই অবস্থায় ও অন্য কোথাও গিয়ে একাও তো থাকতে পারবে না।

–কেন পারবে না? আজকাল কত অল্প বয়েসী ছেলেমেয়ে বিয়ে করে আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকে। তাদের ছেলেপুলে হয় না?

পরেশের বন্ধুদের জন্য আরও খানিকটা ময়দা মাখতে লাগলেন মমতা, সুপ্রীতি গজগজ করতে করতে বঁটি নিয়ে বেগুন কেটে দিলেন।

মমতার ভয়টা অন্য জায়গায়। টুনটুনি একটা ভুল করে ফেলেছে, সেই জন্যই পরেশের সঙ্গে তার বিয়েটা বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়েছে তাঁদের। কিন্তু পরেশের মতিগতি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। নিজের বাড়িতে সে এই বিয়ের কথা জানায়নি। পরেশ যদি হঠাৎ এ বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেয়, টুনটুনিকে আর না নেয়? তাহলে কি টুনটুনি আর তার গর্ভের সন্তানের বোঝা সারা জীবন প্রতাপকেই টানতে হবে? অথবা পরেশের নামে তখন মামলা-মকদ্দমা করতে হবে, সে একটা বিশ্রী ব্যাপার। সেই জন্যই তো মমতা কোনো রকমে একটা বছর সহ্য করে যেতে চান। একটা বছর পর অন্তত পরেশ যদি ভালোয় ভালোয় টুনটুনিকে নিয়ে যায়

এই সময় টুনটুনি রান্নাঘরে আসতেই মমতা সুপ্রীতির দিকে একটা স্থির দৃষ্টি দিয়ে অনুনয় করলেন, যেন তিনি ঐ প্রসঙ্গটা না তোলেন।

টুনটুনি বললো, ও মা, তোমরা এইসব লুচিটুচি করতে গেছ কেন? ওর বন্ধুরা কাটলেট এনেছে। এই একগাদা!

মমতা ক্লিষ্টভাবে বললেন, না, না, ওরা খাবার আনবে কেন? তুই বারণ করে দিস।

সুপ্রীতি রাগ গোপন করে চলে গেলেন নিজের ঘরে।

পরেশ তার বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে গেল, সাড়ে পাঁচটায়, টুনটুনিকেও সঙ্গে নিয়ে গেল কোনো সিনেমা দেখাবে বলে। একটু পরেই প্রতাপের বাড়ি ফেরার কথা। পরেশ পারতপক্ষে প্রতাপের মুখোমুখি পড়তে চায় না। মমতা জানেন, সিনেমা দেখে ফেরার সময় পরেশ টুনটুনিকে বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যাবে, তখন আর ওপরে আসবে না।

প্রতাপ অবশ্য ফিরলেন আরও দেড় ঘণ্টা বাদে। চোখ-মুখে ক্লান্তির ছাপ। আদালত থেকে একবার বাড়ি এসে আর বেরুতে ইচ্ছে করে না প্রতাপের, অন্য কোনো কাজ থাকলে একবারে। সেরে আসেন। বিমানবিহারী কিংবা মামুন সাহেবের কাছে যান প্রায়ই। আজ অবশ্য অন্য একটা জায়গায় যেতে হয়েছিল।

জামা-প্যান্ট ছাড়তে ছাড়তে প্রতাপ বললেন, আজ কী হলো জানো? কোর্ট থেকে সোজা বাড়ি ফিরবো ভেবে শিয়ালদা স্টেশনে এসেছি, হঠাৎ নেপুকাকার সঙ্গে দেখা। নেপুকাকা কে জানো তো? মালখানগরে আমাদের বাড়ির পুব দিকে, বড় পুকুরটার ধারে নেপুকাকাদের বাড়ি ছিল, তোমার বোধ হয় মনে নেই। আমিও প্রথমে চিনতে পারিনি, অনেক বছর দেখিনি, বেশ বুড়ো হয়ে গেছেন নেপুকাকা। বেশ লম্বা চওড়া মানুষ ছিলেন, এক সময় হাতের গুলি ফুলিয়ে আমাদের বলতেন, টিপে দ্যাখ, দাবাতে পারবি? একেবারে লোহা! দুগা পুজোর সময় পাঁঠা বলি দিতেন নেপুকাকা। আগে একজন কামারকে ডাকা হতো। একবার নেপুকাকা বললেন, কামার লাগবে কিসে, আমিই বলি দিতে পারি। খাঁড়া নিয়ে এক কোপে কাটা চাই, তাও আবার অষ্টমীর দিন জোড়া পাঁঠা, খালি গায়ে, কপালে সিঁদুর লাগিয়ে, খাঁড়া হাতে নেপুকাকাকে দেখাত ঠিক কাঁপালিকের মতন…

মমতার এ গল্প শোনার মন নেই। আজ বিকেল থেকে তিনি শুধু ভাবছেন ছেলের কথা। কেন যেন তাঁর মনে অযৌক্তিক একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে যে, বাবলু এবার শিগগিরই ফিরে। আসবে। সেই যে শিলিগুড়িতে চাকরি নিয়ে গিয়েছিল, তারপর আর বাবলু বাড়ি ফেরেনি, মমতার সঙ্গে দেখা হয়নি, তিন বছরের বেশি হয়ে গেল। বাবলুরও কি মন কেমন করে না?

আর একটা কথাও মমতার মনে হচ্ছে। বাবলু যদি হঠাৎ এসে পড়ে, তাহলে সে থাকবে কোথায়? বাড়ি বদল করার সময় বাবলুর জন্য একটা আলাদা ঘর রাখার কথা চিন্তাই করা হয়নি। বাবলুকে কি চিরকালের জন্য নিবাসন দেওয়া হয়েছে? এ বাড়িতে সুপ্রীতির ঘর আছে, টুনটুনিকেও ঘর দিতে হয়েছে, শুধু বাবলু ও মুন্নির কোনো নিজস্ব ঘর নেই।

প্রতাপ বললেন, আমি চিনতে না পারলেও নেপুকাকা ঠিক চিনেছেন আমাকে। নেপুকাকার বয়েস খুব বেশি না, পঁয়ষট্টি ছেষট্টি হবে, কিন্তু কুঁজো হয়ে গেছেন এরই মধ্যে। নেপুকাকা আমার হাত ধরে টানাটানি করতে লাগলেন, উনি এখন থাকেন যাদবপুরে, সেখানে আমাকে জোর করে নিয়ে যাবেনই যাবেন। আমি আর শেষপর্যন্ত না বলতে পারলাম না।

মমতা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখন যাদবপুর ঘুরে এলে?

প্রতাপ বললেন, না গিয়ে পারলাম না যে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। এইসব পুরোনো মানুষজনের সঙ্গে আর দেখা না হওয়াই ভালো। যাদবপুরের অনেকখানি ভেতরে একটা জবরদখল কলোনিতে নেপুকাকা বাড়ি করেছেন। নেপুকাকার চার-চারটি মেয়ে, তারপর এক ছেলে। ছেলেটাই সবচেয়ে ছোট। দেশ ছেড়ে এসে নেপুকাকা এদিকে চাকরি বাকরি যোগাড় করতে পারেননি, কী করে এতদিন চালিয়েছেন কে জানে, তার মধ্যেও আবার মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।

মমতা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখন কিছু খাবে? নাকি চানটান করে একেবারে রাত্তিরের খাওয়া খেয়ে নেবে?

প্রতাপ বললেন, নেপুকাকার ওখানে দুটো সিঙ্গাড়া খেয়েছি, খিদে নেই। তারপর শোনো, নেপুকাকার বউকে আমরা নতুন কাকিমা বলতাম, খুব সুন্দরী ছিলেন, এখন অবশ্য ওঁকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। নেপুকাকার বড় মেয়ের নাম সরস্বতী, সে আমাদের কানুর সমান। বয়েসী, সেই সরস্বতী এরই মধ্যে বিধবা হয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে নেপুকাকার, ওখানেই থাকে।

মমতা বললেন, আমি আসছি রান্নাঘর থেকে।

প্রতাপ বললেন, আর একটু দাঁড়াও, বাকিটা শুনে যাও। তোমাকে কেন এই সব বলছি জানো? একটা ব্যাপার দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। নেপুকাকার সঙ্গে যখন কলোনির মধ্যে সেই বাড়িটাতে হাজির হলাম, তখন দেখি নতুন কাকিমা বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির এক মহিলার সঙ্গে ঝগড়া করছেন। কী খারাপ ভাষা যে বলছেন, তা তুমি কল্পনা করতে পারবে না। সেই আমাদের সুন্দরী নতুন কাকিমা, যার দিকে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম, তার এই দশা! নেপুকাকাও ঝগড়া থামাবার বদলে পাশের বাড়ির মহিলার দিকে তেড়ে গেলেন। আমার মনে হলো, এ কিসের মধ্যে এসে পড়লাম রে বাবা? এদিকে নেপুকাকা আমাকে ছাড়বেন না। যাই হোক, ঘণ্টাখানেক বসতেই হলো। টিনের চাল দিয়ে মোটামুটি দুখানা ঘরের একটা বাড়ি বানিয়েছেন। তার মধ্যে একগাদা লোক। নেপুকাকার ছোট ছেলেটি, বিয়ে করেছে, সে-ই সংসার চালায় এখন, সামান্য কী একটা চাকরি করে। সরস্বতীর বড় ছেলেটির বয়েস তেইশ, সে বেকার। আমাকে যে জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন নেপুকাকা, তার আসল উদ্দেশ্য ঐ সরস্বতীর ছেলেটার জন্য একটা চাকরি যোগাড় করে দেওয়া। ওদের ধারণা, আমি একজন হাকিম, আমার অনেক ক্ষমতা। চাকরি দেবার কোনো ক্ষমতাই যে আমার নেই, তা ওদের বোঝাই কী করে। নেপুকাকা আর সরস্বতী প্রায় আমার পা ধরে আর কি!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামান্য অন্যমনস্কভাবে প্রতাপ বললেন, সবচেয়ে আশ্চর্য কী লাগলো যেন, ওঁদের মনগুলো পর্যন্ত ছোট হয়ে গেছে। পুকুর ধারে মস্ত বড় বাড়ি ছিল নেপুকাকাদের, নেপুকাকা এক এক সময় ঐ অত বড় পুকুরের এক ধার থেকে বাজখাঁই গলায় ডাকতেন। আমাদের, আমরা এপার থেকে শুনতে পেতাম। সেই নেপুকাকা এখন ঘ্যানঘেনে সুরে কথা বলেন। এখন ঐ ছোট ছোট ঘুপচি ঘরের মধ্যে থাকে, তাই জগৎটাও ওদের কাছে ভীষণ ছোট, সব কথাই স্বার্থ দিয়ে জড়ানো। দেবে, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা যায়, কিন্তু মনটাও যদি ছোট হয়ে যায়, তাহলে আর মনুষ্যত্বও থাকে না। আত্মসম্মানজ্ঞানটা নষ্ট হয়ে গেলে মানুষের সবকিছুই চলে যায়।

মমতা ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, আমাদেরও মন ছোট হয়ে গেছে। আমরাও তো ছোট ছোট ঘুপচি ঘরে থাকি! রিফিউজি কলোনি না হলেও …

প্রতাপ অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তাঁর একটু অভিমান হলো। মমতা কি জানেন না যে, এই বাড়ি ভাড়াই তাঁর সাধ্যের অতিরিক্ত? তবু নেপুকাকাদের সঙ্গে তাঁর তুলনা চলে না।

মমতা বললেন, বাবলু যদি ফিরে আসে, তখন সে কোথায় থাকবে, তা কখনো ভেবে দেখেছো?

প্রতাপ বললেন, বাবলু? সে আসবে…চিঠি লিখেছে নাকি?

মমতা বললেন, তুমি কি চাও, তমার ছেলে আর না ফিরুক?

প্রতাপ বললেন, কী পাগলের মতন কথা বলছো? বাবলুর এখনও ফেরার সময় হয়েছে। নাকি? পি এইচ ডি কমপ্লিট না করে ফেরার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তা ছাড়া, পলিটিক্যাল সিচুয়েশান খানিকটা ইমপ্রুভ না করলে–বিমান বলেছে, সামনের ইলেকশানে যারাই পাওয়ারে আসুক, বন্দীমুক্তি আর পুরোনো কেস উইথ ড্র করার ব্যাপারে তাদের কিছু প্রতিশ্রুতি দিতেই হবে।

–টুনটুনিকে যে তুমি একেবারে পছন্দ করো না, সেটা কি খুব বড় মনের পরিচয়?

–টুনটুনি যা কাণ্ড করেছে, সে জন্য তাকে চাবকানো উচিত ছিল, তবু তো আমি সব সহ্য করেছি।

–তবু টুনটুনি তোমার নিজের বোনের মেয়ে। সে যদি একটা ভুল করেই থাকে, তবু কি তাকে একেবারে ফেলে দেওয়া যায়? তুমি টুনটুনি আর পরেশকে এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে। দেবার কথা বলো নি?

প্রতাপ অভিযোগ শোনা একেবারে পছন্দ করেন না। তাঁর ব্যবহারের কোনো দোষ দেখালে তিনি উত্তর দেবার বদলে রেগে যান। তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করছি, সংসার চালাতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে, আর ঐ মেয়ে এ বাড়িতে থেকে বেলেল্লা করবে? নিজের বোনের মেয়ে হলেও এসব সহ্য করবো না!

মমতা বললেন, আমারও মন ছোট হয়ে গেছে। ঠাকুরঝিকে তুমি বরানগরের বাড়ি থেকে আদর করে নিজের বাড়িতে ডেকে আনলে, তোমার নিজের দিদি, কিন্তু সত্যি কথা বলছি, এক এক সময় আমার মনে হয়, আমি কি সারা জীবন ধরে ঠাকুরঝির সেবা করে যাবো? ওর যখন অত বড় অসুখ হলো, তখন আমি এমনও ভেবেছি যে…

প্রতাপ ধমক দিয়ে বললেন, মমো! চুপ করো।

মমতা তবু বললেন, ঘুপচি ঘুপচি ঘরে থেকে আমাদেরও মন ছোট হয়ে গেছে। তোমার নেপুকাকার আর দোষ কী! নিজের দিদিকে তুমিও কি আজকাল সেই আগের মতন খাতির করো? দিনের পর দিন একটা কথাও তো বলো না ওঁর সঙ্গে।

প্রতাপ বললেন, তুমি খালি আমার দোষই দেখো!

মমতা বললেন, আমি নিজের দোষও অস্বীকার করছি না। সব সময় শুধু টাকার চিন্তা, এ আমার আর ভালো লাগে না! বাবলুটা কত কষ্ট করে ওখানে থাকে, তার মধ্যেই সে একবার তো টাকা পাঠিয়েছিল। তুমি তা ফেরত দিলে।

প্রতাপ বললেন, সে কষ্ট করে থাকে বলেই তার টাকা ফেরত দিয়েছি। টাকা রোজগার করতে গিয়ে তার পড়াশুনো নষ্ট করার দরকার নেই!

আর কথা না বাড়িয়ে প্রতাপ দপদপিয়ে চলে গেলেন স্নান করতে। মমতা টাকার খোঁচা দিলে প্রতাপের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়।

এক একদিন হঠাৎ একটা দারুণ অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়।

স্নান সেরে ফিরে এসেই প্রতাপ আদালতের নথিপত্র খুলে গুম হয়ে বসে রইলেন। মমতার সঙ্গে একটা কথা বললেন না। মমতাও অনবরত চোখের জল মুছছেন। এই পরিবারে আজ আর গুমোট কাটার সম্ভাবনা ছিল না।

কিন্তু সিনেমা দেখে ফেরার সময় টুনটুনি নিচের চিঠির বাক্স থেকে একটা চিঠি নিয়ে এলো। মুন্নি কলেজ থেকে ফেরার সময় রোজ বাক্সটা দেখে আসে, এই চিঠি তার পরে এসেছে।

বিদেশের চিঠি দেখেই মমতার বুকটা ধক করে উঠলো। আজ সারা দিন বাবলুর কথা মনে পড়েছে, ডান চোখের পাতা কেঁপেছে কয়েকবার, ঠিক বাবলুর চিঠি এসেছে সেই জন্য। বাবলু। কি ফিরে আসছে!

টুনটুনির কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে স্ট্যাম্প দেখে মুন্নি বললো, এটা অ্যামেরিকার চিঠি নয় মা, বিলেতের।

লম্বা থামে বেশ মোটাসোটা চিঠি, যদিও ওপরে প্রতাপের নাম আছে, তবু মুন্নি বাবাকে দেখাবার আগেই ছিঁড়ে ফেললো। এক খামের মধ্যে তুতুল প্রত্যেকের নামে আলাদা আলাদা চিঠি দেয়। খাম খোলার পর মুন্নি নিজের চিঠিটা নিতে গিয়ে সবিস্ময়ে বললো, এর মধ্যে একটা চেক।

সুপ্রীতি জপে বসেছেন একটু আগে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে উঠতে পারবেন না। তবু মুন্নি তাঁকে চিঠি আসার কথাটা শুনিয়ে বাবার ঘরে চলে এলো।

প্রতাপ চেকটা নিয়ে বললেন, তুতুল টাকা পাঠিয়েছে, দু শো পাউন্ড, এ যে অনেক টাকা!

মুন্নি বললো, মা, তোমার খুব ফ্রিজের শখ, এবার একটা ফ্রিজ কিনে ফেললো।

মমতা স্বামীর দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে বললেন, আমার মাথার দিব্যি রইলো, তুমি এ টাকা কিছুতেই ফেরত পাঠাতে পারবে না। তোমার যত অহঙ্কারের ফল ভোগ করতে হয়। আমাদের।

প্রতাপ গম্ভীরভাবে বললেন, এবারে তুতুল বুদ্ধি করে চেকটা তোমার নামে পাঠিয়েছে। তুতুলের আগের টাকা আমি ফেরত দিইনি, সে মুসলমান বিয়ে করেছে বলে দিদি সে টাকা নিতে চায়নি। এবার এ টাকা ফেরত দেবার অধিকার শুধু তোমার।

মমতা হাত বাড়িয়ে চেকটা নিয়ে ভালো করে দেখলেন। চেক নয়, ব্যাঙ্ক ড্রাফট, সেটা সত্যিই মমতার নামে, এবং সত্যিই দু শো পাউন্ড!

মমতা তাকালেন টুনটুনির দিকে। এমন একটা সুখবর ওর হাত দিয়ে এসেছে। টুনটুনির। জন্য হঠাৎ বেশ স্নেহবোধ করলেন মমতা। আহা, পোয়াতী মেয়েটাকে রোজ এখন একটু দুধ খাওয়ানো দরকার।

৫৩. প্রতাপের বাড়ি বেশ দূরে

প্রতাপের বাড়ি বেশ দূরে, তাই মামুন আদালতেই দেখা করতে এলেন। এই ক’মাসে বেশ রোগা হয়ে গেছেন মামুন, মাথার চুল আরও পেকেছে, প্রায় সমবয়স্ক হলেও প্রতাপের তুলনায় তাঁকে বেশি বয়স্ক দেখায়। প্রতাপ একটা মামলার রায় লিখছিলেন বলে মামুনকে কিছুক্ষণ বসতে হলো। কয়েকজন উকিলবাবু গল্প করতে লাগলেন তাঁর সঙ্গে, জয়বাংলার মানুষ সম্পর্কে সকলেরই খুব কৌতূহল। উকিলবাবুদের মধ্যে অনেকেরই বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে, পুরোনো কথা কার কতটা মনে আছে তা নিয়ে প্রায় একটা প্রতিযোগিতা চলে। যে-কোনো জায়গায় গেলেই মামুন দেখতে পান, পাঁচজনের মধ্যে অন্তত তিনজন এসেছেন পূর্ববঙ্গ থেকে। সাধে কী আর এখানকার কেউ কেউ এক এক সময় বলে ওঠে, ওফ, বাঙালরা কলকাতা শহরটা একেবারে দখল করে নিল!

খানিকবাদে দুই বন্ধু শিয়ালদা কোর্ট থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। বাতাসে একটু শীত শীত ভাব, মামুন কুতা-পাজামার ওপর শাল জড়িয়ে এসেছেন, প্রতাপ অবশ্য কোনো গরম জামা পরেননি।

মামুন বললেন, প্রতাপ, তোমার মনে আছে, এখানে নরেন কেবিন বলে একটা চায়ের দোকান ছিল, ছাত্র বয়েসে আমরা সেখানে ডিমের চপ খেতে যেতাম? বেশ বানাতো কিন্তু! সেই দোকানটা আছে এখনও?

প্রতাপ হেসে বললেন, কী জানি! ওদিকে তো আমার অনেকদিন যাওয়া হয় না।

মামুন বললেন, চলো না, আজ সেইখানে গিয়ে চা খাই! নাকি তুমি হাকিম বলে ওইসব জায়গায় তোমার যাওয়া চলে না? নিষেধ আছে?

প্রতাপ বললেন, না, না, নিষেধ আবার কী? রাস্তায় বেরুলে কে হাকিম আর কে আসামী তা কি চেনার উপায় আছে? আমার কথা বাদ দাও, আমি তো একটা চুনোপুঁটি, জেলায় থাকার সময় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটদের কত ক্ষমতা দেখেছি, কত তাদের তেজ আর দাপট, আবার তারাই যখন রাইটার্স বিল্ডিংসে ডেপুটি সেক্রেটারি বা জয়েন্ট সেক্রেটারি হয়ে আসে, তখন কলকাতার রাস্তায় তাদের কে পোঁছে? কলকাতা সবাইকে গ্রাস করে নেয়।

মামুন বললেন, তাইলে চলো না একবার নরেন কেবিনে যাই?

প্রতাপ বললেন, যাওয়া যেতে পারে। আমাকে একবার ওরা ছুরি মারার চেষ্টা করেছিল, আর বোধ হয় দ্বিতীয়বার মারবে না!

মামুন থমকে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলেন, ছুরি মারতে এসেছিল? কারা?

প্রতাপ বললেন, কারা সেটা বলা মুশকিল। নকশাল, না সি পি এম না কংগ্রেস! কে যে কখন কাকে ছুরি মারছে, তা কি বোঝার উপায় আছে? আমাকে সম্ভবত মারতে এসেছিল নকশালরাই, ওরা দু-একজন জজ-ম্যাজিস্ট্রেটকে খুন করেছে, অথচ আমার ছেলে ছিল ওই দলে। কচি কচি ছেলে, তাদের কারা যে এই সব উসকানি দেয়!

মামুন বললেন, তা হলে যেতে হবে না! তুমি এই কথাটা তো আমাকে আগে বলো নাই?

প্রতাপই এবার মামুনের হাত ধরে টেনে বললেন, চলো যাই, ইচ্ছে যখন হয়েছে, আরে ছাত্রদের ভয় পেলে কি চলে? তারা তো তোমার-আমার ঘরেরই ছেলেপুলে। তবে ইদানীং খুনোখুনি একটু কমেছে।

তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর পরেও সেই নরেন কেবিন অবিকল একই রকম আছে। বাঙালীরা ব্যবসায়ের উন্নতি বিশেষ পছন্দ করে না, কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে পারলেই হলো। একটা টেবিল-চেয়ারও বাড়েনি কিংবা কমেনি, শুধু দেওয়ালগুলি মলিন হয়েছে। কাউন্টারে একজন। মাঝবয়েসী লোক, সম্ভবত আগেকার মালিকের ছেলে। তার পেছনে ঝুলছে জবাফুলের মালা পরানো একটি কালীঠাকুরের ছবি।

মামুন ভেতরে ঢুকে চারপাশটা দেখলেন আবেগ মাখানো চোখে। এই সময়ে দোকানে। বিশেষ ভিড় নেই, দিনের বেলায় ছাত্ররা চলে গেছে, সন্ধের ছাত্ররা এখনো আসেনি, দুটো তিনটে টেবিলই ফাঁকা। মামুন একদিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ওই টেবিলটায় আমাদের আড্ডা ছিল, তাই না?

তারপর তিনি দোকানের মালিকের দিকে হাতজোড় করে বললেন, নমস্কার। জানেন, ছাত্র বয়েসে আমরা এখানে আসতাম, বহু বৎসর হয়ে গেল, সেকেণ্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের আগে!

মালিকটি প্রতি-নমস্কার করে বললো, জয়বাংলা থেকে এসেছেন? বসুন, বসুন, কী খাবেন?

মামুন বললেন, এগ চপ! একসময় এই নরেন কেবিনের এগ চপ ফেমাস ছিল। এখনও

মালিকটি বললো, অবশ্যই। ডিমের ডেভিল আছে, সেই সঙ্গে মটন ঘুগনি খেয়ে দেখুন। এখন খুব চলছে।

টেবিলে বসার পর মামুন প্রতাপকে জিজ্ঞেস করলেন, দেখেই কী করে বুঝলো আমি জয়বাংলার লোক?

প্রতাপ বললেন, তোমার উচ্চারণ শুনে বুঝেছে।

মামুন বললেন, আমি কলকাতায় এতদিন ছিলাম, ঘটিভাষা পারফেক্ট বলতে পারি।

প্রতাপ বললেন, তবু একটা টান থেকে যায়, বুঝলে! আমি তো টানা এত বছর ধরে আছি, তবু আমার কথা শুনেও অনেকে ধরে ফেলে। কিন্তু আমার ছেলেমেয়েদের উচ্চারণে সেই টান। নেই। এক জেনারেশনে উচ্চারণ চেইঞ্জ করা যায় না।

মামুন বাইরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রিপন কলেজের নাম এখন সুরেন্দ্রনাথ কলেজ হয়েছে? আর সেন্ট্রাল কলেজ এখন মৌলানা আজাদ? আর কী কী নাম বদল হয়েছে?

–হয়েছে অনেক কিছু। হ্যারিসন রোডের নাম এখন মহাত্মা গান্ধী রোড তা জানো তো!

–সেটা দেখেছি। এর মধ্যে দুই তিনদিন কলেজ স্ট্রিটে গেছিলাম। আচ্ছা প্রতাপ, আমাদের সাথে যারা পড়তো, লুতফর রহমান, বৈদ্যনাথ, সুবিমল এরা সব কোথায় আছে জানো?

–নাঃ, খবর রাখি না। সুবিমল সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের সারভিসে আছে, একবার ট্রেনে দেখা হয়েছিল। চাকরি নিয়ে প্রথমে বেশ কয়েক বছর তো আমাকে মফস্বলে পোস্টিং নিতে হয়েছিল, তাই সকলের সঙ্গে যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়।

প্রতাপ একটা সিগারেট ধরাতেই মামুন লোভীর মতন তাকালেন। ডাক্তারের নির্দেশে তাঁর সিগারেট খাওয়া একেবারে বন্ধ। কিন্তু আকাঙ্ক্ষাটা যায়নি। তিনি বলেই ফেললেন, একটা সিগারেট খাবো নাকি আজ? পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে এত–

প্রতাপ বললেন, না। ছেড়েছো যখন আর খেও না!

কলেজজীবনের টুকিটাকি গল্প করতে লাগলেন দু’জনে। অনেক স্মৃতি।

একসময় মামুন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, বুলার খবর কী? সে কোথায় থাকে?

প্রতাপ মামুনের চোখের দিকে কয়েক পলক চেয়ে থেকে হেসে বললেন, তোমার সেই ‘আশমানের প্রজাপতি’? এখনো মনে রেখেছে তার কথা? নাঃ, তার খবর কিছু জানি না!

–তোমার সাথে তার আর কখনো দেখা হয়নি?

–তা অবশ্য দেখা হয়েছিল। বেশ কয়েকবারই দেখা হয়েছে। তবে গত কয়েক বছর আর দেখা হয়নি। টালিগঞ্জের দিকে থাকে, এইটুকু জানি।

–একবার যাওয়া যায় না তার কাছে? ওর বাড়ির লোকজন কিছু কি মনে করবেন? বুলার স্বামী কী করেন?

–বুলার স্বামী এখানে থাকেন না। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই বহু বছর। বুলার জীবনটা সুখের হয়নি।

–ইস রে! এত ভালো মেয়ে ছিল, অপরূপ সুন্দর ছিল গানের গলা। আমি তো মনে। করতাম, বুলা একদিন পশ্চিমবাংলার নাম করা গায়িকা হবে। ওর ভালো নাম গায়ত্রী, তাও আমার মনে আছে। সত্যিকারের ট্যালেনটেড মেয়ে, তার জীবনটা এরকমভাবে নষ্ট হয়ে গেল? আমাদের বাঙালীঘরের মেয়েদের অনেক গুণ থাকলেও তারা ব্যবহার করতে পারে না। কেন এমন হলো, প্রতাপ? বুলার স্বামী এমন মেয়ের গুণের কদর করতে পারলো না?

প্রতাপ একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

মায়ের মৃত্যুর পরই দেওঘরের সঙ্গে সম্পর্ক চুকে গিয়েছিল প্রতাপের। বুলা দেওঘরেই থাকে, না টালিগঞ্জে থাকে, তা তিনি জানেন না। এক একবার টালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে বুলার সঙ্গে দেখা করবার বাসনা তাঁর মনে জাগে, আবার তা দমন করে ফেলেন। বুলার সম্পর্কে তাঁর যে টান, তাকে কি ভালোবাসা বলা যায়? না, তিনি তো বুলাকে সেভাবে কখনো চাননি। তবু বুলা সম্পর্কে তাঁর খানিকটা অপরাধবোধ, খানিকটা দুর্বলতা এবং খানিকটা অধিকারবোধও যেন রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য বন্ধন।

মামুন বললেন, প্রতাপ, তুমি বুলার বিয়ের খবর শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলে তাই না?

একটু হালকা সুরে প্রতাপ বললেন, বুলাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলে তুমি, কষ্ট পাবার কথা তো তোমার! আমি কষ্ট পাবো কেন? তার সঙ্গে সেরকম কোনো সম্পর্ক তো আমার ছিল না!

মামুনও হেসে বললেন, আরে, আমি তো শুধু কবিতাই লিখেছি। যেমন লোকে। নদী-সরোবর, বৃষ্টি-মেঘ-জ্যোৎস্না নিয়ে কবিতা লেখে, সেই রকমই প্রায়। আমি মুসলমানের ব্যাটা। সেই আমলে কোনো ব্রাহ্মণের মেয়েকে বিয়ে করার কথা কি স্বপ্নেও চিন্তা করা যেত? তা ছাড়া বুলার বেশি পছন্দ ছিল তোমাকেই, তুমি তাকে অনায়াসে বিয়ে করতে পারতে।

বুলা যে একসময় বেপরোয়া হয়েই নিজের মুখে প্রতাপকে প্রায় বিয়ের প্রস্তাব জানিয়েছিল, সে কথা মামুনকে বলা হয়নি। এতদিন পর আর বলারও কোনো মানে হয় না।

প্রতাপ বললেন, কেন, আমার বউ মমতাকে তোমার পছন্দ হয়নি? সে বুলার চেয়ে কোন অংশে কম?

মামুন লজ্জা পেয়ে বললেন, আরে না, না, ছি ছি, মমতা বউঠানের তো তুলনাই হয় না। এইরকমভাবে বলাটাই আমার বোকামি হয়েছে। ওইসব পুরোনো কথা তোলার আর কোনো মানে হয় না, তাই না? তবু বুলার অসুখী জীবনের কথা শুনে খারাপ লাগলো। আর একবার দেখতে ইচ্ছে করে তাকে।

–তুমি দেখা করতে পারো। তোমরা পাশাপাশি গ্রামের মানুষ, তোমাকে দেখলে সে নিশ্চয় খুশি হবে।

–চলো না। আমরা দুইজনে একবার যাই। প্রতাপ, আমরা দুইজনেই সমানভাবে বুলাকে ভালোবেসেছিলাম, সে কথা এখন অস্বীকার করে লাভ কী? কিন্তু আমাদের ভালোবাসা ছিল নিষ্কলুষ। সেইজন্যই আমাদের দুইজনের মধ্যে রেষারেষি কিংবা বিবাদ হয়নি।

দোকানের মালিক জয়বাংলার অতিথিকে খাতির দেখাবার জন্য নিজের হাতে খাবার নিয়ে এলো। আস্ত ডিম সেদ্ধ করে তার ওপর বিস্কুটের গুঁড়ো মাখিয়ে ভাজা, তারই নাম এগ চপ কিংবা ডিমের ডেভিল। সঙ্গে এক প্লেট করে কিমা মেশানো ঘুগনি।

মাঝখানে খাবার এসে পড়ায় বুলা প্রসঙ্গটা চাপা পড়ে গেল। একদল ছাত্র ঢুকলো হই হই করে। তারা আলোচনা করছে বাংলাদেশ বিষয়ে। তাদের কোলাহলে মামুন আর প্রতাপ চুপ। করে রইলেন একটুক্ষণ।

মুজিবনগরের বাংলাদেশ সরকারকে ইন্দিরা গান্ধী কেন স্বীকৃতি দিচ্ছে না, এই নিয়ে তর্ক বেঁধেছে দুই দল ছাত্রদের মধ্যে। ওরা কয়েকজন সম্প্রতি অনেকগুলি শরণার্থী শিবির দেখতে এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে গিয়েছিল বোঝা গেল। তিরানব্বই লাখ শরণার্থী এ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে ভারতে। ক্যাম্পগুলোতে কলেরায়, বন্যায়, অপুষ্টিতে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে শয়ে শয়ে, আর কতদিন এরা এইভাবে টিকে থাকতে পারবে? ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্টই বা কতকাল এদের। বোঝা বইবে? পৃথিবীর অন্য শক্তিগুলো মুখ ফিরিয়ে আছে। ইন্দিরা গান্ধীর উচিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া, বাংলাদেশ একটা আলাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা পেলে তখন ইণ্ডিয়া খোলাখুলি বাংলাদেশকে সামরিক সাহায্য দিতে পারবে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে। নাক গলানো হবে না। ভারতীয় সৈন্যদের সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানী সৈন্যদের দমন করা ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের আর কোনো গতি নেই।

ছাত্রদের অন্য দলটি বলছে, ভারতীয় সৈন্য কেন ইস্ট পাকিস্তানে ঢুকবে? সেটা অ্যাগ্রেশান। বাংলাদেশের যুবশক্তি মুক্তিযুদ্ধ চালাচ্ছে, তারা সেই গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাক। তাতে যত সময় লাগে লাগুক। মুক্তিযোদ্ধারাই দেশটাকে স্বাধীন করতে পারলে সেটাই হবে তাদের পক্ষে সবচেয়ে সম্মানজনক। সারা পৃথিবীর সামনে তারা গর্বিত মাথা তুলে দাঁড়াবে!

প্রতাপ নিচু গলায় বললেন, এইসব ছেলেরা একদিন চীন, মাও সে তুঙ, ভিয়েতনাম, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এই ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতো না। হঠাৎ যে বাড়ির পাশের আগুনের দিকে তাদের চোখ পড়েছে, এটাই আশ্চর্য কথা।

মামুন বললেন, এই যে ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাবার কথা বলছে, আমাদের জেনারেল ওসমানিরও সেই মত। তিনি ইণ্ডিয়ান আর্মির পারটিসিপেশন ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। এটা একটা সর্বনেশে কথা!

প্রতাপ বললেন, কেন? এ কথাটা তো আমার কানেও মন্দ ঠেকছে না। নিজেদের চেষ্টায় দেশ স্বাধীন করা তো অনেক বেশি অনারেবল!

মামুন বললেন, তোমরা একটা জিনিস বুঝতে পারছে না। অনিশ্চিতভাবে কতদিন এই মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? ততদিনে যে দেশটা একেবারে ছারখার হয়ে যাবে। আমাদের কাছে নিয়মিত খবর আসে, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আর্মির হাতে মারা যাচ্ছে। লুটপাট চলছে প্রচণ্ড। বাংলাদেশের সোনাদানা সব পাচার হয়ে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা যতই সাহসের পরিচয় দিক, গাদা বন্দুক আর হাতবোমা নিয়ে কি একটা। আধুনিক, অর্গানাইজড সেনাবাহিনীকে খতম করা যায়? মানুষ মারতে ওদের একটুও দ্বিধা নেই, প্রতাপ, কত পরিবার যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, তা তোমরা ঠিক বুঝবে না।

একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মামুন আবার বললেন, আরও একটা কথা আছে। আমরা মুখে বলি বটে, যে সাড়ে সাত কোটি বাঙালী স্বাধীন বাংলা চায়। কিন্তু আসলে তা তো সত্যি নয়! দেখো, ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন প্রায় বাতিল করে দিয়ে একটা উপ-নির্বাচন। ডাকলো। আমরা এখান থেকে ভেবেছিলাম বাংলাদেশের একটা মানুষও সেই উপ-নির্বাচনে। অংশ নেবে না, তারা সেই নির্বাচন বয়কট করবে। কিন্তু তা তো হলো না! শত শত হঠাৎ গজানো নেতা সেই উপ-নির্বাচনের ক্যাণ্ডিডেট হয়েছে। এইসব মানুষ কারা? আমি এক এক সময় ভাবি, বাংলাদেশ যদি স্বাধীন হয়, তখন এইসব বিশ্বাসঘাতক কী ভূমিকা নেবে? তারপর ধরো, রাজাকার, আল বদর, আল শামস, এইসব বাহিনীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, এরাও তো বাঙালী! পাক আর্মি এখন এদেরই বেশি করে লেলিয়ে দিচ্ছে মুক্তিবাহিনীর দিকে। শান্তি কমিটি, জামাতে ইসলামের লোকেরা বেছে বেছে খুন করছে শিক্ষিত বাঙালীদের। এইসব খবরই আমরা পাই আর শিউরে উঠি। বাঙালীর হাতেই মরছে বাঙালীরা। যাকে আমরা সোনার বাংলা বলি, তার চতুর্দিকে এখন শুধু গোরস্থান আর শ্মশান।

প্রতাপ বললেন, ওঃ, এত হত্যা আর অত্যাচারের কথা আর সহ্য করতে পারি না। এক এক সময় এই মানুষ জাতটার ওপরেই ঘেন্না ধরে যায়।

মামুন বললেন, আরও বিপদ আছে। এদেশে তিরানব্বই লাখ শরণার্থী এসেছে। ভারত সরকার যতদূর সম্ভব সাহায্য করার করছে, তা অস্বীকার করি না। সাধারণ মানুষও খুবই সহানুভূতি দেখাচ্ছে এ পর্যন্ত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কি এই সহানুভূতি ঠিক থাকতে পারে? পাকিস্তানী এজেন্ট আর কট্টর ইসলামপন্থী এদেশেও কম নেই। তারা যদি কোনোক্রমে। একটা দাঙ্গা বাধিয়ে দিতে পারে, তা হলে আমাদের কী অবস্থা হবে, চিন্তা করতে পারো? আমাদের নেতারা যারা এখনো পর্যন্ত সঙঘবদ্ধ হয়ে আছে মোটামুটি, তারাই বা কতদিন এরকম থাকতে পারবে? তোমাকে একটা ঘটনা বলি শোন। একদিন আমি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামরুজ্জামান সাহেবের আপিসঘরে বসেছিলাম। একসময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন মাঝারি গোছের নেতা এলেন দেখা করতে। তেনারা আবার জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। একথা সেকথার মধ্যে তাঁরা আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের নামে নিন্দামন্দ চালিয়ে যেতে লাগলেন। একজন তো হঠাৎ কামরুজ্জামান সাহেবকে তোল্লাই দেবার জন্য বলেই ফেললেন, আপনি অল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, আপনাকে বাদ দিয়ে তাজউদ্দিন সাহেব প্রধানমন্ত্রী হয়ে বসলেন কীভাবে? আমরা তো ভেবেছিলাম আপনিই…

দেখো প্রতাপ, কামরুজ্জামানকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি, তবু আমার বুকটা একটু কেঁপে উঠেছিল। অতিরিক্ত তোষামোদে পাথরও গলে যায়। বাঙালী পলিটিশিয়ানরা কোন ছার! কিন্তু কামরুজ্জামান উঠে দাঁড়িয়ে চক্ষু লাল করে বললেন, দেশ থেকে বাড়িঘর, বউ ছেলেমেয়ে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছেন, কিন্তু আপনারা চরিত্রটা ফেলে আসতে পারেননি? এখানেও আমাদের মধ্যে ঝগড়া লাগাতে এসেছেন? আগে অন্তত সবাই মিলেমিশে দেশটা স্বাধীন করুন, তারপর ফিরে গিয়ে যত ইচ্ছে দলাদলি করবেন!

ছাত্রদের চ্যাঁচামেচি তুঙ্গে উঠেছে, আর এখানে বসা যায় না। প্রতাপ উঠে পড়ে বিল মেটাতে গেলেন, দোকানের মালিক হাত জোড় করে বললেন, পয়সাটা থাক স্যার!

মামুন বললেন, আরে সে কি! পয়সা নেবেন না কেন?

মালিকটি বললো, আপনারা জয়বাংলা থেকে এসেছেন! আমার দোকানে খেয়েছেন, এতেই ধন্য হয়েছি। এই সামান্য পয়সা আর কী নেবো?

প্রতাপ বললেন, ইনি জয়বাংলার মানুষ, আমার সঙ্গে জয়বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এনাকে সঙ্গে করে এনেছি, আমি কেন বিনা পয়সায় খাবো? আপনার ইচ্ছে হলে টাকাটা বাংলাদেশ ফাণ্ডে চাঁদা দিয়ে দেবেন!

প্রায় জোর করেই দু’জনের খাবার ও চায়ের দাম কাউন্টারের ওপর রেখে প্রতাপ বেরিয়ে এলেন।

মামুন বললেন, যাই বলো, এইসব ব্যবহার বেশ টাচিং। সর্বত্রই এইরকম ভালো ব্যবহার পাই। আমাদের কারুর এখন ট্রেনের টিকিট কাটতে হয় না। সঙ্গে পরিচয়পত্র থাকলে ট্রামে বাসেও ভাড়া লাগে না।

প্রতাপ বললেন, একটা কথা তুমি ঠিকই বলেছে। এখন সাধারণ লোকে যে খাতির করছে, আর বেশিদিন থাকলে সেটা আর পাবে না।

মামুন বললেন, অতিথিদের পনেরো দিনের বেশি থাকার কথা নয়। আমাদের প্রায় আট মাসের ওপর হয়ে গেল! কবে যে দেশে ফিরতে পারবো তা জানি না! দাও প্রতাপ, আজ একটা অন্তত সিগারেট দাও! আজ মনটা খুব চঞ্চল লাগছে। হঠাৎ যেন ছাত্র বয়েসে ফিরে গেছিলাম।

ঝুলোঝুলি করে মামুন একটা সিগারেট আদায় করে ছাড়লেন। সেটাতে আরাম করে টান দিয়ে তিনি বললেন, প্রতাপ, তুমি নরেন কেবিনের মালিককে বললে, তুমি জয়বাংলার কেউ না। তুমি বাংলাদেশের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারো? বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তুমি মালখানগরে একবার যাবে না?

একটুও দ্বিধা না করে প্রতাপ বললেন, না!

–সে কি! মালখানগরে তোমাদের বাড়িটা আর একবার দেখতে ইচ্ছে করে না! বাংলাদেশ স্বাধীন হলে যাওয়া-আসার আর কোনো অসুবিধা থাকবে না আশা করি।

–অসুবিধে না থাকলেও হয়তো ঢাকায় যেতে পারি, বেড়াতে, কিন্তু মালখানগরে আর গিয়ে কী হবে বলো? সিক্সটি ফাইভের আগে তো ওদিক থেকে কিছু লোকজন যাওয়া আসা করতো। তাদের মুখে শুনেছি, আমাদের বসতবাড়ির দরজা-জানলাও কারা যেন খুলে নিয়ে গেছে। পুকুরের ওপারে আমাদের যে বাগানটা ছিল, সেটা নাকি একেবারে নিশ্চিহ্ন, সেখানে চাষ হয়। আমাদের বৈঠকখানা বাড়িটা পাকিস্তান সরকারের কী একটা অফিস হয়েছে। এইসব দেখার জন্য ফিরে যাবো? এর মধ্যে বাড়িটা যদি কেউ জবরদখল করে থাকে, সে আমাকে দেখে আঁতকে উঠবে না? কেউ কি সেখানে আমাকে আদর করে বসতে দেবে? না, মামুন, যা গেছে তা গেছে। আমাদের বাড়িটার যে সুন্দর ছবিখানা মনের মধ্যে গেঁথে আছে, সেটাই থাক। ফিরে গিয়ে শুধু কষ্ট পাবো। সেই ছবিটা নষ্ট করেই বা কী লাভ হবে!

মামুন চুপ করে রইলেন।

একসময় প্রতাপ মামুনকে পৌঁছে দিলেন পার্ক সাকাসের বাড়িতে। মঞ্জু হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান তুলছে, সেখানে রয়েছে পলাশ, বরুণ ও আরও তিন চারটি ছেলেমেয়ে। মামুনের মেয়ে হেনা বাড়িতে নেই, সে কয়েকদিনের জন্য গেছে ফাস্ট এইড ও নার্সিং-এর ট্রেইনিং নেবার জন্য। মহেন্দ্র রায় লেনে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে খোলা হয়েছে এই শিবির। বেগম সাজেদা চৌধুরী এবং আরও কয়েকজন পরিচালনা করছেন সেই শিবির। গৌরী আইয়ুবের সঙ্গে পরিচয় হবার পর তিনিই মামুনকে বলেছিলেন, আপনার মেয়েকেও এই ট্রেইনিং দিইয়ে রাখুন না। স্বাধীনতার জন্য মেয়েদেরও তো কিছু অংশ নিতে হবে!

প্রতাপ কিছুক্ষণ থেকে ছেলেমেয়েদের গানবাজনা শুনে বিদায় নিলেন।

মামুন কিন্তু বুলার কথা ভুললেন না। তিন চারদিন পর আবার একদিন প্রতাপের কাছে এসে বললেন, একবার কি তার বাসায় যাওয়া যায় না? আমরা শুধু দেখা করে দুটো কথা বলবো, তাতে দোষের কী আছে? তুমি তো ওদের বাসা চেনো!

প্রতাপ প্রথমে অন্য প্রসঙ্গ তুলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেন। টালিগঞ্জে বুলার শ্বশুরবাড়িতে প্রতাপ কখনো যাননি বটে, কিন্তু তাঁর ভতুমামার বাড়ির কাছেই সেই বাড়ি, তিনি দূর থেকে দেখেছেন। ভমামাদের বাড়িতেও প্রতাপের আর যেতে ইচ্ছে করে না।

মামুন অন্য কথায় ভুললেন না। হার্টের অসুখটা হবার পর থেকেই তিনি বড় বেশি স্মৃতি রোমন্থন শুরু করেছেন। বুলাকে তিনি মনে মনে তাঁর যৌবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময় নিবেদন করেছিলেন, এখন তিনি সেই বুলার কাছে আর একবার ফিরে যেতে চান। সে যেন যৌবনেই ক্ষণেকের জন্য ফিরে যাওয়া। বুলা যে এখন একজন প্রৌঢ়া মহিলা, তিনি জানেন, তিনি নিজেও তো প্রায় বৃদ্ধ, তিনি তো আর বুলার রূপদর্শন করতে চাইছেন না, বুলার সঙ্গে তিনি পুরোনো দিনের কথাই বলবেন।

প্রতাপকে শেষপর্যন্ত রাজি হতেই হলো। এসপ্লানেডে এসে তাঁরা টালিগঞ্জের ট্রাম ধরলেন। এ বছরের মতন গরম বিদায় নিয়েছে, বাতাস বেশ মোলায়েম রকমের ঠাণ্ডা। ময়দান দিয়ে ছুটছে ট্রাম, কোনো একটা ফুটবল ম্যাচের পর রাশি রাশি যুবক সেই ট্রামের সর্বত্র বাদুড়ের মতন ঝুলছে, তাদের আনন্দধ্বনি ও খিস্তিখেউড়ে কান পাতা যায় না, তবু মামুন তারই মধ্যে প্রতাপকে শোনাচ্ছেন বুলার বিয়ের দিনটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা।

প্রতাপ অবশ্য তা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন না। তাঁর মনে পড়ছে বুলার দেওর সত্যেনের কথা। দেওঘরের সেই সন্ধ্যা, সত্যেন সেদিন বুলাকে ছোট গিন্নি বলে সম্বোধন করেছিল, বুলার হাত ধরে জোর করে টেনে তাকে গান গাইতে বলেছিল। দেওর হিসেবে সে বউদির সঙ্গে কিঞ্চিৎ ঠাট্টা-ইয়ার্কি করতেই পারে, কিন্তু প্রতাপ কিছুতেই সেটা পছন্দ করতে পারেননি, তাঁর অহেতুক রাগ হচ্ছিল।

সত্যেন এখন বেশ নামী লোক, কাগজে প্রায়ই তার নাম বেরোয়, কিছুদিন আগে তার স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে। সে খবরও প্রতাপ কাগজে পড়েই জেনেছেন। নিজের পয়সায় সত্যেন স্ত্রীর ছবি সমেত বড় করে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। সত্যেনের যে-কোনো খবরই প্রতাপের চোখ টানে। প্রতাপের সবসময়ই মনে হয়, লোকটা সুবিধের নয়। বুলার স্বামী বেঁচে আছে কি না কে জানে, মোট কথা সে থেকেও নেই, বুলার ছেলে বিদেশে, তা হলে বুলা কি এখন পুরোপুরি সত্যেনের খপ্পরে পড়ে আছে? থাকলেই বা কী, প্রতাপ তো কোনো রকমেই বুলাকে সাহায্য করতে পারবেন না। এসব ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না।

টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে নেমে একটুক্ষণ হাঁটার পরেই প্রতাপ থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর মনে হলো, তিনি একটা বিষম ভুল করতে যাচ্ছেন।

তিনি বললেন, মামুন, একটা কথা বলি? বাড়িটা আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, তুমি একাই যাও।

মামুন বিরাট অবাক হয়ে বললেন, সে কি, এতদূর এসেও তুমি যাবে না কেন?

প্রতাপ বললেন, বাড়িতে কিছু বলে আসিনি, ফিরতে দেরি হলে ওরা চিন্তা করবে। তুমিই যাও বরং। বুলার শ্বশুরবাড়ির ওরা নারানগঞ্জের লোক, তোমাকে দেখে খুশিই হবে। ওর দেওর সত্যেনবাবু মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক কমিটির একজন হোমরাচোমড়া।

মামুন প্রতাপের হাত ধরে বললেন, আরে একদিন বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলে কী হয়? চলো, চলো, আমরা বেশিক্ষণ থাকবো না।

প্রতাপ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দৃঢ়ভাবে বললেন, না, আমি যাবো না। যে-কারণে প্রতাপ মালখানগরের নিজেদের বাড়িটা আর কখনো ফিরে গিয়ে দেখবেন না ঠিক করেছেন, সেই কারণেই বুলার কাছে তিনি আর জীবনে কখনো যেতে চান না।

৫৪. এ বছর এত বৃষ্টি

এ বছর এত বৃষ্টি যে শীতকালেও রেহাই নেই। বর্ষার বৃষ্টি মানুষের গা-সহা, কিন্তু শীতের বৃষ্টি ভিজতে অনেকেই ভয় পায়। রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা।

একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখেছে তপন, বস্তির মধ্যে এসে কৌশিককে বললো, চট করে তৈরি হয়ে নে, এক্ষুনি যেতে হবে!

কৌশিক খাঁটিয়ায় শুয়ে আছে, জ্বরটা তার ছাড়ছে না কিছুতেই। সে উদাসীন ভাবে বললো, আবার কোথায় যেতে হবে, আর পারছি না!

তপন বললো, এই জায়গাটা হট হয়ে গেছে। এখানে আর থাকা যাবে না। যে-কোনো সময় এই বস্তি রেইড হবে। তোর জন্য না, জুট মিলের দু’তিনজন ওয়াকার একজন ওয়ার্কস ম্যানেজারকে খুন করে অ্যাবসকন্ড করে আছে, পুলিশ একবার এই বস্তিতে ঢুকলে তাকে ঠিক চিনে ফেলবে। ওঠ, উঠে পড়, দেরি করা যাবে না।

কৌশিক বললো, কোথায় যাবো, ঠিক করেছিস?

তপনের মুখ-চোখ স্বাভাবিক নয়; ভয়, উত্তেজনা, আশঙ্কা অনেক কিছু মিশে আছে। তবু সে ফ্যাকাসে ভাবে হাসবার চেষ্টা করে বললো, পমপমের কাছে!

কথাটা কৌশিকের বিশ্বাস হলো না। পমপম সম্পর্কে তার মনে একটা গম্ভীর হতাশা জন্মে গেছে, তার মনে হয় পমপমের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না। পমপম তাকে ছেড়ে যাবে কিংবা পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করবে, তা হতে পারে না, পমপম সে ধাতুতে গড়া নয়। কিন্তু তপনের কথা শুনে বোঝা যায় না, পমপম আর বেঁচে আছে কিনা। কৌশিকের ধারণা, পমপমকে হয় আবার পুলিশ ধরেছে, তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মফস্বলের কোনো জেলে, অথবা পমপম আর পৃথিবীতে নেই। না হলে পমপম যে-কোনো উপায়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই!

কৌশিক ক্লান্ত ভাবে বললো, কোথায় পমপম? তপন মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে বললো, কালই তার খবর পেয়েছি, সে আছে উল্টোডাঙ্গার একটা বাড়িতে।

–সত্যি কথা বলছিস?

–আমি তোকে বাজে কথা বলবো?

একটা লুঙ্গির মধ্যে টুকিটাকি জিনিসগুলো নিয়ে বোঁচকা বেঁধে ফেললো তপন। অনেক বই রয়েছে, সেগুলো আর নেওয়া যাবে না। খাঁটিয়া ছেড়ে উঠে গায়ে একটা জামা গলিয়ে নিতে গেল কৌশিক। তপন তাকে বললো, তোর ঐ নোংরা পাজামাটা খুলে ফাল, প্যান্ট পরেন। রাস্তা দিয়ে একটু ভদ্র সেজে যেতে হবে।

মাত্র দিন পঁচিশেক থাকা হয়েছে এখানে, তবু যেন ঘরটার ওপর একটা মায়া পড়ে গেছে, কৌশিক চারদিক চোখ বুলিয়ে দেখলো। এখানে আর ফেরা হবে না। দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা আছে ক্রাচ দুটো। সে দিকে তাকিয়ে কৌশিক জিজ্ঞেস করলো, এগুলো কী করবো? আমার এখন একটা ক্রাচেই চলে যায়। এমনকি ক্রাচ ছাড়াও মোটামুটি হাঁটতে পারি।

তপন বললো, তাহলে ক্রাচ না নিলেই ভালো হয়। পুলিশের রিপোর্টে আছে, তোর পা। ভাঙা!

ঘর থেকে বেরিয়ে দু’জনে একটুখানি বৃষ্টি ভিজে এসে রিকশায় উঠলো। তপন। রিকশাওয়ালাকে বললো, সামনের পদাটা টাঙিয়ে দাও!

সন্ধে হয়েছে একটু আগে। বৃষ্টির জন্য ওদের সুবিধেই হয়েছে, কারুর নজর পড়বে না রিক্সার দিকে।

কৌশিক জিজ্ঞেস করলো, পমপমের খবর কে তোকে দিল?

তপন বললো, দিয়েছে একজন। তুই চিনবি না।

–উল্টোডাঙ্গায় কার বাড়িতে আছে? আমাদের চেনা কে আছে উল্টোডাঙ্গায়?

–পমপম আছে একজন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে!

–কী ব্যাপার বলতো, তপন, তুই ফামবল করছিস কেন? তুই আমাকে মিথ্যে কথা বলছিস না তো?

–আরে না, মিথ্যে কথা কেন বলবো!

–অন্যবার আমরা শেষ রাত্তিরে ডেরা ছেড়ে যাই। আজ তুই আমাকে এই সন্ধেবেলা বার করে আনলি যে!

–বললাম না, এই বস্তিতে আর থাকা যাবে না। যে-কোনো সময়…

–বস্তি রেইড হবে, সে খবর তোকে কে দিল? তুই আগে থেকে জানলি কী করে?

–বলছে, একজন, খুব রিলায়েবল সোর্স!

–হুঁ, সাধারণত এই ধরনের রিলায়েবল সোর্সগুলো পুলিশের ইনফর্মার হয়। আমাকে ধরিয়ে দিলে তুই হাজার দশের টাকা পেতে পারিস, তপন!

–তুই আমাকে এই কথা বললি?

–আমার আর দুনিয়ায় কারুকে বিশ্বাস হয় না।

–কৌশিক, তোর পায়ে ধরি, আজ আবার আমার সাথে ঝগড়া লাগাস না। এই তোর গা ছুঁয়ে বলছি, যদি এক বাপের ব্যাটা হয়ে থাকি, যদি মায়ের দুধ খেয়ে থাকি, তা হলে কোনোদিন তোর সাথে ট্রেচারি করবো না। আমি নিজে মরে যাবো, সেও ভি আচ্ছা…

–এসব লম্বা লম্বা কথা আমি শুনতে চাই না। পমপমের খবর তোকে কে দিয়েছে, সে কথা বল ঠিক করে।

–নিশীথদা বলেছে।

–নিশীথা মানে? কে নিশীথদা? কোনোদিন তো এই নাম শুনিনি। আমাদের দলে এই নামে কে আছে?

–নিশীথ মজুমদার, মানিকতলা পাড়ার।

–নিশীথ মজুমদার, মানে কংগ্রেসী? তার সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক?

–তুই ছোটবেলায় মানিকতলায় থাকতি, নিশীথদা তোকে চেনেন, পমপমকে চেনেন। তোদের স্নেহ করেন। সব মানুষকে কি পাটির লেবেল দিয়েই শুধু বিচার করতে হয়।

–আলবৎ তাই বিচার করতে হবে। যারা শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাস করে না, তারা সবাই আমার শত্রু।

–প্রথম থেকেই সবাইকে শত্রু বলে ধরে নিয়ে এই তো ফল হলো, আমরা এগোতেই পারলাম না। যাক, ঐসব কথা এখন থাক। নিশীথদা আমাদের হেলপ করছেন ব্যক্তিগত ভাবে । তুই আর পমপম দু’জনেই ছোটবেলা অতুল্য ঘোষের বাড়িতে দিলীপ-মেনির সঙ্গে খেলা করতে যেতিস, নিশীথদা সেই কথা বললেন। বললেন, ওরা তো আমার ছোট ভাই-বোনের মতন।

–আমি নিশীথদার কোনো সাহায্য চাই না। আমি তোরও কোনো সাহায্য চাই না। এক্ষুনি আমি রিকশা থেকে নামবো! আই ক্যান টেক কেয়ার অফ মাইসেলফ!

–পাগলামি করিস না, কৌশিক, তোর পায়ে ধরি। পমপমের সঙ্গে আগে তোর দেখা করা দরকার কি না বল! পমপমকে দেখার পর তোর যা ইচ্ছা করিস!

দুর্বল শরীরেও কৌশিক রাগে ফুসতে লাগলো, তপন জোর করে চেপে ধরে রইলো তার দু’হাত।

নৈহাটি স্টেশনেও আজ ভিড় কম। আজ কিসের যেন একটা সরকারি ছুটির দিন, অফিস ফেরত বাবুরা আজ অনুপস্থিত। এমনি হাঁটতে পারলেও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে কষ্ট হয়। কৌশিকের। তবু তপন তাকে ধরলো না।

একটা লোকাল ট্রেন থেমেই আছে প্লাটফর্মে। একটি কামরার সামনে দাঁড়িয়ে স্বল্প আলোয় একজন লোক কাগজ পড়ছে। তপন একবার তাকে চকিতে দেখে নিয়ে সেই কামরাতেই উঠলো। সেই লোকটি ট্রেন ছাড়ার আগের মুহূর্তে কাগজটা ভাঁজ করে লাফিয়ে উঠে পড়লো এবং দরজার কাছে একটা সাটে বসে চেয়ে রইলো বাইরের দিকে।

যে-কটি স্টেশনে ট্রেন থামলো, প্রত্যেকবার লোকটি নেমে দাঁড়ালো প্ল্যাটফর্মে।

তপন কৌশিককে কথা বলতে নিষেধ করেছে। কিন্তু কৌশিকেরও সন্দেহ হলো লোকটির হাব ভাব দেখে। তপন সেই লোকটির দিকে প্রায় এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কৌশিক একবার তপনকে কনুইয়ের খোঁচা মেরে জানতে চাইলো লোকটি সম্পর্কে। তপন মাথা নাড়লো দু’দিকে।

উল্টোডাঙ্গা স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম থেকে সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা নামতে হয়। কৌশিক রেলিং ধরে আস্তে আস্তে নামতে নামতে বারবার পেছন ফিরে তাকালো, সেই লোকটিকে দেখতে পেল না।

এখানেও বৃষ্টি পড়ছে, রিকশাও নেই। ওরা মুশকিলে পড়ে গেল।

তপন বললো, মিনিট পাঁচেক হাঁটতে হবে। পারবি?

কৌশিক বললো, পারবো। একটু সময় লাগবে। তুই আমার হাত ধরিস না, সামনে সামনে চল।

এই ঠাণ্ডার মধ্যেও তপনের মুখে ঘাম চকচক করছে। নিঃশ্বাস পড়ছে ঘনঘন। খানিকটা এগোবার পর সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, ট্রেনের সেই কাগজ-পড়া লোকটি খানিকটা দূরত্ব রেখে আসছে এদিকেই।

তপন একটা গলির মধ্যে বেঁকলো। গলির শেষ বাড়িটা একেবারে নতুন, দোতলা। একতলার ঘরগুলো অন্ধকার। দোতলার একটি ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু সব কটা জানালায় ভারী পর্দা টানা। গলির দু’পাশে আরও নতুন নতুন বাড়ি উঠছে, এখনো লোকজন বিশেষ আসেনি মনে হয়। খুব নির্জন।

গলিটার মাঝখানে এসে তপন হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, কৌশিক, আমি একটা রিস্ক নিয়েছি, নিতে বাধ্য হয়েছি। তেকে আগে থেকে বলিনি, তুই শেষ মুহূর্তে যদি বেঁকে বসিস, মানে, তোকে একটা মিথ্যে কথা বলেছি।

সঙ্গে সঙ্গে কৌশিকের মুখখানা বিকৃত হয়ে গেল। সে একটা ফাঁদে পড়া হিংস্র প্রাণীর মতন একবার সামনের বাড়িটা, একবার গলিটার মুখের দিকে দেখলো, গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রেনের সেই লোকটি।

কৌশিক বললো, শালা স্পাই! তোর দশ হাজার টাকার লোভ হয়েছে—

তপন কৌশিকের হাত চেপে ধরে বললো, শোন শোন, আগে কথাটা শোন—

কৌশিক হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে করতে বললো, তুই এক বাপের সন্তান, না বেজন্মা? খানকীর বাচ্চা! আমাকে ধরিয়ে দিবি? তুই বাঁচতে পারবি না, তোকে খতম করবোই! তুই পমপমের নাম করে টেনে এনে।

তপন বললো, কৌশিক, কৌশিক, শোন, এখানে পমপম নেই, কিন্তু…

কৌশিক বললো, পমপম নেই! আমাকেও মারবি ভেবেছিস! তোর মতন একটা নিমকহারামকে কুচি কুচি করে কাটবো।

নিজেকে ছাড়াতে না পেরে কৌশিক তপনের হাত কামড়ে ধরলো। তপন তবু মুঠি আলগা না করে বললো, এখানে তোর মা আছেন। একবার তোকে দেখা করতেই হবে।

কৌশিক মুখ তুলে বিমূঢ়ভাবে বললো, মা? শুয়োরের বাচ্চা, তুই এবার আমার মায়ের নাম বলে ভরকি দিচ্ছিস!

তপন বললো, মাসিমা সত্যিই এখানে আছেন। তুই মাসিমার সঙ্গে দেখা করবি না বলেছিলি, কিন্তু মাসিমা কেঁদে কেঁদে পাগলের মতন হয়ে গেছেন!

–আবার বাজে কথা?

–না, বাজে কথা নয়। নিশীথদা তোর মাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।

–তোকে বলেছি না, মায়ের সঙ্গে, আমার বাড়ির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।

-–কেন, মাসিমা কী দোষ করেছেন! মাসিমা বলেছেন, তোকে শুধু একবার দেখতে চান। উনি নিজের চোখে দেখলে বিশ্বাস করবেন যে তুই বেঁচে আছিস!

–আর, তোর মতন একটা ইডিয়েটকে নিয়ে…তুই আমার মাকেও বিপদে ফেলতে চাস? সেইজন্যই তো বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক রাখি না। পুলিশ আমার মাকে নিয়ে টানাটানি করবে। মারবে। অত্যাচার করবে! ও শুয়োরের বাচ্চারা সব পারে।

–এখানে কেউ টের পাবে না। গলির মোড়ের ঐ লোকটাকে ভয় নেই, ও আমাদের সাহায্য করতে এসেছে।

-–ও কে?

–বলছি তো, সাহায্য করতে এসেছে। কৌশিক, প্লীজ, বেশি সময় নেই। একবার চল, মাসিমার সামনে রাগারাগি করিস না! মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে যেতে হবে।

–না, আমি মায়ের সামনে যাবো না!

–এ কী রকম কথা, আমি বুঝতে পারছি না। তুই পমপমের সঙ্গে দেখা করতে চাস, আর নিজের মাকে দেখবি না একবার? এ আবার কিসের বিপ্লব?

–মাকে কী বলবো আমি? আমি কি মার কাছে ফিরে যেতে পারবো?

–কিছু বলতে হবে না। মাসিমা শুধু তোকে একবার দেখবেন!

বিমূঢ় কৌশিককে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে এলো তপন।

সদর দরজা খোলা, দোতলায় সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন নিশীথ মজুমদার। পাজামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা, তার ওপর একটা মুগার চাঁদর জড়ানো। মধ্যবয়েসী, বেশ সবল পুরুষ। তাঁর মুখের চাপা উদ্বেগের চিহ্ন মুছে ফেলে তিনি তপনকে জিজ্ঞেস করলেন, সব ঠিক আছে?

তপন বললো, হ্যাঁ, এ পর্যন্ত কোনো গণ্ডগোল হয় নি। নিশীথ মজুমদার কৌশিকের দাড়ি সমেত থুতনিটা ছুঁয়ে বললেন, এই সেই কৌশিক? চিনতে পারে কার সাধ্য। তোকে আমি ছ’সাত বছরের বাচ্চা দেখেছি, মনে আছে?

কৌশিক কোনো উত্তর দিল না।

নিশীথ মজুমদার বললেন, খুব হীরো হয়েছিস, জেলের পাঁচিল থেকে লাফ দিয়েছিলি! ওরে, ব্রিটিশ আমলে আমরাও একবার জেল ভেঙেছিলুম। পমপমের বাবা অশোকদা, উনিও তখন কংগ্রেস করতেন, অশোকদা ছিলেন আমাদের সঙ্গে।

তারপর তিনি কৌশিকের কাঁধে সস্নেহ হাত রেখে বললেন, চল, বৌদি বড় কান্নাকাটি করছেন।

আলো-জ্বলা রটির দরজা ঠেলে খুলে ফেলে নিশীথ মজুমদার বললেন, বৌদি এই নিন, আপনার ছেলে। এবার বিশ্বাস হলো তো!

একটা বেতের চেয়ারে বসে ছিলেন অলকা, ছুটে এসে কৌশিকের মাথাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে কুশু, কুশু বলে হু-হুঁ করে কাঁদতে লাগলেন।

কৌশিকের চোখ জ্বালা করছে কিন্তু কান্না আসছে না। তার কান্না শুকিয়ে গেছে। সে আস্তে আস্তে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো, মা, ভালো আছো তো? পিন্টু, সোমারা ভালো আছে?

অলকা আবার শুধু বললেন, কুশু!

কৌশিক শান্তভাবে বললো, মা, শুধু কাঁদলে তো চলবে না। বেশি সময় নেই।

অলকা চোখ মুছতে লাগলেন, কিন্তু তিনি হেঁচকি থামাতে পারছেন না। একটুক্ষণ কৌশিকের সারা গায়ে হাত বুলিয়ে, কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললেন, আমি নিশীথকে ধরেছিলুম, কোনোরকমে একবার দেখা করিয়ে দেবার জন্য “হ্যাঁরে, এভাবে কতদিন চলবে তুই কোথায় থাকিস এখন?

–কোনো ঠিক নেই, মা।

–তুই আমাদের হুগলির বাড়িতে গিয়ে থাক। ওখানে কেউ টের পাবে না।

–পুলিশ ঠিক তাড়া করে যাবে। মামাদের ওখানে থাকলে মামারাই বিপদে পড়বে।

–হলে তুই বিলেতে চলে যা। বাবলু গেছে, আরও অনেকেই তো গেছে শুনেছি।

–আগে যারা চলে গেছে, তারা গেছে। এখন যাওয়া যাবে না। তুমি ও জন্য কিছু ভেবো না। আমি ঠিক থাকবো।

নিশীথ মজুমদার ইচ্ছে করেই এসময় ঘরে থাকেন নি। তপনকে নিয়ে তিনি গল্প করছেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এই বারান্দা থেকে গলির মোড় পর্যন্ত দেখা যায়। একটু পরে তপন চঞ্চল হয়ে উঠে বললো, আর দেরি করা বোধহয় ঠিক হবে না!

নিশীথ মজুমদার সেই ঘরের দরজায় টক টক শব্দ করে বললেন, বৌদি, এবার ওকে ছেড়ে দিতে হবে।

কৌশিক বললো, মা, এবার যাই! তোমরা ভালো থেকো!

অলকা বললেন, আর একটু দাঁড়া!

আসলে দাঁড়াতেই অসুবিধে হচ্ছে কৌশিকের, পায়ে ব্যথা করছে, শরীরটা অসম্ভব দুর্বল লাগছে হঠাৎ। কিন্তু অলকা দাঁড়িয়ে আছেন বলে সে বসতেও পারেনি এতক্ষণ। মায়ের সামনে। কোনোরকম অসুস্থতা সে দেখাতে চায় না।

অলকা হ্যান্ডব্যাগ খুলে একড়া একশো টাকার নোট বার করে বললেন, এগুলো তোর কাছে রাখ।

নোট গুলোর দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করলো কৌশিক। তারপর দু’খানা একশো টাকার নোট তুলে নিলো।

অলকা বললেন, এই সবগুলোই রাখ তোর কাছে। তোর জন্য এনেছি, কুশু!

কৌশিক বললো, না, এতেই হবে।

অলকা তবু দু’তিনবার জোর করতে থাকলে কৌশিক দৃঢ়ভাবে বললো, মা, আমরা যে কাজ করতে নেমেছি, তাতে লোভ করতে নেই। বেশি টাকাও সঙ্গে রাখতে নেই। বলছি তো, এতেই চলে যাবে এখন। মা, যাই?

চোখের জল মুছে অলকা ব্যাগ থেকে দু’খানা ইনল্যান্ড চিঠি বার করে বললেন, এই দ্যাখ, পমপম আমাকে লিখেছে। তুই ওকেও কোনো খবর দিস না?

চিঠি দু’খানা প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে নিল কৌশিক। দ্রুত চোখ বোলালো। দুটো চিঠিই বেশ সংক্ষিপ্ত। বহরমপুরের এক নার্সিং হোমের ঠিকানা। পমপম অসুস্থ হয়ে সেখানে আছে, কৌশিকের সন্ধান হারিয়ে ফেলেছে বলে অলকার কাছ থেকে কৌশিকের ঠিকানা জানতে চায়। চিঠির হাতের লেখা পমপমের নয়, কিন্তু তলার সইটা আঁকাবাঁকা হলেও পমপমেরই।

চিঠি দু’খানা পকেটে ভরে নিয়ে কৌশিক এই প্রথম নিজে থেকে জড়িয়ে ধরলো মাকে। এতক্ষণে তার চোখে জল এসেছে, সে বাষ্পজড়ানো গলায় বললো, আমার জন্য চিন্তা করো না, মা, আমি ঠিক থাকবো। শরীরের যত্ন নিও!

ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই কৌশিক বললো, আমি এক্ষুনি বহরমপুর যাবো!

নিশীথ মজুমদার বললেন, চলো, আমি তোমাদের গলির মোড় পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি। বৌদির জন্য ভাবিস না, কুশু, বৌদিকে পুলিশ ডিসটার্ব করবে না। তোর বাবা এক সময় আমাদের কত সাহায্য করেছেন!

গলির মোড়ে এখন একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনের সেই লোকটি আড়ালে কোথাও ছিল, এখন এগিয়ে এসে ট্যাক্সির দরজা খুলে দিয়ে তপনকে বললো, হাওড়া স্টেশানে কিংবা শিয়ালদায় যাইস না। নৈহাটিতেও যাইস না।

সে নিজে উঠলো না, ট্যাক্সির গায়ে দু’বার চাপড় মারতেই ড্রাইভার ছেড়ে দিল। কৌশিকের শরীর অস্থির অস্থির করছে। তার অসুস্থ শরীরে এতখানি আবেগ সহ্য হয়নি। এই রকম সময়ে গোটা কতক অ্যাসপ্রো-জাতীয় ট্যাবলেট খেলে তার উপকার হয়। তপনের কাছ থেকে পোঁটলাটা নিয়ে খুলে সে ট্যাবলেট বার করলো, কিন্তু একটু জল না হলে খাবে কী

সে ঝুঁকে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলো, আপনার কাছে জলের বোতল আছে?

তপন বললো, নিশীথদার ওখানে জলের কথা বললি না? নিশীথদা কিছু খাবারের ব্যবস্থা করবেন বলেছিলেন, আমি বারণ করলাম।

ড্রাইভারটি বললো, রাস্তার ধারে কোনো টিউবওয়েল দেখলে থামাবো? আমার কাছে তো ডিসটিল্ড ওয়াটার আছে, ব্যাটারিতে দেবার জন্য।

কৌশিক বললো, ঐ ডিসটিলড ওয়াটারই দিন, একটু খানি, এক ঢোঁক।

ওষুধ খাবার পর মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে কৌশিক বললো, ঐ যে লোকটা, ট্রেনে আমাদের ফলো করছিল, শেষে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিল, ও কে রে? নিশীথদার লোক!

তপন আড়ষ্টগলায় বললো, তোকে আগে ওঁর কথা জানাইনি, তুই রেগে যেতিস। আমাদের অনেক সাহায্য করেছে।

–কোন পার্টির লোক, সেটা বল আগে।

–কোনো পার্টির না, উনি পুলিশ। স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক, আমার চেনা।

–তুই বুঝি আজকাল পুলিশের সঙ্গেও মাখামাখি শুরু করেছিস?

–কৌশিক, তোকে আগে একদিন বলেছিলাম। তোর মনে নেই। ওনার বাড়ি ইস্টবেঙ্গলে, আমাদেরই সরাইল গ্রামে। কথায় কথায় আমাদের সাথে একটা আত্মীয়তাও বেরিয়ে গেল। তাই উনি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতন সাহায্য করছেন। নিজের ডিপার্টমেন্টের কারুকে না। জানিয়ে, রিস্ক নিয়ে। অন্য পুলিশ আমাদের ফলো করছে কি না, সেটা উনিই ভালো বুঝতে পারবেন। এনার জন্যই কোনো বিপদ হয় নি।

কৌশিক ক্লান্ত ভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চোখ বুজে রইলো খানিকক্ষণ।

তারপর আস্তে আস্তে বললো, একটা সিগারেট দিবি? ধরিয়ে দে, আমার বড়ড শরীরটা খারাপ লাগছে। ট্যাক্সি নিয়ে কতদূর যাবো? ও, এই নে, মা দিয়েছে।

একশো টাকার নোট দুটো সে বাড়িয়ে দিল তপনের দিকে।

তপন বললো, আমি নিয়ে কী করবো। তোর কাছে রাখ।

হাত বাড়িয়ে তপনের কাঁধ ছুঁয়ে কৌশিক বললো, তুই আমার ওপর রাগ করেছিস? আমি তোকে খুব খারাপ খারাপ গালাগাল দিয়েছি। আগে কোনোদিন আমি এসব গালাগাল উচ্চারণও করতুম না। মাথাটা কী যে হয়ে যায় মাঝে মাঝে।

তপন শুকনো ভাবে বললো, গালাগালটা কিছু না। রাগের মাথায় লোকে খারাপ কথা বলতে পারে। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো, আমাদের মধ্যে অবিশ্বাস এসে যাচ্ছে। তুই আমাকে যখন তখন সন্দেহ করিস। যদি আমরা নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাস করতে না পারি, তা হলে

আর কী বাকি রইলো।

–আমি ক্ষমা চাইছি, তপন।

–ক্ষমা চাইবার কিছু নেই। তুই তাহলে মনে করি যে আমি তাকে সত্যিই ধরিয়ে দিতে পারি?

–মানুষ যা একেবারেই বিশ্বাস করে না, সে রকম কথাও এক এক সময় মুখ দিয়ে বলে ফেলে। দিনের পর দিন একা থাকলে বোধহয় এরকম হয়। আমি আর একা থাকতে পারছি না! কবে আবার কাজ শুরু করবো?

–আজ রাতে তোকে কোথায় রাখবো, সেইটাই ভাবছি।

–আমি আজ রাত্তিরেই বহরমপুর যাবো। যে কোনো উপায়ে।

–ভবেনদা হাওড়া আর শিয়ালদায় যেতে বারণ করলো। নিশ্চয়ই কিছু বিপদ আছে। তাহলে বহরমপুর যাওয়া যাবে কী করে? সন্ধের পর কি অতদূর বাস যায়?

-–শিয়ালদার বদলে দমদম থেকে ট্রেনে উঠবো। রাত্তিরটা ট্রেনেই কেটে যাবে। কাল সকালে–

–বহরমপুর ডেঞ্জারাস জায়গা এখন। আমি বরং ভাবছিলাম, বসিরহাট কিংবা বনগাঁয় জয় বাংলার বারে গেলে কেমন হয়? কোনো রিফিউজি ক্যাম্পে ঢুকে গেলে পুলিশ সন্দেহ করবে না।

–আমাকে বহরমপুরে যেতেই হবে! তুই পমপমের খবর সত্যিই জানতিস না? পমপম নিজের হাতে চিঠি পর্যন্ত লিখতে পারে না।

বহরমপুরে নেমে সরাসরি নার্সিং হোমে না গিয়ে তপন বাস স্ট্যান্ডের কাছে খুব শস্তার এক হোটেলে একখানা ঘর ভাড়া নিল। কৌশিক সারাদিন শুয়ে রইলো সেখানে। ট্রেনে ছারপোকার কামড়ে তার সারা শরীর ফুলে গেছে প্রায়। পেটে আবার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। বুলেটটা যেন মাঝেমাঝে পেটের মধ্যে নড়াচড়া করে, সে টের পায়।

নার্সিং হোমটা একবার ঘুরে দেখে এলো তপন। সেখানে পমপম সেনগুপ্ত নামে কোনো পেসেন্ট নেই, অবশ্য পমপম অন্য নাম নিতেই পারে। এত জায়গা থাকতে পমপম বহরমপুরের এক নার্সিং হোমে কেন আসবে, তা বোঝা যাচ্ছে না।

রাত সাড়ে আটটার পর পেটের ব্যথাটা একটু কমলে কৌশিক ছোট ছেলের মন বায়না ধরলো, সে নিজে একবার নার্সিং হোমে গিয়ে দেখে আসবে। পমপম নিশ্চয়ই সেখানে আছে। এই সময় যে বাইবের কোনো লোককে নার্সিং হোমে ঢুকতেই দেওয়া হয় না, সে কথা সে। কিছুতেই শুনবে না।

তখন কৌশিকের একটা কথা মনে পড়লো। এক সময় এই বহরমপুরের জেলেই তাকে থাকতে হয়েছিল কয়েক মাস। সেই সময় অলি একবার দেখতে এসেছিল তাকে। তখন নকশালদের সঙ্গে কেউ কোনোরকম সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে চায় না, তবু অলি এসেছিল, সাহস করে। সে এনেছিল পমপমের খবর, অতীনের খবর। পরে পমপমের কাছে কৌশিক শুনেছিল যে বহরমপুরে অলির এক মামা থাকেন, তিনি ডাক্তার, তিনি নকশালদের কিছু কিছু সাহায্য করেন। কী যেন অলির সেই ডাক্তার মামার নাম? শক্তি না শান্তি? শক্তি মজুমদার? শান্তি মজুমদার, এই দুটোর একটা হবেই!

এবারে তপনকে বেরুতেই হলো কৌশিককে নিয়ে। বহরমপুর শহরটা এক বছর আগেও যতটা ভয়ের জায়গা ছিল, এখন আর ততটা নেই। সীমান্ত বেশি দূরে নয়, এখানেও জয় বাংলার প্রচুর লোক গিসগিস করছে। এখানে ট্রেনিং ক্যাম্প হয়েছে দুটো, রাস্তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যখন তখন দল বেঁধে যাতায়াত করে। পুলিশী ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল।

নার্সিং হোমটা কাছেই, গেটের বাইরেই প্রধান ডাক্তারের নাম লেখা, শান্তিময় মজুমদার।

কৌশিকের যেন চোখ জ্বলে উঠলো। প্রবল মনঃসংযোগে সে স্মৃতি থেকে এই নামটা উদ্ধার করেছে। পমপম একবারই মাত্র নামটা উল্লেখ করেছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে অলির সঙ্গে চেনাশুনোর সূত্রেই পমপম এখানে এসেছে।

কৌশিক বললো, দিস ইজ ইট! পমপম এখানে থাকতে বাধ্য। শোন, তপন, ডাক্তারটি যদি এখন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে না চায়, তাহলে একদিনের জন্য আমি এখানে ভর্তি হয়ে যাবো। বলবি, আমি গুরুতর অসুস্থ। তোর কাছে তো এখনো শ দেড়েক টাকা আছে?

ভেতরের কাউন্টারে একটি লোক ঘাড় নীচু করে কী যেন লিখে চলেছে। কৌশিক তার সামনে গিয়ে বললো, দেখুন ডক্টর মজুমদারের সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।

লোকটি মুখ না তুলেই বললো, এখন তো দেখা হবে না। কাল সকালে ন’টার পর আসবেন।

কৌশিক বললো, আমার পেটে সাঙ্ঘাতিক ব্যথা হচ্ছে, নিশ্বাস ফেলতে পারছি না। কোনো ডাক্তার অ্যাটেন্ড না করলে মরে যাবো। আমাকে ভর্তি করে নিন।

লোকটি বললো, একটাও তো বেড় খালি নেই ভাই। হাসপাতালে চলে যান!

কৌশিক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বড় করে দম নিল। কোমরের কাছে হাত বুলোলো একবার। এখন সে তার রিভলভারটার অভাব খুব বোধ করছে। এই লোকটার কপালে রিভলভারের নলটা ঠেকালেই কাজ হয়ে যেত। অস্ত্র নেই, গায়ের জোর নেই, এমনকি গলার জোরও এমন কমে গেছে যে কৌশিক ওকে ধমকেও ভয় দেখাতে পারবে না।

সে একবার তপনের দিকে তাকালো। এইসব ব্যাপারে তপন খুব সুবিধে করতে পারে না। তার চেহারা বা কথা শুনলে কেউ সমীহ করে না।

কৌশিক খুবই বিনীত ভাবে বললো, দয়া করে একবার মুখ তুলে আমার কথাটা শুনবেন? আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। ভবানীপুরের বিমানবিহারী চৌধুরীর মেয়ে অলি চৌধুরী আমাদের পাঠিয়েছেন। তিনি ডক্টর মজুমদারের ভাগ্নী হন। ডক্টর মজুমদার নাম শুনলেই চিনতে পারবেন। আপনি অনুগ্রহ করে তাঁকে একবার খবর দিন যে অলির কাছ থেকে কৌশিক রায় নামে একজন এসেছে। বিশেষ দরকার। বুঝতেই পারছেন, খুব দরকার না থাকলে এই সময় ডিসটার্ব করতুম না।

লোকটি এবার কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে এসে পাশের একটা ছোট্ট ঘর দেখিয়ে বললো, এখানে বসুন। আপনাদের ভাগ্য ভালো, ডাক্তারবাবুর আর ঠিক পাঁচ মিনিট বাদে ডি এম-এর বাংলোয় তাস খেলতে যাবার কথা।

একটু বাদে সেই ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন অলির ছোট মামা। সাদা প্যান্টশার্টের ওপর একটা শাদা পুলওভার পরা। তিনি দু’জনের ওপর চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের মধ্যে কৌশিক রায় কে?

কৌশিক আগেই উঠে দাঁড়িয়েছে। খানিকটা নাভাস ভাবে বললো, আমি!

ঠোঁটে বিদ্রূপ ও কৌতুক মেশানো একটা হাসির ঝিলিক দিয়ে শান্তিময় বললেন, এতদিনে বাবু কৌশিক রায়ের আসবার সময় হলো? আমরা দু’মাস ধরে আপনার প্রতীক্ষায় বসে আছি। প্রায় শবরীর প্রতীক্ষার মতন।

কৌশিক ঠিক বুঝতে না পেরে বললো, আমার জন্য?

শান্তিময় বললেন, ইয়েস! পুলিশ আপনার জন্য এখানে ফাঁদ পেতে রেখেছে। আপনি এলেই খপ করে ধরবে। দরজার দিকে তাকাচ্ছেন কী, এখান থেকে পালানো সহজ?

কৌশিক শান্তিময়ের চোখে চোখ রেখে বললো, আমাদের যারা ধরিয়ে দেয়, তাদের। কিছুতেই আমরা ক্ষমা করি না। আমাদের কেউ না কেউ এসে ঠিক প্রতিশোধ নিয়ে যাবে।

ডাক্তার অনুচ্চ শব্দে হাসলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, হুঁ, এখনও খানিকটা তেজ অবশিষ্ট আছে দেখছি! অত উত্তেজিত হবার কিছু নেই, আমার এই নার্সিং হোমের প্রেমিসেসের মধ্যে আজ অবধি আমি পুলিশ ঢুকতে দিই নি। একটা কথা জিজ্ঞেস করি, অলি চলে গেছে অ্যামেরিকায়। সে তোমাদের এখানে পাঠালো কী করে?

কৌশিক বললো, অলি পাঠায় নি। অলির নামটা নিতে হলো, না হলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছিল না। আপনাকে বেশিক্ষণ আটকাবো না। আমি শুধু একটাই কথা জানতে চাই। পমপম সেনগুপ্ত, অলির খুব বন্ধু। সে কি এখানে আছে?

শান্তিময় বললেন, পমপমের আর এক বন্ধু কৌশিক রায় কেন পমপমকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটা জানতে পারি কী?

সাঙ্ঘাতিক বিমর্ষভাবে কৌশিক বললো, কী হয়েছে পমপমের!

–এসো আমার সঙ্গে!

পুরোনো আমলের বাড়ি, ওপরে ওঠার সিঁড়িটা বিরাট লম্বা। সেই সিঁড়ির মুখে এসে কৌশিক একটু থমকে গেল।

তপন মৃদু গলায় বললো, তুই আমার কাঁধে ভর দে। আমি ধরে ধরে তুলছি।

শান্তিময় মুখ ফিরিয়ে কৌশিককে ভালো করে দেখলেন। তারপর তপনকে বললেন, তুমি ভাই বাঁ দিকটা ধরো, আমি এই দিক ধরছি। সেই ভাবে উঠতে পারবে, স্ট্রেচার আনবো?

কৌশিক বললো, এই ঠিক আছে। আমার সিঁড়ি ভাঙতে একটু কষ্ট হয়।

শান্তিময় বললেন, একটু? তোমার গায়ে বেশ জ্বর, মুখের চামড়া দেখলেই বোঝা যায় দারুণ অ্যানিমিয়া, তোমার শরীরের আর আছে কী? তোমার সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি, তোমার দু’পা ভেঙেছিল, কাঁধে আর পেটে গুলি ঢুকেছে।

তপন বললো, পেটের মধ্যে এখনো গুলিটা রয়েছে।

শান্তিময় বললেন, পেটের মধ্যে গুলি নিয়েও অনেকে বহুদিন বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু এই অ্যানিমিয়াটা খুব ভয়ের। পমপম যে এখানে আছে, সে খবর বুঝি তোমরা আগে পাওনি?

কৌশিক বললো, মাত্র আজই পেয়েছি। এর আগে আমার বন্ধু তপন ওকে তন্নতন্ন করে খুঁজেছে। কোনো ট্রেস পায় নি।

শান্তিময় বললেন, পমপমের বাবা ওকে কলকাতার একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন কিন্তু পমপম বাবার পয়সায় চিকিৎসা করাবে না বলে বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে দুম করে চলে এসেছিল এখানে। তাও এসেছিল নিতান্তই মনের জোরে, তখন ওর একা একা চলাফেরা করার ক্ষমতাই ছিল না। আসবার সময় তোমাদের নামে বাড়িতে একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছিল, তোমরা সেটা পাওনি?

তপন বললো, আমি তিন-চারবার পমপমদের বাড়িতে গেছি, ওর বাবার সঙ্গেও দেখা করেছি, চিঠি তো দেওয়া হয়ইনি, কোনো খবরও দেননি পমপম সম্পর্কে।

–উনি জানেন যে পমপম এখানে আছে। উনি দু’বার এসে দেখেও গেছেন। এদিকে মুশকিল হয়েছে কি, তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে পমপম অসম্ভব ডিপ্রেশনে ভুগছে। তার ধারণা হয়েছে, আমি ফ্র্যাংকলি বলছি,, কৌশিক রায় সম্ভবত বেঁচে নেই, আর তার বন্ধু তপন সব সম্পর্ক ত্যাগ করেছে! এই ডিপ্রেশানের ফল কী জানো? কৌশিক রায় বেঁচে নেই, এই কথা চিন্তা করতে করতে পমপমের নিজের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গেছে। যে পেসেন্ট নিজে বাঁচতে চায় না। তাকে ডাক্তাররা কতদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে?

তপন আর শান্তিময় প্রায় বহন করেই কৌশিককে নিয়ে এলেন তিন তলায়। তারপর দু’জনেই হাঁপাতে লাগলেন।

সিঁড়ির মুখের কোলাপসিবল গেট টেনে বন্ধ করে দিয়ে শান্তিময় বললেন, ওপর তলাটায় আমরা নিজেরা থাকি। আর পমপম থাকে। আরও একটা গেস্ট রুম আছে, সেখানে আজ তোমরা দু’জনে থাকবে।

পমপম একটা লোহার খাটে শুয়ে আছে। গভীর ভাবে ঘুমন্ত। তার চেহারাটা শুকিয়ে এত ছোট হয়ে গেছে যে তাকে চেনাই যায় না। তার শিয়রের কাছে এসে দাঁড়ালো ওরা তিনজন। শান্তিময় পমপমের কপালটা ছুঁয়ে বললেন, হেভি সিডেটিভ দিয়ে ওকে ঘুম পাড়াতে হয়। নইলে পেটের ব্যথায় চিৎকার করতে থাকে। অনেক চেষ্টা করেও ঐ ব্যথাটা কমানো যাচ্ছে না। আমার ধারণা, ওটা সাইকোসোমাটিক। তবে, লালবাজারে যে পুলিশ অফিসারটি পমপমের শরীরের প্রাইভেট পার্টসেও টচার করেছে, আমারই এক এক সময় ইচ্ছে করে, তাকে গুলি করে মেরে আসি। তোমরা এত কনস্টেবল মারো, তাকে কিছু করতে পারলে না?

কৌশিক চোয়াল শক্ত করে বললো, তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না!

সেখান থেকে জানলার কাছে সরে গিয়ে শান্তিময় বললেন, কৌশিক রায়, এ কী ধরনের বিপ্লব তোমাদের? যুদ্ধে যারা আহত হবে, তাদের জন্য একটা চিকিৎসক স্কোয়াড তৈরি করার কথা আগে ভাবো নি? পুলিশের তাড়া খেয়ে যারা আত্মগোপন করবে, তারা যে কোথায় শেলটার নেবে, খবর কী করে যোগাড় হবে, সে সম্পর্কে প্ল্যান নেওয়া উচিত ছিল না? লোকের কাছ থেকে বন্দুক কাড়ছো, বুলেট কোথা থেকে পাবে, তা ভেবেছো?

হঠাৎ থেমে গিয়ে শান্তিময় বললেন, যাক, তোমরা আমার কাছে এসে পড়েছে বলেই আমি তোমাদের ওপর উপদেশ ঝাড়তে চাই না। আমার এই এক দোষ হয়েছে ইদানীং। বেশি বকবক করা। তবু একটা কথা বলবোই। কৌশিক, তপন, তোমাদের বাঁচতে হবে। বেঁচে না থাকলে কিসের বিপ্লব, কিসের দেশোদ্ধার, কিসের গরিবের উন্নতি। অকারণে প্রাণ দিলে এর কোনোটাই হয় না। হ্যাঁ, মানছি, বড় একটা কাজের জন্য, মহৎ একটা উদ্দেশ্যর জন্য মানুষ অনেক সময় প্রাণ দিতে দ্বিধা করে না, কিন্তু তাতে সেই মহৎ উদ্দেশ্যটা যাতে একটুখানি সফল হয়, কিংবা অন্যরা প্রেরণা পায়, সেটাও তো দেখতে হবে? শুধু শুধু ব্যর্থ মৃত্যু, এত চমৎকার সব প্রাণ, এগুলো নষ্ট হতে দেখলে আমি সহ্য করতে পারি না। বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে, বেঁচে থেকে উদ্দেশ্য সফল করতে হবে। এই যে তোমাদের নেতা মানিক ভটচাজ, তাকে দেখতে গিয়েছিলুম, কী সামান্য ভাবে, মিনিংলেস ভাবে তার মৃত্যু হলো বলো তো!

কৌশিক বললো, আপনি মানিকদাকে দেখেছেন?

–দেখেছি বলতে পারো, আবার দেখিনিও বটে। একটা ডেড বডি দেখা মানে সেই লোকটিকে তো দেখা নয়। আমাকে ডেকে নিয়ে গেল এত দেরি করে, ততক্ষণে সব শেষ। পরে অলির কাছে, পমপমের কাছে শুনেছি তোমাদের নেতা ঐ মানিকবাবুর কথা, এমন একটা মহৎ মানুষ প্রাণ দিলেন সামান্য পাটি রাইভালরির জন্য? এতে দেশের কী উপকারটা হলো শুনি, বাঁচতে না শিখলে, জীবনটাকে ভালোবাসতে না শিখলে কি পৃথিবীটাকে ভালোবাসা–

কৌশিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, এই মানিকদাকে রক্ষা করার জন্য অতীন একজনকে মারতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর খুনের অপবাদ নিয়ে দেশান্তরী হয়েছে। তার পরেও পাটির ছেলেরা মানিকদাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলো না!

একটু পরে ঘরে আর একজন মহিলা ঢুকলেন। শান্তিময় পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এই মামার স্ত্রী রীতা। অলির খুব ফেভারিট মামামা। আর রীতা, এই শ্ৰীমান হচ্ছে সেই ফেমাস কৌশিক রায়, যার নাম আমরা রোজ জপ করছি।

রীতা রাগ রাগ মুখ করে বললেন, আপনারা এতদিন পর এলেন? ভয় পেয়ে পালিয়ে ছিলেন? পমপম আপনার জন্য কী কষ্ট পেয়েছে তা শুধু আমরাই জানি।

কৌশিক কাতর ভাবে হাসলো। তারা যে কী অবস্থায় এই দু’মাস কাটিয়েছে, সে কাহিনী এদের শুনিয়ে লাভ নেই।

তারপর দু’দিন কেটে গেল সেখানে। তপন চলে যেতে চাইলেও শান্তিময় তাকেও ছাড়লেন না। তপনের যে ইতিমধ্যে টি বি হয়ে বসে আছে, তা সে নিজেই জানতো না। কৌশিকের জন্য সে নিজের দিকে মনোযোগ দেবার সময়ই পায়নি।

তৃতীয় দিনে শান্তিময় একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দিলেন। তিনি এই নার্সিং হোমের মধ্যেই কৌশিক আর পমপমের বিয়ে দিতে চান।

তিনি পমপমের বিছানার পাশে কৌশিককে দাঁড় করিয়ে বললেন, দেখো, তোমরা দুটি আহত, দুঃখী মানুষ। তোমরা আর কতদিন বাঁচবে সে গ্যারান্টি আমি দিতে পারি না। তবু, তোমরা যদি মনের দিক থেকে পরস্পরের খুব কাছাকাছি থাকো, আপাতত বিপ্লব-টিপ্লব ভুলে শুধু দু’জনে দু’জনের ওপর নির্ভর করো, তাহলে তোমাদের শরীর-স্বাস্থ্যের উন্নতি হলেও হতে পারে। এই আমার ধারণা, যদি কোনোদিন পুরো সুস্থ হয়ে ওঠো, তাহলে আবার আদর্শ নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে না হয়। আপাতত আমি এখানেই আর একটা খাট এনে দিচ্ছি, তোমরা রাত্তিরেও পাশাপাশি থাকবে।

রীতা আর তপন দু’জনেই খুব উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করলো এ প্রস্তাব।

পমপম হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বললো না, চুপ করে চেয়ে রইলো। কৌশিক ক্ষীণ আপত্তি জানিয়ে বললো, এক ঘরে পাশাপাশি খাটে থাকতে পারি, আমার সেটাই ইচ্ছে, কিন্তু তার জন্য কি বিয়ে করার দরকার আছে?

শান্তিময় বললেন, আমি বিয়ের শাস্ত্রীয় কিংবা মরাল দিকটার কথা বলছি না। দুটি সুস্থ যুবক-যুবতী স্বেচ্ছায় লিভিং টুগেদার করলেও আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু তোমরা যেহেতু অসুস্থ, দুর্বল, সেইজন্যই এই সামাজিক বন্ধনটায় তোমাদের ক্ষেত্রে টোটকার কাজ করতে পারে। কেন, বিয়েতে তোমার আপত্তিই বা কিসের?

পরদিনই শান্তিময় ডেকে আনলেন একজন ম্যারেজ রেজিস্ট্রার। তাঁর খাতায় এক মাস আগের ডেট দিয়ে নোটিস বসানো হলো। তারপর তিনি পমপম আর কৌশিকের আইনসিদ্ধ বিয়ের পুরোহিত হয়ে বসলেন দুটি লোহার খাটের মাঝখানের চেয়ারে।

পমপম নীচে নামতে পারে না, তার নিম্নাঙ্গে ক্যাথিটার লাগানো, রীতা একখানা নতুন শাড়ি পরিয়ে তাকে বসিয়ে দিয়েছেন। পেটের ব্যথা যাতে না বাড়ে, সেই জন্য পমপমকে সারাদিন সলিড ফুড কিছু না দিয়ে শুধু গ্লুকোজ খাওয়ানো হয়েছে। পমপমের আজ জ্ঞান আছে পুরোপুরি, সে এমনকি একবার রসিকতা করে বললো, কৌশিকের দাড়িটা কামিয়ে দিলে না? এমন ঝোঁপ-জঙ্গলের মতন দাড়িওয়ালা বর আমি আগে দেখিনি!

কৌশিকও বললো, আহা, ক্যাথিটার লাগানো নববধূই বা পৃথিবীতে কে আগে দেখেছে?

এ বিয়েতে কোনো মন্ত্র নেই। আইনের শুকনো কথাগুলো উচ্চারণ করার পর রেজিস্ট্রার মহোদয় নিজস্ব একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন, আপনাদের বিবাহ দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ হোক।

তপন বেরিয়ে গিয়ে কোথা থেকে যোগাড় করে এনেছে এক রাশ নানা ধরনের ফুল। সেইগুলো সে ছড়িয়ে দিল কৌশিক আর পমপমের লোহার খাটে।

বিয়ে হলো, আর ফুলশয্যা হবে না?

৫৫. আবিদ হোসেনের ঘরে

আবিদ হোসেনের ঘরে আজ অতীন আর সোমেনের নেমন্তন্ন। আবিদের বাবা আর মা চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে, কলকাতায় কিছুদিন থেকে সদ্য এদেশে এসে পৌঁছেছেন। আবিদের দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে। অবশ্য তার ছোট দুই ভাই যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, তাদের জন্য উদ্বেগ থেকে যাবেই।

আবিদের মা রান্না করে খাওয়াবেন, ওদের কাছে কলকাতার নতুন খবর শোনা যাবে, সুতরাং সন্ধ্যার নিমন্ত্রণটি বেশ আকর্ষণীয়ই মনে হয়েছিল অতীনের। কিন্তু একটা মুশকিল হলো এই যে আবিদ বাড়িওয়ালা সত্যদা এবং তাঁর স্ত্রী মার্থাকেও নেমন্তন্ন করে গুবলেট পাকিয়েছে। সত্যদা অত্যন্ত ফল, নিজের বাড়িতে ভাড়াটের কাছে বাংলা খাবার খেতেও তিনি আসবেন সুট ও বো পরে, তিনি ধোঁয়ার গন্ধ সহ্য করতে পারেন না বলে তাঁর সামনে সিগারেট টানা চলবে না। তিনি উপস্থিত থাকলে কেউ সোফায় পা মুড়ে বসতেও সাহস পায় না। মার্থা থাকার জন্য আর একটা ঝামেলা। মার্থা এমনিতে বেশ হাসিখুশি ভালো মহিলা, কিন্তু তার সামনে বাংলায় কথা বলা অভদ্রতা। কিন্তু বাকি সবাই বাঙালী, সকলেই মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী, কলকাতার গল্প শুনতে আগ্রহী, কিন্তু সে সব বলতে হবে ইংরিজিতে, এ কী অত্যাচার!

নিউ ইয়র্কে এবং কেমব্রিজেও বিভিন্ন বাঙালী বাড়ির সান্ধ্য আসরে অতীন লক্ষ করেছে, কেউ যদি মেম বউ নিয়ে আসে, তাহলে অন্যরা বিরক্ত হয়। রাস্তায়-ঘাটে, দোকানে, অফিসে বা কলেজে সর্বক্ষণই তো ইংরিজি বলতে বলতে ঠোঁট ব্যথা হয়ে যায়, উইক এন্ডের নেমন্তন্নগুলো তো বাংলায় প্রাণ খুলে আড্ডা দেবার জন্যই। যারা মেম বিয়ে করে, তারা কি এটা বোঝে না? কোনো একটা বাংলা রসিকতা ইংরিজিতে অনুবাদ করতে প্রাণ বেরিয়ে যায়। আসলে, যে মেম বিয়ে করেছে সেও আসে ভাত-মাছের ঝোল খাবার লোভে। নিজের বাড়িতে ঐ রান্না বিশেষ হয় না। কিন্তু অন্যের বাড়ির নেমন্তন্নে বউকে বাড়িতে ফেলে আসাও যায় না, সেটা সাঙ্ঘাতিক অভদ্রতা!

সোমেন তো আবিদকে বলেই ফেলেছিল যে, সত্যদা আর মাথাকে নেমন্তন্ন করার দরকার নেই! কিন্তু বাড়িওলাকে খাতির না করলে চলে না। আবিদের আরও বেশি খাতির করার কারণ, সত্যদা কোনো ভাড়াটের ঘরেই একজনের বেশি দু-জনকে থাকতে দিতে রাজি নন। ভাড়াটেরা তাদের গার্ল ফ্রেন্ডদের ঘরে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তাদের নিয়ে রাত্রিবাস করা চলবে না। এই নিয়মরক্ষার ব্যাপারে সত্যদা এবং মাথা দু-জনেই খুব কঠোর। এখন আবিদের বাবা-মা ছেলের ঘরেই এসে উঠেছেন। এতেও সত্যদার আপত্তি। তিনি আবিদকে বলেছিলেন, বাবা-মাকে কোনো মোটেলে রাখো। এখানে অন্য সবাই ছাত্র, পড়াশুনো করে, আর তুমি বাবা-মাকে নিয়ে সংসার পেতে বসবে, তা তো ঠিক নয়! কিন্তু আবিদের বাবা-মা বিপদে পড়ে এখানে এসেছেন, তাঁদের কাছে ফরেন এক্সচেঞ্জ বিশেষ নেই, হোটেল-মোটেলে কতদিন থাকবেন? তা ছাড়া আবিদের মা ছেলেকে ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে একেবারেই রাজি নন।

আবিদ রীতিমতন কাকুতি-মিনতি করে সত্যদার কাছ থেকে সম্মতি আদায় করেছে।

আবিদের মা ইংরিজি জানেন না, এই যা রক্ষা। ইংরিজি না জানলেও ইংরিজিতে কথা বলতে হবে, এ রকম কোনো বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে না, সেই সুযোগ নিয়ে সোমেন তাঁর সঙ্গে সাড়ম্বরে বাংলায় গল্প চালিয়ে যেতে লাগলো। সে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো, মাসিমা, কী কী রাধছেন, আগে থিকা কইয়া দ্যান তো! আলু-পটলের ডালনা? আপনেরা পটল লইয়া আসছেন শুনছি। কতদিন যে পটল খাই নাই। আর পাঁচফোঁড়ন দেওয়া ডাইল।

কথা বলতে বলতে সে একবার অতীনের দিকে চোখ টিপে বললো, এই সব কথা ইংরিজিতে অনুবাদ করতে গেলে প্রাণটি বেরিয়ে যেত ভাই!

সুতরাং অতীনকেই মার্থার সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব নিতে হলো।

মার্থা জিজ্ঞেস করলো, বাবলু, ইজ নট মিলি কামিংত?

স্ত্রী না হলেও স্টেডি গার্ল ফ্রেন্ডদের নেমন্তন্ন করার প্রথা আছে এদেশে। আবিদ হোসেন অবশ্য শর্মিলাকে বলেনি, একখানা ঘরের মধ্যে কতজনকে আর ডাকা যায়! তাছাড়া, জাস্টিস আবু সয়ীদ চৌধুরী এবং আরও দু’জনের আসার কথা আছে, এরা বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা। বোঝাবার জন্য পৃথিবীর বহু দেশে ঘুরছেন, নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জেও ভাষণ দিয়েছেন।

শর্মিলার অবশ্য আজ এমনিতেই অতীনের কাছে আসবার কথা আছে। সে এসে পড়লে পার্টিতে যোগ দেবে, কোনো অসুবিধে নেই।

অতীন বললো, শী ইজ সাপোজড টু কাম। শী সেইড শী উড বী আ বিট লেইট!

মার্থা বললো, বড় সুমিষ্ট স্বভাবের মেয়েটি। ওকে আমি খুব পছন্দ করি। আচ্ছা বাবলু, ঐ আবিডের মতন তুমিও কি ইস্ট পাকিস্ট্যানের, আই মিন, এখন যাকে ব্যাংলাডে বলা হচ্ছে, সেখানকার মানুষ?

অতীন একটু দ্বিধা করে বললো, না!

তার বাবার বাড়ি পূর্ববঙ্গে ছিল, বাবার জন্ম সেখানে, কিন্তু অতীন তো পূর্ববঙ্গে জন্মায় নি। সেখানকার কোনো স্মৃতিও তার নেই।

মার্থা জিজ্ঞেস করলো, তা হলে আবিদের দেশের সঙ্গে তোমার দেশের সম্পর্কটা ঠিক কী? ইস্ট জামানি-ওয়েস্ট জার্মানির মতন?

অতীন বললো, না, ঠিক তাও নয়। বলা শক্ত!

সত্যিই তো শক্ত! সম্পর্কটা আসলে কী? পশ্চিম জার্মানি এখনো মনে করে, দেশবিভাগটা আসলে অবাস্তব। পূর্ব জামানি আবার ফিরে আসবে, জার্মান জাতি এক হবে। পশ্চিম বাংলায় কি কেউ এ রকম মনে করে? না, দেশবিভাগটাই এখন কঠোর বাস্তব। পূর্ব জার্মানি কোনোদিনই আর ক্যাপিটালিস্ট জামানির সঙ্গে যোগ দেবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পশ্চিম বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে? পাকিস্তানী আমলের সব বিধিনিষেধ উঠে যাবে?

অতীন খানিকটা ভাসা ভাসা ভাবে বললো, আমাদের দু’দিকের ল্যাঙ্গোয়েজ অ্যান্ড কালচারের অনেক মিল আছে, বিশেষত ল্যাঙ্গোয়েজের মিলটাই খুব বড় একটা টান, তাই না?

মার্থা মাথা নেড়ে বললো, না, আমি তা মনে করি না!

মার্থা অবশ্য তার বক্তব্য ব্যাখ্যা করলো না। সে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ফেললো। এইটাই মার্থার একটা বৈশিষ্ট্য, সে এক বিষয়ে বেশিক্ষণ কথা বলে না। সে হঠাৎ হেসে বললো, তুমি একটা লাল রঙের ফোর্ড গাড়ি কিনেছো? আমাদের কিছু বলোনি?

অতীন একটু শঙ্কিত হলো। হাসি মুখে বললেও এটা কি মাথার অভিযোগ?

মাত্র দিন সাতেক আগে গাড়িটা কিনেছে অতীন। সোমেনের বান্ধবী লিন্ডা ইসকনের সদস্যা হয়ে চলে গেছে লস এঞ্জেলিস, যাওয়ার আগে সে, তার গাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে গেছে একেবারে জলের দামে। সোমেনের পীড়াপীড়িতেই অতীন সেটা কিনে নিয়েছে তিনশো ডলারে, সে পুরো টাকাটাও অতীনের কাছে ছিল না, সোমেন ধার দিয়েছে।

এ দেশে সবাই রাত্তিরবেলা বাড়ির সামনের রাস্তায় গাড়ি ফেলে রাখে। কিন্তু অতীন প্রথম তিন দিন অতি সাবধানতায় গাড়িটাকে ঢুকিয়ে রেখেছিল গেটের মধ্যে। সত্যদা একদিন আপত্তি করেছিলেন, ভোরবেলা তাঁর নিজের গাড়ি বার করতে অসুবিধে হয়।

অতীন বললো, গাড়িটা তো আমি এখন বাইরেই রাখছি!

তার বাহুতে একটা চাপড় মেড়ে মার্থা বললো, সে কথা বলছি না। গাড়ি বাইরে রাখবে না। কি বেডরুমে রাখবে। কিন্তু তোমার গাড়িতে একদিনও আমাকে চড়ালে না তো! একদিন তোমার গাড়িতে আমি শপিং করতে যাবো।

অতীন বললো, অবশ্যই, অবশ্যই!

মার্থার সঙ্গে কথা বলতে হলেও অতীন কান খাড়া করে অন্যদের কথা শুনছে। আবিদের বাবা এবং মা দু’জনেই খুব প্রশংসা করছেন কলকাতার। কলকাতার মানুষেরা খুব সজ্জন, কলকাতার ট্রামবাস ভালো, কলকাতায় নানা রকম খাবার পাওয়া যায়, কলকাতায় সিনেমায় নাইট শো দেখে সবাই হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরে। কোনো ভয় করে না।

অতীনের কেমন যেন সন্দেহ হতে লাগলো। কলকাতার গুণগান আজকাল শোনাই যায়ত না। তাছাড়া, সত্যিই তো কলকাতার ট্রামবাস মোটেই ভালো নয়, সব রকম খাবার দূরের কথা, মাঝে মাঝে চালই পাওয়া যায় না। তবু আবিদের বাবা-মা এত প্রশংসা করছেন, দেশত্যাগী হয়ে তাঁরা বাধ্য হয়ে কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে।

সত্যদা নিজের স্ত্রীকে অতীনের কাছে গছিয়ে দিয়ে এখন ওদের সঙ্গে দিব্যি বাংলায় গল্পে মেতে উঠেছেন। তাঁর মতন একজন সাহেব মানুষেরও যে কলকাতা সম্পর্কে এত আগ্রহ, তা আগে বোঝা যায়নি।

সত্যদা বললেন, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, বুঝলেন, এখনো মরা হাতি লাখ টাকা! ইন্ডিয়ার অন্য ইউনিভার্সিটির তুলনায় এখনো এদেশে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ডিগ্রির বেশি দাম দেয়।

অতীন জানে, একথাটাও সত্যি নয়। সত্যদা যখন এদেশে প্রথম আসেন, তখন হয়তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সুনাম অক্ষুণ্ণ ছিল, এখন অতীন এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশে কারুর কাছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখ্যাতি শোনেনি। বরং তার ডিপার্টমেন্টের একজন। অধ্যাপক কিছুদিন বসু বিজ্ঞান মন্দিরে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তিনি ফিরে এসে বলেছেন, তোমাদের কলকাতায় কেউ তো গবেষণা বা সিরিয়াস পড়াশুনোর কাজকর্ম করে না। সবাই পলিটিক্স করে। হায়, তারা যদি পলিটিক্সটাও ভালো বুঝতো!

আবিদের বাবা সাঈফ সাহেব বললেন, আরে মশায়, আমিও তো ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট। ফটিতে বি-এ পাস করছি। বেকবাগানের একটা বাড়িতে থাকতাম, সেই বাড়িখান এখনো একই রকম আছে। আমার ওয়াইফরে দেখাইতে নিয়া গ্যালাম একদিন।

আবিদের মা নাসিম বেগম বললেন, আমার সব থিকা ভালো লাগছে, কলকাতার দোকান বাজারে গ্যালেই জয় বাংলার মানুষ শোনোনেই সবাই কত খাতির করে, কোল্ড ড্রিংকস আইন্যা দেয়, দাম কমায়, কেমন আপন আপন ভাব। অথচ পাকিস্তানী আমলে ভাবতাম, ইন্ডিয়ার সকলেই বুঝি আমাগো শত্তুর!

অতীন অনেকক্ষণ চুপ করে আছে দেখে মাথা একটু গলা চড়িয়ে সকলের উদ্দেশে জিজ্ঞেস করলো, আমি একটা কথা জানতে চাই। এখন প্রায়ই খবরের কাগজে আর টেলিভিশনে ইস্ট পাকিস্ট্যানের নানান রকম খবর থাকে। এডোয়ার্ড কেনেডি গিয়ে দেখে এসেছে যে সত্যিই কয়েক মিলিয়ান রেফিউজি সেখান থেকে ইন্ডিয়া চলে এসেছে। এখন তোমরা কি মনে করো, ইন্ডিয়া যদি প্যাকিস্ট্যানের সঙ্গে যুদ্ধ লাগায়, সেটাই একমাত্র সলিউশান!

সাঈফ সাহেব এবং সোমেন একসঙ্গে বলে উঠলো, অফ কোর্স! যুদ্ধ ছাড়া এই বর্বরতাকে আর কিছুতেই দমন করা যাবে না।

আবিদ নিজে চার-পাঁচ মাস আগে পর্যন্ত ছিল প্রবল পাকিস্তানের সমর্থক, এখন তার মতামত সম্পূর্ণ উল্টে গেছে, সে জোর দিয়ে বললো, শুধু ইন্ডিয়া কেন, ওয়ার্ল্ডের সব পাওয়ারেরই উচিত পাকিস্তানকে একটা উচিত শিক্ষা দেওয়া। যাতে ওরা আর কোনদিনই আর্মি দিয়ে সিভিলিয়ানদের ওপর অত্যাচার করতে না পারে।

মার্থা খুব সরলভাবে বললো, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে এদেশে কত প্রতিবাদ আর মিছিল হয়। আমাদের ইয়াং জেনারেশন যুদ্ধ চায় না। শান্তি চায়। আর তোমরা তোমাদের দুই গরিব দেশে যুদ্ধ লাগাতে চাইছ? তোমরা ওয়ার মংগার?

এবার অতীন পর্যন্ত বলে উঠলো, তোমার এই তুলনাটা অত্যন্ত বোকার মতন হলো, মার্থা! ভিয়েতনামে যেটা চলছে, সেটা একটা ইমমরাল ওয়ার। তোমরা অ্যামেরিকানরা চোদ্দ-পনেরো হাজার মাইল উড়ে গিয়ে নর্থ ভিয়েতনামে বোমা ফেলছো, নাপাম গ্যাস দিয়ে তোক মারছো! আর ইস্ট পাকিস্তানে চলছে একটা বেঁচে থাকার লড়াই, প্রতিরোধ না করলে লোকরা মরতেই থাকবে!

মার্থা বললো, সব যুদ্ধই ইমমরাল। আমি কোনো যুদ্ধই সমর্থন করি না। আমি এখনো মনে করি, যুদ্ধের বদলে আলোচনার টেবিলেই এই সমস্যার সমাধান করা উচিত!

তারপর শুরু হয়ে গেল তর্ক!

নাসিম বেগম ইংরিজি না বুঝলেও এটা জানেন যে অ্যামেরিকান সরকার এখনও পাকিস্তানের সামরিক শাসকদেরই সমর্থক। তাঁর চোখে সব অ্যামেরিকানই এক। তিনি মার্থাকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের মাসতুতো বোন ধরে নিয়ে এমনই চটে গেলেন তার ওপরে যে তাকে তিনি খাবার পরিবেশনই করতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, আবিদ, তুই ঐ ম্যামডারে প্লেট দে। আমি দিমু না!

আবিদের অন্য অতিথিরা শেষ পর্যন্ত এলো না, শর্মিলা ন’টার পর অতীনকে খুঁজতে এসে এখানে যোগ দিল।

নাসিম বেগম এতক্ষণ পর একটি বাংলা বলা মেয়েকে পেয়ে খুব আদর করতে লাগলেন। বাঙালী মহিলাদের স্বভাবই এই, অচেনা কারুকে পছন্দ হলে অমনি তার সঙ্গে চেনাশুনো কারুর মুখের মিল পেয়ে যায়। নাসিম বেগমও শর্মিলাকে দেখেই বললেন, যে তাকে নাকি দেখতে অবিকল তাঁর খালাতো বোনের মতন। সেই খালাতো বোনের কোনো সংবাদ নেই।

নাসিম বেগম শর্মিলার গায়ে হাত বুলিয়ে স্নেহের সঙ্গে বলতে লাগলেন, কইলকাতার মেয়েরা কী লক্ষ্মী। অফিসে কাজ করে, আবার বাসায় এসে রান্না করে স্বামীপুত্র কন্যাদের খাওয়ায়, যত্ন করে, বাড়িতে ঝি-চাকরও রাখে না। সব নিজেরা করে। তিনি এলগিন রোডে এক হিন্দু ভদ্রলোকের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন, সে বাড়ির পাঁচটি মেয়ে, প্রত্যেকেই এক একটি রত্ন, যেমন লেখাপড়ায় ভালো, তেমন কাজে কম্মে…

অতীন পাশে এসে বললো, এ কিন্তু কলকাতার মেয়ে নয়। জামসেদপুরের। বিহারী! কলকাতার মেয়ে হচ্ছে অলি। ইস, আজ যদি অলি এখানে উপস্থিত থাকতো, সে কত খুসী হলে!

এত কলকাতা নিয়ে আলোচনার জন্যই অলির কথা বার বার মনে পড়ছে অতীনের। অলি এখন কী করছে? মেরিল্যান্ডের মস্ত বড় একটা বাড়িতে অলি একা থাকে। এর আগে তো কোনোদিন সে এমন একা থাকে নি।

বিরিয়ানিও আছে, সাদা ভাতও আছে। ডালও আছে, বুরহানিও তৈরি করেছেন নাসিম বেগম। স্যামন মাছের ঝোল আর মুগির রোস্ট। তিন চার রকমের সবজির তরকারি। রান্না অতিশয় উৎকৃষ্ট। বাবা-মা আছেন বলেই আবিদ হোসেন মদ-টদ কিছু সার্ভ করেনি আগে। অতীন আর সোমেন সেটা জানতো বলেই নিজেরা আগে থেকে একটুখানি পান করে এসেছে। বেশি নেশা করে এলে খাবার খেতে ইচ্ছে করে না, অল্প নেশায় খিদে বাড়ে। তবু অতীন প্রায় কিছুই খেল না। অযৌক্তিকভাবে তার একটা কথাই বার বার মনে পড়ছে, অলি কেন এখানে নেই? অলির থাকা উচিত ছিল!

খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পরই সত্যদা আর মাথা বিদায় নিল। সত্যদা ঠিক দশটা বেজে পনেরো মিনিটে ঘুমোতে যান। পাক্কা সাহেব হলেও তিনি আজ একটু বিচলিত হয়েছিলেন। প্রায় সতেরো-আঠারো বছর তিনি দেশে যাননি, দেশের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগই নেই। প্রায়, তবু আজ আবিদ হোসেনের বাবার মুখে বাঙাল ভাষা শুনে তাঁর মুখ দিয়েও কিছু কিছু বাঙাল ভাষা বেরিয়ে আসছিল। কুমিল্লার নানান লোকজনের খবরাখবর নিচ্ছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে তাঁর মুখে একটা অদ্ভুত বিষাদের রেখা ফুটে উঠছিল। সতেরো বছর পরেও এ রকম থাকে!

ওঁরা দু’জন চলে যাবার পর সোমেন হাঁপ ছেড়ে বললো, যাক, বাঁচা গেল! উফ! এই মাথাটা এমন ইডিয়েট, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে…।

শর্মিলা কাতরভাবে বললো, এই, ও রকম করে বলো না! মার্থা খুবই কাইন্ড হার্টেড মহিলা। কখনো কারুর নামে খারাপ কথা বলেন না।

সোমেন বললো, দেখো শর্মিলা, কাইন্ড হার্টেড মহিলারাও গ্রেট বোর হতে পারে। তুমি তো সবাইকেই ভালো দেখো। কিন্তু আমরা কি নিরিবিলিতেও একটু অ্যামেরিকানদের চুটিয়ে গালাগাল দিতে পারবো না? সেখানেও একজন আমেরিকান মহিলা বসে থাকলে তোমাকে আর একটা কথা বলি শোনো। কানে খাটো লোকেরা অনেক কথা শুনতে পায় না। কিন্তু তুমি তাদের শালা কালা বলো, অমনি ঠিক বুঝতে পারবে। সেই রকমই, যেসব ধলা মেয়েরা বাঙালীদের বিয়ে করেছে, তারা বাংলা বুঝতে পারে না। কিন্তু তুমি বাংলায় খুব সাঁটে সাহেবদের নিন্দে করে দেখো না, ওরা ঠিক ধরে ফেলবে! সেটা বোঝে!

শর্মিলা বললো, ওদের সামনে নিন্দে করার দরকারটাই বা কী?

সোমেন বললো, ওরা আমাদের দেশে আমাদের নিন্দে করে না? অবশ্য ওরা সেটা গোপন রাখার চেষ্টাও করে না, আমরা শালা ভিখিরির জাত—

আরও কিছুক্ষণ আড্ডা হলো, কিন্তু অতীন গুম হয়ে গেছে, সে শুধু দেখছে মেরিল্যান্ডের সেই বাড়িটা, একতলা পুরো অন্ধকার, আটিস্ট মহিলাটি বিদেশে গেছেন। পাশের দিকে দোতলার একটি ঘরে অলি একা। চোর-ডাকাত আসতে পারবে না। বার্গলার্স অ্যালার্ম দেওয়া আছে, তবু নিছক একাকিত্বেরই কি একটা কষ্ট নেই?

শর্মিলা প্রায়ই ফোন করে খবর নেয়। কিন্তু অলি নিজে থেকে একবারও ফোন করেনি অতীনকে।

এক সময় পাটি ভাঙলো। এখন অতীনের গাড়ি আছে, শর্মিলাকে তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়া উচিত। রাত মাত্র সাড়ে দশটা। এখন একটা লং ড্রাইভেও যাওয়া যায়।

বাড়ির সামনের রাস্তাটা পেরিয়ে যাবার পর শর্মিলা বললো, বাবলু, আজ একবার লংফেলো ব্রীজে যাবে? সেই সেবারের ঘটনার পর ওদিকে আর আমরা কখনো যাইনি! অতীন শুকনো গলায় বললো, আজ থাক। আজ আমার ঘুম পাচ্ছে!

শর্মিলা ব্যস্ত হয়ে বললো, ওমা, তোমার ঘুম পাচ্ছে, তা হলে তুমি গাড়ি বার করলে কেন? আমি ট্যাক্সিতে চলে যেতে পারি।

অতীন কোনো উত্তর দিল না। সে খুব জোরে একটা মোড় ঘুরলো।

শর্মিলা বললো, বাবলু, তুমি আমাকে পৌঁছে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে একলা ফিরবে, আমার একটা চিন্তা থাকবে।

অতীন বললো, তোমাকে কতবার বলেছি, মিলি, আমার অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যু নেই? আই হ্যাভ আ চামড় লাইফ!

শর্মিলা বললো, অত গর্ব করা ভালো নয়। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ। শর্মিলা কোনো কথা বললেও অতীন শুধু ই-হাঁ করে যায়। শর্মিলা তো অতীনের নাড়ি-নক্ষত্র জানে, সে বুঝলো, আজ অতীনের কিছু গোলমাল হয়েছে! সে পৌঁছোবার আগেই ওই পার্টিতে অতীন কারুর সঙ্গে ঝগড়া করেছে নাকি?

কিন্তু এখন সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা ঠিক নয়। দু’দিন পর অতীনের কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটা জানা যাবে।

প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য সে বললো, বাবলু, তুমি আমার শাড়িটা দেখে কিছু বললে না যে? আমি একটা নীল শাড়ি পরে এসেছিলুম। আবিদের মা আমাকে একটা শাড়ি দিলেন। প্রায় জোর করে সেটা পরে তাঁকে দেখাতে বললেন। খুব চমৎকার জামদানি!

শাড়ি বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে অতীন হঠাৎ হেঁড়ে গলায় গান জুড়ে দিল। তু লাল পাহাড়ীর দেশে যা। রাঙা মাটির দেশে যা! হেথায় তুরে মানাইছে না গ! ইক্কেবারে মানাইছে না গ!

শর্মিলা বললো, এটা আবার কী গান?

অতীন বললো, এটাই আমার এখন ন্যাশনাল সঙ! আমার কি কেমব্রিজে গাড়ি চালানোর কথা?

শর্মিলাকে পৌঁছে দেবার সময় তাকে একবারও চুমু খেল না অতীন। ফেরার সময়েও তার ঠোঁটে ঐ একই গান। আজ যে বার বার অলির কথা মনে পড়ছে, সে কথা শর্মিলাকে বলা যায় না। আবার শর্মিলাকে বলতে পারলো না বলেও তার কষ্ট হচ্ছে।

গাড়িখানা পার্ক করার পর অতীন সোমেনের দরজার সামনে একবার দাঁড়ালো। আলো নিবে গেছে, সোমেন এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো? তার এখনো আড্ডা মারতে ইচ্ছে করছে। আবিদের কাছে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না!

ওপরে নিজের ঘরে এসে অতীন গেলাসে খানিকটা হুইস্কি ঢেলে একটা বই খুলে বসলো। তবু সে ঐ গানটাই গাইছে। হেথায় তুরে মানাইছে না গা! ইক্কেবারে মানাইছে না গ! 2 একটু পরেই সে দুমদাম করে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো নীচে। এখন বসবার ঘরে টি ভি দেখার কেউ নেই। এই সময় নিরিবিলিতে ফোন করা যায়।

প্রায় এক মিনিট রিং হবার পর অলি ফোন ধরলো। এরই মধ্যে অতীনের অস্থিরতা তুঙ্গে পৌঁছে গেছে। সে কর্কশ গলায় বললো, এতক্ষণ কোথায় ছিলি? কী করছিলি?

অলি বললো, আমি নীচে কুকুরটাকে খাবার দিতে গিয়েছিলুম। তারপর লেটার বক্সে একটা চিঠি পেলুম।

–কার চিঠি?

উত্তর দিতে কি দু’এক মুহূর্ত দেরি হলো অলির? সে কি দ্বিধা করেছিল? কিংবা সে সঙ্গে সঙ্গেই বললো, শৌনকের। অনেক বড় চিঠি। আমি টেলিফোনের রিং শুনতে পাচ্ছিলুম, কিন্তু

অতীন ফেটে পড়ে বললো, হু ইজ দিস গড় ড্যাম শৌনক? অলি, আই ওয়ান্ট ফুল ডিটেইলস অ্যাবাউট দিস ক্যারেকটার! তুই যার-তার সঙ্গে মিশবি, আমি এটা মোটেই পছন্দ করি না!

অলি খুব মিষ্টি করে বললো, তোমার কী হয়েছে, বাবলুদা? এত রাগারাগি করছো কেন? শর্মিলা কেমন আছে?

–তুই কেমন আছিস, অলি?

–আমি ভালো আছি, বাবলুদা। চমৎকার আছি। শৌনকের চিঠিটা পড়া এখনো শেষ হয়নি। ও লিখেছে যে আমাদের চেনাশুনো বন্ধুরা সবাই ভালো আছে।

–প্লিজ, প্লিজ, অলি, শৌনক-টৌনকের কথা বাদ দে! আমি শুধু তোর কথা শুনতে চাই।

খুব মিষ্টি হেসে অলি বললো, কী ব্যাপার, বাবলুদা। আজ বুঝি শর্মিলার সঙ্গে তোমার ঝগড়া হয়েছে। তাই আমার কথা মনে পড়েছে? এটা তো ঠিক নয়? শর্মিলার সঙ্গে তোমার কী। হয়েছে, আমাকে বললো, আমি মিটিয়ে দিচ্ছি। আমি শর্মিলাকে ফোন করবো?

অতীন প্রায় হাহাকারের স্বরে বললো, অলি, অলি, ঐসব কিছু না। আমি শুধু জানতে চাইছি, তুই কেমন আছিস! আমি কি তোর জন্য কিছু

উত্তর না দিয়ে অলি কুলকুল করে হাসতে লাগলো। অতীন আবার বললো, অলি, তুই একলা একলা থাকিস, তোর কথা আমার প্রায়ই মনে।

তাকে বাধা দিয়ে অলি বললো, আমার একা থাকতে খুব ভালো লাগে, কেউ ডিসটার্ব করার নেই, মনে মনে আমি কলকাতায় ফিরে যাই…

রিসিভারটা রেখে দিয়ে অতীন সোজা চোখে প্রায় পাঁচ সাত মিনিট তাকিয়ে রইলো। দেওয়ালের দিকে। টেবিল থেকে হুইস্কির বোতলটা নিয়ে সে কাঁচাই চুমুক দিল খানিকটা।

বিছানায় ঢলে পড়ে যাবার সময় পর্যন্ত সে চাপা দুঃখের সঙ্গে বলতে লাগলো, অলি, অলি, অলি, অলি আমার কেউ না। শালা, শুয়োরের বাচ্চা শৌনক, তুই যদি কোনোদিন অলির মনে দুঃখ দিস…আমার মতন কিংবা আমি কেউ না… আমি তোদের বাধা হয়ে দাঁড়াবো না। আমি সরে যাবো…

৫৬. মেয়েদের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা

মেয়েদের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা একটু বেশি থাকে। কারণ তাদের ঘর সামলাতে হয়, ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করতে হয়। সোনার গয়না গড়াবার জন্য অনেক মেয়েরই খুব ঝোঁক থাকে, কিন্তু ক’জন মেয়ে আর সেই গয়না নিয়মিত পরে? সে সব তোলা থাকে সিন্দুকে, আসলে সেগুলি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক। এক সেট সুন্দর কাপ-ডিশ কিনলেও গৃহিণী তা সহজে ব্যবহার করতে চায় না, আলমারিতে সাজিয়ে রাখে ভবিষ্যতের কোনো একটা বিশেষ উৎসবের দিনের জন্য।

কিন্তু ঢাকায় এখন অনেকেই আর ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। প্রত্যেকদিন সকালে উঠেই মনে হয়, আজকের দিনটা ভালোয় ভালোয় কাটবে তো? যাদের বাড়ি থেকে বেরুতে হ্য, তারা ঠিকঠাক ফিরবে?

আজ জাহানারা ইমাম বিছানায় পাতলেন একটা ঝকঝকে নতুন চাঁদর। বালিশের ওয়াড়গুলো বদলালেন। দুটি বাথরুমেই ঝোলালেন নতুন বিলিতি তোয়ালে। এই ক’মাস যেমন-তেমন করে খাওয়া দাওয়া হচ্ছিল, আজ তিনি খাওয়ার টেবিলে পাতলেন অপূর্ব কারুকার্য করা লেসের টেবল ক্লথ। একবার একজন চিটাগাং থেকে এনে দিয়েছিল ইটালিয়ান ডিনার সেট, এর আগে একদিনও ব্যবহার করা হয়নি, আজ সেইসব প্লেট টেবিলে শোভা পেল। সেই সঙ্গে কাট গ্লাসের পানির গেলাস। কাঁটা-চামচগুলোও চকচকে নতুন।

খেতে এসে শরীফ আর জামী হাঁ হয়ে গেল। পিতা-পুত্র পরস্পরের দিকে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর শরীফ জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, আজ কোনো বড় দরের মেহমানকে দাওয়াত দিয়েছো নাকি? কিছু বলোনি তো?

জাহানারা ঈষৎ হেসে বললেন, নাঃ, আজ আমরাই আমাদের মেহমান।

শরীফ তবুও কিছু বুঝতে পারলেন না। ঈদ কেটে গেছে আটদিন আগে। এবারের ঈদ কেটেছে অত্যন্ত অনাড়ম্বর ভাবে। কারুর জন্যই নতুন পোশাক কেনা হয়নি, বাড়িতে বিশেষ খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। পাকিস্তানী আর্মির ঘোষণা ছিল, ঈদ উপলক্ষে সারা দেশে। জাঁকজমক করতে হবে, সে নির্দেশ পালন করেছে শুধু মুষ্টিমেয় কিছু ধনী পরিবার আর দালালশ্রেণী। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনীর গোপন ইস্তাহারে জানানো হয়েছিল, দেশের এই দুর্দিনে ঈদ উৎসবের আড়ম্বর করা অন্যায়। জাহানারা শুধু বিশেষ কয়েকজন অতিথির কথা চিন্তা করে ঈদের সেমাই, জদা বেঁধেছিলেন, তারা অবশ্য আসেনি।

তাহলে আজ কিসের উৎসব? শরীফের পীড়াপীড়িতে জাহানারা বললেন, কিছু না! এইসব জিনিসপত্র এতদিন প্রাণে ধরে জমিয়ে রেখেছিলাম। আজ হঠাৎ মনে হলো, কী হবে জমিয়ে। রেখে! হঠাৎ মরে গেলে তো সাত ভূতে লুটেপুটে খাবে। তারচেয়ে নিজেরাই ভোগ করে যাই!

শরীফ ও জামী দু’জনেই একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

জাহানারা আবার বললেন, ভেবেছিলাম, রুমী-জামীর বিয়ের সময় এইগুলা বার করবো। ওদের কি আর বিয়ে হবার চান্স আছে? আগামীকালই কী হবে বলা যায় না!

আগামীকাল ‘ক্রাস ইন্ডিয়া’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণার মর্ম যে কী তাই-ই বুঝতে পারছে না কেউ। একটা গুজব রটেছে যে কট্টর পাকিস্তানী সমর্থকরা এই উপলক্ষে কয়েক লাখ বাঙালীকে ইন্ডিয়ার চর হিসেবে ঘোষণা করে মেরে ফেলবে। যাতে সেই দৃষ্টান্ত দেখে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা ভয় পেয়ে আত্মসমর্পণ করে।

পরিবেশ খানিকটা হালকা করার জন্য জামী বললো, জানো আম্মা, কয়দিন আগে জোনাকী সিনেমা হলের পাশে সেই যে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কটা লুট হলো, সেইটা আসাদ, মুনীর, ফিরোজ, ফিরদৌসদের কীর্তি!

জাহানারা বললেন, তাই নাকি? ঐটুকু-টুকু ছেলেরা কী করে পারলো?

জামী বললো, শোনো না মজা। ওরা যোগাড় করেছিল একটা মোটে স্টেনগান। আসাদ নিল সেটা। আর মুনীরের হাতে একটা খেলনা রিভলবার। সেটাকে দেখতে একেবারে আসলের মতন। আরীফের বাবা পীরসাহেব, তাঁর গাড়িটা নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়লো।

শরীফ হাসতে হাসতে বললেন, পীরসাহেবের গাড়ি নিয়ে ব্যাঙ্ক ডাকাতি? তোবা তোবা!

জামী বললো, পীরসাহেব কিছু টের পান নাই। গাড়ির নাম্বার প্লেটটাও বদল করে নেওয়া হয়েছিল জলিদের বাসায় গিয়ে। একজনকে ওরা আগেই ব্যাঙ্কের সামনের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিল খবর নেবার জন্য। বেলা এগারোটায় ওদের গাড়ি পৌঁছাতেই সে বললো, অল ক্লিয়ার। আসাদ, মুনীর আর ফিরোজ দৌড়ে ভেতরে ঢুকেই দারোয়ানের কপালে স্টেনগানটা ঠেকাতেই সে হায় আল্লা, প্রাণে মাইরেন না বলে ফেলে দিল তার রাইফেল। মুনীর ক্যাশ কাউন্টারের ধারে গিয়ে খেলনা পিস্তলটা উচিয়ে বললো, হ্যান্ডস আপ! সব কয়টা লোক দুই হাত তুলে দাঁড়ালো। আর ম্যানেজার আগ বাড়িয়ে এসে বললো, ন্যান ন্যান, আপনেরা টাকা নিয়ে যান, যত খুশি নিয়ে যান, মুক্তিবাহিনীর টাকা দরকার, সে তো আমরা জানিই।

জাহানারা জিজ্ঞেস করলেন, কত টাকা পেয়েছে?

জামী বললো, শোনো না আরও মজা। তাড়াতাড়িতে ওরা কোনো বস্তা কিংবা থলি সাথে নেয় নাই। ম্যানেজার তোল বান্ডিল বান্ডিল টাকা এগিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু ওরা নেবে কিসে? ফিরোজ তার গায়ের শার্টটা খুলে তাতেই বেঁধে নিল যতগুলো পারলো, তারপর বাইরে আসতেই জামার হাত দিয়ে টুপটাপ করে টাকা খসে পড়তে লাগলো রাস্তায়।

শরীফ বললেন, নভিস আর কাকে বলে!

জামী বললো, কাছেই দুটো আর্মির ট্রাক দাঁড়িয়েছিল। তারা এতক্ষণে কিছু টের পায় নাই। কিন্তু রাস্তার লোক আজকাল মুক্তিবাহিনীর কোনো অ্যাকশান দেখলেই আনন্দে হাততালি দেয় জানো তো! ওদের দেখে অনেক লোক হাততালি দিয়ে জয় বাংলা জয় বাংলা বলে চাচাতে লাগলো! অবশ্য আমির মোটা মোটা ট্রাকগুলো স্টার্ট নেবার আগেই ওরা গাড়ি নিয়ে হাওয়া।

শরীফ আর জাহানারা দু’জনেই হাসতে লাগলেন প্রাণ খুলে।

মানুষই একমাত্র প্রাণী যে বিপদের পরিমণ্ডলের মধ্যে থেকেও হাসতে পারে।

আলমারি দেরাজে সাজানো জিনিসপত্র ব্যবহারের জন্য বার করে ফেললেও জাহানারা-শীরফরা অবশ্য একটা ঘরে অনেক জিনিসপত্র জমাচ্ছেন। বিভিন্ন দোকান থেকে ঘুরে ঘুরে কিনে আনছেন সোয়েটার, মাফলার আর মোজা। একবার জিন্না এভিনিউয়ের ফুটপাথের এক দোকান থেকে জাহানারা একসঙ্গে ছ’খানা সোয়েটার কিনতে গিয়ে একজন আর্মির লোকের কাছে ধমক খেয়েছিলেন। হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়িয়ে সেই লোকটি জানতে চায়, কেন এক সঙ্গে ছ’খানা সোয়েটার কেনা হচ্ছে! সেদিন জাহানারার মাথায় চট করে একটা উত্তর যুগিয়ে গিয়েছিল, তাই তিনি বিপদে পড়েননি। তিনি বলেছিলেন, বেগম লিয়াকত আলী কহা হয় না, জওয়ান লোগোঁকে লিয়ে সুয়েটার, টাওয়েল, সাবুন.ইয়ে সব খরিদ করকে আপওয়া অফিস মে ভেজ না? উয়ো যো অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন হ্যায়…

ওষুধও কিনতে হচ্ছে বিভিন্ন দোকান থেকে। শরীফ, জামী যে-যখনই বাইরে বেরোয়, কিছু ওষুধ নিয়ে আসে। কেনা হচ্ছে শত শত প্যাকেট সিগারেট। জমানো হচ্ছে চাল। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে ছোট ছোট পুঁটলি করে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে চালের মধ্যে। কখন গোপন অতিথিরা আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। ওদের জন্য এইসব লাগে। আগে শুধু টাকা আর সিগারেট দিলেই হতো। এখন শীত এসে গেছে, ওদের কারুরই শীতবস্ত্র নেই। তবে ঐ সব ছেলেরা বলে, মোজা কেনার দরকার নেই, মোজা কোনো কাজে লাগে না, কারণ ওদের প্রায় কারুরই পায়ে জুতো নেই!

পাকিস্তানী আর্মির সাংঘাতিক কড়াকড়ির মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত থেকে ঠিকই চলে আসে ঢাকায়, দু-এক জায়গায় অ্যাকশান করেই আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। জাহানারা চাতক পাখির মতন তাদের জন্য প্রতীক্ষা করে থাকেন। রাত দুটোর সময়েও যদি তারা এসে চুপি চুপি পেছনের দরজায় টোকা মারে, তাতেও আনন্দে তাঁর প্রাণটা লাফিয়ে ওঠে।

প্রত্যেকবারই তাঁর মনে হয়, ওদের সঙ্গে বুঝি রুমী এসেছে!

ঠিক আটানব্বই দিন আগে রুমীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল মিলিটারি, তারপর থেকে আর রুমীর কোনো খবর নেই। সামরিক দফতর কোনো খবর তো দেবেই না, সেখানে কিছু জানতে যাওয়াও বিপজ্জনক। শুধু পাগলাবাবাই এখনো বলে যাচ্ছেন যে রুমী ঠিকই বেঁচে আছে, তিনিই একদিন রুমীকে ছাড়িয়ে আনবেন। পাগলাবাবা আরও অনেক জননীকেই এই আশ্বাস দিয়েছেন, এসব কি নিছক সান্ত্বনা?

এমনও তো হতে পারে যে রুমী বন্দীদশা থেকে পালিয়ে গেছে কোনোক্রমে! ইন্ডিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে? কিন্তু তা হলে কি রুমী তার মা বাবাকে একটা খবরও দেবে না? হয়তো একেবারে নিচ্ছিদ্র গোপনীযতা তার পক্ষে খুব জরুরি। এখনও সময় আসেনি!

মনি, বাচ্চু, মাহবুবরা এলে জাহানারা তাদের খাবার পরিবেশন করতে করতে এক সময় জিজ্ঞেস করেন, তোরা সত্যি করে বল তো, রুমী কোথায়? তোরা তো আমাকে জানিস, আমাকে মেরে ফেললেও পাক আমি আমার পেট থেকে কোনো কথা বার করতে পারবে না। চরম খারাপ সংবাদ হলেও তোরা আমাকে বল, আমি শুধু সত্যি কথাটা জানতে চাই!

দু’একজন মিথ্যে কথা বলার চেষ্টা করেছিল, জাহানারা ধরে ফেলেছেন। এরা সত্যিই রুমীর খবর জানে না।

বাবুল চৌধুরী অবশ্য পান মাঝে মাঝে। অল্প বয়েসীরা বাবুলকে একজন অদ্ভুত মানুষ হিসেবে সমীহ করে। সে প্রায় কারুর সঙ্গেই পারতপক্ষে কথা বলে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে চুপ

করে এক দিকে চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু অ্যাকশানে অংশ নিলে সে অসাধারণ সাহসের পরিচয়। দেয়। যেন তার বিন্দুমাত্র প্রাণের মায়া নেই।

মাঝখানে হঠাৎ শোনা গেল সেকটর টুর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছে। তাতে ঢাকার অনেক পরিবারে নিদারুণ শোক নেমে এসেছিল, জাহানারাও খুব ভেঙে পড়েছিলেন। কিছু অল্প বয়েসী ছেলে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠেছিল বুক চাপড়ে। খালেদ মোশাররফ যুবসমাজের হীরো, তার নির্দেশেই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় এসে পাকিস্তানী শক্তিকে কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সেই খালেদ মোশাররফ নেই।

দু চারদিন পর সীমান্তের মেলাঘর ক্যাম্প থেকে সঠিক সংবাদটি আসে। খালেদ মারা যায়নি, কসবার যুদ্ধ পরিচালনা করার সময় সে সাঙ্ঘাতিক আহত হয়েছে। ত্রিপুরা থেকে তাকে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে লখনউ-এর হাসপাতালে। শেলের টুকরোয় তার কপাল ফুটো হয়ে গেলেও সে বেঁচে যাবে। তার জায়গায় এখন সেকটর টু-র কমান্ডার হয়েছে মেজর হায়দার।

যে-ছেলেটি পাকা খবর এনেছিল, সে বললো, জানেন আম্মা, আমাদের বেস ক্যাম্পে যখন খালেদ ভাইয়ের সম্পর্কে ঐ দুঃসংবাদ আসে, তখন সেখানে যেন একেবারে কারবালার মাতন পড়ে গিয়েছিল! আমিও সারা রাত্রি ধরে কেঁদেছি!

বলতে বলতে চোখে পানি এসে গিয়েছিল তার, একটু সামলে নিয়ে সে আবার হেসে বললো, কিন্তু কসবার যুদ্ধে আমাদেরই জয় হয়েছে, আমরা কসবা কেড়ে নিয়েছি!

ঢাকার কাগজে অবশ্য পরপর চারদিন ফলাও করে কসবার ঘোরতর যুদ্ধের খবর ছাপা হয়েছে, ভারতীয় চররা কামান, ফিল্ডগান, ভারী মটার, অ্যান্টি ট্যাঙ্ক গান নিয়ে আক্রমণ করলেও পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের প্রচণ্ড মার মেরে ভাগিয়ে দিয়েছে। আসলে যে কসবা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে তা কেউ বুঝতে পারেনি। পাকিস্তানী খবরে এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের সামান্যতম উল্লেখও থাকে না, যদিও মিলিটারি জওয়ানরা নাকি এখন মুক্তি শব্দটা শুনলেই ভয় পায়।

খবরের কাগজ পড়লে মনে হয়, ভারতের সঙ্গে বোধ হয় সত্যিই যুদ্ধ বেধে গেছে। প্রায়ই হেডিং থাকে, ভারতের নির্লজ্জ আক্রমণ। যখন তখন কারফিউ দেওয়া হচ্ছে, এমনকি দিনে দুপুরেও। সন্ধের পর নিষ্প্রদীপের মহড়া। অথচ, ভারতের আকাশবাণী কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতারে সর্বাত্মক যুদ্ধের কোনো ইঙ্গিত নেই। ইন্দিরা গান্ধী বিদেশে ঘুরছেন। ঢাকার অনেকেই মনে মনে অধীর হয়ে ভাবে, ভারত সত্যি সত্যি যুদ্ধে নেমে পড়ছে না কেন? এই অনিশ্চয়তা আর সহ্য হয় না। বুকে ব্যথা করে।

মুক্তিযুদ্ধের তৎপরতা যত বাড়ছে, ততই ঢাকার সাধারণ বাঙালীদের ওপর কট্টর পাকিস্তান সমর্থকদের অত্যাচার বাড়ছে। মিলিটারির লোক ছাড়াও বিহারীরা রাস্তা-ঘাটে যাকে তাকে ধরে বলছে, তুম মালাউন হ্যায়! সে বেচারী প্রবল প্রতিবাদ করে কোনোরকমে ভুল উর্দু উচ্চারণে কোরান-শরীফ থেকে মুখস্থ বলার চেষ্টা করে, মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে নামাজ পড়ে, তবু তাদের বিশ্বাস হয় না। পেছনে লাথি মারে। মিলিটারি পাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। এলিফ্যান্ট রোডে একদিন দুপুরে একজন ভয় পেয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল, সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। পরে জানা গেল, সে তো মালাউন নয় বটেই, তার বাবা শান্তি কমিটির এক পাণ্ডা, লোকটির মাথায় সামান্য দোষ ছিল।

একদিন জামীর এসে বললো, জানো আম্মা, বিহারীরা অনেকে এখন মাথা ন্যাড়া করে একটা লাল ফেট্টি বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

জাহানারা বললেন, আমি দেখেছি বাজার করতে গিয়ে। হঠাৎ মাথা ন্যাড়া করার ধুম পড়ে গেল কেন রে?

জামী বললো, কী জানি! ঠিক শয়তানের সহোদরের মতন দেখায়!

জাহানারা বললেন, তুই ভূতের গলির ইব্রাহিমকে দেখেছিল? সেও মাথা ন্যাড়া করেছে। আজ বায়তুল মোকাররমের কাছে দেখি, সেও মাথায় একটা লাল ফেট্টি বেঁধে ঘুরছে!

জামী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ইব্রাহিম ভাই? সে ওরকম সেজেছে কেন? সেও কি রাজাকার হলো নাকি?

জাহানারা বললেন, নারে! ভীতু মানুষ। ভেবেছে ঐ রকম সাজলে তাকে আর কেউ রাস্তা। ঘাটে জেরা করবে না।

জামীর তরুণ মুখশ্রীতে ঘৃণার রেখা ফুটে উঠলো। সে বললো, কাপুরুষ! আমি আর কোনোদিন ওর মুখ দেখবো না! ফুঁঃ!

জামীর রাগ দেখে হাসতে লাগলেন জাহানারা।

জামী বাইরে থেকে নতুন নতুন খবর নিয়ে আসে। কদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে, যুদ্ধ ঘনিয়ে এলে ঢাকায় স্ট্রিট ফাইট শুরু হবে। মুক্তিযোদ্ধারা আশা করে যে তারা যখন ঢাকাকে ঘিরে এগিয়ে আসবে তখন ঢাকার নাগরিকরাও যেন এদিক থেকে পাক বাহিনীকে আঘাত হানতে শুরু করে। সে জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার। পরাজয়ের মুখোমুখি হলে নিয়াজীর সাঙ্গোপাঙ্গরা মরায়া হয়ে ঢাকা শহরে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।

জাহানারার মনে পড়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় চার্চিলের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা, উই শ্যাল ফাইট ইন দা হাউজেজ, উই শ্যাল ফাইট ইন দা স্ট্রিটস!

জামী সেই চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য বদ্ধপরিকর। শরীফই বা বাদ যাবে কেন। জাহানারার আজ আপত্তি করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বুঝে গেছেন, এখন নিয়তির কাছে সব বন্ধক দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। এইরকম ভাবে আরও কয়েকমাস চললে শেষপর্যন্ত কেউই বুঝি আর বেঁচে থাকবে না। সর্বস্ব পণ করলে যদি স্বাধীনতা আসে, তা হলে হয়তো কিছু মানুষ অন্তত বেঁচে থাকবে আবার এই বাংলাদেশে জীবনের স্পন্দন জাগাতে।

কেরোসিনের টিন এগারো টাকা থেকে লাফিয়ে উঠেছিল আঠারো টাকায়, গতকাল বাজার থেকে একেবারে উধাও! সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে বিস্ফোরণের পর প্রায়ই কারেন্ট থাকে না। কেরোসিনও না পাওয়া গেলে রান্না হবে কী করে। বুড়ামিয়াকে কেরোসিনের খোঁজে পাঠিয়ে জাহানারা গাড়ি নিয়ে বেরুলেন জরুরি কিছু কেনাকাটা করতে।

বায়তুল মোকাররমের কাছাকাছি যেতেই প্রচণ্ড কোলাহল শোনা গেল। হর্ন বাজাতে বাজাতে অনেকেই গাড়ি ঘুরিয়ে নিচ্ছে। লোকজনের চ্যাঁচামেচিতে একটু কান পেতে শুনে জাহানারা বুঝলেন, আবার ওখানকার একটা দোকানে বোমা ফেটেছে! দিনের বেলা মিলিটারির নাকের ওপর দিয়ে ছেলেগুলো বোমা ফাটিয়ে চলে যায়!

কয়েকদিন আগেই ফ্যান্সি হাউজ নামে শাড়ির দোকানটায় এ রকম একটা প্রচণ্ড শক্তিশালী বিস্ফোরণে একজন পাঞ্জাবী মেজর আর তার সঙ্গে কয়েকজন মহিলা জখম হয়েছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল তিনজন মিলিটারি, তারা নিহত। কেউ এখন আর ভয়ের চোটে শাড়ির দোকানে ঢুকছে না! জাহানারা মনে মনে খুশিই হলেন। তিনি জানেন, ফ্যান্সি হাউজ যারা আক্রমণ করেছিল, সেই আসাদ, ফিরোজ, মুনীররা রুমীরই বন্ধু। এদের দলে রুমীও থাকতে পারতো। কোথায় গেল রুমী!

সর্বক্ষণই যে রুমীর কথা মনে পড়ে, তবু মুখ ফুটে তা বলেন না। যদি শরীফ কষ্ট পায়। শরীফের স্বভাবটা খুব চাপা। তিনিও যে আজকাল রুমীর প্রসঙ্গ আর বিশেষ তোলেন না, তা কি জাহানারার কথা ভেবেই? শরীফ দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছেন, ওজন কমে গেছে অনেক, তবু সব সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু না কিছু সাহায্য করার ব্যাপারে মেতে আছেন। যেন ওরা সকলেই তাঁর নিজের সন্তান।

গাড়ি ঘুরিয়ে জাহানারা চলে এলেন একটা ফটোগ্রাফির দোকানে। কয়েক দিন আগে তিনি রুমীর এক বন্ধু হ্যারিসের কাছ থেকে রুমীর একটা ছবির নেগেটিভ নিয়ে এসেছিলেন। ইদানীং রুমী বাড়িতে একেবারে ছবি তুলতে চাইতো না। হ্যারিসের কাছে বেশ কয়েকখানা ছবি ছিল, তার মধ্য থেকে একখানা বেছে জাহানারা নেগেটিভটা এনলার্জ করতে দিয়েছিলেন।

ছবির দোকানে সেটা ডেলিভারি নিতে এসে জাহানারার বুকখানা ধক করে উঠলো। এত জীবন্ত ছবি! কোমরে চিশতির পিস্তল, কাঁধের ওপর গুলির বেল্ট ঝোলানো, মাথায় একটা ক্যাপ ত্যারছা করে পরা, কোমরে দু’হাত দিয়ে একটুখানি ঝুঁকে রুমী যেন কার সঙ্গে কথা বলছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা! বলিভিয়া, কিংবা ভিয়েৎনামের নয়, এই বাংলার।

বাড়ি ফেরার পথে জাহানারা বিড় বিড় করতে লাগলেন কয়েকটি কবিতার লাইন। তাঁর কবিতাপাগল ছেলেটা জীবনানন্দ দাশের এই লাইনগুলি আবৃত্তি করতে খুব ভালোবাসতো :

আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়–হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়
হয়তো বা হাঁস হবো–কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়
সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে
আবার আসিব আমি বাংলার মাঠ নদী খেত ভালোবেসে
জলঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলায় এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়…

দুচোখ দিয়ে অবিরল অশ্রু গড়াচ্ছে, কবিতার লাইনের মাঝে মাঝে জাহানারা ফিসফিস করে সেই ছবিটাকে জিজ্ঞেস করছেন, রুমী, তুই আসবি না? কবে আসবি? তোকে যে আসতেই হবে!

বাড়িতে ফিরে নিচের তলার বসবার ঘরের এক কোণের টেবিলে একটা স্ট্যান্ডের ওপর লাগালেন সেই ছবি। সারল্যমাখা মুখোনিতে কী দৃপ্ত তার ভঙ্গি! এই রকম হাজার হাজার ছেলে যে দেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়তে যায়, সেই দেশকে পরাধীন করে রাখবে কোন্ শক্তি।

ছবিটার তলায় একটা কাগজ সেঁটে দিয়ে জাহানারা লিখলেন, আবার আসিব ফিরে–এই বাঙলায়।

দূর থেকে তিনি মুগ্ধ হয়ে ছবিটা দেখতে লাগলেন, খানিক বাদে হঠাৎ তাঁর মুখে ফুটে উঠলো একটা আতঙ্কের ছাপ। সর্বাঙ্গে বিধতে লাগলো অনুশোচনার কাঁটা। তিনি ছুটে গিয়ে ছবিটা তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরলেন।

এ কী করতে যাচ্ছিলেন তিনি! বসবার ঘরে রুমীর ছবি সাজিয়ে রাখছিলেন। তার মানে তিনিও কি ধরে নিয়েছেন, রক্ত মাংসের রুমী আর নেই, সে এখন শুধু ছবি! না, না, না, তা হতে পারে না!

রুমী তোকে ফিরতে হবে, ফিরে আসতেই হবে। এ দেশ স্বাধীন হবে, তা তুই দেখবি না? এরপর দেশ গড়ার কত রকম কাজ থাকবে, তাতে অংশ না নিয়ে তুই ফাঁকি দিয়ে চলে যাবি? তোর মতন ছেলে কি তা পারে?

৫৭. হলুদ ও কমলা রঙের শাড়ি পরা

হলুদ ও কমলা রঙের শাড়ি পরা, তার ওপরে একটা কালো ওভারকোট, ইন্দিরা গান্ধী বেরিয়ে এলেন নিউ ইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্ট থেকে। প্রায় শ পাঁচেক প্রবাসী ভারতীয় এসেছে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে, ভারতীয় অফিসাররাও রয়েছে, কিন্তু কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া আমেরিকান সরকারের কোনো প্রতিনিধি সেখানে নেই। আর কয়েক দিন পরই তাঁর চুয়ান্ন বছর বয়েস হবে, শরীর পরিপূর্ণ যৌবনময়, কিন্তু আজ তাঁর মুখে একটা কালো ছাপ। জনতার জয়ধ্বনি শুনেও তাঁর মুখে হাসি ফুটলো না। তিনি তলার ঠোঁটটা কামড়ে ধরে আছেন, এটাই তাঁর রাগের চিহ্ন।

প্রবাসী ভারতীয়রা নানারকম প্রশ্ন করতে লাগলো তাঁকে ঘিরে। তিনি কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। একবার শুধু বললেন, তিনি সকলের সঙ্গে পরে এক সময় মিলিত হবেন নিশ্চয়ই, কিন্তু এখন তিনি ক্লান্ত, তিনি বিশ্রাম নিতে চান।

গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া বইছে, ওভারকোটের কলারটা তুলে দিয়ে, টকটক করে জুতোর শব্দ তুলে তিনি গিয়ে উঠলেন লিমুজিনে। ম্যানহাটনের লেক্সিংটন অভনিউতে একটি হোটেলে তিনি আগে কয়েকবার উঠেছেন, এবারও সেই হোটেলেই তাঁর জন্য সুইট বুক করা আছে।

চলন্ত গাড়ির জানলা দিয়ে তিনি বাইরে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু কিছুই দেখছেন না। তাঁর পাশে উপবিষ্ট একজন কূটনীতিবিদ গুনগুন করে বললেন, কী আশ্চর্য, প্রেসিডেন্ট নিক্সন যৌথ বিবৃতি দিতেও রাজি হলেন না? আমরা ভেবেছিলাম…

ইন্দিরা গান্ধী রাগতভাবে সেই ব্যক্তির দিকে তাকালেন। এ বিষয়ে তিনি এখন কোনো আলোচনা করতে চান না। এই অপমানটাই তাঁর বুকে সবচেয়ে বেশি বেজেছে। তিনি পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের নিবাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমেরিকায় এসেছেন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন-এর সঙ্গে তার দু’দিন ধরে আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তবু নিক্সন একটা যৌথ বিবৃতি দেবার প্রয়োজনও মনে করলেন না? যেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনের কোনো গুরুত্বই নেই!

গোটা দেশকে দারুণ সংকটের মধ্যে রেখে ইন্দিরা বেরিয়ে পড়েছেন পশ্চিমী দেশগুলির কাছ থেকে নৈতিক সমর্থন আদায় করতে। প্রথমে গেলেন বেলজিয়াম, তারপর অস্ট্রিয়া, তারপর ব্রিটেনে। সবাই খুব আদর-আপ্যায়ন করছে, ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রশস্তি জানাতে কোনো কার্পণ্য নেই, শরণার্থী প্রসঙ্গ উঠলেই মৌখিক সহানুভূতি জানাচ্ছে প্রচুর, আর্থিক সাহায্যেরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু আসল সমস্যাটি এড়িয়ে যাচ্ছে অতি ভদ্রতার সঙ্গে। কী যেন তারা গোপন করে যেতে চায়। সকলেরই ভাবখানা এই যে, আমেরিকান বড় ভাইয়ের সঙ্গে তুমি তো দেখা করতে যাচ্ছোই, সেখানেই তুমি সব শুনবে!

ওয়াশিংটন ডি সি-তে এসেও ইন্দিরা প্রথমে ঠিক আঁচ করতে পারেননি পাকিস্তানের প্রতি নিক্সনের কেন এত পক্ষপাতিত্ব। আমেরিকাও তো গণতন্ত্রের গর্ব করে, তবু পাকিস্তানের একজন সামরিক শাসক, যে গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল অগ্রাহ্য করেছে, তাকেই অন্ধভাবে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন নিক্সন!

প্রেসিডেন্ট নিক্সন আবহাওয়া, খাদ্য, শরীর-স্বাস্থ্যের খবর ও ঠাট্টা ইয়ার্কিতে সময় কাটাতে চান। ইন্দিরা গান্ধী এক সময় সরাসরি প্রশ্ন করলেন, পাকিস্তান সরকার সে দেশের পূর্বাঞ্চলে যে অত্যাচার চালাচ্ছে, সে বিষয়ে আপনি কি কিছু ভেবেছেন?

নিক্সন আলগা ভাবে বললেন, অবশ্যই ভেবেছি! পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে যদি কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়, তা হলে তাতে আমাদের মাথা গলানো ঠিক নয়। আমাদের কাছে দুটি দেশই সমান। তোমাদের মধ্যে একটা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রাজনৈতিক সমাধান করে ফেলা উচিত। এই দুটি দেশে আবার যুদ্ধ লাগুক, তা আমরা চাই না, আশা করি তোমরাও চাও না!

ইন্দিরা বললেন, সমস্যাটা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেই। সেখানে নৃশংস গণহত্যা চলেছে। তোমার দেশের সাংবাদিকরাই সে সব বিস্তৃত খবর প্রকাশ করেছে। আনটনি ম্যাসকারেনহাসের ‘দা রেপ অফ বাংলাদেশ’ নামে বই বেরিয়েছে, তাতে জেনারেল ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীকে হিটলারের নাৎসী বাহিনীর সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়েছে।

নিক্সন সূক্ষ্ম বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বললেন, এটা যদি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হয়, তাহলে তাতে আমাদেরও মাথা গলানো উচিত নয়। তোমাদেরও মাথা গলানো উচিত নয়, তাই নয় কি?

ইন্দিরা বললেন, ইয়োর এক্সেলেন্সি, দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে সারা পৃথিবী উদ্বিগ্ন হয়। আর কোনো একটি দেশের মধ্যেই যদি সেনাবাহিনী লক্ষ লক্ষ সাধারণ নাগরিককে খুন করে, বিশেষ কোনো ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক মতবাদসম্পন্ন মানুষদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়, তা নিয়ে সারা পৃথিবীর মাথাব্যথা থাকবে না। এটা শুধু রাজনীতির প্রশ্ন নয়। মানবতার প্রশ্ন। এটা এখুনি বন্ধ করা দরকার। সে জন্য আপনাদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের নিবাচিত নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানী সামরিক শাসকরা অবিলম্বে আলোচনায় বসে। শেখ মুজিবকে মুক্তি দেবার জন্য আপনারাই চাপ দিতে পারেন।

নিক্সন বললেন, আমি এখনও বুঝতে পারছি না। সে জন্য ভারত এত বেশি চঞ্চল হচ্ছে কেন? এই বিষয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে তো আলোচনা হচ্ছেই।

ইন্দিরা বললেন, ভারতের বিচলিত হবার প্রধান কারণ এর মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে চলে এসেছে। আমরা এই বিপুল জনসংখ্যার ভার সহ্য করবো কী

নিক্সন বললেন, সে তো বটেই। সে তো বটেই। সেনেটর কেনেডি গিয়ে শরণার্থী শিবিরগুলি দেখে এসেছেন। আমরা তো খাদ্য দিচ্ছি, অর্থ সাহায্য দিচ্ছি, কম্বল পাঠাচ্ছি!

ইন্দিরা বললেন বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য আমরা পাচ্ছি বটে, কিন্তু পাকিস্তান তার জনসংখ্যা কমাবার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঠেলে ভারতে পাঠিয়ে দেবে, আর আমরা তাদের খাইয়ে পরিয়ে যাবো, এরকম কতকাল চলবে?

নিক্সন বললেন, প্রয়োজনে আমরা সাহায্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবো!

আরক্ত মুখে ইন্দিরা বললেন, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, ভারত গরিব দেশ ঠিকই, দেশের সমস্ত মানুষকেই আমরা খাওয়াতে পারি না, এর ওপর এক কোটি শরণার্থী এলে আমরা বিশ্বের সাহায্য নিতে বাধ্য। কিন্তু আমি আপনার কাছে ভিক্ষের পাত্র নিয়ে আসিনি। ভিক্ষের পরিমাণ। বাড়িয়ে দিতেও অনুরোধ করছি না। আমরা চাইছি, এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান। একদিকে আপনারা শরণার্থীদের জন্য সাহায্য পাঠাবেন, অন্যদিকে পাকিস্তানী অত্যাচারী সেনাবাহিনীর হাতে আরও অস্ত্র তুলে দেবেন, এ কেমন নীতি?

নিক্সন সহাস্যে বললেন, আপনার শাড়িটা অপূর্ব সুন্দর! ইন্ডিয়াতে কি এখনো মসলিন হয়? কাশ্মীরের সঙ্গে নাকি সুইটসারল্যান্ডের খুব মিল আছে?

পরদিন সেক্রেটারি অফ স্টেট রজার্সের সঙ্গে কিছুক্ষণ বৈঠক হলো ইন্দিরার, তাতে অনেক কিছু পরিষ্কার হলো। রজার্স চাঁছাছোলা মানুষ। তিনি দু’চার কথার পরই বললেন, সম্মানীয়া প্রধানমন্ত্রী কি জানেন যে আজ, আপনার সঙ্গে যখন আমি কথা বলছি, ঠিক এই সময়েই পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হিসেবে মিঃ ভুট্টো চীনে মিঃ চু-এন লাইয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন!

ইন্দিরা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, দিল্লিতে র আগে থেকে এর সামান্য ইঙ্গিতও পায়নি? ওয়াশিংটনের দূতাবাসও তাকে কোনো খবর দেয়নি!

রজার্স বললেন, কয়েক ঘণ্টা আগে পিকিং এয়ারপোর্টে প্রায় দু’হাজার চীনা তরুণ-তরুণী। গান গেয়ে মিঃ ভুট্টোকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন।

ইন্দিরার মুখে আবার অপমানের ছাপ পড়লো। তিনি আমেরিকায় পদার্পণ করার সময়ে তো কিছু ভারতীয় ছাড়া আমেরিকান জনসাধারণ তো তাঁকে কোনো সংবর্ধনাই জানায়নি! ভারতের প্রতি সাধারণ আমেরিকানদেরও কোনো সহানুভূতি নেই? দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলি অপদার্থ, তারা ভারতের বক্তব্য ঠিক মতন তুলে ধরতে পারে নি এখানকার জনগণের কাছে, অ্যামেরিকার গায়ক-শিল্পী-কবিরা বাংলাদেশ শরণার্থীদের জন্য চাঁদা তুলছে, প্রচার চালাচ্ছে, তা হলে তো এখানে সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ কিছু আছে।

রজার্সের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, চীন-পাকিস্তান-আমেরিকা মিলে একটা ত্রিপাক্ষিক শক্তি হতে চলেছে। কয়েকটা অদ্ভুত যোগাযোগও ঘটে গেছে এর মধ্যে। মাঝখানে প্রচারিত হয়েছিল যে মাও সে তুং-এর যোগ্য উত্তরাধিকারী লিন পি আও। এই লিন পি আও অত্যন্ত উগ্র আমেরিকা-বিরোধী, ভারতের উগ্রপন্থী নকশাল বিপ্লবীদেরও তিনি দ্রোণাচার্য। সেই লিন পি আও রহস্যজনক ভাবে হঠাৎ অন্তর্ধান করেছেন। কেউ বলছে তিনি গুরুতর অসুস্থ, কেউ বলছে মৃত, আবার কেউ বলছে হঠাৎ চীনের ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে তিনি চীন ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। মোট কথা, লিন পি আও সরে যাবার ফলে চীনে আমেরিকার প্রবেশের পথ তৈরি হয়ে গেছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে কিসিংগারের দৌত্যে নিক্সনের চীন-সফর আসন্ন। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে কোনো কারণেই বর্তমান পাকিস্তান সরকারকে পদচ্যুত করতে চায় না আমেরিকা। হিটলারের ইহুদি নিধনে আজও সমগ্র পশ্চিম দুনিয়া অশ্রু বিসর্জন করে, অসংখ্য বই লেখা হয়, ফিল্ম তোলা হয়, তার কারণ ইহুদিরা ধনী এবং শ্বেতাঙ্গ। এশিয়ার কয়েক লক্ষ গরিব মুসলমান-হিন্দু নিহত হলে মার্কিন সরকার তা নিয়ে মাতামাতি করতে যাবে কেন? গরিবরা তো এমনিতেই মরে!

নিক্সন নিজের মুখে যা বলতে চাননি, তা রজার্সকে দিয়ে বলালেন। পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার যে অস্ত্র সরবরাহের চুক্তি আছে, তা আমেরিকা রক্ষা করে যাবে, সে অস্ত্র পাকিস্তানীরা যেমন ভাবেই ব্যবহার করুক না কেন! সোভিয়েত ইউনিয়ানের সঙ্গে ভারতের মৈত্রী চুক্তি ছদ্মনামে সামরিক চুক্তি হয়েছে, সেই ভারত এখন আবার নির্লজ্জ ভাবে পশ্চিমী দেশগুলির কাছে সমর্থন চাইতে আসে কেন? ভারত কি গাছেরও খাবে, তলারও কুড়োবে?  মোটকথা, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের এখন যুদ্ধ বাঁধানো মোটেই সুবিবেচনার কাজ হবে না, পাকিস্তানের পক্ষে অনেক বন্ধু আছে। যুদ্ধ বাধিয়ে ভারত ভূখণ্ডে যদি সোভিয়েত ইউনিয়ানকে টেনে আনা হয়, তাহলে সেখানে আর একটি ভিয়েৎনাম হবে।

রজার্সের সঙ্গে বৈঠকের পর নিক্সনের সঙ্গে আবার নৈশভোজে মিলিত হলেন ইন্দিরা। আনুষ্ঠানিক সব কিছুই হলো, কিন্তু যুক্ত বিবৃতি বেরুলো না–অর্থাৎ ইন্দিরার আমেরিকায় আগমনের ফলাফল শূন্য।

ইন্দিরা ঠিক করলেন, আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে যতদূর সম্ভব সত্যিকারের বাস্তব চিত্রটি বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন। এটা ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক লড়াই নয়, সাময়িক প্রাধান্যের বিষয়ও নয়, এটা কয়েক কোটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন। পাকিস্তানে যা চলছে, তা জেনোসাইড, পৃথিবীর সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরই এটা বন্ধ করার জন্য প্রতিবাদ জানানো উচিত।

আমেরিকার প্রেস ও টি ভি অত্যন্ত শক্তিশালী মিডিয়া। আমেরিকার যুবসমাজ ভিয়েনাম যুদ্ধকে নৈতিক সমর্থন দেয়নি। এখানকার সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার সমর্থক, বিপন্নদের সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের কার্পণ্য নেই। সুতরাং জনমানসের প্রতিফলন হিসেবে মিডিয়া যদি প্রবল ভাবে চাপ দেয়, তা হলে আমেরিকান সরকার বর্তমান নীতি বদল করতে বাধ্য হতে পারে।

সেই জন্যই ইন্দিরা বক্তৃতা করেছেন প্রেস ক্লাবে, গীর্জায়। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি এসেছেন নিউ ইয়র্কে। এখানে তিনি কলমবিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবেন, ন্যাশনাল নেটওয়ার্কে টি ভি সাক্ষাৎকারও নির্দিষ্ট হয়ে আছে।

হোটেলে পৌঁছে ইন্দিরা নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন।

কিছু ভারতীয় এখানেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে। খানিক পরে স্নান সেরে তিনি তাদের সামনে এসে বসলেন। তাদের নানা প্রশ্নের উত্তরে ইন্দিরা যুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন। একবারও পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশ নামটি উচ্চারণ করলেন না। বারবার জোর দিয়ে বললেন, মনে রাখবেন আমরা গরিব হলেও কিছুতেই আত্মসম্মান বিসর্জন দেবো না। স্বাধীনতার চব্বিশ বছরে ভারত গণতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে, এ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো বৃহৎ শক্তির কাছে মাথা নিচু করেনি।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতায় ইন্দিরার সুর অনেক চড়া হলো। তিনি বললেন, ভারত ও পাকিস্তানের দায়িত্ব সমানভাবে দেখার চেষ্টা করছে আমেরিকান সরকার, এটা কী ধরনের যুক্তি? পাকিস্তান তার নিজের লোকদের মারছে, সেখানকার জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ বাধ্য হয়ে এসে আশ্রয় নিচ্ছে ভারতবর্ষে, মানবিকতার খাতিরে ভারত তাদের খাওয়াচ্ছে-পরাচ্ছে, এর কোনোটাই তো অসত্য নয়! তবু এই সংকট সৃষ্টিতে ভারত ও পাকিস্তানের সমান দায়িত্ব!

টি ভি সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা বললেন, ভারতের ধৈর্যের একটা সীমা আছে! চীন এবং আমেরিকা পাকিস্তানকে অস্ত্র সাহায্য করলেও কিছু আসে যায় না, ভারত এই সমস্যার সমাধান। করবেই! সবাই রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতাদের সঙ্গেই আলোচনা করে সে সমাধান আনতে হবে! পশ্চিম পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন, অথচ আমেরিকান সরকার ওঁর মুক্তির জন্য কোনো চেষ্টাই করবে না?

আমেরিকা থেকে ইন্দিরা এলেন ফ্রান্সে। প্যারিসের ওর্লি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানালেন প্রধানমন্ত্রী জর্জ পঁপিদু।

অল্প বয়েসে সুইজারল্যান্ডে থাকার সময় ইন্দিরা ফরাসী ভাষা ভালোই রপ্ত করেছিলেন। দোভাষীর দরকার হলো না, পঁপিদুর সঙ্গে সরাসরি কথা শুরু করলেন। জর্জ পঁপিদু সংস্কৃতিবান পুরুষ, রূপসী নারীদের প্রতি ফরাসীদের আদিখ্যেতা সুবিখ্যাত, তিনি মহা আড়ম্বরের সঙ্গে ইন্দিরার সংবর্ধনার ব্যবস্থা করলেন। তার উত্তরে ইন্দিরা বললেন, প্রত্যেকবার ফরাসী দেশে এলেই তাঁর শিহরন হয়। কারণ, ফ্রান্স তো শুধু একটি দেশ নয়। ফ্রান্স তার চেয়েও বড়। ফ্রান্স একটি আদর্শ। সারা পৃথিবীতে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রথম দেখিয়েছে এই দেশ।

ইন্দিরার বাবার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল জর্জ পঁপিদুর। ইন্দিরার প্রতি তাঁর ব্যবহার কিছুটা স্নেহমিশ্রিত। ইন্দিরা তাঁকে আন্তরিক ভাবে বললেন, আমি এখন কী করবো, তা বলতে পারেন? আমি যেন একটা আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছি। আমার দেশের অনেক লোক যুদ্ধ যুদ্ধ বলে লাফাচ্ছে। কিন্তু একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেও যে দেশটার সর্বনাশ হয়ে যাবে, তা কি আমি বুঝি না? এ দিকে প্রায় এক কোটি শরণার্থীর বোঝা কাঁধে নিয়ে বসে আছি। সত্যি কথা বলতে কি, এত লোকের ঠিকঠাক বাসস্থান এখনো আমরা দিতে পারি নি, খাদ্য। বণ্টনের ব্যবস্থাপনাতেও অনেক ত্রুটি আছে। অনেকে ছড়িয়ে পড়ছে শিবিরের বাইরে, তারা অনেকেই স্থানীয় ভাবে কম মজুরিতে কাজ করছে। এমনিতেই আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা বিরাট, তার ওপরে যদি এই সব শরণার্থীরা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে, তা হলে যে-কোনোদিন বিক্ষোভ শুরু হয়ে যাবে। এই শরণার্থীরা কবে দেশে ফিরবে তার যদি নিশ্চয়তা না থাকে, তা হলে স্থানীয় লোক কতদিন এদের সহ্য করবে? তার ওপরে আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সমস্যা আছে। তুচ্ছ উপলক্ষে দাঙ্গা বাধতে পারে। দাঙ্গা বাধাবার জন্য পাকিস্তানও চেষ্টা চালাবেই। শুধু পশ্চিম বাংলাতেই এ পর্যন্ত এক হাজার পাকিস্তানী চর ধরা পড়েছে। হঠাৎ যদি সারা দেশে বড় আকারের দাঙ্গা বেধে যায়, তা হলে কত অসহায় মানুষ যে মরবে তার ইয়ত্তা নেই। এই অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা কিছুতেই জিইয়ে রাখা যায় না।

পশ্চিমী শক্তিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে বড় কোনো আশ্বাস দিতে পারলেন না। তবে পঁপিদু এইটুকু ভরসা দিলেন যে যুদ্ধ বাধলে ফ্রান্স কোনো অস্ত্র সরবরাহ করবে না পাকিস্তানকে। এবং শরণার্থীদের জন্য সাহায্য দানের পরিমাণ বাড়াবে।

প্যারিসে বসে ইন্দিরা একটি ভালো খবর পেলেন।

জনাব ভুট্টো পিকিং-এ গিয়ে চীনের নেতাদের সঙ্গে যতই দহরম মহরম করুন, চু-এন লাইকে খুশি করার যতই ব্যবস্থা নিন না কেন, তবু তিনি কোনো যৌথ বিবৃতি আদায় করতে পারেন নি। গোপন সংবাদ ছিল এই যে ভারত যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ানের সঙ্গে কুড়ি বছরের মৈত্রী চুক্তি করেছে, সেরকম পাকিস্তানও চীনের সঙ্গে একটা মৈত্রী চুক্তি আদায় করতে চায়, যাতে পাকিস্তানের বিপদে চীন সামরিক শক্তি নিয়ে পাশে দাঁড়াতে নৈতিক ভাবে বাধ্য থাকে। কিন্তু চীনের নেতারা প্রকাশ্যে অন্তত সেরকম কোনো চুক্তি ঘোষণা করেন নি। ভুট্টোর দৌত্যকেও খুব সার্থক বলা যায় না।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার খুব ইচ্ছে ইন্দিরার। দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে বিশাল সৈন্যবাহিনী মোতায়েন খরচ তা হলে কমানো যায়। দেশের উগ্রপন্থী বিপ্লবীদেরও তাতে ঠাণ্ডা করা যাবে। চু-এন লাইয়ের সঙ্গে তিনি একবার আলোচনায় বসতে চান। পঁপিদুকে তিনি। অনুরোধ করলেন, এই ব্যাপারে যদি কোনোরকম মধ্যস্থতা করে সাহায্য করতে পারেন।

প্যারিস ছাড়ার আগে ইন্দিরা গেলেন পিতৃবন্ধু, প্রখ্যাত লেখক আন্দ্রে মালরোর সঙ্গে দেখা করতে। এককালে তিনি ফরাসী সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। যথেষ্ট বয়েস হয়েছে মালরোর, তবু সব ব্যাপারেই উৎসাহ প্রবল। তিনি বললেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধীনতা চাইছে, কেন ওদের স্বাধীনতা দেওয়া হবে না? আমি সব সময় স্বাধীনতার সমর্থক। বাংলাদেশ নিয়ে যুদ্ধ বাধলে আমি নিজে বন্দুক নিয়ে ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবো।

আলাপচারির সময় ইন্দিরাকে একটু বোর্দোর বিখ্যাত লাল মদ্য পান করাবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে করতে এক সময় মালরো মুচকি হেসে বললেন, এ বছর নোবল পুরস্কার পেল পাবলো নেরুদা। হুঃ! তুমি ওর কবিতা-টবিতা কিছু পড়েছো নাকি? সময় পেলে পড়ে দেখো!

এরপর পশ্চিম জার্মানিতে গিয়ে উইলি ব্রানটের কাছে প্রায় একইরকম কথা শুনতে হলো ইন্দিরাকে। নাৎসী অত্যাচারের স্মৃতি যে-দেশে এখনো, দগদগ করছে, তারাও এখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের নিধন নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে রাজি নয়। মানবতার চেয়েও রাজনীতি অনেক বড়।

ব্যথা এবং অপমানবোধের সঙ্গে সঙ্গে একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাও জেগে ওঠে। সেইরকম মনোভাব নিয়ে ইন্দিরা কুড়ি দিন পর ফিরে এলেন দিল্লিতে। এয়ারপোর্টে তাঁর ক্যাবিনেটের সদস্যরা প্রশ্ন তুললো, এরপর কী? যুদ্ধ ছাড়া আর কি কোনো সমাধান আছে?

ইন্দিরা বললেন, আমার এতগুলি দেশ ঘোরার একটাই সুফল আপনাদের জানাতে পারি। আমি সবাইকেই বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি যে পাকিস্তান সমস্যার কোনো জোড়াতালি সমাধান করা যাবে না। যদি সংকট মেটাতে হয়, পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের মতামত নিয়েই তা মেটাতে হবে। শরণার্থীদের আমরা তাদের দেশে ফেরত পাঠাবোই! আপনাদের এখন যুদ্ধের কথা চিন্তা করবার দরকার নেই। তার আগে দেশের মানুষদের বোঝানো দরকার, এই দুঃসময়ে কিছুতেই যেন জাতীয় সংহতিতে ফাটল না ধরে। কোনো রকম উস্কানিতেই যেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না বাধে। আপনারা যে যার এলাকায় গিয়ে এই কথা প্রচার করুন।

একজন প্রশ্ন করলো, আপনি এখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবেন না?

ইন্দিরা চুপ করে রইলেন। সাতচল্লিশ সালে ভারত দু’খণ্ড হয়েছে। এবার তিন খণ্ড হবে, সে দায়িত্ব তিনি কি সহজে নিতে পারেন? এরপর যদি আরও খণ্ড খণ্ড হতে থাকে? তাহলে ইতিহাস কি তাঁকে ক্ষমা করবে?

চুয়ান্নতম জন্মদিনটি তিনি নিরিবিলিতে বাড়িতে কাটালেন।

মাথার ওপর সব সময় যেন একটা বিরাট বোঝা। সীমান্তে সংঘর্ষ দিন দিন যেমন বাড়ছে, তাতে যে-কোনো সময় হঠাৎ যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। যুদ্ধ যদি লাগে, তা কতদিন চলবে? ভিয়েৎনামের দৃষ্টান্ত মনে পড়লেই আতঙ্ক হয়। এ বছর বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ দুর্বল হয়ে আছে, এর পর একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালাতে গেলে দেউলিয়া হয়ে যেতে হবে, দেশে চরম উচ্ছঙ্খলা আসবে, গণতন্ত্র উচ্ছন্নে যাবে। পশ্চিমী শক্তিগুলি সেটাই চায়।

দেশে ফিরে ইন্দিরা একটা ব্যাপার অনুভব করলেন। বিরোধী দলগুলি তাকে আর আক্রমণ। করছে না। যারা কংগ্রেসকে সমর্থন করে না, ব্যক্তিগত ভাবেও নেহরু-কন্যাকে অপছন্দ করে, তারাও নিজের দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অন্য দেশে অপমানিত বা প্রত্যাখ্যাত হতে দেখলে খুশি হয় না। এত সংকটের মধ্যেও ইন্দিরার সংযমকে প্রশংসা করতে হয়। সাম্প্রদায়িক দল কিংবা বামপন্থী দলগুলিও বাংলাদেশের প্রশ্নে সরকারবিরোধী নয়। বাষট্টি কিংবা পয়ষট্টির যুদ্ধের সময়ও সারা দেশে এরকম সর্বদলীয় ঐক্য দেখা যায় নি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের নির্যাতনে সকলেই আবেগমথিত।

একদিন কলকাতায় একটা জনসভা করতে এলেন ইন্দিরা।

পশ্চিম বাংলায় বিধানসভা ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়েছে, কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে পাঠানো হয়েছে সরকারি কাজকর্ম পরিচালনার জন্য। বামপন্থী দলগুলি এজন্য দারুণ ক্ষুব্ধ, তারা অবিলম্বে নির্বাচন দাবি করেছে। অতিবাম বিপ্লবী নকশালপন্থীরা এখনো পুরোপুরি দমিত হয়নি, চারু মজুমদার পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কলকাতায় গণ্ডগোল লেগেই থাকে।

কিন্তু এবার ইন্দিরাকে কেউ কোনো কালো পতাকা দেখালো না, বামপন্থীরা কোনো প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করেনি। ময়দানের বিশাল জনসভায় ইন্দিরার ভাষণের সময় সসম্ভ্রম নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগলো। সিদ্ধার্থ রায়ের কাছে আগেই ইন্দিরা খবর পেয়েছেন যে অনেক অকংগ্রেসীও তাঁর আজকের মিটিং শুনতে এসেছেন।

এই সভাতেও ইন্দিরা বাংলাদেশ সমস্যার কোনো স্পষ্ট সমাধানের ইঙ্গিত দিতে পারলেন না। যুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই। দেশের মানুষকে তিনি আরও আত্মত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানালেন।

মিটিং সেরে ইন্দিরা এলেন রাজভবনে। এখানে শিল্পী, সাহিত্যিক, চিত্রতারকাদের সঙ্গে তাঁর ঘরোয়া আলোচনার কথা। ময়দানে বক্তৃতা করে এসে ইন্দিরা কিছুটা ক্লান্ত। ওডিকলন দেওয়া পেপার ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে তিনি সামনের কয়েক জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি কেমন, আপনারাই বলুন, আমি শুনি। আচ্ছা, এখানে মিটিং শুরু হবার আগে যে কোরাস গান হয়, তা বছরের পর বছর একই রকম কেন? এখানে কি নতুন গান কিছু হয় নি? গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের পর আর কেউ গান লেখেন না?

এখন সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় কারুর মন নেই। কথায় কথায় যুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেই গেল। মাথার ওপরে যুদ্ধের ছায়া। কলকাতায় গত এক মাস ধরে নিয়মিত অপ্রদীপের মহড়া চলছে। সীমান্তসংঘর্ষ সীমান্ত ছাড়িয়ে প্রায়ই ঢুকে পড়ছে ভেতরে। এই তো কয়েকদিন আছে বয়ড়ার কাছে পাকিস্তানী স্যাবার জেটের সঙ্গে ভারতীয় ন্যাটের মুখোমুখি লড়াই হয়েছে, দুটি পাক বিমান শেষপর্যন্ত ভেঙে পড়েছে ভারতের ভূমিতে। এটা খবরের কাগজের গুজব বা আকাশবাণীর অতিশয়োক্তি নয়, কারণ বন্দী পাইলট দু’জনের ছবিও ছাপা হয়েছে। ওদিকে হিলি সীমান্তে পাক ফৌজ অনেকখানি ঢুকে এসে সাধারণ নাগরিকদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই দাবি করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে তারা অনেক জায়গা দখল করে নিয়েছে, তাই-ই বা কতখানি সত্য। সর্বাত্মক যুদ্ধ কি আসন্ন?

ইন্দিরা বললেন, যুদ্ধ কবে হবে কিংবা আদৌ হবে কি না, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, যুদ্ধের চাপ আমরা সহ্য করতে পারবো কি না। সৈন্যরা হাতিয়ার নিয়ে লড়াই করে বটে, কিন্তু সিভিলিয়ানদেরও অনেক দায়িত্ব নিতে হয়। আমাদের দেশে কত রকম জটিল সমস্যা, সীমান্তে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী, এর মধ্যে আমাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখাই আসল দরকার।

তারপর তিনি স্মৃতিচারণের ভঙ্গিতে বললেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমি কিছুদিনের জন্য লণ্ডনে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। তখন লণ্ডনে নিয়মিত বোমা পড়ছে। তবু ব্রিটিশ সরকার সমস্ত কনসার্ট হলগুলো খোলা রাখতেন, লোকের টিকিট লাগতো না। বোমা পড়ার একটু বিরতি হলেই লোকে বাজনা শুনতে ছুটে যেত। উদ্বেগ, দুশ্চিন্তার সময় গানবাজনা শোনার খুবই উপকারিতা আছে। আপনারা যাঁরা লেখক-শিল্পী, আপনাদের দেখতে হবে, যাতে দেশের মানুষ যুদ্ধের উন্মাদনায় না মেতে ওঠে।

এই রকম কথা চলছে, হঠাৎ হলঘরের দরজায় সামনে পুরোদস্তুর সামরিক পোশাক পরা একজন শিখ এসে দাঁড়ালো। দু’একজন অবাক হয়ে ফিসফিস করে বললো, ইনি তো লেফটেনান্ট জেনারেল অরোরা। আর্মির ইস্টার্ন কমাণ্ডের প্রধান।

লেফটেনান্ট জেনারেল অরোরা একটা স্যালুট দিয়ে এগিয়ে এলেন ভেতরে। তারপর ইন্দিরার হাতে একটা চিরকুট দিলেন।

ছোট্ট একটি কাগজ, সেটি পড়তে এক মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। তবু ইন্দিরা সেটার দিকে চেয়ে রইলেন তিন-চার মিনিট। তারপর কাগজটা ভাঁজ করতে লাগলেন। আট ভাঁজ–ষোলো ভাঁজ করার পর সেটাকে ছিঁড়ে ফেললেন কুটি কুটি করে।

তাঁর মুখের একটা রেখাও কাঁপলো না। উত্তমকুমারের সঙ্গে তিনি একটা কথা বলতে বলতে থেমে গিয়েছিলেন, সেই কথাটা শেষ করলেন। এর মধ্যে চা-জলখাবার এসে গেল।

ইন্দিরা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা আমাকে মাপ করবেন, আমি বেশিক্ষণ আপনাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ আজ পাচ্ছি না। একটা জরুরি কাজে আমাকে এক্ষুনি দিল্লি ফিরতে হবে। আবার পরে কোনোও একদিন আপনাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করা যাবে। আপনারা চা খান। আমি আসি।

অরোরার সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন ইন্দিরা। ততক্ষণে সিদ্ধার্থ রায় এসেগেছেন সেখানে। তিনজনে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলেন। সিঁড়ির কাছাকাছি গিয়ে ইন্দিরা দৌড় মারলেন বাচ্চা মেয়ের মতন। বাইরে এসেই প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়লেন একটা জিপে। সোজা দমদম। সেখান থেকে এয়ার ফোর্সের প্লেনে দিল্লি।

এক ঘণ্টার মধ্যেই সারা কলকাতায় খবর ছড়িয়ে পড়লো যে পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান ভারতের পাঁচটি শহরে বোমারু বিমান নিয়ে আক্রমণ করেছে। পুরোপুরি যুদ্ধ লেগে গেছে। সেই জন্যেই প্রধানমন্ত্রী তাড়াহুড়ো করে ফিরে গেলেন দিল্লিতে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম পাটনায় রয়েছেন, তাঁকেও এক্ষুনি দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

কেউ কেউ অবশ্য বললো, ভারতই আগে অতর্কিতে পশ্চিম সীমান্ত আক্রমণ করে এখন পাকিস্তানের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে। যুদ্ধ লাগাবার এটাই নিয়ম। কোনো দেশই নিজেকে আক্রমণকারী বলে স্বীকার করতে চায় না। সারা বিশ্বকে জানায় যে আক্রান্ত হয়ে প্রতিরক্ষা করছে।

এর কিছু পরেই রাষ্ট্রপতি সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করলেন।

ঠিক মধ্য রাতে ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ দিলেন। ভারত-পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

যুদ্ধ, তা হলে সত্যিই লাগলো।

যুদ্ধে জয় বা পরাজয় যাই হোক, দু’পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয় সাঙ্ঘাতিক। অনর্থক মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদের অপচয় হয়, সহস্র সহস্র প্রাণের অপচয় হয়, তবু মানুষ যুদ্ধ করে। যুদ্ধের অস্ত্র গুলি যতক্ষণ দূরে গর্জায়, ততক্ষণ সাধারণ মানুষ যুদ্ধটাকে একটা উৎসব মনে করে যেন। বহুলোক ব্ল্যাক আউটের মধ্যেও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বোমারু বিমানের জন্য উৎসুক হয়ে রইলো। রেডিও চালু রইলো সারা রাত।

৫৮. ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার প্রায় এক কোণে একটা নির্জন জায়গা গাছপালা দিয়ে ঘেরা, কাছাকাছি কোনো পাকা বাড়ি নেই। সেখানে মস্ত বড় একটা শিশুগাছের তলায়, অনেকখানি। ভূগর্ভে কংক্রিট দিয়ে বানানো হয়েছে কয়েকটি ঘর। নভেম্বর থেকে এই নিরাপদ, গোপন। জায়গাটিতেই সরিয়ে আনা হয়েছে পূর্বাঞ্চলের আর্মি কমান্ডের সদর দফতর। উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার ছাড়া অন্যদের এখানে প্রবেশ নিষেধ। সেনাবাহিনীতে এর নাম ট্যাকটিক্যাল হেড কোয়ার্টার, সংক্ষেপে ট্যাক।

শীতের সন্ধ্যা, বাতাস নেই বলে গাছের একটি পাতাও নড়ে না। চতুর্দিকে কোনো শব্দ নেই। দু’ জন স্টাফ অফিসারের সঙ্গে জুতোয় শব্দ তুলে সেই শিশুগাছটার নীচে এসে পৌঁছোলেন জেনারেল নিয়াজী। বাংলার শীত তাঁর কাছে তুচ্ছ মনে হয়, তিনি গরম পোশাকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। তাঁর পরনে সামার ট্রাউজার্স, একটা ধূসর রঙের বুশ শার্ট এবং গলায় একটা সিল্কের স্কার্ফ জড়ানো। সরু সিঁড়ি দিয়ে তিনি নামতে লাগলেন মাটির নীচে। টিউব লাইটের আলোয় সেই ভূগর্ভও দিনের মতন উজ্জ্বল।

লম্বা করিডরের দু’পাশে ঘর। পর পর কয়েকটি ঘর পার হয়ে জেনারেল নিয়াজী ঢুকলেন একটি প্রশস্ত কক্ষে। সে ঘরের তিন দিকের দেওয়ালই বড় বড় মানচিত্র দিয়ে ঢাকা। এক পাশে সারি সারি কয়েকটি টেবিলের ওপর টেলিফোন ও ওয়্যারলেস সেট। মেজর জেনারেল সামসেদ, মেজর জেনারেল ফরমান, রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ এবং আরও তিরিশজন অফিসার সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। সকলেই গম্ভীর।

ঘরের মাঝখানে গটগট করে এসে দাঁড়িয়ে সেনাপতি নিয়াজী উচ্ছল গলায় বললেন, চীয়ার আপ! ফাইনালি দা ওয়ার হ্যাঁজ বিগান!

নিয়াজীর মুখে একটুও দুশ্চিন্তার রেখা নেই। বরং তিনি বেশ উৎফুল্ল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ লাগবে, কি লাগবে না বা কখন লাগবে, এই উদ্বেগ তাঁর সহ্য হচ্ছিল না। মাথার ওপর সর্বক্ষণ যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে বসে থাকার চেয়ে প্রকৃত যুদ্ধ করা একজন যোদ্ধার পক্ষে সহজ। যুদ্ধ যে একটা লাগবেই এ তো জানা কথা। অবশেষে এসেছে সেই সময়। ইন্দিরা গান্ধী যখন বিকেলে কলকাতার ময়দানে বক্তৃতা করছেন, তখনই রাওয়ালপিণ্ডি থেকে পাকিস্তান বেতারে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তলায় তলায় সবরকম প্রস্তুতি নিলেও তেসরা ডিসেম্বর মধ্যরাত্রির আগে যুদ্ধের কথা উচ্চারণ করেন নি, কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আর ধৈর্য রাখতে পারছিলেন না, নভেম্বরের শেষ দিকে রাজধানীতে একদল চীনা প্রতিনিধির সামনে তিনি হঠাৎ বলেছিলেন, এর পর আমাকে আর আপনারা এখানে পাবেন না। দশদিনের মধ্যেই হয়তো আমাকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে! সেই দশদিনও পূর্ণ হলো না। পূর্ব ও পশ্চিম, দু’দিকেই রণাঙ্গন খুলে গেল।

নিয়াজী নিজেও যুদ্ধ শুরু করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর আগে কয়েকবারই তিনি বলেছেন যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিশে সীমান্ত পেরিয়ে অনেকবার হামলা করেছে, তার সমুচিত জবাব দেবার জন্য তিনিও পশ্চিম বাংলার সীমান্তের ওদিকে বাহিনী পাঠিয়েছেন, বয়রা আর হিলিতে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়েছে, নিজেদের কয়েকটি বিমান ও ট্যাঙ্ক হারাতে হলেও ভারতীয়দেরও কম ক্ষতি হয় নি! নিয়াজীর আরও একটি ধারণা ছিল যে ভারতীয়রা আক্রমণ শুরু করবে পবিত্র ঈদের দিনে। সেদিন পাকিস্তানী সৈনিক ও কমাণ্ডাররা উৎসব পালনের জন্য অসতর্ক থাকবে। রাজধানী থেকেও এই মর্মে তাঁকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঈদের দিনে যুদ্ধ লাগিয়ে বাঙালী মুসলমানদের মনে যে আঘাত দিতে চাইবে না ভারতীয় পক্ষ, সে কথা তাঁদের মাথায় আসেনি।

সমবেত সেনানায়কদের কাছে নিয়াজী বললেন, এবার আর আন্তজাতিক সীমানা অতিক্রম করা না করার প্রশ্ন নেই! এখন খোলাখুলি যুদ্ধ। প্রতিপক্ষকে আমরা শুধু তাড়িয়ে নিয়ে যাবো না, যেখানে পাবো সেখানে মারবো। ইনসানাল্লা,এখন থেকে যুদ্ধ হবে ভারতের মাটিতে।

আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ওয়ার স্ট্র্যাটেজি আবার ঝালিয়ে নিলেন নিয়াজী। অনেক দিক বিবেচনা করে দুর্গ প্রতিরক্ষা ধারাটিই বেছে নিয়েছেন তিনি। এই নীতিতে সীমান্তের শহরগুলিকে দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। এক একটা দুর্গের মধ্যে শক্তি পুঞ্জীভূত করে রাখলে সেগুলিকে জয় না করে শত্রুপক্ষ এগোতে পারবে না। দুর্গে আত্মরক্ষাকারীদের দমন করতে হলে আক্রমণকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়া দরকার। এক একটা দুর্গ অবরোধ করে শত্রুপক্ষ যদি পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসতে চায়, তাতেও তাদের প্রচুর সৈন্য লাগবে। প্রথা অনুযায়ী আত্মরক্ষাকারীদের তুলনায় আক্রমণকারীদের সংখ্যা অন্তত তিনগুণ বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু ইস্টার্ন সেকটরে পাকিস্তানী বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী প্রায় সমান সমান। সুতরাং দুর্গ প্রতিরক্ষা নীতিতে ভারতীয়রা সুবিধে করতে পারবে না।

যশোর, ঝিনাইদহ, বগুড়া, রংপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, ভৈরববাজার, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামের দুর্গগুলিতে ৬০ দিনের গোলাবারুদ আর ৪৫ দিনের উপযুক্ত খাবার মজুত করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও অনেক ছোট ছোট শহরকে দুর্গ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়ে গেছে, শত্রু ঢুকবে কোন দিক দিয়ে?

উপমা দেবার জন্য জেনারেল নিয়াজী তাঁর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন সামনে। সগর্বে বললেন, আমার এই হাতের আঙুলের মতন আমার সৈন্যরা সমস্ত বড়ার আউটপোস্টে ছড়িয়ে আছে, সেখানে তারা যতদিন সম্ভব যুদ্ধ চালাবে, তারপর এই দেখুন, আঙুলগুলো গুটিয়ে আনার মতন, তারা দুর্গে ফিরে এসে শক্ত মুষ্টি তৈরি করবে, এই মুষ্টির আঘাতেই শত্রুর মাথা ভাঙবে!

এ ছাড়াও ফরাক্কা বাঁধের ধ্বংসসাধনের জন্য তৈরি হয়েছে কমান্ডো বাহিনী। রাজসাহীর দিক থেকে ইংলিশবাজারে ঢুকে পড়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত, চট্টগ্রামের প্রতিরক্ষাও এমনই সুদৃঢ় যে কোনোক্রমেই ঢাকার দিকে আসতে পারবে না ভারতীয়রা।

বক্তৃতা শেষ করে নিয়াজী সৈন্যাধ্যক্ষদের বললেন, আপনারা প্রতিটি যোদ্ধাকে জানিয়ে দিন যে লড়াই করতে হবে শেষপর্যন্ত, প্রাণপণে। শgs হাতে প্রাণ দিলে তারা শহিদ হবে, শত্রুর প্রাণ নিতে পারলে গাজী হবে। এখান থেকে আমাদের ফিরে যাবার কোনো পথ নেই। মওলা-এ-আলীর কৃপায় জয় আমাদের হবেই, পাকিস্তানকে আমরা অখণ্ড রাখবোই!

অফিসাররা মুখে স্বস্তির চিহ্ন নিয়েই ফিরলেন ট্যাক থেকে। তাঁরাও তো চাইছিলেন একটা কিছু হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। আটমাস ধরে বাংলার মাঠে-ঘাটে, জল কাদায় বিদ্রোহীদের পেছনে। ছোটাছুটি করে সাধারণ সৈন্যরা ক্লান্ত, তাদের মনোবল ভেঙে পড়ছিল। পশ্চিম থেকে যখন তাদের পুবে পাঠানো হচ্ছিল, তখন তাদের বোঝানো হয়েছিল যে তারা কাফের মারতে যাচ্ছে। পবিত্র ইসলাম এবং পাকিস্তানের সংহতিরক্ষার পুণ্য দায়িত্ব তাদের ওপর। কিন্তু কয়েক মাস পরেই তারা বুঝে গেল যে হিন্দুরা সব ভেগে পড়েছে, মুক্তিবাহিনীর প্রায় সবাই মুসলমান, লড়াইটা হচ্ছে মুসলমানের সঙ্গে মুসলমানের।

শিক্ষিত অফিসারদের একটা অংশ আরও একটি কারণে ক্ষুব্ধ। তারা স্বচক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা এতদিন ধরে দেখে নিজেরাই বুঝতে পেরেছেন যে সত্যিই তো পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় এই অঞ্চল অনেক ভাবে বঞ্চিত। ঢাকায় প্রচুর ঝি চাকর পাওয়া যায়, কারণ, এখানে অসংখ্য বেকার, পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় এখানে একজন ভৃত্যকে অর্ধেক মাইনে দিলেই চলে। মেয়েরা পর্যন্ত রাস্তায় ভিক্ষে করে। গ্রামের অধিকাংশ লোকের চেহারা হাড় জিরজিরে, এরকম তারা পশ্চিমে দেখেনি কখনো।

আর্মি-অফিসার হলেই সকলের বিবেক নষ্ট হয়ে যায় না। যাদের বিবেক আছে, তাদের বিবেকদংশনও হয় কখনো কখনো। গত আট-ন’ মাস ধরে যা চলছে, তাতে অনেকেই অনুতাপ ও লজ্জা বোধ করেন। পঁচিশে মার্চ ঢাকা থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চুপি চুপি পালিয়ে গেলেন। অনেকেই জানে সেদিনের ঘটনা। বিকেলবেলা ইয়াহিয়া খান ক্যান্টনমেন্টের ফ্লাগস্টাফ হাউসে গিয়েছিলেন এক চা-পানের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সূর্যাস্তের সময় আবার তিনি ফিরলেন প্রেসিডেন্ট হাউসে অতি আড়ম্বরময় শোভাযাত্রা করে। প্রথমে তাঁর দেহরক্ষী অশ্বারোহী দল, তারপর পাইলট জিপ, প্রেসিডেন্টের নিজস্ব চার-তারকা প্লেটসহ পতাকা লাগানো গাড়ির দু’পাশে সিকিউরিটির একাধিক গাড়ি, সবাই ভাবলো প্রেসিডেন্ট আসছেন। আসলে রফিক নামে একজন ব্রিগেডিয়ার প্রেসিডেন্ট সেজে বসেছিলেন সেই শোভাযাত্রার মধ্যমণি হয়ে। ইয়াহিয়া খান তখন একটা ডজ গাড়িতে ছুটছেন এয়ারপোর্টের দিকে। এ কেমন প্রেসিডেন্ট যাঁকে নিজের দেশের দ্বিতীয় রাজধানী থেকে গোপনে প্রস্থান করতে হয়? রাত্তির থেকেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করার আদেশ দিয়েছিলেন, তার আগেই তাঁর রাওয়ালপিণ্ডি পৌঁছে যাবার ব্যস্ততা।

তারপর এই ন’ মাসে প্রেসিডেন্ট আর একবারও এলেন না পূর্ব পাকিস্তানে? দেশের যেটা বড় অংশ, সেখানে সে দেশের প্রেসিডেন্ট এতদিনে একবারও আসতে পারেন না? পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর লুণ্ঠন-ধর্ষণ-গণহত্যার কাহিনীতে সারা পৃথিবী আন্দোলিত, লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করে চলে যাচ্ছে, অথচ এই রাষ্ট্রের যিনি সর্বময় কর্তা তিনি বসে রইলেন চোদ্দশো মাইল দূরে! পশ্চিমের কোনো রাজনৈতিক নেতাও এদিকে আসেন নি। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে জনাব ভুট্টোও এখানে এসে বাঙালীদের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহস করলেন না? বাঙালীরা বিক্ষুব্ধ, বিদ্রোহী, কিন্তু তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কেউ করবে না, সামরিক বাহিনী দিয়ে তাদের শাসন করতে হবে? এই কি ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ? বাঙালীদের মধ্যেও এখন কোনো গণ্য করার মতন নেতা নেই, গভর্নর আবদুল মালিক শুধু সামরিক শাসকদের পুতুল নন, একটা অকেজো, জং ধরা পুতুল। ন’মাস ধরে দেশের বৃহত্তম অংশের সাধারণ মানুষদের ওপর কর্তৃত্ব চালাচ্ছে শুধু আর্মি অফিসাররা। পূর্ব পাকিস্তান তো তা হলে সত্যিই নিছক একটা কলোনি, সেখানকার মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরাও এতদিনে এই অন্যায় শাসনের স্বরূপ বুঝতে পেরেছে, সেখানেও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। আর্মি অফিসাররাও বুঝতে পারছিলেন, এভাবে বেশিদিন চলে না।

প্রথম তিনদিনেই অনেকটা বোঝা গেল যুদ্ধের গতি কোন দিকে।

পাকিস্তানী বিমান কলকাতায় বোমা ফেলতে যায় নি, কিন্তু প্রথমদিনই পশ্চিম রণাঙ্গনে পাকিস্তান এয়ার ফোর্স সাতটি ভারতীয় ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে এলো। কলকাতার দিক থেকে ৩রা ডিসেম্বর রাত দুটো চল্লিশে ভারতীয় যুদ্ধবিমান উড়ে এলো ঢাকার আকাশে। মেশিন গান, হাল্কা মেশিন গান এবং অ্যাক অ্যাক গোলাবর্ষণ শুরু হলো সেই বিমান আক্রমণের প্রতিরোধে। পাকিস্তানী ফাইটার বিমানগুলি আকাশে উড়লো। গোলাবর্ষণের ফুলঝুরি আর আকাশে বিমানে বিমানে ডগ ফাইট দেখলো ঢাকার নাগরিকরা। পাকিস্তানী বিমান ভেঙে পড়লে তারা হাততালি দেয়, ভারতীয় বিমানে আগুন লেগে গেলে তারা হতাশার শব্দ করে। একদিনেই পাকিস্তানী এয়ার ফোর্সকে ৩২ বার যুদ্ধের জন্য শূন্যে উড়তে হয়, গোলা খরচ হয় ৩০ হাজার রাউন্ড। ভূমি থেকে বিমানবিধ্বংসী কামান ৭০ হাজার গোলা ব্যয় করে ফেলে। প্রথম দিন বেশ কিছু ক্ষয়-ক্ষতি সহ্য করে ফিরে যায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। পরদিন তারা আবার হানা দিল। অতর্কিতে, ছোট ছোট জঙ্গী বিমানের পাহারায় ১০টি মিগ ২১ এস, ৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের। ছ’খানা বোমা ফেললো ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ের ওপর। বিরাট বিরাট গর্ত সৃষ্টি হয়ে অকেজো হয়ে গেল সেই রানওয়ে। গর্ত ভরাট করতে না পারলে পাকিস্তানী স্যাবার জেটগুলি আকাশে উড়তে পারবে না। দ্রুত গর্ত মেরামতি শুরু করে দিল প্রকৌশলী বিভাগ, আর ভারতীয় বিমান যখন-তখন উড়ে এসে ঘায়েল করতে লাগলো মেরামতকারীদের, যতটা গর্ত বোজানো হয়, নতুন বোমার ঘায়ে তারচেয়ে আরও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়। অসহায় ভাবে ভূমিতে আটকে থাকা স্যাবার জেটগুলো পড়ে পড়ে মার খেতে লাগলো। ক্ষতবিক্ষত তেজগাঁ এয়ারপোর্টের রানওয়ে অকেজো হয়ে গেল একেবারে।

তেজগাঁ থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কুর্মিটোলায় আর একটি নতুন বিমানবন্দর তৈরি হচ্ছিল, রানওয়ের কাজ প্রায় শেষ, ভারতীয় বোমারু বিমান সেই রানওয়েটিও ধ্বংস করে দিয়ে গেল একই সঙ্গে। এর পরে সেকেন্ড ক্যাপিটালের নতুন চওড়া চওড়া রাস্তাগুলিকেই রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করার একটা মরীয়া প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু কিছু কিছু টেকনিক্যাল সমস্যায় সে প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়। ৬-ই ডিসেম্বর সকাল দশটার মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর যুদ্ধ শেষ। অবশিষ্ট ১৪ জন জঙ্গী পাইলট বেকার হয়ে বসে না থেকে বাম সীমান্ত দিয়ে কোনোক্রমে বেরিয়ে চলে গেল পশ্চিম রণাঙ্গনে। এরপর থেকে বাংলাদেশের আকাশে শুধু ভারতীয় বিমানের আধিপত্য।

পূর্ব পাকিস্তানে নৌবাহিনীর অবস্থা আরও করুণ।

পাকিস্তানী সাবমেরিন গাজীর ছিল ভয়াবহ খ্যাতি। যুদ্ধের শুরুতেই করাচী থেকে গাজী চলে এসেছিল অনেকখানি পথ, উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় ইস্টার্ন ফ্লিটকে চরম আঘাত হানার। কিন্তু বিশাখাপত্তন উপকূলের অদূরেই ভারতীয় ডেস্ট্রয়ার আই এন এস রাজপুত গাজীর সন্ধান পেয়ে গেল। গাজী আর রাজপুতের লড়াই চলেছিল অল্পক্ষণমাত্র, রাজপুতের ডেপথচার্জে গাজীর মতন শক্তিশালী সাবমেরিন টুকরো টুকরো হয়ে চিরকালের মত মিলিয়ে গেল সমুদ্রগর্ভে। এটা পাকিস্তানের পক্ষে দুভাগ্যই বলতে হবে। গাজীর অকাল মৃত্যুতে পাকিস্তানে নেমে এলো। শোকের ছায়া। এরপর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব দিকে নৌবাহিনীর আর কোনো সাহায্য পাঠাবার আশা রইলো না। বঙ্গোপসাগরে টহল দিতে লাগলো আই এন এস ভিক্রান্ত, তার ডেক থেকে ছোট ছোট সী হক বিমান উড়ে গিয়ে বারবার আঘাত হানলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে।

পূর্ব পাকিস্তানের নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল শরীফের অধীনে ছিল মাত্র গোটা কয়েক গানবোট আর ফ্রিগেট, আর কিছু বেসরকারি লঞ্চ দখল করে তাতে কামান বসিয়ে জোড়াতালি দিয়ে। বানানো নৌযান। এর বিরুদ্ধে নিযুক্ত রয়েছে ভারতীয় টাস্ক ফোর্সের বিমানবাহী জাহাজ, ডেস্ট্রয়ার ও ফ্রিগেট। ১৪টি সী হক, ২টি সী কিং, ২টি সাবমেরিন, একটি মাইন সুইপার। যুদ্ধের প্রথম দিকেই চট্টগ্রামের কাছে কুমিল্লা নামে গানবোট ভারতীয় বিমান আক্রমণে ডুবে গেল, ‘রাজসাহী’ অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় কোনোক্রমে বন্দরে ফিরে এলো। আর কোনো গানবোট বন্দর এলাকার বাইরে যেতে সাহস করেনি। খুলনাতেও কয়েকটি নৌযান বোমার আঘাতে ঘায়েল। হয়, বাকি কয়েকটিকে লুকিয়ে রাখা হয় জঙ্গলের মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তানে নৌযুদ্ধের প্রতিরোধেরও এখানেই শেষ।

বাকি রইলো শুধু স্থলবাহিনী।

পূর্ব পাকিস্তানে রয়েছে ১২৬০ জন অফিসার, ৪১,০৬০ জন বিভিন্ন শ্রেণীর সৈনিক নিয়ে গঠিত এক সুদক্ষ সেনাবাহিনী। এ ছাড়াও ৭৩ হাজারের একটি আধা সামরিক বাহিনী। পাকিস্তানী আর্মড ফোর্স বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই রাষ্ট্রের জন্মের অল্পকাল পর থেকেই সেনাবাহিনীর হাতে চলে এসেছে শাসনক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় বাজেটে প্রতি বছরই সেনাবাহিনীর জন্য বিপুল ব্যয় করা হয়েছে, আমেরিকা এবং পশ্চিমী দেশগুলি থেকে নিয়মিত অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র পেয়েছে। অফিসাররা সুশিক্ষিত, সাধারণ সৈনিকেরা সুশৃঙ্খল। এই শক্তিশালী পাকিস্তানী বাহিনীকে দমন করা মোটেই সহজ কথা নয়। তবু, প্রথম দু’দিন বীরোচিত লড়াই করেই পাকিস্তানী বাহিনী পশ্চাৎ অপসরণ শুরু করলো কেন?

পূর্বাঞ্চলে ভারতের পক্ষে রয়েছে ৭টি পদাতিক ডিভিশান। পশ্চিম পাকিস্তানের লড়াই ছাড়াও চীনা সীমান্ত জুড়ে ভারতকে বিপুল সংখ্যক সৈন্যকে নিযুক্ত রাখতে হয়েছে, যে-কোনো মুহূর্তে চীনা হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে নাগা-মিজো। বিদ্রোহীরা যাতে উদ্দাম হয়ে না ওঠে, সেজন্য সেখান থেকেও সৈন্য সরানো যায় না। সুতরাং বাংলাদেশ যুদ্ধের জন্য ভারতের পক্ষে ৭টি ডিভিশনের বেশী সেনা আনা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশ বাহিনী। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বাহিনী অনেকটা সংগঠিত হয়েছে, রয়েছে কে-ফোর্স, এস-ফোর্স আর জেড-ফোর্স নামে তিনটি ব্রিগেড। ৯টি সেকটরে ২০ হাজার সশস্ত্র বাঙালী সৈনিক। এবং ট্রেনিং প্রাপ্ত এক লাখ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। এবং সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ মানুষের সমর্থন।

এমনকি বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরাও ভারত বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। এই আট ন’মাসে গ্রামের নিরক্ষর লোকেরাও এল এম জি, স্টেনগান, বাংকার, মাইন এইসব চিনতে শিখে গেছে। চাষী, জেলে, ইস্কুলের ছেলেরা পর্যন্ত গোপন খবর এনে দেয়। মুক্তিবাহিনীকে। একটা আট বছরের ছেলে এক নম্বর সেকটরের কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলামকে একদিন ফিল্ড ম্যাপের ওপর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এই দ্যাখেন স্যার, বল্লভপুর গ্রাম। আর এইখানে একটা বড় পুকুর। মেসিনগানটা বসানো আছে এই পুকুরের ধারে। আর ইস্কুল বাড়িতে থাকে খানসেনারা। এই ধান ক্ষেতের ধারে মাইন বসানো আছে স্যার, কিন্তু এই ধারটা দিয়া আমি গরুবছর নিয়া যাই, কিছু হয় না, তাইলে ঐখানে মাইন পেতে নাই…

যে-দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ হচ্ছে, সেই দেশের জনসাধারণ আক্রমণকারীদের দেখলে জয়ধ্বনি দেয়, ফুলের মালা পরাতে আসে। আর নিজের দেশের সেনাবাহিনীকে দেখলে ঘৃণার চোখে তাকায়, দূরে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী সৈন্যরা জিতবে কী করে!

এই আট ন’ মাসে পাকিস্তানী সৈন্যরা অনেকটা লাগামছাড়া হয়ে গিয়েছিল। তারা। লুণ্ঠন-ধর্ষণ করেছে অবাধে, সামান্য ছুতোয় গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, তার ফলে তারা সৈনিকের তেজও হারিয়েছে। বিলাসিতা ও দুর্নীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে আর তা থেকে ফেরা যায় না। তা ছাড়া যুদ্ধের জন্য শুধু হাতিয়ার লাগে না, একটা কিছু চড়া ধরনের উন্মাদনারও প্রয়োজন হয়। শুধু ধর্মীয় উন্মাদনায় এতদিন টেনে রাখা যায় না।

প্রকৃত যুদ্ধে নেমে পড়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা উপলব্ধি করলো, কার জন্য তারা লড়াই করছে? দেশের যে-অংশ রক্ষা করার জন্য তারা প্রাণ দিতে যাচ্ছে, সেই অংশের অধিকাংশ মানুষই তাদের চায় না। এখানে ধর্ম অবান্তর। পাকিস্তানী সৈন্যরা ভারতীয় বাহিনীকে মোটেই ভয় পায় নি, তাদের প্রকৃত ভয় মুক্তি বাহিনীকে। ভারতীয়দের সঙ্গে তাদের লড়াই হবে সৈনিকের সঙ্গে সৈনিকের, তাতে জয়-পরাজয় আছে। কিন্তু মুক্তি বাহিনীর ছেলেরা আসছে মরিয়া হয়ে প্রতিশোধ নিতে, এই যুদ্ধ শুরু হবার অনেক আগেই তাদের অনেকের ভাই কিংবা বাবা নিহত হয়েছে, মা-বোন-স্ত্রী ইজ্জত হারিয়েছে। ওদের হাতে পড়লে ওরা যুদ্ধবন্দী রাখে না, সঙ্গে সঙ্গে কচুকাটা করে। সেইজন্যই যে-কোনো সম্মুখ যুদ্ধে হারের সম্ভাবনা দেখা দিলেই পাকিস্তানী সৈন্যরা চেঁচিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের বলে, আমরা আত্মসমর্পণ করছি, আমাদের বন্দী করো, আমাদের মুক্তিবাহিনীর হাতে দিও না!

যুদ্ধের সময় মিথ্যে প্রচার চলে খুব, অপরপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য। অনেক সময় তাতে নিজেদেরও বিভ্রান্ত হতে হয়। রেডিওতে বলা হচ্ছে যে ঝিনাইদহে প্রচণ্ড লড়াইয়ে ভারতীয়পক্ষ খুব মার খাচ্ছে, কিন্তু ঝিনাইদহের মানুষ দেখছে, সেখানে কোনো লড়াই-ই নেই, পাকিস্তানী সৈন্যরা দুদিন আগেই সেখান থেকে পালিয়েছে। মাটির তলায় ট্যাকে বসে নিয়াজী খবর পেলেন যে পশ্চিম পাকিস্তানে ভারতীয়রা সাঙ্ঘাতিক হারছে, অমৃতসর শহরের পতন হয়েছে। নিয়াজী দু’হাত ছড়িয়ে হুররে বলে উঠলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সেনাপতি, কিন্তু তাঁর হেড কোয়ার্টারের দেওয়ালে পশ্চিম পাকিস্তানের ম্যাপ, ঐদিকের যুদ্ধ সম্পর্কেই যেন তাঁর বেশি আগ্রহ। তিনি ধরে বসে আছেন যে পশ্চিম রণাঙ্গনে যদি অনেকখানি ভারতীয় ভূমি দখল করে ফেলা যায়, তা হলে তাই নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে দরাদরি করা যাবে!

দু’দিন পরেই জানা গেল, ওসব অমৃতসর দখল-খলের খবর ভুয়ো! এদিকে পূর্ব রণাঙ্গনে তাঁর বাহিনী প্রায় সর্বত্র পিছিয়ে আসছে, কয়েক জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিন্নভিন্ন। ভারতীয় বিমানবাহিনী নিয়মিত ঢাকার আকাশে এসে বোমা ফেলে যাচ্ছে, কিন্তু একটাও পাকিস্তানী বিমান আকাশে ওড়াবার উপায় নেই। জলপথে পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। পশ্চিম থেকে তিনি আরও আটটি পদাতিক ব্যাটেলিয়ান চেয়েছিলেন, নভেম্বরের মধ্যে মাত্র পাঁচটি পেয়েছেন, বাকি তিনটি আর আসতে পারবে না। আকাশ কিংবা সমুদ্রপথ দিয়ে আর কোনো সাহায্য পাবার আশা নেই।

হাসিখুশী, উচ্ছল স্বভাবের এই সেনাপতি গুম হয়ে গেলেন হঠাৎ।

চতুর্থ দিনে গভর্নর আবদুল মালিক ডেকে পাঠালেন নিয়াজীকে। চতুর্দিকে প্রবল পরস্পরবিরোধী গুজব, তিনি যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা জানতে চান। তাঁরও প্রাণের ভয় ধরে গেছে।

দু’জন সিনিয়র অফিসার নিয়ে নিয়াজী এলেন গভর্নর হাউসে। একটি নিভৃত কক্ষে তাঁদের মিটিং শুরু হলো। যুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলতে বলতে হঠাৎ নিয়াজী চুপ করে গেলেন, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন গভর্নরের মুখের দিকে। আর কিছুই বলেন না, সে এক অস্বস্তিকর নীরবতা।

কিছু একটা বলতে হবে বলেই গভর্নর মালিক বললেন, জেনারেল সাহেব, জীবনে উত্থান-পতন তো থাকেই। এক সময় যার কপালে অনেক যশ আসে, তাকেই হয়তো এক সময় পরাজয়ের অমর্যাদা মেনে নিতে হয়। আবার অবস্থা বদলে যায়।

নিয়াজীর বিশাল শরীরটা কাঁপছিল, দু’হাতে মুখ ঢেকে তিনি শিশুর মতন কেঁদে উঠলেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে!

বৃদ্ধ মালিক সাহেবেরও চোখে জল এসে গেল। তিনি নিয়াজীর পিঠে হাত রেখে আপ্লুত স্বরে বললেন, মনের জোর হারাবেন না, জেনারেল। মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখুন!

একজন বাঙালী ওয়েটার ট্রে-তে করে কফি আর স্যান্ডুইচ নিয়ে ঘরে ঢুকলো সেই সময়। নিয়াজীর সঙ্গী দু’জন অফিসার লাফিয়ে উঠে তাকে বললো, এই যা, যা, বেরিয়ে যা ঘর থেকে!

ওয়েটারটি বাইরে এসে ফ্যালফেলে চোখে অন্যদের বললো, সাহেবরা ভিতরে কান্নাকাটি করতেছে!

দু’তিনজন ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বললো, এই চুপ! চুপ! এসব কথা কারুকে বলিস না!

পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধনীতি সম্পূর্ণ বিপরীত। হেড কোয়ার্টারের নির্দেশে নিয়াজী চেয়েছিলেন যুদ্ধটাকে যতদূর সম্ভব প্রলম্বিত করতে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাইরের অন্যান্য দেশ এসে মাথা গলাবে, রাষ্ট্রপুঞ্জে বিতর্ক হবে, পররাজ্য আক্রমণকারী হিসেবে ভারতকে দোষী করা যাবে। আর ভারতীয়পক্ষ ঠিক এই সবকটি ঝামেলা এড়াবার জন্যই ঠিক করেছিল, এই যুদ্ধ শেষ করতে হবে ঝড়ের বেগে। সেইজন্য প্রথম দিন থেকেই তারা নিয়োগ করেছে সর্বশক্তি। সেকটর কমান্ডাররা জেনে গিয়েছিলেন যে দু’সপ্তাহের বেশি এই যুদ্ধ কিছুতেই চলতে দেওয়া হবে না!

বেশ কয়েকটি বড় রকমের পরাজয়ের খবর এলেও নিয়াজী আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলেন দুদিন বাদেই। তিনি ভূগর্ভ ট্যাকেই অধিকাংশ সময় কাটাচ্ছিলেন, তাঁকে কেউ দেখতে পায় না। সেইজন্য গুজব রটে গেল সেনাপতি নিয়াজী ভয় পেয়ে নিজের বাহিনীকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে হেলিকপটারে করে পালিয়ে গেছে। এই গুজব নিয়াজীর আত্মাভিমানে বড় আঘাত দিল। তিনি দর্পের সঙ্গে বেরিয়ে এলেন সুড়ঙ্গ থেকে।

বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের লোকজন ঢাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে রেড ক্রস থেকে নিরপেক্ষ এলাকা বলে ঘোষণা করেছে, ভারতীয়রা। সেখানে বোমাবর্ষণ করবে না বলে অনেকে এসে আশ্রয় নিচ্ছে সেখানে। বিদেশী সাংবাদিকরাও আর ঢাকায় থাকতে চাইছে না। কারণ ঢাকায় বসে যুদ্ধের প্রকৃত খবর কিছুই জানা যায় না।

ট্যাক থেকে বাইরে আসবার আগে নিয়াজী নিজে রাওয়ালপিণ্ডির সঙ্গে একবার ফোনে কথা বলে নিলেন। প্রত্যেকদিনই হেড কোয়ার্টার থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে শ্বেত ও পীত বন্ধুরা এবার পাশে এসে দাঁড়াবে। উত্তরের পাহাড় থেকে নেমে আসবে চীনে সৈন্যরা আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে এসে ঢুকবে আমেরিকার সেভেনথ ফ্লিট। নিয়াজী অধৈর্যের সঙ্গে রাওয়ালপিণ্ডিতে জেনারেল হামিদের ব্যক্তিগত সচিবকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের বন্ধুদের জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? উত্তর এলো, ছত্রিশ ঘণ্টা!

ঢাকা ছেড়ে গাড়িতে, হেলিকপটারে পালাচ্ছে বিদেশীরা। নিয়াজী এরই মধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পোঁছে কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কে বলেছে আমি পালিয়েছি? আমি তার নাম জানতে চাই!

কেউ ভয়ে কোনো উত্তর দিল না।

এরপর নিয়াজী এলেন হাসপাতাল পরিদর্শনে। সেখানে ঢুকতেই একডজন পাকিস্তানী নার্স ঘিরে ধরলো তাঁকে। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে সেই রমণীদের। মুক্তি বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাদের কী অবস্থা হবে সে দৃশ্য কল্পনা করেই তারা কাঁপছে। বাঙালী মেয়েদের ওপর যে পাকিস্তানী সৈন্যরা ধর্ষণ করেছে, তার কিছু কিছু বাস্তব প্রমাণ তো এই নার্সরা স্বচক্ষে দেখেছে।

নার্সরা নিয়াজীকে বললো, বর্বর মুক্তিসেনাদের হাত থেকে আমাদের বাঁচান। আমাদের হেলিকপটারে করে বামা পাঠিয়ে দিন।

যুবতী নারী দেখলেই নিয়াজী রঙ্গ-রসিকতার লোভ সামলাতে পারেন না। কিন্তু আজ তাঁর সে মেজাজ নেই। তিনি রুক্ষ ভাবে বললেন, অত ঘাবড়াবার কী আছে? শিগগিরই বড় রকমের সাহায্য আসছে! যদি সাহায্য শেষপর্যন্ত না-ও আসে, তবু তোমাদের মুক্তি বাহিনীর হাতে পড়তে হবে না। তার আগে, আমরাই তোমাদের মেরে ফেলবো!

সেখান থেকে নিয়াজী চললেন ক্যান্টনমেন্টের দিকে। বিমানবন্দরের বাইরে একদল বিদেশী এসে ভিড় করে আছে, কখন হেলিকপ্টার পাবে সেই আশায়। নিয়াজী সেই ভিড় ঠেলে দেখতে গেলেন প্রতিরক্ষার কামানগুলো কী অবস্থায় আছে।

ভিড়ের মধ্যে রয়েছে কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক। নিয়াজীকে দেখে তাদের ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। তাদের মধ্যে একজন হেঁকে জিজ্ঞেস করলো, জেনারেল, ভারতীয়রা দাবি করছে শিগগিরই তারা ঢাকায় পৌঁছে যাবে। এটা কতদূর সত্যি? তারা সঠিক কতটা দূরে আছে?

নিয়াজী ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি নিজেই গিয়ে দেখে আসুন না!

সেই সাংবাদিকটি আবার জিজ্ঞেস করলো, আপনি আপনার দিকের কী অবস্থা সেটা অন্তত বলুন!

নিয়াজী বললেন, আমি আমার শেষ সৈন্যটি নিয়ে, শেষ গুলিটি থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ করবো। এটাই আমার কথা!

অন্য একজন প্রশ্ন করলো, ঢাকা মুক্ত রাখার মতন ফোর্স কি আপনার আছে!

নিয়াজী সগর্বে বুকে চাপড় মেরে বললেন, ঢাকার পতন যদি কখনো হয়, তবে তা হবে আমার মৃতদেহের ওপর! আমার এই বুকের ওপর দিয়ে ওদের ট্যাংক চালাতে হবে!

যুদ্ধের চতুর্থদিনে অগ্রগতি দেখে নিশ্চিত হয়ে ইন্দিরা গান্ধী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নামে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলেন। দিল্লির পার্লামেন্টে তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে এই ঘোষণা সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে গেল সারা দেশে। কলকাতায়, সীমান্তের ক্যাম্পগুলিতে, সীমান্ত ছাড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকরা আনন্দে কোলাকুলি করতে লাগলো, মিষ্টি খাওয়া আর খাওয়ানোর ধুম পড়ে গেল। পূর্ব ও পশ্চিমের পাকিস্তান আর জোড়া লাগবে না।

ভারত যখন স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন সমেত পূর্ব-ইউরোপের, সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলোও আর দেরি করবে না। বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, একটি বাস্তব সত্য। বাংলাদেশে পাকিস্তানী সৈন্যরাই এখন হানাদার বাহিনী। এখন একমাত্র লক্ষ্য হলো রাজধানী ঢাকা দখল করা। সেই শুভক্ষণটি আর কত দূরে?

৫৯. একটা নদীর বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে

একটা নদীর বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাবুল চৌধুরী। কাদামাখা খালি পা, হাঁটু পর্যন্ত গোটানো টাউজার্স, নানা জায়গায় ছেঁড়া, গায়ে কোনো জামা নেই, শুধু একটা হাতকাটা হলুদ সোয়েটার, তার কাঁধের কাছে শুকনো রক্তের কালো ছোপ, সেটা যেন একটা বড় মাকড়সার ছবি। গত সাত মাস সে চুল-দাড়ি কাটেনি। তার গৌরবর্ণ দীর্ঘ শরীরটি এখন একটা মরচে-পড়া লোহার দণ্ডের মতন। হাতে একটা এল এম জি, কোমরে গুলির বেল্ট, সে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। শীতের বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তবে আলো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তের-চোদ্দ বছরের কিশোর শফি, তারও হাতে একটা রাইফেল। ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলো, বাবুল ভাই, অরা চীনা?

বাবুল কোনো উত্তর দিতে পারলো না। তার বুকের মধ্যে যেন ঝড় বইছে, প্রচণ্ড আবেগে কাঁপছে ঠোঁট। সে নিজে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রায় দশ বারোটি বিমান গম্ভীর গর্জনে অনেক নিচে নেমে এসে চক্কর দিচ্ছে, তার থেকে নেমে আসছে ছত্রী সৈন্য বাহিনী। সত্যিই কি চীন তা হলে পাকিস্তানের সমর্থনে সসৈন্যে এগিয়ে এলো? কদিন ধরেই এরকম জোর গুজব! বাবুলের মন ভেঙে যাচ্ছে। দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের আশার প্রতীক চীন, তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লবী চেতনার প্রধান প্রেরণা চীন, সেই চীন পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মারবে? চীনা সৈন্যের সঙ্গে শেষপর্যন্ত যুদ্ধ করতে হবে বাবুলকে? রাষ্ট্রপুঞ্জে চীন পাকিস্তানীদের পক্ষে ওকালতি করেছে, মার্কিনীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মাঝপথে। যুদ্ধ থামাবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত যুদ্ধেও যোগ দেবে?।

শফি বললো, বাবুল ভাই, হানাদাররা অগো দিকে গুলি ছোঁড়ে না! চীন তাইলে আইস্যা পড়লো!

বাবুল শফির কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরলো।

টাঙ্গাইলের সাদা রঙের সার্কিট হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানী মেজর জেনারেল কাদির। আশা-নিরাশায় তার বুকটা ধকধক করছে। তা হলে শেষ পর্যন্ত এসে পড়লো বহু প্রতীক্ষিত সেই সাহায্য। রাওয়ালপিণ্ডি থেকে ঢাকায় জেনারেল নিয়াজীকে বারবার চীনা সহযোগিতার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে চীনারা আসবেই। এর মধ্যে মৈমনসিং ও জামালপুর দুর্গের পতন হয়েছে, মেজর জেনারেল কাদিরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পিছিয়ে আসার। এক মাইন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে লেফটেনান্ট কর্নেল সুলতানও কোনোক্রমে এসে পৌঁছেছে টাঙ্গাইলে, তার দুর্ধর্ষ ৩১ নং বালুচ বাহিনী ছিন্নভিন্ন। ঢাকা-টাঙ্গাইল রাস্তাটি মাইনে কণ্টকিত। ভারতীয়রা ঘিরে আসছে চতুর্দিক থেকে, মুক্তিযোদ্ধারা পলায়নপর পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি করে দিচ্ছে প্রচণ্ড।

রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়ে জেনারেল কাদির চেঁচিয়ে এক মেজরকে জিজ্ঞেস করলো, ওরা। কারা? খবর নিয়েছো? ওরা কালিহাতির দিকে নামছে!

মেজর সারওয়ার বললো, স্যার, সবাই বলছে ওরা চাইনিজ!

জেনারেল কাদির ধমক দিয়ে বললো, ওরা বলছে মানে কারা বলছে? প্লেনগুলো কাদের চিনতে পারছো? এগিয়ে গিয়ে দেখ!

মিনিট দশেকের মধ্যে হঠাৎ জ্বলে-ওঠা আশার মশালটি হঠাৎই নিবে গেল। চীনে নয়, ওরা ভারতীয়! বাংলার আকাশে এখন ভারতীয় বিমানবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য। চীনে বিমানদের এত সহজে তারা এতখানি ভেতরে আসতে দেবে কেন? ভারতীয় মিগ-২১ বিমানগুলি এখন। স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। মিগগুলি ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে আর অন্য বিমান থেকে নামছে ছত্রী সৈন্যরা। তাদের বাধা দেবার জন্য একটিও পাকিস্তানী বিমান নেই।

প্যারাসুটগুলো খুব কাছে আসার পর দেখা যাচ্ছে তাদের বহন করা অস্ত্রশস্ত্র। জেনারেল কাদির-এর পাশে দাঁড়ানো একজন অফিসার কপাল চাপড়ে বলে উঠলো, হায় আল্লা, ওটা কী। আসছে, ৩.৭ ইঞ্চি কামান?

অতবড় কামান এই পিছিয়ে আসা পাক বাহিনীতে নেই। টাঙ্গাইল রক্ষা করার কোনো ব্যবস্থাও নেই। অক্ষম ক্রোধে জেনারেল কাদির একটা স্টেনগান তুলে নিয়ে সেই প্যারাসুটগুলোর দিকে এক ম্যাগাজিন খালি করে দিলেন। একটাও লাগলো না, প্যারাসুট বাহিনী এখান থেকে গুলির সীমার অনেক বাইরে।

টাঙ্গাইলের একটা বিরাট বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে কাদের সিদ্দিকী আর তার দলবল। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাদের চোখমুখ উদ্ভাসিত, কয়েকজন হাতিয়ার নিয়ে লাফাচ্ছে উল্লাসে। তাদের কাছে আগেই খবর এসেছিল যে আজই ভারতীয় ছত্রীসেনা নামবে, আজই শুরু হবে টাঙ্গাইল শহর দখলের চুড়ান্ত লড়াই।

মিগ-২১ বিমানগুলি চক্কর দিতে দিতে খুব নিচু হয়ে দেখিয়ে গেল বাংলাদেশের পতাকা। তলা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা লতা-পাতায় আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে সংকেত জানালো।

প্রথমে মনে হলো প্লেন থেকে খসে পড়ছে কাগজের টুকরো। ভারতীয় বিমান এরই মধ্যে বাংলাদেশের সর্বত্র পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানিয়ে প্রচুর লিফলেট ছড়িয়েছে, এও যেন তাই। ক্রমেই সেই কাগজের টুকরোগুলো বড় হয়ে ফুলের মতন দেখায়, যেন আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমে ফুলের কুড়ি, তারপর হঠাৎ তা পাপড়ি মেলে, প্যারাসুট গুলো খুলে গিয়ে ছাতার মতন সেগুলি আস্তে আস্তে দুলতে থাকে। দুটি ফাইটার বিমান ঘুরে ঘুরে তাদের পাহারা দিচ্ছে। কালিহাতি আর পুংসির মাঝামাঝি তারা নামছে, সেখানে শত্রুপক্ষের কোনো কামান নেই, সে খবর আগেই পাওয়া গেছে। দূর থেকে ছত্রীবাহিনীকে আকাশপথে নামতে দেখেও এগিয়ে গিয়ে আক্রমণ করার সাধ্য এখানকার পাকিস্তানী বাহিনীর নেই, তারা এখন পশ্চাৎ অপসরণে ব্যস্ত।

মধুপুর, গোপালপুর, কালিহাতি থেকে শোলাকুরা পর্যন্ত পাকা সড়ক কাদের সিদ্দিকীর মুক্তিবাহিনী সম্পূর্ণ মুক্ত করে ফেলেছে। পাক বাহিনী তাড়াহুড়ো করে পিছু হটছে, যেসব জায়গায় সেতু ভাঙা, সেখানে রাশি রাশি পাটের বস্তা ফেলে কোনোক্রমে পার করাচ্ছে গাড়ি, প্রত্যেকটা গাড়ি মালপত্র এবং মানুষে এত ভর্তি যে জোরে যেতেও পারছে না। রাজাকার, আল বদর, আল শামস ও শান্তি কমিটির পাণ্ডারাও এখন প্রাণভয়ে সেনাদলের পিছু পিছু পালাতে চায়, কিন্তু গাড়িতে জায়গা নেই তাদের জন্য। তারা কেউ কেউ জোর করে গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করলে পাক সৈন্যরা লাথি মেরে কিংবা রাইফেলের বাঁট দিয়ে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে তাদের। বিশ্রী গালাগাল করছে। দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যারা দালালি করেছিল, এই তাদের পুরস্কার।

রাস্তার ধারে ধারে ওত পেতে আছে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা, সুযোগ পেলেই গুলিবর্ষণ করছে এই পলায়নপর দলের ওপর।

ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার ক্লের তাঁর বাহিনী নিয়ে জামালপুর দখল করে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে এসেছেন। তিনি এগোতে লাগলেন মধুপুরের দিকে। সেই বাহিনী, মুক্তি বাহিনী এবং ছত্রী বাহিনী তিন দিক থেকে আক্রমণ করলো টাঙ্গাইল শহর।

টাঙ্গাইল রক্ষার আর কোনো উপায় নেই দেখে পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার কাদির পালাতে লাগলেন কালিয়াকৈর-এর দিকে। ৯৩ ব্রিগেডের আর একদল সৈন্য ছত্রী বাহিনীর হাতে মার খেয়ে সেদিকেই আসছে। বড় সড়কের ওপরে এসে তারা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। মাথার ওপর যখন তখন এসে ভারতীয় বিমান মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে যাচ্ছে, মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী কখন কোন দিক থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ঠিক নেই, রাস্তায় মাঝে মাঝে মাইন বিস্ফোরণে উড়ে যাচ্ছে এক একটা গাড়ি। এরকম চল্লিশটা গাড়ি রাস্তায় উল্টে পড়ে আছে। টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী অজিত হোমের বেডফোর্ড গাড়িখানা পাক সেনারা জোর করে দখল করে নিজেরা ব্যবহার করছিল, প্রচণ্ড মাইন বিস্ফোরণে সে গাড়ির ইঞ্জিন উড়ে গিয়ে আটকে আছে একটা বড় গাছে।

যাদের আর লড়াই করার মতন মনোবল নেই, যারা পালাতেই ব্যস্ত, তাদের পক্ষে এতবড় দল নিয়ে চলাফেরা করা বিপজ্জনক, তাই ব্রিগেডিয়ার কাদির সবাইকে ছড়িয়ে পড়তে বললেন। আল্লার নাম নিয়ে যে-রকমভাবে পারে ঢাকায় পৌঁছবার চেষ্টা করুক। কাদির নিজের সঙ্গে রাখলেন মাত্র আটজন অফিসার ও আঠারো জন সৈনিক। এদের নিয়ে তিনি পাকা সড়ক ছেড়ে রাতের অন্ধকারে নেমে পড়লেন মাঠের মধ্যে।

গ্রাম্য রাস্তা মুক্তিবাহিনীর নখদর্পণে। ভারতীয়রাও মুক্তি বাহিনীর সাহায্য নিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানীরা জলকাদার মধ্যে নেমে দিকভ্রান্ত হয়ে গেল। গ্রামের মানুষের কাছ থেকেও কোনো সাহায্য পাবার আশা নেই, বরং তারা পাক সৈন্যদের দেখলেই মুক্তিবাহিনীকে খবর দিয়ে দেয়। তাই ছত্রভঙ্গ পাক সৈন্যরা পাগলের মতন এদিক ওদিক ছুটতে লাগলো, যে কোনো মানুষ দেখলেই তারা এলোপাথারি গুলি চালায়, অনর্থক সাধারণ মানুষ মরে। কিন্তু তারা গাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে, তাদের গুলির স্টক অফুরন্ত নয়, তাদের গোলাগুলি ফুরিয়ে যেতেই গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের তাড়া করে, শাবল-কোদাল বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মারে। এক সময় যারা নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর যখন-তখন অত্যাচার করেছিল, এখন তাদের হাতেই এইসব সৈন্যদের প্রাণ দিতে হয়। যাদের ভাগ্য ভালো, তারা যৌথ কমান্ডের সামনে পড়ে গিয়ে হাত তুলে চেঁচিয়ে বলে, আমাদের ধরো! আমাদের ধরো! যৌথ কমান্ডের হাতে বন্দী হয়ে তারা প্রাণে বেঁচে যায়।

ব্রিগেডিয়ার কাদিরের ছোট্ট দলটি পল্লীবাংলার জলকাদার মধ্যে এসে পড়ে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কোন দিকে কালিয়াকৈর? রাতের অন্ধকারে তারা অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পথ চলে, দিনের বেলা কোনো জঙ্গলে কিংবা ভাঙা বাড়িতে লুকিয়ে থাকে। এরকমভাবে দু’দিন কেটে গেল। সঙ্গে কোনো খাবার নেই, পানীয় জল পর্যন্ত নেই। এদো পানা-পুকুরের নোংরা জল খেতে গা ঘিনঘিন করে, কিন্তু উপায় নেই।

খালি পেটে পুকুরের জল চুমুক দিয়ে খেতে খেতে ব্রিগেডিয়ার কাদিরের বারবার বমি হতে লাগলো। দুর্বল শরীর নিয়ে আর হাঁটতে পারছেন না। বড় সড়কে না উঠলে ঢাকায় পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই, কিন্তু সেই প্রধান রাস্তা এখন শত্রুর দখলে। কালিয়াকৈর-এ তাঁদের একটা বাহিনীর অপেক্ষা করার কথা, সেই দলটাকে পেলে প্রাণপণ লড়াই করে কোনোক্রমে শত্রুর ব্যুহ ভাঙার শেষ চেষ্টা করা যায়। কিন্তু কালিয়াকৈর কতদূর?

অবসন্ন, পরিশ্রান্ত হয়ে ব্রিগেডিয়ার কাদির একটা বড় ঝোঁপের মধ্যে গিয়ে বসলেন। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে এসেছে। অভিমানে অশ্রু এসে যাচ্ছে তাঁর চোখে। তিনি সৈনিক, যুদ্ধ করতে ভয় পান না। যদি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে কাফের ও গদ্দারদের বিরুদ্ধে লড়ে প্রাণ দিতে হতো, তাতেও তিনি গৌরব বোধ করতেন। কিন্তু হাইকমান্ডের একি উল্টোপাল্টা নির্দেশ! কেন তাঁদের হঠাৎ পিছিয়ে আসার হুকুম দেওয়া হলো? এয়ার কভার ছাড়া, ট্যাঙ্ক বাহিনীর সহায়তা ছাড়া পিছিয়ে আসা যায়! নিয়াজী চাইছেন যে-কোনো উপায়ে ঢাকাকে রক্ষা করতে, কিন্তু কাদিরের বাহিনীর কাছে ঢাকা এখন মরীচিকা।

একজন অফিসার একটা গাছের ডাল ভেঙে এনে বললো, স্যার, এই পাতাগুলো চিবিয়ে দেখুন, একটু গলা ভিজবে।

কাদির সন্দিগ্ধভাবে বললেন, কী গাছ? যদি বিষাক্ত হয়?

অফিসারটি বললো, আমি আগে খেয়ে দেখেছি স্যার। টক টক খেতে।

কাদির হাত বাড়িয়ে সেই ডালটা নিয়ে তেতুলপাতা চিবোতে লাগলেন। কাদার মধ্যে থেবড়ে বসে তেতুলপাতা খাওয়াই তার নিয়তিতে ছিল।

আস্তে আস্তে তিনি বললেন, আমাদের দু-তিনজনকে যে-কোনো উপায়েই হোক ঝুঁকি নিয়ে খানিকটা এগিয়ে দেখতে হবে, ৯৩ ব্রিগেডের কোনো অংশ এদিকে আছে কিনা! তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পারলে আমরা এই অবস্থায় কদিন বাঁচবো? কে কে যেতে রাজি আছো?

প্রথম কেউ কোনো কথা বললো না, তারপর জাফর নামে একজন মেজর হাত তুলে বললো, আমি রাজি আছি স্যার। এ ছাড়া সত্যি আর উপায় নেই। ইনসানাল্লা,তাদের খুঁজে বার করবোই।

কাদির বললেন, তুমি পাঁচজন জওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে যাও! খুদা হাফেজ।

মেজর জাফর জওয়ানদের সঙ্গে নিয়ে গুঁড়ি মেরে সেই ঝোঁপ থেকে বেরুলো। ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। সামনেই একটা জলাভূমি, তারা নেমে পড়লো সেই ঠাণ্ডা কনকনে পানির মধ্যে। সেটা খুব গভীর নয়। সেটা পেরিয়ে এসে একটা মাঠ, কাছাকাছি কয়েকটা অর্ধ-দগ্ধ বাড়ি, জনমনুষ্য নেই। একটা তীব্র পচা গন্ধ নাকে এলো, ওখানে নিশ্চয়ই কয়েকটা লাশ পড়ে আছে। টর্চের আলো ফেলে দেখা গেল, একটা বাড়ির উঠোনে একটি মাঝবয়েসী উলঙ্গ স্ত্রীলোক, দুটি শিশু আর একজন বৃদ্ধ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, অন্তত চার-পাঁচ দিনের বাসী মড়া। এই পথ দিয়ে পাকবাহিনী যাওয়ার নির্ভুল চিহ্ন।

মাঠের অর্ধেকটা আসতেই দূরে একটা ক্ষীণ শব্দ পাওয়া গেল, কোনো গাড়ির হেডলাইটের একঝলক আলো। ঐখানে কোনো রাস্তা আছে, ঐ পর্যন্ত যেতেই হবে।

মাঠের মাঝখানে কয়েকটা ঝুপসি গাছ। তার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কান ফাটানো শব্দ, ছুটে এলো একঝাঁক বুলেট। সঙ্গে সঙ্গে জাফরের দলটা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে পজিশান নিল। একজন জওয়ান এর মধ্যেই মারা গেছে, একজন কাতরাচ্ছে।

দু’পক্ষের গুলি বিনিময় হলো পাঁচ মিনিট ধরে। জাফরের দলটা খোলা মাঠের মধ্যে, অন্যরা গাছের আড়ালে থাকার সুবিধে পেয়েছে। জাফরদের এখন পেছন ফিরে পালাবারও কোনো উপায় নেই, তবু দু’জন জওয়ান মাথাখারাপের মতন উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়োবার চেষ্টা করতেই ফুড়ে গেল গুলিতে। আরও একজন আগে মারা গেছে। একটা মৃতদেহকে আড়াল করে জাফর চেঁচিয়ে উঠলো, আই সারেন্ডার!

গাছের আড়াল থেকে লাইট মেশিনগান নিয়ে বেরিয়ে এলো বাবুল চৌধুরী আর শফি। মাত্র দেড়জন!

বাবুল এখন মুক্তিবাহিনীর কোনো বিশেষ সেক্টরে নেই। একটা গ্রাম থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে শফিকে নিয়ে সে একাই ঘোরে। পলাতক সৈন্যদের খুঁজে খুঁজে ধরাই তার কাজ। মাঝে মাঝে যখন তার গোলাবারুদ ফুরিয়ে যায় তখন মুক্তিবাহিনীর কোনো দলে এসে দু-তিন দিনের জন্য যোগ দেয়। তার কাছে খালেদ মশারফের দেওয়া পরিচয়পত্র আছে।

মাত্র দেড়জনকে দেখে মেজর জাফরের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করলো। আর একটু সাবধান হলে কি এদের খতম করা যেত না? হঠাৎ ঘাবড়ে গিয়ে একসঙ্গে এত ফায়ারিং করা মূখামি হয়ে গেছে। জাফরের কাছে আর গুলি নেই। সে মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে, তার সারা শরীর কাঁপছে। ইন্ডিয়ান আর্মি নয়, মুক্তিবাহিনীর লোক, এরা বন্দী রাখে না।

শফি বেশি উৎসাহে আগে এগিয়ে এসেছে, মেজর জাফর এক লাফ দিয়ে তার গলা চেপে। ধরে কাছে টেনে নিল। কোমর থেকে একটা ছুরি তুলে বললো, খবরদার, আমাকে ধরলে এই বাচ্চাটাকে শেষ করে দেবো!

পরিষ্কার জ্যোৎস্না রাত। পাঁচটা মৃত সৈনিক এদিক ওদিক ছড়ানো। বিশাল শক্তিশালী মেজর জাফর শফির গলা চেপে ধরেছে, জ্যোৎস্নায় চকচক করছে ছুরির ফলা। এল এম জি-টা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইলো বাবুল, তারপর কঠিন গলায় বললো, কিল হিম! কিল হিম! তোমরা পঁচিশ-তিরিশ লাখ বাঙালীকে মেরেছো, আরও একটা বাচ্চাকে মারবে, তাতে আর এমন বেশি কী হবে? শফি, তুই মরতে ভয় পাস?

শফি তার কৈশোরের সদ্য ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বললো, না বাবুল ভাই। ও আমারে মারুক, তারপর তুমি অরে কুত্তা দিয়া খাওয়াইও। জয় বাংলা! জয় বাংলা!

এল এম জি-টা উঁচু করে বাবুল বললো, ওর কথার মানে বুঝলে?

মেজর জাফর কুত্তা শব্দটা বুঝেছে। তারচেয়েও বাবুলের কণ্ঠস্বর তাকে ক্ষণেকের জন্য উন্মনা করে দিল। তারপরই সে শফিকে ঠেলে দিয়ে আবেগের সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো, চৌধুরী সাব! বাবুল চৌধুরী? ম্যায় মেজর জাফর…

বাবুল এবার এগিয়ে এসে ওর পেটে এক লাথি মেরে বললো, মেজর জাফর! ইদ্রিসের বাচ্চা! বল হারামজাদা, মনিরা কোথায়?

মাটিতে ছিটকে পড়ে জাফর বললো, আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও!

বাবুল তার কপালের ওপর এল এম জি র নলটা ঠেকিয়ে বললো, আগে বল, মনিরা কোথায়। আমার বাড়ি থেকে যে মেয়েটিকে তার লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল…

জাফর বললো, আমি জানি না! আল্লার কশম, আমি জানি না। তারা অন্য লোক, আমি তো তোমাকে বলেছিলাম…

বাবুল বললো, আমি ঠিক তিন গুনবো!

সে জাফরের বুকের ওপর একটা পা দিয়ে দাঁড়ালো।

পেছন দিক থেকে পাওয়া গেল অনেক পায়ের শব্দ। গোলাগুলির আওয়াজ শুনে। যৌথবাহিনীর একটি দল ছুটে এসেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের একজন বাবুলকে চিনতে পেরেছে, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সে উল্লাসে ফেটে পড়ে বললো, স্যার, আপনি একা এই সবকটাকে খতম করেছেন?

ইন্ডিয়ান কমান্ডার জাফরকে মারতে দিল না, অন্যদের সরিয়ে দিয়ে সে জাফরকে মাটি থেকে তুলে তার র‍্যাংক দেখে নিল। তারপর গম্ভীরভাবে বললো, মুক্তির ছেলেরা তোমাকে খুন করতে চায়। আন্তজাতিক আইন অনুযায়ী আমি তোমাকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে রাখতে পারি, যদি তুমি দেখিয়ে দাও তোমার সঙ্গীরা কোথায় আছে। তাতে যদি রাজি না থাকে, তা হলে আমি তোমাকে মুক্তিদের হাতে তুলে দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকবো!

একেবারে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে মেজর জাফর এমনই বিহ্বল হয়ে গেছে যে সে কোনো কথাই বলতে পারছে না। সে ইন্ডিয়ান কমান্ডারের হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে।

বাবুল বললো, কমান্ডার, ওকে আমার হাতে দিন। আমি ওকে ধরেছি। ওর সঙ্গে আমার। পার্সোনাল স্কোর মেটাবার আছে!

জাফর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, না, না, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি!

একজন জাফরের পিঠে একটা স্টেনগানের নল চেপে ঠেলতে লাগলো। জলাভূমির মাঝখানে এসে যৌথবাহিনীর সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়লো ঝোঁপটার চারদিকে, জাফরকে দিয়ে বলানো হলো সারেন্ডার করতে।

তার উত্তরে ছুটে এলো একঝাঁক বুলেট!

ভারতীয় কমান্ডারটি তবু নিজের দলকে আক্রমণ করতে নিষেধ করে চিৎকার করে বললো, পাকিস্তানী সিপাহীলোগ, হাতিয়ার ডাল দো! ইউ আর সারাউন্ডেড!

এবার ঝোঁপের মধ্য থেকে একজন কেউ সঙ্গীদের নির্দেশ দিল, স্টপ ফায়ারিং! স্টপ ফায়ারিং।

মুক্তিযোদ্ধারাই আগে অকুতোভয়ে ছুটে গেল ঝোঁপের মধ্যে। পলাতক পাকিস্তানী দলটির অস্ত্রগুলো কেড়ে নিয়ে তাদের চড় লাথি মারতে লাগলো রাগের চোটে!

ইন্ডিয়ান কমান্ডারটি জোরালো টর্চ ফেলে ব্রিগেডিয়ার কাদিরকে দেখে আনন্দে শিস দিয়ে উঠলো। পোশাকের তারকা দেখলেই চেনা যায় ব্রিগেডিয়ার। এত উঁচু র‍্যাঙ্কের বন্দী পাওয়া ভাগ্যের কথা!

তেঁতুলগাছের নিচে রক্তশূন্য মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রিগেডিয়ার কাদির। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তাঁকেও কয়েকটা চড় মেরেছে। একবার তিনি ভেবেছিলেন রিভলভারটা দিয়ে আত্মহত্যা করবেন। করাচীতে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার মুখ মনে পড়ে গেল। ইন্ডিয়ান আর্মির হাতে ধরা পড়লে তবু বেঁচে থাকার আশা থাকে।

রিভলভারটা ইন্ডিয়ান কমান্ডারের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিয়ে ব্রিগেডিয়ার ধরা গলায় বললেন, আমাকে মুক্তির হাতে দিও না! যদি মারতে হয় তুমি মারো!

ইন্ডিয়ান কমান্ডার বললো, তুমি জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী সবরকম সুযোগ সুবিধে পাবে। আমাদের জেনারেল মানেক শ’র ঘোষণা রেডিওতে শোনোনি?

শফি জাফরকে দেখিয়ে বললো, এই হারামজাদাটা আমারে ছুরি মারতে আসছিল। এরে শাস্তি দিবেন না?

বাবুল বুঝিয়ে বললো, এই কাপুরুষটি একটি বাচ্চার গলায় ছুরি চেপে ধরেছিল।

ভারতীয় কমান্ডারটি শফিকে কাছে টেনে এনে তার চুলে হাত দিয়ে আদর করতে করতে বাবুলকে বললো, এত ছোট বাচ্চাকে এই যুদ্ধের মধ্যে এনেছেন কেন? আপনারা আমরা লড়াই করছি, তাই কি যথেষ্ট নয়?

বাবুল বললো, এই ছেলেটির কোনো বাড়ি নেই। এর বাবা-মাকে এই শয়তানরা খুন করেছে। এরপর ওর লড়াই করা ছাড়া আর কি উপায় আছে বলো? ও রাইফেল চালাতে জানে!

শফি জাফরের একটা চোখের ওপর থুঃ করে একদলা থুতু ফেললো।

বাবুল তাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে গেল। তারপর বন্দীদের সার বেঁধে নিয়ে যাওয়ার যখন ব্যবস্থা হচ্ছে তখন সে আর শফি নিঃশব্দে সরে গেল মল দল থেকে।

এখন যেতে হবে কালিয়াকৈর। সেখান থেকে ঢাকা। সবাই জেনে গেছে যে শেষ লড়াইটা হবে ঢাকায়। সেখানে পথে পথে যুদ্ধ চলবে। বাবুল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখানে পৌঁছোতে চায়।

তারা আগে ফিরে গেল মাঠের মধ্যে সেই ঝুপসি গাছতলায়। এখানে বাবুলের কাঁধের ঝোলাটা পড়ে আছে। গাছতলায় বসে সে ঝোলা থেকে একটা পাঁউরুটি বের করে অর্ধেকটা ছিঁড়ে দিল শফিকে। গত দু দিন ধরে তারা বাসী, শুকনো পাঁউরুটি খেয়ে যাচ্ছে।

খেতে খেতে বাবুল জিজ্ঞেস করলো, কী রে শফি, এখন হাঁটতে পারবি, না একটু ঘুমিয়ে নিবি?

শফির সত্যি ঘুমে চোখ টেনে এসেছে, তবু সে বললো, না, হাঁটতে পারমু! দিনের বেলা ঘুমাবো।

বাবুল বললো, এক কাজ কর, ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নে। আমি পাহারা দিচ্ছি।

শফি বললো, তাইলে তুমি আগে ঘুমাও, আমি পাহারা দেবো।

কিছু একটা শব্দ পেয়ে বাবুল শফির মুখটা চেপে ধরলো। এমন ফটফটে জ্যোৎস্নার মধ্যে কেউ নিজেকে সম্পূর্ণ লুকোতে পারে না। পাকা সড়কের দিক থেকে অন্তত পাঁচজন লোক মাঠের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে এই দিকেই এগোচ্ছে। মৃদু ছড় ছড় শব্দ হচ্ছে মাটিতে।

এরা শত্রু না মিত্র সেটাই বোঝা শক্ত। মাঝে মাঝে এই ভুল হচ্ছে, ইন্ডিয়ান আর্মির সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি বিনিময় হয়ে যাচ্ছে।

শফিকে নিয়ে বাবুল গাছের আড়ালে চলে গিয়ে নিঃসাড়ে দাঁড়ালো। ওদের সে আরও কাছে আসতে দিতে চায়। ওরা এই গাছতলাতেই পৌঁছোতে চেষ্টা করছে।

যখন ওরা প্রায় পঞ্চাশ গজের মধ্যে এসে পড়েছে, তখন বাবুল নিঃসন্দেহ হলো যে এরা দলছুট পাকিস্তানী সৈন্য। প্রত্যেকেই লম্বা চওড়া, ইন্ডিয়ান আর্মির এ রকম মাত্র পাঁচ জন বুকে হেঁটে মাঠ দিয়ে আসবে না।

বাবুল একঝাঁক বুলেট বর্ষণ করলো। শফিও তার রাইফেল চালালো।

প্রতিপক্ষ উত্তর দেবার কোনো চেষ্টাই করলো না। একজন লাফিয়ে উঠে দু হাত উঁচু করে চ্যাঁচাতে লাগলো, সারেন্ডার! সারেন্ডার!

ধপাধপ করে তারা তাদের রাইফেল ও একটা স্টেনগান ছুঁড়ে দিল সামনে। বাবুল তবু ঝুঁকি নিল না। সে গাছের আড়াল থেকেই হুকুম দিল, সবাই মাথার ওপর হাত তুলে এগিয়ে এসো!

তিনজন এগোতে লাগলো সেইভাবে, দু’জন উঠতে পারলো না। যে তিনজন বেঁচে আছে, তাদের মধ্যে একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন। তারা কাছাকাছি আসতেই বাবুল আবার হুকুম দিল, এবার মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসো।

এবার বাবুল আর শফি গাছের আড়াল থেকে বেরুতেই সেই পাকিস্তানীরা বিস্ফারিত চোখে দেখলো দেড়জনক। একজন পেছন ফিরে পাগলের মতন দৌড়োলো হাতিয়ার কুড়িয়ে নেবার জন্য। শফিই নির্ভুল টিপে তাকে ফেলে দিল মাটিতে। ক্যাপ্টেনের পাশের লোকটি দারুণভাবে আহত, সে বসে থাকতে পারলো না, গড়িয়ে গেল মাটিতে। ক্যাপ্টেন হাতজোড় করে বললো, বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও!

বাবুল এগিয়ে এসে তাকে একটা লাথি কষিয়ে বললো, বল মনিরা কোথায়?

ক্যাপ্টেনটি হতভম্ব হয়ে বললো, কে? আমি তো জানি না মনিরা কে!

বাবুল তবু তাকে আর একটা লাথি মেরে বললো, শুয়ারের বাচ্চা, আগে বল মনিরাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?

একসময় বাবুল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যাতায়াত করতো। আগের মেজর জাফরের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। কিন্তু এই ক্যাপ্টেনটি সম্পূর্ণ অচেনা, তবু তাকে সে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলো মনিরার কথা।

লোকটি মার খেয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো, বাঁচাও, বাঁচাও!

বাবুল দাঁতে দাঁত চেপে বললো, শয়তান, আগে যখন বাঙালীরা এইভাবে দয়া চেয়েছে, তখন কারুকে ছেড়েছিস?

সঙ্গে একটা বন্দী নিয়ে যাওয়ার অনেক ঝামেলা। একে ছেড়ে দেওয়ারও কোনো মানে হয় না, একজনকে ছাড়া মানেই ঢাকায় আর একজন শত্ৰু বৃদ্ধি। নিজের বুলেট আর খরচ না করে সে শফিকে বললো, এই লোকটাই তোর বাবা-মাকে মেরেছে। একে শেষ করে দে!

শব্দটা হওয়ার পর বাবুল শফির কাঁধে হাত দিয়ে বললো, এখন আর ঘুম হবে না, চুল। একেবারে ঢাকায় পৌঁছে লড়াই শেষ করে ঘুমোবো।

৬০. টাঙ্গাইল শহর এখন সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত

টাঙ্গাইল শহর এখন সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত, সার্কিট হাউসের দখল নিয়েছেন মেজর জেনারেল নাগরা। আদালত ভবনের ঘরগুলোয় রাখা হয়েছে বন্দীদের, প্রতি ঘণ্টায় আরও বন্দীদের নিয়ে আসা হচ্ছে এখানে। পলাতক পাকিস্তানী বাহিনীর একটা দল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তুরাগ নদীর পাড়ে। সেখানে তাদের মোকাবিলা করছে যৌথ মিত্রবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার ক্লের। জামালপুর ও মৈমনসিং-এ পাকিস্তানী দুর্গের পতন হয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে পাক সৈন্যরা যাতে পিছু হটে ঢাকায় গিয়ে রাজধানী রক্ষায় অংশ নিতে না পারে সেই দায়িত্ব নিয়েছেন মেজর জেনারেল। নাগরা। টাঙ্গাইল না পেরিয়ে ওদের ঢাকা যাবার কোনো উপায় নেই।

নাগরা শুধু একটা ব্যাপারে অস্বস্তি বোধ করছেন, তাঁকে এখানে একটা সভায় বক্তৃতা করতে হবে। তিনি একজন পেশাদার সৈনিক, বক্তৃতা করার অভ্যেস নেই তাঁর। তা ছাড়া, তিনি একটা ব্যাপারে চিন্তিত। ঢাকা অবরোধ প্রথম মুক্ত করবে কে? তাঁর ডিভিশন ১০১ কমুনিকেশান জোন-এর ওপর দায়িত্ব দেওয়া ছিল, ঢাকার উত্তরে টঙ্গী পর্যন্ত পৌঁছে অবস্থান নেওয়া। সেইজন্যই ট্যাঙ্ক ও ভারী ধরনের অস্ত্রশস্ত্র তাঁর বাহিনীতে বেশি নেই। মূল পরিকল্পনায় ছিল যে আখাউড়ার দিক থেকে এগিয়ে আসা মিত্রবাহিনীই ঢাকার ওপর আঘাত হানবে। যশোর, খুলনা, বগুড়া, রংপুরের দিক থেকেও ভারতীয় পদাতিক বাহিনী গোলন্দাজ ও ট্যাঙ্ক স্কোয়াড নিয়ে এগিয়ে আসছে। কিন্তু মেজর জেনারেল নাগরাই সবচেয়ে আগে এসে পৌচেছেন ঢাকার খুব কাছে। ছত্রীবাহিনী নামিয়ে টাঙ্গাইল যে এত দ্রুত দখল করা যাবে, আগে কেউ ভাবেনি। কাঁদেরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী এখানকার অনেকগুলি ব্রীজ ভেঙে অনেকখানি পাকা সড়ক আগেই মুক্ত করে সুবিধে করে রেখেছিল। এখন মুক্তিবাহিনীর ছেলেরাও ঢাকা আক্রমণ করার জন্য ছটফট করছে।

এদিককার মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকীর পেড়াপীড়িতে নাগরাকে সংবর্ধনা সভায় যেতেই হলো। বিন্দুবাসিনী স্কুলের মাঠে কয়েক লক্ষ মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। উল্লাসের চিৎকার আর জয়ধ্বনিতে কান পাতা দায়। বহু নারী-পুরুষ ছুটে এসে নাগরাকে মালা পরাতে লাগলো, মালার বোঝায় তাঁর নুয়ে পড়ার উপক্রম। শেষপর্যন্ত মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা অন্যদের আটকে কোনোক্রমে মঞ্চে তুললো ভারতীয় সেনাপতিকে।

সেই বিশাল জনসমুদ্রের দিকে বেশ কয়েক মিনিট নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন নাগরা। যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, একটু কান পাতলে দুরে কামান গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়, মাঝে মাঝেই ভারতীয় বোমারু বিমান উড়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার দিকে। এরপর ঢাকার রক্তক্ষয়ী শেষ সংগ্রাম কতদিন চলবে, কত মানুষ মরবে তার ঠিক নেই, কিন্তু টাঙ্গাইলের মানুষ এরই মধ্যে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে গেছে।

প্রথমে মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে ভারতীয় সেনাপতিকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানানো হলো। কয়েক ডজন মুক্তিযোদ্ধা আকাশের দিকে বন্দুকের নল উচিয়ে ট্রিগার টিপে ‘গান স্যালিউট’ দিল তাঁকে। তারপর নাগরা যাতে সবাই বুঝতে পারে এমন সহজ হিন্দীতে ধীরে ধীরে বললেন, আমরা যে এতদূর পর্যন্ত বিজয়ী হয়ে এসেছি, তার জন্য মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের কৃতিত্ব অনেকখানি। মুক্তিবাহিনীর এই বীরত্বের ইতিহাস আগামী দিনের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। আপনাদের টাঙ্গাইলের এই ছেলেটি, এই কাদের সিদ্দিকী, এর মতন সাহসী সংগঠক আমি খুব কমই দেখেছি। এ সত্যিই টাইগার। একে আমার সালাম জানাচ্ছি! আপনারা অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন, ধৈর্য ধরে আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন, বাংলাদেশের আশীভাগ এখন আমাদের দখলে, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকায় চরম আঘাত হানবো। আপনারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখুন, আমাদের সাহায্য করুন! জয় বাংলা! জয় হিন। জয় যৌথবাহিনী। ইন্দিরা-মুজিব জিন্দাবাদ!

সভা অনেকক্ষণ চলবে, কিন্তু মেজর জেনারেল নাগরা বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। তাঁকে হেড কোয়াটারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। মঞ্চ বাঁধা হয়েছে বিন্দুবাসিনী স্কুলের ছাদে, সেখান থেকে মই বেয়ে তিনি নেমে এলেন। আবার একদল লোক ছুটে এলো তাঁকে মালা দেবার জন্য, তিনি গাড়িতে উঠে পড়লেন ভিড় ঠেলে। সভায় গোলমাল থামাবার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা আবার আকাশে গুলি ছুঁড়লো।

টাঙ্গাইল শহর এবং কাছাকাছি গ্রামগুলি এখন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। ছত্রভঙ্গ পাকিস্তানী সৈন্যদের তারা বন্দী করে আনছে, সেই সঙ্গে খুঁজে খুঁজে ধরছে কুখ্যাত দালাল ও শান্তি কমিটির নেতাদের। মুছা তালুকদারের ছেলে খোকা পালাতে গিয়ে জোগনীচরে মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। এই খোকার আর একটি ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল জল্লাদ, তার নির্দেশে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে মারা হয়েছে, সে রাজাকারদের সংগঠক। আর একজন নৃশংস রক্তলোলুপ অধ্যাপক খালেককে ধরা যায়নি, কিন্তু খোকাকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে মঞ্চের নীচে।

কয়েক মিনিটের মধ্যে খোকার বিচার সাঙ্গ হলো, তারপর মঞ্চে তুলে সর্বসমক্ষে তিন মুক্তিযোদ্ধা তার পেটে ঢুকিয়ে দিল বেয়নেট। যাদের মা-বোন-ভাই এই খোকার নির্দেশে আদেশে নিহত হয়েছে, তারা এমনভাবে চিৎকার করতে লাগলো যেন ওই শাস্তিতেও তারা সন্তুষ্ট নয়, তারা খোকার শরীরটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে চায়।

সার্কিট হাউসে এসে মেজর জেনারেল নাগরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাই কমান্ডের কাছ থেকে নতুন নির্দেশ পেয়ে গেলেন। ১০১ কমুনিকেশান জোন ঢাকা নগরীর পনেরো মাইলের মধ্যে পৌঁছে ঘাঁটি গেড়ে বসলেই তাদের দায়িত্ব সফলভাবে পূর্ণ হয়েছে ধরা হবে। তবে অবস্থা বুঝে এই বাহিনী যদি আরও এগিয়ে যেতে চায় তাতে আপত্তি নেই। সেক্ষেত্রে যুদ্ধে উপস্থিত সেনাপতিই সিদ্ধান্ত নেবেন।

মেজর জেনারেল নাগরার বুকটা একবার কেঁপে উঠলো। তিনি পুরো জেনারেল নন, মেজর জেনারেল, তিনি ছিলেন ফ্রন্ট লাইনের অনেক পেছনে। তা হলে কি ঢাকা দখলের মতন একটা ঐতিহাসিক কৃতিত্ব তাঁর ভাগ্যেই ঝুলছে?

তিনি তার বাহিনীর সবকটি পজিশানে নির্দেশ পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

এদিকে ভারতীয় সবাধিনায়ক মানেকশ’র গম্ভীর গলা ভারতীয় বেতারে কয়েকদিন ধরেই বারবার শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানী সিপাহী, হাতিয়ার ডাল দো! যুদ্ধে জয়-পরাজয় আছেই। ঢাকা শহর এখন আমার কামানের এলাকার মধ্যে। এরপর লড়াই চালাতে গেলে তোমাদের শুধু শুধু রক্তক্ষয় হবে। তোমরা হাতিয়ার নামিয়ে আত্মসমর্পণ করো, তোমাদের জীবন ও সম্মানরক্ষার দায়িত্ব আমরা নেবো!

ভারতীয় বিমান ঢাকার আকাশে এসে একবার ছড়িয়ে যাচ্ছে এই মর্মে লক্ষ লক্ষ লিফলেট, আবার এসে বোমা ফলছে। বোমার আঘাতে গভর্নর হাউসের একদিক গুঁড়িয়ে গেছে। প্রাণ বাঁচাবার জন্য গভর্নর মালেক দ্রুত পদত্যাগপত্র লিখে দলবল নিয়ে পালিয়ে এসেছেন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। ওখানে ভারতীয় বোমার ভয় নেই।

ভূগর্ভ বাঙ্কারে দু’হাতে মাথা চেপে বসে আছেন জেনারেল নিয়াজী। রাওয়ালপিন্ডির হেড কোয়াটার তাঁকে বারবার মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছে। কোথায় চীনে সৈন্য? বঙ্গোপসাগরে মার্কিন রণতরী বাহিনী ঢুকে পড়েছে বলে জোর গুজব উঠেছিল, কোথায় সেই সেভেন্থ ফ্লিট? তিনি শুধু দেখতে পাচ্ছেন একটা দড়ির ফাঁস এগিয়ে আসছে তাঁর গলার দিকে। আকাশে শত্রুপক্ষের বিমান গর্জন। অন্যদের ওপর ভরসা করে তাঁকে চালাতে বলা হয়েছিল এত বড় একটা যুদ্ধ?

ভারতীয় সর্বাধিনায়ক মানেকশ তাঁর শেষ হুমকি দিলেন। তিনি ভারত বাংলা যৌথ কমান্ডকে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির নির্দেশ দিচ্ছেন এক রাত্রির জন্য। আগামীকাল সকাল নটার মধ্যে যদি পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ না করে, তা হলে চরম আঘাত হানা হবে ঢাকা শহরে, একজন সৈন্যকেও পালাতে দেওয়া হবে না!

শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে ঢাকা রক্ষা করার সাধ জেনারেল নিয়াজীর মিটে গেছে এর মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তান গোল্লায় যাক। এখন তাঁর একমাত্র চিন্তা পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য ও নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা যাবে কী করে! আরও যুদ্ধ চালিয়ে গেলে পশ্চিমে আরও নব্বই হাজার বিধবা ও প্রায় পাঁচ লাখ অনাথ ছেলেমেয়ের সংখ্যা বাড়বে! এখন আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো গতি নেই। সেই মর্মে তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পাঠালেন, কিন্তু তার কোনো উত্তর নেই। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া হতাশায় ডুবে আছেন, কারুর সঙ্গে দেখা করতে চান না।

গলার ফাঁসটা ক্রমশ কঠিন হয়ে আসছে দেখে জেনারেল নিয়াজী মরীয়া হয়ে পাকিস্তানের কমান্ডার ইন চিফ হামিদকে টেলিফোন করে অনুরোধ জানালেন, স্যার, আমি প্রেসিডেন্টের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। আপনি অনুগ্রহ করে একটু ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে দেখবেন, তাড়াতাড়ি কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না!

শেষপর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছ থেকে একটা লম্বা উত্তর এলো। তাতে যুদ্ধ বন্ধ এবং পাকিস্তানী নাগরিকদের জীবনরক্ষার সমস্ত রকম ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের কোনো কথা নেই। সে নির্দেশ পেয়ে নিয়াজী আবার ধাঁধায় পড়ে গেলেন। এর মানে কী? এমনি এমনি যুদ্ধ বন্ধ করা যায় নাকি? ভারতীয় পক্ষ তা গ্রাহ্য করবে কেন? তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় দিয়েছে।

নিয়াজী তখন রাও ফরমান আলীকে ডাকলেন যুদ্ধ বন্ধ চুক্তির শর্তগুলো ঠিক করার জন্য। লম্বা ছিপছিপে চেহারার জেনারেল ফরমান আলী ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, নিয়াজীর মতন বাগাড়ম্বরপ্রিয় কিংবা আবেগপ্রবণ নন। তিনি দ্রুত রচনা করলেন একটি সন্ধিপত্র, সেটি নিয়ে তারা দু’জনে গেলেন আমেরিকান কনসাল জেনারেল মিঃ স্পীভাকের কাছে। এই দুই সৈন্যাধ্যক্ষকে তেমন কিছু খাতির দেখালেন না এই মার্কিন কূটনীতিবিদটি। নিয়াজী তাঁকে অনুরোধ করলেন ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে তাঁদের হয়ে আলোচনা করতে, এর উত্তরে মিঃ স্পীভাক নীরস গলায় জানালেন যে আপনাদের হয়ে কথাবার্তা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু আপনাদের বাতাটা পাঠাবার ব্যবস্থা করতে পারি।

তাও মিঃ স্পীভাক অতি সাবধানী হয়ে নিজের দায়িত্বে নিয়াজীর বাতা সরাসরি জেনারেল মানেকশকে না পাঠিয়ে সেটা পাঠালেন ওয়াশিংটনে তাঁর কর্তাদের কাছে। নিয়াজী ও ফরমান আলী নিজেদের কমান্ডে ফিরে এসে অধীর প্রতীক্ষায় বসে রইলেন উত্তরের জন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে লাগলো, উত্তর আর আসে না!

রাও ফরমান আলী যুদ্ধবিরতি যুক্তির খসড়া ছাড়া আরও একটি পরিকল্পনার খসড়াও রচনা করে রেখেছিলেন। পরাজিত সেনানায়কেরা চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের আগে গোপন দলিলপত্র পুড়িয়ে ফেলে, নিজেদের পাপের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে হয়, সে দায়িত্বও নিয়েছেন ফরমান আলী, তা ছাড়াও তিনি বিশ্বাসঘাতক বাঙালীদের শেষ শিক্ষা দিয়ে যাবেন। বাঙালীরা স্বাধীন হয়ে নিজেরা রাজত্ব চালাবে? এই গোরস্তানে হাজার হাজার করোটি আর শুকনো হাড় দিয়ে তারা কি ভেল্কি দেখাবে সারা পৃথিবীকে?

বাঙালীদের মধ্যে জ্ঞানে-গুণে যারা কিছুটা উন্নত, সেই সমস্ত মানুষদের একটা তালিকা প্রণয়ন করে রেখেছিলেন ফরমান আলী। এদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক-অধ্যাপক, উকিলব্যারিস্টার, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি সব ধরনের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী। এদের সকলকে হত্যা করতে পারলে স্বাধীন বাংলাদেশ চলবে কাদের নিয়ে? ভারতীয় সৈন্যরা যখন ঢাকার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছোলো, তখন ফরমান আলী আল বদর ও আল শামস বাহিনীকে

লেলিয়ে দিলেন সেই তালিকা ধরে ধরে সকলকে বিনাশ করবার জন্য। আল বদর, আল শামসের লোকেরাও তো বাঙালী, তারা কি যুদ্ধের গতি বুঝতে পারেনি, যুদ্ধের শেষ মুহূর্তেও তারা স্বজাতির শ্রেষ্ঠ মানুষদের বিনা দোষে মেরে ফেলতে রাজি হলো কেন? কোনো যুক্তি নেই, বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও যাবে না, যুদ্ধের উন্মাদনা সব শ্রেণীর মানুষকে সব যুক্তি ভুলিয়ে দেয়। হিটলারের এস এস বাহিনীও তো শেষদিন পর্যন্ত তাদের নৃশংসতা বন্ধ করেনি।

প্রখ্যাত অধ্যাপক এবং নাট্যকার মুনীর চৌধুরী ঢাকায় তার সেন্ট্রাল রোডের বাড়িতে সকাল এগারোটায় স্নান সেরে মায়ের কাছে খাবার চেয়েছেন। মা খাবার সাজিয়ে দিচ্ছেন, এমন সময় সাত-আটটি যুবক এসে তাকে ডাকলো। তাদের কমান্ডার একবার অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে চান। মুনীর চৌধুরী বললেন, খাবার দেওয়া হয়ে গেছে, একটু দাঁড়াও খেয়ে নিই। ছেলেরা বললো, স্যার, আমাদের কমান্ডার ওই মোড়ের মাথায় অপেক্ষা করছেন, আপনি যাবেন আর দুটো কথা বলে চলে আসবেন। বড়জোর পাঁচ মিনিট সময় লাগবে, এসে খাবেন।

ছেলেগুলির মুখের ভাষা বিনীত কিন্তু হাতে বন্দুক, তাই তাদের ধমক দিয়ে তাড়ানো যায় না। লুঙ্গির ওপর গেঞ্জি পরা, মাথার চুল আঁচড়ানো হয়নি, সেই অবস্থায় বেরিয়ে পড়লেন মুনীর চৌধুরী, মোড়ের কাছে আসতেই আল বদর বাহিনী তাঁর চোখ মুখ বেঁধে ফেললো!

ঠিক একই ভাবে ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়াটার থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো। আনোয়ার পাশাকে, চণ্ডীচরণ বোস স্ট্রিটের বাড়ি থেকে আইনজীবী এ কে এম সিদ্দিককে, ডাক্তার আবদুল আলীম চৌধুরীকে, বিজ্ঞানী আবুল কালাম আজাদকে এবং আরো অনেককে। মীরপুরের গোরস্তানে এদের হত্যা করে গোর দেবারও কোনো ব্যবস্থা হলো না, লাশের ওপর জমতে লাগলো লাশ।

টাঙ্গাইল শহরে মুক্তিবাহিনীর কারুর চোখে সারা রাত ঘুম নেই। মেজর জেনারেল নাগরার অধীনে দু’জন ব্রিগেডিয়ার, সান সিং আর ক্লের দুটি বাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেছে ঢাকার পথে, তাদের সঙ্গে আছে মুক্তিবাহিনীর অত্যুৎসাহী যোদ্ধারা। মুক্তিবাহিনীর বাকি ছেলেরা রাত জেগে যুদ্ধরত বারো হাজার ভারতীয় সৈন্যদের জন্য নাস্তা তৈরি করছে, হেলিকপটারে সেই খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে বিভিন্ন সমর প্রাঙ্গণে।

ব্রিগেডিয়ার ক্লের কড়া নামের একটা জায়গায় একটা পাক বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে প্রচণ্ড লড়াই চালিয়ে শেষপর্যন্ত তাদের পর্যদস্ত করে নদীর ধারে আস্তানা গেড়েছেন। ব্রিগেডিয়ার সান সিং-এর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী নবীনগর-সাভারের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে ঢাকার দিকে। সাভারের জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে হঠাৎ খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাত তখন তিনটে, আকাশ খান খান হয়ে গেল কামান আর মেশিনগানের গর্জনে।

ব্রিগেডিয়ার সান সিং-এর অধীনে তিন হাজার রেগুলার আর্মি এবং বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানী ক্যাম্পটিতে সৈন্যসংখ্যা কিছুতেই সাত আট শোর বেশি না। তবু তারা অসম সাহসীর মতন আক্রমণ চালিয়ে যেতে লাগলো। কিছুতেই আত্মসমর্পণ করবে না। সান সিং-এর অনেক সৈন্য পাকা সড়কের পশ্চিম পাশের কাঁচা রাস্তা দিয়ে সাভার বাজার পর্যন্ত পেরিয়ে গেল, এই ভাবেও ঢাকার দিকে এগুনো যায়, কিন্তু পেছনে একটা শত্রু ঘাঁটি রেখে যাওয়াটা সান সিং-এর পছন্দ হলো না। এই গোঁয়ার পাকিস্তানীরা কিছুতেই আত্মসমর্পণ করবে না, সবাই মরতে চায়?

সান সিং বারবার তাদের অস্ত্রসংবরণ করতে বললেন, উত্তরে ছুটে এলো ঝাঁক ঝাঁক গুলি। শেষপর্যন্ত সান সিং নিজে একটি গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেলেন এই ঘাঁটিটি উৎখাত করতে। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা আরও এগিয়ে যেতে চায়। সান সিং সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পের অধিনায়ক ছিলেন, এই সমস্ত দুরন্ত, দুঃসাহসী ছেলেদের সম্পর্কে তাঁর মনে একটা স্নেহের ভাব আছে। তিনি বুঝলেন, এই মরীয়া পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করতে গেলে সুবিধে হবে না, পটাপট করে মরবে, এখানে পেশাদার সৈন্যদের সঙ্গে টক্কর দিতে হবে পেশাদার সৈন্যদের। একটা উঁচু দেওয়ালের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তিনি চেঁচিয়ে মুক্তিবাহিনীকে বলতে লাগলেন, আপনারা এগোবেন না, আপনারা পেছন দিকে থেকে আমাদের সাহায্য করুন, পিছিয়ে যান। কিন্তু কে কার কথা শোনে! এবার সান সিং কঠোরভাবে আদেশ দিলেন, আমার নির্দেশ ছাড়া কেউ একটিও গুলি ছুঁড়বে না।

পাকিস্তানী বাহিনীর সাঙ্ঘাতিক গোলাবর্ষণের মুখে ভারতীয় সৈন্যরা খানিকটা এগিয়েও পিছিয়ে আসছে বারবার। পাক বাহিনী একটা বাড়ির দোতলায় উঠে সুবিধেজনক অবস্থান পেয়েছে। বিশেষত একটা জলের ট্যাঙ্কের পাশ দিয়ে অনবরত মটারের গর্জন হচ্ছে, কিছুতেই ঘায়েল করা যাচ্ছে না সেটাকে।

হঠাৎ সান সিং দেখলেন আগুনের ঝলক ও ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেড়জন। মানুষ। একজন দীর্ঘকায় পুরুষ, আর একটি কিশোর। এরা কি পাগল নাকি! তিনি নিজে ছুটে গিয়ে লম্বা লোকটির কাঁধের জামা চেপে ধরে কর্কশভাবে বললেন, তোমরা আদেশ অমান্য করছো যে! ফেরো!

মুখ ফিরিয়ে বাবুল চৌধুরী শান্ত গলায় বললো, ওই মটরটাকে থামানো দরকার। আমি জলের ট্যাঙ্কের পেছন দিকে যাচ্ছি!

সান সিং বললেন, সে কাজ আমাদের জওয়ানরাই পারবে। একটু সময় লাগবে বড় জোর। ওরা কতক্ষণ যুঝবে! তোমাদের বলেছি না পেছনে থাকতে!

বাবুল চৌধুরী বললো, শুধু আপনারাই যুদ্ধ করবেন কেন? এটা আমাদেরও লড়াই, ব্রিগেডিয়ার!

সান সিং ধমক দিয়ে বললেন, শুধু শুধু বোকার মতন প্রাণ দেওয়ার কোনো মানে হয় না। লড়াই করার পরে আরও অনেক সুযোগ পাবে। গেরিলা যোদ্ধারা এরকম মুখোমুখি যুদ্ধ করে না। আমার অর্ডার বড় রাস্তার দিকে যাও!

বাবুল বললো, আমি এগিয়ে যাবোই, ব্রিগেডিয়ার! আমাকে বাধা দিয়ে লাভ নেই। এদের শেষ করে দিতে পারলেই ঢাকার রাস্তা একেবারে খোলা। মীরপুরের ব্রীজে ওরা কোনো কামান বসায়নি, আমি দেখে এসেছি!

ওদিক থেকে আবার একটা মটারের গোলা ছুটে আসতেই স্নান সিং কিশোরটির কাঁধ ধরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মাটিতে। বাবুল চৌধুরী ছুটে গেল সামনের দিকে।

সান সিং শফিকে নিয়ে চলে এলেন একটা দেওয়ালের আড়ালে। শফি ছটফট করে বলতে লাগলো, আমিও যাবো, আমারে ছাইড়্যা দ্যান, আমিও যাবো!

সান সিং সাত আট মাস মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে থেকে কিছুটা বাংলা শিখেছেন। তিনি শফিকে শক্ত করে ধরে রেখে বললেন, আরে বাচ্চা, এটা মরণবাঁচন লড়াই, ফুটবল খেলা আছে না! চুপ। মেরে থাক!

বাবুল চৌধুরী মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে। কিন্তু পাক সৈন্যরা নিশ্চয়ই তাকে দেখতে পেয়েছে। একটা সার্চলাইট পড়লো সেখানে, কয়েক ঝাঁক মেশিনগানের গুলি সেই আলো-অন্ধকার কুঁড়ে দিতে লাগলো। সান সিং-ও যেন দেখতে পেলেন লম্বা লোকটিকে মাটিতে পড়ে যেতে। গুলি খেয়ে সে কয়েক পাক গড়িয়ে গেল, তার হাতের এল এম জি-টাও থামেনি, একটু পরেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো জলের ট্যাঙ্কটি।

দেওয়ালটার ওপর লাফিয়ে উঠে সান সিং হাত দুড়ে বললেন, চার্জ! ডান পাশের বাঙ্কারটা। দখল করো! বাঁয়ে একদল ভাগছে, ধরো!

দেড় ঘণ্টা তুমুল লড়াইয়ের পর সাভারের পাক ঘাঁটির পতন হলো। ওদের দেড়শো মতন। সৈন্য এর মধ্যেই মারা গেছে, বাকিরা অস্ত্রত্যাগ করলো, কিছু পালালো। বন্দীদের আটকে রাখার ব্যবস্থা করে সান সিং নিজের সৈন্যবাহিনীর একটি অংশকে নির্দেশ দিলেন মীরপুরের দিকে এগিয়ে যেতে। তারপর তিনি টর্চ হাতে এগিয়ে গেলেন ভাঙা জলের ট্যাঙ্কটির দিকে।

ট্যাঙ্কটির পিলারগুলো পার হয়ে একটা নালার ধারে উপুড় হয়ে পড়ে আছে বাবুল চৌধুরী। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার গায়ের জামা

যারা মটর চালাচ্ছিল, তাদের কয়েকজনও ওপর থেকে খসে পড়েছে এখানে। বাবুল বুকে হেঁটে এই পর্যন্ত এসে অতর্কিতে ওদের পেছন থেকে গুলি করেছে, এল এম জি র গুলির ঝাঁপটাতেই ট্যাঙ্কটি ঝাঁঝরা হয়ে খসে পড়েছে।

বাবুলের শরীরে এখনো প্রাণ আছে। সান সিং তাকে চিৎ করতেই সে প্রথমে এল এম জি-টা। তুলতে গেল, তারপর সান সিং-এর পাশে শফিকে দেখে চিনতে পেরে সে ব্যগ্র ভাবে জিজ্ঞেস করলো, ব্রিগেডিয়ার, ওরা খতম হয়েছে?

সান সিং বললেন, যথেষ্ট সাহস দেখানো হয়েছে! এবার আমার হাত ধরে ওঠো তো, কোথায় কোথায় গুলি লেগেছে! টাঙ্গাইল হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে তো?

বাবুল উঠে দাঁড়িয়ে বললো, হাসপাতালে যেতে হবে কেন? আমার তো বেশি লাগেনি! এই দ্যাখো, আমি দু হাত তুলতে পারছি। দু পায়ে দাঁড়াতে পারছি। আমার মাথায় কোনো চোট নেই!

একটা গুলি লেগেছে বাবুলের ঘাড়ে, একটা বাম বাহুতে। খুব গুরুতর আঘাত নয় ঠিকই। তবে বাম বাহুতে বুলেট ঢুকে আছে ভেতরে, সে-যন্ত্রণা সে এখনো টের পাচ্ছে না। সে শফির পিঠ চাপড়ে বললো, চল, এবার সোজা ঢাকায় যাবো!

মীরপুর ব্রীজ অরক্ষিত, মুক্তিবাহিনীর সূত্রে এ খবর শেষরাতের মধ্যেই পেয়ে গেলেন মেজর জেনারেল নাগরা। ব্রিগেডিয়ার ক্লের-কে সেদিকে এগোবার নির্দেশ দিয়ে ভোরবেলা তিনি উঠলেন একটি হেলিকপটারে, সঙ্গে নিলেন টাঙ্গাইলের হীরো কাদের সিদ্দিকীকে। আকাশপথ সম্পূর্ণ নিরাপদ। শীতকালের সূর্য গড়িমসি করে উঁকি মারছে পূর্ব দিগন্তে। আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে লাল আলো।

সাভার ও মীরপুরের রাস্তার মাঝামাঝি একটা বাঁকে যখন হেলিকপটারটি নামলো, তখনও সেখানকার বাতাসে বারুদের গন্ধ। ব্রিগেডিয়ার সান সিং-এর কাছ থেকে মেজর জেনারেল নাগরা শুনলেন জাহাঙ্গীর নগরের লড়াইয়ের বিবরণ। সামনে আর বড় রকমের কোনো বাধার সম্ভাবনা নেই। মীরপুর পেরুনো মানেই তো ঢাকার দরজায় পৌঁছে যাওয়া। মুক্তিবাহিনীর প্রায় এক হাজার যোদ্ধা এরই মধ্যে গ্রাম্য রাস্তা দিয়ে মীরপুর ব্রীজের পাশে পৌঁছে গেছে। ভারতীয় বাহিনীও সেই ব্রীজের দিকে মার্চ করছে।

মেজর জেনারেল নাগরা কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলেন। একটা ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি দুরবীন চোখে লাগিয়ে দেখতে চেষ্টা করলেন ঢাকা নগরী। বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু বাড়িঘর। কাঁদেরের হাতে দূরবীনটা দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, দ্যাখো তো, ওই বাড়িটা কোন্ বাড়ি?

কাদের বললো, ওইটা তো শেরে বাংলা নগরের নতুন সংসদ ভবন! বিল্ডিংটাই বানানো হয়েছে, কোনোদিন কাজে লাগেনি!

আবার দূরবীন চোখে এটে দেখতে দেখতে নাগরা জিজ্ঞেস করলেন, রাস্তার ওপর কারা যেন দৌড়োদৌড়ি করছে মনে হচ্ছে? ওরা কারা?

কাদের বললো, ওরা আমাদের ছেলে! ছুটকো ছাটকা কিছু হানাদার সেনা এখনো আছে। বোধ হয়, তাদের দেখলেই তেড়ে যায়।

নাগরা বললেন, মীরপুর ব্রীজের প্রায় কাছেই আমি দেড়জনকে দেখতে পাচ্ছি। একজন ঢ্যাঙা, একজন বেঁটে, ওদের কি ভয়ডর নেই? হাতে অস্ত্রও আছে।

সান সিং বললেন, ওরা এক অদ্ভুত জুটি, জেনারেল। পরে ওদের কথা আপনাকে শোনাবো!

চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে নাগরা একজন কমুনিকেশান অফিসারকে ডেকে খবরাখবর নিলেন। অন্যদিক থেকে যৌথবাহিনী নারায়ণগঞ্জ, দাউদকান্দি, নরসিংদি এসে গেছে। ঢাকা শহর এখন সত্যিই চতুর্দিক থেকে ভারতীয় কামানের আওতায়, ওপরে বিমান বাহিনী তো আছেই। ইচ্ছে করলে নাগরার বাহিনীই এখন ঢাকায় আগে পৌঁছোতে পারে।

নাগরাকে দেখলে নিয়াজীর মুখের অবস্থা কী হবে সেটা ভেবে নাগরা মুচকি হাসলেন। নিয়াজী নাগরাকে ভালোই চেনেন। দু’জনে একসঙ্গে কমিশনড় অফিসার হিসেবে ট্রেনিং নিয়েছেন ব্রিটিশ আমলে। পাকিস্তানী আর্মিতে তাড়াতাড়ি পদোন্নতি হয়, তাই নিয়াজী জেনারেল হয়েছেন, আর নাগরা এখনো মেজর জেনারেল।

হেমায়েতপুর সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে একটা জিপের বনেটে এক টুকরো কাগজ রেখে নাগরা খসখস করে লিখলেন একটা ব্যক্তিগত চিঠি;

প্রিয় আবদুল্লাহ

আমরা এসে পড়েছি। তোমার সব বাহাদুরি আর খেলা শেষ। আমরা তোমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছি। বুদ্ধিমানের মতন আত্মসমর্পণ করো। না হলে তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। আমরা কথা দিচ্ছি, আত্মসমর্পণ করলে জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমাদের সঙ্গে আচরণ করা হবে। তোমাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানাচ্ছি, তোমার জীবনের নিরাপত্তা অবশ্যই দেওয়া হবে।

তোমার
মেজর জেনারেল নাগরা
সকাল ৮-৩০ মিনিট, ১৬-১২-৭১

কাছে সাদা পতাকা নেই, তাই একজনের একটা সাদা জামা খুলে নিয়ে পতাকার মতন করে বাঁধা হলো একটা জিপ গাড়িতে। তারপর নাগরার সেই চিঠিটা নিয়ে কয়েকজন সেই জিপ ছুটিয়ে গেল ঢাকার দিকে।

আধঘণ্টার মধ্যে বিনা বাধায় বাতটি এসে পৌঁছে গেল নিয়াজীর কাছে। তখন তাঁর পাশে বসে আছেন মেজর জেনারেল জামশেদ, মেজর জেনারেল ফরমান আলী ও রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ। এর মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ স্পীভাক মারফত প্রেরিত যুদ্ধ বন্ধের আবেদন বাটি পৌঁছে গেছে ভারতীয় সেনাধ্যক্ষ মানেকশ’র কাছে। তিনি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। যুদ্ধবিরতি আবার কী? বিজয়ী পক্ষ চূড়ান্ত জয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে নিছক যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে কেন? মানেকশ চান আত্মসমর্পণ এবং অস্ত্র সমর্পণ। শুধু তারপরেই নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে।

নিয়াজীর কাছ থেকে অন্য সেনাপতিরা চিরকুটটা নিয়ে দেখলেন। ফরমান আলী উদ্ধতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, এই নাগরা নামের লোকটিই কি তবে ভারতীয় পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত আলোচনা করতে আসছে।

অন্যরা নীরবে তাকিয়ে রইলেন। চিরকুটটির অর্থ অতি স্পষ্ট। আলোচনা-টালোচনা কিছু নয়। হয় আত্মসমর্পণ, অথবা যুদ্ধ! আর যুদ্ধ মানেই প্রতি ইঞ্চি ভূমি দখলের লড়াই।

ফরমান আলী আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কোনো রিজার্ভ বাহিনী আছে কি? নিয়াজী সেই উর্দু শুনেও হতভম্বের মতন তাকিয়ে আছেন দেখে রিয়ার অ্যাডমিরাল শরীফ পাঞ্জাবীতে অনুবাদ করে বললেন, কুজ পাল্লে হ্যায়? অর্থাৎ থলেতে কিছু আছে কি?

নিয়াজী এবার তাকালেন জামশেদের দিকে। বিষণ্ণ মুখে জামশেদ দুদিকে মাথা নাড়লেন।

ফরমান আলী ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, তবে তো আর লড়াইয়ের প্রশ্নই ওঠে না। যাও, ওই লোকটাকে খাতির করে নিয়ে এসো!

বিকেলবেলা পূবাঞ্চলের ভারতীয় সেনাপতি জগজিৎ সিং অরোরা সস্ত্রীক একটি বিশেষ বিমানে এসে পৌঁছোলেন ঢাকায়। এর আগে কলকাতা থেকে মেজর জেনারেল জেকব দুপুরে এসে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের ব্যাপারটা পাকা করে ফেলেছেন। আত্মসমর্পণ দলিলে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড কথাটিতে আপত্তি তুলেছিলেন ফরমান আলী। এখনও তাঁরা বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিতে চান না, তারা আত্মসমর্পণ করবেন শুধু ভারতীয় পক্ষের কাছে। সে আপত্তি অগ্রাহ্য হলো। এই রকমই দিল্লির নির্দেশ। অনুষ্ঠানটি হবে রমনা রেস কোর্সে। অত বড় প্রকাশ্য জায়গায় অপমানের দৃশ্যটি অনুষ্ঠিত হোক, তা নিয়াজী চান না। তার সে আপত্তিও উড়িয়ে দেওয়া হলো। ওই ময়দানে ৭ মার্চ শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, ওই জায়গা থেকেই পাকিস্তানী বাহিনী চিরবিদায় নেবে! বিজয়ী পক্ষের শর্তই পরাজিতরা মেনে নিতে বাধ্য।

ঢাকা শহরে যে এখনো এত মানুষ আছে তা আজ সকালেও বিশ্বাস করা যায়নি। লক্ষ লক্ষ লোকে রাস্তায় নেমে পড়ে পাগলের মতন চিৎকার করছে। ভারতীয় সৈন্যদের ট্রাক দেখলেই লোকে ছুঁড়ে দিচ্ছে ফুলের মালা, আর পাকিস্তানী বাহিনীর দিকে থুতু। বয়স্ক ব্যক্তিরা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছে এই দৃশ্য। কেউ কেউ ভাবছে, পয়ষট্টি আর একাত্তর সাল, এই ছ বছরের মধ্যে কত তফাত! এর পরের ভবিষ্যৎ পাঁচ-ছ’ বছরের মধ্যে আবার কী হবে কে জানে!

বিকেলবেলা আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানটি হলো সংক্ষিপ্ত। মুক্তিযোদ্ধারা শহরের রাজপথে ঘুরে ঘুরে প্রচণ্ড উল্লাসে আকাশের দিকে গোলাগুলি বর্ষণ করছে। রাজধানী ঢাকায় কোনো সরকারের অস্তিত্ব নেই। আইনশৃঙ্খলা যে কোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, ভারতীয় সৈন্যরা শান্তিরক্ষায় পুরোপুরি দায়িত্ব নিতে পারে না, উজ্জ্বল সাধারণ নাগরিকদের ওপর ভারতীয় সেনারা গুলি চালালে সে হবে আর এক কেলেঙ্কারি। এমনিতেই একদল লোক সর্বক্ষণ চিৎকার করছে, নিয়াজী, ফরমান আলীদের তাদের হাতে তুলে দিতে হবে, তারা ওই নরঘাতকদের দেহ ছিঁড়ে কুটিকুটি করবে!

ভোরবেলাতেই কয়েকটি হেলিকপটারে কিছু পশ্চিম পাকিস্তানের ধনী ব্যক্তি ও কয়েকজন আহত সেনাপতি পলায়ন করেছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নার্সদের তাড়াহুড়োতে তাঁরা নিতে ভুলে গেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা যাতে প্রতিশোধ নিতে শুরু করে না দেয় তাই বিভিন্ন জায়গায় নিযুক্ত করা হয়েছে ভারতীয় সেনাদের। বিজয়ের গর্বে তারাও বাড়াবাড়ি করে ফেলছে অনেক জায়গায়। আইন শৃঙ্খলার কোনো রক্ষক নেই বলেই গুন্ডা বদমাসশ্রেণী শুরু করে দিয়েছে। লুটপাট, অবাঙালীদের বাড়িঘর লুণ্ঠনের তো একটা নৈতিক সমর্থন আছেই। ভারতীয় সেনারা অবাঙালী হলেও তারাও অনেক জায়গায় হাত মেলাচ্ছে সেইসব লুণ্ঠন যজ্ঞে। ঢাকায় এসব বিদেশী জিনিস পাওয়া যায়, এসব তো আগে দেখেনি ভারতীয়রা। রেফ্রিজারেটার, টি ভি, টু-ইন-ওয়ান, কার্পেট, টিনের খাবার, এই সব ভর্তি হতে লাগলো ভারতীয় সৈন্যদের ট্রাকে। শুধু সেই বিজয় উন্মত্ত সৈনিকেরা বাংলাদেশের সুন্দরী মেয়েদের দিকে হাত বাড়াতে সাহস করলো। না, সে ব্যাপারে তাদের ওপর গোড়া থেকেই কঠোর নির্দেশ ছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী!

রেসকোর্স ময়দানে টেবিল পেতে জেনারেল অরোরা ও জেনারেল নিয়াজী বসলেন পাশাপাশি। বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রায় কেউই আসেননি। সকলেই আশা করেছিল, বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানি অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু তিনি অভিমান করে আসতে রাজি হননি। তিনি আশা করেছিলেন যে পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে শুধু বাংলাদেশ বাহিনীর কাছে। কিন্তু এই অবাস্তব প্রস্তাবে পাকিস্তানীরা রাজি হবে কেন, তারা তো বাংলাদেশ বাহিনীর অস্তিত্বই স্বীকার করে না, তারা পরাজয় মেনেছে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর কাছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত হয়েছেন শুধু এয়ার কমান্ডার এ কে কুশু, মেজর হায়দার, ফ্লাইট লেফটেনান্ট ইউসুফ। আর নিজের গড়া মুক্তিবাহিনীর অবিসংবাদী নেতা কাদের সিদ্দিকী।

নিয়াজী তার কোমরের বেল্ট খুলে রিভলভারটা দিলেন অরোরাকে। তারপর আত্মসমর্পণের দলিলে সই করতে গিয়েও তাঁর হাত এমনই কাঁপতে লাগলো যে কলমে লেখাই পড়লো না। আর একটি কলম এগিয়ে দেওয়া হলো তাঁর দিকে। অস্ত্রসমর্পণের প্রতীক হিসেবে একশো জন পাকিস্তানী অফিসার এবং একশো জন জওয়ান তাদের হাতিয়ার মাটিতে নামিয়ে রাখলো।

ভারত-পাকিস্তানের পশ্চিম রণাঙ্গনেও যুদ্ধ থেমে গেল স্বাভাবিক কারণেই। সন্ধের সময়। দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধজয়ের ঘোষণায় আশ্চর্য সংযমের পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, এই জয় নিয়ে আমাদের গর্ব করার এমন কিছুই নেই। দু’পক্ষেরই বহু সৈন্য হতাহত হয়েছে। আমাদের আসল যুদ্ধ তো দারিদ্র্যের সঙ্গে। দারিদ্র্যই আমাদের প্রধান শত্রু!

রেসকোর্স ময়দানের শেষ প্রান্তে শফিকে সঙ্গে নিয়ে বসেছিল বাবুল চৌধুরী। এখনো সে তার ক্ষতস্থানের কোনো চিকিৎসা করায়নি, নিজেরই জামা ছিঁড়ে কোনোরকমে ব্যান্ডেজ বেঁধে নিয়েছে। তার মুখখানা রক্তশূন্য, অসম্ভব যন্ত্রণা ও ক্লান্তিতে সে প্রায় ধুকছে। কিন্তু আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান না দেখা পর্যন্ত সে নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না। তা হলে সত্যিই লড়াই শেষ। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় আর সম্মুখযুদ্ধ করতে হলো না। হাতের এল এম জি-টাতে লাঠির মতন ভর দিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বললো, চল শফি, এবার আমাদের ছুটি!

একটুখানি এগিয়েই সে সামনে দেখতে পেল কাদের সিদ্দিকীকে। কাদের তার চেয়ে বয়েসে অনেক ছোট, প্রায় তার ছাত্রের পর্যায়ে পড়ে; তবু বাবুল একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা, কাদের নিজস্ব দলটির অধিনায়ক, তাই বাবুল তাকে একটি স্যালিউট দিয়ে বললো, আমার আর অস্ত্রের দরকার নেই। এটা আপনি রাখুন!

কাদের বললো, এখনই অস্ত্র ছাড়বেন না। আমাদের এখনও অনেক কাজ বাকি। শেখ মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ওরা যদি শেখ সাহেবকে না ছাড়ে তা হলে আলটিমেটাম দিয়ে আমরা পাকিস্তান আক্রমণ করবো!

বাবুল বললো, সেসব আপনারা করবেন। আমার কাজ শেষ। এটা আপনারা রাখুন!

এল এম জি-টা সে ফেলে দিল কাঁদেরের পায়ের কাছে। কাঁদেরের মন তখন বঙ্গবন্ধুর জন্য উতলা হয়ে আছে। সে বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে যেতে চায়, ব্যস্ততার মধ্যে সে আর কথা বাড়ালো না, একজন সঙ্গীকে অস্ত্রটা তুলে নিতে বলে সে একটা জিপে উঠে পড়লো।

শফির কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে লাগলো বাবুল। তার পায়েও কখন একটা চোট লেগেছে সে। খেয়াল করেনি, তাকে কিছুটা খোঁড়াতে হচ্ছে। রাস্তায় মানুষের ভিড়ে গায়ে গা ঠেকে যায়। অচেনা লোকজনও এসে হঠাৎ হঠাৎ আলিঙ্গন করছে। চতুর্দিকে উদ্দাম কোলাহল। এ যেন এক অচেনা নগরী। গোলাগুলির শব্দের সঙ্গে একটা ভয়ের অনুষঙ্গ থাকে, আজ চতুর্দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে, তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের উল্লাসধ্বনি। আর শোনা যাচ্ছে সম্মিলিত গর্জন, জয় বাংলা!

নিজের পাড়ায় এসে এগোতে এগোতে বাবুল থমকে দাঁড়ালো। জাহানারা আপার বাড়িটা এত নিস্তব্ধ কেন? এ বাড়িতে এখনো বাংলাদেশের পতাকা ওড়েনি। এটা যেন অবিশ্বাস্য!

সদর দরজাটা খোলা। বাবুল শফিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে এলো। বসবার ঘরটা খালি, কেমন যেন শোকের গন্ধ! ভেতরের দিকে এক জায়গায় আট-দশজন নারী-পুরুষ বসে নীচু গলায় দোয়া-দুরুদ-তুল পড়ছেন। বাবুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। রুমী তা হলে নেই!

একজন বাবুলকে বসে পড়ার ইঙ্গিত করলো। তারপর ফিসফিস করে জানালো সংক্ষিপ্ত সংবাদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিংবা রুমীর প্রসঙ্গ কিছুই নেই। মাত্র তিনদিন আগে জাহানারার স্বামী শরীফ মারা গেছেন। হার্ট অ্যাটাকের পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ব্ল্যাক আউটের জন্য হাসপাতালের মেইন সুইচ অফ করে দেওয়া হয়েছিল। লাইফ সেভিং মেশিন চালু করা যায়নি, প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই প্রাণটা গেছে শরীফের।

একটু পরে একটা কাঠের মূর্তির মতন জাহানারা এসে দাঁড়ালেন সেখানে। তাঁর মুখে শোক-দুঃখ-খেদের লেশমাত্র নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তিনি যে চাল-চিনি ইত্যাদি জমিয়ে রেখেছিলেন, এখন সে ঘরের দরজার তালা খুলে দিয়ে ঐসব দিয়ে কুলখানির জর্দা রাঁধবার নির্দেশ দিতে লাগলেন। বাবুলকে তিনি একবার দেখলেন। কিন্তু একটা প্রশ্নও করলেন না!

অন্য একজন হঠাৎ চিৎকার করে বললো, ও বাবুল, তুমি ফিরে এলে, যুদ্ধও শেষ হলো, তা হলে রুমী কোথায়?

বাবুল মুখ নীচু করলেন। ধারালো বাণের মতন আরও অনেক প্রশ্ন ছুটে এলো। রুমী কোথায়? বসির কোথায়? সিরাজুল, জুয়েল, মন্টু, আশরাফ, দেবনাথ, মজিদ, নাঈম, শওকত, বেলু, নাজমা, জ্বলেখা, কাইয়ুম, নুরুজ্জামান, এরা কোথায়?

কেউ জানে না ওরা কোথায়। স্বাধীনতা এসেছে, কিন্তু ওরা আর ফিরে আসবে না! স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হবে না!

খানিক পরে জাহানারা ইমামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে এগোতে গিয়ে বাবুল আবার আঁতকে উঠলো। সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে তার বাড়ির সিঁড়িতে কে বসে আছে, এক প্রেতিনী?

ছেঁড়া ঝুলঝুলে শাড়ি, চুলগুলো শনের দড়ির মতন, মুখের চামড়ায় কয়েক পরত ময়লা। তবু শুধু চোখের দৃষ্টিতেই চেনা গেল মনিরাকে। কোথা থেকে একটা আখের টুকরো যোগাড় করে সে চিবোচ্ছে।

বাবুলকে দেখে সে মুখ তুলে খুব বেশিরকমের স্বাভাবিক গলায় বললো, এই যে, দুলাভাই, আসছেন? হেই মানুষ কোথায়?

এই মনিরার খোঁজেই বাবুল একদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল। মনিরা নিজেই এতদিন বাদে ফিরে এসে অপেক্ষা করছে তার জন্য। কিন্তু মনিরাকে এখন কার হাতে তুলে দেবে বাবুল! তার চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে, সে এবার অজ্ঞান হয়ে যাবে। ঝাঁপসা চোখে বাবুলের একবার মনে হলো, এই মনিরাই যেন আজকের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতীক।

সে শফিকে বললো, ওরে, আমাকে ধর! আমি আর পারছি না। মরে যাচ্ছি বোধ হয়, আমাকে ধর!

বাবুলের শরীরটা দুলছে, প্রতিরোধ শক্তি শেষ হয়ে আসছে। সিরাজুলের আত্মদানের খবর সে শুনেছে কয়েকদিন আগে। সিরাজুল আর ফিরবে না, আরও হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে কোনোদিন ফিরে আসবে না এই স্বাধীন বাংলাদেশে। আর্মি ব্যারাক থেকে শুধু ফিরে এসেছে মনিরা। সে কতবার ধর্ষিতা হয়েছে তার ঠিক নেই, কতভাবে অত্যাচারিত হয়েছে তা কে জানে, তবু তার প্রাণ যায়নি, এই দেশটারই মতন। সে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে।

পাগলাটে গলায় মনিরা জিজ্ঞেস করতে লাগলো, ও দুলাভাই, হেই মানুষ কোথায়? সে আপনের সাথে ফেরে নাই? সে এখনো যুদ্ধ করে নাকি? বাবুল কোনো উত্তর দিতে পারছে না। সে এখন অন্ধকার দেখছে।

৬১. বেইরুটে প্লেন এগারো ঘণ্টা লেট

বেইরুটে প্লেন এগারো ঘণ্টা লেট। প্রথম তিন ঘণ্টা এক্ষুনি ছাড়বে, এক্ষুনি ছাড়বে স্তোকবাক্য দিয়ে সব যাত্রীদের বসিয়ে রাখা হলো এয়ারপোর্টে, তারপর বিমানের কলকজার বড় রকমের গণ্ডগোল সমর্থিত হলে সবাইকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো হোটেলে। এয়ারপোর্টের পাশেই সমুদ্র, শহরের মধ্যে বিলাসিতা ও টুরিস্ট মনোরঞ্জনের উগ্র রংচং, শব্দ এবং গন্ধ।

তুতুলের মন খারাপ হয়ে গেছে। এতদিন পর বাড়ি ফিরছে, মাঝপথে এরকম বাধা! হোটেলে এসেও তো কিছু করার নেই, আলম জিজ্ঞেস করলো, কিছু শপিং করতে যাবি নাকি রে? এখানে পারফিউম নাকি সস্তা!

তুতুল দু’দিকে মাথা নাড়লো। এখন তার দোকানবাজারে যেতেও ইচ্ছে করছে না। তার দুর্বল শরীর যেন ঠিক ধরে রাখতে পারছে না তার অস্থির মনটাকে। দু’মাস আগেই তুতুল আর আলমের কলকাতায় যাওয়ার কথা ছিল, টিকিট রিজার্ভেশানও হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ তুতুল আবার অসুস্থ হয়ে পড়লো। হাসপাতালেও যেতে হলো। যে-ডাক্তার তুতুলের অপারেশান করেছিলেন, তিনি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। রক্তচাপ পাগলের মতন দ্রুত ওঠা-নামা করছিল, কথা বলতে গেলে তুতুলের জিভ জড়িয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ডাক্তারকে দ্বিতীয়বার ছুরি কাঁচি চালাতে হয়নি, ওষুধেই কাজ হয়েছে। ডাক্তারটি তুতুলকে পছন্দ করেন, তিনি ওকে এখনো পুরোপুরি সুস্থতার সার্টিফিকেট দেননি, আরও দু’এক মাস পরে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তুতুল এবার প্রায় জেদ করেই প্লেনে উঠেছে।

তার শরীরে অবশ্য অসুস্থতার ছাপ নেই, মুখখানায় শুধু পাতলা পাতলা ছায়া, চোখ দুটি আবার বেশি উজ্জ্বল মনে হয়। সে চুলে খোঁপা বাঁধে না, লন্ডনে সে প্যান্ট পরতে অভ্যস্ত হলেও মেমসাহেবদের মত চুল কাটেনি, তার কোমর পর্যন্ত ছড়ানো গভীর কালো চুলের দিকে অনেকেই ফিরে ফিরে তাকায়।

হাসপাতালের ক্যাবিন আর হোটেলের ঘরে বিশেষ তফাত নেই, সব একরকম। পাঁচ তলার ওপরে ওদের যে ঘরখানা দেওয়া হয়েছে, তার জানলার কাছে দাঁড়ালে শহরের একটা টুকরো দেখা যায়, শুধু বাড়ি ঘর আর রাস্তা, গীর্জা আর মসজিদের চূড়া, গাছপালা প্রায় চোখেই পড়ে না। বিকেলের আকাশ বারুদ বর্ণ।

আলম তার পাশে এসে কাঁধে হাত দিয়ে একটু চমকে উঠলো। কপালে হাত ছুঁইয়ে বললো, তোর আবার জ্বর আসছে নাকি রে? ইয়েস, একটু টেমপারেচার আছে।

তুতুল আলমের হাতটা সরিয়ে দিয়ে জোর দিয়ে বললো, না, জ্বর নেই। আমি কিছু ফিল করছি না।

আলম বললো, খানিকক্ষণ বালিশে মাথা দিয়ে রেস্ট কর। এই শালারা হয়তো মাঝরাত্তিরে এয়ারপোর্টে দৌড় করাবে।

তুতুল জানলা থেকে সরে এসে একটা চেয়ারে বসে বললো, আমি এক কাপ চা খাবো।

আলম ততক্ষণে তার হ্যান্ডব্যাগ ঘেঁটে ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্রটি বার করে ফেলেছে। ঠোঁটের ঝুলন্ত সিগারেটটি অ্যাশট্রেতে গুঁজে সে খানিকটা হালকাভাবে বললো, শুয়ে পড়লে দেখতে সুবিধে হতো। তুই ডাক্তারি পাস করে যে রোগিণী হয়েই থাকলি সব সময়।

হাসি-ঠাট্টা করার মতন মেজাজ নেই এখন তুতুলের। সে পরিপূর্ণ চোখে চেয়ে বললো, তুমি ওসব করতে পারবে না এখন। আমি তো বলছি, আমি এখন ভালো আছি।

আলম কাছে এসে তুতুলের ঠোঁটে প্রায় জোর করেই একটা চুমু দিল, এবং চুমুটা দীর্ঘস্থায়ী হলো। তারপর বললো, আমার থার্মোমিটার লাগে না আমি ওষ্ঠ দিয়েই বুঝি, টেমপারেচার অন্তত এক শো। ও কিছু না! ডায়াস্টোলিক আর সিস্টোলিকটা একটু দেখতে দে।

তুতুলের বাহুতে পট্টি জড়াতে জড়াতে আলম অবার বললো, এত সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে আজ, পৃথিবীতে তোর মতন সুন্দরী রোগিণী আর একটাও নাই। এই হলদে শাড়িটাতে তোকে মানিয়েছে খুব। চীয়ার আপ!

তুতুল তবু চুপ করে রইলো।

আলম বললো, তুই আমাকে একটা খোঁচা দেবার চান্স মিস করলি। ঐ যে কইলাম আমার থার্মোমিটার লাগে না, তুই উল্টা চার্জ করতে পারতি, সব ফিমেল পেশেন্টদেরই আমি ওষ্ঠ দিয়া জ্বর মাপি কি না!

এই কথাতেও তুতুল হাসলো না, সে জিজ্ঞেস করলো, কত?

আলম কান থেকে স্টেথোস্কোপ খুলতে খুলতে বললো, একটু নীচের দিকে, সিক্সটি–হান্ড্রেড টেন, তেমন অবনমাল কিছু না।

তুতুল বললো, এইটাই আমার নমাল। বললুম না, আমি ভালো আছি!

আলম বললো, ঠিক, ভালোই তো আছিস। এতদিন পর বাড়ি ফিরে মায়ের সাথে দেখা হবে, তোর এখন শরীরের জোর, মনের জোর আনতে হবে। দাঁড়া, এবার চা আনতে বলি।

হঠাৎ দরজায় খটখট শব্দ হলো। আলম গিয়ে দরজা খুলে দিতেই তাদের বিমানের একজন। সহযাত্রী ঝলমলে মুখে উত্তেজিত ভাবে বললো, মিঃ আলম, খবর শুনেছেন?

লোকটির নাম রমেন হালদার, বীরভূমের সিউড়িতে বাড়ি, তুতুলদের ঠিক সামনের সীটে বসে এসেছে লন্ডন থেকে, সেই সময় আলাপ হয়েছে।

আলম বললো, ভেতরে আসুন না। কী খবর?

রমেন বললো, শোনেননি? হোটেলের লবিতে টি ভি আছে, এইমাত্র একটা নিউজ বুলেটিনে বললো, ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ওয়ার শেষ হয়ে গেছে! সকাল থেকেই সীজ-ফায়ার।

আলম খুশি হওয়ার বদলে ভয় পেয়ে বললো, সীজ ফায়ার? তার মানে কি রাষ্ট্রসঙ্ঘ ইন্টারভিন করলো?

রমেন বললো, না, না, বললো যে পাকিস্তান সারেণ্ডার করেছে ঢাকায়।

আর কথা বাত নয়, আলম আর তুতুল দু’জনেই ছুটে গেল হোটেলের লবিতে। টিভি-তে তখন অবশ্য খবরের বদলে দুবোধ্য ভাষায় নাটক শুরু হয়েছে। অনেক লোক জমায়েত হয়েছে। সেখানে, কেউ কেউ ট্রানজিস্টার রেডিও-তে বি বি সি ধরার চেষ্টা করছে। এক ঘণ্টার মধ্যে টিভি-তে আবার খবর পড়লো, এর মধ্যে গলফ নিউজ নামে একটা খবরের কাগজও এসে। গেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন!

তুতুল আর আলম ঘরে ফিরলো একেবারে ডিনার খেয়ে। নীচে বেশ মজা হচ্ছিল। বি ও এ সি’র এই ফ্লাইটের যাত্রীদের মধ্যে বেশ কিছু ভারতীয় এবং বেশ কিছু পাকিস্তানী রয়েছে। হোটেলের লবিতে দু’দলে ঝগড়া বেঁধে গিয়েছিল। যেন বেইরুটেই আবার একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লেগে যাবে। তুতুল আর আলম অবশ্য সে ঝগড়ায় যোগ দেয়নি, তারা হাসছিল দূরে দাঁড়িয়ে।

ঘরের দরজা বন্ধ করে আলম বিরক্তির সঙ্গে বললো, কোনো মানে হয়? দেশ স্বাধীন হয়ে গেল, আর আমরা এখনো পড়ে আছি এই গড় ড্যাম বেইরুটে। এই হারামজাদারা কখন প্লেন ছাড়বে তার এখনো ঠিক নাই!

তুতুল এর মধ্যে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। সে বললো, সত্যি, এখানে যেন আমাদের বন্দী করে রেখেছে!

আলম বললো, এখন ঢাকায়, কলকাতায় কী দারুণ উৎসব হচ্ছে ভেবে দ্যাখো! আমাদের ফ্লাইট রাইট টাইমে গেলে আমরা বিকালেই পৌঁছে যেতাম!

তুতুল গা থেকে চাঁদরটা খুলে ফেলে আলমের গলা জড়িয়ে মুচকি হেসে বললো, আমার আনন্দ হচ্ছে তোমার থেকেও বেশি! কেন জানো? আমার একটা স্বার্থপর কারণ আছে। কী বলো তো?

আলম বললো, কী?

তুতুল দুষ্টমীর সুরে বললো, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল। তোমাকে আর যুদ্ধে যেতে হলো। না। তোমার জন্য আমার ভয় ছিল। আমার ভাগ্যটা তো খুব খারাপ। আমার খালি মনে হতো, তুমি একবার যুদ্ধের মধ্যে ঢুকে পড়লে তোমাকে আমি আর ফিরে পাবো না। এবার আর একটা সত্যি কথা বলি? দ্বিতীয়বার আসলে আমার অসুখ হয়নি। তোমাকে আটকাবার জন্য আমি অসুখের ভান করেছিলুম।

আলম তুতুলকে বুকে টেনে নিয়ে বললো, ওরে পাজী, পাজী রে!

আলম ভালো করেই জানে, তুতুলের এ কথাটা সত্যি নয়। সে নিজে ডাক্তার, লন্ডনের নাম করা সার্জেন তুতুলকে নিয়মিত দেখেছেন, তাঁর কাছে তুতুলের অসুখের ভান করা সম্ভব নয়। যন্ত্র তো আর মিথ্যে বলবে না। ইচ্ছে করে কেউ ব্লাড প্রেসার এমন ফ্লাকচুয়েট করাতে পারে না।

পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ করার জন্য আলম খাটছে ছেষট্টি সাল থেকে। তারপর যখন সত্যিই বাংলাদেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলো, তাতে সে প্রত্যক্ষ অংশ নিতে পারলো না, এ জন্য তার মনে যে একটা দুঃখ ছিল, তা সে তুতুলকে একবারও বুঝতে দেয়নি। কিংবা, তুতুল হয়তো ঠিকই বুঝেছিল। সে দু’একবার আলমকে চলে যেতে বলেছিল, কিন্তু এ বছরের গোড়া থেকেই তুতুল অসুস্থ, অত বড় অপারেশান হলো তার, এক সময় বাঁচার আশাই ছিল না। সেই অবস্থায় তুতুলকে ফেলে রেখে সে কোথায় যাবে?

অবশ্য স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য লন্ডনে বসেই অন্য অনেক রকম সাহায্য করেছে আলম। পাকিস্তানীদের অত্যচারের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে আমরা প্রচুর লিফলেট, বুকলেট ছাপিয়ে বিলি করেছে। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় সভাসমিতি, জলসার আয়োজন করেছে, টাকা তুলে পাঠিয়েছে মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য। এখনও আলমের সঙ্গে আছে পাঁচ হাজার পাউন্ড, সে ভেবেছিল যুদ্ধ আরও অনেকদিন চলবে।

পুরোপুরি সুস্থ, না হয়েও যে তুতুল এবার দেশে ফেরার জন্য জেদ ধরেছিল, সেটাও আলমের কথা চিন্তা করেই। সে বুঝতে পারছিল আলমের ছটফটানি। নিজের বউয়ের জন্য আলম মুক্তিযুদ্ধের মতন একটা মহান ঘটনায় অংশ নিতে পারছে না, এজন্য তার মনে একটা ক্ষোভ বা অভিমান দানা বাঁধছে নিশ্চয়ই। অন্তত কলকাতায় পৌঁছলেও আলম সীমান্তে গিয়ে হাসপাতাল খুলতে পারতো।

তুতুল বললো, যুদ্ধ যদি না থামতো, আমিও তোমার সঙ্গে ফ্রন্টে যেতুম। আমি হাসপাতালে সাহায্য করতে পারতুম না?

আলম বললো, যুদ্ধ থেমে গেছে, এখন তো চিন্তার কিছু নেই। তুলতুলি, আমাদের প্ল্যানটা এবার একটু চেইঞ্জ করতে হবে। তোমাকে কলকাতায় নামিয়ে দিয়ে আমি ঢাকায় চলে যাবো!

তুতুল আহত বিস্ময়ের সঙ্গে বললো, আমাকে কলকাতায় নামিয়ে দেবে মানে? আমি একলা থাকবো?

আলম বললো, একলা থাকবি কেন, পাগলী, কলকাতায় তোর মা আছে, অন্য আত্মীয়স্বজন। আছে। ঢাকায় যাওয়ার জন্য আমার মন ছটফট করছে। বন্ধু বান্ধবরা কে কেমন আছে জানি না।

তুতুল আবার বললো, আমাকে ফেলে তুমি একা ঢাকায় চলে যাবে? কয়েকদিন পরে গেলে হয় না।

আলম বলো, বাঃ, পরে গেলে চলবে কেন? আমার সঙ্গে এতগুলান টাকা রয়েছে, সেটা পৌঁছে দিতে হবে।

–ঐ টাকা হোত এখন আর যুদ্ধের কাজে লাগবে না। বাংলাদেশ সরকারকে দেবে। দুদিন পরে দিলে কী ক্ষতি হয়? টি ভির খবরে বললো, চট্টগ্রামের দিকে এখনো গুলিগোলা চলছে। যুদ্ধ থামলেও সব দিক শান্ত হয়নি।

–ওতে কিছু আসে যায় না। আমায় ঢাকায় যেতেই হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তা হলে এক কাজ করো, তুমিও চলো আমার সঙ্গে।

–আমি সোজা ঢাকায় চলে যাবো, কলকায় না থেমে? মায়ের সঙ্গে দেখা করেও যাবো?

–সেও তো একটা কথা বটে। তুমি মায়ের সাথে দেখা না করেই বা কী করে যাবে? তাইলে তো আমাকে একলাই ঢাকায় এগিয়ে যেতে হয়! তুমি পরে এসে আমাকে জয়েন করবে।

–তুমি একটা দিনও কলকাতায় থেকে যেতে পারো না?

–আমার মা নাই বটে, কিন্তু অন্য আত্মীয়-স্বজন আছে, ভাই আছে, তাদের দেখার জন্য আমারও তো মন ছটফট করতে পারে।

–ও হ্যাঁ, তা ঠিক!

–তুমি রাগ করলে?  

–নাঃ, রাগের কী আছে। এটাই ঠিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। আমি কলকাতায় নেমে যাবো, তুমি ঢাকায় চলে যাবে।

আর কোনো কথা না বলে তুতুল বাথরুমে ঢুকে গেল। তার কান্না শুনতে পেল না আলম। তুতুলের মনের মধ্যে গেঁথে আছে একটা অযৌক্তিক ভয়, আলম একবার তার চোখের আড়াল হলেই সে আর তাকে ফিরে পাবে না। তুতুলকে যারা ভালোবাসে, তারা হারিয়ে যায়।

পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে বাথরুম থেকে বেরিয়ে তুতুল নিঃশব্দে শুয়ে পড়লো। দু’জনের কেউই ঘুমোলো না। তাদের ফ্লাইট অ্যানাউন্সমেন্ট হলো মাঝরাত্তিরে।

কলকাতায় এসে ওরা পৌঁছলো পরদিন বেলা দশটায়। বিমানবন্দরে কেউ ওদের রিসিভ করতে আসেনি। আগেরবার বাড়িতে ফেরার কথা জানিয়ে তুতুল চিঠি দিয়েছিল, পরে আবার টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানাতে হয়েছিল যে সে আসতে পারছে না। এবারে আর তুতুল কিছু লেখে

নিজের দেশে ফেরা, অথচ বিমানবন্দরে একজনও চেনা নেই, কেউ হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে না। এতে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। অন্যসব যাত্রীদের জন্য কত মানুষ এসেছে, কেউ কেউ আনন্দে কেঁদে ফেলছে। ভিড়ের মধ্যে একটি যুবকের হাতছানি দেখে তুতুলের ঠোঁট বুক কেঁপে উঠেছিল। ঠিক যেন বাবলু! কিন্তু বাবলু এখানে কী করে আসবে, সে তে বোস্টনে। কোনো কারণে বাবলু হয়তো দেশে ফিরে এসেছে, কোনো রহস্যময় উপায়ে তুতুলের ফেরার খবর পেয়েছে! তুতুল ভালো করে দেখলো, অনেকটা মিল থাকলেও সে ছেলেটি বাবলু নয়, সে হাত নাড়ছে তুতুলের পেছনের একজন যাত্রিণীর দিকে।

কাস্টমস বেরিয়ার পেরিয়ে এসে আলম ঢাকার ফ্লাইটের খবর নিল। আজ কলকাতা-ঢাকা তিনটে স্পেশাল ফ্লাইট যাবে, তারমধ্যে একটা বিদেশীদের জন্য। আলমের ব্রিটিশ পাশপোর্ট, তার টিকিট পেতে কোনো অসুবিধে হবে না। সে ফ্লাইট ছাড়বে দেড় ঘণ্টা পরে। এর মধ্যে তুতুলকে শহরে পৌঁছে দিয়ে আলম ফিরে আসতে পারবে না।

আলম জিজ্ঞেস করলো, তুমি ট্যাক্সি নিয়ে যেতে পারবে?

তুতুল মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, হ্যাঁ।

আলম বললো, চলো, আমি তোমাকে আগে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আসি, তারপর আমার টিকিটের ব্যবস্থা করবো।

লন্ডনের তুলনায় এখানকার শীত কিছুই না, তবু বাইরে এসে তুতুল যেন শীতে কেঁপে উঠলো। তার কাঁধে ভারি ব্যাগ। আলম নিজের সুটকেসটা এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে তুতুলের সুটকেসটা বয়ে নিয়ে আসছে।

দরাদরি করে একটা ট্যাক্সি ঠিক হলো, দরজা খুলে তুতুল বসলো ভেতরে। জানলার কাছে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আলম বললো, চিন্তার কিছু নেই। তুমি তোমার মায়ের কাছে যেকয়দিন ইচ্ছা থাকো, তারপর চলে এসো ঢাকায়। এখান থেকে টেলিফোন করা যায় না। একটা টেলিগ্রাম করে দেবে, আমি এয়ারপোর্ট থেকে তোমায় নিয়ে যাবো। ঠিক আছে?

তুতুল মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, হ্যাঁ।

আলম বললো, লক্ষ্মী হয়ে থেকো। প্রথমেই বেশি ঘোরাঘুরি করো না। তোমার শরীরটার রেস্ট দরকার। তোমার মাকে আমার নমস্কার জানিও। ওষুধগুলা সব ঠিক ঠাক খেও, কেমন? ও হ্যাঁ, ব্লাড প্রেসারের ওষুধটা, ভুলেই গেছিলাম…

কোটের পকেট থেকে একটা ওষুধের শিশি বার করে আলম দিল তুতুলকে। তুতুল সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো, আমি কিছু ওষুধ খাবো না। তোমার তো দেখবার দরকার নেই! চলিয়ে ট্যাক্সি।

তারপরই সে নুয়ে পড়লো কান্নায়।

আলম বললো, পাগলী আর কাকে বলে! ড্রাইভার সাব, ঠারিয়ে, ঠারিয়ে, এক মিনিট ঠারিয়ে।

তারপর ভেতরে মাথা ঝুঁকিয়ে সে তুতুলের বাহু ছুঁয়ে বললো, এই, তুই অত কান্নাকাটি করলে আমি যাই কী করে? একবার হাসি মুখে আমাকে কিছু বল।

তুতুল আলমের হাত ধরে টেনে ক্ষ্যাপাটে গলায় বললো, না, তুমি যাবে না। তোমাকে যেতে দেবো না। তুমি কিছুতেই আমাকে ফেলে যেতে পারবে না।

আলম দৌড়ে গিয়ে নিজের সুটকেসটা নিয়ে এসে ভেতরে উঠে পড়ে বললো, ঠিকই তল, একদিন পরে ঢাকায় গ্যালে কী ক্ষতি হয়! কলকাতার বাংলাদেশ মিশানে সব খবর পাওয়া যাবে!

ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো, কিধার জায়গা সাব?

আলম বললো, গ্র্যান্ড হোটেল।

তুতুল বললো, আমরা হোটেলে থাকবো?

আলম বললো, আগে একটা হোটেলে গিয়ে উঠি। স্নান-টান করি। তুমিও তো বলেছো, তোমার মায়ের বাসায় থাকার জায়গা নেই। খবর না দিয়ে বাক্সপ্যাটরা নিয়ে সেখানে কি যাওয়া যায়?

তুতুল চিন্তা করতে লাগলো। মামার বাড়িতে সত্যিই তো মোটে নাকি তিনখানা ঘর। টুনটুনিও থাকে ওখানে।

আলম বললো, হোটেলে ওঠা যাক। তারপর ধীরে সুস্থে গিয়ে দেখা করবে, তোমার মা যদি তোমাকে ওখানে থাকতে বলেন তো তুমি থেকে যাবে।

তুতুল চুপ করে গেল।

আলম আশা করেছিল কলকাতার রাস্তাঘাটে একটা যুদ্ধ জয়ের উৎসব দেখতে পাবে। কাগজের ফুলের মালা, ব্যান্ড পাটি, লোকেরা চিৎকার করে জয়ধ্বনি দিচ্ছে, ট্যাঙ্ক নিয়ে ফিরছে সোলজাররা, মেয়েরা তাদের দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে মালা!

সেসব কিছু নেই। কোনো উন্মাদনা, কোনো মিছিলও চোখে পড়ে না। অতি সাধারণ একটা দিন। বাসে ঝুলে ঝুলে যাচ্ছে মানুষ। রিকশা, লরি, ষাঁড়, ঠেলাগাড়িতে মাঝে মাঝে জট পাকিয়ে আছে ট্রাফিক, গাড়ির হর্নের শব্দে কানে তালা লেগে যায়।

গ্র্যান্ড হোটেলে একটাও ঘর নেই। ট্যাক্সি নিয়ে আরও দু’তিন জায়গায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত ওরা থিয়েটার রোডের একটা মাঝারি হোটেলে কোনোক্রমে একটি ডাবল বেড রুম পেল। কাউন্টারে খাতায় নাম টাম লেখার পর ঘরের চাবিটা হাতে পেয়ে আলম বললো, চলো!

তুতুল একটা মূর্তির মতন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলমের দু’তিনবার ডাকেও সে কোনো সাড়া দিল না। তারপর আচ্ছন্ন গলায় বললো, হোটেলে থাকবো?

কলকাতায় এসে, মায়ের সঙ্গে দেখা না করে একটা হোটেলের ঘর ভাড়া করে থাকার মধ্যে কেমন যেন একটা রুচিহীনতা অনুভব করছে তুতুল। এই কলকাতা শহরে তার জন্ম, তার মা আর প্রতাপমামা কত কষ্ট করে তাকে পড়িয়েছেন। গুনে গুনে ট্রামবাসের পয়সা হিসেব করে তুতুল প্রতিদিন কলেজে গেছে। একবার রাস্তায় চটি ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেটা সারাবার পর্যন্ত পয়সা ছিল না, ব্লাউজ থেকে একটা সেফটিপিন খুলে চটিতে আটকে নিয়েছিল। সেই তুতুল এখন বিলেত-ফেরত ডাক্তার হয়েছে, তার স্বামী বেশ অবস্থাপন্ন, তারা কলকাতায় এসে হোটেলে উঠছে? সবারি কাকে আর বলে!

তুতুল আস্তে আস্তে বললো, আমি আগে বাড়ি যাবো!

আলমও তুতুলের মনের ভাব বুঝতে পারলো খানিকটা। ঢাকাতে গিয়ে সে নিজে অবশ্য হোটেলেই ওঠে। কিন্তু তুতুলের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, সে বললো, চলো, তোমাকে আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি। আমি হোটেলে থাকলে তোমার আপত্তি নেই তো? একই শহরে তো থাকবো?

নিজের সুটকেসটা ওপরে পাঠাবার নির্দেশ দিয়ে আলম তুতুলের জিনিসপত্র নিয়ে আবার ট্যাক্সিতে উঠলো। এক্ষুনি সিগারেট শেষ করেছে, আবার সে সিগারেট ধরালো একটা।

হঠাৎ তুতুল বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সে আলমকে রাস্তা চেনাতে লাগলো। কলকাতার। চোদ্দ পনেরো বছর বয়েসে আলম একবার এখানে এসেছিল, এই শহর সে ভালো। করে চেনে না। সে পথচারিদের দিকে তাকিয়ে চেনা মানুষ খুঁজছে। সে শুনেছিল, ঢাকার শিক্ষিত লোকজনদের মধ্যে অনেকেই কলকাতায় এসে আশ্রয় নিয়েছে এই ক’মাস। চেনা লোক চোখে পড়ছে না বটে, তবে কিছু কিছু লোককে দেখে আলম বুঝতে পারছে, তারা ঐ পারের বাঙালী। চেহারায় পোশাকে কিছু একটা থাকে, যাতে বোঝা যায়। জিপে চড়ে হৈ হৈ করতে করতে চলে গেল একদল যুবক, তারা নিশ্চিত মুক্তিযোদ্ধা।

গড়িয়াহাটের মোড়ের কাছে এসে তুতুল হাসিমুখে বললো, আমি জানি, তুমি কেন আমাদের বাড়ি যেতে চাইছিলে না। তুমি আমার মাকে ভয় পাচ্ছো। তুমি আমার মায়ের চিঠি পড়েছিলে!

আলমও জোর করে ফিকে ভাবে হেসে বললো, মোছলমান জামাইরে শাশুড়ি ঝাঁটা পেটা করে যদি প্রথমেই?

তুতুল বললো, আমরা গরিব হয়ে গেলেও আমার মা বড় ঘরের মেয়ে, বনেদী বাড়ির বউ ছিলেন, নিজের হাতে কোনোদিন ঝাটা ধরেননি!

আলম বললো, জিভের ঝাঁটার মারে আসল ঝাঁটার থেকে লাগে বেশি! প্রথম দিনটা থাক। আজ আমি তোমাকে গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে আসবো। তুমি কথা টথা বলে দ্যাখো, যদি লাইন ক্লিয়ার দ্যাখো, আমি তারপর না হয় যাবো!

তুতুল বললো, মা যদি অবুঝ হয়, মানে, আমার মা যতই আমাকে বকুনি দিক, আমি তো আমার মাকে ছাড়তে পারবো না কখনো।

আলম বললো, তাহলে বুঝি আমাকে ছাড়বে?

আলমের দিকে কয়েক পলক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তুতুল বললো, মাঝে মাঝে তুমি এমন বোকার মতন কথা বলো! আমার কথাটা শেষ করতে দাও। আমি বলছি, আমার মাকে আমি ছাড়তে পারবো না, কিন্তু মা যদি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, আমি আর কোনোদিন তোমাকে আমাদের বাড়িতে আসতে বলবো না। তখন কলকাতায় এলে অন্য কোনো বাড়িতে কিংবা হোটেলে থাকতেও আমার খারাপ লাগবে না। মাঝে মাঝে আমি একা মায়ের সঙ্গে দেখা করে যাবো।

আলম বললো, দ্যাটস ফাইন ফর মি! কিন্তু পরীক্ষাটা কি আজই হবে? আজ আমার সত্যিই ইচ্ছে করছে না। আজ আমি হোটেলে ফিরে যাই? প্লিজ তুতুল!

তুতুল বললো, এখন যে বাড়িতে যাচ্ছি, এ বাড়িতে আমি কখনো থাকিনি। এই দিককার রাস্তাও আমি ভালো চিনি না।

আলম বললো, আমি তোমাকে ঠিকানা খুঁজে পৌঁছে দিচ্ছি। তুমি বিকেলবেলা একবার চলে এসো হোটেলে। ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসতে পারবে।

ঠিকানা বিশেষ খুঁজতে হলো না, সেলিমপুরের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রতাপ, একজন বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলছেন। তুতুল চেঁচিয়ে বলে উঠলো, ঐ তো! আমার মামা!

আলম তুতুলের উরুতে মৃদু চাপ দিয়ে বললো, এখন আমার পরিচয় দিও না। তুমি নামো, আমি সুটকেসটা নামিয়ে দিচ্ছি। এই ট্যাক্সি নিয়েই আমি চলে যাবো!

বৃদ্ধ ব্যক্তিটি উঠে গেলেন আর একটি গাড়িতে। মুখ তুলে প্রতাপ তুতুলকে দেখলেন। অবাক হয়েছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু কোনোরকম উচ্ছাস দেখানো তাঁর স্বভাবে নেই। তিনি যেন অতিকষ্টে মুখে একটু হাসি এনে বললেন, এসেছিস! ভালো করেছিস। তোর মায়ের শরীরটা ভালো নেই। এই তো এইমাত্র ডাক্তার চলে গেলেন।

তুতুল প্রতাপকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে মা’র?

প্রপ বললেন, সেটাই তো ঠিক ধরা যাচ্ছে না। অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে রে!

তুতুল মুখটা ঘুরিয়ে স্নান গলায় বললো, ডাক্তার চলে গেলেন? আমি জিজ্ঞেস করতুম। আলম, আমার মা খুব অসুস্থ।

আলমকে এবার নামতেই হলো। সে প্রতাপকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে যেতেই প্রতাপ তাকে ধরে ফেলে বুকে জড়িয়ে বললেন, এসো বাবা, ভেতরে এসো!

খাটের মাথায় তিনটে বালিশে ভর দিয়ে আধ-শোওয়া হয়ে রয়েছেন সুপ্রীতি, এক পাশে বসে আছেন মামুন, অন্যদিকে মমতা। একটা মুগার চাঁদর দিয়ে তাঁর শরীর ঢাকা। সুপ্রীতি কী যেন বলছেন মামুনকে, তাঁর গলার স্বর খসখসে, অর্ধেক কথা বোঝা যাচ্ছে না। শরীরটা ছোট্ট হয়ে গেছে। প্রথম পলক মাকে দেখেই, তুতুলের মনে পড়ে গেল জয়দীপের কথা!

কতদিন ধরে তুতুল স্বপ্ন দেখেছে, বাড়ি ফিরেই মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে একটা বাচ্চা মেয়ের মতন। মায়ের কোলে মুখ ওঁজে আদর খাবে। সেরকম কিছুই হলো না, সে বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়ে, মায়ের পায়ে হাত রেখে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কী হয়েছে, মা?

সুপ্রীতির মুখখানা আলোকিত হয়ে উঠলো। কিন্তু তিনি তুতুলকে কিছু বলার আগে গলা উঁচু করে দরজার কাছে দাঁড়ানো আলমকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ঐ বুঝি জামাই? ও মামুন, দ্যাখো, আমার জামাইকে দ্যাখো, কেমন সুপুরুষ! ভালো জামাই হয়েছে না? ও কি আমিন চৌধুরীর বাড়ির ছেলে?

মামুন আলমকে চেনেন না। তিনি বললেন, খুব সুন্দর জামাই হয়েছে। ও দিদি, তোমার মেয়ে-জামাই এসে পড়েছে, আর তোমার চিন্তা কী! আজ সকলেরই আনন্দের দিন!

সুপ্রীতি বললেন, দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেছে। ও তুতুল, শুনেছিস, হিন্দুস্থান পাকিস্তান আবার এক হয়ে গেছে। চল, আমরা সবাই মিলে একবার বাড়ি যাই।

মামুন বললেন, হ্যাঁ, দিদি, যাবো, আমরা নিশ্চয়ই যাবো। আর কয়েকটা দিন যাক। তুমি একটু সুস্থ হয়ে নাও। মালখানগরে গেলে নৌকো থেকে একটু হাঁটতে হবে, তোমার মনে আছে?

সুপ্রীতি বললেন, হ্যাঁ, আমি ঠিক হাঁটতে পারবো। জানো মামুন, আমার মা, মনে আছে তো আমার মাকে? দেওঘরে মা শেষনিঃশ্বাস ফেলার আগে কতবার খোকনকে বললেন, ও খোকন, আমারে একবার বাড়ি নিয়ে যা! খোকন কিছুতেই নিয়ে গেল না। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে। আমার জামাই এসেছে, সে নিয়ে যাবে।

প্রতাপ দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চুপ করে।

তুতুল একবার তাকালো আলমের দিকে। তারা দু’জনেই বুঝেছে যে সুপ্রীতির ক্যানসার হয়েছে। সুপ্রীতির কথাবার্তাও অসংবদ্ধ তুতুলের চোখ জলে ভরে গেল। মমতা তার মাথায় হাত রাখলেন।

আলম এসে দাঁড়ালো সুপ্রীতির শিয়রের কাছে। সুপ্রীতি তার একখানা হাত ধরে বললেন, তুমি আমিন চৌধুরীর বড় ছেলে, বড় ভালো ছেলে। আমার তুতুল তোমার অযোগ্য হবে না, দেখো। তবে, মেয়েটা বড় অভিমানী। ও কখনো অভিমান করলে তুমি ভুল বুঝো না যেন। বাবা।

আলম বললো, না মা, ওকে আমি ভুল বুঝবো না।

সুপ্রীতি চোখ বড় বড় করে বললেন, কী বললে? মা বললে? তুমি আমিন চৌধুরীর বড় ছেলে, তুমি মাকে আম্মা বলো না? মালখানগরে ওরা সবাই আম্মা বলতো।

আলম বললো, আম্মাও বলি, মা-ও বলি। আপনাকে আমি মা বলবো।

সুপ্রীতি তার চুলে হাত দিয়ে বললেন, অনেক বড় বাড়ি, সকলে এক সঙ্গে থাকবো, বড় উনুনে রান্না হবে, উত্তরের বারান্দায় লাইন করে আসন পাতা হবে। ইস, মা দেখলে কত খুশি হতো! নতুন জামাই এসেছে, মা দেখলো না!

৬২. সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ওরা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গাইছে, সোনা সোনা সোনা, লোকে বলে সোনা, সোনা নয় তত খাঁটি, লোকে যত বলে তারো চেয়ে খুঁটি, আমার বাংলাদেশের মাটি…। পাঁচ-সাতটি তরুণ কণ্ঠ। ধুপ ধাপ পায়ের আওয়াজ করে তাল দিচ্ছে তারা। কেউ কেউ নাচছেও বোধ হয়। কে কী ভাববে, তা নিয়ে ওদের বিন্দুমাত্র ক্রুক্ষেপ নেই। এ বাড়ির অন্য ভাড়াটেরা এর মধ্যে অনেকেই শুয়ে পড়েছে বাতি নিবিয়ে, তারা এই গানের হুল্লোড় শুনে চমকে উঠবে, বিরক্ত হবে, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ প্রতিবাদ করবে না অবশ্য।

দোতলায় এসে ওদের গান থামলো। তারপর বন্ধ দরজার গায়ে চাপড় পড়লো। প্রথমে একটি নরম হাতে, একটু পরেই একসঙ্গে কয়েকজন দরজা ঠেলতে ঠেলতে স্লোগান দিল, জেলের তালা ভাঙবো! শেখ মুজিবকে আনবো! জেলের তালা ভাঙবো!

মামুন আলো জ্বেলে রেখেই শুয়ে পড়েছিলেন। উঠে এসে ছিটকিনি খুলে কাষ্ঠহাসি দিয়ে বললেন, কী রে, এই ঘরটাকেও তোরা জেলখানা মনে করেছিস নাকি?

মামুনের কথা কেউ শুনলো না। মঞ্জু একটা মস্ত বড়ো রাজভোগ জোর করে তার মুখে ঠেসে দিয়ে হাসতে হাসতে বললো, এই তোমার দ্বারিক ঘোষের মিষ্টি!

হঠাৎ যেন ঘরখানা ভরে গেল প্রাণচাঞ্চল্যে। তিনটি তরুণী আর পঁচজন যুবক, তারা যে-যেখানে পারলো বসে পড়লো, কথা বলতে লাগলো দুতিনজন একসঙ্গে। সাদা দেওয়ালগুলোতে কোনো ছবি নেই, কিন্তু ওদের পোশাকের রঙে ঝলমল করে উঠলো পরিবেশ।

গত চার-পাঁচদিন ধরে এরকমই চলছে। যখন তখন এসে পড়ছে এক একটি দল, শুরু হচ্ছে আচ্ছা। সেইসঙ্গে হাসি, অকারণ উচ্ছ্বসিত হাসি, যেন কথার চেয়ে হাসিটাই আসল। রাত দেড়টা-দুটোর আগে আড্ডা ভাঙে না, এরপর অনেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে, কলকাতার রাত থেকে হঠাৎ যেন সব আতঙ্ক মুছে গেছে, নকশালদের খুনোখুনিও বন্ধ।

হলুদ সিল্কের শাড়ির ওপর একটা কমলা রঙের সোয়েটার পরেছে মঞ্জু, এই দুটি রঙেই যেন তার রূপ সবচেয়ে ভালো খোলে। মঞ্জুর সঙ্গে অন্য দুটি মেয়ের মধ্যে একজন তাহমিনা, ব্যারিস্টার মতিউর রহমানের কন্যা, তার সাজ বেশ উগ্র, ঠোঁটে চড়া লিপস্টিক, অতি সূক্ষ্ম ভুরু, এই শীতেও তার গায়ে সোয়েটার বা আলোয়ান নেই, অবশ্য সে হল্যান্ড থেকে সদ্য এসেছে। অন্য মেয়েটিকে মামুন ঠিক চিনতে পারছেন না। ছেলেদের মধ্যে রয়েছে মাহবুব, আপেল, পলাশ, সাত্তার, শওকতরা।

খাটের তলা থেকে হারমোনিয়ামটা টেনে পলাশ বাজাতে শুরু করে দিল, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী…’। মামুন গান ভালোবাসেন। কিন্তু এক একসময় গানটাও তার কাছে অত্যাচার বলে মনে হয়, তিনি বিরক্তভাবে ভাবলেন, আবার এত রাত্রে গান!

মঞ্জু বললো, আরও অনেক মিষ্টি রয়ে গেছে, কে কে খাবে? মামুনমামা, তুমি আর একটা খাও! তুমি এত দ্বারিক ঘোষের মিষ্টির গল্প বলতে, অনেক খুঁজে আনা হয়েছে!

মামুন মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে না না বলতে লাগলেন, মঞ্জু তার হাতের রস গড়ানো রাজভোগটা খুঁজে দিল পলাশের মুখে, পলাশের দু’ হাত হারমোনিয়ামে, সে বাধা দিতে পারলো না, অন্যরা একটা উদ্দাম হাসির ঝড় তুললো।

এই আড্ডায়, হাসিতে, গানে সুর মেলাতে পারছেন না মামুন। এদের সঙ্গে তার বয়েসের অনেক তফাত তো বটেই, তা ছাড়াও আজ সারাদিন ধরেই তার বুকটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এইরকমই হয়, কোনো কিছুর জন্য যদি তীব্র প্রতীক্ষা থাকে, দিনের পর দিন যার জন্য প্রবল অনিশ্চয়তা কুরে কুরে খায়, তারপর সেটা পাওয়া হয়ে গেলেও যেন ঠিক সেরকম আনন্দ হয় না। এত ভয়, উৎকণ্ঠা ও বিপদের বিষাদের পর স্বাধীনতা এলো, মামুন খুশি হয়েছেন ঠিকই। তবু মাঝে মাঝে মন খারাপও লাগছে কেন? জয়ের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছেদের বিষণ্ণতা তো লেগে থাকবেই। এই যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছে, যারা চিরকালের মতন হারিয়ে গেছে, তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেছেন মামুন অনেকবার। কিন্তু সেইজন্যই কি তার বুকে পাষাণভার চেপে আছে?

শওকত জিজ্ঞেস করলো, কবে ঢাকায় ফিরবেন, মামুনভাই?

উত্তর দেবার আগে মামুন তীব্র চোখে একবার মঞ্জুর দিকে তাকালেন। এই প্রশ্নটা সবচেয়ে প্রথমে মনে আসা উচিত ছিল মঞ্জুর। কিন্তু সে ঢাকা ফেরার ব্যাপারে একবারও উচ্চবাচ্য করেনি! এজন্য মঞ্জুর ওপর বেশ বিরক্ত হয়েছেন মামুন। মঞ্জুর স্বামী বাবুল চৌধুরীর সঠিক কোনো খবর আজও পাওয়া যায়নি। হারিয়ে যাওয়া তিরিশ লক্ষ বাঙালীর মধ্যে সেও আছে কি না তাও কেউ জানে না, তবু সে সম্পর্কে মঞ্জুর কোনো উদ্বেগ নেই? দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে কি মেয়েরাও সব স্বাধীন হয়ে যা ইচ্ছে করবে, ধেই ধেই করে এখানে সেখানে অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াবে!

মামুন উত্তর দেবার আগেই আর একজন বললো, দাঁড়াও, আর কয়েকটা দিন যাক। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারই তো এখনো ঢাকায় যায়নি। কুত্তার বাচ্চা রাজাকাররা এখনো নাকি এদিক সেদিকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

শওকত বললো, না, গেছে, বাংলাদেশ সরকার আজ বিকাল থেকে ঢাকায় ফাংশান করছে। আজ দুপুরেই আমি এয়ারপোর্টে তাজউদ্দিন সাহেবদের সী-অফ করে এসেছি!

মাহবুব বললো, ঢাকার আশেপাশে এখনো গোলমাল চলছে ঠিকই। মুক্তিযুদ্ধের পোলাপানদের হাতে এল এম জি, স্টেনগান… আজ এখানকার দু-একটা পেপারে কাদের সিদ্দিকীর গ্রেফতারের খবর পড়েছো?

মামুন শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, আঁ? টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকী গ্রেফতার হয়েছে নাকি? কেন?

মাহবুব বললো, গ্রেফতার হয়নি এখনো, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছে ইন্ডিয়ান আর্মিকে। ঢাকার পল্টন ময়দানে কাদের সিদ্দিকী হাজার হাজার লোকের সামনে চারজন লোককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে শাস্তি দিয়েছে, সে কথা শোনেননি? ল অ্যান্ড অর্ডার যদি সে নিজের হাতে নিতে চায়…

মামুন বললেন, মুক্তিযুদ্ধের অতবড় একজন বীর কাদের সিদ্দিকীকে যদি ইন্ডিয়ান আর্মি অ্যারেস্ট করে, তাহলে সাধারণ মানুষ আবার ক্ষেপে যাবে না? ইন্ডিয়ান আর্মির ওপরেই ক্ষেপে যাবে।

মাহবুব বললো, সারা দেশে এখন অরাজকতা, শেখ সাহেব যদি না আসেন, তাহলে আর একটা গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। গেরিলারা যদি বিনাবিচারে যাকে তাকে ধরে মারতে শুরু

মঞ্জু বললো, তোমরা আবার ঐ সব কথা শুরু করলে! এখন থামো তো!

তাহমিনা বললো, গান হোক, গান হোক! এত কষ্টে স্বাধীনতা পাওয়া গেল, তা নিয়ে আনন্দও করতে জানো না? এর মধ্যেই উল্টো সুর গাইতে শুরু করলে!

মঞ্জু বললো, কে কে চা খাবে? আমি চায়ের পানি বসাবো!

হার্টের অসুখের পর মামুন চা-পান কমিয়ে দিয়েছেন, তবু তিনি এখন বললেন, আমারে এক কাপ দিস, মঞ্জু!

মঞ্জুর ছেলে সুখ এখন জাস্টিস মাসুদ সাহেবদের বাড়িতেই থাকে। হেনা কৃষ্ণনগরের এক ক্যাম্পে নার্সের কাজ শুরু করেছিল, আগামীকাল তার ফেরার কথা। মঞ্জু প্রত্যেক সন্ধেবেলা। কোনো না কোনো বিজয় উৎসবে গান গেয়ে আসছে। মঞ্চে বসে হাজার মানুষের হাততালি শোনার নেশা পেয়ে বসেছে তাকে। কয়েকদিন আগে তার গানের একটা রেকর্ডও বেরিয়েছে এইচ এম ভি থেকে, কলকাতার বড় বড় কাগজে ছাপা হয়েছে তার ছবি।

পলাশ আবার হারমোনিয়ামে সুর ধরলো।

যাঃ, সত্যিই পাকিস্তান ভেঙে গেল? এই চিন্তাটা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছেন না। মামুন। তিনি তো এই ন’ মাস মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইছিলেনই, তবু কেন এই নৈরাশ্য? পশ্চিম পাকিস্তানীদের অন্যায় শোষণ, সামরিক বাহিনীর বীভৎস অত্যাচার, বাঙালী মুসলমানদের একেবারে পঙ্গু করে দেবার চেষ্টা, এসব তো মামুন নিজের চোখেই দেখেছেন। মরিয়া হয়েই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিশেষ প্রস্তুতি না নিয়েই মুক্তি সংগ্রামে নেমে পড়েছিল। তবু তার ধারণা ছিল, পাকিস্তানী শাসকরা একসময় ভুল বুঝতে পারবে, ভুট্টোর পরামর্শে কর্ণপাত না করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের হাতে প্রধানমন্ত্রিত্ব দেবেন। পাকিস্তান বাচবে। শেষ মুহূর্তেও ওরা সেই ভুল স্বীকার না করে পাকিস্তান ভাঙতেও রাজি হয়ে গেল! এখনকার ছেলে ছোকরারা বুঝবে না, একসময় কত স্বপ্ন, কত সাধ নিয়ে গড়া হয়েছিল এই পাকিস্তান, এর জন্য কত অশ্র, কত রক্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে।

সিঁড়িতে ধুপ ধাপ শব্দ করতে করতে আবার উঠে এলো একটি দল। তাদের মধ্যে শাখওয়াত হোসেনকে দেখে মামুন বেশ চমকে উঠলেন। হোটেল টাইকুন ও দিন-কাল পত্রিকার মালিক এই হোসেন সাহেবের সঙ্গে মামুনের কলকাতা শহরের বিভিন্ন জায়গায় দেখা হয়েছে কয়েকবার, মামুন শুকনো ভদ্রতা রক্ষা করেছেন মাত্র, এর সঙ্গে আর পুরোনো সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। হোসেন সাহেবকে তিনি কোনোদিন তার বাসায় আসতে বলেননি, তবু তিনি এখানে চলে এলেন কী করে?

তাহমিনা হাততালি দিয়ে বলে উঠলো, ঠিক টানে টানে চলে এসেছে! ওরে নাসিম, বলেছিলাম না, ডোন্ট গেট নারভাস, তুই হারাবি না!

দু’দিকে কান পর্যন্ত হাসি ছড়িয়ে হোসেন সাহেব বললেন, হারাবে কেন? তোমাদের সাথে আছে… এই নাও, তোমাদের সকলের জন্য বিরিয়ানি এনেছি, সিরাজ থেকে, আর কিছু কাবাব, মুর্গ মশল্লম শেষ হয়ে গেছে, ওরা ভালো বানায়।

হোসেন সাহেবের এক সঙ্গীর হাতে তিন-চারখানা বিরাট খাবারের প্যাকেট। ঘি ও মাংসের গন্ধে ঘরের বাতাস থেকে গান মুছে গেল।

এমন দিনে সকলকেই খাতির করতে হয়, মামুন নিজের চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আসামু আলাইকুম, বসেন বসেন!

হোসেন সাহেব মামুনকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আলাইকুম আসোলাম, হক সাহেব, স্বাধীন, স্বাধীন! আমরা একটা স্বাধীন নেশান! আপনের কথাই সত্যি হইলো, ইন্ডিয়াই আমাগো প্রকৃত বন্ধু! হারামজাদা পাকিস্তানীরা এমন শিক্ষা পাইছে যে এখন ঘা শুকাইতে এক জেনারেশান লাগবে।

চেয়ারটাতে গ্যাট হয়ে বসে তিনি সোনার সিগারেট কেস খুলে প্রথমে নিজে একটি তুললেন, তারপর সেটা বন্ধ করে পকেটে ভরতে গিয়েও কী মনে করে আবার এগিয়ে দিলেন মামুনের দিকে।

মঞ্জু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, না, মামুনমামাকে দেবেন না। ওঁর সিগারেট বন্ধ।

হোসেন সাহেব বললেন, আরে, আইজ একটা খাইলে কোনো ক্ষতি নাই!

গত কয়েকদিন ধরে মামুন মঞ্জুকে লুকিয়ে আবার সিগারেট টানতে শুরু করেছেন। এখনও সংযম রাখতে পারলেন না, তুলে নিলেন একটা।

হোসেন সাহেব যেখানে উপস্থিত থাকেন সেখানে তিনিই প্রধান বক্তা। সিগারেটে বড় টান। দিয়ে তিনি বললেন, আমি সারেণ্ডারের খবরটা কোথায় পেলাম জানেন? দিল্লিতে? আজমীড় শরীফ হয়ে আমি আগ্রা, লক্ষ্ণৌ, দিল্লি ঘুরে আসলাম। ওঃ, ইন্ডিয়া কি বিরাট কান্ট্রি, কত ভ্যারাইটি, এখানে মোছলমান, শিখ, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, হিন্দু,কতরকম মানুষ, সবাই মিলামিশা আছে। আর ম্যাডাম ইন্দিরা গান্ধী, গ্রেট লেড়ি, সারা দুনিয়ায় এমন মহান লেডি আর নাই, বোঝলেন। সিক্টটিথ বিকালে আমি দিল্লিতে, সারেণ্ডারের খবর শোনার পর বুকখান দশহাত হইয়া গেল, আর পাকিস্তানের সেকেণ্ড ক্লাস সিটিজেন না, স্বাধীন বাংলার ফাস্ট ক্লাস সিটিজেন, ম্যাডাম ইন্দিরা গান্ধীরে স্বচক্ষে দ্যাখলাম, বোঝলেন, দিল্লির পার্লামেন্টের সামনে, বড় ঘরের মেয়ে তা দ্যাখলেই বোঝা যায়, কই, তোমরা বিরিয়ানি খাও, এখনও গরম আছে।

শওকত একসময় হোসেন সাহেবের পত্রিকা অফিসে চাকরি করতো, কোনোদিন ওর সামনে চোখ তুলে কথা বলেনি, কিন্তু এই ক’মাসেই সে যেন অনেক বদলে গেছে। সে রীতিমতন। ইয়ার্কির সুরে বললো, হোসেন সাহেব, আপনি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক বললেন কেন? স্বাধীন বাংলাতেও কি প্রথম শ্রেণী, দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক থাকবে নাকি?

হোসেন সাহেব বললেন, ওটা কথার কথা! বাংলাদেশে আমরা সবাই ফাস্ট ক্লাস, কী কও? আচ্ছা, ইচ্ছা করলে আমরা এখন ইন্ডিয়ারও সিটিজেনশিপ নিতে পারি না? ইন্দিরা গান্ধীরে ঠিকমতন বুঝাইলে উনি রাজি হবেন মনে হয়। ইন্ডিয়ায় একসময় আমার অনেক প্রপাটি ছিল। জানো, পার্ক সার্কাসে আমি একটা বাড়ি এক্সচেঞ্জ করছিলাম, সেই বাড়িটা আজ সকালে এককবার দ্যাখতে গেলাম, কী সুন্দর চকমিলানো বাড়ি, আম গাছ দুইটা এখনো আছে, এক হিন্দু উকিল সেই বাড়ি নিয়েছে, ঢাকায় পুরানা পল্টনে আমার একখান বাড়ির বিনিময়ে, কিন্তু কলকাতায় সেই বাড়ির দাম এখন ভারতীয় টাকায় নয় লাখ! ক্যান ইউ ইমাঝিন! সেই বাড়িখান যদি ফিরৎ পাইতাম এখন।

শওকত একই রকম লঘ সুরে জিজ্ঞেস করলো, আপনি ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ চান? বাংলাদেশ ছেড়ে দেবেন? আপনি চলে গেলে আমাদের কী করে চলবে!

হোসেন সাহেব বললেন, না, না। বাংলাদেশ ছাড়বো কেন? সে কোয়েশ্চেনই ওঠে না। আমি কইতেছি ডুয়াল সিটিজেনশিপের কথা। যেমন ধরো আমেরিকা আর ক্যানেডা, ইচ্ছামতন। যখন যে দেশে থাকতে চাই থাকলাম। একমাস আগে আমি আমেরিকা ট্যামেরিকা ঘুইরা আসলাম তো!

মামুন চুপ করে আছেন। তিনি অনুভব করলেন, এই ক’মাসে আর যাই-ই হোক, হোসেন। সাহেবের ইংরিজি জ্ঞানের বেশ উন্নতি হয়েছে।

বিরিয়ানি খেয়ে একদল বিদায় নিয়ে চলে গেল। রাত এখন সাড়ে বারোটা। কয়েকজন এখনো রয়ে গেছে। হোসেন সাহেব কথায় মশগুল হয়ে আছেন। মামুনের ঘুম পেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি মুখ ফুটে অন্যদের চলে যেতে বলবেন কী করে? হোসেন সাহেবরা তার ঘরে মেহমান, ভদ্রতা রক্ষা করতে হবে। মামুন হাই চাপছেন। হেনা থাকে না বলে মঞ্জু এখন জাস্টিস মাসুদের বাড়িতে শুতে যায়, সে বাড়ি বেশি দূর নয়, কিন্তু এর পরে আর সেখানে মঞ্জু যাবে কী করে? রাত দুপুর পার করে সে বাড়ির লোকদের ডেকে তুলবে? মঞ্জুর চোখে চোখ ফেলার চেষ্টা করছেন তিনি, কিন্তু মঞ্জু মুগ্ধভাবে চেয়ে হোসেন সাহেবের বাগাড়ম্বর শুনছে অন্যদিকে চেয়ে।

মাঝখানে দুটি গান হলো বটে, কিন্তু পলাশ একটু গান থামাতেই হোসেন সাহেব আবার কথা শুরু করলেন। শুধু ইন্দিরা গান্ধীর গুণপনার বিবরণ। আর ভারতের মহান জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতার উচ্ছ্বাস।

আরও দু’জন বিদায় নিল দশ নিট পরে।

শওকত জিজ্ঞেস করলো, হোসেন সাহেব, আলতাফের খবর কী? সে আপনার সাথে ইন্ডিয়ায় আসে নাই?

হোসেন সাহেব বললেন, না হে! সে তো ওয়েস্ট জামানি চলে গিয়েছিল। চিকিৎসার জন্য। যুদ্ধ করতে গিয়ে সে তো উল্ডেড হয়েছিল কিনা। অতি সামান্য অবশ্য। বাম পায়ের বুড়া আঙ্গুলে একটা চোকলা ওঠছে। কিছুদিন আগে তাকে দিল্লিতে দ্যাখলাম। এখন ভালোই আছে। তাকে দিল্লিতেই থাকতে বলেছি, সে আমার বিজনেস ইন্টারেস্ট দেখবে এখানে।

এতক্ষণ বাদে মামুন জিজ্ঞেস করলেন, আলতাফের ছোট ভাই বাবুল চৌধুরীর কোনো সন্ধান রাখেন?

হোসেন সাহেব একবার মঞ্জুর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, সে তো একজন কোলাবোরেটার, তাই না? কমুনিস্ট!

যেন এর বেশি কিছু আর বলার প্রয়োজন নেই। তিনি আবার সিগারেট ধরাতে মন দিলেন, তারপর মুখ তুলে বললেন, চলো নাসিম! শওকত যাবে কোথায়? আমার গাড়ির ড্রাইভার আবার ঘুমায়ে পড়লো নাকি!

শওকত জিজ্ঞেস করলো, কবে ঢাকায় ফিরবেন আপনি?

হোসেন সাহেব হেসে বললেন, দেরি আছে। কতকগুলা বিজনেস ডিল করে যাবো। ইন্ডিয়ার সাথে এবার ভালোমতন বিজনেস শুরু হবে। তা তো বুঝতেই পারো। এরা কি আর শুধা ধা যুদ্ধ করলো। আমি অলরেডি বারো কোটি টাকার টোব্যাকো, মানে সিগারেট, তামাক, পানের ইমপোর্ট অর্ডার পেয়েছি। তার বদলে আমি মাছ পাঠাবো। কলকাতার মানুষ আমাগো মাছের জন্য জেহা বার করে আছে।

শওকত হাসতে হাসতে বললেন, তামাকের বদলে মাছ! এ যে নিকোটিনের বদলে প্রোটিন! এ তো আমাদের ঠকা!

হোসেন সাহেবের মুখ থেকে হাসি মুছে গেছে। তিনি বললেন, ঠকতে তো হবেই! এখন কত বছর ঠকতে হয় তাই দ্যাখো! এই হিন্দু ইন্ডিয়া মাগনা যুদ্ধ করে নাই। সব সুদে-আসলে তুলে নেবে! মুসলমানের হোমল্যান্ড ছিল পাকিস্তান, সেটা ভেঙে দিয়ে দিল্লিতে সবাই নাচানাচি করতাছে, বোঝলা? নিজে দেখে আসছি! আই হ্যাভ সিন ইন মাই ওউন আইজ! বাংলাদেশ-টাংলাদেশ ওরা কিছু বোঝে না। মুসলমানদের ডাউন দিয়াই অগো আনন্দ। হেঃ, সেকুলার না হাতি! ইন্ডিয়া মানেই হিন্দু! আর ঐ যে ইন্দিরা গান্ধী, মুখেই শুধু মিঠা মিঠা বুলি, আসলে ইয়াহিয়া খানের বদলে ঐ ইন্দিরা গান্ধীই এখন ইস্ট পাকিস্তানরে এক্সপ্লয়েট করবে। আগে ছিল পাকিস্তানী আর্মি, এখন রইলো ইন্ডিয়ান আর্মি। এই আমি কইয়া দিলাম। লিখ্যা রাখো, একবার যে ইন্ডিয়ান আর্মি ঢাকায় গিয়া গাইড়া বসছে, আর সহজে আসবে না!

মঞ্জু আর তাহমিনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেছে, শওকত কয়েকবার উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাসি দিয়ে হোসেন সাহেবকে বোঝাতে চেয়েছে, মামুন দুতিনবার বাধা দেবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু হোসেন সাহেব সেসব কিছুই লক্ষ না করে ছুটিয়ে দিয়েছেন কথার রেলগাড়ি। ঘরের মধ্যে লোকজন কমে গেছে বলে হোসেন সাহেব প্রাণ খুলে কথা বলতে শুরু করেছেন, পলাশের মুখে সরু দাড়ি দেখে তিনি তাকেও ধরে নিয়েছেন নিজেদের একজন হিসেবে।

পলাশ গায়ক মানুষ, সে রাজনৈতিক আলোচনায় বিশেষ অংশ নেয় না। সে লজ্জা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমি এবার চলি?

শওকত তার হাত ধরে টেনে বললো, আর একটু বসো। একসঙ্গে যাবো।

তারপর সে গলা চড়িয়ে বললো, ইন্ডিয়ান আর্মি আর ফিরে আসবে না, তাই না? আপনি এই গুজবটাও শোনেননি যে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অফিসাররা বাংলাদেশের সব জেলায় গিয়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হবে! তারাই দেশটা চালাবে!

হোসেন সাহেব বললেন, এটা গুজব কে কইলো তোমায়? এইটাই ফ্যাকট!

শওকত মামুনের দিকে ফিরে বললেন, আপনিও তাই মনে করেন, মামুনভাই? ইন্ডিয়ান আর্মি আর ফিরে আসবে না? ওরা বাংলাদেশকে একটা কলোনি করে রাখবে?

মামুন মৃদু হেসে বললেন, সব ইন্ডিয়ান আর্মি নিশ্চয়ই ফিরবে না। কিছু থেকে যাবে। যে বারো-চোদ্দ হাজার ইন্ডিয়ান আর্মি এই যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে, বাংলাদেশের মাটিতে যাদের গোর হয়েছে, তারা আর ফিরবে কী করে বলো!

হোসেন সাহেব সদর্পে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তোমরা যতই ইন্ডিয়ার তোষামোদ করো, আমি তবু সাচাই কথা বলবো! এখন থেকে আমাদের হিন্দ ইন্ডিয়ার আণ্ডারেই থাকতে হবে। এত ছোট বাংলাদেশ স্বাধীন থাকতে পারে না!

শওকত বললো, কেন, নেপাল নেই? বার্মা নেই? হোসেন সাহেব বললেন, নেপাল হিন্দু রাজ্য আর বার্মিজরা বৌদ্ধ। তোমরা তো সব কিছু তলিয়ে দেখো না! ঐ ইন্দিরা গান্ধীর চোখ দ্যাখলেই বোঝা যায়, প্যাটে প্যাটে শয়তানী বুদ্ধি। যুদ্ধ মানেও ব্যবসা! সে এমনি এমনি যুদ্ধ করে নাই। যা খরচ হয়েছে, এখন সুদে-আসলে। উঠাইয়া নেবে।

মঞ্জু কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, ভালো লাগছে না! আমার এসব কথা একেবারে ভালো লাগছে না! আপনারা চুপ করবেন?

তাহমিনা বললো, প্লিজ স্টপ ইট! ইন্ডিয়ার সঙ্গে হয়তো পরে আমাদের সম্পর্ক অন্যরকম হতে পারে, কিন্তু এখনই আপনারা কু গাইছেন কেন? হোয়াই সো সুন? বিগ ব্রাদারকে কেউ বেশিদিন সহ্য করে না! আমেরিকানরা যখন ফ্রান্সকে লিবারেট করলো, তার কিছুদিন পরেই ফ্রান্স অ্যান্টি-আমেরিকান হয়ে গেল! সোভিয়েত ইউনিয়ন ইস্টার্ন ইউরোপের দেশগুলো লিবারেট করে সেখানে বড় বড় শহরে নিজেদের সোলজারদের একটা করে মূর্তি বসিয়ে গেছে, তাই নিয়ে এখন হাসি-ঠাট্টা হয়। তবু অ্যাটলিস্ট প্রথম দিকে সেসব দেশে অনেক ইউফোরিয়া ছিল। আমাদের মাত্র চারদিন হয়েছে! এর মধ্যেই এইসব শুরু করলেন আপনারা? ইন্ডিয়া আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে, তা কি অস্বীকার করতে পারবেন? তার বিনিময়ে আমাদের কি কিছুই দেবার নেই?

শওকত বক্র হেসে বললো, কিছু কেন, বেশ কিছুই আমরা অলরেডি দিয়েছি। এই যে নব্বই-পঁচানব্বই লাখ শরণার্থী এতদিন রয়ে গেল ইন্ডিয়ার মাটিতে, তাদের পেচ্ছাপ-পায়খানাও রয়ে গেল এখানে। তাতে এখানকার জমি উর্বর হবে। সেটাই বা কম কী? বলো, পলাশ?

এবার পলাশ হেসে উঠলো হা হা শব্দে।

এরপর বিদায় নেবার পালা। রাত দেড়টা বাজে, মঞ্জু আর জাস্টিস মাসুদের বাড়িতে যেতে চাইলো না। তাহমিনাও মঞ্জুর সঙ্গে থেকে যেতে চায়। হোসেন সাহেব তার গাড়িতে শওকত, পলাশ, নাসিমকে নিয়ে চলে গেলেন।

পাশাপাশি দুটি খাট, একটিতে মঞ্জু আর তহমিনা শোবে। একসময় মামুনের ঘুম এসে গিয়েছিল, এখন তার চোখ খরখরে। আজ আর সারা রাতে তার ঘুম আসবে কি না সন্দেহ। ঘুম চটে গেছে। মনের মধ্যে একটা উথাল-পাথাল চলছে, এক জীবনে দেশের দু’বার স্বাধীনতা দেখলেন মামুন, প্রথমবারের তীব্র আনন্দের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের যে অনেক তফাত তা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারছেন না। হোসেন সাহেবের কথাগুলির তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেননি, তবু একটা বিষণ্ণতা যাচ্ছে না কিছুতেই।

রাত্রির প্রসাধন সারতে মঞ্জু গেছে বাথরুমে, তাহমিনা লজ্জা লজ্জা মুখ করে জিজ্ঞেস করলো, মামুনমামা, আপনার সামনে স্মোক করতে পারি? একটা সিগারেট!

এ মেয়ে ইওরোপে থাকে, ধূমপানের নেশা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়। অন্যদের সামনে সে একথা প্রকাশ করেনি। মামুন ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে চোখ ঘুরিয়ে বললেন, আমাকেও একটা দাও, মঞ্জু এসে পড়ার আগে।

তাহমিনা শুধু মামুনকে সিগারেট দিল না, মেম সাহেবদের ভঙ্গিতে তার গণ্ডদেশে একটা চুম্বন করে বললো, ইউ আর আ ডিয়ার!

তারপর সিগারেট ধরিয়ে সে বললো, মামুনমামা, ঐ হোসেন সাহেব একজন ফিলদি রিচ পার্সন, তাই না? এইসব লোকের পাকিস্তানী আমলেও যত সুযোগ সুবিধা ছিল, পরের জমানাতেও সেই একইরকম থাকবে, দেখবেন! ওনার কথা শুনে আমার একটা পিকিউলিয়ার ফিলিং হচ্ছিল, জানেন! একঘণ্টা আগে ইন্দিরা গান্ধীর খুব প্রশংসা করছিলেন, যেই ঘরের অন্যলোক চলে গেল অমনি ইন্দিরা গান্ধীর নিন্দা শুরু করলেন। আমার মনে হলো, এইরকম লোক আমি আগে অনেক দেখেছি। পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি তো, সব দেশেই এই রকম হোসেনসাহেবরা থাকে। আমার আরও মজা লাগছিল এই জন্য যে, আমি ইন্ডিয়ান।

মামুন একটু চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাই নাকি? তবে যে শোনলাম, তুমি—

তাহমিনা হাসলো। মজার ব্যাপার। আমার বাবা ইন্ডিয়া ছেড়ে চলে গিয়ে পাকিস্তানের সিটিজেনশীপ নিয়েছিল। কিন্তু আমি আবার ফিরে এসেছি।

মামুন আরও কিছু শোনার জন্য উৎসুকভাবে তাকিয়ে রইলেন।

তাহমিনা বললো, আমার জন্ম বরিশালে। আমার আম্মা-আব্বু কলেজ লাইফেই আমাকে ইওরোপে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আই অ্যাম ম্যারেড় টু অ্যান ইন্ডিয়ান ডক্টর, ইউসুফ আলী, আমার হাজব্যান্ডের সাথে আমি আমস্টারডামে থাকি। মনে-প্রাণে আমি বাংলাদেশের সাপোর্টার। কিন্তু আই হোল্ড অ্যান ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট।

মামুন বললেন, এই জেনারেশানটা আমি বুঝি না। সত্যিই বুঝি না!

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে মঞ্জু বললো, এইবার তুমি যাও, আপা!

এত রাতে ঠাণ্ডার মধ্যে মঞ্জু চুল ভিজিয়েছে? একটা তোয়ালে দিয়ে সে চুল মুছছে, তার পরনে এখন একটা সাধারণ ডুরে শাড়ি, সে গুনগুন করে গান গাইছে। মামুন মঞ্জুর সঙ্গে একটাও কথা বললেন না, নিজের খাটে শুয়ে কম্বল দিয়ে মুখ ঢাকা দিলেন।

তার ঘুম আসছে না। একটু পরেই তিনি অনুভব করলেন, তার খাটের পাশে কেউ এসে বসেছে। নারীর যৌবনের সুগন্ধ এসে লাগছে তার নাকে। মামুন নিশ্বাস বন্ধ করতে চাইছেন।

মঞ্জু বললো, মামুনমামা, আমরা ঢাকা ফেরার আগে একবার আজমীড় শরীফ যাবো না?

মামুন শরীরটাকে নিস্পন্দ করে রাখলেন, কোনো সাড়া দিলেন না।

মঞ্জু আবার জিজ্ঞেস করলো, আমরা তাজমহল দেখবো না? ও মামুনমামা, বলো না।

এবারও উত্তর না পেয়ে মঞ্জু জোর করে মামুনের মুখের ওপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে দিয়ে অভিমানের সুরে বললো, তুমি আমার ওপর রাগ করেছো? আমি কী দোষ করেছি? তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না?

হঠাৎই যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন মামুন। ভালোবাসা শব্দটি বহুদিন হারিয়ে গিয়েছিল। দেশকে ভালবাসা মানুষকে ভালোবাসা, এইসব কথা যখন-তখন মুখে এসে যায়, খুব বেশি বিশ্বাসের জোর না থাকলেও চলে! কিন্তু একজন নারীর মুখ থেকে ভালোবাসা শব্দটির উচ্চারণের শিহরনই অন্যরকম।

মামুন উঠে বসে অভিভূতের মতন তাকিয়ে রইলেন মঞ্জুর দিকে। কোনো কথাই বলতে পারলেন না।

মামুনের বাহু ছুঁয়ে মঞ্জু বললো, তোমার শরীর খারাপ করছে না তো?

মামুন এবার দুদিকে মাথা নাড়লেন।

মঞ্জু মামুনের কাছে ঝুঁকে এসে বললো, আমরা কলকাতা ছেড়ে বেশি দূরে যাইনি কখনো। আমরা ইন্ডিয়ার আর কিছু দেখবো না? দার্জিলিং? মামুনমামা, হেনার খুব ইচ্ছা শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া করার।

খুট করে বাথরুমের দরজার শব্দ হতেই মঞ্জু সরে গেল। সেকি বেশি তাড়াতাড়ি সরে গেল? তাহমিনার কাছে তার কিসের লজ্জা?

তাহমিনা বললো, হায় আল্লা, ইট ইজ টু এ এম! আর কোনো কথা না, এবার ঘুম। কিন্তু আই অ্যাম নট শ্লিপি অ্যাট অল! সারা রাত গল্প করলে কেমন হয়? আর তিন চার ঘণ্টা পরেই তো ভোর হয়ে যাবে।

মামুন দুর্বল গলায় বললেন, তোমরা চাও তো গল্প করা, আমি ঘুমবো।

তাহমিনা খিলখিল করে হেসে বললো, আমরা দু’জন গল্প করলে আপনি ঘুমাতে পারবেন? মামুনমামা, আমি জানি, ইউ আর আ পোয়েট। আপনার দুই একটা কবিতা শোনান না আমাদের? কী বলল, মঞ্জু?

মঞ্জু উত্তর দিল না। মামুন শুকনো গলায় বললেন, দা মিউজ হ্যাঁজ লেট মী! এখন শুয়ে পড়াই ভালো। ঠিক সাড়ে ছটায় ঝি এসে দরজা খটাখট করবে।

ওদের মতামতের অপেক্ষা না করে মামুন নিজেই আবার শুয়ে পড়লেন মুখে কম্বল চাপা দিয়ে। মঞ্জু আর তাহমিনা আরও কিছুক্ষণ গল্প করলো ফিসফিস করে। মামুন ওদের কথা ঠিক শুনতে পাচ্ছেন না, কিন্তু তার মাথার মধ্যে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই বাক্য, মামুনমামা, তুমি আমায় আর ভালোবাসো না? তুমি আমায় আর ভালোবাসো না? তুমি আমায় আর ভালোবাসো না?

কেন মঞ্জু বললো এ কথা? মামুন তো কোনোদিন মঞ্জুর সামনে ভালোবাসা শব্দটি ঠিক স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেননি! অবশ্য ভালোবাসা শব্দটি অনেকেই হাল্কাভাবে ব্যবহার করে। বাংলাভাষায় ভালোবাসা যে কতরকম! মাকে ভালোবাসা, পোষা কুকুরকে ভালোবাসা, সন্দেশ রসগোল্লা ভালোবাসা, সবই তো ভালোবাসা! স্নেহের নামও তো ভালোবাসা!

পঁচিশে মার্চের পর থেকে মামুন মঞ্জু সম্পর্কে স্নেহ বা ভালোবাসা, কোনোটাই বোধ করেননি। এই ন’মাসের দুশ্চিন্তায়, দুঃস্বপ্নে সেসব কোমল অনুভূতির কোনো স্থানই ছিল না। বরং এর মধ্যে বেশি খরচ-টরচ হয়ে গেলে তিনি মঞ্জুকে বকুনিও দিয়েছেন কয়েকবার। কোনোরকমে বেঁচে থাকাটাই যেখানে সমস্যা, সেখানে অন্য কোনো কথাই মনে আসে না। মঞ্জু তো এই কয়েকমাসে একবারও মামুনের বাহু ছুঁয়ে এমন অন্তরঙ্গ সুরে কিছু বলেনি। স্বাধীনতা এসেছে বলেই কি স্বাভাবিক চিত্তবৃত্তিগুলি ফিরে এসেছে?

তাহমিনা আর মঞ্জুর কথাবার্তা থেমে গেল এক সময়, মামুনের তবু ঘুম আসছে না। এখন কত রাত তা কে জানে! মামুন ছটফট করতে লাগলেন। গত মাস দেড়েক এই ঘরে তার একা থাকা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। এখন পাশের খাটে শুয়ে আছে দুই যুবতী! শরীর ভেঙে গেছে, মামুন এখন প্রৌঢ়ত্বের এলাকা পার হয়ে বার্ধক্যের দিকে ঝুঁকেছেন, বাইরে থেকে দেখে সবাই তাই বুঝবে। কিন্তু মনটা যে এখনো তাজা রয়ে গেছে, তা তো কেউ দেখে না। মন এখনও চঞ্চল হয়, ভালোবাসার জন্য একটা কাঙালপনা আজও রয়ে গেছে। মজ সম্পর্কে একটা সুপ্ত টান তিনি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারেন না। অন্য যুবকেরা মঞ্জুর সঙ্গে বেশি অন্তরঙ্গতা করলে তার বুক ঈর্ষায় জ্বলে যায়। মকে বাবুল চৌধুরীর হাতে পুনরায় সঁপে দেওয়া তার এক পবিত্র দায়িত্ব, সেই জন্যই মঞ্জুকে তিনি আগলে আগলে রাখেন। শুধু কি সেইজন্য? বাবুল যদি আর বেঁচে না থাকে? এত সব স্বাস্থ্যবান সুবেশ যুবকের সঙ্গে মঞ্জুর এখন মেলামেশা, ঐ পলাশ ছেলেটা তো মঞ্জুর পাশ থেকে নড়তেই চায় না, তবু মঞ্জু আজ হঠাৎ কী ব্যাকুল গলায় তাকে বললো, মামুনমামা, তুমি আমায় আর ভালোবাসো না? মঞ্জু কি তাহলে শুধু মামুনের ভালোবাসারই প্রত্যাশী? নাকি, এটা নিছক কথার কথা!

খুট করে বেড় সুইচ টিপে আলো জ্বেলে মামুন খাট থেকে নামলেন। দুই নারীই এখন ঘুমন্ত। মঞ্জু চিত হয়ে আছে, তাহমিনা দেওয়ালের দিকে পাশ ফেরা। দিন দিন আরও যেন সুন্দর হচ্ছে মঞ্জু। কলকাতায় এত নারী দেখলেন মামুন, কিন্তু মঞ্জুর চেয়ে সুন্দর যেন একজনও না। মঞ্জু যেন মামুনের প্রথম যৌবনের মানসী সেই বুলা অর্থাৎ গায়ত্রীরই প্রতিমূর্তি। কী আশ্চর্য মিল!

এই যে মামুন এখন মঞ্জুর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন, এখন তিনি আর মঞ্জুর মামুনমামা নন। তিনি কবি মোজাম্মেল হক। অনেকদিন কবিতা লেখেননি, তাতে কী হয়েছে, কবির কখনো মৃত্যু হয় না।

মৃদু নিঃশ্বাসে মঞ্জুর বুক উঠছে নামছে। কপালে এসে পড়েছে কুঞ্চিত চুল। মঞ্জুর ঠোঁটে একটু একটু হাসি লেগে আছে। চোখ দুটি যেন ঘুমন্ত দুটি পাখি।

মামুন আরও এগিয়ে এসে মঞ্জুকে স্পর্শ করতে গেলেন। বুকের মধ্যে অসম্ভব তোলপাড় হচ্ছে। যেন এক্ষুনি জাগিয়ে তুলে জানানো দরকার, ওরে, আমি তোকেই শুধু ভালোবাসি। তোকে ছেড়ে আমি একদণ্ড থাকতে পারি না।

হাতখানা তুলেও মামুন থেমে রইলেন। যেন একটা পাথরের মূর্তি। তাহমিনা পাশে শুয়ে আছে, এসময় মঞ্জুকে ছুঁয়ে জাগানো যায় না।

বুকের মধ্যে শুধু তোলপাড় নয়, একটা সূচবেঁধার মতন ব্যথাও হচ্ছে, আবার কি হৃদযন্ত্রণা শুরু হলো? সেকেন্ড অ্যাটাক! ডাক্তার সিগারেট খেতে প্রবলভাবে নিষেধ করেছিলেন, এবার অ্যাটাক হলে আর বাচার আশা নেই। ঢাকায় আর পোঁছোনো হবে না? যদি আজ রাতেই মৃত্যু আসে, তার আগে একবার মঞ্জুকে বুকে নেবেন না?

টলতে টলতে সরে এসে মামুন একটা সরবিট্রেট মুখে দিলেন, তারপর জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বুকটা ডলতে লাগলেন জোরে জোরে। তার চোখ জলে ভিজে আসছে। না, না, তিনি এখন মরতে চান না কিছুতেই।

জানলার বাইরে দেখা যাচ্ছে আবছা অন্ধকারে শীতকালের ঠাণ্ডা আকাশ। ভোরের আর কত দেরি? কাছেই একটা মশজিদ আছে, সেখান থেকে মাইকে প্রত্যেকদিন ফজরের আজানের সুর ভেসে আসে। সেই শব্দে এক একদিন অতি ভোরে ঘুম ভেঙে যায় বলে মামুন বিরক্তই হন। আজ তিনি ব্যাকুলভাবে সেই আজানের মধুর সুরের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।

আশ্চর্য ব্যাপার, বুকে এইরকম ব্যথা, তবু মামুনের দুটি ইচ্ছে ক্রমশ তীব্র হতে লাগলো। আর একটা সিগারেট খাওয়া আর মঞ্জুকে একবার গাঢ় আলিঙ্গনে বুকের মধ্যে পাওয়া। এ কী অদ্ভুত পাগলামি, মামুন নিজেই বুঝতে পারছেন এরকম করা যায় না। তবু কেন ইচ্ছে হয়! না, না, বাচতে হবে, ঢাকায় ফিরে যেতে হবে, বাবুল চৌধুরীর হাতে তুলে দিতে হবে মঞ্জুকে, ফিরোজার কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে হেনাকে। মামুনের এখনও কত দায়িত্ব। স্বাধীন বাংলাদেশের রূপটি তিনি দেখে যাবেন না?

দু’চোখ দিয়ে দরদর করে অশ্রু নেমে আসছে, মামুন হাত জোড় করে ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, হে আল্লা, হে মহান পিতা, আমাকে শক্তি দাও! ভোগবাসনা ভুলিয়ে আমাকে শান্তি দাও! সদ্যোজাত বাংলাদেশকে তুমি রক্ষা করো। দীন দুঃখী, নিপীড়িত মানুষগুলিকে তুমি নতুনভাবে জীবন গড়ার ভরসা দাও! হে করুণাময়, আমার চিত্তের অস্থিরতা ঘুচিয়ে দাও! অনুচিত বাসনা থেকে, লোভ থেকে আমায় মুক্তি দাও! “আলহামদুলিল্লাহে নাহমাদুহু অ নাস্তাঈনূহু…” আমাকে আবার কবিত্বশক্তি ফিরিয়ে দাও!

৬৩. লাল রঙের গাড়িটার ওপর

লাল রঙের গাড়িটার ওপর পাতলা বরফ বিছিয়ে আছে। যেন একটা সাদা সিল্কের চাঁদর দিয়ে গাড়িটা ঢাকা। ডিসেম্বরের গোড়া থেকেই বেশ ঘন তুষারপাত শুরু হয়ে গেছে, এ বছর একেবারে সাদা ক্রিসমাস হবে, মাত্র আর দুদিন বাকি। চতুর্দিকে ছুটি ছুটি রব উঠে গেছে। বাতাস এমন নির্মল যে বড় একটা নিশ্বাস নিলে মনে হয় যেন বুকটা জুড়িয়ে গেল।

পায়ে গ্যালশ, অর্থাৎ গামবুট, ভারি ওভারকোটটার কলার তুলে দেওয়া, কান ঢাকা টুপি, হাতে একটা বেলচা নিয়ে বরফ পরিষ্কার করছে অতীন। রাস্তার বরফ সাফ করার ভার মিউনিসিপ্যালিটির, বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়ে পরিষ্কার করার দায়িত্ব সত্যদা এক একদিন এক একজন ভাড়াটেকে ভাগ করে দিয়েছেন। অতীন ভোরে উঠতে পারে না। নির্দিষ্ট দিনগুলিতে শর্মিলা তাকে ফোন করে জাগিয়ে দেয়। এই মাসেই অতীনের নিজস্ব টেলিফান এসেছে।

রাস্তার দু ধারের গাছগুলিতে ঝুলন্ত সরু সরু বরফের অজস্র সোনাঝুরি, সকালের রোদে ঝলমল করছে সব কিছু। আকাশ এখন পরিষ্কার, কিন্তু কখন যে হঠাৎ আবার তুষারপাত শুরু হবে, তার কোনো ঠিক নেই।

গাড়ির ভেতরে ঢুকে হিটার চালিয়ে দেবার একটু পরেই গাড়িটা গরম হয়ে গলিয়ে দিল তুষারের আবরণ, বেশ নিজে নিজেই ধোয়া হয়ে গেল। এক টুকরো ফ্লানেল দিয়ে অতীন আদর করে মুছতে লাগলো গাড়িটাকে। এর মধ্যেই গাড়িটা তার খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে, থার্ড হ্যাণ্ড গাড়ি। কিন্তু এর মধ্যে একদিনও গড়বড় করেনি। নিউ ইয়র্কে বেকার থাকার সময় অতীন মাকে চিঠি লিখেছিল যে সে একটা লাল রঙের গাড়ি কিনেছে। তখন গাড়ি কেনা দূরে থাক, টিউব ট্রেনের টিকিট কাটার জন্যই তাকে পয়সা ধার করতে হতো সিদ্ধার্থর কাছে। এতদিন পর অতীন যে গাড়িটা কিনলো, সেটার রং সত্যিই লাল।

নিছক শখে কেনেমি, গাড়িটা অতীনের কাছে এখন জামা-জুতোর মতনই প্রয়োজনীয় জিনিস। বাড়ি থেকে তার অফিস এগারো মাইল দূরে, বাসে বা ট্রেনে প্রতিদিন যাতায়াত করতে যা খরচ পড়ে তার চেয়ে গাড়ির খরচ কম। তা ছাড়া প্রতিদিন সময় বাঁচে। টিউব স্টেশান। থেকে তার অফিস প্রায় পনেরো মিনিট হাঁটার দূরত্বে।

চাকরি পাওয়ার জন্য অতীনের কোনো চেষ্টাই করতে হয়নি, এমনকি একটা দরখাস্তও লিখতে হলো না। ইউনিভার্সিটিতেই বিভিন্ন বড় বড় কম্পানির প্রতিনিধিরা আসে, পি-এইচ ডি-র ছাত্রছাত্রীরা কে কীরকম কাজ করছে তার খবরাখবর নেয়। তিনটি কম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিল অতীন, তাদের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে খেতে সে চাকরির শতাদি আলোচনা করেছে। সেই সময় তার মনে পড়ছিল, নিউ ইয়র্কের এক হোটেলের সুইমিং পুলে এক ব্যাটা সাহেবের সঙ্গে ইন্টারভিউ দেবার কথা। কত অপমান সহ্য করতে হয়েছে সেসব দিনগুলিতে। সিদ্ধার্থর সুট ধার করে পরে যেত, নিখুঁতভাবে বাঁধতে টাইয়ের গিট। আর এখন টাই-ফাইয়ের বালাই নেই, জিনস আর পাকা পরেই সে লাঞ্চ খেতে গেছে। এখন তার গায়ে একটা নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পি-এইচ ডি শেষ করেই তার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল না! চাকরিটা নেবার আগে দিন তিনেক অতীন খুব মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে মুখ ভ্যাংচাতো। শর্মিলা তাকে বুঝিয়েছে। শর্মিলা সেই কয়েকটা দিন প্রায় সর্বক্ষণ তার সঙ্গে ছিল। এখনো অতীনের ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, জোর করে দেশে ফেরা মানে আত্মহত্যার সমান। অতীনের বাবা-মাও তাকে ফেরার কথা একবারও লেখেন না।

সোমেনের কাছে এসে উঠেছে তার মামালে ভাই শমীক, সে সদ্য পাশ করে এসেছে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। তার কাছ থেকে পশ্চিমবাংলার রাজনীতির অবস্থা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। নকশালপন্থীরা এখন যাকে বলে অন দা রান। বড় নেতাদের মধ্যে এখনও একমাত্র চারু মজুমদারই ধরা পড়েননি। কানু সান্যাল, সুশীতল রায়চৌধুরী, অসীম চ্যাটার্জিরা চারুবাবুর নীতির বিরোধিতা করতে শুরু করেছেন জেলে বসেই, খতম আন্দোলনকে এখন বলা হচ্ছে ভুল, মাও সে তুং খতম বলতে খুন বোঝাননি, নতুন ব্যাখ্যায় খতম মানে নিরস্ত্রীকরণ, ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। অর্থাৎ যাকে ইচ্ছে তাকে খুন করাটা ঠিক হয়নি। কিন্তু বড় দেরিতে এসেছে এই উপলব্ধি। এখন চলেছে খুনের বদলা খুনের পালা। সি পি এমের ছেলেরা ঠিক করেছে, তাদের একজন খুন হলে প্রতিশোধ হিসেবে তিনজন নকশালকে শেষ করে দেওয়া হবে। কংগ্রেসের ছেলেরা এক একটা পাড়া ধরে নকশাল ছেলেদের খুঁজে বার করে প্রকাশ্যে হত্যা করছে। পুলিশও মারছে নির্বিচারে। এখন যে সব ছেলেমেয়ের গায়ে সামান্য নকশাল গন্ধ আছে, তাদেরই জীবন বিপন্ন।

অতীনের তুলনায় শমীকের বয়েস কম, কিন্তু সে অতীন মজুমদারের নাম জানে। অতীন ঠিক নেতা ছিল না, তবু বিভিন্ন পোস্টারে ও দেওয়াল লিখনে নাকি তার নামে লাল সেলাম জানানো হয়েছে। অনেকের ধারণা অতীন মজুমদার মৃত, কারুর কারুর ধারণা সে নিরুদ্দিষ্ট। এই সময় অতীন মজুমদার দেশে ফিরলে তাকে ফুলের মালা কিংবা লাল সেলাম দিয়ে সংবর্ধনা জানাবার জন্য কেউ থাকবে না। বরং তার জন্য অপেক্ষা করবে ছুরি, বন্দুক অথবা জেলের দরজা।

অতীন তার সাইকেলটা শমীককে দিয়ে দিয়েছে। ছাত্র অবস্থায় সাইকেল নিয়ে ঘোরা যায়। কিন্তু সাইকেল চেপে রোজ অফিস যাওয়া যায় না। তা ছাড়া রোজ বাইশ মাইল সাইকেল চালানো কি চাট্টিখানি কথা! আসলে গাড়ি কেনার ব্যাপারে অতীনের একটা লজ্জাবোধ আছে, সেইজন্য সে মনে মনে প্রায়ই এই যুক্তিগুলো আওড়ায়। গাড়িটার দাম সে শোধ করে দিয়েছে এই মাসেই, এটা এখন তার নিজস্ব গাড়ি, এর মধ্যেই গাড়িটা তার খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে। দেখে কেউ চট করে বুঝতে পারবে না যে এটা পুরোনো গাড়ি।

এই ছুটিতে প্রথম সে গাড়িটা নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে। সিদ্ধার্থ ক্রিসমাসের ছুটিটা একসঙ্গে কাটাবার জন্য নেমন্তন্ন করেছে অতীনদের। প্রথমে দুদিন থাকা হবে নিউ ইয়র্কে, তারপর বাফেলো। পাঁচুদা-শান্তা বউদিরা এখন বাফেলোতে আছেন। ওদের ওখানে নিউ ইয়ার্স ইভের বিরাট পাটি। মাঝখানে ওরা নায়েগ্রা জলপ্রপাত দেখে ঘুরে আসবে টরোন্টো। এতদিন হয়ে গেল, অতীন আমেরিকার কোথাও বেড়াতে যায়নি, কিছুই প্রায় দেখেনি। শমিলার মামাতো বোন সুমিও যাবে সঙ্গে, মেরিল্যাণ্ড থেকে অলিকে তুলে নেওয়া হবে।

ডিসেম্বরের গোড়া থেকেই সবাই জিজ্ঞেস করে, ছুটিতে কোথায় যাচ্ছো? এদেশে অনেকেই প্রায় প্রতি উইক এণ্ডে বাইরে যায়, আর ক্রিসমাসের লম্বা ছুটিতে চতুর্দিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। দেশে পুজোর ছুটির মতন। অতীনের মনে পড়ে প্রত্যেক পুজোর ছুটিতে বাড়িসুদ্ধ সকলে মিলে দেওঘরে যাওয়া হতো। শুধু দেওঘরেই প্রত্যেকবার। আর কোথাও না। কারণ দেওঘরে ঠাকুমা থাকতেন। দাদার মৃত্যুর পর আর যাওয়া হয়নি। একটি মৃত্যু বদলে দিয়েছিল অনেক কিছু।

এদেশে ট্রেনে তেমন ভিড় হয় না, সবাই বেরিয়ে পড়ে গাড়ি নিয়ে। শর্মিলা প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে, অতীন মদ খেয়ে গাড়ি চালাতে পারবে না। গত বছর ক্রিসমাস থেকে নিউ ইয়ার্স ডে-র মধ্যে সাড়ে পাঁচ শো লোক গোটা আমেরিকায় মারা গিয়েছিল শুধু গাড়ির অ্যাকসিডেন্টে। নিজে মদ না খেলেও অন্য মাতালরা গাড়িতে এসে ধাক্কা মারতে পারে, সে ঝুঁকি তো রয়েছেই।

গাড়িটা মুছে পরিষ্কার করে অতীন দোতলায় উঠে এসে ব্রেক ফাস্ট বানাতে লাগলো। দুটো ডিম সেদ্ধ, খানিকটা স্যালামি, চারখানা টোস্ট, দু কাপ কালো কফি। কফির সঙ্গে আবার একটুকরো কেক। সকালবেলাটায় অতীন বেশি করে খেয়ে নেয়, দুপুরে সে লাঞ্চ খায় না, তাতে শরীরটা ঝরঝরে থাকে, মাঝে মাঝে চা খায়, তার সঙ্গে বড় জোর একটা স্যাণ্ডউইচ। নতুন চাকরিতে ঢুকেই অতীনকে খুব খাটতে হচ্ছে। প্রথম থেকেই তাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে ল্যাবে। এই ওষুধ কম্পানির নিজস্ব রিসার্চ ল্যাব তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বড়।

রাত্তিরের খাওয়াটা সে আর শর্মিলা একসঙ্গে খায়। হয় কোনো রেস্তোরাঁয়, অথবা শর্মিলা রান্না করে। এখন সুমির সঙ্গেও অতীনের বেশ ভাব হয়ে গেছে, সুমির রান্নার হাত শর্মিলার চেয়ে অনেক ভালো, অবশ্য সুমি প্রায় সন্ধেতেই বাড়ি থাকে না, সে একটি মারাঠী ছেলের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে।

অফিস থেকে অতীন আর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরে না, সোজা শর্মিলাদের ওখানে চলে যায়। ওখানে স্নান করে। শর্মিলা টি ভি আসক্ত, দুটো সিরিয়াল সে কিছুতেই মিস করে না। ‘ডালাস’ থাকলে শর্মিলা কিছুতেই বাড়ি থেকে বেরুবে না, রান্না করতে করতে টি ভি দেখবে।

আজ শর্মিলা কিছু কেনাকাটি করবে বলে রেখেছে, আজ বাইরে খাওয়া। শর্মিলাদের বাড়ির সামনেটা বরফে ঢাকা। এ বাড়িতে প্রায় শুধু মেয়েরাই থাকে, এরা বরফ পরিষ্কার করে না। গাড়িটা রাস্তায় পার্ক করে অতীন দৌড়ে এসে পর্চে উঠলো, তারপর পা ঠুকে ঠুকে বরফ ঝাড়তে লাগলো। এর মধ্যেই মাইনাস টেন, তাপমাত্রা রোজই নামছে। একটু আগে ঝিরিঝিরি তুষারপাত শুরু হয়েছে।

দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো সুমি। গলার কাছে ফার লাগানো একটা সুন্দর নীল রঙের ওভারকোট পরেছে, চুল বাঁধারও কী যেন একটা কায়দা করেছে নতুন ধরনের। সুমির নতুন বন্ধু ভিজেয় শাঠে ভালো ছবি আঁকে, সে সুমির একটা বড় পোর্ট্রেট আঁকছে কয়েকদিন ধরে।

হাই বলে সুমি এদেশী কায়দায় অতীনের গালে ঠোঁট ছোঁয়ালো, তারপর বললো, তুমি যেই এলে, অমনি স্নো পড়তে শুরু করলো!

অতীন বললো, একটু স্নোর মধ্যে হাঁটলে তোমার গালটা আরও লালচে দেখাবে। তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসবো, সুমি?

সুমি বললো, নতুন গাড়ি, তাই সবাইকে তুমি লিফট দিচ্ছো? না, আজ আমার দরকার নেই। তোমরা কপোত-কপোতী নিরিবিলিতে থাকো, আমি দশটার পর ফিরবো!

অতীন তবু বললো, শর্মিলা তো শপিং করবে, আমরা এক্ষুনি বেরুবো। তোমাকে বিজয়ের ওখানে নামিয়ে দিতে পারি।

এ কথার উত্তর না দিয়ে সুমি অতীনের চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, এইবার বুঝবে মজা!

তারপর সে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটে গেল।

অতীন একটু হকচকিয়ে গেল, সুমির কথাটার মানে সে বুঝতে পারলো না। কিসের জন্য মজা বুঝবে? চাকরিটা ভালো পেয়েছে বলে? সে তো দু মাস হয়ে গেল।

ওপরে উঠে এসে দেখলো, শর্মিলা এখনো বেরুবার জন্য তৈরি হয়নি বিছানার ওপর একটা বই খোলা, টি ভিও চলছে, শর্মিলা পরে আছে একটা পাতলা হাউসকোট। অতীনকে দরজা খুলে দিয়ে সে আবার বিছানায় গিয়ে বসে পড়লো।

অতীন ভুরু তুলে জিজ্ঞেস করলো, এ কী, তুমি দোকানে যাবে না?

সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শর্মিলা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অতীনের দিকে। যেন সে অতীনকে নতুন দেখছে। অতীন মাথা ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,কী? তাও কোনো উত্তর নেই। এক একটা দিন মেয়েরা এরকম রহস্যময়ী হয়ে যায়, তাদের ভাবভঙ্গি কিছুই বোঝা যায় না।

ওভারকোটটা খুলে অতীন একটা চেয়ারের ওপর রাখলো। তারপর জ্যাকেট, সোয়েটারও খুলতে লাগলো। ঘরের ভেতরটা বেশ গরম হয়ে আছে, শর্মিলাদের বাড়িটা পুরোনো আমলের। প্রত্যেক ঘরে ফায়ার প্লেস রয়েছে, সেখানে অবশ্য কাঠের আগুন জ্বলে না, একটা ইলেকট্রিক হীটার গনগন করছে।

অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অতীন আবার জিজ্ঞেস করলো, তোমার শরীর খারাপ?

শর্মিলা বললো, বাবলু, আমার পাশে এসে একটু বসো।

জুতোটা খুলে অতীন শর্মিলার পাশে এসে শুয়ে পড়ে বললো, কী ব্যাপার। আজ আর বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না? দ্যাটস ফাইন ফর মি।

শর্মিলা বললো, বাবলু, আমি যদি হঠাৎ মরে যাই?

শর্মিলাকে চুমু খেতে গিয়েও থেমে গেল অতীন। কনুইতে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে শর্মিলার চোখমুখ দেখলো, কোনো অসুস্থতার লক্ষণ তার চোখে পড়লো না। শর্মিলার চোখের পাতা। তিরতির করে কাঁপছে।

সে গম্ভীর গলায় বললো, মরে গেলে আর কী হবে, হারিয়ে যাবে! হঠাৎ মরার শখ হলো। কেন?

আবার কোনো উত্তর না দিয়ে অতীনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো শর্মিলা। অতীনের মুখে চেপে রইলো মুখখানা। এরকম সময় কী কথা বলতে হয় অতীন জানে না তার ইচ্ছে করছে খুব কষে একটা ধমক লাগাতে। কিন্তু অতীন একটু জোরে কথা বললেই শর্মিলা তাকে বলে মেল শোভেনিস্ট। আর একবার যদি শর্মিলা অভিমান করে, তা হলে সেই অভিমান ভাঙাতে অতীনের তিন-চারদিন লেগে যাবে। সে চুপ করে থেকে শর্মিলার পিঠে হাত বোলাতে লাগলো।

একটু পরে শর্মিলা ধড়মড় করে উঠে পড়ে চলে গেল বাথরুমে। অতীন চিৎ হয়ে শুয়ে একটা সিগারেট ধারালো। এ সব কী হেঁয়ালি হচ্ছে, সে কিছুই ধরতে পারছে না। পুরুষরা এরকম পারে না, তারা তাদের প্রত্যেকটি আচরণের একটা না একটা ব্যাখ্যা দিয়ে যায় সব সময়। ভুল বা মিথ্যে হলেও একটা কিছু যুক্তি সাজাবার চেষ্টা থাকে। হয়তো সামান্য কোনো ব্যাপার নিয়ে শর্মিলার মন খারাপ হয়েছে। অতীন তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো, তার ব্যবহারে কোনো ত্রুটি হয়েছে কি না। আজ সকালেও শর্মিলার সঙ্গে টেলিফোনে গল্প হয়েছে, তখন সে ভালো মেজাজেই ছিল। অবশ্য, কখনো কখনো দু তিনদিন, বা কয়েক সপ্তাহ আগের কোনো ঘটনা মনে পড়ে যাওয়াতেও শর্মিলা ব্যাকুল হয়ে পড়ে।

হঠাৎ অতীনের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগলো। অলি কি কিছু বলেছে? অলির সঙ্গে শর্মিলার প্রায়ই টেলিফোনে কথা হয়, ওদের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব।

অতীনের মুখখানা কুঁচকে গেল। সে এক হাতের আঙুল চালাতে লাগলো চুলের মধ্যে। বাথরুমে অবিরাম কলের জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। কল খুলে রেখে কি শর্মিলা চুপ করে বসে আছে?

যখনই কোনো পরিস্থিতিতে অতীন বুঝতে পারে না যে তার কী করা উচিত। তখনই সে রেগে যায়। মাথা ঠাণ্ডা করে কোনো সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না। একবার সে ভাবলো, এক্ষুনি লাফিয়ে উঠে বাথরুমের দরজায় দুম দুম করে ধাক্কা মেরে বলবে, এসব কী ন্যাকামি হচ্ছে? আমি অফিস থেকে খেটেখুটে ফিরছি, বরফ ভরা রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসতে হয়েছে, তারপরেও তোমাকে দোকানে নিয়ে যাবার জন্য তৈরি আছি, খিদেয় পেট জ্বলছে, তবু তুমি আমার দিকে মনোযোগ না দিয়ে নিছক ভাবালুতা করে যাচ্ছো? তোমার যদি রাগ বা দুঃখের কারণ কিছু ঘটে থাকে, তা হলে আমাকে সেটা পরিষ্কার খুলে বলো!

অতীন বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই শর্মিলা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। অনেকটা স্বাভাবিক গলায় বললো, চলো, বেরোই। কয়েকটা জিনিস কিনতেই হবে।

শর্মিলা পোশাক বদলাতে লাগলো, অতীন ওদের রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে খানিকটা আগের দিনের ডাল, একটুখানি স্প্যাগেটি-চিংড়ি এই সব লেফট ওভার খেয়ে মেটালো খিদে। একটা বীয়ারের ক্যান খুলে চুমুক দিল।

নিচে নেমে এসে, গাড়িতে বসে উইণ্ডস্ক্রিন পরিষ্কার করতে করতে অতীন জিজ্ঞেস করলো, এবার জানতে পারি কি মহারানীর আজ কী জন্য মেজাজ খারাপ?

শর্মিলা তার নরম হাতে অতীনের গালটা ছুঁয়ে বললো, বাবলু, তোমাকে আমি ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি! কিন্তু তোমাকে না জানিয়ে আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি।

–কী সেটা?

–সেটা আমি তোমাকে কিছুতেই বলতে পারছি না। প্লিজ, ডোন্ট ইনসিস্ট। পরে একদিন বলবো। অন্তত দু-একদিন পরে। এই, তুমি সীট বেল্ট বাঁধোনি?

–তুমিও বেঁধে নাও।

অতীন গাড়ি ঘোরালো ডাউন টাউনের দিকে। তুষারপাত থামেনি, তবু রাস্তায় অনেক মানুষ। দোকানগুলোতে চাঁদের হাট বসে গেছে। এত আলো যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কোনো কোনো দোকানের সামনে জ্যান্ত সান্টাক্লজকে ঘিরে মজা করছে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা।

অতীনের কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিয়েছে শর্মিলা। অতীন একটা ব্যাপারে স্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছে। অলি নয়, অলি কিছু বলেনি। শর্মিলাটা একেবারে পাগলী, নিশ্চয়ই অতি তুচ্ছ কোনো ব্যাপারকে সে অন্যায় বলে ভাবছে। এইরকম সূক্ষ্ম-অনুভূতিপরায়ণতার জন্যই শর্মিলাকে তার বেশি ভালো লাগে। অলির সঙ্গে এই দিক দিয়ে তার খুব মিল।

শর্মিলা আপন মনে বলে উঠলো, খুব মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে একবার। আমি আমার মায়ের কাছে আজ পর্যন্ত কোনো কথা গোপন করিনি। মা তোমার কথাও সব জানে। কিন্তু এই কথাটা মাকে কী করে বলবো!

–কোন কথাটা?

–টেলিফোনেও বলা যাবে না। দেশে ফিরে, মার পাশে শুয়ে রাত্তিরবেলা চুপি চুপি বলতে হবে। মা ঠিক বুঝবে, রাগ করবে না।

–তা হলে একবার দেশে ঘুরে এসো। এই সেপ্টেম্বরে তোমার রিসার্চ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ছ সপ্তাহ ঘুরে এলে ক্ষতি কী?

–ভ্যাট! তোমাকে ছেড়ে আমি দেশে যাবো? তোমাকে ছেড়ে আমি আর একদিনও থাকতে পারবো না। যদি হঠাৎ মরে যাই, তুমি আমার পাশে থাকবে।

–আবার ওইসব বাজে কথা! শোনো, লেটস বী প্র্যাকটিক্যাল। আমার দেশে ফেরার অসুবিধে আছে। কিন্তু, তুমি কেন যাবে না? পাঁচ-ছ সপ্তাহের জন্য ঘুরে এসো!

–কোনো প্রশ্নই ওঠে না আমার একার যাওয়ার। যাক গে, ওসব কথা থাক। নিউ ইয়র্ক যাওয়ার প্রোগ্রাম ঠিক হয়ে গেছে? সিদ্ধার্থর সঙ্গে আর কথা হয়েছে কিছু?

–হ্যাঁ, আজ ও অফিসে টেলিফোন করেছিল। খুকু, ক্রিসমাসে তো আমরা বেড়াতে যাচ্ছিই একসঙ্গে। তারপর জানুয়ারি মাসটা তুমি দেশে ঘুরে আসতে পারো। নো প্রবলেম। কালকেই আমি একটা সীট রিজার্ভেশন করিয়ে রাখতে পারি। টাকার জন্য আটকাবে না। মায়ের জন্য তোমার মন কেমন করছে…

–আমি দেশে যাবো না। হ্যাঁ, নিউ ইয়র্কে আমরা সবাই মিলে কি সিদ্ধার্থর ওখানেই থাকবো? এতজন মিলে যাচ্ছি। সুমির সঙ্গে ভিজেয়-ও যেতে পারে।

–সিদ্ধার্থ সেসব ব্যবস্থা করবে।–অলিকে বলে রেখেছো? কখন স্টার্ট করা হবে, অলি জানে?

–তুমি আজ রাত্তিরে ফোন করে বলে দিও।

–কেন, তুমি ফোন করতে পারো না? আমিই তো অলির সঙ্গে বেশির ভাগ দিন কথা বলি। এটা তোমারই জানানো উচিত। আমি কিন্তু এক সপ্তাহ অলিকে ফোন করতে পারিনি। অলি নিজে থেকে একবারও ফোন করে না।

–তুমি মাকে কিছু জানাতে চাও, অথচ দেশেও ফিরতে চাও না, আমি ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না, খুকু।

–ওই জুতোর দোকানটার সামনে একটু দাঁড়াবে, প্লীজ!

গাড়ি পার্ক করতে জায়গা খুঁজে পাওয়া একটা বিরাট সমস্যা। অতীন নামে না, সে প্যারালাল পার্কিং করে গাড়িতেই বসে থাকে। পুলিশ এসে তাড়া দিলে সে আস্তে আস্তে চালাতে শুরু করে, আবার ঘুরে সেখানেই আসে। দোকানে কেনাকাটি করতে সে পছন্দও করে না।

তিনটি দোকান ঘোরার পর ওরা একটা চীনে রেস্তোরাঁয় খেতে ঢুকলো। পুরোনো প্লাজার পেছন দিকে এই দোকানটা বেশ নিরিবিলি, দুটি বুড়ি এটা চালায়, অতীনদের দেখলে চেনা সুরে কথা বলে।

ঢুকেই ডানদিকের টেবিলে বসে আছে সুমি আর ভিজেয়, আরও দু-একজন যুবক-যুবতী। অতীন থমকে দাঁড়ালো। সে শর্মিলাকে নিয়ে নিরালায় কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু এড়াবার উপায় নেই, ভিজেয় দারুণ আড্ডাবাজ ধরনের, সে উঠে দাঁড়িয়ে দু হাত তুলে বললো, হাই! ইধার আও! কাম অ্যাণ্ড জয়েন আস!

দুটো টেবিল জুড়ে বসার ব্যবস্থা হলো। এক ক্যারাফে লাল মদ এলো। অন্য ছেলেমেয়ে দুটিও মহারাষ্ট্রীয়, বেশ প্রাণবন্ত, শর্মিলার সঙ্গে তারা গল্প জমিয়ে দিল, কিন্তু অতীন কিছুতেই স্বচ্ছন্দ হতে পারছে না।

খাওয়া টাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সুমি উঠে গেল ওয়াশরুমে। এদের ওই সব জায়গা বেসমেন্টে, একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে হয়। একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পর অতীনও উঠে গেল, সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো আয়নার সামনে। সুমি টয়লেট থেকে বেরুতেই অতীন ঘুরে দাঁড়িয়ে খানিকটা রুক্ষ গলায় বললো, তোমরা দু’জনে আমার সঙ্গে চালাকি করছো কেন?

সুমি বললো, আমি? আমি কী করেছি?

অতীন বললো, তুমি তখন আমাকে বললে কেন মজা বুঝবে? কী হয়েছে?

সুমি হাসি মুখে বললো, ও, সেটা ভুল বলেছি। অ্যাকচুয়ালি ইউ আর আ ভেরি আনলাকি গাই! এর মধ্যেই বাঁধা পড়ে গেলে। সেজদি কিছু বলেনি তোমাকে?

–হেঁয়ালি করছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। একবার বলছে দেশে ফিরে মায়ের সঙ্গে দেখা করা উচিত, আবার বলছে যাবে না। ব্যাপারটা কী?

–সেজদি মাকে জিজ্ঞেস না করে কিছু করে না। আমি অবশ্য বলেছি, এখন দেশে না ফেরাই ভাল। পরে এক সময় বললেই হবে।

–বলবার মতন ব্যাপারটা কী, সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না!

দু তিনটে পেপার ন্যাপকিনে হাত মুছে সুমি নগ্ন কোমরের কাছ থেকে ছোট রুমালটা বার করে এনে মুখ মুছলো। তারপর বললো, সেজদি কি নিজের মুখে তোমাকে বিয়ের কথা বলবে! তুমি আর কতদিন দেরি করবে?

–বিয়ে!

–বাবলুদা, তুমি আঁতকে উঠলে মনে হচ্ছে। বিয়ে কথাটা কখনো শোনোনি? নাকি তুমি বিয়ে নামের ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাস করো না?

–আমি ওসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। বিয়ের জন্য এত ব্যস্ত হবার কী আছে!

–আমার মত যদি শোনো, দু-এক মাসের মধ্যে তোমরা বিয়েটা সেরে নাও। এখানকার কমিউনিটি হলে অ্যারেঞ্জ করা যেতে পারে, অনিল সাহনি আর দুগার তো ওইভাবেই বিয়ে হলো। এই ধকলটা কাটিয়ে উঠলেও এরপর সেজদির মনের ওপর খুব চাপ পড়বে! আমার মতন তো নয়। সেজদি অনেক নরম মেয়ে!

–এই ধকল মানে!

–অ্যাবরশান করাবার পর মনের ওপর একটা চাপ পড়বে না?

কেউ যেন অন্ধকারে অতীনের মাথায় একটা ডাণ্ডা মেরেছে। অতীনের বোধশক্তি খানিকটা অবশ হয়ে গেল। সে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।

সুমি খানিকটা বকুনির সুরে বললো, আগে থেকে কোনো প্রটেকশান নেবে না, কিছু না! সেজদি দু মাস হলো কনসিভ করেছে, তার খোঁজও রাখো না?

একটি বিশুদ্ধ নির্বোধের মতন অতীন জিজ্ঞেস করলো, কনসিভ করেছে মানে?

অতীনের গায়ে একটা খোঁচা মেরে সুমি বললো, কী তখন থেকে মানে মানে করছো? কিছুই বোঝা না তুমি, ন্যাকা? সব ছেলেরাই এই রকম, নিজের দায়িত্বটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। যেন শুধু মেয়েদেরই দোষ। সেজদির দু মাস ধরে পীরিয়ড বন্ধ।

ছাব্বিশ বছর বয়েসের যুবকের তুলনায় অতীন সত্যিই এই সব ব্যাপার খুব কম জানে। সে মেয়েদের রূপ দেখে, শর্মিলার মনটাকেও সে বুঝবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু নারী শরীরের কলকজা কিংবা জন্মরহস্য সম্পর্কে তাঁর ধারণা অস্পষ্ট। সে আবার সরল বিস্ময়ে প্রশ্ন করলো, পীরিয়ড? তা বন্ধ হলে কী হয়?

সুমি বললো, ইউরিন টেস্টে পজিটিভ পাওয়া গেছে। এখন খুব তাড়াতাড়ি কিউরেট করিয়ে নিলে কোনো রিস্ক থাকবে না। ভাগ্যিস এটা লিগ্যাল হয়েছে কয়েক মাস আগে। না হলে কী ঝাট হতো বলো তো? ইওরোপে যেতে হতো। ভিজেয়র এক বন্ধু ডাক্তার, সে সব ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে, ক্রিসমাসের ছুটিটার পরেই!

শুনতে শুনতে অতীনের চোখ বিস্ফারিত হতে লাগলো। এতক্ষণে যেন মাথায় ব্যাপারটা ঢুকেছে। শর্মিলার গর্ভে এসেছে তার সন্তান। হঠাৎ একটা হিংস্র জানোয়ারের মতন সে সুমির কাঁধ চেপে ধরে বিকট গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, কিউরেট করা হবে মানে? মেরে ফেলবে? আঁ? কে বলেছে? কার এত সাহস? অ্যাঁ?

এক মধ্যবয়স্কা শ্বেতাঙ্গিনী সিঁড়ি দিয়ে নেমে এই দৃশ্য দেখে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল, কোনো কৌতূহল প্রকাশ করলো না। যেন একটি কালো বিদেশী যুবক তার সঙ্গিনীর গলা টিপেও মেরে ফেলে এই নিভৃত জায়গায়, তাতেও ওর কিছু যায় আসে না।

সুমি চাপা গলায় ধমক দিয়ে বললো, কী পাগলের মতন করছো। ছাড়ো!

অতীনের মুখখানা অস্বাভাবিক হয়ে গেছে, জ্বলজ্বল করছে চোখ, সে আবার চেঁচিয়ে বললো, কেন আমাকে আগে এইসব বলোনি? কে বলেছে মেরে ফেলতে? খবর্দার!

সুমি তাকে বেশ জোরে এক ধাক্কা দিয়ে বললো, ছেলেমানুষী করো না, বাবলুদা! আগে বিয়ে করোনি কেন? এখন আর এ ছাড়া উপায় কী? এই আর্লি স্টেজে অ্যাবরশান করালে ভয়ের কিছু নেই। এবার যাও, সেজদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে একটা হাত ধরে বলো, আমি তোমার, কী যেন বলে, কী যেন কথাটা, হ্যাঁ, পাণিপ্রার্থী!

সুমি ওপরে চলে যাবার পরেও অতীন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। তার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটেছে। তার মাথার মধ্যে সত্যি সত্যি একটা ঝড় বইছে। সে এখন অন্য মানুষ। সে একজনের পিতা। শর্মিলার সঙ্গে শারীরিক উন্মত্ততার সময় সে এই সম্ভাবনার কথা খেয়ালই করেনি।

ওপরে উঠে এসে সে শর্মিলার দিকে তাকিয়ে বললো, চলো, আমরা বাড়ি যাবো।

তারপর কোটের পকেট থেকে ওয়ালেট বার করে কিছু ডলার রাখতে গেল টেবিলে। ভিজেয় তার হাত চেপে ধরে বললো, ইউ ওয়ান্ট টু স্টার্ট এ ফাইট?

এটা একটা চালু রসিকতা। কে বিল মেটাবে তা মারামারি করে জিতে ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ যারা আগে থেকে বসে আছে, তারা তাদের টেবিলে অন্যদের ডাকলে সেই অতিথিদের দাম দিতে নেই।

শর্মিলা বললো, আর একটু বসি না। বাবলু, বসো

সুমি শর্মিলার দিকে চোখ টিপে ইঙ্গিত করলো। অতীন ততক্ষণে শর্মিলার হাত ধরে টানতে শুরু করেছে, শর্মিলা উঠে দাঁড়িয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিল।

রেস্তোরাঁর বাইরে পা দিয়েই অতীন চোখ গরম করে তাকিয়ে বললো, আমি তোমায় খুন করে ফেলবো! তুমি আমায় চেনো না!

শর্মিলা হেসে বললো, তোমাকে আমি ভালোই চিনি।

–তুমি আমাকে এসব কথা বলোনি কেন?

–আমি কী করে বলবো বলো তো? নিজেরই যে মাথাটা ঘুলিয়ে গেছে। সুমি ইউরিন টেস্ট করাতে বললো, তখনও আমি বিশ্বাস করিনি।

–তোমার সব কথা আমাকে বলার কথা ছিল না? ঐ যে পীরিয়ড না কি বন্ধ হয়ে গেছে

–ঐ কথাটা বলা যায় না। মেয়েরা বলতে পারে না। এটা বলার মানে হলো, আমি প্রেগনেন্ট হয়ে গেছি বাবলু, এবার তুমি আমাকে বিয়ে করো। এটা কি কোনো মেয়ে বলতে পারে?

–তুমি একদিন বলেছিলে দেশে ফিরে গিয়ে, মা-বাবাকে জানিয়ে বিয়ে করবে! আমি সেই কথাটাই ধরে বসে আছি। সেইজন্যই এখন বিয়ের কথা ভাবিনি।

–আমাদের দেশে ফেরার অসুবিধে। তাই অ্যাবরশান করাতে হবে।

যেন শর্মিলার হাতটা মুচড়ে ভেঙে দেবে, সেইভাবে আঁকড়ে ধরে অতীন গর্জন করে উঠলো, না! কিছুতেই না!

শর্মিলা কাতর ভাবে বললো, প্লীজ চেঁচিয়ো না, বাবলু। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ভয়ের কিছু নেই, বিশ্বাস করো!–অতীন গাড়ির দরজা খুলে শর্মিলাকে প্রায় ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বললো, আমার বুঝি কোনো মতামত নেই? মাই চাইল্ড! আমি বলছি, ওসব চলবে না। আমরা এখানেই বিয়ে করবো, এই সপ্তাহে!

শর্মিলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো, আমার মাকে আগে না জানিয়ে আমি কী করে বিয়ে করবো? মা আমার কোনো কথায় আপত্তি করে না। আমি পারবো না, পারবো না। বাবলু, প্লীজ, প্লীজ!

এতক্ষণ রাগে গজরাচ্ছিল অতীন, এবার সেও হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো। এমনভাবে সে জ্ঞান হবার পর আর কোনোদিন কাঁদেনি। কাঁদতে কাঁদতে সে মাথা ঠুকতে লাগলো স্টিয়ারিং হুইলে। শর্মিলার কান্না বন্ধ হয়ে গেল, সে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো অতীনের দিকে। তার রাগী, গোঁয়ার প্রেমিকটির এমন অসহায় শিশুর মতন গলার আওয়াজ সে কখনো শোনেনি।

সে অতীনের পিঠ ধরে থামাবার চেষ্টা করে বলতে লাগলো, এই, এই, কী করছো!

অতীন বললো, আমি এই গাড়িটা পুড়িয়ে ফেলবো। চাকরি ছেড়ে দেবো। তোমার সঙ্গে। জীবনে আর দেখা করবো না! কেউ আমাকে আর খুঁজে পাবে না! আমি একটা বাজে ছেলে, আমার বেঁচে থাকার কেনো মূল্য নেই! খুকু, তুমিও আমাকে বুঝলে না!

শর্মিলা বললো, বাবলু, ওরকম করো না। তোমাকে ছেড়ে আমি একটা দিনও থাকতে। পারি? সুমিরা বলছে, এই স্টেজে অ্যাবরশান করানোতে কোনো অসুবিধে নেই…

জলে ভেজা মুখোনি তুলে জন্ম দুঃখীর মতন গলায় অতীন বললো, খুকু, আমি একটা। অপদার্থ! আমার জন্য আমার দাদা মরেছে। হ্যাঁ, আমারই জন্য, আমার দাদার মতন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে জলে ডুবে গেল! তারপর মানিকদাকে বাঁচাবার জন্য একটা লোককে, হ্যাঁ, আমিই তাকে মেরেছি, এই হাত দিয়ে, আমি, আমি মানুষ মেরেছি। এরপর আমার সন্তানকেও মারবো? আমি সারা জীবন খুনী হয়ে থাকবো? আমার জীবনের তা হলে কী মূল্য রইলো?

শর্মিলা নিঃশব্দে হাত বোলাতে লাগলো অতীনের মুখে। তার আঙুলে এখন লেগে আছে। স্নেহ।

একটু পরে সে বললো, আমিও কি মন থেকে সত্যিকারের চাই? আমার নিজেরও যে মরে যেতে ইচ্ছে করে, বাবলু! এসো, তা হলে আমরা দু’জনে একসঙ্গে মরে যাই?

খুব আগ্রহের সঙ্গে অতীন বললো, তাই করবে? ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে গ্যাস খুলে দিয়ে আমরা যদি ঘুমের ওষুধ খাই, কোনো কষ্ট হবে না।

শর্মিলা আচ্ছন্ন গলায় বললো, তুমি যদি চাও…

অতীন বললো, চলো, আজই! আমার ঘরে চলো।

শর্মিলা অতীনের বুকে মুখ রেখে বললো, আমি সব সময় তোমার সঙ্গে থাকবো। তুমি যা বলবে,

শর্মিলার তলপেটে হাত রাখলো অতীন। আবার কান্নার তোড় এসে গেল তার চোখে। সে বললো, তা হলে এই বাচ্চাটাও মরে যাবে? আবার একজনকে মারবো? না, না, খুকু, আমি আর শুধু নিজেকেই মারতে পারি। তুমি থাকো। তুমি ওকে মেরো না।

শর্মিলা আস্তে আস্তে বললো, মাকে সব কিছু খুলে লিখলে মা বুঝবে। মা তোমার কথা জানে। লোকে যাই বলুক, আমরা এখানেই বিয়ে করতে পারি। প্রেগনেন্ট মেয়ের বিয়ে কি এ দেশে হয় না?

অতীন বললো, সিদ্ধার্থ সব ব্যবস্থা করে দিতে পারে। নিউ ইয়র্কে ওর অনেক চেনাশুনো আছে। আমরা নিউ ইয়র্কে গিয়ে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে…

–এখন সব ছুটি–

–হোক ছুটি। জোর করে অফিস খোলাবো। না হলে নিউ ইয়ার্স ডের পর আরও দু চারদিন থেকে যাবো নিউ ইয়র্কে।

–তোমার মা বাবাকে জানাবে না?

–এখন জানাবার সময় নেই। আই মীন, আমার মা বাবার মতামত নেবার প্রশ্ন ওঠে না, ওদের জানাবো নিশ্চয়ই…

দু’জনেই চোখের জল মুছে ফেললো। হঠাৎ যেন মনে হলো, সব বাধাগুলোই তুচ্ছ। লোকলজ্জাকে গুরুত্ব দেবার কোনো মানেই হয় না। বাবা-মাকে আগে থেকে জানিয়ে কিংবা দেশে ফিরে গিয়েই যে বিয়ে করতে হবে, তারই বা কী মানে আছে? ওরা যথেষ্ট অ্যাডাল্ট এবং দু’জনের বাবা-মারই আপত্তি জানাবার কোনো প্রশ্নই নেই। এই সব অকিঞ্চিৎকর কথা ভেবে ওরা ভূণহত্যা কিংবা আত্মহত্যার মতন সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড করতে যাচ্ছিল! ওরা এত নিবোধ!

দুরন্ত স্পীডে গাড়ি চালিয়ে অতীন ফিরে এলো নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। প্রথমেই ফোন। করলো সিদ্ধার্থকে। রিং হয়ে গেল, কেউ ধরলো না। সিদ্ধার্থ বাড়িতে নেই।

অতীন বললো, সিদ্ধার্থর সঙ্গে তো কথা হয়েই আছে। ওকে কাল সকালে ঠিক পেয়ে যাবো।

শর্মিলা বললো, অলিকে জানিয়ে দাও। ও কখন রেডি হয়ে থাকবে…

অতীন একটু ইতস্তত করে বললো, হ্যাঁ, অলিকে জানাতে হবে। তুমি ওকে ফোনে বলে দিও।

শর্মিলা বললো, তুমি ওকে ফোন করো, বাবলু! এটা তোমারই বলা উচিত।

অতীন ফোনের বোতাম টিপলো। কিছুক্ষণ ইংরিজিতে কথা বলার পর ফোন রেখে দিয়ে আড়ষ্ট গলায় বললো, ব্যাপারটা কী হলো বুঝতে পারলাম না। সেই আর্টিস্ট মহিলা বললেন, অলি চলে গেছে। ইন্ডিয়ায় ফিরে গেছে। তা কখনো হতে পারে?

শর্মিলা বললো, অলির ওই বাড়ি ছেড়ে ছেড়ে যাবার কথা ছিল। অন্য বাড়িতে উঠে গেছে?

অতীন বললো, ভদ্রমহিলা দু’তিনবার বললেন যে শী হ্যাঁজ লেফট ফর ইন্ডিয়া। তা কখনো হতে পারে? মাত্র কয়েকমাস হলো এসেছে, এর মধ্যে ফিরে যাবে? ও আমাদের না জানিয়ে?

শর্মিলা হিসেব করে বললো, আমার সঙ্গে অলির লাস্ট কবে কথা হয়েছিল? লাস্ট সোমবার? না, রবিবার, আট দিন আগে। সেদিনও আমায় কিছু বলেনি। আচ্ছা, পাপিয়াকে ফোন করে দ্যাখো তো!

পাপিয়া নামের একটি বাংলাদেশের মেয়ের সঙ্গে অলির পরিচয় হয়েছিল, সেও মেরিল্যান্ডে অলির বাড়ির কাছেই থাকে। তাকে শর্মিলাই ফোন করলো। পাপিয়া বেশ অবাক ভাবেই বললো যে অলি চারদিন আগে একটা চার্টার্ড ফ্লাইটে দেশে চলে গেছে। টিকিট কেটেছিল এক মাস আগে। জিনিসপত্র সব নিয়ে গেছে। সে আর ফিরবে না। সে যাবার আগে শর্মিলা-অতীনদের জানায়নি? এখানকার সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেছে সে।

শর্মিলা আর অতীন বেশ খানিকক্ষণ মুখোমুখি চেয়ে চুপ করে বসে রইলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, আমি জানি না, শৌনক ছেলেটি কেমন। আশা করি সে অলির মতন একটা সরল, ভালো মেয়েকে দুঃখ দেবে না। অলি শৌনককে ছেড়ে থাকতে পারলো না। আমাদের না জানিয়ে চলে গেল। আমরা কি বাধা দিতাম? খুকু, তোমার কাছে আমার কোনো কিছুই গোপন নেই। শুধু একটা কথা বলিনি এতদিন। আজ না বললে অন্যায় হবে। একসময় অলির সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক ছিল।

মাটির দিকে চেয়ে শর্মিলা বললো, আমি জানি। তোমার দিকে অলির তাকানোর ভঙ্গি। ওর বিষণ্ণ মুখে হাসি ফোঁটাবার চেষ্টা। এ সব দেখেই আমি বুঝেছি।

অতীন বললো, কিন্তু ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক, মানে, কোনোদিন সেরকম কিছু, আই মীন, ফিজিক্যাল ঘনিষ্ঠতা হয়নি।

শর্মিলা বললো, তাতে কিছু আসে যায় না। অলি তোমাকে ভালবাসে। ও তোমাকে দেখাব জন্যই শুধু এদেশে এসেছিল। অলি আমার কথা কিছু জানতো না। আমি অলির কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নিয়েছি!

অতীন জোর দিয়ে বললো, দ্যাট কোয়েশ্চেন ডাজ নট অ্যারাইজ অ্যাট অল। অলি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারেনি। শৌনকের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হয়েছে, সে কথা ও নিজের মুখে স্বীকার করেছে আমার কাছে। বিশ্বাস করো! সে জন্য আমি অলিকে মোটেই দোষ দিই না। অলির সঙ্গে আমার যোগাযোগ রাখার কোন উপায় ছিল না।

শর্মিলা উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমি এবার যাই, বাবলু।

অতীন বিস্মিত ভাবে বললো, যাবে মানে, কোথায় যাবে?

শর্মিলা বললো, বাড়ি যাবো। আমাদের বোধ হয় আরও কিছুদিন ভেবে দেখা দরকার।

অতীন এগিয়ে এসে শর্মিলার হাত ধরে বললো, আজ রাত্তিরটা তুমি আমার সঙ্গে থাকো।

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে শর্মিলা পাগলাটে গলায় বললো, যাস্ট বিকজ আই অ্যাম প্রেগনেন্ট, সেজন্যই আমাকে তুমি বিয়ে করবে? ছিঃ! অলিকে কষ্ট দিয়েছি, সে কথা কি আমি সারাজীবন ভুলতে পারবো? আমার চেয়ে অলি অনেক ভালো মেয়ে। ওকে যেভাবেই হোক। ফিরিয়ে আনে।

অতীন শর্মিলার দু’হাত আবার জোর করে ধরে রেখে বললো, তুমি ভুল করছে। আমার থেকেও শৌনকের জন্য অলির টান অনেক বেশি। সেইজন্য ও আমাকে কিছু না জানিয়ে চুপি চুপি চলে গেল। অলির জীবনে আর আমি নেই। আমি ওকে আর ডিসটার্ব করতেও চাই না। খুকু, তুমিই আমার সব কিছু!

শর্মিলাকে টানতে টানতে এনে লম্বা আয়নাটার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে অতীন তীব্র গলায় বললো, খুকু, তুমি শুধু এখন আমার প্রেমিকা নও। তুমি এখন মা। আমার সন্তানের মা। ছেলে বা মেয়ে যাই হোক, তার তো দেশে ফিরে যেতে কোনো বাধা থাকবে না কখনো। আমার যা হয় হোক! তবু আমাদের সেই বাচ্চাটা একদিন বড় হবে, দেশে ফিরে যাবে, একটা সুন্দর, সুস্থ জীবন গড়ে তুলবে। তার মধ্য দিয়ে আমি বাঁচবো। খুকু, ওকে বাঁচিয়ে রাখো, আমাকে বাঁচতে দাও।

দু’জনে কপালে কপাল ঠেকিয়ে আবার কাঁদতে লাগলো একসঙ্গে।

(উত্তরপর্ব সমাপ্ত)

৬৪.১ উপসংহার : বিকেল শেষ হবার মুখে

উপসংহার

বিকেল শেষ হবার মুখে, সন্ধে নামবার আগে, এক একদিন আকাশ হঠাৎ ঝলমল করে ওঠে। অনেকটা বিশুদ্ধ দিনের ভোরবেলার মতন। সূর্য তখন বেশি উজ্জ্বল মনে হয়, কিন্তু তাপ কম, পাতলা পাতলা মেঘ ভেদ করে আকাশ-গঙ্গার মতন নেমে আসা আলোর রশ্মি খালি চোখেও দেখা যায়। যেন কোনো দৈব দৃশ্য। এ রকম সন্ধিকাল কচিৎ কখনো আসে বলেই তা বড় সুন্দর।

এমন বিকেলে বৃদ্ধ মানুষদের বাড়ির বাইরে বেরুনো ঠিক নয়। জ্যৈষ্ঠ মাসে যেমন কোকিল ডাকে না, মাঘ মাসে যেমন শিউলি ফোটে না, হেমন্তকালে যেমন বাতাসের চাঞ্চল্য বন্ধ থাকে, সেই রকম মানুষের জীবনেও নানা ঋতুর পালাবদল মেনে নিতে হয়।

প্রতাপ মজুমদার এমন এক বিকেলেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আকাশ কিংবা প্রকৃতি দেখছিলেন না, তিনি লক্ষ করছিলেন পথের মানুষের স্রোত। বাড়ি ফাঁকা, একেবারেই ফাঁকা, তিনি যেন এক নিঃস্ব পরিত্যক্ত, তাঁর কেউ নেই! এ কথা সত্যি নয় অবশ্য। শহরের অনেক বাড়িই দুপুর-বিকেলে নির্জন, বা একজন-দু’জন মহিলা, অতি শিশু, বা কাজের লোক থাকে, কিন্তু সন্ধের পরেও কেউ ফিরবে না, রাত্তিরেও কেউ আসবে না, এ রকম জানা থাকলে দুপুরবেলাটাও বড় শূন্য মনে হয়। একাকিত্ব খুব ভারি হয়ে চেপে বসে। প্রতাপ আর সহ্য করতে পারছিলেন না।

লোকে আর তাঁকে প্রৌঢ় বলে না। পাড়ার ছেলেরা কাকাবাবুর বদলে এখন তাঁকে দাদু বলে ডাকে। প্রথাগত কারণে তিনি এখন বৃদ্ধ তো বটেই, কিন্তু তাঁর চেহারায় এখনও বার্ধক্যের তেমন ছাপ নেই। শরীর বেশ মজবুত, চামড়ার কুঞ্চন চোখে পড়ার মতন নয়, শুধু চুলগুলোই প্রায় সমস্ত সাদা হয়ে এসেছে। এক সময় এই বয়েসী বাঙালীবাবুরা ছড়ি ব্যবহার করতেন। উড়ুনি ও পাম্প শুর মতন ছড়িও এখন প্রায় অন্তর্হিত, শুধু সাহিত্য-চলচ্চিত্র-নাটকে তার রেশ রয়ে গেছে কিছুটা। ছায়াছবি ও মঞ্চে এখনো বয়স্ক বাবা ও অল্পবয়েসী ঠাকুদারা ধুতি-পাঞ্জাবী, কাঁধে চাঁদর ও রূপো বাঁধানো ছড়ি হাতে আবির্ভূত হন। প্রতাপ সাধারণত ট্রাউজার্স ও হাওয়াই শার্ট পরেন, হাতে ছড়ি নেবার প্রশ্নই ওঠে না। অবশ্য আজকালকার ছেলেদের মতন তিনি প্যান্টের সঙ্গে চটি পরতে পারেন না, মোজা ও ফিতে বাঁধা জুতো এবং কোমরে বেল্ট ছাড়া রাস্তায় বেরুলে তাঁর কী রকম যেন গ্লানি বোধ হয়।

তাঁকে বৃদ্ধদের দলে ঠেলে দেবার প্রধান কারণ এই যে তিনি চাকরি থেকে পাকাপাকিভাবে অবসর নিয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে।

ব্রিটিশ আমলের তাড়াহুড়ো করা জোড়াতালি দিয়ে তৈরি এই শহরে পচন ধরতে শুরু করেছে বেশ কিছুদিন যাবৎ। ভিত শক্ত ছিল না বলেই ওপরটা নড়বড় করতে শুরু করেছে তাড়াতাড়ি। রাস্তাগুলি যেখানে সেখানে ধসে পড়ছে যখন তখন, পুরনো অট্টালিকাগুলোকে এখন কুৎসিত মনে হয়, পরিকল্পনাবিহীন নতুন সৌধগুলি আরও উৎকট, ইংরেজিতে যাকে বলে মন্সট্রসিটি। মাঝে মাঝে এ শহরের দু-একটি অঙ্গে একটু আধটু পলেস্তারা বুলিয়ে সুন্দর করার চেষ্টা হয়, কিন্তু তা যেন অকালে বুড়িয়ে যাওয়া বারবনিতার মুখে রুজ পাউডার মাখার মতন। মনে মনে এই উপমাটা প্রতাপ মজুমদারেরই। তাঁর যে বেশ্যাদের, যুবতী বা বৃদ্ধা যাই-ই হোক, সে রকমভাবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে তা নয়, নিছক একটা তুলনা। প্যারিসে কোনো শিল্পীর আঁকা এ রকম এক করুণ রূপোপজীবিনীর ছবি তিনি দেখেছিলেন বটে, ছবিটা মনের মধ্যে ছাপ ফেলে আছে। শিল্পীর নাম মনে নেই।

শহরের চেয়েও শহরতলি অঞ্চল আরও কদর্য। বন্যার পর জল সরে গেলে যেমন থিকথিকে নোংরা কাদায় হাজার রকম আবর্জনা ছড়িয়ে থাকে। দেশ বিভাগের পরবর্তী বছরগুলিতে কলকাতা শহরের দিকে মানুষের বন্যা ধেয়ে এসেছিল, দেশ বিভাগের সেই স্মৃতি এখন অনেকের মন থেকেই মুছে গেছে; কিন্তু চতুর্দিকে এখনো ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের অস্থায়ী আস্তানা। হোগলার ঘর সরে গিয়ে এখন টিন বা টালির ছাদ হয়েছে, একতলা-দোতলা বাড়িও উঠেছে প্রচুর, তা হলেও এর কোনোটাই যেন এখনো পুরোপুরি গৃহ নয়, নিছক মাথা গোঁজার জায়গা, এর সঙ্গে জড়িয়ে যায়নি বংশানুক্রমিক মমতা।

শহরতলির কলোনি সম্পর্কেই প্রতাপের এ রকম বিরাগ, মানুষ সম্পর্কে নয়। তিনি মানুষ সম্পর্কে সব সময় কৌতূহলী। জুয়াড়ী যেমন সর্বক্ষণ লাভ-লোকসানের কথা চিন্তা করে, তিনিও সেরকম মানুষের জীবনের উত্থান-পতন লক্ষ করে আনন্দ পান। অতি অসহনীয় অবস্থার মধ্যেও যেসব মানুষ যুদ্ধ করে খানিকটা ওপরে উঠতে চায়, তিনি শ্রদ্ধা করেন সেইসব মানুষকে।

প্রতাপদের বাড়িও শহরতলিতে, তাঁর নিজের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, মমতার সনির্বন্ধ অনুরোধ বা গঞ্জনা বা কটুক্তি, অর্থাৎ আদেশেই তিনি তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় সব টাকা। দিয়ে এই ছোটবাড়িটি বানিয়েছেন। জীবনের বহু বছরই তিনি কাটিয়েছেন বিভিন্ন ভাড়া বাড়িতে এবং সেটাই তাঁর পছন্দ ছিল। যাযাবর পুরুষদের বোধহয় মেয়েরাই থিতু করিয়েছে শেষ পর্যন্ত। সমবয়েসীদের কাছে রঙ্গচ্ছলে প্রতাপ বলেন, দ্যাখো ভাই, আমেরিকা রাশিয়ায় শান্তি চুক্তি হওয়া উচিত কিনা কিংবা ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের সংসারে আমার মতামতটাই প্রধান। কিন্তু আমার রোজগারের টাকা কীভাবে খরচ হবে কিংবা বোপা আসেনি বলে কয়েকটা রাত বিনা মশারিতেই শুতে হবে কিনা, এই সব ছোটখাটো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন আমার স্ত্রী।

বাড়িটি সাদা রঙের, দোতলা। যাদবপুর বাস ডিপো ছাড়িয়ে সামান্য দূরে। কারুকে বাড়ির অবস্থান বোঝাতে গেলে প্রতাপ মজুমদার বলেন, কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরি পার হয়ে একটুখানি গেলেই ডানদিকে দেখবে দশ ফুট চওড়া একটা গলি, সেখানে তিনটে বাড়ি বাদ দিয়ে…

রাজভবন থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিনিটের জানি।… অবশ্য মাঝপথে জ্যাম থাকলে কতক্ষণ সময় লাগবে সে কথা তিনি উল্লেখ করেন না, সেরকম প্রায়ই থাকে। রাজভবন থেকে বাড়ির দূরত্নমাপা যে এক ধরনের দুর্বলতা, প্রতাপ সেটা বুঝতে পারেন না।

আসলে, সদ্য তৈরি বাড়িটির জন্য প্রতাপও বেশ গর্বিত। তাঁর নিজের বাড়ি। এতদিনে তাঁর রিফিউজি পরিচয়টা ঘুচেছে, এই দেশে তাঁর নিজস্ব এক খণ্ড ভূমি হয়েছে। বাড়ির জন্য মমতাই জেদ ধরেছিলেন বটে, প্রতাপেরও গোপন ইচ্ছে ছিল। বাড়িওলার নোটিশ পেয়ে যখন-তখন বাড়ি ছাড়ার গ্লানি তাঁকে আর সহ্য করতে হবে না। তা ছাড়া ছেলে-মেয়েরা এসে থাকবে, তাদের জন্যও তত ঘর দরকার।

একতলায় তিনটি দোকান, গাড়ি না থাকলেও একটা গ্যারাজ করানো হয়েছে। দোতলাটি গৃহকর্তাদের নিজস্ব। মমতা গেছেন হরিদ্বারে। এখন বাড়িতে নানু নামে যে ছেলেটি সব কাজ করে, সেও আজ ছুটি নিয়েছে, রাত্তিরে ফিরবে না। তাই বেরুবার আগে প্রতাপ দু’ তিনটে দরজায় তালা দিলেন। চাবি সম্পর্কে তাঁর অন্যমনস্কতা আছে, মমতা এই ব্যাপারে তাঁকে বার বার সাবধান করে গিয়েছেন, সেই জন্য প্রতাপ তালা লাগাবার পর দু বার পকেট বাজিয়ে দেখলেন। হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।

যতই আন্তর্জাতিক অপবাদ রটে থাকুক, তবু এই কলকাতারও কিছু কিছু রমণীয় মুহূর্ত আছে। যার দেখার চোখ আছে শুধু সে-ই দেখতে পায়। এই শহর মাঝে মাঝে এক মায়াদর্পণ তুলে ধরে, সকলের জন্য নয়, যেমন আজ এই বিকেল ও সন্ধের মাঝখানটিতে। এ এক অন্যরকম আলো যাতে পথের বিভঙ্গ চোখে পড়ে না, বাড়িগুলির অসামঞ্জস্য তুচ্ছ হয়ে যায় মনে হয় পৃথিবী তো মানুষের বসবাসের জন্য। যে যেখানে আছে কোনোক্রমে কি নির্ঝঞ্ঝান সেখানে বাস করতে পারে না?

সময় যৌবন-ভোগ্য। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্রতাপ মজুমদার নিজেও যে তা জানেন ন তা নয়। কিন্তু বহিরঙ্গে বৃদ্ধ বলে মনে হলেই তো সবাই বুড়িয়ে যায় না। একলা পথে বেরুলে প্রতাপ এখনো প্রায়ই মনে মনে একটা ছোকরা হয়ে যান। ফুচকা বা আলুকাবলিওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। পল্লীর অল্পবয়েসী ছেলেরা যখন তাঁকে দেখে সিগারেট লুকোয় কিংবা কেউ দাদু বলে সম্বোধন করে, তখন তিনি সচেতন হয়ে মুখে একটা গাম্ভী ফুটিয়ে তোলেন। এই শহরে এত মানুষ, এত বেশি মানুষ, যে কখনো নিরালা হবার উপায় নেই। কেউ না কেউ মনে করিয়ে দেবেই যে তুমি কে, তোমার বয়েস বা টাকাপয়সার জোর আছে কিনা!

বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রতাপের হঠাৎ মনে হয়েছিল, আজকের দিনটা বেশ সুন্দর, তবু এ জীবনের কী মানে হয়? এই ধরনের চিন্তা এক হিসেবে নিতান্তই অর্থহীন, আবার বিপজ্জনকও বটে। আজকাল প্রায়ই প্রতাপের মাথায় এই চিন্তাটা আসছে। এটা তাড়াতে হলে মানুষের সংসর্গ চাই, কথাবার্তায় ভুলে থাকা দরকার। সেইজন্যই তিনি ছটফটিয়ে পথে নেমে এসেছেন। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? তাঁর চোখে ভেসে উঠলো বিমানবিহারীর বাড়ির ছবি। একমাত্র ঐ বাড়িতেই তিনি যখন তখন যেতে পারেন, কিন্তু যান না, আজকের অপরূপ বিকেলের মতনই তিনি ঐ বাড়িটিকে বছরে মাত্র আট দশবার দেখতে চান। যেন একটা মূল্যবান কাশ্মীরী শাল, যা বহু ব্যবহারে জীর্ণ হতে দেওয়া যায় না!

প্রতাপ বাস স্টপে এসে দাঁড়ালেন। এই সময়টায় এখান থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যায়, কিন্তু ট্যাক্সি চাপার ব্যাপারে প্রতাপের মনে একটু কৃপণতার ভাব আছে, মনে পড়ে যায় যে তাঁর আয় এখন সংকুচিত। আবার, কাছেই সরকারি বাস ডিপো হলেও পয়সা বাঁচাবার জন্য তিনি সাধারণ অল্প ভাড়ার বাসে চাপতে পারেন না।

সামনেই একটা বেশ চওড়া ধরনের অসমাপ্ত তিনতলা বাড়ি, আরও অনেক উঁচুতে যাবে হয়তো। মাল্টি স্টোরিড় বিল্ডিং-এর রেওয়াজ ক্রমশই শহরতলির দিকেও এগিয়ে আসছে। নিজের তদারকিতে একটা বাড়ি বানিয়েছেন বলেই এখন নতুন তৈরি হওয়া বাড়ির দিকে আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে থাকেন। জানলার গ্রীলটা কী রকম, দরজার কাঠ প্লাইউড না সলিড পাঁচ ইঞ্চি না দশ ইঞ্চি দেওয়ালের গাঁথনি, এসব দেখেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।

সেই নির্মীয়মাণ বাড়ির বাইরের কাঠের ভারা বেয়ে নেমে এলো একজন প্রৌঢ়, পরনে লুঙ্গি ও ছেঁড়া গেঞ্জি হলেও মুখে বেশ একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ। এই লোকটিই কি এই হবু প্রাসাদের রাজমিস্তিরি? অন্যরা এখনো কাজ করছে, ও হঠাৎ নেমে এলো কেন? লোকটি নিজের যন্ত্রপাতি একটা চটের থলিতে ভরে নিয়ে কারুকে কিছু না বলে হাঁটা শুরু করে দিল। ও একা একা কোথায় যাচ্ছে? একটু পরেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে।

এত বড় একটা ইট-কংক্রিটের প্রাসাদ যে বানায়, সে কাজের শেষে কোথায় যায়? তার। নিজের বাড়িটি কী রকম? এমনও হতে পারে, লোকটি আর কালকে ফিরে আসবে না। কেউ কি ওর খোঁজ করতে যাবে? সে যাই হোক, এই বাড়িটা অসম্পূর্ণ পড়ে থাকবে না, অন্য কোনো রাজমিস্তিরি নিশ্চিত আসবে। একদিন এই বাড়ির প্রত্যেক ঘরে ঘরে দেখা যাবে নতুন মুখ, কোথাও কোনো দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যাবে না। এই রকমই তো নিয়ম।

প্রতাপের হঠাৎ মনে হলো, ঐ বিষণ্ণ রাজমিস্তিরিটি তাঁর যমজ ভাই!

হাওয়া জোরালো হচ্ছে, আকাশে পাতলা লালচে আভা। ঝড় আসবে নাকি? প্রতাপ ঝড় ভালোবাসেন, কিন্তু যেখানে আকাশ বা মাটি দিগন্ত ছোঁয়া, বড় বড় গাছের মাথা নুয়ে পড়ে, বিভ্রান্ত গরুর গাড়ি এদিক ওদিক ছোটে, ওপরের দিকে তাকালে পবন-পদবী কথাটার অর্থ চাক্ষুষ হয়। শহুরে ঝড়ে সে রকম প্রকৃতি নেই।

রাস্তা পার হতে হতে একটি ধুতি ও শার্ট পরা লম্বা লোক দু-তিনবার তাকালো এদিকে। লোকটিকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু কোথায়, কী সূত্রে চেনা তা ঠিক মনে পড়ছে না। এই সব পরিস্থিতিতে নিছক অবান্তর কথায় কয়েক মিনিট সময় অপ-খরচ করতে হয়। প্রতাপ। দেখতে না পাওয়ার ভান করে মুখটা ফিরিয়ে নিলেন।

তাঁর পেছনেই একটা শাড়ির দোকান। ছ-সাত মাস ধরে খুলেছে, বেশ কায়দায় সুসজ্জিত। বাঁ দিকের কাচের শো উইন্ডো-তে একটি হলুদ রঙের ম্যনেকুইন, সেদিকে তাকিয়ে তিনি চমকে উঠলেন। এই নকল নারীমুর্তির কি গম্ভীর চাহনি। তার মুখ এবং একটু বাঁ পাশ ফিরে তাকানোর ভঙ্গিটি খুব চেনা।

এই বাস স্টপে প্রতাপ অনেকবার দাঁড়িয়েছেন, কাপড়ের দোকান আর ম্যানেকুইনটিকেও তিনি দেখেছেন। কিন্তু আজ এই অভিনব বিকেলের আলোকেই এই নিথর মূর্তিটি হঠাৎ এমন। একটা চেনা রূপে উদ্ভাসিত হলো।

এই সব মূর্তি কী দিয়ে বানায়? আগেকার গ্যাটাপাচার কিংবা আলুর খেলনার আর এখন চলন নেই। সব কিছুই প্লাস্টিক কিংবা পলিথিন। সেই রকমের কিছুই হবে, কাঠের মূর্তির এমন। নিখুঁত মুখের ডৌল কি হতে পারে? কোন অজ্ঞাত শিল্পী সুলেখার মুখোনি এমন হুবহু নির্মাণ করলো।

প্রৌঢ়ত্ব পার হয়ে এলে, বিশেষত কর্মহীন জীবনে, খুব পুরনো কথা মনে পড়ে। যৌবন পেছন ফিরে তাকায় না। মানুষ একনাগাড়ে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর ছুটে এসে হঠাৎ এক সময় থমকে গিয়ে ভাবে, এত নদী, এত বিপদসঙ্কুল গিরিখাদ যে পার হয়ে এলুম, কোথাও তো। অতলে তলিয়ে গেলুম না! বৃষ্টিভেজা ঝাঁপসা গাছপালার মতন বিস্মৃতি ভেদ করে উঠে আসে। কয়েকটি উজ্জ্বল মুখ।

কোথায় হারিয়ে গেল সুলেখা! এমন সুন্দর, এমন প্রাণবতী রমণী আর তোত একটিও চোখে পড়লো না এতখানি জীবনে। সে তো শুধু প্রতাপের কুটুম্ব ছিল না, ত্রিদিবের স্ত্রী হওয়াটাই তার একমাত্র পরিচয় ছিল না, সে ছিল মূর্তিমতী লাবণ্য, প্রতাপের সঙ্গে তার বিশেষ একটা মধুর সম্পর্ক ছিল। সুলেখারা বুঝি বেশিদিন পৃথিবীতে থাকে না?

কেন যে সুলেখা জীবনের এমন একটা অপচয় করলো, তা প্রতাপ আজও বুঝতে পারেন না। ত্রিদিবেরও বহুদিন কোনো খবর নেই। ত্রিদিবের জীবনটাও তছনছ হয়ে গেল।

সে তো প্রায় কুড়ি বাইশ বছর আগেকার কথা। মনের কোন খোপটায় সুলেখার স্মৃতি লুকিয়ে ছিল এতদিন। বহু বছর তার নাম উচ্চারিত হয়নি, তার মুখখানাও বোধহয় অনেকের মনে নেই। সুলেখা দিল্লি চলে যাবার পর তাকে আর প্রতাপ একদিনও দেখেননি।

কোনো কিছুই একেবারে হারিয়ে যায় না, এই নিয়মেই বোধহয় সুলেখা আবার ফিরে এসেছে, এক কারিগরের কল্পনায়, যাদবপুরের এক দোকানে নমুনা শাড়ি পরানো হলুদ মূর্তি হিসেবে। প্রতাপের দৃঢ় ইচ্ছে হলো, এই মুতিটা কে বানিয়েছে তা খুঁজে দেখতেই হবে। লোকটি সুলেখাকে দেখেছে কখনো? না দেখে থাকলে, সে সুলেখাকে অবিকল কল্পনা করলে কী করে?

ধুতি-শার্ট পরা ঢ্যাঙা লোকটি পাশে এসে বললো, কেমন আছেন, স্যার?

গলার আওয়াজ শুনেই লোকটিকে মনে পড়লো। এ বছরের গোড়াতেই তিনখানা নতুন পাখা কিনেছিলেন প্রতাপ, তখন দেওয়া হচ্ছিল টেন পার্সেন্ট রিবেট। কম্পানিটা নতুন।

তিনটির মধ্যে দুটো পাখাই অচিরে গোলমাল করতে শুরু করে। বাঙালি জীবনের মতনই ধীর গতি, রেগুলেটারের শেষ পয়েন্টেও দুরন্ত হয় না। মমতা ঘোরতর আপত্তি করেছিলেন, কারণ পাখাগুলি কেনা হয়েছিল যাদের কথা চিন্তা করে, তারা খুব বেশি গতি পছন্দ করে। যাদবপুর অঞ্চলে পাখার প্রধান উপযোগিতা মশা তাড়াবার জন্যই।

স্ত্রীর তাড়নায় প্রতাপকে সেই পাখা বদলাতে যেতে হয়েছিল রাধাবাজারে। আবার ট্যাক্তি ভাড়া করে। বাড়িতে আর কোনো পুরুষ মানুষ তো নেই যে এইসব হেঁদো কাজ করবে। সেই দোকানে গিয়ে প্রতাপ শুনলেন যে পাখা সেখান থেকে বদল হয় না, দাম ফেরত দেবার তে প্রশ্নই নেই। তাঁকে যেতে হবে কম্পানির গুদামে। সেটা অবশ্য কাছেই।

সেই পাখা-কম্পানির গুদামে এই লম্বা ফর্সা লোকটি ইনচার্জ। বিশেষ কারণে একে মনে আছে। আজ তো ছুটির দিন নয়, এই বিকেলে সেই গুদামে বসে না থেকে লোকটি রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছে কী করে?

সেদিন লোকটির ওপর প্রথমে খুবই রেগে গিয়েছিলেন প্রতাপ। একা ট্যাক্সি নিয়ে এতদূরে নতুন পাখা বদলানোর মতন বিরক্তিকর কাজ করতে গিয়ে এমনিতেই তাঁর মেজাজ খিঁচড়ে ছিল, তার ওপর এত কাণ্ড করে কম্পানির গুদামে পৌঁছোবার পর এই লোকটি বলেছিল, ছাপ্পান্ন ইঞ্চি পাখা আর স্টকে নেই। বদল হবে না। অথবা সাতদিন পর আবার আসতে হবে।

প্রতাপের ন্যায়-অন্যায় বোধ অমনি দপ করে জ্বলে উঠেছিল। ব্যাঙ্ক থেকে তোলা নতুন নগদ টাকা দিয়ে পাখা কিনেছেন। সাত বছরের গ্যারান্টি। এর মধ্যে কিছু অসদ্ভাব হলে কম্পানি পাখা মেরামত কিংবা বদল করতে বাধ্য। খবরের কাগজে তারা অনুরূপ শর্তে বিজ্ঞাপন দেয়। কিন্তু এর মধ্যেও একটা বিরাট তঞ্চকতা আছে। প্রতাপ মজুমদারের মতন একজন রাশভারি মানুষকেও এই কম্পানির যে-কোন একজন খুদে কর্মচারী অবজ্ঞার সঙ্গে বলে দিতে পারে, আজ হবে না, সাতদিন পর আসবেন। সেই সাতদিন পরে গেলে আবার অনায়াসেই বলবে, আজও নতুন স্টক আসেনি, আপনি এক সপ্তাহ বাদ দিয়ে ঘুরে আসুন!

প্রতাপের মুখখানা রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছিল। তিনি অনেকগুলি ভর্ৎসনা বাক্য উচ্চারণ করার পর দৃঢ় স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি আজই অন্য পাখা চাই, না হলে আপনাদের নামে আমি মামলা করবো!

এই সব ক্ষেত্রেও ঐ খুদে কর্মচারী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলতে পারে, যান যান মশাই, আপনার যা খুশী করুন গিয়ে। ও সব আমাদের ঢের দেখা আছে। আজ অবধি আমরা নতুন পাখা সম্পর্কে একটাও কমপ্লেন পাইনি…

কিন্তু এই লম্বা, ফ্যাকাসে ধরনের ফর্সা চেহারার কর্মচারীটি অন্য ধাতুর। সে কাঁচুমাচুভাবে বলেছিল, স্যার, আপনি বড় রেগে গেছেন, আপনার ব্লাড প্রেসার হাই মনে হচ্ছে, একটু বসুন! কারখানায় গো স্লো হলে আমরা কী করবো বলুন! বসুন না, কোল্ড ড্রিংকস এনে দেবো? স্যার, আপনার কি সিংহ রাশি? কিছু মনে করবেন না স্যার, মানুষের মুখ দেখে আমার অ্যাস্ট্রোলজি স্টাডি করার হ্যাঁবিট আছে…

পাখা উপলক্ষে প্রতাপকে ঐ গুদামে তিনবার যেতে হয়েছিল, কিন্তু তাঁর ক্রোধ উপশমে সাহায্য করেছিল ঐ লোকটি। এর সাহচর্যে তাঁর সময় মন্দ কাটেনি। এ আর পাঁচটা মানুষের মতন নয়। সারাদিন আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়, এমন একটা বদ্ধ গুমোট ঘরে বসেও এই লোকটি গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও মানুষের নিয়তি বিষয়ে চর্চা করে। নিজস্ব থিয়োরি আছে। প্রতাপের অতীত-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেশ কিছু উদ্ভট কথা বলেছিল। প্রতাপের একেবারেই জ্যোতিষ-ট্যোতিষে বিশ্বাস নেই, শতকরা পঞ্চাশ ভাগ আন্দাজে মেলানো কথা শুনে তিনি মজা পান।

লোকটির নামও তিনি জানেন না। ঐ লোকটিও সম্ভবত প্রতাপের নাম-ধাম মনে রাখেন। পরস্পরের মুখ চেনা। তবু লোকটি এতদিন পর দেখা হলেও এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার, আপনার পাখা ঠিকঠাক চলছে তো? কেমন আছেন স্যার। কিছু মনে করবেন না, আপনার কি ইদানীং অকারণে মন খারাপ হয়? ফাঁকা ফাঁকা লাগে? মাটির নীচে যে-সব জিনিস জন্মায়, সেগুলো আপনি খাবেন না স্যার। সেদিনই বলেছিলাম, মনে আছে? মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, আপনার ওপরে এখনো বৃহস্পতির প্রভাব চলছে, কচু, আলু, পেঁয়াজ, মুলো, আদা এসব একদম বাদ!

প্রতাপ হেসে বললেন, আপনার বাড়ি এদিকেই নাকি?

লোকটি উদাসীন ভাবে বললো, বাড়ি? না, আমার বাড়ি নেই। সেসব ছিল ওদিকে, নেহরু আর জিন্না সাহেব সে বাড়ি খেয়ে নিয়েছেন। এদিকে আর কিছু হয়নি।

প্রতাপ আবার জিজ্ঞেস করলেন, থাকেন কোথায়?

লোকটি বললো, গড়িয়া থেকে একটু এগিয়ে, অ্যানুয়াল লীভ নিয়েছি স্যার, ভাবছি একবার রমন মহর্ষির আশ্রমটা দেখে আসবো।

প্রতাপ তাকে নিজের বাড়ির ঠিকানা জানিয়ে বললেন, এই তো কাছেই, আসবেন একদিন, গল্প করা যাবে…।

এই মানুষটি কোনোক্রমেই প্রতাপের সামাজিক সমস্তরের নয়। তবু তিনি ওকে আগ বাড়িয়ে নিজের বাড়িতে আসতে বললেন কেন? এ রকম তার স্বভাব তো নয়। তিনি হেরে যাচ্ছেন? জ্যোতিষচর্চার ওপর তাঁর একটু একটু করে ঝোঁক জন্মাচ্ছে নাকি? প্রতাপ আপনমনে একটু হাসলেন। আসলে ঐ লোকটিকেই তিনি স্টাডি করতে চান। ও প্রতাপের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত কেন, ওর তো কোনো স্বার্থ নেই। পয়সা চাইবার মতন লোক ও নয়। আসুক না বাড়িতে, মমতার হাত দেখানো-টেখানোতে খুব উৎসাহ আছে, সে খুশী হবে।

পরপর দুটি মিনিবাস এসে দাঁড়িয়েছে। প্রথমটি ছেড়ে দিয়ে তিনি দ্বিতীয়টিতে উঠলেন। তার কারণ গোলাপী শাড়ি পরা একটি যুবতী। তার মুখ তিনি ভালো করে দেখেননি, মেয়েটি ছাতা গুটিয়ে মিনিবাসের পাদানিতে একটি পা রাখার পর তিনি দেখলেন লাল রঙের চটি পরা একটি নিখুঁত পা, ঈষৎ উঁচু হয়ে ওঠা শাড়িতে ফসা, মাখন-কোমল গুলফ, সব মিলিয়ে চমৎকার একটা সামঞ্জস্য। অল্প বয়েস থেকেই তিনি সম্ভব হলে সুন্দর কোনো রমণীকে নির্বাচন করে বাসে-ট্রেনে ওঠেন, এখনো সেই অভ্যেসটি রয়ে গেছে। তাঁর এখন সাতষট্টি বছর বয়েস, তবু তিনি এ জন্য নিজের বিবেকের কাছেও লজ্জা বোধ করেন না। এ তো শুধু সৌন্দর্যের উপাসনা।

পিছন দিক থেকে সেই যুবতাঁকে দেখতেও যেন সুলেখার মতন। আজ বারবার তিনি সুলেখার আদল দেখছেন কেন? নিজেই আবার তৈরি করছেন সুলেখাকে? ঐ রমণীর মুখ দেখার জন্য প্রতাপ অবশ্য সামনে এগিয়ে গেলেন না, বেশ দূরত্ব রেখে বসলেন।

চুরানব্বই বছর বয়স্ক এক খরখরে, সক্রিয়, গান্ধীবাদী সমাজসেবককে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার আত্মোৎসর্গের সব ব্যাপারটাই তো বুঝলুম, কিন্তু আপনি ব্যক্তিগত জীবনে এত কঠোর সংযম পালন করলেন কী করে? এমনকি আপনার গুরু গান্ধীজীও তো কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা…

উত্তরে সেই মহৎ ব্যক্তিটি হেসে বলেছিলেন, মানুষের চিন্তার তো কোনো ছবি ওঠে না, তার কোনো রেকর্ডও থাকে না, তবু তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি বাবা। প্রায় ষাট বৎসর কোনো নারীর সঙ্গে সহবাস করিনি, সেটা ইচ্ছাকৃত ব্রহ্মচর্য বলতে পারো। নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছি। সেখানে আর কোনোরকম ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার স্থান না থাকাই উচিত, কেননা, নারী এলে বিষয়-সম্পত্তির মোহও এসে পড়ে। কিন্তু এখনো, এই বয়েসেও কোনো রূপবতী স্ত্রীলোক দেখলে মনে হয়, অন্য পুরুষরা দূরে সরে থাক, সে আমার পাশে দাঁড়াক, আমার সঙ্গে দুটো কথা বলুক এই ইচ্ছেটাকে তুমি কী বলবে, বাবা, সংযম না লোভ?

খবরের কাগজে এই বিবরণটি পড়েই প্রতাপের মনে হয়েছিল, সুলেখার সঙ্গেও আমার ঠিক ঐ রকম সম্পর্কই ছিল। সুলেখা নিভৃতে দুটো কথা বললেই তিনি বড় আনন্দ পেতেন। ঐ বৃদ্ধ বড় সাংঘাতিক কথা বলেছেন। তবে, চুরানব্বই বছর বয়েসেও এমন আকাঙ্ক্ষা থাকে?

হাজরা মোড়ে নেমে প্রতাপকে খানিকটা হাঁটতে হলো। পাতাল রেলের জন্য এদিককার রাস্তার এখনো লণ্ডভণ্ড অবস্থা। চেনা জায়গাগুলো অচেনা লাগে। প্রত্যেকটি মানুষই যে সমাজে বাস করে, সেই সমাজের নিরন্তর সমালোচনাও করে যায় মনে মনে। এইভাবেই জনমত জিনিসটা নিঃশব্দে গড়ে ওঠে। প্রতাপ ভাঙা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলতে লাগলেন, এত দেরি হয় কেন, সব কিছু ঠিকঠাক হতে এত দেরি লাগে কেন?

তাঁর মনটা আজ মাঝে মাঝে উৎফুল্ল হয়ে উঠছে, যদিও হালকা ফুরফুরে নয়, তলায় তলায় রয়েছে একটা প্রচ্ছন্ন অভিমানের বিরুদ্ধতা, অবশ্য তিনি নিজেও সচেতন নন সে ব্যাপারে। আজ বিকেলের নতুন রকমের আকাশ তাঁর অজান্তেই তাঁর মনটাকে একটা নদীর জোয়ার-ভাঁটায় রূপান্তরিত করেছে।

বিমানবিহারীর বাড়ির সামনে এসে প্রতাপ থমকে গেলেন। তিনি তো এখানে আসতে চাননি। কোথায় যেতে চেয়েছিলেন? হ্যাঁ, বাড়ি থেকে বেরুবার সময় একবার ভেবেছিলেন গঙ্গার ধারে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখবেন। অন্যমনস্কভাবে নেমেছেন হাজরায়। বাড়িতে একা মন টিকছিল না। গঙ্গার ধারে চুপ করে বসে থাকতে খারাপ লাগে না, ওখানে বড় একটা চেনাশুনো কারুর সঙ্গেও দেখা হয় না।

সেই নকশাল আমলে খুব বোমাবাজি হতো এই গলির মধ্যে। একবার বেশ বড় রকমের চুরিও হয়েছিল। বিমানবিহারীর বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গাটা আর নেই, তিনি তখন একটা উঁচু পাঁচিল তুলে দিয়েছেন। বড্ড বেমানান দেখায়। বাড়িটার আদি নকশার সঙ্গে এই দেয়ালের–ঘেরাটোপ একেবারে খাপ খায়নি, কিন্তু উপায়ই বা কী, এটা সাময়িকতার দায়। যে-দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ শুয়োরের খোঁয়াড়ের মতন খুপরিতে কোনোক্রমে মাথা গুঁজে থাকে, সে দেশে একটা সাধারণ তিনতলা বাড়িকেও দুর্গে পরিণত করতে হয়। শুধু পাঁচিল নয়, বসানো হয়েছে একটা লোহার গেট, নিযুক্ত হয়েছে একজন দারোয়ান।

দারোয়ানটি গেটের কাছে ছিল না, কোথা থেকে যেন প্রতাপকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে একটা লম্বা সেলাম দিয়ে বললো, আচ্ছা হ্যায়, সাব?

প্রতাপ নিঃশব্দে সরে পড়তে চাইছিলেন। এখন দাঁড়াতেই হলো। তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, হাঁ। তোমাদের সব খবর ভালো।

গেটের তালা খুলতে খুলতে দারোয়ানটি জানালো যে বিমানবিহারী বাড়িতে নেই। বাবু আর মা আজ সকালেই কৃষ্ণনগর গেছেন।

সেই মুহূর্তে প্রতাপের মুখ দেখলে মনে হবে, কেউ যেন তাঁকে একটা অতি নিষ্ঠুর, কটু, অপমানজনক কথা বলেছে। বিমানবিহারীর এখন বাড়িতে না-থাকাটা যেন একটা বিশ্বাসঘাতকতা। প্রতাপ কোনো খবর দিয়ে আসেননি, তিনি ইদানীং এ বাড়িতে যখন তখন আসেন না। তিনি যে আজ আসবেন, তার কোনোরকম ইঙ্গিতও বিমানবিহারী পাননি। প্রতাপের বাড়ির টেলিফোন একমাস ধরে খারাপ। তবু প্রতাপ বিক্ষুব্ধ হলেন। তাঁর চরিত্রই যে এরকম। তিনি ভাবলেন, বিমান কেষ্টনগরে গেছে, নিশ্চয়ই গাড়িতেই গেছে, একবার তো সে আমার বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারত, আমি যাবো কি না?

দারোয়ানটি বললো, আইয়ে, অন্দর আইয়ে।

দারোয়ান জানে, বিমানবিহারী না থাকলেও প্রতাপের পক্ষে এ বাড়িতে এসে বসার বাধা নেই। প্রতাপদের মতন তো নয়, এ বাড়িতে অনেক লোক, সস্ত্রীক বিমানবিহারী কলকাতার বাইরে গেলেও সদরে তালাচাবি লাগান না।

প্রতাপ বললেন, না, আজ আর বসবো না। বাবুরা কবে ফিরবেন?

বিমানবিহারী দিন সাতেকের জন্য গেছেন শুনে প্রতাপ আরও দাহ বোধ করলেন। বিমান তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যাবার প্রস্তাব পর্যন্ত দিল না? প্রতাপের পক্ষে এটাই ছিল বেড়াতে যাবার প্রকৃষ্ট সময়। মমতা হরিদ্বারে গেছেন, অন্তত দু’সপ্তাহের মধ্যে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রতাপের কলকাতায় থাকার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

বিমান তাঁকে অবজ্ঞা করছে? তাই যদি হয়, তা হলে আর রইলো কে? বৃদ্ধ হলে কুকুর-বিড়ালের গা থেকে লোম খসে যাবার মতন মানুষেরও বন্ধুবান্ধব খসে যায়। নিজের স্বভাবের তীব্রতার জন্যই প্রতাপের বন্ধু সংগ্রহ খুবই কম। কেউ যদি তুল্যমূল্য ব্যবহার না করে, সামান্য অমনোযোগের ভাব দেখায়, তা হলেই প্রতাপ তার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখেন না। সম্পর্ক হারাতে হারাতে প্রতাপ প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৌঁছে গেছেন। এবার বোধহয় মমতাকেও হারাতে হবে। মমতার সঙ্গে প্রায়ই মতের অমিল হচ্ছে আজকাল।

প্রতাপ ফেরার আগেই পেছন থেকে একটি সরু, সুরেলা কণ্ঠ বলে উঠল, প্রতাপকাকা!

প্রতাপ মুখ ফিরিয়ে দুই বোনকে দেখলেন পাশাপাশি। ট্যাক্সি থেকে নেমেছে, হাতে অনেকগুলি প্যাকেট, নিশ্চয়ই নিউ মার্কেট থেকে এলো। এদের দেখেই প্রতাপের ক্ষোভ অনেকটা মিলিয়ে গেল। তিনি হালকা স্বরে বললেন, দুই প্রজাপতি, কোথায়, কোন কাননে গিয়েছিলে?

বুলির বেশ ভার ভরন্ত চেহারা হয়েছে, রূপ অনেক খুলেছে। একটা রাগী রাগী ভাব; স্বভাবটা অবশ্য আগেরই মতন উচ্ছল। প্রতাপকাকাকে সে গুরুজন বলে বাড়াবাড়ি সম্মান করে না। সে বললো, নন্দন কানন। এই, তুমি চলে যাচ্ছিলে যে?

প্রতাপ বললেন, বাড়িতে কেউ নেই শুনলাম। তুই কবে এলি বম্বে থেকে?

বুলি বললো, পরশু। কাল আমার টিভি-তে একটা রেকর্ডিং আছে। সুজন সিং, প্যাকেটগুলো ধরো না! প্রতাপকাকা, ভেতরে চলো।

ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে অলি হাসি হাসি মুখ করে চেয়ে আছে প্রতাপের দিকে। হালকা ঘি রঙের শাড়ী পরা, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। চেহারাটা এখনো লম্বা, ছিপছিপে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা হিসেবে বুলির বেশ খানিকটা নাম হয়েছিল, কিন্তু বিয়ের পর তাকে চলে যেতে হলো বম্বেতে। তবু গানের টানে সে প্রায়ই আসে কলকাতায়। মাত্র দু’মাস আগেও একবার এসেছিল।

বুলি বললো, আমি এবার দু’সপ্তাহ থাকবো। এবার যাওয়া হবে সুন্দরবন? তুমি বড় মিথ্যুক হয়েছে আজকাল। খুব যে বলেছিলে লঞ্চ জোগাড় করে দেবে!

তুমি একা একা মাঝে মাঝে সুন্দরবন যাও!

আগেরবার বুলি যখন এসেছিল, তখন কথায় কথায় একদিন সুন্দরবন বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা হয়েছিল। অলি আর বুলি দুই বোনেরই খুব উৎসাহ। কলকাতার এত কাছে, তবু ওরা সুন্দরবন দেখেনি। টাইগার প্রজেক্টের এখন যে ডিরেক্টর তার বাবা প্রতাপের সহকর্মী ছিলেন, সেই সুবাদে প্রতাপ লঞ্চের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারপর কথাটা চাপা পড়ে যায়। বুলির স্বভাবই এই, সে প্রথমেই অভিযোগের সুরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।

প্রতাপ বললেন, তুই তো আর আমাকে মনে করিয়ে দিসনি।

বুলি বলল, আহা-হা, তারপর আর তুমি এলেই না। তুমি আমার আর খোঁজও নিলে না!

প্রতাপ বললেন, তুই কলকাতায় এসে তো আমার একটু খবর নিতে পারিস। তুই কখন আসিস, চলে যাস, আমি জানতেই পারি না। এখন যে অনেকদূরে থাকি!

অলি বললো, এমন কিছু দূর না! আমাদের ঐ যাদবপুর যাবার চেয়ে তোমার পক্ষে এখানে আসা খুব সহজ। বাবা বলছিল, তোমার আজকাল পাত্তাই পাওয়া যায় না!

অলি বলল, কাল রাত্তিরে কৃষ্ণনগর থেকে একটা টেলিগ্রাম এসেছিল, বাবাকে তাই আজ সকালেই তাড়াহুড়ো করে চলে যেতে হলো। বাবা একবার বলেছিল, যদি তোমাকে খবর দেওয়া যায়। কিন্তু আজই দুপুরে কোর্টে মামলা আছে, বাবাকে তার আগে পৌঁছতে হবে, সময় ছিল না।

সম্পূর্ণ যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা। অলি ঠিকই বুঝেছে যে বিমানবিহারী কিছু না জানিয়ে হঠাৎ কৃষ্ণনগরে চলে গেছেন শুনে প্রতাপের মনে খটকা লাগবে। কৃষ্ণনগরের সম্পত্তি নিয়ে কিছুদিন ধরে বেশ শরিকী ঝাট চলছে।

বুলি বলল, তোমার নতুন বাড়ি তো আমি দেখিইনি। হাউস ওয়ার্মিং পার্টি দেবে না? কাল টিভি স্টেশন থেকে তোমার ওখানে যেতে পারি। কাকিমাকে বলে রাখবে, ওঁর হাতে তৈরি মটরশুটির কচুরি খাবো।

প্রতাপ বললেন, কাল আসতে পারিস। কিন্তু তোর কাকিমা এখানে নেই। হরিদ্বার গেছে।

বুলি সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে বললো, হরিদ্বার গেছে কেন? একা?

অলি বললো, মুন্নিরা এখন হরিদ্বারে থাকে। কাকিমা সেখানে গেছেন।

বুলি তবু অবাক ভাবে বললো, কাকিমা একা গেল কেন? প্রতাপকাকা, তুমি নিশ্চয়ই কাকিমার সঙ্গে ঝগড়া করেছে।

প্রতাপ হাসলেন। খানিকটা শ্লেষের সঙ্গে বললেন, তোদের কাকিমা এখন স্বাধীন। এখন আর আমাকে সঙ্গে নিতে চায় না। শোন, তোরা বাজার টাজার করে এলি, এখন বিশ্রাম নিবি, আমি আর এখন বসবো না। পরে একদিন আসবো।

বুলি বলল, আমাদের মোটেই বিশ্রাম নেবার দরকার নেই। তুমি বসবে এসো। প্রতাপ বললেন, আমার একটা কাজ আছে রে। যেতে হবে!

অলি প্রতাপের বাহু ছুঁয়ে বললো, যতই কাজ থাক, একটু না বসে যেতে পারবেন না। চা খাবেন না?

অলি জোর করলে প্রতাপ দুর্বল হয়ে পড়েন। একমাত্র অলিই তাঁর ওপর জোর করতে পারে।

প্রতাপ বললেন, চট করে এক কাপ চা খেয়েই উঠবো কিন্তু!

দোতলায় এসে অফিস ঘরে বসলেন প্রতাপ। বড় হল ঘরটায় পার্টিশান দিয়ে তিনটে চেম্বার করা হয়েছে। তার মধ্যে একটা চেম্বারে অলি বসে। ব্যবসা বড় হয়েছে, কয়েকজন কর্মচারী রাখা হয়েছে। তারা বোধহয় একটু আগেই চলে গেছে। চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর বিমানবিহারী অনেকবার প্রতাপকে বলেছিলেন তাঁর অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের ভার নিতে। প্রতাপ কিছুতেই রাজি হননি। প্রস্তাবটা উড়িয়ে দিয়ে প্রতাপ বলেন, এতকাল চাকরি করেছি, এবার পরিপূর্ণ ছুটি উপভোগ করতে চাই, বুঝলে!

কথাটা যে সত্যি নয়, তা প্রতাপও জানেন। কোনো রকম কাজ না থাকলে ছটি উপভোগ করাও যায় না। কিন্তু বিমানবিহারীর সঙ্গে কোনোরকম বৈষয়িক সম্পর্কে যেতে চান না প্রতাপ, বই অনুবাদও বহুদিন বন্ধ করে দিয়েছেন।

বুলি বললো, একটু বসো, কাকা, আমি আসছি ওপর থেকে।

অলি বললো, চা-টা আমি তৈরি করে আনছি। জগদীশ নেই, পারুলের মায়ের চা আমার পছন্দ হয় না।

প্রতাপ হাসিমুখে তাকালেন অলির দিকে। এর আগের দিন পারুলের মায়ের তৈরি চা খেয়ে প্রতাপ প্রসন্ন হননি, অলি ঠিক মনে রেখেছে। চায়ের ব্যাপারে প্রতাপ খুব শৌখীন।

অলির সবদিকে নজর। একসঙ্গে এত কাজ করে অলি, তবু-তার কোনো ব্যাপারেই ক্লান্তি নেই। এখানে প্রকাশনার অনেকখানি দায়িত্বই নিয়েছে অলি, একটা কলেজে সে আবার। ইংরিজির লেকচারার, আবার বহরমপুর-মুর্শিদাবাদের দিকে কোনো একটা সমাজসেবা

প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সে জড়িত। তবু তার সময়ের অভাব হয় না। প্রতাপ বেশ কিছুদিন এ বাড়িতে না এলেই অলি নিজে থেকে খোঁজ নিতে যায় যাদবপুরে। একদিন মমতা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, হঠাৎ রক্তস্রাব শুরু হয়েছিল, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। প্রতাপ দিশেহারা বোধ করছিলেন, যে-ডাক্তারটি এখন তাঁদের পারিবারিক চিকিৎসক, তিনি ছুটিতে গিয়েছিলেন পুরীতে, পাড়ার একজন নতুন ডাক্তারকে ডেকেও প্রতাপ ভরসা পাচ্ছিলেন না। বাড়িতে অন্য কোনো স্ত্রীলোক নেই, এইসব অসুখে পুরুষ মানুষ কতটা কী করতে পারে? ঠিক সেই সময়ে উপস্থিত হয়েছিল অলি। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে সমস্ত ভার নিয়ে নিল। এক ঘণ্টার মধ্যে একটা নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলো মমতাকে। আর কোনো অসুবিধেই হয়নি। মমতা অনেক ব্যাপারেই নির্ভর করেন অলির ওপর।

অথচ বাবলু যখন এসেছিল, অলি তখন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতো। বাবলুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে সে কথা বলেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সব কথাই অর্থহীন, অবশ্য শর্মিলার সঙ্গে তার বেশ ভাব হয়েছিল।

চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে ফিরে এলো অলি। প্রতাপ তার দিকে একবার চেয়েই অপরাধীর মন মাথা নীচু করলেন।

৬৪.২ নিউ জার্সি টার্ন পাইকের কাছে

নিউ জার্সি টার্ন পাইকের কাছে গাড়ি থামতে সিদ্ধার্থ একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, ভদ্রলোকের আসল নাম অভয়চরণ দে। কলকাতায় হ্যারিসন রোডে, মানে এখন যেটা মহাত্মা গান্ধী রোড, সেখানে থাকতেন। ওর বাবার ছিল কাপড়ের ব্যবসা। পুরোনো কলকাতার সুবৰ্ণবণিক, বুঝলি। বাড়ির সবাই বৈষ্ণব। ভদ্রলোক পড়াশুনা করেছেন স্কটিশচার্চ কলেজে। ওঁর এক ইয়ার ওপরে পড়তেন সুভাষ বোস, মানে নেতাজী সুভাষ বোস।

অতীন বললো, ওরে বাবা, তা হলে তো অনেক বয়েস। তুই এতসব জানলি কী করে?

সিদ্ধার্থ গাড়িতে আবার স্টার্ট দিয়ে বললো, আমার সঙ্গে একবার ওর দেখা হয়েছিল। আউট অফ কিউরিয়সিটি গিয়েছিলাম আমি। তারপর শোন, ফ্যানটাস্টিক গল্প। ঐ অভয়চরণ ফোর্থ ইয়ারে উঠে পড়া ছেড়ে দিলেন, ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েও বোধ হয় ডিগ্রি নেননি, বা এই রকম একটা কিছু। তখন ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা স্বদেশী হাওয়া ছিল তো! তাঁর বাবা তাঁকে একটা স্বদেশী কম্পানিতে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিলেন, ইন ফ্যাকট একজন বাঙালীর ওষুধ কম্পানি। সেই কম্পানির কাজে তাঁকে মাঝে মাঝে এলাহাবাদ, লক্ষী, ঝাঁসী এই সব জায়গায় যেতে হতো। এর মধ্যে তিনি বিয়ে করলেন, ছেলেপুলে হলো, রীতিমতন সংসারী মানুষ, আর পাঁচজন বাঙালী মধ্যবিত্ত যেমন হয়। চাকরিতে বেশ উন্নতি করেছিলেন, নিজস্ব ব্যবসাও ছিল, কলকাতা আর এলাহাবাদে উনি নিজের দোকানও করেছিলেন। তবে মাথায় একটু ধর্মের পোকা ছিল। বোষ্টম বাড়ির ছেলে তো, মাছ-মাংস খেতেন না, চাও খেতেন না, ঝোঁক ছিল। পুজো-আচ্চার দিকে, সে রকম তো অনেকেরই থাকে। যৌবনে উনি একবার এক বন্ধুর পাল্লায়। পড়ে গৌড়ীয় মঠের এক সাধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। গৌড়ীয় মঠ কোথায় জানিস।

অতীন ভুরু কুঁচকে বললো, আমরা আবার মঠ-মন্দিরের খোঁজ রেখেছি কবে? তোকে এত ফেনিয়ে বলতে হবে না। কাট ইট শর্ট।

সিদ্ধার্থ বললো, ব্যাকগ্রাউণ্ডটা একটু বলে নিচ্ছি। এটা কিন্তু একটা বিরাট ফেনোমেনান, আমাদের জানা দরকার। এ যুগে এরকম রিয়েল লাইফ অ্যাডভেঞ্চার স্টোরি কল্পনাওকরা যায় না। আমি তোকে এর রিলিজিয়াস অ্যাঙ্গেলটা দেখতে বলছি না, অন্য দিকটা ভেবে দেখিস। ঐ গৌড়ীয় মঠের সাধু অভয়চরণকে বলেছিলেন, তোমরা শিক্ষিত যুবকেরা সারা পৃথিবী জুড়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করছে না কেন? এটা একটা উদ্ভট প্রস্তাব। সেই নাইন্টিন টুয়েন্টিজের কথা, দেশ পরাধীন, সেখানকার ছেলেরা সারা পৃথিবীতে চৈতন্যের বাণী শোনাতে যাবে? কে শুনবে? তা ছাড়া অভয়চরণ সংসারী মানুষ, ধর্মপ্রচারের দায়িত্ব তাঁর নয়। তবে, ঐ গৌড়ীর মঠের গুরুর কথাবার্তা তাকে বেশ ইমপ্রেস করেছিল। মাঝে মাঝে কলকাতায় এলে তিনি ঐ গুরুর সঙ্গে দেখা করতেন। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভয়চরণের ধর্মের দিকে ঝোঁক বাড়তে লাগলো, বাড়িতে পাঁচজনকে ডেকে ধর্মের কথা আলোচনা করতেন। যেমন কিছু কিছু ব্যবসায়ীদেরও অবসর সময়ে ধর্মবাতিক থাকে, সেরকম বলতে পারিস। ওঁর স্ত্রী বা পরিবারের লোকজন এসব পছন্দ করতেন না। অভয়চরণ চা খান না, ওঁর স্ত্রীর চা খুব প্রিয়। বৃদ্ধ বয়েসে, অভয়চরণ যখন সংসার ছাড়বেন ঠিক করলেন, তখন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের কারণটা বেশ মজার। উনি স্ত্রীকে আলটিমেটাম দিলেন, চা এবং স্বামী, এই দুটোর মধ্যে তোমাকে একটা বেছে নিতে হবে। ওঁর স্ত্রী হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন, তা হলে তো স্বামীকেই ছাড়তে

অতীন বললো, ধ্যাৎ! এই জন্য কেউ বউকে ছাড়ে নাকি? শুধু চা খাওয়ার জন্য যদি কেউ বউয়ের ওপর রাগ করে, তা হলে তো বুঝতে হবে, সে একটা হামবাগ!

সিদ্ধার্থ হেসে বললো, শুধু ঐ জন্যই বউকে ছাড়েননি নিশ্চয়ই। আসলে পারিবারিক জীবনটাই তাঁর ভালো লাগছিল না। গৌড়ীর মঠের সেই সাধু, নামটা ভুলে গেছি, মৃত্যুর আগে অভয়চরণকে বলে গিয়েছিলেন, যারা বাংলা আর হিন্দী জানে না, তাদের মধ্যে চৈতন্যদেবের আদর্শ প্রচার করার জন্য সংসার ছেড়ে অভয়চরণ সেই কাজে লেগে গেলেন। কলকাতা থেকে চলে এলেন দিল্লি, বিনা পয়সার কোনো গেস্ট হাউসে জায়গা পেলেন কোনো রকমে, সেখানে শুধু নিজের চেষ্টায় ব্যাক টু গড় হেড’ নামে একটা কাগজ বার করতে লাগলেন ইংরিজিতে। তিনি একলাই তার লেখক, সম্পাদক, প্রুফ রিডার আর সেলসম্যান। কোনো চায়ের দোকানের সামনে রাস্তায় বসে বিক্রি করতেন সেই পত্রিকা, মানে লোককে ধরে ধরে গছাবার চেষ্টা আর কি। ভদ্রলোকের বয়েস তখন ছাপ্পান্ন-সাতান্ন!

অতীন বললো, এই রকম ক্ষ্যাপাটে ধরনের লোক কিছু থাকে।

সিদ্ধার্থ বললো, বেশ কিছু থাকে। তারা এক সময় হারিয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্য এই বুড়ো লোকটির জেদ। বাড়ি থেকে তো পয়সা কড়ি কিছু নেন না, খাওয়ার ঠিক নেই, শীতের জামা কাপড় নেই, তবু চালিয়ে যেতে লাগলেন এই পত্রিকা। সেই সঙ্গে ভগবদগীতার অনুবাদ ও টীকা রচনা করতে লাগলেন ইংরিজিতে, সেগুলোও ছাপাবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

–ইংরিজি ভালো জানতেন?

–পুরোনো আমলের বি-এ পাশ লোকেরা ইংরিজি মোটামুটি জানতো। বোম্বাস্টিক ধরনের ইংরিজি। ঐ সব ছাপাবার জন্য তিনি চিঠি লিখে বিভিন্ন লোকের কাছে সাহায্য চাইতেন। চিঠি। লিখতে পারতেন প্রচুর, অনেকের সঙ্গে সরাসরি দেখাও করতেন। সাধাসিধে ধরনের মানুষ, নিজের কোনো স্বার্থবুদ্ধি নেই, এই সব দেখে কিছু কিছু লোক সাহায্য করতো। তা ছাড়া ধর্মের ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা মাঝে মাঝে টাকা দিয়ে গিলটি-ফ্রি হতে চায়।

–অ্যাই কী করছিস, রাইট টার্ন নিতে হবে না এখানে?

–এর পরেরটা। টানেল দিয়ে যাবো। টাইম স্কোয়ারের কাছে আমাকে একটু থামতে হবে, বুঝলি। ভয় নেই, তোকে ঠিক সময় এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেবো। তুই আবার কবে চায়না যাচ্ছিস?

–এই তো ক্যানাডা থেকে ফিরেই। থার্ড উইকে।

–এবার কলকাতা ঘুরে আসবি নাকি?

–কী করে কলকাতায় যাবো? কম্পানির কাজে মাত্র পাঁচ দিন থাকবো সাংহাইতে। টিকিট দেবে ভায়া টোকিয়ো। ওদিক থেকে ইণ্ডিয়া যাওয়ার স্কোপ কোথায়? এখন ছুটিও পাওয়া যাবে না।

–আমার চায়নাটা যাওয়া হয়নি। অফিস থেকে আমাকে একবার হংকং পাঠাবে শুনছি। দেখি যদি তোর ট্রিপটার সঙ্গে ট্যাগ করতে পারি, তা হলে আমিও ওখান থেকে একবার ঘুরে আসবো। তুই তো আগে দু’ বার চায়না গেছিস, অতীন, ওদেশের গ্রাম-ট্রাম কিছু ঘুরে দেখেছিস?

–একগাদা কাজ নিয়ে যাই, নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকে না। চাইনীজরা কাজের ব্যাপারে বড় খুঁতখুঁতে, যে-কোনো ডিসিশান নেবার আগে অন্তত তিনবার ঝালিয়ে নেবে। শোন সিদ্ধার্থ, রণের একটু জ্বর চলছে দু’ দিন ধরে, আমি কয়েকদিন থাকবো না, তুই একটু খবর নিস। জানিস তো শর্মিলা কী রকম ঘাবড়ে যায়।

–নীপা বলেছে শর্মিলার কাছে গিয়ে এই উইক এণ্ড স্পেণ্ড করে আসবে। আমাদের ছোটবেলায় এরকম কত জ্বর হতো, মাবাবারা মাথাই ঘামাতো না। ও বয়! দ্যাখ, সামনে। বিরাট জ্যাম।

–কেন টানেল নিতে গেলি! বিকেলের দিকটায় প্রত্যেকদিন টানেলের মুখে জ্যাম হচ্ছে।

সিদ্ধার্থ রেডিওটা চালিয়ে ট্রাফিক-সংবাদ শোনার চেষ্টা করলো। সেরকম কোনো ঘোষণা নেই, তাহলে অবস্থা বিশেষ ভয়াবহ নয়। নীচের লেভেলের রাস্তায় গাড়িগুলো বাম্পার টু বাম্পার ঠেকে থাকলেও এক একবার একটু একটু নড়াচড়া করছে।

পেছন দিকে হেলান দিয়ে সিদ্ধার্থ বললো, বাকি গল্পটা শুনবি?

অতীন বললো, সেই বুড়ো লোকটি অ্যামেরিকাতে এলো কী করে?

সিদ্ধার্থ বললো, স্রেফ ইচ্ছা শক্তিতে। এ ছাড়া কোনো ব্যাখ্যা নেই। চায়ের দোকানের সামনে যিনি নিজের পত্রিকা ফিরি করতেন, সেই ব্যক্তিটি প্রায় পনেরো বছর ধরে লোকের কাছে চেয়ে-চিন্তে পত্রিকা ও গীতার অনুবাদ খণ্ডে খণ্ডে ছাপিয়ে চালিয়ে যাবার পর একদিন ভাবলেন, এই সব তিনি পশ্চিমী মানুষের মধ্যে প্রচার করতে যাবেন। টাকা পয়সা কিছু নেই, কী করে যাবেন তার ঠিক নেই, তবু ঠিক করলেন যাবেন। এক সময় ব্যবসা-ট্যবসা করেছেন তো। সেইজন্য তিনি কাজের ব্যাপারে খুব মেথডিক্যাল। পাসপোর্ট, পি ফর্ম, যাওয়া-আসার ভাড়া, এসবের চেয়েও বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ভিসার ব্যবস্থা করা। উনি মাঝে মাঝে বৃন্দাবনে গিয়ে থাকতেন, সেখানে আগরওয়াল বলে একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় ছিল। সেই আগরওয়ালের ছেলের নাম গোপাল, সে ইঞ্জিনিয়ার, থাকে পেনসিলভানিয়াতে। এই আগরওয়ালকে ধরে তার ছেলের কাছ থেকে আনালেন একটা স্পনসরশীপ। তাতে ভিসার সমস্যা গেল। পাসপোর্টও পাওয়া গেল। এবার টিকিট। তিনি চলে এলেন বোম্বাইতে, দেখা করলেন শ্রীমতী সুমতি মোরারজির সঙ্গে। এই মহিলাটি কে জানিস?

অতীন বললো, শিপিং টাইকুন না?

–দ্যাটস রাইট। সিন্ধিয়া স্টিমশীপ লাইনের একজন মালিক। এই মহিলা অভয় দে-কে গীতার অনুবাদ ছাপবার জন্য একবার কিছু টাকা দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর প্রস্তাব শুনে তো একেবারে হাঁ। ধুতি আর ফতুয়া পরা প্রায় সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ একা একা অ্যামেরিকায় ধর্ম প্রচার করতে যেতে চায়। কে এর কথা শুনবে, কে একে পাত্তা দেবে? এই বৃদ্ধ বয়েসে ঐ ঠাণ্ডার দেশে গিয়ে বেঘোরে মরবে নাকি? কিন্তু উনি নাছোড়বান্দা। উনি যাবেনই। শেষ পর্যন্ত শ্ৰীমতী মোরারজি ওঁদের লাইনের একটা জাহাজে অভয়চরণের জন্য একটা সীট করে দিলেন। একটা সুটকেস, একটা ছাতা আর কিছু চিড়ে-মুড়ি নিয়ে উনি উঠলেন জাহাজে। ওঁর ধারণা ছিল, আমেরিকায় গরু-শুয়োর ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না।

–আমেরিকায় যতদিন থাকবেন, ততদিনের খাবার সঙ্গে এনেছিলেন?

–তা জানি না। আমি এদেশে আসার মাত্র দু বছর আগে উনি একটা জাহাজে চেপে ব্রুকলীন পোর্টে নামলেন। কপালে তিলক কাটা, গেরুয়া পোশাক, গলায় কণ্ঠীমালা, হাতে জপের মালা, পায়ে সাদা রবারের জুতো, আমাদের দেশে যেমন পাওয়া যায়, এদেশে ওরকম জুতো কেউ দেখে নি, ওরকম বিচিত্র পোশাকের মানুষও এরা দেখেনি। ওঁর পকেটে মাত্র আটটা ডলার আর সঙ্গে গাদা খানেক সেই নিজের লেখা বই; পোর্ট থেকে বেরিয়ে ডান দিকে না। বাঁ দিকে যেতে হয় তাও জানেন না। একজন সত্তর বৎসরের বৃদ্ধ এত দূর বিদেশে এসেছিলেন কিসের ভরসায়? কিন্তু ওঁর ধারণা, উনি অ্যামেরিকা জয় করতে এসেছেন।

–পরশুদিন ম্যানহাটনে কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে নাচতে নাচতে মিছিল করে রাস্তা জ্যাম করে দিল, টি ভি-তে দারুণ কভারেজ দিয়েছে, কিছু ছেলে আবার মাথায় টিকি রেখেছে দেখলুম, এতগুলো অ্যামেরিকান ছেলেমেয়েকে উনি দলে টানলেন কী করে? সত্যি ঐ রকমভাবে একা এসেছিলেন?

–সেই জন্যই তো এত সবিস্তারে বলছি। এটা একটা দিগবিজয় কাহিনী। মাত্র আট ডলার পকেটে নিয়েই এসেছিলেন। প্রথম কিছুদিন সেই আগরওয়ালের ছেলে গোপাল পেনসিলভানিয়ার বাটলার নামে একটা ছোট্ট জায়গায় ওঁকে আশ্রয় দেন। গোপালের বউ আবার আমেরিকান মেয়ে। ওদের দুটি ছেলেমেয়ে। নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে এরকম একজন লোককে রাখা মুশকিল। গোপাল তাই ওয়াই এম সি এ হস্টেলে একটা ঘর ভাড়া করে দিয়েছিল। দিনের বেলা অভয়চরণ গোপালের বাড়িতে এসে নিজে রান্না করে খেতেন। ইণ্ডিয়া থেকে উনি একটা কুকার এনেছিলেন, যে রকম টিপিক্যাল পেতলের কুকার পাওয়া যায়, তাতে উনি ডাল, তরকারি রান্না করতেন। গোপালের বউ স্যালির উনি মন জয় করেন ঐ রান্না দিয়ে। সাদাসিধে নিরামিষ রান্না তো এরা কখনো খায়নি। অনেক লোক এত বিচিত্র সাধুকে দেখতে আসতো। ন্যাড়া মাথায় বোস্টম বাবাজীদের মতন কাপড়ের টুপী, সঙ্গে সব সময় উনি ওঁর ছাতাটি রাখবেনই। ওর আর একটা গুণ ছিল, স্মৃতিশক্তি খুব ভালো ছিল। আমাদের দেশের অনেকেই সাহেবদের নাম শুনে একটু পরেই ভুলে যায়। অন্য কারুর সঙ্গে পরিচয় করাতে গেলে নাম ভুলে যায়। উনি কিন্তু যার সঙ্গেই পরিচয় হলে, প্রত্যেকের নাম মনে রাখতেন, রাস্তায় দেখা হলে নাম ধরে ডাকতেন।

অতীন জিজ্ঞেস করলো, তুই এত ডিটেইলস জানলি কী করে?

সিদ্ধার্থ বললো, আমার কৌতূহল হয়েছিল বলেই খোঁজ খবর নিয়েছি।

ট্রাফিকের জট একটুখানি খুলেছে, গাড়িগুলো আবার কচ্ছপের গতিতে চলতে শুরু করেছে। সামনে-পেছনে প্রায় শ পাঁচেক গাড়ি, কিন্তু একটাও হনের শব্দ নেই। সিদ্ধার্থ গাড়ি চালাতে চালাতে বাকি কাহিনীটা বলে গেল।

মাসখানেক বাটলারে থাকার পর অভয়চরণ বুঝলেন যে গোপালের ওপর বেশি চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। তা ছাড়া ওখানে তিনি দু একটা বক্তৃতা দিলেও তাঁর আরও অনেক বড় ক্ষেত্র দরকার। এর মধ্যে তিনি অ্যামেরিকার জীবনযাত্রা কিছুটা বুঝে নিয়েছেন। তিনি চলে এলেন নিউ ইয়র্ক। সেখানে থাকবেন কোথায়? এর মধ্যেই তিনি ডাঃ রামমূর্তি মিশ্র নামে একজনের খোঁজ পেয়েছিলেন। চিঠি লিখে যোগাযোগ করেছিলেন এই রামমূর্তি মিশ্রর সঙ্গে। এর বয়েস অনেক কম, স্মার্ট গাই, সাদা স্ন্যাকস্ আর নেহরু জ্যাকেট পরে, কথাবার্তায় খুব তুখোড় আর ছটফটে। অ্যামেরিকানদের মতন কথায় কথায় ওহ হাউ লাভলি, কিংবা ইজনট ইঁট বিউটিফুল বলা শিখে নিয়েছে। এর আবার একটা ‘হঠযোগ স্টুডিও আছে। অর্থাৎ হি সেলস ইন্ডিয়া। মাঝে মাঝে ভারতীয় গান বাজনার উৎসব করেন, রবিশঙ্করকে আনান ইত্যাদি। ইনি কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিলেন অভয়চরণকে। অভয়চরণের তখনকার নাম অবশ্য শ্রীঅভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী। পরে আর একটা নাম হয় প্রভুপাদ। এই দু’জনের কিন্তু বেশিদিন বনলো না। রামমূর্তি মিশ্র আধুনিক শহুরে ধরনের মায়াবাদী। আর প্রভুপাদ ভক্তিবাদী, কৃষ্ণভক্ত। প্রভুপাদ রামমূর্তি মিশ্রের দয়ায় বেশিদিন থাকতে চাইলেন না। নিজস্ব একটা ঘর ভাড়া করলেন। খুবই ছোট্ট, খুপরি মতন ঘর, তারই ভাড়া বাহাত্তর ডলার। সেটাই হলো তার কৃষ্ণ মন্দির, সেখানে তিনি কীর্তন গান আর ভক্তদের উপদেশ দেওয়া শুরু করলেন।

অতীন জিজ্ঞেস করলো, বাহাত্তর ডলার ভাড়া, তা ছাড়া নিজস্ব খাওয়া-দাওয়ার কিছু খরচ তো ছিলই। উনি সে পয়সা পেতেন কোথায়?

সিদ্ধার্থ বললো, ঐ যে বইগুলো তিনি সঙ্গে এনেছিলেন, সেগুলো ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। কিছুতেই তিনি নিরুৎসাহিত হন। সামনের মাস কী করে চলবে তার ঠিক নেই, তবু তিনি কৃষ্ণ মাহাত্ম্য প্রচার চালিয়ে যেতে লাগলেন তেজের সঙ্গে। ডঃ মিশ্রের সঙ্গে থাকার সময় কিছু ইন্ডিয়া সম্পর্কে, ইন্ডিয়ান ফিলসফি সম্পর্কে ইন্টারেস্টেড লোক তাঁকে চিনেছিল। তা ছাড়া কাছেই ছিল প্যারাডক্স নামে একটা রেস্তোরাঁ, সেখানে আসতো লম্বা চুল আর দাড়িওয়ালা বাউণ্ডুলে ছোকরারা, তারা কেউ ছবি আঁকে, কেউ বাজনা বাজায়, পরে এদেরই বলা হতো হিপি। এই ছোকরারা একজন দু’জন করে আসতে লাগলো তাঁর কাছে। প্রভুপাদ যে করতাল বাজিয়ে কীর্তন করতেন, ঐটাকেই তারা একটা নতুন ধরনের গান বলে মনে করে আগ্রহী হলো, তা ছাড়া ভিয়েৎনামী যুদ্ধের ছায়ায় এরা খুঁজছিল একটা কিছু নতুন দর্শন।

প্রভুপাদের নিজস্ব জিনিসপত্র কিছুই প্রায় ছিল না, এক ট্রাঙ্ক ভর্তি বই, একটা ভাঙা টাইপ রাইটার আর ভক্তরা দিয়েছিল একটা টেপ রেকডার। একদিন সেই ঘরেই চুরি হয়ে গেল। চোরেরও কী করুণ অবস্থা! প্রভুপাদ তখন সেভেন্টি সেকেন্ড স্ট্রিটের সেই অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে উঠে গেলেন বাওরী অঞ্চলে। হার্ভে নামে একটা ছেলের একটা অ্যাটিকের ঘর ছিল ওখানে, সে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যাচ্ছে বলে প্রভুপাদকে ওখানে বিনা পয়সায় থাকতে দিয়ে গেল। অবশ্য, সেখানে ডেভিড অ্যালেন নামে আর একটা ছেলেও থাকবে। ঐ ডেভিড আবার নেশাখোর, প্রায় আধ পাগল।

বাওরীতে তুই কখনো গেছিস, অতীন? আমরা সন্ধের পর সেখানে যেতে ভয় পাই। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড এরিয়া হচ্ছে ঐ বাওরী, যত রাজ্যের মাতাল, লুম্পেন, চোর-জোচ্চোর, বেশ্যাদের আড্ডা। নেশাখোররা পেভমেন্টের ওপরে শুয়ে থাকে। যখন তখন মাঝ রাস্তায় ছুরি মারামারি হয়। প্রভুপাদের যেন সেসব ব্যাপারে কোনো ভূক্ষেপই নেই। একটা বেশ বড় ঘর পেয়ে সেখানে তিনি ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে প্রত্যেক সন্ধেবেলা কীর্তন আর গীতাপাঠ চালিয়ে যেতে লাগলেন। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে লাগলো তাঁর কাছে। ঐ কীর্তনের জন্যই ছেলেমেয়েরা বেশি আসে, তারাও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হরে কৃষ্ণ গায়।

পাড়ার মাতাল, ভবঘুরে কিংবা খুনেরা প্রভুপাদকে কোনোদিন ডিসটার্ব করেনি। এই অদ্ভুত চেহারার স্বামীজীকে তারা বরং সমীহই করতো। উনি একা একা বাজার করতে যেতেন, রাস্তায় সকলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসতেন, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বিনীতভাবে উত্তর দিতেন। তাঁর কীর্তনের আসরে দিন দিন ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। প্রভুপাদ ঠিক করলেন, সেই ঘরটাকেই রাধাকৃষ্ণের মন্দির বানাবেন। কিন্তু বিপদ এলো অন্য দিক থেকে।

ঐ যে ডেভিড অ্যালেন বলে একটি ছেলে ঐ ঘরে থাকতো, সে এমনিতে ছিল নিরীহ, কীর্তন গান করতো, প্রভুপাদের উপদেশ মন দিয়ে শুনতো। কিন্তু সাঙ্ঘাতিক নেশার দাসত্ব কিছুতেই ছাড়তে পারছিল না। গাঁজা, এল এস ডি, অ্যামফেটামাইনস-এর নেশা দিন দিন বাড়িয়েই যাচ্ছিল। ঐ নেশার ঝোঁকে সেও উগ্র হয়ে উঠতে। এক একসময় স্বামীজীকে মারতে যেত। একদিন ঘরে আর কেউ নেই, ঐ ডেভিড হঠাৎ বিকট হুংকার দিয়ে স্বামীজীর সামনে এসে দাঁড়ালো, তার চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতন। প্রভুপাদ তাকে বোঝাতে গেলেন, কোনো ফল হলো না, তার তখন কিছুই বোঝার মতন অবস্থা নেই। প্রভুপাদ চার তলার সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলেন রাস্তায়। নিজস্ব জিনিসপত্র কিছুই আনলেন না। অ্যামেরিকায় আসবার ন মাস পরে তিনি আবার আশ্রয় হারিয়ে পথে নামলেন।

এরপর তিনি কী করবেন? একটিই উপায় আছে। তার দেশে ফেরার টিকিট আছে, তিনি আবার জাহাজে চেপে বসে পড়তে পারেন। অনেকক্ষণ তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালেন। কিন্তু সত্তর বছরের বৃদ্ধটি কিছুতেই হার মানবার পাত্র নন। এদেশে এসেছেন কৃষ্ণের নাম প্রচার করতে, যতক্ষণ প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ তিনি সে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। ঐ অ্যাটিকের ঘরে তাঁর আর ফিরে যাওয়ার রুচি নেই। তিনি তাঁর কীর্তনের আসরের দু চারজন ভক্তের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেন। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে মাইকেল গ্রান্ট, সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তার খানিকটা নাম হয়েছিল, ইস্টার্ন ফিলোসফির প্রতি তার আগ্রহও ছিল, সে এগিয়ে এলো সাহায্য করতে। ‘ভিলেজ ভয়েস’ পত্রিকা থেকে বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে সে সেকেণ্ড এভিনিউয়ের একটা খালি দোকান ঘর ভাড়া করে ফেললো বন্ধু বান্ধবদের কাছে চাঁদা তুলে। দোকান ঘরটার বাইরে একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে, তাতে লেখা ম্যাচলেস গিফট। প্রভুপাদকে সঙ্গে করে সেখানে নিয়ে গিয়ে সে বাড়ি ভাড়ার এজেন্টের সঙ্গে কথা বলছে, প্রভুপাদ সেই এজেন্টকে নিজের অনুবাদ করা ভাগবতের তিন খণ্ডের একটা সেট উপহার দিলেন নিজের নাম লিখে। যেন তিনি ঐ বাড়ির দালালটিকে মহামূল্যবান কিছু দিয়ে ধন্য করছেন। তারপর গম্ভীরভাবে তাঁকে বললেন, আমরা এখানে কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ স্থাপনা করবো, আপনি হবেন। তাঁর প্রথম অফিশিয়াল ট্রাস্টি।

অতীন হেসে উঠতেই সিদ্ধার্থ আবার বললো, অ্যাকচুয়ালি তাই হয়েছিল। লোয়ার ইস্ট সাইডে আমরা যে বাড়িটায় এক সময় থাকতাম তোর মনে আছে? তুই প্রথম এদেশে এলি, সেই বাড়ি থেকে এই সেকেণ্ড অ্যাভিনিউয়ের বাড়িটা বেশি দূর নয়। ঐ দোকান ঘরটিতেই প্রতিষ্ঠিত হলো ইসকন, ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস। কেউ কেউ বলেছিল, সংস্থাটির নাম হোক গড় কনশাসনেস, এদেশের লোক তা হলে সহজে বুঝতে পারবে। প্রভুপাদ জোর দিয়ে বললেন, তিনি এদেশের মানুষকে কৃষ্ণের নাম জানাতে এসেছেন, তিনি ঐ নামই রাখবেন। ঐ দোকানঘর আর তার পেছনের অ্যাপার্টমেন্টটা হলো একটা আশ্রমের মতন। সেখানে ভাত-ডাল-চাপাটি-নিরামিষ তরকারি রান্না করে খায়, প্রার্থনা আর কীর্তনের সময় সবাই জুতো বাইরে খুলে আসে, কেউ সেখানে নেশা করতে পারবে না, এমন কি সিগারেটও খেতে পারবে না, সেই বৃদ্ধের এই সব কঠোর নিয়ম অ্যামেরিকান ছেলেমেয়েরা মেনে নিল কেন? দিন দিন তাঁর ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। একদিন সেখানে সদলবলে এলেন অ্যালেন গীনবার্গ। তারপর তিনি ভক্তদের নিয়ে ওয়াশিংটন পার্কে হরেকৃষ্ণ গান গাইতে যেতে শুরু করলেন।

গাড়ি ঢুকে পড়েছে লিংকন টানেলের মধ্যে। সমুদ্রের নীচের এই সুড়ঙ্গ উজ্জ্বল আলোকমালায় সাজানো, গাড়িগুলো এখন ছুটছে তীব্র গতিতে, কোনো একটা গাড়ি যদি হঠাৎ থেমে যায় তা হলে পর পর কতগুলো গাড়িতে যে ধাক্কা লাগবে তার ঠিক সেই। তবু সবাই ছোটে।

সিদ্ধার্থ বললো, এখন অ্যামেরিকার প্রায় প্রত্যেক শহরে ইসকনের মন্দির আছে। ক্যানাডা, ইউ কে, ফ্রান্স, জাপান, কোথায় নেই? একটা বিরাট ধর্মীয় এমপায়ার বলতে পারিস। একজন মধ্যবিত্ত বাঙালী ওষুধ ব্যবসায়ী বুড়ো বয়েসে এসে এত বড় একটা ব্যাপার কী করে করলো?

অতীন বললো, এর সাকসেস স্টোরিটা খুবই চমকপ্রদ ঠিকই। কিন্তু এবার বল তো সিদ্ধার্থ, এ সম্পর্কে তোর এত আগ্রহ কেন? তুই ধর্মের দিকে ঝুঁকেছিস নাকি?

সিদ্ধার্থ বললো, আমি ধর্ম-টর্ম কিছু বুঝি না। তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমি ব্যাপারটা দেখছি অন্য অ্যাংগল থেকে। এই প্রভুপাদ একলা নিঃসম্বল অবস্থায় এসেছিলেন এদেশে। কিন্তু নিজের স্ট্যাণ্ড পয়েন্ট থেকে এক চুলও নড়েননি। এই মাংসাশী জাতকে ইনি বাধ্য করেছেন নিরামিষ খেতে। এদেশে এত সেকসুয়াল পারমিসিভনেস, অথচ ইনি ভক্তদের আদেশ দিয়ে রেখেছেন অবৈধ যৌন সংসর্গ চলবে না। এর ভক্তদের নাম দেন মুকুন্দ, হয়গ্রীব, কুশ, কমলা, অনুরাধা। পুরুষরা মাথা ন্যাড়া করে, মেয়েরা শাড়ি পরে। এগুলো তো শুধু হুজুগ নয়। অ্যামেরিকান হুজুগ দু চার মাস, বড় জোর এক বছর থাকে। শুধু হুজুগে এতখানি আত্মত্যাগ কি সম্ভব? সেই তুলনায় আমরা কী করছি? আমরা এদেশে এসেই নিজের নামটা বদলাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অফিসে আমাকে সবাই সীড বলে ডাকে। আমি নিজেও টেলিফোন তুলে বলি, সীড স্পিকিং। তোর মনে আছে অতীন, একবার একটা ইন্টারভিউয়ের সময় একটা সাহেব তোর নামটা বদলাবার জন্য বলেছিল বলে তুই কীরকম রাগারাগি করেছিলি? এখন। তোর সাহেব তোক আদর করে ম্যাজ বলে। আমরা টাই না পরে অফিস যাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারি না। এমন কি নিজেদের মধ্যে বসেও আমরা সব সময় দেশের নিন্দে করি। আমাদের দেশ কত নোংরা, কত দারিদ্র্য, দেশের গভর্নমেন্ট কত করাপ্ট যেন ওদেশে যে আমরা জন্মেছি, সেই পরিচয়টা যত তাড়াতাড়ি মুছে ফেলা যায় ততই ভালো। আমরা ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলি, ওরা মাতৃভাষা তে শেখেই না, বাপ-মায়ের দেশ সম্পর্কে কিছু জানতে চায় না। অথচ ঐ বুড়ো লোকটি পুরো ভারতীয় কালচার চাপিয়ে দিচ্ছে এদেশের হাজার হাজার ছেলে-মেয়ের মধ্যে।

অতীন গম্ভীরভাবে বললো, ভারতীয় কালচার নয়, ধর্ম। তুই এটা বুঝতে পারছিস না কেন? ধর্মের আফিমে লক্ষ লক্ষ লোককে আজও উন্মাদ করা যায়। আমরা যে ধর্মকে রিজেক্ট করেছি, ওয়েস্টে সেই ধর্মই এখন ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।

–আমরা ধর্মকে রিজেক্ট করেছি? ইণ্ডিয়ায় ধর্ম নেই। তুই পাগল নাকি? তুই নিজের দেশটা ভালো করে চিনলিই না।

–ইণ্ডিয়ায় ধর্ম নিয়ে মাতামাতি নেই, সে কথা বলছি না। বলছি আমাদের কথা। এখানে যে-ধরনের ছেলেমেয়েরা এই প্রভুপাদের ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করছে, আমাদের দেশের সেই ধরনের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কি ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায়। এখানে ইসকনের যে সব মিছিল হয়, তাতে কোনো ইণ্ডিয়ান তো দেখতে পাই না, সবই তো সাহেব-মেম।

–যারা বাংলা-হিন্দী জানে না, অর্থাৎ বিদেশীদের কাছে কৃষ্ণ নাম প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে উনি এসেছিলেন।

–কেন, যারা বাংলা-হিন্দী জানে, তারা সবাই কি কৃষ্ণ নাম জপ করে? তারা আগেই উদ্ধার পেয়ে গেছে?

–মেটেরিয়ালিস্টিক পশ্চিম জগতে ভক্তিধর্ম ছড়াবার ব্রত নিয়েছিলেন উনি, গোটা পৃথিবীর দায়িত্ব ওঁকে নিতে হবে তার কোনো মানে নেই।

–এদের মিছিলে আমি ব্ল্যাকদেরও দেখি না। এদেশে কালো মানুষরাই বঞ্চিত, নিপীড়িত শ্ৰেণী। তাদের উদ্ধার করার জন্য বুঝি প্রভুপাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

–এটা একটা পিকিউলিয়ার ব্যাপার। এদেশের নিগ্রোরা দলে দলে মুসলমান হয়। দ্যাখ না, কেসিয়াস ক্লে মহম্মদ আলী হয়ে গেল। আরও অনেকেই। ওরা হিন্দু ধর্মের দিকে ঘেঁষতে চায় না। স্বামী বিবেকানন্দরও কি কোনো নিগ্রো ভক্ত ছিল অথচ হোয়াইটরা হিন্দু ফিলজফিতে এত আগ্রহ দেখায় কেন কে জানে?

–এটা মোটেই পিকিউলিয়ার নয়। সিম্পল। মুসলমানদের ধর্মে, ইসলামে বেসিক প্রিন্সিপল হল সমভ্রাতৃত্ব, সব মুসলমানেরই ইকুয়াল রাইটস রয়েছে, নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য তারা লড়াই করায় বিশ্বাসী।

–মুসলমানদের মধ্যে বুঝি গরিব বড়লোকের বিভেদ নেই? খুব বেশি মাত্রাতেই আছে। মুসলমানরা বুঝি নিজেদের মধ্যে লড়াই করে না? এত সিমপল নয়।

–আমি বলছি, বেসিক প্রিন্সিপলের কথা। হিন্দু ধর্মের বেসিক প্রিন্সিপল হচ্ছে ত্যাগ, মায়া, পারলৌকিক মুক্তি, এই সব। এই প্রিন্সিপালগুলো ভারতীয় হিন্দুদের অলরেডি বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। আরে, যারা খেতে পায় না, মাথার ওপর রোদ বৃষ্টি আটকাবার মতন একটা ছাদ নেই, তাদের আবার ত্যাগ, মুক্তি কী রে? এককালে যখন প্রচুর ভোগের ব্যাপার ছিল, তখন ত্যাগের প্রশ্ন এসেছিল। এদের এখন সেই অবস্থা। পৃথিবীতে হোয়াইট রেস এখন সমস্ত ক্ষমতা দখল করে আছে, এদের মধ্যে কিছু লোক ভোগ দর্শনে ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাদের কাছে এই ফিলোসফি খানিকটা অ্যাপিল করবে তাতে আর আশ্চর্য কী!

–তুই বড্ড সোজা করে দেখছিস রে, অতীন। একজন বুড়ো লোক পুরোনো ধরনের ইংরিজিতে এদের বৈষ্ণব দর্শন বোঝালো, তাতেই সবাই মেতে গেল? তুই প্রভুপাদের অ্যাচিভমেন্টের সিগনিফিকেন্স বুঝতে পারছিস না।

–আমি বুঝতে পেরেছি, তোর কী হয়েছে। একজন বাঙালী এসে এদেশে এতগুলো মঠ-মন্দির বানিয়েছেন, এত বড় একটা অগানাইজেশনের হেড হয়েছেন, তুই তাতেই মুগ্ধ হয়ে গেছিস। আমি এতটা গুরুত্ব দিতে পারছি না। ধর্মের নাম করে যে প্রতিষ্ঠানই হোক, সেটা ক্রমশ আর একটা সেট হয়ে উঠবে, অ্যাফফ্লুয়েন্ট শ্রেণীর শখের খেলা হবে কিংবা অন্য ধর্মের সঙ্গে লাঠালাঠি লাগবে। আমি মনে করি, ধর্মকে একেবারে নির্মূল করতে না পারলে এই পৃথিবীর মানুষের মুক্তি নেই।

–এসব তোর গোঁড়ামির কথা অতীন। তুই অন্য অ্যাংগেলটা একেবারে দেখছিস না। আমি মনে করি, পশ্চিমী জগৎ অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আর ব্যবসা দিয়ে এতদিন আমাদের জয় করে রেখেছিল, এখন প্রাচ্যদেশের একজন এসে আমাদের দর্শন দিয়ে এদের জয় করছে। ইসকনের অনেক ছেলে মেয়ে প্রভুপাদের জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারে। উনি অবশ্য জীবন দিতে বলতেন না কখনো। ওঁর মতে, এই ধর্ম পৃথিবীতে একটা যুদ্ধবিরোধী শান্তির বাণী প্রচার করবে। তুই ধর্মের ওপর এত খাপ্পা কেন? মানুষ যদি ধর্মের কাছে শান্তি পায়, তাতে আপত্তির কী আছে? স্বার্থপর কিংবা মতলববাজরা অন্যভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে, কিন্তু সেটা তো ধর্মের দোষ নয়। কোটি কোটি মানুষ এখনো যে ধর্মের কাছে আস্থা ও সান্ত্বনা পায়, সেটা তো মিথ্যে নয়।

–তোর দেখছি মাথাটা একেবারে গেছে। তার সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। তুই যা, ওদের দলে ভিড়ে পড়, দীক্ষা নিয়ে চ্যালা হয়ে যা। অবশ্য দ্যাখ, তোকে ওরা আবার দলে নেবে কি না।

–আমি দীক্ষা টিক্ষা নেবার কথা ভাবি না। কিন্তু প্রভুপাদের সমস্ত কেরিয়ারটা স্টাডি করে আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হয়েছে। একজন মানুষ নিজের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে এতদূর তো উঠতে পেরেছে? আর আমরা কী করছি? আমাদের তো কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নেই। অনবরত টাকা রোজগার করছি আর খরচ করছি। দু’ বছর অন্তর গাড়ি বদলাচ্ছি, বাড়ি কিনছি, এই কি জীবন? আমার এই একটা কমপ্লেক্স পেয়ে বসেছে। আমি ঠিক করেছি দেশে ফিরে যাবো। তারপর যা হয় তোক। এদেশে দাসত্ব করা আর ভালো লাগছে না।

সিদ্ধার্থর মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে অতীন বললো, কাল রাত্তিরে কতটা মাল টেনেছিস! এখনো হ্যাং ওভার কাটেনি মনে হচ্ছে? সেবার কি অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তোর মনে নেই? আবার বোকামি করবি?

সিদ্ধার্থ বললো, আমি ঠিক করেছি, আবার ফিরে গিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করবো।

শহরে দু একটা কাজ সেরে সিদ্ধার্থ অতীনকে নামিয়ে দিয়ে গেল জে এফ কে এয়ারপোর্টে। আজ থ্যাংকস গীভিং ডে-র ছুটি, অতীনকে যেতে হবে শিকাগো। তার ফ্লাইটের এখনো দেরি আছে, তাড়া কিছু নেই। লাউঞ্জে বসে সে হ্যাণ্ড ব্যাগ খুলে জরুরি ফাইলটা বার করলো। এই বিজনেস ডিলটা ঠিক মতন করতে পারলেই অতীনের আর একটা প্রমোশন হবেই।

কোটের পকেট থেকে ছোট্ট ক্যালকুলেটারটা বার করে রাখলো বাঁ হাতে। এটা এমনই অভ্যেস হয়ে গেছে যে যে-কোনো অঙ্ক দেখলেই হাত নিশপিশ করে। যদিও ফাইলে অঙ্কগুলো সবই আগে থেকে করা আছে নির্ভুল ভাবে।

অতীনের মন বসছে না। নিউ ইয়র্কে ইসকনের মিছিলের জন্য ট্রাফিক জ্যাম একটা বড় ঘটনা, সব কাগজে প্রথম পাতার খবর হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গটা একবার তুলতেই সিদ্ধার্থ লম্বা গল্প ফেঁদে বসলো। সিদ্ধার্থ যে এই সব ধর্মীয় ব্যাপার নিয়ে এতখানি আগ্রহী হয়ে পড়েছে, তা অতীনের ধারণাই ছিল না। সব সময় হাসি-ঠাট্টা আর ফক্কড়ি করা স্বভাব ছিল সিদ্ধার্থর। এটা বদলে গেছে গত বছর সেই ঘটনার পর। দেশ থেকে নিজের বাবা আর মাকে এনে নিজের কাছে রেখেছিল সিদ্ধার্থ। এখন ও বড় বাড়ি কিনেছে, কোনো অসুবিধে ছিল না। সিদ্ধার্থর বাবা একটা কলেজের হিস্ট্রির অধ্যাপক ছিলেন, পড়য়া মানুষ, এখানে তিনি পড়াশুনো নিয়েই থাকতে পারতেন, কিন্তু হঠাৎ গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেলেন। অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট। দেশে কি অ্যাকসিডেন্ট হয় না? কেউ গাড়ি চাপা পড়ে মরে না? কলকাতায় যা ট্রাফিকের অবস্থা…। এদেশে ফাঁকা রাস্তায় দুর্দান্ত স্পীডে গাড়ি চলে, সিদ্ধার্থর বাবা একা একা হেঁটে বেরোতেই বা গিয়েছিলেন কেন? তাও হাইওয়ে দিয়ে…

কিন্তু তারপর আর সিদ্ধার্থর মা কিছুতেই এদেশে থাকতে চাইলেন না। একেবারে অবুঝ হয়ে গেলেন। সিদ্ধার্থর আর ভাই বোন নেই। ভদ্রমহিলা একা একা কলকাতা শহরে একটা ফ্ল্যাটে থেকে কী আনন্দ পাবেন? কিন্তু তিনি কারুর কথাই শুনলেন না। জোর করেই ফিরে গেলেন দেশে। সিদ্ধার্থ তে খুব আঘাত পেয়েছিল। ওর স্ত্রী নীপাই নাকি মাকে ধরে রাখতে পারেনি। হয়তো কথাটা ঠিক নয়। নীপা অনেক চেষ্টা করেছিল। নিজের মাকে সিদ্ধার্থ নিজেই যদি বোঝাতে না পারে, তা হলে নীপা আর কী করে তাঁর মত ফেরাবে।

এখন সিদ্ধার্থ কি ভাবছে, এদেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে গিয়ে মায়ের কাছে থাকবে? বস্তা সেন্টিমেন্ট! নীপার ইচ্ছে-অনিচ্ছের মূল্য দেবে না, ছেলে-মেয়ের সুবিধে অসুবিধের কথা। চিন্তা করবে না?

সিদ্ধার্থর বাবা শান্ত, নিরীহ ধরনের মানুষ ছিলেন, প্রায় কথাই বলতেন না। অতীনের সঙ্গে দু’ তিনবার দেখা হয়েছে, কিন্তু কেমন আছেন, ভালো আছেন ছাড়া আর কোনো কথাই হয়নি। বই পড়া ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে উৎসাহ ছিল না। এইটাই অতীন বুঝতে পারে না, এদেশে কত কী দেখার আছে, এত রকম মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারি, থিয়েটার, বেড়াবার কত জায়গা, তবু সেসব দেখতে ইচ্ছে করে না? ইতিহাসের অধ্যাপক, কিন্তু ইতিহাস কি শুধু বইয়ের পৃষ্ঠায়? তাঁর স্বাস্থ্য ভালো ছিল, শুধু শুধু প্রাণটা দিলেন।

ইসকনের প্রভুপাদের কথা শুনে অতীন তেমন কিছু মুগ্ধ হয়নি। তার বাঙালী বাঙালী। বাতিক নেই। ধর্মীয় গুরুরা পৃথিবীর কোনো উপকার করতে পারে, একথা সে কিছুতেই মানতে পারবে না। বাবার মৃত্যুর পর সিদ্ধার্থ বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে, ঐ ভক্তিপাদের মধ্যে সে কি ফাদার ফিগার খুঁজছে?

ঐ সব শুনতে শুনতে বার বার দেশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।

শুধু কলকাতা নামটা একবার কেউ উচ্চারণ করলেই অনেকগুলো ছবি ফুটে ওঠে চোখের সামনে।

অতীন যে আগে দু’ বার চীনে গেছে, সে কথা মা-বাবাকে জানায়নি। মা অন্তত ভাবতেন, চীনে গেলেই অতীন একবার নিশ্চয়ই কলকাতায় ঘুরে আসবে। ওঁরা বোঝেন না যে পিকিং থেকে কলকাতায় যাওয়ার চেয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে কলকাতায় যাওয়া সোজা। ছুটি পাওয়াটাই সবচেয়ে শক্ত।

সিদ্ধার্থ আর সে একসঙ্গে দেশে পাকাপাকি ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেনি? ওঃ, সেই অভিজ্ঞতার কথা ভাবলেই এখনো জিভটা তেতো হয়ে যায়। দেশে লোকাল ট্রেনগুলো সব সময় ভর্তি থাকে, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একদল লোক বলে, জায়গা নেই, জায়গা নেই। সারা দেশটাই যেন অতীন আর সিদ্ধার্থকে সব সময় এই কথাটাই শুনিয়েছে, জায়গা নেই, জায়গা নেই!

এমার্জেন্সির পর ইন্দিরা গান্ধী হেরে গেলেন ইলেকশানে, তারপর পশ্চিম বাংলায় বামফ্রন্ট পাওয়ারে এলো। সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হলো, পেণ্ডিং কোর্ট কেসগুলোও তুলে নেওয়া হয়েছিল। অতীন পলিটিক্যাল প্রিজনার ছিল না, তার নামে ছিল মাড়ার চার্জ। কিন্তু বিমানবিহারী কী যেন কলকৌশল করে অতীনের কেসটাও পলিটিক্যাল কেসের মধ্যে ফেলে দিয়ে উইথড্র করিয়ে নিয়েছিলেন। বেইল জাম্প করায় ব্যাপারটাও চেপে দেওয়া হয়েছিল। প্রতাপ খুব ভালো রকম খোঁজ খবর নিয়েছিলেন, অতীনের দেশে ফেরার আর কোনো ঝুঁকি ছিল না। অতীন তো সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। প্রয়োজনের বেশি তে। সে একদিনও থেকে যেতে চায়নি অ্যামেরিকায়। শর্মিলাও এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল। তখনও রণ জন্মায়নি। অনীতার পাঁচ বছর বয়েস, তার লেখাপড়ার কোনোই অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কলকাতায় একটা ঐটুকু মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাই যে বিরাট সমস্যা, তা কি অতীন কখনো ভাবতে পেরেছিল?

কলকাতায় ফিরে অতীন দেখেছিল, সে যে শহরটাকে চিনতো, সে শহরটাই আর নেই, যেন এক অন্য কলকাতা।

সেলিমপুরে বাবা-মায়েরা যে অত ছোট একটা ফ্ল্যাটে থাকেন, তা-ও অতীন এতদিন চিঠি পড়ে বুঝতে পারেনি। তাদের কালীঘাটের বাড়িতে সেই তুলনায় অনেক বেশি জায়গা ছিল। সে যাই হোক, একখানা ঘরে গাদাগাদি করে থাকতেও অতীনের আপত্তি ছিল না। ঐ রকমভাবে তো কত লোকই থাকে। সে অ্যামেরিকা থেকে ফিরেছে বলে কি অন্যদের মাথা কিনে নিয়েছে? বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকার জন্যই তো ফিরে আসা।

শর্মিলার কষ্ট হচ্ছিল বটে কিন্তু মুখে সে কথা প্রকাশ করেনি। শর্মিলা ধুলো আর ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না, অতীন বলেছিল, আস্তে আস্তে মানিয়ে নাও। আমাদের জীবনের অর্ধেকের বেশি সময়ই তো আমরা এই ধুলো-ধোঁয়ার মধ্যে কাটিয়ে গেছি, এখানেই মানুষ হয়েছি, আবার সব অভ্যেস হয়ে যাবে।

শর্মিলা অবশ্য জামসেদপুরের মেয়ে, সেখানকার বাতাস কলকাতার চেয়ে অনেক পরিষ্কার, জামসেদপুরে গেলে শর্মিলা ভালো থাকতো। অতীন টিসকো-তে একটা চাকরির অফার পেয়েও নেয়নি, সে থাকতে চেয়েছিল কলকাতাতেই। সে গিয়েছিল প্রতাপ মজুমদারের পরিবারের দুই ছেলের শূন্যস্থান পূর্ণ করতে।

ওঃ, ড্রাগ রিসার্চ লেবরেটরির সেই চাকরি। ভাবলেই এখনো শরীরটা রি রি করে। কেউ মন দিয়ে কাজ করবে না, অন্যদেরও কাজ করতে দেবে না। কাজ না করেও মাইনে নিতে বিবেকে লাগে না কারুর। একজন যদি ভালোভাবে কাজ করতে চায়, তা হলে সেটা যেন তার অপরাধ, অন্যরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করে। অতীনকে তার সহকর্মীরা কথায় কথায় বলতো, মশাই, আপনাদের অ্যামেরিকায় ওসব চলে! ঐ ‘আপনাদের অ্যামেরিকা’ শুনলেই অতীনের গা জ্বালা

আর ঈর্ষা। কত রকম নোংরা ধরনের ঈষই যে হয়। সিদ্ধার্থরও একই রকম অবস্থা হয়েছিল। সিদ্ধার্থ বলতো, মাইরি, নিষ্কাম ঈর্ষা কাকে বলে দেখেছিস? আমাকে ঈর্ষা করলে অন্য একজনের কোনো লাভ নেই, তার লাইন আলাদা, তার কোনো প্রমোশন হবে না, তবু সে আমার পেছনে লাগবে, আড়ালে আমার নিন্দে করবে। এটা নিষ্কাম ঈর্ষা ছাড়া আর কী?

তবু সব অসুবিধেই তুচ্ছ করতে পারতো অতীন। কিন্তু কলকাতায় তার বন্ধু কোথায়? সিদ্ধার্থ চাকরি নিয়েছিল দুর্গাপুরে। কৌশিক আর পমপম, ওদের দেখে খুব দুঃখ পেয়েছিল অতীন। সবচেয়ে বেশি আঘাত দিয়েছিল অলি।

…সিকিউরিটি চেক-এর কল দিয়েছে। ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালো অতীন। টিকিটটা হাতে নিয়ে ঘড়ি দেখলো। অনেকটা সময় চলে গেল, কাগজপত্র কিছুই পড়া হলো না।

সিদ্ধার্থ আবার দেশে ফেরার কথা ভাবছে। মাঝে মাঝে এরকম ভাবালুতা আসে, ভালো করে ওকে কড়কে দিতে হবে। দেশ! দূরে থাকলেই তবু দেশের কথা ভাবতে ভালো লাগে।

শর্মিলা এ বছর একবার দেশে বেড়াতে যাবার বায়না ধরেছে। তিন বছর আগেই শর্মিলা ছেলে মেয়েকে নিয়ে একবার দেশে ঘুরে এসেছে, সেবার অতীন যায়নি। এ বছর বাড়ি সারাতে গিয়ে অনেক খরচ হয়ে গেল, এবার আর যাওয়া হবে না। সামনের বছর দেখা যাবে। অতীনের নাক দিয়ে গরম প্রশ্বাস বেরুতে লাগলো, রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠলো। অলির কথা মনে পড়লে তার এখনো এরকম রাগ হয়।

৬৪.৩ সেগুন বাগিচার অতবড় বাড়িটা

সেগুন বাগিচার অতবড় বাড়িটা এক সময় নানা বয়সের মানুষের কণ্ঠস্বরে ঝমঝম করতে, এখন সেখানে কয়েকটি মাত্র প্রাণী থাকে। মঞ্জুর বাবা শামসুল আলম শেষজীবনে একেবারে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। অমন হাসিখুশী মানুষটিকে আর চেনাই যেত না। যে-কোনো ঘরে ঢুকেই তিনি দৌড়ে এক কোণায় গিয়ে দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়তেন, ভাবখানা এই যে পেছন থেকে কোনো শত্র তাঁকে আক্রমণ করতে পারবে না। পা দুটি সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে মাটিতে ঠকতে ঠকতে শঙ্কাতুর মুখে বলতেন, ঐ আসছে, ঐ আসছে!

অথচ তিনি খবরের কাগজ পড়তেন, বই পড়তেন, চেনা মানুষদের চিনতে পারতেন। এককালের নামজাদা উকিল, পড়াশুনো করা মানুষ, সেসবও কিছু ভোলেননি, কিন্তু দশ মিনিটের বেশি স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারতেন না। অনেক চিকিৎসা করানো হলো। কিছুদিনের জন্য লন্ডনেও পাঠানো হয়েছিল তাঁকে, কোনো ফল হয়নি। উন্মাদ বলে তাঁকে কিন্তু অবজ্ঞা করার উপায় ছিল না, হঠাৎ হঠাৎ তিনি কোনো গভীর ধরনের সত্য উচ্চারণ করে চমকে দিতেন সকলকে। কলকাতা থেকে ফিরে মঞ্জু যখন প্রথম তার বাবাকে কদমবুসি করতে যায়, তখন শামসুল আলম বসেছিলেন চিলেকোঠায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে, লুঙ্গির কষি আলগা হয়ে গেছে, ঠোঁটের কষ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে, চক্ষু দুটি ঘোলাটে, বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন আপন মনে, তবু তিনি ঠিক চিনতে পারলেন মঞ্জুকে। মঞ্জুর মুখোনি দু’হাতে ধরে স্নেহশীল পিতার মতন আবেগের সঙ্গে বলেছিলেন, ফিরা আসছোস! আয়, আয়, সোনা মাইয়্যা আমার। সুখু মিঞা কোথায়? ওরে মঞ্জু, তুই পোলার নাম রাখছোস সুখু। কিন্তু তোর কপালে সুখ নাই, তার কপালেও সুখ নাই!

বাড়িসুদ্ধ লোক এরকম অলক্ষুণে কথা শুনে আঁতকে উঠেছিল, কেঁপে উঠেছিল মঞ্জুর বুক।

শেখ মুজিব যেদিন সপরিবারে নিহত হলেন, সেদিন আলম সাহেব এক সাঙ্ঘাতিক ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। বাড়ির অন্য লোকেরা যখন ভয়-বিহ্বল কণ্ঠে নানা রকম আলোচনা করছে, তখন তিনি হঠাৎ বলে উঠেছিলেন, এবার যাবে তাজউদ্দিন। সৈয়দ নজরুল, মনসুর আহমদ, কামরুজ্জামান, এরাও খতম হবে। স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করেছিল, তারা কেউ থাকবে না।

জেলখানার মধ্যে সত্যি সত্যি সেই নৃশংস ঘটনা ঘটার দু’দিন আগেই শামসুল আলমের লাশ ভোরবেলা ভাসতে থাকে বাড়ি সংলগ্ন পুকুরের পানিতে। সেটা দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা, তা আর জানা যায় নি।

শামসুল আলমের পুত্র কন্যাদের মধ্যে এখনো বেঁচে আছে পাঁচ জন। দুই বিবাহিতা কন্যা আছে চিটাগাং ও রাজশাহীতে। এক পুত্র বিদেশে। বাড়িটির মাঝখানে প্রাচীর তুলে দুটি ভাগ করা হয়েছে। মধ্যম পুত্র মওদুদের স্ত্রী যোবায়দার সঙ্গে তার শাশুড়ির একেবারেই বনিবনা হয়নি, নিত্যদিন ঝগড়াঝাটির বদলে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়াই ভালো। মালিহা বেগম নিজের অংশ পৃথক করে নিয়েছেন, তাঁর অন্য ছেলেমেয়েরা কখনো ঢাকায় এলে সেই অংশেই ওঠে। মঞ্জু রয়েছে তার মায়ের সঙ্গে।

মালিহা বেগমের অংশটিতেও মোট পাঁচখানি শয়নকক্ষ, দুটি বারান্দা, দুটি বাথরুম, দুটি রান্নাঘর, অনেকখানি বড় উঠোন। এদিকে থাকে মাত্র তিনটি রমণী আর পুরুষ বলতে মঞ্জুর ছেলে সুখু, তার বয়েস এখন সদ্য উনিশ। মালিহা বেগম এখনও বেশ শক্ত সমর্থ আছেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে তাঁর হাঁটু দুটো মাঝে মাঝেই প্রতিবাদ করে, তবু তিনি চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। প্রায়ই তিনি সন্ধেবেলা ছাদে উঠে অন্য অংশটির দিকে উৎসুক নয়নে তাকিয়ে থাকেন। যোবায়দা তার ছেলেমেয়েদেরও এইদিকে আসতে দেয় না। মওদুদ মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে না। মালিহা বেগম দুর থেকে তাঁর ছেলে ও নাতি-নাতনীদের এক ঝলক দেখতে পেলেই তৃপ্তি পান। এই তৃপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রুর ঢল নামে।

মঞ্জু এখন বাংলাদেশের নামকরা গায়িকা বিলকিস বানু। কখনো সে দোকানবাজারে গেলে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা তার অটোগ্রাফ চায়। খবরের কাগজে তার ছবি ছাপা হয়, টি ভি-তে প্রায়ই দেখা যায় বলে তার মুখোনি পরিচিত। খুব প্রয়োজন ছাড়া মঞ্জু অবশ্য বাড়ি থেকে কমই বেরোয়।

মনিরাকে সে নিজের কাছে এনে রেখেছে। কোথায় যাবে মেয়েটা, কেউ তো ওর নেই। আগে ও বাড়িতে থাকার সময় মনিরা যখন তখন ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে যেত, তিন চারদিন তার কোনো পাত্তাই পাওয়া যেত না। তার দৃঢ় ধারণা ছিল, সিরাজুলকে সে খুঁজে পাবেই। এরকম একটা দুর্দিনের পর কোনো একজন মানুষকে খুঁজে পেলেও তাকে যে আর নিজের করে পাওয়া যায় না, তা ও কী বুঝবে! অবশ্য সিরাজুল সত্যিই বেঁচে আছে না তার মৃত্যু হয়েছে, সে সম্পর্কে সঠিক করে কেউ কিছু বলতে পারেনি। সেই বিভীষিকার দিনগুলির পাঁচ সাত বছর পরেও মনিরার মতন হাজার হাজার নারী আশা করে বসে ছিল, তাদের প্রিয়জন হয়তো ফিরে আসবে। স্বাধীনতার যুদ্ধে যে কতজন শহিদ হয়েছে আর কতজন নিরুদ্দেশ, আজও তার হিসেব হলো না।

সকাল দশটা, স্বরলিপি দেখে একটা নতুন গান তুলছে মঞ্জু। কামাল তাকে জাপান থেকে একটা অদ্ভুত যন্ত্র এনে দিয়েছে, এই যন্ত্র থেকে হারমোনিয়াম, তানপুরা, এস্রাজ, পিয়ানো, বেহালার সুর বার করা যায়। সেই যন্ত্রটা সম্পর্কে মঞ্জুর মুগ্ধতা এখনো কাটেনি, প্রত্যেকদিন সেটা বাজাতে বসলেই অবাক হয়ে জাপানীদের বুদ্ধির কথা ভাবে।

একটু পরেই টেলিফোন বেজে উঠলো। মঞ্জু শুধু মুখ তুলে তাকালো একবার, গান থামালো না। সে নিজে টেলিফোন ধরে না। ওটা মনিরার কাজ। মনিরা এখন বলতে গেলে তার প্রাইভেট সেক্রেটারি। যদিও টি ভি, সিনেমা, রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ ও পাওনা আদায়ের জন্য মালেক নামে একটি ছেলেকে মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে, সে সব বাইরের কাজ করে। মালেক প্রতিদিন সকালে এসে নিচের ঘরে বসে ঘণ্টাখানেকের জন্য চিঠিপত্র লেখালেখি করে। এই মালেকের সঙ্গে মনিরার প্রায়ই খটাখটি লাগে।

ফোনটা কয়েকবার বাজবার পর মনিরা ছুটে এলো অন্য ঘর থেকে। ফোনটা তুলে হ্যালো বলার পর সে একঝলক তাকালো মঞ্জুর দিকে। অর্থাৎ সে বুঝিয়ে দিল, মঞ্জুর উঠে আসার দরকার নেই। বেশ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সে বললো, বিলকিস বানু এখানে ব্যস্ত আছেন, কী কওয়ার আছে, আমারে বলেন!

ওপাশ থেকে একজন ধমক দিয়ে বললো, এই মনিরা পাকামি করিস না, মঞ্জুরে ডাক!

মনিরা চোখ বড় বড় করে জিভ কেটে ফেললো। এক হাতে ফোনটা চাপা দিয়ে হাসিমুখে বললো, কামাল সাহেব!

বাজনা বন্ধ করে উঠে এলো মঞ্জু। তার মুখে সামান্য বিরক্তির ছায়া ফুটে উঠলেও কামালকে অগ্রাহ্য করবার উপায় নেই।

মঞ্জু রিসিভারটা নিতেই কামাল বললো, গুড মর্নিং বেগম সাহেবা, মেজাজ শরীফ আছে।

মঞ্জু বললো, জী। আজ বিকাল চারটার সময় রেকর্ডিং তো? মনে আছে আমার। কামাল বললো, সেইটা তো ক্যানসেলড়!

মঞ্জু বললো, ক্যানসেলড? আজ রেকর্ডিং হবে না?

কামাল বললো, আজ স্ট্রাইকের দিন না? সবকিছু বন্ধ। কোনো ট্রান্সপোর্ট পাওয়া যাবে না।

–আজ কিসের স্ট্রাইক?

–তুমি সে খবরও রাখো না? কোন জগতে থাকো! আজ সবকটা অপোজিশান পার্টি প্রতিবাদ দিবস পালন করছে, গত শনিবার কুমিল্লায় ছাত্রদের উপর যে ফায়ারিং হলো…আমি মালেককে বলে দিয়েছি আগামীকাল স্টুডিও খালি নাই। রেকর্ডিং হবে পরশু, সে খবর দেয় নাই?

–মালেক আজ আসে নাই। হরতালের জন্যই আসতে পারে নাই।

–তুমি কী করছিলে মঞ্জু? তোমাকে ডিসটার্ব করলাম?

–গান তুলছিলাম।

–একটু শোনাও না! তোমার বাসায় তো কখনো আসতে বলো না, টেলিফোনেই শোনাও, কানের ভিতর দিয়া একেবারে মরমে পশে যাবে।

আর দু’ চারটি কথা বলে মঞ্জু ফোন রেখে দিল। কামাল রঙ্গ-রসিকতার মুডে ছিল, কিন্তু মঞ্জু তাকে প্রশ্রয় দেয়নি।

একথা ঠিক, সিনেমা-গানবাজনার জগতের কোনো মানুষকে মঞ্জু তার বাড়িতে আসতে দেয় না। টি ভি স্টেশনে কিংবা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গেলেও সে বিশেষ কথাবার্তা বলে না কারুর সঙ্গে। অহংকারী, বদমেজাজী গায়িকা হিসেবে তার দুনাম আছে, তার কোনো বন্ধু নেই। একমাত্র কামাল ছাড়া আর কেউ তার সঙ্গে হালকা সুরে কথা বলার সাহসই পায় না।

ফোনটা রেখে দেবার পর মঞ্জু অন্যমনস্ক ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। একটা হালকা নীল রঙের টাঙাইল শাড়ী পরেছে সে, তার শরীরে এখনও বয়েসের ছাপ পড়েনি। সারাদিনে সে এত কম খাবার খায় যে মেদ জমার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মনিরা জোর করে প্রতিদিন তাকে কিছু খাওয়াবার জন্য হন্যে হয়ে যায়। তবে তার চুলে সামান্য পাক ধরেছে, তাও বোঝা যায় না, মনিরা মেহেদি মেখে দেয়।

মঞ্জু অস্ফুট স্বরে বললো, আজ হরতাল, সুখু কোথায় রে মনিরা!

মনিরা বললো, কী জানি, ঘরেই আছে বোধ হয়। নাস্তা খেয়েছে একটু আগে।

মঞ্জু বললো, দ্যাখ তো, দেখে আয় তো!

সুখু থাকে তিন তলার ঘরে, সেখান থেকে তো কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। অন্যদিন এই সময় তার ঘরে জগঝম্প শব্দ শোনা যায়। খুব জোরে রেকর্ড চালায় সুখু, মাইকেল জ্যাকস, রোলিং স্টোন, পুলিশ এইসব তার পছন্দ। সে বাংলা গান ভালোবাসে না, মায়ের গান নিয়ে কোনোদিন উচ্চবাচ্য করে না। সুখু এক একদিন এমন রেকর্ড বাজায় যে মঞ্জুর গলা সাধার খুব অসুবিধে হয়, তবু ছেলেকে থামতে বলা যাবে না।

মনিরা ডাকবার আগেই ওপর থেকে দুমদুম করে নেমে এলো সুখু। সুন্দর স্বাস্থ্য হয়েছে তার, এর মধ্যেই যথেষ্ট লম্বা, চওড়া কাঁধ। একটা ফেডেড জিনসের ওপর গেঞ্জি পরে আছে, তার গালে নদীর পলিমাটিতে সদ্য গজানো তৃণের মতন দাড়ি।

এ ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে বললো, মা, গিভ মি ফাইভ হান্ড্রেড বাক্‌স!

মঞ্জু উদ্বেগের সঙ্গে বললো, তুই এখন কোথায় যাস?

সুখু হাত বাড়িয়ে বললো, টাকাটা দাও। ইউনিভার্সিটি যাবো।

মঞ্জু বললো, আজ না স্ট্রাইক? আজ কেন যাবি?

সুখু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, তোমরা এমন অদ্ভুত কথা বলো! স্ট্রাইকের জন্য সবাই বাড়িতে বসে থাকবে নাকি? তা হলে স্ট্রাইক হবে কী করে? মিছিল বেরোবে কাদের নিয়ে?

মঞ্জু এগিয়ে এসে বললো, না, না, তোকে যেতে হবে না, আবার একটা গণ্ডগোল হবে।

এসব অবান্তর কথা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে অস্থির ভাবে সুখু বললো, টাকাটা দাও! আমাকে এগারোটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে।

মঞ্জু বললো, সোমবার এক হাজার নিলি, সব খরচ হয়ে গেল এর মধ্যে? আজ বাড়িতে থাক, লক্ষ্মী সোনা…

সুখু সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে বললো, দেবে না? তবে থাক! আমি গ্যালাম!

মঞ্জু বললো, সুখু দাঁড়া, দাঁড়া, টাকা দেবো না বলিনি, আমার একটা কথা শোন–

সুখু আর গ্রাহ্য করলো না, দ্রুত নামতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে। মনিরা ছুটে গিয়ে তাকে ধরার চেষ্টা করলো, সুখু তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ গরম করে বললো, এই, ‘বি না আমারে!

জেদী ছেলে, সে ইদানীং মায়ের কথা শোনে না। সে একবার গোঁ ধরলে আর ফেরানো যায় না তাকে।

অন্য ঘর থেকে মালিহা বেগম এসে শঙ্কিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন, আইজ সব গাড়ি ঘোড়া বন্ধ, তার মইধ্যে পোলাড়া বাইরহিয়া গ্যালো? তুই আটকাইতে পারলি না?

মঞ্জু কোনো উত্তর না দিয়ে জানলার ধারে এসে দাঁড়ালো, তার চোখে অশ্রু এসে গেছে। এই বয়েসের ছেলে যদি অবাধ্য হয়ে পড়ে, তাহলে কী করে তার ওপরে জোর খাটানো যায়? খুব খরচের হাত হয়েছে ছেলেটার, যখন তখন টাকা চায়, কিন্তু এত টাকা কি ওর হাতে দেওয়া। ভাল? না দিলে আরও অভিমান করে।

গ্যারাজ থেকে মোটর বাইকটা বার করে স্টার্ট দিয়েছে সুখু। তার ওপর বসেই বলশালী শব্দ তুলে তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল, যেন এক তেজী ঘোড়সওয়ার।

মা এসে দাঁড়ালেন মঞ্জুর পাশে। দু’জনেরই মনের মধ্যে একই কথা, কিন্তু তার ভাষা নেই।

মাঝে মাঝেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বোমা ফাটে, গোলাগুলি চলে। পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ হয়, আবার ছাত্রদের বিভিন্ন দলের মধ্যেও লড়াই লাগে। জামাতে ইসলামী দল আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তাদের ছাত্র সংগঠন বেশ জোরালো। ছাত্র লিগের সঙ্গে তাদের প্রায়ই সংঘর্ষ হয়। সেই একাত্তর সালের আগেরই মতন, দিনের শেষে ঘরের ছেলেরা ঠিকঠাক ঘরে না। ফেরা পর্যন্ত দারুণ দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। হায় আল্লা, এই দুশ্চিন্তার কি নিষ্কৃতি নেই?

সুখু মাঝে মাঝে রাত্তিরেও বাড়িতে ফেরে না। বলে তো যে বন্ধুদের কাছে থাকে। কী করে বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে? বোমা বানায় নাকি? মনিরা বলেছিল, একদিন সে সুখুর ঘরে ছোট একটা বন্দুক দেখেছিল। সুখু অবশ্য তা প্রবলভাবে অস্বীকার করেছে। মনিরাকে সে দারুণ বকুনি দিয়েছিল মিথ্যে কথা বলার জন্য। কিন্তু মঞ্জুর মন থেকে সন্দেহ যায় নি। মনিরা অকারণে এমন মিথ্যে কথা বলবে কেন? খবরের কাগজেও তো লেখে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হাতেও মাঝে মাঝে বন্দুক-রিভলবার দেখা যায়, তাই নিয়ে তারা পুলিশের মুখোমুখি রুখে দাঁড়ায়। ছাত্ররা যে বোমা ছোঁড়ে, এত বোমা তারা পায় কোথা থেকে?

এই ছেলেই মঞ্জুর জীবনের একমাত্র অবলম্বন, কিন্তু ছেলে এখন মায়ের জন্য সময় দিতে পারে না। মায়ের কাছে এসে দু’দণ্ড বসে না, মা কোথায় গান গাইতে যাচ্ছে কিংবা মায়ের নতুন কী গানের রেকর্ড বেরুলো, সে সম্পর্কে ছেলের কোনো আগ্রহ নেই। মায়ের সঙ্গে যেন শুধু টাকা পয়সার সম্পর্ক।

মঞ্জুর ব্যক্তিগত খরচ প্রায় কিছুই নেই। সাজপোশাকের বাহুল্য নেই, তার মতন আর কোনো নামকরা গায়িকা এমন সাধারণ সাজে মঞ্চে ওঠে না। মঞ্জুর উপার্জন যথেষ্ট ভালো, ফিলমের প্লেব্যাক সিংগার হিসেবে সে এখন এক নম্বর। জনপ্রিয় গায়িকা সেলিমার সবকটি গান তাকেই গাইতে হয়। কামাল হোসেনের হিট ছবিগুলিতে সেলিমা আর বিলকিস বানুর যুগলবন্দী থাকবেই।

মঞ্জুর এই সব উপার্জনই তো তার ছেলের জন্য। সেই সব পাবে। কিন্তু এত কম বয়েসে তার হাতে বেশি টাকা দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত?

কলকাতা থেকে পলাশ ভাদুড়ী মাঝে মাঝে ঢাকায় আসে গানের অনুষ্ঠান করতে। পলাশ আজও বিয়ে করেনি। কিন্তু মঞ্জু তাঁকেও বিশেষ প্রশ্রয় দেয় না, বাড়িতে আসতে বলে না। জীবন সম্পর্কে সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। কলকাতায় অনেকগুলি গানের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়েও প্রত্যাখ্যান করেছে সে।

দূরে কোথাও পর পর দুটো বোমার বিকট শব্দ হলো।

জানলার ধারে দাঁড়ানো তিনটি রমণী বিবর্ণ মুখে তাকালো পরস্পরের দিকে। তারা অসহায়। স্নেহের বন্ধনে আটকাতে না পারলে একটি উনিশ বছরের স্বাস্থ্যবান যুবককে আটকাবার আর কোনো উপায় নেই।

সারা দুপুর বিকেল ধরেই এরকম শব্দ শোনা যেতে লাগলো, আজ আবার বোধ হয় বড় রকমের একটা হাঙ্গামা লেগেছে। শহরের কোথায় কী ঘটছে, তা ওরা ঘরে বসে জানবে কী করে? বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই এখন বেশি রকম গোলমাল হয়। পুলিশ মিলিটারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢুকতে সাহস পায় না।

মঞ্জু একটা ট্রানজিস্টার রেডিও নিয়ে খবর শোনবার চেষ্টা করলো। ঠিক একাত্তর সালের আগের মতনই চলছে, সত্যি কথা বলে না রেডিওতে। খবরে শোনালো যে ছাত্রদের ডাকা হরতাল ব্যর্থ হয়েছে, যানবাহন সব ঠিকঠাক চলছে। ঢাকা শহর শান্তিপূর্ণ। অথচ ওরা পথে একটাও গাড়ি দেখেনি সারাদিন, দূরের বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ বুঝি শান্তির জয়ধ্বনি!

রেডিও থেকে আরও ঘোষণা করলো, রাত ন’টা থেকে কারফিউ! এটাও শান্তির চিহ্ন!

মনিরার মনে পড়ছে, একাত্তর সালের আগে সে ঠিক এই রকম উদ্বেগ নিয়ে বসে থাকতো সিরাজুলের জন্য। শেষের দিকে তো সিরাজুল সর্বক্ষণের জন্যই মেতে উঠেছিল। কিন্তু বাড়িতে ফিরতে না পারলেও সিরাজুল কোনোক্রমে একটা খবর পাঠাতো মনিরাকে। সুখু কি একটা খবরও দিতে পারে না? ফোন করতে পারে না? একবার সে স্নেহের বন্ধন ছিঁড়েছে, মায়ের দুঃখ আর বোঝে না সে! বরং মায়ের ওপর সব সময় যেন তার একটা রাগ রাগ ভাব।

মনিরা অনেক চেষ্টা করেও মঞ্জুকে কিছুই খাওয়াতে পারলো না আজ। রাত ন’টা বেজে যাবার পর সে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে।

একবার মনিরা জিজ্ঞেস করলো, সাহেবরে একটা ফোন করবেন?

মঞ্জু কোনো উত্তর দিল না।

মনিরা আবার জিজ্ঞেস করলো, আমি তাইলে কামাল সাহেবেরে ফোন করি?

মঞ্জু এবারও উত্তর দিল না বটে, তবু মনিরা ফোনটা তুললো। সুখুর বাবাকে নিজে থেকে ফোন করার সাহস তার নেই, কিন্তু কামাল হোসেনের কাছে সে খবর নিতে পারে।

ভাগ্যবানের বউ মরে। এই প্রবাদটি কামাল হোসেনের জীবনে সার্থক হয়েছে। আগে হামিদার ভয়ে সে অন্য মেয়েদের সঙ্গে ভালো করে কথাই বলতে পারতো না। সামান্য অসুখে, ভুল চিকিৎসায় হামিদার মৃত্যু হয়েছে। পেনিসিলিন তার সহ্য হয় কিনা তা পরীক্ষা না করেই এক ডাক্তার তাকে ইঞ্জেকশান ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে অপঘাত। ইতিমধ্যে সেলিমার সঙ্গে তার স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তারপর সেলিমার সঙ্গে জুটি বাঁধতেই কামালের উন্নতি হতে লাগলো তরতর করে। রাজনীতির সঙ্গে কামালের সমস্ত সম্পর্ক ঘুচে গেছে, আগের আমলের বন্ধুদের সঙ্গেও বিশেষ সম্পর্ক নেই। এখন সে ফর্মুলা ফিলম বানায় আর বছরে একবার দুবার সস্ত্রীক বিশ্বভ্রমণ করে আসে।

কেউ কেউ একবার ছদ্মবেশ ধরলে আর তা খুলতে পারে না। মুখোসটাই আসল মুখ হয়ে। যায়।

মনিরা যখন ফোন করলো, তখন কামালের নিউ এস্কাটনের বাড়িতে বিশাল পার্টি চলছে। সব সময়েই একশ্রেণীর মানুষ থাকে, যাদের জন্য স্ট্রাইক, কারফিউ এসব কোনো বাধাই নয়। বাজার থেকে কখন নুন উধাও হয়ে যায়, চালের দাম কত বাড়লো সেসব খবর জানার দরকার নেই তাদের। যতই সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ হোক, স্কচ হুইস্কি তারা সব সময়েই পেয়ে যায়।

এর মধ্যেই কামালের পেটে তিন চার পেগ পড়েছে, সে জমিয়ে তিন চারজনের সঙ্গে গল্প করছিল, এর মধ্যে এসে তাকে টেলিফোন ধরতে হলো। সবাই জোরে জোরে কথা বলছে, প্রথম তিন চারবার সে নামটাই বুঝতে পারলো না। কে? কোথা থেকে? কী চাই? করতে করতে সে মনিরাকে চিনতে পেরে বিরক্তির সঙ্গে বললো, কী হইছে কী? কী চাস তুই?

এই সব পার্টিতে মঞ্জুকে দাওয়াত দিলে কখনো সে আসে না। এরকম সময়ে মঞ্জু কখনো টেলিফোন করে না। মনিরার ব্যাকুল স্বর শুনে প্রথমে কামাল ভাবলো ম বুঝি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তা হলেই মুশকিল! নতুন ছবি শুরু হতে যাচ্ছে, আগে গান রেকর্ডিং না হলে নায়িকার লিপ মেলে না।

মঞ্জুর ছেলে বাড়ি ফেরেনি শুনে কামাল ভুরু কোঁচকালো। আজ বেশ বড় রকমের একটা গণ্ডগোল হয়েছে, সে শুনেছে। দু তিনটি ছাত্র মারা গেছে। এরকম তো প্রায়ই হয়, নতুন কথা কী! পড়াশুনো তো সব গোল্লায় গেছে, ছাত্ররা এইসব নিয়েই মেতে আছে। আরে বাবা, দু চারটে বোমা ছুঁড়ে আর বাস পুড়িয়ে কি আর মিলিটারি রেজিমকে হঠানো যায়?

তবে, এইসব হাঙ্গামায় মফস্বলের ছেলেরাই মরে। শহরের ছেলেরা তুখোড় হয়, তারা পুলিশের রাইফেলের সামনে বুক পেতে দেয় না, তারা গ্রামের ছেলেগুলোকে সামনে এগিয়ে দেয়। এই যে মাঝে মাঝেই দুটো-চারটে ছাত্র প্রাণ দিচ্ছে, কই, চেনাশুনো কোনো বাড়ির ছেলে তো তাদের মধ্যে নেই। মঞ্জুর ছেলেই বা মরতে যাবে কেন?

সে মনিরাকে বোঝালো যে কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া এখন তো খোঁজখবর করার কোনো উপায় নেই। সুখু মিঞার ভালো নাম কী যেন? নজরুল ইসলাম, না, ঐ নামে কোনো ছাত্রের কোনো বিপদ হয়নি, পুলিশের একজন বড় কতা এখানেই রয়েছেন, তিনি বললেন। চিন্তার কিছু নেই। সুখু মিঞা ঠিক ফিরে আসবে।

ফোন রাখার আগে কামাল কৌতুক করে বললো, এই মনিরা তোর মালকানীরে বল এবার। একটা শাদী করতে! বাড়িতে একটা জবরদস্ত পুরুষ মানুষ না থাকলে কী চলে! তুই নিজেও তো আর করলি না, পাত্তর দেখুম নাকি?

সারা রাত প্রায় বিনিদ্র ভাবেই কাটলো। এক একবার একটা গাড়ির শব্দ হতেই মনিরা আর মঞ্জু জানলার ধারে ছুটে যায়। সেগুলো পুলিশের গাড়ি। এর আগে কারফিউয়ের মধ্যেই সুখু দু একবার বাড়ি ফিরেছে। অনেক ছাত্রই কারফিউ মানে না।

সকাল ন’টার মধ্যেও সুখু ফিরে এলো না দেখে মঞ্জুর মনে হলো, কাল সে টাকা দিতে চায়নি বলেই তার ছেলে রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে। ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাত্র-পুলিশ মারামারির বিস্তৃত বিবরণ ও ছবি বেরিয়েছে, সুখুর নাম কোথাও নেই।

একটা বিমর্ষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মঞ্জু বললো, মনিরা, তুই একবার ধানমণ্ডির বাসায় যা! খবর দিয়া আয়।

মনিরা মুখ কুঁচকে বললো, মালেক আসুক। মালেকই তো খবর দিতে পারে। মঞ্জু বললো, মালেক গ্যালে হবে না, তুই যা! আগে দ্যাখ, রিকশা চলে কিনা!

গতকালের কোনো চিহ্ন আজকের রাস্তায় নেই। দোকানপাট সব খোলা, এর মধ্যেই সাইকেল রিকশায় পথ একেবারে ছয়লাপ হয়ে গেছে, লোকেরা অফিস-কাঁচারির দিকে দৌড়োচ্ছে। মাঝে মাঝে আন্দোলন হয়, পুলিশ-মিলিটারি গুলি চালায়, কিছু মানুষ মরে, অন্যদের তা গা সহা হয়ে গেছে। পাকিস্তানী আমলে যেমন চলতো, বাংলাদেশী আমলেও তার খুব একটা হেরফের হয়নি।

একটা রিকশা নিয়ে মনিরা এলো ধানমণ্ডির বাড়িতে। তার মুখখানা ব্যাজার হয়ে আছে, শুধু সুখুর জন্য দুশ্চিন্তাতেই নয়, এ বাড়িতে আসতে তার একেবারেই ইচ্ছে করে না।

এতগুলি বছরে এই বাড়িতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগের তুলনায় বাড়িটা অনেকখানি বেড়েছে, দুদিকে নতুন কনস্ট্রাকশান হয়েছে, তার অনেকখানিই আলতাফের দখলে। হোটেলওয়ালা হোসেন সাহেব বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর চুটিয়ে ব্যবসা করতে গিয়েও পারেন। নি, অকস্মাৎ হার্ট অ্যাটাকে তাঁকে দুনিয়ার মায়া কাটাতে হয়। তাঁর ছেলে ও জামাইরা সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলতাফকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং অমন চালু ব্যবসাটিকেও লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে একেবারে আলতাফের এখন নিজস্ব কারবার। এ বাড়িতেই সে গারমেন্ট ফ্যাকটরি বসিয়েছে, বিদেশ থেকে সুতো আসে, ডিজাইন আসে, এ দেশের শস্তা মজুরিতে জামা-প্যান্ট সেলাই হয়, সেগুলো আবার বিদেশের বাজারে চলে যায়। তা ছাড়া সে মানুষও চালান দেয়। তেলের টাকায় ধনী আরব দেশগুলিতে শ্রমিক-মজুরের খুব চাহিদা। যে দেশে সবাই প্রায় বড়লোক, সে সব দেশে রাস্তা ঝাঁট দেওয়া, বাথরুম সাফ করার লোক পাওয়া যাবে কী করে, গরিব দেশ থেকেই সেইসব কাজের লোক আমদানি করতে হবে।

বাড়ির পুরোনো অংশটায় থাকে বাবুল চৌধুরী।

সদর দরজা খোলা, ভেতরে এসে মনিরা সিঁড়িটার মুখে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। সে একদিন গ্রাম থেকে সিরাজুলের সঙ্গে এসে ঐ পাশের ঘরখানায় উঠেছিল। কতরকম আবর্জনায় ভরা ছিল ঘর, সব কিছু পরিষ্কার করে সে সাজিয়েছিল নিজের সংসার। ঐদিকে ছিল রান্নাঘর। সব ভেঙে গেছে, ঘরখানা আবার গুদাম হয়েছে। ঠিক এইখানে তার চুলের মুঠি ধরে টেনেছিল খান সেনারা, আর ঐ সিঁড়ির মাঝখানে বাবুল চৌধুরী গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

মনিরা পরে শুনেছে যে কে খোঁজার জন্যই বাবুল চৌধুরী গিয়েছিলেন একেবারে বাঘের মুখে, খান সেনাদের ডেরায়; তাকে না পেয়ে উনি নিজের হাতে কত পাকিস্তানী সৈন্য মেরেছেন। সে একটা সামান্য মেয়ে, তার জীবনের কীই বা দাম আছে, তার জন্য অতবড় একটা বিদ্বান মানুষ লড়াই করতে নেমেছিলেন!

সেই বাবুল চৌধুরী এখন মনিরার সঙ্গে ভাল করে কথাই বলতে চায় না। দেখলে বিরক্ত হয়। মানুষের জীবন এমন অদ্ভুত কেন?

সেফু নামের সেই মেয়েটি এখনো এ বাড়িতে কাজ করে। বাবুল চৌধুরী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একটি অল্প বয়েসী অনাথ ছেলেকে কুড়িয়ে এনেছিল, কয়েক বছর পর তার সঙ্গেই সেফুর বিয়ে দেওয়া হয়েছে, ওরা দু’জনে ছাদের ঘরে থাকে।

সেফুর সঙ্গেই মনিরার প্রথম দেখা হলো। আগে ছিল নেংটি ইঁদুরের মতন চেহারা, এখন দিব্যি মোটাসোটা হয়েছে সেফু। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ মনিরার চোখে জল এসে গেল। এই বাড়িতে কেটেছে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দুটি বছর। কিসের জন্য প্রাণ দিল সিরাজুল? তার বদলে কী পাওয়া গেল?

দোতলায় উঠতেই লায়লা জিজ্ঞেস করলো, সেফু, কে আসছে রে?

মনিরা কাঁচুমাচু মুখে বললো, ভাবী আমি মনিরা।

এক সময় যেটা ছিল মঞ্জুর শয়নকক্ষ, সেখান থেকে বেরিয়ে এলো লায়লা। বেশ দীর্ঘকায়া তরুণী, গায়ের রং একেবারে যেন দুধে-আলতায় মেশানো, তবু মুখখানা খানিকটা রুক্ষ ধরনের।

মনিরার চোখে অশ্রুর ঝালর, সে ঐ দরজার সামনে লায়লার বদলে যেন মঞ্জুকেই দেখছে। সেই তার আগেকার মঞ্জু ভাবী, সরল উচ্ছল, সুন্দর। এইটাই তো মঞ্জু ভাবীর নিজস্ব জায়গা।

যুদ্ধ থেকে সাংঘাতিক আহত হয়ে ফিরেছিল বাবুল, আবার তাকে ভর্তি হতে হয়েছিল নার্সিং হোমে। মঞ্জু-হেনা-মামুনরা কলকাতা থেকে ফিরেছিল দশ দিন পর। মামুন আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে তাঁর চিকিৎসার জন্য ফিরতে দেরি হলো, মঞ্জু এসেই ছুটেছিল নার্সিং হোমে। কেন তাদের ফিরতে দেরি হলো, সে কারণটা আর বলা হয়নি ভাল করে, বাবুলও মন দিয়ে শুনতে চায়নি, তার তীব্র অভিমান হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।

কলকাতায় বা ভারতে যারা আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের সম্পর্কে বাবুলের মনোভাব ভাল ছিল না। বাবুলের মতে তারা সুবিধাবাদী। বড় বড় নেতারাও ভারতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আরাম উপভোগ করেছে, মুক্তি যোদ্ধাদের তুলনায় কী আত্মত্যাগ করেছেন তাঁরা? স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে দু একটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাহায্য নিতে হয় ঠিকই। কিন্তু বড় বড় নেতাদের কি মাঝে মাঝে রণপ্রাঙ্গণে এসে সাধারণ সৈনিকদের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল না? বাংলাদেশ বাহিনীর সেনাপতি কর্নেল ওসমানী চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিনগুলিতেও কোনো একটা ফৌজের সঙ্গে পাকিস্তানী ব্যহ ভেদ করতে পারলেন না। আত্মসমর্পণের সময়েও তিনি কলকাতায় বসে রইলেন? নিজের প্রাণের মূল্যটাই তাঁর কাছে বেশি!

মঞ্জু কলকাতার প্রবাস কাহিনী শুরু করলেই বাবুল অন্যমনস্ক হয়ে যেত কিংবা কাজের ছুতোয় উঠে পড়তো। কলকাতার গল্প সম্পর্কে তার কোনো আগ্রহ নেই। ছেলেমানুষী স্বভাবে মঞ্জুও কলকাতায় তাদের দিনগুলির কথা যতটা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললে, ততটা উৎসাহ সে দেখায়নি এই সুদীর্ঘ ন’ মাস ধরে বাবুলদের যে কী নিদারুণ অবস্থা গেছে তা শোনার জন্য।

শরীরে দুটি বুলেটের ক্ষত সারতে বাবুলের সময় লেগেছিল প্রায় তিন মাস। সেই সময়টায় সে খুব খিটখিটে আর বদমেজাজী হয়েছিল, পুরোপুরি সুস্থ হবার পরেও তার স্বভাবটা বদলালো না। শারীরিক কষ্টের জন্য তার মানসিক কষ্ট হচ্ছিল বেশি। স্বাধীনতা এলো বটে, কিন্তু দেশটা চলেছে কোন্ দিকে? শেখ মুজিব ফিরে এলেন, একচ্ছত্র ক্ষমতা পেলেন তিনি সরকার পরিচালনার, কিন্তু নতুন রাষ্ট্রটির কোনো শক্ত বেদীমূল প্রতিষ্ঠিত হলো না।

কিছু লোক স্বাধীনতার নামে শহরে লাফালাফি করছে, অন্যদিকে গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিসহ হয়ে উঠছে। মুনাফাবাজ ও কালোবাজারিরা নুন, তেল, চালের মতন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ে ফাটকা খেলছে, ব্যাঙ্ক লুঠের টাকায় একশ্রেণীর লোক রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, বিদেশ থেকে সাহায্য হিসেবে যেসব খাদ্য, কম্বল ওষুধ আসছে, তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একদল ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, সেসব চোরাচালান হয়ে যাচ্ছে ভারতে।

শেখ মুজিব এসব কঠোর হস্তে দমন করার বদলে উদার ভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। সবাইকে। তিনি নিজের জীবন ফিরে পেয়েছেন এবং সত্যিই স্বাধীনতা এসেছে, এতে তিনি এমনই অভিভূত যে এখন আর তিনি কোনো কটু কথা বলতে চান না। যারা তাঁর পার্টির প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে এই দুর্দিনে তাদের শাস্তি দেবার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা নরহত্যার রক্তে হাত রাঙিয়েছিল তাদেরও তিনি ক্ষমা করে যেতে লাগলেন। তাঁর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, চাটুকারদের মধ্যে অনেকে এই সুযোগে লাগাম ছাড়া হয়ে গেল।

সুস্থ হয়ে ওঠার পর বাবুল আবার ফিরে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনায়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সে কোনো কৃতিত্ব নিতে চায়নি। যখন অনেককে বীর উত্তম, বীর প্রতীক, বীর শ্রেষ্ঠ, বীর বিক্রম–এইসব সম্মানজনক খেতাব দেওয়া হতে লাগলো, তখন বাবুল চৌধুরীর নামও কে যেন প্রস্তাব করেছিল শেখ মুজিবের কাছে। অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেউই তার মতন এমন অস্ত্র নিয়ে পুরোপুরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি, কিন্তু বাবুল আগেই চিঠি লিখে সেই খেতাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। কেউ ঐ প্রসঙ্গ তুললেই সে হেসে বলতো, আরে না, না, ওসব গুজব! লোকে গল্প বানাতে ভালোবাসে। আমি ফ্রিডম ফাইটারদের ক্যাম্পে রান্নাবান্না করে দিতাম, কোনদিন এল এম জি হাতে নিয়েই দেখিনি!

বাহাত্তর সালে মাসের পর মাস বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জের অত্যাচার কাহিনী ছাপা হতো, যা আগে কিছুই জানা যায়নি। যারা পাক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, বাঙালী হয়েও যারা বহু বাঙালীকে হত্যা করেছে, তাদের পরিচয়ও প্রকাশিত হয়ে পড়ছিল। বাবুল সংবাদপত্রের সেইসব অংশ কেটে কেটে রাখতে, মঞ্জুকে সে বলতো দ্যাখো, প্রথম তিন মাস আমিও তো মুক্তিযুদ্ধ সাপোর্ট করি নাই, আমার মনে হতো, এসব আওয়ামী লিগের স্বেচ্ছাচারিতা, এমনভাবে পাকিস্তান ভাঙা যুক্তিসঙ্গত না। আমাকে অনেকে কোলাবরেটার বলতো, কিন্তু আমি শান্তিবাহিনীতে যোগ দিই নাই, মানুষ মারা সাপোর্ট করি নাই, প্রথম যেদিন নিজের চক্ষে দ্যাখলাম ব্রুট ফোর্স কোনো যুক্তির ধার ধারে না, সেইদিনই ঠিক করেছিলাম, যে-কোনো উপায়ে এদের রেজিস্ট করতেই হবে! যে-কোনো থিয়োরির চেয়ে মানুষের জীবন বেশি মূল্যবান। আমার চোখের সামনে যদি কেউ কোনো নিরীহ মানুষের বাড়িতে আগুন লাগায়, তা হলে সেই আগুন নিবানো আর যে ঐ আগুন লাগিয়েছে তাকে শাস্তি দেওয়াই আমার প্রধান কর্তব্য। ক্লাস স্ট্রাগল কবে হবে, তখন এই সব সমস্যা মিটে যাবে। তার জন্য বসে থাকা যায় না। সেটা কাপুরুষতা। সেই জন্যই আমি যুদ্ধে গেছি। কিন্তু যারা নয় মাস ধরে অত্যাচার করেছে, খুন আর লুটপাটে অংশ নিয়েছে, রাও ফরমান আলীর হাতে বুদ্ধিজীবীদের খতম করার তালিকা তুলে দিয়েছে, তাদের কোনো শাস্তি হবে না? তারা নিশ্চিন্তে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে? শেখ মুজিব তা হলে দেশ চালাবেন কী করে? ঐ সব পাষণ্ডগুলাই আবার সব ক্ষমতা দখল করে বসবে।

একদিন বাবুল মঞ্জুকে রান্নাঘর থেকে ডেকে এনে জানলার ধারে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, মঞ্জু, ঐ লোকটাকে দ্যাখো, দ্যাখো। ঐ যে লুঙ্গি আর সিল্কের কুর্ত পরে হেঁটে আসছে। ঐ লোকটা লাইব্রেরি সায়েন্সের একজন অধ্যাপক। আর ঐ দ্যাখো, মনিরা ওর পাশ দিয়ে হেঁটে আসছে। এটা একটা অদ্ভুত দৃশ্য।

মঞ্জু সেই দৃশ্যটার তাৎপর্য বুঝতে পারেনি। সাধারণ একটা সকাল। পথ দিয়ে অনেক মানুষ আসছে, যাচ্ছে। তার মধ্যে সিল্কের কুতা পরে হাঁটছে একজন, মনিরা বাজার করে ফিরছে বিপরীত দিক দিয়ে, কেউ কারুকে চেনে বলে মনে হয় না। এর মধ্যে অস্বাভাবিক কী আছে?

মঞ্জুর বিস্মিত দৃষ্টি দেখে বাবুল উত্তেজিতভাবে বলেছিল, মনিরাকে অন্তত পাঁচজন খান সেনা অত্যাচার করেছে। দুইবার প্রেগনেন্সির পর মিসক্যারেজ হয়েছে, মাথাটাও খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তবু যে বেঁচে আছে, আবার প্রায় নমল হয়েছে, সেটা শুধু ওর ভাইটালিটির জোরে। আর ঐ মানুষটা…

মঞ্জু ভয় পেয়ে বলেছিল, ঐ মানুষটাও কি মনিরাকে…

বাবলু উত্তর দিয়েছিল, না, ঐ মানুষটা বোধ হয় মনিরাকে চেনে না। কিন্তু ঐ হারামজাদা গত বৎসর ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরির সামনে দাঁড়ায়ে কী বলেছিল জানো? ও চ্যাঁচায়ে। বলেছিল, পাকিস্তানী আর্মির লোকেরা বাঙালী মেয়েদের রেপ করতাছে, একথা কে কইলো? সব মিথ্যা প্রচার! যদি দুই-দশটা মেয়েরে ভাগ করে থাকে, তাতে কোনো পাপ নাই! ইসলাম রক্ষার জন্য ওরা জেহাদে নেমেছে, এখন এমন একটু-আধটু তো হবেই। এইসব ভোগ ‘মুতা’ বিবাহ বলে ধরে নিতে হবে। সেদিন এই কথা শুনে আমি ঐ লোকটাকে মারতে গেছিলাম, অন্যরা আমাকে ধরে আটকালো। এখন, এই স্বাধীন বাংলাদেশেও ঐ লোক বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়াবে! মঞ্জু, আমার ইচ্ছা হচ্ছে, এখনই ওকে গিয়ে খুন করি।

মঞ্জু তার স্বামীর হাত চেপে ধরে ব্যাকুলভাবে বলেছিল, না, না, তুমি ঐ সব কথা আর মনে। স্থান দিও না। খুন-জখমের কি শেষ নাই? হায় আল্লা…

সেইসব দিনগুলিতে বাবুল মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। সব সময় গুম হয়ে থাকতো। দেশের অবস্থা যে দিন দিন খারাপ দিকে যাচ্ছে, এ দায়িত্বও যেন তার। বন্ধু বান্ধবদের থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যারা চাকরি করতো, তারা অনেকেই ব্যবসা শুরু করে সহজে টাকা বানাবার নেশায় মেতে উঠেছিল। মাঝে মাঝে বাবুল এমন বিলাপ করতো যে ভয় হতো, যে-কোনো মুহূর্তে সে হয়তো তার মস্তিষ্কের ভারসাম্য হারাবে। মঞ্জু প্রাণপণে সেবা করতো। তার স্বামীকে। এক এক সময় বাবুল সংযত হতো তার সন্তান সুখুকে কোলে নিয়ে। সুখুর নরম রেশমের মতন চুলে হাত বুলাতে বুলোতে সে বলতো, তুই যখন বড় হবি, তখন এই দেশ, এই পৃথিবীটারে কেমন দেখবি রে?

কলকাতা থেকে ফেরার সাত মাস পরে মঞ্জু আবার গর্ভবতী হয়েছিল, তারপরেই এলো বিপর্যয়। বাবুল এই ঘটনাটা কিছুতেই সহজভাবে নিতে পারলো না। মঞ্জুর গর্ভে এসেছে তার নিজের সন্তান, তবু বাবুল ঝোঁকের মাথায় উচ্চারণ করে ফেললো একটা কঠিন খারাপ কথা। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, মনিরাকে ধর্ষণ করেছিল পাঁচজন খান সেনা। তুমিও ধর্ষিতা না কি? এতদিন বলা নাই তো! তোমারে কে ধর্ষণ করলো, তোমার মামুনমামা?

মামুন তখন কামারুজ্জামানের অনুরোধে রিলিফ ডিপার্টমেন্টের ভার নিয়েছেন। দুর্নীতি সামলাতে সামলাতে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছেন। বাবুল কোনোদিনই মামুনকে পছন্দ করতে পারেনি, রিলিফের নানা কেলেংকারির সমস্ত দায়িত্বই মামুনের ওপর চাপিয়ে সে তখন মামুনকে রীতিমতন ঘৃণা করতে শুরু করেছিল, সেই ঘৃণা থেকেই সে এমন কথা বললো?

একবার বলে ফেলেও সে কথাটা ফেরত নিল না। আরও দু তিনবার সে বলতে লাগলো। যে মঞ্জুকে নিয়ে ফুর্তি করার জন্যই তো মামুন তাকে নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন। কলকাতা-ফেরত অনেক লোকই বলেছে যে মামুন মঞ্জুকে নিয়ে থাকতেন এক ঘরে। হোসেন সাহেব নিজের চোখে দেখে এসেছে।

স্বামীর প্রতি যতই ভক্তি থাক, এই ধরনের কথা শুনে মঞ্জু গভীর বিতৃষ্ণার সঙ্গে বাবুলের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ছিঃ! তুমি এত ছোট!

তারপর চললো জেদাজেদির পালা। মঞ্জু একবস্ত্রে ধানমণ্ডির বাড়ি ছেড়ে চলে গেল তার মায়ের কাছে। অবাঞ্ছিত বলেই হয়তো তার গর্ভের সন্তানটি পৃথিবীর আলোহাওয়ায় নিশ্বাস ফেললো না। তবু বাবুল আর ফিরিয়ে নিতে চাইলো না মঞ্জুকে। কাজীর অফিস থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিস এলো। বিনা প্রতিবাদে সেই বিচ্ছেদ মেনে নিল মঞ্জু। অবিলম্বে, ঝোঁকের মাথায় বাবুল বিয়ে করলো তার এক ছাত্রী লায়লাকে।

বাবুলের মা বাবা কেউ তখন নেই। আলতাফের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো না, বাবুল তার বড় ভাইটিকে অশ্রদ্ধা করে। একমাত্র জাহানারা ইমামের বাড়িতেই সে মাঝে মাঝে যেত, সেই পুত্র শোকাতুরা রমণীর কাছে গিয়ে সে চুপ করে বসে থাকতো। জাহানারা ইমামও মঞ্জুর পক্ষ নিয়ে বাবুলকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বাবুল যেন তখন সত্যিই উন্মত্ত। সে কারুর কথা শোনেনি।

মনিরাও সেই সময় এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল মঞ্জুর সঙ্গে। বাবুল চৌধুরীর সঙ্গে ছিল তার কৃতজ্ঞতার সম্পর্ক, কিন্তু সে ভালোবাসতো মঞ্জুকে। কৃতজ্ঞতার চেয়ে ভালোবাসার জোর অনেক বেশি। মামুন সাহেবের মতন এক বৃদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে মঞ্জুর নামে ঐ অপবাদ সে একেবারে সহ্য করতে পারেনি। পুরুষ মানুষগুলো কী, কিছুই বোঝে না? সাত মাস স্বামী সহবাসের পর যে গর্ভ লক্ষণ, তার জন্য হুট করে কি পরপুরুষের নামে দোষ দেওয়া যায়? কোনো স্ত্রীলোক যদি সত্যিই সেরকম কিছু চায়, তা হলে তার জন্য তাকে কলকাতা কিংবা বিলেত-অ্যামেরিকা যেতে হবে কেন?

বাবুল আবার বিবাহ করেছে, আর মঞ্জু এতগুলি বছরের মধ্যে আর কোনো পুরুষের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা করেনি। এটাই যেন তার প্রতিশোধ, মনিরা মঞ্জুর চরিত্রের এই দৃঢ়তাটাকেই শ্রদ্ধা করে। সে-ও আর কোনো পুরুষ মানুষের সান্নিধ্য চায় না। কোনো পুরুষের কাছাকাছি এলেই তার শরীর সিটিয়ে যায়।

বিশেষ কাজে মনিরাকে এ পর্যন্ত মোট তিনবার ধানমণ্ডির এই বাড়িতে আসতে হয়েছে। কোনোবারই লায়লাকে এড়িয়ে সে বাবুলের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি।

লায়লা তার চুলে একটা চিরুনি চালাতে চালাতে বললো, কেমন আছোস রে মনিরা? ঐ বাসার খবর সবর সব ভালো? কবে যেন তোর ভাবীর গান শোনলাম টি ভি-তে, ভালোই গান। করছেন। তবে আধুনিকের থিকা নজরুলগীতিই বেশি ভালো।

মনিরা জিজ্ঞেস করলো, সাহেব আছেন নি?

লায়লা বললো, হ, আছেন তো, দ্যাখ গিয়া, বই মুখে নিয়া বইস্যা আছে। কোনো খবর। আছে নাকি?

মনিরা বললো, জী, সাহেবরে একটা খবর দিতে আসছি।

লায়লা উদাসীন গলায় বললো, আমারে বুঝি বলা যায় না। সাহেব একা থাকতে ভালোবাসে। তুই হুট কইরা ঘরে ঢোকলে সাহেব পরে আমারে খুব বকবে।

মনিরা জানে যে লায়লা এরকম আলগা আলগা কথা বললেও তার কৌতূহল খুব বেশি। মনিরার মতন দূতীর মুখে সাধারণ কিছু শুনলেও সে মানতে চাইবে না। সে অনেক কিছু। জানতে চাইবে।

মনিরা বললো, সুখু মিঞা কাল রাইতে বাড়ি ফেরে নাই। তার মায়ের কষ্ট চোখে দেখোন যায় না। সাহেব যদি ছেলেটার একটু খবর ন্যান!

লায়লা বললো, সুখু? সে কবে যেন আসছিল এখানে? এই সেফু, সে গতকালই আসে নাই?

সেফু বললো, না, চাইর-পাঁচদিন আগে।

লায়লা বললো, সে তো কেবল আসে আর টাকা চায়। বাপের কাছে শুধু হাত পাততেই আসে। কী শিক্ষাই তারে দিতেছে তার মায়। ছেলে একেবারে গোল্লায় গেছে। সাহেবের শরীর। ভালো না, এখন বিরক্ত করিস না। আমি পরে কইয়া দিমু অ্যানে।

মনিরা বললো, কাইল ইনভারচিটিতে খুনাখুনী হইছে, তাইর মধ্যেই সুখু গেছিল।

হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো বাবুল চৌধুরী। অনেক শীর্ণ হয়ে গেছে তার চেহারা, চোখ দুটি কোটরে ঢাকা। মাথার চুলে সাদা ছোপ লেগেছে। লুঙ্গির ওপর গেঞ্জি পরা, কাঁধে তোয়ালে, এক হাতে বই। বাথরুমেও সে বই নিয়ে যায়।

মনিরার দিকে একবার তাকিয়েই সে মুখ ফিরিয়ে নিল। যেন সে তাকে চিনতেই পারেনি। স্ত্রীলোকদের কথাবার্তায় তার কোনো আগ্রহ নেই। সে গম্ভীরভাবে বললো, এই সেফু, গোছলখানায় গরম পানি দিছোস?

লায়লা তাড়াতাড়ি মনিরাকে সরিয়ে নেবার জন্য বললো, আয়, তুই এদিকে আয়, চা খাবি?

মনিরা তবু চেঁচিয়ে বললো, সাহেব, সুখু কাল রাতে বাসায় ফেরে নাই! দুপুরে ইনভারচিটি গেছিলো…

বাবুল থমকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী?

মনিরার কাছে সংক্ষেপে বৃত্তান্ত শুনতে শুনতে বদলে গেল তার মুখের বর্ণ। ভোয়ালে আর বই সে ছুঁড়ে ফেলে দিল। অত্যন্ত দ্রুত পোশাক বদলে নিয়ে, লায়লাকে কিছুই না বলে সে ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

৬৪.৪ হাজরা পার্কের কাছে

হাজরা পার্কের কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন প্রতাপ। তাঁর কিছুই করার নেই, কোথাও যাবার নেই।

রাস্তায় যে এত মানুষ, তাদের প্রত্যেকেরই নিশ্চয়ই কোনো গন্তব্য আছে, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়ার উদ্দেশ্য আছে কিছু একটা। গাড়িগুলো যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে, কেউ অন্যকে জায়গা ছাড়ে না, যে-যেমন খুশী ওভার-টেক করতে গিয়ে পথের মোড়ে জ্যাম তৈরি করে ফেলে, স্টার্ট বন্ধ না করে গজরায়, যেন বলতে চায়, আমার দেরি হয় হোক, কিন্তু তোমাকে কিছুতেই আগে যেতে দেবো না।

বিমানবিহারী এখন কৃষ্ণনগরে। গত কয়েকদিন ধরে আবহাওয়া বেশ মনোরম, কৃষ্ণনগরে ভালোই সময় কাটতে পারতো। বাড়ির ফোনটা খারাপ, কোনো একজন লোক দিয়ে বিমান একটা খবর পাঠালেই প্রতাপ চলে আসতেন। মামলার ব্যাপারে তিনি পরামর্শও দিতে পারতেন। অবশ্য মমতা যে এখানে নেই, তা বিমানবিহারী জানতেন না, মমতাকে একা রেখে প্রতাপ কৃষ্ণনগরে যেতে পারবেন না, এটাই বোধহয় বিমান ভেবেছেন।

প্রতাপকে একা রেখে মমতা তো দিব্যি হরিদ্বারে চলে যেতে পারে।

বুলি ঠিকই ধরেছিল, মমতা এমনি এমনি যায়নি, ঝগড়া করেই গেছে। দাম্পত্য কলহ প্রৌঢ় বয়েসে নাকি বেশ গাঢ় মধুর হয়। কাঠের জ্বালে খেজুর রসের মতন। কই, প্রতাপ তো সেই স্বাদটা পাচ্ছেন না। মমতা তাঁর অমতেই চলে গেল বলে তাঁর ঠোঁটে আজও একটা তেতো তেতো ভাব।

হরিদ্বার বেশ স্বাস্থ্যকর জায়গা। সেখানে একটি ওষুধের কারখানায় অনুনয় চীফ কেমিস্ট, বেশ বড় কোয়াটার পেয়েছে। মুন্নি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে, জামাইটিকে প্রতাপেরও বেশ পছন্দ হয়েছে। তাঁর জামাই কাজ ভালোবাসে, কাজের প্রতি একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ আছে, যা এ যুগে দুর্লভ। অনুনয় স্বল্পভাষী ও বিনীত হলেও তার মতামতের বেশ দৃঢ়তা আছে। মুন্নি প্রায়ই মা-বাবাকে হরিদ্বারে আসার জন্য চিঠি লেখে। সবাই ভাবে, রিটায়ার্ড লোকদের আবার যাবার অসুবিধে কী?

তাহলেও কি মেয়ে-জামাইয়ের কাছে ঘন ঘন যাওয়ার কোনো যুক্তি আছে? হরিদ্বারে থাকে বলেই ওদের বাড়িতে অতিথির অন্ত নেই। দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজন যারাই দিল্লি যায়, তারাই একবার হরিদ্বার ঘুরে আসতে চায়। বিনা পয়সায় ওরকম থাকা-খাওয়ার জায়গা পেলে সেই সুযোগে হরিদ্বার দর্শন করে আসতে কে না চাইবে? বাড়িতে ঘন ঘন অতিথি আসার যে কী বিড়ম্বনা, তা কি মমতা বোঝেন না? তবু তিনি এমনকি প্রতিবেশীদেরও ডেকে বলেন, দিল্লি যাচ্ছো? একবার হরিদ্বারে আমার মেয়ে জামাইয়ের ওখানে ঘুরে এসো, কোনো অসুবিধে নেই…

অদ্ভুত মমতার বিবেচনাবোধ, নিজের মেয়ের ঘাড়েই অতিথির বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন।

প্রতাপ একবারই গেছেন হরিদ্বারে। গতবছর। এমনিতে ঘিঞ্জি শহর, তীর্থস্থানের যাবতীয় ক্লেদ ও খারাপ চরিত্রের মানুষে ভরা, তবু ফাঁকার দিকে গেলে বড় সুন্দর, মসৃণ একটা শোভা আছে। পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন নগাধিরাজ হিমালয়, এই অনুভূতিই শিহরণ জাগায়।

সেবার হৃষীকেশ লছমনঝোলা পর্যন্ত শুধু যাওয়া হয়েছিল, কেদারবদ্রী যাবার পরিকল্পনাও হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নেমে গেল, সেবার একটু আগেই এসে পড়লো বর্ষা।

ফেরার পথেই ট্রেনেমমতা বলেছিলেন, এখন তো আমরা ঝাড়া হাত-পা, এবার থেকে আমরা প্রত্যেক বছরই একবার করে এদিকে আসবো। এদিকে কত বেড়াবার জায়গা! হর কী-প্যারী ঘাটটাই আমার এত ভালো লাগে!

প্রায় চল্লিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পরও মমতা এখনো তাঁর স্বামীর চরিত্র ঠিক বোঝেননি, তাঁর স্বামীর সূক্ষ্ম পছন্দ-অপছন্দের নিরিখ পান না! মমতার উচ্ছাস শুনেও প্রতাপ গম্ভীরভাবে চুপ করে ছিলেন! হরিদ্বারে অনেক কিছু ভালো লাগলেও আসলে বেশ খানিকটা অপমানিত বোধ করেছিলেন প্রতাপ।

অনুনয়ের বাবা গোরাচাঁদও এখন প্রতাপের মতন রিটায়ার্ড, তিনি বিপত্নীক এবং ছেলের কাছেই থাকেন। ইদানীং তিনি নিরামিষ খান, কোনো এক গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন, চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলেছেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক অন্যমনস্কতার ছাপ। হরিদ্বার তো তাঁর পক্ষে আদর্শ জায়গা হবেই, তাছাড়া একা একা তিনি আর অন্য কোথায়ই বা থাকবেন! এই তো নাতি-নাতনী নিয়ে আহ্লাদ করার সময়!

এই মানুষটিকে প্রতাপ কিছুতেই পছন্দ করে উঠতে পারলেন না!

এতখানি বয়েস হলেও প্রতাপ ঠাকুর-দেবতার কাছে মাথা নোয়ান না। কোনো বিখ্যাত ধর্মস্থানে গেলে তিনি মন্দিরের বাইরের দিকে ঘুরে ঘুরে দেয়ালের কারুকার্য কিংবা ভাস্কর্য দেখেন। মমতা যান ভেতরের বিগ্রহকে প্রণাম করতে। প্রতাপের তাতে আপত্তির কিছু নেই। ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি তাঁর মনে কিছুটা অবজ্ঞার ভাব থাকলেও বাইরে তা প্রকাশ করেন না। কখনো। তাঁর বন্ধু বিমানবিহারীই তো রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষা নিয়েছেন কিছুদিন আগে, প্রতাপ তা নিয়ে পরিহাস পর্যন্ত করেননি। কেউ যদি ওসবে আনন্দ কিংবা শান্তি পায় তো পাক। কিন্তু ধর্ম অবলম্বন করেও কারুর মন যদি অনুদার থাকে, মুখে যা বলে নিজের জীবনে সে রকম আচরণ না করে, তাহলে সেই সব মানুষকে তিনি প্রায় অস্পৃশ্য জ্ঞান করেন।

গোরাচাঁদের ঠিক অতটা দোষ নেই। হয়তো ওর মনের মাপটাই ছোট।

এ দেশে পুত্র সন্তান আর কন্যা সন্তানের তফাত যে কতদূর যেতে পারে, তা প্রতাপ যেন প্রথম বুঝলেন হরিদ্বারে গিয়ে। গোরাচাঁদ তাঁর ছেলের বাড়িতে থাকেন, সেটা তাঁর ন্যায্য অধিকার। আর প্রতাপ-মমতা মেয়ের কাছে গেলে তাঁরা হন অতিথি। মুন্নি লেখাপড়া শিখেছে, সে-ও হরিদ্বারে সরকারি ওয়েলফেয়ার বোর্ডে চাকরি পেয়েছে, তবু গোরাচাঁদ মনে করেন, এটা তাঁর ছেলের সংসার, তিনি এই পরিবারের কর্তা। প্রতাপ হলেন কুটুম্ব। গোরাচাঁদের ব্যবহারে সব সময় এটা টের পাওয়া যায়। যদিও তিনি যে সব সময় হামবড়া ভাব দেখান তা নয়, বরং অতিরিক্ত খাতিরই করেন, কিন্তু প্রতাপের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন একটু উঁচু থেকে। মমতা ঐ খাতিরটাই দেখতে পান, গোরাচাঁদের পায়ের তলার প্লাটফর্মটা তাঁর নজরে পড়ে না।

মমতাকে এসব কথা উল্লেখ করলেই তিনি প্রতাপকে বলবেন, তোমার সবতাতেই বাড়াবাড়ি!

এ বছর মম কেদার-বদ্রী যাবার পরিকল্পনা একেবারে ঠিকঠাক করে ফেলেছিলেন, প্রতাপ চাইছিলেন দক্ষিণ ভারতের দিকে যেতে, এমন সময় মুন্নির চিঠি এলো। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি তার দ্বিতীয় সন্তান প্রসব হবে।

চিঠিটা পড়ে বেশ উৎফুল্ল ভাবে প্রতাপ বলেছিলেন, বাঃ, তবে তো আর এখন হরিদ্বারে যাবার কোনো মানে হয় না। মুদি পাহাড়ে উঠতে পারবে না, কেদারবদ্রী ক্যানসেল! তাহলে বেঙ্গালোরের টিকিট কাটি? আমরা সাউথ ইন্ডিয়া ঘুরে আসি!

মমতা গভীরভাবে অবাক হয়েছিলেন। একই সংবাদের দু’রকম প্রতিক্রিয়া!

তিনি বলেছিলেন, তুমি বলছো কী? খুকীর বাচ্চা হবে, সেই সময় আমরা ওর কাছে না গিয়ে সাউথ ইন্ডিয়ায় ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াবো?

প্রতাপ বলেছিলেন, আমরা ওর কাছে গিয়ে কী করবো? বাড়িতে বেশি লোকজন থাকলে সামলাতে ওরই ঝামেলা হবে। ওখানে ভালো হাসপাতাল আছে, কোম্পানির নিজস্ব ডাক্তার আছে…

–তা বলে আমি মা হয়ে ওর কাছে থাকবো না সেই সময়? অনুনয়ের মা বেঁচে নেই, বাড়িতে সে রকম আর কেউ নেই দেখবার…

–তবে মুন্নিকেই এখানে আসতে লিখে দাও। আমাদের এখানে এসে দু’এক মাস থাকুক। বাড়ির কাছেই নতুন একটা নার্সিং হোম খুলেছে…

–ওরা কী করে আসবে? খুকী বেশিদিন ছুটি পাবে না, ওর নতুন চাকরি। ওর ছেলেটাও ওখানকার স্কুলে ভর্তি হয়েছে

–বেশিদিন না থাকতে পারে, অন্তত এক মাস থাকুক। তাতে আর এমন কি অসুবিধে

–তোমার কি আক্কেল বুদ্ধি কোনোদিন হবে না? অতদূর থেকে মেয়েটা আসবে, তারপর আঁতুরের বাচ্চা নিয়ে ট্রেনে করে ফিরবে এতখানি পথ? কেন, আমাদের হরিদ্বারে যেতে কী অসুবিধে? তোমার এখানে কী এমন রাজকার্য আছে?

আবার হরিদ্বার যেতে হবে, গোরাচাঁদের সঙ্গে ভদ্রতার সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দিনের পর দিন অবান্তর কথা বলে সময় কাটাতে হবে তাঁর সঙ্গে। প্রত্যেকদিনই মনে হবে, মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে বেশিদিন থাকা হয়ে যাচ্ছে না তো! গোরাচাঁদ যতদিন খুশী থাকতে পারেন, কারণ তিনি ছেলের বাপ। এই চিন্তাতে প্রপের মনে ক্ষোভ জমছিল। তিনি হঠাৎ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে উঠেছিলেন, ছেলে-মেয়েদের যাঁর যখন যেখানে বাচ্চা হবে, অমনি তোমাকে সেখানে ছুটে যেতে হবে? কেন, তুমি কি দাই নাকি?

তীব্র শ্লেষ ছিল এই উক্তিতে। পুরোনো সুপ্ত বেদনা ছিল।

মমতা আহত ভাবে একটুখানি চুপ করে ছিলেন। এককালের ফর্সা মুখখানাতে একটু কালো ছাপ পড়তে শুরু করেছে। মাথার চুল অবশ্য তেমন পাকেনি। বয়েসের মেদ জমেনি, শরীরটি এখনো ছিপছিপে, কিন্তু ভাঁজ পড়েছে নাকের দু’পাশে।

স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিটি শব্দে বিষ মাখিয়ে তিনি বলেছিলেন, জানি, সারা জীবনটাই তো দেখলাম, ছেলে-মেয়েদের প্রতি তোমার একটুও স্নেহ-মমতা নেই! তুমি স্বার্থপর! নিজের সুখ ছাড়া আর কিছু বোঝে না! তোমার এত অহংকার যে ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারেও তুমি অহংকারে মটমটিয়ে থাকতে চাও! তোমার জেদটাই সব সময় বড় হবে! তোমার জন্য আমার ছেলে-মেয়েদের আমি কিছুতেই ছাড়তে পারবো না! সারাজীবন যথেষ্ট ভুগেছি তোমার এই জেদের জন্য!

মমতা যথাস্থানেই তীব্র আঘাতটা হেনেছিলেন। প্রতাপ আর একটিও শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন না। তিনি স্বার্থপর? ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি কিছুই করেননি?

প্রতাপ আহত ভাবে মমতার দিকে তাকাতেই তিনি আবার তিক্ত গলায় বলেছিলেন, সেবারে বাবলুদের ওখানে গিয়ে তুমি কী কাণ্ড করলে মনে নেই?

চার বছর আগে ছেলের পেড়াপিরিতে প্রতাপ আর মমতা গিয়েছিলেন বিদেশে। প্রতাপের যাবার ইচ্ছে ছিল না, সদ্য তখন বাড়ি তৈরিতে হাত দিয়েছেন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের সব টাকা তাতেই প্রায় শেষ হয়ে যাবে। একতলায় দোকানঘর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতে হবে। কিন্তু অতীন বারবার চিঠি লিখছিল, হঠাৎ একদিন দুম করে দু’খানা টিকিট পাঠিয়ে দিল।

প্রতাপের বিদেশ ভ্রমণের শখ নেই, এতবড় ভারতবর্ষেরই তো কত জায়গা দেখা হয়নি। কিন্তু মমতার খুব ইচ্ছে প্যারিস-লন্ডন দেখার। আমেরিকার থেকেও ইউরোপ সম্পর্কে তার কৌতূহল বেশি, তার কারণ অ্যামেরিকান বইপত্রের চেয়েও ইওরোপিয়ান সাহিত্য মমতার। অনেক বেশি পড়া। মুন্নির বিয়ে হয়ে গেছে, সুতরাং টিকিট পাবার পরেও না যাবার কোনো যুক্তি দেখাতে পারেননি প্রতাপ।

প্রথমে গেলেন লন্ডনে! অ্যামেরিকায় যাওয়া আসার পথে ঐ টিকিটে দু’বার ইওরোপ থামা যাবে, সেই জন্য ফেরার সময় প্যারিস দেখা ঠিক হয়েছিল। লন্ডনে এয়ারপোর্টে রিসিভ করলো তুতুল আর আলম। সুপ্রীতির মৃত্যুর আগে তুতুল টানা ছ’মাস ছিল কলকাতায়। মায়ের যতখানি সেবা সে করেছে, মানুষের পক্ষে তার চেয়ে বেশি বুঝি সম্ভব নয়। অত রোগযন্ত্রণা সত্ত্বেও শেষের কয়েকটা দিন শান্তি পেয়েছিলেন সুপ্রীতি, মাঝে মাঝে ছোট্ট মেয়ের মতন তুতুলকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে থাকতেন।

মায়ের মৃত্যুর পরেও তুতুল লন্ডন ফিরতে চায়নি,কলকাতাতেই থেকে যেতে চেয়েছিল, তখন আবার মমতার শরীর খারাপ ছিল। সেই পুরোনো আলসার। প্রতাপই জোর করে তুতুলকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। তুতুলের স্বামী থাকবে লন্ডনে, আর সে থাকবে কলকাতায়, এ আবার হয় নাকি?

তুতুল আর আলম অবশ্য প্রতিবছরই একবার করে ঢাকা যাবার পথে কলকাতা ঘুরে যায়, দু’চারদিন থাকে। যে-বারে অতীন-শর্মিলারা কলকাতায় এসেছিল, সেবার হঠাৎ কোনো খবর না দিয়েই তুতুলও এসে উপস্থিত। প্রতাপকে সে বলেছিল, মামা আমরা ভাইবোনেরা কতদিন একসঙ্গে থাকিনি! খুব ইচ্ছে হল, তাই চলে এলাম।

নতুন বাড়ি তখনো তৈরি হয়নি, সেলিমপুরের ছোট ফ্ল্যাটটায় সকলকে ধরে না, মুন্নির বিয়ে হয়নি, টুনটুনিকেও দুটি বাচ্চাসমেত ধরে নিয়ে এসেছিল তুতুল, ঐটুকু জায়গার মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা, তবু কী আনন্দ আর হৈ চৈ করেছিল কয়েকদিন সকলে মিলে। সেই সবকিছুর মূলে ছিল তুতুল, সে সবার ফুলদি, সকলের দিকে তার সমান নজর। বাড়ি ভর্তি লোকজন দেখে প্রতাপের এক একবার মনে পড়ে যেত মালখানগরের কথা, এই রকম পারিবারিক জীবনেই তোত তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন। মালখানগরে জায়গা ছিল অনেক, এখানে ওদের সবার শোওয়ার পর্যন্ত জায়গা হয় না, তবু আনন্দ কিছু কম ছিল না।

তুতুল চলে যাবার পরই যেন আবার বদলে গিয়েছিল সবকিছু। টুনটুনির স্বামী পরেশের সঙ্গে সামান্য কথা কাটাকাটি হতে হতে একসময় অতীন তাকে এমন ধমকালো যে দু’দিন পরেই টুনটুনি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ফিরে গেল ক্ষুগ্নমনে। শর্মিলার কলকাতার জল-হাওয়া সহ্য হচ্ছিল না, জ্বর হতে লাগলো বারবার, সে চলে গেল জামশেদপুরে বাপের বাড়িতে। এখানকার চাকরিতে গণ্ডগোল শুরু হলো অতীনের। তারপর তো এক সময় বাড়ি আবার ফাঁকা।

তুতুলের আন্তরিক ইচ্ছেতে শুধু সেই একবারই একটা পারিবারিক সম্মেলন হয়েছিল বলা যায়।

লন্ডনে এসে প্রতাপ দেখলেন, এখানেও যেন তুতুল একটা মস্তবড় পরিবার নিয়ে থাকে। তুতুল-আলমের কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি এখনো, কিন্তু ওদের কেনসিংটনের বাড়িটা যেন সব সময় একটা হট্টমেলা। কে কখন আসছে-যাচ্ছে তার কোনো ঠিক নেই। প্রত্যেক বেলা অন্তত দশ-বারোজন খায়, তুতুল আর আলম দু’জনেই কাজে বেরিয়ে গেলে বাইরের লোকরাই রান্নাবান্না করে বাংলাদেশের অনেক ছেলেমেয়ে লন্ডনে এসে কোথাও থাকার জায়গা না পেলে তুতুলদের এখানে এসেই ওঠে। প্রতাপ আর মমতা যখন এলেন, তখনও ঐ বাড়িতে আরও পাঁচজন যুবক-যুবতী অতিথি হয়ে ছিল।

লন্ডন শহরে পা দেবার পর থেকে প্রতাপ কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না যে এটা তাঁর প্রাক্তন প্রভুদের দেশ। চাকরির প্রথমদিকে প্রতাপ যখন নদীয়ায় পোস্টিং পেয়েছিলেন, তখন সেখানকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ফ্র্যাঙ্কলিন সাহেব, বাঘের মতন গরগরে মেজাজ, কথায় কথায় সুভাষ বোসকে বলতেন জামান স্পাই আর জওহরলাল নেহরুকে বলতেন, ব্লাবারমাউথ, ওপন এয়ার ব্যারিস্টার। শুধু নিজের ওপরওয়ালার জন্যই নয়, সমস্ত ব্রিটিশ জাতটাকেই প্রতাপ মনে করতেন শত্রুপক্ষ। লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময়, কিংবা কোনো দোকানে ঢুকে প্রতাপ যেন সর্বাঙ্গে রোঁয়া ফুলিয়ে থাকতেন, কেউ একটু খারাপ ব্যবহার করলেই যেন তিনি ধমকে উঠবেন। আমরা এখন স্বাধীন জাতি, নিজের টাকায় বেড়াতে এসেছি, তোমাদের দয়ার তোয়াক্কা করি না!

আসলে এসব কথা যে অনেকেই এখন আর মনে রাখেনি, প্রতাপের তা খেয়াল থাকতে না। রাস্তাঘাটের সাধারণ ইংরেজরা একদিন পরে আর তাদের আঙুলে পুরোনো এম্পায়ারের ঘিয়ের গন্ধ শোঁকে না। কালো লোকদের যে তারা অনেকে পছন্দ করে না, সেটাও নিছক বর্ণবিদ্বেষ নয়, প্রতিযোগিতার ভয়।

তুতুল-আলমের বাড়িতে যে অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েরা আসে, তারা যেন ঔপনিবেশিক আমলের কথা জানেই না। তারা ইংরেজদের সমালোচনা করে, গালাগালি দেয়, আবার প্রশংসাও করে, যেন সমান সমান। কেউ কেউ ইংরেজ মেয়ে বন্ধু নিয়ে আসে, সেই সব মেয়েদের তারা মেমসাহেব বলে একটুও বেশি খাতির করে না, অনেক সময় তাদের ওপর হুকুম চালায়, রান্নাঘরে পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশের এই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের প্রতাপ আগে ভালো করে দেখেননি, তিনি মুগ্ধ হয়ে ওদের কথা শোনেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম-বগুড়া-রাজশাহী থেকে আসা এই সব ছেলেমেয়েদের সুন্দর স্বাস্থ্য, চোখেমুখে কোনো রকম হীনমন্যতার ছাপ নেই, বরং কলকাতার ছেলেমেয়েদের তুলনায় এরা অনেক বেশি প্রাণবন্ত, সব সময় উৎসাহে টগবগ করছে, কোনো আড়ষ্টতা নেই কথাবাতায়। কয়েকজন পড়াশুনোতেও খুব ভালো।

প্রতাপের শুধু একটা ব্যাপারে খটকা লাগতো। এত ভালো ভালো ছেলেমেয়েরা সব দেশের। বাইরে চলে এলে বাংলাদেশটা গড়া হবে কাদের নিয়ে? মুক্তিযুদ্ধে অনেক তরুণ প্রাণ দিয়েছে, অনেক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, তার পরেও যদি এই সব শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা দেশ ছেড়ে চলে আসে, তা হলে সেটা সে দেশের বড় দুর্ভাগ্য!

এই প্রসঙ্গটা একবার আলমের কাছে তুলতেই সে দুঃখের হাসি হেসে বলেছিল, মামাবাবু, এর মধ্যে অনেক ঘাপলা আছে। বাংলাদেশ নামে একটা স্বাধীন দেশেরই শুধু জন্ম হয়েছে, কিন্তু সে দেশের মানুষগুলো স্বাধীন হয় নাই! স্বাধীনতার নামে মানুষ যত কিছু আশা করে, তার কিছুই কি আমরা পেয়েছি? সাধে কি আর এই সব ছেলেমেয়েরা দেশ ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়! তবু দেখবেন, ইন্ডিয়ার ছেলেমেয়েদের তুলনায় এই নতুন বাংলাদেশীরা বিদেশে বসেও অনেক বেশি দেশের কথা চিন্তা করে, কষ্ট পায়, দেশের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ এদের অনেক বেশি। ইন্ডিয়ার লোকেরা অনেকটা সিনিক্যাল হয়ে গেছে, তাদের ধারণা, দেশটার আর কিচ্ছু হবে না, ক্রমশ আরও গোল্লায় যাবে, সুতরাং বিদেশে থাকাই ভালো। কিন্তু আমরা এখনো আশাবাদী। আসলে, আমাদের লড়াইটা এখনো থামে নাই!

লন্ডনে সাতটি দিন প্রতাপ-মমতা পরম আনন্দে কাটিয়েছিলেন। ডাক্তার হিসেবে তুতুল আর আলম দু’জনেই যথেষ্ট ব্যস্ত, তবু ওরা পালা করে ছুটি নিয়ে মামা-মামীমাকে দ্রষ্টব্য স্থানগুলি। ঘুরিয়েছে। মমতার ব্রিটিশ কান্ট্রিসাইড দেখার বাসনা ছিল, তাই দুটো দিন থেকে আসা হলো। ডোভারে আসার সময় তুতুল এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে শেষদিন সে হঠাৎ ঠিক করেছিল, প্রতাপ আর মমতাকে সে একেবারে অ্যামেরিকায় অতীনের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসবে। অতীনরা থাকে নিউ ইয়র্ক শহর থেকে বেশ দূরে, যদি কোনো কারণে তারা ঠিক সময়। এয়ারপোর্টে পৌঁছতে না পারে, তা হলে প্রতাপরা বিপদে পড়বেন। যদিও লন্ডন থেকে দু’বার ফোনে কথা হয়েছে অতীন-শর্মিলার সঙ্গে, সে রকম গণ্ডগোলের কোনো সম্ভাবনাই নেই। তুতুলের কথা শুনে আলম আপত্তি করেনি, সে বলেছিল, যাও না, ঘুরে এসো, কয়েকদিন থেকে এসো ভাইয়ের কাছে। কিন্তু তার দু’দিন বাদেই আলমের নিজের মামা, যিনি অল্প বয়েসে পিতৃহীন আলমকে নিজের সন্তানের মতন মানুষ করেছেন, তিনি লন্ডনে চিকিৎসা করাবার জন্য আসছেন শুনে প্রতাপ-অমমতা দু’জনেই বলেছিলেন, এখন তুই চলে যাবি কী? তা কখনো হয়? তুই আর আলম পরে আসিস অ্যামেরিকায়, আমরা তো থাকছি কিছুদিন।

নিউ ইয়র্কে এয়ারপোর্টে শর্মিলা আসতে পারেনি, কারণ তার ছেলের সবে মাত্র আড়াই মাস বয়েস, অতীন ঠিক দাঁড়িয়েছিল। একটা রাত বাবা-মাকে নিয়ে নিউইয়র্কের একটা হোটেলে কাটিয়ে পরদিন সে গাড়ি চালিয়ে ওদের নিয়ে এলো ট্রয় নামে একটা ছোট শহরে। নিজের ছেলের বাড়িতে পা দেবার সেই প্রথম কয়েকটি মুহূর্তের কথা মমতা অনেকবার অনেকের কাছে গল্প করেছেন। বাড়ির সামনে একটা বাগান, তারপর ঠিক যেন হলুদ রং দিয়ে আঁকা ছবির মতন একটা বাড়ি, পেছনদিকে ঘন জঙ্গল। গাড়ি থেকে নামবার পর দেখলেন, সেই বাড়ির দরজার সামনে আড়াই মাসের ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শর্মিলা। বাচ্চাটা হাত-পা ছুঁড়ে যেন ঠাকুদা-ঠাকুমাকে অভ্যর্থনা করছে। সেদিকে তাকিয়ে মমতার বুকখানা ধক করে উঠেছিল। বাচ্চাটার মুখখানা যেন অবিকল তাঁর বড় ছেলে পিকলুর মতন!

আসলে পিকলু আর বাবলু দু’ভাইয়েরই চেহারায় যথেষ্ট মিল ছিল। বাবলুর ছেলে বাবলুরই মতন হয়েছে। তবু মমতার মনে পড়েছিল পিকলুর কথা, কেন যে এতকাল বাদে হঠাৎ পিকলুর স্মৃতি এমনভাবে ফিরে এলো তা কে জানে! আর কেউ মনে রাখেনি, কিন্তু মমতার মনে তো এখনো পিকলুর সব বয়েসের চেহারাই জ্বলজ্বল করে। তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল হঠাৎ। পরে মমতার মুখে ঐ কথা শুনে প্রতাপ হেসে বলেছিলেন, তোমরা যে ঐটুকু বাচ্চাকে দেখে কার সঙ্গে মিল না অমিল তা কী করে বোঝো, ভগবান জানেন! আমার। কাছে তো সব বাচ্চাই সমান মনে হয়!

গয়না-গাঁটি আর কিছুই অবশিষ্ট নেই মমতার, শুধু কী করে যেন নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া একটা মোহর থেকে গিয়েছিল, সেটা সঙ্গে করে এনেছিলেন। সেই মোহর দিয়ে তিনি নাতির মুখ দেখলেন। তারপর শর্মিলার কোলের দিকে হাত বাড়াতেই ঐ আড়াই মাসের বাচ্চা ঝাঁপিয়ে চলে এসেছিল তাঁর কোলে। তখন তাঁর চোখের জল সামলানো সত্যিই দায়।

তুতুল-আলমের বাড়ির তুলনায় অতীন-শর্মিলাদের বাড়ির অনেক তফাত। লন্ডনের সঙ্গে এই ছোট জায়গাটার তো কোনো তুলনাই চলে না। যদিও এখানকার পরিবেশ ও প্রকৃতি অত্যন্ত সুদৃশ্য ও মনোরম। লন্ডনে ওদের বাড়িতে যেমন সর্বক্ষণ হৈ চৈ লেগে থাকতো, এই বাড়ি আবার সব সময় নিস্তব্ধ, নির্জন। শনিরবিবার ছাড়া কোনো অতিথি আসার সম্ভাবনাই নেই। শর্মিলা আর অতীন দু’জনেই চাকরিতে বেরিয়ে যায় সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে, তার একটু আগেই ওদের মেয়ের স্কুলের বাস আসে। এরপর থেকে সারা সকাল, দুপুর, সন্ধে প্রতাপ আর মমতাকেই একসঙ্গে থাকতে হয় বাড়িতে। কলকাতার সঙ্গে তফাত এই, এখানে আর একটি আড়াই মাসের প্রাণী থাকে। সেই নাতিকে নিয়ে মমতার সময় বেশ ভালোই কাটে। যদিও সেই শিশুর সারাদিন একেবারে ছকে বাঁধা, সে কখন খাবে, কখন ঘুমোবে, কখনো হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে উঠলে কী করতে হবে, তা শর্মিলা প্রায় পাখি পড়াবার মতন মমতাকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

প্রতাপের সময় কাটে শুধু টিভি দেখে আর বইপত্র পড়ে। তিনি অবশ্য কোনোদিনই তেমন পড়ুয়া স্বভাবের নন, খবরের কাগজ-টাগজ পড়তে ভালোবাসেন, কিন্তু গল্প-উপন্যাসের দিকে ঝোঁক নেই। তবু অতীনের বেডরুম থেকে একদিন তিনি একটি হাল আমলের মার্কিনী নভেল নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলেন। প্রথম আট-দশ পাতা পড়েই তাঁর প্রায় বমি এসে গেল, বইখানা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এত সব অশ্লীল, কুৎসিত কথা ও শরীরের বর্ণনা এরা এমন অবলীলাক্রমে লেখে? লেখকের নাম জন আপডাইক, পেছনের মলাটে বড় বড় পত্রিকার সমালোচকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার উদ্ধৃতি! গোপন পর্ণোগ্রাফি নয়, এটাই আধুনিক সাহিত্য? বইখানা ছুঁড়ে ফেলে দেবার পরেও প্রতাপ আবার কুড়িয়ে নিয়ে সাবধানে ঠিক জায়গায় রেখে দিয়েছিলেন, যাতে ছেলে এবং ছেলের বউ বুঝতে না পারে তিনি ঐ বই হাতে নিয়েছিলেন!

অতীনরা রবিবার শুধু নিউ ইয়র্ক টাইমস রাখে, অন্যদিন একটি স্থানীয় পত্রিকা। প্রথমবার একশো কুড়ি পৃষ্ঠার নিউ ইয়র্ক টাইমস দেখে প্রতাপ প্রায় হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন। এত বড় খবরের কাগজ! পরে দেখলেন তার অধিকাংশই বিজ্ঞাপনে ভর্তি, খবরগুলি দেখলে মনে হয়, কলকাতার তো কোনো উল্লেখের প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি ভারত নামে যে একটা দেশ আছে পৃথিবীতে, সেটাই বোঝা যায় না! একদিন শুধু হায়দ্রাবাদে একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় আড়াইশো। জনের মৃত্যুর সংবাদ ভেতরের একটা পাতায় আবিষ্কার করা গিয়েছিল, সারা ভারতে ঐ একমাত্র উল্লেখযোগ্য খবর। আড়াইশো জন মরেছে, আর সত্তর কোটি মানুষ যে কী করে বেঁচে আছে, সে সম্পর্কে এদের মাথাব্যথা নেই।

স্থানীয় পত্রিকাটি একেবারেই স্থানীয়। কোনো একটি ফার্মে গোরুদের কী একটা অসুখ হয়েছে, সেটাই একদিন প্রথম পাতার হেডলাইন। নীচের দিকে ছোট করে ছাপা হয়েছে মহাশূন্যে এই প্রথম দু’জন নভোচারী কী করে এক রকেট থেকে আর এক রকেটে যাতায়াত করলে তার বিবরণ এটাকেও এরা খবরের কাগজ বলে! তবে, এই স্থানীয় কাগজটিও বত্রিশ পৃষ্ঠা, পাতা জোড়া জোড়া বিজ্ঞাপন, তার মধ্যে আবার কী সব কুপন থাকে, শর্মিলা কেটে কেটে রেখে দেয়। ঐগুলো দেখালে সুপার মার্কেটে কিছু জিনিসপত্র শস্তায় পাওয়া যায়।

টিভি দেখতে দেখতেও প্রতাপ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। চার-পাঁচটা চ্যানেল থাকলেও দুপুরের দিকে একেবারে অসহ্য প্রোগ্রাম দেখায়, রান্না, ব্যায়াম, কিংবা অতি ন্যাকা ন্যাকা সিরিয়াল, তাতে যত থাকে চুমু, ততই কান্নার দৃশ্য। প্রতাপ বরং কমার্শিয়াল বা বিজ্ঞাপনের স্পটগুলো আগ্রহের সঙ্গে দেখেন। তাতে এই প্রবল কনজিউমার সোসাইটির চিত্রটা যেন ঠিক ঠিক ফুটে ওঠে। সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় কতকগুলো জিনিস নিয়ে কী বিরাট কর্মকাণ্ড! কয়েকটা ছেলেমেয়ে নেচে কুঁদে চিউয়িংগামের গুণকীর্তন করে গেল। এখন এরা চিউইংগাম বলে না তো, বলে বাবলগাম। টিভিতে তিরিশ সেকেন্ডে ঐ বিজ্ঞাপনের দাম নাকি পঞ্চাশ-ষাট হাজার ডলার, শর্মিলার কাছে এই কথা শুনে প্রতাপ আঁতকে উঠেছিলেন। পঞ্চাশ-ষাট হাজার ডলার মানে তো বিশাল টাকা! পৃথিবীতে চিউইংগাম কিংবা বাবলগাম না থাকলেই বা কী ক্ষতি হতো! ময়লা ফেলার বড় ঠোঙা, যাকে এরা ট্র্যাস ব্যাগ বলে, তারও ঐ রকম বিজ্ঞাপন লাগে। এইসব বাজে জিনিস কেনানোর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, আর ঐ সব জিনিস যারা কেনে, তারাও টাকা রোজগারের জন্য সারা সপ্তাহ মুখের রক্ত তুলে খাটছে। মেয়েরা পারফিউম মাখতে ভালোবাসে সেটা বোঝা গেল, কিন্তু তাদের মুখের গন্ধ, বগলের গন্ধ ঢাকার জন্য স্প্রে, হাতে মাখার লোশান, নোখে মাখার রং, চোখের পল্লবে মাখার কালি, এই সবও চাই! এই সব কিছু মাখলে তাদের একটা কিম্ভুতকিমাকার প্রাণী মনে হবে না? বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে যখন, মেয়েরা কেনে নিশ্চয়ই। অতীন আর শর্মিলা দু’জনে দুটো গাড়ি নিয়ে অফিস যায়। দুটো গাড়ি রাখার জন্য ওরা বেশি উপার্জন করতেও বাধ্য। গ্যারাজের দরজা আপনি আপনি খুলে যাবে, তার জন্যও একটা যন্ত্র। হাত দিয়ে দরজাটা খুললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়!

প্রতাপের মনে পড়ে অনেকদিন আগেকার একটা খবর। সোভিয়েত ইউনিয়ানের প্রধানমন্ত্রী ক্রুশ্চেভ সেবার এসেছিলেন অ্যামেরিকা সফরে। রুশ-মার্কিন ঠাণ্ডা লড়াই তখন সবে কমতে শুরু করেছে। ক্রুশ্চেভই বোধহয় প্রথম সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পদার্পণ করেছিলেন অ্যামেরিকায়। এ দেশের গমের ক্ষেত, ভুট্টার ক্ষেত দেখে তিনি মুগ্ধ। এত উৎপাদন পৃথিবীর আর কোনো দেশে হয় না। যন্ত্র দিয়ে ফসল কাটা হয়, একজন মাত্র চাষা একরের পর একর জমি চাষ করে, ফসল তোলে। এখানকার অনেক চাষার নিজস্ব প্লেন আছে। এক জায়গায়। ক্রুশ্চেভকে আধুনিকতম যন্ত্রপাতি দেখানো হচ্ছিল। অনেক গুলি দেখলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তার মধ্যে একটা ছিল লেবুর রস করার যন্ত্র। রান্নাঘরে কাজে লাগে, যখনই দরকার হবে, ঐ যন্ত্র একটা লেবু কেটে রস বার করে দেবে। ক্রুশ্চেভ এক টুকরো লেবু তুলে নিয়ে বলেছিলেন, কিন্তু তোমরা যাই-ই বললো, আমার দু’আঙুলে টিপে আমি ঐ যন্ত্রের চেয়ে আরও ভালোভাবে রস বার করতে পারি!

বিমানবিহারীর বাড়িতে বসে স্টেটসম্যান পত্রিকায় ঐ খবরটা পড়ে প্রতাপ খুব হেসেছিলেন। বিমানবিহারী বলেছিলেন, পশ্চিমী দেশগুলো যাচ্ছে কোথায় বলো তো! এরা কি মানুষের হাতের আঙুলের ব্যবহারও ভুলিয়ে দেবে? সবই যদি যন্ত্রে করে দেয়। তা হলে মানুষ যে ক্রমশ অথর্ব হয়ে যাবে! ওদের বিজ্ঞানীরা এটা চিন্তা করে না? প্রতাপ বলেছিলেন, যারা মেধাবী, খুব বুদ্ধিমান, তারাই বিজ্ঞানী হয়, তাই না? কিন্তু মানুষের সভ্যতা ধ্বংস করার জন্য যে বিজ্ঞানীরা অ্যাটম বোমা বানায়, তাদের কি তুমি বুদ্ধিমান বলতে পারো?

না অতীন আর শর্মিলা ফেরে সন্ধের পর। সারাদিন অফিস করার পর, পনেরোকুড়ি মাইল গাড়ি চালিয়ে এসে ওরা বেশ ক্লান্ত থাকে। এ দেশের অফিসগুলোতে যেমন মাইনে ভালো দেয়, তেমনি খাঁটিয়েও মারে। ফাঁকি মারার উপায় নেই, কারণ প্রত্যেকেরই কাঁধে চাপানো থাকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব। অতীনকে তো এক-একদিন বাড়িতে ফিরেও অনেক রাত পর্যন্ত অফিসের কাজই করতে হয়। শর্মিলার কিন্তু আশ্চর্য জীবনীশক্তি, বাড়ি ফিরেই সে কাজে লেগে যায়। বড় মেয়ের পড়াশুনো দেখা, ছেলেকে ঘুম পাড়ানো, তারই মধ্যে রান্নাবান্না, তখন সে মমতাকে কোনো কাজই করতে দেবে না। আর প্রত্যেকদিন সে শ্বশুর-শাশুড়িকে চার-পাঁচ রকম রান্না করে খাওয়াবেই। দুপুরবেলা সে থাকতে পারে না সেজন্য তার আফশোসের শেষ নেই, যদিও সব কিছুই সে গুছিয়ে রেখে যায়।

শর্মিলার মতন মেয়েকে ভালো না লাগার কোনো উপায় নেই। সব সময় তার মুখে একটা সারল্য মাখানো হাসি, অবিরাম সারা বাড়ি ছুটে বেড়াচ্ছে, সে একটু ভুলোমনা স্বভাবের, এইমাত্র কোনো একটা জিনিস কোথায় রেখেছে তাও ভুলে যায়, এবং নিজের ভুলের কথা সে নিজেই হাসতে হাসতে স্বীকার করে। মমতা তো তাঁর পুত্রবধূর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। প্রতাপ অবশ্য শর্মিলার সঙ্গে ব্যবহারে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি, খানিকটা আড়ষ্টতা রয়েই গেছে। একমাত্র ছেলের বউ, তাকে তো নিজের মেয়ের মতনই মনে করা উচিত, প্রতাপ তা বুঝলেও মনটাকে সে রকমভাবে তৈরি করতে পারেননি আজও। প্রথম অতীনের চিঠিতে তার বিয়ের খবর পেয়ে প্রতাপ আর মমতা দু’জনেই তীব্র আঘাত পেয়েছিলেন। তারপর অন্তত তিনমাস তাঁরা দু’জনেই ছেলেকে এক লাইনও চিঠি লিখতে পারেননি, অতীনের পাঁচখানা চিঠির উত্তর দেওয়া হয়নি। প্রতাপের মনে হয়েছিল, তিনি নিজেই যেন তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু বিমানবিহারীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। যদিও বিমানবিহারী কিংবা অলি সামান্যতম বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বরং অলি তার অ্যামেরিকার কোন বান্ধবীর কাছ থেকে অতীনের বিয়ের খবর পেয়ে বাড়ি বয়ে এসে মমতার কাছে শর্মিলার খুব সুখ্যাতি করে গিয়েছিল।

মমতা সেসব ভুলে যেতে পেরেছেন, প্রতাপ পারেন না। বিয়ের সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যেই যে সন্তান প্রসব করে, সেই মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়া কি সহজ? শর্মিলাকে চোখে দেখার আগে প্রতাপ এমনও ভেবেছিলেন যে একটা নষ্ট, দুশ্চরিত্র, লোভী স্বভাবের মেয়ে টোপ ফেলে তাঁর ছেলেকে বিয়ের জালে জড়িয়েছে। পশ্চিমী প্রভাবে যে-মেয়ের নৈতিকতা দূষিত হয়ে গেছে, সে হবে মালখানগরের মজুমদার বংশের বউ! সে বিয়েতে বাধা দেবার কোনো উপায় ছিল না বলেই অসহায় ক্রোধে প্রতাপ আরও বেশি জ্বলেছিলেন। শর্মিলাকে দেখার পর অবশ্য প্রতাপের সে ভুল ভেঙে যায়। শর্মিলার নির্মল মুখোনি দেখেই তিনি বুঝেছিলেন, ভুল বা অন্যায় যা কিছু হয়েছে, সেসবের জন্য তাঁর গোঁয়ার ছেলেই দায়ী। শর্মিলাকে যে এক সময় প্রতাপ খুব খারাপ মেয়ে ভেবেছিলেন, শর্মিলা সে কথা না জানলেও তবু সেই জন্যই শর্মিলার সামনে দাঁড়ালে প্রতাপ এখনো লজ্জা বোধ করেন।

প্রথম শনিবারেই এসে পড়েছিল সিদ্ধার্থ সপরিবারে, সঙ্গে আর একটি বন্ধু দম্পতি। ওরা আসার পর বাড়িটা সরগরম হয়ে উঠলো। নিজের ছেলের চেয়েও সিদ্ধার্থের সঙ্গেই প্রতাপের কথাবার্তা হলো অনেক বেশি। অতীনের যত ভাব তার মায়ের সঙ্গে, বাবার কাছে এসে সে। কাজের কথা বলে, গল্প করতে পারে না।

সিদ্ধার্থ এসেই জিজ্ঞেস করেছিল, মেসোমশাই, এ দেশটা কেমন লাগছে, বলুন!

প্রতাপ হেসে বলেছিলেন, বেশ ভালো!

সিদ্ধার্থ সঙ্গে সঙ্গেই বলেছিল, কী করে বললেন, ভালো? কিছুই তো দেখেননি! এয়ারপোর্ট থেকে এক রাত হোটেলে কাটিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছেন। বাড়ির মধ্যে বসে থেকে দেশটটার কী বুঝবেন! অতীনকে বলেছিলুম, নিউ জার্সিতে আমার ওখানে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে আপনাদের নিয়ে… জানেন মেসোমশাই, আপনার ছেলে বড় কাজ-পাগল হয়েছে! আমি ওকে কতবার বলেছি, অফিসে বেশি বেশি কাজ দেখালে ওরা আরও নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে! ব্লাড সাকার্স! প্রমোশন, মাইনে বাড়াবার লোভ দেখিয়ে বলবে, সব, রক্ত নিঙড়ে দাও! আমরা ব্রাউন স্কিন বলে আমাদের পিঠ চাপড়ে বলবে, তোমরা খুব কাজের লোক, এসিয়ানস আর ডিলিজেন্ট পীল! তাতেই আমরা গলে যাই! মেসোমশাই, আপনি দেশটা ভালো করে ঘুরে দেখুন, তারপর আপনার মতামত শুনবো, আপনাদের জেনারেশানের মতামতটা জানতে চাই!

প্রতাপ বলেছিলেন, যেটুকু দেখেছি এর মধ্যে, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বড় পরিষ্কার আর সুন্দর। সব জায়গায় একটা আনন্দ ফুর্তির ভাব আছে!

সিদ্ধার্থ বলেছিল, ওরকম ওপর ওপর দেখলে চলবে না। বড় বড় বাড়ি আর চওড়া চওড়া রাস্তা, ওসব তো আছেই। দোকানগুলো জিনিসপত্রে ঠাসা, বেশিরভাগ ফ্যামিলিতে দুটো গাড়ি, নানা রকম গ্যাজেট, চতুর্দিকে ডলারের ঝনঝন শব্দ, শুধু ভোগ-বিলাসের জিনিসই নয়, আর্ট-কালচারের ব্যাপারেও পৃথিবীতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা এরা পয়সা দিয়ে কিনে আনতে পারে। তবু, এ সব দিয়েও তো একটা দেশ বা জাতকে ঠিক বোঝা যায় না। আপনি সারা দেশটা ঘুরে দেখুন এই অতীন, মেসোমশাই-মাসিমাদের কবে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছিস? নিউ ইয়র্কটা ভালো করে দ্যাখা, তারপর ওয়াশিংটন ডি সি।

অতীন বলেছিল, সামনের মাসে ছুটি নিচ্ছি, তখন বেরুবো, তোরাও চল না, একসঙ্গে দুটো গাড়ি নিয়ে…

সিদ্ধার্থ বলেছিল, যেতে পারি। মেসোমশাই, আপনি শুধু বড় বড় শহরের বাইরের চাকচিক্য দেখে ভুলবেন না। নিউ ইয়র্কেও আছে হালেম, বাওরি, শিকাগোয় ঘেটো আছে, তারপর যদি মিড ওয়েস্টের গ্রামে যান, দেখবেন কী কনজারভেটিব সব লোকগুলো। সে এক অন্য অ্যামেরিকা।

রাত্তিরবেলা বাগানে বারবিকিউ করা হলো। লোহার উনুনে ঝলসানো হচ্ছে মুগী, গোল হয়ে ঘিরে বসেছে সবাই। আকাশ পরিষ্কার, ঈষৎ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, মাঝে মাঝে খুব নীচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে প্লেন। একটু দূরে বাচ্চারা কী যেন একটা দুর্বোধ্য গান দু’এক লাইন গাইছে আর হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছে।

সিদ্ধার্থ একটা স্কচের বোতল বার করে বললো, মেসোমশাই, আপনার ছেলে লজ্জায় বলতে পারছে না। আমরা একটু হুইস্কি খাবো, তাতে কি আপনি আপত্তি করবেন? আমাদের খাওয়া অভ্যেস হয়ে গেছে, এখন আপনারা এসেছেন বলে যদি লুকিয়ে লুকিয়ে বেসমেন্টে গিয়ে খেয়ে আসতে হয়…

প্রতাপ বললেন, না, না। তোমরা খাও, তাতে কী হয়েছে? জানি, এ দেশে থাকলে, মানে অনেক পার্টি-টাটিতে যেতে হয়…

সিদ্ধার্থ বললো, ঠাণ্ডার দেশ তো, একটু-আধটু খেলে ভালোই লাগে। আপনি একটু খাবেন?

প্রতাপ বললেন, না, আমি খাই না। তোমরা খাও! আমার জন্য তোমরা চিন্তা কোরো না।

খেলার ক্যাপটেনের ভঙ্গিতে সিদ্ধার্থ মাথার ওপর দু’হাত তুলে হাততালি দিয়ে সবাইকে ডেকে বললো, এই, শোনো, মেলোমশাই আমাদের ড্রিংক করার পারমিশান দিয়েছেন। সিগারেট টানার জন্যও কারুর আড়ালে যাওয়ার দরকার নেই। আমি তো জানিই, উনি খুব ব্রড মাইন্ডেড!

গেলাসে স্কচ ঢালতে ঢালতেই সিদ্ধার্থ আবার চেঁচিয়ে বললো, এই অতীন, ওয়াইনের বোতলগুলো ডিপ ফ্রিজে রেখে আয়। খাওয়ার সময় লাগবে।

অতীন বললো, আমি দুটো হোয়াইট ওয়াইনের বোতল অলরেডি চিল করতে দিয়েছি।

সিদ্ধার্থ বললো, আমি একটা ক্যালিফোর্নিয়ার রোজে এনেছি, ওটাকেও ঢুকিয়ে দে প্লিজ।

অতীন বললো, মুর্গীর সঙ্গে হোয়াইট ওয়াইনই তো ভালো।

সিদ্ধার্থ বলল, আমার মিষ্টি ওয়াই ভালো লাগে। বিশেষ করে রোজের টেস্টটা… বোতলটাকে ঠাণ্ডা করতে দে, ডিপ ফ্রিজে দিলে একেবারে চিলড় হবে।

অতীন এক ধমক দিয়ে বললো, ঠিক আছে, তোর খেতে ইচ্ছে হয় খাবি। কিন্তু রেড ওয়াইন আবার কেউ চিড় করে খায় নাকি? বাঙালের মতন কথা! রেড ওয়াইন খেতে হয় নর্মাল টেম্পারেচারে, ছিপিটা একটু আগে খুলে রাখলে।

প্রতাপ চোখ বড় বড় করে শুনছেন। মদ বিষয়ে তাঁর ছেলের এত জ্ঞান দেখে তিনি একেবারে চমৎকৃত। মদ খাওয়ারও এত নিয়মকানুন থাকে! এ দেশে থাকতে গেলে বোধহয় এসব শিখতে হয়। যস্মিন দেশে যদাচারঃ! মেয়েরা বীয়ার নিয়েছে। সিদ্ধার্থর এগারো বছরের ছেলেটি বায়না ধরলো, আমি কোক খাবো না, আমাকে রুট বীয়ার দাও! রুট বীয়ার কথাটা প্রতাপের কানে খট করে লাগে, যদিও তিনি জেনেছেন যে ওর মধ্যে অ্যালকোহল থাকে না। তবু বাচ্চা বয়েস থেকেই বীয়ার নামটার দিকে ঝোঁক।

খাদ্য পরিবেশনের সময় খোলা হলো ওয়াইনের বোতলগুলো, অন্যরকম গেলাস এলো। একটা সুন্দর গেলাসে লাল রঙের মদ ঢেলে সিদ্ধার্থ প্রতাপের কাছে এসে বললো, মেসোমশাই, আপনি একটু খেয়ে দেখুন, খারাপ লাগবে না।

প্রতাপ সন্ত্রস্তভাবে বললেন, না, না, আমি খাবো না। আমি কোনোদিন…

সিদ্ধার্থ গেলাসটা প্রতাপের মুখের কাছে এনে বললো, একটু খেয়ে দেখুনই না। এতে কোনো দোষ নেই। ওয়াইন কিন্তু মদ নয়। আমাদের দেশে সব কিছুকেই ওয়াইন বলে। এটা। স্রেফ আঙুরের রস। আপনি তো এমনি আঙুর খান, এটা খেলে প্রায় সেইরকমই… একটু চেখে দেখুন!

প্রতাপ বেশ দৃঢ়ভাবে গেলাসটা সরিয়ে দিয়ে বললেন, না, আমাকে দিও না।

তিনি একটু বিরক্ত হয়েছেন। যে-কোনো ফলকেই ফারমেন্ট করলে অ্যালকোহল তৈরি হয়, তা কি তিনি জানেন না! এরা বিদেশে থাকে বলে মনে করে, দেশের লোক সব বিষয়ে অজ্ঞ! আঙুর আর ওয়াইন এক! পুই শাক, পালং শাকও গাছ, গাঁজাও একটা গাছ থেকে হয়। তাই বলে যে পুঁই পালং খায়, তাকে গাঁজা খেতে হবে?

প্রতাপের কাছে সুবিধে করতে না পেরে সিদ্ধার্থ মমতাকে জোরাজুরি করতে লাগলো। মমতা অনেকবার আর্তভাবে না না বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত গেলাসটা নিলেন। প্রতাপের দিকে আড়চোখে লাজুক লাজুক ভাবে তাকিয়ে চুমুক দিলেন সেই লাল মদে।

সিদ্ধার্থ হাততালি দিয়ে বলে উঠলো, ব্রাভো! মাসিমা অনেক বেশি স্মার্ট!

একসময় মমতার বাপের বাড়িতে কিছুটা ইঙ্গবঙ্গ পরিবেশ ছিল। ছোটবেলায় মমতা একজন মেমসাহেবের কাছে কিছুদিন ইংরিজি শিখেছিলেন। মমতার বাবা বিলিতি মদ্য পান করতেন মাঝে মাঝে, বাড়িতে অতিথি এলে তাঁদেরও খাওয়াতেন। বিয়ের দু’এক বছর পরেও প্রতাপ শ্বশুরবাড়িতে এরকম পাটি দেখেছেন, তখনও অবশ্য ত্রিদিব জোর করেও প্রতাপকে ওসব খাওয়াতে পারেননি। কিন্তু মমতা বোধহয় চেখে দেখেছেন দু’একবার। সে সব অনেককাল আগের কথা, এত বছর এক গরিববাড়ির বউ হয়ে থেকেও মমতা সেসব একেবারে ভোলেননি। প্রতাপ লক্ষ করেছেন, এদেশে এসে মমতা ইংরিজিতে কথাবার্তা বেশ চালিয়ে যেতে পারেন।

সিদ্ধার্থ শুধু জোর করে মমতাকে ওয়াইন খাইয়েও ছাড়লো না, মমতাকে দিয়ে গানও করালো। খাওয়া দাওয়ার পর গান শুরু হয়েছিল, সিদ্ধার্থ ধরে বসলো, প্রত্যেককেই কিছু না কিছু গাইতে হবে, মমতা হাসতে হাসতে প্রবলভাবে মাথা নাড়ছিলেন, তার মধ্যে অতীন বলে দিল, হ্যাঁ, মা গান জানে, আমি ছোটবেলায় শুনেছি! শেষ পর্যন্ত মমতা গাইলেন একখানা অতুলপ্রসাদের গান, অনভ্যাসের জন্য গলা দুএকবার কেঁপে গেলেও এখনো সুর আছে বোঝা যায়। পিকলুর মৃত্যুর পর প্রতাপ আর কোনোদিন মমতাকে গাইতে শোনেননি। প্রতাপকে অবশ্য কেউ গান করার জন্য অনুরোধ জানালো না।

সিদ্ধার্থরা চলে যাবার পর, আবার সোমবার দুপুরে বাড়িটা যেন আরও বেশি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর প্রত্যেকটি দিন একই রকম। প্রতাপের কিছুই করার নেই। একা একা তিনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেশিদূর যেতে পারেন না। রাস্তা হারাবার ভয় শুধু নয়, খুব খরচের ব্যাপার। অতীনের বাড়িটা শহর ছাড়িয়ে একটা ফাঁকা জায়গায়, কাছাকাছি মাত্র আর একখানা বাড়ি আছে, এদিকে বাস চলে না, গাড়ি ছাড়া যাতায়াতের কোনো উপায় নেই। ট্যাক্সি মানেই অনেক খরচ। ডলারের মূল্য টাকায় হিসেব করলে পিলে চমকে যায়। প্রতাপের নিজস্ব কিছু ডলার ফুরিয়ে গেলে কি ছেলের কাছে হাত পাততে হবে?

শর্মিলা আর অতীন সময়ই পায় না। শনিবার রবিবার কাছাকাছি কোনো নদী দেখতে যাওয়া। হয় কিংবা বাইরের কোনো হোটেলে খাওয়া, তাও অন্য অতিথি এসে গেলে সেদিন আর বেরুনো হয়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে অতীন পরিকল্পনা করে বাবা-মাকে নিয়ে দূরে কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবে, কিন্তু অফিসে এই সময়টাতেই তার এত কাজের চাপ যে কিছুতেই ছুটি দিচ্ছে না।

মমতা বেশ নাতি-নাতনীকে নিয়ে মেতে আছেন। তাঁদের নাতনী অনীতার বয়েস এখন। তেরো, কিন্তু সে একবর্ণ বাংলা জানে না। জীবনে মাত্র একবারই সে কলকাতায় গেছে, তখন বেশ বাংলা কথা শিখে নিয়েছিল, আবার ভুলে গেছে সব। তার বাবা-মাও তার সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলে। অনীতা যখন ছোট ছিল, তখন প্রতাপের সঙ্গে তার বেশ খাতির জমেছিল, দাদুর হাত ধরে সে বালিগঞ্জ লেকে বেড়াতে যেত আর নিজেই অনর্গল কথা বলতো। এখন সে যেন সেই দাদুকে ভুলেই গেছে। ভালো করে কথাই বলতে চায় না। প্রতাপের ইংরিজি শুনে বুঝতেই পারে না, বারবার বলে, পাৰ্ডন মী? পাৰ্ডন মী? এদের উচ্চারণ অন্যরকম, প্রতাপের জিভেই আসে না ঠিক মতন। নাউ-কে বলে ন্যাও, কাউকে বলে খ্যাও। শুধু উচ্চারণ নয়, অনেক কথাও যে আলাদা। সিডিউল-কে যে এরা স্কেজুল বলে ল প্রতাপ জানবেন কী করে? প্রথম প্রথম তিনি বুঝতেই পারতেন না। আদালতে তিনি চিরকাল শুনে এসেছেন, আই বেগ ইয়োর পাৰ্ডন, এরা বলে পাৰ্ডন মী!

মমতার কোনো অসুবিধে হয় না। তাঁর ইংরিজি তো বটেই, তাঁর বাংলা কথাও অনীতা বুঝতে পারে। কিছু একটা উপায়ে ওদের মনের যোগাযোগ ঘটে গেছে, সেটাই আসল। মমতা, অবশ্য খুব সাধ করে তাঁর নাতনীর নাম রেখেছিলেন উজ্জযিনী, চিঠিতে প্রত্যেকবার তিনি সেই নামই লিখতেন, এখানে আসার পর বোঝা গেল, সে নামের চিহ্নমাত্র কোথাও নেই। শর্মিলা বলেছিল, আমার নামটাই এরা উচ্চারণ করতে পারে না, উজ্জয়িনী বলতে তো এদের দাঁত ভেঙে যাবে! সেইজন্যই অনীতা নাম রাখা হয়েছে, মেমসাহেবদেরও নাম হয় অ্যানিটা। প্রতাপ মাঝে মাঝে ভাবেন, অনীতা মানে কী?

কাছাকাছি আর একটিমাত্র বাড়ি, প্রতাপের ঘরের জানলা দিয়ে সেই বাড়ির পেছন দিকের কিছুটা অংশ ও বাগান দেখা যায়। ওদের বাগানটা ভারি সুন্দর, কতরকম গোলাপ যে লাগিয়েছে তার ঠিক নেই। গোলাপের যে এত বিভিন্ন রং হয়, তাও প্রতাপ জানতেন না, তাকিয়ে থাকলে চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু তাকাবার কি উপায় আছে! জানলার ধারে গেলেই প্রতাপের চোখে পড়ে, ওই বাড়ির পেছনের বারান্দায় ডেক চেয়ারে বসে আছে একটি কিশোরী মেয়ে, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে একটি যুবক। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, প্রায় সব সময়েই ওদের দেখা যায়। ওরা কি স্কুল কলেজে যায় না? মেয়েটির পায়ে বোধহয় পোলিও, প্রায় অনীতারই সমান বয়েস, ছেলেটিকেও প্রায় কিশোরই বলা চলে। কথা বলতে বলতে ওরা টপ টপ করে চুমু খায়। এদেশে পথে-ঘাটে যুবক-যুবতীদের প্রকাশ্যে চুমু খেতে দেখলেই প্রতাপ চোখ ফিরিয়ে নেন। টিভি-তে প্রতি দু মিনিট অন্তর চুমু, এসব দেখে অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েরা তোত। শিখবেই! একদিন দেখলেন, ছেলেটা ওই মেয়েটার বুকের জামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। লজ্জায় নয়, রাগে প্রতাপের মুখটা রক্তিম হয়ে গেল!

মমতা একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি জানলার ধারে দাঁড়িয়ে কী দেখছো?

প্রতাপ বলেছিলেন, এসো, দ্যাখো, এদেশের ছেলেমেয়েদের কাণ্ড!

কিশোরী মেয়েটিকে তখন চেয়ার থেকে কোলে তুলে নিয়ে সেই ছেলেটি কাঠের বারান্দায় শুইয়ে ফেলেছে, ফ্রকটা উল্টে দিয়েছে কোমর পর্যন্ত।

মম সঙ্গে সঙ্গে জানলার পর্দা টেনে বলেছিলেন, ছিঃ, তোমার কি ভীমরতি হয়েছে নাকি?

প্রতাপ বলেছিলেন, ওই টুকু বয়েস, কী কাণ্ড বলো তো! ও বাড়িতে কি দেখবার আর কেউ নেই? ছি ছি ছি–

–তুমি ওই পর্দা আর সরিও না।

–এই বয়েস থেকেই এরা শরীরের ব্যাপার শুরু করে, কদিন বাদেই তো সব জানা হয়ে যাবে, সব পুরোনো হয়ে যাবে। তারপর কী নিয়ে বাঁচবে! আমি মরাল কোয়েশ্চেন তুলছি না, কিন্তু এরকম লাগামছাড়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে কি সমাজ গড়া যায়? ওদের বাপ-মা কিছু খেয়াল করবে না, এত ইরেসপনসিবল…

–তুমি কি এদেশটাকে বদলাবার জন্য এখানে এসেছো নাকি? চুপ করো তো। ওদের ব্যাপার ওরা বুঝবে!

–আমাদের অনীতাও ওই বয়েসী, সেও যদি…

–ছি ছি ছি, তোমার মুখে কি কোনো কথাই আটকায় না?

প্রতাপ চুপ করে গেলেও নিজের নাতনী সম্পর্কে তিনি একেবারে সন্দেহমুক্ত হতে পারেন না। অনীতার কাছেও তার ছেলেবন্ধু আসে, সে তখন দরজা বন্ধ করে দেয়। অনীতার কথাবাতার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ একটা পরিণত মন উঁকি মারে। সে যেন বাচ্চা নয়। দেশে এই বয়েসের মেয়েদের মুখে সেরকম কথা শোনার কথা কল্পনাও করা যায় না।

মাস দেড়েক বাদে এক রাত্রে প্রতাপ হঠাৎ মমতাকে বলেছিলেন, এবার বাড়ি চলো! আর এখানে আমার ভালো লাগছে না!

সে রাতে অতীন আর শর্মিলাকে একটা নেমন্তন্নে যেতে হয়েছিল। এরকম ওদের মাঝে মাঝে যেতেই হয়। একবার এখান থেকে সত্তর মাইল দূরে আর এক বাঙালী পরিবারের নেমন্তন্নে অতীনরা বাবা-মাকে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে কিছুক্ষণ থাকার পরই প্রতাপ বুঝেছিলেন, তাঁরা দু’জনে সেখানে বেমানান। আর সবাই যুবক-যুবতী, তারা নিজেদের মতন হাসি-ঠাট্টা করে, গান গায়, নাচে, সেখানে দু’জন অভিভাবকশ্রেণীর মানুষ শুধু অন্যদের অস্বস্তির কারণ ঘটায়। প্রথম প্রথম তারা দু’একটা শুকনো ভদ্রতার কথা বলে, তারপর নিজেদের মধ্যে গল্পে মত্ত হয়। প্রতাপ-মমতাকে খেতে দেওয়া হয়েছিল বাচ্চাদের সঙ্গে, তারপর বিশ্রাম নিতে বলা হয়েছিল একটা ফাঁকা ঘরে। প্রতাপ আরও লক্ষ করেছিলেন, সেই পার্টিতে যে-সব বাঙালীরা এসেছিল, তারা কলকাতার খবর কিংবা দেশের কথা জানার জন্য একটুও আগ্রহী নয়, তারা এখানে নতুন বাড়ি কেনা কিংবা গাড়ি বদলানো কিংবা অফিসের খবর কিংবা নিউ ইয়র্ক স্টেটের নতুন গভর্নর কে হবে, সেইসব নিয়ে আলোচনা করছিল। তাহলে কি আলমের কথাই সত্যি? আলম-তুতুলের বাড়িতে একগাদা অল্পবয়েসী ছেলেমেয়ে থাকলেও কখনো প্রতাপ নিজেকে বাতিলের দলে বলে অনুভব করেননি। ওরা তাঁকেও আলোচনায় জড়াতো, তাঁর সঙ্গে তর্ক করতো।

সেই সন্ধেবেলাতেও অতীন আর শর্মিলা তাদের সঙ্গে পার্টিতে যাবার জন্য বাবা-মাকে অনুরোধ করেছিল। ওদের কোনো বন্ধুর ম্যারেজ অ্যানিভাসারির পার্টি, অতীনের বাবা-মা এখানে আছেন শুনে তাঁদেরও নিয়ে যাবার জন্য বিশেষ করে বলেছে। প্রতাপ ততদিনে বুঝে গিয়েছিলেন যে এগুলো এদেশী ভদ্রতা। বাড়িতে বাবা-মা থাকলে তাঁদেরও নিয়ে যাবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হবে, বাবা-মায়েরও ভদ্রতা হচ্ছে, খুব ধন্যবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করা। এদেশে ভদ্রতা মানেই অতিশয়োক্তি, বহু অকারণ কথা খরচ। সারাদিনে কতবার থ্যাঙ্ক ইউ বলতে হয়। কতবার বলতে হয় হাউ নাইস, ইজট ইঁট ওয়ান্ডারফুল!

প্রতাপও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অতীন যেন তাতে স্বস্তি পেয়ে বলেছিল, তাহলে আর অনীতারণকে নিয়ে যাবো না। ওরা তোমাদের কাছেই থাকুক!

লিভিংরুমে বসে প্রতাপ টিভি দেখতে লাগলেন অনেক রাত পর্যন্ত। অনীতাও রাত জাগে, সে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে, তার ঘরেও একটা ছোট টিভি আছে। রণকে ঘুম পাড়িয়ে, অন্যান্য কাজকর্ম সেরে মমতা প্রতাপের পাশে এসে বসতেই প্রতাপ মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, এবার বাড়ি চলো। আমার এখানে আর ভালো লাগছে না। বাবলুকে বলবো, সামনের সপ্তাহেই আমাদের জন্য প্লেনের সীট বুক করতে!

মমতা আকাশ থেকে পড়ে বললেন, এর মধ্যেই ফিরে যাবো মানে? কেন, তোমার এত তাড়া কিসের? ফিরে গিয়ে কী করবো?

–বললাম যে আমার আর ভালো লাগছে না!

–এখনো তে এদেশটার কিছুই দেখা হয়নি। বাবলুরা সামনের মাসে ছুটি নেবেই বলেছে।

–ওদের কবে সময় হবে, ততদিন আমরা এখানে খাঁচার মধ্যে বন্দী হয়ে থাকবো নাকি!

–কে তোমাকে বন্দী করে রেখেছে? রোজ খানিকটা হেঁটে এলেই পারো। কাছেই কী সুন্দর একটা ফরেস্ট, আপেল ফলে থাকে, কত রকম চেরি হয়েছে দেখলাম, কেউ নেয় না।

–মমো, তুমি আমার কথাটা বুঝতে পারছো না? এখানে নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকলে আরও তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাবো।

–দেশে ফিরে গিয়েই বা তুমি কী কাজ করবে এখন?

–নিজের দেশ, নিজের বাড়ি, সেটাই আমাদের পক্ষে সবচেয়ে ভালো জায়গা। রাস্তাঘাটে পাঁচ জনের সঙ্গে কথা বলাও একটা কাজ। এখানে আমাদের কথা বলারও কোনো অধিকার নেই। পাশের বাড়িতে একটা ছেলে বাঁদরামি করলেও কিছু বলতে পারবো না।

একটু থেমে, মমতার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি হঠাৎ উচ্চারণ করেছিলেন সেই কঠোর কথাটা।

তিনি বললেন, বাবলু আর শর্মিলা এত আগ্রহ করে আমাদের এদেশে নিয়ে এসেছে কেন জানো? বাব-মাকে খাতির করার জন্য নয়। এখন আমি বুঝেছি। ওরা আমাদের এনেছে, ছেলে-মেয়েদের পাহারা দেবার জন্য। কেন, তোমার ছেলের বউ তোমাকে নিজের মুখে বলেনি যে আমরা আসবার আগে রণকে পাহারা দেবার জন্য বেবী সীটার লাগতো! সে জন্য অনেক পয়সা খরচ হতো। এখন সেই পয়সাটা বাঁচাচ্ছে!

মমতাও প্রবল বিতৃষ্ণার সঙ্গে বলেছিলেন, ছিঃ! তোমার মনটা এত ছোট! তুমি এত স্বার্থপর। রণ আর অনী বুঝি শুধু বাবলুর ছেলেমেয়ে? ওরা আমাদের নাতি নাতনী নয়? ওদের সম্পর্কে আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই? ভালোবাসা নেই? ওদের কাছে পেয়ে আমি যে কত সুখ পাচ্ছি তা তুমি বোঝো না? শর্মিলা প্রাণ দিয়ে আমাদের যত্ন করে।

কথাটা একবার উচ্চারণ করে ফেলার পর প্রতাপ আর তা ফেরত নেননি। কয়েকদিন ধরে কথাটা মনের মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাঁর ধারণাটাই আরও দৃঢ় হলো।

রক্তের সম্পর্ক! নিজের ছেলে-মেয়ের সঙ্গেই রক্তের সম্পর্ক টের পাওয়া যায় না এক এক সময়, নাতি-নাতনী সম্পর্কে আর কতটা টান থাকতে পারে? দূরত্বই অনেক সম্পর্ক ঘুচিয়ে দেয়। আবার চার-পাঁচ বছর দেখা না হলে অনীতা আর রণ তাঁদের চিনতেই পারবে না। কাছাকাছি থাকলে, নিজের বাড়িতে কোনো শিশু থাকলে তার ওপর মায়া পড়ে, সে কি শুধু রক্তের সম্পর্কের জন্য?

অতীন আর শর্মিলা বাবা-মাকে দিয়ে শুধু বেবী সিটিং করাবার জন্যই এদেশে নিয়ে আসেনি, তারা এতটা স্বার্থপর নয় নিশ্চয়ই, প্রতাপ তা বোঝেন। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি প্রতাপদের সেই ভূমিকাই তো পালন করতে হচ্ছে! এখানে প্রতাপের নিজস্ব চলাফেরার স্বাধীনতা নেই, পুত্র ও পুত্রবধূর ওপর সব সময় নির্ভরশীল, গাড়ি ছাড়া কোথাও যাওয়া যাবে না। এই অবস্থাটা প্রতাপ কিছুতেই সহ্য করতে পারছেন না।

প্রতাপ জেদ ধরে রইলেন, অতীন-শর্মিলার হাজার পেড়াপীড়িতেও তিনি আর কর্ণপাত করলেন না। এমনকি মমতাকে ওখানে রেখে তিনি একা ফিরে আসতেও রাজি ছিলেন। মমতা অবশ্য তা হতে দেননি, তিনিও ফিরলেন স্বামীর সঙ্গে। কিন্তু সে জন্য তিনি স্বামীকে আজও ক্ষমা করতে পারেননি!

হাজরা পার্কের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে প্রতাপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এখানে তিনি প্রায়। ঘণ্টাখানেক ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। শেষ হয়ে এসেছে বিকেল। বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করছে না, অথচ কোথায় যাবেন?

রাস্তাটা পার হয়ে তিনি হাঁটতে লাগলেন উদ্দেশ্যহীন ভাবে।

৬৪.৫ তারপর কী যেন

অসহায় মেয়ে মোর
শানিত ছুরিকা হানিয়া কণ্ঠে তোর
তাণ্ডবলীলা শুরু করেছিল, রক্তবসনা তুই
পূত পবিত্র এক মুঠি ফুল; শেফালী চামেলী জুই…

তারপর কী যেন? পরের লাইনগুলো মনে পড়ছে না কেন? স্মৃতি গোলমাল হয়ে যাচ্ছে বারবার। মানুষের স্মৃতিই যদি নষ্ট হয়ে যায়, তা হলে আর বেঁচে থেকে লাভ কী?

আজ সুন্দর বাতাস দিচ্ছে। রোদ বেশ চড়া হলেও জামরুল গাছটার নীচে বেশ অনেকখানি। ছায়া। আয়েশা কিন্তু রোদ্দুরের মধ্যে বসেই কতকগুলো গাঁদাফুলের চারার তলার মাটি খুঁড়ছে। মাটি ঘাটতে কী ভালোবাসে ঐ মেয়েটা! এটা খুব আশ্চর্যের যদিও, তের-চোদ্দ বছরের কিশোরী মেয়ে, শহরের ইস্কুলে পড়ে, ইংরিজি গান গায়, তার মাটির প্রতি এত টান! হালকা ঘি রঙের শালোয়ার কমিজ পরেছে আয়েশা। বয়েসের তুলনায় চেহারাটা বেশ বড়সড়। মাতামহীর ধারা পেয়েছে, অনেকেই ওকে যুবতী বলে ভুল করে, এর মধ্যেই দু এক জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করেছে।

একটা চাকা লাগানো চেয়ারে বসে মামুন মুগ্ধ হয়ে নাতনীকে দেখছেন। মেয়ে-জামাই থাকে চিটাগাং। তারা বেশি আসতে পারে না, কিন্তু স্কুল ছুটি হলেই আয়েশা চলে আসে এখানে। মামুনের ছোট মেয়ে তার স্বামীর সঙ্গে থাকে দুবাইতে, তিন বছর দেখা হয়নি তার সঙ্গে।

আয়েশাকে দেখতে দেখতে মামুনের মাঝে মাঝে দৃষ্টিবিভ্রম হচ্ছে। তিনি ফিরে যাচ্ছেন অনেক বছর পিছনে, যেন তিনি ওখানে হেনাকেই দেখতে পাচ্ছেন। হেনার অবশ্য কোনোদিনই গাছপালার প্রতি ঝোঁক ছিল না। এরকমভাবে সে মাটিও ঘাঁটতো না। ওকে দেখে মামুনের আবার বেগম সুফিয়া কামালের কবিতাটাও মনে পড়ছিল। যাকে নিয়ে এই কবিতাটা লেখা, সেই মেহেরুননেসা নামের মেয়েটির বয়েস বোধহয় আয়েশারই সমান ছিল। এক সময় পুরো কবিতাটাই মামুন মুখস্থ বলতে পারতেন গড়গড় করে।

একটা মটোর সাইকেলের শব্দ হচ্ছে না? মামুন চমকে উঠলেন। আলতাফ এসেছে নাকি? মামুন ভয় পাওয়া চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। গেটের কাছে কেউ নেই। সামনের রাস্তাটাও ফাঁকা, দুটো ছাগল মুচমুচ করে ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে। একটা শান্ত সকাল। শুধু যে স্মৃতিটাই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে তা নয়, মাঝে মাঝে মামুন এরকম শব্দও শোনেন। এক সন্ধেবেলা মটোর সাইকেলের বিকট গর্জন তুলে আলতাফ এসে হাজির হয়েছিল এই বাড়িতে, সে কতকাল আগের কথা। কিন্তু ঐ আলতাফই মামুনের জীবনটা বদলে দিয়েছিল।

ঐ আয়েশাকে মামুন ওর জন্মের পর পুনপুনি বলে আদর করতেন। সেই নামটাও থেকে গেছে। মামুন ডাকলেন, ওরে পুনপুনি, একবার এদিকে আয় তো!

মাটিতে ল্যাটা মেরে বসেছে আয়েশা, সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। মামুন আবার ডাকতেই সে কাছে এসে বললো, কী? পানি খাবে?

মামুনের জল তেষ্টা বেশি। সারাদিন ধরে তিনি বারবার জলপান করেন, নইলে গলা শুকিয়ে যায়। ডাক্তাররাও তাঁকে যত খুশী জল খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তাঁর চেয়ারের কাছেই রয়েছে একটা জগ আর গেলাস। আয়েশা এক গেলাস পানি ভরে দেবার পর মামুন মিনতির ভঙ্গিতে বললেন, একটা সিগারেট ধরায়ে দে, সোনা!

আয়েশা চক্ষু পাকিয়ে বললো, আবার? তিনটা দিয়েছি সকাল থেকে।

মামুনের ডান হাতটা প্রায় অসাড়, নিজে নিজে দেশলাই জ্বালতে খুবই অসুবিধে হয়। পত্নী, আত্মীয় বন্ধু ও চিকিৎসকদের প্রবল নিষেধ সত্ত্বেও মামুন সিগারেটটা ছাড়তে পারেন নি। সিগারেটে আর এখন তাঁর কী ক্ষতি হবে, তিনি তো আর আয়ু চান না! নিজে সিগারেট ধরাবার জন্য মামুন একটা লাইটার যোগাড় করেছিলেন, ফিরোজা সেটা কোথাও সরিয়ে রেখেছেন।

আয়েশা একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে আবার ফিরে গেল গাঁদা ফুল গাছগুলোর কাছে। দু একটা টান দেবার পর, মাথাটা একটু চনমনে হতেই কবিতাটার বাকি লাইনগুলো মনে এসে গেল।

ভালোবেসেছিলি এই ধরণীরে, ভালোবেসেছিলি দেশ
তাই বুঝি তোর কুমারী তনুতে জড়ায়ে রক্ত বেশ
। প্রথম শহিদ বাংলাদেশের মেয়ে
দুটি ভাই আর মায়ের তপ্ত বক্ষ রক্তে নেয়ে
দেশের মাটির ‘পরে
গান গাওয়া পাখি, নীড় হারা হয়ে
লুটালি প্রবল ঝড়ে…

কবিতাটা বিড়বিড় করতে করতে মামুনের দু’ রকম অনুভূতি হলো। তাঁর স্মৃতি যে একেবারে নষ্ট হয়নি, এতে তিনি কিছুটা চাঙ্গা বোধ করলেন, তারপরেই তিনি আত্মগ্লানির সঙ্গে ভাবলেন, আরে ছি ছি ছি, আয়েশাকে দেখে একী অলক্ষুণে কবিতা মনে পড়লো তার! এ তো একাত্তরের এক শহিদ মেয়েকে নিয়ে লেখা, আর আয়েশার মতন সুন্দর, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল মেয়ে, সামনে তার সোনালি ভবিষ্যৎ…

তিনি আবার আয়েশাকে কাছে ডাকলেন, তার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বললেন, ওরে পুনপুনি সোনা, তুইও কি বিয়ে করে সৌদি-দুবাই কিংবা বিলাত-অ্যামেরিকা চলে যাবি? আমি যতদিন বেঁচে আছি, যাইস না! তোর এই বুড়ো দাদাটারে আর তো কেউ ভালোবাসে না!

আয়েশা বললো, তুমি বেশি বেশি বুড়া বুড়া ভাব করবে না তো! তুমি এখনও দিব্যি হাঁটতে পারো। ওঠো, আমার সাথে হাঁটো! এইবার একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা ঢাকায় যাবো। মা বলেছে, তোমাকেও নিয়ে যাবে।

মামুন আর্তস্বরে বলে উঠলেন, না, না, আমি আর ঢাকায় যাবো না! ঢাকা আমার সহ্য হয় না।

বাড়ির ভেতর থেকে নাস্তা খাবার জন্য ডাক এলো আয়েশার। মামুন সকালবেলা গরম পানিতে মধু আর লেবুর রস খান শুধু, তিনি বসে রইলেন গাছতলায়। তাঁর ভুরু দুটো কুঁচকে গেছে। ঢাকার নাম শুনলেই তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তাঁর জীবন থেকে তিনি ঢাকা শহরটা মুছে দিতে চান। তিয়াত্তর সালের পর থেকে তিনি আর একবারও পা দেননি ঢাকায়। মাদারিপুরের এই গ্রামের বাড়িতেই তিনি শান্তিতে থাকেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর তাজউদ্দিনের অনুরোধে মামুন একটা সরকারি কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সময় কাজের মানুষের খুব অভাব ছিল। একটা নতুন দেশ গড়তে গেলে যে সব সমর্থ ও বুদ্ধিমান লোকের প্রয়োজন হয় তাদের অনেককেই তো মেরে ফেলেছিল পাকবাহিনী। তারা ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জিনিয়ারদেরও বাদ দেয়নি। মামুন ত্রাণ ও পুনবার্সনের দায়িত্ব নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিলেন, চতুর্দিকে চুরি-জোচ্চুরি, বিদেশ থেকে সাহায্য পাওয়া ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ছিনিমিনি চলছিল, দেশে একবার অরাজকতা এসে গেলে একদল লোক লুটেপুটে খাবার চেষ্টা করবেই। তবু মামুন পুনবাসনের কাজটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। দিনরাত পরিশ্রম করতেন। শত শত পরিবারের ট্র্যাজেডির কাহিনী শুনতে শুনতে তাঁর মেজাজ সবসময় উগ্র হয়ে থাকতো। একদিন একটি অসৎ কর্মচারিকে হাতেনাতে ধরে ফেলে তিনি তাকে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছিলেন। মামুনের মতন ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষের ওরকম ব্যবহার দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল সকলে। মামুনের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে। কারুর কোনো প্রশ্ন করার সাহস ছিল না বলেই কেউ তাঁর ঐ ব্যবহারের প্রতিবাদ করেনি। সেই কর্মচারিটি তাঁর পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিল। শেখ সাহেব নিজে মামুনকে ধানমুণ্ডির বাড়িতে ডেকে তাঁর কাজের তারিফ করেছেন।

মামুন সে সময় নিজের স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা করতেন না। তিনি একা নন, তাঁর মতন কাজ-পাগল সেরকম আরও অনেকে ছিল। একদল লোক যেমন লুটপাট-তছরূপের সুযোগ। নিচ্ছিল, সেই রকমই আবার একদল মানুষ দেশ গড়ার উদ্যমে মেতে উঠেছিল। শেখ সাহেব নিজেও চার পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমোবার সময় পেতেন না। ঢাকা শহরে তখন চলছিল ধারাবাহিক উন্মাদনা। সদ্য পাওয়া স্বাধীনতা নিয়ে তখনও যেন একটা দিশাহারা অবস্থা। ভারত থেকেও দলে দলে মানুষ আসছিল। নানা রকম সরকারি ডেলিগেশান ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা, দু পক্ষেরই তখন প্রবল উচ্ছাস। হঠাৎ যেন মামুনের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতন হলো। বাবুলের সঙ্গে মঞ্জুর বিবাহবিচ্ছেদ, এবং তার জন্য তিনিই দায়ী!

বাবুলের মতন একজন শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষ যে এরকম একটা অদ্ভুত গোঁয়ার্তুমি করতে পারে, তা তার বন্ধুরাও কল্পনা করতে পারেনি। বাবুল যে মুক্তিযুদ্ধে দারুণ সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে, সে কাহিনীও মামুন পরে শুনেছেন। কিন্তু সে সম্পর্কে কোনো কথা বলা চলবে না তার সঙ্গে, যেন ঐ বিষয়ে আলোচনাই নিষিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা কলকাতায় চলে গিয়েছিল, তাদের সম্পর্কে বাবুল সবসময় বক্রোক্তি করতে, যেন তারা সবাই সুবিধাবাদী, পলাতক। কিন্তু বিদেশে না গেলে কি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গড়া যেত? সেরকম একটা সরকার গড়া না হলে যুদ্ধ পরিচালনা করতে কে? অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রই বা সাহায্য দিত কার হাতে? বড় বড় সব নেতারা কারাবন্দী হলে কিংবা টিক্কা খানের নির্দেশে নিহত হলে লাভ হতে কী? এক শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিই তো কী দারুণ অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছিল। কলকাতায় যারা গিয়েছিল, তাদের প্রায় সকলেই যে কত কষ্ট, উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটিয়েছে, সে সব কথা বাবুল শুনতেই চায়নি। অথচ মামুন যখন পঁচিশে মার্চের পর ঢাকা ছেড়ে চলে যান ভারতের দিকে, তখন মঞ্জুকে সঙ্গে পাঠাতে সে একটুও আপত্তি করেনি। বরং আগ্রহই দেখিয়েছিল। সেই বাবুল মঞ্জু সম্পর্কে অমন কুৎসিত একটা সন্দেহ করলো! মঞ্জুও গান গেয়ে, মিছিলে-সমাবেশে যোগ দিয়ে স্বাধীনতার লড়াইতে সামান্য কিছু সাহায্য কি করেনি? যুদ্ধ কি শুধু কামানবন্দুক নিয়েই হয়? শত্রুর বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলাও একটা বড় কাজ।

সাধ করে যেন আরও বেশি অপমানিত হবার জন্য বাবুলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মামুন। ওঃ কী কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেছিল বাবুল সেদিন! এ তো ঈর্ষা নয়, অন্ধ ক্রোধ। একটা যুদ্ধ এসে বাবুল চৌধুরীকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। মামুনের প্রতি তার যে কেন এত ঘৃণার ভাব, তা কিছুতেই বোঝা যায় না। মঞ্জু সম্পর্কেও তার মনে সামান্য দুর্বলতাও অবশিষ্ট ছিল না। মঞ্জুর ছেলে তখন ছোট, গর্ভে একটি সন্তান এবং সে সন্তান যে বাবুলেরই তাতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। মঞ্জুর সঙ্গে পৃথিবীর আর দ্বিতীয় কোনো পুরুষের সেরকম ঘনিষ্ঠতা হয়নি, তবু বাবুল সেই অসহায় অবস্থার মধ্যে মঞ্জুকে বলেছিল, তুমি যেখানে খুশী চলে যেতে পারো! মামুনকে সে তিক্ত কণ্ঠে জানিয়েছিল, আমি আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা করতে চাই না। আমার বাসায় ইউ আর নো লংগার ওয়েলকাম। মঞ্জুকেও আমি আর আমার স্ত্রী মনে করি না। শী ইজ অল ইয়োরস!

তবু মামুন বাবুলের হাত জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিলেন। মঞ্জু বিনা দোষে শাস্তি পাবে, এটা যে তাঁর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। তিনি যত দুর্বলতা দেখিয়েছেন, বাবুল ততই বেশি বিদ্রূপ করেছে। তখন মামুন ভেবেছিলেন, তিনি দূরে সরে গেলে হয়তো আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবুল তো মানুষ খারাপ নয়। মামুন একেবারে চোখের আড়াল হয়ে গেলে নিশ্চয়ই তার রাগ কমবে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে মঞ্জু ও তার সন্তানদের ফিরিয়ে নেবে। তাজউদ্দিনের সনির্বন্ধ অনুরোধেও কর্ণপাত করেননি মামুন। নিজের পদে ইস্তফা দিয়ে, ঢাকা থেকে সমস্ত পাট চুকিয়ে চলে এলেন মাদারিপুরে। কিন্তু বাবুল যখন আর একটা বিয়ে করলো

–আদাব মামুনসাহেব! ভালো আছেন?

মামুন গেটের দিকে ঘাড় ফেরালেন, কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সমস্ত রোমকূপে শিহরন বোধ করলেন। কেউ নেই। ইদানীং বিশেষ কেউই তাঁর কাছে আসে না। অথচ তিনি স্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন এবং চেনা কণ্ঠস্বর। গোবিন্দ গাঙ্গুলী না? সেই ভদ্রলোক মাঝে মাঝে আসতো।

মামুন গলা তুলে বললেন, কে? কে ওখানে? গোবিন্দ নাকি? ভিতরে আসো।

কোনো উত্তর নেই। গোবিন্দ গাঙ্গুলী এলে লুকিয়েই বা থাকবে কেন? মামুন ভুল শুনেছেন। তাছাড়া, গোবিন্দ গাঙ্গুলী তো আর থাকে না এখানে? নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে গেল ভারতে। নাকি মারা গিয়েছে সে? ঠিক মনে পড়ে না। বেশ সাহসী ধরনের মানুষ ছিল, একাত্তরেও দেশ ছেড়ে যায়নি।

আবার মটোর সাইকেলের শব্দ। না, এটাও ভুল। এই শব্দটা তাকে বড় বেশি জ্বালাতন করে। আলতাফ, আলতাফ, সে-ই সব গণ্ডগোলের মূল। আলতাফের সঙ্গে পরিচয় না হলে তার ছোটভাই বাবুলের সঙ্গে মঞ্জুর বিয়েও হতো না।

গাঁদা গাছগুলোর ঝাড়ের সামনে, যেখানে একটু আগে আয়েশা বসেছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে গোবিন্দ গাঙ্গুলী। গায়ের রঙ কালো, শক্ত সমর্থ চেহারা, একটা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো, লুঙ্গির ওপর ফতুয়া পরা। ডান বাহুতে একটা রুপোর তাবিজ।

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, কী গোবিন্দ? ফিরে এসেছো? বেশ করেছে। তোমার বউ আর পোলাপানেরা সব ভালো আছে তো?

গোবিন্দ হেসে বললো, আছে একরকম আপনাদের আশীর্বাদে। আমার লঞ্চটা মাদারিপুর ঘাটে খারাপ হয়ে পড়ে আছে। সেইটার জন্য আসলাম।

মামুন বললো, তোমার লঞ্চ ডুবে গিয়েছিল না?

গোবিন্দ বললো, আবার ভাসিয়ে তুলেছি। আমি কি, এত সহজে ছাড়বার পাত্তর?

মামুনের চোখে একটা ঘোর লাগলেও তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর সামনে গোবিন্দ গাঙ্গুলী দাঁড়িয়ে নেই। সকালের রোদ্দুরেও তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হচ্ছে। তিনি দেখছেন একটা ছায়ামূর্তি। গোবিন্দ গাঙ্গুলী মরে গেছে কবে!

তবু তিনি বললেন, তুমি আবার এখানে লঞ্চ চালাবে কী করে? তুমি না তোমার ফ্যামিলি নিয়ে ইণ্ডিয়ায় চলে গ্যালে?

–আমি যাই নাই, মামুন সাহেব। শেখ মুজিব খুন হবার পর আপনি যখন ইণ্ডিয়ায়। পালালেন, তখন আমার ফ্যামিলিও সেই স্টিমারে গিয়েছিল। ওদের পাঠিয়ে দিয়েছি, কিন্তু নিজে কখনো দেশ ছাড়ি নাই। এই একটা জীবনে কত কী দাখলাম!

–না, না, আমিও পালিয়ে যাই নাই। সে সময় আমাকে চিকিৎসা করাবার জন্য সবাই জোর করে কলকাতায় পাঠালো।

আয়েশা এসে মামুনকে ঝাঁকানি দিয়ে বললো, বিড়বিড় করে কী বলছো, দাদা? ঘুমিয়ে। পড়েছিলে নাকি? নবোদা জিজ্ঞেস করলো, তুমি এখন গোসল করতে যাবে? তোমাকে তেল মাখিয়ে দেবে?

মামুন বললেন, না, পরে। আচ্ছা পুনপুনি, তোর মনে আছে, আমি সেভেন্টি ফাইভে যে কলকাতায় গেলাম, সে কি শেখ সাহেব শহিদ হবার পরে না আগে?

আয়েশা তার গোলাপী ঠোঁটটা উল্টে বললো, সে আমি কী জানি!

মামুন হেসে বললেন, ঠিকই তো, তোর তখন দুই-তিন বছর বয়েস বোধহয়। তোর কী করে মনে থাকবে! পরেনা, আগেই। শেখ সাহেবকে ওরা খতম করে দিল অগাস্ট মাসে, আমি কলকাতায় গেলাম জুলাই মাসে। হার্টে আবার বেদনা শুরু হলো। আমি কিছুতেই ঢাকায় যাবো না, তাই তোর মা-বাবা আমায় জোর করে পাঠালো কলকাতায়। সেখানের ডাক্তাররা আমার চিকিৎসা আগে করেছে।

–শেখ মুজিবকে ওরা কেন মেরেছিল?

–হায় রে কিশোরী কইন্যা, এর উত্তর আমি তোরে কী করে দেবো? বড় হয়ে এর উত্তর তোদেরই খুঁজে নিতে হবে। আজও তো বাংলাদেশ যুদ্ধের ইতিহাস লেখা হলো না। তোদের জেনারেশানই রচনা করবে স্বাধীন বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস। আর একটা সিগারেট ধরায়ে দিবি, সোনা!

–না, নো মোর সিগারেট বিফোর লাঞ্চ!

আয়েশা একটা পাখির মতন যেন ফুরুৎ করে উড়ে গেল বাগানের দিকে। মামুনের মনে হয়, তাঁর এই আদরের নাতনীটার মুখখানা ফুলের মতন আর শরীরটা পাখির মতন। কিন্তু দুষ্ট মেয়েটা সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই নিয়ে চলে গেল! কেন আর তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।

মুজিবের মৃত্যুর আগেই তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন, তা ঠিক, তবু তিনি সেই সকালের দৃশ্যটা অবিকল চোখের সামনে দেখতে পান। যেন তিনি সেদিন উপস্থিত ছিলেন বত্রিশ নম্বর ধানমুণ্ডির সেই বাড়িতে। ট্যাঙ্ক নিয়ে ওরা মারতে গিয়েছিল, সৈন্যের পোশাক পরা হলেও তারা তো পাকিস্তানী না, বাংলাদেশেরই মানুষ। ঘুম থেকে উঠে এসে, গুলিগোলার আওয়াজে খুব বিরক্ত হয়ে তিনি ওদের ধমক দিতে এসেছিলেন। তিনি জাতির পিতা, এদেশের সমস্ত মানুষই তাঁর সন্তান, তিনি ভেবেছিলেন তাঁর ধমক শুনে ছেলেপুলেরা ভয় পেয়ে মাথা নীচু করে, রাইফেলের নল নামিয়ে চলে যাবে। হায় রে, আজকাল ছেলেপেলেরাও কি সব সময় বাবা-মায়ের ধমক শোনে? বাপ-মাকেও সেরকম শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য হতে হয়। দোতলায় সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে শেখ সাহেব হাত তুলে গর্জে উঠলেন, এই, তোরা বেয়াদপি করতে এসেছিস কেন? এর উত্তরে এক ঝাঁক তপ্ত বুলেটে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেল। মৃত্যুর আগে তাঁর সারা মুখে লেগেছিল ভয়, না বেদনা, না শুধু বিস্ময়? সিঁড়ির মাঝখানে পড়ে গিয়ে তিনি আর ক’ মুহূর্ত বেঁচে ছিলেন? তিনি কি জেনে গিয়েছিলেন যে আততায়ীরা ওপরে উঠে তাঁর স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে, ভাইপো-ভাগ্নীদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারছে! তিনি শুনতে পেয়েছিলেন তাঁর শিশুপুত্র রাসেলের মৃত্যু-আর্তনাদ?

পাকিস্তানের জেল মানে বাঘের গুহা। সেখান থেকেও ছাড়া পেয়ে এসে শেখ সাহেব কী করে কল্পনা করবেন যে তাঁকে প্রাণ দিতে হবে বাংলাদেশের মানুষের হাতে। অবশ্য, যে তাজউদ্দিন সাহেব ছিলেন প্রথম বাংলাদেশ সরকার গড়ার প্রধান স্থপতি, যাঁর দেশাত্মবোধ নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না, সেই তাজউদ্দিন সাহেবকে শেখ মুজিব নিজে বরখাস্ত করবেন, তাই-ই বা কে কল্পনা করেছিল? যে-গণতন্ত্রের নামে শেখ সাহেব সারা জীবন গলা ফাটালেন, শেষে তিনি নিজেই হত্যা করতে গেলেন সেই গণতন্ত্রকে। খবরের কাগজের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের অধিকার খর্ব করতে করতে শেষ পর্যন্ত শেখ সাহেব জারি করতে চাইলেন একদলীয় শাসন! বাকশাল! রাষ্ট্রপতি আবু সয়ীদ চৌধুরীকে সরে যেতে হলো, মুজিব স্পষ্টত এগিয়ে যেতে লাগলেন একনায়কতন্ত্রের দিকে। পাকিস্তানী আমলের দুঃসহ স্মৃতি তখনও সকলের মনে জ্বলজ্বল করছে। শেখ সাহেব যে-দিন তাজউদ্দিনকে সরিয়ে দেন, সেইদিনই মামুন বুঝেছিলেন, আওয়ামী লীগের ধ্বংস আসন্ন।

কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন করার সময় মামুন একটা গল্প শুনেছিলেন নবাব ফারুকীর কাছে। উনি এক সময় ছিলেন স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেলা। এক সময় ছাত্ররা ঐ সুরেন বাড়জ্যেকে এমনই শ্রদ্ধা করতো যে একবার তাঁকে একটা জুড়িগাড়িতে চড়িয়ে কোনো সভায় নিয়ে যাওয়ার সময় ঘোড়াদুটো খুলে দিয়ে ছাত্ররা নিজেরাই সেই গাড়ি টেনেছিল। আবার এক সময় ঐ সুরেন বাড়জ্যেকেই ছাত্ররা ফুলের মালা পরাবার বদলে জুতোর মালা পরিয়েছিল। রাজনীতি এমনই বস্তু। তবে, সেই সময় এমন খুনোখুনি ছিল না। শেখ মুজিব ভুল রাস্তায় যাচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু যারা তাঁকে নৃশংসভাবে খুন করতে গেল, তারাও দেশপ্রেমিক কিংবা গণতন্ত্রের পূজারী কিংবা নিপীড়িত জনগণ নয়, তারাও ক্ষমতালোভী! ইতিহাস থেকে এরা শিক্ষা নেয় না। একজনকে খুন করে সেই রক্তাক্ত সিংহাসনে কে কবে সুস্থিরভাবে বসতে। পেরেছে? খন্দকার মুস্তাক, খালেদ মশারফ, জিয়াউর রহমান…। খালেদ মশারফ-এর ঠিক যে কী হয়েছিল, তা মামুন আজও জানতে পারেননি, কেউ স্পষ্টাস্পষ্টি খুলেও বলে না। এমন চমৎকার হীরের টুকরো ছেলে, এত চেনা, মামুনের আপার বাসায় এসে কতবার ভাত খেয়ে। গেছে। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ছিল খালেদ। লড়াই করতে করতে একবার গুরুতর আহতও হয়েছিল, সে শেখ সাহেবের ইন্তেকালের পর আর একটা অভ্যুত্থান ঘটাতে গিয়েছিল? ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নায়কদের মতন এমন করুণ চরিত্র আর হয় না, তারা নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

দোতলায় সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন শেখ মুজিব, সদ্য ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন, নীচের দিকে এল এম জি হাতে সৈন্যদের দেখতে পেলেন, হয়তো মুখ চিনতে পেরেছেন দু’ একজনের, ভুরু তুলে তিনি তাঁর গম্ভীর গলায় গর্জে উঠলেন, এই, তোরা মনে করেছিস কী? সঙ্গে সঙ্গে ঘ্যার ঘ্যার ঘ্যার শব্দে গুলি! ঝাঁঝরা শরীরে জাতির পিতা গড়াতে লাগলেন সিঁড়ি দিয়ে, দু চোখে গভীর বিস্ময়, সত্যিই দেশের মানুষ তাঁকে মারলো?

কলকাতায় সেবার মামুন থেকে গেলেন প্রায় ছ’ মাস। অনেকেই তাঁকে ফিরতে বারণ করেছিল। তিনি শেখ সাহেবের ঘনিষ্ঠ মহলের একজন হিসেবে মাকামারা হয়ে গিয়েছিলেন, দেশে ফিরলে তাঁর বিপদের সম্ভাবনা খুব বেশি। জেলখানার মধ্যে তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ নিহত হলেন, এর পর আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের খুঁজে খুঁজে খতম করা হবে, ঠিক একাত্তরে যা হয়েছিল! মামুন বিশ্বাস করতে চাননি, বাংলাদেশ তো পাকিস্তানে আবার মিশে যায়নি, আবার নিজের দেশ থেকে পালাতে হবে কেন? জিয়াউর রহমানকে মামুন তখন অবিশ্বাস করতে চাননি। জিয়াউর রহমানও একজন মুক্তিযুদ্ধের বীরযোদ্ধা, কে-ফোর্সের কমাণ্ডার ইন চীফ, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য জীবন পণ করে লড়েছিলেন না? চিটাগাং রেডিওতে প্রথম স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছিলেন তো তিনিই। কিন্তু মুজিব-হত্যার পর কলকাতায় যারা পালিয়ে এসেছিল, তাদের মুখে মামুন শুনলেন, জিয়াউর রহমান আসলে নাকি রিলাকটান্ট ফ্রীডম ফাইটার, মুক্তিযুদ্ধে পাকেচক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার ঝোঁক ছিল পাকিস্তানেরই দিকে। তাছাড়া তিনি ভীষণ ক্ষমতাপ্রিয়। প্রেসিডেন্টের সিংহাসনে বসেই তিনি প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে লাগলেন। তাঁর রাগ যেন অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরেই বেশি! যারা পাকিস্তানের সমর্থক, এককালের কোলাবরেটর, জিয়ার আমলে, নিশ্চয়ই জিয়ার সমর্থন পেয়ে, তারা প্রকাশ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে আবার হম্বি তম্বি করতে লাগলো! কয়েকজন কুখ্যাত ঘাতক ও দালাল জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী পর্যন্ত হয়ে বসলো! আর যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য লড়াই করেছিল, তারা লুকিয়ে পড়ছে, তারা আর নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয়ই দিতে চায় না! ইতিহাসের এক অসাধারণ লড়াইয়ের এই পরিণতি!

শেখ সাহেব উদারভাবে সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, সেটাই হয়েছিল তাঁর প্রথম ভুল। রাজাকার, আলবদর, লুঠেরা, ধর্ষণকারী, যারা শান্তি কমিটির নামে ঘাতক কমিটি বানিয়েছিল, তাদের তালিকা তৈরি হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি নথিবদ্ধ হচ্ছিল, কিন্তু তাদের কোনো শাস্তিই দেওয়া হলো না। সকলে ঢালাও ক্ষমা পেয়ে গেল! অপরাধের শাস্তির কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো না দেশের মানুষের কাছে। যারা পাকিস্তান আর্মিতে থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তাদের স্বাধীন দেশের আর্মিতে স্থান দিয়ে পুরো র‍্যাংক দেওয়ার মধ্যে কি কোনো বাস্তববুদ্ধির পরিচয় আছে? আসলে শেখ মুজিব স্বাধীন দেশ পাওয়ার আনন্দে শাস্তি দিতে ভুলে গিয়ে শুধু প্রশ্রয় দিয়েই গেছেন। তাঁর নিজের আত্মীয় বন্ধুর ছেলেপুলেরা লুঠতরাজ করছে, তাদের সম্পর্কেও তিনি চোখ বুজে থাকছেন। রেডক্রসের টাকাকড়ি নিয়ে তছরুপের অভিযোগ উঠছে, তিনি কান দিচ্ছেন না। অপোজিশান লীডার হিসেবে যিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠদের অন্যতম, শাসক হিসেবে তিনি ব্যর্থ। তাঁর কি দরকার ছিল প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হওয়ার? তিনি বুঝতে পারেননি যে বেশির ভাগ অপরাধীই নিঃশর্ত ক্ষমা পাবার পর কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে যায় না, তারা আবার মাথায় চড়ে বসে, ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। শেখ মুজিবকে যারা হত্যা করতে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে সেরকম দু চারজন ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছিল না?

জাতির পিতার ঘাতকদের কোনো শাস্তি দিলেন না জিয়াউর রহমান। জেলখানায় কারা তাজউদ্দিনদের খুন করলো? এত বড় বড় নেতাদের জেলখানার মধ্যে অতর্কিতে গুলি করে মেরে ফেলার মতন বীভৎস ঘটনা তো পাকিস্তানী আমলেও ঘটেনি। যাদের নাম বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার কথা, তাদের প্রাণ কেড়ে নিল সৈনিকের পোশাকে আততায়ীরা? আর্মির লোকেরা তাদের চেনে না, এ কখনো হতে পারে? জিয়াউর রহমানের এরকম মনোভাব দেখেই আবার অনেকে আত্মরক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করলো। কেউ কেউ ভারতে, কেউ কেউ ইংল্যাণ্ডে।

মামুন শুনেছেন, কাদের সিদ্দিকীও দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। টাঙ্গাইলের ঐ ছেলেটিকে মামুন আগে চিনতেন না, ওর বড়ভাইয়ের সঙ্গে সামান্য পরিচয় ছিল। একাত্তরের সেই দুঃসহ দিনগুলিতে কলকাতায় বসে মামুন কাদের সিদ্দিকীর অসীম সাহসিকতার কাহিনী শুনে রোমাঞ্চিত হতেন। সেই চরম বিপদের মধ্যেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থেকে সে এক বিশাল মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলেছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর সে শেখ মুজিবের আহ্বানে সদলবলে অস্ত্র ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেনি। মামুন মনে মনে তার নাম রেখেছিলেন, এ যুগের গ্যারিবল্ডি। এইসব দেশপ্রেমিকরা যদি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তবে সেই দেশটাই কত দুভাগা! কোথায় আছে এখন কাদের? যে দেশের স্বাধীনতার জন্য সে অনেকবার জীবন বিপন্ন করেছিল, আজ সেই স্বাধীন দেশে তার ফেরার অধিকার নেই, এজন্য না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে

গাঁদাফুলের ঝাড়টার কাছে আবার এসে দাঁড়িয়েছে দু’জন মানুষ। একজন বেশ কাছে, আর একজন খানিকটা দূরে। কাছের মানুষটি দীর্ঘকায়, সারা মুখ ভর্তি দাড়ি-গোঁফ, মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, চওড়া বুক, হাতের কবজীতে বলিষ্ঠতার স্বাক্ষর, এ কে? চেনা চেনা লাগছে। ও, এই তো কাদের সিদ্দকী? তার চক্ষু দুটি যেন বালবের মতন, সেখান থেকে স্ফুরিত হচ্ছে। অভিমান আর ঘৃণা।

মামুন অস্ফুট স্বরে বললেন, কাদের? বেঁচে আছিস? এখন কোথায় থাকিস তুই?

কাদের বললো, হ্যাঁ, বেঁচে আছি! সহজে মরবো ভেবেছেন? আবার ফিরে আসবো এই দেশে, ইনসাল্লা, এই দেশটাকে সত্যি সত্যি স্বাধীন করতে হবে। সেজন্য আপনারা কতদূর কী চেষ্টা করছেন, মামুনভাই?

মামুন একটা হাত তুলে বললেন, আমার কথা বাদ দাও। আমার সূর্য অস্ত গেছে আমার। আর কোনো ক্ষমতাই নাই!

দূরে দাঁড়ানো লোকটি বললো, আমিও বেঁচে আছি। আবার লড়াই লাগলে জান কবলু করবো।

ওকেও চিনতে পারলেন মামুন। কয়েক বছর আগে একবার টাঙ্গাইল শহরেই একজন আলাপ করিয়ে দিয়েছিল, ওর পরিচয় শুনে মামুন ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ওর নাম হাবীব, লোকের মুখে মুখে ওর নাম হয়ে গিয়েছিল জাহাজমারা হাবীব। একাত্তরের অগাস্টে ধলেশ্বরী নদীতে সেই বিখ্যাত যুদ্ধের নায়ক। নারায়ণগঞ্জ থেকে সাতটি স্টিমার ও লঞ্চ ভর্তি একুশ কোটি টাকার অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে যাচ্ছিল পাক সৈন্যরা রংপুরের দিকে। টাঙ্গাইলের মাটি-কাটা নামে গ্রামের কাছে সেই জলযানগুলিকে আক্রমণ করে বাঙালীর ছেলেরা। পাকিস্তানী সৈন্যদের তুলনায় কাঁদেরের বাহিনীর হাতে অস্ত্র ছিল সামান্য, কিন্তু বুদ্ধি ও মনের জোর দিয়ে তারা সেই জাহাজগুলো ঘায়েল করে দেয়, প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহ করে নিজেদের জন্য, বাকি গুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই জাহাজমারা হাবীবকে টাঙ্গাইলে যখন দেখেছিলেন মামুন, তখন তার শরীরে মলিন, ছেঁড়া পোশাক, চোখ দুটি ভেতরে ঢোকা, ঠোঁটে তিক্ততার ছাপ। সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব দিয়েছে একটা, আর কিছু দেয়নি। তার এখন সংসার চলে না, সন্তানেরা অনাহারে থাকে। সেদিন হাবীব বলেছিল, গ্রাম থেকে শহরে এসেছি রোজগারের চেষ্টায়, যদি আর কিছু না জোটে, রিকশা চালাবো। সেই রিকশার হ্যাঁন্ডেলে ছোট একটা সাইন বোর্ডে লেখা থাকবে, ‘জাহাজমারা হাবীব বীর বিক্রম।

এই সব খাঁটি বীরদের যথাযোগ্য সম্মান দিল না দেশ, আর বিশ্বাসঘাতকরা হচ্ছে মন্ত্রী আর আমলা। এখন আবার খুব ধর্ম ধর্ম জিগির উঠেছে। দরিদ্র মানুষদের যারা দু’ বেলা আহার্যের সংস্থান করে দিতে পারে না, তারাই বেশি করে ধর্ম গেলাবার চেষ্টা করে।

হাবীব বললো, সেই লড়াইয়ের সময় আমার প্রাণটা গ্যালেই ভালো ছিল। ছেলে-মেয়ের কান্না আর সহ্য হয় না, মামুন সাহেব!

কাদের সিদ্দিকী বললো, কামানবন্দুকের গুলির সামনেও কোনোদিন ভয় পাই নাই। তার বিনিময়ে পেলাম নিবাসন! দেশের মানুষ আমাদের ভুলে গেল এত তাড়াতাড়ি? যারা এখন বাংলাদেশের হতাক, তারা দেশের জন্য কী করেছে? এই প্রশ্ন উঠাবার সাহস কি কারুর নাই? মামুনভাই, আপনিও কি…

মামুন দু’হাতে কান চাপা দিলেন। তিনি কী উত্তর দেবেন এইসব প্রশ্নের?

গাঁদাফুলের ঝাড়টার কাছ থেকে মূর্তিদুটো মিলিয়ে গেছে, মামুন তবু সেই দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আয়েশা কোথায় গেল, তার সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। একবার মামুনের মনে হলো, আজ এতসব পুরোনো কথা মনে পড়ছে কেন? তার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে নাকি? মৃত্যুর ঠিক আগে নাকি সব স্মৃতি একবার ঝলসে ওঠে!

নব এসে বললো, চলেন, ভিতরে চলেন। অনেক বেলা হয়ে গেছে। এবার খাবেন নাবেন। চলেন।

নবর হাত ধরে মামুন উঠে দাঁড়ালেন, আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলেন বাড়ির দিকে। এই নব মামুনের পালিত পুত্র। গত বছর ফিরোজার মৃত্যুর পর সে-ই বলতে গেলে এ বাড়ির কর্তা, মামুনকেও তার হুকুম মেনে চলতে হয়।

মামুন অনুনয়ের সুরে বললেন, অনেকক্ষণ সিগারেট খাই নাই, একটা দিবি?

নব কঠোর ভাবে বললো, না। এখন না। ভাত খাওয়ার পরে একটা পাবেন!

এই নবকে মামুন কুড়িয়ে পেয়েছিলেন সুন্দরবনে।

সেবারে মামুন কলকাতায় গিয়েছিলেন প্রতাপের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে। প্রতাপ এক অদ্ভুত গোঁয়ার মানুষ, সে এদেশে কখনো এলোই না। সে জেদ ধরে আছে, পাশপোর্ট-ভিসা নিয়ে সে তার জন্মস্থান দেখতে আসতে চায় না। যদি কখনো ভিসাব্যবস্থা উঠে যায়, তাহলে সে বেড়াতে আসবে। সে রকম সম্ভাবনাও নেই, প্রতাপের আসাও হবে না। হেনা বাবলির বিয়ের সময় প্রতাপ না এলেও মুন্নির বিয়েতে মামুন না গিয়ে পারেননি।

সেই সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। ভারতে তখন ইন্দিরা গান্ধীর পতন হয়েছিল, কেন্দ্রে শাসকদল হয়েছিল জনতা পাটি, মোরারজী দেশাই প্রধানমন্ত্রী। পশ্চিমবাংলাতেও কংগ্রেসীরা হটে গেছে, বামপন্থীরা সরকার গড়েছে। হঠাৎ দণ্ডকারণ্য থেকে হাজার হাজার রিফিউজি চলে আসতে লাগলো পশ্চিমবাংলায়। এতকাল পরেও তাদের গা থেকে রিফিউজি ছাপটা তুলে ফেলা হয়নি, দণ্ডকারণ্যে তারা নিজেদের নিবাসিত মনে করে।

কী করে যেন তাদের মধ্যে রটে গিয়েছিল যে কংগ্রেস সরকারের পতন হয়েছে বলে এরপর বাঙালী উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবাংলাতেই স্থান পাবে। পঞ্চাশের দশকে বামপন্থী নেতারা বাঙালী উদ্বাস্তুদের বাংলার বাইরে পাঠাবার বিরোধিতা করেছিল না? এখন পশ্চিমবাংলা সরকারের অনেক মন্ত্রীও তো এককালের উদ্বাস্তু। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি ছিল পূর্ব বাংলায়, তিনি নিশ্চয়ই বিধান রায়-প্রফুল্ল সেন-সিদ্ধার্থ রায়দের চেয়ে পূর্ববঙ্গের মানুষের মর্মবেদনা অনেক বেশি বুঝবেন। নদীমাতৃক দেশের এই সব মানুষ মধ্যপ্রদেশের পাহাড়-জঙ্গলে কী করে মানিয়ে নেবে?

কিন্তু বিরোধী পক্ষে থাকা আর সরকার পক্ষে থাকার মধ্যে অনেক তফাত ঘটে যায়। এক কালে যারা উদ্বাস্তুদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন, এখন তাঁরা পশ্চিমবাংলায় আবার এত উদ্বাস্তুদের ভার নিতে রাজি হলেন না। কিন্তু ততক্ষণে উদ্বাস্তুদের স্রোত প্রবল ভাবে এদিকে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। হাজার হাজার থেকে তাদের সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছে গেল। এরা সত্যই ছিন্নমূল, কতবার যে মাথায় ওপরের ছাউনি ছেড়ে পোঁটলা-পুটলি নিয়ে ছেলেমেয়ের হাত ধরে এরা পথে নামলো তার ঠিক নেই। দণ্ডকারণ্যের আশ্রয়ে তারা যদি সামান্য স্বাচ্ছন্দ্য পেতো, তা হলে কি তারা অনিশ্চয়তার দিকে আবার পা বাড়াতে!

পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাঝরাস্তায় তাদের আটকাবার চেষ্টা করলো, কিন্তু সেই জোয়ার সামলানো সহজ কর্ম নয়। উদ্বাস্তুদের এই ঢল কিন্তু কলকাতা আক্রমণ করলো না, তারা এগিয়ে চললো বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে।

কলকাতায় বসে মামুন তখন আতঙ্ক বোধ করেছিলেন। এই উদ্বাস্তুরা সীমান্ত বাংলাদেশে। ঢুকে পড়বে নাকি? তা হলেই সর্বনাশ! এমনিতেই জিয়াউর রহমানের আমল থেকে ভারত-বিরোধী হাওয়া বেশ গরম, তারপর উদ্বাস্তুরা গেলে সকলেই মনে করবে, ভারত সরকার চক্রান্ত করে হিন্দুদের পাঠিয়েছে। এই মতলবেই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ভারত সরকার মদত দিয়েছিল! এইসব দেশত্যাগী হিন্দুরা এত বছর বাদে যদি প্রাক্তন জমি-বাড়ি দাবি করে বসে, তা হলে এক সাঙ্ঘাতিক হাঙ্গামা বেধে যাবে। শুধু হিন্দুরাই তো ওদিক থেকে আসেনি, ভারত থেকেও বহু সহস্র মুসলমান চলে গেছে বাংলাদেশে। কলকাতার উপকণ্ঠে যে এককালে বহু মুসলমানের বাস ছিল, তা তো মামুন নিজের চোখেই দেখেছেন। সেইসব মুসলমানরাও যদি এখন কলকাতার জায়গা-জমি দাবি করে? এটা কিছুতেই আর সম্ভব নয়। দু দিকেই অনেক ট্রাজেডি ঘটে গেছে তা ঠিক, কিন্তু এখন আর নতুন করে তার সুরাহা করা যাবে না। দেশবিভাগকে এখন বাস্তব সত্য বলে মেনে নিতেই হবে। প্রতাপ যাই-ই বলুন, ভিসা-পার্টের এই জন্যই দরকার আছে।

উদ্বাস্তুরা অবশ্য সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করলো না। তারা চায় সুন্দরবনের দ্বীপগুলিতে বসতি স্থাপন করতে। সেখানে তারা মাছ ধরবে, ধান চাষ করে জীবিকানির্বাহ করবে, এইসব কাজই তারা ভালো জানে, তারা আর সরকারের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায় না।

কিন্তু সুন্দরবনে ব্যাঘ্র প্রকল্প হয়েছে, বাঘদের বাঁচিয়ে রাখা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। অরণ্য সংরক্ষণ না করলে পরিবেশ দূষণ হবে, ওখানে মানুষের পঙ্গপালদের থাকতে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া মোরারজী দেশাইয়ের কঠোর নির্দেশ, কিছুতেই উদ্বাস্তুদের প্রশ্রয় দেওয়া হবে না, সরকার তাদের যেখানে থাকতে দিয়েছে, সেখানেই তারা থাকতে বাধ্য। পশ্চিমবাংলা সরকারও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উদ্বাস্তুদের ফেরত পাঠাতে বদ্ধপরিকর হলো। প্রথমে ভালো ভাবে বোঝাবার চেষ্টা, তারপর জোর-জবরদস্তি। তাদের র‍্যাশন বন্ধ করে দেওয়া হলো, তারা যাতে স্থানীয় ভাবে কোনোক্রমেই কেনো কাজ জোটাতে না পারে, পশ্চিমবাংলায় বসে এক পয়সাও রোজগার করতে না পারে, তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হলো সবরকম। উদ্বাস্তুদের সম্বল কিছুই নেই, তারা ঘটিবাটি বিক্রি করে চালালো কয়েকটা দিন, তারপর স্রেফ অনাহার। তবু তারা দাঁতে দাঁত দিয়ে বাংলার মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চায়। এতই তাদের মাটির টান? বাংলা। ভাষার প্রতি টান? কিন্তু প্রাণের দায় দেখা দিলে মাতৃভূমি বা মাতৃভাষার টান কিছুই না! অনাহারের সঙ্গে সঙ্গে এলো রোগ। পট পট করে শিশু ও বৃদ্ধ বৃদ্ধারা মরতে লাগলো। হাসনাবাদ বসিরহাটে আবার জ্বলতে লাগলো গণ-চিতার আগুন। সরকার সেই ক্ষুধার্ত, ভয়ার্ত মানুষগুলোর চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখলে খালি ট্রেন। ইচ্ছে করলে ফিরে যেতে পারো, অথবা মরো।

এক সময় শুরু হলো ফেরার পালা। দণ্ডকারণ্য ছেড়ে স্বজাতির কাছে যারা আশ্রয়ের জন্য এসেছিল, তারা এখানকার বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে, সর্বস্বান্ত হয়ে আবার ফিরে গেল দণ্ডকারণ্যে।

অনেকেই ফিরলেও পঁচিশ তিরিশ হাজার মানুষ কিছুতেই যেতে চাইলো না শেষ পর্যন্ত। তাদের এক নেতার নাম হারীত মণ্ডল, সে আগে দু’একবার গোপনে এসে এই এলাকাটা সরেজমিনে তদন্ত করে গিয়েছিল। এই পরিবেশই তাদের পক্ষে ঠিক ঠিক মানানসই। এতবড় সুন্দরবনের দু’একটি দ্বীপ তাদের জন্য ছেড়ে দিলে কী এমন ক্ষতি হবে সরকারের? সুন্দরবনে যে একেবারেই মানুষ থাকে না, তা তো নয়!

তারা মরিয়া হয়ে পড়ে রইলো, হারীত মণ্ডল তাদের বোঝাতে লাগলো, যদি মরতে হয়, মরবো এই মাটিতেই! দণ্ডকারণ্যের আদিবাসীদের হাতে মার খাওয়ার বদলে না হয় বাঙালীরাই। আমাদের মারুক!

ঐ অবুঝ উদ্বাস্তুদের দল যাতে নদী পার হতে না পারে, সেইজন্য সরকার সেদিককার ঘাট থেকে সরিয়ে দিল সমস্ত নৌকো, বন্ধ করে দিল স্টিমার সারভিস। সুন্দরবনের নদী শুধু নোনা নয়, তাতে হিংস্র কামঠ থাকে প্রচুর। স্নান করতেও কেউ জলে নামে না। একদিন হারীত মণ্ডল বাছা বাছা জনা পঞ্চাশেক যুবককে নদীর ধারে এনে বললো, ওরে তোরা সাঁতার ভূলে গেছিস? মানুষের কামড়ের চেয়ে হাঙরের কামড়ে কি বেশি ব্যথা লাগে? যদি মায়ের দুধ খেয়ে থাকিস তো মায়ের নাম করে আয় আমার সাথে! জয় বাবা কালাচাঁদ! এইবার সুদিন আসবেই! এতদিনে আমরা সুদিনের মুখ দেখবো।

সবাই এক সঙ্গে ঝাঁপ দিল জলে। হিংস্র জলজ প্রাণীরাও বোধহয় সেই মরিয়া মানুষদের দেখে ভয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। ওরা সাঁতার কেটে নদী পার হয়ে জোর করে দখল করে নিল অনেকগুলো নৌকো। রাতের অন্ধকারে তারা পরিবারের লোকজনদের সেইসব নৌকোয়। চাপিয়ে নিয়ে এলো মরিচঝাঁপি দ্বীপে। হিসেব অনুযায়ী দুটি বাঘের জন্য বরাদ্দ যে অরণ্য অঞ্চল, সেখানে আশ্রয় নিল হাজার তিরিশেক মানুষ।

কয়েক মাস ধরে তারা রয়ে গেল সেই দ্বীপে। সরকারের তরফে কোনো রকম সাহায্য নেই, বরং সবদিক দিয়েই বিরোধিতা, তবু তারা বেঁচে রইলো। মানুষের বেঁচে থাকা এমনই নেশা! সেখানে পানীয় জল নেই, নৌকো করে তারা দূরের গ্রাম থেকে জল আনবার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের নৌকো ডুবিয়ে দেয়। তখন মেয়েরা চালাতে লাগলো নৌকো, হারীত মণ্ডলের পালিতা কন্যা গোলাপী সেই নৌকোয় দাঁড়িয়ে পুলিশদের বলে, তোমরা আমাগো গায়ে হাত দেবা? তোমাগো ঘরে মা-বোন নাই?

কয়েক মাস পরে শোনা গেল, তারা সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী। তারা ঐ দ্বীপে টিউবওয়েল বসিয়েছে, ইস্কুল খুলেছে। এখন আর তারা উদ্বাস্তু নয়, স্বাধীন গৃহস্থ, তারা সরকারের কাছ থেকে এক পয়সা চায় না। তারা মাছ ধরে, জঙ্গলের কাঠ কাটে, আপাতত এই তাদের জীবিকা। পরের মরসুমে শুরু হবে চাষ আবাদ। তারা এখন জঙ্গল ধ্বংস করছে বটে, আবার নতুন করে গাছও লাগাচ্ছে।

মুন্নির বিয়েতে মামুন তাঁর স্ত্রী এবং ছোট মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। তারপর ফিরোজা বেগমের অনুরোধে সবাইকে নিয়ে গেলেন আজমীঢ় শরীফ দর্শন করতে, সেখান থেকে দিল্লি-আগ্রা এবং কাশ্মীর। কাশ্মীর দেখার খুব শখ ছিল তাঁর। ফেরার পথে কলকাতায় এসে আবার থেকে যেতে হলো বেশ কয়েকদিন। প্রতাপ কিছুতেই ছাড়তে চান না।

একদিন প্রতাপ বললেন, সুন্দরবনের সাতজেলিয়া গ্রামে আমার চেনা এক ভদ্রলোক থাকেন। চলো, সেখানে একবার বেড়াতে যাবে নাকি? দিন তিনেক পরেই ফিরে আসবো। মেয়েদের আর বাচ্চাদের অবশ্য নিয়ে যাওয়া যাবে না, ঘর মোটে একখানা, তুমি আর আমি যাবো।

মামুন রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।

সাতজেলিয়ার খুব কাছেই মরিচঝাঁপি দ্বীপ। প্রতাপের খুব ইচ্ছে ছিল, উদ্বাস্তুদের নতুন বসতিটা একবার দেখে আসার। সারা ভারতে শরণার্থী বাঙালীদের সম্পর্কে এই বদনাম যে তারা অলস, তারা খেটে খেতে জানে না, তারা গভর্নমেন্টের বোঝা হয়ে থাকতে ভালোবাসে। পাঞ্জাবী উদ্বাস্তুদের সঙ্গে তাদর অনেক তফাত। কিন্তু মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুরা সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত পরিশ্রম করে, তারা কোনো সরকারি সাহায্য চায় না, এটা কী করে সম্ভব হলো? পাঞ্জাবী উদ্বাস্তুদের তো দণ্ডকারণ্যে পাঠানো হয়নি, তারা পেয়েছে হরিয়ানা, দিল্লি, তাদের পরিচিত পরিবেশ।

কিন্তু মামুন আর প্রতাপ পৌঁছোবার আগের দিনই মরিচঝাঁপিতে এক সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেছে!

সরকারের নির্দেশ অগ্রাহ্য করেও তাদের এই উপনিবেশ গড়া কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না সরকার। তারা স্বাবলম্বী হয়ে সরকারের বোঝা কমিয়েছে, কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ধারণা, ওরা অবাধ্য হয়ে একটা কুদৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের তাড়াবার অনেক রকম চেষ্টা চলছিল। গোটা পঁচিশেক স্টিমার ও লঞ্চ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল সেই দ্বীপ, পুলিশ বাহিনী বন্দুক উচিয়ে তাদের প্রলোভন দেখিয়েছে, দণ্ডকারণ্যে ফিরে গেলেই তারা জমি পাবে, গরু পাবে, টাকা পাবে। ওদিকে দ্বীপে দাঁড়িয়ে একটা চোঙা মুখে নিয়ে হারীত মণ্ডল ঠাট্টা ইয়ার্কি করেছে।

শেষ পর্যন্ত সরকার অবশ্য তাদের পুলিশ দিয়ে মেরে তাড়ায়নি। মধ্যরাত্রে একদল গুণ্ডা হঠাৎ ছুরি লাঠি নিয়ে আক্রমণ করলো সেই বসতি। কেউ বলে, তারা কোনো একটি বড় রাজনৈতিক দলের কর্মী, কেউ বলে তারা সরকারেরই ভাড়া করা গুণ্ডাবাহিনী! তারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে সবকটা বাড়িতে, যারা বাধা দিতে এসেছে লাঠি মেরে তাদের মাথা ফাটিয়েছে, ছুরি দিয়ে পেট ফাঁসিয়েছে কয়েকজনের। সেই অসহায় মানুষগুলো ঘুম-চোখে হঠাৎ এই উপদ্রব দেখে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল, আগুন ও মানুষের হাত থেকে বাঁচবার জন্য অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জলে। সবাইকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে তোলা হয়েছিল লঞ্চে-স্টিমারে। এক রাতের মধ্যে মরিচঝাঁপি সাফ। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গড়া কুঁড়েঘরগুলির আগুন ধিকিধিকি করে জ্বললো আরও দু তিনদিন ধরে।

সাতজেলিয়া, ছোট মোল্লাখালির মানুষজন দূর থেকে শুনেছে সেই রাতের আর্তনাদ। মাছ ধরা জেলে ডিঙিগুলো শেষরাতের দিকে ওদিকে গিয়ে স্বচক্ষে দেখেছেও অনেক কিছু। অনেক রকম গল্পও ছড়িয়েছে সেই রাতের ঘটনা নিয়ে। হারীত মণ্ডলকে নাকি শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার জন্য আগেই ঘোষণা করেছিল, তার মাথার দাম দশ হাজার টাকা। হারীত সেই দামি মাথাটা কী করে বাঁচালো কে জানে! কিংবা হয়তো তার লাশ জলে ভেসে গেছে। কেউ কেউ বলে যে গুণ্ডাবাহিনীর একজন নেতার নাম ল্যাঙা, তার একটা পা খোঁড়া, সে এই অঞ্চলে কয়েকদিন আগে থেকেই যাতায়াত করছিল, সে হারীত মণ্ডলকে মারার জন্য লাঠি তুলতেই হারীত নাকি চেঁচিয়ে উঠেছিল, ওরে ভুলু, ওরে, তুই আমায় চিনতে পারলি না? ওরে, আমি যে তোর বাবা! তুই আমার ছেলে, সুচরিত!

মামুন আর প্রতাপ সাতজেলিয়ায় এসে পৌঁছোবার পর সর্বক্ষণ এইসব কাহিনীই শুনলেন। প্রতাপ একেবারে গুম হয়ে গিয়েছিলেন। অন্য দেশের সরকারের ব্যাপারে মন্তব্য করা উচিত নয় বলে মামুন চুপ করে ছিলেন, কিন্তু তিনি একটা অন্য কাণ্ড করে বসলেন। যে বাড়িতে এসে উঠেছিলেন তাঁরা, সেই বাড়ির গোয়ালঘরে আশ্রয় নিয়েছিল একটি ছেলে। ছেলেটির সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত, একটা পা ভেঙে গেছে, সে মরিচঝাঁপি থেকে নদীতে ভেসে সাতজেলিয়ায় উঠেছে। ঐ গ্রামে কিংবা ছোট মোল্লাখালিতে এরকম আরও কিছু কিছু আহত মানুষজন ভেসে এসেছে। গ্রামের লোক এদের নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছে না। পুলিশের হাতেই তুলে দেওয়া উচিত, কিন্তু থানা অনেক দূর, সেই গোসাবায়। এই ছেলেটি কেঁদে কেটে কাকুতি মিনতি করে বলছে, তাকে যেন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া না হয়, পুলিশ তাকে দণ্ডকারণ্যেও ফেরত পাঠাবে না, মেরে ফেলবে। সে হারীত মণ্ডলের পালিত পুত্র, তার নাম নবকুমার। হারীত মণ্ডলের ওপর সরকারের খুব রাগ, ঐ ছেলেটির ধারণা, হারীতকে মেরেই ফেলা হয়েছে, নবকেও গুণ্ডারা নাম ধরে খুঁজেছিল, হারীতের পরিবারটাই তারা নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। সে সাতজেলিয়া গ্রামে যে-কোনো বাড়িতে চাকর হয়েও লুকিয়ে থাকতে চায়।

মামুন হঠাৎ বলে উঠলেন, এই ছেলেটাকে আমি বাংলাদেশে নিয়ে যাবো!

প্রতাপ বলেছিলেন, তা কি করে সম্ভব! ওর তো পাসপোর্ট নেই। ও বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারবে না। ওকে তুমি নিজের কাছে রাখবে কী করে? এ তো বে-আইনী কাজ!

মামুন বলেছিলেন, হোক বে-আইনী। আমার দেশে অনেক বে-আইনী কাজই তো চলছে, এইটুকু একটাতে আর কী এমন ক্ষতি হবে? একটা সিম্বলিক জেসচার হিসেবে আমি ওকে নিয়ে যেতে চাই, প্রতাপ। স্বাধীন বাংলাদেশে এই দেশত্যাগীদের অন্তত একজনকে ফিরিয়ে নিতে পারলে আমি শান্তি পাবো!

প্রতাপ অনেক ভাবে মামুনকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, মামুন তবু তাঁর গোঁ ছাড়েননি। জেলেডিঙ্গি করে নবকে প্রথমে গোপনে পার করে দেওয়া হয়েছিল খুলনার সাতক্ষীরায়। সেখানে মামুনের এক ভগ্নীপতি থাকেন, কিছুদিন সেখানে ছিল নব, তারপর মামুন তাকে মাদারিপুরে আনিয়ে নিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত কোনো গোলমাল হয়নি। মাদারিপুরের গ্রামাঞ্চলে এখনও কিছু কিছু হিন্দু পরিবার রয়ে গেছে, সুতরাং পুলিশের নজরে ও পড়েনি। মামুন এক এক সময় ভাবেন, তাঁর মৃত্যুর পরেও কি নব এখানে টিকতে পারবে? মামুন ওর নামে কিছুটা জমি লিখে দিয়েছেন, হয়তো এর পরে ওকে লড়াই করে বাঁচতে হবে। ভারতে ফিরে গেলেও তো ওর সে একই নিয়তি, সেখানেও লড়াই না করলে কে ওকে খেতে পরতে দেবে?

খাওয়া দাওয়ার পর দুপুরে লম্বা একটা ঘুম দিলেন মামুন। বিকেলবেলা তিনি আয়েশার সঙ্গে গল্প করতে বসলেন, এই নাতনীটি যেকদিন কাছে এসে থাকে, সেই কটা দিন তিনি সত্যিকারের আনন্দ পান। আয়েশা ঝণার জলের মতন কলকল সুরে কথা বলে। মামুন মাঝে মাঝেই শুনতে পাচ্ছেন একটা মটোর সাইকেলের আওয়াজ। যেন অনেক দূর থেকে একটা মটোর সাইকেল এইদিকে ধেয়ে আসছে। প্রায়দিন সন্ধেবেলাতেই তাঁর এরকম ভুল হয়। আলতাফ! সেই আলতাফ এখন কত বদলে গেছে, তবু তাকে প্রথম দেখার দিনটি মামুন। ভুলতে পারেন না।

হঠাৎ এক সময় বাগানের গেটের সামনে সত্যি সত্যি একটা মোটর সাইকেলের গর্জন হলো। চোখের ভুল নয়, কানের ভুল নয়, মাথায় হেলমেট পরা এক যুবক ঢুকছে গেট ঠেলে। বুকটা কেঁপে উঠলো মামুনের। তিনি বললেন, কে আসে রে, দ্যাখ তো, পুনপুনি!

আয়েশা উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ওমা এ তো সুখুভাই!

মঞ্জুর ছেলে সুখুকে দেখে মামুনের খুশী হয়ে ওঠার কথা, কিন্তু তাঁর কপালে আশঙ্কার ভাঁজ পড়েছে। সুখু কি এনেছে কোনো দুঃসংবাদ? না হলে সে তো এমনি এমনি এত দূর আসবে না!

গেরিলা যোদ্ধার মতন সাজপোশাক করা সুখু কাছে এসে বললো, মাদারিপুরে, টাউনের মধ্যে আমার ক্লাসের এক বন্ধু থাকে, তার বাড়িতে ছিলাম কাল রাতে, তোমার সাথে দ্যাখা করতে আসলাম। কেমন আছিস রে, আয়েশা!

তারপর সুখুর গরম পানি দেওয়া হলো, সে স্নান করলো, খেয়ে নিল। রাত্তিরে এখানেই থাকবে বোঝা গেল। মামুনের বারবার মনে হচ্ছে, মাদারিপুরে বন্ধুর বাড়িতে আসার ছুতোটা ঠিক নয়, সুখু তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছে, কিন্তু কারণটা এখনো বলছে না। ঢাকায় প্রবল ছাত্র-আন্দোলন শুরু হয়েছে, মামুন সে খবর পান রেডিও শুনে। সুখু যে একজন ছাত্রনেতা হয়েছে, সে খবরও তার কানে আসে। কিন্তু তিনি মঞ্জু কিংবা তার ছেলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই রাখেন না। তবে মঞ্জুর গানের কয়েকখানা রেকর্ড তিনি শোনেন বারবার।

রাত সাড়ে নটার মধ্যে মামুনের শুয়ে পড়া অভ্যেস। আজও তিনি শুয়ে পড়লেন, চোখের সামনে মেলে ধরলেন একটা বই। দু’তিন পাতা পড়তে পড়তেই ঘুম এসে যায়। ঠিক ঘুম আসার সেই মুহূর্তটাতেই তাঁর ঘরে এসে ঢুকলো সুখু। মামুন ভাবলেন, এবারে সে কিছু বলবে। তাও সে কিছু বলে না, ঘুরে ঘুরে আলমারির বই দেখতে লাগলো।

মামুন জিজ্ঞেস করলেন, কী রে? কাল তোদের ইউনিভার্সিটিতে অনেক হাঙ্গামা হয়েছে, তুই এ সময় ঢাকা ছেড়ে চলে আসলি যে?

সুখু বললো, তোমাকে দেখতে আসলাম। তুমি আমাদের কোনো খবর নাও না।

মামুন বললেন, খবর সবই পাই। তুই বাবা-মাকে বলে এসেছিস তত? না হলে তারা চিন্তা করবে। আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে।

সুখু বললো, মাঝে মাঝে বাবা-মাকে চিন্তায় রাখা ভালো। অন্য সময় তো তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

বাবার সঙ্গে দেখা টেখা করিস? তার শরীর ভালো আছে? ব্লাড প্রেসার হাই শুনেছিলাম।

–সব ঠিক আছে। দাদা, তুমি আমাকে কিছু টাকা দিতে পারো? মামুন এবার নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। তিনি হেসে বললেন, যাক, বাঁচা গেল। তা হলে তুই এই বুড়োটাকে দেখতে আসিসনি। অতি ভক্তি সন্দেহজনক! কত চাই?

সুখু মামুনের দিকে এবার সোজাসুজি চেয়ে বললো, ফিফটি থাউজেন্ড বাক্‌স?

মামুন চমকে উঠে বললেন, অত টাকা? তা আমি পাবো কোথায়! অত টাকা দিয়ে তুই কী করবি?

–ফরেনে যাবো। লন্ডনে পড়াশুনা করবো। এখানে থাকলে আমার পড়াশুনা হবে না।

–তাহলে তো ঢাকা ইউনিভার্সিটিটাই লন্ডনে তুলে নিয়ে যেতে হয়। দুই বৎসব সব পরীক্ষা পিছিয়ে আছে তাই না?

–তুমি আমাকে টাকাটা দিতে পারবে কি না বলো?

–অত টাকা আমার নাই। তোর মায়ের কাছে না চেয়ে আমার কাছে চাইতে এসেছিস যে?

-–মা দেবে না। মা আমাকে ফরেনে যাবার পারমিশনও দেবে না। মাকে বোঝাবার দায়িত্বটাও তোমাকেই নিতে হবে।

–তোর মা আমার কথা শোনবে কেন? আমি কে, কেউ না! আমি তো একটা বাতিল বুড়া। গ্রামে পড়ে থাকি।

মামুনের শিয়রের কাছে বসে পড়ে সুখু বললো, তুমি কেউ না? আমি যে শুনেছি, তোমার জন্যই আমার মা আর বাবার মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। তখন আমি ছোট ছিলাম, কিছু বুঝি নাই, কিন্তু এখন জানি, আমার মাকে তুমি সব সময় গাইড করেছো। তোমাকে সে পীর পয়গম্বর মনে করে।

কনুইতে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে উঠে মামুন বললেন, তোকে কে বলেছে এ সব কথা? তোর মা বলেছে?

–জী না। মা আমার সাথে কোনো পার্সোনাল কথা বলে না। মাকে আমার কেমন জানি ডিসট্যান্ট আর অ্যালুফ মনে হয়। আমাকে বলেছে মনিরা আপা।

–মনিরার পেটে কোনো কথা থাকে না। তোকে শুধু এইটুক বলেছে, আর কিছু বলেনি?

–আমার বাবা তোমাকে হিংসা করতো। ফরনাথিং জেলাসি!

–ফরনাথিং? তুই ঠিক জানিস?

–আমার মায়ের সাথে তোমার সত্যি সত্যি লাভ অ্যাফেয়ার ছিল নাকি?

–সুখু, তুই সঙ্গে কোনো আর্মস এনেছিস? রিভলভার কিংবা ছোরা? আমাকে নদীর ধারে নিয়ে চল, তারপর আমাকে খুন করে রেখে যা! তা হলেই সব ঝাট চুকে যায়।

–তুমি এত আপসেট হচ্ছো কেন? আমি কি তোমাকে কোনো অ্যাকিউজ করতে। এসেছি? টাকা চাইছি, সেটাকেও ব্ল্যাক মেইল মনে করো না। আমার খুব দরকার তাই চেয়েছি, দিতে না পারলে কি জোর করবো নাকি?

–সুখু, আমি জীবনের ফ্যাগ এন্ড-এ পৌঁছেছি, এখন আর কোনোরূপ মিথ্যা বলতে পারবো না। আমার সব কথা শুনলে তোর রক্ত গরম হয়ে যাবে। আমাকে খুন করতে ইচ্ছা হলে করিস। গলাটা চিপে ধরলেও আমি খতম হয়ে যাবো। একথা সত্যিই যে, আমি তোর মাকে ভালোবাসতাম। তারচেয়েও বড় কথা, তুই বাবুল চৌধুরীর সন্তান না, তুই আমার ছেলে!

রাগ করার বদলে সুখু হা-হা করে হেসে উঠলো। মামুনের মুখের কাছে ঝুঁকে এসে বললো, আমাকে ঠকাতে পারবে না। নো ওয়ে। আমি চেক করেছি। আমার সন্দেহ হয়েছিল একবার। কিন্তু আমার জন্ম হয়েছিল স্বরূপনগরে। সেখানেও আমি গেছি একবার। বিয়ের পর আমার মা আর বাবা স্বরূপনগরে চলে গিয়েছিল। দুই বৎসরের মধ্যে তাদের সাথে তোমার একবারও দেখা হয়নি। বাবুল চৌধুরী আমার জেনুইন ফাদার, নো ডাউট অ্যাবাউট ইট। অবশ্য অন্য। কেউ আমার ফাদার হলেও আমি অখুশী হতাম না!

মামুন কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ফিজিক্যালি তুই আমার সন্তান না হলেও তুই আমার ছেলে। তোর বাবা তোক ছোটবেলায় যতবার কোলে নিয়েছে, তার থেকে অনেক বেশিবার আমি তোকে আদর করেছি। তোকে আমি একটু একটু করে বড় হয়ে উঠতে দেখেছি, ঠিক যেন আমারই ছেলে তুই, আমি এইরকম মনে করতাম। আমি ভালবাসতাম তোর মাকে। হ্যাঁ, সেটা ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই না। প্রতিদিন তাকে না দেখে থাকতে পারতাম না। যখন খবরের কাগজে এডিটারি করতাম, কত ব্যস্ততা ছিল, তবু প্রত্যেক সন্ধ্যাবেলা একবার ছুটে যেতাম তোকে আর তোর মাকে দেখবার জন্য। বাবুল চৌধুরীর জেলাস হবার যথার্থ কারণ ছিল। আমি অন্ধ ছিলাম, বুঝি নাই! বাবুলের স্ত্রী পুত্রকে আমি ভালোবাসা দিয়ে কেড়ে নিতে চেয়েছিলাম, তার তো রাগ হবেই। সেইজন্য সে সন্ধ্যার সময় বাড়ি থাকতো না। কিন্তু একটা কথা তোকে বিশ্বাস করতেই হবে, আল্লার কসম। আমি তোর মাকে কোনোদিন পাপচক্ষে দেখি নাই। কোনোদিন অন্যায়ভাবে স্পর্শ করি নাই। তোর মায়ের মতন পবিত্র রমণী আর হয় না। তার অন্তরটা নিষ্কলুষ! তবু একথা ঠিক, আমি ভালোবাসা দিয়ে তার জীবনে সর্বনাশ ডেকে এনেছি!

সুখু আবার হেসে উঠলো। এবার সে মামুনের মাথার চুলে হাত দিয়ে বললো, তোমরা এই ব্যাপারটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছো কেন? মাই ফাদার ইজ আ ফুল! তোমার সঙ্গে তোমার ভাগ্নীর একধরনের প্লেটনিক লাভ-এর সম্পর্ক ছিল, তা নিয়ে এত মাথা ফাটাফাটি করার কী ছিল? ইউ আর টু ডিসেন্ট আ জেন্টলম্যান টু ডু এনিথিং ইমমরাল! তোমার সঙ্গে আমার মায়ের যে সম্পর্ক ছিল, সেটা স্নেহের থেকে দুতিন ডিগ্রি বেশি বলা যেতে পারে, সেটা আমার বাপ ব্যাটা। মেনে নিতে পারেনি!

মামুন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন সুখুর দিকে। সুখু কী বলছে তা যেন তিনি কিছুই। বুঝতে পারছেন না। এই জেনারেশানের ছেলেদের অন্যরকম ভাষা। তিনি ভেবেছিলেন সুখু তাঁকে খুন করতে চাইবে, তার বদলে ছেলেটা হাসছে!

সুখু আবার বললো, বৃদ্ধ, আমাকে আর মাকে যদি অতই ভালোবাসতে, তাহলে হঠাৎ ঢাকা ছেড়ে চলে আসলে কেন? এটা কী ধরনের স্যাক্রিফাইস!

মামুন বললেন, ঠিক স্যাক্রিফাইস না। আমি বাবুল চৌধুরীকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে, তোদের সাথে আমার কোনো স্বার্থের সম্পর্ক ছিল না। ভালোবাসা যথেষ্ট ছিল বলেই একেবারে ত্যাগ করেও চলে আসতে পেরেছি।

–তোমাদের যত সব বাজে সেন্টিমেন্ট। তবে, এ কথা জেনে রাখো, আমার বাবার চেয়ে। আমি তোমাকে অনেক বেটার পার্সন মনে করি!

–ও কথা বলিস না। বাবুলের অনেক গুণ আছে। ও যে কত বড় ফ্রীডম ফাইটার ছিল তা তো কেউ জানেই না। নিজেকে ও বড় বেশি গুটিয়ে রাখে। ওর যত যোগ্যতা ছিল, সব যদি ব্যবহার করতো, তাহলে দেশে একজন বিখ্যাত মানুষ হতে পারতো! কেন যে ও সবসময় ঘরে বসে থাকে, হয়তো আমিই সেজন্য দায়ী।

–বুল সীট! কেউ কাউর জন্য দায়ী হয় না। যার যোগ্যতা থাকে, সে নিজেই প্রকাশ করে। সবসময় যারা বই পড়ে আর থিয়োরি কপচায়, তারা দেশের কোনো কাজে লাগে না। আসল কথাটা বলো, তুমি টাকাটা আমাকে দেবে না?

–যদি বলিস, এই বাড়ি বিক্রি করে দিতে পারি তোর জন্য।

–তারপর কি তুমি ফকির হয়ে বেড়াবে! হাঁটতেও তো পারো না ভালো করে! থাক, দরকার নাই। মাকেই বলতে হবে। তুমি আমার মাকে বুঝাবার দায়িত্বটা নেবে?

–তোকে একটা অনুরোধ করবো, সুখু! তুই বিদেশে যাইস না। তোর মায়ের অনেক দুঃখ। তুই চলে গেলে সে কী নিয়ে বাঁচবে? তোদের মতন ছেলেরা দেশ ছেড়ে চলে গেলে এ দেশটার কী দশা হবে?

সুখু একটুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। তারপর বললো, আমি তোমার কাছে দুই চারদিন থাকবো। পুলিশ আমাকে ধরতে আসলে তুমি আমাকে বাঁচাবে?

মামুন বললেন, ও, এই ব্যাপার! না, পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবার ক্ষমতা আমার নাই। কে আমাকে গ্রাহ্য করে। কিন্তু তোকে আমি বিদেশে পাঠাবার বদলে জেলে পাঠানোই প্রেফার করবো। আমাদের মতন দেশে একবার অন্তত জেলে না গেলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না।

পরদিনই দু’ঘণ্টার ব্যবধানে আলাদা আলাদা ভাবে এসে পৌঁছোলো মঞ্জু আর বাবুল। দু’জনেই খবর পেয়েছে যে সুখুকে অ্যারেস্ট করার জন্য পুলিশ খুঁজছে। বাবুল একেবারে সঙ্গে এনেছে পাসপোর্ট ফর্ম। সে দু’তিনদিনের মধ্যেই ছেলেকে লন্ডনে পাঠিয়ে দিতে চায়। মঞ্জুর ইচ্ছে, ছেলে কিছুদিনের জন্য কলকাতায় চলে যাক। কিন্তু সুখু হঠাৎ বেঁকে বসেছে। সে কোথাও যাবে না। বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে সে ভালো করে কথাই বলতে চায় না। সে আয়েশার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতে লাগলো মন দিয়ে, একসময় দু’জনে মাদারিপুর শহরে বেড়াতে চলে গেল।

মঞ্জু বাবুলের সামনে একবারও আসেনি। বাবুল মামুনের সঙ্গে কথা বললো কাটাকাটা ভাবে। ছেলের টানে সে বাধ্য হয়ে এখানে এসেছে। মামুন একসময় অসহায় ভাবে বললেন, বাবুল, তুমি এই ব্যাপারে অন্তত আমাকে দোষ দিও না। তোমার ছেলেকে আমি এখানে ডেকে আনি নাই, তাকে আমি জোর করে ধরে রাখতে চাই না। তবে, তার প্রায় বিশ বৎসর বয়েস হয়েছে, এখন সে নিজের ইচ্ছা মতনই চলতে চাইবে।

বাবুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলো।

তাকে দুপুরবেলা খেয়ে যাওয়ার অনেক অনুরোধ করলেন মামুন। বাবুল শুকনো ধন্যবাদ। জানিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করলো। সে এক বন্ধুর গাড়ি চেপে এসেছে, তাকে আজই ফিরে যেতে হবে।

বাড়ি থেকে নেমে গেটের দিকে এগিয়ে গেল বাবুল। গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। বাবুল বাইরে বেরুবার আগে থমকে দাঁড়ালো, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ডান দিকে। বাগানের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে মঞ্জু, এ দিকে পেছন ফিরে খুব মনোযোগ দিয়ে কী একটা ফুলগাছ দেখছে।

বাবুল সেদিকে এগিয়ে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা দ্বিধার ভাব আছে। কাছাকাছি। গিয়ে, একটুক্ষণ থমকে থাকার পর সে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছো, মঞ্জু?

মঞ্জু মুখ ফিরিয়ে বাবুলকে দেখলো। তার মুখে রাগ, দুঃখ, অভিমান কিছুই নেই। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে, সে বললো, ভালো। তুমি ভালো আছো?

৬৪.৬ হরিদ্বারে যাওয়ার ব্যাপারটা

হরিদ্বারে যাওয়ার ব্যাপারটা সব ঠিকঠাক করে প্রায় শেষ মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন মমতা। এর মধ্যে একদিন কানু এসেছিল, সে ট্রেনের টিকিট যোগাড় করে দিয়েছে। কানুর কাছে এসব কোনো সমস্যাই নয়। কানুর ছোট মেয়ে চায়না এবার পার্ট-টু পরীক্ষা দিয়েছে, এখনও রেজাল্ট বেরোয়নি, সে যেতে রাজি হয়েছে মমতার সঙ্গে, এই সুযোগে তারও বেড়ানো হবে। চায়না মেয়েটি বেশ সপ্রতিভ, লোকজনের সঙ্গে পরিষ্কার চোখে কথা বলতে পারে, সে সঙ্গে থাকলে মমতার কোনো অসুবিধে হবারই কথা নয়। কিন্তু প্রতাপকে একলা ফেলে যাবেন কী করে মমতা?

ঝগড়ার পর কথা বন্ধ ছিল, মমতা নিজেই কথা খুলে দিলেন। নিজেই কিছুটা নত ও কোমল হয়ে প্রতাপকে মিনতি করে বলেছিলেন, তুমিও চলো আমার সঙ্গে। তুমি না গেলে আমার ভালো লাগবে না!

প্রতাপ লক্ষ করে যাচ্ছিলেন যে মমতা নিজে নিজেই হরিদ্বার যাবার সব ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন, টিকিট কাটালেন, যাত্রাপথের সঙ্গিনী ঠিক করলেন, প্রতাপের টাকাপয়সাও চাইলেন না। ইদানীং মমতার নিজস্ব একটা অর্থ দফতর হয়েছে, হঠাৎ হঠাৎ প্রতাপকে না জানিয়ে তিনি দু’একটা দামী জিনিস কিনে ফেলেন। মমতার বহুকালের শখ ছিল একটা কার্পেটের, এতদিন বাদে তিনি শয়নকক্ষে বিছিয়েছেন বেশ পুরু, সুন্দর লতা-পাতার ডিজাইন করা একটা লাল কাশ্মীরী কার্পেট। এর দাম যে কত হাজার টাকা লেগেছে, তা মমতা কিছুতেই জানাতে চাননি প্রতাপকে। প্রথম বেশ কয়েকদিন শুতে এসে সেটাকে প্রতাপের একটা অচেনা মানুষের ঘর বলে মনে হতো। এই শীতে মমতা প্রতাপের জন্য বেশ একটা মূল্যবান কোট তৈরি করিয়েছেন, তাও প্রতাপের অজান্তে। কোটটা গায়ে দেবার পর প্রতাপ খানিকটা ঠাট্টার সুরেই বলেছিলেন, আজকাল তোমার খুব টাকার গরম হয়েছে, তাই না?

মমতা বলেছিলেন, সারাটা জীবন তোমার কাছে হাত-তোলা হয়েই কাটাতে হয়েছে, দাসী বাঁদীর মতন শুধু সেবা করে গিয়েছি। কোনোদিন কিছু তো দাওনি আমাকে!

প্রতাপ অবাক হয়ে বলেছিলেন, তোমাকে কোনোদিন কিছু দিইনি? এই সবকিছুই তো তোমার জন্য!

মমতা বলেছিলেন, সবকিছু? :! দয়া করে দিয়েছো, নেহাত যেটুকু প্রয়োজন না মেটালে নয়। কিন্তু মানুষের তো সাধ-আহ্লাদও থাকে। সেসব তুমি জানতেও চাওনি। নিজের ইচ্ছেমতন কিছুই করতে পারিনি।

মমতার এইসব কথার মধ্যে কৌতুক একটুও ছিল না, ছিল প্রচ্ছন্ন অভিমান মেশানো স্পষ্ট অভিযোগ। আজকাল মমতার কথার মধ্যে প্রায়ই অভিযোগের সুর ফুটে ওঠে। মুন্নির বিয়ে হয়ে যাবার পর, বাড়িতে এখন শুধু স্বামী-স্ত্রী, সাংসারিক ঝামেলাও চুকে গেছে, এখন মমতার যেন অন্য একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠছে।

সেই কথার পর থেকে মমতার কেনা কোটটা প্রতাপ আর গায়ে দিতে চান না। তাঁর ইচ্ছে করে না। কলকাতায় যেটুকু শীত পড়ে, তাতে তাঁর পুরোনো আমলের পকেট ছেঁড়া কোটটাতেই বেশ কাজ চলে যায়।

মমতার শত অনুরোধেও অবশ্য প্রতাপ আর মত বদল করেননি। উদাসীনভাবে বলেছিলেন, আমি আর হরিদ্বার গিয়ে কী করবো! মুন্নির বাচ্চাকে নিয়ে তুমি ব্যস্ত থাকবে, অনুনয় আর তার বাবা অন্য দিকগুলো সামলাবে, আমি শুধু শুধু তোমাদের বোঝা বাড়াতে যাবো কেন? তা ছাড়া বাড়ির ট্যাক্সের ব্যাপারে সামনের সপ্তাহে করপোরেশনে একটা হিয়ারিং আছে…

তখন প্রশ্ন উঠেছিল, কলকাতায় বাড়িতে প্রতাপের সঙ্গে কে থাকবে? এই প্রশ্নে প্রতাপ আবার জ্বলে উঠেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কারুর থাকার দরকার নেই। তিনি নিজেই নিজের ভার যথেষ্ট নিতে পারেন, নানু তো আছেই, সে রান্নাবান্না করে দেবে। রাত্তিরে তিনি একা থাকতে পারবেন না কেন, তিনি কি ছেলেমানুষ!

প্রতাপ ছেলেমানুষ নন, কিন্তু তিনি যে বৃদ্ধ, সে কথাও তাঁর মনে থাকে না।

মমতা তবু নানুকে পই পই করে বলে গিয়েছিলেন, সে যেন প্রতিদিন বসবার ঘরে বিছানা পেতে শোয়। প্রত্যেকদিন সকালে বাবুকে গরম জলে লেবুর রস আর মধু মিশিয়ে দিতে ভুলে না যায়। বাবুকে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়াও তার দায়িত্ব। প্রথম দশ বারোদিন নানু ঠিক ঠিক সেই দায়িত্ব পালন করেছে। তারপর তার বাড়িতে একটা বিয়ের ব্যাপার থাকলে সে ছুটি নেবে না? প্রতাপ নিজেই তাকে ছুটি দিয়েছেন। নানু তবু এক ফাঁকে এসে রান্নাটা করে দিয়ে যায়।

মমতাকে পৌঁছে দিতে হাওড়া স্টেশনেও গিয়েছিলেন প্রতাপ। তিনি নিজে কুলি ঠিক করেছিলেন এবং দেরি করে কম্পার্টমেন্টের দরজা খোলার জন্য কন্ডাকটর গার্ডকে বকাবকিও করেছিলেন। মমতা আর চায়না একটা কুপে পেয়েছে, সুতরাং নিশ্চিন্ত, পথে অন্য কোনো যাত্রী। তাদের বিরক্ত করবে না। স্টেশনের কল থেকে প্রতাপ ওয়াটার বটলে জল ভরে দিলেন ওদের জন্য। সবই তিনি করছেন, কিন্তু কোনো আবেগ নেই। মমতা সেই যে রাগের মাথায়। বলেছিলেন, তোমার টাকা লাগবে না, নিজের টাকাতেই আমি হরিদ্বার যেতে পারবো, সেই কথাটা তাঁর বুকে যে ঘা দিয়েছে, সেটা দগদগে হয়ে আছে, কিছুতেই চাপা পড়ছে না। প্রতাপ। সারাজীবন কষ্ট করে সংসারে যে ভাবে টাকা উপার্জন করেছেন তা যেন তুচ্ছ হয়ে গেছে ওই একটি কথায়। মমতার সঙ্গে তাঁর ব্যবহারে কোনো খুঁত নেই। এমন কি প্রতাপ মাঝে মাঝে হাসি মুখও দেখিয়েছেন, তবু সেটা যেন অতিরঞ্জিত এক মুখোসের মতন। ব্যস্ততায় ও বাইরে যাবার উত্তেজনায় মমতা তা লক্ষ করেননি।

ট্রেনটা ছাড়তে একটু লেট করছিল, প্রতাপ দাঁড়িয়েছিলেন প্লাটফর্মে, মমতাদের জানলার সামনে। হঠাৎ তাঁর মনটা যেন এক তরল বিষণ্ণতায় ভিজে গেল। কেন যেন তাঁর মনে হলো, মমতার সঙ্গে তাঁর এই শেষ দেখা। প্রায় চল্লিশ বছরের মধ্যে মমতা তো তাঁকে ছেড়ে কখনো একা কোথাও যাননি। এবার কি মমতার কোনো বিপদ ঘটবে? ট্রেন দুর্ঘটনা? হরিদ্বারে খরস্রোতা নদী…। প্রতাপ এই চিন্তাটা মন থেকে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। মমতা না থাকলে বাকি জীবনটা তিনি কাটাবেন কী করে?

ট্রেনটা দুলে উঠতেই মমতা তাঁর স্বামীর হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, কথা দাও, তুমি শরীরের যত্ন নেবে? নানুকে আমি বলে গেছি, সে সব কিছু করবে, তুমি নিজে মশারি টাঙাতে যেও না, নানু সব জানে, তুমি শুধু বাজারটা করে দিও, তোমার পছন্দমতন মাছ… আর একটা কথা বলবো? তুমি আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করো, চিঠি লিখলে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবে? আমি এক মাসের বেশি থাকবো না, মুন্নি একটু সামলে উঠলেই…

মমতার ব্যাকুল মুখোনি দেখে প্রতাপের দয়া হয়েছিল। একটা বয়েসে ভালোবাসা রূপান্তরিত হয়ে যায় স্নেহ-মমতায়। ভালোবাসার চেয়ে তার শক্তি বেশি। তিনি শিশুকে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে মমতার হাত চাপড়ে বলেছিলেন, কোনো চিন্তা করো না, আমি ঠিক থাকবে। তুমি পোঁছোনো মাত্র চিঠি দিও। সাবধানে থেকো। রাত্তিরে কোনো স্টেশনে ট্রেন থামলে জানলা খুলো না, অবশ্য সঙ্গে চায়না আছে, ও স্মাট মেয়ে চায়না, ভালো করে ঘুরে আয়

সেদিন হাওড়া স্টেশন থেকে ফেরার পথে প্রতাপ বাস বা ট্যাক্সি না নিয়ে হেঁটে ব্রীজ পার হয়েছিলেন। তারপর স্ট্র্যান্ড রোড ধরে খানিকটা এগিয়ে, ফেরীঘাট দেখে কী খেয়াল হয়েছিল, তিনি টিকিট কেটে ফেরীতে চেপে আবার গঙ্গা পার হলেন। তাঁর তো বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া ছিল না। ফেরীতে চেপে মধ্যপথে এসে তাঁর মনে হয়েছিল, এই গঙ্গা যেখানে পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামছে, সেখানে চলে গেল মমতা। সে আবার ফিরে আসবে তো? নদী কখনো থামে না, কিন্তু মানুষের জীবন হঠাৎ এক সময় থেমে যায়। তাঁর ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। এই অলক্ষুণে কথাটা বারবার মনে পড়ছে কেন? না, না, মমতার কিছু হবে না, তার শরীর ভালো আছে, এত বছর একটা সংসার সামলাবার পর এই তো সবেমাত্র সে নির্ঞ্ঝাট হয়েছে, এখন সাধ-আহ্লাদ মেটাবে…

একবার হেঁটে হাওড়া ব্রীজ পেরিয়ে এসে আবার অকারণে ফেরী করে সেই হাওড়ার দিকেই যাওয়া, অন্য কেউ প্রতাপকে এরকম ছেলেমানুষী করতে দেখলে সাঙ্ঘাতিক অবাক হতো। আবার ওই ফেরীতেই এপারে এসে প্রতাপ অনেকক্ষণ বসেছিলেন আউটরাম ঘাটের কাছে। প্রতাপদের ছেলেবেলায় এটাকে বলা হতো উট্রাম ঘাট, এখন আউটরাম নামটাই চালু হয়ে গেছে, এটা যে কোনো সাহেবের নামে তাও হয়তো লোকে ভুলে গেছে। বোধহয় ভাবে কেনারাম, বেচারামের মতনই আউটরাম। ইডেন গার্ডেন-এর নাম অবশ্য কেউ নন্দন কানন দেয়নি, যদিও অকটরলোনি মনুমেন্ট হয়ে গেছে শহিদ মিনার। এই ইডেন গার্ডেনে একসময় গোরাদের ব্যান্ড বাজতো, প্রতাপের মনে আছে। এখানেই স্বাধীনতার পরে কোনো একটা বছর বিরাট একটা মেলা হয়েছিল না? ত্রিদিবের গাড়িতে সবাই মিলে আসা হয়েছিল, সুলেখা, পিকলু বাবলু-মুন্নি, মমতা; দিদি আর তুলতুলও ছিল কি? হ্যাঁ ছিল, শুধু মা ছিল না। তার কিছুদিন পরেই তো পিকলু…। বাকিরাও সব কোথায় গেল?

এই গঙ্গা নদীই পিকলুকে খেয়েছে। মমতা আবার এই নদীর ধারেই গেল। মমতা আবার পুণ্য-টুন্যের কথা ভেবে হরিদ্বারের নদীতে স্নান করতে না নামে। গঙ্গার ওপর প্রতাপের ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই একটুও। পিকলু চলে যাবার পর তিনি আর কোনোদিন গঙ্গায় স্নান করেননি। এমন কি সুপ্রীতিকে পোড়াবার পর অনেকে আদিগঙ্গার বিশ্রী নোংরা জলে নেমেছিল, প্রতাপ রাজি হননি কিছুতেই।

মাঝে মাঝে প্রতাপের মনে এমন একটা বিশ্রী চিন্তা আসে যে তাঁর নিজের গলাটা টিপে ধরতে ইচ্ছে করে। তবু চিন্তাকে রোধ করা যায় না। পিকলু বাঁচাতে গিয়েছিল বাবলুকে, বাবলুর। বদলে যদি পিকলু বেঁচে থাকতো? পিকলু নিশ্চিত এদেশের একজন গণ্যমান্য মানুষ হতো। না, না, প্রতাপ বাবলুকেও কোনোদিন হারাতে চাননি। মমতার ধারণা, প্রতাপ তাঁর ওই ছেলেটিকে ভালোবাসেন না। ভুল ধারণা। ছোটবেলা থেকেই বাবলু দুরন্ত, সে জন্য প্রতাপ ওকে অনেকবার শাস্তি দিয়েছেন, তবু বাবলুর প্রতিই বোধহয় তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিল বেশি। বাবলুকে বিলেত পাঠাবার জন্য একসময় তিনি সর্বস্বান্ত হননি? বাবলুর জন্য দুশ্চিন্তায় তিনি যে বছরের পর বছর ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হয়েছেন, তা বুঝতেও দেননি মমতাকে। এখনও বাবলুর চিঠি এলে, সে বাবাকে লেখে না, মাকেই লেখে, তবু প্রতাপ মমতাকে লুকিয়ে চোরের মতন সে চিঠি দুতিনবার পড়েন না!

গঙ্গার ধারে সন্ধেবেলা অনেক মানুষ বসে থাকে, অল্পবয়েসী ছেলে-মেয়েরা একটু নিরালা। খুঁজে হৃদয় ও শরীরের উত্তাপ বিনিময় করতে চায়। দুটি যুবক রেলিং-এ হেলান দিয়ে খুব জোরে জোরে হাসছে। একটু দূরে কে যেন গান গাইছে। সে দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ প্রতাপ যেন। একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। তিনি যে বেঞ্চিতে বসে আছেন, সেখানে তাঁর বদলে রয়েছে অন্য একজন মানুষ, রেলিং-এ ভর দেওয়া ওই যুবক দুটির জায়গায় অন্যরকম পোশাক পরা, অন্য দুটি যুবক হাসছে, একটা গাছের পাশে যে তিনজন যুবতী, তাদের শাড়ির রং, মুখের চেহারা সট সট করে বদলে গেল, তারা অন্য হয়ে গেল। যেন আজ থেকে পঁচিশ-তিরিশ কিংবা পঞ্চাশ বছর পরের একটা দৃশ্য উদ্ভাসিত হলো প্রতাপের চোখের সামনে। তখন তিনি থাকবেন না, এই মানুষগুলি কেউই থাকবে না। এই একই জায়গায় অন্যরা আসবে, হাসবে, গান গাইবে। মাত্র কয়েকটা বছরের ব্যাপার, তারপরই সব শেষ!

প্রতাপের শিহরন হয়েছিল, খানিকটা ভয়ও পেয়েছিলেন। এরকম দৃশ্য তিনি দেখলেন কেন? এরকম একটা ফুঁকো দার্শনিকতাই বা কেন ভর করলো তাঁর মাথায়?

একা থাকলেই যত রাজ্যের বাজে চিন্তা এসে মাথা জুড়ে বসে। মমতার সঙ্গে তাঁর যাওয়াই উচিত ছিল, না হয় কোনোরকমে মুন্নির শ্বশুরের সঙ্গে কয়েকটা দিন মানিয়ে চলতেন। মমতাকে ছেড়ে থাকতে প্রতাপের যে কষ্ট হচ্ছে, সে কথা প্রথম কয়েকটা দিন প্রতাপ নিজের মনের কাছেও স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু ফাঁকা বাড়িতে তাঁর কিছুতেই বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করে না। বিমানবিহারীর বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যে যাবার জায়গাও নেই। প্রতাপ নিজেই ট্রেনে চেপে কৃষ্ণনগর চলে যাবেন? বিমান ক’দিনের জন্য গেছেন তা অলিরাও ঠিক জানে না, প্রতাপ যেতে যেতেই যদি তিনি ফিরে আসেন? প্রতাপ আর কোনো বন্ধু সংগ্রহ করেননি। একা একা তিনি কোথাও বেড়াতে যাবেন? বাড়ির ট্যাক্সের হিয়ারিং আবার পিছিয়ে গেছে এক সপ্তাহ, এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয় যদিও, কিন্তু ওটা আগে চুকিয়ে ফেলা দরকার।

একা একা রাস্তায় ঘুরতেও মন্দ লাগে না। অনেক রকম মানুষ দেখা যায়। অন্যদের কথা কান পেতে শুনলে চমকে যেতে হয় এক এক সময়। তিরিশের কাছাকাছি বয়েসের একজোড়া যুবক-যুবতী পাশাপাশি হাঁটছে, তাদের দু’একটা টুকরো কথা কানে এলো। মেয়েটি ব্রহ্মকমল ফুলের কথা বলছে। ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স থেকে এই ফুল তুলে আনলে অলকানন্দা নদীর তীর পর্যন্ত টাটকা থাকে, নদীর এপারে আনলেই সে ফুল শুকিয়ে যায়। প্রতাপ এই কথাটা আগেও যেন কোথায় শুনেছেন। এই ফুল পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামতে চায় না। মেয়েটি সদ্য ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ঘুরে এসেছে মনে হলো। মমতারও ওই জায়গাটা দেখতে যাওয়ার খুব শখ। আশ্চর্য, একটু আগে প্রতাপ এই সাইনবোর্ড দেখেছিলেন, ‘হরিদ্বার-হৃষীকেশ-ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বেড়াতে যেতে চান? আমরা আছি। হলিড়ে ট্রাভেলস!’

যুবতীটির মুখ সুখস্মৃতিতে ঝলমল করছে। তার সঙ্গীটিকে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে, অনেকটা সিদ্ধার্থর মতন নয়? বাবলুর বন্ধু সিদ্ধার্থ নাকি? সিদ্ধার্থ ফিরে এসেছে? প্রতাপ প্রায় তাকে ডাকতে উদ্যত হয়েও থেমে গেলেন। না, তার ভুল হচ্ছে। বাবলুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা কেউ কলকাতায় এলে দু’একদিনের মধ্যেই বাড়িতে এসে দেখা করে। কিছু না কিছু জিনিসপত্রের সঙ্গে শর্মিলা তার শাশুড়ির জন্য চকলেট পাঠাবেই। বাচ্চা মেয়েদের মতন মমতা। এখনো চকলেট খেতে ভালোবাসেন। সেবারে বাবলুদের কাছে বেড়াতে গিয়ে মমতা বারবার বলতেন, আমি অত্র মাংস টাংসর ভক্ত নই, তবে এদেশের আইসক্রিম আর চকলেট সত্যিই খুব ভালো। প্রতাপ অবশ্য মিষ্টি একেবারেই খেতে পারেন না, তিনি আমিষাশী, তবে আমেরিকায় মাছ-মাংস খেয়ে সুখ পাননি। তিনি গোমাংস খান না, বাবলুদের বাড়িতে অবশ্য গোরু-শুয়োর দুই-ই চলে, তাঁর প্রেসার হাই বলে কোলেস্টরলের ভয়ে তিনি শুয়োরও স্পর্শ করেননি, ওদেশের মুর্গিগুলো কৃত্রিম উপায়ে বড় করা বলে তাঁর কাছে বিস্বাদ লেগেছে, পাঁঠার মাংস প্রায় পাওয়াই যায় না বলতে গেলে, ভেড়ার মাংসে কেমন যেন একটা বোঁটকা গন্ধ, সামুদ্রিক মাছও প্রতাপের বিশেষ পছন্দ নয়। বাবলু প্রায়ই ইলিশ মাছ কিনে আনতো, শ্যাড মাছ ইলিশের মতন, তা ছাড়া পদ্মার ইলিশও বিমানে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, পাওয়া যায় ওখানকার বাংলাদেশী দোকানে, দুর দুর, দেশের টাটকা ইলিশের সঙ্গে তার কোনো তুলনাই চলে না। ডিপ ফ্রিজে জমানো কাঠের মতন শক্ত মাছ দেখলেই তো অভক্তি জন্মে যায়। তবে হ্যাঁ, স্বীকার করতেই হবে, অ্যামেরিকা তরিতরকারি আর ফলমূলের স্বর্গ। প্রতাপের সবচেয়ে ভালো লাগতো মাশরুম, অমন সুস্বাদু মাশরুম তিনি জীবনে কখনো খাননি।

কলকাতায় ফিরে প্রতাপ নিউ মার্কেটে এই ধরনের মাশরুম কিনতে গিয়েছিলেন, কে যেন একজন বললো, মাশরুম চিনতে হয়, এদেশের এক এক জাতের মাশরুম বিষাক্ত হতে পারে, তাই শুনেই মমতা বেঁকে বসলেন, প্রতাপের কিনে আনা মাশরুম রান্না না করেই ফেলে দিলেন আস্তাকুঁড়ে।

হাজরা রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রতাপ আপনমনে হাসলেন। ঘুরে ফিরে মমতার কথাই তাঁর মনে আসছে। তিনি যে এতটা স্ত্রৈণ, তা আগে তো কখনো টের পাননি। তিনি ভেবেছিলেন, মমতা হরিদ্বারে চলে গেলে তিনি বেশ একলা একলা স্বাধীনভাবে থাকবেন। এখন এক-একবার লোভ হচ্ছে একটা টিকিট কেটে হঠাৎ হরিদ্বার পৌঁছে মমতাকে চমকে দিতে।

রাস্তার ধারের একটা জবরদখল স্টলে দাঁড়িয়ে প্রতাপ এক গেলাস চা খেলেন। চা তো নয়। যেন গরম গরম ষাঁড়ের পেচ্ছাপ। চায়ের নামে এরা কী দেয় মানুষকে? প্রতাপের মেজাজ গরম হয়ে গেলেও কিছু বললেন না। পয়সাটা ছুঁড়ে দিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন।

মুখের স্বাদটা এমন বিশ্রী হয়ে গেছে যে পাল্টানো দরকার।

একসময় সিগারেটের নেশা ছিল খুব, ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় তিন বছর আগে। এখনো অনেকক্ষণ একা থাকলে বা অস্থির বোধ হলে হাতের আঙুল আর ঠোঁট নিশপিশ করে। সিগারেট ছাড়তে হয়েছিল প্রায় বাধ্য হয়েই। প্রত্যেকদিন সকালে খুব কাশি হতো, একবার ব্রঙ্কাইটিসের মতন হয়ে গিয়েছিল, কাশিও চলছে, সিগারেটও চলছে। একদিন কাশতে কাশতে প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাবার মতন অবস্থা, মমতা বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, কাশো, আরও কাশো, সিগারেট তো ছাড়তে পারবে না কোনোদিন! প্রতাপ তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন জানলা দিয়ে। মমতা খুব হেসেছিলেন তখন। মমতার এই হাসিটাই প্রতাপকে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে বাধ্য করেছে। এরপর দু’তিনবার মাত্র দুর্বল হয়েছিলেন প্রতাপ, বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তার এগিয়ে দেওয়া সিগারেট প্রতাপ গ্রহণ করতে যেতেই মমতা বলতেন, জানতাম, তুমি পারবে না! অমনি প্রতাপ প্রত্যাখ্যান করে বীরের মতন বলেছেন, দ্যাখো পারি কি না। একবার একটা সিগারেট ঠোঁটে চুঁইয়ে পর্যন্ত ফেলে দিয়েছিলেন।

এখন মমতা নেই, এক প্যাকেট সিগারেট কিনলে কেমন হয়? একটা দোকানের সামনে দাঁড়াতেই তিনি যেন অন্তরীক্ষে মমতার হাসি শুনতে পেলেন। প্রতাপ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, কাছাকাছি একটি বাড়ির ছোট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দুটি মহিলা খুব হাসছে। প্রতাপ ঠিক করলেন, সিগারেট বিষয়ে যদি প্রতিজ্ঞা ভাঙতেই হয়, মমতার সামনেই ভাঙবেন, কাপুরুষের মতন আড়ালে নয়।

তা হলে একটা পান খাওয়া যেতে পারে। বাড়িতে কখনো সখনো দু’একটা পান খেলেও প্রতাপের এ নেশা নেই। লোকজনের সামনে কিছু চিবোনোর মধ্যে কেমন যেন একটা জন্তু জন্তু ভাব থাকে। পুরুষ মানুষের লাল ঠোঁটও তাঁর চোখে কদাকার লাগে। বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্ন খাবার পর কেউ কেউ যখন মুখে দু’তিনটি পানের খিলি একসঙ্গে পুরে জাবর কাটে, সেই অবস্থায় আবার কথা বলতে আসে, প্রতাপ সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেন।

প্রতাপ দোকানদারটিকে বললেন, ওহে, এক খিলি পান সাজো তো। খয়ের দিও না!

পানওয়ালা তার দোকানের পাটাতনের নীচের অন্ধকার গহুর থেকে রাশি রাশি খালি বোতল বার করে ক্রেটে সাজাচ্ছে। সে এখন ব্যস্ত, উত্তর দিল না।

প্রতাপ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চলন্ত মানুষের স্রোত দেখতে লাগলেন।

এই শহরের মানুষ কি হঠাৎ বেড়ে গেছে? আজ পথে এত বেশি লোক মনে হচ্ছে কেন? কিংবা এমন মনোহরণ বাতাস বইছিল বলেই কি অনেক লোক বাইরে বেরিয়ে এসেছে? কলকাতার অনেক বাড়িতেই তো হাওয়া ঢোকে না। এখন অবশ্য বাতাসের বেশ জোর। ঠিক ঝড় নয়, ঝোড়ো হাওয়ার মতন। আকাশের রং এখন পাতলা লালচে। পায়রাগুলো হুড়োহুড়ি করে ঘরে ফিরছে। এই শহরে বেশ কিছু টিয়া পাখিও আছে। পশ্চিম আকাশের দিকে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি, ওদের কী নাম কে জানে! দুটি দমকল সন্ধ্যারতির শব্দ জানিয়ে চলে গেল।

খানিক পরে প্রতাপের খেয়াল হলো, লোকটি তাকে পান দেয়নি তো!

পানওয়ালাটি তখন বোতল নিষ্কাশন বন্ধ রেখে তারই মতন চেহারার আর একটি লোকের সঙ্গে নিচু স্বরে কিছু আলোচনা করছে। একজন খরিদ্দার যে তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, সে খেয়ালই নেই।

এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতন যে প্রতাপ মজুমদার শ্রেণীর একজন রাশভারী চেহারার ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালে এই পানওয়ালা শ্রেণীর কেউ তাকে খাতির করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠবে।

এর ব্যত্যয় দেখে প্রতাপ বিস্মিত হলেন। তারপর গম্ভীর আদেশের সুরে বললেন, ওহে, তোমার কাছে পান চাইলুম না?

পানওয়ালাটি প্রতাপের ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলো। সে পাশ ফিরে প্রতাপের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বললো, খালি একটা পান চাইছেন তো? দাঁড়ান, দিচ্ছি!

তারপর সে তার সঙ্গীর প্রতি আর দু’চারটি কী সব নির্দেশ দিয়ে নিজের দোকানের পাটাতনের ওপর উঠে বসলো। হাত মুছলো একটা নোংরা ভিজে ন্যাকড়ায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আর একটি পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছোকরা প্রতাপের পাশে এসে জিজ্ঞেস করলো, বেচুলাল, আমার চুরুট এনেছো?

পানওয়ালাটি এবারে বেশ উৎসুকভাবে বললো, হ্যাঁ বাবু, আজ সকালেই এসেছে।

পান সাজায় হাত না দিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে ওপরের তাক থেকে বিভিন্ন বাক্সের চুরুট দেখাতে লাগলো ছোকরাটিকে।

প্রতাপ ওর স্পর্ধা দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। আগুনের মতন রাগ ছড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর সারা দেহে। তিনি ভাবলেন, লোকটির কান ধরে টেনে নামিয়ে দুই থাপ্পড় কষাবেন ওর গালে।

কিন্তু প্রতাপ মজুমদারের মতন মানুষেরা কোনো পানওয়ালাকে থাপ্পড় মারে না। এরকম ইচ্ছে তাঁদের মাঝে মাঝেই হয়, কিন্তু সেই রাগ মনেই পুষে রাখতে হয়, কিংবা বাড়িতে ফিরে স্ত্রী-পুত্র কন্যাদের ওপর সেই রাগের প্রভাব পড়ে।

প্রতাপ আর দাঁড়ালেন না সেখানে। তিনি আর অন্য দোকানেও গেলেন না। পান খাওয়ার ইচ্ছেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ওই বেয়াদপ পানওয়ালাটিকে কি কোনো শাস্তিই দেওয়া যাবে না? তিনি শুধু এক খিলি পান চেয়েছেন, অতি সামান্য তার দাম, সেইজন্য লোকটা তাকে অবজ্ঞা করলো? অথচ সে তো পানের দোকানই খুলে বসেছে। পুলিশের উচিত্র ওর দোকান তুলে দেওয়া!

ওই পানওয়ালার কথা ভাবতে ভাবতেই প্রতাপ অনেকটা রাস্তা হেঁটে গেলেন। নিরপেক্ষ ভাবেও তিনি বিচার করতে চাইলেন লোকটাকে। যে-খদ্দের বেশি পয়সার জিনিস কিনবে, তার প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখাবে, এটাই তো ব্যবসার নিয়ম। সে দিক থেকে লোকটি অন্যায় করেনি। কিন্তু প্রতাপ আগে এসেছেন, এমনিতেই তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আর কিছু না হোক, সে তো কাঁচুমাচু ভাবে বলতে পারতো বাবু, আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আর একটু দাঁড়ান, পানে হাত দেবার আগে এনাকে চুরুটটা দিয়ে নিই!

মনের মধ্যে রাগটা রয়েই গেল।

সেই জন্যই বোধহয় প্রতাপ একটু পরে আর একটি বাজে ঘটনায় জড়িয়ে পড়লেন।

ঘটনাটি অতি সামান্য। যে-কোনো বড় শহরেই এরকম খুচখাচ অপরাধের ঘটনা যখন তখন ঘটে। অনেক অন্যায় আছে, যেদিকে আইনের দৃষ্টি পড়ে না। নগরে যারা থাকে, তারা সবাই নাগরিক চেতনাসম্পন্ন হয় না। কলকাতার মতন বিশৃঙ্খলভাবে বেড়ে যাওয়া শহরে বিশেষ কোনো সামাজিক নীতিবোধও গড়ে ওঠেনি।

হাজরা রোড আর ডোভার রোডের মোড়ের কাছটায় একটা রিকশা হঠাৎ উল্টে যায়। রিকশাটিতে বসেছিল একটি হলুদ শাড়িপরা যুবতী, তার হাতে একটি খাতা ও একটি মোটা বই, সম্ভবত অখণ্ড গীতবিতান, সেও আচমকা বিসদৃশ ভাবে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। হাজরার এই অংশটিতে সামান্য বৃষ্টি হলেই দু’পাশে নোংরা জমে থাকে। যুবতীটি কোনোক্রমে উঠে দাঁড়ালো, তার বইটিতে কাদা লেগেছে, রাগে-দুঃখে সে রিকশাওয়ালাটিকে বকতে শুরু করে দিল, এখন তার ভাষা ঠিক রাবীন্দ্রিক নয়। এমন সময় একটি মোটর সাইকেল চড়া যুবক সেখানে এসে উপস্থিত, সেও রিকশাওয়ালাটিকে ধমকে বললো, অ্যাই, তুমি নতুন রিকশা চালাচ্ছো? আর একটু হলেই তো আমার সঙ্গেই ধাক্কা লাগতো!

যুবতীটি মাধ্যাকর্ষণের টান অনুভব করার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা মোটর বাইকের গর্জন শুনেছিল। রিকশার ধার ঘেষে এই মোটর বাইকটিই যাচ্ছিল তো। তার ধারণা হলো, এই লোকটিই দুষ্কৃতকারী। সে বললো, আপনিই তো ধাক্কা মেরেছেন!

যুবকটি বললো, না না, আমি খুব জোর সামলে নিয়েছি। এই ব্যাটা এমন বিচ্ছিরিভাবে চালাচ্ছিল, গাঁ থেকে সদ্য এসেছে বোধহয়, হর্ন শুনেও বোঝে না। এদিক দিয়ে আবার একটা ট্যাক্সি…

যুবতীটি তবু বললো, আপনিই ধাক্কা মেরেছেন। আপনার লজ্জা করে না?

যুবকটি বললো, কী মুশকিল! আমি ধাক্কা মারলে কি আমি আবার এখানে ফিরে আসতুম? আমি খুব জোর সাইড করে না নিলে একটা বড় অ্যাকসিডেন্ট হতে পারতো। আমি কি আপনাকে কিছু হেল্প করতে পারি? আপনার যদি বেশি জোর চোট লেগে থাকে…

কলকাতা শহরে মাটি খুঁড়েও মানুষ ওঠে। কাছেই একটা বস্তিমতন আছে, চোখের নিমেষে জমে গেল ভিড়। একটি চলনসই চেহারার যুবতী, একটি সপ্রতিভ ও সুদৃশ্য পোশাক পরিচ্ছদে ভূষিত মোটর সাইকেল চালক আর একটি গোবেচারা, রোগা, হতভম্ব রিকশাওয়ালা, এই তিনটি পাত্রপাত্রীর মধ্যে যুবকটিই আদর্শ টার্গেট। ভিড়ের মধ্যে দুতিনজন রয়েছে পাড়ার গার্জেন টাইপের, একজন ধ্যাডেঙ্গা চেহারার লোক যুবকটির কলার শক্ত করে চেপে ধরে প্রথম থেকেই সপাটে গালাগাল শুরু করে দিল। তার কণ্ঠস্বর ঈষৎ জড়ানো, কাছেই গচার বাংলা মদের দোকান।

জনতার প্রথম দাবি, মেয়েছেলের অপমান করা হয়েছে, যুবকটিকে ক্ষমা চাইতে হবে।

দ্বিতীয় দাবি, মোটর সাইকেল এই গরিব রিকশাওয়ালাকে ধাক্কা মেরেছে, সুতরাং শুধু ক্ষমা চাইলেই চলবে না, কিছু ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।

ধ্যাড়েঙ্গা লোকটির অনুচ্চারিত দাবি, যে-লোক একটি মেয়েছেলেবসা রিকশায় ধাক্কা মারতে পারে, তার মোটর সাইকেল চালাবার কোনো অধিকারই নেই, ওই মোর্টর সাইকেলটি আপাতত বাজেয়াপ্ত করা দরকার।

আর যুবকটি বারবার বলতে লাগলো, আমি ধাক্কা মারিনি। ধাক্কা মারলে কেউ কখনো ফিরে আসে? আমি অনেকটা চলে গিয়েছিলুম, গাড়ি ঘুরিয়ে…

এই ঘটনার মাঝামাঝি প্রতাপ এসে দাঁড়ালেন ভিড়ের পেছনে।

প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। রাস্তার আলো জ্বলেনি। প্রত্যেক সন্ধেতেই তো আলো জ্বলে না। এরই মধ্যে দোতলা বাস যাচ্ছে, অন্য অনেক গাড়ি-রিকশা যাচ্ছে, মানুষের ঢেউ বয়ে চলেছে। একপাশের একটা ভিড়ের মধ্যে কী নিয়ে চ্যাঁচামেচি হচ্ছে তা নিয়ে অন্যদের মাথাব্যথা নেই। আইন এবং নীতিবোধ এখান থেকে অনেক দূরে।

অবস্থা ঘোরালো হচ্ছে ক্রমেই। যারা নিছক কৌতূহলে ভিড় জমিয়েছিল, তারা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, ধেয়ে আসছে পাড়া থেকে নতুন স্বার্থান্বেষীরা। মেয়েটি তার ভুল বুঝতে পেরে এখন যুবকটির পক্ষ নিয়েই কথা বলছে, সে যুবকটিকে বিপদে ফেলতে চায় না, সে ওর ক্ষমাপ্রার্থনায় আগ্রহী নয়, সে এখন পালাতে পারলে বাঁচে। তার কণ্ঠে প্রায় কান্না। কিন্তু তাকে ঘিরে রেখেছে। কয়েকজন, নাটক শেষ না হলে তাকে যেতে দেওয়া হবে না। অবশ্য তার গায়ে হাত দেবে না

ঢ্যাঙা লোকটি কুৎসিত ভাষা শুরু করে দিয়েছে, অন্য দু’জন টানাটানি করছে মোটর সাইকেলটি, যুবকটির গায়ে কয়েকটি চড়-চাপড়ও পড়েছে। এই সময় প্রতাপ ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলেন।

তিনি বিচারক, বহু বৎসর ধরে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে এসেছেন। চোখের সামনে এরকম একটি অন্যায় ঘটতে দেখলে তিনি তা চুপ করে সহ্য করে যেতে পারেন না। তিনি ভুলে গেলেন যে তিনি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন অনেকদিন আগে, তা ছাড়া চাকুরিরত বিচারকরাও সমাজের সব অন্যায়-অবিচার রোধ করার দায়িত্ব নেন না। তাঁর মতন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাস্তাঘাটে কক্ষনো এইসব বাজে লোকদের ঝামেলায় মাথা গলান না, নাক কুঁচকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়াই নিয়ম। এসব জায়গায় কথা বলতে গেলে মানী লোকের মান থাকে না।

প্রতাপের এই মোটর সাইকেল চালকটির মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, সে সৎ ধরনের, সে মিথ্যে কথা বলছে না। এই শহরে কোনো গাড়ি অন্য গাড়িকে বা মানুষকে ধাক্কা দিলে পালিয়ে যেতেই চায়, ফিরে আসে না। সে ফিরে এসেছে মেয়েটিকে সাহায্য করবার জন্য, এটা একটা দুর্লভ ব্যাপার, এ জন্য সে অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য, তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কেন? ঢ্যাঙা লোকটির খারাপ ভাষাই প্রতাপ সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করছেন।

প্রতাপ একেবারে সামনে এসে কড়াভাবে ধমক দিয়ে বললেন, এর কলার ধরেছো কেন? আগে ছেড়ে দাও? ভদ্রভাবে কথা বলো।

ঢ্যাঙা লোকটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললো, আপনি চুপ মারুন তো! এই হারামীর বাচ্চা এই পাড়া দিয়ে রোজ ফাঁট মেরে মোটর বাইক হাঁকিয়ে যায়, আমি ঠিক চিনে রেখেছি! শালা মাগীবাজ…

পেছন থেকে আর একজন বললো, আপনি কী জানেন দাদু? কেন ফোঁপর দালালি করছেন! যান, যান, নিজের কাজে যান!

প্রতাপ বললেন, রোজ এই রাস্তা দিয়ে যাওয়াটা কি অপরাধ? এই রাস্তাটা কি তোমার সম্পত্তি নাকি? ওকে ছেড়ে দাও! মেয়েটির সঙ্গে ওর যা হয়েছে, তা ওরা দু’জনে বুঝে নেবে!

ঢ্যাঙা লোকটি বললো, আপনি ফের বকবক করছেন! যান ভাগুন, কাটুন এখান থেকে!

প্রতাপ আবার দৃঢ়ভাবে বললেন, না, তুমি আগে ছাড়ো ওকে! কিংবা ওকে পুলিশের হাতে দেওয়া হোক, ফাঁড়ির মোড়ে পুলিশ আছে।

সেই লোকটি এবার হিংস্র মুখখানা ফেরালো প্রতাপের দিকে। তারপর ডান হাতের পাঞ্জাটা ওপরে তুললো, সেটা চকিতে প্রতাপের নাকের ওপর ঠেসে ধরে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, ভাগ। শাল্লা! আমি কে চিনিস না? পুলিশ দেখানো হচ্ছে! আমার মুখের ওপর কতা!

লম্বা মাতালটির গায়ে বেশ জোর। সেই এক ধাক্কায় প্রতাপ ছিটকে পড়ে গেলেন রাস্তার একধারে। কিছু লোক ভয় পেয়ে দৌড়ে সরে গেল, একটা কেউ প্রতিবাদ জানালো না।

এরপর ব্যাপারটা চুকতে মিনিট দু’এক লাগলো। যুবকটি তেজ দেখিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতেই কিল-ঘুষি বর্ষণ শুরু হয়ে গেল তার ওপরে, মেয়েটিকে চলে যাবার রাস্তা করে দেওয়া হলো। রিকশাওয়ালাটি আগেই পালিয়েছে। যুবকটি বেশি চিৎকার করার সুযোগই পেল না, কেননা গণ-বিচারকদের ক্রুদ্ধ হুংকারের জোর অনেক বেশি, তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হলো পাশের একটা অন্ধকার গলিতে। মোটর সাইকেলটি আগেই তার হাতছাড়া হয়েছে।

যুবকটি যদি শেষ পর্যন্ত খুন না হয়, তা হলে এটা কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনাই নয়। সাধারণত কিছুটা বেশ জোর মারধরের পর ভিকটিমকে একটুখানি সুযোগ দেওয়া হয় পালাবার। সে তখন প্রাণভয়ে ছোটে, নিজের সম্পত্তির কথা ভুলে। মোটর সাইকেলটি টুকরো টুকরো হয়ে আজ রাতের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাবে মল্লিকবাজারে।

ভিড় মিলিয়ে গেছে, রাস্তা আবার স্বাভাবিক। যানবাহন চলছে। পথচারীরা নানা রকম কথা বলতে বলতে যাচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ বিষণ্ণ, কেউ নিজের ওপরেই বিরক্ত।

প্রতাপ যেমনভাবে পড়েছিলেন, ঠিক সেইভাবেই আধশোয়া অবস্থায় দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। রইলেন। তিনি অজ্ঞান হননি, খুব যে তাঁর আঘাত লেগেছে তাও নয়, নিজের চেষ্টাতেই তিনি উঠে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু তাঁর মন নিশ্চল হয়ে গেছে, চক্ষু দুটি স্থির। এখনো লোডশেডিং চলছে। সেইজন্য কেউ তাঁকে দেখতেও পাচ্ছে না। দু’একজন পথ-চলতি লোকের পা লাগছে তার গায়ে, কেউ কেউ চমকে উঠছে, কিন্তু একজন মানুষ না জন্তুর গায়ে পা লাগলো তা দেখবার জন্যও কেউ এই অন্ধকারে থামে না।

বেশ খানিকক্ষণ পর উল্টোদিকের একটি দোকানঘর থেকে একজন লোক টর্চ হাতে নিয়ে এলো এদিকে। প্রতাপের সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ও দাদা, আপনার বেশি লেগেছে নাকি? উঠতে পারছেন না?

প্রতাপ কোনো উত্তর দিলেন না।

লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো, শিরদাঁড়ায় চোট লেগেছে? আমি ধরবো আপনাকে?

প্রতাপ এবারে আস্তে আস্তে উঠে বসলেন।

লোকটি টর্চ ফেলে প্রতাপকে ভালো করে দেখলো। তারপর জিভে আফসোসের শব্দ করে বললো, এঃ! ভদ্দরলোক, আপনার অনেক বয়েসও হয়েছে দেখছি, কেন ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেন? আমি তো আমার দোকান থেকে দেখছিলুম, তখন ভয়ে এগোইনি, ওরা সব মস্তান-গুণ্ডা, ওদের সঙ্গে কি ভদ্রলোকেরা পারে? বেশি কিছু বলতে গেলে ছুরি চালিয়ে দেয়।

প্রতাপ তবু কোনো কথা বললেন না। মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভাষা যেন তাঁর শেষ হয়ে। গেছে।

লোকটি আরও দু’চারটি সান্ত্বনার বাক্য বললো, তার দোকানে প্রতাপকে একটু বসে বিশ্রাম নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করলো, প্রতাপ তাতেও রাজি হলেন না।

লোকটি বললো, তা হলে একটু পা-চালিয়ে চলে যান। একটু সাবধানে থাকবেন। এই যে আপনি ওদের কাজে আজ বাধা দিতে গেসলেন, আপনাকে ওরা চিনে রাখলো, আবার এ পাড়ায় দেখলেই ধরবে।

প্রতাপ হাঁটতে আরম্ভ করলেন। সেই হাজরা রোড থেকে যাদবপুর পর্যন্ত পুরোটাই তিনি হেঁটে এলেন একটা ঘোরের মধ্যে। তাঁর জামায় এবং একটা হাতে জল কাদা মাখা, তা একটু মুছে নেবার কথাও মনে পড়লো না। তাঁর মন সম্পূর্ণ অবশ, রাগ বা দুঃখেরও অনুভূতি নেই। এতখানি রাস্তা আসার সময় তিনি যে গাড়ি চাপা পড়েননি, সেটাই আশ্চর্য ব্যাপার।

নিজের বাড়িটি চিনতে তাঁর ভুল হলো না, তিনি সদরের তালা খুললেন। দোতলায় এসে দ্বিতীয় তালাটিও খুললেন ঠিক মতন। তারপর হাত-পা না ধুয়ে, জামা না খুলে তিনি একটা দাঁড় করানো পুতুলের হঠাৎ এলিয়ে যাবার মতন পড়ে গেলেন বিছানায়। তারপর তিনি ঘুমের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

প্রায় ঘণ্টা চারেক বাদে তাঁর ঘুম ভাঙলো। প্রথমে চোখ মেলে তিনি নিজের পরিপার্শ্বটা চিনতে পারলেন না। এটা কার বাড়ি কিংবা কোন দেশ? তিনি কি সমুদ্রে ভাসছেন? না, পিঠের নীচে বিছানা, সেই বিছানাটা দুলছে কেন? মাথাটা বিষম ভারী, তিনি মাথা তুলতে পারছেন না।

আরও একটু পরে তিনি আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। দেয়ালে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে তিনি সুইচ টিপলেন, অন্ধকার রইলো এক রকমই, বিদ্যুৎ হয়তো এর মধ্যে একবার এসে প্রস্থান করেছে আবার।

এদেশে সবাই এখন অন্ধকারে অভ্যস্ত। নিজের বাড়ির মধ্যে হাঁটাচলা করার কোনো অসুবিধে নেই। রান্নাঘরে গিয়ে মোমটা খুঁজতে হবে, একথা প্রতাপের মনে পড়লো। তবু তিনি একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। নিজেকে একটা অন্যরকম মানুষ মনে হচ্ছে কেন? সারা বুক জুড়ে একটা ব্যথা ভাব। পা ফেলতে আলগা আলগা লাগছে, অথচ পায়ে তো চোট লাগেনি।

মাথাটা দু’বার ঝাঁকিয়ে তিনি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন। সন্ধেবেলা একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটে গেছে, তা তাঁর মনে পড়েছে, কিন্তু সে জন্য রাগ হচ্ছে না কেন? যেন অন্য কারুর জীবনের ঘটনা, তিনি শুনেছেন মাত্র। দৃশ্যটাও তিনি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু একজন গুণ্ডার হাতে ধাক্কা খেয়ে যে প্রতাপ মজুমদার পড়ে যাচ্ছেন, তিনি আর এখনকার এই প্রতাপ মজুমদার এক নন। এটা একটা ছবির অংশ। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল।

মোমবাতিটা জ্বেলে তিনি সিঁড়ির দরজা বন্ধ করলেন। এতক্ষণ খোলা ছিল, চোর ঢুকতে পারতো। এ পাড়ায় খুব চোরের উপদ্রব। বেশ রাত হয়েছে, রাস্তায় কোনো শব্দ নেই। নানু আজ রাতেও থাকবে না, সেটা ঠিকই ছিল। বিকেল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, প্রতাপের খিদে পাবার কথা, কিন্তু খিদের কোনো বোধ নেই।

দোতলায় চারখানা ঘর, তার মধ্যে একখানাই শুধু স্বামী-স্ত্রী ব্যবহার করেন। বাকি তিনখানা ঘর সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কখন ছেলেমেয়েরা আসবে। বাবলু-শর্মিলা এলে যাতে কোনো অসুবিধে না হয়, সে জন্য মমতার ব্যবস্থার ত্রুটি নেই। ওরা এই নতুন বাড়িতে একবারও আসেনি, প্রত্যেক বছরই শীতকালে আসবে বলে ভাবে, একটা না একটা বাধা পড়ে যায়।

ওই ঘরগুলোও একবার দেখা দরকার। অন্ধকারের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়ে লুকিয়ে থাকতে পারে। জমাট অন্ধকারের মধ্যে শীর্ণ মোমের আলোয় প্রতাপকে একটা অদ্ভুত ছায়ামূর্তির মতন মনে হয়।

অনেকদিন আগে বিমানবিহারী একটা রিভলভার দিয়েছিলেন প্রতাপকে। তাঁর নামে লাইসেন্সও করা আছে। এর মধ্যে প্রতাপ কয়েকবার সেটা ফেরত দিতে চেয়েছিলেন, বিমান খালি বলেন, থাক না, ব্যস্ত হবার কী আছে?

আলমারি খুলে রিভলভারটা বার করে তিনি প্রত্যেকটা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখলেন। একটা জানলায় শব্দ হচ্ছে, সেটা বন্ধ করে দেবার আগে রাস্তায় একবার উঁকি দিলেন, একেবারে শুনশান। তবু প্রতাপ রিভলভারটা উঁচু করে ধরে আছেন। বাইরে বেরুবার সময় কোনোদিন এটা সঙ্গে নেন না। মমতা মাথার দিব্যি দিয়েছেন, তাঁর বদমেজাজী স্বামী হঠাৎ একটা কিছু করে

বসতে পারেন, মমতার সব সময় এই ভয়। আজ যদি রিভলভারটা সঙ্গে থাকতো তা হলে প্রতাপ নির্ঘাৎ ওই ঢ্যাঙা শয়তানটাকে গুলি করতেন। সেটা কি কোনো অন্যায় হতো?

নানু সব রান্না করে গুছিয়ে রেখে গেছে। রুটি, আলু-পেঁয়াজের তরকারি, মুলো দিয়ে। কচ্ছপের মাংস, এটা প্রতাপের খুব পছন্দের খাবার, মমতা কচ্ছপের মাংস খান না, তাই অন্য সময় আনা হয় না। আর গাজরের হালুয়া। সব কটার ঢাকনা খুলে দেখতে দেখতে প্রতাপের হঠাৎ মনে পড়লো, পাখার গুদামের কর্মচারিটি তাঁকে বলেছিল, মাটির তলায় যা জন্মায় আপনি সেগুলো আর খাবেন না। কেন বলেছিল এ কথা? লোকটি কিন্তু মতলববাজ নয়।

তিনি নিজেই খাবার গরম করে নিতে পারেন। তবু আজ আর স্টোভ জ্বাললেন না। মোমটা আর রিভলভারটা টেবিলের ওপর রেখে তিনি খেতে বসলেন। একটুখানি রুটি ছিঁড়ে, তার মধ্যে তরকারি মাখিয়ে হাতে ধরে রইলেন। আজ না খেলেও চলে। বুকটা খুব ভারী ভারী লাগছে, মনে হয় যেন গলা দিয়ে, বুক পেরিয়ে খাদ্যগুলো নীচে নামতে পারবে না, মাঝখানে কোথাও আটকে যাবে। মুলো দিয়ে কচ্ছপের মাংস খেতে ভালোবাসতো যে প্রতাপ মজুমদার, সে অন্য লোক। আজ তাঁর ওইসব খাদ্যে কোনো আসক্তিই নেই।

তারপর তিনি দেখলেন, তার বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে চাপ চাপ কাদা। তাঁর ডান হাতের পাঞ্জাটাও নোংরা। খেতে বসার আগে তিনি এমনিতেই প্রত্যেকদিন হাত ধুয়ে নেন, আজ রাস্তার ধুলো কাদার মধ্যে অনেকক্ষণ শুয়েছিলেন, তার পরেও বাড়ি ফিরে স্নান করেননি। তাঁর সমস্ত শরীরটাই নোংরা। কিন্তু যেন তাতে কিছু যায় আসে না।

মোমটা নিবু নিবু হয়ে আসছে। আর কি মোম আছে? উঠে খুঁজতেও ইচ্ছে করছে না। বিমর্ষতায় ভরে যাচ্ছে বুক। কেন এমন হচ্ছে আজ? সন্ধেবেলার ঘটনাটার জন্য দোষ তো তাঁরই। উল্টোদিকের দোকানদারটি ঠিকই বলেছিল, ওইসব গুণ্ডা-মাস্তানদের সঙ্গে কি শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা পারে? ওরা অনায়াসে যে-সব খারাপ কথা বলে, লোককে ধাক্কা মারে, পেটে ছোরা বসিয়ে দেয়, ফস করে পাইপগান চালায়, তা কি ভদ্র মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব? সবাই এড়িয়ে যায়। এই রকমই চলতে থাকবে।

একটা নিম্নশ্রেণীর লোক তাকে অকারণে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল, অত লোকের সামনে, কেউ প্রতিবাদ করলো না? ভদ্রতা-সভ্যতা কি উঠে গেল এদেশ থেকে? পানের দোকানের যে-ছোকরাটি চুরুট কিনতে এসেছিল, সেও তো বলতে পারতো, এই ভদ্রলোক আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছেন, একে দিয়ে নাও, তারপর আমার চুরুট দেখিয়ো।

মোটর সাইকেল-চালক ছোকরাটি অবশ্য অন্যরকম। সে ফিরে এসেছিল। আজকালকার তরুণদের মধ্যে এরকমও তো আছে। ওর চোখে মুখে প্রতাপ একটা সতোর দীপ্তি দেখতে পেয়েছিলেন। সেই ছেলেটির ওই পরিণতি। কেউ বাধা দেবে না? রাস্তার সব লোক তো খারাপ হতে পারে না, কিন্তু যারা অসং নয় তারা সবাই ভীতু? সেই ছোকরাটিকে একেবারে মেরে ফেললো কি না, তাই-ই বা কে জানে! আজকাল খুন তো জলভাত, কাগজ খুললে রোজই চোখে পড়ে। একটু রাজনীতির রং মেশাতে পারলে পুলিশও ছোঁয় না। ছেলেটিকে যদি প্রাণে না মেরে পঙ্গু করে দেয়, সে খবর ছাপাও হবে না।

সেবার অ্যামেরিকায় গিয়ে প্রতাপের মনে হয়েছিল এখানে টাকা রোজগারের জন্য তাঁর দেশের ছেলেমেয়েরা দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে আছে, কিন্তু এখানকার সমাজে তাঁদের কোনো স্থান নেই, মেইন স্ট্রিমের সঙ্গে তাদের যোগ থাকে না, তাদের সেনস অফ বিলংগিং হয় না। রাস্তায় কোনো গণ্ডগোল হলে তারা ভাবে, এটা আমাদের ব্যাপার নয়। পাশে দাঁড়িয়ে দুটি আমেরিকান ঝগড়া বা তর্ক করলেও এরা কোনো পক্ষ নেবে না। কালো লোক বলে কোনো দোকানদার যদি তার প্রতি সরাসরি অপমান না করে স্রেফ অবজ্ঞার ভাব দেখায়, ইচ্ছে করে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে, তারও কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না, অন্য দোকানে চলে যাবে। বর্ণবিদ্বেষের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ প্রতাপের চোখে পড়েনি, কিন্তু অনুভব করেছেন, সেটা চাপা ভাবে অনেকের মধ্যে আছে। সেটা অস্বাভাবিকও তো নয়। কালোর চেয়ে ফর্সা লোকেরা সব জায়গাতেই তো বেশি খাতির পায়।

আজ প্রতাপ বুঝলেন, নিজের দেশে থেকেও তো সবসময় সব কিছুতে অংশ নেওয়া যায় না। রাস্তায় কোনো গণ্ডগোল হলে আজকাল সবাই পরামর্শ দেয়, ওতে মাথা গলিও না। পাশের বাড়ির একটা ছেলে বখামি করলে তাকিয়ো না তার দিকে, তাকে কিছু বলতে যেও না, বলতে গেলে নিজের মান নষ্ট হবে। এইসব ব্যাপার নিয়ে বড়জোর খবরের কাগজে চিঠি লেখা যায়।

প্রতাপ ভাবলেন, তিনি নন, অন্য একজন প্রতাপ মজুমদার, যিনি চেয়েছিলেন নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে সাধ্যমতন স্বাচ্ছন্দ্য দিতে, বাস্তুচ্যুত হয়ে, পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েও যে মানুষটি অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন, সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন, কারুর কাছে মাথা নীচু করেননি, সেই মানুষটি আজ চরম একা। ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে থাকে না, তাদের এখন নিজস্ব জীবন আছে। পাড়ার লোক বা অল্প চেনারা খানিকটা সম্ভ্রমের সঙ্গে বলে, আপনার ছেলে তো আমেরিকায় থাকে? কিসের জন্য এই সম্রম? তিন-চার বৎসর অন্তর সেই ছেলে একটা ক্যামেরা বা রেডিও বা কিছু বিদেশী পারফিউম নিয়ে আসবে, তার টুথ পেস্টটা দেখেও অন্যরা বলবে, আহা কী সুন্দর! মাঝে মাঝে নিয়মরক্ষার জন্য চিঠি বা কিছু টাকা পাঠাবে। সেই প্রতাপ মজুমদার আজ এক ও ণ্ডার হাতে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার নর্দমার পাশে শুয়েছিল, তাকে কেউ চেনে না, ওইটাই তাঁর যোগ্য স্থান।

হ্যাঁ। অন্য প্রতাপ মজুমদার, তিনি নন। এখন তাঁর কিছুতেই কিছু যায় আসে না।

প্রতাপ টের পাচ্ছেন না, তাঁর গাল বেয়ে টপ টপ করে জল গড়াচ্ছে খাবারের থালায়। বারবার একটা কথাই মনে পড়ছে, আমাকে এখন আর কারুর কোনো প্রয়োজন নেই, আমি অপ্রয়োজনীয়, আমি অপ্রয়োজনীয়!

দপ করে আলো জ্বলে উঠলো। এখন এই আলোটারও যেন কোনো প্রয়োজন ছিল না। সব কিছু কেমন যেন ক্যাটক্যাট করছে এই আলোতে। এখন লোকে ঘুমাবে, এখন আলো না। থাকলেও চলে। প্রতাপের মতন ক’জনই বা এখন জেগে থাকে? সন্ধের সময়, যে-সময়টা সভ্য মানুষ বই-টই পড়ে, গান-বাজনা শুনতে চায়, সেই সময়েই অন্ধকারে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। সেই সময় অন্ধকার রাস্তায় অনেক কিছু ঘটে যায়।

প্রতাপ এবার খাওয়ার চেষ্টা করলেন। সবটাই তাঁর তেতো লাগলো। তিনি এক ঝটকায় প্লেট, বাটিগুলো ফেলে দিলেন মাটিতে, নিস্তব্ধতার মধ্যে বেশ জোরে ঝনঝন শব্দ হলো, একটা দুটো প্লেট ভাঙলো। প্রতাপ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রিভলভারটার দিকে।

একটু পরেই তিনি ভাবলেন, এই রাগ তো তাঁর নয়, অন্য প্রতাপ মজুমদারের। যে-লোকটি মূর্খের মতন সারাজীবন খেটেখুটে শুধু একটা পরিবার গড়ে তুলতে চেয়েছিল, বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ভূমিকার কথা কিছু ভাবেনি। নিজের পরিবারের মানুষজনের কাছে তার অনেক কিছু প্রত্যাশা ছিল বলেই এখন তার মধ্যে বিরাট ব্যর্থতাবোধ ও হতাশা আসা সম্ভব। মূর্খ। মূর্খই তো সে। আজকালকার দিনে ছেলেমেয়েরা কি কাছে থাকতে পারে সব সময়। একটা ছেলে গেছে অপঘাতে, সে বেঁচে থাকলেও কী রকম হতো কে জানে! অন্য ছেলে তার কাজের সুবিধের জন্য বিদেশে থাকে, সে এখন নিজের পরিবার গড়বে, সেটাই তো স্বাভাবিক, সে বাপ-মাকে নিয়ে সর্বক্ষণ মাথা ঘামাবে কেন? স্নেহ-মমতা অনেকটা জলের মতনই স্বাভাবিকভাবেই নিম্নগামী।

প্রতাপ মেঝে থেকে বাসনপত্রগুলো আবার কুড়োলেন। আর একটা কথা তাঁর মনে পড়লো। অন্ধকারের মধ্যে একটা লোক টর্চ জ্বেলে উল্টোদিকের দোকান থেকে তাঁর হাত ধরে তুলতে এসেছিল। এইরকম লোকও তো আছে। কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়, কেউ হাত ধরে তোলে। তিনি ওই দ্বিতীয় ব্যক্তিটির ভূমিকাটা তো অনুসরণ করতে পারেন।

সব বাতি নিবিয়ে, রিভলভারটা বালিশের তলায় রেখে প্রতাপ শুয়ে পড়লেন। তিনি আর আগেকার প্রতাপ মজুমদার নন, এই ভেবে হৃষ্ট বোধ করলেন খানিকটা।

পরদিন ঘুম ভাঙলো বেশ দেরিতে। কোনো তাড়া নেই অবশ্য। নানু এখনো আসেনি, তিনি নিজেই চা করে নিলেন। খবরের কাগজ নীচে দিয়ে যায়, সেটা আনতে গিয়ে সিঁড়ি ভাঙার সময় তিনি টের পেলেন, তার শরীরটায় তেমন যুত নেই। বুকের মধ্যে একটা চাপ চাপ ভাব। মাঝে মাঝে খুকখুক করে কাশি আসছে। চোরা ঠাণ্ডা লেগে গেছে বোধহয়। নিজের শরীর খারাপের ব্যাপারটা তিনি গুরুত্ব দেন না, বিকেলের দিকে একবার ব্লাড প্রেশারটা চেক করাবেন ভাবলেন।

চা খাওয়ার খানিক পরেই অলি এসে উপস্থিত। সে ঝলমলেভাবে হেসে বললো, যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে আমার একটা কাজ আছে, এদিকে আসতে আসতে তাই ভাবলুম, তোমার বাড়িতে একটু চা খেয়ে যাই। ব্যাচেলারের জীবন কেমন লাগছে, প্রতাপকাকা?

প্রতাপও মুচকি হাসলেন। অলির অজুহাতটা হয়তো সত্যি নয়। অলি যে শুনেছে মমতা হরিদ্বারে গেছেন, প্রতাপ একলা রয়েছেন, সেই জন্য অলি তাঁর খবর নিতে এসেছে। অলির এইসব দিকে তীক্ষ্ণ নজর।

অলি বললো, নানু কোথায়? তোমার চা কে বানিয়ে দিল?

প্রতাপ বললেন, আমি বুঝি চা করতে পারি না? আমাকে এত অপদার্থ ভাবিস! দ্যাখ, তোকে কেমন চা বানিয়ে খাওয়াচ্ছি। আর কি খাবি, বল? আমি ভালো ওমলেটও বানাতে পারি।

অলি বললো, থাক আর ওমলেট লাগবে না। আমি খেয়ে এসেছি।

কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে সে একটা টিফিন কৌটো বার করে বললো, এতে একটু আতার পায়েস এনেছি তোমার জন্য। তুমি মিষ্টি খাও না বললে চলবে না, এটুকু তোমায় খেতে হবে। বুলি বেঁধেছে কাল রাত্তিরে। বুলি নানারকম রান্না খুব ভালো পারে, জানো তো?

প্রতাপ বললেন, ঠিক আছে, খাবো। আতার পায়েস? কখনো খাইনি।

অলি আর একটা কাগজের বাক্স বার করে, এতে আছে কয়েকটা চিকেন প্যাটিজ। টাটকা। আজ সকালেই বানানো হয়েছে।

প্রতাপ জিজ্ঞেস করলেন, আর কী কী এনেছিস?

অলি বললো, কাকীমা নেই, বাড়িটা ভীষণ খালি খালি লাগছে। ও হ্যাঁ, বুলি বলে দিয়েছে, এই শনিবার ওর গানের প্রোগ্রামটা দেখাবে টি ভি-তে, তুমি দেখো।

প্রতাপ বললেন, দেখবো। এমনিতে টি ভি খোলাই হয় না, মমতাই ওসব দেখে, কিন্তু বুলির গান অনেকদিন শুনিনি। হ্যাঁরে, বুলি একদিন আমার কাছে খেতে চেয়েছিল। নানু আজ থেকে থাকবে। তোরা কাল দুপুরে আমার এখানে খেতে আয় না! আমি বাজার করবো, নানু খুব খারাপ রাঁধে না, ইচ্ছে করলে তুই আর বুলিও এখানে এসে কিছু রাঁধতে পারিস, বেশ পিকনিকের মতন হবে।

অলি বললো, এই রে, তুমি আগে বললে না? আমি যে আজ বিকেলের ট্রেনে ঝাড়গ্রাম যাচ্ছি, সব ঠিক ঠাক হয়ে গেছে।

–হঠাৎ ঝাড়গ্রাম যাবি কেন?

–বিনপুরে কৌশিক পমপম থাকে না? ওদের কাছে যেতে হবে। পমপম খবর পাঠিয়েছে।

–কৌশিক ওই গ্রামের ইস্কুলেই রয়ে গেল? ও দিকে অন্য কোনো ভালো কাজ টাজ পেতে পারতো না?

–প্রতাপকাকা, যার যেখানে ভালো লাগে, সে সেখানেই থাকবে। ওরা দু’জনে ওখানে বেশ মজাসে আছে।

–এখনও বুঝি পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিটি চালিয়ে যাচ্ছে ওদিকে?

–ওই যে বললুম না, যার যা ভালো লাগে, সে সেটাই করবে!

প্রতাপ রান্নাঘরে এসে চা বানাতে লাগলেন, অলি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগলো। প্রতাপ লক্ষ করলেন, একটু যেন রোগা হয়েছে অলি, কিন্তু তার মুখে কোনো মালিন্য নেই। মেয়েটা কি সুখেই আছে? অলিকে কখনো মন-মরা অবস্থায় দেখেননি তিনি।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অজুহাতটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। চা খাওয়ার পর অলি চলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। প্রতাপের খুব ইচ্ছে অলি আর একটু থাকুক। অলির উপস্থিতিতে যেন বাড়িটা ভরে গেছে।

বসবার ঘরের দেওয়ালে প্যারিস থেকে কিনে আনা একটা রেমব্রাশুটের ছবি বাঁধানো, সেটা একটু বেঁকে গেছে, অলি সোজা করে দিয়ে বললো, প্রতাপকাকা, আমি তাহলে যাই? লক্ষ্মী হয়ে থেকো, কাকীমা নেই বলে তুমি যেন যতখুশী অনিয়ম করো না। ঠিক সময়ে খাবে।

–তুই ঝাড়গ্রাম থেকে কবে ফিরবি?

–আমার এখন কলেজ ছুটি, হয়তো দিন সাতেক থাকবো, একটু বেশিও হতে পারে। পমপমের শরীর ভালো না জানোই তো!

–হ্যাঁ রে অলি, তুই আমার খবর নিবি, পমপমের সেবা করতে যাবি, যার যখন অসুবিধে হবে তোকে দৌড়ে যেতে হবে, এসব তো বুঝলুম, কিন্তু তোর কথা কেউ ভাবে?

–কেন ভাববে না কেন? অনেকেই ভাবে। তুমি ভাবো না?

–অলি, একটা সত্যি কথা বলবি? বিয়ে তো করলি না, কিন্তু তুই কারুকে ভালো বাসিস না? সেরকম কেউ নেই?

অলি মুখ ফিরিয়ে, খুব যেন অবাক হবার ভাব করে বললো, ভালোবাসার কেউ নেই? কী বলছো তুমি? আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবাকে ভালোবাসি, কৌশিককে ভালোবাসি, অনুপম, তপন, বাবলুদাকেও ভালোবাসি। আমার কি ভালোবাসার লোকের অভাব? আরও আছে।

–তুই বাবলুর নামটাও বললি? তার সঙ্গে তোর দেখা হয় না কত বচ্ছর…

–ভালোবাসতে দোষের কী আছে? দেখা না হলেও ভালোবাসা যায়। তবে, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি শৌনককে।

–ওঃ, তোর মাথা থেকে এখনও সেই ভূত যায়নি? তুই আজও সেই ছেলেমানুষটিই রয়ে গেলি!

চোখ গোল গোল করে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে অলি বললো, তোমাকে আর একটা গোপন কথা বলি, প্রতাপকাকা। শৌনককে আমি যদিও বিয়ে করিনি, তবু মাঝে মাঝে সে রাত্তিরে আমার পাশে বিছানায় শুয়ে থাকে।

অলি বেশ জোরে হেসে উঠতেই প্রতাপের ইচ্ছে হলো তার হাত ধরে বলতে, অলি, তুই এখুনি চলে যাসনি। আর একটু থাক।

কিন্তু মুখ ফুটে সেটা বলা গেল না। তিনি অলির সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন একতলায়। প্রতাপের বুকটা টনটন করতে লাগলো অলির জন্য। অলি কয়েকদিন কলকাতায় থাকবে না, এখন কলকাতাটা তাঁর আরও ফাঁকা মনে হবে।

অলি এগিয়ে গেল বাস স্টপের দিকে, প্রতাপ দেখলেন নানু ফিরছে, অলির সঙ্গে সে তো দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সদর দরজাটা খোলা রেখে প্রতাপ ওপরে উঠতে লাগলেন।

হঠাৎ তাঁর পা দুটো যেন অসাড় হয়ে এলো, তিনি এক পা এক পা করে উঠতে যেন প্রচুর পরিশ্রম করছেন। বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইছে। কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চাইছে বুক থেকে। তিনি থেমে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করলেন। এরকম তাঁর কখনো হয়নি আগে। এটা একটা বড় রকমের অসুখ? তিনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবেন?

প্রতাপের মনে পড়লো, বিছানায় বালিশের তলায় রিভলভারটা আছে। যে প্রতাপ মজুমদার হাজরা রোডে একটা গুণ্ডার ঘৃণার ধাক্কায় নর্দমায় পড়ে শুয়ে ছিল, তার পক্ষে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থেকে অন্যের সেবা নেওয়া মানায় না। সে অধিকার তার নেই।

প্রতাপ ছুটে ওপরে উঠতে গেলেন, একটুও না উঠে তিনি পড়ে গেলেন সিঁড়িতে। পড়তে পড়তে ফিসফিস করে তিনি ডাকলেন, অলি, অলি…

৬৪.৭ টুং করে একটা শব্দ হতেই

টুং করে একটা শব্দ হতেই অতীন মুখ তুলে ওপরে তাকালো। আসনবন্ধনী আটকে নেবার ও ধূমপান নিষেধের নির্দেশ জ্বলে উঠেছে। এর মধ্যেই এসে গেল ডেনভার? কী করে যে সময়টা কেটে গেল, অতীন খেয়ালই করেনি। বিমানে উঠেই সে ফাইল খুলে অফিসের কাগজপত্রে ডুব দিয়েছিল। নতুন কিছু যে পড়ার আছে কিংবা কিছু তথ্য মুখস্থ করে রাখা দরকার তা নয়। এই শিক্ষাটা সে তার সহকর্মী জিমি গারনারের কাছ থেকে নিয়েছে, অফিসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গেলে সব সময় মাথায় ঐ চিন্তাটাই রাখতে হয়, অন্য কোনো চিন্তার স্থান দিতে নেই, তাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ক্ষিপ্রতা বাড়ে। গত পাঁচ দিন ধরে সে প্রত্যেক সন্ধেবেলা আকাশে উড়ছে। দিনের বেলা এক শহরে, রাত্তিরটা অন্য শহরে।

ফাইলটা বন্ধ করে সে হাত-সুটকেশে রাখলো। বিমানযাত্রা তার কাছে এমনই একঘেয়ে যে সে সহযাত্রীদের দিকেও তাকায় না। সে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখলো। নীচে ডেনভার নগরের আলোর আলপনা দেখা যাচ্ছে। অতীন এর আগে ডেনভারে আসেনি। এবারেও না-আসার মতন। এই কলোরাডো রাজ্যের গভীর অরণ্যানী ও পর্বতের সৌন্দর্য বিশ্ববিখ্যাত, চোদ্দ হাজার ফিটের ওপর তুষারময় পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে হাই ওয়ে আছে এখানে, কিন্তু অফিসের কাজে এলে কেউ সে সব দেখে না। অতীন ডেনভার শহরের ডাউন টাউন ছাড়া কিছুই দেখবে না। এদেশের সব বড় শহরের ডাউন টাউন প্রায় একই রকম চোখ ধাঁধানো অথচ কৃত্রিম। কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচের যথেচ্ছাচার।

হলিডে ইন হোটেলে রাত্রি যাপন, সকাল ঠিক সাড়ে ন’টায় এক কারখানার দু নম্বর সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎকার নির্দিষ্ট হয়ে আছে, সেই আলোচনা মধ্যাহভোজ পর্যন্ত গড়াবে। তারপর আর একজনের সঙ্গে চুক্তিপত্রের খসড়া নিয়ে আলোচনা। পাঁচটা দশে আবার বিমান ধরতে হবে নিউ মেক্সিকোর সান্টা ফে-তে যাবার জন্য। কোম্পানীর দূত হয়ে অতীনকে বিভিন্ন কারখানায় ঘুরতে হচ্ছে। কোম্পানি তাকে বুমেরাং-এর মতন ছুঁড়ে দিয়েছে, ঠিক ঠিক জায়গায় আঘাত করে তাকে ফিরতে হবে সোমবারের মধ্যে। এর মধ্যে তাকে একটুও মচকালে চলবে না।

ভুল করে অতীন সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিল, প্যাকেটটা রেখে দিল জ্যাকেটের পকেটে। সিদ্ধার্থ সিগারেট ছেড়েছে, বন্ধুরা আরও অনেকে ছেড়ে দিয়েছে, অতীন পারছে না। জরুরি কাজের টেনশানে ধূমপান আরও বেড়ে যায়। অন্যমনস্কভাবে সে একবার দেখে নিল টাই-এর গিটটা। আজ সারাদিন সে এতই ব্যস্ত ছিল যে খবরের কাগজ পড়ার সময় পায়নি। এখনও তিন চার মিনিট সময় আছে, সে তুলে নিল লস এঞ্জেলিস টাইমসের গোছাটা। প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে নিল দ্রুত। অনেকদিনের অভ্যেস, আগেই দেখে নেয় ভারতবর্ষের কোনো খবর আছে কি না। নেই, প্রায় কোনোদিনই থাকে না। না থাকলেই নিশ্চিন্ত লাগে। কোনো বড় রকমের দুর্ঘটনা, খুনোখুনি বা দুঃসংবাদ থেকে দেশটা তাহলে অন্তত একদিনের জন্য মুক্ত আছে।

পৃথিবীটা ইদানীং ছোট হয়ে আসছে, কিন্তু ইন্ডিয়া এখান থেকে অনেক, অনেক দূরে।

কয়েকদিন ধরেই এখানকার কাগজগুলো পোল্যান্ড নিয়ে খুব মেতে উঠেছে। ছোট্ট একটা দেশ, তাকে নিয়ে চার কলম হেড লাইন। সেখানকার শ্রমিকরা সরকার-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে, সেই ছবিও যোগাড় করেছে এরা। পোল্যান্ডের শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে অ্যামেরিকানদের কত মাথাব্যথা আর দরদ! অতীন ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো।

অতীনের মনে পড়লো জিমি গারনারের কথা। অফিসের এই সহকর্মীটির সঙ্গেই অতীনের সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব। অবশ্য প্রায়ই তার সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি, ফাটাফাটিও হয়। জিমি ইচ্ছে করে অতীনকে মাঝে মাঝে খুঁচিয়ে দেয়। কিছুদিন আগে এখানকার কাগজে উড়িষ্যার কালাহাণ্ডিতে দুর্ভিক্ষে মানুষ মরার সংবাদ বেরিয়েছিল। জিম বলেছিল, ওটিন, দু’ বছর আগে কিউবার কানকুন শহরে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে যোগ দিতে তোমাদের প্রাইম মিনিস্টার ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন মনে আছে? সেখানে তিনি বলেছিলেন, ভারতে এখন যথেষ্ট খাদ্যশস্য জন্মায়, ভারত আর কারুর কাছে খাদ্যের জন্য ভিখিরির মতন হাত পাতবে না! আমাদের এখানে টি ভি ইন্টারভিউতেও তিনি সে কথাই রিপিট করেছিলেন। উনি কি তা হলে মিথ্যাবাদী? এখনও তোমাদের দেশে না-খেয়ে মানুষ মরে, এখনো কলকাতার রাস্তা-ঘাটে খেতে-না-পাওয়া লোকেরা শুয়ে থাকে কেন? অতীন ইন্দিরা গান্ধীর সমর্থক নয়। রাজনীতি যারা করে তারা প্রত্যেকেই তো মিথ্যে কথা বলে। খাদ্যের উৎপাদন যথেষ্ট হলেও দেশের বহু মানুষের ক্রয় ক্ষমতা নেই। খাদ্য তো বিনামূল্যে দেওয়া হয় না। ভারতের গ্রামাঞ্চলে কোটি কোটি ভূমিহীন শ্রমিকের কোনো কাজ থাকে না বছরে তিন চার মাস। কোনো উপার্জন না থাকলে তারা খাদ্য কিনবে কী দিয়ে, তাই তারা না খেয়ে থাকে। ভারত রাষ্ট্র এখনো এইসব মানুষদের কাজ দিতে পারেনি।

কিন্তু বিদেশে থাকলে প্রত্যেককেই খানিকটা রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা পালন করতে হয়। ইন্দিরা গান্ধীকে যতই অপছন্দ করুক অতীন, কিন্তু সে কথা সে জিমিকে বলবে কেন? কূটনৈতিক চালে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও স্বভাব নয় অতীনের। তার ভাষায় নম্রতা কম, শব্দগুলি উগ্র ও ধারালো। জিমিকে সে বলেছিল, ইন্ডিয়া চিরকালই গরিব দেশ, সেখানকার মানুষদের প্রাণের মূল্য নেই, তাদের নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে। কিন্তু নিউ ইয়র্ক শহরেও ভিখিরি থাকে কেন বলো তো? এই সপ্তাহের নিউজ উইক দেখো, নিউ ইয়র্কে প্রত্যেক রাতে কতজন ভবঘুরে রাস্তায় শুয়ে থাকে, তার একটা রিপোর্ট বেরিয়েছে!

বিমানটি ভূমি স্পর্শ করেছে, এরপর দরজা খুলতে কিছুটা সময় লাগলেও সবাই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। এক্ষুনি বেরুনো যাবে না জেনেও যেন আর দু’ এক মিনিট ধৈর্য ধরে থাকতে পারে না। এই সদা ব্যস্ততার দেশে থাকতে থাকতে অতীনেরও সেই অভ্যেস হয়ে গেছে। বিমানবন্দরে কেউ তাকে প্রত্যুৎগমন করতে আসবে না। সে প্রশ্নই ওঠে না। তবু প্রত্যেকবার প্লেন থেকে নেমে ভিড়ে ভর্তি চাতালটিতে এসে অতীন একবার উৎসুকভাবে মুখ তুলে দেখে। কতজন হাসছে, কেউ কেউ হাতছানি দিচ্ছে, কেউ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। চুমু, এরা কেউ অতীনকে চেনে না।

ডেনভারে এবং কাছাকাছি অতীনের দু’ একজন পরিচিত ব্যক্তি অবশ্য আছে। এই শহরেই থাকে আবিদ হোসেন, বহু বছর আগে কেমব্রিজে এর সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতো অতীন, এখনও যোগাযোগ আছে। এই বাংলাদেশী ছেলেটি উন্নতি করেছে খুব, এখানে আর্কিটেক্ট হিসেবে তার নাম ছড়িয়েছে, সে বড় বড় আকাশ ঝাড় বাড়িগুলির নকশা বানায়। আবিদ খুব বন্ধুবৎসল, তার স্ত্রীর হাতের রান্না বিশ্ববিখ্যাত। আর আছে একটু দূরে বোলডার শহরে শুভেন্দু দত্ত ও তার স্ত্রী বিশাখা। অতীনের স্কুল জীবনের বন্ধু শুভেন্দু এখন মস্ত বড় অধ্যাপক, ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ফ্যাকালটির হেড, আর বিশাখার সঙ্গে শর্মিলার এত ভাব যে অতীনের এখানে আসার খবর পেলে ওরা জোর করে অতীনকে হোটেল থেকে বাড়িতে ধরে নিয়ে যেত।

অতীন কারুকেই খবর দেয়নি। সে তো বেড়াতে আসেনি, সে এসেছে কাজ নিয়ে। খুব কঠিন কাজ। বিজনেসের সঙ্গে প্লেজার মেশানো যায় না। অতীনের অফিসের ঠিক একধাপ ওপরের কর্তা রবার্ট ম্যাককরমিক একবার তাকে একটা প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়েছিল। সে বলেছিল, জানো তো, প্রতিটি সপ্তাহেরই দুটি ভাগ আছে। পাঁচ আর দুই। পাঁচদিন কাজ, দু’ দিন ছুটি। পাঁচদিন তুমি একরকম, দু’ দিন তুমি আলাদা মানুষ। এই দুটোকে কক্ষনো একসঙ্গে মেশাবে না। শনি রবিবারে তুমি বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করবে না, অফিসের কথা চিন্তাও করবে না। আমার তো এই দুটি দিন পরিবারের জন্য উৎসর্গীকৃত। আমি বাগান করি, তার কাটি, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাই, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের সুখ দুঃখের খবর নিই। তুমি ইয়াং ম্যান, তোমরা অন্যরকম ফুর্তি-ফাৰ্তা করতে পারো এই দুটো দিন। কিন্তু বাকি পাঁচদিন তুমি-আমি কোম্পানির ক্রীতদাস। কোম্পানি তো সেইজন্যই মাইনে দিচ্ছে, তাই না? প্রাতরাশের সময় থেকে রাত্তিরে শুয়ে আলো নেবানো পর্যন্ত তোমাকে কাজের কথাই চিন্তা করতে হবে। এমন কি স্বপ্নেও তুমি অফিসের লোকজনদের দেখে ফেলবে। আর একটা কথা! অফিসের কাজের ব্যাপারে বাইরের কোনো পার্টির সঙ্গে যদি তোমার জরুরি কোনো কথাবার্তা থাকে, তা হলে আগের রাত্তিরটা অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেবে। সে রাত্রে পরিমিত মদ্যপান এবং ঘুমের বড়ি সেবন বাঞ্ছনীয়। রাত্রি জাগরণে মন চঞ্চল থাকে। আগের রাত্রে তুমি যদি অন্য লোকজনের সঙ্গে বেশি গল্পগাছা করো, তা হলে পরের দিনও মনের মধ্যে সেইসব কথার রেশ থেকে যায়, কাজের কথাগুলি সব যথাসময়ে ঠিকঠাক মনে পড়ে না। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব ঠিক মতন অনুধাবন করা, সেই জন্য তোমার মস্তিষ্কটা সব সময় একাগ্র করে রাখা উচিত। অফিসের স্বার্থে তুমি যদি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চাও, তা হলে আগের রাত্রে জমাট সাত ঘণ্টা খুম অবশ্য প্রয়োজনীয়।

এখন প্রত্যেকদিনই অতীনকে জরুরি কথাবার্তা চালাতে হচ্ছে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কথা মনে রেখে। রবার্ট ম্যাককরমিকের উপদেশ শিরোধার্য করে সে প্রত্যেক রাতেই ঘুমের বড়ি খাচ্ছে, সকালে শরীরটা বেশ ঝরঝরে থাকে। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে অতীন একটা ট্যাক্সি নেবে। শৃঙ্খলাবদ্ধ হোটেলগুলির সব জায়গাতেই ঘর একরকম, ব্যবস্থা সমান। দু পেগ সুরা, হালকা আহার ও ঘণ্টাকয়েক টি ভি দেখা, তারপর ওষুধ খেয়েই ঘুম। আজ সন্ধেবেলা তার আর কিছুই করার নেই। পাঁচটি শহরের অভিযানের মধ্যে তিনটিতেই অতীন সার্থক হয়েছে, এখন পর্যন্ত তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সব চলছে ঠিকঠাক, আর দুটি কোম্পানীর মালিকদের ঠিকমতন তার বক্তব্য বোঝাতে পারলেই অতীন বিজয়ীর মতন ফিরবে নিউ ইয়র্কে।

অনেকদিন আগে অতীন একটা ফিল্ম দেখেছিল, নাম, ‘দ্য ম্যান ইন দা গ্রে ফ্লানেল সুট’। এমন কিছু উচ্চাঙ্গের ফিল্ম নয়। তবু সেটা অতীনের মনে দাগ কেটে আছে। নায়ক গ্রেগরি পেক। যুদ্ধ পরবর্তী কালে এদেশে মাঝারি চাকুরিজীবীরা সবাই গ্রে ফ্লানেল স্যুট পরতো। হাতে ব্রীফ কেস নিয়ে ঐ পোশাক পরা হাজার হাজার মানুষ ট্রেন থেকে নেমে ভূগর্ভ ফুড়ে উঠে আসতো নিউ ইয়র্ক শহরে। তারপর অফিসের দিকে ছোটাছুটি। সারাদিন ধরে তাদের কাজ যেন মস্ত বড় একটা চাকার ছোট ছোট পেরেকের মতন। তাদের আলাদা কোনো চরিত্র নেই। সন্ধের পর বাড়ি ফিরেও একই রুটিন বাধা জীবন। প্রথমেই খাওয়া, তারপর বউ বাচ্চাদের সঙ্গে দু চারটে টুকিটাকি কথা, তারপর টি ভি দেখতে দেখতে হাই তোলা। ঐ রকম একজন মানুষ গ্রেগরি পেগ। কিন্তু অফিসে কিংবা বাড়িতে হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতন তার মনে পড়ে যেত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার টুকরো টুকরো ঘটনা। অন্যান্য সমর্থ আমেরিকানদের মতন তাকেও যুদ্ধে যেতে হয়েছিল। নর্মাণ্ডি উপকূলে সে একদিনে ঠাণ্ডা মাথায় একুশজন নারী-পুরুষকে খুন করেছিল গুলি চালিয়ে। একবার একটা কামানের শেলের গর্তের মধ্যে পড়ে গিয়ে সে দুটি জার্মান কিশোরের মুখোমুখি হয়, অতি তৎপরতায় বেয়নেট চালিয়ে সে দু’জনকেই গেঁথে ফেলেছিল মাটিতে। মাঝে মাঝেই তার চোখে ভেসে ওঠে সেই মৃত্যুকাতর কিশোর দুটির মুখ। এখন গ্রে ফ্লানেল স্যুট পরা এই অফিস কর্মচারীটিকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, সে একজন কতবড় খুনী। সে এখন আর পাঁচজনের মতনই, অফিসে কাজের সুনাম আছে, বাড়িতে সে দায়িত্বশীল স্বামী ও দুটি ছেলেমেয়ের স্নেহময় পিতা।

অতীনের পোশাক অবশ্য ধূসর নয়। সে পরে আছে একটা হালকা নীল রঙের স্ট্রাইপড স্যুট। সে কিছুটা লম্বা বলেই স্ট্রাইপ পছন্দ করে, তাতে আরও একটু লম্বা দেখায়। বহু বছর ঠাণ্ডার দেশে থাকার জন্য তার রং বেশ ফর্সা হয়েছে। অবশ্য তাহলেও এদেশে কেউ তাকে শ্বেতাঙ্গ বলে মনে করবে না, বড়জোর মিশ্রিত মেকসিক্যান ভাবতে পারে। এখনও তার মাথার চুল সমস্তই কালো। এই পোশাক ও গাম্ভীর্যমাখা মুখোনির আড়ালে তার সমস্ত অতীত চাপা পড়ে গেছে।

জিমি গারনার প্রায়ই অতীনকে ক্ষ্যাপাবার চেষ্টা করে। একদিন সে বলেছিল, আচ্ছা, ওটিন, তুমি এতটা লম্বা হলে কী করে? আমার তো ধারণা ছিল, সমস্ত ভারতীয়রাই আফ্রিকানদের মতন বেঁটে বেঁটে। গরিব জাতির পক্ষে বেঁটে হওয়াই স্বাভাবিক, যেমন ধরো ইটালিয়ানরা।

অতীন বলেছিল, দ্যাখো, মূর্খ অনেকেই হয়। কিন্তু তোমরা অ্যামেরিকানরা, তোমাদের মতন আর কেউ মূর্খটা এমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জাহির করে না। তোমাদের ইতিহাস-ভূগোলের জ্ঞান দেখে আমার পিলে চমকে যায়! তোমরা নিজের দেশটা ছাড়া আর কিছু চেনো না! আফ্রিকায় পিগমিদের মতন দু’ একটি উপজাতি মাত্র খর্বকায়, তুমি শুধু সেই কথাটাই কোথায় যেন শুনেছো। গড় আফ্রিকানরা বেশ লম্বা। তোমাদের দেশের কালো মানুষদের দেখেই বোঝা উচিত, তারা আফ্রিকা থেকেই এসেছে। মাসাই ট্রাইবের নাম শুনেছো? তারা প্রত্যেকেই ছ ফিটের ওপর। বেশিরভাগ ভারতীয়ই আদি আর্যদের বংশধর, তারা বেঁটে হবে কেন? তুমি এদেশে পাঞ্জাবীদের দেখোনি? তুমি গত রবিবার সি বি এস চ্যানেলে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার দেখেছিলে। তার মতন দীর্ঘকায়, সুপুরুষ তোমাদের দেশে কটা আছে খুঁজে বার করো তো!

জিমি হো হো করে হেসে উঠেছিল। এই একটা এদের অদ্ভুত গুণ। মুখের ওপর কঠোর সত্য কথা শুনিয়ে ধমক দিলেও এরা হাসে। এদের ফুসফুস জোরালো, এরা যখন তখন হাসতে জানে।

জিমি হাসতে হাসতে বলেছিল, তোমাকে তোমার দেশের কথা তুলে একটু খোঁচা মারলেই তোমার গণ্ড রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে আর চক্ষু বিস্ফারিত হয়। তুমি তোমার দেশের জন্য সবসময় খুব টান অনুভব করো, তাই না? তোমার পাসপোর্টটার কথাও মনে থাকে না!

এটাও আর একটা মারাত্মক খোঁচা, অতীন যেন সর্বাঙ্গ জ্বলে পুড়ে ছটফট করে, ঠিক কোনো উত্তর দিতে পারে না, তখন জিমি তাকে টানতে টানতে বীয়ার খেতে নিয়ে যায়।

অতীন নিজের সুটকেসটি খালাস করার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ালো, বেশ বড় এয়ারপোর্ট, সন্ধেবেলা অনেকগুলো ফ্লাইট। অবিরাম জনস্রোত ও অপেক্ষারত যাত্রী-যাত্ৰিণীদের মধ্যে দু’ চারজন ভারতীয়ও রয়েছে। অতীন তাদের কারুর চোখে চোখ ফেলে না। শুধু ভারতীয় বলেই যে কারুর সঙ্গে অকারণে কথা বলতে হবে তার কোনো মানে নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে আবার অফিসের কাজের কথাই ভাবছে। ডেনভারে যদি আলোচনা ফলপ্রসূ হয়, তাহলে সান্টা ফে-তে কাজ অনেকটা এগিয়ে থাকবে। আজ ক্যানসাস সিটিতে সে একটা মহা জেদী লোকের পাল্লায় পড়েছিল, সারা দুপুর তার সঙ্গে বাক কৌশল দিয়ে ধস্তাধস্তি করতে হয়েছে। খানিকক্ষণ পরেই তার সন্দেহ হয়েছিল, লোকটি ইহুদি। নামটা জার্মান ঘেঁষা, হতেও পারে। রবার্ট ম্যাককরমিক তাকে সাবধান করে দিয়েছিল, ইহুদিদের সঙ্গে সব সময় হিসেব করে কথা বলতে হবে। ওরা কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না, সব সময় একটা প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। এমনকি, তুমি যদি অতি সাধারণ ভাবে জিজ্ঞেস করো, আজকের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর না? তার উত্তরে একজন ইহুদি বলবে, কেন, তোমার মতে কি গতকালের আকাশ কম নীল ছিল?

অ্যাংলো স্যাক্সনদের সংস্পর্শে থেকে থেকে অতীনের মনেও বোধহয় একটা সূক্ষ্ম ইহুদি-বিদ্বেষ জন্মে যাচ্ছে। এদেশে ইহুদিদের বেশ প্রতাপ, সেইজন্যই এদের সম্পর্কে একটা চাপা বিরোধিতাও রয়েছে। যতই টাকা পয়সার জোর থাক, তবু কোনো ইহুদির পক্ষে অ্যামেরিকায় প্রেসিডেন্ট হওয়া অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয়। অতীনের দু একজন ইহুদি বন্ধু। আছে। তারা চমৎকার মানুষ, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে অতীন দেখেছে, ওদের সঙ্গে কথার প্যাঁচে পারা খুবই শক্ত। আজ দুপুরেই অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে অতীনের মনে হয়েছিল, তাকে ক্যানসাস সিটিতে আরও দু’ একটা দিন থেকে যেতে হবে। তা হলে পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো বদল করতে হবে। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অনেকটা রফা হয়েছে, তবে অনেকটাই এখনো নির্ভর করছে ডেনভারের দুটো লোকের সঙ্গে আলোচনার সার্থকতার ওপর।

এই শনিরবিবারেও অতীনের ছুটি নেই। আলোচনাটা এমনি জরুরি যে একটি কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট সপরিবারে সান্টা-ফে শহরে বেড়াতে গেছে, অতীন সেখানে যাচ্ছে সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে কথাবার্তা পাকা করতে। এই কাজটায় সময়ের একটা বিশেষ মূল্য আছে, তা বুঝেই সেই ব্যক্তিটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে রাজি হয়েছে তার ছুটির মধ্যেও রানিং এগেইনস্ট টাইম যাকে বলে। মাথার ওপর ঝুলে আছে জাপানী খাড়া। জাপানকেই নিয়ে যত ভয়।

অতীন বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল, এখন সে একটি গ্লোরিফায়েড সেলসম্যান। তার কোম্পানি নতুন নতুন প্রোডাক্ট বার করলে অতীনের কাজ হচ্ছে অন্য কোম্পানির সঙ্গে যৌথ দায়িত্ব স্থাপন কিংবা পৃথিবীর অন্য দেশে সেই বস্তুটির উৎপাদনের ব্যাপারে টেকনিক্যাল দিকগুলি নিয়ে বোঝাঁপড়া করা। অতি সম্প্রতি তার কোম্পানি এক অভিনব ভূমি-সার প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ম্যাজিক ফার্টিলাইজার। এতে যে-কোনো ফসলের উৎপাদন ত্বরান্বিত ও অন্তত তিনগুণ করা যাবে। অ্যামেরিকায় এ বস্তুটির মার্কেটিং কোনো সমস্যা নয়, সে দায়িত্বও অতীনের নয়। কিন্তু চীন সম্প্রতি সে দেশে বিদেশী কোম্পানিদের কিছু কিছু কারখানা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে, দেড় শো মিলিয়ন ডলারের একটি গ্লোবাল টেন্ডার ফ্লোট করেছে সার কারখানার জন্য। জাপান ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই সেই দেড় শো মিলিয়ন ডলারের অর্ডারটা গ্রাস করা দরকার। চার-পাঁচটি অ্যামেরিকান কোম্পানি সিণ্ডিকেট করে এই কাজে হাত দিলে চট করে শুরু করে দেওয়া যায়। এখানকার জন ডিয়ার কম্পানির ক্যাটার পিলার নামে ট্রাক্টর জগৎবিখ্যাত, তারা এখন সার নির্মাণেও হাত দিয়েছে। সেই কোম্পানিরই ভাইস প্রেসিডেন্ট আছে সান্টা-ফে শহরে, তাকে ভজাতে পারলেই অতীনের দ্বিগুণ পদোন্নতি কেউ আটকাতে পারবে না, মাইনে বাড়বে বছরে চব্বিশ শো ডলার। এই টাকাটা তার খুব দরকার, বাড়িটা পাল্টাতে হবে, একটা নতুন বাড়ি কেনার জন্য শর্মিলা পছন্দ করে রেখেছে। মায়ের হাত খরচের টাকাও বাড়াতে পারবে অতীন, বাবাকে সে লিখবে একটা গাড়ি কেনার জন্য। এই বয়েস আর বাবা-মায়ের কলকাতার রাস্তায় ট্রামে বাসে ঘোরার দরকার নেই।

সুটকেসটা ঘুরতে ঘুরতে আসছে, হঠাৎ অতীনের কেমন যেন একটা অস্বস্তির ভাব হলো। কিছু একটা ভুল শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে, কিছু কিছু ভুল অক্ষর সে দেখছে। এরকম শব্দ, এরকম অক্ষর এখানে থাকার কথা নয়। কী হচ্ছে গোলমাল? কেউ তার নাম ধরে ডাকছে? এরকম হয় মাঝে মাঝে, আচমকা পেছন থেকে ডাক শুনতে পায়। পরিষ্কার বাংলায়। একবার সে অবিকল কৌশিকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিল, কৌশিক যেন ব্যাকুলভাবে ডাকছে, অতীন! অতীন! বাবলু! সেবার অতীন ভয় পেয়েছিল, তা হলে কি কৌশিক বেঁচে নেই? তার কুসংস্কার নেই, তবু ছেলেবেলায় ঠাকুমার মুখে গল্প শোনা স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর ঠিক মুহূর্তটায় মানুষ নাকি তার ঘনিষ্ঠজনকে ডাকে, সে যতদূরেই থাকুক, ঠিক শুনতে পায়। সেটা অবশ্য মেলেনি, কৌশিক বেঁচে আছে।

সুটকেসটা তুলে নিয়ে অতীন ওপরের দিকে তাকালো। টি ভি স্ক্রিনে বিমানগুলির আগমন-নির্গমনের নির্ঘণ্ট দেখানো হচ্ছে অনবরত। অতীনের আজ আর কোথাও যাবার দরকার নেই, তবু এমনিতেই চোখ পড়ে যায়। তার বুকটা ধক করে উঠলো। জলের মতন ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে কয়েকটি অক্ষর, সেটা আসলে তার নাম। একি সত্যি হতে পারে? নাকি তার চোখে ঘোর লেগেছে।

শুধু নাম নয়, একটি বার্তা। অতীন মজুমদার, ফ্লাইট নাম্বার এ এল সাতশো দুইয়ের সদ্য আগত যাত্রী, আপনাকে অবিলম্বে অনুসন্ধান কাউন্টারে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। আপনার জন্য জরুরি সংবাদ আছে।

তারপর সে শুনতে পেল, অন্তরীক্ষে যন্ত্রস্বরেও সেই কথাই ঘোষণা করা হচ্ছে। তা হলে সে ভুল ডাক শোনেনি, ভুল অক্ষর দেখেনি। ঘোষকের বীভৎস উচ্চারণের জন্যই অতীন তার নিজের নামটা ঠিক বুঝতে পারেনি এতক্ষণ।

কে তার নামে এখানে খবর পাঠাবে। সে যে আজ এই সময়ে ডেনভার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছোবে, তারও তো কোনো ঠিক ছিল না। বাড়ি থেকে হতেই পারে না। গত রাত্তিরে সে ছিল শিকাগোতে, সেখান থেকে শর্মিলাকে ফোন করে বলেছিল, ক্যানসাস সিটিতে তার ক’দিন থাকতে হবে, তার ঠিক নেই।

অফিসের কেউ? কাল রাতে সে জন ম্যাককরমিককেও ফোন করেছিল, তারপর আর এর মধ্যে এমন কী ঘটতে পারে? তাহলে কি আবিদ হোসেন কোনোভাবে খবর পেয়ে গেল? কিংবা শুভেন্দু? ওদের পক্ষে অতীনের গতিবিধি জানার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

ব্যাপারটা যেন ফ্রান্স কাফকার উপন্যাসের মতন। অতীন যে আজ সন্ধেবেলা এই নির্দিষ্ট বিমানটিতে ডেনভার-এ এসে পৌঁছোবে, সে বিষয়ে সে নিজেই নিশ্চিত ছিল না, টিকিট কেটেছে শেষ মুহূর্তে এয়ারপোর্টে এসে, অথচ এখানে তার জন্য একটা বার্তা অপেক্ষা করে আছে!

খুব একটা ব্যস্ততা না দেখিয়ে অতীন হাঁটতে শুরু করে দিল। অফিস থেকেই আন্দাজে কোনো খবর পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই! আবার নতুন কী ঘটতে পারে? তার কাজে কোনো ভুল। হয়েছে? পুরো ডিলটাই বানচাল হয়ে গেছে, জাপানীরা মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে? কিংবা কোম্পানিটা হঠাৎ বিক্রি হয়ে গেল নাকি? আজ থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে? এদেশে তা বিচিত্র কিছু নয়।

অনুসন্ধান অফিসে একটি তরুণী মেয়ে কী সব লেখালেখিতে খুব ব্যস্ত। অতীন তার সামনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই সে এক টুকরো কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো, এখানে ফোন করো

কাগজে শুধু একটা টেলিফোন নাম্বার লেখা। সেটা দেখা মাত্রই অতীনের সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করতে লাগলো। তার চোখে ভেসে উঠলো ছেলে আর মেয়ের মুখ। রণ আর অনীতা। নিশ্চয়ই ওদের একজনের কিছু হয়েছে। কতবড় বিপদ? রণ ভীষণ দুষ্ট, যখন তখন বাড়ির দরজা খুলে বেরোয়, বাড়ির কাছেই হাই ওয়ে!… অনীতা ওর এক বান্ধবীর বাড়িতে পড়তে যায়, ফেরে একলা একলা, হেঁটে হেঁটে। কতদিন অতীন শর্মিলাকে বলেছে যে মেয়ে এখন বড় হয়েছে…। দিনকাল খারাপ, গুণ্ডামি বদমাইশি বাড়ছে হু-হু করে, ছেলেচুরি, নাবালিকা ধর্ষণ… একমাস আগেই তাদের বাড়ির কাছের লেকে গলা মোচড়ানো অবস্থায় একটি কিশোরী মেয়েকে পাওয়া গিয়েছিল…। ছেলেটা সম্পর্কেই বেশি ভয়, বেসমেন্টে একদিন ওয়াশিং মেশিনের মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেছিল…

অতীন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো, টেলিফোন বুথের দিকে যেতে তার পা সরছে না। অচেনা জায়গায় একা একা প্রচণ্ড কোনো খারাপ খবর সে সহ্য করবে কী করে? সে যে এত দুর্বল, তা সে নিজেই জানতো না। রণের কী হয়েছে? রণ আর নেই? রণ, রণ, তার প্রিয়তম সন্তান! অতীনের বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে।

অনুসন্ধান কাউন্টারের তরুণীটির চোখ সত্যি সত্যি অনুসন্ধিৎসু। সে একটা টেলিফোনে কথা বলছিল, তাতে হাত চাপা দিয়ে অতীনকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে আমি কিছু সাহায্য করতে পারি?

মেয়েটির মাথায় চুল গোলাপি রঙের, চোখের মণি নীল। ঠিক যেন একটা পুতুল। উচ্চারণে একটা ত ত ভাব আছে।

অতীন একটা সিগারেট ধরিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলো, এই ফোন নাম্বারটা ছাড়া আর কোনো মেসেজ নেই?

মেয়েটি বললো, দাঁড়াও, দেখছি। একজন লেডি খুব ব্যস্তভাবে তোমাকে ফোন করছিলেন। নাম হচ্ছে… ইয়ে, শার্ম… শার্মাইলা?

–শর্মিলা মজুমদার। হ্যাঁ, কী বলেছেন তিনি?

–তোমার স্ত্রী? তোমাকে এয়ারপোর্ট থেকেই ফোন করতে বলেছেন। নিশ্চয়ই কোনো ভালো খবর আছে তোমার জন্য। কিংবা আজ তোমাদের বিবাহবার্ষিকী নাকি, ভুলে গেছ?

এরা সবসময়ই কৌতুক করে কথা বলে। কিন্তু অত তুচ্ছ কারণ হলে এরা সময় নষ্ট করতে না। শর্মিলাকে নিশ্চয়ই ঘটনার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলতে হয়েছে। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের দুর্ঘটনায় সবাই বিচলিত হয়। অনীতা অনেকটা বড় হয়েছে, সে সাবধানী, কিন্তু রণ, সে অতীনের লাইটার নিয়ে খেলা করে, আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছে? শর্মিলা রান্নাঘরের গ্যাস খুলে রেখেছিল?

যুবতীটির চোখে যেন সহানুভূতির চিহু। সে বললো, সব টেলিফোন বুথগুলি ভর্তি দেখছি, তুমি এখান থেকেই ফোন করতে পারো, তবে অপারেটারের থ্রু দিয়ে কালেক্ট কল…

অতীন বললো, তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ।  

মেয়েটি একটি হাসির ঝিলিক দিয়ে বললো, ইউ আর ওয়েলকাম।

রিসিভারটা ধরে অতীন বুঝতে পারলো তার হাত কাঁপছে। মনে মনে দুবার বললো, স্টেডি। স্টেডি!

তারপর সে জিজ্ঞেস করলো, হ্যালো কে?

অনেক দূর থেকে মিষ্টি, সুরেলা এক বালক কণ্ঠ ভেসে এলো, হাই ড্যাডি! হোয়ার আর ইউ ইন টেক্সাস?

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার কথা অতীন অনেকবার শুনেছে,আজ অনুভব করলো সেটা কী রকম সত্যি সে দরদর করে ঘামছে। তার বুকের ওপর যেন একটা ভারী ওজন ছিল, এইমাত্র সরে গেল। রণ ভালো আছে। রণ ভালো আছে। তার ইচ্ছে করছে দু হাতে জড়িয়ে বণকে আদর করতে।

অতীন এবার ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করলো, রণি, কেমন আছিস রে তোরা? কী হয়েছে। বাড়িতে? দিদি কোথায়?

রণ বললো, দিদি ইজ ওয়াচিং টিভি। আ ভেরি বোরিং মুভি, আই ডিডনট লাইক ইট!

ড্যাডি, হোয়েন আর ইয়া কামিং হোম?

রণ ভালো আছে! অনীতা ভালো আছে। শর্মিলা কোথায়?

রণ উচ্চকণ্ঠে ডাকলো, মম, মম, ড্যাডি ইজ কলিং ইয়া। মম, ম ও ম…। ড্যাড, আর ইয়া রিয়েলি ইন টেকসাস? হ্যাভ ইয়া মেট এনি কাউ বয়!

অতীনের এবার ভুরু কুঁচকে গেল। তাহলে কিছুই ঘটেনি, শুধু শুধু তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলা হয়েছিল? এর মানে কী? এরপর রণ যেই জানালো যে মা এখন বাথরুমে ঢুকেছে, আধ ঘণ্টার মধ্যে বেরুবে না, অতীন তাকে এক ধমক দিয়ে বললো, শিগগির মাকে ডাকো? ছেলে ভালো আছে, সুতরাং এখন আর তাকে স্নেহের আদিখ্যেতা দেখাবার কোনো মানে হয় না!

রণ বাথরুমের দরজায় কয়েকবার কিল মেরে ফিরে এসে বললো, মা বলছে, তোমার নাম্বার দাও, আধ ঘণ্টা বাদে রিং ব্যাক করবে!

অতীন আবার আদেশ করলো, রণ, যাও মাকে বলো, এক্ষুনি বেরিয়ে আসতে। আমার একটুও সময় নেই!

রিসিভারটা নামিয়ে রেখে অতীন আবার সিগারেট ধরালো। সে আর ধৈর্য ধরতে পারছে না। শর্মিলার এরকম পাগলামির কারণটা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। কাউন্টারের মেয়েটি কী ভাবছে! শুধু শুধু ফাজলামি করে ওদের ধোকা দেওয়া হয়েছে। শর্মিলাকে বকুনি দেওয়ার জন্য সে চোয়াল শক্ত করলো।

বহু দূরে নিউ জার্সির বাড়িতে শর্মিলা বাথরুমে বাথটাবে শুয়ে মাথায় ও মুখে জলের ধারা নিচ্ছে। টাবের জলে এত ফেনা যেন মনে হয় সে আশ্বিনের পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘের মধ্যে শুয়ে আছে। সন্ধেবেলার এই স্নান তার একটা প্রধান বিলাসিতা। অফিস থেকে ফিরেই তাকে রান্না করতে হয়।

ফ্যামিলি রুমে টিভিটা খোলা। কার্পেটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে অনীতা, এক হাতে একটা স্বচ্ছ ঠোঙা ভর্তি আলু ভাজা, অন্য হাতে লুঙলাম নামে একজন জনপ্রিয় লেখকের রোমহর্ষক উপন্যাস। কৈশোর সদ্য পার হয়ে আসছে অনীতা, এর মধ্যেই তার শরীরে যৌবন ঝনঝন শব্দ করতে শুরু করে দিয়েছে। এ দেশে যৌবন তাড়াতাড়ি আসে। অনীতার চুল একটা নীল রিবন দিয়ে বাধা, সুন্দর চুল হয়েছে তার। টি ভি-তে সে তার প্রিয় ধারাবাহিক মাপেট শো দেখছে, মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন এসে গেলেই সে মনোযোগ দিচ্ছে হাতের বইতে ও আলুভাজায়।

একটু দূরে নানারকম খেলনা ছড়িয়ে বসে আছে তার ছোট ভাই। সবই নকল যুদ্ধের সরঞ্জাম। ছোট ভাইটিকে অনীতা ডেনিস দা মিনেস বলে ডাকে, এ রকমই মুখখানা রণের।

বেশ গাট্টাগোট্টা স্বাস্থ্য, আইসক্রিম আর চকলেট তার প্রিয় খাদ্য, ভাত তার চোখে বিষ, বাড়ির তৈরি স্যান্ডুইচও সে সহজে ছুঁতে চায় না। একমাত্র ম্যাকডোনাল্ড কোম্পানির হ্যামবার্গার সে বিশেষ পছন্দ করে। এক একদিন তার কান্না থামাবার জন্য শর্মিলাকে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে ঐ হ্যামবার্গার কিনে আনতে হয়।

শীত বিদায় নিয়েছে। জানলার বাইরে রাস্তার গাছগুলিতে দেখা যায় নতুন কিশলয়। ফিরে আসছে পাখিরা।

ছেলের মুখে দ্বিতীয়বার খবর পেয়ে শর্মিলা অবাক হয়ে ভাবলো, অতীন হঠাৎ তাকে ব্যস্ত হয়ে ফোনে ডাকছে কেন? সে তো রাত ন’টার আগে কখনো ফোন করে না?

ভুলো-মনা বলে শর্মিলার খ্যাতি আছে বন্ধু মহলে। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন বেড়ে যাচ্ছে তার বিস্মরণ। তোয়ালে আর সাবান নিয়ে একদিন সে রান্নাঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেবেছিল, এখানে কেন যেন এসেছি? একবার একমাসে সে তিনবার গ্যাসের বিল শোধ করার জন্য চেক পাঠিয়েছিল, সেই কোম্পানির একজন কর্মী ফোন করে জানতে চেয়েছিল, কী ব্যাপার, তুমি আমাদের এত টাকা দিতে চাইছো কেন বলো তো?

বন্ধুরা কেউ এই জন্য শর্মিলাকে হাসি ঠাট্টা করলেই সে বলে, বয়েস হচ্ছে তো, কিছুই মনে রাখতে পারি না। তা ছাড়া এই দেশে আর আমার একটা দিনও থাকতে ইচ্ছে করে না!

শর্মিলাকে দেখে অবশ্য বয়েস বোঝা যায় না। দুটি সন্তানের জননী হয়েও শর্মিলার শরীর একটুও ভাঙেনি। প্রতিদিন স্নানের পর মনে হয়, তাজা, সমুদ্র থেকে উঠে আসা কোনো দেবীর মতন। অনেকেই বলে, কুমারী বয়েসে কিংবা বিয়ের সময় শর্মিলা এমন কিছু রূপসী ছিল না। রোগাটে ছিল, চোখের কোণে ক্লান্তির ছাপ লুকোতে মুখের হাসিতে। তার হাসিটুকুই ছিল সুন্দর। দুই ছেলেমেয়ের জন্মের পরেই যেন সে পূর্ণ বিকশিত হলো, রংও খুলেছে অনেকটা। ছেলে-মেয়ে সঙ্গে থাকলেও তাকে জননী বলে মনেই হয় না। মনে হয় যেন যৌবনের রঙ্গভূমিতে সে সদ্যই এসেছে।

কয়েক মুহূর্ত পরেই শর্মিলার মনে পড়ে গেল। দারুণ ব্যস্তভাবে সে শরীরের ফেনা ধুয়ে, কোনো রকমে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে, হাউস কোটটা জড়িয়ে নিয়ে ছুটে এলো বাথরুমের বাইরে। টেলিফোন ধরে উৰ্বশ্বাসে বললো, সরি বাবলু, আমার একটু দেরি হয়ে গেল।

অতীন কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলো, হোয়াটস দা জোক?

শর্মিলা অনুতপ্ত গলায় বললো, এক্সট্রিমলি সরি, চান করছিলাম, তুমি কোথা থেকে ফোন করছো? তুমি আমার মেসেজ পেয়েছিলে?

–হোয়াট ইজ দি মেসেজ?

–তোমার অফিসে ফোন করেছি, জিমি গারনারকে খবর দিয়েছি, তারপর ক্যানসাস আর ডেনভার এয়ারপোর্টে… ওরা কিছুতেই মেসেজ নিতে চায় না, বললো, পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না।

–কাট ইঁট শট, মিলি! আমি খুবই টায়ার্ড। তোমার যদি ইম্পটান্ট কিছু বলবার থাকে।

অনীতা যদিও একইসঙ্গে টি ভি দেখা, আলুভাজা খাওয়া ও খুনোখুনির গল্প পড়া চালিয়ে যাচ্ছে, তবু পারিবারিক ঘটনা প্রবাহের দিকে তার চোখ কান খোলা থাকে। মায়ের স্বভাবও সে জানে। এরই মধ্যে মাকে সে তার নিজের তুলনায় একজন ছেলেমানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। সে এবার চেঁচিয়ে বললো, মা-আ, সামবডি আজ ইন্ডিয়া থেকে ফোন কল করেছে। গ্র্যান্ড পা ইজ সিক, সেইজন্যই তুমি বাবাকে মেসেজ দিতে চাইছিলে।

শর্মিলা এবারে একবার দম নিল। খবরটা সে অতীনকে কী ভাবে বলবে সেটাই সে বুঝতে পারছিল না। মেয়ের নির্দেশ পেয়ে সে বললো, হ্যাঁ, বাবলু, দেশ থেকে আজ একটা ফোন এসেছে, তোমার লালুকাকা ফোন করেছিল…

–লালুকাকা? সে আবার কে? নেভার হার্ড অফ হিম!

–বাঃ, তোমার একজন কাকা আছে না?

–আমার একটিই কাকা, তাকে আমরা কানুকাকা বলি।

–হ্যাঁ, তিনিই। ঠিক। ভালো করে শোনা যাচ্ছিল না।

–ভালো করে শোনা না গেলেও লালুকাকা নামে কি নতুন কেউ গজাবে? এনি ওয়ে, কী বললেন কানুকাকা?

–বাবলু, মাথা ঠাণ্ডা করে শোনো। ডোন্ট গেট আপসেট! তোমার বাবা খুব অসুস্থ। তোমার এক্ষুণি একবার কলকাতায় যাওয়া দরকার।

–কে অসুস্থ?

–বাবা। তোমার বাবা।

কয়েক মুহূর্ত অতীন নীরব রইলো। চোখের সামনে সে দেখতে পেল বাবাকে। জেদী, চিরকালের অভিমানী। বাবার ব্লাড প্রেসার যথেষ্ট বেশি। মাঝে মাঝে এখান থেকে চেনাশুনো যারা দেশে যায়, তাদের হাত দিয়ে অতীন ওষুধ পাঠায়, সে ওষুধ তিনি নিয়মিত খান কি না সন্দেহ। এই বয়েসেও বাবার অনেকরকম ছেলেমানুষী আছে, বয়েসটা মানতে চান না। কারডিয়াক অ্যারেস্ট? সেরিব্রাল অ্যাটাক?

–কী অসুখ হয়েছে? কতটা সীরিয়াস? হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে?

–তা ঠিক বোঝা গেল না। দেশের টেলিফোন কি বোঝা যায় ভালো করে? আমি তবু খানিকটা শুনতে পাচ্ছি, তোমার কানুকাকা বোধ হয় কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না, শুধু হ্যালো হ্যালো করে চাচাচ্ছিলেন, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন, আমি যত বলছিলুম যে তুমি এখানে নেই, উনি তা বুঝতেই পারছিলেন না। তিনঘণ্টা চেষ্টা করে নাকি লাইন পেয়েছেন, বললেন, তোমার পক্ষে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতায় ফেরা…

–অসম্ভব! আমি এখন কী করে যাবো?

–ওর কথা শুনে মনে হলো, তোমার যাওয়াটা খুব জরুরি!

–তুমি জানো না আমার মাথার ওপর এখন কত বড় দায়িত্ব? তোমার উচিত ছিল ভালো করে জেনে নেওয়া যে অসুখের চেহারাটা কী! কতটা ক্রিটিক্যাল।

–কথা বোঝা গেল না যে! তিন মিনিট হতে না হতেই ছেড়ে দিলেন, তার মধ্যে দু মিনিট তো হ্যালো হ্যালো করেই কাটালেন।

–তুমি রিং ব্যাক করতে পারতে।

–কোথায়? তোমাদের বাড়িতে? সে ফোন তো অনেকদিন খারাপ। কানুকাকা অন্য জায়গা থেকে ফোন করছিলেন, সেখানকার নাম্বারটা জেনে নেবার চান্সই পেলাম না।

-–কানুকাকার নিজের বাড়িতেই ফোন আছে, সে নাম্বারটা আমাদের খাতায় লেখা নেই। যাকগে, পাঁচুদারা কলকাতায় গেছেন, তুমি ওঁদের ফোন করে এক্ষুনি একটা খবর নিতে বলল

–পাঁচুদা-শান্তাবৌদিরা পরশুদিনই ফিরে এসেছেন। বাবলু, তুমি ওখান থেকেই ইন্ডিয়া চলে যাবে, না একবার নিউ জার্সিতে ফিরে আসবে?

–এখান থেকে কী করে যাবো? তা ছাড়া যাওয়াটা কি চাট্টিখানি কথা। অফিসের কাজ হুট করে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায়? কাল দুটো অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পরশুদিন সান্টা-ফে শহরে গিয়ে ডিলটা করা সবচেয়ে ক্রুশিয়াল, তার আগে…

বাবলু, তোমার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তোমাকে তো যেতেই হবে। মা একলা, তিনি অসহায় হয়ে পড়বেন…।

–যদি এতই সীরিয়াস ব্যাপার হয়, দেশ থেকে ফোন এসেছিল, তবু আমি ডাকার পর তুমি বাথরুম থেকে বেরুতে চাওনি? আধঘণ্টা বাদে আমাকে

–সেজন্য তুমি আমায় পরে বকুনি দিও। প্লীজ, মাথা গরম করো না। জানোই তো, মাঝে মাঝে আমার অ্যামেনেশিয়া মতন হয়, মন খারাপ থাকলে আরও বেশি হয়…।

–এখন ছেড়ে দিচ্ছি, পরে আবার ফোন করবো। ভেবে দেখি কী করা যায়। বাই-ই। অতীনের মুখখানা থমথমে হয়ে গেছে। তাতে যতখানি উৎকণ্ঠা, তারচেয়েও বেশি রাগ ও অসহায় মাখা। যে-অবস্থার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, সেরকম কোনো সংকটের মধ্যে হঠাৎ পড়ে গেলে মানুষের এরকম রাগ ও অসহায় ভাব আসে। বাড়ি ঘর ছেড়ে দিনের পর দিন সে নতুন নতুন শহরে ঘুরছে, মাথার মধ্যে শুধু কাজ আর কাজ, অদূরেই সার্থকতার হাতছানি, এই সময় চোদ্দ হাজার মাইল দূর থেকে যদি বাবার অসুখের খবর আসে, তা হলে তৎক্ষণাৎ কী করা উচিত তা অতীন জানবে কী করে?

কানুকাকার ফোন! বড়বাজারের ব্যবসায়ীদের মতন টিপিক্যাল হেঁতকা চেহারা হয়েছে কানুকাকার। সব সময় লম্বা চওড়া কথা। মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে কানুকাকা লোকদের পাঠায়, তাদের বাড়িতে থাকার জায়গা দিতে বলে। কানুকাকার এক শালা এসে তো প্রায় দেড় মাস থেকে গেল! বাড়িতে গেস্ট রাখতে আপত্তি নেই অতীনের, কিন্তু দেশ থেকে গেস্টরা এলেই মনে করে, তাদের জন্য আমি অফিস টফিস ছুটি নিয়ে স্ট্যাচু অফ লিবাটিতে যেতে হবে, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এ চড়তে হবে, নায়েগ্রা বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে…

কানুকাকার অম্বলের অসুখ, সব সময় সেই অসুখের কথা বলতে ভালোবাসে। অসুখ সম্পর্কে বাতিকগ্রস্ত। কতটা বাড়িয়ে বলেছে কে জানে। অতীন যদি এখানকার সবকিছু ফেলে কলকাতায় গিয়ে দেখে বাবা কয়েকদিন বুকের ব্যথায় কষ্ট পেয়ে, সেই সময়ে নার্সিংহোমের থাটে আধ-শোওয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন, তখন কী রকম লাগবে? তার যে কী সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে গেল, তা কি কেউ বুঝবে? বাবার যা বয়েস, তাতে এখন থেকে মাঝে মাঝে অসুখ তো হবেই, তার জন্য প্রত্যেকবার তো চোদ্দ হাজার মাইল দূর থেকে ছুটে যাওয়া যায় না! বাবা নিজেই নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হয়ে বলবেন, তুই শুধু শুধু কেন কাজ ফেলে চলে এলি, বাবলু। এক কাড়ি টাকা খরচ। আমি কি অথর্ব হয়ে গেছি? আই কেন টেক কেয়ার অফ নাই সেলফ!

মাঝে মাঝে চেক-আপের জন্য বাবা তো অনায়াসেই নার্সিংহোমে ভর্তি হতে পারেন। টাকা পয়সার কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়। ব্যাঙ্কে ইনস্ট্রাকশান দেওয়া আছে, প্রত্যেক মাসে মায়ের নামে এক শো ডলার পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এক শো ডলার মানে দেশের বারোশো টাকা, এ বছর ডলারের ভ্যালু আরও বেড়েছে।

প্রায় তিন-চার বছর দেশে যাওয়া হয়নি। এই সেপ্টেম্বরে সবাইকে নিয়ে যাওয়া মোটামুটি ঠিক হয়ে আছে, শর্মিলা টুকিটাকি উপহারের জিনিস কিনতে শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যে অতীনকে যদি সামান্য কারণে একা ঘুরে আসতে হয়, তাহলে পরে আর শর্মিলাদের নিয়ে। ঘাওয়াটা–

বাবা কাজের মানুষ, সারাজীবন খাটাখাটনি করেছেন, তিনি কাজ এবং দায়িত্বের মর্ম বোঝেন। দেশের অনেকেরই এই জ্ঞানটা নেই, সেখানে ওয়ার্ক কালচারই তো গড়ে ওঠেনি। কাজে ফাঁকি মারাটাই ন্যাশনাল প্যাস্টাইম। একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে মাঝপথে সেটা যে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিতে পারে, সে মানুষ হিসেবেও ছোট হয়ে যায়। কোম্পানির এই নতুন। প্রজেক্টের টেকনিক্যাল দিকটা অন্যদের বোঝাবার জন্য অতীনই রপ্ত করেছে, সেটা এখন অন্য কোনো সহকর্মীর বুঝে নিতে আবার খানিকটা সময় লাগবে, জাপানীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সময়টা এখানে বিশেষ মূল্যবান, একটা দিনও নষ্ট করা চলে না।

একজন ধরা-পড়া মাফিয়া চাঁই-এর স্বীকারোক্তি খবরের কাগজে পড়েছিল অতীন। ঐ গুণ্ডা দলে দীক্ষা নেবার সময় লোকটি যে শপথ বাক্য পাঠ করেছিল, তাতে ছিল যে, কোনোদিন সে নিজের মা বাবার নাম উচ্চারণ করতে পারবে না, স্ত্রী যদি মৃত্যুশয্যাতেও থাকে, তাহলেও সেই অজুহাতে দলপতির আদেশ অমান্য করা চলবে না।

এখানকার বড় বড় কমার্শিয়াল হাউজ, এদেশের ভাষায় যে-গুলিকে বলে করপোরেশন, সেখানকার নিয়ম কানুনের সঙ্গে ঐ মাফিয়াদের মন্ত্র গুপ্তির বিশেষ কোনো তফাত নেই। প্রত্যাশার বেশি কাজ তুলে দাও, তুমি আদর পাবে, বড় বাড়ি, বড় গাড়ি পাবে, হাওয়াইতে ছুটি কাটানো ইত্যাদি সুবিধে পাবে। আর যদি তোমার উৎপাদন ঝুলে যায়, দায়িত্ব থেকে সামান্য ভ্রষ্ট হও, অমনি তোমাকে কোল থেকে নামিয়ে আর একজনকে কোলে বসাবে। মাফিয়াদের মতনই এইসব করপোরেশনগুলো দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতারও নিয়ন্ত্রণ করে। চীনের অর্ডারটা পাবার জন্য রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি-তেও তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে, অতীনের কোম্পানির বড় সাহেবরা সেই ব্যাপারে ব্যস্ত, অতীনের ওপর সব কিছু নির্ভর করছে না মোটেই, কিন্তু এরা শুধু রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়েই কাজ আদায় করায় বিশ্বাস করে না, প্রডাকশান, ম্যানেজমেন্ট, লিয়াঁজ থেকে প্যাকেজিং পর্যন্ত নিখুঁত হওয়া চাই।

অতীনের ওপর শুধু দায়িত্ব নতুন দ্রব্যটির কেমিক্যাল কম্পাউন্ড এবং ভায়াবিলিটি বিষয়ে কয়েকজন মানুষকে বুঝিয়ে দলে টানা, এর মধ্যে জন ডিয়ার কোম্পানির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, যিনি ছুটি নিয়ে সান্টা ফে শহরে বসে আছেন, তাঁর সম্মতি আদায় করাই সবচেয়ে জরুরি।

জো ম্যাককরমিককে অতীন যদি নিজের অবস্থাটা বুঝিয়ে বলে ছুটি চাইতে যায়, জো অধৈর্যভাবে সবটা শুনবেই না। রাগে গরগর করতে করতে বলবে, শোনো, পৃথিবীর কোন প্রান্তে তোমার পিতা কী অবস্থায় রয়েছেন, তা নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাতে চাই না। আমার মাথা এমনিতেই যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় পূর্ণ, সেইসব সমাধান করবার জন্যই কোম্পানি আমাকে টাকা দেয়। তুমি যদি এই অবস্থায় কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যেতে চাও, তাহলে তোমার বিবেককে জিজ্ঞেস করো।

অর্থাৎ অতীনের পদোন্নতি তো হবেই না, চাকরিটাই চলে যেতে পারে। এ রকম বদনাম নিয়ে চাকরি ছাড়লে অন্য কোনো কোম্পানি তাকে ভালো কাজ দেবে না।

নাঃ, এখন যাওয়া হবে না, যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

সুটকেসটা কোথায় গেল? এনকোয়ারি কাউন্টার ছেড়ে অতীন আনমনে চলে এসেছে একটা কফি কনারে, সুটকেসটা ফেলে এসেছে ভুলে। আজকাল ছিচকে চোরের উপদ্রব বেশ বেড়েছে। দৌড়ে ফিরে যেতে গিয়েও অতীন বাধা পেল। একদল কৃষ্ণ ভক্ত ফর্সা ছেলে-মেয়ে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছে। মেয়েরা শাড়ি পরা, কোনো কোনো ছেলের মাথার টিকিতে ফুল বাঁধা। এয়ারপোর্টের বাকি লোকরা হাঁ করে দেখছে এদের। এরা কোথায় চলেছে, কিউবা নাকি? আশ্চর্য কিছু না, রাশিয়াতেও নাকি এদের প্রভাব ছড়িয়েছে। সিদ্ধার্থ ঠিকই বলেছিল, স্বামী বিবেকানন্দর চেয়েও প্রভুপাদের সাহেব-মেম শিষ্য-শিষ্যার সংখ্যা অনেক বেশি! গাঁজা-ভাং-মদ-যৌনতা ছেড়ে আরও বড় কোন নেশায় এরা মেতে আছে?

সুটকেসটা নিয়ে এসে অতীন এক কাপ কফি নিয়ে একা একটা টেবিলে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টের সব কিছু মুছে গিয়ে তার চোখে ভেসে উঠলো অন্য একটি ছবি। বাবা নয়, সে দেখতে পেল মাকে। হাসপাতালের সাদা ধপধপে খাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মা। মা ঠিক এইদিকেই তাকিয়ে আছে, মায়ের পেছন দিকে জানলা। মায়ের চোখ দুটো ফুলোফুলো, কান্নাকাটি করেছে মনে হয়। মাকে অতীন বড়জোর আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে দেখেছে কয়েকবার, ঝরঝরিয়ে কাঁদতে দেখেছে কি কখনো? হ্যাঁ, বহুদিন আগে, অনেক ছেলেবেলায়, অতীন একবার দোতলা বাসে চেপে সাউথ ক্যালকাটায় গিয়েছিল একা, বাবা খুব মেরেছিল, সেইদিন মা…

দাদা তখনও বেঁচে, দাদার সঙ্গে এক বিছানায় শুতে অতীন, দাদা প্রায়ই বলতো, তুই বুঝিস না বোকা, মা তোকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে!

অতীনের দম আটকে আসতে লাগলো। গলাটা যেন কেউ চেপে ধরেছে। মায়ের চোখ ছলছল করছে, মা তার জন্য প্রতীক্ষা করে আছে, আর অতীন এখনো যাবে কি যাবে না ভাবছে! চুলোয় যাক চাকরি। একটা কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে, জো ম্যাকরমিককে বললে কিছুই লাভ হবে না। কিন্তু জিমি গারনার তার বন্ধু, জিমিকে অনুরোধ জানালে সে সাহায্য করবে নিশ্চিত।

গরম কফিতে চুমুক দিয়ে অতীন একটু ধাতস্থ হলো। জিমি আন্তরিকভাবে সাহায্য করতে চাইলেও পারবে কি? জিমি অ্যাকাউন্টসের লোক, এইসব টেকনিক্যাল জ্ঞান তার প্রায় কিছুই নেই। তাকে সব বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। সময়, সময়টাই বড় কথা!

টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট ঘুষি মেরে অতীন অস্ফুট কাতর স্বরে বললো, বাবা, তুমি অসুখ বাধাবার আর সময় পেলে না? অন্তত আর সাতটা দিনও যদি আমাকে দিতে?

প্রথমেই নিউ ইয়র্কে ফেরার একটা টিকিট কাটা দরকার। আজ রাতের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যেতে পারলে, কাল সকাল থেকেই ইন্ডিয়ার ফ্লাইট বুকিং-এর চেষ্টা চালানো যায়। চট করে একদিনের মধ্যে কি বুকিং পাওয়া যাবে?

বিমানবন্দরের চাতাল দিয়ে অনেকখানি হেঁটে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো অতীন। আজ রাতের মধ্যেই সে নিউ ইয়র্ক ফিরবে? এ কি করছে সে, এ তো স্রেফ পাগলামি। অফিস থেকে অন্য একজনকে আনার ব্যবস্থা না করে সে কি এমনভাবে চলে যেতে পারে। কাল সকালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কারুকে না কারুকে রাখতেই হবে। তারপর সান্টা ফে। কিন্তু শনি-রবিবার কাকে পাওয়া যাবে অফিস থেকে?

এত দ্বিধার মধ্যে অতীন জীবনে পড়েনি। সে দাঁড়িয়েই রইলো ভিড়ের মাঝখানে। এই অবস্থায় যদি পরামর্শ দেবার কেউ থাকতো!

একটু পরে একটা সমাধান মাথায় এলো অতীনের। তার বদলে শর্মিলাকে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়? শমিলা বুদ্ধিমতী, সে মাকে সবরকম সাহায্য করতে পারবে। রণ আর অনীকে কিছুদিনের জন্য সিদ্ধার্থদের কাছে রাখা যেতে পারে। আচমকা তার চোখ দুটো জ্বালা করে। উঠলো, মুখটা অস্পষ্ট হয়ে গেল অভিমানের ছায়ায়। দেশ থেকে ফোন এলো, বাবার অসুখ, গুরুতর ব্যাপার, অতীনকে কলকাতায় যেতে হবে, এই সাংঘাতিক বিষয়টাও শর্মিলা ভুলে গেল কী করে? বাথরুম থেকে তাড়াতাড়ি বেরুতে চায়নি। যদি শর্মিলার বাবা কিংবা মা সম্পর্কে এই রকম খবর আসতো, তাও কি সে হাফ-হার্টেডভাবে নিতে পারতো? অতীনের বাবা-মাকে শর্মিলা ভালো করে চিনলোই না!

কিন্তু এখন রাগ করার সময় নয়, এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। অতীনের শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে, দুপুরে সে প্রায় কিছু খায়নি, কফিটা পান করার পর আরও খিদে বোধ হলো। কোম্পানির পয়সায় হোটেলটা যখন বুক করাই আছে, তখন সেখানে গিয়ে, স্নানটা সেরে নিয়ে, কিছু খেয়ে তারপর সবদিক ভেবে দেখতে হবে। দু’ এক ঘণ্টা সময়ে আর কী আসবে যাবে!

এখন সন্ধে সাড়ে সাতটা। নিউ ইয়র্কে সময় অনেক এগিয়ে, একটু পরেই ছেলেমেয়েরা শুয়ে পড়বে। আজ শুক্রবার, কল্যাণ-মিতালি প্রায়ই একটু বেশি রাত করে, বাচ্চাদের ঘুম পাড়াবার পর, ভিডিও ছবি দেখার জন্য শর্মিলাকে ডাকে। শর্মিলা যদি সেখানে চলে যায়? ওকে এখানকার হোটেলের ফোন নাম্বারটা জানানো হয়নি, দেশ থেকে আবার কোনো খবর আসতে পারে।

এবার অতীন টেলিফোন বুথে গিয়ে একজন লোকের পেছনে দাঁড়ালো। তার মনে পড়ছে সমীরের কথা। সমীর তার বাবার অসুখের খবর পেয়ে পরের দিনই দেশের দিকে পাড়ি দিয়েছিল। ততক্ষণে সব শেষ। ফিরে এসে সমীর বলেছিল, এবার থেকে শুধু শ্রাদ্ধ করার জন্য দেশে যেতে হবে। বাপ-মা ফুরিয়ে গেলে আর হুড়স ধাড়স করে দেশে ছুটতে হবে না। তাই শুনে সিদ্ধার্থ বলেছিল, বাপ-মা আর শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে মোট চারবার। তাও শ্বশুর-শাশুড়ির বেলায় শুধু বৌকে পাঠালেই চলে।

শর্মিলা ফোনের পাশেই বোধ হয় দাঁড়িয়ে ছিল, রিং হবার সঙ্গে সঙ্গে সে বললো, ইয়েস? বাবলু?

অতীন বললো, শোনো খুকু…

শর্মিলা বললো, তার আগে আমার কথাটা শুনে নাও। আবার খবর এসেছে। লন্ডন থেকে এইমাত্র ফুলদি ফোন করেছিল। তোমার ফুলদি, মানে তুতুলদি। উনি কলকাতা থেকে কল পেয়েছেন, ওরা কিছুতেই অ্যামেরিকার লাইন পাচ্ছে না, লন্ডন নাকি তবু পাওয়া যায়। ফুলদিকে অলি জানিয়েছে…

–অলি, মানে আমাদের অলি চৌধুরী।

–হ্যাঁ। কী বলেছে সে?

–সে ফুলদিকে বলেছে তোমাকে জানিয়ে দিতে যে তোমার বাবা হয়তো ভালো হয়ে যাবেন, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তাই তোমাকে দেখতে চেয়েছেন একবার

-–ঠিক করে বলল, কী হয়েছে!

–উনি খুবই অসুস্থ—

–অসুস্থ… না…শেষ? আমার কাছে লুকিও না!

–ও রকম কথা ভাবছে কেন, বাবলু! যদি ফাস্ট অ্যাটাক হয়, ভালো হয়ে ওঠার খুবই চান্স আছে। তবে তোমার একবার যাওয়া নিশ্চয়ই দরকার, তেই ওর খানিকটা বুস্টিংআপ হতে পারে, ফুলদি সেই কথাই বললো। তুমি কি ওখান থেকেই সোজা চলে যেতে চাও? বাড়ি আসবে না?

–খুকু, তুমি এত অবুঝ হও কি করে? জানো না, কী ধরনের কাজ নিয়ে আমি ঘোরাঘুরি করছি? এখানে বেড়াতে আসিনি। ফুল ইনফরমেশান না পেলে

–আমার ওপর রাগ করছো কেন? তোমার খুব তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার, তাই ভাবলুম যদি ওয়েস্ট কোস্ট দিয়ে চলে যাও…

–কী করে এই কথা ভাবলে? আমার কাছে অত টাকা কোথায়? তাছাড়া অফিসকে পুরোপুরি লেট ডাউন করে…

–তুমি কি যাবে না ভাবছো? তোমার যাওয়াটা নিশ্চয়ই খুব ইম্পটান্ট, নইলে লন্ডন ধরে। আমার তোমাকে খবর দেবার চেষ্টা…

–শোনো খুকু, এই রকম সময়ে তুমি আমাকে একটু সাহায্য করবে না? আমাকে শুধু শুধু প্রশ্ন না করে তুমি নিজে একটা কিছু সাজেস্ট করতে পারো না? এই অবস্থায় আমি…

–আমি বলছি, বাবলু, তোমার যাওয়া উচিত, তোমার যত কাজই থাক…

–যাবো তো নিশ্চয়ই। কিন্তু হাউ সুন? বাড়ি হয়েই যেতে হবে, টাকার ব্যবস্থা করতে হবে, সঙ্গে বেশ কিছু টাকা না নিয়ে গেলে

–তুমি যদি আজই ফিরে আসতে চাও, তা হলে যত রাতই হোক আমি তোমাকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে যাবো না

–আজ রাতে ফেরা অসম্ভব! কাল বিকেলের আগে কিছুতেই হবে না। তুমি ততক্ষণে এক কাজ করো। তুমি যেভাবেই হোক, এক্ষুনি সুরেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলো।

–কোন সুরেশ?

-–আঃ, কী মুশকিল, তুমি সুরেশ ভাটিয়াকে চেনো না? যার ট্রাভল এজেন্সি আছে। ওকে বলল, কাল রাত্তিরে অথবা পরশু সকালে যে-কোনো ফ্লাইটের একটা টিকিট যেন বুক করে রাখে। সোজা যেন কলকাতায় যাওয়া যায়, মাঝপথে বসিয়ে রাখলে চলবে না। যেমন করেই হোক, ওকে একটা টিকিট যোগাড় করতেই হবে। এই সময়টা টিকিটের খুব রাশ থাকে। আর তুমি কলকাতায় একটা টেলিগ্রাম পাঠাও যে আমি আসছি। ঠিক কখন পৌঁছোবো, সেটা পরে জানাচ্ছি। প্লিজ, মনে করে এগুলো করো। আবার যেন ভুলে যেও না!

দু-তিন সেকেন্ড থেমে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে করুণ গলায় শর্মিলা বললো, না, ভুলবো না, লিখে রাখছি। সুরেশকে না পেলে কল্যাণকে রিকোয়েস্ট করবো, ওর কোন ট্রাভল এজেন্সির সঙ্গে চেনা আছে বাবলু, আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাবে না? আমিও বাবাকে দেখতে যেতে চাই…  

–দু’জনে একসঙ্গে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ছেলেমেয়েরা থাকবে…আমি এখন রাখছি—

–বাবলু, আর একটা কথা বলবো? একটা রিকোয়েস্ট…

–বলো…

–তুমি অত দূরে আছো, একলা একলা, মাথায় অফিসের কাজের চিন্তা, তার মধ্যে এরকম একটা দুঃসংবাদ শুনলে বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা কী রকম। বেশি চিন্তা করো না, আমার মনে হচ্ছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। অফিসে তোমার সুনাম আছে, ওরা ঠিক বুঝবে যে না গিয়ে তোমার উপায় ছিল না…বাবলু, আর একটা কথা, তুমি আজ বেশি ড্রিংক করো না, প্লীজ

–না, না, ওসব ভয় পেও না। আমি ঠিক থাকবো…

–আজ রাতটা তুমি একলা একলা থাকবে, আমার মোটেই ভালো লাগছে না

–কিচ্ছু হবে না। তুমি তো জানো, আমার নার্ভ কত স্ট্রং!

ফোনটা রেখে অতীন রুমাল দিয়ে মুখ মুছলো। তার প্রচণ্ড গরম লাগছে। জ্যাকেটের তলায় জমাটা ভিজে সেঁটে গেছে গায়ের সঙ্গে। তবু, বাড়িতে কাল বিকেলে ফিরবে, শর্মিলার কাছে এই কথাটা উচ্চারণ করে ফেলার পর অনেকখানি নিশ্চিন্ত বোধ করছে সে। কাল বিকেলের দিকে ফেরা, দ্যাটস লজিক্যাল! তার মধ্যে অফিসের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবেই, সে সকালের প্রথম মিটিংটা অন্তত অ্যাটেন্ড করতে পারবে। শর্মিলা ভয় পাচ্ছে, এখানে একা একা সে এত বড় একটা খবরের চাপ সামলাতে পারবে না। হুঁ! লাইফ ইজ হার্ড!

অতীন নিজের নাকের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কথা বলে যাচ্ছে।

আমি যদি আমার বাবার মৃত্যুসংবাদও পেতাম, তাহলেও সেটা খুব শান্তভাবে নিতে পারতাম। বাবার প্রায় সত্তরের কাছাকাছি বয়েস, নেহাৎ কম না। নিজের ইচ্ছেমতন জীবন কাটিয়েছেন। একদিন তো চলে যেতে হবেই। তবে, অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর শুনলে বিচলিত হয়ে পড়তে হয়ই। ঠিকমতন চিকিৎসা করলে আরও দশ-বারো বছর আয়ু পাওয়া এমন কিছু শক্ত নয় আজকাল। মুন্নি আর অনুনয় অনেক দূরে থাকে, মা একা একা অসহায় হয়ে পড়বে। সে রকম আত্মীয়-স্বজনও কেউ নেই। কানকাকার ওপর মোটেই ভরসা করা যায় না। মা আশা করবে–আমি ফিরে গিয়ে সব ব্যবস্থা করবো। কার্ডিয়াক বা সেরিব্রাল অ্যাটাক হলে তো অন্য কিছু করার নেই, খুব তাড়াতাড়ি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে যাওয়া ছাড়া…মায়ের হাতে কিছু টাকা আছে আশা করি…

খুকু ভাবছে, খবরটা পেয়ে আমি উতলা হয়ে উঠেছি। ঠিক তা নয়। আসলে একটা ডায়লেমা, ঠিক এই সময়ে, একটা দারুণ প্রয়োজনীয় কাজের মধ্যে, হঠাৎ দেশে ফেরার ব্যবস্থা। করার মধ্যে যে ঝাট… বাবা শেষনিঃশ্বাস ফেলে থাকলে এত ব্যস্ততার কিছু ছিল না। শুধু শ্রাদ্ধ করতে যাওয়ার জন্য আমার অত গরজ নেই, বাবারও ওসব ব্যাপারে তেমন বিশ্বাস ছিল না , নেহাৎ একটা নিয়মরক্ষা, শ্রাদ্ধ তো দশ-বারোদিন পর হয়, ঠিক ঠিক খবরটা যদি পাওয়া যেত, তাহলে এদিকের কাজ চুকিয়ে…। বাবা যখন তাঁর নিজের বাবার অসুস্থতার খবর শুনে। মালখানগরে গিয়েছিলেন, তখন তিনিও ঠাকুদাকে দেখতে পাননি…

এইসব ভাবতে ভাবতে অতীনের চোখের সামনে একটা চলচ্চিত্রও তৈরি হয়ে যাচ্ছে। যাদবপুরে তাদের বাড়ি, গলির মোড়ে এক রাশ জঞ্জাল, পুরোনো পুরোনো গাড়িগুলোর বিকট হন, ভিড়ে ভর্তি দোতলা বাসগুলো একদিকে হেলে পড়েছে প্রায় একটা নার্সিং হোম, সেখানে। একটা ক্যাবিনের মধ্যে আর কেউ নেই কেন? শুধু মা। নার্সিংহোমের সাদা ঘর, জানলার বাইরে সাদা আকাশ, বিছানার ওপর সাদা চাঁদর ঢাকা, মায়ের পরনে সাদা শাড়ি, এক রাশ শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মা, চোখ দুটিতে টলটল করছে জল, মা তাকিয়ে আছে এদিকে, এই ডেনভার এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ছুটে এসেছে মায়ের দৃষ্টি…

এই ছবিটা দেখতে দেখতে অতীন কেঁপে উঠলো, একচল্লিশ বছর বয়স্ক, আত্মবিশ্বাসী, সার্থকতা-শিকারী অতীন মজুমদার সেই মুহূর্তে একটি বালক হয়ে গেল। তার ইচ্ছে হলো তক্ষুনি এক ছুট লাগাতে। আট বছর বয়েসে, দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে ভিড়ের মধ্যে একবার মাকে হারিয়ে ফেলে বাবলু যেমন ছোটাছুটি করেছিল। তার ইচ্ছে হলো, অফিসের কাগজপত্র ভর্তি সুটকেসটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে যে-কোনো একটা প্লেনে উঠে পড়তে।

এখানে কেউ কারুর মুখের দিকে এক পলকের বেশি তাকায় না। প্রয়োজন ছাড়া কেউ অন্যের মনোজগতে উঁকি মারে না। অতীন এই বিশাল বিমানবন্দরে কী অসহায়ভাবে একা!

একটু পরে সে কাঁধ দুটি ঝাঁকিয়ে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে এলো বাইরে। ঠাণ্ডা বাতাসের ঝলক সে গ্রাহ্যও করলো না। একটা ট্যাক্সিতে উঠে সে নাম বলে দিল হোটেলের। মাকে ঐ নার্সিং হোমের ঘরটাতেই সে কেন দেখছে বার বার? মায়ের চোখে জল।

কী সাংঘাতিক ইনসুটিংকট এই মাতৃস্নেহ ব্যাপারটা। অত দূরে থেকেও মা তাকে প্রবলভাবে টান মারতে পারে হঠাৎ হঠাৎ। প্রথম প্রথম তো বিদেশে এসে অতীন প্রায়ই মাকে স্বপ্ন দেখতো। শিলিগুড়ি থাকার সময় এরকম হয়নি, জামসেদপুর কিংবা জেলে থাকার সময়েও না, কিন্তু লন্ডনে আসার পর সে দূরত্বের কষ্টটা অনুভব করতো। এখনও মাঝে মাঝে মায়ের স্বপ্নটা ফিরে আসে। মাত্র বছরখানেক আগেই তো, ক্রিসমাসের ঠিক পরেই, রণের যেদিন পা ভাঙলো, খুকু বাড়িতে ছিল না। খুকুকে খবর না দিয়েই সে রণকে নিয়ে গেল হাসপাতালে, বিশেষ কিছু হয়নি অবশ্য। সেই রাতেই অতীন তার মাকে স্বপ্ন দেখেছিল, কী স্বপ্ন মনে নেই, কিন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল সে। পাশেই ঘুমিয়ে ছিল শর্মিলা, তার ঘুম ভাঙেনি, তাকে জাগিয়ে অতীন কিছু বলতেও চায়নি। সেই কান্না একেবারে গোপন থেকে গেছে। অতীনের মতন মানুষ। যে স্বপ্ন দেখে কাঁদতে পারে তা কেউ বিশ্বাসই করবে না। ঐ সব সেন্টিমেন্টাল স্বপ্ন-টপ্ন তো। সবাই দেশে ফেলে আসে। প্রথমবার না হোক, দ্বিতীয়বার অবশ্যই।

৬৪.৮ হোটেলে চেক ইন করে

হোটেলে চেক ইন করে অতীন নিজের ঘরে উঠে এলো। পাঁচতলায়। ভাড়া করা একদিনের মাথা গোঁজার আস্তানা, এই কক্ষে নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ আগেও অন্য মানুষ ছিল, তাদের নিশ্বাস রয়ে গেছে ভেতরের ভারি বাতাসে। তবু বেলবয়কে বখশিস গুঁজে বিদায় দিয়ে দরজা বন্ধ করলেই এই চার দেয়াল ঘেরা জায়গাটা একটা ব্যক্তিগত গুহা হয়ে যায়। এখানে যা খুশী করা যেতে পারে।

প্রথমেই জুতো মোজা খুলে সে হালকা হলো। টাইটা খুলে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিল বিছানার ওপর। জ্যাকেটটারও সেই দশা হলো। তার ভয়ংকর তৃষ্ণা পেয়েছে। তার হাত ব্যাগে সব সময় ছোট একটা হুইস্কির বোতল থাকে, স্নানের আগে খানিকটা কড়া পানীয় নেওয়া তার অভ্যেস। তার মনে পড়লো শর্মিলার অনুরোধ, সে একটু হাসলো।

দু’বার চুমুক দিয়েই বোতলটা খাটের তলায় রেখে দিল অতীন। এখন সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ। তার পুরোনো অভ্যেসটা রয়ে গেছে, ঘরের মধ্যে একলা থাকলে সে সব পোশাক খুলে ফেলে। এবার স্নান করতে যেতে হবে। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে সে বেশ জোরে জোরে বলে উঠলো, বাবা, আমি আসছি। আমার সঙ্গে দেখা হবার আগে তুমি চলে যেও না। আমার একটু দেরি হবে, কিন্তু আমি ঠিক আসবো! মা, তুমি চিন্তা করো না, আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছোবার চেষ্টা করছি। বিশ্বাস করো, এর আগে যাওয়া সত্যি সম্ভব নয়। মুন্নি আর অনুনয়রা হরিদ্বার থেকে পৌঁছে গেছে? মা, তোমার শরীর ভালো আছে তো?

ঘর সংলগ্ন বাথরুমের দরজাটা খুলে অতীন প্রথমে বাথটাবটা ভালো করে পরিষ্কার করলো। আগে যারা স্নান করে যায়, তারা অনেকেই ধুয়ে দেয় না। অন্যদের গায়ের ময়লা লেগে যাবে ভাবলেই গা-টা শিরশির করে। গরম জল ঠাণ্ডাজল এক সঙ্গে চালিয়ে বাথটাবটা ভরতে ভরতে অতীনের একটা কথা মনে পড়ে গেল। অলি লন্ডনে ফুলদিকে ফোনে খবর দিয়েছে। অলি কি শর্মিলাকেও ফোন করার চেষ্টা করে পায়নি, না ফোন করেইনি? অলির সঙ্গে শর্মিলার অবশ্য কোনোদিনই মনোমালিন্য হয়নি, ওদের পরস্পরের মধ্যে কিছু একটা বোঝাঁপড়া আছে। এখান থেকে অলিকে ফোন করে তো বাবার সঠিক অবস্থাটা জানা যেতে পারে।

।গায়ে জল না দিয়েই অতীন ফিরে এলো ফোনের কাছে। মাত্র কয়েক মাস আগে ভারতের সঙ্গে ডাইরেক্ট ডায়ালিং চালু হয়েছে। দেশ থেকে কেউ সহজে এখানকার লাইন পায় না, কিন্তু এখান থেকে অনেক সময় চট করে পাওয়া যায়। অলিদের বাড়ির ফোন নাম্বার অতীনের নোট বইতে লেখা নেই। কোনো প্রয়োজন হয় না। তবু একটু ভুরু কুঁচকে থাকতেই অলিদের নম্বরটা তার মনে পড়ে গেল, ডাবল ফোর ডাবল এইট, ওয়ান টু। হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই। কোনো কোনো জিনিস একেবারে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলেও সারাজীবন মনে থেকে যায়। ওয়াই এম সি এর তলার পাবলিক রেস্তোরাঁ থেকে একদিন ফোন করতে গিয়ে অলি বলেছিল, আমাদের নাম্বারটা এইভাবে মনে রাখবে, চুয়াল্লিশ, তার ডাবল হলো অষ্টআশী, আর আট আর চার বারো!

হোটেলের ঘর থেকে লং ডিসটেন্স কল করলে চার্জ অনেক বেশি পড়ে। লবিতে আছে শস্তা ফোন। তা পড় ক গে বেশি, এখন আবার পুরো প্রস্থ পোশাক পরে অতীন নীচে যেতে পারবে না। সে বোতাম টিপতে লাগলো। কানট্রি কোড, সিটি কোড, তারপর নাম্বার…। না লাগছে না। তবু ধৈর্য হারালে চলবে না, পাঁচ বার সাতবার করলে ঠিক লেগে যেতে পারে।

অন্তত পনেরো-ষোলো বছর অতীন টেলিফোন করেনি অলিকে। আজ সে করছে নিজের স্বার্থে। হোক স্বার্থ। অলির সঙ্গে সম্পর্কটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন অলির কথা মনে পড়লেই অতীনের এক ধরনের জ্বালা জ্বালা ভাব হয়। অলি সূক্ষ্ম একটা প্রতিশোধ নিয়ে। চলেছে, অথচ কিছুতেই তা বোঝা যাবে না। সবাই বলবে অলির মতন মহৎ মেয়ে আর হয় না। চতুর্দিকে অলির গুণগান। দেশে ফেরার পর সে অতীনের সঙ্গে সামান্যতম খারাপ ব্যবহার করে নি, শর্মিলাকে কত আদর যত্ন করেছে, নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছে। অলি এমন ভালো অভিনয় করতে জানে! শৌনকের নাম বলে সেবারে কী ধোঁকাই দিয়েছিল! শৌনক ছাড়া আর কারুকে বিয়ে করবে না অলি, এই তার প্রতিজ্ঞা, অথচ শৌনককে কেউ দেখতে পায় না। যত সব বোগাস ব্যাপার!

অলির জন্যই তো অনেকটা সেবার ফিরে গিয়েও দেশে থেকে যাওয়া হলো না অতীনের। অলি আসলে কিছুতেই ক্ষমা করবে না অতীনকে, সে সব সময় তার মনে অপরাধবোধটা জাগিয়ে রাখতে চায়।

আজ লাইন পেলেই অতীন প্রথমে বলবে অলি, আজ আবার তোমার কাছে দয়া চাইবার জন্য আমাকে ফোন করতে হলো। ওগো দয়াময়ী, তুমি আমার বাবার খবরটা একটু দেবে?

সবসুদ্ধ দেশে ফিরে গিয়েও যে থাকা গেল না, তার আরও কয়েকটা কারণ ছিল। তা সবাইকে বলা যায় না। চাকরির অসুবিধে, থাকার জায়গার অসুবিধে, ধুলো-ধোঁয়ার জন্য অসুখ বিসুখ, এসবই তুচ্ছ। এসবই কি অতীন আগে থেকে জেনে যায়নি? সে সব সহ্য করতে পারতো। কিন্তু আর একটা আঘাত দিয়েছিল কৌশিক-পমপম।

অতীনের মতন মানুষরা শুধু মা বাবার জন্যই ফিরে যায় না, মা বাবার সঙ্গে আর কতটুকু সময় কাটানো যায় এই বয়েসে! ফিরতে হয় দেশের টানে, বন্ধুদের টানে। অতীনের সেই দুটি টানই প্রবল ছিল। কিন্তু দেশ তাদের জায়গা দিতে চায়নি, যেন অনবরত একটা অব্যক্ত ধ্বনি শোনা গেছে, ফিরে যা! ফিরে যা! আর বন্ধুরা! কয়েকজন বন্ধু স্ত্রী-পুত্র কন্যা নিয়ে ঘোর সংসারী হয়ে গেছে। কেউ কেউ এখন ক্লাব লাইফ-পার্টি লাইফ নিয়ে গর্ব করে। কৌশিক পমপম ছাড়া তার পরিচিতদের মধ্যে আর কেউই প্রায় প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেই, শুধু রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে। পমপম আর কৌশিকের ব্যবহার ছিল অদ্ভুত ঠাণ্ডা। কৌশিকের পেটের মধ্যে এখনো একটা গুলি রয়ে গেছে, অতীন প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে বিদেশে এনে চিকিৎসা করাবে, কৌশিক রাজি হয়নি। হেসে বলেছিল, ওটা আমি হজম করে ফেলেছি প্রায়। পুরোটা হজম হয়নি, মাঝে মাঝে খোঁচা দেয়। তাই বিপ্লবের চিন্তাটা একেবারে ছাড়িনি। বিপ্লবের প্রত্যাশায় কৌশিক-পমপম ঝাড়গ্রামের দিকে ইস্কুল মাস্টারি করে জীবনটা কাটিয়ে দেবে। অতীন একদিন দারুণ অভিমানের সঙ্গে কৌশিককে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল, তুই আমার সঙ্গে এমন পর পর ব্যবহার করছিস কেন রে? আমার গায়ে কি আমেরিকান গন্ধ হয়ে গেছে? তোর খুব বিপদের সময় আমি আসতে পারিনি বলে তুই এখনো রেগে আছিস? আমিও এক সময় একা একা কম বিপদের মধ্যে কাটাইনি।

কৌশিক ম্লান হেসে বলেছিল, আরে না, ওসব কিছু না। তুই সব কিছু ছেড়েছুঁড়ে ঝাড়গ্রামের বীনপুরে আমাদের সঙ্গে এসে থাকতে পারবি? আমরা এক লেভেলে এলে তারপর আবার ঠিকমতন কম্যুনিকেশন হতে পারবে। আসল কাজ এখন এইসব জায়গাতেই শুরু করতে হবে রে, একেবারে তলা থেকে ভিত তৈরি করতে না পারলে…

সেটা কী করে অতীনের পক্ষে সম্ভব? কৌশিক পমপমদের কোনো বাচ্চা কাচ্চা নেই, ওরা তবু জীবন নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু অতীন এখন দুটি সন্তানের পিতা, তার একটা অন্য দায়িত্ব আছে।

কৌশিকের চেয়ে পরপমেরই যেন বেশি বিরাগ অতীনের ওপর। আসলে ওরা দু’জনেই খুব মরালিস্ট, ওরা অলির বদলে শর্মিলার সঙ্গে অতীনের বিয়েটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। শুকনো খটখটে চেহারা হয়ে গেছে পমপমের, অলির সঙ্গে তার চরিত্রেরও কোনো মিল নেই, তবু ওদের মধ্যে এত বন্ধুত্ব কী করে হলো কে জানে!

দেশে ফিরে যাবার এক মাস বাদেই অনীতা বলতে শুরু করেছিল, ড্যাডি, লেটস গেট ব্যাক হোম। উই হ্যাভ সীন এনাফ অফ ইণ্ডিয়া!

প্রথমবার শুনে আঁতকে উঠেছিল অতীন। সে বলেছিল, চুপ, চুপ! তুই কী বলছিস রে অনীতা! হোম মানে? ইণ্ডিয়াই তো আমাদের হোম। এখানে দাদু-দিদু আছেন।

অনীতার তখন মাত্র পাঁচ বছর বয়েস। সে কিছুতেই বুঝবে না। সে বারবার মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেছিল, নো-ও-ও! দিস ডাটি প্লেস ইজ নট আওয়ার হোম! আওয়ার হোম ইজ ইন নিউ ইয়র্ক।

অতীনের ইচ্ছে হয়েছিল, মেয়েটার কান ধরে এক চড় কষাতে। দোষ অবশ্য অনেকটা তাদেরই। অনীতার জন্মের পর সে আর শর্মিলা চাকরি নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে মেয়েটাকে বাংলা শেখাতে পারেনি, নিজের দেশের কথা ঠিক মতন বোঝাতেও পারেনি। অনীতা জানে, যেখানে সে জন্মেছে, যে বাড়িতে তার নিজস্ব একটা ঘর আছে, যেখানে তার প্রতিবেশী খেলার সাথীরা আছে, সেটাই তার হোম। জন্মসূত্রেও তো সে আমেরিকান!

অনীতা প্রায়ই নিউ ইয়র্কে ফিরে যাবার জন্য কান্নাকাটি করতো, মাস কয়েক বাদে তার হুপিং কাশি হয়ে গেল। অবস্থা এমনই দাঁড়ালো যে, এক সময় মনে হয়েছিল, ওকে আর বাঁচানো যাবে না। দেশের কোনো ওষুধ পত্রে বিশ্বাস করা যায় না। তখন কেঁপে উঠেছিল অতীনের পিতৃহৃদয়। অনীতাকে বাঁচাবার জন্যই ফিরতে হয়েছিল অত তাড়াতাড়ি। এখান থেকে চাকরি বাকরি ছেড়ে, পোঁটলা-পুটলি বেঁধে যারা দেশে চলে যায়, আবার এক বছরের মধ্যে ফিরে এসে তিক্তভাবে স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী শোনায়, অতীন নিজেও যে সেইদলে পড়বে, তা সে কখনো ভাবেনি। যাবার আগে সে ভেবেছিল, গ্রীন কার্ড ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যাবে। ভাগ্যিস ছেড়েনি!

এইবার লাইন পাওয়া গেছে কলকাতার। রিং হচ্ছে। প্রথমেই কি অলি ধরবে? ফোনটা ওদের বাড়ির দোতলায়, এখন ওখানে সকাল, অলি কি এরই মধ্যে অফিস ঘরে এসেছে?

একজন স্ত্রীলোকের কণ্ঠ, অলির নয়, সম্ভবত কাজের মেয়ের, সে বারবার বলছে, বাড়িতে কেউ নেই। আওয়াজ বেশ অস্পষ্ট!

অতীন বললো, অলি নেই! বিমানকাকা? কিংবা কাকিমা? বলো যে আমেরিকা থেকে একজন ফোন করছে, খুব দরকার।

কাজের মেয়েটির বোধহয় ফোন ধরার অভ্যেস নেই, সে বারবার বলছে ঐ একই কথা, বাড়িতে আর কেউ নেই কো, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে অতীনকে লাইন কাটতেই হলো। অতবড় বাড়িতে একজনও কেউ নেই ফোন ধরবার মতন? সেটা তো আরও আশঙ্কার কথা। সবাই মিলে যাদবপুরে গেছে বাবার কাছে! সব শেষ!

স্নানের কথা আর তার মনেই পড়লো না। সে উঠে দাঁড়িয়ে ছটফট করতে লাগলো। না, হতেই পারে না, বাবার সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে। অনেক ভুল তো বোঝাবুঝি রয়ে গেছে। বাবাকে একবার জানাতেই হবে, আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি, পি এইচ ডি করার আগে থেকেই আমি এ দেশ থেকে চলে যেতে চেয়েছিলাম, তোমরাই তখন বারণ করেছিলে, আজও আমার বিদেশে পড়ে থাকতে একটুও ভালো লাগে না। চাকরি করছি, টাকা রোজগার করছি, ঠিক যন্ত্রের মতন, এদেশের মাটিতে আমার একটুও শিকড় জন্মায়নি। এমনকি শর্মিলাও, অনেকে ওকে ঠিক বুঝতে পারে না, শর্মিলা আজকাল আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে, কিন্তু ও ভেতরে ভেতরে কষ্ট পায়। অন্য অনেক বন্ধুর স্ত্রীই এদেশ ছেড়ে যাবার কথা আর ভাবে না, কিন্তু শর্মিলা এত বছর পরেও এখানকার জীবনযাত্রা পছন্দ করতে পারেনি, যে কোনো দিন, যে কোনো শর্তে সে চলে যেতে রাজি। শুধু ছেলেমেয়েদুটো চায় না। ভারত ওদের দেশ নয়, সে দেশটা সম্পর্কে ওদের কোনো মায়া নেই, সে দেশের মানুষদেরও ওরা চেনে না…।

দেয়ালের দিকে তাকিয়ে অতীন চিৎকার করে বললো, অলি, অলি, আমি পৌঁছোনো পর্যন্ত আমার বাবাকে তুমি বাঁচিয়ে রাখো। বাবাকে কয়েকটা কথা বলতেই হবে। তুমি আমার বাবার বিছানার কাছে থেকে এই সময়টুকু। তোমার ওপর এখনো আমি এই জোর করতে পারি। পারি না?

ঘুরে দাঁড়িয়ে অতীন ভাবলো। শর্মিলাকে ফোন করবে? যদি নতুন কোনো খবর এসে থাকে।  কে খবর দেবে? ফুলদি! এখান থেকেই ফুলদিকে ফোন করা যেতে পারে। এই কথাটা আগে মনে আসেনি কেন?

লন্ডনের লাইন পাওয়া সোজা। কানেকশান পেয়েই সে জিজ্ঞেস করলো, কে, আলমদা? ফুলদি কোথায়?

অন্যসময় আলম ঠাট্টা ইয়ার্কি ছাড়া কথা বলে না। আজ সে গম্ভীরভাবে বললো, শালাবাবু। তোমার ফোন এক্সপেক্ট করছিলাম এতক্ষণ। তোমার ফুলদিকে তো আমি এই মাত্তর এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসলাম। এতক্ষণ কলকাতার দিকে রওনা হয়ে গেছে।

অতীন চমকে গিয়ে বললো, এরই মধ্যে? ফুলদি কখন খবর পেয়েছে?

আলম বললো, খবর পেয়েছে প্রায় সন্ধ্যার সময়! ব্যাপারটা হলো কী, একটা টিকিট কোনো রকমে ম্যানেজ করা গেল, আমাদেরই হাসপাতালে একজন যাওয়া ক্যানসেল করেছে ফরচুনেটলি তোমার ফুলদি সেটা পেয়ে গেল, এই ভোর রাত্রেই ফ্লাইট।

–কলকাতায় কী হয়েছে?

–তুমি খবর সব শোনো নি?

–না,সব শুনি নি। আমার বাবা কতটা অসুস্থ? কিংবা এর মধ্যেই কিছু ঘটে গেছে?

–সেটা ফ্র্যাংকলি আমি জানি না, বাবলু। জানলে বলতাম। আমাদের দেশের লোকেরা মনে করে হঠাৎ শুনলে আমরা শক পাবো, তাই সত্য কথাটা চট করে বলে না। ক্রিটিক্যালি ইল বললে ধরে নিতে হবে এক্সপায়ার করে গেছে। ঐ শব্দটাও আমি শুনি নাই। তবে, লেটুস হোপ ফর দা বেটার।

–ফুলদি আপনাকে কিছু বলে যায় নি?

–কান্নাকাটি শুরু করেছিল। মামাকে খুব ভালোবাসে তো। মামার কাছেই মানুষ হয়েছে।

–ফুলদি কান্নাকাটি করছিল?

–আহা, তার মানে এই না যে সব শেষ। তোমার ফুলদি নিজে ডাক্তার হলে কী হয়, কোনো কঠিন খবর সহ্য করতে পারে না। তুমি কবে যাচ্ছো!

–দেখি, খুব সম্ভবত কালকেই। আচ্ছা, আলমদা, রাখি।

–ও শোনো শোনো বাবলু, আর একটা কথা। তোমার মা এখন কলকাতায় নাই, তা শুনেছো তো? সেইটাই আরও দুঃখের ব্যাপার।

-–মা কলকাতায় নেই মানে? মা কোথায়?

–মা হরিদ্বারে তোমার ছোটবোনের কাছে গেছেন, তার তো বাচ্চা হবে বোধ হয়। দ্যাটস হোয়াট আই গ্যাদার ফ্রম দা টেলিফোনিক কনভারসেশান। তোমার মা কাছে নাই, তোমরা কেউ কাছে নাই তোমার বাবার এই এতখানি বয়েসে খুব ডিপ্রেসিং তো লাগতেই পারে, আরও শোনলাম, হি অ্যাটেমটেড সুইসাইড।

–হোয়াট?

–ডোন্ট গেট আপসেট, বাবলু। সেজন্য ফেটাল কিছু হয় নাই। এখন অসুস্থ আই অ্যাম শিওর, হি উইল সারভাইভ দিস টাইম। তোমার ফুলদি গেছে, সে যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে।

ফোনটা ছুঁড়ে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করলো অতীনের। বাবা আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন? কার ওপর রাগ করে? বাবার চরিত্রে এটা একেবারেই মানায় না, নিজের মতামতের ওপর যার সব সময় গভীর বিশ্বাস। তা ছাড়া এখন কোনো দায় দায়িত্ব নেই, সারাটা জীবন স্ট্রাগল করে এসে এখন নিশ্চিন্ত সময়ে পৌঁছে তিনি জীবনটা আগে আগে শেষ করে দিতে চাইবেন কেন? বাবার মতন মানুষদের আত্মবিশ্বাসের জোর সহজে টলে না। আলমদার কথা ঠিক বোঝা গেল না। মা কাছে নেই! মা কি খবরটা জানতে পেরেছে? লন্ডন-আমেরিকায় ফোন করার চেয়ে হরিদ্বারে ফোন করা অনেক শক্ত।

না, অতীন আর একা সামলাতে পারছে না। শর্মিলা ঠিকই বলেছিল, আজ রাত্তিরেই তার নিউ জার্সিতে ফিরে যাওয়া উচিত ছিল। এই রকম মানসিক অবস্থা নিয়ে সে কাল সকালে একজন ঝানু ব্যবসায়ীর সঙ্গে অফিসের কাজ নিয়ে আলোচনা চালাবে? অসম্ভব? এরা সব সময় প্রথমেই উল্টো যুক্তি দিয়ে শুরু করে। অতীন হেরে যাবে।

এই হোটেলের লবিতেই দুটি স্থানীয় বিমান কেম্পানীর অফিস ও একটি ভ্রমণ সংস্থা আছে। এখন অবশ্য বন্ধ। হোটেল কাউন্টারের কর্মচারিরা অনেক সময় টিকিটের ব্যবস্থা করে দেয়, ওরা কমিশন পায়। অতীন ডেস্ক ট্যাপ করে বললো, আমাকে নিউ ইয়র্ক কিংবা নিউ অ্যার্ক যাবার একটা টিকিট যোগাড় করে দিতে পারো? খুবই জরুরি প্রয়োজন।

একটি যুবাকণ্ঠ পালিশ করা ভদ্রতার সঙ্গে বললো, কোন তারিখের টিকিট চান, স্যার?

অতীন বললো, এখন থেকে দু’ঘণ্টা পরের যে কোনো ফ্লাইটের।

সেই যুবকটি বললো, খুবই দুঃখিত স্যার আমি যতদূর জানি, আগামী তিন দিনের কোনো টিকিট নেই।

অতীন এবার বিরক্ত হয়ে বললো, ডেনভার থেকে নিউ ইয়র্ক যাবার কোনো টিকিট নেই। গাদা গাদা ফ্লাইট আছে। আজ রাত্তিরে না হয়, কাল আর্লি মর্নিং যেকোনো ফ্লাইটে।

–একটি টিকিটও নেই। এখানে দন্ত চিকিৎসকদের একটা সমাবেশ শেষ হলো, দেড় হাজার ডেলিগেট আজই ফিরছেন। তা ছাড়া আপনি নিশ্চয়ই জানেন, পরশু নিউ ইয়র্কের সঙ্গে কলোরাডো স্টেটের ফুটবল খেলা, সেজন্য অসংখ্য যাত্রী, ওয়েটিং লিস্টেই আছে একশো ছাপ্পান্ন জন। এমনকি ফার্স্ট ক্লাসের টিকিটও নেই।

অতীন তাকে জোর ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেল। লোকটি তো ইচ্ছে করে বাজে কথা বলবে না, টিকিট বিক্রি হলে ও কিছু পয়সা পেত। টিকিট গছালেই ওর লাভ। হ্যাঁ, ফুটবল খেলা এখানে একটা মস্ত বড় হুজুগ। আজকের কাগজেই আছে যে কলোরাডো স্টেট অনেকদিন বাদে ফাইন্যালে এসেছে। শীত শেষ হবার পরই শুরু হয়ে যায় স্প্রিং টাইম রাশ, অনেকেই এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে যায়, টিকিট পাওয়া শক্ত, এ কথা অতীন আগে চিন্তা করে নি।

তা বলে আমেরিকার মধ্যে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার প্লেন পাওয়া যাবে না, এটা অতীন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলো, হোটেলে বসে থাকার কোনো মানে হয় না। সে একটু বাদেই চেকআউট করে চলে যাবে এয়ারপোর্ট, সেখানে কোনো না কোনো ফ্লাইটে সে জায়গা পাবেই।

এবার নিজেই বেজে উঠলো টেলিফোন। সেটা তুলেই অতীন জিজ্ঞেস করলো, পাওয়া গেছে টিকিট?

শর্মিলা বললো, বাবলু, টিকিটের ব্যাপার নিয়ে খুব মুশকিল দেখা দিয়েছে। সতীশ ভাটিয়া টরেন্টোতে গেছে, তার সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না। কল্যাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু ওর যে বন্ধু ট্রাল এজেন্ট, সে বললো, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে টিকিট পাবার কোনো আশা নেই। সব কটা এয়ারলাইনস হেভিলি বুকড। তার ওপর কী হয়েছে, আজ এয়ার ফ্রান্সের একটা জেট ক্রাশ করেছে শুনেছো? এয়ার ফ্রান্স আপাতত বন্ধ। আর এয়ারইণ্ডিয়ার লন্ডনের গ্রাউন্ড স্টাফ স্ট্রাইক করেছে, তাই এয়ার ইণ্ডিয়ার ফ্লাইট এখান থেকে যাচ্ছে না। সব ডিজরাপটেড় হয়ে গেছে। আমি এয়ার ইণ্ডিয়ার এখানকার ম্যানেজারকে বাড়িতে ফোন করেছিলাম, সব বুঝিয়ে বলাতে উনি দুঃখ প্রকাশ করলেন, এখন কোনোই নাকি উপায় নেই ওঁদের।

অতীন খুব শান্ত ঠাণ্ডা গলায় বললো, ঠিক আছে, আমি আগে গিয়ে পৌঁছেই, তারপর একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবেই। তুমি চিন্তা করো না।

শর্মিলা বললো, তোমার কী হয়েছে বাবলু? শরীর খারাপ লাগছে?

–না তো। কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি।

–কল্যাণের বন্ধু বললো, মঙ্গলবার জাপান এয়ার লাইনসের একটা টিকিটের ব্যবস্থা হতে পারে, তাও ওয়েস্ট কোস্ট দিয়ে, ব্যাংকক পর্যন্ত পৌঁছে দেবে, বাকিটুকু কনফার্মড নয়, ওখানে পৌঁছে চান্স নিতে হবে।

–মঙ্গলবারের টিকিট দিয়ে আমি কী করবো? বলছি তো, আমি নিউ ইয়র্ক গিয়ে ঠিকই ব্যবস্থা করবো যা হোক, কালই পৌঁছোচ্ছি। রণ আর অনীতা খেয়ে নিয়েছে?

–ওরকম ভাবে কথা বলছো কেন বাবলু? সত্যি করে বলল, তোমার কী হয়েছে?

–আমার কিচ্ছু হয়নি। মিলি, আমি যদি এই চাকরিতে রেজিগনেশান দিই, তোমার আপত্তি আছে?

–একটুও না!

–অ্যামেরিকান কম্পানির হয়ে চায়নায় ম্যাজিক ফার্টিলাইজার গছাবার জন্য মুখের রক্ত তুলে খাটছি। জিমি বলেছিল, তোমাদের ইণ্ডিয়ায় তো আরও বেশি ফার্টিলাইজার দরকার। তুমি সেজন্য কিছু করতে পারো না? সেই কথাটা হঠাৎ এখন খুবই অপমানের মতন লাগছে। এই চাকরিটা আমি ছেড়েই দেবো!

–ঠিক আছে, চাকরি ছেড়ে দাও। তোমার গলাটা খুব টায়ার্ড শোনাচ্ছে বাবলু। এত খাটুনিরও কোনো মানে হয় না। যদি বলো তো, আমরা সবাই দেশে ফিরে যেতে পারি তোমার সঙ্গে। নেক্সট অ্যাভেইলেবল ফ্লাইটে। রণ আর অনীতাকে জোর করে নিয়ে যেতে হবে দরকার হলে।

–ছেলে-মেয়েদের কান্না আমরা কি বেশিদিন সহ্য করতে পারবো? আমাদের মন দুর্বল হয়ে যাবে। তা ছাড়া সামনেই অনীতার পরীক্ষা।

একটু পরে ফোনটা রেখে দিয়ে অতীন চুপ করে বসে রইলো। আরও কী যেন একটা বাকি আছে? মা হরিদ্বারে মুন্নির কাছে। মুন্নি বাবাকে এত ভালোবাসে, সে বাবাকে আর দেখতে পাবে না? বাবা কি এর মধ্যে চলে গেছেন, না আছেন? ফুলদি এমন হুড়োহুড়ি করে প্লেন ধরলো কেন?

ও, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, এখনো বাকি আছে জিমিকে ফোন করা। জো ম্যাককরমিকের বদলে জিমিকেই সে খবরটা জানাবে আগে। জিমি তার প্রকৃত বন্ধু। সে ঠিক বুঝবে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় কারুকে বাড়িতে পাওয়া খুবই অনিশ্চিত। জিমির স্ত্রী সেরা ফোন ধরলো। সেরাও অতীনকে চেনে, বেশ কয়েকবার ডিনার খাইয়েছে। সেরা একটু কুণ্ঠিত ভাবে বললো, শোনো ওটিন, জিমি তো পাশের বাড়িতে টেনিস খেলতে গেছে, তোমার কি খুবই দরকার? কাল সকালে ফোন করলে হয় না। কিংবা অধিক রাতে?

অতীনও বিনীত ভাবে বললো, ক্ষমা করো, সেরা, সত্যিই খুব প্রয়োজনীয় কথা আছে। জীবন মরণের প্রশ্ন। তুমি ওকে ডাকো। আমি দশ মিনিট পরেই আবার রিং করছি।

জিমি গারনার মাঝে মাঝে সরল সরল প্রশ্ন করে অতীনকে খোঁচায় বটে কিন্তু সে মোটেই বোকা সোকা মানুষ নয়। এদেশের অনেক কিছুই অপছন্দ করে অতীন, কিন্তু জিমি গারনারের মতন কয়েকজন মানুষকে শ্রদ্ধা না করে পারে না। পরোপকারী, বন্ধুবৎসল। হিংসে বলে কোনো জিনিস নেই মনের মধ্যে। এদেশে বিশেষজ্ঞ হওয়াটাই রেওয়াজ, যে ইতিহাস ভূগোল কিছুই জানে না, সে হয়তো অর্থনীতিটা ভালো বোঝে। যে বিজ্ঞানের পণ্ডিত, সে সমাজতত্ত্ব নিয়ে একটুও মাথা ঘামায় না। জিমিও অর্থনীতি ভালো জানে, সে একবার ভারত ঘুরে এসেছে, সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন। সে একবার বলেছিল, আমি যদি ভারতীয় হতাম, তা হলে সোসালিজমই সাপোর্ট করতাম। আমেরিকায় আমি ক্যাপিট্যালিজিমের কোনো দোষ দেখি না, এখানে এ সিস্টেমটা ভালোই ওয়ার্ক করছে। তুমি যাই-ই বলল ওটিন, আমাদের পঁচিশ কোটি মানুষের মধ্যে বড় জোর পঁচিশ হাজার ভবঘুরে কিংবা স্বেচ্ছায় ভিখিরি। আর তোমাদের আশি। কোটি মানুষের মধ্যে তিরিশ কোটিই দারিদ্র্য সীমার নীচে। তোমাদের দেশে সমবণ্টন ছাড়া গত্যন্তর নেই।

অতীন বলেছিল, মূর্খ, সমাজতন্ত্র কখনো দুটো পাঁচটা দেশে টিকতে পারে না। সারা পৃথিবীটাকেই ঐ সিসটেমের মধ্যে আনা দরকার। ক্যাপিট্যালিজিমের মূল লক্ষ্যই হলো দুর্বল রাষ্ট্রগুলিকে শোষণ, তোমরা, জাপানীরা আর পশ্চিম ইওরোপের রাষ্ট্রগুলি এখন যা করছে, এতে কখনো গরিব দেশের সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্র সফল হতে পারে?

জিমি বললো, তুমি যাকে শোষণ বলছে, আমি তাকে বলবো, প্রতিযোগিতা। প্রকৃতির মধ্যে, সমস্ত প্রাণী জগতে সব সময় এই প্রতিযোগিতা চলছে। শুধু মানুষের স্বভাব থেকে সেটা বাদ দিতে চাও?

অতীন বললো, মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবেই তা জানি কিন্তু এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা। এর পেছনে থাকে অস্ত্রবলের হুমকি!

জিমি হাসতে হাসতে বলেছিল, তাও ঠিক বটে! তা হলে দরকার হচ্ছে ক্যাপিটালিজিমের সঙ্গে সোসালিজমের একটা চূড়ান্ত লড়াই! তাই না? কে জেতে কে হারে! ঐ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে বলো তো? কেউ না! মানুষের সভ্যতার দুটো হাত যখন পরস্পরের দিকে অ্যাটম আর হাইড্রোজেন বম ছুঁড়ে মারবে, তখন আর মানুষ থাকবে না, জয়ী হবে শুধু ধ্বংস।

ঠিক দশ মিনিট বাদে আবার রিং করতেই জিমি সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিয়ে বললো, জীবন মরণের প্রশ্ন? বটে! ইঁট বেটার বী টু। টেনিস খেলা ছেড়ে এসে আমি আফিসের সমস্যা নিয়ে। মাথা ঘামাতে চাই না, তুমি জানো!

অতীন বললো, জিমি, আমার বাবা খুব অসুস্থ। পারহ্যাপস হি ইজ ডাইং। জিমি বললো, এতে মরণের ব্যাপারটা বোঝা গেল। আর জীবনের ব্যাপারটা কী?

–আমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।

–গুড! পৃথিবীতে অনেকেই চাকরি ছাড়ে। এমন কিছু নতুন কথা নয়। সে জন্য এত রাত্রে আমাকে বিরক্ত করার কী মানে হয়? আমি তোমার বস্ নই। ডেনভারে এখন রাত দশটা, এখানে এখন বারোটা তা জানো?

–বন্ধু হিসেবে তোমার কাছে আমি একটা পরামর্শ চাই। চাকরি আমি ছাড়বোই। কিন্তু এরকম মাঝপথে…শোনো, মনে করো, তোমার বাবা, অনেক দূরের কোথাও খুবই সুস্থ, তোমাকে দেখতে চান, তোমার এক্ষুনি যাওয়া দরকার। কিন্তু অফিসের অনেক কাজের দায়িত্ব তোমার মাথার ওপরে চাপানো। সেইসব কাজ বড়, না বাবাকে দেখতে যাওয়াটা আরও অনেক বড়? এটা মনুষ্যত্বের প্রশ্ন। এই রকম ক্ষেত্রে অফিসের দায়িত্বটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলা কি ইমরাল? খুব অন্যায়?

–এক এক করে উত্তর দিচ্ছি। প্রথম কথা, আমার যখন তিন বছর বয়েস তখন আমার বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। আমি মায়ের কাছেই ছেলেবেলাটা কাটিয়েছি। আমার মা পরে আবার বিয়ে করেছে, তখন থেকে আমি হস্টেলে। বাবাকে আমি খুব কমই দেখেছি, সুতরাং আই হ্যাভ হার্ডলি এনি ফিলিং ফর মাই ফাদার। তার মুখটাও মনে করতে পারি না। ফর দ্যাট ম্যাটার, আমার মা সম্পর্কেও সে রকম কিছু দুর্বলতা নেই, কারণ, মায়ের দ্বিতীয় পক্ষের দুটো ছেলে-মেয়ে হয়েছিল, তাদের নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকতেন। আমাদের সমাজে এরকম সম্পর্ক কিছুই অস্বাভাবিক নয়। অপর পক্ষে, তোমরা প্রাচ্যদেশীয়রা, এখনো পিতা-মাতার সঙ্গে সারাজীবন সম্পর্ক রাখো, তোমাদের একটা পারিবারিক বন্ধন আছে, সেটা খুব ভালো ব্যাপার। এই দ্যাখো না, সেরার মা আর বাবা এখন কে কোথায় আছে, সেরা ঠিক বলতেই পারবে না। তোমাদের দেশে এ রকম হতে পারে? সুতরাং বুঝতেই পারছো, তোমার অনুভূতি আর আমার অনুভূতি এক হতেই পারে না। আমার বাবার মৃত্যু সংবাদ পেলে আমি হয়তো একবার কবরখানায় যাবো, কিন্তু তার আগে, হাসপাতালে তাকে দেখতে যাওয়া বোধ হয় আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না। ক্লিয়ার? ইজ দ্যাট আন্ডারস্টুড.?

–কিন্তু জিমি, যদি তোমার বাবার সঙ্গে তোমার ক্লোজ সম্পর্ক থাকতো, যদি তোমার বাবার একটাই বিয়ে হতো, সে রকমও তো অনেকে আছে এখানে–

–ওয়েট, ওয়েট, অত হাইপথিসিস-এ কাজ নেই। তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। প্রাচ্যদেশীয়রা বাবা-মায়ের অসুখ শুনলেই দৌড়ে যায়, এটা আমি জানি। কিন্তু তোমার পক্ষে দৌড়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, দুদিকে দুটো মহাসমুদ্র আছে। আগামী দু’দিনে তুমি কোনোক্রমেই অ্যামেরিকা ছেড়ে ভারতে যেতে পারছে না, সুতরাং চাকরি ছাড়ার জন্য এত ব্যস্ততার কী আছে? এই দু’দিন তুমি অফিসের কাজ করে নাও। ডেনভার থেকে চলে যাও সান্টা ফে, কেল্লা ফতে করো, তারপর কোম্পানিই তোমাকে একগাদা টাকা দিয়ে ভারতে পাঠাবে!

–আগামী দু’দিন আমি আমেরিকা ছেড়ে যেতে পারবো না কেন? তুমি টিকিটের রাশ-এর কথা ভাবছো? যেমন করেই হোক আমি টিকিট যোগাড় করবো, আই মাস্ট, আমার বাবার সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে, অ্যাট এনি কষ্ট…

–তোমার ইচ্ছেটা খুব নোবল। কিন্তু উপায় সত্যিই নেই। তুমি নিজেকে এখনো খুব ভারতীয় মনে কর, বাট ইউ আর না লংগার অ্যান ইন্ডিয়ান। তুমি এখন একজন অ্যামেরিকান। তোমার অ্যামেরিকান পাসপোর্ট। ভারতে যেতে হলে তোমাকে ভিসা নিতে হবে। শনিরবিবার সব ছুটি, তোমাকে কেউ ভিসা দেবে না! টিকিটের প্রশ্ন পরে…

অতীনের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। এই কথাটা তার মনেও আসেনি। মাত্র সাড়ে চার মাস আগে তার নাগরিকত্ব বদল হয়েছে, সে অ্যামেরিকান পাসপোর্ট নিয়েছে। এ দেশে যেসব ভারতীয় দম্পতি অনেকদিন আছে, তারা সময়মতন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজন ভারতীয় পাসপোর্ট রেখে দেয়। অন্যজন অ্যামেরিকান পাসপোর্ট নেয়। তাতে দু’নৌকোতেই পা রাখা যায়। অতীন নিজের পাসপোর্ট বদলেছে শুধু কাজের সুবিধের জন্য। কোম্পানির কাজে তাকে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়, ভারতীয় পাসপোর্ট থাকলে অনেক দেশের ভিসা পেতে ঝামেলা ও সময় লাগে। অনেক। বিশেষত চীন তো ভিসা দিতেই চায় না। তার কোম্পানিই বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে তার অ্যামেরিকান সিটিজেনশীপের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অতীন কি শর্মিলার চেয়েও ভুলো-মনা হয়ে গেল? অথবা, সে এটা মনে রাখতে চায় না!

অতীনের সাময়িক নীরবতায় জিমি গারনার ঠাট্টার সুরে হাসতে হাসতে বললো, ওটিন মাঝুমদার, ইউ আর ট্র্যাপড! ইউ আর অ্যান অ্যামেরিকান নাউ। তুমি যখন তখন ইচ্ছে। করলেই ভারতে যেতে পারো না! ইউ হ্যাভ টু হ্যাভ আ প্রপার ভিজা! তাহলে আর এই দুটো দিন নষ্ট করবে কেন, অফিসের কাজ করে নাও! টাকাটা পেয়ে যাবে, আমি ব্যবস্থা করে দেবো!

অতীন এবার বিকট রাগের সঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল, ড্যাম ইউ! ড্যাম ইউ! আমি বলেছি, আমি এই কোম্পানির কাজ আর করবো না। আমার বাবা মৃত্যুশয্যায়, কিংবা কী হয়েছে। কে জানে, এর মধ্যে এখন আমি অফিসের কাজের কথা ভাববো?

জিমি তবু হাসতে হাসতে বললো, কাম ডাউন, কাম ডাউন! নো পয়েন্ট শাউটিং অ্যাট মি! আমি কেউ না। তুমি আমার কাছে পরামর্শ চাইছো। ইন্ডিয়ান এমব্যাসির লোকজনরা কি শনি বা রবিবার ছুটির মধ্যে তোমার ভিসা দেবে? আই ডোন্ট থিংক সো। সুতরাং, এসো, আমরা বাস্তববাদী হই। দুটো দিন তোমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। তাহলে এই দুটো দিন কাজে লাগালে ক্ষতি কি? আর একটা কথা বলবো? তুমি ঐ যে একটু আগে বললে, একটা কর্তব্য সম্পাদনের মাঝপথে দায়িত্ব কাঁধ থেকে নামিয়ে দেওয়া ইমমরাল কি না, এই যে এই প্রশ্নটা। তোমার মনে জেগেছে, এর তাৎপর্যই হলো এই যে দা ওয়েস্ট হ্যাঁজ অলরেডি বাগড় ইউ! ইউ আর থরোলি ওয়েস্টারনাইজড, ওটিন! তুমি যদি এখনো প্রাচচদেশীয় থাকতে, তা হলে তুমি মনে মনে বলতে, চাকরিই যখন ছেড়ে দিচ্ছি, তখন এই গড় ড্যাম্ অ্যামেরিকান কোম্পানিটার লাভ হলো, না লোকসান হলো তাতে আমার কী আসে যায়? তুমি তা ভাবোনি। তুমি কাজকে সম্মান দিতে শিখেছে। তা হলে, বাকি দু’দিনে কাজটা সম্পূর্ণ করে নাও! তুমি এ পর্যন্ত যা করে এসেছে, তা হাইলি অ্যাপ্রিশিয়েটেড…

অতীন উচ্চগ্রামে বলে যেতে লাগলো, নো, নো, নো, নো…

দু’ঘণ্টা পরেও অতীন স্নান করলো না, কিছু খেলো না, পোশাকও পরেনি, একই জায়গায় বসে আছে মেঝের কার্পেটের ওপর। পর্যায়ক্রমে সে কৌশিক আর অলির কথা ভাবছে। ওরা এখন কী মনে করছে তার সম্পর্কে, সেটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এর মাঝে মাঝে সে দেখতে পাচ্ছে তার মাকে। মা সাদা শাড়ী পরা। মায়ের এই রূপটা সে কিছুতে সহ্য। করতে পারছে না।

খাটের তলায় রয়েছে মদের বোতলটা। কিন্তু অতীনের আর পান করার প্রবৃত্তি হলো না। বহুক্ষণ বাদে সে একটা সিগারেট ধরালো। তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে গেল জানলার ধারে। বাথরুমে দুটো কল খোলা, জল পড়ার শব্দ হচ্ছে, বাথটাব উপছে জল গড়াচ্ছে সারা মেঝেতে, তবে এই হোটেলটা কাঠের তৈরি নয়, পাথরের, কোথাও একটা নর্দমা আছে নিশ্চয়ই বাথরুমে, নইলে এতক্ষণে হৈচৈ পড়ে যেত।

অতীন জলের শব্দে ভ্রূক্ষেপও করলো না। সে খুলে দিল জানলার কাঁচ। প্রথম এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া মুখে মেখে সে এতই তৃপ্ত বোধ করলো যে সে জানলা ডিঙিয়ে চলে এলো বাইরে। সামনেই ফায়ার এসকেপের ঘোরানো লোহার সিঁড়ি। অতীন সেই সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ালো। এটা হোটেলের পেছন দিক, একটা সরু রাস্তা, এই রাস্তাতেও গাড়ি চলাচলের বিরাম নেই, ওপর দিকে যে-কেউ তাকালে একটি উলঙ্গ পুরুষ মূর্তি দেখতে পাবে।

অতীন একবার একটু ঝুঁকে ভাবলো। এখান থেকে লাফিয়ে পড়লে কেমন হয়? অন্য যে কারুর ছাতু হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তার কিছু হবে না, বেঁচে যাওয়াই তার নিয়তি। সে জলে ডুবেও মরেনি, একবার দোতলা বাসে আগুন লেগেছিল, সে ছুটে বেরিয়ে এসেছে। উত্তর বাংলায় বোমার আঘাতটা তার গায়ে না লেগে লেগেছিল মানিকদার গায়ে, আর একবার চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়েও তার কোনো ক্ষতি হলো না, একদিন সে সাইকেল চালিয়ে আসছিল, একটা গাড়ি ধাক্কা দিল, তবু তার গায়ে আঁচড় লাগলো না। এই তো কিছুদিন আগে, অ্যারিজোনার টুন শহর থেকে তার একটা প্লেন ধরার কথা ছিল, ঠিক সময়ে এসে সে পৌঁছোতে পারলো না। সে গেল একঘণ্টা পরের একটা ফ্লাইটে, আর আগের প্লেনটা, যাতে তার সীট বুক করা ছিল, সেটা মুখ থুবড়ে মরলো মরুভূমিতে। কেন এমন হয়? তার এই বেঁচে থাকা কিসের বিনিময়ে? সে নিজে বেঁচে গিয়ে তার দাদাকে মেরেছে! না, না, সে তো একবারও তার দাদার সাহায্য চায়নি, দাদা নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জলে। অতীনের যদি সাধ্য থাকলে, তা হলে সে এক শো বারও নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাদাকে বাঁচাতে চেষ্টা করতে না! মানিকদাকে সে সেইভাবেই বাঁচাতে যায়নি? ঠিক সেই মুহূর্তে মানিকদা তার নিজের দাদা হয়ে গিয়েছিল, কেউ তা বুঝলো না! এমনকি, মানিকদাও পরে বলেছিলেন, তুই কেন পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক গুলি চালালি? সেই বদমাশটার লোহার ডান্ডা খেয়ে মানিকদা মরে গেলে কি এই প্রশ্ন করতে পারতেন! তবু মানিকদা শেষ পর্যন্ত বাঁচলেন না। অতীন কি অলিকেও মেরেছে? যে অলিকে সে প্রথম যৌবনে চিনতো, সেই অলি তো আর কোথাও নেই! জামসেদপুরে, প্রবল জ্বরের মধ্যে, অনেকদিন আত্মগোপন করে করে বিমর্ষ অবস্থায় যখন অতীনের ধারণা হয়েছিল, তার আর বাঁচার আশা নেই, আর জ্বরের ঘোরে একদিন শর্মিলাকেই সে অলি বলে ভেবেছিল। কেউ সে কথা জানে না। অলিকে অপমান করবে না বলেই সে আর পরে অলিকে সেদিনের ঘটনাটা বলতে পারেনি। কৌশিক-পমপমরা মনে করে, শুধু ডলারের ঝনঝনানির মোহ আর এলেবেলে পার্থিব সুখের জন্য সে এ দেশে পড়ে আছে! ওঃ মা, মাগো! তুমিও কি তাই ভাবো!

ফায়ার এসকেপের ঠাণ্ডা লোহার সিঁড়িতে বসে নগ্ন অবস্থায় অতীন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। এখানে কেউ তাকে দেখবে না। একবার একটু পেছনদিকে হেললেই সে নীচে পড়ে যাবে।

আজকের আকাশ বেশ পরিষ্কার। ফিনকি দিচ্ছে জ্যোৎস্না, প্রচুর নক্ষত্র এখন জাগ্রত হয়েছে। একদিকে আটলান্টিক, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগর। এর মাঝখানের ভূখণ্ডে আটকা পড়ে আছে অতীন। প্লেনের টিকিট নেই। নিজের দেশে ফিরতে গেলেও তাকে ভিসা নিতে হবে। শুধু তার কান্নার বাষ্প হয়তো উড়ে যাচ্ছে প্রাচ্যের দিকে।

শুধু কান্নাই যায়। আর বহু আশা-আকাঙ্ক্ষা, জীবন বদলের ব্যাকুলতা ছুটে আসে এই দিকে। সমুদ্র পেরিয়ে এই মুহূর্তে ভারত উপমহাদেশের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে প্রতীক্ষায় অধীর হয়ে আছে, কবে তারা এ দেশে আসার সুযোগ পাবে। পাসপোর্ট, ভিসা, স্পনসরশীপ, চাকরি, কলেজে অ্যাডমিশান, গ্রীন কার্ড। কিছু একটা পেলেই মোক্ষ মিলে যাবে, অন্তত সমস্যাপীড়িত ঐতিহ্য থেকে মুক্তি। টাইম, ইউ ওল্ড জিপসি ম্যান! সময় কোনো দেশে, কোনো রাজধানীতে বেশিদিন থেমে থাকে না। এই তো কিছুদিন আগেও ইতিহাসের যাত্রা ছিল পূর্ব দিকে। আলেকজান্ডার, আট্টিলা, মেগাস্থিনিস, ম্যাগেলান, কলাম্বাস, ভাস্কো ডা গামা। যত পুবে যাবে, ততই সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে। শুধু সোনাদানা নয়, পরমার্থিকও। হঠাৎ কবে যেন শুরু হয়ে গেল উল্টোদিকের প্রবাহ। আবার পূর্ব থেকে পশ্চিমে ফেরা। বারুদ আবিষ্কার করেছিল চীন, কিন্তু কামান গর্জনের প্রতাপ ঘোষিত হলো প্রতীচ্যে। শুধু ঐহিক সুখ-সমৃদ্ধি নয়। একটা মুক্ত জীবনের স্বপ্নময় ছবিও যেন ঝলসে উঠলো সেখানে। শুধু স্বাধীনতা নয়, তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় একটি অশ্রুতপূর্ব ধারণা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা! যৌবনের জলতরঙ্গ এখন ধাইছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। ইসকনের কয়েক হাজার নারী-পুরুষ শাড়ি কিংবা ধুতি পরে, কৃষ্ণনাম করে নেচে-গেয়ে একটু নতুনত্ব দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের কয়েক কোটি ছেলেমেয়ে এখন শুধু বিদেশী পোশাক পরে, মাতৃভাষার বদলে বিদেশী ভাষা বলে, স্বদেশের ঐতিহ্যের তোয়াক্কা করে না। তারাও নাচে, আনন্দ করে শুধু পশ্চিমের গানবাজনা শুনে। তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, বাড়তেই থাকবে।

পশ্চিমের সৌন্দর্য বড় মোহময়, কারণ তার পেছনে আছে সর্বনাশের বহুবর্ণ আভা। সেদিকে তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণেরও দুটি ভাগ, তার মধ্যে পশ্চিম টানছে পূর্বকে। একসময় গোটা প্রাচ্যের পশ্চিম সীমা ছিল রোম সাম্রাজ্য। কী দারুণ দীপ্তি ছিল তার। যতই ভোগ-ঐশ্বর্যের উচ্চ শিখরে উঠছিল রোম, ততই ধ্বংসের বিকিরণ চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। ঠিক যেন সূর্যাস্তের বর্ণচ্ছটা।

প্রাচীন ইজিপশিয়ান সাম্রাজ্যের গৌরব টিকে ছিল প্রায় সাতাশ শো বছর ধরে। বাইজানটাইন সভ্যতা এক হাজার বছর, অটোমান এম্পায়ার পাঁচ শো বছর। পশ্চিমের ধনতন্ত্র আর কতদিন? আবার কি কোনোদিন সময় নামে যাযাবরটি পশ্চিম থেকে পুবে গিয়ে তাঁবু গাড়বে? তার আগে বুদবুদের মতো শেষ হয়ে যাবে না তো এই ছোট্ট পৃথিবী? মহাশূন্য আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটা বড় ছোট হয়ে গেছে। তাই বুঝি এর প্রতি আর বড় বড় রাষ্ট্রনায়কদের মায়া নেই? তারা কি ভাবছে, এখানে কয়েকটি অ্যাটম-হাইড্রোজেন বোমা ফেলে দিয়ে, এত বেশি জনতার ভিড় থেকে মুক্তি পেয়ে তাঁরা চাঁদে কি মঙ্গলগ্রহে গিয়ে বসতি গড়বে? সেখানেও পূর্ব-পশ্চিম থাকবে। এমনকি, এই সূর্যের আওতা থেকে ছিটকে গিয়ে অন্য কোনো গ্রহমণ্ডলীর মধ্যে নতুন উপনিবেশ গড়লেও মানুষের পূর্ব-পশ্চিম থেকে নিষ্কৃতি নেই। মানুষকে তো কোনো না কোনো সময়ে নিজের মনের দিকে তাকাতেই হবে।

ঝন ঝন করে আবার টেলিফোন বাজতেই অতীন চোখ মেলে মাথা উঁচু করলো। কে ডাকছে? শর্মিলা, না অলি? বাবা বেঁচে আছেন, না নেই? কী হবে জেনে? দু’দিকে দুই মহাসাগর, অতীনের টিকিট নেই, ভিসা নেই। সে তো আর হনুমানের মতন লাফিয়ে পার হয়ে। যেতে পারবে না! কারুকে এই অবস্থাটা ব্যাখ্যা করারও মানে হয় না। অতীন খাঁচায় বন্দী, সুতরাং তার বাবা বেঁচে আছেন কি না, তা জানার কোনো দরকার নেই। তার শরীরে এখন কোনো পোশাক নেই, সে শুয়ে আছে প্রায় শূন্যের ওপর। প্রায় একটা জন্তুর মতন, ধরা যাক আদি মানব, অর্থাৎ বাঁদর। তা হলে তাকে ভারতীয় কিংবা অ্যামেরিকান, কোনো জাতের মধ্যে ফেলা যাবে না। বাঃ, এই তো ভালো। বাজুক টেলিফোন, বেজে চলুক, আওয়াজটা মন্দ লাগছে না!

পৃথিবীর একদিকে যখন আলো, অন্যদিকে তখন অন্ধকার। একদিকে জাগরণ, অন্যদিকে ঘুম। কোথাও আবার দিনের বেলাতেও অন্ধকার, কোথাও রাত্তিরেও আলোর উৎসব। ডেনভারে এখন গভীর রাত, কলকাতায় প্রায় দুপুর। একই পৃথিবীর দু’প্রান্তের মানুষ অনুভবই করে না যে তাদের মাঝখানে রিখ বদলে গেছে। অতীন যে সময়টাকে মনে করছে আজ। কলকাতার মানুষ ঠিক সেই সময়টাকেই মনে করছে গতকাল।

অতীন যখন গভীর রাতে ডেনভারের নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে একবার তাকালো, তখন কলকাতায়, প্রখর মধ্যাহে একটি নার্সিংহোমের সামনে ছোটখাটো একটি ভিড় জমেছে। যে-প্রতাপ মজুমদার দুদিন আগেও বিকেল-সন্ধে কাটাবার জন্য কার বাড়িতে যাবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না, আজ তাঁকেই দেখার জন্য এসেছেন বেশ অনেকেই। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে অবশ্য প্রবেশ অধিকার আছে শুধু অলির। মমতার কাছে খবর গেছে। তিনি এখনও পৌঁছতে পারেননি। তুতুল এখনো আকাশে। অতীনের কাছ থেকে পৌঁছয়নি কোনো বার্তা। প্রতাপ সেসব কোনোই অভাব বোধ করছেন না। তাঁর নাকে নল লাগানো থাকলেও চেতনা সম্প্রতি ফিরে এসেছে পুরোপুরি, অলি যে তাঁর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তা তিনি অনুভব করছেন, তাঁর ভালো লাগছে। অলি কোথা থেকে এখানে এলো, তা অবশ্য তিনি মনে করতে পারছেন না। এই জায়গাটাই বা কোথায়?

প্রতাপ বলতে চাইলেন, পায়ের দিকের জানলা দুটো খুলে দে তো, অলি!

প্রতাপের কণ্ঠস্বর একটুও ফুটলো না, অলি কিছুই বুঝতে পারলো না। তবু তাতেও কোনো অসুবিধে হলো না অবশ্য। অন্য কে যেন দমাস দমাস করে খুলে দিল জানলা দুটো। প্রতাপ দেখলেন তার বাইরে হরিৎ প্রান্তর। প্রায় দিগন্ত ছড়ানো। তারপর নদী। আবার ফসলের ক্ষেত, আবার নদী, একটা জলাভূমি, চৌধুরীদের পোডো বাড়ি। সুলেমান চাচার কাছারি, পীর সাহেবের মাজার, শিব মন্দির, ঠিক যেন একটা নৌকো দুলে দুলে যাচ্ছে, তিনি দেখছেন। তারপর নৌকো যেখানে থামলো, সেই ঘাটলায় একটা মকরমুখো বড় পাথর। আরে, এ যে মালখানগরের মজুমদারদের নিজস্ব ঘাট! ঠিক সেই রকমই আছে। ভিসা লাগলো না, পাসপোর্ট লাগলো না, তবু প্রতাপ এখানে পৌঁছে গেলেন কী করে? তা হলে এখনো আসা যায়? প্রতাপ বিশেষ অবাক হলেন না। তাঁর মনটা খুশীতে ভরে গেছে। ঘাটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন নীল শাড়ি পরা সুহাসিনী। রিপন কলেজ থেকে পুজোর ছুটিতে বাড়িতে আসার সময় প্রতাপ মায়ের ঠিক এই যুবতী চেহারাটাই দেখতেন। তবু প্রতাপের একবার মনে হলো, দেওঘরে মৃত্যুর আগে, মা বলেছিলেন, খুকন, তুই একবার আমারে সেই বাড়িতে নিয়া যাবি? প্রতাপ তখন কিছুই করতে পারেননি, তবু মা সেখানে পৌঁছে গেছেন? বাঃ, বেশ মজা তে।

প্রতাপ একবার চেয়ে দেখলেন, সেই বাড়ি, আটচালা, উঠোনের তিনদিকে পিসি-মাসিদের ঘর একই রকম আছে। সেই আম গাছ, অন্যদিকে বাতাবি লেবুর গাছ, দক্ষিণের পুকুরে মাছের ঘাই, তার অন্যপারে রহস্যময় জঙ্গল, সব ঠিকই আছে। এক্ষুনি যেন বাবা খড়ম ফটফটিয়ে আসবেন। কলকাতার থেকে এখানকার বাতাসে কত আরাম!

অলি যেন তাঁর বাল্যকালের খেলার সঙ্গী, এইভাবে প্রতাপ তার দিকে চেয়ে সকৌতুকে বললেন, আমি চলোম রে, তোরা আর আমায় ধরতে পারবি না। আমি মা’র কাছে যাচ্ছি! ঐ

তারপর প্রতাপ পরম সন্তোষে চোখ বুজলেন।

মায়ের কাছে যাবার আগে পা ধুয়ে নিতে হবে। পায়ে কাদা লেগেছে। সারা গায়ে এত ময়লা এলো কোথা থেকে। ও, তিনি রাস্তার ধারে একটা নর্দমায় শুয়ে ছিলেন, সেই কাদা। এখনো ওঠেনি। এমনভাবে মাকে জড়িয়ে ধরা যায় না। শুধু পা ধুলেই হবে না। সমস্ত শরীর পরিষ্কার করতে হবে। ঘাট থেকে প্রতাপ আবার জলে নামতে লাগলেন, কী সুন্দর, স্নিগ্ধ, স্নেহ স্পর্শের মতন জল, আর কী আরাম। প্রতাপ ডুব দিলেন সেই জলে।

সমাপ্ত

৬৫. লেখকের কথা

৬৫. লেখকের কথা

উপন্যাসে ভূমিকা, লেখকের বক্তব্য কিংবা কৈফিয়ত দেবার প্রথা নেই। কিন্তু আমার কিছু ঋণ স্বীকারের দায় আছে। এই উপন্যাসের পশ্চাৎপটে আছে সমসাময়িক ইতিহাস, বেশ কিছু রাজনৈতিক পালাবদল, কিছু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে উপস্থিত করা হয়েছে সরাসরি। এই সব তথ্য আমি সংগ্রহ করেছি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও বহু গ্রন্থ থেকে। কোনো কোনো আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিয়েছি, যেমন, জাহানারা ইমামের পারিবারিক ঘটনাটি আমি পেয়েছি তাঁর যুদ্ধকালীন ডায়েরি থেকে, যা পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসের মাঝে মাঝে পৃষ্ঠার নীচে ফুটনোট বড় বিসদৃশ দেখায়, তাই দেওয়া হয়নি। কিন্তু মূল সূত্র বুঝতে না পেরে কিছু কিছু পাঠক আমার তথ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের মাঝপথেই বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় আমার রচনার অংশবিশেষ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। একটি উদাহরণ দিচ্ছি, পঁয়ষট্টি সালের যুদ্ধের সময় ভারত-পাকিস্তান দুই ভূখণ্ডেই নতুন করে ধর্মীয় উন্মাদনার বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা বীভৎস ও বিচারবুদ্ধিহীন তো বটেই, এক এক সময় হাসির খোরাকও জুগিয়েছে। তারই একটি ছোট্ট ঘটনা এই যে, ঢাকার কয়েকজন মৌলবী জেহাদ ঘোষণা করে ছোট ছোট টিনের তলোয়ার কোমরে ঝুলিয়ে মসজিদে যেতেন নামাজ পড়তে। জেহাদের সময় ওটা সুন্নত। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেছেন, এটা আমার স্বকপোলকল্পিত বিদ্রূপ বা অজ্ঞতা। প্রথম অভিযোগটি একেবারেই সত্য নয়। দ্বিতীয়টি অধসত্য হতে পারে। পঁয়ষট্টির যুদ্ধের সময় আমি ঢাকা শহরে ছিলাম না। তকালীন পরিবেশের বিবরণ আমি পেয়েছি কয়েকটি গ্রন্থে, তার মধ্যে এই বিশেষ ঘটনাটি, পূর্ব পাকিস্তানের এক সময়ের মুখ্যমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান রচিত স্বৈরাচারের দশ বছর’ গ্রন্থ থেকে হুবহু উদ্ধৃত।

উপন্যাস মূলত কল্পনারই লীলাভূমি, তা তথ্যে ভারাক্রান্ত করা যায় না। তবু কোনো কোনো ঘটনার বিবরণ পাঠ করে কিছু কিছু উৎসুক পাঠক আমার কাছে জানতে চেয়েছেন যে ঐ সব। বিষয়ের বিস্তৃত বিবরণ কোন্ গ্রন্থে পাওয়া যায়। তাঁদের সুবিধের জন্য এবং আমার ঋণ স্বীকারের কর্তব্যবোধে এখানে একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থতালিকা দিচ্ছি। কিছু বই ইতিমধ্যেই হস্তান্তরিত হয়েছে বলে নাম দেওয়া গেল না।

১। একাত্তরের দিনগুলি–জাহানারা ইমাম

২। আমি বিজয় দেখেছি–এম আর আখতার মুকুল

৩। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে রফিকুল ইসলাম।

৪। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর–আবুল মনসুর আহমদ

৫। স্বাধীনতা ‘৭১ (দুই খণ্ড)–কাদের সিদ্দিকী।

৬। শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে–মযহরুল ইসলাম সম্পাদিত

৭। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস বশীর আলহেলাল

৮। স্বৈরাচারের দশ বছর–আতাউর রহমান খান

৯। কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও কবিতা–রফিকুল ইসলাম

১০। পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর তফাজ্জল হোসেন (মানিক মি)

১১। কোরআন শরীফ ভাই গিরিশচন্দ্র সেন অনুবাদিত

১২ হেরা পর্বতের সেই কোহিনূর শাহ সূফী আলহাজ শেখ শামউদ্দিন আহম্মদ

১৩। মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর–আবদুল মওদুদ

১৪। সেই যে আমার নানারঙের দিনগুলি যোবায়দা মির্যা

১৫। ভারত যখন স্বাধীন হচ্ছিল–মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
অনুঃ মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী।

১৬। বাংলাদেশের সন্ধানে মোবাশ্বের আলী।

১৭। বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ–কামরুদ্দীন আহমদ

১৮। জয়বাংলা, মুক্তিফৌজ ও শেখ মুজিব–কলহন।

১৯। পাক ভারতের রূপরেখা প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী

২০। ভাসানীর কাগমারি… সংগ্রাম শাহ আহমদ রেজা

২১। জাতীয়তাবাদ বিতর্ক–মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর সম্পাদিত

২২। আমরা স্বাধীন হলাম–কাজী সামসুজ্জামান।

২৩। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম–গাজীউল হক।

২৪। কথামালার রাজনীতি (১৯৭২-৭৯) রেজোয়ান সিদ্দিকী

২৫। একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র

২৬। শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ–রশীদ হায়দার সম্পাদিত

২৭। প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ সত্যেন সেন

২৮। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ–মিজানুর রহমান মিজান সম্পাদিত।

২৯। পাকিস্তান কোন পথে–গৌরীশঙ্কর চৌধুরী।

৩০। প্রভুপাদ সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী।

৩১। চারু মজুমদারের ঐতিহাসিক আটটি দলিল–শহীদ স্মরণ কমিটি।

৩২। Society and politics in East Pakistan–Badruddin Umar

৩৩। A Aish-E-Chinar–Sheikh Abdullam

৩৪। Dacca–Sharif Uddin Ahmed

৩৫। Financing the rural poor–Razia S. Ahmed

৩৬। Witness to Surrender – Siddique Salik

৩৭। The Rape of Bangladesh–Anthony Mascarenhas

৩৮। In the Wake of Naxalbari–Sumanta Bannerjee

৩৯। The Naxalite Movement–Sankar Ghosh

৪০। Naxalbari and After–A Frontier Anthology ইত্যাদি